📄 বর্ণনাকারীর ন্যায়পরায়ণতা (রাবির আদালত)
বর্ণনাকারীর ন্যায়পরায়ণতা (রাবির আদালত):
রাবির আদালত তথা ন্যয়পরায়নতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে মতানৈক্য হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, বিষয়টি অত্যন্ত ব্যাপক। বর্ণনাকারীর মাঝে ন্যায়পরায়ণতা প্রমাণের ক্ষেত্রে বেশ মতবিরোধ রয়েছে,
১. বর্ণনাকারী মুসলমান হলে এবং তার সম্পর্কে স্পষ্ট কোন ত্রুটি না পাওয়া গেলে তাঁকে ন্যায়-পরায়ণ গণ্য করা হবে। কিছু কিছু মুহাদ্দিসের নিকট ন্যায়-পরায়ণতা প্রমাণের জন্য এটুকু যথেষ্ট।
২. কিছু মুহাদ্দিসের নিকট ত্রুটি না পাওয়া ও মুসলমান হওয়া-ই যথেষ্ট নয় বরং সুস্পষ্টভাবে বর্ণনাকারী ন্যায়পরায়ণ প্রমাণিত হতে হবে। বর্ণনাকারীর সম্পর্কে স্পষ্ট ত্রুটি না পা গেলে তাকে মাস্তুর বলে।
৩. অনেকের মতে ন্যায়-পরায়ণ সাব্যস্ত হওয়ার জন্য তার বাহ্যিক ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ন্যায়পরায়ণতা প্রমাণিত হওয়া আবশ্যক।
৪. বর্ণনাকারী ন্যায়-পরায়ণ প্রমাণিত হওয়ার জন্য তার সম্পর্কে কতজন ইমামের বক্তব্য জরুরি? এবিষয়েও মতবিরোধ রয়েছে। কারও মতে একজন ইমামের পক্ষ থেকে ন্যায়পরায়ণ সাব্যস্ত হলেই তা যথেষ্ট। আবার কেউ কেউ বলেন, ন্যায়-পরায়ণ সাব্যস্ত হওয়ার জন্য একাধিক ইমামের বক্তব্য প্রয়োজন।
এ বিষয়গুলোর সঙ্গে আরেকটি মতবিরোধপূর্ণ বিষয়ও যোগ করা যায়। কোন্ কোন্ বিষয় একজন মুসলমানের ত্রুটি হিসেবে গণ্য হবে? এক্ষেত্রে কিছু অপ্রীতিকর বিষয় রয়েছে, যা এখানে আলোচনা করা সংগত নয়।
অনেক বর্ণনাকারী শুধু একারণে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন যে, তিনি ইরাকের অধিবাসী আহলুর রায় বা ফকিহ। অথবা তিনি কুরআন সৃষ্ট হওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। এবিষয়গুলো অনুধাবন এবং তা থেকে বেঁচে থাকা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না। যারা এ বিষয়ের ইতিহাস গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছেন এবং উলুমুল হাদিসে পান্ডিত্য অর্জন করেছেন, তারাই কেবল এ থেকে বেঁচে থাকেন। প্রায়ই আমি ছাত্রদেরকে এ বিষয়ে সতর্ক করে থাকি। তারা যেন জারাহ তা'দীলের ইতিহাস, সূক্ষ্মতা ও এর মাঝে বহিরাগত বিষয়ের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখে। বৃহৎ কলেবরের গ্রন্থগুলোতে ব্যবহৃত শব্দ ও ইঙ্গিতের মর্ম উপলব্ধির পাশাপাশি এগুলোর প্রতি সতর্ক থাকা খুবই জরুরি। কিছু কিতাব রয়েছে বড় বড় কিতাবের সার-নির্যাস ও সংক্ষিপ্তরূপ। যেমন, আত-তাকরীব। যারা শুধু এগুলোর এর উপরই নির্ভর করে হাদিসকে সহিহ-যয়িফ বলে তাদের অজ্ঞতা সম্পর্কে বলার কিছু নেই।
বর্ণনাকারীদেরকে ন্যায়-পরায়ণ সাব্যস্তের ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসদের মাঝে প্রচুর মতবিরোধ রয়েছে। কিছু মুহাদ্দিস কোন বর্ণনাকারীকে সহিহ বললেও অন্যান্য মুহাদ্দিস তাকে যয়িফ বলেছেন। এধরণের মতবিরোধপূর্ণ বর্ণনাকারীর সংখ্যা অনেক। সুতরাং সর্বসম্মতিক্রমে ন্যায়-পরায়ণ বা যয়িফ রাবির সংখ্যা মতানৈক্যপূর্ণ রাবির তুলনায় অনেক কম।
পূর্বে মতবিরোধের বিভিন্ন প্রকার ও দিক উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলোর মাঝে একটি বিষয় মতানৈক্যের পরিধিকে ব্যাপক বিস্তৃত করে। দেখা যায়, মতবিরোধপূর্ণ একজন রাবি থেকে দশটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। যেসব মুহাদ্দিস তাকে ন্যায়-পরায়ণ সাব্যস্ত করেছেন, তারা দশটি হাদিসই গ্রহণ করেছেন। এভাবে তাদের নিকট এই বর্ণনাকারীর সব হাদিস দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য। তারা এর থেকে বিধি-বিধান আহরণ করেন। পক্ষান্তরে যেসব মুহাদ্দিস তাকে যয়িফ সাব্যস্ত করেছেন, তারা এই বর্ণনাকারীর সব হাদিস প্রত্যাখ্যান করেছেন।
আর এভাবেই বিভিন্ন মতবিরোধের সূত্রপাত হয়েছে। প্রত্যেক ইমামই দাবি করেন যে, তিনি হাদিস দ্বারা দলিল দিয়েছেন। প্রয়োজনের ক্ষেত্রে হাদিসের মাঝে সমন্বয় সাধন করেছেন। হাদিস বা ফিকহি ইজতেহাদে তিনি মুহাদ্দিসদের নীতি ও অনুসৃত পথের উপর রয়েছেন। ফলে আমাদের কারও পক্ষে তাদের বক্তব্য প্রত্যাখ্যানের সুযোগ থাকে না।
একইভাবে সহিহ হাদিসের অন্যান্য শর্ত প্রমাণের ক্ষেত্রে মতানৈক্য হয়েছে। যেমন, রাবির যবত (আয়ত্বশক্তি) প্রমাণিত হওয়ার ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফা রহ. এর দেয়া শর্তটি উল্লেখ করা সমীচীন। ইমাম আবু হানিফা রহ. শর্ত দিয়েছেন, বর্ণনাকারী হাদিস শোনার সময় থেকে অন্যের নিকট পৌঁছানো পর্যন্ত তা মুখস্থ রাখা জরুরি। এবং মধ্যবর্তী সময়ে সে হাদিসটি কখনও ভুলবে না।
এটি একটি কঠিন শর্ত। রাবিদের বর্ণনায় অসামঞ্জস্যতা (ইজতেরাব) ও হাদিসের ব্যাপারে মানুষের যথেচ্ছা হস্তক্ষেপ দেখে তিনি এ শর্ত যোগ করেছেন। শর্তটির কারণে অনেক হাদিসের ক্ষেত্রে সহিহ ও যয়িফ নির্ণয়ে অন্যদের সাথে ইমাম আবু হানিফার রহ. এর মতবিরোধ হয়েছে।
এই সূক্ষ্ম আলোচনা দ্বারা কোন্ কোন্ মূলনীতির উপর ভিত্তি করে হাদিসকে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করা হয়, সে সম্পর্কে সামান্য ধারণা সৃষ্টি হয়েছে বলে আশা রাখি। এর মাধ্যমে শায়খ আব্দুল ওয়াহাব খাল্লাফের অসার বক্তব্যের বাস্তবতা উপলব্ধি করতে সহজ হবে। তিনি তার 'মাসাদিরুত তাশরী ফিমা লা নাসসা ফিহি' নামক কিতাবে লিখেছেন,
فَكُلُّ حَدِيْثٍ : مِنَ المُيْسُوْرِ مَعْرِفَةُ أَنَّهُ مُتَوَاتِرٌ أَوْ غَيْرُ مُتَوَاتِرٍ وَ صَحِيحٌ أَوْ حَسَنٌ أَوْ ضَعِيفٌ
অর্থাৎ হাদিসের স্তর নির্ণয় করা অনেক সহজ। মুতাওয়াতির, গাইরে মুতাওয়াতির, সহিহ, হাসান কিংবা যয়িফ সে যাই হোক।
কিতাবটি পাঠক মহলে প্রচারিত না হলে এবং মানুষের হাতে হাতে না পৌঁছলে এ বিষয়ে সতর্ক করার কোন প্রয়োজন ছিল না।
আখবারু আবি হানিফা ও আসহাবিহী-তে আলামা সাইমারি রহ. উল্লেখ করেছেন, 'একদা ঈসা ইবনে হারুন রহ. আব্বাসীয় খলিফা মামুনের নিকট বেশ কিছু হাদিস লেখা একটি কিতাব নিয়ে এলেন। তিনি বললেন,
هذه الأحاديث سمعتها معك من المشايخ الذين كان الرشيد يختارهم لك، و قد صارت غاشية مجلسك الذين يخالفون هذه الأحاديث - يريد أصحاب أبي حنيفة - فإن كان ما هؤلاء علي الحق: فقد كان الرشيد فيما يختار لك علي الخطأ، وإن كان الرشيد علي الصواب : فينبغي لك أن تنفي عنك أصحاب الخطأ.
অর্থাৎ (হে খলিফাতুল মুসলিমীন) খলিফা হারুনুর রশিদ আপনার জন্য কিছু মুহাদ্দিস নির্বাচন করেছিলেন। তাঁদের কাছ থেকে আপনি ও আমি এই হাদিসগুলো শুনেছি। অথচ আপনার সভাসদবর্গ এসব হাদিসের বিরোধিতা করে থাকে। (এর দ্বারা তিনি ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এর অনুসারীদেরকে উদ্দেশ্য নিয়েছেন)। এরা যদি সঠিক হয়, তবে খলিফা হারুনুর রশিদের পক্ষ থেকে আপনার জন্য নির্বাচিত মুহাদ্দিসগণ ভুল সাব্যস্ত হবেন। আর মুহাদ্দিসগণ যদি সত্যের উপর থাকেন, তবে সভাসদবর্গকে দরবার থেকে বের করে দেয়া উচিত।
বাদশাহ মামুন তার কাছ থেকে কিতাবটি নিয়ে বললেন,
لعل للقوم حجة و أنا سائلهم عن ذلك.
"হয়ত তাদের নিকট শক্তিশালী কোন দলিল রয়েছে। এ সম্পর্কে আমি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করবো”
এরপর তিনি ঈসা ইবনে হারুন রহ. এর দেয়া কিতাবটি একের পর এক তিন ব্যক্তিকে দিলেন। কেউ তাঁকে সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারল না। সংবাদটি ঈসা ইবনে আবান রহ.এর কাছে পৌঁছলো। তিনি পূর্বে খলিফা মামুনুর রশিদের দরবারে আসতেন না। এ ঘটনা শুনে তিনি 'আল- হুজ্জাতুস সগীর' নামে একটি কিতাব লেখেন। এ কিতাবে তিনি তাদের অভিযোগগুলো সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করেন। তিনি হাদিসের প্রকারভেদ, হাদিস বর্ণনার পদ্ধতি, বিরোধপূর্ণ হাদিসের কোনটি গ্রহণযোগ্য ও কোনটি পরিত্যাজ্য এবং পরস্পরবিরোধী হাদিসের ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। প্রত্যেক হাদিসের জন্য একটি অধ্যায় বা পরিচ্ছেদ তৈরি করেন। প্রত্যেক পরিচ্ছেদে ইমাম আবু হানীফার রহ. মাজহাব, তাঁর দলিল, এ সম্পর্কিত হাদিস ও কিয়াস উল্লেখ করেন। কিতাবটি খলিফা মামুনের হাতে পৌঁছলে তিনি তা পড়ে বললেন,
هذا جواب القوم اللازم لهم.
"এটা তাদের পক্ষ থেকে সমুচিত জওয়াব।”
এরপর তিনি নীচের কবিতা আবৃত্তি করেন,
حسدوا الفتي إذا لم ينالوا سعيه فالناس أعداء لها و خصوم كضرائر الحسناء قلن لزوجها حسدا و بغيا: إنه لذميم
“লোকেরা সেই যুবকের মর্যাদা ও উচ্চাসন লাভ করতে না পেরে তাঁর সাথে শত্রুতা ও বিদ্বেষ পোষণ করছে। যেমন নারীরা হিংসা ও বিদ্বেষ বশত তাদের সুন্দরী সতিনের মন্দচারিতা স্বামীর কাছে প্রকাশ করে থাকে।”
হাদিসের ব্যাপারে ফকিহগণের মাঝে মতবিরোধের তৃতীয় বিষয় হল, হাদিসের উপর আমল করার জন্য হাদিসটি সহিহ হওয়া জরুরি কি না?
উলামায়ে কেরামের মধ্যে এ ব্যাপারে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, হাদিস সহিহ কিংবা হাসানের স্তরে উন্নীত হলে তা দ্বারা সর্বসম্মতিক্রমে দলিল দেয়া বৈধ। এর উপর আমল করাও সিদ্ধ। আর যয়িফ হাদিস ফাযায়েল ও মোস্তাহাব বিষয়ের ক্ষেত্রে আমলযোগ্য। এটিই অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের অভিমত।
অধিকাংশ ফকিহ যয়িফ হাদিসকে শরয়ী আহকাম তথা হালাল-হারাম ইত্যাদির জন্য প্রমাণ হিসেবে পেশ করার পক্ষে রায় দিয়েছেন। তারা যয়িফ হাদিসকে কিয়াসের তুলনায় শক্তিশালী মনে করেন। আর কিয়াস হল, শরিয়তের চার দলিলের একটি। আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের নিকট কিয়াস শরিয়তের অকাট্য দলিল। এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।
তিন ইমাম তথা ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালেক ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. যয়িফ হাদিসের উপর আমলের পক্ষে মতামত দিয়েছেন। মুহাদ্দিসদের কেউ কেউ এ মত গ্রহণ করেছেন। যেমন, আবু দাউদ, নাসায়ী, ইবনে আবি হাতেম রহ. তবে যয়িফ হাদিস গ্রহণের ক্ষেত্রে দুটি শর্ত রয়েছে।
১. মারাত্মক পর্যায়ের যয়িফ না হওয়া।
২. সংশিষ্ট মাস-আলায় যয়িফ হাদিস ব্যতীত অন্য কোন হাদিস না থাকা।
আল্লামা ইবনে হাযাম রহ. যয়িফ হাদিস দলিল হওয়ার মতটি গ্রহণ করেছেন। আল্লামা ইবনে হাযাম রহ. তাঁর বিখ্যাত কিতাব আল- মুহালা-তে লিখেছেন,
و هذا الأثر في دعاء القنوت وإن لم يكن مما يحتج بمثله، فلم نجد فيه عن رسول الله صلي الله عليه و سلم غيره. و قد قال أحمد ابن حنبل رحمه الله : ضعيف الحديث أحب إلينا من الرأي. قال علي و هو إبن حزم -: وبهذا نقول
আলোচ্য হাদিসটি দুয়ায়ে কুনুতের দলিল। যদিও এ ধরনের হাদিস দ্বারা দলিল পেশ করা ঠিক নয়। তবে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যেহেতু এ বিষয়ে অন্য কোন হাদিস আমাদের নিকট পৌঁছয়নি, এজন্য আমরা এর মাধ্যমে দলিল দেই। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেন, আমাদের নিকট কিয়াসের তুলনায় যয়িফ হাদিস অগ্রগণ্য। আল্লামা ইবনে হাযাম রহ. বলেন, 'এটি আমাদেরও মত।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর ছেলে আব্দুল্লাহ রহ. বলেন, আমি আমার পিতাকে জিজ্ঞাসা করলাম, কোন শহরে সহিহ ও যয়িফ হাদিসের পার্থক্য নির্ণয়ে অপারগ একজন মুহাদ্দিস এবং আরেকজন যুক্তিনির্ভর আলেম আছেন। কেউ যদি কোন সমস্যার সম্মুখীন হয় তবে সে কার শরনাপন্ন হবে? তিনি উত্তর দিলেন,
يسأل صاحب الحديث و لا يسأل صاحب الرأي. ضعيف الحديث أقوي من الرأي
সে মুহাদ্দিসের কাছে জিজ্ঞাসা করবে। যে কিয়াসের ভিত্তিতে মাসআলা দেয়, তার নিকট জিজ্ঞাসা করবে না। কারণ কিয়াসের তুলনায় যয়িফ হাদিস অধিক শক্তিশালী।
ইমাম শাফেয়ি রহ. কোন মাস-আলার ক্ষেত্রে সহিহ হাদিস না পেলে মুরসাল হাদিস দিয়ে দলিল দিতেন। অথচ ইমাম শাফেয়ির রহ. নিকট মুরসাল হাদিস যয়িফ হাদিসের অন্তর্ভুক্ত। আলামা মাওয়ারদি রহ. এর সূত্রে আল্লামা সাখাবি রহ. বিষয়টি ফাতহুল মুগীছে উল্লেখ করেছেন।
শায়খ আব্দুলাহ সিদ্দিক আল-গুমারী রহ. আর-রাদ্দুল মুহকামুল মাতিন-এ লিখেছেন,
و قولهم: الحديث الضعيف لا يعمل به في الأحكام ليس علي إطلاقه كما يفهمه غالب الناس أو كلهم...
"যয়িফ হাদিস আমল যোগ্য নয়”, মুহাদ্দিসদেরম এই বক্তব্য বাহ্যিক অর্থে নেয়া ঠিক নয়। সাধারণ অনেকেই এমনটি বুঝে থাকে। আমাদের কুতুবখানায় আল-মিয়ার এর একখানা হস্তলিপি আছে। অষ্টম শতাব্দীর কোন এক হাফেযে হাদিস এর সঙ্কলক। কিতাবটি তিনি ফিকহি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করেছেন। প্রত্যেক পরিচ্ছেদে সেসব যয়িফ হাদিস উল্লেখ করেছেন যেগুলো দিয়ে চার ইমাম বা তাঁদের কেউ দলিল দিয়েছেন। সেই সাথে তিনি হাদিস যয়িফ হওয়ার কারণ উল্লেখ করেছেন। হাদিস যয়িফ হওয়ার গ্রহণযোগ্য ত্রুটিস সম্পর্কেও আলোচনা করেছেন। কিতাবটি খুবই মূল্যবান। এটি সংকলকের প্রচুর হিফয এবং হাদিস, ফিকাহ ও মতানৈক্যপূর্ণ বিষয়ে গভীর পান্ডিত্যের প্রমাণ। আমার মনে হয় এর সংকলক আল্লামা ইবনুল মুলাক্কিন (রহ)।
যয়িফ হাদিসের উপর আমলের বিশেষ কিছু ক্ষেত্র রয়েছে। যেমন, পরস্পর বিরোধী দু'টি হাদিসের কোন একটিকে প্রাধান্য দেয়ার জন্য যদি শুধু যয়িফ হাদিস থাকে তাহলে উক্ত যয়িফ হাদিস গ্রহণযোগ্য হবে। এটি পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অধিকাংশ আলেমের অভিমত।
ইমাম বাইহাকি রহ. তার 'আল-মাদখাল ইলা দালা-ইলিন নবুওয়্যাহ' এর পরিশিষ্টে উল্লেখ করেছেন, [এটি আদ-দালাইল গ্রন্থের শুরুতে মুদ্রিত হয়েছে]
أَرَدْتُ وَ المِشِيئَةُ لِلَّهِ تَعَالِيَ أَنْ أَجْمَعَ بَعْضَ مَا بَلَغَنَا مِنْ مُعْجِزَاتِ نَبِيِّنَا مُحَمَّدٍ صلي الله عليه و سلم وَ دَلَائِلِ نُبُوَّتِهِ ... عَلَي نَحْوِ مَا شَرَطْتُ فِي مُصَنَّفَاتِي مِنَ الإِكتِفَاء بِالصَّحِيحِ مِنَ السَّقِيمِ وَ الإِجْتِزَاءُ بِالْمَعْرُوْفِ مِنَ الغَرِيْبِ، إِلا فِيما لا يَتَّضِحُ المراد من الصَّحِيح أوِ المَعْرُوْفِ دُونه ، فَأُوْرِدُه ، وَالإِعْتِمَادُ على جُمْلَةِ مَا تَقَدَّمَ من الصَّحِيحِ أَوِ المعروف عِنْدَ أَهْلِ المَغَازِي وَ التَّوَارِيخ
নবিজি সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যেসব মু'জেযা ও নবুওয়াতের প্রমাণ আমাদের কাছে পৌঁছেছে সেগুলো একত্র করার ইচ্ছা করেছি। এ বিষয়ে আল্লাহর অনুগ্রহ প্রার্থনা করছি। এক্ষেত্রে নির্ধারিত কিছু শর্তের আলোকে বর্ণনাগুলো সংকলন করবো। দুর্বল হাদিসের পরিবর্তে শুধু সহিহ হাদিস এবং গরীব হাদিসের পরিবর্তে শুধু মা'রুফ হাদিস উল্লেখ করবো। তবে কোন ক্ষেত্রে যদি শুধু সহিহ ও মা'রুফ হাদিস দ্বারা উদ্দিষ্ট অর্থ স্পষ্ট না হয় তবে নিস্তরের সেসব হাদিস উল্লেখ করবো যেগুলো ইতিহাস ও মাগাযী বিশারদদের (রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুদ্ধের বিষয়ে অভিজ্ঞ) কাছে সহিহ অথবা মা'রুফ।
ইমাম বাইহাকি রহ. সুনানুল কুবরা-তে নামাজি ব্যক্তির সামনে সুতরা এর পরিবর্তে দাগ টেনে দেয়ার অধ্যায়ে একজন রাবির নামের বিষয়ে মতবিরোধ উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, 'ইমাম শাফেয়ি রহ. তাঁর পূর্বের মাজহাব অনুযায়ী এ হাদিস দিয়ে দলিল দিয়েছেন। নতুন মাজহাবের ক্ষেত্রে তিনি তাওয়াক্কুফ করেছেন অর্থাৎ মতামত পেশ করা থেকে বিরত থেকেছেন। বুওয়াইতীর কিতাবে তিনি লিখেছেন, নামাজি ব্যক্তি হাদিসটি বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নিজের সামনে রেখা অঙ্কন করবে না। তবে হাদিসটি যদি প্রমাণিত হয়, তখন এর উপল আমল করবে। সম্ভবত রাবির নামের মতবিরোধেরে বিষয়ে তিনি অবগত হয়েছিলেন। সুতরাং এ ধরনের ফয়সালা দেয়াতে কোন অসুবিধা নেই।
মুকাদ্দামায়ে ইবনুস সালাহে ইমাম বাইহাকি রহ. এর বক্তব্যের উপর নির্ভর করে উক্ত হাদিসকে মুজতারাব হাদিসের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। [উলুমুল হাদিস, ১৯তম প্রকার]।
ইমাম নববি রহ. আল-মাজমু-তে লিখেছেন,
وَالتَّرْجِيحُ بِالمُرسَل جائز
মুরসাল হাদিস দ্বারা বিরোধপূর্ণ বিষয়ে প্রাধান্য দেয়া বৈধ।
অথচ সর্বজনবিদিত বিষয় হলো, ইমাম নববি রহ. মুরসাল হাদিসকে যয়িফ মনে করেন।
ইমাম ইবনে জুযাই আল-কালবী মালেকি মাজহাবের বিখ্যাত আলেম ছিলেন। তিনি প্রসিদ্ধ তাফসীরগ্রন্থ আত-তাসহীল এর ভূমিকায় মুফাসসিরদের বিরোধপূর্ণ বক্তব্যের কোন একটিকে প্রাধান্য দেয়ার বারোটি পদ্ধতি আলোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন,
فَإِذَا وَرَدَ عَنهُ عَلَيْهِ السلام تَفْسِيرُ شَيْءٍ مِنَ القُرْآن عَوَّلْنَا عَلَيْهِ وَ لَا سِيَّمَا إِنْ وَرَدَ فِي الحَدِيْثِ الصَّحِيحِ
অর্থাৎ রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কুরআনের কোন তাফসীর বর্ণিত হলে আমরা তা গ্রহণ করি। বিশেষভাবে যখন তা সহিহ সূত্রে বর্ণিত হয়।
তিনি 'বিশেষভাবে সহিহ সূত্র' কথাটি উল্লেখ করেছেন। এর স্পষ্ট বোঝা যায় যে, যয়িফ হাদিস দ্বারাও বিরোধপূর্ণ বক্তব্যকে একটির উপর অপরটিকে প্রাধান্য দেয়া বৈধ।
আলামা ইবনুল কাইয়্যিম রহ. তুহফাতুল মাউদুদ- এ সূরা নিসার ذَلِكَ أَدْنِي أَنْ لَا تَعُوْلُوْا আয়াতের আউল শব্দের অর্থের ভিন্নতা উল্লেখ করেছেন। আউল এর একটি অর্থ হলো, সম্পদ বৃদ্ধি পাওয়া। ইমাম শাফেয়ি রা. এই অর্থ উল্লেখ করেছেন। আউলের আরেকটি অর্থ হলো, জুলুম-অত্যাচার করা, যা অধিকাংশ মুফাসসিরের অভিমত।
ইবনুল কাইয়্যিম রহ. অধিকাংশ মুফাসসিরের বক্তব্যকে ক'টি কারণে প্রাধান্য দিয়েছেন। একটি কারণ হল, এঅর্থটি একটি হাদিস দ্বারাও প্রমাণিত। যদিও হাদিসটি গরীব, তবে তা প্রাধান্য দেয়ার যোগ্য। হাদিসটি হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ا أَنْ لَا تَحُوْرُوا
ইবনে হিব্বান রহ. হাদিসটি মারফু সূত্রে বর্ণনা করেছেন। অথচ আবু হাতেম রাযি র. হাদিসটি মারফু বলাকে ভুল সাব্যস্ত করেছেন। তিনি হাদিসটিকে হজরত আয়েশার রা. উপর মাউকুফ বলে উল্লেখ করেছেন। পূর্ববর্তী অধিকাংশ মুহাদ্দিস থেকে মতটি বর্ণিত হয়েছে। অথচ আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেছেন, হাদিসটি প্রাধান্য দেয়ার যোগ্য।
হানাফি মাজহাবের বিশিষ্ট আলেম, গবেষক আল্লামা ইউসুফ বাননূরী রহ. তাঁর অসাধারণ গ্রন্থ মা'আরিফুস সুনানে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দাঁড়িয়ে পেশাবের কারণসমূহ বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, لِعِلَّةٍ كَانَتْ بِبَاطِنِ رَكْبَتِهِ অর্থাৎ রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাঁটুতে ব্যথা ছিল। এজন্য তিনি দাঁড়িয়ে পেশাব করেছিলেন। ইমাম বাইহাকি রহ. এর সুনানে এবিষয়ে একটা বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। হাদিসটি যদিও যয়িফ, তবে তা কারণ বর্ণনার জন্য যথেষ্ট।
টিকাঃ
২৪ মোল্লা আলী ক্বারী র. কৃত শরহু মুসনাদি আবি হানীফা রহ. পৃ.৩। ত্বহাবীর সূত্রে মোল্লা আলী ক্বারী রহ. এটি উল্লেখ করেছেন। আল-মাদখাল ফি উসুলিল হাদীস, পৃ.১৫।
২৫ মাসাদিরুত তাশরী ফিমা লা নাসসা ফিহি, পৃ.১৫।
২৬ মিরকাতুল মাফাতিহ শরহু মিশকাতিল মাসাবিহ, খ.১, পৃ.১৯। হানাফী মাযহাবের বিখ্যাত ইমাম আল্লামা ইবনে হুমাম রহ. ফাতহুল কাদীরে লিখেছেন, الإستحباب يثبت بالضعيف غير الموضوع অর্থাৎ যয়ীফ হাদীস দ্বারা মুস্তাহাব সাব্যস্ত হবে, তবে জাল হাদীস দ্বারা মুস্তাহাব সাব্যস্ত হবে না। ফাতহুল ক্বাদীর, খ.১, পৃ.৪১৭। এটি হানাফী মাযহাবের প্রাচীন উসূলবিদগণের অভিমত। যেমন আল্লামা সারাখসী র. তার উসুলুস সারাখসী-তে এটি উল্লেখ করেছেন, খ.২, পৃ.১১৩। শাফেয়ী মাযহাবের প্রখ্যাত আলেম ইমাম নববী র. তাঁর কিতাবুল আযকার-এ লিখেছেন, قال العلماء من المحدثين و الفقهاء و غيرهم: يجوز العمل في الفضائل و الترغيب و الترهيب بالحديث الضعيف ما لم يكن موضوعاً، و أما الأحكام كالحلال و الحرام و البيع و النكاح و الطلاق و غير ذلك. فلا يعمل فيها إلا بالحديث الصحيح أو الحسن إلا أن يكون في إحتياط في شيء من ذلك كما إذا ورد حديث ضعيف بكراهة بعض البيوع أو الأنكحة فإن المستحب أن يتنزه عنه و لكن لا يجب
মুহাদ্দিস, ফকীহ ও অন্যান্য উলামায়ে কেরাম বলেছেন, ফযীলত, তারগীব (উৎসাহমূলক) ও তারহীব (ভীতি প্রদর্শক) বিষয়ের ক্ষেত্রে যয়ীফ হাদীসের উপর আমল করা বৈধ। তবে হাদীসটি জাল হলে তার উপর আমল বৈধ হবে না। অবশ্য বিধি-বিধান যেমন হালাল-হারাম, ক্রয়-বিক্রয়, বিবাহ ও তালাক ইত্যাদি ক্ষেত্রে সহীহ অথবা হাসান হাদীস ব্যতীত অন্য হাদীসের উপর আমল করা হবে না। তবে বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে অধিক সতর্কতা প্রমাণের জন্য দুর্বল হাদীস দ্বারা প্রমাণ পেশ করা যাবে। যেমন, কোন বিবাহ কিংবা ক্রয়-বিক্রয়কে মাকরুহ সাব্যস্তকারী কোন যয়ীফ হাদীস বর্ণিত হলে উক্ত ক্রয়-বিক্রয় বা বিবাহ থেকে বিরত থাকা মুস্তাহাব। তবে এটি ওয়াজিব নয়। আল-আযকার, পৃ.৭-৮। = মালেকী মাযহাবের বিখ্যাত উসুলে ফিকহের কিতাব নাশরুল বুনুদ আলা মারাকিস সউদ, ২/৬৩- তে রয়েছে, فائدة: علم من إحتجاج مالك و من وفقه بالمرسل أن كلا من المنقطع و المعضل حجة عندهم لصدق المرسل بالمعني الأصولي علي كل منهما
ফায়দা: ইমাম মালেক রহ. ও একই মতের অনুসারী অন্যান্য আলেমের মুরসাল হাদীস দ্বারা দলিল প্রদানের দ্বারা বোঝা গেল, মুনকাতে ও মু'জাল উভয় প্রকার হাদীস তাদের নিকট দলিল। কেননা, উভয়টিই মূলের বিবেচনায় মুরসালের অন্তর্ভুক্ত।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. থেকে এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন উক্তি রয়েছে। ইবনুজ নাজ্জার আল-হাম্বলী রহ. শরহুল কাউকাবুল মুনীর- এ (৫৭৩/২) ইমাম আহমাদ রহ. এর নীচের বক্তব্য দ্বারা আলোচনা শেষ করেছেন। طريقي لست أخالف ما ضعف من الحديث إذا لم يكن في الباب ما يدفعه
আমার নীতি হলো, আমি যয়ীফ হাদীসের বিরোধীতা করি না। তবে যদি যয়ীফ হাদীসের বিপরীতে শক্তিশালী দলিল থাকে তাহলে তা গ্রহণ করি।
ইবনে হাযাম রহ. ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. থেকে এজাতীয় বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে। এজন্য দেখুন, ই'লামুল মুয়াক্বিয়ীন, খ.১, পৃ.৩১।
২৭ ইমাম সাখাভী কৃত ফাতহুল মুগীস, খ.১, পৃ.৮০, ২৬৭ ও অন্যান্য উলুমুল হাদীসের কিতাব। নাসায়ী শরীফের উপর ইমাম সিন্ধী রহ. এর শরাহ, হাশিয়াতুস সিন্ধী আলা সুনানিন নাসায়ী, খ.১, পৃ.৬। আল-জারহু ওয়াত তা'দীল, আল্লামা ইবনে আবি হাতিম, খ.৮, পৃ.৩৪৭। ইমাম নববী রহ. তাহযীবুল আসমা ওয়াল লুগাত-এ (২/৮৬) ইবনে আবি হাতিম রহ. এর সম্পূর্ণ বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। তিনি মনে করেছেন, এটি ইবনে আবি হাতিম এর বক্তব্য। অথচ এটি তার পিতা আবু হাতিম রহ. এর বক্তব্য।
২৮ আল-মুহাল্লা, খ--৪, পৃষ্ঠা-১৪৮
২৯ আল-মুহাল্লা, আল্লামা ইবনে হাযাম (রহঃ) খ.১, পৃ.৬৮, ইমাম সাখাবী (রহঃ) ফাতহুল মুগীসে এধরনের বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। ফাতহুল মুগীছ, খ.১, পৃ.৮০, ই'লামুল মুয়াক্বিয়ীন, আল্লামা ইবনুল কায়্যিম (রহঃ), খ.১, পৃ.৩১
৩০ ফাতহুল মুগীছ, খ.১, পৃ.৮০, ১৪২,২৬৮
৩১ পৃ.১৯৩। আল-মি'য়ার কিতাবটি তাজুদ্দিন আবুল হাসান আলী ইবনে আবি মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ ইবনে হাসান বিন আবু বকর আল-উরদুবিলি আত-তিবরীযি (৬৭৭-৭৪৬ হিঃ) রহ. এর। ইমাম সুবকী রহ. তাবাকাতুশ শাফেইয়্যা- তে তার জীবনী আলোচনা করেছেন। খ.১০, পৃ.১৩৭। ইবনে হাজার আসকালানী রহ. আদ-দুরারুল কামিনা-তেও তাঁর জীবন আলোচনা করেছেন। খ.৩, পৃ.৭২।
৩২ আদ-দালাইল, খ.১, পৃ.৯৬।
৩৩ সুনানুল কুবরা। খ.২, পৃ.২৭১।
৩৪ আল-মাজমু। খ.১, পৃ.১০০।
৩৫ তুহফাতুল মউদুদ, পৃ.২৯-৩০।
৩৬ আল-ইহসান, খ.৯ পৃ.৩৩৮। হাদীস নং ৪০২৯।
📄 আরবি ভাষাগত দিক থেকে হাদিস সংরক্ষণ
এবিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি যে, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদিসের শব্দটি কীভাবে বলেছেন। মারফু (পেশসহ), মানসুব (জবরসহ) নাকি মাজরুর (যেরসহ) । সকলেই অবগত যে সূক্ষ্মতার বিবেচনায় আরবি ভাষা অতুলনীয়। ব্যাকরণ বা শব্দগত সামান্য পরিবর্তনে মূলভাবের পরিবর্তন হয়। ফলে বিধি-বিধানেও ব্যাপক পরিবর্তন আসে।
এই বিষয়ে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা তখনই প্রকট হয় যখন দুই বা ততোধিক রাবির বর্ণনায় মতানৈক্য দেখা দেয়। এক্ষেত্রে একটি শব্দের বিভিন্ন সম্ভাবনার মাঝে কোন একটাকে সুনির্দিষ্ট করা গেলে মতবিরোধের পথ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু কোন একটিকে সুনির্দিষ্ট করা সম্ভব না হলে ফিকহি মতানৈক্যও চলতে থাকে।
সংশিষ্ট বিষয়ে ইমাম ইবনে কুতাইবা রহ. এর অতুলনীয় একটি আলোচনা রয়েছে। বিশেষভাবে এর গুরুত্ব উপলব্ধি করার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু উদাহরণসহ আলোচনাটি তুলে ধরছি,
আল্লামা ইবনে কুতাইবা র. তাঁর 'তা'বিলু মুশকিলিল কুরআন'-এর শুরুতে লিখেছেন,
"আল্লাহ তায়ালা আরবদেরকে ই'রাবের এমন একটি নেয়ামত দান করেছেন, যা তাদের ভাষা-সৌন্দর্য এবং শব্দ-বিন্যাসের জন্য অলঙ্কার স্বরূপ। কখনও একই জাতীয় দু'টি বাক্য বা ভিন্ন দু'টি অর্থের মধ্যে পার্থক্য করার জন্য এগুলো কাজে লাগে। যেমন, কর্তা ও কর্মপদ উভয়ের দিকে যখন ক্রিয়াপদের সম্পৃক্ততার সম্ভাবনা থাকে, তখন ই'রাবই কেবল উভয়টির মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে। যদি বক্তা তানবিনসহ এভাবে বলে, هَذَا قَاتِلٌ أَخِي, তখন এ শব্দের তানবিন প্রমাণ করে যে, লোকটি তার ভাইকে এখনও হত্যা করেনি। কিন্তু যদি তানবিন ছাড়া ইযাফাতের সাথে এভাবে বলে, هَذَا قَاتِلُ أَخِي তখন তানবিন না থাকাটা প্রমাণ করে যে, এ লোকটি তার ভাইকে হত্যা করে ফেলেছে। কুরআনের এ আয়াতটির ক্ষেত্রে-
فَلَا يَحْزُنُكَ قَوْهُمْ، إِنَّا نَعْلَمُ مَا يُسِرُّوْنَ وَ مَا يُعْلِنُوْنَ
কেউ إِنَّ (ইন্না) এর স্থলে আন্না পড়লে অর্থ সম্পূর্ণ পালটে যাবে। তখন মূল ভাবও বিকৃত হবে। কউল এর পরে কেউ কেউ নসব দিয়ে থাকে যেমন যন এর পরে নসব দেয়া হয়। তখন আয়াতের অর্থ হবে, "আল্লাহ তায়ালা প্রকাশ-অপ্রকাশ্য সবকিছু জানেন" তাদের এ বক্তব্যে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পেরেশান ও চিন্তিত। ইচ্ছাকৃত এ ধরনের পরিবর্তন কুফুরী। এ ধরনের কিরাত লাহনে জলী হওয়ার কারণে নামাজ নষ্ট হয়ে যাবে। মুক্তাদির জন্যও এধরনের ভুলের ক্ষেত্রে চুপ থাকা বৈধ নয়।
রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন لَا يُقْتَلُ قَرْشِيٌّ صَبْرًا بَعْدَ الْيَوْمِ যারা হাদিসটিকে যজম হিসেবে বর্ণনা করেছে, তাদের এ বর্ণনার অর্থ হবে, কুরাইশী ব্যক্তি মুরতাদ কিংবা অন্যকে হত্যা করলেও তাকে হত্যা করা হবে না। যারা এটিকে রফা হিসেবে বর্ণনা করেছে, তাদের বর্ণনা অনুযায়ী অর্থ হবে, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরাইশীদের সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন যে, তাদের কেউ ইসলাম গ্রহণ করলে মুরতাদ হয়ে হত্যার যোগ্য হবে না। এখানে অর্থের পরিবর্তন হয়েছে শুধু ই'রাবের পরিবর্তনের কারণে।
কখনও কখনও একই শব্দে হরকত তথা যের, জবর ও পেশের পরিবর্তনের কারণে অর্থের পরিবর্তন হয়। যেমন আরবরা বলে থাকে, رَجُلٌ لُعْنَةٌ। আইনের উপর সাকিনসহ বললে উদ্দেশ্য হয়, অভিশপ্ত লোক। অর্থাৎ লোকেরা তাকে অভিশাপ দেয়। এখন লোকটি যদি অন্যদেরকে অভিশাপ দেয় তখন আইনের উপর জবর দিয়ে رَجُلٌ لُعَنَةٌ বলা হয়।
মানুষ যদি কাউকে গালি দেয়, যাকে গালি দেয়, তাক সুব্বাতুন বলা হয়। আর ঐ ব্যক্তি যদি অন্য কাউকে গালি দেয়, তখন তাকে সুবাবাতুন বলা হয়। একইভাবে যাকে নিয়ে ঠাট্টা করা হয়, তাকে হুজআতুন এবং কেউ যদি অন্যকে নিয়ে ঠাট্টা করে তবে তাকে হুজাআতুন বলে। যাকে নিয়ে উপহাস করা হয়, তাকে সুখরাতুন বলে। যে অন্যকে নিয়ে উপহাস করে তাকে সুখারাতুন বলে। যাকে নিয়ে হাসি-তামাশা করা হয়, তাকে জুহকাতুন বলে। যে অন্যকে নিয়ে হাঁসে তাকে জুহাকাতুন বলা হয়। যাকে ধোঁকা দেয়া হয়, তাকে খুদআতুন এবং যে অন্যকে ধোঁকা দেয়, তাকে খুদাআতুন বলে।
ফিকাহ শাস্ত্রে মতবিরোধ সৃষ্টিকারী কিছু বাস্তব সম্মত উদাহরণ নীচে উল্লেখ করা হলো,
কেউ শরয়ী পদ্ধতিতে একটি ছাগল জবাই করল। এবং ছাগলের পেট থেকে একটি বাচ্চা পাওয়া গেল। এ বাচ্চা জবাই ছাড়া খাওয়া বৈধ হবে নাকি তা জবাই করতে হবে?
এ বিষয়ে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর একটি হাদিস রয়েছে ذَكَاةُ الْجَنِيْنِ ذَكَاةُ أُمِّهِ | এ হাদিসের ই'রাবের ব্যাপারে বিভিন্ন বর্ণনা এসেছে। মূল মতানৈক্য হাদিসের দ্বিতীয় ذ শব্দ নিয়ে। এটা কি মারফু (পেশযুক্ত) নাকি মানসুব (জবরযুক্ত) পড়া হবে?
আলামা ইবনুল আসির তাঁর 'আন-নিহায়া'-তে লিখেছেন, হাদিসটি রফা ও নসব উভয় সূত্রেই বর্ণিত হয়েছে। যারা একে রফাসহ পড়েছেন, তারা একে পূর্বের মুবতাদা এর খবর সাব্যস্ত করেছেন। তখন অর্থ হবে, বাচ্চার জবাই, তার মায়ের জবাই। অর্থাৎ মাকে জবাই করলে বাচ্চার জবাই এর জন্য যথেষ্ট হবে। নতুন করে জবাইয়ের কোন প্রয়োজন নেই।
যারা হাদিসটিকে নসবসহ পড়েছেন, তারা বলেন, উহ্য ইবারত এরূপ, ذَكَاةُ الْجَنِيْنِ كَذَّكَاةِ أُمِّهِ হরফে জার হযফ করে মাজরুরকে মানসুব বি-নযইল খাফেজ এর ভিত্তিতে নসব দেয়া হয়েছে। অথবা উহ্য ইবারত এরূপ, يُذَكَّيْ تَذْكِيَةً مِثْلَ ذَكَاةِ أُمِّهِ । এখানে মাসদার ও তার সিফতকে হযফ করে মুযাফ ইলাইহিকে তার কায়েম-মাকাম বানান হয়েছে। যারা নসব পড়েছেন তাদের নিকট বাচ্চা যদি জীবিত বের হয়, তবে তা জবাই করা আবশ্যক। কেউ কেউ উভয় যাকাত শব্দকে নসব পড়েছেন। তখন " ذَكُوْا الجَنِينَ ذَكَاةَ أُمه "
সুতরাং শেষ দুই বর্ণনা অনুযায়ী বাচ্চা হালাল হওয়ার জন্য তা জবাই করা আবশ্যক। প্রথম বর্ণনাটি দু'টি অর্থের সম্ভাবনা রাখে। প্রথমত: মায়ের জবাই বাচ্চার জন্য যথেষ্ট হবে। বাচ্চাকে জবাই করার প্রয়োজন হবে না। দ্বিতীয়ত: মায়ের জবাই এর মতো বাচ্চাকে জবাই করা আবশ্যক হবে। এ অর্থটি তাশবিহে বালিগের এর পদ্ধতিতে সাব্যস্ত হবে। (তাশবিহে বালিগের ক্ষেত্রে হরফুত তাশবিহ এবং ওজহে শিবা উহ্য রাখা হয়)
প্রসিদ্ধ রেওয়ায়াত তথা উভয় শব্দে পেশ এর বর্ণনাটি ইমাম শাফেয়ি গ্রহণ করেছেন। দ্বিতীয় বর্ণনাটি গ্রহণ করেছেন ইমাম আবু হানীফাসহ এক দল আলেম। ইবনে হাযাম যাহেরীও এমত গ্রহণ করেছেন। প্রত্যেকেই তার মাযহাবকে অন্যান্য দলিল দ্বারাও শক্তিশালী করেছেন।
কাজি ইয়াজ রহ. তার অতুলনীয় কিতাব 'আল-ইলমায়' শব্দের হরকত, সাকিন ও প্রকৃত রূপ সংরক্ষণে গুরুত্বারোপ করে লিখেছেন,
"ই'রাবের ভিন্নতার কারণে উলামায়ে কেরামের মাঝে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছে। ১. যেমন রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস ذَكَاةُ الْحَنِينِ ذَكَاةُ أُمِّهِ এর মাঝে মতানৈক্য হয়েছে। হানাফীগণ দ্বিতীয় যাকাত শব্দে নসব দেয়াকে প্রাধান্য দিয়ে হুকুম দিয়েছেন যে, বাচ্চাকে নতুন করে জবাই করা আবশ্যক। হানাফি আলেমগণ ছাড়া মালেকি ও শাফেয়ি আলেমগণ রফাকে প্রাধান্য দিয়ে বাচ্চার জবাইকে অপ্রয়োজনীয় সাব্যস্ত করেছেন এবং মায়ের জবাইকে বাচ্চা হালাল হওয়ার জন্য যথেষ্ট মনে করেছেন।
২. রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস لا نُوْرَثُ مَا تَرَكْنَاهُ صَدَقَةٌ এ হাদিসে সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরাম সাদাকাতুন শব্দটি মুবতাদার খবর হিসেবে মারফু (পেশসহ) পড়েছেন। যার অর্থ হবে, নবিগণ পরিত্যক্ত সম্পদে মিরাস সাব্যস্ত হয় না, বরং তা সদকা। পক্ষান্তরে শিয়াদের ফিরকায়ে ইমামিয়া এটাকে তামীয হিসেবে মানসুব পড়ে থাকে। তখন অর্থ হবে, ঐ পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নবিদের মিরাস সাব্যস্ত হবে না, যা তারা সদকা করেছেন (বরং যে সম্পদ তাদের মালিকানায় থাকবে তাতে মিরাস সাব্যস্ত হবে)। এ অর্থ গ্রহণ করলে নবি ও অন্যান্যদের মাঝে কোন পার্থক্য থাকে না এবং নবিগণের বিশেষ বৈশিষ্ট্যও প্রমাণিত হয় না। অবশ্য ইমাম নুহাস হাল হওয়ার ভিত্তিতে একে নসব দিয়েছেন।
৩. একইভাবে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উক্তি, هُوَ لَكَ عبد بن زمعة | কিছু আলেম হরফে নেদা উহ্য মেনে عبد কে রফা দিয়েছেন এবং بن কে এর তাবে হিসেবে রফা ও নসব উভয়টা বৈধ বলেছেন। যেমন মুনাদা মুফরাদের সিফাতের ক্ষেত্রে জুম্মা ও ফাতাহ দুই ই'রাবই দেয়া যায়। হানাফীগণ عبد কে মুবতাদা সাব্যস্ত করে একে তানবিন দিয়েছেন, অর্থাৎ هُوَ الوَلَدُ لَكَ عَبْدٌ | এবং إبن زمعة কে মুনাদা মুযাফ হিসেবে নসব দিয়েছেন। এ ব্যাখ্যা অনুযায়ী অর্থ হবে, হে ইবনে যামআ, ছেলেটি তোমার গোলাম। আরবি ভাষায় এ জাতীয় অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে।
এ বিষয়ের সাথে সংশিষ্ট আরেকটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
فِي كُلِّ سَائِمَةِ إِبِلٍ فِي أَرْبَعِيْنَ بِنتُ لَبُوْنٍ، لَا يُفَرَّقُ إِبِلٌ عَنْ حِسَابِهَا، مَنْ أَعْطَاهَا مُؤْتَحِرًا فَلَهُ أَجْرُهَا وَ مَنْ مَنَعَهَا فَإِنَّا آخِدُوْهَا وَ شَطْرَ مَالِهِ عَزْمَةٌ مِنْ عَزَمَاتِ رَبِّنَا عَزَّ وَ جَلَّ، وَلَيْسَ لَآلِ مُحَمَّدٍ مِنْهَا شَيْءٌ
"চল্লিশটি পালিত উট থাকলে একটি বিনতে লাবুন যাকাত দিতে হবে। উটের হিসাবে কোন পার্থক্য করা হবে না। কেউ যদি সওয়াবের আশায় নিজে যাকাত আদায় করে, তবে সে সওয়াবের অধিকারী হবে। আর যে স্বেচ্ছায় যাকাত আদায় করবে না, আমরা তার থেকে যাকাত উসুল করবো। সাথে সাথে শাস্তি হিসেবে তার অর্ধেক সম্পত্তি নিয়ে নিব। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে আবশ্যক বিধান। মুহাম্মাদ সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পরিবারের জন্য এর কোন অংশ নেই।"
উক্ত হাদিসে شَطْرَ مَالِهِ শব্দ নিয়ে মতানৈক্য হয়েছে। শাতরুন শব্দটির ত্ব এর উপর সাকিন, শিন ও র এর উপর জবর দিয়ে পড়লে এটি মুযাফ। এবং পরবর্তী শব্দ তার মুযাফ ইলাইহি হবে। অথবা শিনের উপর পেশ, ত্ব তাশদীদ যুক্ত যের অর্থাৎ شِطْرُ। তখন এটি মাজি মাজহুল এবং পরবর্তী অংশ তার নায়েবে ফায়েল হবে। ই'রাবের এ পার্থক্যের কারণে হাদিসের অর্থেও ভিন্নতা সৃষ্টি হবে। কেননা প্রথম ক্ষেত্রে অর্থ হবে যে যাকাত দেবে না, তার থেকে যাকাত গ্রহণ করা হবে এবং শাস্তি স্বরূপ অর্ধেক সম্পত্তি নিয়ে নেয়া হবে। এটি প্রসিদ্ধ মত। তবে অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম এর উপর আমল করেন না।
এ হাদিস থেকে শাস্তিস্বরূপ অর্থের উপর জরিমানা করার বৈধতা সাব্যস্ত হয়। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ. এ হাদিসের উপর কিছুটা আমল করেছেন বলে বর্ণিত আছে। আল্লাহ তায়ালা ভাল জানেন।
দ্বিতীয় ব্যাখ্যা তথা মাজি মাজহুলের ক্ষেত্রে অর্থ হবে, তার সম্পদ দু'অংশ ভাগ করা হবে। যাকাত উসুলকারী তার ইচ্ছামত দু'অংশের মাঝে সর্বোত্তম অংশ গ্রহণ করবে। এই ব্যাখ্যাকে প্রাধান্য দিয়েছেন ইমাম ইবরাহিম হারবি। তিনি ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল র. এর অন্যতম ছাত্র। তাঁর ইলম, যুহদ ও তাকওয়ার উপমা দেয়া হতো। তিনি প্রথম ব্যাখ্যা তথা ইযাফাতের পদ্ধতিকে বর্ণনাকারীর ভুল সাব্যস্ত করেছেন।
টিকাঃ
৬৭ বিষয়টি উলামায়ে কেরামের বর্ণনা ও রাবীদের বক্তব্যের ভিন্নতার ব্যাপারে তাদের সতর্কীকরণ বক্তব্য থেকে অর্জন করতে হয়। সুতরাং এটি শিখার পথ হলো, উলামায়ে কেরামের মুখে শ্রবণ কিংবা তাদের লিখিত স্পষ্ট বক্তব্য। প্রেসের দেয়া যের-যবর দ্বারা এটি অর্জন করা যায় না। এটি সর্বজনবিদিত একটি বিষয়। কোন তালেবে ইলমকে এটি সতর্ক করার প্রয়োজন নেই। বিষয়টি এজন্য উল্লেখ করলাম, হেমসের বিখ্যাত শায়খ, ফকীহ, মুফাসসির আল্লামা আব্দুল আজীজ উয়ূনুস সুউদ রহ. ১৩৯৮ হি: শাওয়াল মাসে আমার কাছে একটি দু:খজনক ও হাস্যকর ঘটনা শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, যোহরের আযানের আগে আমার কাছে একজন লোক এলো। আমি তাকে পূর্বে চিনতাম না। পরে জানতে পারলাম, তিনি শায়খ নাসিরুদ্দিন আলবানী। তিনি যোহরের আযানের অপেক্ষা করতে লাগলেন। মুয়াযযিন যখন আযানে )الله أَكْبَرَ الله أكبر আল্লাহু আকবারা আল্লাহু আকবার বললো, (অর্থাৎ আকবার এর র এর উপর যবর দিয়ে বললো) এই লোকটি খুবই রাগান্বিত হয়ে বললো, এটি ভুল। এটি বেদয়াত। আমাদের শায়খ তাকে বললেন, এতে কী ভুল হয়েছে, বিদয়াতের কী হয়েছে? শায়খ আলবানী বললেন, এটি সহীহ মুসলিমের বিপরীত। আমাদের শায়খ তাকে প্রশ্ন করলেন, সহীহ মুসলিমে কী আছে? তিনি বললেন, সহীহ মুসলিমে )الله أكْبَرُ الله أكبر আল্লাহু আকবারু আল্লাহু আকবার, অর্থাৎ পেশসহ আছে। تلقيتم صحيح مسلم عن شيوخكم، عن شيوخهم إلي الإمام مسلم أنه روي الحديث بضم الراء، أو هو ضبط المطبعة ؟ অর্থাৎ "আপনি কি মুসলিম শরীফ আপনার উস্তাদ, তারা তাদের উস্তাদ এভাবে পরম্পরাসূত্রে ইমাম মুসলিম রহ. থেকে আকবার শব্দটি পেশযুক্ত অবস্থায় পড়েছেন? নাকি এটি প্রেসের দেয়া পেশ?" আমাদের শায়খ বলেন, এরপর লোকটি চুপ হয়ে গেল। আমিও চুপ করলাম। এরপর তিনি নামায আদায় করে চলে গেলেন।
এই ঘটনা থেকে জ্ঞানীদের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিৎ। সত্য কথা হলো এই লোকটির মাত্র একজন শায়খ রয়েছে, যিনি আলেপ্পোর একজন আলেম। সে তার ইজাযা বা অনুমতি গ্রহণ করেছে। তার নিকট থেকে সরাসরি ইলম অর্জন, সংশ্রব বা দীর্ঘদিন অবস্থান করে অধ্যয়ন করেনি। কাযী ইয়ায রহ. এর আল-ইলমা-তে (পৃ.২৮) রয়েছে, আব্বাসী খলিফা মু'তাসিম বিল্লাহ ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. কে বললেন, আপনি ইবনে আবু দাউদের সাথে কথা বলুন। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তিনি বললেন, আমি ঐ ব্যক্তির সাথে কিভাবে কথা বলবো, যাকে কখনও কোন আলেমের দরজায় দেখিনি। দেখুন, আদাবুল ইখতেলাফ, পৃ.১৬২ ও তার পরবর্তী আলোচনা।
৬৮ উস্তাদ আব্দুল ওয়াহাবের এ বিষয়ে বৃহৎ কলেবরের একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। তিনি এর নাম রেখেছেন, আসারুল লুগাহ ফি ইখতিলাফিল মুজতাহিদীন।
৬৯ আন-নিহায়া, খ.২, পৃ.১৬৪।
৭০ আন-নুকাতুত ত্বরীফা, আল্লামা যাহেদ আল-কাউসারী র. পৃ.৬২।
৭১ আবু দাউদ, খ.২, পৃ.২৩৩। হাদীস নং ১৫৭৫। নাসায়ী শরীফ, খ.৫, পৃ.১৫। হাদীস নং ২৪৪৪।
৭২ আল-হিসবাতু ফিল ইসলাম, আল্লামা ইবনে তাইমিয়া র.। পৃ.৩১। শরহুল কামুস, আল্লামা মোর্তজা যাবিদি। মাদ্দা-শিন, ত্ব, র। আত-তালখীসুল হাবীর, খ.২, পৃ.১৬০। ফাতহুল বারী, খ.১৭, পৃ.১২৩।