📄 দ্বিতীয় ও চতুর্থ সংস্করণের ভূমিকা
সমস্ত প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক আলাহর জন্য। তাঁর মহান নির্দেশ, "আর সব মোমিনের অভিযানে বের হওয়া সংগত নয়। তাই তাদের প্রত্যেক দলের একটি অংশ কেন বের হলো না। তারা দীনের জ্ঞান লাভ করবে। এবং স্বজাতির কাছে প্রত্যাবর্তন করে তাদেরকে সতর্ক করবে। ফলে তারা সঠিক পথে ফিরে আসবে।”¹
দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের সরদার মুহাম্মাদ সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি। তিনি এরশাদ করেছেন,
يَحْمِلُ هَذَا الْعِلْمَ مِنْ كُلِّ خَلَفٍ عُدُولُه، يَنْفُونَ عَنْهُ تَحْرِيفَ الْغَالِينَ ، وَ إِنْتِحَالَ الْمُبْطِلِينَ، وَ تَأْوِيلَ الْجَاهِلِينَ
“পূর্ববর্তীদের ন্যায় নিষ্ঠ ও সৎ লোকেরাই ইলমকে ধারণ করবে। সীমালঙ্ঘনকারীদের বিকৃতি, পথচ্যুতদের হস্তক্ষেপ ও মূর্খদের অপ-ব্যাখ্যা থেকে তা সংরক্ষণ করবে।”²
এটি আসারুল হাসীসিশ শরীফ গ্রন্থের দ্বিতীয় ও চতুর্থ সংস্করণ।³ দীর্ঘ দিন হল আগের সংস্করণ ফুরিয়ে গেছে। নতুন সংস্করণ প্রকাশের জন্য পাঠকবৃন্দ থেকে বারবার তাগাদা আসছিল। তাই এবারের সংস্করণ।
প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, আপনারা নিশ্চয় বইয়ের আলোচ্য বিষয়ের নাজুকতা এবং সেই সাথে এর গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত আছেন। বলাবাহুল্য, এ গ্রন্থের অনুরাগী-অনুযোগী দু'শ্রেণিরই পাঠক-পাঠিকা রয়েছেন।
فلا تسمع الأقوال من كل جانب
فلا بد من مثن عليك و قادح
“যে কারও কথায় কান দিয়ো না। স্বাভাবিক হল, কেউ তোমার প্রশংসা করবে আবার কেউ নিন্দা করবে।"৪
বর্তমানে যুবসমাজ এক শ্রেণির ভ্রমগ্রস্ত স্বাধীন আলেম দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। দ্বীনি বিষয়ে এদের স্বাধীনতাচর্চা ও যাচ্ছেতাই হস্তক্ষেপ ভয়াবহ পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। আমাদের অগ্রজ ওলামায়ে কেরামের প্রসিদ্ধ ও সর্বজনগৃহীত মতাদর্শের বিরোধীদের আজকাল মুজাদ্দিদ বা দায়ীয়ে ইসলাম জাতীয় সম্মাননা ও উপাধি দেয়া হচ্ছে। বলাবাহুল্য, এ ধরনের উপাধি প্রদান এই বিরোধিতাকারীদের উঁচু করে দেখাবার অপপ্রয়াস মাত্র।
এলেম, আদব ও সুস্থ পরিবেশের অভাবে যুবক শ্রেণির মনে যেসব ধ্যান-ধারণা ব্যাধি রূপ নিয়েছে তা যাতে সত্যিকার পরিশুদ্ধ বোধে রূপায়ণ হয়, এ গ্রন্থে আমি সে চেষ্টাই করেছি। অন্যভাবে বলা চলে, এটি আমাদের অগ্রজ-অনুজদের পথ ও পদ্ধতি সংরক্ষণের একটি ছোট প্রয়াস। আমার আত্মিক প্রশান্তির জন্য আমি মনে করি এটুকুই যথেষ্ট।
সংক্ষিপ্ত এগ্রন্থটি উম্মাহর শীর্ষ আলেম ও স্কলারদের সন্তুষ্টি ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে। এঁদের মধ্যে যাঁর সন্তুষ্টি ও আন্তরিকতা আমার জন্য সীমাহীন আনন্দের বিষয় বলে মনে করি তিনি ভারত উপমহাদেশের আলেমকুল-শিরোমণি শায়খুল হাদিস আলামা যাকারিয়া কান্ধলবী (রহ.)। শায়খ আনন্দচিত্তে তাঁর এক ছাত্রের মাধ্যমে গ্রন্থটির সূচিপত্র শ্রবণ করেন, সেই মজলিসে আমিও উপস্থিত ছিলাম। সূচিপত্র শোনা হলে তিনি সন্তুষ্ট হন। তাঁর ছাত্রকে সম্পূর্ণ বই পড়ে শোনাবার জন্য বলেন। এমনকি শায়খ যখন মৃত্যু শয্যায় শায়িত সেসময়ও তিনি মনোযোগ সহকারে সম্পূর্ণ কিতাব শোনেন। একটি মূল্যবান অভিমত দিয়ে শায়খ আমাকে ধন্য করেছেন। (আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জান্নাত নসিব করুন। আমিন।)
আল্লাহর অপার অনুগ্রহে এক ইলম মজলিসে আলেমগণের মুরব্বী, ফকিহগণের শিরমুকুট শায়খ আলামা আহমদ যারকা রহ. কিতাবটি পাঠ করে তাঁর সন্তোষ প্রকাশ করেন। ইলম ব্যস্ততার মধ্য থেকেও তিনি মূল্যবান সময় দিয়েছেন। তাঁর একটি অমূল্য অভিমত গ্রহণ করতে পেরে আমি ধন্য। পাশাপাশি শায়খ কিতাবটিকে দিরায়াত ও রেওয়াত এর মাঝে 'সেতুবন্ধন' হিসেবে উল্লেখ করে আমার কর্তব্য অনেকগুণে বাড়িয়ে দিয়েছেন। কারণ তা একটি অসামান্য কঠিন কাজ। বিশেষত মানুষ রেওয়াতের ইলম বা হাদিস বর্ণনা সম্পর্কিত জ্ঞানকে সহজ ও ব্যবহারিক মনে করেছে। এবং দিরায়াতের ইলম তথা হাদিসের বোধ অর্জন বা ফিকাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। যেমন প্রবাদ রয়েছে,
الناس أعداء لما جهلوا
"মানুষ অজানা বিষয়ের শত্রু"
উম্মাহর এ ক্রান্তিলগ্নে আমি আল্লাহর কাছে তাঁর সাহায্য ও তওফিক চাইছি। এই গ্রন্থ লেখার কারণে আমাকে কিছু কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়েছে। এর উপর আমি তুষ্টচিত্তে ধৈর্যধারণ করেছি। আমি এর প্রতিদান আশা করি যিনি জগৎসমূহের প্রতিপালক এবং বিচার ও প্রতিদান দিবসের মালিক, তাঁরই কাছে। একশ্রেণির লোক এই বলে আমাকে দুষেছে যে, এই গ্রন্থনা মুহাদ্দিসগণের সাথে প্রকাশ্য শত্রুতা ও সুস্পষ্ট বিরোধিতা। এধরণের অতথ্য থেকে আমি মহান আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। মুহাদ্দিসীনদের বিরোধিতা করে এই কিতাবে কিছু তো উল্লেখিত হয়নি বরং আমার ভাষায় এমন একটি শব্দও পাওয়া যাবে না যাতে এ রকমের বক্তব্যের প্রতি সামান্য সম্বন্ধও প্রকাশ পায়। অবশ্য ফিকাহ ও মুহাদ্দিস ফকিহগণের অবস্থান ও মর্যাদা এবং শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মপন্থার বিশুদ্ধ বোধ অর্জনে তাদের যোগ্যতা ও উঁচু অবস্থান উল্লেখ করা যদি এই শ্রেণির কাছে হাদিসের বিরোধিতা হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। তাঁদের সম্পর্কে এছাড়া আর কী বলা যায়,
وكم من عائب قولا صحيحا
وآفته من الفهم السقيم
সঠিক কথার দোষান্বেষীর অভাব নেই। আর এ ব্যাধির মূল হল, তাদের বক্র চিন্তা-চৈতন্য।
আমার মনপ্রসন্নতার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, অচিরেই জালিম ও মজলুমের মাঝে ফয়সালার দিন এসে পড়বে। সেদিন জালিমের কাছ থেকে মজলুমের হক কড়ায় গণ্ডায় আদায় করে নেয়া হবে। নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা আমার অবস্থা সম্পর্কে অবগত আছেন, আমি শরিয়তের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হাদিস সংরক্ষণার্থে এ কাজে নিবিষ্ট হয়েছি। যাতে হাদিস ও নবিজির সুন্নতের নামে দীন নিয়ে তামাশাকারীদের হীনকর্মের প্রতিষেধ করা যায়।
ইসলামি ফিকাহ হল কুরআন ও সুন্নাহর ফলাফল ও সার অংশ। কোন বিষয়ের ফলাফল ও সারাংশের সংরক্ষণকে সেই বিষয়ের বিরোধিতা হিসেবে মানুষ কীভাবে আখ্যা দেয়! ফকিহ কোনো ইমাম বা ফিকাহের উপর আক্রমণ প্রতিহত করা এসব মানুষের কাছে গোঁড়ামি বা অন্ধানুকরণ। তাদের উদ্দেশ্য, মানুষ যেন কিতাব ও ইলম থেকে উপকৃত হওয়া থেকে বিমুখ হয় এবং তারা নিজেরাই ইলমের ক্ষেত্রে নিজস্ব ক্ষেত্র তৈরি করে নিতে পারেন। এমনকি তারা দীন ও ইলমের মধ্যে তাদের অসংলগ্ন ভাষাও প্রয়োগ করে থাকেন অমুক সংস্কারপন্থী, তমুক সনাতনপন্থী ইত্যাদি।
একবার এক শীতের রাতে ইশার নামাজের পর আমার কাছে এক যুবক আসে। সে হালবের এক ওয়ার্কশপে মেকানিক হিসেবে কাজ করত। আমার সাথে সে যখন কথা বলছিল, তখন তার কথা বলার ধরন ছিল তার নেতাদের মতই অপরিশীলিত, অসংলগ্ন। বোঝা গেল, সে বেচারা ইলম নিয়ম-কানুন ও দীনের বোধশূন্য একজন সাধারণ লোক। আমি এতে ধৈর্যধারণ করি। আসলে আল্লাহর স্মরণ ও কর্তব্যজ্ঞান আমার একাজকে সহজ করেছে। তার সাথে অনেকক্ষণ ধরে এভাবে কথা বলতে বলতে রাত বারোটা বেজে গেলে সে কোনো মীমাংসা ছাড়াই সেদিনকার মত উঠে চলে যায়।
সে সঙ্গে করে একটি কাগজ এনেছিল। তাতে লেখা ছিল ইমাম মুসলিম (রহ.) উটের গোশত খাবার পর ওজু করার হাদিস বর্ণনা করেছেন। এবং ইমাম নববি (রহ.) নিজ মাজহাবের বিপরীত হাদিসের উপর আমল করেছেন। কাগজটিতে আরও উল্লেখ ছিল ইযা সাহহাল ফাহুয়া মাজহাবি (হাদিস সহিহ হলে সেটিই আমার মাজহাব।) এবং আল্লামা কামাল ইবনে হুমাম ও আল্লামা আবদুল হাই লাখনবী (রহ.) এর নাম।
সে আলামা ইবনুল হুমাম এর নাম ইবনুল হাম্মাম এবং আলামা আবদুল হাই লাখনবী (রহ) এর নাম আবদুল হাই লাকানবী উচ্চারণ করছিল। সে কেমন অক্ষরহীন ছিল তা এ থেকে সহজেই অনুমেয়।
তার বক্তব্যের সার ছিল, ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম শাফেয়ি (রহ.) যেহেতু "হাদীস সহিহ হলে সেটিই আমার মাজহাব" এর প্রবক্তা, তাই তাদের উচিত ছিল উটের গোশত খাওয়ার পর ওজু করার বিধান দেয়া। কেননা এখানে উটের গোশত খাওয়ার পর ওজু করার হাদিসটি সহিহ।
আমি আল্লাহর ওয়াস্তে পাঠক-পাঠিকাদের কাছে প্রশ্ন করব, একজন সচেতন মুসলমান কীভাবে কুরআন এবং নবিজি সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নত থেকে উৎসারিত ফিকাহ সম্পর্কে এ ধরনের ধোঁকায় নিপতিত হয় বা সন্দেহ সৃষ্টিকারীদের ব্যাপারে ধৈর্যের পরিচয় দিতে পারে! জানা প্রয়োজন, এ ধরনের বিভ্রান্ত লোকেরা এসব সন্দেহ সৃষ্টিদেরই প্রবঞ্চনার শিকার। এখন আপনারাই ভেবে দেখুন, সত্যিকার গোঁড়া ও অন্ধ কারা।
তাদের ধারণা, দিকভ্রান্ত লোকদের ভুলগুলি যারা শুধরে দিতে চায় তারাই নাকি যুবক শ্রেণিকে পথভ্রষ্ট করছে! পারত পক্ষে তারা যুবক শ্রেণিকে ইজতিহাদ ও মুজতাহিদের আসনে বসাবার জন্য উৎসাহ যোগাচ্ছে। যাতে তারা পবিত্র শরিয়তকে নিজ ইচ্ছানুসারে বিকৃত ও পদদলিত করতে পারে।
আলামা নববি ও আলামা সুবকি (রহ.) তাদের শাফেয়ি মাজহাবের কিছু মাস-আলার সাথে মতদ্বৈততা করেছেন। একইভাবে আল্লামা ইবনে আরাবী এবং আল্লামা কাজী ইয়াজ (রহ.) তাঁদের মালেকি মাজহাবের কিছু মাস-আলায় মতবিরোধ করেছেন। আল্লামা আইনী ও আল্লামা ইবনুল হুমাম (রহ.) তাঁদের হানাফি মাজহাব এবং ইবনে তাইমিয়া ও ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) তাঁদের হাম্বলি মাজহাবের কিছু কিছু মাস-আলার ক্ষেত্রে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। ভ্রষ্ট লোকেরা এসব মতভিন্নতা দেখে মনে করেন ও সেই সাথে প্রচারও করেন যে, ইমামদের ভুল হয়েছে। একারণে তাদের অনুসরণ বৈধ নয়। সাধারণের উচিত এই ইমামদের বিরোধিতা করা, ঠিক যেভাবে এই আলেমগণ দ্বিমত করেছেন।
আপাতদৃষ্টিতে তাদের একথা সঠিক প্রতীয়মান হলেও, সন্দেহ নেই, তাদের এই মতামত সুস্পষ্ট ভ্রান্তি। কেননা তারা যে তুলনাটি করেছে সেটিই ভুল। আপনিই বলুন, নব আবির্ভূত এ শ্রেণির মাঝে কে এমন রয়েছে যে আলামা নববি, সুবকি, আইনী, ইবনুল হুমাম, ইবনে তাইমিয়া বা ইবনুল কাইয়্যিম প্রমুখ আলেমগণের সাথে তুলনীয় হতে পারে!
সত্যি বলতে তারা দীনের মৌলিক বিষয়গুলিকে হাসি-ঠাট্টার অনুষঙ্গে রূপ দিচ্ছে। অজ্ঞতা ও মূর্খতাকে পুঁজি করে মানুষের মাঝে বিস্তৃত করছে ভ্রাম্নি জাল। এধরণের অভিযোগ তুলে ফকিহ ও সলফে-সালেহীনদের কর্মপন্থার নিন্দা ও তা প্রত্যাখ্যানের আহ্বান করছে। তাদের অবস্থা হলো, তারা নিছক নিজেদের প্রসিদ্ধি অর্জনে অন্যের সমালোচনা ও নিন্দায় লিপ্ত হয়। যখন কোনো বিষয়ে কিছু বলা বা লেখার অবকাশ থাকে, তখন তারা যেকোনো একটি কিতাবের উদ্ধৃতি প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। অথচ উদ্ধৃতি দেবার কৌশল, বিশুদ্ধভাবে এবারত পাঠ ও এর মর্মোদ্ধারের পন্থা সম্পর্কে এরা প্রায় সম্পূর্ণ অজ্ঞ।
তাদের মাঝে কেউ কেউ নিজেদের রচনা ও সংকলনগুলিকে জনসম্মুখে প্রচার করেন। এগুলো মুখ্যত গালিগালাজ, নোংরা দোষচর্চা, অমূলক সমালোচনা ও ভিত্তিহীন অভিযোগে আকীর্ণ। তাদের বাসনা, দুনিয়ার সব লেখক যেন তাদের প্রতি বশ্যতা স্বীকার করে নেন এবং তাদের মতই গালিগালাজ ও নোংরা দোষচর্চায় লিপ্ত হন। অহংবোধ ও আত্ম-দম্ভের কারণে অন্য কাউকে ইলম ও পরিশুদ্ধ চিন্তা- চৈতন্যের ধারক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার ক্ষেত্রে তারা অতিশয় কুণ্ঠাবোধ করেন।
তাদের এসব কাজকমের উপর কিছু ওলামায়ে কেরাম বলেন, 'তোমরা অন্যের জন্য তাকলিদের দ্বার উন্মুক্ত করো আর অন্যদেরকে নিজেদের অনুসারী বানাতে ব্যতিব্যস্ত থাকো। তাদের একজন নুমান আলুসী রহ. এর আল আয়াতুল বায়্যিনাত কিতাবের ভূমিকায় প্রথম আট পৃষ্ঠা অনর্থক ও মনগড়া বক্তব্য লিখেছেন। এরই পরিণতি হিসেবে তার বেশ কিছু অনুসারী-অনুরক্ত যুবক সব ধরনের নিয়ম- নীতি লঙ্ঘন করে নিছক অন্যকে কষ্ট দেয়াতে লিপ্ত হয়েছে। এরা নিজেদেরকে ভেবে বসেছে মুজতাহিদ বা এরও উর্ধ্বে।
এই কিতাবে না ছিল ইলম কোনো সমালোচনা যার প্রত্যুত্তর দেয়া প্রয়োজন, না তিনি কোনো তাৎপর্যময় কথা লিখেছেন যা বিশ্লেষণ করা যায়। ব্যতিক্রম ছিল, আল্লামা ইবনুস সালাহ ও আল্লামা তকিউদ্দীন সুবকি (রহ.) এর দু'টি উক্তি। আলহামদুলিল্লাহ আমি এর উত্তর দিয়েছি এবং এ ব্যাপারে তার অজ্ঞতার স্বরূপ তুলে ধরেছি। তিনি তার এ কিতাবের সনদ হিসেবে অভিজ্ঞ ওলামায়ে কেরামের স্বীকৃতি নেবার চেষ্টা করেছিলেন। ইলমুল উসুলের অজ্ঞতা হেতু তিনি এ প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হন।
আমি তার অন্য একটি কিতাবের ভূমিকায় দেখেছি। তিনি আমার কিছু কথার এমন ব্যাখ্যা করেছেন যার সাথে মূল প্রসঙ্গের কোন সাদৃশ্যও নেই। ভাবলে বিস্মিত হই, এ কি তার অজ্ঞতা নাকি তিনি বুঝেও না বোঝার ভান করছেন! এমন অজ্ঞতা বা অজ্ঞতার ভান করার সুমিষ্ট ফলাফলও তিক্ত হয়ে থাকে।
তিনি হয়তো ভেবেছিলেন ওলামায়ে কেরাম আমার কিতাবটি পাঠে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবেন। অথচ, মহান আলাহর অনুগ্রহে এ কিতাব বহু সময় ধরে উম্মতের সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেম ও ইলমইলম শিক্ষার্থীদের মাঝে সমাদৃত হয়ে আসছে।
আল্লাহ তায়ালার তওফিকে এটি সেই সত্যের বহিঃপ্রকাশ যাতে আমার বিশ্বাস এবং সেই বাতিলের খণ্ডন যা আমি পরহেজ করি। আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রার্থনা, যারা এ কিতাব কল্যাণের উদ্দেশ্য পাঠ করবে তিনি যেন তাদের হেদায়েত দিয়ে থাকেন। তবে যারা মনে প্রাণে হিংসা ও বিদ্বেষ রেখে পাঠ করবে, তাদের সব ধরনের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। এ ব্যাপারে আমার কোনো দায়ও নেই।
فَأَمَّا الزَّبَدُ فَيَذْهَبُ جُفَاءً وَأَمَّا مَا يَنْفَعُ النَّاسَ فَيَمْكُثُ فِي الْأَرْضِ
অতএব, ফেনা তো শুকিয়ে খতম হয়ে যায় এবং যা মানুষের উপকারে আসে, তা জমিতে অবশিষ্ট থাকে। আল্লাহ্ এমনিভাবে দৃষ্টান্তসমূহ বর্ণনা করেন।⁶
হে আল্লাহ, আমাদের, আমাদের পিতা-মাতা, শিক্ষক, পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততি ও মুসলিম উম্মাহকে মাগফিরাত দান করুন। কেয়ামত অবধি অগণিত দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক, রাসুলুলাহ হজরত মুহাম্মাদ সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর, তাঁর পরিবার এবং অনুসারী সাহাবিগণের উপর।
মুহাম্মাদ আওয়ামাহ
মদীনা মুনাওয়ারা
১৬ শাবান, ১৪০৬ হিজরি
২২ শাবান, ১৪১৬ হিজরি
টিকাঃ
১ সূরা তাওবা, আয়াত নং ১২২।
২ হাদীসটি প্রায় দশজন সাহাবি থেকে বর্ণিত। এটি কবুল (গ্রহণযোগ্য) বা রদ (প্রত্যাখ্যাত) হবার ব্যাপারে মুহাদ্দিসদের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) হাদীসটি সহীহ হবার কথা বলেছেন। আমার ধারণা, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) হাদীসটিকে সহীহ বলা দ্বারা তা ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য হবার বিষয়টি নির্দেশ করেছেন। তাঁর কাছে পারিভাষিকভাবে সহীহ হওয়া উদ্দেশ্য নয়। আল্লামা আলাবী (রহ.) তাঁর বুগইয়াতুল মুলতামিস গ্রন্থে লিখেছেন, হাদীসটি হাসান, গরীব ও সহীহ। (বুগইয়াতুল মুলতামিস, পৃ. ৩৪)
৩ এই গ্রন্থের তৃতীয় সংস্করণ মূলত দ্বিতীয় সংস্করণের অনুলিপি। পার্থক্য, পরের সংস্করণে একটি অতিরিক্ত সংযুক্তি যুক্ত হয়েছে।
৪ এটি ইহইয়াউল উলুম ও আল-কামুস এর ব্যাখ্যাকার আলামা মুহাম্মাদ মুর্তজা যাবিদি (রহ.) এর কবিতার পঙক্তি।
৫ মৃত্যুঃ পহেলা শাবান, ১৮০২ হিজরি। তিনি মদীনা মুনাওয়ার জান্নাতুল বাকীতে শায়িত আছেন।
৬ সূরা রা'দ। আয়াত নং ১৭।
📄 শায়খুল হাদিস আল্লামা যাকারিয়া কান্ধলবী (রহ.) এর অভিমত
الحمد لله الذي توالت علينا نعماؤه و اتصلت بنا آلاؤه، و الصلوة والسلام علي سيد خلقه محمد الذي تم حسنه و بهاؤه، و عم لنصح الخلق جهده و بلاؤه، وعلي آله وأصحابه الذين إقتبسوا نور حديثه و نالهم ضيائه، و علي من إتبعهم بإحسان إلى يوم الدين
أما بعد:
আলাহ তায়ালা পবিত্র কুরআন সংরক্ষণের সৌভাগ্য এ উম্মতের হাফেযদের দান করেছেন। উভয় জাহানের সরদার হজরত মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নত সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন উম্মতের মুহাদ্দিস ও ফকিহদের মাধ্যমে। যারা দুর্বল ও শক্তিশালী হাদিস শনাক্ত করেছেন এবং সহিহ ও হাসান হাদিসের নিরিখে আহরণ করেছেন হুকুম-আহকাম।
তাঁরা হাদিসের বিস্তর ক্ষেত্রে নাসেখ-মানসুখ সম্পর্কে অবগত হবার জন্য হাদিস নিয়ে গবেষণা করেছেন। সঠিক মর্মোদ্ধার প্রণালি অধ্যয়ন করেছেন। যে হাদিসগুলিকে প্রাধান্যের উপযুক্ত ভেবেছেন সেগুলিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। হাদিসের শব্দভাণ্ডার ও মর্ম-সাগরের নিতলে ডুব দিয়ে উদ্ধার করে এনেছেন কাঙ্ক্ষিত মর্ম। আহরণ করেছেন উসুল থেকে শাখাগত মাস-আলা। পাশাপাশি এসব কিছুকে সুবিন্যস্ত করেছেন অধ্যায় ও পরিচ্ছেদে, গ্রন্থাদির কলেবরে। হে আলাহ, আপনি তাঁদের উপর আপনার রহমত ও প্রশান্তির বারি বর্ষণ করুন এবং জান্নাতের সুউচ্চ স্তর দান করুন।
হাদিসের স্ববিরোধিতা দূরীকরণ, মতানৈক্যের হাদিসগুলির ক্ষেত্রে একটির ওপরে আরেকটিকে প্রাধান্যদান, অস্পষ্ট হাদিসের ব্যাখ্যাপ্রদান এবং দুর্বোধ্য হাদিসের বিশ্লেষণে মুহাদ্দিসগণের রয়েছে অপরিসীম অবদান। অভিন্ন উদ্দেশ্য ও পারস্পরিক হৃদ্যতা বজায় রেখে মাসআলা আহরণ ও প্রাধান্যদানের পদ্ধতির বিভিন্নতার কারণে অনেক বিধানে তাদের মাঝে মতানৈক্য ঘটেছে। এ মতানৈক্য যেমন স্বাভাবিক, ঠিক তেমনই অবশ্যম্ভাবীও। এতে অযৌক্তিক বা নিন্দনীয় কোনো বিষয় নেই। উপরন্তু তা উম্মতের জন্য রহমতস্বরূপ। এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরাম সম্যক অবহিত আছেন।
আরবিতে একটি প্রবাদ রয়েছে, মানুষ অজ্ঞতার শত্রু। এ প্রবাদ অনুযায়ী, দীনের বোধ ও ইলমশূন্য একশ্রেণির মানুষ ফকিহগণের উপর অবান্তর অভিযোগ করে। তাদের বিরুদ্ধে দুর্বিনীত ও অপরিশীলিত ভাষা ব্যবহার করে থাকে। সেকারণেই, অগ্রজ-অনুজ আলেমগণ মতবিরোধের কারণসমূহের উপর বেশ কিছু বিশ্লেষণী গ্রন্থ লিখে গেছেন। যেমন শায়খুল ইসলাম আহমাদ আবদুল হালীম ইবনে তাইমিয়া আল-হাররানী (রহ) এর রাফউল মালাম আন আয়িম্মাতিল আ'লাম এবং কাজী আবুল ওয়ালিদ ইবনে রুশদ আল-কুরতুবী (রহ) এর বিদায়াতুল মুজতাহিদ।
এবিষয়ে আমিও আমার যৌবনে একটি বই লিখেছিলাম। বইয়ের নাম ইখতিলাফুল আয়িম্মা। আলহামদুলিলাহ, এ থেকে মানুষ উপকৃত হয়েছে।
ভাতৃপ্রতিম শায়খ আল্লামা মুহাম্মাদ আওয়ামাহ তিন বছর আগে হালবের আর রওযা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়ের উপর সারগর্ভ একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। এই প্রবন্ধই পরবর্তীতে তিনি সংযোজন-বিয়োজন করে গ্রন্থে আকার দেন। যার নামকরণ করা হয় আসারুল হাদীসিশ শরীফ ফি ইখতিলাফি আয়িম্মাতিল ফুকাহা। ছানিরোগ ও বার্ধক্য হেতু আমি কিতাবটি নিজে পড়তে পারিনি। তবে আমার এক সঙ্গীর মুখে এর পাঠ শুনেছি। এটি আমার কাছে যথেষ্ট উপকারী মনে হয়েছে। সংক্ষিপ্ত হওয়া সত্ত্বেও এর রয়েছে উচ্চাঙ্গিক ইলম আলোচনা ও তত্ত্বের সমৃদ্ধি। এ কিতাব থেকে আমি যথেষ্ট উপকৃত হয়েছি এবং প্রসন্ন বোধ করছি। এটি আলেম ও তালেবে ইলমের পাঠযোগ্য, বক্রতা ও বিচ্ছিন্নতা থেকে সুপথের নির্দেশক। ইমামদের ব্যাপারে অশালীন উক্তিকারী যালেম ও হতভাগ্যদের দল থেকে মুক্তির আলোকবর্তিকা।
আল্লাহর কাছে আমার প্রার্থনা, তিনি যেন আমাদের এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে তাঁর মনোনীত ও সন্তুষ্টির পথে চালিত করেন এবং তাঁর প্রেরিত নূর ও হিদায়াত প্রাপ্ত নবির আনীত ধর্মের উপর অটল-অবিচল থাকবার তওফিক মঞ্জুর করেন এবং এর উপরই আমাদের মৃত্যু দান করেন।
যাকারিয়া ইবনে মুহাম্মাদ কান্ধলবী
মদীনা মুনাওয়ারা
১৫ শাবান, ১৪০১ হিজরি
📄 শায়খ মুস্তফা আহমাদ আয-যারকা রহ. এর অভিমত
যাবতীয় প্রশংসা মহিমাময় আলাহর জন্য। তিনি পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন,
“আর সমস্ত মুমিনের অভিযানে বের হওয়া সংগত নয়। তাই তাদের প্রত্যেক দলের একটি অংশ কেন বের হলো না, যাতে দীনের জ্ঞান লাভ করে এবং সংবাদ দান করে স্বজাতিকে, যখন তারা তাদের কাছে প্রত্যাবর্তন করবে, যেন তারা বাঁচতে পারে।”⁷
দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক শেষ নবি হজরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি। তিনি ইরশাদ করেছেন,
“আল্লাহ ঐ ব্যক্তিকে প্রফুল্ল রাখেন যে আমার নিকট থেকে কিছু শ্রবণ করে। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘সেসে আমার কাছ থেকে হাদিস শ্রবণ করে এবং যেভাবে শুনেছে ঠিক সেভাবেই অন্যকে পৌঁছে দেয়। অনেক শ্রোতা এমন রয়েছে যারা বার্তা বাহক অপেক্ষা অধিকতর সতর্ক ও সচেতন।”
অন্য বর্ণনায় এসেছে,
“অনেক ফকিহ এমন রয়েছে যারা নিজেদের চেয়ে বড় ফকিহদের নিকট ফিকাহকে পৌঁছে দেয় এবং অনেক ফিকাহের বাহক এমন রয়েছে যারা ফকিহ নয়।”⁸
রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত মুয়ায ইবনে জাবাল (রা.) সম্পর্কে বলেছেন,
“সাহাবীদের মাঝে হালাল ও হারাম সম্পর্কে সর্বাধিক বিচক্ষণ হল মুয়ায ইবনে জাবাল।”⁹
তিনি আরো বলেছেন
“তাদের মাঝে সর্বোত্তম বিচারক হলো আলী। ”¹⁰
উপর্যুক্ত বক্তব্যগুলি থেকে প্রতীয়মান হয় যে শরিয়তের ইলমের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পদক্ষেপ হলো কুরআন ও সুন্নাহ হিফয করা। এবং চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো এর পূর্ণাঙ্গিক বোধ বা তাফাক্কুহ ফিদ্দ্বীন অর্জন করা। এটি এমন একটি স্তর যেখানে সাহাবায়ে কেরাম (রা.) থেকে শুরু করে সর্ব যুগের মানুষের মাঝে তারতম্য হয়েছে।
শায়খ আওয়ামাহর এই আসারুল হাদীসিশ শরীফ গ্রন্থ সম্পর্কে আমি অবহিত আছি। তিনি নিজে যেমন ব্যুৎপন্ন, ঠিক তেমনি এই গ্রন্থও জ্ঞানে-তথ্যে সমৃদ্ধ। অনেক শ্রোতা এমন রয়েছে যারা বার্তা বাহক অপেক্ষা অধিকতর সতর্ক-সচেতন' নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এই হাদিসের মর্ম ও উদ্দেশ্য তিনি খুব সহজবোধ্য করে ব্যাখ্যা করেছেন। লেখক এই গ্রন্থে হাদিসের প্রকৃত বোধ অর্জনের উপর বিভিন্ন যুগের ওলামায়ে কেরামের অমূল্য বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন এবং প্রতিটি বিষয়ের উপর ফিকহি আলোচনার ক্ষেত্রে আনুষঙ্গিক উদাহরণ ও তথ্যের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন। সাথে সাথে তুলে ধরেছেন শাখাগত মাস-আলায় তাঁদের মতানৈক্যের কারণসমূহ।
এই গ্রন্থ অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য আলোচনায় সমৃদ্ধ। যা লেখকের সূক্ষ্মদৃষ্টি, বিস্তর অধ্যয়ন ও অসাধারণ উপস্থাপনা শৈলীর পরিচায়ক। সংক্ষিপ্ত হলেও এতে পাঠকবৃন্দ এমন অনেক তথ্য খুঁজে পাবেন যা অনেক বড় বড় কিতাবেও দুর্লভ। এছাড়া তিনি ইলমুদ দিয়ারাও ইলমুল রিওয়া তথা হাদিস ও ফিকাহের মাঝে সেতুবন্ধন গড়ে তুলেছেন।
গ্রন্থটি আমার কাছে অধিক পছন্দনীয় হবার আরেকটি কারণ হল, এর লেখক হাদিস ও রিজালশাস্ত্রের উপর গভীর পারদর্শী। ইতোপূর্বে তিনি হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) এর তাকরিবুত তাহযীব এবং ইমাম যাহাবির আল-কাশেফ এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ সহ আরও বহুগ্রন্থ রচনা করেছেন।
আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, এই গ্রন্থ পাঠক-পাঠিকাকে হাদিসের বোধ তথা ফিকাহের ইলম অর্জনে যারপরনাই উদ্বুদ্ধ করবে। আল্লাহ তায়ালা লেখককে তাঁর ইলম ও দ্বীনদারিত্বের উত্তম প্রতিদান দান করুন এবং তা থেকে সকলকে উপকৃত হবার তওফিক দিন।
শেষে ওলামায়ে কেরামের মতানৈক্যের ব্যাপারে আল্লামা আবু বকর ইবনুল আরাবী (রহ.) এর একটি কথা উল্লেখ করা সংগত মনে করছি। এটি উম্মতের জন্য ক্ষতিকর ঐক্যপরিপন্থী মতানৈক্য এবং কল্যাণকর মতানৈক্যের মাঝে পার্থক্য করেছে। পবিত্র কুরআনের ... واعتصموا بحبل الله আয়াতের ব্যাখ্যাপ্রসঙ্গে তিনি তাঁর আহকামুস সুগরা গ্রন্থে লিখেছেন,
"তোমরা বিভক্ত হয়ে পড়ো না, অর্থাৎ আক্বীদার ক্ষেত্রে বিভক্ত হয়ো না। অথবা তোমরা একে অপরের প্রতি হিংসা লালন করো না। অথবা শাখাগত বিষয়ে একে অপরকে ভুল সাব্যস্ত করো না। অর্থাৎ শাখাগত মাসআলা-মাসায়েলের ক্ষেত্রে একজন অপরজনকে অশুদ্ধ ভেবো না বরং প্রত্যেক মুজতাহিদ (ও তার অনুসারীগণ) তার ইজতিহাদ অনুযায়ী আমল করবে। কেননা এক্ষেত্রে প্রত্যেকেই আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরেছে এবং প্রত্যেকেই দলিলের উপর আমল করছে। আর এখানে যে দলাদলির ব্যাপারে নিষেধ করা হয়েছে তা হলো সেই ফেরকাবাজী যা মুসলমানদের মাঝে ফিতনা ও বিভক্তির কারণ হয়। কিন্তু শাখাগত বিষয়ের মতানৈক্য মূলত শরিয়তের সৌন্দর্য। কেননা রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
"যদি কোনো ফয়সালাকারী ইজতিহাদ করে এবং সে ইজতিহাদ সঠিক হয়, তবে সে দু'টি সওয়াবের অধিকারী হবে। আর সে ইজতেহাদ ভুল হয়ে থাকলে সে একটি সওয়াবের অধিকারী হবে।” ¹¹
গ্রন্থটিতে লেখক মতানৈক্যপূর্ণ কিছু বিষয়ও তুলে ধরেছেন। যেমন যয়িফ হাদিসের উপর আমল করা বা না করার বিষয়টি। এ প্রসঙ্গে তিনি সুনির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে যয়িফ হাদিসের উপর আমল করার ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা এনেছেন। তদুপরি ওলামায়ে কেরামের প্রাসঙ্গিক বক্তব্য ব্যাখ্যা সহকারে উল্লেখ করেছেন। বাস্তবতা হল, চার মাজহাবের প্রতিটিতেই কিছু মাস-আলার ক্ষেত্রে এমন কিছু যয়িফ হাদিসের উপর আমল করার রীতি রয়েছে যা ফকিহগণ আমলযোগ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন। যেমন,
نهي عن بيع الكالي بالكالي
রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাকিতে ক্রয়কৃত বস্তু বাকিতে বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। ¹²
পরিশেষে আমি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি যেন তিনি এই মূল্যবান কিতাবের মাধ্যমে সকলকে উপকৃত করেন এবং এর সংকলককে উত্তম প্রতিদান দান করেন।
মুস্তফা আহমাদ যারকা ১৫ মুহাররম, ১৩১৬ হিজরি
টিকাঃ
৭ সূরা তাওবা, আয়াত নং ১২২।
৮ তিরমিযী শরীফ, হাদীস নং ২৬৫৬।
৯ তিরমিযী শরীফ, খ.৫, পৃ.৬৬৪ হাদীস নং ৩৭৯০।
১০ সুনানে ইবনে মাজা, হাদীস নং ১৫১
১১ আহকামুস সুগরা, খ.১, পৃ. ১৫৩
১২ হাদীসটি অনেক মুহাদ্দিস বর্ণনা করেছেন। ইবনে আবি শাইবা (রহ.) তাঁর মুসান্নাফে হাদিসটি উল্লেখ করেছেন। আমি তাহকীকসহ হাদিসটি বিশ্লেষণ করেছি। হাদীস নম্বর ২২৫৬৬।
📄 প্রথম সংস্করণের ভূমিকা
الحمد لله رب العالمين و أفضل الصلوة و أكمل التسليم علي سيدنا و مولانا محمد رسول الله إمام الأيمة المجتهدين و سيد الهادين و المهتدين و علي آله و أصحابه أجمعين:
১৩৯৮ হিজরী সফর মাসের তৃতীয় বৃহস্পতিবার। শামের 'হালব' শহরের বিখ্যাত ইউনিভারসিটি 'জামেয়াতুর রওজা'য় অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে আমার একটি লেকচার দেয়ার সুযোগ হয়েছিলো। যার বিষয়বস্তু ছিলো 'হাদীসে নববির উপর ইমামদের ইখতেলাফ।' বক্ষমান পুস্তিকাটির সূচনা হয়েছে এই লেকচার থেকেই। অনুষ্ঠানে উপস্থিত আমার কিছু বন্ধুজন এই লেকচারটিকেই পুস্তকাকারে উপস্থাপনের সাগ্রহ অনুরোধ জানালেন। আর বললেন, এ থেকে সর্বসাধারণের দ্বীনি প্রয়োজন পূরণ হবে। তারা অধিকাংশ জিজ্ঞাসার সন্তোষজনক উত্তর এবং উদভ্রান্ত শ্রেণী সঠিক পথের দিশা পাবে। তাদের আগ্রহ এবং আলাহ তায়ালার তওফিক সেই আলোচনাটিকে যুক্তি- প্রমাণ, উদাহরণ ও তথ্য- উপাত্ত সমৃদ্ধ একটি কিতাব প্রণয়নে সাহায্য করলো। আমি লেকচারের মূল উপজীব্য বিষয়কে অবিকৃত রেখে বিষয়টি যথেষ্ট সাবলীল করার চেষ্টা করেছি।
সালাফের অনুসরণ-অনুকরণ বিষয়ক আমার লেখাগুলো আলেম ও শায়েখদের নিকট পেশ করেছি এবং এ কিতাবটি আমার উসতাযে মুহতারাম ফকীহুল আসর আল্লামা আব্দুল্লাহ সিরাজুদ্দীন এর নিকট পেশ করেছি। যিনি বাস্তবিকই মুহাক্কিক, মুতাকালিম, সুফি, মুফাসসির ও মুহাদ্দিস। আল- হামদুলিল্লাহ! তিনি এর সাথে একাত্মতা ঘোষণা ও প্রশংসা করে আমাকে ধন্য করেছেন।
অতঃপর আমি এটি রিয়াদের সর্বজনবিদিত মুহাক্কিক, মুহাদ্দিস, ফকিহ ও উসূলী আল্লামা শায়েখ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহ. এর নিকট প্রেরণ করেছি। তিনি তাঁর মূল্যবান অভিমত দিয়ে আমাকে ধন্য করেছেন। হে রাব্বুত-তাওফিক! আমাকে তাঁদের মন্তব্যের যোগ্য প্রতিভূ বানিয়ে দিন।