📘 নবীজীর হাদীস ও ইমামগণের মতভেদ > 📄 শায়েখ আব্দুল আবু গুদ্দাহ ফাত্তাহ রহ. এর মূল্যবান অভিমত

📄 শায়েখ আব্দুল আবু গুদ্দাহ ফাত্তাহ রহ. এর মূল্যবান অভিমত


আলহামদুলিল্লাহ! মুহাম্মাদ আওয়ামাহ রচিত 'আসারুল হাদীসিশ শরীফ ফি ইখতিলাফি আইম্মাতিল ফুকাহা' অধ্যয়নের সুযোগ হয়েছে। ১৩৯৮ হি. রমজানুল মুবারকের দ্বিতীয় দিন শনিবার রোদ- ঝলমল এক সকালে ইয়ামানের 'সানয়া'তে অবস্থানকালে এটি পড়ার সুযোগ হয়। আনন্দের বিষয় হলো, তাঁর এ মূল্যবান সংকলনের পুরোটাই এক বৈঠকে শেষ করেছি এবং তা থেকে যথেষ্ট উপকৃত হয়েছি। অন্তরের নিভৃত কোন থেকে শীতল ও প্রশান্ত প্রার্থনায় ডুবে ছিলাম মুতালা'আর পুরোটা সময়জুড়ে। রব্বুল আলামীন এর সংকলককে আরো বিস্তৃত তওফিকে আবৃত করুন। আমি আন্ত রিকভাবে কামনা করি, এর সদূরপ্রসারী ফল এতটা ব্যাপক হোক যে, এর দ্বারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম উম্মাহর সরল-সাধারণ মানুষকে সন্দিগ্ধকারীদের মুখে লাগাম লেগে যাবে। এরা বিস্তৃত পথ ছেড়ে কঠিন ও সংকীর্ণ পথ অবলম্বন করেছে। ফকিহ ইমামগণের ব্যাপারে বিষোদগার করে সাধারণ এবং সর্বজন স্বীকৃত ইমামগণের ইলম মর্যাদাকে মূর্খতার অপবাদ দিয়েছে। এভাবে মুসলিম উম্মাহের মাঝে বিচ্ছিন্নতাবাদের শ্লোগান তুলেছে।

আল্লাহ পাকের অশেষ কৃতজ্ঞতা যে, তিনি বিশ্লেষক ও সাহসী সংকলককে এর তওফীক দান করেছেন। আর তিনিই নেয়ামত ও তওফীকদাতা। আমরা তাঁর নিকট সরল ও সঠিক পথের দিশা চাই।

وصلي الله علي سيدنا و نبينا محمد و علي آله وأصحابه و أتباعه و الأئمة المجتهدين المعتبرين عند كل عالم و صالح و صدیق، آمین

আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ

একই বছরে (১৩৯৮হিঃ) ২৬ শে শাওয়াল বৃহস্পতিবার হিন্দুস্থানের বিখ্যাত মুহাদ্দিস শায়েখ আল্লামা হাবীবুর রহমান আজমী হালবে আগমন করেন। শায়খের আগমনে আমি খুবই আনন্দিত হই। কারণ তখনও কিতাবের পান্ডুলিপি ছাপার জন্য প্রেসে পাঠানো হয়নি। সুযোগমত আমি তাঁকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এ পুস্তকটি শুনালাম। তিনি অত্যন্ত আগ্রহ ও মনযোগের সাথে এটি শ্রবণ করে যারপরনাই সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বললেন, "তুমি আমাকে যা কিছু পড়ে শুনিয়েছো, আমি তার প্রত্যেকটি অক্ষরের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করছি।"

সমস্ত প্রশংসা এক আল্লাহর জন্যই। তাঁর মহত্বের কাছে আকুল মিনতি, তিনি যেন একে মহা বিপদের দিন আমার নাজাতের ওসিলা বানিয়ে দেন। এর দ্বারা ব্যাপকভাবে মানুষকে উপকৃত করেন। তিনিই একমাত্র তওফিক দাতা।

মুহাম্মাদ আওয়ামাহ
হালব, জমইয়্যাতুত তায়ালিমিশ শরয়ী, ২/১১/১৩৯৮ হিঃ

📘 নবীজীর হাদীস ও ইমামগণের মতভেদ > 📄 অবতরণিকা

📄 অবতরণিকা


শরয়ী ব্যাপারে ইখতেলাফে আইম্মার কারণসমূহ আলোচনা-পর্যালোচনা প্রত্যেক মুসলমানের ইলম ও আমলী জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর মাধ্যমে একজন মুমিন শরিয়তের মূল উৎস কুরআন ও সুন্নাহ থেকে মাসয়ালা আহরণে ইমামদের পূর্ণ দক্ষতা সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করে। সে উপলব্ধি করে যে, ইমামগণ মাসআলা উদঘাটনে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। আর কর্মজীবন তথা আমলী জিন্দেগীতে এ বিষয়টির আলোচনা-পর্যালোচনা তার অন্তরকে ইমামদের ব্যাপারে চিন্তামুক্ত ও প্রশান্ত রাখে। কেননা এসব ইমামদের হাতে সে তার মুয়ামালাত, মুয়াশারাত, আখলাকিয়াত ও সূলুকের লাগাম দিয়েছে এবং তাঁদেরকে সে আলাহ ও নিজের মাঝে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে। একজন মুমিন তার সাধ্যানুযায়ী ইমামদের মতানৈক্যের কারণ সম্পর্কে অবগত হয়েই কেবল এ প্রশান্তি অর্জন করবে।

জেনে রাখা দরকার, ইমামদের মতানৈক্যর সুনির্দিষ্ট উসূল ও নীতিমালা রয়েছে। সত্যান্বেষণ ও নীতি-নিষ্ঠ বিধান অর্জন ছিলো তাদের মূল লক্ষ্য। অতএব, যে বিষয়ে ঐকমত্য পৌঁছা সম্ভব ছিল, সে বিষয়ে তারা ঐকমত্য পৌঁছেছেন। যে বিষয়ে মতানৈক্য থেকে বাঁচার কোন পথ ছিল না, সে বিষয়ে মতানৈক্য হয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের কোন ত্রুটি নেই। কারণ, তারা ছিলেন নিরেট সত্যান্বেষী। স্পষ্ট দলিলের অনুসারী। তাদের কেউ গোঁড়ামী, আত্মম্ভরিতা বা অহংকারের বশবর্তী হয়ে মতানৈক্য করেননি। নিজেকে পরিচিত ও প্রসিদ্ধ করার উদ্দেশ্যেও কারও ছিলো না। বরং দলিলের দাবি অনুযায়ী তারা বাধ্য হয়ে মতানৈক্য করেছেন।

বর্তমানে বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। উপর্যুক্ত বাস্তবতার বিপরীতে আমরা একটি ভয়ংকর ও ধ্বংসাত্মক স্রোতের মুখোমুখি হয়েছি। সমাজের একশ্রেণীর মানুষ ইমামদের সম্পর্কে কুধারণা পোষণ করছে। ইমামদের ইলম ও আমলী জিন্দেগীর প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে অভিনব সব কথাবার্তায় জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করছে। তারা ইমামদের উপর এমন এক শ্রেণীকে প্রাধান্য দেয়, যারা তাদের সাথে কখনও তুলনীয় হতে পারে না। অথচ ইমামগণ ছিলেন যুগে যুগে বুদ্ধিজীবী, কাজী, ফকিহ ও বিচারকরদের গর্ব। দীন-ইসলামের সংরক্ষক। পাহাড়সম উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। এরা নিজেরাও বোঝে না যে তারা কীসের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে।

ফকিহদের মতানৈক্যের বিষয়টি মূলত: ইজতেহাদের একটি অংশ। একারণে মতানৈক্য বিষয়ক আলোচনা শুধু জটিলই নয় বরং শাখা- প্রশাখাযুক্তও। মূল বক্তব্য শুরুর পূর্বে মতবিরোধের একটি
বিশেষ দিক নির্দিষ্ট করে নেয়া জরুরি। আমি এখানে মূলত: ইমামদের মতবিরোধের ক্ষেত্রে হাদিসের ভূমিকা বিষয়ে আলোচনা করবো। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালার সাহায্য ও রহমত কামনা করছি।

ইমামদের মতবিরোধ বিষয় আলোচনাটি আমি এভাবে উপস্থাপন করেছি।
ক. প্রারম্ভিকা: ইমামদের নিকট হাদিসের মর্যাদা।
খ. মতানৈক্যের প্রথম কারণ: হাদিস কখন আমলযোগ্য হয়।
সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মতানৈক্যের দ্বিতীয় কারণ: হাদিসের বুঝ অর্জনে তারতম্য।
ঘ. মতানৈক্যের তৃতীয় কারণ: বাহ্যিকভাবে পরস্পর বিরোধী হাদিসের ক্ষেত্রে ইমামগণের মতবিরোধ
ঙ. মতানৈক্যের চতুর্থ কারণ: হাদিস সম্পর্কে অবগতির তারতম্যেও কারণে সৃষ্ট মতবিরোধ।
এছাড়াও কিছু প্রচলিত ধারণা ও অভিযোগ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এগুলো বুঝতে ও সমাধান করতে অনেকেই ব্যর্থ হয়েছে। পরিশিষ্ট হিসেবে কিতাবের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের একটি সারসংক্ষেপও উল্লেখ করেছি।

📘 নবীজীর হাদীস ও ইমামগণের মতভেদ > 📄 প্রারম্ভিকা: ইমামদের নিকট হাদিসের মর্যাদা

📄 প্রারম্ভিকা: ইমামদের নিকট হাদিসের মর্যাদা


মূল আলোচনার পূর্বে ইমামদের অন্তরে হাদিসের অবস্থান সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা জরুরি। এ থেকে স্পষ্ট হবে, হাদিস গ্রহণ ও তার উপর আমল করার ব্যাপারে তারা কতটা আগ্রহী ছিলেন।

ইমাম আবু হানিফা রহ. বলেন-

لم تزل الناس في صلاح ما دام فيهم من يطلب الحديث. فإذا طلبوا العلم بلا حديث فسدوا

"মানুষের মাঝে যতক্ষণ হাদিস অন্বেষী মহৎ ব্যক্তিবর্গের অবস্থান থাকে, ততক্ষণ তারা কল্যাণময় সময় অতিবাহিত করে। যখনই তারা হাদিস ব্যতীত ইলম অন্বেষণ শুরু করে, তখনই বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। ¹³

তিনি আরও বলেন,

إياكم و القول في دين الله بالرأي، وعليكم بإتباع السنة فمن خرج عنها ضل.

আল্লাহর দীনের ব্যাপারে মনগড়া কথা থেকে বেঁচে থাকো। তোমাদের জন্য সুন্নাহর অনুসরণ আবশ্যক। যে ব্যক্তি সুন্নাহ-বিমুখ হলো, সে ভ্রষ্ট হয়ে গেলো। ¹⁴

ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেন-

أي أرض تقلني إذا رويت عن النبي صلي الله عليه وسلم حديثا و قلت بغيره

যদি আমি রসুলের সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদিস বর্ণনা করি এবং তার বিপরীত মত প্রকাশ করি কোন জমিন আমাকে স্থান দেবে? ¹⁵

একবারের ঘটনা। ইমাম শাফেয়ি রহ. একটি হাদিস বর্ণনা করলেন। ইমাম বোখারির রহ. উস্তাদ ইমাম হুমায়দী তাঁকে বললেন, আপনি এই হাদিসটি গ্রহণ করেন? ইমাম শাফেয়ি রহ. তাঁকে বললেন, আপনি আমাকে ক্রুশ ঝুলিয়ে কখনও গির্জা থেকে বের হতে দেখেননি। আপনি নিশ্চিত থাকুন যে, আমি রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস শুনলে তার উপর আমল করে থাকি। ¹⁶

ইমাম মালেক রহ. হাদিসের খুবই চমৎকার একটি উপমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, السنن سفينة نوح من ركبها نجا، ومن تخلف عنها غرق

"সুন্নাহ হল নূহ আ. এর জাহাজের মত। যে তাতে আরোহণ করলো, সে নাজাত পেলো। যে পিছে পড়লো, সে ডুবে গেলো।”¹⁷

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেছেন, من رد حديث رسول الله صلى الله عليه وسلم فهو على شفا هلكة

“যে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস প্রত্যাখ্যান করে, সে ধ্বংসের মুখে নিপতিত হয়।”¹⁸

তিনি আরও বলেন, "বর্তমান সময়ে হাদিস অন্বেষণের প্রয়োজনীয়তা অন্য সময়ের চেয়ে বেশি। (ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর সময় ছিলো ২৪১ হিঃ) ইমাম আহমাদ রহ. এর এক ছাত্র তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, কেন? তিনি বললেন, বিদয়াতের আবির্ভাব হয়েছে। সুতরাং যার কাছে হাদিস থাকবে না, সে বিদয়াতে নিপতিত হবে। "¹⁹

ইমামদের জীবনচরিত ও ইতিহাস গ্রন্থে এজাতীয় অসংখ্য বক্তব্য রয়েছে। সামান্য ক'টি এখানে উল্লেখ করা হলো। তাদের এই উক্তি থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, প্রত্যেকের জন্য রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ অনুসরণ আবশ্যক। রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহের শিক্ষা অর্জন ও তার উপর আমল করার মাধ্যমেই একজন মুসলমান সফল ও মুক্তিপ্রাপ্তদের অন্তর্ভূক্ত হবে। আর যে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ থেকে বিমুখ, তার লাঞ্ছনা ও সরল পথ থেকে বিচ্যুতি অবধারিত।

প্রাথমিক পর্যায়ে একজন সাধারণ মানুষের মনে ফকিহদের ইমাম হওয়ার বিষয়টি বদ্ধমূল হওয়া জরুরি। শরিয়তের বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে মতবিরোধের কারণ অনুসন্ধান তার জন্য সহজ হবে। কেননা প্রত্যেক ইমামই রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ অনুসরণের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। তবে কেউ যদি তাদের ইমাম হওয়ার স্বীকৃতি প্রদান না করে সে কখনও এই আলোচনার প্রতি কোন আগ্রহ বোধ করবে না। বরং সে বলবে, তারাও মানুষ, আমরাও মানুষ। সে এই বিশ্বাস রাখবে না যে, ইমামগণ দলিল অনুসন্ধান করে তা অনুসরণ করার জন্য সীমাহীন চেষ্টা করেছেন; একজন ডুবন্ত ব্যক্তি মুক্তির জন্য যেমন উপায় অনুসন্ধান করে, তাঁরা এর চেয়েও বেশি চেষ্টা করেছেন। ইমামদের প্রতি আক্রমণ ও তাদেরকে অজ্ঞতার অভিযোগে অভিযুক্ত করতেও সে দ্বিধা করবে না। কারণ সে ইমামগণের প্রতি কোন সুস্থ ধারণা পোষণ করে না।

আমরা এখন ইমামগণের মতানৈক্যের কারণ সম্পর্কে আলোচনা করবো।

টিকাঃ
১৩ আল-মিযানুল কুবরা, আল্লামা শা'রানী রহ, খ.১, পৃ.১৫
১৪ আল-মিযানুল কুবরা, খ.১, পৃ.৫০।
১৫ মা'না কাওলিল ইমামিল মুত্তালাবি ইযা সাহহাল হাদিসু ফাহুয়া মাযহাবি এর ভূমিকা। আল্লামা তাজুদ্দিন সুবকী (রহঃ)।
১৬ প্রাগুক্ত। ইমাম শাফেয়ী রহ. থেকে অনেকেই এটা বর্ণনা করেছেন। এমনকি ইমাম তাজুদ্দিন সুবকী রহ. ত্ববাকাতুল কুবরা- তে (২/১৩৮) রবী আল-মুরাদী এর জীবনী আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, ইমাম শাফেয়ী রহ. এর জীবনে এই জাতীয় ঘটনা কয়েকবার সঙ্ঘঠিত হয়েছে。
১৭ মিফতাহুল জান্নাহ ফিল ইহতিজাজ বিস সুন্নাহ এর পরিশিষ্ট। হাফেজ জালালুদ্দিন সুয়ূতী রহ.
১৮ মানাকিবুল ইমাম আহমাদ, আল্লামা ইবনুল জাওযী রহ.। পৃ.১৮২।
১৯ মানাকিবুল ইমাম আহমাদ, আল্লামা ইবনুল জাওযী রহ.। পৃ.১৮৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00