📘 নবীজীর হাদীস ও ইমামগণের মতভেদ > 📄 মতানৈক্যের তৃতীয় কারণ: বাহ্যিকভাবে পরস্পর বিরোধী হাদিসের ক্ষেত্রে ইমামগণের মতবিরোধ

📄 মতানৈক্যের তৃতীয় কারণ: বাহ্যিকভাবে পরস্পর বিরোধী হাদিসের ক্ষেত্রে ইমামগণের মতবিরোধ


ইমামদের মতবিরোধের কারণসমূহের মাঝে তৃতীয় কারণটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে শরিয়তের ইলমের মহান দু'টি শাখা তথা ইলমুল হাদিস ও উসুলে ফিকাহ থেকে উপকৃত হওয়ার বিশেষ সুযোগ রয়েছে।

ইলমুল হাদিস থেকে উপকৃত হওয়ার পদ্ধতি হলো, একই বিষয়ে বর্ণিত একাধিক হাদিস ও আসার সম্পর্কে অবগত হওয়া। এবং মাস-আলার সঙ্গে নিকটবর্তী বা দূরবর্তী সম্পর্ক রয়েছে এমন বর্ণনাগুলো একত্রিত করা।

উসুলে ফিকাহ থেকে উপকৃত হওয়ার পদ্ধতি হলো, এর মাধ্যমে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে গৃহীত কায়দা ও হুকুম সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। উসুলে ফিকাহের ক্ষেত্রে যে যতো গভীর পান্ডিত্য অর্জন করবে, তাঁর বুঝ ও চিন্তা-চেতনা ততো বেশি সূক্ষ্ম, দৃঢ় ও সৃজনশীল হবে। পরস্পর বিরোধী নসের দলিলের মাঝে সমন্বয় সাধণের অসাধারণ যোগ্যতা সৃষ্টি হবে।

নীচের আলোচনায় আমরা বিষয়টি প্রত্যক্ষ করবো।

একজন প্রাথমিক স্তরের তালিবুল ইলমও অবগত রয়েছে, শরিয়তের অনেক মাসআলায় পরস্পর বিরোধী একাধিক হাদিস থাকে। কখনও একই বিষয়ে দু'য়ের অধিক অর্থের সম্ভাবনা থাকে। এই বিরোধ নিরসনে উলামায়ে কেরাম নীচের পদ্ধতিগুলো আলোচনা করেছেন,

প্রথম পদ্ধতি:

১. পরস্পর বিরোধী হাদিস দু'টির মাঝে এমনভাবে সমন্বয় করা যে উভয়টার উপর আমল করা সম্ভব হয়।

২. অথবা উভয়টা ব্যাখ্যা করা।

৩. অর্থের মাঝে সমন্বয় করার চেষ্টা করা।

দ্বিতীয় পদ্ধতি: উভয়টার মাঝে সমন্বয় সাধন সম্ভব না হলে একটিকে রহিত সাব্যস্ত করা।

তৃতীয় পদ্ধতি: আর যদি একটাকে রহিত প্রমাণ করা সম্ভব না হয় এবং রহিত হওয়ার দলিল না পাওয়া যায়, তবে দু'টোর যে কোন একটাকে প্রাধান্য দেয়া।

আলেমদের মাঝে কেউ কেউ তৃতীয় পদ্ধতিকে দ্বিতীয় পদ্ধতির উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। অর্থাৎ প্রথমে সমন্বয় সাধন এরপর, প্রাধান্য দান অত:পর, রহিতকরণ।

এই মাসলাক বা পদ্ধতিগুলোর বিস্তারিত বিবরণ বেশ দীর্ঘ। আমি নীচে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করছি,

১. দু'টি বিরোধপূর্ণ হাদিসের মাঝে সমন্বয় সাধনের ক্ষেত্রে মানুষের বুঝশক্তি বিশেষ ভূমিকা পালন করে। পরস্পর বিরোধী দু'টি হাদিসের ক্ষেত্রে কিছু আলেম দাবি করতে পারেন, এদের মাঝে সমন্বয় সাধন অসম্ভব, কিন্তু আলাহ তায়ালা অন্য কোন আলেমের নিকট বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়ে থাকেন। ফলে তিনি উভয়ের মাঝে সমন্বয় সাধনের উপযুক্ত কারণ বিশ্লেষণ করেন। একারণে বাহ্যিকভাবে পরস্পর বিরোধী দু'টি হাদিসের মাঝে সমন্বয় সাধনের ক্ষেত্রে উলামায়ে কেরাম খুবই সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন এবং বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই ফয়সালা দিতে বলেছেন।

২. বিরোধপূর্ণ হাদিস দু'টির মাঝে সমন্বয় সাধন সম্ভব না হলে ইমাম যেকোন একটা রহিত হওয়ার দিকে মনোনিবেশ করেন। সুনির্দিষ্ট দলিল ছাড়া রহিত হওয়ার দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। রহিত হওয়ার প্রমাণগুলোকে মুয়াররিফাতুন নসখ বা রহিত হওয়ার পরিচয়ক বলা হয়। রহিত হওয়ার পরিচয়ক চারটি,

এক. রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর স্পষ্ট বর্ণনার দ্বারা রহিত হওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হওয়া। যেমন, মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদিস,

كنت نهيتكم عن زيارة القبور، فزوروها

অর্থ: আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম। এখন তোমরা কবর যিয়ারত করো।

দুই. কোন সাহাবির বক্তব্য দ্বারা রহিত হওয়া সম্পর্কে অবগত হওয়া। যেমন, আবু দাউদ ও নাসায়ী শরীফে বর্ণিত হজরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা. এর হাদিস,

كان آخر الأمرين من رسول الله صلى الله عليه وسلم ترك الوضوء مما مست النار

অর্থ: আগুনে স্পর্শকৃত বস্তু আহারের ক্ষেত্রে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএর সর্বশেষ আমল ছিলো ওজু না করা।

তিন. তারিখ বা সময়ের ব্যবধানের মাধ্যমে রহিত হওয়া সম্পর্কে অবগত হওয়া। যেমন, হজরত শাদ্দাদ ইবনে আওস রা. থেকে বর্ণিত, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

أفطر الحاجم و المحجوم

অর্থ: যে শিঙা লাগায় এবং যাকে শিঙা লাগানো হয়, উভয়ের রোজা ভেঙ্গে যাবে।

কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে, এটি অষ্টম হিজরীতে বর্ণিত হাদিস। এটি হযতর ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত হাদিস দ্বারা রহিত হবে। হজরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন,

إحتجم النبي صلي الله عليه وسلم وهو محرم صائم

অর্থ: রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোজা রেখে ইহরাম বাঁধা অবস্থায় শিঙা লাগিয়েছেন।

এটি বিদায় হজের সময়কার ঘটনা। বিদায় হজ হয়েছিলো দশম হিজরীতে।

অনেক ক্ষেত্রে সময়ের ব্যবধান নির্দেশক কিছু প্রমাণ দ্বারা রহিত হওয়ার বিষয়টি অবগত হওয়া যায়। যেমন, বর্ণনাকারী সাহাবি পূর্বে বর্ণিত হাদিসের পরে ইসলাম গ্রহণ করেছন এবং তিনি সরাসরি হাদিসটি রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট থেকে শোনার বিষয়টিও স্পষ্ট করেছেন। সুতরাং পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবির হাদিসটি পূর্বে ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবির হাদিস রহিত করবে।

এছাড়াও অনেক সূক্ষ্ম ও তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত রয়েছে, যার মাধ্যমে রহিত হওয়ার বিষয়টি নির্ণয় করা সম্ভব। তবে এর উপর খুবই তাত্ত্বিক ও বিশ্লেষণমূলক গবেষণা হওয়া আবশ্যক।

চার. হাদিস রহিত হওয়ার বিষয়টি এর বিপরীতে সঙ্ঘঠিত ইজমা দ্বারা সুস্পষ্ট হওয়া। কিন্তু ইজমা সঙ্ঘঠিত হওয়ার ব্যাপারটি প্রমাণ করা এবং কেউ এর বিরোধিতা করেনি এটা নিশ্চিত হওয়া কঠিন।

৩. যদি কোন একটি হাদিস রহিত প্রমাণ করা করা সম্ভব না হয়, তবে ইমামগণ দু'টির যে কোন একটিকে প্রাধান্য দেয়ার চেষ্টা করেন। দু'টি হাদিসের একটিকে প্রাধান্য দেয়া খুবই জটিল।

বিরোধপূর্ণ হাদিসের প্রথম ধাপ তথা উভয়ের মাঝে সমন্বয় সাধনের জন্য বিশেষ বুঝ ও উপযুক্ত আকল প্রয়োজন। দ্বিতীয় ধাপ তথা কোন একটা হাদিসকে রহিত প্রমাণের জন্য উক্ত হাদিস সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা থাকা জরুরি। তৃতীয় ধাপ তথা একটিকে প্রাধান্য দেয়ার ক্ষেত্রে বর্ণিত হাদিসের সম্পর্কে রেওয়াত ও দিরায়াত উভয় পদ্ধতির জ্ঞান থাকতে হবে। দিরায়াত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো হাদিসটি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান, ফিকাহ ও প্রখর বুঝ। আর রিওয়াতের জ্ঞান হলো, হাদিসের সঙ্গে সংশিষ্ট সকল বিষয় সম্পর্কে সম্যক অবগত হওয়া অর্থাৎ হাদিসের সনদ বিশ্লেষণ। সনদ বিশ্লেষণের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি কষ্টকর। অতঃপর, বর্ণনাকারী সাহাবিদের জীবনী, তাদের ইতিহাস, বর্ণনাকারীদের গুণাগুন, হাদিসে বর্ণিত শব্দ ইত্যাদি বিশ্লেষণ করা আবশ্যক।

আমি প্রথম সংস্করণে যখন এই বিষয়টা লিখি তখন উপর আমার মাথায় একটা উপযুক্ত উদাহরণ ছিলো। সেটি এখন উল্লেখ করছি,

কোন পাত্রে কুকুর মুখ দিলে তা পবিত্র করার পদ্ধতির ব্যাপারে অধিকাংশ ইমাম হজরত আবু হুরাইরা রা. এর হাদিসের উপর আমল করে থাকেন। নবি কারীম সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

إذا ولغ الكلب في إناء أحدكم فليغسله سبع مرات

অর্থ: তোমাদের কারও পাত্রে কুকুর মুখ দিলে সে যেন তা সাতবার ধৌত করে।

হানাফীগণ বলেন, তিনবার ধৌত করার দ্বারা পাত্র পবিত্র হয়ে যাবে। হাদিসের বর্ণনাকারী সাহাবি হজরত আবু হুরাইরা রা. এর উপরই আমল করেছেন এবং ফতোয়া দিয়েছেন। হানাফীদের মূলনীতি হলো, হাদিসের বর্ণনাকারী যদি বর্ণিত হাদিসের বিপরীত আমল করে, তবে উক্ত হাদিসের উপর আমল করা বিশুদ্ধ নয়। কেননা এক্ষেত্রে হাদিসে মা'লুল বা অভিযুক্ত হয়ে যায়।

বিশিষ্ট গবেষক ও মুহাদ্দিস আল্লামা যাহেদ আল-কাউসারি রহ. লেখেন,

إن التسبيع أي غسل الإناء سبع مرات هو المنسوخ، دون التثليث لتدرجه في أمر الكلاب من التشدد إلي التخفيف دون العكس ، فأمر بقتلها مطلقا لقلع عادة الناس في الألف بها، ثم بقتل الأسود البهيم خاصة، ثم بالترخيص في كلب الصيد و الماشية و الزرع ونهوها. فالتسبيع هو المناسب لأيام التشدد والتثليث هو المناسب لأيام التخفيف وهو آخر الأمرين

অর্থ: সাতবার ধৌত করার বিষয়টি রহিত (মানসুখ)। কিন্তু তিনবার ধৌত করার বিষয়টি রহিত নয়। কেননা রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুকুরের ক্ষেত্রে কঠোর বিধান থেকে ধীরে ধীরে সহজ বিধান গ্রহণ করেছেন। বিষয়টি এর উল্টো নয়। অর্থাৎ সহজ থেকে কঠোরতার দিকে যাননি। প্রথম দিকে সব কুকুর হত্যার নির্দেশ দেন। ফলে কুকুরের প্রতি মানুষের হৃদ্যতা ও দুর্বলতা শেষ হয়ে যায়। অত:পর ঘন কালো কুকুর গুলো হত্যার নির্দেশ দেন। এরপর ক্ষেত, পাহারা বা শিকারের জন্য কুকুর রাখার অনুমতি দেন। সুতরাং সাতবার ধৌত করার বিধানটি কঠোরতার সময় আরোপকৃত বিধানের সাথে সংশিষ্ট। এবং তিনবার ধৌত করার বিধানটি শিথিলতার সময়ের। আর এটি ছিলো সর্বশেষ আমল। সুতরাং পূর্বেরটি রহিত সাব্যস্ত হবে।

এর থেকে স্পষ্ট, বিষয়টি শুধু সাতবার ধৌত করা এবং অষ্টম বার মাটি দ্বারা পরিষ্কার করার মাঝে সীমাবদ্ধ নয় এবং এটি আবু হুরাইরা রা. এর ফতোয়া ও আমলের মাঝেও সীমাবদ্ধ নয়; বরং এখানে প্রতিপাদ্য বিষয় হলো, কুকুরের সাথে সংশিষ্ট সকল বিধানে সহজতা আরোপ করা হয়েছে। পরবর্তীতে কুকুর হত্যা থেকেও নিষেধ করেছেন। সুতরাং এখানে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উদ্দেশ্যও স্পষ্ট যে তিনি কী চান, সহজতা নাকি কঠোরতা? যখন মূল উদ্দেশ্যটি জানা গেলো, তখন উদ্দেশ্যের আলোকে হুকুমের মাঝেও পরিবর্তন হবে।

ইমামগণ দু'টি পরস্পর বিরোধী হাদিসের মাঝে সমন্বয় সাধনের জন্য যেসব পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন, সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ খুবই কঠিন। ইমামরা তাঁদের কিতাবে এগুলো বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এই বিষয়ে সর্বপ্রথম কলম ধরেছেন, ইমাম শাফেয়ি রহ.। তিনি তাঁর আর-রিসালা-তে এক আলোচকের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে বলেছেন,

إن أصل ما نبني نحن و أنتم عليه : أن الأحاديث إذا اختلفت لم نذهب إلي واحد منها دون غيره إلا بسبب يدل علي أن الذين ذهبنا إليه أقوي من الذين تركنا. قال محاوره: وما ذلك السبب؟ قلت الشافعي : أن يكون أحد الحديثين أشبه بكتاب الله ، فإذا أشبه كتاب الله كانت فيه الحجة.. فإن لم يكن فيه نص كتاب الله كان أولاهما بنا الأثبت منهما، وذلك أن يكون من رواه أعرف إسنادا و أشهر بالعلم وأحفظ له أو يكون روي الحديث الذي ذهبنا إليه من وجهين أو أكثر، و الذي تركنا من وجه ، فيكون الأكثر أولي بالحفظ من الأقل أو يكون الذي ذهبنا إليه أشبه بمعني كتاب الله أو أشبه بما سواهما من سنن رسول الله ، أو أولي بما يعرف أهل العلم ، أو أصح في القياس ، و الذي عليه الأكثر من أصحاب رسول الله صلي الله عليه وسلم.

অর্থ: হাদিসের গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের সবার মূলনীতি হলো, কয়েকটি হাদিস যখন পরস্পর বিরোধী হয়, তখন আমরা একটাকে ছেড়ে অন্যটাকে গ্রহণ করি না। একটা ছেড়ে অন্যটা গ্রহণের উপযুক্ত কারণ পেলেই শুধু দ্বিতীয়টা গ্রহণ করি। আমাদের দ্বিতীয় হাদিসটা প্রমাণ করে যে, সেটি পরিত্যক্ত হাদিস থেকে মজবুত ও শক্তিশালী।

প্রশ্নকারী জিজ্ঞাসা করলো, একটা হাদিস প্রাধান্য দেয়ার কারণ কী কী? ইমাম শাফেয়ি রহ. বললেন, দু'টি হাদিসের মাঝে একটির বক্তব্য যখন কুরআনের সাথে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ হবে, তখন অন্যটির উপর একে প্রাধান্য দেয়া হবে। যদি পবিত্র কুরআন থেকে এধরণের কোন প্রমাণ না পাওয়া যায়, তবে হাদিস দু'টির মাঝে যেটি শক্তিশালী সেটি গ্রহণ করা হবে। হাদিসটি অধিক শক্তিশালী হওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, উক্ত হাদিসের বর্ণনাকারীগণ মুহাদ্দিসদের নিকট গ্রহণযোগ্য ও প্রসিদ্ধ হবে। ইলম ও স্মরণশক্তির ক্ষেত্রেও তারা অন্যের চেয়ে অগ্রগামী হবে। সুতরাং বর্ণনাকারীর মুখস্থশক্তি প্রাধান্য দেয়ার অন্যতম কারণ। একইভাবে ইলমের ক্ষেত্রে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হওয়াটাও প্রাধান্য দেয়ার একটা বিশেষ ভিত্তি। এভাবে যে হাদিসটি দুই বা দু'য়ের অধিক সনদে বর্ণিত হয়েছে, সেটি এক সনদে বর্ণিত হাদিসের উপর প্রাধান্য পাবে। সুতরাং অধিক সংখ্যক ব্যক্তি কম সংখ্যকের উপর হেফজ বা মুখস্থের দিক থেকে প্রাধান্য পাবে। সুতরাং

১. কুরআনের অর্থের সঙ্গে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ ও নিকটবর্তী হওয়ার কারণে একটি প্রাধান্য পাবে।
২. বিরোধপূর্ণ হাদিসগুলির যেটি অন্যান্য হাদিসের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হবে, সেটি প্রাধান্য পাবে।
৩. মুজতাহিদ ইমাম নিজের অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার আলোকে একটিকে অপরটির উপর প্রাধান্য দেবে।
৪. যেটা কিয়াস ও যুক্তির অধিক নিকটবর্তী সেটা প্রাধান্য পাবে।
৫. একটা হাদিসের উপর অধিকাংশ সাহাবিদের আমল রয়েছে, কিন্তু অপরটির উপর আমল কম, তবে যেই হাদিসের উপর অধিকাংশ সাহাবির আমল রয়েছে, সেটি প্রাধান্য পাবে।

ইমাম শাফেয়ি রহ. এর পরে ইমাম হাযিমি রহ. পরস্পর বিরোধী নসের মাঝে প্রাধান্য দেয়ার বিষয়ে তার আল-ই'তেবার ফিন নাসিখি ওয়াল মানসুখি মিনাল আসার-এ প্রাধান্য দেয়ার পঞ্চাশটি পদ্ধতি আলোচনা করেছেন এবং এগুলোর অধিকাংশ পদ্ধতির উদাহরণ উল্লেখ করেছেন। আলোচনার শেষে তিনি লিখেছেন,

وثم وجوه كثيرة أضربنا عن ذكرها كيلا يطول بها هذا المختصر

অর্থ: এছাড়াও প্রাধান্য দেয়ার অনেক কারণ রয়েছে। সংক্ষিপ্ত কিতাবের কলেবর বড় হওয়ার আশঙ্কায় এগুলোর আলোচনা থেকে বিরত থেকেছি।

অত:পর, হাফেজ ইরাকী রহ. ইবনুস সালাহ এর মুকাদ্দামার টীকায় ইমাম হাযিমি রহ. উক্ত বক্তব্যটি উল্লেখ করে লিখেছেন,

وجوه الترجيحات تزيد علي المأة ، و قد رأيت عدها مختصرا فأبدا بالخمسين التي عدها الحازمي، ثم أسرد بقيتها علي الولاء

অর্থ: প্রাধান্য দেয়ার কারণ ও পদ্ধতি একশ' এর বেশি। ইমাম হাযিমি রহ. যে পঞ্চাশটি উল্লেখ করেছেন সেগুলো সংক্ষেপে উল্লেখ করে অবশিষ্টগুলো তিনি ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করেছেন। হাফেজ ইরাকী রহ. একশ' দশটি পদ্ধতি উল্লেখ করে লিখেছেন, প্রাধান্য দেয়ার আরও পদ্ধতি রয়েছে। তবে এর কিছু পদ্ধতি সম্পর্কে বিতর্ক রয়েছে।

আলামা কাজি শাওকানি ইরশাদুল ফুহুলে প্রাধান্য দেয়ার কারণগুলিকে বারটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করেছেন। এবং এই বারটির অধীনে মোট একশ' ষাটটি পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। প্রত্যেক প্রকারের আলোচনার শেষে তিনি লিখেছেন, এক্ষেত্রে প্রাধান্য দেয়ার আরও পদ্ধতি রয়েছে।

উক্ত আলোচনা থেকে বর্তমানে কিছু লোকের অজ্ঞতা ও উদাসীনতা স্পষ্ট। এদের সামনে বাহ্যিকভাবে পরস্পর বিরোধী দু'টি হাদিস পেশ করা হলে এরা বোখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হাদিসকে অন্যান্য কিতাবের হাদিসের উপর প্রাধান্য দেয়। প্রাধান্য দেয়ার অন্যান্য কারণগুলোর দিকে মোটেও ভ্রুক্ষেপ করে না। অথচ আলামা ইরাকী রহ. প্রাধান্য দেয়ার কারণগুলি ধারাবাহিকভাবে আলোচনার ক্ষেত্রে ১১০ টি পদ্ধতি বা কারণের মধ্যে ১০২ নং কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, বোখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হাদিসটি অন্যের উপর প্রাধান্য পাবে। সুতরাং এই মূর্খরা হাদিস প্রাধান্য দেয়ার ১০১টি কারণ বাতিল করেছে। এটি হয়তো তারা অজ্ঞতাবশত করেছে, নতুবা ইচ্ছাকৃতভাবে অজ্ঞতার ভান করেছে। এই উভয় শ্রেণির বাহ্যিক সৌন্দর্যগুলোও পরিণামে তিক্ত হয়।

কাজি শাওকানি রহ. হাদিসের সনদের মাধ্যমে প্রাধান্য দেয়ার যে ৪২ টি পদ্ধতি আলোচনা করেছেন, তন্মধ্যে ৪১ নং কারণ হলো, বোখারি ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদিস অন্য কিতাবে বর্ণিত হাদিসের উপর প্রাধান্য পাবে। সুতরাং ধোঁকাবাজদের এই প্রতারণায় নিজেকে নিপতিত করবেন না যে, ইমাম ইবনুস সালাহ বোখারি ও মুসলিমে সমষ্টিগতভাবে বর্ণিত হাদিসকে সবচেয়ে সহিহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এবং একে বোখারির এককভাবে বর্ণিত হাদিসের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি বোখারির এককভাবে বর্ণিত হাদিসকে ইমাম মুসলিম রহ. এর এককভাবে বর্ণিত হাদিসের উপরও প্রাধান্য দিয়েছেন।

ইমাম ইরাকী প্রাধান্য দেয়ার অন্যান্য ১০০ টি পদ্ধতি আলোচনার পরে বোখারি ও মুসলিমে সমষ্টিগতভাবে বর্ণিত হাদিস প্রাধান্য দেয়ার কথা বলেছেন। এটি তিনি ইমাম ইবনুস সালাহ এর কিতাবের টীকায় উল্লেখ করেছেন। সুতরাং ইবনুস সালাহ রহ. এর বক্তব্য ও প্রাধান্য দানের পদ্ধতি সম্পর্কে হাফেজ ইরাকী রহ. সম্যক অবগত ছিলেন। সুতরাং একথা বলা আদৌ সংগত হবে না যে, হাফেজ ইরাকী রহ. ইবনুস রহ. এর বক্তব্য সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন অথবা ভুলে গেছেন। এটি একটি অসম্ভব কথা। বরং ইমাম ইবনুস সালাহ রহ. এর বক্তব্যটি খুবই সীমাবদ্ধ ও সংকীর্ণ পরিসরের। পক্ষান্তরে হাফেজ ইরাকী রহ. ও উসুলবিদগণের বক্তব্যের পরিসর অত্যন্ত দীর্ঘ ও যথার্থ। আল্লাহ তায়ালা তৌফিক দিলে ইনশাআল্লাহ এবিষয়ে অন্য কোন গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

বোখারি ও মুসলিম শরীফে হাদিস উল্লেখের পদ্ধতি দ্বারাও বিষয়টি আমাদের সামনে স্পষ্ট হবে, তারা সংশ্লিষ্ট অধ্যায়ে উল্লেখিত হাদিসগুলোর কোনটি গ্রহণ করছেন আবার কোনটি ছেড়ে দিয়েছেন। যেমন ইমাম মুসলিম রহ. মুসলিম শরীফে প্রথমে জানাযার উদ্দেশ্যে দন্ডায়মান হওয়ার হাদিস উল্লেখ করেছেন। ২১৭ অত:পর এটি রহিত হওয়ার হাদিস উল্লেখ করেছেন। ২১৮

ইমাম কুরতুবী রহ. তাফসিরে কুরতুবী-তে লিখেছেন, ইমাম মুসলিম রহ. যেই হাদিসকে বিধান হিসেবে গ্রহণ করেন, সেটি অধ্যায়ের শেষে উল্লেখ করে থাকেন। ২১৯

ইমাম বোখারি রহ. শুধু জানাযার উদ্দেশ্যে দাঁড়ানোর হাদিসটি উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এটি রহিত হওয়ার হাদিসটি উল্লেখ করেননি।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। বিখ্যাত ফকিহ ও মুহাদ্দিস আলামা ইউসুফ বান-নূরী রহ. তিরমিযি শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ মায়ারিফুস সুনানে লিখেছেন,

وقد قلت قديما و أقول: هؤلاء الأئمة الكبار أربار الصحاح : من البخاري ومسلم و غيرهما قد إنحازوا إلى جهة تفقها و إجتهادا ، أو إتباعا لأئمتهم في دقائق الفقه و الإجتهاد و غوامض المسائل ، و اختاروا جانبا في الخلافيات، ثم لما ألفوا أخرجوا في في تأليفهم ما يوافق مذاهبهم الفقهية و سري فقههم إلي الحديث و تركوا ما عداها، حيث لم يذهبوا إليها، إلا من التزم إخراج أحاديث الفريقين، كالإمام الترمذي غالبا و كابن شيبة و عبد الرزاق في مصنفيهما، و أحمد في مسنده..

অর্থ: আমি পূর্বেও বলেছি, এখনও বলছি, বোখারি ও মুসলিম রহ. সহ সহিহ হাদিস সমূহের সঙ্কলক বড় বড় ইমামগণ ফিকাহ ও ইজতেহাদের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট মতের দিকে ঝোঁক রাখতেন। ফিকাহের বিভিন্ন বিষয় ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মাস-আলার ক্ষেত্রে তাদের অনুসরণীয় ইমামের মতাদর্শ গ্রহণ করেছেন। মতবিরোধপূর্ণ মাস-আলায় তাঁরা সুনির্দিষ্ট মাজহাবের অনুসারী ছিলেন। এরপর তারা হাদিসের কিতাবসমূহ সংকলনের সময় তাদের ফিকহি মাজহাব অনুযায়ী সংকলন করেছেন। হাদিসের সংকলনের ক্ষেত্রে তারা নিজেদের ইজতেহাদও কাজে লাগাতেন। যেসব হাদিস তাদের ইজতিহাদ ও গৃহীত মাজহাবের অনুগামী হতো না, সেগুলো উল্লেখ থেকে বিরত থাকতেন। তবে অনেক মুহাদ্দিস উভয় পক্ষের হাদিস সংকলন করেছেন। যেমন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইমাম তিরমিযি রহ, ইমাম ইবনে আবি শাইবা, ইমাম আব্দুর রাজ্জাক এবং ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ।

হাদিস সংকলনের ক্ষেত্রে তাদের ফিকাহ ব্যবহারের একটি উদাহরণ পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ জানাযার উদ্দেশ্যে দাঁড়াবে কি না, এ বিষয়ে ইমাম মুসলিম রহ. এর হাদিস বর্ণনার পদ্ধতি আলোচনা করা হয়েছে। ইমাম মুসলিম রহ. প্রথমে দন্ডায়মান হওয়ার হাদিস উল্লেখ করেছেন। অত:পর এটি রহিত হওয়ার হাদিস উল্লেখ করেছেন। একইভাবে ইমাম নাসায়ী রহ.ও রহিত হওয়ার হাদিস উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ইমাম বোখারি রহ. শুধু দন্ডায়মান হওয়ার হাদিস উল্লেখ করেছেন। ইমাম মুসলিম রহ. যে হাদিস দ্বারা এটি রহিত হওয়ার দলিল দিয়েছেন, সে হাদিস থেকে ইমাম বোখারি রহ. রহিত হওয়ার বিষয়টি বোঝেননি। একারণে তিনি হাদিসটি উল্লেখ করা থেকে বিরত থেকেছেন। সুতরাং ইমাম মুসলিম ও নাসায়ী রহ. তাদের ফিকাহ অনুযায়ী রহিত হওয়ার হাদিস উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ইমাম বোখারি রহ. রহিত হওয়ার মতটি গ্রহণ না করায় হাদিসটি উল্লেখ করেননি।

এবিষয়ে আরেকটি উদাহরণ হলো, হজরত আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

من صلي علي جنازة في المسجد فلا شيئ له অর্থাৎ যে ব্যক্তি মসজিদে কারও জানাযা পড়লো, তার কোন সওয়াব নেই।

পূর্বে হাদিসটি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। হাদিসটি ইমাম মুসলিম রহ. উল্লেখ করেননি। কিন্তু এ বিষয়ে হজরত আয়েশা রা. এর হাদিসটি উল্লেখ করেছেন, তিনি বলেন,

ما أسرع ما نسي الناس ما صلي رسول الله صلي الله عليه وسلم علي سهيل بن البيضاء إلا في المسجد অর্থ: "মানুষ কত দ্রুত ভুলে যায়! নিশ্চয় রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুহাইল ইবনুল বায়যা এর জানাযা মসজিদে আদায় করেছেন।”

একইভাবে ইমাম নাসায়ী রহ. আয়েশা রা. এর হাদিসটি উল্লেখ করেছেন। এটি হলো ইমাম মুসলিম ও নাসায়ী রহ. এর ফিকাহ। কিন্তু ইমাম আবু দাউদ রহ. প্রথমে হজরত আয়েশা রা. এর হাদিসটি উল্লেখ করেছেন। অতঃপর, তিনি হজরত আবু হুরাইরা রা. এর হাদিসের মাধ্যমে পরিচ্ছেদ শেষ করেছেন। এটি হলো ইমাম আবু দাউদ রহ. এর ফিকাহ ও বুঝ। ইমাম ইবনে মাজা রহ. ঠিক এর উল্টো করেছেন অর্থাৎ তিনি প্রথমে হজরত আবু হুরাইরা রা. এর হাদিস উল্লেখ করেছেন, এরপর হজরত আয়েশা রা. এর হাদিস উল্লেখ করে লিখেছেন,

حـديـث عـائـشة أقـوي হজরত আয়েশা রা. এর হাদিসটি শক্তিশালী।

এটি ইমাম ইবনে মাজা রহ. ফিকাহ ও বুঝ। সুতরাং এসমস্ত হাদিসের ইমামদের বুঝ ও ফিকাহের অনুসরণ না করে বিখ্যাত ফকিহ ইমামগণের অনুসরণ উত্তম নয় কি? বরং তাঁদের অনুসরণের চেয়ে ফকিহ ইমামগণের অনুসরণ অধিক উত্তম। পূর্বে ইমাম তিরমিযি রহ. এর বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি বলেছেন, ফকিহগণ হাদিসের অর্থ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত। এটি এমন দ্ব্যর্থহীন বিষয়, যাতে কোন অস্পষ্টতা নেই।

ইমাম বোখারি রহ. একটা হাদিস বর্ণনা করলে তা থেকে একটি মাসআলা প্রমাণিত হয়। সুতরাং ইমাম বোখারি বর্ণিত হাদিস থেকে যে বিধান গ্রহণ করা হয়েছে একে ইমাম আবু দাউদ বর্ণিত হাদিস থেকে গৃহীত হুকুমের উপর প্রাধান্য দেয়া সঠিক নয়। কেননা, এর দ্বারা মূলত: ইমাম বোখারি রহ. এর ইজতিহাদ ও মাযহাবকে অন্য কোন মুহাদ্দিসের মাজহাবের উপর প্রাধান্য দেয়া হয়। বাস্তব কথা হলো, ইমাম বোখারি রহ. সংশিষ্ট মাস-আলায় যেই হাদিসটা তার মাজহাব অনুযায়ী পেয়েছেন, সেটা বর্ণনা করেছেন। সুতরাং প্রত্যেক ক্ষেত্রে বোখারি বর্ণিত হাদিসকে প্রাধান্য দেয়ার অর্থ হলো, ইমাম বোখারির মাযহাবকে অন্যদের উপর প্রাধান্য দেয়া। প্রত্যেক মাস-আলায় বোখারি বর্ণিত হাদিসকে প্রাধান্য দেয়ার যে রীতি সংশয় সৃষ্টিকারীরা তৈরি করেছে, বাস্তবতা এর সম্পূর্ণ বিপরীত।

হাদিসে বুঝ অর্জনের ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসগণের পারস্পরিক ব্যাবধান ও মতবিরোধ খুবই বিস্তৃত। তাদের মতবিরোধের এই বিস্তর পরিসর থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, একটি ফিকহি মাস-আলার বিধান আহরণ কতটা কষ্টসাধ্য। এর মাধ্যমে এটাও অনুধাবন করা যাবে যে, ইমামগণ ইলমের কতো উচ্চ শিখরে আরোহণ করেছিলেন। আমি যে বিষয়টি আলোচনা করছি, এটি মূলত: ইজতেহাদের জন্য প্রয়োজনীয় ইলম সমূহের একটি ইলমের প্রাথমিক কিছু অংশ। সুতরাং ইজতেহাদের জন্য আবশ্যক অন্যান্য ইলমের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থানের ব্যাপারে কী ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি রাখা উচিত? বিষয়টি সম্পর্কে পরবর্তীতে সামান্য আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।

ইমামদের মতবিরোধের তৃতীয় কারণ সম্পর্কে আলোচনা শেষ করার পূর্বে একটি অপ্রসিদ্ধ মাসআলা নিয়ে আলোচনা করবো। এ বিষয়ের উপর পৃথক কোন কিতাব লেখা হয়নি। উলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে বিস্তর কোন আলোচনাও করেননি। অথচ অন্যান্য প্রত্যেকটি মাস-আলায় তারা ব্যাপক আলোচনা করেছেন। যেমন, সূরা তওবা ছাড়া বিসমিলাহ প্রত্যেক সূরার অংশ হওয়া, ইমামের পিছে কিরাত পড়া, রুকুতে যাওয়া ও রুকু থেকে উঠার সময় হাত উঠানো ইত্যাদি। আমি এই মাসআলাটি গ্রহণ করার কারণ হলো এর মধ্যে উপযুক্ত তিনটি পদ্ধতির উপর আলোচনার সুযোগ রয়েছে।

ইমাম নববি রহ. বলেছেন, "আমাদের মাজহাব তথা শাফেয়ি মাজহাবে পুরুষ ও মহিলার জন্য সাদা চুলে হলুদ বা লাল খেযায ব্যবহার করা মোস্তাহাব। বিশুদ্ধ মতানুযায়ী কালো খেযাব ব্যবহার করা হারাম। কেউ কেউ বলেছেন, মাকরুহে তানযীহি। তবে গ্রহণযোগ্য মত হলো, এটি হারাম। কেননা রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

واجتنبوا السواد

"তোমরা কালো রঙ থেকে বেঁচে থাকো।"

কাজি ইয়াজ রহ. বলেন, সাহাবা ও তায়েবীগণের যুগ থেকে সালাফে-সালেহিন খেযাব লাগানো এবং খেযাবের বিভিন্ন প্রকার নিয়ে মতানৈক্য করেছেন। তাদের কেউ কেউ বলেছেন, খেযাব না লাগানো উত্তম। তারা রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এবিষয়ে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। এ হাদিসে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাদা চুলকে পরিবর্তন করতে নিষেধ করেছেন। এছাড়াও রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে তাঁর সাদা চুল পরিবর্তন করেননি। খেযাব না লাগানোর মতটি হজরত উমর রা, হজরত আলী রা, হজরত উবাই বিন কা'য়াব রা. ও অন্যান্য সাহাবি থেকে বর্ণিত। অন্যান্যরা মতামত দিয়েছেন, খেযাব লাগানো উত্তম। সাহাবা, তাবেয়ি ও পরবর্তীদের অনেকেই খেযাব ব্যবহার করেছেন। এ ব্যাপারে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস রয়েছে। হাদিসটি ইমাম মুসলিম রহ. সহ অন্যান্য মুহাদ্দিস বর্ণনা করেছেন।

যারা খেযাব ব্যবহারের পক্ষে মতামত দিয়েছেন, তারা আবার খেযাবের রঙ নিয়ে মতানৈক্য করেছেন। অধিকাংশ খেযাব ব্যবহারকারী হলুদ রঙ ব্যবহার করতেন। যেমন, হজরত ইবনে উমর রা, আবু হুরাইরা ও অন্যান্য সাহাবীগণ। হজরত আলী রা. থেকেও এধরণের একটি মত পাওয়া যায়।

অনেকেই মেহেদী ও কাতাম (এক জাতীয় উদ্ভিদ) ব্যবহার করতেন। কেউ কেউ জাফরান ব্যবহার করেছেন। একদল সাহাবি ও তাবেয়ি কালো রঙের খেযাবও ব্যবহার করেছেন। হজরত উসমান রা, হজরত হাসান রা, হজরত হুসাইন রা, হজরত উকবা ইবনে আমের রা, ইবনে সিরীন রহ. ও হজরত আবু বুরদা রহ. থেকে কালো বণের খেযাব ব্যবহারের কথা বর্ণিত রয়েছে।

কাজি ইয়াজ রহ. বলেন, ইমাম ত্ববরানী রহ. বলেছেন, সাদা চুলের রঙ পরিবর্তন করা বা না করার ব্যাপারে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যেসব হাদিস বর্ণিত হয়েছে, এগুলো সহিহ। এগুলোর মাঝে কোন বৈপরীত্য নেই। যার চুল হজরত আবু বকর রা. এর পিতা আবু কুহাফা রা. এর মতো সাদা হবে, যাতে কোন সৌন্দর্য থাকে না, সে খেযাব ব্যবহার করতে পারবে। যার চুল হালকা সাদা হয়েছে তার জন্য খেযাব ব্যবহারের বিধান প্রযোজ্য নয়।

ইমাম ত্ববরানী রহ. বলেছেন, খেযাবের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তীগণের মতানৈক্য তাদের অবস্থার ভিন্নতার কারণে সৃষ্টি হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে যে আদেশ-নিষেধ রয়েছে, এটি সর্বসম্মতিক্রমে ওয়াজিব সাব্যস্ত করে না। একারণে পূর্বের কেউ এর বিপরীত আমলকারীকে দোষারোপ করেননি। সুতরাং হাদিসগুলোর মাঝে কোন একটি রহিত হওয়ার দাবি করাও ঠিক নয়।

কাজি ইয়াজ রহ. বলেন, ইমাম ত্ববরানী রহ. ছাড়া অন্যান্যরা বলেন, খেযাব লাগানোর দু'টি অবস্থা রয়েছে। কেউ যদি এমন শহর বা স্থানে থাকে, যেখানে সাধারণ প্রচলন হিসেবে খেযাব ব্যবহার করা হয় অথবা তা থেকে বিরত থাকা হয়, তবে সে শহরবাসীর আমল অনুযায়ী আমল করবে। প্রচলিত আমলের বিরোধিতা করবে না। কেননা সাধারণ প্রচলনের বিরোধিতা প্রসিদ্ধির অর্জনের উপলক্ষ্য হতে পারে। ফলে এটি মাকরুহ হবে। দ্বিতীয় অবস্থা হলো, বিধানটি সাদা চুলের পরিচ্ছন্নতার উপর নির্ভরশীল হবে। যার সাদা দাঁড়ী উজ্জ্বল এবং খেযাব ব্যবহার ছাড়াই সুন্দর, তার জন্য খেযাব ব্যবহার না করা উত্তম। যার সাদা দাঁড়ী বা চুল খেযাব লাগানো ছাড়া অসুন্দর দেখায়, তার জন্য খেযাব ব্যবহার করা উত্তম। এটি কাজি ইয়াজ রহ. বর্ণনা করেছেন। কিন্তু সুন্নাহের অধিক নিকটবর্তী সঠিক মতটি আমাদের মাজহাবের আলোকে পূর্বে বর্ণনা করেছি।” [ইমাম নববি রহ. এর বক্তব্য শেষ হলো]

ইমাম হাকেম রহ. তাঁর মা'রেফাতু উলুমিল হাদিস-এ ২৯ নং ইলমের শিরোনাম দিয়েছেন,

معرفة سنن لرسول الله صلي الله عليه وسلم يعارضها مثله ، فيحتج أصحاب المذاهب بأحدهما

“রাসূল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পরস্পর বিরোধী হাদিস সম্পর্কে অবগত হওয়া এবং ইমামগণ এগুলোর কোন একটি দ্বারা দলিল প্রদান।” এই শিরোনামের অধীনে তিনি এবিষয়ে ক'টি উদাহরণ উল্লেখ করেছেন এবং চমৎকার একটি উদাহরণের মাধ্যমে আলোচনা শেষ করেছেন। উদাহরণটি আমরা নীচে উল্লেখ করবো। উল্লেখ্য পরস্পর বিরোধী হাদিসের জ্ঞানকে পরবর্তীতে মুখতালাফুল হাদিস নামে অভিহিত করা হয়।

ইমাম হাকেম রহ. আব্দুল ওয়ারিস বিন সাঈদ আততান-নূরী থেকে নিজ সনদে উল্লেখ করেছেন, তিনি বলেন, আমি মক্কায় আগমন করলাম। সেখানে ইমাম আবু হানিফা রহ. ও ইমাম ইবনে আবি লায়লা ও ইমাম ইবনে শুবরুমা রহ. কে পেলাম। আমি ইমাম আবু হানিফা রহ. কে জিজ্ঞাসা করলাম, এক ব্যক্তি কোন কিছু বিক্রি করলো এবং বিক্রময়ের মাঝে শর্তারোপ করলো, তার সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কি? তিনি বললেন, বিক্রয় বাতিল। শর্তও বাতিল। অতঃপর, আমি ইমাম ইবনে আবি লাইলা রহ. কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, শর্ত বাতিল। কিন্তু বিক্রয় বৈধ। এরপর আমি ইমাম ইবনে শুবরুমা রহ. কে বিষয়টি জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, বিক্রয় বৈধ এবং শর্তও বৈধ।

আমি বললাম, সুবহানাল্লাহ, তিনজনই ইরাকের ফকিহ। একই মাস-আলায় তিনজন পৃথক পৃথক মতামত দিলেন। অতঃপর, আমি ইমাম আবু হানিফা রহ. এর কাছে গেলাম। এবং তাঁকে সমস্ত ঘটনা শোনালাম। তিনি বললেন, আমি জানি না তারা কী বলেছে। আমার নিকট আমর বিন শুয়াইব তার পিতা থেকে এবং সে তার দাদা থেকে বর্ণনা করেছে, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিক্রয়ের সঙ্গে শর্তারোপ থেকে নিষেধ করেছেন। বিক্রয় বাতিল, শর্তও বাতিল।

অত:পর, আমি ইবনে আবি লাইলার নিকট আসলাম। তাঁকেও বিষয়টা জানালাম। তিনি বললেন, আমি জানি না তারা দু'জন কী বলেছে। আমার নিকট হিশাম ইবনে উরয়া তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে আদেশ দিয়েছেন, আমি যেন বারীরাকে ক্রয় করে আযাদ করে দেই। বিক্রয় বৈধ কিন্তু শর্ত বাতিল।

অত:পর, আমি ইবনে শুবরুমা রহ. এর নিকট এসে পুরো ঘটন বললাম। তিনি বললেন, তারা দু'জন কী বলেছে আমি জানি না। আমার নিকট মিসয়ার ইবনে কিদাম হজরত মুহারিব ইবনে দিসার থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি হজরত জাবের রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট থেকে একটি উটনী ক্রয় করলাম। তিনি আমাকে শর্ত দিলেন যে, তিনি উটনীতে আরোহণ করে মদিনায় যাবেন। এক্ষেত্রে বিক্রয় বৈধ এবং শর্তও বৈধ।

অনেকেই বিষয়টিকে মুধ চেটে খাওয়ার চেয়েও সহজ মনে করে থাকে। রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবনে মাত্র একবার হজ করেছেন। যদি তাদের কাউকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, সেটা কি হজ্বে মুফরাদ ছিলো নাকি ক্বিরান, নাকি তামাতু? আপনার প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই অল্পবিদ্যার তথাকথিত শায়খরা একটা, দুইটা অথবা দশটা হাদিস পড়ে উত্তর দেয়া শুরু করে থাকে। এদের কোন বিষয়ে যদি আপনি বিরোধিতা করেন, সঙ্গে সঙ্গে সে বলবে, অমুক ইমাম এটা বলেছেন, অমুক ইমাম এই মত দিয়েছেন। বিরোধিতার সাথে সাথে অন্ধ তাকলীদে বিশ্বাসী হয়ে পড়ে। অথচ কিছুক্ষণ আগে সে ইজতেহাদের ছদ্মাবরণে নিজেকে মুজতাহিদ হিসেবে উপস্থাপন করছিলো।

ইমাম হাকেম রহ. মতবিরোধপূর্ণ হাদিসের আলোচনায় হজরত আনাস রা. এর হাদিস উল্লেখ করেছেন। হজরত আনাস রা. বলেন, আমি রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হজ ও উমরা উভয়ের জন্য তালবিয়া পাঠ করতে শুনেছি। তিনি হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. এর হাদীসও উল্লেখ করেছেন, যা হজরত আনাস রা. এর হাদিসের বিপরীত। অতঃপর, ইমাম হাকেম রহ. লিখেছেন, ইমাম আবু বকর ইবনে ইসহাক অর্থাৎ ইমাম ইবনে খোযাইমা রহ. এবিষয়ের উপর প্রয়োজনীয় আলোচনা করে তামাত্তুকে গ্রহণ করেছেন। একইভাবে ইমাম আহমাদ ও ইসহাক রহ. হজ্বে তামাত্তুকে উত্তম বলেছেন। ইমাম শাফেয়ি রহ. ইফরাদ হজকে উত্তম বলেছেন এবং ইমাম আবু হানিফা রহ. ক্বিরান হজকে উত্তম বলেছেন।

ইমাম ইবনে খোযাইমা রহ. এবিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ও খুবই দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। তাঁর এই আলোচনাটি পাঁচ খন্ড বিশিষ্ট। ইমাম হাকেম রহ. নিজেই তা উল্লেখ করেছেন। তিনি ইবনে খোযাইমা রহ. এর এই আলোচনা সম্পর্কে আবুল হাসান সানজানী রহ.এর বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। আবুল হাসান সানজানী রহ. বলেন, "ইবনে খোযাইমা রহ. এর হজের উপর লিখিত গ্রন্থটি অধ্যয়ন করেছি। আমি নিশ্চিত যে, এতো সুন্দর ইলম আলোচনা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।”

আমি বলবো, ইমাম ইবনে খোযাইমা রহ. এর সমযুগীয় বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম ত্বহাবী রহ. এর আলোচনা দেখলে তাঁর বিস্ময়ের সীমা থাকত না।

ইমাম নববি রহ. কাজি ইয়াজ রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন,

قد أكثر الناس الكلام على هذه الحديث، فمن مجيد منصف ، و من مقصر متكلف و من مطيل مكثر، ومن مقتصر مختصر. قال: وأوسعهم في ذلك نفسا أبو جعفر الطحاوي الحنفي فإنه تكلم في ذلك في زيادة علي ألف ورقة و تكلم معه في ذلك أبو جعفر الطبري ، ثم أبو عبد الله إبن أبي صفرة ثم المهلب و القاضي أبو عبد الله إبن المرابط ، و القاضي أبو الحسن إبن القصار البغدادي، و الحافظ أبو عمر ابن عبد البر وغيرهم

"হজের হাদিসগুলো সম্পর্কে অনেক আলেমই কলম ধরেছেন। এদের মাঝে কিছু আলেম শ্রদ্ধাভাজন ও ভারসাম্যপূর্ণ। কিছু আলেম অসম্পূর্ণ ও লৌকিকতাপূর্ণ আলোচনা করেছেন। কেউ কেউ খুবই দীর্ঘ এবং কেউ কেউ একেবারে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছেন। এ ব্যাপারে সবচেয়ে সুন্দর ও বিস্তারিত আলোচনা করেছেন হানাফি মাজহাবের বিখ্যাত ইমাম আবু জা'ফর ত্বহাবী। তিনি এমাসআলায় এক হাজার পৃষ্ঠার বেশি লিখেছেন। তাঁর সময়ে ইমাম আবু জা'ফর তবারী রহ.ও এর উপর আলোচনা করেছেন। এরপর ইমাম ইবনে সুফরা, ইমাম মুহাল্লাব ও কাজি আবু আব্দুলাহ ইবনুল মুরাবিত, কাজি আবুল হাসান ইবনে কাসসার বাগদাদি ও হাফেজ ইবনে আব্দুল বার রহ. সহ প্রমুখ হাদিস বিশারদ ও ফকিহ এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

এরপরও কি কোন বুদ্ধিমান শিক্ষার্থী তার নিজের অধ্যয়ন করা কয়েক পৃষ্ঠা প্রাধান্য দিয়ে ইমামগণের বক্তব্যকে দেয়ালে ছুঁড়ে মারবে? সে কী পড়েছে আর কী বুঝেছে আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন।

একটি শাখাগত মাস-আলার উপর এতো বিস্তর আলোচনাকারী হলেন ইমাম ত্বহাবী রহ। তাঁর এই আলোচনা সহিহ বোখারির কলেবরের কাছাকাছি। অথচ তিনি নিজে সর্বদা একজন ইমামের মাজহাবে অটল থেকেছেন এবং নিজেকে ইমামের দিকে সম্পৃক্ত করেছেন। ইমাম ত্বহাবী রহ. হানাফি মাজহাবের বিখ্যাত আলেম ছিলেন। কয়েকটি মাস-আলায় ইমাম আবু হানিফা রহ. এর বিরোধিতা করা সত্ত্বেও তিনি ইমাম আবু হানিফার দিকে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন এবং আবু হানিফা রহ. কিংবা তাঁর কোন অনুসারী এর সমালোচনা করেননি।

পূর্ববর্তী ইমামগণ পরস্পর বিরোধী হাদিস সংকলন, বিশ্লেষণ এবং এগুলোর সমাধান নির্ণয়ে সীমাহীন গুরুত্ব দিয়েছেন। এবিষয়ে ইমাম শাফেয়ি রহ. 'ইখতেলাফুল হাদিস' রচনা করেছেন। ইমাম ইবনে কুতাইবা রহ. তা'বীলু মুখতালাফিল হাদিস রচনা করেছেন এবং এর উপর 'মায়াখিজ' রচনা করেছেন। দু'টো কিতাবই বর্তমানে মুদ্রিত। এবিষয়ে যাকারিয়া সাজী রহ. এর একটি কিতাব রয়েছে। কাশফুয যুনুন এর লেখক হাযী খলিফা রহ. এর নাম উল্লেখ করেছেন ইখতেলাফুল হাদিস। ইবনে জারীর ত্ববারী রহ.ও একটি কিতাব লিখেছেন। তিনি এর নামকরণ করেছেন, তাহযিবুল আসার। কাশফুয যুনুন এর লেখক এসম্পর্কে লিখেছেন, এ এটি একটি অদ্বিতীয় গ্রন্থ এবং মতবিরোধপূর্ণ হাদিসের উপর এর সম পর্যায়ের কোন গ্রন্থ নেই। একিতাবের একটি অংশ প্রথমে চার খণ্ডে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে পঞ্চম খন্ডও প্রকাশিত হয়েছে।

পরস্পর হাদিসের বিষয়ে ইমাম ত্বহাবী রহ. অসাধারণ দু'টি কিতাব রচনা করেছেন। একটি হলো, (شرح معاني الآثار المختلفة المروية عن رسول الله صلي الله في الأحكام) আসার)। এই কিতাবটি ইমাম ত্বহাবী রহ. এর প্রথম কিতাব হওয়া সত্ত্বেও এটি তার মুজতাহিদ ও বড় ইমাম হওয়ার সাক্ষর বহন করে। হাফেজ কারাশী রহ. এর বক্তব্য অনুযায়ী এটি ইমাম ত্বহাবী রহ. এর প্রথম কিতাব।

এবিষয়ে ইমাম ত্বহাবী রহ. এর দ্বিতীয় কিতাব হলো, মুশকিলুল আসার। হাফেজ কারাশী রহ. এর বক্তব্য অনুযায়ী এটি ইমাম ত্বহাবী রহ.এর সর্বশেষ কিতাব। এই কিতাব সম্পর্কে ইমাম যাহেদ আল-কাউসারি রহ. বলেছেন, এটা এমন একটি কিতাব, ইতোপূর্বে যার মতো কোন কিতাব রচিত হয়নি。

টিকাঃ
২১৩ আর-রিসালা, পৃ.২৮৪।
২১৪ ইমাম হাযিমী রহ. কৃত আল-ই'তেবার ফিন নাসিখি ওয়াল মানসুখি মিনাল আসার, পৃ.৯-২৩
২১৫ ইবনুস সালাহ এর উপর আল্লামা ইরাকীর হাশিয়া, পৃ.২৪৫।
২১৬ ইরশাদুল ফুহুল, পৃ.২৭৬-২৮৪।
২১৭ মুসলিম শরীফ, খ.২, পৃ.৬৫৯।
২১৮ মুসলিম শরীফ, খ.২, পৃ.৬৬১।
২১৯ তাফসীরে কুরতুবী, খ.৩, পৃ.২১২।
২২০ মায়ারিফুস সুনান, খ.৬, পৃ.৩৭৯-৩৮০
২২১ সহীহ মুসলিম শরীফ, খ.২, পৃ.৬৬৮
২২২ নাসায়ী শরীফ, খ.১, পৃ.৬৩৯।
২২৩ আবু দাউদ শরীফ, খ.৩, পৃ.৫৩০-৫৩১।
২২৪ ইবনে মাজা শরীফ, খ.১, পৃ.৪৮৬
২২৫ ইমাম নববী কৃত মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্ত শরহু মুসলিম, খ.১৪, পৃ.৮০।
২২৬ মা'রেফাতু উলুমিল হাদীস, পৃ.১২৮।
২২৭ মা'রেফাতু উলুমিল হাদীস, পৃ.১২৪।
২২৮ মা'রেফাতু উলুমিল হাদীস, পৃ.৮৩। ইমাম ইবনে খোযাইমা রহ. এর কিতাবের বিভিন্ন খন্ড মূলত: হাদীসের আলোকে হয়েছে। মূল কিতাবের কলেবর প্রায় দু'শ পৃষ্ঠা। এর চেয়ে কম বা বেশি হতে পারে।
২২৯ ইমাম নববী রহ. কৃত মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যগ্রন্থ, খ.৮, পৃ.১৩৬।
২৩০ আল-জাওয়াহিরুল মুজিয়্যা, খ.১, পৃ.১০৪।
২৩১ যুয়ূলু তাযকিরাতিল হুফফায এর উপর ইমাম যাহেদ আল-কাউসারী রহ. এর তা'লীক। পৃ.১৯৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00