📄 শায়খ মুস্তফা আহমাদ আয-যারকা রহ. এর অভিমত
যাবতীয় প্রশংসা মহিমাময় আলাহর জন্য। তিনি পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন,
“আর সমস্ত মুমিনের অভিযানে বের হওয়া সংগত নয়। তাই তাদের প্রত্যেক দলের একটি অংশ কেন বের হলো না, যাতে দীনের জ্ঞান লাভ করে এবং সংবাদ দান করে স্বজাতিকে, যখন তারা তাদের কাছে প্রত্যাবর্তন করবে, যেন তারা বাঁচতে পারে।”⁷
দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক শেষ নবি হজরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি। তিনি ইরশাদ করেছেন,
“আল্লাহ ঐ ব্যক্তিকে প্রফুল্ল রাখেন যে আমার নিকট থেকে কিছু শ্রবণ করে। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘সেসে আমার কাছ থেকে হাদিস শ্রবণ করে এবং যেভাবে শুনেছে ঠিক সেভাবেই অন্যকে পৌঁছে দেয়। অনেক শ্রোতা এমন রয়েছে যারা বার্তা বাহক অপেক্ষা অধিকতর সতর্ক ও সচেতন।”
অন্য বর্ণনায় এসেছে,
“অনেক ফকিহ এমন রয়েছে যারা নিজেদের চেয়ে বড় ফকিহদের নিকট ফিকাহকে পৌঁছে দেয় এবং অনেক ফিকাহের বাহক এমন রয়েছে যারা ফকিহ নয়।”⁸
রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত মুয়ায ইবনে জাবাল (রা.) সম্পর্কে বলেছেন,
“সাহাবীদের মাঝে হালাল ও হারাম সম্পর্কে সর্বাধিক বিচক্ষণ হল মুয়ায ইবনে জাবাল।”⁹
তিনি আরো বলেছেন
“তাদের মাঝে সর্বোত্তম বিচারক হলো আলী। ”¹⁰
উপর্যুক্ত বক্তব্যগুলি থেকে প্রতীয়মান হয় যে শরিয়তের ইলমের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পদক্ষেপ হলো কুরআন ও সুন্নাহ হিফয করা। এবং চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো এর পূর্ণাঙ্গিক বোধ বা তাফাক্কুহ ফিদ্দ্বীন অর্জন করা। এটি এমন একটি স্তর যেখানে সাহাবায়ে কেরাম (রা.) থেকে শুরু করে সর্ব যুগের মানুষের মাঝে তারতম্য হয়েছে।
শায়খ আওয়ামাহর এই আসারুল হাদীসিশ শরীফ গ্রন্থ সম্পর্কে আমি অবহিত আছি। তিনি নিজে যেমন ব্যুৎপন্ন, ঠিক তেমনি এই গ্রন্থও জ্ঞানে-তথ্যে সমৃদ্ধ। অনেক শ্রোতা এমন রয়েছে যারা বার্তা বাহক অপেক্ষা অধিকতর সতর্ক-সচেতন' নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এই হাদিসের মর্ম ও উদ্দেশ্য তিনি খুব সহজবোধ্য করে ব্যাখ্যা করেছেন। লেখক এই গ্রন্থে হাদিসের প্রকৃত বোধ অর্জনের উপর বিভিন্ন যুগের ওলামায়ে কেরামের অমূল্য বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন এবং প্রতিটি বিষয়ের উপর ফিকহি আলোচনার ক্ষেত্রে আনুষঙ্গিক উদাহরণ ও তথ্যের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন। সাথে সাথে তুলে ধরেছেন শাখাগত মাস-আলায় তাঁদের মতানৈক্যের কারণসমূহ।
এই গ্রন্থ অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য আলোচনায় সমৃদ্ধ। যা লেখকের সূক্ষ্মদৃষ্টি, বিস্তর অধ্যয়ন ও অসাধারণ উপস্থাপনা শৈলীর পরিচায়ক। সংক্ষিপ্ত হলেও এতে পাঠকবৃন্দ এমন অনেক তথ্য খুঁজে পাবেন যা অনেক বড় বড় কিতাবেও দুর্লভ। এছাড়া তিনি ইলমুদ দিয়ারাও ইলমুল রিওয়া তথা হাদিস ও ফিকাহের মাঝে সেতুবন্ধন গড়ে তুলেছেন।
গ্রন্থটি আমার কাছে অধিক পছন্দনীয় হবার আরেকটি কারণ হল, এর লেখক হাদিস ও রিজালশাস্ত্রের উপর গভীর পারদর্শী। ইতোপূর্বে তিনি হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) এর তাকরিবুত তাহযীব এবং ইমাম যাহাবির আল-কাশেফ এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ সহ আরও বহুগ্রন্থ রচনা করেছেন।
আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, এই গ্রন্থ পাঠক-পাঠিকাকে হাদিসের বোধ তথা ফিকাহের ইলম অর্জনে যারপরনাই উদ্বুদ্ধ করবে। আল্লাহ তায়ালা লেখককে তাঁর ইলম ও দ্বীনদারিত্বের উত্তম প্রতিদান দান করুন এবং তা থেকে সকলকে উপকৃত হবার তওফিক দিন।
শেষে ওলামায়ে কেরামের মতানৈক্যের ব্যাপারে আল্লামা আবু বকর ইবনুল আরাবী (রহ.) এর একটি কথা উল্লেখ করা সংগত মনে করছি। এটি উম্মতের জন্য ক্ষতিকর ঐক্যপরিপন্থী মতানৈক্য এবং কল্যাণকর মতানৈক্যের মাঝে পার্থক্য করেছে। পবিত্র কুরআনের ... واعتصموا بحبل الله আয়াতের ব্যাখ্যাপ্রসঙ্গে তিনি তাঁর আহকামুস সুগরা গ্রন্থে লিখেছেন,
"তোমরা বিভক্ত হয়ে পড়ো না, অর্থাৎ আক্বীদার ক্ষেত্রে বিভক্ত হয়ো না। অথবা তোমরা একে অপরের প্রতি হিংসা লালন করো না। অথবা শাখাগত বিষয়ে একে অপরকে ভুল সাব্যস্ত করো না। অর্থাৎ শাখাগত মাসআলা-মাসায়েলের ক্ষেত্রে একজন অপরজনকে অশুদ্ধ ভেবো না বরং প্রত্যেক মুজতাহিদ (ও তার অনুসারীগণ) তার ইজতিহাদ অনুযায়ী আমল করবে। কেননা এক্ষেত্রে প্রত্যেকেই আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরেছে এবং প্রত্যেকেই দলিলের উপর আমল করছে। আর এখানে যে দলাদলির ব্যাপারে নিষেধ করা হয়েছে তা হলো সেই ফেরকাবাজী যা মুসলমানদের মাঝে ফিতনা ও বিভক্তির কারণ হয়। কিন্তু শাখাগত বিষয়ের মতানৈক্য মূলত শরিয়তের সৌন্দর্য। কেননা রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
"যদি কোনো ফয়সালাকারী ইজতিহাদ করে এবং সে ইজতিহাদ সঠিক হয়, তবে সে দু'টি সওয়াবের অধিকারী হবে। আর সে ইজতেহাদ ভুল হয়ে থাকলে সে একটি সওয়াবের অধিকারী হবে।” ¹¹
গ্রন্থটিতে লেখক মতানৈক্যপূর্ণ কিছু বিষয়ও তুলে ধরেছেন। যেমন যয়িফ হাদিসের উপর আমল করা বা না করার বিষয়টি। এ প্রসঙ্গে তিনি সুনির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে যয়িফ হাদিসের উপর আমল করার ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা এনেছেন। তদুপরি ওলামায়ে কেরামের প্রাসঙ্গিক বক্তব্য ব্যাখ্যা সহকারে উল্লেখ করেছেন। বাস্তবতা হল, চার মাজহাবের প্রতিটিতেই কিছু মাস-আলার ক্ষেত্রে এমন কিছু যয়িফ হাদিসের উপর আমল করার রীতি রয়েছে যা ফকিহগণ আমলযোগ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন। যেমন,
نهي عن بيع الكالي بالكالي
রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাকিতে ক্রয়কৃত বস্তু বাকিতে বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। ¹²
পরিশেষে আমি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি যেন তিনি এই মূল্যবান কিতাবের মাধ্যমে সকলকে উপকৃত করেন এবং এর সংকলককে উত্তম প্রতিদান দান করেন।
মুস্তফা আহমাদ যারকা ১৫ মুহাররম, ১৩১৬ হিজরি
টিকাঃ
৭ সূরা তাওবা, আয়াত নং ১২২।
৮ তিরমিযী শরীফ, হাদীস নং ২৬৫৬।
৯ তিরমিযী শরীফ, খ.৫, পৃ.৬৬৪ হাদীস নং ৩৭৯০।
১০ সুনানে ইবনে মাজা, হাদীস নং ১৫১
১১ আহকামুস সুগরা, খ.১, পৃ. ১৫৩
১২ হাদীসটি অনেক মুহাদ্দিস বর্ণনা করেছেন। ইবনে আবি শাইবা (রহ.) তাঁর মুসান্নাফে হাদিসটি উল্লেখ করেছেন। আমি তাহকীকসহ হাদিসটি বিশ্লেষণ করেছি। হাদীস নম্বর ২২৫৬৬।
📄 প্রথম সংস্করণের ভূমিকা
الحمد لله رب العالمين و أفضل الصلوة و أكمل التسليم علي سيدنا و مولانا محمد رسول الله إمام الأيمة المجتهدين و سيد الهادين و المهتدين و علي آله و أصحابه أجمعين:
১৩৯৮ হিজরী সফর মাসের তৃতীয় বৃহস্পতিবার। শামের 'হালব' শহরের বিখ্যাত ইউনিভারসিটি 'জামেয়াতুর রওজা'য় অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে আমার একটি লেকচার দেয়ার সুযোগ হয়েছিলো। যার বিষয়বস্তু ছিলো 'হাদীসে নববির উপর ইমামদের ইখতেলাফ।' বক্ষমান পুস্তিকাটির সূচনা হয়েছে এই লেকচার থেকেই। অনুষ্ঠানে উপস্থিত আমার কিছু বন্ধুজন এই লেকচারটিকেই পুস্তকাকারে উপস্থাপনের সাগ্রহ অনুরোধ জানালেন। আর বললেন, এ থেকে সর্বসাধারণের দ্বীনি প্রয়োজন পূরণ হবে। তারা অধিকাংশ জিজ্ঞাসার সন্তোষজনক উত্তর এবং উদভ্রান্ত শ্রেণী সঠিক পথের দিশা পাবে। তাদের আগ্রহ এবং আলাহ তায়ালার তওফিক সেই আলোচনাটিকে যুক্তি- প্রমাণ, উদাহরণ ও তথ্য- উপাত্ত সমৃদ্ধ একটি কিতাব প্রণয়নে সাহায্য করলো। আমি লেকচারের মূল উপজীব্য বিষয়কে অবিকৃত রেখে বিষয়টি যথেষ্ট সাবলীল করার চেষ্টা করেছি।
সালাফের অনুসরণ-অনুকরণ বিষয়ক আমার লেখাগুলো আলেম ও শায়েখদের নিকট পেশ করেছি এবং এ কিতাবটি আমার উসতাযে মুহতারাম ফকীহুল আসর আল্লামা আব্দুল্লাহ সিরাজুদ্দীন এর নিকট পেশ করেছি। যিনি বাস্তবিকই মুহাক্কিক, মুতাকালিম, সুফি, মুফাসসির ও মুহাদ্দিস। আল- হামদুলিল্লাহ! তিনি এর সাথে একাত্মতা ঘোষণা ও প্রশংসা করে আমাকে ধন্য করেছেন।
অতঃপর আমি এটি রিয়াদের সর্বজনবিদিত মুহাক্কিক, মুহাদ্দিস, ফকিহ ও উসূলী আল্লামা শায়েখ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহ. এর নিকট প্রেরণ করেছি। তিনি তাঁর মূল্যবান অভিমত দিয়ে আমাকে ধন্য করেছেন। হে রাব্বুত-তাওফিক! আমাকে তাঁদের মন্তব্যের যোগ্য প্রতিভূ বানিয়ে দিন।
📄 শায়েখ আব্দুল আবু গুদ্দাহ ফাত্তাহ রহ. এর মূল্যবান অভিমত
আলহামদুলিল্লাহ! মুহাম্মাদ আওয়ামাহ রচিত 'আসারুল হাদীসিশ শরীফ ফি ইখতিলাফি আইম্মাতিল ফুকাহা' অধ্যয়নের সুযোগ হয়েছে। ১৩৯৮ হি. রমজানুল মুবারকের দ্বিতীয় দিন শনিবার রোদ- ঝলমল এক সকালে ইয়ামানের 'সানয়া'তে অবস্থানকালে এটি পড়ার সুযোগ হয়। আনন্দের বিষয় হলো, তাঁর এ মূল্যবান সংকলনের পুরোটাই এক বৈঠকে শেষ করেছি এবং তা থেকে যথেষ্ট উপকৃত হয়েছি। অন্তরের নিভৃত কোন থেকে শীতল ও প্রশান্ত প্রার্থনায় ডুবে ছিলাম মুতালা'আর পুরোটা সময়জুড়ে। রব্বুল আলামীন এর সংকলককে আরো বিস্তৃত তওফিকে আবৃত করুন। আমি আন্ত রিকভাবে কামনা করি, এর সদূরপ্রসারী ফল এতটা ব্যাপক হোক যে, এর দ্বারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম উম্মাহর সরল-সাধারণ মানুষকে সন্দিগ্ধকারীদের মুখে লাগাম লেগে যাবে। এরা বিস্তৃত পথ ছেড়ে কঠিন ও সংকীর্ণ পথ অবলম্বন করেছে। ফকিহ ইমামগণের ব্যাপারে বিষোদগার করে সাধারণ এবং সর্বজন স্বীকৃত ইমামগণের ইলম মর্যাদাকে মূর্খতার অপবাদ দিয়েছে। এভাবে মুসলিম উম্মাহের মাঝে বিচ্ছিন্নতাবাদের শ্লোগান তুলেছে।
আল্লাহ পাকের অশেষ কৃতজ্ঞতা যে, তিনি বিশ্লেষক ও সাহসী সংকলককে এর তওফীক দান করেছেন। আর তিনিই নেয়ামত ও তওফীকদাতা। আমরা তাঁর নিকট সরল ও সঠিক পথের দিশা চাই।
وصلي الله علي سيدنا و نبينا محمد و علي آله وأصحابه و أتباعه و الأئمة المجتهدين المعتبرين عند كل عالم و صالح و صدیق، آمین
আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ
একই বছরে (১৩৯৮হিঃ) ২৬ শে শাওয়াল বৃহস্পতিবার হিন্দুস্থানের বিখ্যাত মুহাদ্দিস শায়েখ আল্লামা হাবীবুর রহমান আজমী হালবে আগমন করেন। শায়খের আগমনে আমি খুবই আনন্দিত হই। কারণ তখনও কিতাবের পান্ডুলিপি ছাপার জন্য প্রেসে পাঠানো হয়নি। সুযোগমত আমি তাঁকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এ পুস্তকটি শুনালাম। তিনি অত্যন্ত আগ্রহ ও মনযোগের সাথে এটি শ্রবণ করে যারপরনাই সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বললেন, "তুমি আমাকে যা কিছু পড়ে শুনিয়েছো, আমি তার প্রত্যেকটি অক্ষরের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করছি।"
সমস্ত প্রশংসা এক আল্লাহর জন্যই। তাঁর মহত্বের কাছে আকুল মিনতি, তিনি যেন একে মহা বিপদের দিন আমার নাজাতের ওসিলা বানিয়ে দেন। এর দ্বারা ব্যাপকভাবে মানুষকে উপকৃত করেন। তিনিই একমাত্র তওফিক দাতা।
মুহাম্মাদ আওয়ামাহ
হালব, জমইয়্যাতুত তায়ালিমিশ শরয়ী, ২/১১/১৩৯৮ হিঃ
📄 অবতরণিকা
শরয়ী ব্যাপারে ইখতেলাফে আইম্মার কারণসমূহ আলোচনা-পর্যালোচনা প্রত্যেক মুসলমানের ইলম ও আমলী জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর মাধ্যমে একজন মুমিন শরিয়তের মূল উৎস কুরআন ও সুন্নাহ থেকে মাসয়ালা আহরণে ইমামদের পূর্ণ দক্ষতা সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করে। সে উপলব্ধি করে যে, ইমামগণ মাসআলা উদঘাটনে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। আর কর্মজীবন তথা আমলী জিন্দেগীতে এ বিষয়টির আলোচনা-পর্যালোচনা তার অন্তরকে ইমামদের ব্যাপারে চিন্তামুক্ত ও প্রশান্ত রাখে। কেননা এসব ইমামদের হাতে সে তার মুয়ামালাত, মুয়াশারাত, আখলাকিয়াত ও সূলুকের লাগাম দিয়েছে এবং তাঁদেরকে সে আলাহ ও নিজের মাঝে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে। একজন মুমিন তার সাধ্যানুযায়ী ইমামদের মতানৈক্যের কারণ সম্পর্কে অবগত হয়েই কেবল এ প্রশান্তি অর্জন করবে।
জেনে রাখা দরকার, ইমামদের মতানৈক্যর সুনির্দিষ্ট উসূল ও নীতিমালা রয়েছে। সত্যান্বেষণ ও নীতি-নিষ্ঠ বিধান অর্জন ছিলো তাদের মূল লক্ষ্য। অতএব, যে বিষয়ে ঐকমত্য পৌঁছা সম্ভব ছিল, সে বিষয়ে তারা ঐকমত্য পৌঁছেছেন। যে বিষয়ে মতানৈক্য থেকে বাঁচার কোন পথ ছিল না, সে বিষয়ে মতানৈক্য হয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের কোন ত্রুটি নেই। কারণ, তারা ছিলেন নিরেট সত্যান্বেষী। স্পষ্ট দলিলের অনুসারী। তাদের কেউ গোঁড়ামী, আত্মম্ভরিতা বা অহংকারের বশবর্তী হয়ে মতানৈক্য করেননি। নিজেকে পরিচিত ও প্রসিদ্ধ করার উদ্দেশ্যেও কারও ছিলো না। বরং দলিলের দাবি অনুযায়ী তারা বাধ্য হয়ে মতানৈক্য করেছেন।
বর্তমানে বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। উপর্যুক্ত বাস্তবতার বিপরীতে আমরা একটি ভয়ংকর ও ধ্বংসাত্মক স্রোতের মুখোমুখি হয়েছি। সমাজের একশ্রেণীর মানুষ ইমামদের সম্পর্কে কুধারণা পোষণ করছে। ইমামদের ইলম ও আমলী জিন্দেগীর প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে অভিনব সব কথাবার্তায় জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করছে। তারা ইমামদের উপর এমন এক শ্রেণীকে প্রাধান্য দেয়, যারা তাদের সাথে কখনও তুলনীয় হতে পারে না। অথচ ইমামগণ ছিলেন যুগে যুগে বুদ্ধিজীবী, কাজী, ফকিহ ও বিচারকরদের গর্ব। দীন-ইসলামের সংরক্ষক। পাহাড়সম উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। এরা নিজেরাও বোঝে না যে তারা কীসের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে।
ফকিহদের মতানৈক্যের বিষয়টি মূলত: ইজতেহাদের একটি অংশ। একারণে মতানৈক্য বিষয়ক আলোচনা শুধু জটিলই নয় বরং শাখা- প্রশাখাযুক্তও। মূল বক্তব্য শুরুর পূর্বে মতবিরোধের একটি
বিশেষ দিক নির্দিষ্ট করে নেয়া জরুরি। আমি এখানে মূলত: ইমামদের মতবিরোধের ক্ষেত্রে হাদিসের ভূমিকা বিষয়ে আলোচনা করবো। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালার সাহায্য ও রহমত কামনা করছি।
ইমামদের মতবিরোধ বিষয় আলোচনাটি আমি এভাবে উপস্থাপন করেছি।
ক. প্রারম্ভিকা: ইমামদের নিকট হাদিসের মর্যাদা।
খ. মতানৈক্যের প্রথম কারণ: হাদিস কখন আমলযোগ্য হয়।
সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মতানৈক্যের দ্বিতীয় কারণ: হাদিসের বুঝ অর্জনে তারতম্য।
ঘ. মতানৈক্যের তৃতীয় কারণ: বাহ্যিকভাবে পরস্পর বিরোধী হাদিসের ক্ষেত্রে ইমামগণের মতবিরোধ
ঙ. মতানৈক্যের চতুর্থ কারণ: হাদিস সম্পর্কে অবগতির তারতম্যেও কারণে সৃষ্ট মতবিরোধ।
এছাড়াও কিছু প্রচলিত ধারণা ও অভিযোগ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এগুলো বুঝতে ও সমাধান করতে অনেকেই ব্যর্থ হয়েছে। পরিশিষ্ট হিসেবে কিতাবের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের একটি সারসংক্ষেপও উল্লেখ করেছি।