📘 মুতাযিলা আকিদা 📄 মু'তাযিলী মতবাদের ব্যর্থতার কারণ

📄 মু'তাযিলী মতবাদের ব্যর্থতার কারণ


মু'তাযিলা মতবাদ মুক্ত বুদ্ধি এবং স্বাধীন চিন্তার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়ে অতিঅল্প সময়ের মধ্যে মুসলিম বিশ্বে প্রসার লাভ করলেও পরবর্তী সময়ে মুতাযিলা মতবাদ স্থায়িত্ব লাভ করতে পারেনি। তবে শতাব্দীকাল ব্যাপী মুসলিম বিশ্বে প্রভাব বিস্তার করেছিল। আব্বাসীয় খলিফা ওয়াসিক বিল্লাহ এর মৃত্যুর পর মুতাযিলীগণ রাষ্টীয় পৃষ্ঠপোষকতা হতে বঞ্চিত হন এবং ইতোমধ্যে আশায়েরা মতবাদ মুসলমানদের মধ্যে স্থান করে নেয়। মু'তাযিলাদের বেশি বেশি যুক্তি প্রদর্শনের মানসিকতার বিপরীতে আশায়েরাদের মধ্যম পন্থা অবলম্বনের কারণে মুসলমানদের মধ্যে তা তুলনামূলক অধিক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। পরবর্তী সময়ে আল গাযালী সুফীবাদকে মুসলিম দর্শনের সাথে একীভূত করে উপস্থাপনের ফলে মু'তাযিলা মতবাদের জনপ্রিয়তা হ্রাস পায়। মু'তাযিলা মতবাদের ব্যর্থতার কিছু কারণ উল্লেখ করা হলো :

১. আব্বাসীয় খলিফা ওয়াসিক বিল্লাহ এর মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত হওয়া। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলে মু'তাযিলা মতবাদে প্রচার ও প্রসারে বিঘ্ন ঘটে এবং রাষ্টীয় ব্যবস্থাপনার সুযোগ সুবিধা কাজে না লাগতে পারা এবং অর্থনৈতিক সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদী সময়ের জন্য মু'তাযিলগণ তাঁদের অবস্থানকে ধরে রাখতে পারেনি।

২. মু'তাযিলার আন্দোলনের ব্যর্থতার আরকটি কারণ হলো। তাঁদের বিরোধী পক্ষ তথা আশায়েরা আলিম, মুহাদ্দীস, মুফাসসীর, ফকীহগণ আমল আখলাক, তাকওয়া ও দ্বীনদারীর দিক থেকে তাঁদের তুলনায় অনেক ঊর্ধ্বে ছিলেন এবং তাঁদের নৈতিক প্রভাবও জনগণের মধ্যে বিস্তার লাভ করেছিল।

৩. মু'তাযিলাগণ তাঁদের মতবাদকে যুক্তির ভিত্তিতে উপস্থাপন করেছিলেন এবং রাজকীয় ক্ষমতার জোরে তা দীর্ঘস্থায়ী করতে চেয়েছিলেন এবং তাঁদের বিরোধী আলিম, ফকীহ, মুহাদ্দীস এবং বড় বড় ইমামগণকে নির্যাতন ও নিপিড়নের লক্ষ্য বস্তু বানিয়েছিলেন।

৪. মু'তাযিলাগণ তাঁদের আকীদাকে প্রমাণ করার জন্য বুদ্ধি ভিত্তিক যুক্তি প্রমাণকে কুরআন ও সুন্নাহ এর ওপরে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। সাধারণ মুসলমানগণ তা ভালোভাবে গ্রহণ করেননি।

৫. মু'তাযিলাদের সাথে আশায়েরা মতবাদের পার্থক্যগুলো ছিল মূলত দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য এবং ব্যাখ্যা প্রদানগত পার্থক্য। কিন্তু তারা এই মতবাদগুলোকে কুফুরী ও ইসলাম এবং তাওহীদ ও শিরক এর পার্থক্য বলে মনে করতেন।

৬. মু'তাযিলা মতবাদের তত্ত্ব এবং ব্যাখ্যা সমূহ খুবই সূক্ষ্ম ও কঠিন ছিল যা মুসলিম আলিম ও দার্শনিকগণের নিকট পেশ করা গেলেও সাধারণ মুসলমানগণ এর নিকট তাঁদের তত্ত্ব ও ব্যাখ্যা উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে।

৭. মু'তাযিলাগণ তাঁদের বিরোধী আলিম, ফকহী ও মুহাদ্দীসগণকে নিয়ে উপহাস করতেন এবং তাঁদের গ্রহণযোগ্য দলীল প্রমাণকে অস্বীকার করতেন। যদিও কুরআন ও হাদীসের দৃষ্টিতে তা সঠিক ছিল।

৮. মু'তাযিলাগণ আল্লাহ তায়ালার দর্শন লাভকে অস্বীকার করতেন। এমনকি জান্নাত, জাহান্নাম, ফেরেশতা এবং তারাবীহ এর নামাজ এর ন্যায় বিষয়সমূহকে নিয়ে তারা এরকম আকীদা পোষণ করতেন যে, তা আহলি সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত এর বিরোধী ছিল।

৯. মু'তাযিলা আন্দোলন ব্যর্থতার কারণ ছিল যে, আহলি সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত এর দুটি দল আশায়েরা এবং মাতুরীদিয়াগণ তাঁদের মতবাদকে সঠিক ও যুক্তিপূর্ণ দলীলের ভিত্তিতে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ইমাম গাযালী, ইমাম রাজী এবং ইমাম ইবনে তাইমীয়া উল্লেখযোগ্য।

টিকাঃ
১ (পেজ ১১৩). ইসলামী বিশ্বকোষ, প্রাগুক্ত, ২০শ খণ্ড, পৃ. ৬৫।

📘 মুতাযিলা আকিদা 📄 মু'তাযিলী চিন্তাবিদ

📄 মু'তাযিলী চিন্তাবিদ


১. ওয়াসিল ইবন আতা:
ওয়াসিল ইবন আতা আবু হুজাইফা আল গাযযাল ছিলেন মু'তাযিলা মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ৮০হি:/৬৯৯ সনে মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৩১ হিজরী/৭৪৮ সনে ইন্তেকাল করেন। তিনি মদীনা থেকে স্বদেশ ত্যাগ করে বসরায় গমণ করেন এবং হাসান আল বাসরীর সাহচর্য লাভ করেন এবং বসরায় বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিলেন জাহম ইবন সাফওয়ান এবং বাশশার ইবন নূরদ তবে তাঁদের সাথে তাঁর সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ওয়ালি ইবন আতা এর স্ত্রী আমর ইবন উবাইদ এর বোন ছিলেন। মু'তাযিলা মতবাদের প্রতিষ্ঠাতাগণ এর মধ্যে ওয়াসিল ইবন আতা এর পরেই আমর ইবন উবায়েদ এর স্থান ছিল।

ওয়াসিল ইবেন আতা চারটি বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন :১
১. আল্লাহ তায়ালার সিফাত বা গুণাবলি সমূহ চিরন্তন নয়।
২. মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতা রয়েছে এ বিষয়ে তিনি কাদরিয়াগণের সাথে একমত পোষণ করেন।
৩. কোন মুসলিম কবিরা গুনাহ করলে সে ইসলাম ও কুফরীর মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করে (আল মানযিলাতু বাইনাল মানযিলা তাইন)।
৪. হযরত ওসমান (রা:)-এর হত্যাকাণ্ডে ও উষ্ট্রীর যুদ্ধে এবং সিফফীনের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী উভয় দলের মধ্যে একটি দল নিশ্চয়ই ভ্রান্ত।

২. আবুল হুযায়েল আল আল্লাফ :
আবুল হুযায়েল আল আল্লাফ মু'তাযিলা চিন্তাবিদ ও ধর্মতত্ত্ববিদ ছিলেন। তাঁর পুরা নাম মুহাম্মদ ইবন হুযায়েল ইবন উবাইদুল্লাহ। তিনি বসরায় জন্মগ্রহন করেন তাঁর জন্মস্থান নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। কারো কারো মতে ১৩৫ হিজরী/৭৫২ সাল এবং কারো কারো মতে, ১৩১ হিজরী/৭৪৮ সনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বাগদাদে বসবাস করতে থাকেন এবং সেখানেই ২২৬ হিজরী/৮৪০ সনে ইন্তেকাল করেন। তিনি ধর্ম দর্শনের উন্নয়নে একনিষ্ঠভাবে কাজ করেন এবং এর ওপর প্রভাব বিস্তার করেন। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম হলেন আন নাজ্জাম, ইহইয়া ইবন বিশর ও আল শাহহাম এবং আল জুব্বাই অন্যতম। তাঁর মতে মানুষ পৃথিবীতে স্বাধীন কিন্তু পরকালে স্বাধীন নয়।

৩. নাযযাম:
আবুল হোযাইলের পর তাঁর শিষ্য ইবরাহীম ইবন সাইয়ার আন নাযযাম ইলমে কালামের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখেন। তিনি ছিলেন খলিফা মামুনুর রশিদের শিক্ষক। তিনি বসরায় ৮০৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং বাগদাদে ৮৪৫ সালে ইন্তেকাল করেন। তিনি ধর্মতত্ত্ববিদ, দার্শনিক ও মধ্যযুগের একজন বড় পণ্ডিত ছিলেন। তিনি মু'তাযিলা আকীদার বড় একজন চিন্তাবিদ ছিলেন। তবে শাহরিস্তানী 'মিলাল ও নিহাল' নামক গ্রন্থে তাঁর দর্শনজ্ঞান সম্পর্কে বলেন, “তিনি অনেক দর্শন গ্রন্থ পাঠ করেন এবং মু'তাযিলাপন্থী ইলমে কালামকে দর্শনের সাথে মিলিয়ে ফেলেন।'

নাযযাম স্বাধীন মুক্ত চিন্তার অধিকারী ছিলেন তবে তিনি ইজমা ও কিয়াসকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন না। মানুষের ইচ্ছা-স্বাধীনতায় তিনি বিশ্বাস করতেন। তিনি আরো মনে করতেন যে, আল্লাহ তায়ালা অন্যায় করতে পারেন না এবং মানুষের মন্দ ও অকল্যাণ এর জন্য মানুষ নিজেই দায়ী।
জড় পদার্থ কতগুলো গুণের যৌগিক। হিশাম ইবনুল হাকামের ন্যায় তিনিও এমত পোষণ করেন যে, রং-স্বাদ-সুগন্ধ সবই পদার্থ। নাযযাম অভিভাজ্য পরমাণুকেও অস্বীকার করেন। এ বিষয়ে তাঁর যুক্তি-তর্ক-দর্শনের প্রত্যেকটি গ্রন্থে স্থান লাভ করেছে।

ছুমামা ইবন আশরাস:
ছুমামা ইবন আশরাস একজন ধর্মতত্ত্ববিদ এবং মুক্তবুদ্ধির প্রবক্তা ছিলেন। তাঁর জ্ঞান ও মেধার কারণে খলিফা হারুনুর রশিদ ও মামুনুর রশিদ তাঁকে রাজদরবারে স্থান দিতেন। রক্ষণশীলদের প্রতি তিনি তাঁর সমালোচনার কারণে তাঁদের শত্রুতে পরিণত হন। তিনি মু'তাযিলা সম্প্রদায়ের বাগদাদ শাখার একজন পণ্ডিত ছিলেন। দার্শনিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তিনি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র মতামত প্রকাশ করতেন। যেমন তাঁর মতে আল্লাহ তায়ালা জগতকে স্বভাবতই সৃষ্টি করেছেন। বিশ্বজাহান সৃষ্টির প্রেরণা আল্লাহ তায়ালার সত্ত্বাগত, এটা তাঁর ইচ্ছার প্রতিফলন নয়।

টিকাঃ
১ (পেজ ১১৪). ইসলামী বিশ্বকোষ, প্রাগুক্ত, ৬ষ খণ্ড, পৃ. ২৮১।
১ (পেজ ১১৫). ইসলামী বিশ্বকোষ, প্রাগুক্ত, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ২৮১।
২ (পেজ ১১৫). ইসলামী বিশ্বকোষ, প্রাগুক্ত, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫০।
১ (পেজ ১১৭). আল্লামা শিবলী নু'মানী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৫; শাহরিস্তানী, 'আল মিলাল ও নিহাল' (লন্ডন, ১৮৪২ পৃ. ৪৯)।
২ (পেজ ১১৭). আল্লামা শিবলী নু'মানী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৬; আল্লামা তাফতাযানী, 'শরহে মাকাসিদ', পৃ. ২৯৮ ।
৩ (পেজ ১১৭). ইসলামী বিশ্বকোষ, প্রাগুক্ত, ১১শ খণ্ড, পৃ. ৮৫।

📘 মুতাযিলা আকিদা 📄 মু'তাযিলী মতবাদের আকীদাসমূহ

📄 মু'তাযিলী মতবাদের আকীদাসমূহ


মু'তাযিলাগণ ছিলেন যুক্তিবাদী এবং মুক্ত চিন্তার অধিকারী। ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের আলোকে বিচার বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করলেও তারা প্রত্যেকটি বিষয়কে যুক্তির কষ্টি পাথরে যাচাই করেছেন। তারা কুরআন ও সুন্নাহর সরাসরি বক্তব্য ও শাব্দিক অর্থকে মানবীয় জ্ঞান বুদ্ধির আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন। নিম্নে তাঁদের আকীদাসমূহ আলোচনা করা হলো

১. আল্লাহ তায়ালার গুণাবলি : তারা আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অত্যধিক কঠোর ছিলেন। এজন্যই তারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করতেন না। তারা মনে করতেন চিরন্তন সত্তার সাথে তাঁর গুণাবলি সমূহকে মিলানো সম্ভব নয়। তাতে আল্লাহ তায়ালার ভিন্ন ভিন্ন অস্তিত্বের সম্ভাবনা তৈরি হবে যা একত্ববাদ বিরোধী।

২. কুরআন মাখলুক বা সৃষ্ট : পবিত্র কুরআনকে চিরন্তন ধরে নেওয়া হলে, দুটি চিরন্তন সত্ত্বার আবির্ভাব মেনে নেওয়া হয়। একটি আল্লাহ তায়ালার চিরন্তন সত্ত্বা অপরটি আল কুরআন। দুটি চিরন্তন সত্ত্বা পাশাপাশি অবস্থান করলে আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদকে অস্বীকার করা হয়। সুতরাং কুরআন সৃষ্ট বা মাখলুক।

৩. আল্লাহর দর্শন: মু'তাযিলাগণ মনে করেন পৃথিবীতে আল্লাহ তায়ালাকে দেখা সম্ভব নয়। এমনকি পরকালেও আল্লাহ তায়ালাকে দেখা সম্ভব নয়। কারণ তারা মনে করেন কোন কিছুকে দর্শন করার জন্য তাঁর শরীর বা আকার আকৃতি থাকা বাধ্যতামূলক। আল্লাহ তায়ালা এ সবকিছুর ঊর্ধ্বে বিধায় তাঁকে দর্শন সম্ভব নয়।

৪. ইচ্ছার স্বাধীনতা : মুতাযিলাগণ মনে করেন মানুষ তাঁর স্বাধীন ইচ্ছার দ্বারা পরিচালিত। মু'তাযিলাদের যুক্তি হল মানুষকে তাঁর কর্মের স্বাধীনতা দেওয়া না হলে তাঁর ওপর আদেশ এবং নিষেধ আরোপ করা অর্থহীন এবং তাঁকে শাস্তি এবং পুরস্কার দেওয়া যুক্তি যুক্ত নয়।

৫. কবীরাহ গুনাহকারী মুসলমান কাফিরও নয় মুসলিমও নয় : মু'তাযিলাগণ মনে করে থাকেন কবীরাহ গুনাহকারী মুসলমান ঈমান থেকে বের হয়ে যায় না। আবার তাঁর মধ্যে ঈমানও থাকে না। অর্থাৎ সে কবীরা গুনাহ করা অবস্থায় কাফের নয় এবং মুসলমানও নয়। তাঁর অবস্থান হলো মানযিলাতু বাইনাল মানযিলাতাইন।

৬. আল্লাহ তায়ালা অকল্যাণকর কাজের স্রষ্টা নন : মু'তাযিলাদের আকীদা হলো আল্লাহ মানুষকে সৎকাজে আদেশ দেন এবং অসৎকাজে থেকে নিষেধ করেন। তিনি মানুষকে ভাল-মন্দ বিবেচনা করার ক্ষমতা দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে অশ্লীল, অন্যায় ও পাপ কাজের নির্দেশ প্রদান করেন না। সুতরাং ঐসকল পাপ কাজের স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালা নন।

৭. পরকালীন প্রতিদান দেওয়া ওয়াজিব : মু'তাযিলাগণের মতে পরকালীন প্রতিদান দেওয়া আল্লাহর জন্য ওয়াজিব বা বাধ্যতামূলক। কেননা তিনি ন্যায়পরায়ণ এবং ওয়াদা পূর্ণকারী। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৎকাজের আদেশ দিয়েছেন এবং এজন্য পুরস্কার নির্ধারণ করেছেন। পরকালীন প্রতিদান দেওয়া ওয়াজিব না হলে আল্লাহ তায়ালা ওয়াদা খেলাফকারী সাব্যস্ত হবেন।

৮. পাপীদের জন্য কোন শাফা'য়াত নেই : মু'তাযিলাদের মতে, কবীরা গুনাহকারী পাপীদের জন্য কিয়ামতের দিন কোন শাফা'য়াতের ব্যবস্থা থাকবে না। পাপীর জন্য সুপারিশের ব্যবস্থা থাকলে এটা তাঁকে পুরস্কৃত করার নামান্তর। যা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

৯. কবরের আযাব : মু'তাযিলাগণের মতে কবরের আযাব হবে না। তারা কবরের আযাব এবং মুনকার ও নাকির এর প্রশ্ন এবং উত্তরকে অস্বীকার করেন। কবরের আযাব সাব্যস্ত হলে বিচারের পূর্বেই শাস্তিদান অপরিহার্য হয়ে পড়ে। যা ন্যায় বিচারের পরিপন্থী।

১০. হারাম বস্তু রিযিক নয়: মু'তাযিলাদের মতে হারাম বস্তু রিযিক নয়। তাঁদের মতে হালালই একমাত্র রিযিক। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে হালাল উপার্জনের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন এবং হারাম উপার্জন বর্জন করতে বলেছেন। হারামকে রিযিক ধরা হলে আল্লাহ তায়ালা যে রিযিকদাতা তা অসম্মান করা হয়।

টিকাঃ
১ (পেজ ১২৩). মুসলিম ইবন হাজ্জাজ আল কুশাইরী, সহীহ মুসলিম (ঢাকা: বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, ১৯৯২, অনু. মাওনালা আফলাতুন কায়সার), কিতাবুল ঈমান, অনুচ্ছেদ: ২৪, গুনাহের দরুন ঈমানের ত্রুটি হয়, পরিপূর্ণ মু'মিন থাকে না; ১ম খণ্ড, হাদীস নং, ১১০, পৃ. ১৫১।

📘 মুতাযিলা আকিদা 📄 তাফসীরুল কাশশাফে মু'তাযিলী আকীদার প্রভাব

📄 তাফসীরুল কাশশাফে মু'তাযিলী আকীদার প্রভাব


আল্লামা যামাখশারী তাফসীরুল কাশশাফ গ্রন্থটি মু'তাযিলী আকীদার ভিত্তিতেই প্রণয়ন করেছেন। তাফসীরুল কাশশাফ এর অনন্য রচনা শৈলী, প্রাঞ্জল ভাষার ব্যবহার এবং পবিত্র কুরআনকে প্রকৃতপক্ষে মু'জিযা হিসেবে উপস্থাপন সত্ত্বেও এর বিভিন্ন স্থানে মু'তাযিলী আকীদার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। তিনি অতি সূক্ষ্মভাবে মু'তাযিলী আকীদাকে তাঁর তাফসীরে সন্নিবেশিত করেছেন। যা একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। কেবল অতি বিজ্ঞ আলেমদের পক্ষে তা খুঁজে বের করা সম্ভব।

তাফসীরে কাশশাফ এর বিভিন্ন আয়াত ও সূরার ব্যাখ্যার পাশাপাশি আল্লামা যামাখশারী অত্যন্ত কৌশলে মু'তাযিলী আকীদাকে কোন কোন স্থানে প্রত্যক্ষভাবে এবং কোন কোন স্থানে পরোক্ষভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য চেষ্টা করেছেন। আরবী ব্যাকরণের বিন্যাস ও ক্বিরাত এর পার্থক্য বর্ণনার পাশাপাশি মু'তাযিলী আকীদাকে বর্ণনা করেছেন। যেন মনে হবে আল্লামা যামাখশারী মু'তাযিলী আকীদাকে প্রবেশ করানোর জন্য কোন সুযোগকেই হাত ছাড়া করেননি।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম- এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা যামাখশারী বলেন:
ফان قلت ما معنى تعلق إسم الله تعالى بالقرأة؟ قلت فيه ও جهان অحدهما ان يتعلق بها تعلق القلم بالكتابة في قولك كتبت بالقلم على معنى ان المؤمن لما اعتقد ان فعله لا يجئ معتدا به في الشرع ও اقعا على السنة حتى يصدر بذكر اسم الله لقوله عليه الصلاة والسلام كل أمرذى بال لم يبدأ فيه باسم الله فهو أبتر وإلا كان فعلا كلا فعل جعل فعله مفعولا باسم الله كما يفعل الكتب بالقلم -

আল্লামা যামাখশারী উক্ত ব্যাখ্যায় আল্লাহ তায়ালার সিফাতকে অস্বীকার করেছেন। মু'তাযিলা ও কাররামিয়াদের মতানুযায়ী যারা আল্লাহর সিফাতকে অস্বীকার করেন তাঁদের মতে غير الاسم المسمى । আহলি সুন্নাত ওয়াল জামাআত এর আলিমদের মতে الاسم هو المسمى ।

আয়াত ৫- داياك نعبد وإياك نستعين -
আল্লামা যামাখশারী এ আয়াতের ব্যাখ্যা বলেন:
ফান قلت : فلم قدمت العবادة على الاستعانة قلت : لان تقديم الوسيلة قبل طلب الحاجة - ليستوجبوا الاجابة إليها - فان قلت : لم أطلقت الاستعانة؟ قلت ليتناول كل مستعان فيه -

আল্লামা যামাখশারী উক্ত ব্যাখ্যায় : ليتوجبوا الاجابة إليهما এর মাধ্যমে মু’তাযিলা আকীদাকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস চালিয়েছেন। কেননা মু’তাযিলাদের মতে, বান্দাকে প্রতিদান দেয়া আল্লাহর জন্য ওয়াজিব।

আল্লামা যামাখশারী সূরা আলে ইমরানের ৭নং আয়াতের তাফসীর নিম্নোক্তভাবে বর্ণনা করেন:
هُوَ الَّذِي أَنزَلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ مِنْهُ آيَاتٌ مُّحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمُّ الْكِتَابِ وَأُخَرُ مُتَشَابِهَاتٌ

উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা যামাখশারী বলেন:
"(محكمات) احكمت عبارتها بأن حفظت من الاحتمال والاشتباه (متشابهات) محتملات ( هذا أم الكتاب أى أصل الكتاب تحمل المتشابهات و ترد إليها ও উদাহরণ স্বরূপ (لا تدركه الابصار)، (إلى ، بها ناظرة)، (لا يامر بالفحشاء) (أمرنا مـتـرفـيـهـা) "_

আল্লামা যামাখশারী উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় মু'তাযিলা মতবাদকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর মতে আল্লাহ তায়ালার দর্শন সম্ভব নয় এবং আল্লাহ তায়ালা বান্দার সকল কর্মের স্রষ্টা নন। এজন্যই তিনি মুহকাম ও মুতাশাবিহ এর উদাহরণ দিতে গিয়ে এখানে ৪টি আয়াতের অংশকে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে لاتدركه الابصار و هو يدرك الابصار আয়াতটি মুহকামাত আয়াতের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু অপর আয়াত: - وجوه يومئذ ناضرة إلى ربها ناظرة - আয়াতটিকে মুতাশাবিহ এর অন্তর্ভুক্ত মনে করেন।

টিকাঃ
১ (পেজ ১২৯). মাহমূদ ইবন উমর আল্লামা যামাখশারী, আল কাশশাফ আন হাকাইকি গাওয়ামিদিত তানযীল ওয়া উয়ূনুল আকাবীল ফী ওজুহীত তাবীল, (বৈরুত, দারুল কিতাব আল আরাবী, ১৩৬৬ হি./১৯৩৭ খ্রী) ১ম খণ্ড, পৃ.৩।
১ (পেজ ১৩০). আহমাদ ইবন মুনীর আল ইসকান্দারী, আল ইনতিসাফু ফীমা তাদাম্মা নাহুল কাশশাফু মিনাল ই'তিযাল, (মিশর: আলবাবী আল হালাবী, ১৩৯২ হিজরী), ১ম খণ্ড, পৃ. ৩।
২. আল কুরআন সূরা আল আরাফ ৭: ১৮০।
৩. আল কুরআন, সূরা ২০ ত্বাহা, ৮।
৪. আল কুরআন সূরা ৫৯ আল হাশর, ২৪।
৫. আল কুরআন সূরা ১৭ আল ইসরা, ১১০।
১ (পেজ ১৩১). আল কুরআন, সূরা ৮১ তাকবীর, ২৮-২৯।
১ (পেজ ১৩২). আল কুরআন, সূরা ৪৩ যুখরুফ, ৭২।
২. আল কুরআন, সূরা ৩২ আস সাজদাহ, ১৪
৩. মুহাম্মদ ইবন ইসমাঈল আল বুখারী, আস সহীহ, কিতাবুল জিহাদ ওয়াল সিয়ার, বাবু হাফরিল খান্দাক, ৩/২১৩; মুসলিম ইবন হাজ্জাজ আল কুশায়রী, আস সহীহ, কিতাবুল জিহাদ ওয়াল সিয়ার, বাবু গাযওয়াতুল আহযাব খন্দক, ৩/১৪৩০।
৪. আল কুরআন, সূরা ১৮ আল কাহাফ, ১৭।
১ (পেজ ১৩৩). আল কুরআন, সূরা আল ফাতিহা, ৫।
২. যামাখশারী প্রাগুক্ত: পৃ. ১৪।
১ (পেজ ১৩৪). মুহাম্মদ ইবন ইসমাঈল আল বুখারী, আস সহীহ, কিতাবর রিকাক, বাবুল কাসদি ওয়াল মুদাওয়ামাতি আলাল 'আমাল, ৭/১৮২; মুসলিম ইবন হাজ্জাজ আল কুশায়রী, আস সহীহ, কিতাবুল সিতাফতিল মুনাফিক্বীনা ওয়া আহক্বামুহুম, বাবু লান ইয়াদখুলাল জান্নাতা আহাদুন বি'আমালিহী, ৪/২১৭১।
২. আল কুরআন, সূরা ৩২ সাজদা, আয়াত, ১৭।
১ (পেজ ১৩৫). আল কুরআন, সূরা ৪১ হা-মীম আস্ সাজদা, আয়াত, ২৮।
২. আল কুরআন, সূরা ২৮ আল কাসাস, আয়াত, ৮৪।
৩. আল কুরআন, সূরা ৫ আল মায়েদাহ, আয়াত, ৯।
৪. আল কুরআন, সূরা ১০ ইউনুস, আয়াত, ৯।
১ (পেজ ১৩৬). আল কুরআন: সূরা ১৮ আল কাহাফ, আয়াত, ৩০।
২. আল কুরআন, সূরা ৪২ আল আশ শুরা, আয়াত, ২৬।
৩. আল কুরআন, সূরা ৪৫ জাছিয়া, আয়াত, ৩০।
৪. আল কুরআন, সূরা আল ফাতিহা, আয়াত, ৭।
১ (পেজ ১৩৭). যামাখশারী, প্রাগুক্ত, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৭।
২. আল কুরআন, সূরা ৪ আন নিসা আয়াত, ১১৬।
৩. আল কুরআন, সূরা ৩৯ আয যুমার আয়াত, ৫৩।
১ (পেজ ১৩৮). আল কুরআন, সূরা ২ আল বাকারা: ২৮৪।
২. আল কুরআন, সূরা ৩ আলে ইমরান আয়াত, ১২৯।
৩. আল কুরআন, সূরা ৩ আল ইমরান, আয়াত, ৭।
১ (পেজ ১৩৯). আল্লামা যামাখশারী, প্রাগুক্ত, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৩৭।
২. আল কুরআন, সূরা ৬ আল আন'আম, আয়াত, ১০২।
৩. আর কুরআন, সূরা ৭৫ আল কিয়ামাহ, আয়াত, ২৩-২৪।
১ (পেজ ১৪০). আল কুরআন, সূরা ৭ আল আরাফ, আয়াত, ২৮।
২. আল কুরআন, সূরা ১৭ আল ইসরা, আয়াত, ১৬।

ফন্ট সাইজ
15px
17px