📘 নবীজীর হাদীস ও ইমামগণের মতভেদ > 📄 দ্বিতীয় সন্দেহ

📄 দ্বিতীয় সন্দেহ


দ্বিতীয় সন্দেহটি হলো, অনেকের ধারণা হাদিসের উপর আমলের জন্য হাদিস সহিহ হওয়া যথেষ্ট। যারা এ বক্তব্যের প্রবক্তা তাদের যুক্তি হলো, আল্লাহ আমাদের উপর তাঁর রসুলের সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনুসরণ আবশ্যক করেছেন। সুতরাং তাঁর পক্ষ থেকে যখন কোন হাদিস সহিহ হবে, সেটি আমলের জন্য যথেষ্ট হবে। কোন মুসলমানের জন্য বৈধ নয় যে, সে রসুলের সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সহিহ হাদিস পাওয়া সত্ত্বেও তার উপর আমল করতে বিলম্ব করবে। যেমন পূর্বে ইমাম শাফেয়ির রহ. বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ইমাম হুমাইদীকে রহ. বলেছেন, আমি কি গির্জা থেকে বের হয়েছি যে, আমি রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস অনুসরণ করবো না?

দ্বিতীয় কথা হলো, মাখলুকের মাঝে যারা নিষ্পাপ নয়, তাদের অনুসরণও আবশ্যক নয়। ইলমের দিক থেকে যত উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হন না কেন নিষ্পাপ না হলে তাঁর অনুসরণ জরুরি নয়।

উত্তরে আমরা বলব, এখানে মৌলিক বিষয় দু'টি
১. হাদিস সহিহ হলে তা আমলের জন্য যথেষ্ট।

২. আমাদেরকে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুসরণের আদেশ দেয়া হয়েছে। অন্য কারও অনুসরণের আদেশ দেয়া হয়নি।

প্রথম বাক্যের উত্তরটি إِذَا صَحَّ الْحَدِيثُ فَهُوَ مَذْهَبِي )হাদিস সহিহ হলে সেটাই আমার মাজহাব) এর উত্তর থেকে স্পষ্ট। সুতরাং হাদিস সহিহ হলে তা আমলের জন্য যথেষ্ট, এ কথার অর্থ হলো হাদিস আমলের যোগ্য হতে হবে। হাদিস আমলযোগ্য হওয়ার জন্য সনদ ও মতনগত বিশুদ্ধতার পাশাপাশি আরও অনেক শর্ত পূর্ণ হওয়া আবশ্যক। যেমন, হাদিসটি উসূল ও হাদিসের মৌলিক শর্তের ভিত্তিতে আমল যোগ্য হওয়া। তাকরীবুত তাহযীব থেকে রাবির জীবনী দেখে নিলেই হাদিস আমলযোগ্য হয়ে যায় না। যেমনটি কেউ কেউ ধারণা করে থাকে। অথচ হাদিসের সাথে সংশিষ্ট সকল মৌলিক ও শাখাগত ইলম অর্জন ছিল এ শাস্ত্রের শ্রেষ্ঠ মনিষীদের কাছে যারপরনাই গুরুত্বপূর্ণ। নতুবা এ ধরনের ভ্রান্তি ফেকাহকে ধ্বংসের পূর্বে মূল সুন্নাহকেই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিতো।

ইবনে আবি খাইসামা শরহু ইলালিত তিরমিযি-তে ও আল্লামা আবু নুয়াইম হিলইয়াতুল আউলিয়া-তে হজরত ঈসা বিন ইউনুসের সূত্রে হজরত আ'মাশ থেকে, তিনি হজরত ইবরাহিম নাখয়ি রহ. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,

إني لأسمع الحديث فأنظر الى ما يؤخذ به فأخذ به وأدع سائره
আমি হাদিস শ্রবণ করি, অত:পর দেখি এর মাঝে কোনটা গ্রহণ করা যায়। গ্রহণযোগ্য হলে তার উপর আমল করি এবং অবশিষ্টগুলো পরিত্যাগ করি।

হাফেজ ইবনে আব্দুল বার রহ. নিজ সনদে বিখ্যাত মুজতাহিদ ইবনে আবি লাইলা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন,

لا يفقه الرجل في الحديث حتى يأخذ منه ويدع
"হাদিসের উপর কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত অভিজ্ঞ হবে না যতক্ষণ না সে হাদিসের কিছু অংশ গ্রহণ করবে এবং কিছু পরিত্যাগ করবে।"

আল্লামা আবু নুয়াইম রহ. আমীরুল মু'মিলেন ফিল হাদিস ইমাম আব্দুর রহমান বিন মাহদির রহ. জীবনী উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেছেন,

لا يجوز أن يكون الرجل إماما حتى يعلم ما يصح مما لا يصح وحتى لا يحتج بكل شيء وحتى يعلم بمخارج العلم
"কেউ হাদিসের ইমাম হতে পারবে না যতক্ষণ না সে হাদিসের মাঝে কোনটি সহিহ এবং সহিহ নয়, সেটা নির্ণয় করতে পারবে এবং দলিলের ক্ষেত্রে কোনটি গ্রহণযোগ্য এবং কোনটি পরিত্যাজ্য তা নির্ধারণ করতে পারবে। সেই সাথে ইলমের উৎস সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন করবে।"

ইবনে হিব্বান রহ. নিজ সনদে আল্লামা আব্দুল্লাহ ইবনে ওহাব রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন,

لقيت ثلاث مائة عالم وستين عالما ، ولولا مالك والليث لضللت في العلم
"আমি তিনশ' ষাট জন আলেম থেকে ইলম অর্জন করেছি। কিন্তু যদি ইমাম মালেক রহ. ও ইমাম লাইস রহ. এর সঙ্গে সাক্ষাৎ না হতো তবে আমি গোমরাহ হয়ে যেতাম।"

ইবনে হিব্বান রহ. তার থেকে আরও বর্ণনা করেছেন,

اقتدينا في العلم بأربعة : اثنان بمصر واثنان بالمدينة : الليث بن سعد ، وعمرو بن الحارث بمصر : ومالك والماجشون بالمدينة ، ولولا هؤلاء لكنا ضالين.

"আমি ইলম অর্জনে চারজনের অনুসরণ করেছি। দু'জন মিশরের এবং দু'জন মদিনার। ইমাম লাইস বিন সা'দ এবং আমর বিন হারেস ছিলেন মিশরীয়। ইমাম মালেক রহ. এবং ইমাম মাজিশুন ছিলেন মদিনার অধিবাসী। তারা যদি না থাকতেন, তবে আমি পথভ্রষ্ট হয়ে যেতাম।"

ইমাম ইবনে আবি হাতেম এবং ইমাম ইবনে আব্দুল বার রহ. তাঁর থেকে এজাতীয় বক্তব্য বর্ণনা করেছেন। আল্লামা কাউসারি রহ. ভ্রষ্টতার কারণ বিশ্লেষণ করে উক্ত বক্তব্যের উপর আল-ইনতেকা- এ টীকা সংযোজন করেছেন। ইবনে আসাকির রহ. নিজ সনদে ইবনে ওহাব রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন, ইমাম মালেক বিন আনাস এবং লাইস বিন সা'য়াদ যদি না থাকতেন, তবে আমি ধ্বংস হয়ে যেতাম। আমি ধারণা করতাম রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যে সকল হাদিস বর্ণিত হয়েছে, তার সবগুলোর উপর আমল করা হবে।

অন্য বর্ণনায় এসেছে, আমি পথভ্রষ্ট হয়ে যেতাম। ইমাম কাউসারি রহ. বলেন, ফিকাহ থেকে বিচ্ছিন্ন অনেক রাবির ক্ষেত্রেই এমনটি ঘটেছে, যারা কোন হাদিসটি আমলযোগ্য এবং কোনটি আমলযোগ্য নয়, তা পার্থক্য করতে পারত না।”

কাজি ইয়াজ রহ. ইবনে ওহাব রহ. এর বক্তব্যটি এভাবে বর্ণনা করেছেন,

قال ابن وهب : لولا أن الله أنقذني بمالك والليث لضللت. فقيل له: كيف ذلك؟ قال : أكثرت من الحديث فحيرني. فكنت أعرض ذلك على مالك والليث، فيقولان لي: خذ هذا ودع هذا.

"ইমাম ইবনে ওহাব রহ. বলেন, আল্লাহ তায়ালা যদি আমাকে ইমাম মালেক ও লাইস বিন সা'য়াদের মাধ্যমে রক্ষা না করতেন, তবে আমি পথভ্রষ্ট হয়ে যেতাম। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, কীভাবে? তিনি বলেন, আমি অনেক হাদিস বর্ণনা করতাম। ফলে আমি পেরেশান হয়ে যেতাম। তখন আমি হাদিসগুলো ইমাম মালেক ও ইমাম লাইস বিন সায়াদের কাছে পেশ করতাম। তখন তারা আমাকে বলতেন, এটি গ্রহণ করো এবং এটি ছেঁড়ে দাও।”

একারণে সুফিয়ান সাউরি রহ. এই চিন্তাগত পেরেশানির আশঙ্কা এবং এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন, تفسير الحديث خير من سماعه "হাদীসের ব্যাখ্যা শিখা অধিক হাদিস শোনা থেকে উত্তম।”

ইমাম আবু আলী নিসাপুরি রহ. বলেন, الفهم عندنا أجل من الحفظ অর্থাৎ আমাদের নিকট হাদিস মুখস্থের চেয়ে হাদিসের বুঝ অর্জন অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

আল-ফকিহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ-তে রয়েছে, এক ব্যক্তি ইবনে উকদা রহ. কে একটা হাদিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলো। তিনি বললেন, এজাতীয় হাদিস কম বর্ণনা করো। কেননা এগুলোর বর্ণনা তার জন্যই কেবল শোভনীয় যে এর মর্ম উপলব্ধি করতে পারে। ইহইয়া বিন সুলাইমান আব্দুল্লাহ বিন ওহাব থেকে, তিনি হজরত ইমাম মালেক রহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি ইমাম মালেক রহ. কে বলতে শুনেছি, অনেক হাদিস ভ্রষ্টতার কারণ হয়। আমি এমন কিছু হাদিস বর্ণনা করেছি যার প্রত্যেকটি বর্ণনার পরিবর্তে দু'টি বেত্রাঘাত খেতে বেশি পছন্দ করি।”

ইমাম মালেকের উক্ত বক্তব্যের ব্যাখ্যায় শায়খ আল্লামা ইসমাইল আল-আনসারি বলেছেন, হাদিস ভ্রষ্টতার কারণ তার জন্যই হয়, যে হাদিসের অপব্যবহার করে এবং অনুপযুক্ত স্থানে তা প্রয়োগ করে। নতুবা নবিজি সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহের মাঝে তো শুধু হেদায়েতই রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, وَاتَّبِعُوهُ لَعَلَكُم تَهْتَدُون অর্থাৎ তোমরা তাঁর অনুসরণ করো, অবশ্যই হেদায়াত প্রাপ্ত হবে। কেউ যদি কোন জিনিস উপযুক্ত স্থানে রাখার পরিবর্তে অন্য জায়গায় রাখে, তবে সে পথভ্রষ্ট হবে। এজন্য আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের অনেক আয়াতে নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নতকে হিকমা বলেছেন। আর হিকমা বলা হয় কোন জিনিস তার উপযুক্ত স্থানে রাখা।

আল-জামে লি আখলাকির রাবি ও আদাবিস সামে-তে রয়েছে, ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেন,

قيل لمالك ابن انس إن عند بن عيينة عن الزهري اشياء ليست عندك فقال مالك وأنا كل ما سمعته من الحديث احدث به الناس أنا إذا اريد ان اضلهم

“ইমাম মালেক রহ. কে বলা হলো, ইমাম ইবনে উয়াইনা রহ. এর কাছে ইমাম যুহরীর রহ. অনেক হাদিস রয়েছে, যা আপনার কাছে নেই। ইমাম মালেক রহ. বললেন, আমি যেসব হাদিস শুনেছি, তার সব যদি মানুষের নিকট বর্ণনা করি, তবে আমি তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে দেবো।

এ কারণে আল্লামা ইবনে ওহাব রহ. বলেছেন,

الحَدِيثُ مَضَلَّةٌ إِلَّا لِلْعُلَمَاءِ অর্থাৎ আলেমগণ ব্যতীত অন্যদের জন্য হাদিস ভ্রষ্টতার কারণ।

এখানে আলেম দ্বারা ফকিহ উদ্দেশ্য। এবিষয়ে ইমাম ইবনে উয়াইনা রহ. এর বক্তব্য পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।

সুতরাং সন্দেহ থাকে না যে, হাদিসের প্রকৃত বুঝ অর্জন করেছে ফকিহগণ। তাঁদের অনুসরণ ও সংস্রব মানুষকে বক্রতা ও ভ্রষ্টতা থেকে মুক্ত রাখবে। এ বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন বিখ্যাত দুই ইমাম, ইবনে উয়াইনা ও ইবনে ওহাব রহ.। অন্যান্য ইমামগণ তাদের এ বক্তব্য উদ্ধৃতি হিসেবে উল্লেখের মাধ্যমে এর স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। যেমন ইবনে উয়াইনা রহ. থেকে ইবনে আবি যায়েদ কাইরাওয়ানি, ইমাম খলিল আল-জুন্দি, ইবনে হাজার হায়তামি রহ. বর্ণনা করেছেন। আল্লামা ইবনে ওহাবের বক্তব্যটি বর্ণনা করেছেন, ইবনে আবি হাতেম, ইবনে হিব্বান, ইবনে আবি যায়েদ, ইমাম বাইহাকি, ইবনে আব্দুল বার, কাজি ইয়াজ, ইবনে আসাকির ও ইবনে রজব হাম্বলি রহ. সহ প্রমুখ আলেম।

আল্লামা ইবনে আব্দুল বার আত-তামহীদে আবু জা'ফর আইলির সূত্রে যে বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন, সেখানে আবু জাফর আইলি বলেছেন, আমি ইবনে ওহাব রহ. কে অসংখ্যবার একথা বলতে শুনেছি। একারণে আমি যে উৎসগুলো থেকে উক্ত বক্তব্য উদ্ধৃত করেছি, সেখানে ইবনে ওহাব রহ. এর বক্তব্যটি বার বার উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ উদাসীন মহল এ থেকে বড়ই আশ্চর্যজনকভাবে উদাসীন রয়েছে।

ইমাম তিরমিযি রহ. সুনানে তিরমিযিতে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কন্যা যয়নব রা. এর গোসলের বর্ণনা সম্বলিত উম্মে আতিয়্যা রা. এর হাদিস উল্লেখ করেছেন। এবং এর উপর দীর্ঘ আলোচনা করে শেষে লিখেছেন, وَكَذِلِكَ قَالَ الْفُقَهَاءُ وَهُمْ أَعْلَمُ بِمَعَانِي الحَدِيثِ অর্থাৎ ফুকাহায়ে কেরাম এমনটি বলেছেন, তারা হাদিসের প্রকৃত অর্থ সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত।

খতিব বাগদাদি রহ. আল-ফকিহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ-এ লিখেছেন, وليعلم أن الإكثار من كتب الحديث وروايته لا يصير به الرجل فقيها, وإنما يتفقه باستنباط معانيه, وإنعام التفكير فيه

"জেনে রেখো, হাদিসের কিতাবের আধিক্য এবং অধিক সংখ্যক হাদিস বর্ণনা দ্বারা কেউ ফকিহ হয়ে যায় না। বরং হাদিসের অর্থ আহরণ এবং তা নিয়ে গভীর গবেষণা দ্বারাই ফকিহ হওয়া যায়।"

অতঃপর তিনি ইমাম মালেক থেকে সনদসহ বর্ণনা করেছেন, তিনি তার দুই ভাগ্নে আবু বকর ইবনে আবি উয়াইস এবং ইসমাইল ইবনে আবি উয়াইসকে ওসিয়ত করেছেন। أراكما تحبان هذا الشأن وتطلبانه ؟ " قالا : نعم, قال : " إن أحببتما أن تنتفعا به, وينفع الله بكما, فأقلا منه . وتفقها"

তিনি তাদেরকে বললেন, "তোমাদের দু'জনকে দেখছি, তোমরা হাদিস সংকলন, তা শ্রবণ এবং অন্বেষণ অধিক পছন্দ করো? তারা বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তোমরা যদি পছন্দ করো যে, তোমরা তা থেকে উপকৃত হবে এবং আল্লাহ তায়ালা তোমাদের দ্বারা অন্যের উপকার করবেন, তবে কম হাদিস বর্ণনা করো এবং হাদিসের বুঝ তথা ফিকাহ বেশি অর্জন করো।”

আবু নুয়াইম ফজল বিন দুকাইন রহ. ইমাম বোখারি রহ. এর বিখ্যাত উস্তাদ ছিলেন। খতিব বাগদাদি রহ. নিজ সনদে তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি ইমাম যুফার রহ. এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম। তিনি চাদর মুড়ে বসে ছিলেন। আমাকে ডেকে বললেন,

يا أحول تعال حتى أغربل لك أحاديثك " فأريه ما قد سمعت فيقول : " هذا يؤخذ به وهذا لا يؤخذ به, وهذا ناسخ وهذا منسوخ"

“হে ট্যারা, এ দিকে এসো। তোমার হাদিসগুলো আমি বাছাই করে দেবো। আমি পূর্বে শোনা হাদিসগুলো তার নিকট পেশ করলাম। তিনি বললেন, এটা গ্রহণীয়, এটা বর্জনীয়। এটা নাসেখ, এটা মানসুখ।”

এজন্য ইমাম মালেক রহ. হাদিস গ্রহণের পূর্বে যাচাই করতেন। তিনি যাচাইয়ের ক্ষেত্রে রাবি সিকা ও গ্রহণযোগ্য হওয়ার পাশাপাশি দেখতেন সে ফকিহ কি না। এবং বর্ণিত হাদিস সম্পর্কে তার বুঝ আছে কি না।

কাজি ইয়াজ রহ. তারতিবুল মাদারেকে উল্লেখ করেছেন, ইবনে ওহাব রহ. বলেন, ইমাম মালেক রহ. আত্তাফ বিন খালেদ সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন গ্রহণযোগ্য মুহাদ্দিস। ইমাম মালেক রহ. বললেন, তোমরা কি তার কাছ থেকে হাদিস গ্রহণ করো? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, আমরা ফকিহ ছাড়া অন্যের কাছ থেকে হাদিস গ্রহণ করি না। "

এক্ষেত্রে ইমাম মালেকের আদর্শ হলেন, তাঁর উস্তাদ ইমাম রবীয়াতুর রায় রহ.। খতিব বাগদাদি রহ. আল-কিফায়াতে নিজ সনদে ইমাম মালেক থেকে বর্ণনা করেছেন, ইমাম রবীয়া রহ. ইবনে শিহাব যুহরীকে বলেছেন, তুমি রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে হাদিস বর্ণনা করে থাকো, সুতরাং সতর্কতার সাথে তা মুখস্থ করবে। ইমাম মালেক রহ. তাঁর অপর উস্তাদ আমিরুল মু'মুমিনিন ফিল হাদিস ইমাম আবুয যিনাদ আব্দুলাহ বিন যাকওয়ান রহ. এরও অনুসরণ করেছেন। আবুয যিনাদ রহ. থেকে ইবনে আব্দুল বার রহ. নিজ সনদে উল্লেখ করেছেন,

وأيم الله إن كنا لنلتقط السنن من أهل الفقه والثقة ونتعلمها شبيها بتعلمنا آي القرآن "আলাহর শপথ, আমরা ফকিহ ও সিকা রাবিদের থেকে হাদিস গ্রহণ করতাম এবং সেগুলো পবিত্র কুরআনের আয়াতের মতো শিখতাম।"

পূর্ববর্তী ইমামদ্বয়ের পূর্বে কুফার বিশিষ্ট ইমাম ও শায়খ ইবরাহিম নাখয়ি রহ. এ ব্যাপারে নির্দেশনা প্রদান করেছেন। খতিব বাগদাদি রহ. তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন, একদা মুগীরা যাব্বি তাঁর মজলিশে আসতে বিলম্ব করলো। ইবরাহিম নাখয়ি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, মুগীরা, তুমি দেরি করলে কেন? তিনি বললেন, আমাদের কাছে একজন মুহাদ্দিস এসেছেন। তাঁর কাছ থেকে আমরা হাদিস লিখছিলাম। তখন ইবরাহিম নাখয়ি রহ. বললেন, আমরা তো কেবল তার কাছ থেকে হাদিস গ্রহণ করতাম যার ব্যাপারে নিশ্চিত হতাম যে, সে হালাল ও হারামের মাঝে উত্তমরূপে পার্থক্য করতে পারে। তুমি এমন মুহাদ্দিস দেখবে যে সে হাদিস বর্ণনা করছে কিন্তু হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল বলছে। অথচ সে জানে না যে সে কী করছে।

খতিব বাগদাদি রহ. আল-ফকিহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ-এ ইমাম শাফেয়ির রহ. বিশেষ ছাত্র ও ইলমের উত্তরাধিকার ইমাম মুযানির রহ. দীর্ঘ একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। বক্তব্যের শেষে ইমাম মুযানি রহ. বলেছেন,

فانظروا رحمكم الله على ما في أحاديثكم التي جمعتموها ، واطلبوا العلم عند أهل الفقه تكونوا فقهاء إن شاء الله "তোমাদের উপর আলাহ তায়ালা রহমত বর্ষণ করুন। তোমরা তোমাদের সঙ্কলিত হাদিসের প্রতি সতর্ক থেকো। ফকিহগণের কাছ থেকে ইলম অন্বেষণ করো। ইনশাআল্লাহ তোমরাও ফকিহ হয়ে যাবে।"

বোখারি শরীফের বিখ্যাত ব্যাখ্যাতা ইমাম কাসতালানী রহ. তাঁর লাতাইফুল ইশারাতে লিখেছেন,

ويرحم الله إمام دار الهجرة مالك بن أنس ، فقد روي عنه فيما ذكره الهذلي أنه سأل نافعا الإمام المقري عن البسملة فقال: السنة الجهر بها فسلم إليه مالك وقال كل علم يسأل عن أهله

আলাহ তায়ালা ইমামু দারিল হিজরা ইমাম মালেক রহ.এর উপর রহমত বর্ষণ করুন। তাঁর থেকে ইমাম হুযালি বর্ণনা করেছেন, তিনি একবার ইমাম মুকরিকে বিসমিলাহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি বললেন, বিসমিল্লাহ উচ্চ আওয়াজে পড়া সুন্নত। ইমাম মলেক রহ. তাঁর কাছে সালাম পাঠালেন এবং বললেন, প্রত্যেক ইলম তার উপযুক্ত ব্যক্তির কাছে জিজ্ঞাসা করা হয়।

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে হাদিসের প্রতি দৃষ্টি দেয়ার পাশাপাশি ফকিহদের মতামতের প্রতি দৃষ্টি দেয়ার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে। পূর্ববর্তী ইমামদের বক্তব্য থেকে কখনও প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে, শুধু হাদিস সহিহ হলেই তা আমলের জন্য যথেষ্ট। বিষয়টি আরেকটু বিস্তারিতভাবে তুলে ধরছি। এতে তাদের দাবির ভ্রান্তি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠবে।

সাহাবায়ে কেরাম রা. থেকে শুরু করে পূর্ববর্তী কেউ-ই শুধু হাদিস বর্ণনা আমলের জন্য যথেষ্ট মনে করতেন না। বরং তারা দেখনতেন, হাদিসের উপর আমল করা হয়েছে কি না? পূর্বে আল্লামা যাহেদ আল-কাউসারি রহ. এর বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, ফিকাহের থেকে বিচ্ছিন্ন অনেক রাবির ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেছে। তারা কোন হাদিস আমলযোগ্য এবং কোনটি আমলযোগ্য নয়, তা পার্থক্য করতে পারত না।”

এটি বিস্তর একটি বিষয়। ইমাম ইবনে আবি যায়েদ কাইরাওয়ানী রহ. (৩৮৪ হিঃ) এর বক্তব্য কিতাবুল জামে থেকে উল্লেখ করবো। সেই সাথে কাজি ইয়াজ রহ. এর বক্তব্যও তারতিবুল মাদারেক থেকে উদ্ধৃত করবো। এখানে তারা সালাফে সালেহিনের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। সালাফে-সালেহিন কেবল সেসব হাদিসের উপর আমল করতেন, যার উপর পূর্বে কেউ করেছে। কিন্তু যেসব হাদিসের উপর কেউ আমল করেনি, হাদিসগুলো বিশ্বস্ত সূত্রে বর্ণিত হলেও তারা তার উপর আমল করতেন না।

ইমাম ইবনে আবি যায়েদ রহ. আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আক্বিদা, আদর্শ ও রীতির আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছেন,

والتسليم للسنن لا تعارض برأي ولا تدافع بقياس، وما تأوله منها السلف الصالح تأولناه وما عملوا به عملناه وما تركوه تركناه ويسعنا أن نمسك عما أمسكوا، ونتبعهم فيما بينوا، ونقتدي بهم فيما استنبطوه ورأوه في الحوادث، ولا نخرج من جماعتهم فيما اختلفوا فيه أو في تأويله، وكل ما قدمنا ذكره فهو قول أهل السنة وأئمة الناس في الفقه والحديث على ما بيناه وكله قول مالك فمنه منصوص من قوله، ومنه معلوم من مذهبه

“রাসূল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস গ্রহণ করতে হবে। যুক্তি দ্বারা হাদিসের বিরোধিতা করা যাবে না। কিয়াস দ্বারা হাদিস প্রত্যাখ্যান করা হবে না। পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরাম যার উপর আমল করেছেন, আমরাও তার উপর আমল করি। তারা যার উপর আমল করেননি, আমরাও তার উপর আমল করি না। তারা যা থেকে বিরত থেকেছেন, তা থেকে বিরত থাকা আমাদেরও কর্তব্য। তারা যেসব বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যা করেছেন, আমরা তার আনুগত্য করি। তারা বিভিন্ন বিষয়ে যেসব মাসআলা গ্রহণ করেছেন, আমরা তার অনুসরণ করি। যে বিষয়ে তারা মতবিরোধ করেছেন কিংবা যার ব্যাখ্যায় মতানৈক্য হয়েছে, সেক্ষেত্রে আমরা পূর্ববর্তীদের জামাত থেকে বের হই না।

উপর্যুক্ত বক্তব্যগুলো আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের বক্তব্য। এটি ফিকাহ ও হাদিসের ইমামগণের অভিমত। এগুলো ইমাম মালেকেরও বক্তব্য। কিছু বিষয় সরাসরি তাঁর থেকে বর্ণিত এবং কিছু বিষয় তাঁর গৃহীত মাজহাব থেকে আহরিত।

ইমাম মালেক রহ. বলেন, একটি হাদিসের উপর ফকিহদের মতানুযায়ী আমল করা নিজস্ব মতানুযায়ী আমলের চেয়ে শক্তিশালী। তিনি আরও বলেন, আমি যেসব হাদিসের উপর আমল করি, তার ব্যাপারে একথা বলা কঠিন যে, আমার কাছে এর বিপরীত অমুক অমুক বর্ণনা করেছে। কেননা তাবেয়িদের অনেকের কাছে বিভিন্ন সূত্রে হাদিস বর্ণিত হলেও তারা বলতেন, "আমি হাদিসটি সম্পর্কে সম্যক অবগত আছি। কিন্তু এর বিপরীত আমল চলে আসছে।"

মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর ইবনে হাযাম রহ. তাঁর ভাইকে কখনও কখনও বলতেন, তুমি এ হাদিস অনুযায়ী কেন ফয়সালা করলে না? তিনি উত্তর দিতেন, আমি মানুষকে এর উপর আমল করতে দেখিনি।

ইবরাহিম নাখয়ি রহ. বলেন, আমি যদি সাহাবাগণকে কব্জী পর্যন্ত ওজু করতে দেখতাম, তবে আমিও তাই করতাম; যদিও আমি কনুই পর্যন্ত ওযুর আয়াত পাঠ করি। কেননা তাদের ব্যাপারে সুন্নত পরিত্যাগের অভিযোগ করা সম্ভব নয়। তারা ইলমের দিক থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ। রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুসরণের ব্যাপারে সর্বাধিক আগ্রহী। সুতরাং নিজ ধর্মের ব্যাপারে সন্দেহপোষণকারী ছাড়া কেউ তাদের ব্যাপারে এ অভিযোগ করার দুঃসাহস দেখাবে না।

ইমাম আব্দুর রহমান ইবনে মাহদি বলেন, মদিনাবাসীর মাঝে প্রচলিত সুন্নত, হাদিসে বর্ণিত সুন্নত থেকে উত্তম। ইমাম ইবনে উয়াইনা বলেন, ফকিহগণ ব্যতীত অন্যদের জন্য হাদিস ভ্রষ্টতার কারণ। এর দ্বারা তিনি উদ্দেশ্য নিয়েছেন, অন্যরা হাদিসকে তার বাহ্যিক অর্থের উপর প্রয়োগ করে। অথচ অন্য হাদিসের আলোকে এ হাদিসের বিশেষ ব্যাখ্যা রয়েছে। অথবা, হাদিসের বিপরীতে সূক্ষ্ম দলিল রয়েছে যা তার কাছে অস্পষ্ট। হাদিসটি অন্য কোন দলিলের আলোকে পরিত্যাজ্য হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর এ সব বিষয়ে গভীর পান্ডিত্যের অধিকারী ফকিহ ছাড়া অন্যরা অবগত নয়।

ইমাম ইবনে ওহাব রহ. বলেন, যে মুহাদ্দিসের কোন ফকিহ ইমাম নেই, সে ভ্রষ্ট। আলাহ পাক যদি আমাদেরকে ইমাম লাইস ইবনে সা'য়াদ ও ইমাম মালেকের দ্বারা মুক্তি না দিতেন, তবে আমরা পথভ্রষ্ট হয়ে যেতাম।

ইমাম ইবুন আবি যায়েদ বলেন, ইমাম মালেক রহ. বলেছেন, মদিনায় এমন কোন মুহাদ্দিস ছিলেন না, যিনি কখনও দু'টি পরস্পর বিরোধী হাদিস বর্ণনা করেছেন। ইমাম আশহাব বলেন, ইমাম মালেক রহ. এর দ্বারা উদ্দেশ্য নিয়েছেন, কোন মুহাদ্দিস এমন হাদিস বর্ণনা করতেন না, যার উপর আমল করা হয় না।

কাজি ইয়াজ রহ. তারতিবুল মাদারেক-এ লিখেছেন,

باب ما جاء عن السلف والعلماء في الرجوع إلى عمل أهل المدينة في وجوب الرجوع إلى عمل أهل المدينة وكونه حجة عندهم وإن خالف الأكثر روي أن عمر بن الخطاب رضي الله تعالى عنه قال على المنبر: احرج بالله على رجل روى حديثاً العمل على خلافه . قال ابن القاسم وابن وهب رأيت العمل عند مالك أقوى من الحديث، قال مالك:

وقد كان رجال من أهل العلم من التابعين يحدثون بالأحاديث وتبلغهم عن غيرهم فيقولون ما نجهل هذا ولكن مضى العمل على غيره، قال مالك: رأيت محمد بن أبي بكر ابن عمر بن حزم وكان قاضياً، وكان أخوه عبد الله كثير الحديث رجل صدق، فسمعت عبد الله إذا قضى محمد بالقضية قد جاء فيها الحديث مخالفاً للقضاء يعاتبه، ويقول له: ألم يأت في هذا حديث كذا؟ فيقول بلى. فيقول أخوه فما لك لا تقضي به؟ فيقول فأين الناس عنه، يعني ما أجمع عليه من العلماء بالمدينة يريد أن العمل بها أقوى من الحديث قال ابن المعذل سمعت إنساناً سأل ابن الماجشون لم رويتم الحديث ثم تركتموه؟ قال: ليعلم أنا على علم تركناه।

পরিচ্ছেদ: অধিকাংশের আমল বিপরীত হওয়া সত্ত্বেও মদিনা বাসীর আমল গ্রহণ ও তা হুজ্জত হওয়া প্রসঙ্গে উলামায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহিনের বক্তব্য।

বর্ণিত আছে, হজরত উমর রা. মিম্বারে ভাষণ দেয়ার সময় বলেছেন, আল্লাহর শপথ, আমি ঐ ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করবো, যে এমন হাদিস বর্ণনা কওে যার উপর সাহাবাদের আমল নেই।

ইমাম ইবনে কাসেম ও ইবনে ওহাব রহ. বলেন, ইমাম মালেক রহ. এর কাছে প্রচলিত আমল বর্ণিত হাদিস থেকে অধিক শক্তিশালী। ইমাম মালেক রহ. বলেন, অনেক তাবেয়ি এমন ছিলেন যারা হাদিস বর্ণনা করতেন, এরপর তাদের কাছে এর বিপরীত হাদিস উল্লেখ করা হলে তারা বলতেন, আমি হাদিসটি সম্পর্কে সম্যক অবগত আছি। কিন্তু এর বিপরীত আমল চলে আসছে।

ইমাম মালেক রহ. বলেছেন, আমি মুহাম্মাদ বিন আবু বকর ইবনে হাযাম রহ. কে দেখেছি, তিনি একজন বিশিষ্ট কাজি ছিলেন। তাঁর ভাই আব্দুল্লা ছিলেন সত্যবাদী ও বড় মাপের মুহাদ্দিস। মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রহ. যখন এমন কোন ফয়সালা করতেন, যার বিপরীতে হাদিস রয়েছে, তখন আব্দুল্লাহ রহ. তাকে ভর্ৎসনা করে বলতেন, এ ব্যাপারে তো এই হাদিসটি বর্ণিত আছে? তিনি বলতেন, হ্যাঁ। আব্দুল্লাহ রহ. জিজ্ঞাসা করতেন, তাহলে এ অনুযায়ী বিচার করলেন না কেন? তিনি বলতেন, এ ব্যাপারে মদিনাবাসীর আমল কি? অর্থাৎ মদিনার আলেমগণ কোনটির উপর আমলের ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। তাঁর মূল উদ্দেশ্য হলো, মদিনার আলেমগণের মাঝে প্রচলিত ঐকমত্যপূর্ণ বিষয়ের উপর আমল করা হাদিসের উপর আমলের চেয়ে শক্তিশালী।

ইমাম ইবনুল মুয়াজ্জাল বলেন, এক ব্যক্তি ইবনুল মাজিশুনকে জিজ্ঞাসা করলো, তোমরা হাদিস বর্ণনা করে তা পরিত্যাগ করো কেন? তিনি উত্তর দিলেন, যেন লোকদেরকে এ বিষয়ে জানিয়ে দেই যে, হাদিসটি সম্পর্কে আমাদের অবগতি থাকা সত্ত্বেও আমরা তার উপর আমল করিনি।

ইমাম ইবনে মাহদি রহ. বলেন, মদিনাবাসীর মাঝে পূর্ব থেকেই প্রচলিত সুন্নত হাদিস থেকে উত্তম। তিনি আরও বলেন, একটি বিষয়ে অনেক হাদিস আমার সংগ্রহে থাকে। কিন্তু ইসলামের শুরু থেকে প্রচলিত আমল যদি এর বিপরীত হয়, তখন হাদীসগুলি আমার কাছে দুর্বল বিবেচিত হয়।

ইমাম রবীয়া' রহ. বলেন, আমার কাছে এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তির বর্ণনার চেয়ে এক হাজারের লোক থেকে অপর এক হাজার লোকের বর্ণনা অধিক উত্তম। কেননা আমার আশঙ্কা হয় এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তির বর্ণনা তোমাদের থেকে সুন্নত ছিনিয়ে নেবে।

ইবনে আবি হাযেম রহ. বলেন, আবু দারদা রা. কে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করা হতো। তিনি প্রশ্নের উত্তর প্রদান করতেন। অত:পর, তাঁকে বলা হতো, আমাদের কাছে তো এই হাদিস এভাবে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলতেন, আমিও হাদিসটি শুনেছি, কিন্তু প্রচলিত আমল এর বিপরীত।

ইমাম ইবনে আবিয যিনাদ রহ. বলেন, উমর বিন আব্দুল আযিয রহ. ফকিহদেরকে একত্র করতেন। যেসব হাদিস ও সুন্নতের উপর আমল করা হয়, তাদেরকে সেসম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেন। এরপর তিনি তাদের বক্তব্য অনুযায়ী ফয়সালা করতেন। যেসব হাদিসের উপর আমল করা হয় না, সেগুলো পরিত্যাগ করতেন, যদিও তা বিশ্বস্ত সূত্রে বর্ণিত হতো।

উপর্যুক্ত বক্তব্যগুলো কাযি ইয়াজ রহ. বর্ণনা করেছেন। এবার খতিব বাগদাদি রহ. এর বক্তব্যের প্রতি লক্ষ করুন। তিনি আল-ফকিহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ-এ শিরোনাম দিয়েছেন, "যেসব কারণে খবরে ওয়াহিদকে পরিত্যাগ করা হবে।" তিনি ইমাম মুহাম্মাদ বিন ঈসা তাব্বা' রহ. এর বক্তব্য দিয়ে পরিচ্ছেদটি শুরু করেছেন। ইমাম মুহাম্মাদ বিন ঈসা রহ. ছিলেন ইমাম মালেক রহ. এর বিশিষ্ট ছাত্র; একজন বিশিষ্ট ফকিহ ও মুহাদ্দিস। তিনি বলেন,

“রাসূল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত প্রত্যেকটি হাদিসের উপর আমলের ব্যাপারে কোন সাহাবি থেকে যদি কোন বর্ণনা না পাওয়া যায়, তবে হাদিসটি পরিত্যাগ করো।”

ইবনে খাল্লিকান রহ. শাফেয়ি মাজহাবের বিশিষ্ট ইমাম আবুল কাসেম আব্দুল আযিয বিন আব্দুলাহ আদ-দারকী রহ. (৩৭৫ হিঃ) এর জীবনী আলোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, "তাঁর কাছে যখন কোন মাসআলা জিজ্ঞাসা করা হতো, তিনি দীর্ঘ সময় তা নিয়ে চিন্তা করতেন। এরপর ফতোয়া প্রদান করতেন। কখনও কখনও তিনি ইমাম আবু হানিফা রহ. ও ইমাম শাফেয়ি রহ. এর মাজহাবের বিপরীত ফতোয়া দিতেন। এ বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলতেন, তোমাদের ধ্বংস হোক, অমুকে অমুকে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস গ্রহণ করা ইমামদ্বয়ের বক্তব্য গ্রহণ থেকে উত্তম।

ইমাম যাহাবি রহ. উক্ত বক্তব্যটি সিয়ারু আ'লামিন নুবালা-তে উল্লেখ করে মন্তব্য লিখেছেন, قُلْتُ : هَذَا جَيِّدٌ، لَكِنْ بِشَرْطِ أَنْ يَكُونَ قَدْ قَالَ بِذَلِكَ الحَدِيْثِ إِمَامٌ مِنْ نُظَرَاءِ الإِمَامَيْنِ مِثْلُ مَالِكٍ، أَوْ سُفْيَانَ، أَوِ الأَوْزَاعِي، وَبِأَنْ يَكُونَ الحَدِيثُ ثَابِتاً سَالِماً مِنْ عِلَّةٍ، وَبِأَنْ لاَ يَكُونَ حُجَّةُ أَبِي حَنِيفَةَ وَالشَّافِعِيِّ حَدِيثاً صحيحاً معارضاً للآخرِ أَمَّا مَنْ أَخَذَ بِحَدِيثٍ صَحِيحٍ وَقَدْ تَنكَّبَهُ سَائِرُ أَئِمَّةِ الاجتهَادِ، فَلَا

"আমি বলব, এটি উত্তম। কিন্তু শর্ত হলো, ইমামদ্বয়ের সমতুল্য কোন আলেম যেমন ইমাম মালেক, সুফিয়ান সাউরি অথবা ইমাম আওযায়ী রহ. এর মতো বড় কোন ইমাম উক্ত হাদিস অনুযায়ী ফতোয়া দিতে হবে; হাদিসটি সব ধরনের ত্রুটি থেকে মুক্ত ও বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হবে। সাথে সাথে, ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম শাফেয়ি রহ. এর দলিলটি এমন কোন সহিহ হাদিস হবে না, যা আলোচ্য হাদিসের বিপরীত। কিন্তু কেউ যদি এমন হাদিস গ্রহণ করে, যা সব মুজতাহিদ পরিত্যাগ করেছেন, তাহলে তার বক্তব্য গ্রহণ করা হবে না।”

আবু যুরয়া দিমাশকী তাঁর তারিখে এবং ইমাম রামাহুরমুযি আল-মুহাদ্দিসুল ফাযেলে ইমাম আওযায়ী রহ. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,

"আমরা যখন কোন হাদিস শুনতাম, তা আমাদের সাথিদের কাছে পেশ করতাম। যেমন ভেজাল নির্ণয়ের জন্য দেরহাম পেশ করা হয়। হাদিসটি যদি তাদের কাছে ত্রুটিমুক্ত হতো, তখন তা গ্রহণ করতাম। যেই হাদিস সম্পর্কে তারা আশ্বস্ত হতেন না, সেটা আমরা পরিত্যাগ করতাম।

ইমাম তকিউদ্দীন ইবনে তাইমিয়া রহ. আল-মুসাওয়াদা-তে লিখেছেন,

"ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. যেসব হাদিস ও আসার বর্ণনা করেছেন, সেটি তার মাজহাব হিসেবে গণ্য হবে। কোন হাদিসকে সহিহ, হাসান বললেও সেটি তার মাজহাব হিসেবে পরিগণিত হবে। এমনকি যেসব হাদিসের সনদের ব্যাপারে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে তাঁর কিতাবে লিখেছেন সেগুলোও তাঁর মাজহাব। এভাবে যেসব হাদিস তিনি প্রত্যাখ্যান করেননি বা এর বিপরীত ফতোয়া প্রদান করেননি, সেগুলোও তার মাজহাব হিসেবে গণ্য হবে। কেউ কেউ বলেছেন, এগুলো তার মাজহাবের অন্তর্ভূক্ত হবে না”

এখানে আমাদের উদ্দিষ্ট বক্তব্য হলো, "যে হাদিস তিনি প্রত্যাখ্যান করেননি বা এর বিপরীত ফতোয়া দেননি” এ অংশটি। এটি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ. ও অন্যান্য ইমামগণ কখনও একটি হাদিস সহিহ সত্ত্বেও পরিত্যাগ করেছেন। এর পরিবর্তে অন্য হাদিসের উপর আমল করেছেন। সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, হাদিস সহিহ হলেই তার উপর আমল করা জরুরি নয়।

একজন আলেমের সৌন্দর্য হলো, সে হাদিস ও ফিকাহ উভয়ের প্রতি সমান দৃষ্টি রাখে। সে একটির উপর আমল করতে গিয়ে অন্যের উপর জুলুম করে না।

ইয়াহইয়া বিন ইয়াহইয়া লাইসী রহ. ইমাম মালেক রহ. থেকে মুয়াত্তায়ে মালেক বর্ণনা করেছেন। কাজি ইয়াজ রহ. তাঁর জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন,

قال يحيى: كنت آتي عبد الرحمان بن القاسم، فيقول لي من أين يا أبا محمد؟ فأقول له: من عند عبد الله بن وهب. فيقول لي: اتق الله، فإن أكثر هذه الأحاديث ليس عليها العمل. ثم آتي عبد الله بن وهب، فيقول لي من أين؟ فأقول له : من عند ابن القاسم، فيقول لي اتق الله، فإن أكثر هذه المسائل رأي ثم يرجع يحيى فيقول : رحمهما الله فكلاهما قد

أصاب في مقالته نهاني ابن القاسم عن إتباع ما ليس عليه العمل من الحديث، وأصاب ونهاني ابن وهب عن كلفة الرأي، وكثرته، وأمرني بالإتباع وأصاب. ثم يقول يحيى: إتباع ابن القاسم في رأيه رشد واتباع ابن وهب في أثره هدى

ইমাম ইয়াহইয়া বলেন, আমি আব্দুর রহমান ইবনুল কাসেমের নিকট আগমন করতাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করতেন, হে আবু মুহাম্মাদ, কোথা থেকে এলে? আমি উত্তর দিতাম, আমি আব্দুল্লাহ বিন ওহাবের নিকট থেকে এলাম। তিনি বলতেন, আল্লাহকে ভয় করো। কেননা এসব হাদিসের অধিকাংশের উপর মদিনাবাসীর আমল নেই। এরপর, আব্দুল্লাহ বিন ওহাবের নিকট আসতাম। তিনি জিজ্ঞাসা করতেন, কোথা থেকে এলে? আমি বলতাম, আবুল কাসেমের নিকট থেকে এলাম। তিনিও আমাকে বলতেন, আল্লাহকে ভয় করো। কারণ, তাঁর এসব মাস-আলার অধিকাংশ হলো যুক্তি।

অত:পর ইমাম ইয়াহইয়া স্বগতোক্তি করে বলেন, আল্লাহ তায়ালা উভয় ইমামের উপর রহমত বর্ষণ করুন। প্রত্যেকেই তাদের বক্তব্যে সঠিক অবস্থানে রয়েছেন। ইমাম ইবনুল কাসেম আমাকে যেসব হাদিসের উপর আমল করা হয় না, তা থেকে নিষেধ করেছেন। তিনি সঠিক কাজ করেছেন। ইমাম ইবনুল ওহাব আমাকে অপ্রয়োজনীয় ও অধিক কিয়াস থেকে নিষেধ করেছেন। তিনিও সঠিক বলেছেন। অত:পর ইমাম ইয়াহইয়া বলেন, ইমাম ইবনুল কাসেমের বক্তব্যের অনুসরণের মাঝে যেমন উত্তম নির্দেশনা ও হেদায়াত রয়েছে, তেমনি ইমাম ইবনুল ওহাবের অনুসরণের মাঝেও রয়েছে উত্তম পথ-নির্দেশনা।

ইমাম আবু নুয়াইম নিজ সূত্রে ইবরাহিম নাখয়ি রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন,

لا يستقيم رأي إلا برواية ولا رواية إلا برأي

অর্থাৎ হাদিস ব্যতীত কোন কিয়াস গ্রহণযোগ্য নয়। আবার সঠিক কিয়াস ব্যতীত হাদিসের কোন আমল গ্রহণযোগ্য নয়।

একইভাবে ইমাম মুহাম্মাদ বিন হাসান শাইবানী রহ. লিখেছেন,

لا يستقيم العمل بالحديث إلا بالرأي ولا يستقيم العمل بالرأي إلا بالحديث

প্রয়োজনীয় কিয়াস ছাড়া হাদিসের উপর বিশুদ্ধ আমল সম্ভব নয়। আবার হাদিস ব্যতীত কোন ক্বিয়াসও গ্রহণযোগ্য নয়。

কাজি রামাহুরমুযি রহ. (৩৬০হি:) আল-মুহাদ্দিসুল ফাজিল এর ভূমিকায় তার সমযুগীয় বাগদাদের অধিবাসী এক আলেমকে নসীহত করেছেন। এই আলেম মুহাদ্দিসগণের ব্যাপারে অশোভনীয় কথা বলেছিল। তাঁকে নসীহত করে বলেছেন,

"তুমি ইলমের আদবের প্রতি কেন লক্ষ করো না? ইলমের সাথে সংশিষ্টদের প্রতি নমনীয়তা প্রদর্শন তোমার কর্তব্য নয় কি? ফকিহদেরকে যথার্থ মূল্যায়ন করো। হাদিস বর্ণনাকারী রাবীদেরকেও উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করো। রাবীদেরকে ফিকাহ অর্জনের প্রতি এবং ফকিহদেরকে হাদিস অর্জনের প্রতি উদ্বুদ্ধ করো। উভয়ের মর্যাদার স্বীকৃতি প্রদান করো। উভয়ের অনুসৃত পথ থেকে উপকৃত হও। ফকিহ ও মুহাদ্দিস ঐক্যবদ্ধ থাকার মাঝেই তাদের পরিপূর্ণতা। অনৈক্য উভয়ের জন্যই হানিকর।”

ইমাম আবু সুলাইমান খাত্তাবি রহ. (মৃত: ৩৮৮ হিঃ) আবু দাউদ শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ মায়ালিমুস সুনান এর ভূমিকায় লিখেছেন,

"বর্তমান সময়ে আলেমদেরকে দু'ভাগে বিভক্ত দেখি। একদল হলেন মুহাদ্দিস। অপরদল হলেন, ফকিহ। এক দল অপর দল থেকে বিশেষ কোন বৈশিষ্ট্যের কারণে পৃথক নয়। উদ্দেশ্য অর্জনে কেউ কারও থেকে বিমুখ হতে পারবে না। কেননা হাদিস হলো মূল ও ভিত্তি। ফেকাহ হলো শাখা ও অবকাঠামো। যেই ভবন মজবুত ভিত্তি ছাড়া প্রতিষ্ঠিত হয়, সেটি অল্পদিনেই ধ্বসে পড়ে। আর যেই ভিত বা মূলের কোন ভবন বা কাঠামো নেই, তা কোন মূল্যই রাখে না。

হাফেজ সাখাবি রহ. ফাতহুল মুগীসে গরীব হাদিস প্রসঙ্গে আলোচনার শেষে লিখেছেন,

"পূর্বে উল্লেখিত বিষয় ছাড়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো, হাদিসের বুঝ ও ফিকাহ অর্জন এবং হাদিস থেকে বিধি-বিধান আহরণ। এ বিষয়ের গুরুত্ব খুবই স্পষ্ট। এটি বিখ্যাত ইমামদের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যও। যেমন, ইমাম মালেক, শাফেয়ি, আহমাদ, হাম্মাদ ইবনে সালামা, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা, সুফিয়ান সাউরি, আব্দুলাহ ইবনুল মুবারক, ইসহাক ইবনে রাহওয়াই, ইমাম আওযায়ীসহ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অসংখ্য ইমাম। এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনেক কিতাব রচিত রয়েছে।

ইমাম ইবনে আসাকির তাঁর তারিখে ইমাম আবু যুরয়া রাযি রহ. এর জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন, ইমাম আবু যুরয়া রহ. বলেন, আমি এক রাতে হাদিসের বর্ণনাকারীদের সম্পর্কে অনেক চিন্তা-ফিকির করছিলাম। ইতোমধ্যে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। স্বপ্নে দেখলাম, এক ব্যক্তি আওয়াজ করে বলছে, হে আবু যুরয়া, হাদিসের মূল পাঠ নিয়ে গবেষণা, মৃত ব্যক্তি তথা হাদিস বর্ণনাকারীদের জীবনী নিয়ে গবেষণার চেয়ে উত্তম।

এ কারণে আবু যুরয়া রাযি রহ. নিজে বলতেন, عليكم با لفقه ، فإنه كالتفاح الجبلي يطعم سنته

"তোমাদের জন্য ফিকাহ অর্জন করা আবশ্যক। কেননা ফিকাহ ঐ পাহাড়ি আপেলের ন্যায় যার স্বাদ নির্দিষ্ট মৌসুমে সবচেয়ে বেশি হয়।”

ইমাম হাকেম রহ. তাঁর মুকাদ্দামায় ইলমে হাদিসের বিভিন্ন প্রকারের মাঝে একটি প্রকার উল্লেখ করেছেন 'হাদীসের বুঝ অর্জন'। এখানে তিনি হাদিসের বুঝ অর্জনের প্রতি খুবই গুরুত্ব দিয়েছেন। এরপর তিনি সেসব বিখ্যাত মুহাদ্দিসের আলোচনা করেছেন, যারা ফকিহ হিসেবেও প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি লিখেছেন, النوع العشرين من هذا العلم معرفة فقه الحديث إذا هو ثمرة هذه العلوم وبه قوام الشريعة فأما فقهاء الإسلام أصحاب القياس والرأي والاستنباط والجدل والنظر فمعروفون في كل عصر وأهل كل بلد ونحن ذاكرون بمشيئة الله في هذا الموضع فقه الحديث عن أهله ليستدل بذلك على أن أهل هذه الصنعة من تبحر فيها لا يجهل فقه الحديث إذا هو نوع من أنواع هذا العلم

ইলমুল হাদিসের বিশতম প্রকার: হাদিসের ফিকাহ বা বুঝ অর্জন। কেননা এটি ইলমুল হাদিসের ফলাফল। এর উপরই শরীয়ত প্রতিষ্ঠিত। ইসলামের প্রত্যেক যুগে ও প্রত্যেক দেশে প্রসিদ্ধ অনেক ফকিহ ইমাম ছিলেন। যারা আসহাবুল কিয়াস, আসহাবুর রায়, আসহাবুল জাদাল, আসহাবুন নজর ওয়াল ইস্তেম্বাত নামেও প্রসিদ্ধ ছিলেন। এ বিষয়েও আমরা আলোচনা করব যে, হাদিসের বুঝ অর্জনের ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসরাও এগিয়ে এসেছেন। একারণে তাদের মতামতের প্রতিও লক্ষ রাখা উচিত। এর দ্বারা স্পষ্ট হবে যে, মুহাদ্দিসগণ হাদিসের বুঝশূন্য নন। তারাও এবিষয়ে গভীর জ্ঞান রাখতেন। কেননা হাদিসের বুঝ অর্জন, ইলমুল হাদিসেরই একটি বিশেষ প্রকার।

ইমাম ইবনে হিব্বান রহ. হাদিসের বুঝ অর্জনের উপর দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। এখানে তিনি হাদিস বর্ণনাকারীদের ভুল বুঝ এবং তাদের অসতর্কতা সম্পর্কেও আলোচনা করেছেন। খতিব বাগদাদি রহ. আল-কিফায়া এর শুরুতে এ বিষয়ে খুবই দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। তাঁর এ বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য সেটিই, যা পূর্বে ইমাম ইবরাহিম নাখয়ি ও ইমাম মুহাম্মাদ রহ. এর বক্তব্য থেকে আলোচনা করেছি। যারা এ বক্তব্যের উদ্দেশ্য পূর্ণভাবে আয়ত্ব করতে পেরেছেন, তারাই বিশিষ্টজনদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে তার সন্তুষ্টির পথে চলার তৌফিক দান করুন। আমিন।

ইমাম ইবনে রজব হাম্বলি রহ. ফাজলু ইলমিস সালাফ আলাল খালাফে লিখেছেন,

أما الأئمة و فقهاء أهل الحديث فإنهم يتبعون الحديث الصحيح حيث إذا كان معمولا به عند الصحابة و من بعدهم أو عند طائفة منهم فأما ما اتفق علي تركه فلا يجوز العمل به لأنهم ما تركوه علي علم أنه لا يعمل به

"প্রসিদ্ধ ইমাম ও হাদিস বিশারদ ফকিহগণ কোন একটি হাদিস সহিহ হলে কেবল তখনই এর উপর আমল করতেন, যখন তার উপর কোন সাহাবি, তাবেয়ি, অথবা তাদের নির্দিষ্ট একটি দল নিয়মিত আমল করেছেন। আর সাহাবায়ে কেরাম (রা:) যে হাদিসের উপর আমল না করার উপর একমত হয়েছেন, তার উপর আমল করা জায়েয নয়। কেননা এর উপর যে আমল করা যাবে না, সেটা জেনেই তারা হাদিসটি পরিত্যাগ করেছেন।”

অত:পর ইমাম ইবনে রজব হাম্বলি রহ. লিখেছেন,

বড় বড় ইমাম যেমন ইমাম শাফেয়ি রহ. ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর পরে নতুন নতুন মতবাদের আবির্ভাব হয়েছে। এসব মতবাদ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকতে হবে। যেমন হাদিস ও সুন্নাহ অনুসরণের নামে যাহেরী মাজহাবের আবির্ভাব হয়েছে। অথচ এরাই হাদিসের সবচেয়ে বড় বিরোধী। কেননা তারা ইমামগণের বুঝ থেকে সরে এসেছে এবং নিজস্ব বুঝকে যথেষ্ট মনে করেছে। ফলে সে ইমামগণ যেই মত অবলম্বন করেছেন, তার বিপরীত মতটি নিজের জন্য পছন্দ করেছে।

ই'লামুল মুয়াক্বিয়ীনে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর উক্তি বর্ণনা করা হয়েছে,

"إذا كان عند الرجل الكتب المصنفة فيها قول رسول الله صلى الله عليه وسلم واختلاف الصحابة و التابعين فلا يجوز أن يعمل بما شاء ويتخير فيقضى به ويعمل به حتى يسأل أهل العلم ما يؤخذ به فيكون يعمل على أمر صحيح"

যদি কারও নিকট রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর লিখিত হাদিসের কিতাবসমূহ, সাহাবা, তাবেয়ি, তাবে-তাবেইনদের মতপার্থক্য সম্বলিত বর্ণনা থাকে, তবে তার জন্য যে কোন একটা গ্রহণ করা বৈধ হবে না। সে এর উপর আমল করবে না। এর দ্বারা বিচার করাও জায়েয হবে না। মতবিরোধপূর্ণ বিষয়ের কোনটি গ্রহণ করবে সে ব্যাপারে আলেমদেরকে জিজ্ঞাসা করবে। এবং সঠিকটা জেনে তার উপর আমল করবে।

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. উক্ত বক্তব্যের প্রতি লক্ষ করুণ। তিনি বলেছেন, সে যেন উলামায়ে কেরামকে জিজ্ঞাসা করে যে কোনটির উপর আমল করবে। এখানে সতর্ক করেছেন যে, কখনও একটি হাদিস সহিহ হতে পারে; যেহেতু হাদিস সহিহ হওয়াটা তার উপর আমলের জন্য যথেষ্ট নয়, একারণে সে উক্ত হাদিস অনুযায়ী ফতোয়া দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে না। সহিহ হাদিস পেলেই তার উপর ফতোয়া দেয়ার ব্যাপারে তিনি সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব, হাদিসটির উপর আমল করা যাবে কি না এবিষয়ে উলামায়ে কেরাম তথা ফকিহগণকে জিজ্ঞাসা না করে হাদিস অনুযায়ী ফতোয়া দেয়া বৈধ নয়। উলামায়ে কেরাম তাকে বলে দেবেন, কখন হাদিসের উপর আমল করা হবে এবং কখন আমল থেকে বিরত থাকা হবে।

বিখ্যাত ইমাম ও মুজতাহিদ সুফিয়ান সাউরি রহ. বলেন,

قد جائت أحاديث لا يأخذ بها

অনেক হাদিস রয়েছে, যার উপর আমল করা হয় না。

পূর্বে ইমাম ইবনে আবি লাইলার বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে যে,

لا يفقه الرجل في الحديث حتى يأخذ منه ويدع

"হাদিসের উপর কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত অভিজ্ঞ হবে না যতক্ষণ না সে কিছু হাদিস গ্রহণ করবে এবং কিছু পরিত্যাগ করবে।”

ইমাম যাহাবি রহ. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা-তে ইবনে হাযাম যাহেরি রহ. এর জীবনী লিখতে গিয়ে তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। ইবনে হাযাম যাহেরি রহ. লিখেছেন, আমি সত্য অনুসরণ করি এবং ইজতিহাদ করে থাকি। আমি কোন মাজহাব মানি না। ইবনে হাযাম যাহেরীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে ইমাম যাহাবি লিখেছেন, "এটি তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যে ইজতেহাদের স্তরে উন্নীত হয়েছে। শর্ত হলো, তার এ যোগ্যতা সম্পর্কে অনেক বিজ্ঞ উলামায়ে কেরাম স্বীকৃতি প্রদান করতে হবে। এমন যোগ্য আলেমের জন্য তাকলিদ করা উচিত নয়। যেমনিভাবে প্রাথমিক স্তরের কোন ফকিহ যে কুরআনের কিছু অংশ মুখস্থ করেছে তার জন্য কোনভাবেই ইজতিহাদ করা বৈধ নয়। সে কীভাবে ইজতিহাদ করবে, আর কী মাসআলা দেবে? কীসের ভিত্তিতে ইজতিহাদ করবে? সে কীভাবে উড়বে, অথচ তার কোন ডানা নেই?

তৃতীয় প্রকার হলো, ফিকাহের ক্ষেত্রে পূর্ণ বুঝের অধিকারী, তীক্ষ্ম বুদ্ধি সম্পন্ন, হুশিয়ার ও প্রচুর ধী-শক্তিসম্পন্ন একজন ফকিহ এবং একজন মুহাদ্দিস যখন শাখাগত মাসআলা মুখস্থ করবে, উসুলে ফিকাহ, নাহু-সরফ তথা আরবি ব্যাকরণে অভিজ্ঞ, কুরআন হেফজের পাশাপাশি কুরআনের তাফসীরেও যথেষ্ট পারদর্শী হবে তখন তাকে মুজতাহিদের স্তরে গণ্য করা হবে। তবে শর্ত হলো, শরিয়েতর দলিল পর্যালোচনার যোগ্যতা সম্পন্ন হতে হবে। এসব বিষয়ে যোগ্যতা অর্জন করলেও তাকে স্বাধীন মুজতাহিদ (মুজতাহিদে মুতলাক) গণ্য করা হবে না। বরং সে মুজতাহিদে মুকায়‍্যাদ বা অধীন মুজতাহিদ হিসেবে গণ্য হবে। কোন মাসআলা যদি তার কাছে সঠিক মনে হয়, তবে এক্ষেত্রে তিনটি বিষয় লক্ষণীয়। ১. এ ব্যাপারে গ্রহণযোগ্য দলিল থাকতে হবে। ২. তার মতের স্বপক্ষে বিখ্যাত কোন ইমাম যেমন ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালেক, সুফিয়ান সাউরি, ইমাম আওযায়ী, ইমাম শাফেয়ি, আবু উবায়েদ, ইমাম আহমাদ অথবা ইমাম ইসহাক প্রমুখ ইমামের আমল থাকতে হবে। শর্ত দু'টি পাওয়া গেলে তার কাছে সঠিক বিষয়ের উপর সে আমল করতে পারবে। আরেকটি শর্ত হলো, ৩. এক্ষেত্রে সে রুখসুত বা নিজের কাছে পছন্দনীয় ও সহজ বিষয় গ্রহণ করবে না। এবং খুবই সতর্কতা ও ভয়ের সাথে আমল করবে। অবশ্য তার বিপক্ষে গ্রহণযোগ্য দলিল কায়েম করা হলে তার জন্য এধরণের গবেষণার অনুমতি থাকবে না। তখন তার উপর তাকলিদ করা আবশ্যক।

এ ধরনের আলেম যদি তার সমপর্যায়ের ফকিহদের বিরোধিতার ভয় করে, তবে তার জন্য আবশ্যক হলো, ফকিহদের সঙ্গে উক্ত মাসআলা নিয়ে আলোচনা করা। কোনভাবেই সে সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহদের থেকে বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করবে না। কেননা সম্ভাবনা রয়েছে যে, সে একটি মাসআলায় প্রবৃত্তির ধোঁকায় পড়েছে এবং একক মতামতের দ্বারা সে মানুষের মাঝে প্রসিদ্ধি অর্জনের সুপ্ত বাসনা লালন করছে। বিষয়টি এমন হলে সে জবাবদিহিতা ও শাস্তির মুখোমুখি হবে। সুতরাং এসব ক্ষেত্রে সত্যের পর্দার আড়ালে তার প্রবৃত্তিপূজা সুপ্ত থাকে। অনেক লোক রয়েছে, যারা সত্য বলেছে এবং সত্যের আদেশ করেছে, কিন্তু তার অসৎ উদ্দেশ্যে ও ধর্মীয় নেতৃত্ব গ্রহণের বাসনার কারণে আল্লাহ তায়ালা তার উপর এমন ব্যক্তি নিযুক্ত করেন, যে তাকে কষ্ট দেয় এবং তার বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটি ফকিহদের অন্তরের একটি সুপ্ত ব্যাধি।

ইমাম যাহাবির উল্লেখিত বক্তব্য নিয়ে একটু চিন্তা করুন। তিনি বলেছেন, কোন মাসআলায় যদি একটি বিষয় তার নিকট হক্ব মনে হয়, এ ব্যাপারে তার দলিলও থাকে, তবুও বিখ্যাত কোন ইমাম এ ব্যাপারে মতামত দিলেই কেবল এর উপর আমল করতে পারবে।

পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি এমন একটি সহিহ হাদিস গ্রহণ করল, যা সব ইমাম পরিত্যাগ করেছেন, তবে তার জন্য এটি গ্রহণ করা বৈধ নয়। উপরে আল্লামা ইবনে রজব হাম্বলি রহ. এর বক্তব্য বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, হাদিস অনুসরণের নামে অনেক নতুন ফিতনার উদ্ভব হয়েছে। এক্ষেত্রে কিছু লোক ইমামদের থেকে বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করে ইমামদের পরিত্যক্ত মাসআলাগুলো গ্রহণ করেছে।

ইবনুল কাইয়্যিম রহ. ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর ব্যাপারে একটি দাবি করেছেন। বক্তব্যটি ইমাম যাহাবি ও ইমাম ইবনে রজব হাম্বলি রহ. এর বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। ইবনুল কাইয়্যিম রহ. লিখেছেন,

“ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. কোন আমল, কিয়াস, কারও বক্তব্য কিংবা সংশ্লিষ্ট হাদিসের বিপরীত হাদিস অনবহিত থাকা ইত্যাদি বিষয়কে সহিহ হাদিসের উপর প্রাধান্য দিতেন না।”

হাদিসের উপর আমলের জন্য উক্ত হাদিসের উপর বিখ্যাত কোন ইমামের আমল শর্ত হিসেবে উল্লেখের ব্যাপারে ইমাম যাহাবি রহ. এর বক্তব্য স্পষ্ট। আল্লামা ইবনে রজব হাম্বলি রহ. এর বক্তব্যও যাহেরীদের সমালোচনা ও হাদিস অনুসরণের নামে তাদের বিচ্ছিন্নতার নিন্দার ব্যাপারে স্পষ্ট। কেননা, তারা হাদিস সহিহ হওয়ার কথা বলে এমন হাদিস গ্রহণ করে, যা পূর্বে কেউ গ্রহণ করেনি।

কেউ কেউ ইবনুল কাইয়্যিম রহ. এর এজাতীয় বক্তব্য অবলম্বন করে সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্তকৃত মাসআলায় বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করেছে। যেমন, মহিলাদের জন্য স্বর্ণালঙ্কার ব্যবহার হারাম সাব্যস্ত করেছে। অথচ এর বৈধতার ব্যাপারে ইজমার কথা উল্লেখ করেছেন ইমাম বাইহাকি ও ইবনে হাজার আসকালানির মতো বিখ্যাত ইমাম ও পরবর্তী উলামায়ে কেরাম।

ইমাম যাহাবি ও ইবনে রজব হাম্বলি রহ. মূলত: ইবনুল কাইয়্যিম রহ. এর উক্ত বর্ণনার দুর্বলতার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। অর্থাৎ এক্ষেত্রে ইবনুল কাইয়্যিম রহ. ইমাম আহমাদ রহ. থেকে যে বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন, তা নেহায়েত দুর্বল। যদিও ইবনুল কাইয়্যিম রহ. নিজ মাজহাব ও অন্যান্য মাজহাবের উসুলের ব্যাপারে যথেষ্ট ইলমের অধিকারী ছিলেন।

মাজমুউল ফাতাওয়ায়ে ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল থেকে বর্ণিত দু'টি উক্তির মাঝে সামঞ্জস্য বিধান প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, "ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর বক্তব্য স্ববিরোধী হিসেবে উপস্থাপনের পরিবর্তে এমন অর্থের উপর প্রয়োগ করা উত্তম, যার দ্বারা একটি বক্তব্য অপর বক্তব্যকে সত্যায়ন করে। বিশেষ করে এমন বক্তব্যের ক্ষেত্রে যা নতুন উদ্ভাবিত এবং পূর্ববর্তী কোন ইমাম থেকে বর্ণিত নয়। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেন,

যে মাসআলায় তোমার কোন ইমাম নেই, তা থেকে বিরত থাকো। খলকে কুরআনের ফিতনার সময় তিনি বলতেন, আমি এমন কথা কীভাবে বলবো, যা ইতোপূর্বে কেউ বলেনি। "

ইমাম মাইমুনি রহ. বলেন, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. আমাকে বলেছেন, হে আবুল হাসান, যে মাসআলায় তোমার কোন ইমাম নেই, তা থেকে তুমি বেঁচে থাকো।

ইমাম মাইমুনি রহ. এর জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে ইমাম যাহাবি রহ. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা-তে লিখেছেন,

الإمام العلامة الفقيه ... تلميذ الإمام أحمد ومن كبار الأئمة

"তিনি বিখ্যাত ইমাম, ফকিহ ও আল্লামা। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর বিশিষ্ট ছাত্র। হাম্বলি মাজহাবের বিশিষ্ট ইমামদের অন্যতম।”

ইমাম মাইমুনি রহ. এতো বড় ব্যক্তিত? হওয়া সত্ত্বেও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. তাঁকে এ নসীহত করেছেন। এর থেকে সহজে বোঝা যায়, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর এ ওসিয়ত কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

মুহাম্মাদ বিন ঈসা বিন নাজীহ আত-তাব্বা আল-বাগদাদি রহ (২২৪ হিঃ) ছিলেন একজন বিখ্যাত ইমাম, বিশ্বস্ত হাফেযে হাদিস ও বিশিষ্ট ফকিহ। পূর্বে আল-ফকিহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ থেকে সনদসহ তাঁর বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেন, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রত্যেক হাদিস যার উপর তার কোন সাহাবি আমল করেননি, তা তুমি পরিত্যাগ করো।”

উক্ত বক্তব্যের উপর খতিব বাগদাদি রহ. মন্তব্য লিখেছেন,

"কোন আস্থাভাজন রাবি কোন হাদিস বর্ণনা করলে হাদিসটি কয়েক কারণে প্রত্যাখ্যাত হতে পারে। এর মধ্যে তৃতীয় কারণটি হলো, মুসলিম উম্মাহের ইজমার বিরোধী হওয়া। সুতরাং ইজমার বিরোধী হওয়াটা প্রমাণ করে যে, হয়তো হাদিসটি মানসুখ নতুবা হাদিসের সনদটি বিশুদ্ধ নয়। কেননা সমগ্র মুসলিম উম্মাহর পক্ষে রহিত নয় এমন একটি সহিহ হাদিসের বিরোধিতা করা সম্ভব নয়। বিষয়টি ইবনুত তাব্বা রহ. তাঁর উক্তিতে বর্ণনা করেছেন, যা আমরা পরিচ্ছেদের শুরুতে উল্লেখ করেছি。

এমন বক্তব্য উপস্থাপন, যা ইতোপূর্বে কেউ উল্লেখ করেনি, এটি উলামায়ে কেরামের কাছে একটি পাগলামী ছাড়া কিছুই নয়। ইমাম সাইমারি রহ. আখবারু আবি হানিফা ও আসহাবিহি নামক কিতাবে ইমাম যুফার রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন,

إني لست أناظر أحدا حتي يقول قد أخطأت، ولكني أناظره حتي يجن ، قيل : كيف يجن؟ قال: يقول بما لم يقل به أحد

"অর্থাৎ কেউ ভুল স্বীকার করলেও তার সাথে আমি ইলমী আলোচনা করতে থাকি, যতক্ষণ না সে পাগল হয়ে যায়। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, কীভাবে পাগল হয়? তিনি উত্তর দিলেন, এমন মতামত পেশ করে, যা কেউ কখনও বলেনি।”

কেউ প্রশ্ন করতে পারে, আপনি ইমাম সুবকি রহ. বক্তব্যের কী উত্তর দেবেন? তিনি মা'না ক্বাওলিল ইমামিল মুত্তালাবি- তে লিখেছেন,

الأولي عندي إتباع الحديث، و ليفرض الإنسان نفسه بين يدي النبي صلي الله عليه وسلم وقد سمع ذلك منه أيسعه التأخر عن العمل، لا والله وكل أحد مكلف بحسب فهمه

"আমার কাছে হাদিস অনুসরণ করা উত্তম। এব্যক্তি নিজেকে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সামনে উপস্থিত মনে করবে। সে যদি রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সরাসরি হাদিসটি শ্রবণ করতো, তবে কি সে এর উপর আমল করা থেকে বিরত থাকত? আলাহর শপথ, অবশ্যই না। সুতরাং প্রত্যেক ব্যক্তির উপর তার বুঝ অনুযায়ী বিধি-বিধান আরোপিত হবে।”

আমি বলবো,

প্রথমত: আমাদেরকে ইমাম সুবকি রহ. এর বাক্যের প্রতি লক্ষ করতে হবে। তিনি বলেছেন, আমার কাছে হাদিস অনুসরণ করা উত্তম। তিনি বলেছেন, আমার কাছে উত্তম। এর দ্বারা বোঝা যায়, বিষয়টি উলামায়ে কেরামের মাঝে মতবিরোধপূর্ণ। তবে এক্ষেত্রে তিনি হাদিস অনুসরণের মত গ্রহণ করেছেন। কিন্তু অন্যান্য উলামায়ে কেরাম শর্তারোপ করেছেন যে, হাদিসের উপর পূর্বের কোন ইমাম আমল করতে হবে। যেমনটি ইমাম যাহাবি ও ইবনে রজব হাম্বলি রহ. এর উক্তি থেকে বর্ণনা করা হয়েছে।

আমাদের এ বক্তব্যের উদ্দেশ্য এটা নয় যে, ইমামের আমল হাদিসের উপর আমল করার ব্যাপারে ফয়সালাকারী হবে। এবং ইমামের আমল না পাওয়া ব্যতীত হাদিস দলিল হবে না। আল্লাহর কাছে এ ধরনের বক্তব্য থেকে আশ্রয় চাই। উপর্যুক্ত আলোচনা দ্বারা কখনও এটি উদ্দেশ্য নয়। বরং এককভাবে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস হুজ্জত এবং প্রত্যেক মুসলমানের জন্য তা অবশ্য পালনীয়।

আমাদের আলোচনার উদ্দেশ্য হলো, কোন ইমামের আমল এ বিষয়ের জন্য দলিল যে, সালাফে সালেহিন উক্ত হাদিসটি পরিত্যাগের ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছাননি। কেননা সর্বসম্মতিক্রমে সালাফে-সালেহিনের পক্ষ থেকে কোন হাদিস পরিত্যাগ প্রমাণ করে যে, উক্ত হাদিসের বিপরীত আরেকটি গ্রহণযোগ্য হাদিস রয়েছে।

পরবর্তী উলামায়ে কেরামের মধ্যে ইমাম যাহাবি ও ইবনে রজব হাম্বলি রহ. এর পূর্বে ইমাম ইবনুস সালাহ একই শর্তারোপ করেছেন। ইমাম ইবনুস সালাহ রহ. লিখেছেন,

وإن لم تكمل إليه ووجد في قلبه حزازة من مخالفة الحديث بعد أن بحث فلم يجد لمخالفته عنه جوابا شافيا فلينظر هل عمل بذلك الحديث إمام مستقل فإن وجد فله أن يتمذهب بمذهبه في العمل بذلك الحديث عذرا في ترك مذهب إمامه

"কারও মাঝে যদি ইজতেহাদে মুতলাক বা মুকায়্যাদের শর্তগুলো পূর্ণভাবে না পাওয়া যায়, কিন্তু সে উক্ত হাদিস নিয়ে গবেষণার পর প্রতিপক্ষেরে পক্ষ থেকে সন্তোষজনক উত্তর না পাওয়ায় তার অন্তরে যদি হাদিস বিরোধিতার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়, তবে সে দেখবে উক্ত হাদিসের উপর বিখ্যাত কোন ইমাম আমল করেছেন কি না। যদি সে এমন কোন ইমামকে পায়, তবে তার জন্য উক্ত হাদিস গ্রহণ করে উক্ত ইমামের মাজহাবের উপর আমল বৈধ। কেননা এক্ষেত্রে তার ইমামের মাজহাব পরিত্যাগের ওজর পাওয়া গেছে।"

পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরামের এ ব্যাপারে অনেক বক্তব্য রয়েছে, কখনও কখনও হাদিস সহিহ হলেও তার উপর আমল করা হয় না। ইতোপূর্বে ক'টি উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন, ইমাম ইবনে আবি লাইলা বলেছেন,

لا يفقه الرجل في الحديث حتى يأخذ منه ويدع

"হাদীসের উপর কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত অভিজ্ঞ হবে না যতক্ষণ না সে কিছু হাদিস গ্রহণ করবে এবং কিছু পরিত্যাগ করবে।”

আল্লামা ইবনে রজব হাম্বলি রহ. কৃত শরহু ইলালিত তিরমিযি-তে ইমাম সুফিয়ান সাউরি রহ.এর উক্তি উল্লেখ করা হয়েছে,

قد جائت أحاديث لا يأخذ بها

অনেক হাদিস রয়েছে, যার উপর আমল করা হয় না。

তারিখে আবু যুরয়াতে ইমাম আওযায়ী রহ. থেকে বর্ণিত আছে,

تعلم ما لا يؤخذ به كما تتعلم ما يؤخذ به

"গ্রহণীয় হাদিসের পাশাপাশি আমল করা হয় না এমন হাদীসও শিক্ষা করো।”

উলামায়ে কেরাম থেকে এজাতীয় অনেক বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে।

দ্বিতীয়ত: ইমাম সুবকি রহ. এর বক্তব্যে খুবই সূক্ষ্ম একটি বিষয় রয়েছে। যে উক্ত বক্তব্য দ্বারা দলিল দেবে তার জন্য এ সূক্ষ্ম বিষয়টিও বিশ্লেষণ করা জরুরি।

ইমাম সুবকি রহ. বলেন,

و ليفرض الإنسان نفسه بين يدي النبي صلي الله عليه وسلم وقد سمع ذلك منه أيسعه التأخر عن العمل، لا والله

এব্যক্তি নিজেকে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সামনে উপস্থিত মনে করবে। সে যদি রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সরাসরি হাদিসটি শ্রবণ করতো, তবে কি সে এর উপর আমল করা থেকে বিরত থাকত? আলাহর শপথ, অবশ্যই না।

আমি বলব: আলাহর শপথ, এটি একটি মারাত্মক বিষয়। সরাসরি রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস পেয়ে কীভাবে তার উপর আমল করতে বিলম্ব করবে? অথচ হজরত আবু সাঈদ মুয়ালা রা. নামাজরত অবস্থায় রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ডাকলেন। তিনি ডাকে সাড়া না দেয়ায় রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উপর অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। তিনি বললেন, হে আলাহর রসুল, আমি নামাজ আদায় করছিলাম। রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বললেন,

ألم يقل الله : إستجيبوا لله وللرسول إذا دعاكم

"আল্লাহ তায়ালা কি বলেননি যে, আলাহ এবং তার রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তোমাদেরকে ডাকেন, তোমরা ডাকে সাড়া দাও"

হাদিসটি ইমাম বোখারি রহ. কিতাবুত তাফসীরের শুরুতে আল-ফাতিহাতু সাবউল মাসানি ওয়াল কুরআনুল আজিম নামক পরিচ্ছেদের অধীনে উল্লেখ করেছেন।

রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ডাকে সাড়া দিতে বিলম্ব হওয়ার কারণে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর উপর অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। অথচ তিনি নামাজরত ছিলেন। সুতরাং একজন মু'মিন রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর থেকে হাদিস শুনে কীভাবে তার উপর আমল করতে বিলম্ব করবে?

কিন্তু এটি তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর থেকে কোন বিষয়ে সরাসরি একটি হাদিস শুনেছেন। কিন্তু রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগের পরবর্তীদের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। অর্থাৎ প্রথম শতাব্দী থেকে কেয়ামত পর্যন্ত অন্য সবার অবস্থান ভিন্ন। আমাদের সামনে অনেক সময় একই বিষয়ে দু'টি পরস্পর হাদিস বর্ণিত হয়ে থাকে। যেমন, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

توضؤوا مما مست النار অর্থাৎ আগুনে স্পর্শকৃত বস্তু আহার করলে ওজু করো।

হাদিসটি হজরত যায়েদ বিন সাবেত, হজরত আবু হুরাইরা, হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে।

অন্য হাদিসে বর্ণিত আছে, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদা ছাগলের গোশত খেলেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, ছাগলের কাঁধ খেয়েছেন। এরপর নামাজ আদায় করলেন। কিন্তু তিনি পানি স্পর্শ করলেন না। ইমাম বোখারি রহ. হাদিসটি ওজু অধ্যায়ে ছাতু ও গোশত খেয়ে ওজু না করার পরিচ্ছেদে উল্লেখ করেছেন। হজরত ইবনে আব্বাস রা, আমর বিন উমাইয়্যা জামরী এবং উম্মুল মু'মিনিন হজরত মাইমুনা রা. থেকে হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে। ইমাম মুসলিম রহ. উল্লেখিত বর্ণনার পরে এ বর্ণনাটি এসব সাহাবি থেকে বর্ণনা করেছেন। অতিরিক্ত হিসেবে তিনি হজরত আবু রাফে রা. থেকে একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। ইবনে আব্বাস রা. থেকে মুসলিম শরীফের এক বর্ণনায় রয়েছে, তিনি রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে নামাজের জন্য বের হতে দেখলেন। ইতোমধ্যে রুটি ও গোশত হাদিয়া এলো। রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিন লুকমা আহার করলেন এবং নামাজ আদায় করলেন। কিন্তু তিনি পানি স্পর্শ করলেন না।

হজরত যায়েদ বিন সাবেত রা. ও হজরত আবু হুরাইরা রা. স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে, তারা রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছেন, আগুনে স্পর্শকৃত বস্তুর কারণে ওজু করতে হবে। পক্ষান্তরে হজরত ইবনে আব্বাস রা. হজরত মাইমুনা রা. হজরত আবু রাফে রা. এবং হজরত আমর আল-জামরী রা. রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে আগুনে তৈরি গোশত খেতে দেখেছেন।

এরপর রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাজ আদায় করেছেন। কিন্তু তিনি নতুন করে ওজু করেননি।

উল্লেখিত সাহাবিদের কারও জন্য রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিসের উপর আমল থেকে বিলম্বের কোন সুযোগ ছিল না। যেমনটি ইমাম সুবকি রহ. বলেছেন এবং বাস্তবে সাহাবিরা এমনটি করতেন।

কিন্তু সাহাবিদের পরে যারা আগমন করেছে তারা কী করবে? একই সাথে পরস্পর বিরোধী দু'টি হাদিসের উপর কীভাবে আমল করবে? সন্দেহ নেই, পরবর্তীরা দু'টি হাদিসের মধ্যে সমন্বয় কিংবা একটার উপর আরেকটা প্রাধান্য দেয়ার জন্য তৃতীয় কোন দলিল অনুসন্ধান করবে। যেমন হজরত জাবের রা. এর হাদিসে রয়েছে,

كان آخر الأمرين من رسول الله صلي الله عليه وسلم ترك الوضوء مما مست النار

আগুনে স্পর্শকৃত বস্তুর ক্ষেত্রে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সর্বশেষ আমল ছিলো তিনি এর কারণে ওজু করতেন না।

এরপরও ইমাম যুহরি রহ. বলেন, আগুনে স্পর্শকৃত বস্তুর কারণে ওজু করার নির্দেশের হাদিসটি নাসেখ (রহিতকারী)। তাঁর কাছে যে হাদিসে ওজু না করার কথা রয়েছে সেটি ওজু করার হাদিস দ্বারা রহিত। কেননা মুবাহ হওয়ার বিষয়টি পূর্ব থেকে বিদ্যমান। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি রহ. ফাতহুল বারীতে এমনটি বর্ণনা করেছেন। অত:পর তিনি এর বিশ্লেষণ করে ইমাম নববি রহ. এর উক্তি বর্ণনা করেছেন,

إستقر الإجماع علي أنه لا وضوء مما مست النار إلا ما تقدم إستثنائه من لحوم الإبل

এ ব্যাপারে ইজমা সংঘঠিত হয়েছে যে, আগুনে স্পর্শকৃত বস্তুর কারণে ওযুর প্রয়োজন নেই। তবে পূর্বে উটের গোশত এই বিধান থেকে ব্যতিক্রম সাব্যস্ত হয়েছে।

ইমাম সারাখসি রহ. উসুলুস সারাখসি-তে এ বিষয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলেছেন।

তিনি লিখেছেন,

إن قول الرسول صلي الله عليه وسلم موجب للعلم بإعتبار أصله و إنما الشبهة في النقل

নিশ্চয় রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কথা তার মূল অনুযায়ী ইলমে ইয়াকীনের ফায়দা দেবে। কিন্তু পরবর্তীতে বর্ণনার মাঝে সন্দেহ সৃষ্টি হয়।

সুতরাং যে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর থেকে সরাসরি হাদিস শ্রবণ করবে, সে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নির্দেশের ব্যাপারে নিঃসন্দেহ থাকবে। কিন্তু যার কাছে বিভিন্ন সূত্রের মাধ্যমে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএর হাদিস বর্ণিত হয়েছে, তার ক্ষেত্রে বিভিন্ন চিহ্নকে শ্রবণের স্থলাভিষিক্ত ধরা হয়। সুতরাং এসব চিহ্নের মাধ্যমেও অনেক সময় ইলমে ইয়াক্বীন তথা নিশ্চিত জ্ঞান অর্জিত হয়। তখন তার জন্য উক্ত হাদিসের উপর আমল করা আবশ্যক হয়। কিন্তু কখনও হাদিসের বর্ণনাকারীদের মাঝে সন্দেহের সৃষ্টি হয়ে থাকে। কখনও কখনও বর্ণিত হাদিসটি অন্য একটি সুনিশ্চিত ইলম জ্ঞাপক দলিলের বিরোধী হয়। অথবা অন্য কোন বিশুদ্ধ হাদিসের বিরোধী হয়। এভাবে বিভিন্ন কারণে বর্ণিত হাদিসের ব্যাপারে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। এখানে এসব বিষয়ের বিশ্লেষণ অপ্রয়োজনীয়।

আলামা ইবনুল মুনযির রহ. এর আল-আওসাত-এ রয়েছে,

حكي عن حماد بن سلمة أنه قال : إذا جاءك عن رجل حديثان مختلفان لا تدري الناسخ من المنسوخ ولا الأول من الآخر فلم يجئك عنه شيء

হজরত হাম্মাদ বিন সালামা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন তোমার কাছে পরস্পর বিরোধী দু'টি হাদিস বর্ণিত হয় এবং এর মাঝে কোনটা রহিত ও কোনটি রহিতকারী, কোনটা আগে বা পরে, এবিষয়ে যদি তোমার জ্ঞান না থাকে, তবে তোমার নিকট কিছুই বর্ণিত হয়নি।

ইমাম আবু দাউদ রহ. আবু দাউদ শরীফে উল্লেখ করেছেন,

إذا تنازع الخبران عن النبي صلي الله عليه وسلم ينظر بما أخذ به أصحابه

“কোন বিষয়ে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হাদিস পরস্পর বিরোধী হলে সাহাবিরা যার উপর আমল করেছেন সেটি গ্রহণ করা হবে।”

বিষয়টি খুবই বিস্তৃত। তবে আমাদের উপপাদ্য বিষয় হলো, যে ব্যক্তি সরাসরি রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে হাদিস শোনেনি, সে সাহাবি হোক বা অন্য কেউ, তার অবস্থা ঐ ব্যক্তির থেকে ভিন্ন যে সরাসরি রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে হাদিস শুনেছেন। পরবর্তী ব্যক্তির জন্য উভয় হাদিস সম্পর্কে অবগত হয়ে যে কোন একটির উপর আমল করার সুযোগ থাকে। কিন্তু যে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সরাসরি হাদিস শুনেছে, তার জন্য উক্ত হাদিসের উপরই আমল জরুরি। পরবর্তীতে সাহাবি যদি দ্বিতীয় হাদিস সম্পর্কে অবগত হন, তবুও তিনি তার নিজের শোনা হাদিসকে প্রাধান্য দেবেন। তবে বর্ণনাকারী সাহাবি যদি তাকে এ ব্যাপারে আশ্বস্ত করতে পারেন যে, পূর্বের হাদিসটি রহিত হয়েছে, তখন সে ভিন্ন হাদিসের উপর আমল করবে।

হজরত ইবনে আব্বাস রা. রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে গোশত খেয়ে ওজু ছাড়া নামাজ আদায় করতে দেখেছেন। এরপর, হজরত আবু হুরাইরা রা. তাঁর কাছে এই হাদিসটি বর্ণনা করলেন “তোমরা প্রত্যেক আগুনে স্পর্শকৃত বস্তু আহারের কারণে ওজু করো। তখন ইবনে আব্বাস রা. এ হাদীসের উপর আমল করেননি। তিনি রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে যা করতে দেখেছেন তার উপর আমল করেছেন এবং নিজের দেখা বিষয়কে বর্ণিত বিষয়ের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। এক্ষেত্রে হজরত ইবনে আব্বাস রা. কে বলা হবে না যে, আপনি নিজেকে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সম্মুখে উপস্থি মনে করুন এবং তাঁকে এও বলা হবে না যে, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত বিষয়ের উপর আমল করতে কেন বিলম্ব করলেন?

সংশিষ্ট বিষয়ে ইবনে আব্বাস রা. অপর একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা হলো। এতে আমাদের জন্য অনেক শিক্ষণীয় উপাদান রয়েছে। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. মুসনাদে আহমাদে এবং ইমাম ত্বহাবী রহ. শরহু মায়ানিল আসারে ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন। ইমাম ত্বহাবীর বর্ণনায়, একদা হজরত উরয়া ইবনে যুবায়ের রা. হজরত ইবনে আব্বাস রা. কে বললেন, হে ইবনে আব্বাস, আপনি মানুষকে পথভ্রষ্ট করছেন। হজরত ইবনে আব্বাস রা. বললেন, কীভাবে? উরয়া বললেন, আপনি ফতোয়া দিয়ে থাকেন যে, তোয়াফ শেষ হলে হালাল হয়ে যাবে। অথচ হজরত আবু বকর ও হজরত উমর রা. হজ শেষে তালবিয়া পড়তেন এবং ঈদের দিন পর্যন্তইহরাম অবস্থায় থাকতেন। হজরত ইবনে আব্বাস রা. বললেন, একারণে তোমরা পথভ্রষ্ট হয়ে গেছো? আমি তোমাদের কাছে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস বর্ণনা করছি, আর তুমি হজরত আবু বকর ও হজরত উমর রা. এর বক্তব্য বর্ণনা করছো। তখন হজরত উরয়া বিন যোবায়ের রা. বললেন, নিশ্চয় হজরত আবু বকর রা. ও হজরত উমর রা. রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আমলের ব্যাপারে আপনার চেয়ে বেশি অবগত ছিলেন।

ইমাম ত্ববরানী রহ. উক্ত ঘটনাটি এভাবে বর্ণনা করেছেন, হজরত উরয়া হজরত ইবনে আব্বাস রা. কে বললেন, আপনি মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন। হজরত ইবনে আব্বাস রা. বললেন, হে উরাইয়্যা, কীভাবে? হজরত উরয়া বললেন, আপনার মতামত হলো, হজ ও উমরায় ইহরাম বাঁধার পর তোয়াফ করলে সে ইহরাম মুক্ত হয়ে যাবে। অথচ হজরত আবু বকর ও হজরত উমর রা. এর থেকে নিষেধ করতেন। হজরত ইবনে আব্বাস রা. বললেন, তোমার ধ্বংস হোক, তুমি কি আলাহর কিতাব ও রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর তাঁর সাহাবীদেরকে প্রাধান্য দাও? হজরত উরয়া বলেন, তারা আলাহর কিতাব ও রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএর সুন্নতের ব্যাপারে আপনার ও আমার চেয়ে বেশি অবগত ছিলেন। হজরত উরয়া থেকে বর্ণনাকারী ইবনে আবি মুলাইকা রহ. বলেন, এভাবে হজরত উরয়া ইবনে আব্বাস রা. এর সাথে বিতর্ক করলেন。

সুতরাং হজরত ইবনে আব্বাস রা. যখন রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর একটি কাজ দেখেন, তখন তার উপর আমল করতে বিলম্ব করা সমীচীন মনে করেন না। সাধারণ মানুষ রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আমল ছেড়ে অন্যের কথার উপর আমল করুক, সেটাকে বিভ্রান্তিকর মনে করা তার জন্য শোভনীয়। কেননা তিনি রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর থেকে এর বিপরীত আমলটি জানেন না। কিন্তু হজরত উরয়া রা. এর বক্তব্যও যথাস্থানে সঠিক। কেননা আমরা হজরত আবু বকর ও হজরত উমর রা. এর কথার উপর আমল করে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএর সুন্নাহ থেকে বিমুখ হচ্ছি না। আমাদের সম্মুখে দু'টি বিষয় রয়েছে। একটি বিষয় হজরত ইবনে আব্বাস রা. প্রত্যক্ষ করেছেন এবং আরেকটি বিষয় হজরত আবু বকর ও হজরত উমর রা. প্রত্যক্ষ করেছেন। এখন আমরা হজরত আবু বকর ও উমর রা. এর বক্তব্যকে হজরত ইবনে আব্বাসের বক্তব্যের উপর প্রাধান্য দেবো। কেননা তারা হজরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএর অবস্থা সম্পর্কে অধিক অবগত ছিলেন।

আমরা তাদেরকে একই উত্তর প্রদান করবো, যারা ইমাম আবু হানিফা রহ. ইমাম শাফেয়ি রহ, ইমাম মালেক রহ ও ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ. এর ফিকাহ পরিত্যাগ করে এর পরিবর্তে তারা বিভিন্ন নামে নিজেদের ফিকাহ উদ্ভাবন করেছে। যেমন, ফিকহুল কিতাব ওয়াস সুন্নাহ (কুরআন সুন্নাহর ফিকাহ) অথবা ফিকহুস সুন্নাহ (হাদিসের ফিকাহ) এজাতীয় বিভিন্ন নাম দিয়ে মানুষকে সুন্নাহ অনুসরণের দাওয়াত দিয়ে থাকে।

আমরা তাদেরকে বলবো, আমরা ইমামদের পরিবর্তে তোমাদেরকে কখনও তাদের স্থলাভিষিক্ত করতে পারি না। কেননা রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহের ব্যাপারে তারা তোমাদের চেয়ে অধিক জ্ঞাত ছিলেন। এখানে আ'লামু (অধিক জ্ঞাত) বিশেষণের বিশেষণ (ইসমে তাফজীল) ব্যাবহার সংগত নয়। কেননা তাদের ইলমের তুলনায় তোমাদের ইলমের কোন তুলনাই হয় না। রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএর সুন্নাহ অনুসরণে তারা যারপরনাই আগ্রহী ও দৃঢ় ছিলেন। রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস থেকে তারা যে বুঝ অর্জন করেছে, তারই অনুসরণের প্রতি আমাদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছেন।

এই শ্রেণি ইবনে আব্বাস রা.এর উক্ত বক্তব্যের খন্ডিত অংশ উল্লেখ করে নিজেদের বক্তব্য প্রমাণ করার চেষ্টা করে থাকে। অথচ এ লোকটি ইবনে আব্বাস রা. এর অপর একটি বক্তব্য দ্বারা কখনও প্রমাণ পেশ করে না। যাতে তিনি নিজের ইজতিহাদ অনুযায়ী হুকুমের কারণ বের করে বাহ্যিক হাদিসের উপর আমল করা থেকে বিরত থেকেছেন। তিনি তওয়াফ অবস্থায় রমল সুন্নত না হওয়ার মত অবলম্বন করেছেন। এবং যারা একে সুন্নত বলেছেন, তাদের সম্পর্কে বলেছেন, তারা ভুল করেছে। যেমনটি সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে。

অথচ রমল সম্পর্কে হজরত উমর রা. বলেছেন,

شيئ صنعه النبي صلى الله عليه وسلم فلا نحب أن نتركه "এটি এমন একটি আমল, যা রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেছেন। সুতরাং আমরা এটা পরিত্যাগ করতে পছন্দ করি না।”

আমরা ইমাম সুবকি রহ.এর কথার যথার্থ ব্যাখ্যা তুলে ধরেছি। অথচ ধোঁকায় নিপতিত এক মূর্খ আল-আয়াতুল বাইয়্যিনাত-এ উক্ত বক্তব্যটি উল্লেখ করেছে। আমাদের বিশ্লেষণটি এ মূর্খের কোমর ভেঙ্গে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। তার সবচেয়ে শক্তিশালী দলিলের অবস্থা যদি এই হয়, তবে অন্যান্য দলিলের কী অবস্থা খুব সহজে অনুমেয়। তার উদাহরণ ঐ ব্যক্তির মতো যাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনি কী চান? সে উত্তর দিলো, এমন দলিল যার বিশ্লেষণে গর্ববোধ হয়। এমন সন্দেহ যার বিশ্লেষণ লাঞ্ছনার জন্য যথেষ্ট হয়।

দ্বিতীয় অভিযোগ হলো, একজন মুসলমানের উপর শুধু রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে অনুসরণ করা আবশ্যক। একমাত্র রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেই অনুসরণের আদেশ দেয়া হয়েছে, অন্য কাউকে নয়।

আমরা এই অভিযোগকারীকে বলবো, রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ অনুসরণের ব্যাপারে বড় বড় ইমাম ও মুজতাহিদগণের বক্তব্যের কিছু অংশ পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের কাছে ইলম ও আমলের ক্ষেত্রে সুন্নাহ পরিত্যাগ ভ্রষ্টতা ও লাঞ্ছনার কারণ। আপনার একথা দ্বারা বোঝা যায়, তারা হিদায়াতের উপর ছিলেন না। তারা রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সঠিকভাবে অনুসরণ করতেন না। একারণে আপনি তাদের অনুসৃত পথ পরিত্যাগ করে রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএর সুন্নাহ অনুসরণের কথা বলছেন। আপনি তাদেরকে পাদ্রী ও সন্ন্যাসী মনে করেছেন। যারা আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহ ছাড়া হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল সাব্যস্ত করেছে। অথচ ইমামগণ কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণের ব্যাপারে এতটা কঠোর ছিলেন যে তথাকথিত এই জ্ঞানীরা তা কল্পনা করতেও পারবে না। তারা শুধু পরবর্তীদের কাছে রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ পৌঁছে দিয়েছেন; যেমন মুয়াজ্জিন ইমামের তাকবীর পিছনের কাতারের মুসল্লীদের কাছে পৌঁছে দেয়।

কেউ যদি প্রশ্ন করে, আমি দলিল থেকে নিজের বুঝ অনুযায়ী শরয়ী বিধি-বিধান বুঝতে চাই। আমি এ বিধানটি ইমাম আবু হানিফা রহ. যেভাবে বলেছেন, সেভাবে বুঝতে পারছি না। বরং ইমাম শাফেয়ি রহ. যেভাবে বলেছেন সেভাবে বুঝেছি। সুতরাং আমি দলিল না বুঝে কোন আমল করতে পারি না। একারণে আমি ইমাম শাফেয়ি রহ. এর মাজহাব অনুযায়ী আমল করবো। এতে কোন সমস্যা আছে কি?

আমরা বলবো, এটি তো এক মাজহাব থেকে অন্য মাজহাবে স্থানান্তর।

এক মাজহাব থেকে আরেক মাজহাবের দিকে স্থানান্তরের কারণটি তিনটি বিষয়ের যে কোন একটি হতে পারে,

১. বিশেষ কারণে স্থায়ীভাবে সে অন্য মাজহাব গ্রহণ করেছে। বিষয়টি স্বতঃসিদ্ধ ও বৈধ। এধরণের কাজে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই。

২. এ ব্যক্তি সুযোগ সন্ধানী হয়ে বিভিন্ন মাজহাবের মাঝে যেটি পছন্দ হয়, সেটি গ্রহণ করে। এধরণের কাজ নিন্দনীয় ও অবৈধ।

৩. কোন একটি নির্দিষ্ট মাসআলার ক্ষেত্রে ইজতেহাদের যোগ্য ব্যক্তি দলিলের আলোকে উদ্দিষ্ট মাসআলা আহরণের জন্য প্রয়াসী হয়ে বিভিন্ন মাজহাবের দলিল বিশ্লেষণ ও তা অবলম্বন করবে। এ ব্যক্তি যদি ইজতেহাদের যোগ্য হয় এবং প্রান্তিকতা, স্থূলতা ও দৃষ্টির সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হয়, তবে তা শুধু বৈধই নয়, বরং তা ফিকাহ শাস্ত্রের একটি প্রশংসনীয় কাজও। তবে শর্ত হলো, তাকে এ গবেষণায় ন্যায়-পরায়ণ হতে হবে।

পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরামের পাশাপাশি পরবর্তী অনেক উলামায়ে কেরামের এজাতীয় গবেষণা করেছেন। যেমন, ইমাম নববি রহ. ইমাম ইবনুস সালাহ, ঈয ইবনে আব্দুস সালাম, ইবনে তাইমিয়া, ইবনুল কাইয়্যিম, তকিউদ্দীন সুবকি এবং ইবনুল হুমাম রহ. সহ বর্তমান সময় পর্যন্ত অসংখ্য উলামায়ে কেরাম। এমনকি আমাদের উস্তাদের উস্তাদ আল্লামা যাহেদ আল-কাউসারি রহ.কে অনেকে হানাফি মাজহাব অনুসরণের গোঁড়া হওয়ার অপবাদ দিলেও তিনি তাঁর মাকালাতে ওয়াকফ সম্পর্কে একটি দীর্ঘ বিশ্লেষণ ধর্মী আলোচনা করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি ইমাম আবু হানিফা রহ. এ বক্তব্য পরিত্যাগ করেছেন যে, "ওয়াকফ স্থায়ী হওয়ার জন্য বিচারকের ফয়সালা আবশ্যক; কেননা বিচারকের ফয়সালা মূলত: মতানৈক্য দূর করার জন্য প্রয়োজন হয়।" সুতরাং ইমাম কাউসারি রহ. এ মাসআলায় জমহুরের মত অবলম্বন করেছেন। যা সহিহ হাদিস এবং সাহাবাগণের আমল দ্বারা প্রমাণিত এবং অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের অভিমতও এটি। ইমাম কাউসারি রহ. এর বিশ্লেষণ হলো, ইমাম আবু হানিফা রহ. কোন কোন মাসআলায় নিজ ইজতিহাদ অনুযায়ী দলিল থেকে মাসআলা ইস্তেম্বাতের পরিবর্তে ইবরাহিম নাখয়ি কিংবা কাজি শুরাইহের বক্তব্য গ্রহণ করেছেন এবং উক্ত বক্তব্যের দলিল অন্বেষণের চেষ্টা করেননি। কিন্তু পরবর্তী বিশ্লেষণের দ্বারা যখন শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া যাবে যে, ইমাম এ মাসআলায় অন্যের অনুসরণ করেছেন, তখন মাসআলাটি ইমামের দিকে সম্পৃক্ত করা উচিত নয়। কেননা দলিল ছাড়া ইমাম যদি অন্যের অনুসরণ করেন, তবে সেক্ষেত্রে ইমামের অনুসরণ জরুরি নয়। এসব ক্ষেত্রে ইমামের অনুসরণীয় ব্যক্তির ভুল প্রকাশিত হলে তা থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক। ইজতিহাদ মূলত: এমন মাস-আলার ক্ষেত্রে হয় যেখানে সুস্পষ্ট দলিল পাওয়া যায় না।

ইমাম কাউসারি রহ. এর বক্তব্যটি সেসব মামআলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যা তিনি আন-নুকাতুত ত্বরীফা এর ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন। ইমাম কাউসারি রহ. এর বক্তব্য অনুযায়ী এজাতীয় মাসআলার সংখ্যা দশটিরও বেশি।

আমাদের অপর দাদা উস্তাদ আলামা যফর আহমাদ উসমানী রহ. তাঁর বিখ্যাত কিতাব ই'লাউস সুনানে এ পথ অনুসরণ করেছেন। কেননা তিনি বেশ ক'টি মাসআলায় হানাফি মাজহাবে স্থিরকৃত মাসআলার বিপরীত অন্য মাজহাব অনুযায়ী ফতোয়া দিয়েছেন। অথচ এ কিতাবে হানাফি মাজহাব অনুসরণের প্রতি তিনি যথেষ্ট রক্ষণশীল ছিলেন।

কেউ যদি ইজতেহাদের যোগ্য না হয়, গবেষণায় সত্যানুসন্ধানী-ন্যায়পরায়ণ না হয় এবং প্রান্তিকতার দোষে দুষ্ট হয়, তবে এ ব্যক্তির কাজটি চরম গর্হিত ও নিন্দনীয় বিবেচিত হবে। বরং এটি তার ঈমান ও আমলের জন্য ধ্বংসাত্মক কাজ হিসেবে গণ্য হবে। অথচ বর্তমান সময়ের অধিকাংশ স্বশিক্ষিতরা উদার মানসিকতার অন্তরালে ইমামদের সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক ও স্বেচ্ছাচারিতার দ্বার উন্মুক্ত করেছে। তারা যে উপাধি আর শ্লোগানের ছদ্মাবরণ করুক না কেন আমরা কখনও তাদের এ গর্হিত কাজ সমর্থন করি না, বরং এ অন্যায়ের ঘোর বিরোধিতা করে থাকি।

দেখা যায় এক ব্যক্তি হয়তো কোন একটি মাস-আলায় ইমাম আবু হানিফা (রহ:) এর মাজহাব ছেড়ে ইমাম শাফেয়ি (রহ:) এর মাজহাব গ্রহণ করে, কিন্তু এই স্থানান্তর তাকে অন্য একটি মাস-আলায় উদাহরণ স্বরূপ ইমাম মালেক (রহ:) এর মাজহাবে স্থানান্তরের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। আবার তৃতীয় একটি মাস-আলায় সে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহ:) এর মাজহাবে স্থানান্তর করবে। একইভাবে চতুর্থ কোন মাস-আলায় সে চক্রাকারে প্রথম মাজহাব অথবা অন্য কোন ইমামের মাজহাব অনুসরণ করবে।

এই স্থানান্তর সম্পর্কে ইমাম দারমী রহ. নিজ সূত্রে উমর বিন আব্দুল আযিয রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন,

من جعل دينه غرضا للخصومة كثر تنقله

যে ব্যক্তি নিজের দীনকে তর্ক-বিতর্কের লক্ষ্যবস্তু বানায় তার স্থানান্তর ও অভিবাসন বৃদ্ধি পায়।

এভাবে এই স্বেচ্ছাচারী এক মাজহাব থেকে অপর মাজহাবে স্থানান্তর করতে থাকবে। পরিশেষে এ ব্যক্তি শুধু চার মাজহাব থেকেই বের হওয়া পছন্দ করবে না বরং সে এধরণের চল্লিশ মাজহাব থেকেও বের হয়ে যাবে।

ইমাম মালেক রহ. এর সাথে এ ধরনের একজন স্বেচ্ছাচারীর কথোপকথন হয়। ইমাম মালেক রহ. এই তার নিকট উমর বিন আব্দুল আযিয রহ. এর বক্তব্য প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেন।

আল্লামা ইবনে আব্দুল বার (রহ:) আল-ইন্তেকা-তে হজরত ইমাম মালেক (রহ:) এর উক্ত ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন। ইমাম মালেক (রহ:) এর ছাত্র মায়ান বিন ঈসা (রহ:) বলেন, একদা আবুল জুয়াইরিয়া নামক এক ব্যক্তি ইমাম মালেক (রহ:) এর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে মসজিদে নববিতে আসল। লোকটি মুরজিয়া হিসেবে অভিযুক্ত ছিল। সে এসে ইমাম মালেক (রহ:) কে বলল,

يا أبا عبد الله! إسمع مني شيئا ، أكلمك به و أحاجك و أخبرك برأي. قال مالك: فإن غلبتني؟ قال: اتبعتني. قال مالك: فإن غلبتك ؟ قال: إتبعتك، قال: فإن جاءنا رجل فكلمناه فغلبنا؟ قال : تبعناه. قال أبو عبد الله مالك : بعث الله محمدا صلي الله عليه وسلم بدين واحد، و أراك تنقل، قال عمر بن عبد العزيز من جعل دينه عرضة للخصومات أكثر التنقل

"হে আবু আব্দুল্লাহ! আমার একটি কথা শুনুন। আমি আপনার সাথে আলোচনা করব, বিতর্ক করব এবং আমার মতামত উল্লেখ করব। ইমাম মালেক (রহ:) তাকে বললেন, যদি তুমি আমার উপর বিজয়ী হও? সে বলল, আপনি আমার অনুসরণ করবেন। ইমাম মালেক (রহ:) পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, যদি আমি তোমার উপর বিজয়ী হই? সে বলল, আমি আপনার অনুসরণ করব। ইমাম মালেক বললেন, আমাদের কাছে যদি তৃতীয় কোন ব্যক্তি আসে এবং আমরা তার সাথে বিতর্ক করি। সে যদি আমাদের উপর বিজয়ী হয়? সে বলল, আমরা তার অনুসরণ করব। ইমাম মালেক তাকে বললেন, আল্লাহ তায়ালা হজরত মুহাম্মাদ সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে একটা ধর্ম দিয়ে প্রেরণ করেছেন। আমি তোমাকে দেখছি, এদিক সেদিক ছুটাছুটি করছো! হজরত উমর বিন আব্দুল আযিয (রহ:) বলেন, যে ব্যক্তি তার দীনকে বিতর্কের লক্ষ্যবস্তু বানায়, তার ছুটাছুটি বৃদ্ধি পায়”

সুতরাং এধরনের ব্যক্তি ইমামদের অনুসৃত পথ ছেড়ে দলিলের অনুসরণের নামে এমন সব বক্তব্য উপস্থাপন করবে যা ইতোপূর্বে কেউ বলেনি। অথচ সে নিজেও জানে না, সে কত বড় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে কিন্তু মৌখিকভাবে সে দাবি করছে যে, সে সুন্নাহের সাহায্যকারী, সুন্নাহের প্রতি আহ্বানকারী।

ইমাম মালেক রহ. এই বিপদের আশঙ্কা করে বলেছেন,

سلموا للأئمة و لا تجادلوهم، فلو كنا كلما جاءنا رجل أجدل من رجل إتبعناه: لخفنا أن نقع في رد ما جاء به جبريل عليه السلام

তোমরা ইমামদের আনুগত্য করো এবং তাদের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয়ো না। আমাদের কর্মপন্থা যদি এই হত যে, যখনই আমাদের নিকট শক্তিশালী কোন যুক্তিবিদ আগমন করতো আর আমরা তার অনুসরণ করতাম, তবে আশঙ্কা করি যে, আমরা হজরত জিবরাইল (আঃ) এর আনীত বিষয়েরও বিরোধিতায় লিপ্ত হয়ে পড়ব।

যারা দাবি করেছে যে, আমরা ইমাম আবু হানীফার দলিল বুঝি না, বরং ইমাম শাফেয়ি রহ. এর দলিল বুঝি, তাদের এ দাবীটি পূর্বে উল্লেখিত ইমামদের বক্তব্যের অনুরূপ। পূর্বে কিছু আলেম হাদিস সহিহ হওয়ার উপর ভিত্তি করে ইমাম শাফেয়ি রহ. এর বক্তব্যের বিপরীত বিষয়কে তার মাজহাব প্রমাণের চেষ্টা করেছিলেন। ফলে তারা ইমাম শাফেয়ি রহ. এর স্পষ্ট বক্তব্য ছেড়ে তার বিপরীত বিষয়গুলো ইমাম শাফেয়ি রহ. এর মাজহাব হিসেবে প্রতিষ্ঠার পিছে পড়েছিলেন। এদের দাবিটিও পূর্ববর্তী আলেমদের অনুরূপ। বরং দু'টি বিষয় একই। এর ফলাফলও আপনারা প্রত্যক্ষ করেছেন। আল্লাহপাক সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা রহ. এর উপর সন্তুষ্ট হোন। তিনি বলেছেন,

التسليم للفقهاء سلامة في الدين

ফকিহদের অনুসরণের মাঝে দীনের নিরাপত্তা রয়েছে"

ভালভাবে হৃদয়ংগম করা উচিত যে, উপর্যুক্ত তিন ইমাম তথা ইমাম মালেক রহ, ইবনে উয়াইনা এবং ইবনে ওহাব রহ. এ বিষয়ে একমত যে, ফকিহদের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া দীনের মাঝে ভ্রান্তির আশঙ্কা থাকে। মুহাদ্দিসরা যেহেতু ফকিহদের মূল্য ও অবস্থান সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত ছিলেন, একারণে নিজেদের ছাত্রদেরকে ফকিহদের থেকে ইলম অন্বেষণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন। ফকিহ ইমামদের মজলিশের গুরুত্ব উল্লেখ করে তাতে অংশগ্রহণের প্রতি গুরুত্ব দিতেন।

ইবনে আব্দুল বার রহ. আল-ইন্তেকা-তে নিজ সনদে প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস আলী ইবনুল জা'দ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমরা বিখ্যাত মুহাদ্দিস যুহাইর বিন মুয়াবিয়া রহ. এর মজলিশে বসা ছিলাম। ইতোমধ্যে এক ব্যক্তি তার মজলিশে উপস্থিত হলো। তিনি বললেন, কোথা থেকে এসেছো? সে বললো, আমি ইমাম আবু হানিফা রহ. এর মজলিশ থেকে এসেছি। তখন ইমাম যুহাইর রহ. বললেন, একদিন ইমাম আবু হানিফা রহ. এর মজলিশে যাওয়া আমার কাছে একমাস আসার চেয়েও বেশি উপকারী।

যুহাইর বিন মুয়াবিয়া রহ. এমন ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যাকে ইমাম যাহাবি রহ. আল-হাফিজুল হুজ্জা উপাধি দিয়েছেন। তাঁর সম্পর্কে শুয়াইব বিন হারব রহ. এর এ বক্তব্যটি উদ্ধৃত করেছেন যে, আমার কাছে ইমাম যুহাইর ইমাম শু'বা রহ. এর মতো বিশজন মুহাদ্দিস থেকেও বড় হাফিজে হাদিস। অথচ হাদিস শাস্ত্রে ইমাম শু'বা রহ. কে আমিরুল মু'মুমিনিন ফিল হাদিস হিসেবে স্মরণ করা হয়।

তাহযীবু তারিখি ইবনে আসাকির-এ ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর ছেলের উক্তি বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, একদল মুহাদ্দিস ইমাম আবু আসেম যাহহাক বিন মাখলাদের মজলিশে উপস্থিত হলেন। তিনি তাদেরকে বললেন, তোমরা ফিকাহর ইলম অর্জন করো না কেন? তোমাদের মাঝে কোন ফকিহ আছে কি? অত:পর তিনি তাদের সমালোচনা ও নিন্দা করতে লাগলেন। তারা বলল, আমাদের মাঝে একজন ফকিহ রয়েছে। তিনি বললেন, কে? তারা বলল, সে এখনই আসবে। অত:পর যখন আমার পিতা আগমন করলেন, তারা বললো, সে এসেছে। ইমাম আবু আসেম ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ. এর দিকে তাকালেন এবং বললেন, তুমি সামনে এসো। তিনি বললেন, আমি মানুষের উপর দিয়ে অতিক্রম করতে অপছন্দ করি। ইমাম আবু আসেম রহ. বললেন, এটা ফিকাহর আলামত। অতঃপর, বললেন, তোমরা তার জন্য জায়গা করে দাও। তারা জায়গা করে দিলো। তারা ইমাম আহমাদ রহ. কে তাদের সামনে বসালেন এবং তাঁর নিকট একটি মাসআলা পেশ করলেন। তিনি উক্ত মাস-আলার সমাধান প্রদান করলেন। এরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় মাসআলা পেশ করলে তিনি এগুলোরও উত্তর প্রদান করেন। এভাবে তিনি অনেক মাস-আলার সমাধান দান করেন। এতে ইমাম আবু আসেম রহ. আশ্চর্যন্বিত হন।

লক্ষ করুন, কীভাবে ইমাম আবু আসেম রহ. তার মজলিশে উপবিষ্টদেরকে ফিকাহ অর্জনের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন; ফিকাহ অর্জনের প্রতি যিনি মনোনিবেশ করেছেন, তাঁকে কত সম্মান প্রদর্শন করেছেন।

ইমাম আবু আসেম রহ. এর বিখ্যাত উক্তি বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, الرئاسة في الحديث بلا دراية أي تفقه رئاسة نذلة অর্থাৎ হাদিসের বুঝ বা ফিকাহ অর্জন ছাড়া মুহাদ্দিসের আসনে সমাসীন হওয়া একটি অর্থহীন কাজ。

ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ূতী রহ. তাঁর আল-হাবী-তে লিখেছেন, قالت الأقدمون المحدث بلا فقه كعطار غير طبيب فالأدوية حاصلة في دكانه ولا يدري لماذا تصلح والفقيه بلا حديث كطبيب ليس بعطار يعرف ما تصلح له الأدوية إلا أنها ليست عنده অর্থাৎ পূর্ববর্তীগণ বলেছেন, ফিকাহ ব্যতীত মুহাদ্দিসের দৃষ্টান্ত ওষুধ বিক্রেতার ন্যায়; সে ডাক্তার নয়, শুধু ওষুধ বিক্রি করে। তার কাছে তো অনেক ওষুধ রয়েছে, কিন্তু সে জানে না, কোনটার মাধ্যমে আরোগ্য লাভ করবে। হাদিস ছাড়া ফকিহের দৃষ্টান্ত এমন ডাক্তারের ন্যায়, যার কাছে কোন ওষুধ নেই। সে জানে, কোনটার মাধ্যমে আরোগ্য লাভ করবে, কিন্তু এগুলো তার কাছে নেই।

টিকাঃ
৯৫ শরহু ইলালিত তিরমিযি, খ.১, পৃ.৪১৩।
৯৬ হিলইয়াতুল আওলিয়া, খ.৪, পৃ.২২৫।
৯৭ জামেউ বয়ানিল ইলমি ওফাযলিহি, খ.২, পৃ.১৩০।
৯৮ হিলয়াতুল আওলিয়া, খ.৯, পৃ.৩
৯৯ আল-মাজরুহীন, খ.১, পৃ.৪২।
১০০ ইমাম হাযেমী রহ. কৃত শুরুতুল আইম্মাতিল খামসা এর উপর ইমাম যাহেদ আল-কাউসারী রহ. এর টীকা সংযোজন। পৃ.৩৬।
১০১ ইমাম তাজুদ্দিন সুবকী রহ. তাঁর ত্ববকাতে ইমাম আহমাদ বিন সালেহ আল-মিসরী থেকে বর্ণনা করেন, ইমাম আব্দুল্লাহ বিন ওহার রহ. এক লাখ বিশ হাজার হাদীস সংকলন করেন। ত্ববাকাত, খ.২, পৃ.১২৮।
১০২ তারতীবুল মাদারেক, খ.২, পৃ.৪২৭।
১০৩ জামেউ বয়ানিল ইলমি ওয়া ফাজলিহি, খ.২, পৃ.১৭৫।
১০৪ তাযকেরাতুল হুফফায, পৃ.৭৭৬।
১০৫ আল-ফকীহ ওয়াল মুতাফাক্কীহ খ.২, পৃ.৮০।
১০৬ ইমাম হাকেম এটি ইমাম মালেক থেকে মা'রেফাতু উলুমিল হাদীসে বর্ণনা করেছেন। পৃ.৬১। এরপর তিনি লিখেছেন, ইমাম মালেক রহ. খুব অল্প হাদীস বর্ণনা এবং হাদীসের বর্ণনার ব্যাপারে যথেষ্ট রক্ষণশীল থাকা সত্ত্বেও হাদীস বর্ণনা থেকে এতটা সতর্কতা অবলম্বন করছেন। তবে অন্যদের অবস্থা কী হবে, যারা অবলীলায় হাদীস বর্ণনা করে থাকে।
১০৭ 'আল-জামে লিআখলাকির রাবী ও আদাবিস সামে, খ.২, পৃ.১০৯।
১০৮ আত-তামহীদ, খ.১, পৃ.২৬।
১০৯ তিরমিযী শরীফ, খ.৩, পৃ.৩৭২। হাদীস নং ৯৯০।
১১০ আল-ফকীহ ওয়াল মুতাফাক্বীহ, খ.২ পৃ.৮১-৮২। আল-মুহাদ্দিসুল ফাজিল, পৃ.২৪২, ৫৫৯।
১১১ আল-ফকীহ ওয়াল মুতাফাক্বীহ, খ.১ পৃ.৮৩।
১১২ তারতীবুল মাদারেক, খ.১, পৃ.১২৪-১৫।
১১৩ আল-কিফায়া, পৃ.১৬৯।
১১৪ জামেউ বয়ানিল ইলমি ওফাযলিহি, খ.২, পৃ.৯৮।
১১৫ আল-ফকীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ, খ.২, পৃ.১৫-১৯।
১১৬ লাতাইফুল ইশারাত, খ.১, পৃ.৮০, ৯৮।
১১৭ ইমাম হাযেমী রহ. কৃত শুরুতুল আইম্মাতিল খামসা এর উপর ইমাম যাহেদ আল-কাউসারী রহ. এর টীকা সংযোজন। পৃ.৩৬।
১১৮ কিতাবুল জামে, পৃ.১১৭।
১১৯ কিতাবুল জামে', পৃ.১৪৬।
১২০ তারতীবুল মাদারেক, খ.১, পৃ.৬৬।
১২১ আল-ফকীহ ওয়াল মুতাফাক্বীহ। খ.১, পৃ.১৩২।
১২২ ওফায়াতুল আ'য়ান, খ.৩, পৃ.১৮৮-১৮৯।
১২৩ সিয়ারু আ'লামিন নুবালা। খ.১৬, পৃ.৪০৪।
১২৪ তারিখে আবু যুরআ, খ.১, পৃ.২৬৫। আল-মুহাদ্দিসুল ফাজেল, পৃ.৩১৮।
১২৫ আল-মুসাওয়াদা, পৃ.৫৩০।
১২৬ তারতীবুল মাদারেক। খ.২, পৃ.৫৪১।
১২৭ হিলইয়াতুল আওলিয়া, খ.৪, পৃ.৩২৫।
১২৮ ইমাম সারাখসী রহ. তার উসুলুস সারাখসীতে এটি বর্ণনা করেছেন। খ.২, পৃ.১১৩। তার সমযুগীয় আলেম ফখরুল ইসলাম বাযদাবী উসুলুল বাযদাবীতে এটি উল্লেখ করেছেন। পৃ.৫। দেখুন, শরহু আব্দিল আযীয আল-বোখারী আলা উসুলিল বাযদাবী। খ.১, পৃ.১৭-১৮।
১২৯ আল-মুহাদ্দিসুল ফাজিল, পৃ.১৬০।
১৩০ মায়ালিমুস সুনান, খ.১, পৃ.৩।
১৩১ ইবনে বাশকুয়াল কৃত আস-সিলাহ, খ.২, পৃ.৪২৯।
১৩২ মা'রেফাতু উলুমিল হাদীস, পৃ.৬৩।
১৩৩ ফাজলু ইলমিস সালাফ আলাল খালাফ। পৃ.৯।
১৩৪ ফাজলু ইলমিস সালাফ আলাল খালাফ, পৃ.১৩।
১৩৫ [ই'লামুল মুয়াক্বিয়ীন, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৪৪]
১৩৬ শরহুল ইলাল। আল্লামা ইবনে রজব হাম্বলী রহ.। খ.১, পৃ.২৯।
১৩৭ জামেউ বয়ানিল ইলমি ওফাযলিহি, খ.২, পৃ.১৩০।
১৩৮ ই'লামুল মুয়াক্বিয়ীন, খ.১, পৃ.৩০।
১৩৯ মাজমুউল ফাতাওয়া। খ.১০, পৃ.৩২০-৩২১।
১৪০ মানাকিবুল ইমাম আহমাদ। ইমাম ইবুনল জাওযী রহ.। পৃ.১৭৮। আল-মুসাওয়াদা, পৃ.৪০১,৪৮৪। সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, খ.১১, পৃ.২৯৬।
১৪১ সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, খ.১৩, পৃ.৮৯।
১৪২ আল-ফকীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ। খ.১, পৃ.১৩২।
১৪৩ প্রাগুক্ত।
১৪৪ আখবারু আবি হানিফা, আল্লামা সাইমারি (রহঃ), পৃষ্ঠা-১১০-১১]
১৪৫ মা'না কওলীল ইমামিল মুত্তালাবী, খ.২, পৃ.১০২। মাজমুউর রসাইলিল মুনীরিয়া দ্রষ্টব্য।
১৫০ মুসলীম শরীফ। খ.৪, পৃ.৪৩। ইমাম নববী রহ. এর ব্যাখ্যা সম্বলিত। মূল কিতাব, খ.১, পৃ.২৭১-২৭২। হাদীস নং ৯০।
১৫১ বোখারী খ.১, পৃ.৩১০।
১৫২ নাসায়ী শরীফ, খ.১, পৃ.১০৮। হাদীস নং১৮৫। আবু দাউদ শরীফ, খ.১, পৃ.১৩৩। হাদীস নং ১৯২।
১৫৩ মূল বর্ণনাটি ইমাম ইবনে আব্দুল বার রহ. আত-তামহীদে উল্লেখ করেছেন। খ.৩, পৃ.৩৩২-৩৩৪।
১৫৪ উসুলুস সারাখসী, খ.১, পৃ.৩৩৯।
১৫৫ আল-আওসাত, খ.১, পৃ.২২৫।
১৫৬ সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ১৮৫১।
১৫৭ মুসনাদে আহমাদ, খ.১, পৃ.২৫২। ত্বহাবী, খ.২, পৃ.১৮৯।
১৫৮ আল-আওসাত, খ.১, পৃ.৪২। হাদীস নং ২১।
১৫৯ সহীহ মুসলিম, খ.২, পৃ.৯২১। হাদীস নং ২৩৭।
১৬০ গহীহ বোখারী, খ.৩, পৃ.৪৭১। হাদীস নং ১৬০৫।
১৬১ আল্লামা শাতবী কৃত আল-মুয়াফাকাত, খ--৪, পৃষ্ঠা-১৪৪
১৬২ মাকালাতুল কাউসারী, পৃ.২০০-২১৫
১৬৩ মুহাম্মাদ সাঈদ আল-বানী, উমদাতুত তাহকীক ফি মাসআলাতিত তাকলীদ ওয়াত তালফীক, পৃষ্ঠা-৮৬..
১৬৪ সুনানে দারমী, খ--১, পৃষ্ঠা-৯১, মাতবাআতুল ই'তেদাল, দামেস্ক। ১৩৪৯ হিঃ
১৬৫ আল-ইন্তিকা, পৃষ্ঠা-৩৩, আল্লামা ইবনে আব্দুল বার (রহঃ),
১৬৬ আল-মিযানুল কুবরা, খ--১, পৃষ্ঠা-৫১, আল্লামা শা'রানী (রহঃ), আল-মাতবায়াতুল মাইমানিয়‍্যাহ্, ১৩০৬ হিঃ
১৬৭ আল-জাওয়াহিরুল মুজিয়্যা, খ.১, পৃ.১৬৬, ১১৬।
১৬৮ আল-ইন্তেকা, আল্লামা ইবনে আব্দুল বার রহ. পৃ,১৩৪।
১৬৯ তাযকিরাতুল হুফফায, খ.১, পৃ.২৩৩।
১৭০ তাহযীবু তারিখি ইবনি আসাকির, আল্লামা ইবনে বাদরান কৃত। খ.২, পৃ.৩৮
১৭১ আল-মুহাদ্দিসুল ফাজিল, পৃ.২৫৩।
১৭২ আল-হাবী লিল ফাতাওয়া, আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ূতী রহ.। খ.২, পৃ.৩৯৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00