📄 প্রারম্ভিকা: ইমামদের নিকট হাদিসের মর্যাদা
মূল আলোচনার পূর্বে ইমামদের অন্তরে হাদিসের অবস্থান সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা জরুরি। এ থেকে স্পষ্ট হবে, হাদিস গ্রহণ ও তার উপর আমল করার ব্যাপারে তারা কতটা আগ্রহী ছিলেন।
ইমাম আবু হানিফা রহ. বলেন-
لم تزل الناس في صلاح ما دام فيهم من يطلب الحديث. فإذا طلبوا العلم بلا حديث فسدوا
"মানুষের মাঝে যতক্ষণ হাদিস অন্বেষী মহৎ ব্যক্তিবর্গের অবস্থান থাকে, ততক্ষণ তারা কল্যাণময় সময় অতিবাহিত করে। যখনই তারা হাদিস ব্যতীত ইলম অন্বেষণ শুরু করে, তখনই বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। ¹³
তিনি আরও বলেন,
إياكم و القول في دين الله بالرأي، وعليكم بإتباع السنة فمن خرج عنها ضل.
আল্লাহর দীনের ব্যাপারে মনগড়া কথা থেকে বেঁচে থাকো। তোমাদের জন্য সুন্নাহর অনুসরণ আবশ্যক। যে ব্যক্তি সুন্নাহ-বিমুখ হলো, সে ভ্রষ্ট হয়ে গেলো। ¹⁴
ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেন-
أي أرض تقلني إذا رويت عن النبي صلي الله عليه وسلم حديثا و قلت بغيره
যদি আমি রসুলের সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদিস বর্ণনা করি এবং তার বিপরীত মত প্রকাশ করি কোন জমিন আমাকে স্থান দেবে? ¹⁵
একবারের ঘটনা। ইমাম শাফেয়ি রহ. একটি হাদিস বর্ণনা করলেন। ইমাম বোখারির রহ. উস্তাদ ইমাম হুমায়দী তাঁকে বললেন, আপনি এই হাদিসটি গ্রহণ করেন? ইমাম শাফেয়ি রহ. তাঁকে বললেন, আপনি আমাকে ক্রুশ ঝুলিয়ে কখনও গির্জা থেকে বের হতে দেখেননি। আপনি নিশ্চিত থাকুন যে, আমি রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস শুনলে তার উপর আমল করে থাকি। ¹⁶
ইমাম মালেক রহ. হাদিসের খুবই চমৎকার একটি উপমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, السنن سفينة نوح من ركبها نجا، ومن تخلف عنها غرق
"সুন্নাহ হল নূহ আ. এর জাহাজের মত। যে তাতে আরোহণ করলো, সে নাজাত পেলো। যে পিছে পড়লো, সে ডুবে গেলো।”¹⁷
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেছেন, من رد حديث رسول الله صلى الله عليه وسلم فهو على شفا هلكة
“যে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস প্রত্যাখ্যান করে, সে ধ্বংসের মুখে নিপতিত হয়।”¹⁸
তিনি আরও বলেন, "বর্তমান সময়ে হাদিস অন্বেষণের প্রয়োজনীয়তা অন্য সময়ের চেয়ে বেশি। (ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর সময় ছিলো ২৪১ হিঃ) ইমাম আহমাদ রহ. এর এক ছাত্র তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, কেন? তিনি বললেন, বিদয়াতের আবির্ভাব হয়েছে। সুতরাং যার কাছে হাদিস থাকবে না, সে বিদয়াতে নিপতিত হবে। "¹⁹
ইমামদের জীবনচরিত ও ইতিহাস গ্রন্থে এজাতীয় অসংখ্য বক্তব্য রয়েছে। সামান্য ক'টি এখানে উল্লেখ করা হলো। তাদের এই উক্তি থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, প্রত্যেকের জন্য রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ অনুসরণ আবশ্যক। রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহের শিক্ষা অর্জন ও তার উপর আমল করার মাধ্যমেই একজন মুসলমান সফল ও মুক্তিপ্রাপ্তদের অন্তর্ভূক্ত হবে। আর যে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ থেকে বিমুখ, তার লাঞ্ছনা ও সরল পথ থেকে বিচ্যুতি অবধারিত।
প্রাথমিক পর্যায়ে একজন সাধারণ মানুষের মনে ফকিহদের ইমাম হওয়ার বিষয়টি বদ্ধমূল হওয়া জরুরি। শরিয়তের বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে মতবিরোধের কারণ অনুসন্ধান তার জন্য সহজ হবে। কেননা প্রত্যেক ইমামই রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ অনুসরণের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। তবে কেউ যদি তাদের ইমাম হওয়ার স্বীকৃতি প্রদান না করে সে কখনও এই আলোচনার প্রতি কোন আগ্রহ বোধ করবে না। বরং সে বলবে, তারাও মানুষ, আমরাও মানুষ। সে এই বিশ্বাস রাখবে না যে, ইমামগণ দলিল অনুসন্ধান করে তা অনুসরণ করার জন্য সীমাহীন চেষ্টা করেছেন; একজন ডুবন্ত ব্যক্তি মুক্তির জন্য যেমন উপায় অনুসন্ধান করে, তাঁরা এর চেয়েও বেশি চেষ্টা করেছেন। ইমামদের প্রতি আক্রমণ ও তাদেরকে অজ্ঞতার অভিযোগে অভিযুক্ত করতেও সে দ্বিধা করবে না। কারণ সে ইমামগণের প্রতি কোন সুস্থ ধারণা পোষণ করে না।
আমরা এখন ইমামগণের মতানৈক্যের কারণ সম্পর্কে আলোচনা করবো।
টিকাঃ
১৩ আল-মিযানুল কুবরা, আল্লামা শা'রানী রহ, খ.১, পৃ.১৫
১৪ আল-মিযানুল কুবরা, খ.১, পৃ.৫০।
১৫ মা'না কাওলিল ইমামিল মুত্তালাবি ইযা সাহহাল হাদিসু ফাহুয়া মাযহাবি এর ভূমিকা। আল্লামা তাজুদ্দিন সুবকী (রহঃ)।
১৬ প্রাগুক্ত। ইমাম শাফেয়ী রহ. থেকে অনেকেই এটা বর্ণনা করেছেন। এমনকি ইমাম তাজুদ্দিন সুবকী রহ. ত্ববাকাতুল কুবরা- তে (২/১৩৮) রবী আল-মুরাদী এর জীবনী আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, ইমাম শাফেয়ী রহ. এর জীবনে এই জাতীয় ঘটনা কয়েকবার সঙ্ঘঠিত হয়েছে。
১৭ মিফতাহুল জান্নাহ ফিল ইহতিজাজ বিস সুন্নাহ এর পরিশিষ্ট। হাফেজ জালালুদ্দিন সুয়ূতী রহ.
১৮ মানাকিবুল ইমাম আহমাদ, আল্লামা ইবনুল জাওযী রহ.। পৃ.১৮২।
১৯ মানাকিবুল ইমাম আহমাদ, আল্লামা ইবনুল জাওযী রহ.। পৃ.১৮৩।