📘 নবীজীর হাদীস ও ইমামগণের মতভেদ > 📄 মতানৈক্যের দ্বিতীয় কারণ: হাদিসের বুঝ অর্জনে তারতম্য

📄 মতানৈক্যের দ্বিতীয় কারণ: হাদিসের বুঝ অর্জনে তারতম্য


হাদিসের বুঝ অর্জনে ইমামদের মাঝে যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে, তার মূল কারণ দু'টি,

১. হাদিস নিয়ে গবেষণাকারী ফকিহের বুঝ শক্তি, আকল ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার তারতম্য।

২. হাদিসে বর্ণিত শব্দটি একাধিক অর্থের সম্ভাবনা রাখা।

অতএব প্রথম কারণ হলো, হাদিস গবেষণাকারী ফকিহের বুঝ শক্তির তারতম্যের কারণে সৃষ্ট মতানৈক্য। এটি এমন একটি স্বীকৃত বিষয় যাতে কেউ দ্বিমত পোষণ করবে না। কেননা মানুষের বুঝ শক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার মাঝে তারতম্য হওয়ার বিষয়টি স্বতঃসিদ্ধ ও সর্বজন স্বীকৃত। এই তারতম্য কখনও সৃষ্টি ও স্বভাবগত হয়ে থাকে। কখনও অনুশীলন ও অর্জনের পার্থক্যের কারণে হয়ে থাকে।

সভ্যতা ও সংস্কৃতিগত পার্থক্য, মানুষ ও সমাজের সঙ্গে উঠা-বসা, আচরণ, মস্তিষ্কের ক্রিয়াশীলতা ও পরিবেশগত প্রভাবের কারণে মানুষের বুঝশক্তি ও অভিজ্ঞতার মাঝে পার্থক্য সৃষ্টি হয়। মানুষের তার পেশার মাধ্যমেও বিভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জন করে। যেমন, বিচার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি মামলা-মুকাদ্দামার জটিলতা ও তার সমাধান সম্পর্কে অবগত থাকে। ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদির সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তি এগুলোর খুঁটিনাটি বিষয়েও যথেষ্ট জ্ঞান রাখে। এভাবে মানুষের বুঝ শক্তি ও অভিজ্ঞতার মাঝে ব্যবধান সৃষ্টি হয়ে থাকে।

ইমাম শাফেয়ি রহ. কে বলা হলো, মানুষের জন্মগত বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে বলুন। তিনি বললেন, না (অর্থাৎ জন্মগত বুদ্ধিমত্তা আলোচনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়।) ব্যক্তি মূলত: সমাজের সাথে উঠা-বসা ও মানুষের সাথে তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনা-পর্যালোচনার দ্বারা তার বুদ্ধিমত্তা শাণিত করে থাকে।

কখনও আলাহ তায়ালা কারও জন্য বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের উপকরণগুলো ব্যবস্থা করে দেন। ফলে বুদ্ধিমত্তার বিকাশ তার স্বভাবের অংশ হয়ে যায়। যেমন, কবি আউস বিন হুজর বলেছেন,

الألمعي الذي يظن بك الظن كأن قد رأي و قد سمع

প্রকৃত বুদ্ধিমান ব্যক্তি তোমাকে হয়তো কিছু ধারণার কথা বলবে। কিন্তু তা এমনভাবে বাস্তব রূপ লাভ করে, যেন সে তা বাস্তবে শুনেছে ও দেখেছে।

ইবনুর রুমি বলেন,

ألمعي يري بأول رأي آخر الأمر من وراء المغيب

সচেতন এবং বুদ্ধিমান ব্যক্তি প্রথম দর্শনেই কোন বস্তুর চূড়ান্ত পরিণতি দেখতে পান।

এ ধরনের বুদ্ধিমত্তার পাশাপাশি আল্লাহ তায়ালা যদি বাহ্যিক উপকরণগুলোর ব্যবস্থা করে দেন, তখন তাদের বুঝ শক্তি ও বুদ্ধিমত্তা দ্বিগুণ বেড়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা ইসলামের বড় বড় ইমামদের জন্য এই বিষয়গুলোও সহজ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এর দ্বারা তাঁদের সবার বুঝ একই স্তরের হওয়া জরুরি নয়। কেননা এক্ষেত্রে তাদের মাঝেও বিস্তর ব্যবধান রয়েছে।

ইমাম শাফেয়ি রহ. আর-রিসালা এর শুরুতে ইমামদের বুঝশক্তির এই পার্থক্যের কথা আলোচনা করেছেন। এখানে তিনি আমাদের আলোচনার বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন,

وهم درجات فيما وعوا منها

অর্থাৎ তারা যেসব হাদিস সংকলন ও সংরক্ষণ করেছেন, তা বোঝার ক্ষেত্রে তাদের মাঝে বিভিন্ন স্তর রয়েছে।

ক'টি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি আরও স্পষ্ট করার চেষ্টা করবো।

একদা ইমাম আবু হানিফা রহ. হাদিস ও কিরাতের বিখ্যাত ইমাম আ'মাশ রহ. এর মজলিশে উপস্থিত ছিলেন। ইমাম আবু হানিফা রহ. এর কাছে একটি মাসআলা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, এ ব্যাপারে আপানার অভিমত কী? তিনি বললেন, এ ব্যাপারে আমার বক্তব্য এই। ইমাম আ'মাশ রহ. বললেন, আপনি এ বক্তব্যের দলিল কোথায় পেলেন? ইমাম আবু হানিফা রহ. বললেন, আপনি আমার কাছে আবু সালেহের সূত্রে হজরত আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, হজরত আবু ওয়াইল হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে এবং হজরত আবু ইয়াস হজরত আবু মাসউদ আনসারী রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

من دل علي خير كان له مثل أجر عمله

যে ব্যক্তি কোন সৎকাজে পথ প্রদর্শন করলো, তার আমলের পরিমাণ সেও সওয়াব পাবে।

আপনি আমার কাছে হজরত আবু সালেহ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি হজরত আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএর নিকট এক ব্যক্তি এসে বলল, হে আলাহর রসুল, আমি ঘরে নামাজ আদায় করছিলাম। ইতোমধ্যে এক ব্যক্তি ঘরে প্রবেশ করলো। এতে আমার অন্তরে খুশি অনুভূত হলো। রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন,

لك أجران أجر السر والعلانية

অর্থাৎ তুমি দু'টি সওয়াব পাবে। প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে নামাজ আদায়ের সওয়াব।

আপনি আমার নিকট হজরত হাকাম থেকে, তিনি হজরত আবুল হাকাম থেকে, তিনি হজরত হুযাইফা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন...।

আপনি আমার নিকট হজরত আবু সালেহ থেকে, তিনি হজরত আবু হুরাইরা রা. থেকে মারফু রিওয়াত বর্ণনা করেছেন...।

আপনি আমার কাছে আবুয যুবাইর থেকে, তিনি হজরত জাবের রা. থেকে মারফু সূত্রে বর্ণনা করেছেন...।

আপনি আমার নিকট ইয়াজিদ রক্কাশি থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি হজরত আনাস রা. থেকে মারফু সূত্রে বর্ণনা করেছেন...।

অত:পর, ইমাম আ'মাশ রহ. বললেন,

حسبك، ما حدثتك في مأة يوم حدثتني في ساعة، ما علمت أنك تعمل بهذه الأحاديث، يا معشر الفقهاء ، أنتم الأطباء ونحن الصيادلة و أنت أيها الرجل أخذت بكلا الطرفين

"আপনার জন্য যথেষ্ট! আমি আপনাকে একশ' দিনে যা বর্ণনা করেছি, আপনি আমাকে এক মুহূর্তে সেগুলো বর্ণনা করলেন। আমি জানতাম না আপনি এই হাদিসগুলোর উপর আমল করে থাকেন। হে ফকিহগণ, আপনারা হলেন ডাক্তার, আমরা ওষুধ বিক্রেতা। কিন্তু হে আবু হানিফা! আপনি উভয়টার সমন্বয় করেছেন।"

ইমাম আহমাদ রহ. ইমাম শাফেয়ি রহ. কে বললেন, এই মাসআলায় আপনার অভিমত কী? ইমাম শাফেয়ি রহ. উত্তর প্রদান করলেন। ইমাম আহমাদ রহ. বললেন, আপনি কোথা থেকে মাসআলাটি বললেন? আপনার এ বক্তব্যের স্বপক্ষে কুরআন বা হাদিসের কোন দলিল আছে? অতঃপর, ইমাম শাফেয়ি রহ. এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট একটা হাদিস উল্লেখ করলেন।

তারিখে বাগদাদে সনদসহ হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. এর একটি ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমি শামে ইমাম আওযায়ী রহ. এর নিকট আগমন করলাম। আমি তাঁর সঙ্গে বয়রু‌তে সাক্ষাৎ করলাম। তিনি আমাকে বললেন, হে খোরাসানী, আবু হানিফা নামে কুফায় আবির্ভূত এই বিদআতী কে? ইমাম ইবনুল মুবারক বলেন, এই কথা শুনে আমি ঘরে ফিরে এলাম। ইমাম আবু হানিফা রহ. এর কিতাবগুলো অধ্যয়ন শুরু করলাম। এরপর, তিন দিন ধরে সেখান থেকে উত্তম মাসআলাগুলো নির্বাচিত করলাম। তৃতীয় দিন কিতাবটি নিয়ে আমি ইমাম আওযায়ী রহ. এর কাছে এলাম। ইমাম আওযায়ী রহ. এলাকার মসজিদের মুয়াজ্জিন ও ইমাম ছিলেন। ইমাম আওযায়ী রহ. আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, এটি কোন কিতাব? আমি কিতাবটি তাঁকে দিলাম। তিনি একটি মাসআলা দেখলেন, যাতে আমি লিখেছিলাম, নু'মান বলেছেন। আযান দেয়ার পর তিনি দাঁড়ান অবস্থায় কিতাবের শুরু অংশটা পড়লেন। কিতাবটি তিনি জামার হাতার মাঝে রাখলেন। এরপর ইকামাত বললেন এবং নামাজ আদায় করলেন। নামাজ শেষে তিনি কিতাবটি পড়া শুরু করলেন। কিতাবটি শেষে তিনি বললেন, হে খোরাসানী, এই নু'মান বিন সাবেত কে? আমি বললাম, একজন শায়েখ, যার সঙ্গে আমি ইরাকে সাক্ষাৎ করেছি। ইমাম আওযায়ী রহ. বললেন, তিনি অনেক বড় শায়খ। তার কাছে যাও এবং আরও ইলম হাসিল করো। আমি বললাম, তিনি হলেন, আবু হানিফা যার কাছে যেতে আপনি নিষেধ করেছিলেন।

হাফিজুদ্দিন কারদারী তার মানাকিবে এসম্পর্কিত ইবনুল মুবারক রহ. অপর একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ. বলেন, অত:পর আমি ইমাম আওযায়ী রহ. এর সঙ্গে মক্কায় সাক্ষাৎ করলাম। ইমাম আওযায়ী রহ. কে দেখলাম তিনি ইমাম আবু হানিফা রহ. এর সাথে উক্ত মাসআলাগুলো নিয়ে আলোচনা করছেন। ইমাম আবু হানিফা রহ. মাসআলাগুলো আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরলেন। তারা উভয়ে যখন পৃথক হলেন, আমি ইমাম আওযায়ী রহ. কে জিজ্ঞাসা করলাম, তাঁকে কেমন দেখলেন? তিনি বললেন,

غبطت الرجل بكثرة علمه ووفور عقله ، و أستغفر الله تعالي لقد كنت في غلط ظاهر ألزم الرجل فإنه بخلاف ما بلغني عنه

আমি তাঁর ইলমের আধিক্য ও প্রচন্ড বুদ্ধিমত্তা দেখে ঈর্ষা বোধ করছি। সেই সাথে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। তাঁর সম্পর্কে আমি সুস্পষ্ট ভ্রান্তিতে ছিলাম। লোকমুখে তাঁর সম্পর্কে যা শুনেছি তিনি সম্পূর্ণ এর বিপরীত。

খতিব বাগদাদি রহ. বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও হানাফি মাজহাবের বিশিষ্ট ফকিহ ইমাম ইসা ইবনে আবান রহ. এর জীবনী আলোচনা প্রসঙ্গে মুহাম্মাদ বিন সামায়া রহ. এর উক্তি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ঈসা ইবনে আবান রহ. আমাদের সঙ্গে নামাজ আদায় করতেন। অর্থাৎ যে মসজিদে ইমাম মুহাম্মাদ বিন হাসান শাইবানী রহ. নামাজ আদায় করতেন এবং ফিকাহের দরস প্রদান করতেন, সে মসজিদে তিনি নামাজ আদায় করতেন। আমি তাকে ইমাম মুহাম্মাদ রহ. এর মজলিশে বসার অনুরোধ করতাম। তিনি বলতেন, এরা রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিসের বিরোধিতা করে থাকে। ইমাম ঈসা ইবনে আবান রহ. হাফিযে হাদিস ছিলেন। একদিন তিনি আমাদের সঙ্গে ফযরের নামাজ আদায় করলেন। সেদিন ইমাম মুহাম্মাদ রহ. এর মজলিশ ছিলো। নামাজ শেষে তিনি ইমাম মুহাম্মাদ রহ. এর মজলিশে বসলেন। ইমাম মুহাম্মাদ রহ. যখন মজলিশ শেষ করলেন, আমি তার কাছে গেলাম এবং বললাম, এই হলো আপনার ভ্রাতুষ্পুত্র আবান ইবনে সাদাকা। সে হাদিসের উপর যথেষ্ট জ্ঞান রাখে। সে একজন বিশিষ্ট হাফিযে হাদিস। আমি তাঁকে আপনার মজলিশে বসার অনুরোধ জানিয়েছি। কিন্তু সে বরাবরই অস্বীকার করেছে। সে বলে, আমরা নাকি হাদিসের বিরোধিতা করে থাকি।

ইমাম মুহাম্মাদ রহ. তাঁকে বললেন, আমাদের মাঝে হাদিস বিরোধিতার কী দেখলে? আমাদের কাছ থেকে ব্যাখ্যা গ্রহণ ছাড়া আমাদের ব্যাপারে ফয়সালা করো না। সেদিন তিনি ইমাম মুহাম্মাদ রহ. কে হাদিসের পঁচিশটি অধ্যায় সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। ইমাম মুহাম্মাদ রহ. তাঁর প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে থাকেন। এগুলোর মাঝে কোনটি রহিত তা বর্ণনা করতে থাকেন। এবং প্রত্যেকটি বক্তব্যের দলিল-প্রমাণ উল্লেখ করেন।

এ আলোচনা শেষে আমরা মজলিশ থেকে বের হলাম। ইমাম ঈসা ইবনে আবান রহ. আমাকে বললেন,

كان بيني و بين النور ستر فارتفع عني. ما ظننت أن في ملك الله مثل هذا الرجل يظهره للناس و لزم محمد بن حسن لزوما شديدا حتي تفقه به

আমার ও আলোর মাঝে একটি পর্দা ছিলো। আজ পর্দাটি উঠে গেছে। আমি তো আল্লাহর রাজত্বে এমন লোকের অস্তিত্বের কল্পনাও করিনি, যাকে আল্লাহ তায়ালা মানুষের জন্য এভাবে বিকশিত করবেন।

এরপর, তিনি যারপরনাই গুরুত্বের সঙ্গে ইমাম মুহাম্মাদ রহ. এর সংশ্রব অবলম্বন করতে থাকেন। এমনকি তিনি ইমাম মুহাম্মদ রহ. এর ফিকহে গভীর পান্ডিত্য অর্জন করলেন。

ঘটনার প্রতিপাদ্য বিষয়টি খুবই স্পষ্ট। এঘটনায় মতবিরোধের সর্বশেষ কারণের দিকেও ইঙ্গিত করা হয়েছে। মতবিরোধের সর্বশেষ কারণ হলো, হাদিস অবগতির ব্যাপারে তারতম্য।

হাদিসের বুঝ অর্জনে সৃষ্ট মতবিরোধের দ্বিতীয় কারণটি হলো, হাদিসের শব্দ একাধিক অর্থের সম্ভাবনা রাখা। হাদিসের বুঝ অর্জনের ক্ষেত্রে প্রায়ই এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। পরস্পর বিরোধী অর্থগুলো সঠিক হওয়ার জন্য নীচের শর্তগুলো থাকা জরুরি।

১. হাদিস থেকে গৃহীত অর্থটি আরবি ভাষার ব্যাকরণের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়া এবং ব্যাকরণের মূলনীতির বিরোধী না হওয়া।

২. উক্ত অর্থ গ্রহণে কোন ধরনের লৌকিকতা বা কৃত্রিমতার আশ্রয় নেয়া থেকে বিরত থাকা।

৩. অন্য কোন স্পষ্ট নস দ্বারা প্রমাণিত হুকুমের বিরোধী না হওয়া।

এখানে শর্তগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করবো। যেসব ইমামদের মতবিরোধের কারণ সম্পর্কে আলোচনা করছি, তাঁদের ব্যাপারে কখনও কল্পনাও করা যায় না যে, তাঁরা এ বিষয়গুলো থেকে উদাসীন ছিলেন। বলে রাখা প্রয়োজন, আমাদের এ আলোচনা তাদের জন্য প্রযোজ্য যারা ইমামদের মতবিরোধের কারণ সম্পর্কে অজ্ঞ।

হাদিস একাধিক অর্থের সম্ভাবনা রাখলে ইমাম উভয় অর্থের মাঝে সমন্বয় করেন। কোন একটি অর্থকে প্রাধান্য দেয়ার কারণ অনুসন্ধান করেন।

একাধিক অর্থের সম্ভাবনা রাখে এমন ক'টি উদাহরণ উল্লেখ করছি। রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, المتبايعان بالخيار ما لم يتفرقا ক্রেতা-বিক্রেতা চুক্তি বাতিলের অধিকার রাখবে, যতক্ষণ না তারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়।

এই হাদিসে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে মতপার্থক্য হয়েছে। পরস্পর থেকে অবস্থানগত বিচ্ছিন্নতা নাকি কথার মাধ্যমে বিচ্ছিন্নতা উদ্দেশ্য? এক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ দু'টি মাজহাব রয়েছে।

১. ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের জন্য ক্রয়-বিক্রয় বহাল রাখা কিংবা তা বাতিল করার অধিকার সাব্যস্ত হবে, যতক্ষণ না তারা উক্ত মজলিশ থেকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন হবে। তাদের কেউ যদি মজলিশ থেকে সামান্য সরে যায়, তবে চুক্তি সংগঠিত হয়ে যাবে। সুতরাং অন্যের সম্মতি ছাড়া চুক্তি ভঙ্গের অধিকার কারও থাকবে না। এ মতটি গ্রহণ করেছেন ইমাম শাফেয়ি রহ. ও আরও কিছু উলামায়ে কেরাম।

২. হাদিসের আরেকটি সম্ভাব্য অর্থ হলো, ক্রেতা-বিক্রেতা কথার মাধ্যমে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া। অর্থাৎ চুক্তি বহাল কিংবা ভঙ্গের ক্ষেত্রে ক্রেতা-বিক্রেতা যতক্ষণ পর্যন্ত সংশিষ্ট কথোপকথনে মগ্ন থাকবে, ততক্ষণ তাদের চুক্তি বহাল বা ভঙ্গের অধিকার থাকবে। কিন্তু এ চুক্তি সংক্রান্ত কথা শেষ করে যদি তারা অন্য কথায় মগ্ন হয়, তবে চুক্তি আবশ্যক হয়ে যাবে। তখন অন্যের সম্মতি ছাড়া চুক্তি ভঙ্গের অধিকার থাকবে না। এটি ইমাম আবু হানিফা রহ. সহ অন্যান্য আলেমের মাজহাব।

এক্ষেত্রে প্রত্যেক ইমামের বক্তব্যের স্বপক্ষে যথেষ্ট দলিল-প্রমাণ রয়েছে। আমি সংক্ষেপে ক'টি দলিল উল্লেখ করছি। এখানে তাদের মতবিরোধের কারণ বর্ণনা করা আমার মূল উদ্দেশ্য। উভয়পক্ষের সব দলিল উপস্থাপন এবং একটির উপর অপরটির প্রাধান্য দেয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। এটি আমার মতো নগণ্যের কাজও নয়।

ইমাম শাফেয়ি রহ. ও অন্যান্যরা তাদের বক্তব্যের স্বপক্ষে নকলী (কুরআন-সুন্নাহের স্পষ্ট দলিল) ও আকলী দলিল (যুক্তিভিত্তিক ক্বিয়াসী দলিল) প্রদান করেছেন। প্রথমত: তারা এ ব্যাপারে আসার উল্লেখ করেছেন। তাদের পেশকৃত আসারটি হলো, হাদিসের বর্ণনাকারী সাহাবি হজরত আব্দুলাহ বিন উমর রা. এর আমল। তিনি কারও কাছ থেকে কিছু ক্রয় করলে তার থেকে কয়েক কদম দূরে সরে যেতেন। অত:পর প্রয়োজন থাকলে তার কাছে ফিরে আসতেন। সুতরাং বর্ণিত হাদিস সম্পর্কে বর্ণনাকারী সাহাবির বুঝ অন্যদের বুঝের তুলনায় সঠিক হওয়ার অধিক সম্ভাবনা রাখে।

তাদের যৌক্তিক প্রমাণ হলো, হাদিসে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের খিয়ার সাব্যস্ত হবে যতক্ষণ না তারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হবে। এখানে বিচ্ছিন্ন হওয়া দ্বারা অবস্থানের বিচ্ছিন্নতা উদ্দেশ্য নেয়া অধিক যুক্তিসংগত। কেননা, স্বাভাবিকভাবে বিক্রেতা তার দোকানে অবস্থান করে থাকে এবং ক্রেতা তার বাড়িতে। অতঃপর, ক্রেতা বিক্রেতার দোকানে আসে এবং তারা উভয়ে চুক্তির স্থানে একত্রিত হয়ে চুক্তি সম্পন্ন করে। চুক্তি শেষে তারা নিজ নিজ অবস্থানে ফিরে যায়। সুতরাং রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা বলেছেন; এর দ্বারা চুক্তি সম্পন্ন করে তাদের নিজ নিজ স্থানে ফিরে যাওয়া উদ্দেশ্য।

ইমাম আবু হানিফা রহ. ও তাঁর মাজহাব অনুসারীগণ তাদের বক্তব্যের স্বপক্ষে আকলী ও নকলী দলিল উল্লেখ করেছেন। তাদের নকলী দলিল হলো, পবিত্র কুরআনে আলাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন,

يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُواْ لاَ تَأْكُلُواْ أَمْوَلَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلا أَن تَكُونَ تِجَرَةً عَن تَرَاضٍ مِنْكُمْ

হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। কেবল তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ।

এ আয়াত থেকে স্পষ্ট যে, চুক্তি সংগঠিত হওয়ার জন্য উভয়ের সম্মতি হলো মূল। এক্ষেত্রে তাদের সম্মতি প্রকাশের মাধ্যম হলো, ইজাব ও কবুল। সুতরাং এর মাধ্যমে চুক্তি সম্পন্ন হয়ে যাবে।

অত:পর ما لم يتفرقا এর এমন একটি অর্থ গ্রহণ করতে হবে যেন কুরআনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়। অতএব, এক্ষেত্রে কথার মাধ্যমে পৃথক হওয়া উদ্দেশ্য হবে। শরিয়তে অনেক নস এমন রয়েছে যেখানে তাফাররুক দ্বারা বক্তব্যের মাধ্যমে পৃথক হওয়া উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে এবং এসমস্ত ক্ষেত্রে শারীরিক বিচ্ছিন্নতা উদ্দেশ্য নয়। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعاً وَلَا تَفَرَّقُوا

আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ কর; পরস্পর বিচিছন্ন হয়ো না।

وَمَا تَفَرَّقَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ إِلَّا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَتْهُمُ الْبَيِّنَةُ

আহলে কিতাবরা তাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ আসার পরই বিভ্রান্ত হয়েছে।

ইমাম আবু হানিফা রহ.এর আকলী দলিল হলো, ইমাম ইবনে আব্দুল বার রহ. সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা রহ. এর ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ইমাম আবু হানিফা রহ. হাদিসের উদাহরণ পেশ করতেন, অত:পর নিজের আকুল দ্বারা হাদিস প্রত্যাখ্যান করতেন। আমি তাঁর কাছে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস বর্ণনা করলাম,

المتبايعان بالخيار ما لم يتفرقا

ক্রেতা-বিক্রেতা চুক্তি বাতিলের অধিকার রাখবে, যতক্ষণ না তারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়।

তিনি আমাকে বললেন, তারা যদি একই নৌকা বা জাহাজে থাকে, তবে তারা কীভাবে বিচ্ছিন্ন হবে? সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা বলেন, তোমরা কি এর চেয়ে নিকৃষ্ট কিছু শুনেছো?

ইমাম আবু হানিফা রহ. এর এ উত্তরটি খুবই সূক্ষ্ম। তিনি সংক্ষেপে তাঁর উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট করেছেন।

ইমাম আবু হানিফা রহ. এর উদ্দেশ্য হলো, তাফাররুক বা বিচ্ছিন্নতা দ্বারা যদি শারীরিক বিচ্ছিন্নতা উদ্দেশ্য হয়, তবে ক্রেতা-বিক্রেতা ছোট নৌকায় নদীর মাঝে থাকলে, তাদের পক্ষে একজন থেকে অপরজন পৃথক হওয়া সম্ভব নয়। এর দ্বারা একটি অপ্রীতিকর ফলাফল সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ তারা উভয়ে চুক্তি অসম্পূর্ণ অবস্থায় বিক্রয় মজলিশটি তাদের অবস্থান অনুযায়ী দীর্ঘায়িত হবে। এটি একদিন বা কয়েকদিন হতে পারে। এমনকি বছরও অতিবাহিত পারে।

এ উদাহরণটি যখন ইমাম সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা রহ. এর বুঝের বিপরীত হলো, তখন তিনি ধারণা করলেন যে, ইমাম আবু হানিফা রহ. তার যুক্তি দ্বারা হাদিসের বিরোধিতা করছেন। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত।

এবিষয়টি যেমন একটি শব্দের সম্ভাব্য দু'টি অর্থ থাকার উদাহরণ, তেমনি একটি হাদিস বোঝার ক্ষেত্রে মানুষের বুঝের তারতম্যেরও উদাহরণ।

মতবিরোধের এই মৌলিক কারণ তথা হাদিসের বুঝ অর্জনের তারতম্যের উপর আলোচনা দীর্ঘায়িত করবো না। বরং এর পরিবর্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সচেতন করা জরুরি মনে করছি।

কুরআন ও সুন্নাহ থেকে গৃহীত শরয়ী বিধি-বিধান কুরআন ও সুন্নাহের সাথে সম্পৃক্ত দীনের অংশ।

এটি কুরআন ও সুন্নাহ বিরোধী কিছু নয়। কুরআন ও সুন্নাহ যেমন ইসলামের মৌলিক উৎস, তেমনি তা থেকে উৎসারিত ফিকহও ইসলামেরে অংশ। একে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে পৃথক করার কোন অবকাশ নেই।

ইমাম সুয়ূতী রহ. আল-ইতকানে বলেন, পয়ষট্টি নাম্বার প্রকার হলো, কুরআন থেকে উৎসারিত ইলম। ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেন,

جميع ما تقوله الأمة شرح للسنة و جميع السنة شرح للقرآن হাদিস সম্পর্কে উম্মতের বক্তব্যগুলো হাদিসের ব্যাখ্যা। আবার সব হাদিস মূলত: কুরআনেরই ব্যাখ্যা।

ইমাম শাফেয়ি রহ. আরও বলেন,

لیست تنزل بأحد في الدين نازلة إلا في كتاب الله الدليل علي سبيل الهدي فيها

পবিত্র কুরআনে দীনের প্রত্যেকটি সমস্যার সমাধানে যথার্থ হেদায়াত বা নির্দেশনা রয়েছে।

স্বভাবত কুরআনের হেদায়াতটি ইস্তেম্বাত বা সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আলোকে গৃহীত হবে। সুতরাং ইস্তে স্বাত বা কুরআন থেকে বিধান আহরণের পদ্ধতি সঠিক ও সুস্পষ্ট হলে কুরআন থেকে গৃহীত বিষয়টিও কুরআনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবে।

ইমাম শাতবী রহ. বিষয়টি উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি আল-মুয়াফাকাতে লিখেছেন, হাদিসে বর্ণিত বিষয়গুলো মূলত: কুরআনের ব্যাখ্যা। সুতরাং সুন্নাহ হলো কুরআনে বর্ণিত বিধি-বিধানের তাফসীর ও ব্যাখ্যা। নীচের আয়াতটি এ এর সুস্পষ্ট প্রমাণ,

لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ যাতে আপনি লোকদের সামনে ওইসব বিষয় বিবৃত করেন, যেগুলো তাদের প্রতি নাজিল করা হয়েছে।

পবিত্র কুরআনের চোরের শাস্তি বর্ণিত হয়েছে, وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا পুরুষ ও মহিলা চোরের হাত কাটো..।

হাদিসে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১. হাতের কব্জি পর্যন্ত কাটতে হবে। ২. সংরক্ষিত স্থান থেকে মাল চুরি করতে হবে ৩. নিসাব পরিমাণ সম্পদ হতে হবে। সুতরাং এটি হলো কুরআনের উদ্দিষ্ট অর্থ। আমরা একথা বলবো না যে, এই বিষয়গুলো কেবল হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, কুরআন দ্বারা নয়।

উদাহরণ স্বরূপ ইমাম মালেক রহ. বা অন্য কোন মুফাসসির আমাদের সামনে বিভিন্ন আয়াত বা হাদিসের ব্যাখ্যা উল্লেখ করলেন। আমরা তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী আমল করলাম। আমাদের জন্য কখনও একথা বলা সংগত হবে না যে, আমরা কুরআন ও সুন্নাহের উপর আমল না করে অমুক মুফাসসিরের বক্তব্য অনুযায়ী আমল করছি।

বিষয়টি আরও ব্যাপকভাবে উল্লেখ করেছেন, ফকিহগণের উস্তাদ, শায়খ মুহাম্মাদ বাখীত আল- মুতীয়ী। তিনি আহসানুল কালাম ফিমা ইয়াতাআল্লাকু বিস সুন্নাতি ওয়াল বিদআতি মিনাল আহকাম- এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন,

চার দলিল তথা কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস থেকে গৃহীত প্রত্যেক হুকুম আলাহর বিধান ও শরিয়ত। বিধানটি সুস্পষ্টভাবে গৃহীত হোক, কিংবা সঠিক পদ্ধতিতে ইজতেহাদের আলোকে। এটিই রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হেদায়াত। আমাদেরকে এগুলো অনুসরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কেননা, মুজতাহিদের মতামত যদি উল্লেখিত চার উৎসের কোন একটি থেকে গৃহীত হয়, তবে তাঁর নিজের জন্য এবং তাঁর অনুসারীদের জন্য এই মতামতই আল্লাহর বিধান।

সামান্য একটু চিন্তা করলে দেখা যাবে, হজরত আলী রা. এর বক্তব্যটি এই বিষয়ের প্রমাণ বহন করে। এটি বোখারি শরীফের কয়েক জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে। কিতাবাতুল ইলম পরিচ্ছেদে সর্বপ্রথম উক্তিটি হজরত আবু জুহাইফা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হজরত আলী রা. কে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার কাছে কি কোন লিখিত গ্রন্থ আছে? তিনি উত্তর দিলেন, না। তবে, আমার কাছে রয়েছে আল্লাহর কিতাব, আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন মুসলমানকে দেয়া সঠিক বুঝ অথবা এই সহিফায় যা কিছু আছে।

আল্লামা ইবনুল মুনায়িয়র রহ. বলেন, উক্ত বর্ণনায় ফাহম বা বুঝ দ্বারা তাফাক্কুহ (দীনের বুঝ অর্জন), ইস্তেম্বাত (সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আলোকে শরিয়তের মৌলিক উৎস থেকে মাসআলা গ্রহণ) ও ব্যাখ্যা উদ্দেশ্য।

হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেন, এখানে অতিরিক্ত বিষয় হিসেবে ফাহম বা বুঝ উল্লেখ করার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, কিতাবে বর্ণিত বিষয়ের ব্যাখ্যাগুলো কিতাবের অংশ হওয়ার স্বীকৃতি প্রদান। ফাহম বা বুঝ দ্বারা তাঁর কাছে লিখিত কোন কিতাব উদ্দেশ্য নয়।

ইমাম শাতবী রহ. বলেন, উম্মতের জন্য একজন মুফতি রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর স্থলাভিষিক্ত। নীচের বিষয়গুলি এর প্রমাণ,

১. শরিয়তের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, إن العلماء ورثة الأنبياء ... নিশ্চয় উলামায়ে কেরাম নবিগণের উত্তরাধিকারী।

২. উলামায়ে কেরাম শরিয়তের বিধি-বিধান অন্যের নিকট পৌঁছানোর ক্ষেত্রে নবিগণের প্রতিনিধি।

৩. এক দৃষ্টিকোণ থেকে মুফতি শরিয়ত প্রণেতা। কেননা সে শরিয়তের যেসব বিষয় বর্ণনা করে হয়তো শরিয়তের পক্ষ থেকে বর্ণিত, অথবা বর্ণিত বিষয় থেকে ইজতেহাদের মাধ্যমে আহরিত। প্রথম ক্ষেত্রে সে বর্ণনাকারী হবে। এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সে শরিয়ত প্রণেতার স্থলাভিষিক্ত। আর নতুন নতুন বিধান প্রণয়ন করা এটি শারে বা শরিয়ত প্রণেতার কাজ। মুজতাহিদ যখন তার ইজতিহাদ অনুযায়ী নতুন নতুন বিধান প্রণয়ন করে, তখন সে এই দৃষ্টিকোণ থেকে শরিয়ত প্রণেতা। সুতরাং তাঁকে অনুসরণ করা এবং তাঁর কথা অনুযায়ী আমল করা আবশ্যক। আর এটিই প্রতিনিধিত্বের বাস্তব রূপ।

মোট কথা, একজন মুফতি নবির মতো আল্লাহর পক্ষ থেকে সংবাদ দাতা। একজন নবির মতো তাঁর ইজতিহাদ অনুযায়ী শরিয়তের বিধি-বিধান প্রণেতা। খেলাফত প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার মাধ্যমে উম্মতের মাঝে শরিয়তের বিধি-বিধান বাস্তবায়নকারী। একারণে মুফতিদেরকে উলুল আমর হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে।

সালাফে-সালেহিনের উজ্জ্বল নক্ষত্র আমিরুল মু'মিনীন ফিল হাদিস আ? লাহ ইবনুল মুবারক রহ. বলেন, لا تقولوا رأي أبي حنيفة و لكن قولوا تفسير الحديث তোমরা বলো না, এটা আবু হানিফার মত। বরং বলো, এটা হাদিসের ব্যাখ্যা。

বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, আল্লামা ইবনে হাযাম রহ.। তিনি লিখেছেন, جميع ما استنبطه المجتهدون معدود من الشريعة وإن خفي دليله علي العوام ومن أنكر ذلك فقد نسب الأئمة إلي الخطاء و أنهم يشرعون ما لم يأذن به الله و ذلك ضلال من قائله عن الطريق মুজতাহিদগণ যা কিছু ইজতিহাদ করের, এর সবই শরিয়ত হিসেবে গণ্য হবে। যদিও এর দলিল সাধারণ মানুষের কাছে অস্পষ্ট থাকে। যারা বিষয়টি অস্বীকার করে, তারা ইমামদের প্রতি ভুল বিষয় সম্পৃক্ত করে। এবং এই অভিযোগ করে যে, ইমামগণ এমন বিষয়ে শরিয়ত প্রণেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, যে বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন নির্দেশনা নেই। এজাতীয় বক্তব্য বক্তার বিচ্যুতি ও সুস্পষ্ট ভ্রান্তির প্রমাণ।

আল্লামা শায়খ যফর আহমাদ উসমানী রহ. ইবনে হাযাম রহ. উক্ত বক্তব্য উদ্ধৃত করে লিখেছেন, "এটা একজন যাহেরী ব্যক্তির বক্তব্য যিনি কিয়াস স্বীকার করেন না। মুজতাহিদ ইমামগণের প্রতি তার ভক্তি ও আদব দেখুন। সম্ভবত তিনি তাঁর আল-মুহালা সংকলনের পর এটা বলেছেন।”

একটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা আবশ্যক মনে করছি। ইবনে হাযাম রহ. বলেছেন, وإن خفي دليله علي العوام )সাধারণ মানুষের নিকট যদিও দলিলটি অস্পষ্ট থাকে)। এখানে সাধারণ লোক বলতে উসুলে ফিকাহের পরিভাষায় যে আমী ব্যবহার করা হয় সেটা উদ্দেশ্য। অর্থাৎ মুজতাহিদ নয়, এমন প্রত্যেক ব্যক্তি সাধারণ মানুষের অন্তর্ভুক্ত। আমরা সাধারণভাবে যেটা উদ্দেশ্য নিয়ে থাকি, সেটা এখানে উদ্দেশ্য নয়; অর্থাৎ যারা ইলম তুলব করে না, তারাই কেবল সাধারণ মানুষ, বিষয়টি এমন নয়।

সুতরাং ইবনে হাযাম রহ. এর বক্তব্য দ্বারা থেকে প্রমাণিত হলো, ফকিহ ইমামদের ফিকাহ শরীয়তরেই অংশ। এগুলো শরিয়তের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য এর দলির অবগত হওয়া আমাদের জন্য জরুরি নয়। কেননা, দলিলটি আমাদের কাছে বিভিন্ন কারণে অস্পষ্ট থাকতে পারে। যেমন বিষয়টি আমাদের বুঝের উর্ধ্বে হওয়া। ২. দলিলটি আমাদের কাছে না পৌঁছানো। ৩. বিষয়টি অবহিত না হওয়া ইত্যাদি।

হাজার হাজার মাসআলায় ইমাম আবু হানিফা রহ. বা অন্যান্য ফকিহ ইমামদের ফিকাহ নবিজি সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহেরই ব্যাখ্যা। এটি ইসলামে অনুপ্রবেশ করা নতুন কোন বিষয় নয়। শরিয়তের উৎস ও মূলনীতি ছাড়া নিছক তাদের বিবেক-বুদ্ধি নির্ভর কোন মতামতও নয়।

আমরা যখন বলি, ইমাম আবু হানিফা রহ. এর ফিকাহ, ইমাম শাফেয়ি রহ. এর ফিকাহ... আমাদের এ কথার অর্থ হলো, এটি ইমাম আবু হানিফা রহ. এর বুঝ, এটি ইমাম শাফেয়ি রহ. এর বুঝ...। এখানে মৌলিক প্রশ্ন হলো, তাদের বুঝটি কীসের? নিঃসন্দেহে কুরআন ও সুন্নাহের বুঝ।

এর থেকে আমরা মানুষের মাঝে প্রচারিত একটি জঘন্য পর্যায়ের ভ্রান্তি সম্পর্কে অবগত হতে পারি। কেউ কেউ নিজের বুঝকে ফিকহুস সুন্নাহ (হাদিসের ফিকাহ) অথবা ফিকহুস সুন্নাহ ওয়াল কিতাব (কুরআন ও সুন্নাহের ফিকাহ) নামে মানুষের কাছে প্রচার করছে।

ফিকহুস সুন্নাহ ওয়াল কিতাব হলো কুরআন ও সুন্নাহের বুঝ। আর এই লোকটি যা প্রচার করছে, সেটি কার বুঝ? এটি যায়দ, আমর বা এ পর্যায়ের সমাজের সাধারণ শ্রেণির বুঝ। অথচ একে কুরআন ও সুন্নাহের দিকে সম্পৃক্ত করে বলছে, কুরআন ও সুন্নাহের বুঝ। এর মাধ্যমে তারা মানুষকে এভাবে ধোঁকা দেয়ার চেষ্টা করছে যে, তারা দীনের সঠিক জ্ঞানটি মানুষের কাছে পেশ করছে। এর দ্বারা তারা ইমাম আবু হানিফা রহ. ইমাম শাফেয়ি রহ. ও ইমাম মালেক রহ. এর ফিকাহ থেকে মানুষকে বিমুখ করার হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করছে। তারা মানুষকে বলছে, তোমরা কি মুহাম্মাদ সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ফিকাহ চাও নাকি ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম শাফেয়ি এর?

এদেরই একজন এক মজলিশের ইমামতির জন্য অগ্রসর হলো এবং নামাজ শুরুর পূর্বে উপস্থিত লোকদেরকে বললো, তোমরা কী চাও, আমি কি তোমাদের নিয়ে আবু হানিফার নামাজ পড়াবো নাকি মুহাম্মাদ সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএর? চিন্তা করুন, কতো জঘন্য ও নিকৃষ্ট কথা বলেছে।

তারা এই ঘৃণ্য পথ সুগম করার জন্য প্রথমে নিজেদের বুঝকে কিতাব ও সুন্নাহের দিকে সম্পৃক্ত করেছে। আর ইমাম আবু হানিফা রহ. এর বুঝকে ইমাম আবু হানিফার দিকে। একইভাবে ইমাম শাফেয়ি রহ. এর বুঝকে ইমাম শাফেয়ি এর দিকে। অর্থাৎ যেগুলো কুরআন ও সুন্নাহের সঠিক ব্যাখ্যা ও মর্ম ছিলো তা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে। আর নিজের মনগড়া ও ভ্রান্ত ব্যাখ্যাকে কুরআন ও সুন্নাহের প্রকৃত ব্যাখ্যা হিসেবে চালিয়ে দেয়ার অপপ্রয়াসে লিপ্ত হয়েছে।

কিছু মানুষ এদের ধোঁকায় নিপতিত হয়েছে। এদের দ্বারা প্রতারিত হয়েছে। প্রতারণার শিকার এই শ্রেণি মূলত: ফিকাহ সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা রাখে না। একারণেই তারা এ ফেতনার মুখে পড়েছে। এরা লক্ষ করে না যে, সর্বযুগে ইমামদের ইলম, ফিকাহ, তাকওয়া পরহেযগারীর স্বীকৃতি সকলেই দিয়েছে। এসব ইমামদের যুগেই হাদিসের ব্যাপক প্রচার, সংকলন, ব্যাখ্যা ও এগুলোর উপর বিস্ত ারিত গবেষণা হয়েছে।

বর্তমান সময়ে ইসলামি বিশ্বের সর্বস্তর থেকে একটি প্রাণবন্ত ইলমী পরিবেশ বিলুপ্তির পথে। বিষয়টি এপর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রত্যেকেই নিজে মুজতাহিদ হওয়ার দাবি করছে, অথচ সে তার মনের ভাবটি বিশুদ্ধ আরবীতে প্রকাশ করতে অক্ষম; কুরআন ও সুন্নাহের সঠিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা তো অনেক পরের বিষয়। তাঁর অজ্ঞতার মাত্রা এর থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে, সে কথায় কথায় আলাহর জাত সম্পর্কে বেয়াদবিমূলক উক্তি করে। সে বলে, العصمة الله আলাহ তায়ালার জন্য নিরাপত্তা। আল্লাহ তায়ালাকে কে নিরাপত্তা দেবে? আর আলাহ তায়ালা কোন জিনিস থেকে নিরাপদ থাকবেন? এ ব্যাপারে শরিয়তের কোন নস আছে কি? যদি সে ইসমাতের অর্থ না জানে, তবে তো মুসীবত, আর যদি সে জেনে বলে থাকে তবে তার জন্য দীনের সংস্কারের দাওয়াত দেয়ার আগে নিজের ঈমান নবায়ন করা উচিত।

এখানে খুবই জরুরি একটা বিষয়ে সতর্ক করা উচিত। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস থেকে ইজতেহাদকৃত ফিকাহ শরীয়তেরই অংশ এবং একে শরিয়তের বাইরের কোন বিষয় মনে করা বৈধ নয়। তবে এর থেকে একটা বিষয় পৃথক করা আবশ্যক। ইমাম আওযায়ী রহ. একে নাওয়াদিরুল উলামা (আলেমদের বিরল ও বিচ্ছিন্ন মতামত) বলেছেন।

ইমাম বাইহাকি রহ. তাঁর আস সুনানুল কুবরাতে নিজ সূত্রে ইমাম আওযায়ী রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন,

من أخذ بنوادر العلماء خرج من الإسلام

যে ব্যক্তি উলামায়ে কেরামের বিচ্ছিন্ন ও বিরল বক্তব্যগুলো গ্রহণ করবে, সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে。

ইবনে আব্দুল বার রহ. বিখ্যাত আলেম ও আবেদ সুলাইমান তাইমী রহ. থেকে নিজ সূত্রে বর্ণনা করেছেন,

لو أخذت برخصة كل عالم اجتمع فيك الشر كله

যদি তুমি প্রত্যেক আলেমের সহজ ও বিরল মাসআলা গ্রহণ করো, তবে তোমার মাঝে সব ধরনের অকল্যাণ ও নিকৃষ্টতার সমাবেশ ঘটবে।

ইবনে আব্দুল বার রহ. এই বক্তব্যের উপর মন্তব্য করেছেন,

هذا إجماع لا أعلم فيه خلاف

"এর উপর ইজমা হয়েছে। কেউ এর বিরোধিতা করেছে বলে আমার জানা নেই।"

ইবনে রজব হাম্বলি রহ. শরহু ইলালিত তিরমিযি-তে ইমাম মালেক রহ. এর বিশিষ্ট উস্তাদ ইবরাহিম ইবনে আবি আবলাহ রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন,

من حمل شاذ العلماء حمل شرا كثيرا ، وقال معاوية بن قرة: إياك و الشاذ من العلم

যে ব্যক্তি উলামায়ে কেরামের বিরল ও একক মতামতের অনুসরণ করে সে অনেক অকল্যাণের বাহক হয়। হজরত মুয়াবিয়া বিন কুররা (রহ:) বলেন- সাবধান! বিরল ও বিচ্ছিন্ন বক্তব্য থেকে বেঁচে থাকো।

যুলু তাযকিরাতিল হুফফায এর টীকায় আল্লামা যাহেদ আল-কাউসারি রহ. ইবনে আবি আবলাহ এর বক্তব্যটি এভাবে বর্ণনা করেছেন,

من أخذ شواذ العلماء ضل

যে ব্যক্তি উলামায়ে কেরামের বিরল ও শায বক্তব্যের অনুসরণ করল, সে পথভ্রষ্ট হয়ে গেল।

ইমাম বাইহাকি রহ. তাঁর সুনানে ইরাকের শাফেয়ি মাজহাবের বিখ্যাত ইমাম আবুল আব্বাস ইবনে সুরাইজ থেকে, তিনি ইরাকের মালেকি মাজহাবের বিখ্যাত ইমাম কাজি ঈসমাইল বিন ইসহাক থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি খলিফা মু'তাজিদ বিল্লাহ এর দরবারে উপস্থিত হলাম। তিনি আমাকে একটি কিতাব দিলেন। কিতাবটিতে উলামায়ে কেরামের বিচ্যুতি ও ভুলগুলো একত্র করা হয়েছে। আমি খলিফাকে বললাম, হে আমিরুল মু'মিনীন, এই কিতাবের সঙ্কলক ধর্মদ্রোহী যিন্দিক। খলিফা বললেন, এই হাদিসগুলো কি সহিহ নয়? আমি বললাম, হাদিসগুলো যথাস্থানে ঠিক আছে। কিন্তু যেই আলেম নাবীয বৈধ বলেছেন, তিনি মুতআকে হারাম বলেছেন। যিনি মুতআর অনুমতি দিয়েছেন তিনি গান-বাদ্য ও নাবীযকে হারাম বলেছেন। প্রত্যেক আলেমেরই কিছু বিচ্যুতি রয়েছে। যে ব্যক্তি উলামায়ে কেরামের এসমস্ত বিচ্যুতি একত্র করলো এবং সেগুলো গ্রহণ করলো, তার দীন বিদায় নিলো। অত:পর, খলিফার নির্দেশে কিতাবটি পুড়িয়ে দেয়া হলো।

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. তাঁর ইলাল-এ ইমাম ইহইয়া আল-ক্বাত্তান এর ছেলে মুহাম্মদ এর সূত্রে বর্ণনা করেন, ইমাম ইহইয়া আল-ক্বাত্তান রহ. বলেন,

لو أن إنسانا إتبع كل ما في الحديث من رخصة لكان به فاسقا

কেউ যদি হাদিসের প্রত্যেক রুখসতের অনুসরণ করে, তবে ঐ ব্যক্তি ফাসেক হয়ে যাবে।

ইবনে তাইমিয়া রহ. তাঁর আল-মুসাওয়াদা-তে লিখেছেন, আব্দুল্লাহ ইবনে আহমাদ তাঁর পিতা আহমাদ বিন হাম্বল থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি ইহইয়া ইবনে সাইদ আল-কাত্তানকে বলতে শুনেছি,

لو أن رجلا عمل بكل رخصة بقول أهل المدينة في السماع و بقول أهل الكوفة في النبيذ و بقول أهل مكة في المتعة لكان فاسقا

কেউ যদি প্রত্যেক রুখসতের উপর আমল করে, যেমন গান-বাদ্যের ক্ষেত্রে মদিনা বাসীর বক্তব্য, নাবীযের ক্ষেত্রে কুফাবাসীর বক্তব্য এবং মুতয়ার ব্যাপারে মক্কাবাসীর বক্তব্যের উপর আমল করে, তবে সে ফাসেক হিসেবে পরিগণিত হবে।

হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি রহ. তালখীসুল হাবীরে লিখেছেন,

ইমাম আব্দুর রাজ্জাক (রহঃ) হজরত মা'মার থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন,

لو أن رجلا أخذ بقول أهل المدينة في إستماع الغناء و إتيان النساء في أدبارهن ، و بقول أهل مكة في المتعة ، و الصرف و بقول أهل الكوفة في المسكر كان شر عباد الله

কেউ যদি গান শোনা ও মহিলাদের গুহ্যদ্বারে সঙ্গমের ব্যাপারে মদিনাবাসীর মতামত গ্রহণ করে এবং মুত'আ ও সরফ পদ্ধতিতে ক্রয়-বিক্রয়ে মক্কা বাসীর মতামত এবং মাদকদ্রব্যের ব্যাপারে কুফাবাসীর মতামত গ্রহণ করে তবে সে আল্লাহর সর্বনিকৃষ্ট বান্দা হিসেবে পরিগণিত হবে।

ইমাম হাকেম রহ. মা'রেফাতু উলিমিল হাদিস-এ ইমাম আওযায়ী রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন,

ইরাকবাসীর পাঁচটি বক্তব্য থেকে ও হিজাযবাসীর পাঁচটি বক্তব্য থেকে বেঁচে থাকতে হবে। অত:পর তিনি এগুলো উল্লেখ করেন।

ইমাম আজুররী রহ. তাঁর তাহরীমুন নরদ ওয়াশ শাতরঞ্জ ওয়াল মালাহি-তে লিখেছেন,

কেউ যদি দাবা খেলার রুখসত দিয়ে দলিল পেশ করে বলে যে, কিছু কিছু বড় আলেম থেকে দাবা খেলার কথা বর্ণিত আছে, তাকে বলা হবে, এই দলিল মূলত: ইলম থেকে বিচ্ছিন্ন প্রবৃত্তিপূজারী ও স্বেচ্ছাচারী ব্যক্তির। কেননা বড় কোন ব্যক্তি থেকে কোন বিচ্যুতি ঘটলে তার সেই বিচ্যুতির অনুসরণ করার কোন আবশ্যকতা নেই বরং এর থেকে আমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে। রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আশঙ্কা করেছেন পরবর্তীতে মানুষ উলামায়ে কেরামের পদস্খলনের অনুসরণ করবে।

অত:পর ইমাম আজুররী রহ. নিজ সনদে হজরত উমর রা. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,

ثلاث مضلات أئمة مضلة ، و جدال منافق بالقرآن ، و زلة عالم

তিনটি জিনিস পথভ্রষ্টকারী। ১. পথভ্রষ্ট নেতা ও ইমাম। ২. কুরআন নিয়ে কোন মুনাফিকের বিতর্ক। ৩. এবং আলেমের পদস্খলন।

ইলমুল কালাম, ফিকাহ ও হাদিসের বিখ্যাত ইমাম আবুল হাসান কারাবেসী রহ. পূর্ববর্তীদের কিছু বিরল বক্তব্য উল্লেখ করে লিখেছেন,

فإن قال قائل: هؤلاء من أهل العلم، قيل له: إنما يهدم الإسلام زلة عالم، ولا يهدمه زلة ألف جاهل

কেউ যদি প্রশ্ন করে, এরা সকলেই আলেম। তাদেরকে উত্তর দেয়া হবে, একজন আলেমের পদস্খলনই ইসলাম ধ্বংস করবে, কিন্তু এক হাজার মূর্খ লোকের পদস্খলনেও ইসলাম ধ্বংস হবে না।

আল্লাহর শপথ, তিনি সত্য বলেছেন। তবে, এটি সেক্ষেত্রে প্রযোজ্য যখন মূর্খতা ও অজ্ঞতাবশতঃ এই পদস্খলনকে বিশুদ্ধ প্রমাণের চেষ্টা করা হবে। এবং এর বিপরীত বিষয়গুলো বাতিল সাব্যস্ত করার পিছে পড়বে। কিন্তু যদি এই পদস্খলনগুলো খণ্ডন করে মাটি চাপা দেয়া হয়, তবে তাদের ক্ষেত্রে ইসলাম ধ্বংসের অভিযোগ আনা হবে না।

ইবনে আব্দুল বার রহ. জামিউ বয়ানিল ইলমি ও ফাযলিহি-তে লিখেছেন,

شبه الحكماء زلة العالم بإنكسار السفينة، لأنها إذا غرقت غرق معها خلق كثير

বিজ্ঞজনেরা আলেমের পদস্খলনকে জাহাজডুবির সাথে তুলনা করেছেন। একটা জাহাজ যখন ডুবে যায়, তার সাথে অনেক মানুষও ডুবে যায়।

ইবনে রজব হাম্বলি রহ. জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম-এ আদ দিনু আন নসিহা হাদিসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন,

"আলাহ তায়ালা, আলাহর কিতাব ও তাঁর রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্য নসীহতের একটি প্রকার উলামায়ে কেরামের সাথে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত। অর্থাৎ উলামায়ে কেরামের বিশেষ দায়িত্ব হলো কুরআন ও সুন্নাহের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভ্রান্তিকারী বিষয়গুলো খণ্ডন করে এগুলো প্রত্যাখ্যান করা। এবং প্রবৃত্তিপূজা ও স্বেচ্ছাচারিতার বিপরীতে কুরআন ও সুন্নাহের সঠিক প্রমাণাদি উপস্থাপন করা। একইভাবে, উলামায়ে কেরামের পদস্খলন ও দুর্বল বক্তব্য খন্ডন ও প্রত্যাখ্যান করা তাদের কর্তব্য। এবিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহের প্রয়োজনীয় প্রমাণাদি তুলে ধরা তাদের নসীহতেরই অংশ।

আপনি যদি প্রশ্ন করেন, কোন একটি কথা পদস্খলন ও বিচ্যুতি হিসেবে বিবেচিত হওয়ার আলামত কি?

আমি বলবো, ইয়াকুব বিন সুফিয়ান আল-ফাসাবী রহ. তার তারিখে বর্ণনা করেছেন এবং তার সূত্রে ইমাম বাইহাকি রহ. তার আস সুনানুল কুবরা ও মাদখালে হজরত মুয়ায বিন জাবাল রা. এর প্রজ্ঞাপূর্ণ বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন। হজরত মুয়ায বিন জাবাল রা. এর বিশেষ শাগরেদ, বিশিষ্ট হজরত ইয়াযিদ বিন আমিরা রহ. বলেন, হজরত মুয়ায বিন জাবাল রা. যখন কোন আলোচনার মজলিশে বসতেন, তিনি বলতেন, আল্লাহ হাকামুন আদলুন (আল্লাহ তায়ালা ন্যায় পরায়ণ বিচারক)। একদিন তিনি তাঁর এক মজলিশে বললেন, তোমাদের পরবর্তী সময়ে অনেক ফেতনা রয়েছে। তখন সম্পদ স্ফীত হবে। কুরআনের আলোচনা ব্যাপক হবে। এমনকি প্রত্যেক মু'মিন-মুনাফিক, স্বাধীন- গোলাম, পুরুষ-মহিলা ও ছোট-বড় একে গ্রহণ করবে। অচিরেই তোমাদের মাঝে এমন বক্তার আবির্ভাব হবে, যে বলবে, মানুষের কি হলো, আমি কুরআন পড়ছি, অথচ আমাকে কেউ অনুসরণ করছে না? আল্লাহর শপথ, তারা আমার অনুসরণ করবে না, যতক্ষণ না আমি তাদের জন্য নতুন কিছু সৃষ্টি করবো।"

সাবধান, তোমরা এ নব আবির্ভূত বিষয় থেকে দূরে থাকবে। কেননা নব আবির্ভূত বিষয়ের মাঝে ভ্রষ্টতা রয়েছে। তোমরা বিজ্ঞজনের বিভ্রান্তি থেকে সাবধান থাকো। কেননা শয়তান বিজ্ঞজনের মুখ থেকে অনেক সময় বিভ্রান্তিকর কথা বের করে। আবার কখনও মুনাফিকও সত্য বলতে পারে।

হজরত ইয়াযীদ বিন আমিরা রহ. বললেন, আমি হজরত মুয়ায রা. কে জিজ্ঞাসা করলাম, আলাহ আপনার উপর রহমত বর্ষণ করুন, আমি কীভাবে বুঝবো যে, বিজ্ঞজন বিভ্রান্তিকর কথা বলে এবং মুনাফিক কখনও সত্য বলতে পারে।

হজরত মুয়ায রা. বললেন, বিজ্ঞ জনের এমন অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য কথা থেকে তোমরা দূরে থাকবে, যেগুলো শুনে তোমরা আশ্চর্যান্বিত হয়ে বলো, এগুলো কী? তবে, ভুলের কারণে তার থেকে দূরে সরে যাবে না। সে হয়তো সত্য শ্রবণ করে ভুল থেকে ফিরে আসবে। কেননা সত্যের মাঝে একটা নূর থাকে।

ইমাম বাইহাকি রহ. বলেন, বিজ্ঞজনের বিভ্রান্তিকর কথা ও বক্র চিন্তার কারণে তার থেকে একেবারে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া উচিত নয় বরং তার সেসব কথা পরিত্যাগ করা উচিত যেগুলোতে কোন নূর নেই। কেননা সত্যের মাঝে নূর রয়েছে অর্থাৎ এর উপর কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস ভিত্তিক দলিল রয়েছে।"

সুতরাং হজরত মুয়ায ইবনে জাবাল রা. একটি বিশেষ দলের দিকে ইঙ্গিত করে তাদের থেকে সতর্ক করেছেন। তাদের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে, তারা ইসলাম বহির্ভূত বিষয় ইসলামের নামে চালিয়ে দেবে। মানুষের সামনে এমন সব বিদআত উপস্থাপন করবে যার সঙ্গে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। সাথে সাথে তিনি ন্যাক্কার বুযুর্গদের সম্পর্কেও অবহিত করেছেন। যাদের মাঝে ঈমান ও হিকমতের নিদর্শন স্পষ্ট হবে, কিন্তু কখনও যদি তাদের থেকে কোন ভ্রান্তি প্রকাশ পায়, তবে তাদের সাথে প্রথম শ্রেণির মতো আচরণ করা উচিত নয়। বরং এই দলের উত্তম ও সুস্পষ্ট সত্য বিষয়গুলো গ্রহণ করতে হবে এবং তাদের বিরল ও বিচ্ছিন্ন বক্তব্য থেকে দূরে থাকবে। তিনি ভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতার আলামতও বর্ণনা করেছেন। এটি সত্যের মতো আলোকজ্বল হওয়ার পরিবর্তে অন্ধকাচ্ছন্ন হয়। তিনি একে মুশতাবিহাত বলে ব্যাখ্যা করেছেন অর্থাৎ সুস্থ বিবেক ও স্বাভাবিক চিন্তা-চেতনা যা গ্রহণ করতে ইতস্তত বোধ করে। এমনকি বিষয়টি সত্যের এতটা বিরোধী হবে যে, একজন স্বাভাবিক মানুষ বলতে বাধ্য হবে, এটা কী? পক্ষান্তরে নিরেট সত্যের মাঝে দলিল ও নূর থাকে, যা তাকে আরও শক্তিশালী করে।

ই'লামুল মুয়াক্বিয়ীন-এ ইবনুল কাইয়্যিম রহ. এবিষয়ে খুবই মূল্যবান কথা বলেছেন। তিনি উলামায়ে কেরামের বিচ্যুতি থেকে বাঁচার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। তিনি লিখেছেন,

ولابد من أمرين أحدهما أعظم من الآخر وهو النصيحة الله ولرسوله وكتابه ودينه وتنزيهه عن الأقوال الباطلة المناقضة لما بعث الله به رسوله من الهدى والبينات التي هي خلاف الحكمة والمصلحة والرحمة والعدل وبيان نفيها عن الدين وإخراجها منه وإن أدخلها فيه من أدخلها بنوع تأويل

والثاني معرفة فضل أئمة الإسلام ومقاديرهم وحقوقهم ومراتبهم وأن فضلهم وعلمهم ونصحهم الله ورسوله لا يوجب قبول كل ما قالوه وما وقع في فتاويهم من المسائل التي خفى عليهم فيها ما جاء به الرسول فقالوا بمبلغ علمهم والحق في خلافها لا يوجب اطراح أقوالهم جملة وتنقصهم والوقيعة فيهم فهذان طرفان جائران عن القصد وقصد السبيل بينهما فلا نؤثم ولا نعصم ولانسلك بهم مسلك الرافضة في علي ولا مسلكهم في الشيخين بل نسلك مسلكهم أنفسهم فيمن قبلهم من الصحابة فإنهم لا يؤثمونهم ولا يعصمونهم ولا يقبلون كل أقوالهم ولا يهدرونها فكيف ينكرون علينا في الأئمة الأربعة مسلكا يسلكونه هم في الخلفاء الأربعة وسائر الصحابة ولا منافاة بين هذين الأمرين لمن شرح الله صدره للأسلام وإنما يتنافيان عند أحد رجلين جاهل بمقدار الأئمة وفضلهم أو جاهل بحقيقة الشريعة التي بعث الله بها رسوله ومن له علم بالشرع والওয়াক্বিউ ইয়া’লামু ক্বাত’আন আন্নার রাজুল আল জালীলুল্লাজী লাহু ফিল ইসলামে ক্বাদামুন সালিহুন ওয়া আছারুন হাসানাতুন, ওয়াহুয়া মিনাল ইসলাম ওয়া আহলিহি বিমাকানিন ক্বাদ তাকুনু মিনহুল হাফওয়াতু ওয়ায্‌ যাল্লাতু হুয়া ফীহা মা’যূরুন বাল মা’জুরুন লি ইজতিহা দিহি ফালা ইয়াজুযু আইঁ ইউত্তাবি’আ ফীহা ওয়ালা ইয়াজুযু আন তুহদারা মাকানাতুহু ওয়া ইমামাতুহু ওয়া মানযিলাতুহু মিন কুলুবিল মুসলিমীন।

“দু’টি বিষয়ের চর্চা থাকা আবশ্যক। একটি থেকে অন্যটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম বিষয়টি হলো, আল্লাহর, আল্লাহর রসুল, আল্লাহর কিতাব ও তাঁর দীনের জন্য কল্যাণকামিতা এবং দীনকে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আনীত হেদায়াত ও পথ-নির্দেশনার বিপরীত বিষয় থেকে রক্ষা করা।

দ্বিতীয় বিষয় হলো, মুসলিম উম্মাহের ইমামগণের মহত্ত্ব, ও মর্যাদা সম্পর্কে অবগত হওয়া। তাদের হক, অবস্থান ও স্তর সম্পর্কে সচেতন হওয়া। আল্লাহ ও তাঁর রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্য তাদের কল্যাণকামিতা এবং তাদের ইলম ও মহত্ত্ব, তাদের প্রত্যেক কথা গ্রহণকে আবশ্যক করে না। কিছু মাসআলায় রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নির্দেশনা সম্পর্কে তারা অনবহিত ছিলেন। একারণে তাদের সামান্য কিছু ফতোয়ায় ভুল হয়েছে। এগুলোর কারণে তাদের সব ফতোয়া সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করা আদৌ শরিয়ত সমর্থিত নয়। এমনকি এই ভুলের কারণে মর্যাদাহানি কিংবা তাদের সমালোচনার দ্বার উন্মুক্ত করারও কোন সুযোগ নেই। দু'টি বিষয়ই (তাদের সমস্ত কথা গ্রহণ করা এবং সামান্য ভুলের কারণে তাদের সমস্ত কথা পরিত্যাগ) প্রান্তিকতার শিকার এবং সরল পথ থেকে বিচ্ছিন্ন। এদুয়ের মধ্যবর্তী স্তরটিই হলো সরল পথ। ইফরাত-তাফরীত থেকে বেঁচে থাকলে তাদের অতিশয় সাফাই গাওয়ার প্রয়োজন হবে না। তেমনি তাদেরকে দোষী প্রমাণের প্রবণতাও থাকবে না। বরং তাদের ব্যাপারে আমরা সেই ধারণাই পোষণ করবো, যা তারা সাহাবায়ে কেরাম রা. সম্পর্কে পোষণ করতেন। আল্লাহ তায়ালা যার বক্ষকে ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করেছেন, উপর্যুক্ত দু'টি বিষয়ের মধ্যে তার কাছে কোন বৈপরীত্য নেই। তবে, ঐ ব্যক্তি বৈপরীত্য দেখবে যে ইমামগণের মর্যাদা ও ইলম সম্পর্কে অজ্ঞ। অথবা রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আনীত শরিয়তের বাস্তবতা সম্পর্কে যে অনবহিত। শরিয়ত ও এর বাস্তবতা সম্পর্কে যার পর্যাপ্ত জ্ঞান রয়েছে, সে নিশ্চিতরূপে অবগত যে, ইসলামের মহান ব্যক্তিরাও ভুল করতে পারেন। পূর্ববর্তী ইমামরা ইসলামে বিশেষ অবদান রেখেছেন। তাকওয়া ও খোদাভীতিতে ছিলেন অনন্য। ইসলাম ও মুসলমানদের মাঝে তাদের বিশেষ অবস্থান ও মর্যাদা রয়েছে। এরপরও কদাচিৎ তারা ভুল করেছেন। তাদের থেকে কিছু বিচ্যুতি ঘটেছে। এক্ষেত্রে তারা মাজুর। বরং তারা ইজতেহাদের জন্য প্রতিদান প্রাপ্ত হবেন। সুতরাং তার এ বিচ্যুতির অনুসরণ বৈধ নয় এবং মুসলমানদের অন্তর থেকে তার মর্যাদা ও অবস্থান খাটো করার কোন প্রয়াসও বৈধ নয়।

বিষয়টি আমি বেশ দীর্ঘায়িত করেছি। এর দ্বারা সেসব লোকের মুখোশ উন্মোচিত হবে, যারা ইমামদের বিরল, দুর্বল বা বিচ্ছিন্ন কোন বক্তব্য অবলম্বন করে নিজের বিচ্ছিন্ন মতামত বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করে। অথচ ইমামদের ঐ বিচ্ছিন্ন মতের বিপরীতে সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের সঠিক মতামত বিদ্যমান রয়েছে।

স্বার্থলোভী ও দুনিয়াভোগী এসব লোক কখনও কিছু বিরল ও দুর্বল বক্তব্য দ্বারা প্রমাণ পেশ করে এই দাবি করতে পারে যে, আমাদের আলেমের বক্তব্যের উৎস হলো কুরআন ও সুন্নাহ। সুতরাং এর একটি অবস্থান ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। একারণে আমি বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। স্বভাবত আলেমদের অনেক সময় বিচ্যুতি ঘটে থাকে। এবং তাদের কিছু বিরল ও বিচ্ছিন্ন বক্তব্য রয়েছে। কিন্তু এগুলো গ্রহণ ও তার উপর আমল করা কখনও বৈধ নয়।

সত্য পথের দিশাদানকারী একমাত্র আলাহ তায়ালা। আমরা আলাহ তায়ালার নিকট প্রার্থনা করি, তিনি আমাদেরকে সরল পথের দিশা দান করুন। আমাদের কথা ও কাজ শুদ্ধ করে দেন।

টিকাঃ
১৭৩ আল-হিলয়া, আল্লামা আবু নুয়াইম রহ. খ.৯, পৃ.১২১।
১৭৪ আল-বয়ান ওয়াত তাবাইয়্যূন, খ.৪, পৃ.৬৮।
১৭৫-মাসুন, আবু আহমাদ আল-আসকারী, পৃ.১২৭।
১৭৬ মানাকিবুল ইমাম আবু হানিফা, মোল্লা আলী কারী রহ.। আল-জাওয়াহিরুল মুজিয়া, খ.২, পৃ.৪৮৪। মূল বর্ণনাটি খতীব বাগদাদী রহ. আল-ফকীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ নামক কিতাবে উল্লেখ করেছেন। খ.২, পৃ.৮৪। ইমাম আবু ইউসুফ রহ. এর সাথে ইমাম আ'মাশ রহ. এর একই ঘটনা ঘটেছে। জামিউ বয়ানিল ইলমি ওফাযলিহি, খ.২, পৃ.১৩০-১৩১। আখবারু আবি হানিফা ও আসহাবিহি, আল্লামা সাইমারি রহ. পৃ.১২-১৩।
১৭৭ মানাকিবুশ শাফেয়ী রহ.। ইমাম বাইহাকী রহ. কৃত। খ.২, পৃ.১৫৪।
১৭৮ তারীখে বাগদাদ, খ.১৩, পৃ.৩৩৮।
১৭৯ আল-মানাকিব, পৃ.৪৫। আওযাযুল মাসালিক, শাইখুল হাদীস যাকারিয়া কান্ধলবী রহ. খ.১, পৃ.৮৮-৮৯।
১৮০ তারীখে বাগদাদ, খ.১১, পৃ.১৫৮।
১৮১ এ বিষয়ে ইমাম নববী রহ. আরও অনেক হাদীস উল্লেখ করেছেন। দেখুন, আল-মাজমু, খ.৯, পৃ.১৯৭।
১৮২ সূরা নিসা, আয়াত নং ২৯।
১৮৩ সূরা আল- ইমরান, আয়াত নং ১০৩
১৮৪ সূরা আল-বাইয়ি‍্যনা, আয়াত নং ৪।
১৮৫ ইমাম আবু হানিফা রহ. সম্পর্কে সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা রহ. পূর্বের মত এটি। পরবর্তীতে ইমাম আবু হানিফা রহ. সম্পর্কে তার ধারণার পরিবর্তন হয় এবং তিনি সুধারণা পোষণ করেন। আল-জাওয়াহিরুল মুজিয়্যা গ্রন্থে (১/১৬৬) ইমাম আবু ইউসুফ রহ. এর ছাত্র বিশর বিন ওয়ালিদ আল-কিন্দী রহ. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, আমরা ইবনে উয়াইনা রহ. এর মজলিশে বসতাম। যখন জটিল কোন মাসআলার সম্মুখীন হতেন, তিনি বলতেন, এখানে আবু হানিফার কোন শাগরেদ আছে? তাঁকে উত্তর দেয়া হতো, বিশর আছে। তিনি আমাকে বলতেন, তুমি এ প্রশ্নের উত্তর দাও। তাঁর প্রশ্নের উত্তর দেয়া হতো। অতঃপর, তিনি বলতেন, التسليم للفقهاء سلامة في الدين অর্থাৎ ফকীহগণের আনুগত্যের মাঝে দীনের নিরাপত্তা রয়েছে।
১৮৬ আল-ইন্তেকা, পৃ.১৪৯। আল-জাওহারুন নাকী, খ.৫, পৃ.২৭২।
১৮৭ ইবনে আব্দুল বার রহ. এর আল-ইন্তেকা নামক গ্রন্থে রয়েছে, বিখ্যাত হাফিজে হাদীস ফজল ইবনে মুসা সিনানি রহ. ইমাম আবু হানিফা রহ. ও ছাত্রদের যুগ পেয়েছিলেন। একদা তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, যারা ইমাম আবু হানিফা রহ. সম্পর্কে কটুক্তি করে তাদের সম্পর্কে আপনার অভিমত কী? তিনি উত্তর দিলেন, إن أبا حنيفة جاءهم بما يعقلونه و بما لا يعقلونه من العلم ، و لم يترك لهم شيئا فحسدوه ইলমের অধিকারী ছিলেন, যার কিছু তারা বোঝে এবং কিছু বোঝে না। তিনি তাদের জন্য কিছু রেখে যাননি, ফলে তারা তাকে ঈর্ষা করে। আল-ইন্তেকা, পৃ.১৩৬
১৮৮ আল-ইতকান, খ.৪, পৃ.২৪-২৫
১৮৯ সূরা নাহল, আয়াত নং ৪৪।
১৯০ আল-মুয়াফাকাত, খ.৪, পৃ.১০
১৯১ আহসানুল কালাম ফিমা ইয়াতাআল্লাকু বিস সুন্নাতি ওয়াল বিদআতি মিনাল আহকাম, পৃ.৬, ২৩।
১৯২ সহীহ বোখারী, খ.১, পৃ.২০৪।
১৯৩ আত-তারাতিবুল ইদারিয়‍্যা, খ.২, পৃ.২৫৮।
১৯৪ আল-মুয়াফাকাত, খ.৪, পৃ.২৪৪-২৪৫
১৯৫ যাইলুল জাওয়াহিরিল মুজিয়্যা, খ.২, পৃ.৪৬০
১৯৬ আল-মিযানুল কুবরা, আল্লামা শা'রানী রহ. খ.১, পৃ.১৬
১৯৭ ইনজাউল ওয়াতান, পৃ.৫৩। এটি আবু ও আসহাবুহুল মুহাদ্দিসুন সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। পৃ.৬১
১৯৮ সুনানুল কুবরা, ইমাম বাইহাকী (রহঃ), খ--১০, পৃষ্ঠা-২১১, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ইমাম যাহাবী (রহঃ), খ--৭, পৃষ্ঠা-১২৫, তাযকিরাতুল হুফ্ফায, ইমাম যাহাবী, খ--১, পৃষ্ঠা-১৮০
১৯৯ জামিউ বয়ানিল ইলমি ওফাযলিহি, খ--১, পৃষ্ঠা-৯০,৯১, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ইমাম যাহাবী (রহঃ), খ--৬, পৃষ্ঠা-১৯৮, তাযকিরাতুল হুফ্ফায, ইমাম যাহাবী, খ--১, পৃষ্ঠা-১৫১
২০০ শরহু ইলালিত তিরমিযী, আল্লামা ইবনে রজব হাম্বলী (রহঃ), খ--১, পৃষ্ঠা-৪১০
২০১ যুয়ূলু তাযকিরাতিল হুফফায, আল্লামা যাহেদ আল-কাউসারী (রহঃ) এর টীকা সংযোজন। পৃষ্ঠা-১৮৭
২০২ আস-সুনানুল কুবরা, খ.১০, পৃ.২১১।

📘 নবীজীর হাদীস ও ইমামগণের মতভেদ > 📄 মতানৈক্যের তৃতীয় কারণ: বাহ্যিকভাবে পরস্পর বিরোধী হাদিসের ক্ষেত্রে ইমামগণের মতবিরোধ

📄 মতানৈক্যের তৃতীয় কারণ: বাহ্যিকভাবে পরস্পর বিরোধী হাদিসের ক্ষেত্রে ইমামগণের মতবিরোধ


ইমামদের মতবিরোধের কারণসমূহের মাঝে তৃতীয় কারণটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে শরিয়তের ইলমের মহান দু'টি শাখা তথা ইলমুল হাদিস ও উসুলে ফিকাহ থেকে উপকৃত হওয়ার বিশেষ সুযোগ রয়েছে।

ইলমুল হাদিস থেকে উপকৃত হওয়ার পদ্ধতি হলো, একই বিষয়ে বর্ণিত একাধিক হাদিস ও আসার সম্পর্কে অবগত হওয়া। এবং মাস-আলার সঙ্গে নিকটবর্তী বা দূরবর্তী সম্পর্ক রয়েছে এমন বর্ণনাগুলো একত্রিত করা।

উসুলে ফিকাহ থেকে উপকৃত হওয়ার পদ্ধতি হলো, এর মাধ্যমে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে গৃহীত কায়দা ও হুকুম সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। উসুলে ফিকাহের ক্ষেত্রে যে যতো গভীর পান্ডিত্য অর্জন করবে, তাঁর বুঝ ও চিন্তা-চেতনা ততো বেশি সূক্ষ্ম, দৃঢ় ও সৃজনশীল হবে। পরস্পর বিরোধী নসের দলিলের মাঝে সমন্বয় সাধণের অসাধারণ যোগ্যতা সৃষ্টি হবে।

নীচের আলোচনায় আমরা বিষয়টি প্রত্যক্ষ করবো।

একজন প্রাথমিক স্তরের তালিবুল ইলমও অবগত রয়েছে, শরিয়তের অনেক মাসআলায় পরস্পর বিরোধী একাধিক হাদিস থাকে। কখনও একই বিষয়ে দু'য়ের অধিক অর্থের সম্ভাবনা থাকে। এই বিরোধ নিরসনে উলামায়ে কেরাম নীচের পদ্ধতিগুলো আলোচনা করেছেন,

প্রথম পদ্ধতি:

১. পরস্পর বিরোধী হাদিস দু'টির মাঝে এমনভাবে সমন্বয় করা যে উভয়টার উপর আমল করা সম্ভব হয়।

২. অথবা উভয়টা ব্যাখ্যা করা।

৩. অর্থের মাঝে সমন্বয় করার চেষ্টা করা।

দ্বিতীয় পদ্ধতি: উভয়টার মাঝে সমন্বয় সাধন সম্ভব না হলে একটিকে রহিত সাব্যস্ত করা।

তৃতীয় পদ্ধতি: আর যদি একটাকে রহিত প্রমাণ করা সম্ভব না হয় এবং রহিত হওয়ার দলিল না পাওয়া যায়, তবে দু'টোর যে কোন একটাকে প্রাধান্য দেয়া।

আলেমদের মাঝে কেউ কেউ তৃতীয় পদ্ধতিকে দ্বিতীয় পদ্ধতির উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। অর্থাৎ প্রথমে সমন্বয় সাধন এরপর, প্রাধান্য দান অত:পর, রহিতকরণ।

এই মাসলাক বা পদ্ধতিগুলোর বিস্তারিত বিবরণ বেশ দীর্ঘ। আমি নীচে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করছি,

১. দু'টি বিরোধপূর্ণ হাদিসের মাঝে সমন্বয় সাধনের ক্ষেত্রে মানুষের বুঝশক্তি বিশেষ ভূমিকা পালন করে। পরস্পর বিরোধী দু'টি হাদিসের ক্ষেত্রে কিছু আলেম দাবি করতে পারেন, এদের মাঝে সমন্বয় সাধন অসম্ভব, কিন্তু আলাহ তায়ালা অন্য কোন আলেমের নিকট বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়ে থাকেন। ফলে তিনি উভয়ের মাঝে সমন্বয় সাধনের উপযুক্ত কারণ বিশ্লেষণ করেন। একারণে বাহ্যিকভাবে পরস্পর বিরোধী দু'টি হাদিসের মাঝে সমন্বয় সাধনের ক্ষেত্রে উলামায়ে কেরাম খুবই সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন এবং বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই ফয়সালা দিতে বলেছেন।

২. বিরোধপূর্ণ হাদিস দু'টির মাঝে সমন্বয় সাধন সম্ভব না হলে ইমাম যেকোন একটা রহিত হওয়ার দিকে মনোনিবেশ করেন। সুনির্দিষ্ট দলিল ছাড়া রহিত হওয়ার দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। রহিত হওয়ার প্রমাণগুলোকে মুয়াররিফাতুন নসখ বা রহিত হওয়ার পরিচয়ক বলা হয়। রহিত হওয়ার পরিচয়ক চারটি,

এক. রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর স্পষ্ট বর্ণনার দ্বারা রহিত হওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হওয়া। যেমন, মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদিস,

كنت نهيتكم عن زيارة القبور، فزوروها

অর্থ: আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম। এখন তোমরা কবর যিয়ারত করো।

দুই. কোন সাহাবির বক্তব্য দ্বারা রহিত হওয়া সম্পর্কে অবগত হওয়া। যেমন, আবু দাউদ ও নাসায়ী শরীফে বর্ণিত হজরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা. এর হাদিস,

كان آخر الأمرين من رسول الله صلى الله عليه وسلم ترك الوضوء مما مست النار

অর্থ: আগুনে স্পর্শকৃত বস্তু আহারের ক্ষেত্রে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএর সর্বশেষ আমল ছিলো ওজু না করা।

তিন. তারিখ বা সময়ের ব্যবধানের মাধ্যমে রহিত হওয়া সম্পর্কে অবগত হওয়া। যেমন, হজরত শাদ্দাদ ইবনে আওস রা. থেকে বর্ণিত, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

أفطر الحاجم و المحجوم

অর্থ: যে শিঙা লাগায় এবং যাকে শিঙা লাগানো হয়, উভয়ের রোজা ভেঙ্গে যাবে।

কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে, এটি অষ্টম হিজরীতে বর্ণিত হাদিস। এটি হযতর ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত হাদিস দ্বারা রহিত হবে। হজরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন,

إحتجم النبي صلي الله عليه وسلم وهو محرم صائم

অর্থ: রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোজা রেখে ইহরাম বাঁধা অবস্থায় শিঙা লাগিয়েছেন।

এটি বিদায় হজের সময়কার ঘটনা। বিদায় হজ হয়েছিলো দশম হিজরীতে।

অনেক ক্ষেত্রে সময়ের ব্যবধান নির্দেশক কিছু প্রমাণ দ্বারা রহিত হওয়ার বিষয়টি অবগত হওয়া যায়। যেমন, বর্ণনাকারী সাহাবি পূর্বে বর্ণিত হাদিসের পরে ইসলাম গ্রহণ করেছন এবং তিনি সরাসরি হাদিসটি রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট থেকে শোনার বিষয়টিও স্পষ্ট করেছেন। সুতরাং পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবির হাদিসটি পূর্বে ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবির হাদিস রহিত করবে।

এছাড়াও অনেক সূক্ষ্ম ও তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত রয়েছে, যার মাধ্যমে রহিত হওয়ার বিষয়টি নির্ণয় করা সম্ভব। তবে এর উপর খুবই তাত্ত্বিক ও বিশ্লেষণমূলক গবেষণা হওয়া আবশ্যক।

চার. হাদিস রহিত হওয়ার বিষয়টি এর বিপরীতে সঙ্ঘঠিত ইজমা দ্বারা সুস্পষ্ট হওয়া। কিন্তু ইজমা সঙ্ঘঠিত হওয়ার ব্যাপারটি প্রমাণ করা এবং কেউ এর বিরোধিতা করেনি এটা নিশ্চিত হওয়া কঠিন।

৩. যদি কোন একটি হাদিস রহিত প্রমাণ করা করা সম্ভব না হয়, তবে ইমামগণ দু'টির যে কোন একটিকে প্রাধান্য দেয়ার চেষ্টা করেন। দু'টি হাদিসের একটিকে প্রাধান্য দেয়া খুবই জটিল।

বিরোধপূর্ণ হাদিসের প্রথম ধাপ তথা উভয়ের মাঝে সমন্বয় সাধনের জন্য বিশেষ বুঝ ও উপযুক্ত আকল প্রয়োজন। দ্বিতীয় ধাপ তথা কোন একটা হাদিসকে রহিত প্রমাণের জন্য উক্ত হাদিস সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা থাকা জরুরি। তৃতীয় ধাপ তথা একটিকে প্রাধান্য দেয়ার ক্ষেত্রে বর্ণিত হাদিসের সম্পর্কে রেওয়াত ও দিরায়াত উভয় পদ্ধতির জ্ঞান থাকতে হবে। দিরায়াত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো হাদিসটি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান, ফিকাহ ও প্রখর বুঝ। আর রিওয়াতের জ্ঞান হলো, হাদিসের সঙ্গে সংশিষ্ট সকল বিষয় সম্পর্কে সম্যক অবগত হওয়া অর্থাৎ হাদিসের সনদ বিশ্লেষণ। সনদ বিশ্লেষণের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি কষ্টকর। অতঃপর, বর্ণনাকারী সাহাবিদের জীবনী, তাদের ইতিহাস, বর্ণনাকারীদের গুণাগুন, হাদিসে বর্ণিত শব্দ ইত্যাদি বিশ্লেষণ করা আবশ্যক।

আমি প্রথম সংস্করণে যখন এই বিষয়টা লিখি তখন উপর আমার মাথায় একটা উপযুক্ত উদাহরণ ছিলো। সেটি এখন উল্লেখ করছি,

কোন পাত্রে কুকুর মুখ দিলে তা পবিত্র করার পদ্ধতির ব্যাপারে অধিকাংশ ইমাম হজরত আবু হুরাইরা রা. এর হাদিসের উপর আমল করে থাকেন। নবি কারীম সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

إذا ولغ الكلب في إناء أحدكم فليغسله سبع مرات

অর্থ: তোমাদের কারও পাত্রে কুকুর মুখ দিলে সে যেন তা সাতবার ধৌত করে।

হানাফীগণ বলেন, তিনবার ধৌত করার দ্বারা পাত্র পবিত্র হয়ে যাবে। হাদিসের বর্ণনাকারী সাহাবি হজরত আবু হুরাইরা রা. এর উপরই আমল করেছেন এবং ফতোয়া দিয়েছেন। হানাফীদের মূলনীতি হলো, হাদিসের বর্ণনাকারী যদি বর্ণিত হাদিসের বিপরীত আমল করে, তবে উক্ত হাদিসের উপর আমল করা বিশুদ্ধ নয়। কেননা এক্ষেত্রে হাদিসে মা'লুল বা অভিযুক্ত হয়ে যায়।

বিশিষ্ট গবেষক ও মুহাদ্দিস আল্লামা যাহেদ আল-কাউসারি রহ. লেখেন,

إن التسبيع أي غسل الإناء سبع مرات هو المنسوخ، دون التثليث لتدرجه في أمر الكلاب من التشدد إلي التخفيف دون العكس ، فأمر بقتلها مطلقا لقلع عادة الناس في الألف بها، ثم بقتل الأسود البهيم خاصة، ثم بالترخيص في كلب الصيد و الماشية و الزرع ونهوها. فالتسبيع هو المناسب لأيام التشدد والتثليث هو المناسب لأيام التخفيف وهو آخر الأمرين

অর্থ: সাতবার ধৌত করার বিষয়টি রহিত (মানসুখ)। কিন্তু তিনবার ধৌত করার বিষয়টি রহিত নয়। কেননা রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুকুরের ক্ষেত্রে কঠোর বিধান থেকে ধীরে ধীরে সহজ বিধান গ্রহণ করেছেন। বিষয়টি এর উল্টো নয়। অর্থাৎ সহজ থেকে কঠোরতার দিকে যাননি। প্রথম দিকে সব কুকুর হত্যার নির্দেশ দেন। ফলে কুকুরের প্রতি মানুষের হৃদ্যতা ও দুর্বলতা শেষ হয়ে যায়। অত:পর ঘন কালো কুকুর গুলো হত্যার নির্দেশ দেন। এরপর ক্ষেত, পাহারা বা শিকারের জন্য কুকুর রাখার অনুমতি দেন। সুতরাং সাতবার ধৌত করার বিধানটি কঠোরতার সময় আরোপকৃত বিধানের সাথে সংশিষ্ট। এবং তিনবার ধৌত করার বিধানটি শিথিলতার সময়ের। আর এটি ছিলো সর্বশেষ আমল। সুতরাং পূর্বেরটি রহিত সাব্যস্ত হবে।

এর থেকে স্পষ্ট, বিষয়টি শুধু সাতবার ধৌত করা এবং অষ্টম বার মাটি দ্বারা পরিষ্কার করার মাঝে সীমাবদ্ধ নয় এবং এটি আবু হুরাইরা রা. এর ফতোয়া ও আমলের মাঝেও সীমাবদ্ধ নয়; বরং এখানে প্রতিপাদ্য বিষয় হলো, কুকুরের সাথে সংশিষ্ট সকল বিধানে সহজতা আরোপ করা হয়েছে। পরবর্তীতে কুকুর হত্যা থেকেও নিষেধ করেছেন। সুতরাং এখানে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উদ্দেশ্যও স্পষ্ট যে তিনি কী চান, সহজতা নাকি কঠোরতা? যখন মূল উদ্দেশ্যটি জানা গেলো, তখন উদ্দেশ্যের আলোকে হুকুমের মাঝেও পরিবর্তন হবে।

ইমামগণ দু'টি পরস্পর বিরোধী হাদিসের মাঝে সমন্বয় সাধনের জন্য যেসব পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন, সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ খুবই কঠিন। ইমামরা তাঁদের কিতাবে এগুলো বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এই বিষয়ে সর্বপ্রথম কলম ধরেছেন, ইমাম শাফেয়ি রহ.। তিনি তাঁর আর-রিসালা-তে এক আলোচকের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে বলেছেন,

إن أصل ما نبني نحن و أنتم عليه : أن الأحاديث إذا اختلفت لم نذهب إلي واحد منها دون غيره إلا بسبب يدل علي أن الذين ذهبنا إليه أقوي من الذين تركنا. قال محاوره: وما ذلك السبب؟ قلت الشافعي : أن يكون أحد الحديثين أشبه بكتاب الله ، فإذا أشبه كتاب الله كانت فيه الحجة.. فإن لم يكن فيه نص كتاب الله كان أولاهما بنا الأثبت منهما، وذلك أن يكون من رواه أعرف إسنادا و أشهر بالعلم وأحفظ له أو يكون روي الحديث الذي ذهبنا إليه من وجهين أو أكثر، و الذي تركنا من وجه ، فيكون الأكثر أولي بالحفظ من الأقل أو يكون الذي ذهبنا إليه أشبه بمعني كتاب الله أو أشبه بما سواهما من سنن رسول الله ، أو أولي بما يعرف أهل العلم ، أو أصح في القياس ، و الذي عليه الأكثر من أصحاب رسول الله صلي الله عليه وسلم.

অর্থ: হাদিসের গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের সবার মূলনীতি হলো, কয়েকটি হাদিস যখন পরস্পর বিরোধী হয়, তখন আমরা একটাকে ছেড়ে অন্যটাকে গ্রহণ করি না। একটা ছেড়ে অন্যটা গ্রহণের উপযুক্ত কারণ পেলেই শুধু দ্বিতীয়টা গ্রহণ করি। আমাদের দ্বিতীয় হাদিসটা প্রমাণ করে যে, সেটি পরিত্যক্ত হাদিস থেকে মজবুত ও শক্তিশালী।

প্রশ্নকারী জিজ্ঞাসা করলো, একটা হাদিস প্রাধান্য দেয়ার কারণ কী কী? ইমাম শাফেয়ি রহ. বললেন, দু'টি হাদিসের মাঝে একটির বক্তব্য যখন কুরআনের সাথে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ হবে, তখন অন্যটির উপর একে প্রাধান্য দেয়া হবে। যদি পবিত্র কুরআন থেকে এধরণের কোন প্রমাণ না পাওয়া যায়, তবে হাদিস দু'টির মাঝে যেটি শক্তিশালী সেটি গ্রহণ করা হবে। হাদিসটি অধিক শক্তিশালী হওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, উক্ত হাদিসের বর্ণনাকারীগণ মুহাদ্দিসদের নিকট গ্রহণযোগ্য ও প্রসিদ্ধ হবে। ইলম ও স্মরণশক্তির ক্ষেত্রেও তারা অন্যের চেয়ে অগ্রগামী হবে। সুতরাং বর্ণনাকারীর মুখস্থশক্তি প্রাধান্য দেয়ার অন্যতম কারণ। একইভাবে ইলমের ক্ষেত্রে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হওয়াটাও প্রাধান্য দেয়ার একটা বিশেষ ভিত্তি। এভাবে যে হাদিসটি দুই বা দু'য়ের অধিক সনদে বর্ণিত হয়েছে, সেটি এক সনদে বর্ণিত হাদিসের উপর প্রাধান্য পাবে। সুতরাং অধিক সংখ্যক ব্যক্তি কম সংখ্যকের উপর হেফজ বা মুখস্থের দিক থেকে প্রাধান্য পাবে। সুতরাং

১. কুরআনের অর্থের সঙ্গে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ ও নিকটবর্তী হওয়ার কারণে একটি প্রাধান্য পাবে।
২. বিরোধপূর্ণ হাদিসগুলির যেটি অন্যান্য হাদিসের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হবে, সেটি প্রাধান্য পাবে।
৩. মুজতাহিদ ইমাম নিজের অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার আলোকে একটিকে অপরটির উপর প্রাধান্য দেবে।
৪. যেটা কিয়াস ও যুক্তির অধিক নিকটবর্তী সেটা প্রাধান্য পাবে।
৫. একটা হাদিসের উপর অধিকাংশ সাহাবিদের আমল রয়েছে, কিন্তু অপরটির উপর আমল কম, তবে যেই হাদিসের উপর অধিকাংশ সাহাবির আমল রয়েছে, সেটি প্রাধান্য পাবে।

ইমাম শাফেয়ি রহ. এর পরে ইমাম হাযিমি রহ. পরস্পর বিরোধী নসের মাঝে প্রাধান্য দেয়ার বিষয়ে তার আল-ই'তেবার ফিন নাসিখি ওয়াল মানসুখি মিনাল আসার-এ প্রাধান্য দেয়ার পঞ্চাশটি পদ্ধতি আলোচনা করেছেন এবং এগুলোর অধিকাংশ পদ্ধতির উদাহরণ উল্লেখ করেছেন। আলোচনার শেষে তিনি লিখেছেন,

وثم وجوه كثيرة أضربنا عن ذكرها كيلا يطول بها هذا المختصر

অর্থ: এছাড়াও প্রাধান্য দেয়ার অনেক কারণ রয়েছে। সংক্ষিপ্ত কিতাবের কলেবর বড় হওয়ার আশঙ্কায় এগুলোর আলোচনা থেকে বিরত থেকেছি।

অত:পর, হাফেজ ইরাকী রহ. ইবনুস সালাহ এর মুকাদ্দামার টীকায় ইমাম হাযিমি রহ. উক্ত বক্তব্যটি উল্লেখ করে লিখেছেন,

وجوه الترجيحات تزيد علي المأة ، و قد رأيت عدها مختصرا فأبدا بالخمسين التي عدها الحازمي، ثم أسرد بقيتها علي الولاء

অর্থ: প্রাধান্য দেয়ার কারণ ও পদ্ধতি একশ' এর বেশি। ইমাম হাযিমি রহ. যে পঞ্চাশটি উল্লেখ করেছেন সেগুলো সংক্ষেপে উল্লেখ করে অবশিষ্টগুলো তিনি ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করেছেন। হাফেজ ইরাকী রহ. একশ' দশটি পদ্ধতি উল্লেখ করে লিখেছেন, প্রাধান্য দেয়ার আরও পদ্ধতি রয়েছে। তবে এর কিছু পদ্ধতি সম্পর্কে বিতর্ক রয়েছে।

আলামা কাজি শাওকানি ইরশাদুল ফুহুলে প্রাধান্য দেয়ার কারণগুলিকে বারটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করেছেন। এবং এই বারটির অধীনে মোট একশ' ষাটটি পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। প্রত্যেক প্রকারের আলোচনার শেষে তিনি লিখেছেন, এক্ষেত্রে প্রাধান্য দেয়ার আরও পদ্ধতি রয়েছে।

উক্ত আলোচনা থেকে বর্তমানে কিছু লোকের অজ্ঞতা ও উদাসীনতা স্পষ্ট। এদের সামনে বাহ্যিকভাবে পরস্পর বিরোধী দু'টি হাদিস পেশ করা হলে এরা বোখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হাদিসকে অন্যান্য কিতাবের হাদিসের উপর প্রাধান্য দেয়। প্রাধান্য দেয়ার অন্যান্য কারণগুলোর দিকে মোটেও ভ্রুক্ষেপ করে না। অথচ আলামা ইরাকী রহ. প্রাধান্য দেয়ার কারণগুলি ধারাবাহিকভাবে আলোচনার ক্ষেত্রে ১১০ টি পদ্ধতি বা কারণের মধ্যে ১০২ নং কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, বোখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হাদিসটি অন্যের উপর প্রাধান্য পাবে। সুতরাং এই মূর্খরা হাদিস প্রাধান্য দেয়ার ১০১টি কারণ বাতিল করেছে। এটি হয়তো তারা অজ্ঞতাবশত করেছে, নতুবা ইচ্ছাকৃতভাবে অজ্ঞতার ভান করেছে। এই উভয় শ্রেণির বাহ্যিক সৌন্দর্যগুলোও পরিণামে তিক্ত হয়।

কাজি শাওকানি রহ. হাদিসের সনদের মাধ্যমে প্রাধান্য দেয়ার যে ৪২ টি পদ্ধতি আলোচনা করেছেন, তন্মধ্যে ৪১ নং কারণ হলো, বোখারি ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদিস অন্য কিতাবে বর্ণিত হাদিসের উপর প্রাধান্য পাবে। সুতরাং ধোঁকাবাজদের এই প্রতারণায় নিজেকে নিপতিত করবেন না যে, ইমাম ইবনুস সালাহ বোখারি ও মুসলিমে সমষ্টিগতভাবে বর্ণিত হাদিসকে সবচেয়ে সহিহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এবং একে বোখারির এককভাবে বর্ণিত হাদিসের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি বোখারির এককভাবে বর্ণিত হাদিসকে ইমাম মুসলিম রহ. এর এককভাবে বর্ণিত হাদিসের উপরও প্রাধান্য দিয়েছেন।

ইমাম ইরাকী প্রাধান্য দেয়ার অন্যান্য ১০০ টি পদ্ধতি আলোচনার পরে বোখারি ও মুসলিমে সমষ্টিগতভাবে বর্ণিত হাদিস প্রাধান্য দেয়ার কথা বলেছেন। এটি তিনি ইমাম ইবনুস সালাহ এর কিতাবের টীকায় উল্লেখ করেছেন। সুতরাং ইবনুস সালাহ রহ. এর বক্তব্য ও প্রাধান্য দানের পদ্ধতি সম্পর্কে হাফেজ ইরাকী রহ. সম্যক অবগত ছিলেন। সুতরাং একথা বলা আদৌ সংগত হবে না যে, হাফেজ ইরাকী রহ. ইবনুস রহ. এর বক্তব্য সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন অথবা ভুলে গেছেন। এটি একটি অসম্ভব কথা। বরং ইমাম ইবনুস সালাহ রহ. এর বক্তব্যটি খুবই সীমাবদ্ধ ও সংকীর্ণ পরিসরের। পক্ষান্তরে হাফেজ ইরাকী রহ. ও উসুলবিদগণের বক্তব্যের পরিসর অত্যন্ত দীর্ঘ ও যথার্থ। আল্লাহ তায়ালা তৌফিক দিলে ইনশাআল্লাহ এবিষয়ে অন্য কোন গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

বোখারি ও মুসলিম শরীফে হাদিস উল্লেখের পদ্ধতি দ্বারাও বিষয়টি আমাদের সামনে স্পষ্ট হবে, তারা সংশ্লিষ্ট অধ্যায়ে উল্লেখিত হাদিসগুলোর কোনটি গ্রহণ করছেন আবার কোনটি ছেড়ে দিয়েছেন। যেমন ইমাম মুসলিম রহ. মুসলিম শরীফে প্রথমে জানাযার উদ্দেশ্যে দন্ডায়মান হওয়ার হাদিস উল্লেখ করেছেন। ২১৭ অত:পর এটি রহিত হওয়ার হাদিস উল্লেখ করেছেন। ২১৮

ইমাম কুরতুবী রহ. তাফসিরে কুরতুবী-তে লিখেছেন, ইমাম মুসলিম রহ. যেই হাদিসকে বিধান হিসেবে গ্রহণ করেন, সেটি অধ্যায়ের শেষে উল্লেখ করে থাকেন। ২১৯

ইমাম বোখারি রহ. শুধু জানাযার উদ্দেশ্যে দাঁড়ানোর হাদিসটি উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এটি রহিত হওয়ার হাদিসটি উল্লেখ করেননি।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। বিখ্যাত ফকিহ ও মুহাদ্দিস আলামা ইউসুফ বান-নূরী রহ. তিরমিযি শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ মায়ারিফুস সুনানে লিখেছেন,

وقد قلت قديما و أقول: هؤلاء الأئمة الكبار أربار الصحاح : من البخاري ومسلم و غيرهما قد إنحازوا إلى جهة تفقها و إجتهادا ، أو إتباعا لأئمتهم في دقائق الفقه و الإجتهاد و غوامض المسائل ، و اختاروا جانبا في الخلافيات، ثم لما ألفوا أخرجوا في في تأليفهم ما يوافق مذاهبهم الفقهية و سري فقههم إلي الحديث و تركوا ما عداها، حيث لم يذهبوا إليها، إلا من التزم إخراج أحاديث الفريقين، كالإمام الترمذي غالبا و كابن شيبة و عبد الرزاق في مصنفيهما، و أحمد في مسنده..

অর্থ: আমি পূর্বেও বলেছি, এখনও বলছি, বোখারি ও মুসলিম রহ. সহ সহিহ হাদিস সমূহের সঙ্কলক বড় বড় ইমামগণ ফিকাহ ও ইজতেহাদের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট মতের দিকে ঝোঁক রাখতেন। ফিকাহের বিভিন্ন বিষয় ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মাস-আলার ক্ষেত্রে তাদের অনুসরণীয় ইমামের মতাদর্শ গ্রহণ করেছেন। মতবিরোধপূর্ণ মাস-আলায় তাঁরা সুনির্দিষ্ট মাজহাবের অনুসারী ছিলেন। এরপর তারা হাদিসের কিতাবসমূহ সংকলনের সময় তাদের ফিকহি মাজহাব অনুযায়ী সংকলন করেছেন। হাদিসের সংকলনের ক্ষেত্রে তারা নিজেদের ইজতেহাদও কাজে লাগাতেন। যেসব হাদিস তাদের ইজতিহাদ ও গৃহীত মাজহাবের অনুগামী হতো না, সেগুলো উল্লেখ থেকে বিরত থাকতেন। তবে অনেক মুহাদ্দিস উভয় পক্ষের হাদিস সংকলন করেছেন। যেমন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইমাম তিরমিযি রহ, ইমাম ইবনে আবি শাইবা, ইমাম আব্দুর রাজ্জাক এবং ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ।

হাদিস সংকলনের ক্ষেত্রে তাদের ফিকাহ ব্যবহারের একটি উদাহরণ পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ জানাযার উদ্দেশ্যে দাঁড়াবে কি না, এ বিষয়ে ইমাম মুসলিম রহ. এর হাদিস বর্ণনার পদ্ধতি আলোচনা করা হয়েছে। ইমাম মুসলিম রহ. প্রথমে দন্ডায়মান হওয়ার হাদিস উল্লেখ করেছেন। অত:পর এটি রহিত হওয়ার হাদিস উল্লেখ করেছেন। একইভাবে ইমাম নাসায়ী রহ.ও রহিত হওয়ার হাদিস উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ইমাম বোখারি রহ. শুধু দন্ডায়মান হওয়ার হাদিস উল্লেখ করেছেন। ইমাম মুসলিম রহ. যে হাদিস দ্বারা এটি রহিত হওয়ার দলিল দিয়েছেন, সে হাদিস থেকে ইমাম বোখারি রহ. রহিত হওয়ার বিষয়টি বোঝেননি। একারণে তিনি হাদিসটি উল্লেখ করা থেকে বিরত থেকেছেন। সুতরাং ইমাম মুসলিম ও নাসায়ী রহ. তাদের ফিকাহ অনুযায়ী রহিত হওয়ার হাদিস উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ইমাম বোখারি রহ. রহিত হওয়ার মতটি গ্রহণ না করায় হাদিসটি উল্লেখ করেননি।

এবিষয়ে আরেকটি উদাহরণ হলো, হজরত আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

من صلي علي جنازة في المسجد فلا شيئ له অর্থাৎ যে ব্যক্তি মসজিদে কারও জানাযা পড়লো, তার কোন সওয়াব নেই।

পূর্বে হাদিসটি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। হাদিসটি ইমাম মুসলিম রহ. উল্লেখ করেননি। কিন্তু এ বিষয়ে হজরত আয়েশা রা. এর হাদিসটি উল্লেখ করেছেন, তিনি বলেন,

ما أسرع ما نسي الناس ما صلي رسول الله صلي الله عليه وسلم علي سهيل بن البيضاء إلا في المسجد অর্থ: "মানুষ কত দ্রুত ভুলে যায়! নিশ্চয় রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুহাইল ইবনুল বায়যা এর জানাযা মসজিদে আদায় করেছেন।”

একইভাবে ইমাম নাসায়ী রহ. আয়েশা রা. এর হাদিসটি উল্লেখ করেছেন। এটি হলো ইমাম মুসলিম ও নাসায়ী রহ. এর ফিকাহ। কিন্তু ইমাম আবু দাউদ রহ. প্রথমে হজরত আয়েশা রা. এর হাদিসটি উল্লেখ করেছেন। অতঃপর, তিনি হজরত আবু হুরাইরা রা. এর হাদিসের মাধ্যমে পরিচ্ছেদ শেষ করেছেন। এটি হলো ইমাম আবু দাউদ রহ. এর ফিকাহ ও বুঝ। ইমাম ইবনে মাজা রহ. ঠিক এর উল্টো করেছেন অর্থাৎ তিনি প্রথমে হজরত আবু হুরাইরা রা. এর হাদিস উল্লেখ করেছেন, এরপর হজরত আয়েশা রা. এর হাদিস উল্লেখ করে লিখেছেন,

حـديـث عـائـشة أقـوي হজরত আয়েশা রা. এর হাদিসটি শক্তিশালী।

এটি ইমাম ইবনে মাজা রহ. ফিকাহ ও বুঝ। সুতরাং এসমস্ত হাদিসের ইমামদের বুঝ ও ফিকাহের অনুসরণ না করে বিখ্যাত ফকিহ ইমামগণের অনুসরণ উত্তম নয় কি? বরং তাঁদের অনুসরণের চেয়ে ফকিহ ইমামগণের অনুসরণ অধিক উত্তম। পূর্বে ইমাম তিরমিযি রহ. এর বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি বলেছেন, ফকিহগণ হাদিসের অর্থ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত। এটি এমন দ্ব্যর্থহীন বিষয়, যাতে কোন অস্পষ্টতা নেই।

ইমাম বোখারি রহ. একটা হাদিস বর্ণনা করলে তা থেকে একটি মাসআলা প্রমাণিত হয়। সুতরাং ইমাম বোখারি বর্ণিত হাদিস থেকে যে বিধান গ্রহণ করা হয়েছে একে ইমাম আবু দাউদ বর্ণিত হাদিস থেকে গৃহীত হুকুমের উপর প্রাধান্য দেয়া সঠিক নয়। কেননা, এর দ্বারা মূলত: ইমাম বোখারি রহ. এর ইজতিহাদ ও মাযহাবকে অন্য কোন মুহাদ্দিসের মাজহাবের উপর প্রাধান্য দেয়া হয়। বাস্তব কথা হলো, ইমাম বোখারি রহ. সংশিষ্ট মাস-আলায় যেই হাদিসটা তার মাজহাব অনুযায়ী পেয়েছেন, সেটা বর্ণনা করেছেন। সুতরাং প্রত্যেক ক্ষেত্রে বোখারি বর্ণিত হাদিসকে প্রাধান্য দেয়ার অর্থ হলো, ইমাম বোখারির মাযহাবকে অন্যদের উপর প্রাধান্য দেয়া। প্রত্যেক মাস-আলায় বোখারি বর্ণিত হাদিসকে প্রাধান্য দেয়ার যে রীতি সংশয় সৃষ্টিকারীরা তৈরি করেছে, বাস্তবতা এর সম্পূর্ণ বিপরীত।

হাদিসে বুঝ অর্জনের ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসগণের পারস্পরিক ব্যাবধান ও মতবিরোধ খুবই বিস্তৃত। তাদের মতবিরোধের এই বিস্তর পরিসর থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, একটি ফিকহি মাস-আলার বিধান আহরণ কতটা কষ্টসাধ্য। এর মাধ্যমে এটাও অনুধাবন করা যাবে যে, ইমামগণ ইলমের কতো উচ্চ শিখরে আরোহণ করেছিলেন। আমি যে বিষয়টি আলোচনা করছি, এটি মূলত: ইজতেহাদের জন্য প্রয়োজনীয় ইলম সমূহের একটি ইলমের প্রাথমিক কিছু অংশ। সুতরাং ইজতেহাদের জন্য আবশ্যক অন্যান্য ইলমের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থানের ব্যাপারে কী ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি রাখা উচিত? বিষয়টি সম্পর্কে পরবর্তীতে সামান্য আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।

ইমামদের মতবিরোধের তৃতীয় কারণ সম্পর্কে আলোচনা শেষ করার পূর্বে একটি অপ্রসিদ্ধ মাসআলা নিয়ে আলোচনা করবো। এ বিষয়ের উপর পৃথক কোন কিতাব লেখা হয়নি। উলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে বিস্তর কোন আলোচনাও করেননি। অথচ অন্যান্য প্রত্যেকটি মাস-আলায় তারা ব্যাপক আলোচনা করেছেন। যেমন, সূরা তওবা ছাড়া বিসমিলাহ প্রত্যেক সূরার অংশ হওয়া, ইমামের পিছে কিরাত পড়া, রুকুতে যাওয়া ও রুকু থেকে উঠার সময় হাত উঠানো ইত্যাদি। আমি এই মাসআলাটি গ্রহণ করার কারণ হলো এর মধ্যে উপযুক্ত তিনটি পদ্ধতির উপর আলোচনার সুযোগ রয়েছে।

ইমাম নববি রহ. বলেছেন, "আমাদের মাজহাব তথা শাফেয়ি মাজহাবে পুরুষ ও মহিলার জন্য সাদা চুলে হলুদ বা লাল খেযায ব্যবহার করা মোস্তাহাব। বিশুদ্ধ মতানুযায়ী কালো খেযাব ব্যবহার করা হারাম। কেউ কেউ বলেছেন, মাকরুহে তানযীহি। তবে গ্রহণযোগ্য মত হলো, এটি হারাম। কেননা রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

واجتنبوا السواد

"তোমরা কালো রঙ থেকে বেঁচে থাকো।"

কাজি ইয়াজ রহ. বলেন, সাহাবা ও তায়েবীগণের যুগ থেকে সালাফে-সালেহিন খেযাব লাগানো এবং খেযাবের বিভিন্ন প্রকার নিয়ে মতানৈক্য করেছেন। তাদের কেউ কেউ বলেছেন, খেযাব না লাগানো উত্তম। তারা রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এবিষয়ে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। এ হাদিসে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাদা চুলকে পরিবর্তন করতে নিষেধ করেছেন। এছাড়াও রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে তাঁর সাদা চুল পরিবর্তন করেননি। খেযাব না লাগানোর মতটি হজরত উমর রা, হজরত আলী রা, হজরত উবাই বিন কা'য়াব রা. ও অন্যান্য সাহাবি থেকে বর্ণিত। অন্যান্যরা মতামত দিয়েছেন, খেযাব লাগানো উত্তম। সাহাবা, তাবেয়ি ও পরবর্তীদের অনেকেই খেযাব ব্যবহার করেছেন। এ ব্যাপারে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস রয়েছে। হাদিসটি ইমাম মুসলিম রহ. সহ অন্যান্য মুহাদ্দিস বর্ণনা করেছেন।

যারা খেযাব ব্যবহারের পক্ষে মতামত দিয়েছেন, তারা আবার খেযাবের রঙ নিয়ে মতানৈক্য করেছেন। অধিকাংশ খেযাব ব্যবহারকারী হলুদ রঙ ব্যবহার করতেন। যেমন, হজরত ইবনে উমর রা, আবু হুরাইরা ও অন্যান্য সাহাবীগণ। হজরত আলী রা. থেকেও এধরণের একটি মত পাওয়া যায়।

অনেকেই মেহেদী ও কাতাম (এক জাতীয় উদ্ভিদ) ব্যবহার করতেন। কেউ কেউ জাফরান ব্যবহার করেছেন। একদল সাহাবি ও তাবেয়ি কালো রঙের খেযাবও ব্যবহার করেছেন। হজরত উসমান রা, হজরত হাসান রা, হজরত হুসাইন রা, হজরত উকবা ইবনে আমের রা, ইবনে সিরীন রহ. ও হজরত আবু বুরদা রহ. থেকে কালো বণের খেযাব ব্যবহারের কথা বর্ণিত রয়েছে।

কাজি ইয়াজ রহ. বলেন, ইমাম ত্ববরানী রহ. বলেছেন, সাদা চুলের রঙ পরিবর্তন করা বা না করার ব্যাপারে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যেসব হাদিস বর্ণিত হয়েছে, এগুলো সহিহ। এগুলোর মাঝে কোন বৈপরীত্য নেই। যার চুল হজরত আবু বকর রা. এর পিতা আবু কুহাফা রা. এর মতো সাদা হবে, যাতে কোন সৌন্দর্য থাকে না, সে খেযাব ব্যবহার করতে পারবে। যার চুল হালকা সাদা হয়েছে তার জন্য খেযাব ব্যবহারের বিধান প্রযোজ্য নয়।

ইমাম ত্ববরানী রহ. বলেছেন, খেযাবের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তীগণের মতানৈক্য তাদের অবস্থার ভিন্নতার কারণে সৃষ্টি হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে যে আদেশ-নিষেধ রয়েছে, এটি সর্বসম্মতিক্রমে ওয়াজিব সাব্যস্ত করে না। একারণে পূর্বের কেউ এর বিপরীত আমলকারীকে দোষারোপ করেননি। সুতরাং হাদিসগুলোর মাঝে কোন একটি রহিত হওয়ার দাবি করাও ঠিক নয়।

কাজি ইয়াজ রহ. বলেন, ইমাম ত্ববরানী রহ. ছাড়া অন্যান্যরা বলেন, খেযাব লাগানোর দু'টি অবস্থা রয়েছে। কেউ যদি এমন শহর বা স্থানে থাকে, যেখানে সাধারণ প্রচলন হিসেবে খেযাব ব্যবহার করা হয় অথবা তা থেকে বিরত থাকা হয়, তবে সে শহরবাসীর আমল অনুযায়ী আমল করবে। প্রচলিত আমলের বিরোধিতা করবে না। কেননা সাধারণ প্রচলনের বিরোধিতা প্রসিদ্ধির অর্জনের উপলক্ষ্য হতে পারে। ফলে এটি মাকরুহ হবে। দ্বিতীয় অবস্থা হলো, বিধানটি সাদা চুলের পরিচ্ছন্নতার উপর নির্ভরশীল হবে। যার সাদা দাঁড়ী উজ্জ্বল এবং খেযাব ব্যবহার ছাড়াই সুন্দর, তার জন্য খেযাব ব্যবহার না করা উত্তম। যার সাদা দাঁড়ী বা চুল খেযাব লাগানো ছাড়া অসুন্দর দেখায়, তার জন্য খেযাব ব্যবহার করা উত্তম। এটি কাজি ইয়াজ রহ. বর্ণনা করেছেন। কিন্তু সুন্নাহের অধিক নিকটবর্তী সঠিক মতটি আমাদের মাজহাবের আলোকে পূর্বে বর্ণনা করেছি।” [ইমাম নববি রহ. এর বক্তব্য শেষ হলো]

ইমাম হাকেম রহ. তাঁর মা'রেফাতু উলুমিল হাদিস-এ ২৯ নং ইলমের শিরোনাম দিয়েছেন,

معرفة سنن لرسول الله صلي الله عليه وسلم يعارضها مثله ، فيحتج أصحاب المذاهب بأحدهما

“রাসূল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পরস্পর বিরোধী হাদিস সম্পর্কে অবগত হওয়া এবং ইমামগণ এগুলোর কোন একটি দ্বারা দলিল প্রদান।” এই শিরোনামের অধীনে তিনি এবিষয়ে ক'টি উদাহরণ উল্লেখ করেছেন এবং চমৎকার একটি উদাহরণের মাধ্যমে আলোচনা শেষ করেছেন। উদাহরণটি আমরা নীচে উল্লেখ করবো। উল্লেখ্য পরস্পর বিরোধী হাদিসের জ্ঞানকে পরবর্তীতে মুখতালাফুল হাদিস নামে অভিহিত করা হয়।

ইমাম হাকেম রহ. আব্দুল ওয়ারিস বিন সাঈদ আততান-নূরী থেকে নিজ সনদে উল্লেখ করেছেন, তিনি বলেন, আমি মক্কায় আগমন করলাম। সেখানে ইমাম আবু হানিফা রহ. ও ইমাম ইবনে আবি লায়লা ও ইমাম ইবনে শুবরুমা রহ. কে পেলাম। আমি ইমাম আবু হানিফা রহ. কে জিজ্ঞাসা করলাম, এক ব্যক্তি কোন কিছু বিক্রি করলো এবং বিক্রময়ের মাঝে শর্তারোপ করলো, তার সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কি? তিনি বললেন, বিক্রয় বাতিল। শর্তও বাতিল। অতঃপর, আমি ইমাম ইবনে আবি লাইলা রহ. কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, শর্ত বাতিল। কিন্তু বিক্রয় বৈধ। এরপর আমি ইমাম ইবনে শুবরুমা রহ. কে বিষয়টি জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, বিক্রয় বৈধ এবং শর্তও বৈধ।

আমি বললাম, সুবহানাল্লাহ, তিনজনই ইরাকের ফকিহ। একই মাস-আলায় তিনজন পৃথক পৃথক মতামত দিলেন। অতঃপর, আমি ইমাম আবু হানিফা রহ. এর কাছে গেলাম। এবং তাঁকে সমস্ত ঘটনা শোনালাম। তিনি বললেন, আমি জানি না তারা কী বলেছে। আমার নিকট আমর বিন শুয়াইব তার পিতা থেকে এবং সে তার দাদা থেকে বর্ণনা করেছে, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিক্রয়ের সঙ্গে শর্তারোপ থেকে নিষেধ করেছেন। বিক্রয় বাতিল, শর্তও বাতিল।

অত:পর, আমি ইবনে আবি লাইলার নিকট আসলাম। তাঁকেও বিষয়টা জানালাম। তিনি বললেন, আমি জানি না তারা দু'জন কী বলেছে। আমার নিকট হিশাম ইবনে উরয়া তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে আদেশ দিয়েছেন, আমি যেন বারীরাকে ক্রয় করে আযাদ করে দেই। বিক্রয় বৈধ কিন্তু শর্ত বাতিল।

অত:পর, আমি ইবনে শুবরুমা রহ. এর নিকট এসে পুরো ঘটন বললাম। তিনি বললেন, তারা দু'জন কী বলেছে আমি জানি না। আমার নিকট মিসয়ার ইবনে কিদাম হজরত মুহারিব ইবনে দিসার থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি হজরত জাবের রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট থেকে একটি উটনী ক্রয় করলাম। তিনি আমাকে শর্ত দিলেন যে, তিনি উটনীতে আরোহণ করে মদিনায় যাবেন। এক্ষেত্রে বিক্রয় বৈধ এবং শর্তও বৈধ।

অনেকেই বিষয়টিকে মুধ চেটে খাওয়ার চেয়েও সহজ মনে করে থাকে। রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবনে মাত্র একবার হজ করেছেন। যদি তাদের কাউকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, সেটা কি হজ্বে মুফরাদ ছিলো নাকি ক্বিরান, নাকি তামাতু? আপনার প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই অল্পবিদ্যার তথাকথিত শায়খরা একটা, দুইটা অথবা দশটা হাদিস পড়ে উত্তর দেয়া শুরু করে থাকে। এদের কোন বিষয়ে যদি আপনি বিরোধিতা করেন, সঙ্গে সঙ্গে সে বলবে, অমুক ইমাম এটা বলেছেন, অমুক ইমাম এই মত দিয়েছেন। বিরোধিতার সাথে সাথে অন্ধ তাকলীদে বিশ্বাসী হয়ে পড়ে। অথচ কিছুক্ষণ আগে সে ইজতেহাদের ছদ্মাবরণে নিজেকে মুজতাহিদ হিসেবে উপস্থাপন করছিলো।

ইমাম হাকেম রহ. মতবিরোধপূর্ণ হাদিসের আলোচনায় হজরত আনাস রা. এর হাদিস উল্লেখ করেছেন। হজরত আনাস রা. বলেন, আমি রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হজ ও উমরা উভয়ের জন্য তালবিয়া পাঠ করতে শুনেছি। তিনি হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. এর হাদীসও উল্লেখ করেছেন, যা হজরত আনাস রা. এর হাদিসের বিপরীত। অতঃপর, ইমাম হাকেম রহ. লিখেছেন, ইমাম আবু বকর ইবনে ইসহাক অর্থাৎ ইমাম ইবনে খোযাইমা রহ. এবিষয়ের উপর প্রয়োজনীয় আলোচনা করে তামাত্তুকে গ্রহণ করেছেন। একইভাবে ইমাম আহমাদ ও ইসহাক রহ. হজ্বে তামাত্তুকে উত্তম বলেছেন। ইমাম শাফেয়ি রহ. ইফরাদ হজকে উত্তম বলেছেন এবং ইমাম আবু হানিফা রহ. ক্বিরান হজকে উত্তম বলেছেন।

ইমাম ইবনে খোযাইমা রহ. এবিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ও খুবই দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। তাঁর এই আলোচনাটি পাঁচ খন্ড বিশিষ্ট। ইমাম হাকেম রহ. নিজেই তা উল্লেখ করেছেন। তিনি ইবনে খোযাইমা রহ. এর এই আলোচনা সম্পর্কে আবুল হাসান সানজানী রহ.এর বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। আবুল হাসান সানজানী রহ. বলেন, "ইবনে খোযাইমা রহ. এর হজের উপর লিখিত গ্রন্থটি অধ্যয়ন করেছি। আমি নিশ্চিত যে, এতো সুন্দর ইলম আলোচনা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।”

আমি বলবো, ইমাম ইবনে খোযাইমা রহ. এর সমযুগীয় বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম ত্বহাবী রহ. এর আলোচনা দেখলে তাঁর বিস্ময়ের সীমা থাকত না।

ইমাম নববি রহ. কাজি ইয়াজ রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন,

قد أكثر الناس الكلام على هذه الحديث، فمن مجيد منصف ، و من مقصر متكلف و من مطيل مكثر، ومن مقتصر مختصر. قال: وأوسعهم في ذلك نفسا أبو جعفر الطحاوي الحنفي فإنه تكلم في ذلك في زيادة علي ألف ورقة و تكلم معه في ذلك أبو جعفر الطبري ، ثم أبو عبد الله إبن أبي صفرة ثم المهلب و القاضي أبو عبد الله إبن المرابط ، و القاضي أبو الحسن إبن القصار البغدادي، و الحافظ أبو عمر ابن عبد البر وغيرهم

"হজের হাদিসগুলো সম্পর্কে অনেক আলেমই কলম ধরেছেন। এদের মাঝে কিছু আলেম শ্রদ্ধাভাজন ও ভারসাম্যপূর্ণ। কিছু আলেম অসম্পূর্ণ ও লৌকিকতাপূর্ণ আলোচনা করেছেন। কেউ কেউ খুবই দীর্ঘ এবং কেউ কেউ একেবারে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছেন। এ ব্যাপারে সবচেয়ে সুন্দর ও বিস্তারিত আলোচনা করেছেন হানাফি মাজহাবের বিখ্যাত ইমাম আবু জা'ফর ত্বহাবী। তিনি এমাসআলায় এক হাজার পৃষ্ঠার বেশি লিখেছেন। তাঁর সময়ে ইমাম আবু জা'ফর তবারী রহ.ও এর উপর আলোচনা করেছেন। এরপর ইমাম ইবনে সুফরা, ইমাম মুহাল্লাব ও কাজি আবু আব্দুলাহ ইবনুল মুরাবিত, কাজি আবুল হাসান ইবনে কাসসার বাগদাদি ও হাফেজ ইবনে আব্দুল বার রহ. সহ প্রমুখ হাদিস বিশারদ ও ফকিহ এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

এরপরও কি কোন বুদ্ধিমান শিক্ষার্থী তার নিজের অধ্যয়ন করা কয়েক পৃষ্ঠা প্রাধান্য দিয়ে ইমামগণের বক্তব্যকে দেয়ালে ছুঁড়ে মারবে? সে কী পড়েছে আর কী বুঝেছে আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন।

একটি শাখাগত মাস-আলার উপর এতো বিস্তর আলোচনাকারী হলেন ইমাম ত্বহাবী রহ। তাঁর এই আলোচনা সহিহ বোখারির কলেবরের কাছাকাছি। অথচ তিনি নিজে সর্বদা একজন ইমামের মাজহাবে অটল থেকেছেন এবং নিজেকে ইমামের দিকে সম্পৃক্ত করেছেন। ইমাম ত্বহাবী রহ. হানাফি মাজহাবের বিখ্যাত আলেম ছিলেন। কয়েকটি মাস-আলায় ইমাম আবু হানিফা রহ. এর বিরোধিতা করা সত্ত্বেও তিনি ইমাম আবু হানিফার দিকে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন এবং আবু হানিফা রহ. কিংবা তাঁর কোন অনুসারী এর সমালোচনা করেননি।

পূর্ববর্তী ইমামগণ পরস্পর বিরোধী হাদিস সংকলন, বিশ্লেষণ এবং এগুলোর সমাধান নির্ণয়ে সীমাহীন গুরুত্ব দিয়েছেন। এবিষয়ে ইমাম শাফেয়ি রহ. 'ইখতেলাফুল হাদিস' রচনা করেছেন। ইমাম ইবনে কুতাইবা রহ. তা'বীলু মুখতালাফিল হাদিস রচনা করেছেন এবং এর উপর 'মায়াখিজ' রচনা করেছেন। দু'টো কিতাবই বর্তমানে মুদ্রিত। এবিষয়ে যাকারিয়া সাজী রহ. এর একটি কিতাব রয়েছে। কাশফুয যুনুন এর লেখক হাযী খলিফা রহ. এর নাম উল্লেখ করেছেন ইখতেলাফুল হাদিস। ইবনে জারীর ত্ববারী রহ.ও একটি কিতাব লিখেছেন। তিনি এর নামকরণ করেছেন, তাহযিবুল আসার। কাশফুয যুনুন এর লেখক এসম্পর্কে লিখেছেন, এ এটি একটি অদ্বিতীয় গ্রন্থ এবং মতবিরোধপূর্ণ হাদিসের উপর এর সম পর্যায়ের কোন গ্রন্থ নেই। একিতাবের একটি অংশ প্রথমে চার খণ্ডে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে পঞ্চম খন্ডও প্রকাশিত হয়েছে।

পরস্পর হাদিসের বিষয়ে ইমাম ত্বহাবী রহ. অসাধারণ দু'টি কিতাব রচনা করেছেন। একটি হলো, (شرح معاني الآثار المختلفة المروية عن رسول الله صلي الله في الأحكام) আসার)। এই কিতাবটি ইমাম ত্বহাবী রহ. এর প্রথম কিতাব হওয়া সত্ত্বেও এটি তার মুজতাহিদ ও বড় ইমাম হওয়ার সাক্ষর বহন করে। হাফেজ কারাশী রহ. এর বক্তব্য অনুযায়ী এটি ইমাম ত্বহাবী রহ. এর প্রথম কিতাব।

এবিষয়ে ইমাম ত্বহাবী রহ. এর দ্বিতীয় কিতাব হলো, মুশকিলুল আসার। হাফেজ কারাশী রহ. এর বক্তব্য অনুযায়ী এটি ইমাম ত্বহাবী রহ.এর সর্বশেষ কিতাব। এই কিতাব সম্পর্কে ইমাম যাহেদ আল-কাউসারি রহ. বলেছেন, এটা এমন একটি কিতাব, ইতোপূর্বে যার মতো কোন কিতাব রচিত হয়নি。

টিকাঃ
২১৩ আর-রিসালা, পৃ.২৮৪।
২১৪ ইমাম হাযিমী রহ. কৃত আল-ই'তেবার ফিন নাসিখি ওয়াল মানসুখি মিনাল আসার, পৃ.৯-২৩
২১৫ ইবনুস সালাহ এর উপর আল্লামা ইরাকীর হাশিয়া, পৃ.২৪৫।
২১৬ ইরশাদুল ফুহুল, পৃ.২৭৬-২৮৪।
২১৭ মুসলিম শরীফ, খ.২, পৃ.৬৫৯।
২১৮ মুসলিম শরীফ, খ.২, পৃ.৬৬১।
২১৯ তাফসীরে কুরতুবী, খ.৩, পৃ.২১২।
২২০ মায়ারিফুস সুনান, খ.৬, পৃ.৩৭৯-৩৮০
২২১ সহীহ মুসলিম শরীফ, খ.২, পৃ.৬৬৮
২২২ নাসায়ী শরীফ, খ.১, পৃ.৬৩৯।
২২৩ আবু দাউদ শরীফ, খ.৩, পৃ.৫৩০-৫৩১।
২২৪ ইবনে মাজা শরীফ, খ.১, পৃ.৪৮৬
২২৫ ইমাম নববী কৃত মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্ত শরহু মুসলিম, খ.১৪, পৃ.৮০।
২২৬ মা'রেফাতু উলুমিল হাদীস, পৃ.১২৮।
২২৭ মা'রেফাতু উলুমিল হাদীস, পৃ.১২৪।
২২৮ মা'রেফাতু উলুমিল হাদীস, পৃ.৮৩। ইমাম ইবনে খোযাইমা রহ. এর কিতাবের বিভিন্ন খন্ড মূলত: হাদীসের আলোকে হয়েছে। মূল কিতাবের কলেবর প্রায় দু'শ পৃষ্ঠা। এর চেয়ে কম বা বেশি হতে পারে।
২২৯ ইমাম নববী রহ. কৃত মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যগ্রন্থ, খ.৮, পৃ.১৩৬।
২৩০ আল-জাওয়াহিরুল মুজিয়্যা, খ.১, পৃ.১০৪।
২৩১ যুয়ূলু তাযকিরাতিল হুফফায এর উপর ইমাম যাহেদ আল-কাউসারী রহ. এর তা'লীক। পৃ.১৯৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00