📘 মুতাযিলা আকিদা 📄 খালকে কুরআন

📄 খালকে কুরআন


আল কুরআন মহান আল্লাহ তায়ালার বাণী, যা জিবরাইল (আ:) এর মাধ্যমে হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর ওপর অবতীর্ণ হয়। মুতাযিলা চিন্তা উদ্ভবের পূর্বে সকলেই পবিত্র কুরআনকে চিরন্তন মনে করতেন। মুতাযিলা মতবাদ উদ্ভবের পর তারাই সর্বপ্রথম কুরআনের চিরন্তনতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেন। মুতাযিলা চিন্তাবিদগণ যেমনিভাবে আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদের সাথে তাঁর গুণাবলিকে অস্বীকার করেন তেমনিভাবে একই যুক্তিতে পবিত্র কুরআনের চিরন্তনতাকে অস্বীকার করেন।

পবিত্র কুরআনকে চিরন্তন ধরে নেয়া হলে, দুটি চিরন্তন সত্তার আবির্ভাব মেনে নেওয়া হয়। একটি আল্লাহ তায়ালার চিরন্তন সত্তা অপরটি আল কুরআন। দুটি চিরন্তন সত্তা পাশাপাশি অবস্থান করলে আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদকে অস্বীকার করা হয়। সুতরাং কুরআন সৃষ্ট বা মাখলুক। পবিত্র কুরআন রাসূল (সা:) এর ওপর ২৩ বছর ব্যাপী বিভিন্ন স্থান, কাল ও ঘটনার প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছে। পবিত্র কুরআন নির্দিষ্ট এলাকায় তথা আরব ভূমিতে আরবী ভাষায় নাযিল হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে পবিত্র কুরআনকে চিরন্তন সত্তা হিসেবে গ্রহণ করা যুক্তিযুক্ত নয়। আরবী ভাষা পৃথিবীর একটি নির্দিষ্ট জাতির গোষ্ঠীর ভাষা। শব্দ, ভাষারীতিসহ বিভিন্ন বর্ণনা ভঙ্গির কারণে আরবী ভাষা একটি পরিবর্তনশীল ভাষা। উপরিউক্ত বক্তব্যের প্রেক্ষিতে মুতাযিলাগণ আল কুরআনকে চিরন্তন মনে করেন না বরং এটাকে মাখলুক বা সৃষ্ট মনে করেন। এবং এ মতবাদকে তারা আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদ রক্ষার স্বার্থে সঠিক ও যথার্থ মনে করেন।

আল্লামা যামাখশারী এর দলিলের জবাব এবং আহলি সুন্নাত ওয়াল জামায়াত এর মত :
আহলি সুন্নাত ওয়াল জামায়াত এর মতে আল কুরআন হচ্ছে চিরন্তন। কেননা এটা আল্লাহ তায়ালার কালাম। অনাদি ও অনন্তকাল ধরে আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্বের সাথে আল কুরআন একাত্ম হয়েছিল। পরবর্তীতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে আল্লাহ তায়ালা মানুষের জন্য উপযোগী করে তা নাযিল করেছেন। যা লাওহে মাহফুজে সংরক্ষিত ছিল এবং হযরত জিবরাঈল এর মাধ্যমে দীর্ঘ তেইশ বছর ব্যাপী মহানবী (সা:) এর ওপর নাযিল হয়েছে। এটি মাখলুক বা সৃষ্ট নয়। এর শব্দ এবং অর্থ উভয়ই কাদীম এবং মু'জিযাহ।

পবিত্র কুরআনের আয়াতের আলোকে আমরা বলতে পারি পবিত্র কুরআন হলো : هو صفة قديمة أزلية ، قديم لفظه ومعناه
কুরআন হচ্ছে চিরন্তন ও অবিনশ্বর। অনাদি ও অনন্তকাল ধরে আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্বের সাথে আল কুরআন একাত্ম হয়েছিল। পরবর্তীতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে আল্লাহ তায়ালা মানুষের হেদায়েতের জন্য তা নাযিল করেছেন। যা লাওহে মাহফুজে সংরক্ষিত ছিল এবং রমযান মাসের লাইলাতুল কদর এর রাত্রিতে তা লাওহে মাহফুজ থেকে প্রথম আসমানে নাযিল হয় এবং পরবর্তী সময়ে হযরত জিবরাঈল এর মাধ্যমে দীর্ঘ তেইশ বছর ব্যাপী মহানবী (সা:) এর ওপর নাযিল হয়েছে। এটি মাখলুক বা সৃষ্ট নয় এর শব্দ এবং অর্থ উভয়ই কাদীম।

টিকাঃ
১. আল কুরআন, সূরা ৭ আ'রাফ, আয়ত, ১৪৩।
২ (পেজ ৩০৯). আল্লামা যামাখশারী, আল কাশশাফ, প্রাগুক্ত, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৫১-১৫২।
৩. আল কুরআন, সূরা ১৯ বানী ইসরাঈল, আয়ত, ৮৮।
১ (পেজ ৩১০). আল্লামা যামাখশারী, আল কাশশাফ, প্রাগুক্ত, ২য় খণ্ড, পৃ. ৬৯২।
২. আল কুরআন, সূরা ১৬ আন নাহল, আয়ত, ১০২।
১ (পেজ ৩১১). আল কুরআন, সূরা ৬ আনআম, আয়াত, ১১৪।
২. আল কুরনআ, সূরা ৩৫ আল হিজর, আয়াত, ১।
৩. আল কুরআন, সূরা ৪১ হ্যা মীম সাজাদাহ, আয়াত, ৩।
৪. আল কুরআন, সূরা ৮৫ আল বুরুজ, আয়াত, ২১-২২।

📘 মুতাযিলা আকিদা 📄 কবরের আযাব

📄 কবরের আযাব


মু'তাযিলাগণের মতে কবরের আযাব হবে না। তারা কবরের আযাব এবং মুনকার ও নকির এর প্রশ্ন এবং উত্তরকে তারা অস্বীকার করে। কবরের আযাব সাব্যস্ত হলে বিচারের পূর্বেই শাস্তিদান অপরিহার্য হয়ে পড়ে। যা ন্যায় বিচারের পরিপন্থী। আল্লাহ তায়ালা সকল মানুষকে কিয়ামত দিবসে একত্রিত করবেন। হাশরের ময়দানে সকলের হিসাব নেয়া হবে এবং আল্লাহ তায়ালা তাঁদের আমলের ভিত্তিতে তাঁদেরকে পুরস্কৃত বা শাস্তি দান করবেন। কুরআন ও হাদীসে বিষয়টি প্রমাণিত।

মু'তাযিলারা মনে করেন যে, হিসাব দিবসের পূর্বে শাস্তি বা পুরস্কার প্রদানের বিষয়টি যুক্তি সংগত নয়। তাই কবরের আযাব সাব্যস্ত হলে হিসাব গ্রহণ ও বিচারের পূর্বেই শাস্তি প্রদান আবশ্যক হয়ে যায়। মুতাযিলাগণ কবরের আযাব সংক্রান্ত হাদীস সমূহকে অস্বীকার করেছেন। তারা মনে করেন যে সকল হাদীসে কবরের আযাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা মূলত ধমক ও সর্তক করনের জন্য বলা হয়েছে।

আল্লামা যামাখশারী এর দলিলের জবাব এবং আহলি সুন্নাত ওয়াল জামায়াত এর মত :
আহলি সুন্নাত ওয়াল জামায়াত এর মতে কবরের আযাব সত্য। রাসূল (সা:) হতে বর্ণিত সহীহ হাদীসমূহের মাধ্যমে প্রমাণিত যে, কবরের আযাব সত্য এবং মুনকার ও নাকীরের সওয়াল ও জাওয়াব সত্য। কবর হলো পরকালের অনন্ত জীবনের প্রথম ধাপ। যে এই ধাপ থেকেই বোঝা যাবে সে কি সৌভাগ্যবান না কি দুর্ভাগা।

বোখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা:)-এর রেওয়ায়েতে রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেন, তোমাদের মধ্যে কেউ মারা গেলে তাঁকে কবর জগতে সকাল-সন্ধ্যা সে স্থান দেখানো হয়, যেখানে কেয়ামতের হিসাব-নিকাশের পর সে পৌঁছবে। সে স্থান দেখিয়ে প্রত্যহ তাঁকে বলা হয়, তুমি অবশেষে এখানে পৌঁছবে। কেউ জান্নাতী হলে তাঁকে জান্নাতের স্থান এবং জাহান্নামী হলে জাহান্নামের স্থানে দেখানো হয়।

উপরোক্ত কুরআন ও হাদীসের আলোকে প্রমাণ হয় যে, কবরের আযাব সত্য। মুনকার ও নাকীরের সওয়াল ও জাওয়াব সত্য। কবর হলো পরকালের অনন্ত জীবনের প্রথম ধাপ। যে এই ধাপ থেকেই বোঝা যাবে সে কি সৌভাগ্যবান না কি দুর্ভাগা।

টিকাঃ
১. আল কুরআন, সূরা ৩ আল ইমরান, আয়ত, ১৮৫।
২. আল্লামা যামাখশারী, আল কাশশাফ, প্রাগুক্ত, ১ম খণ্ড পৃ. ৪৪৯।
১ (পেজ ৩১৩). মুহাম্মদ ইবনে ইমাঈল আল বোখারী, সহীহ আল বোখারী প্রাগুক্ত, কিতাবুল অযু, বাবু মীনাল কাবায়ের আল্লা ইয়াসতাতীরু মিন বাউলিহি, হাদীস নং, ৬১।
২. মুহাম্মদ ইবনে ইমাঈল আল বোখারী, সহীহ আল বোখারী প্রাগুক্ত, কিতাবুল জানায়েয বাবু আততা'য়াওউজ মিন আযাবিল কাবার, হাদীস নং, ১০৩।
১ (পেজ ৩১৪). মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল বোখারী, সহীহ আল বোখারী, প্রাগুক্ত, কিতাবুল জানায়্যেয, বাবু আততা'য়াওউজ মিন আযাবিল কাবার, হাদীস নং, ১০২।
২. আল কুরআন, সূরা ৪০ আল মু'মিন, আয়াত, ৪৫-৪৬।
৩. মুফতী মুহাম্মদ শাফী, মাআরেফুল কুরআন, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৯১।

ফন্ট সাইজ
15px
17px