📄 আশায়েরা ও মু'তাযিলী আকীদা
ইলমে কালামের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং আশায়েরীদের মতে, যে সব নীতি আহলে সুন্নাত এবং মু'তাযিলীদের মধ্যে ব্যবধানের সৃষ্টি করে, সেগুলো নিম্নে সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হলো :
১. আল্লাহ তায়ালা মানুষকে তাঁর শক্তি বহির্ভূত কাজের (تَكْلِيْفُ بِمَا لَا يُطَاقُ) প্রতিও আদেশ দিতে পারেন। এটা তাঁর জন্য বৈধ। মুতাযিলিগণ মনে করেন আল্লাহ তায়ালা ন্যায়পরায়ণ তিনি এটা করতে পারেন না।
২. কোন গুনাহ ছাড়াই আল্লাহ মানুষকে শাস্তি দিতে পারেন বা পুণ্য ছাড়াই প্রতিদান দিতে পারেন-এ অধিকার তাঁর রয়েছে। মু'তাযিলাগণ মনে করেন পাপীকে শাস্তি দেওয়া আল্লাহ তায়ালার জন্য ওয়াজিব এবং নেকআমলকারীকে পুরস্কার দেয়াও আল্লাহ তায়ালার জন্য ওয়াজিব। কেননা এটা না করলে আল্লাহ তায়ালা জালেম হিসেবে গণ্য হবেন।
৩. আল্লাহ আপন বান্দাদের প্রতি যা ইচ্ছা, তাই করতে পারেন। যা করা মানুষের জন্য আবশ্যক, তা করা আল্লাহর পক্ষে অবশ্য কর্তব্য নয়। কেননা তিনি মহাপরাক্রমশালী এবং সকল আদেশ ও নিষেধের ঊর্ধ্বে। মু'তাযিলাগণ মনে করেন আল্লাহ তায়ালা অন্যায় আদেশ দিতে পারেন না। কেননা তা ইনসাফ এর পরিপন্থী।
৪. শরীয়তের বিধিবিধান এর মাধ্যমে আল্লাহকে চেনা কর্তব্য; বুদ্ধির মাধ্যমে নয়। মু'তাযিলীগণ জ্ঞান ও বুদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে। তাঁদের মতে আল্লাহ তায়ালা কিতাব নাযিল ও রাসূল প্রেরণ না করলেও জ্ঞান ও বুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার প্রতি ঈমান আনয়ন ফরয।
৫. মিযান অর্থাৎ দাড়ি পাল্লা সত্য। আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের আমলনামায় লিখিত পাপ পূণ্যের ওজন করবেন।
৬. আশায়েরাগণের মতে, কুরআনের আয়াতে এটা প্রতীয়মান হয় যে, ধর্ম এবং দুনিয়ার সুবিধার প্রতি লক্ষ্য রাখা আল্লাহর জন্য আবশ্যক নয়।
৭. জীবন সঞ্চারের জন্য শরীরের প্রয়োজন নেই। আগুনকেও আল্লাহ বুদ্ধি, জীবন এবং বাক শক্তি প্রদান করতে পারেন। যেমন ইব্রাহীম (আ:) কে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপের পর আল্লাহ তায়ালা আগুনের প্রতি নির্দেশ জারি করেছিলেন, যেন ইব্রাহীম (আ:) এর জন্য তা ঠাণ্ডা ও শীতল হয়ে যায়। মু'তাযিলীগণ এ মতকে সমর্থন করেন না।
৮. এমনও সম্ভব হতে পারে, আমাদের সামনে উঁচু পাহাড় রয়েছে এবং প্রকট আওয়াজও সেদিক থেকে আসছে, অথচ আমরা কেউ দেখছি না এবং শুনছিও না। আবার এমনও সম্ভব যে, একজন অন্ধ প্রাচ্যে উপবিষ্ট রয়েছে এবং পশ্চিমা দেশে সে একটি মশা দেখতে পাচ্ছে। সংক্ষিপ্ত কথা হলো, ইমাম আশায়েরী প্রকৃতি এবং ইন্দ্রিয়ের ধরাবাঁধা নিয়ম ও ক্ষমতা মেনে নিতে অস্বীকার করেন। মু'তাযিলীগণ এই মতের বিরোধী।
এ আকীদাগুলো আশায়েরাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এ ছাড়া তাঁদের আরো অনেক বিশেষ বিশেষ আকীদা রয়েছে। ইমাম গাযালী 'ইহইয়াউল উলুম' গন্থের প্রারম্ভে একবার সেগুলো সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করেন।
আল্লাহর সত্তা: আল্লাহর সত্তা সম্বন্ধীয় দশটি মৌলিক নীতি: (১) আল্লাহ বিদ্যমান (২) একক (৩) চিরন্তন (৪) মূর্ত নন (৫) শরীরী নন (৬) পরমূর্ত নন (৭) সর্বদিকের ঊর্ধ্বে (৮) পাত্রের উর্ধ্বে (৯) দর্শনীয় (১০) চিরস্থায়ী।
আল্লাহর গুণাবলী সম্পর্কীয় দশটি মৌলিক নীতি: ১. আল্লাহ জীবিত, ২. জ্ঞাত, ৩. ক্ষমতাশীল, ৪. ইচ্ছার অধিকারী, ৫. শ্রবণকারী, ৬. চক্ষুষ্মান, ৭. বাকশীল, ৮. অবিনশ্বর, ৯. তাঁর বাণী চিরন্তন এবং ১০. জ্ঞানী ও ইচ্ছাময়।
আল্লাহর কর্ম সম্পর্কীয় দশটি মৌলিক নীতি: ১. আল্লাহ মানুষের সমস্ত কর্মের স্রষ্টা, ২. মানুষের কর্ম-ফল নিজেদেরই অর্জিত, ৩. আল্লাহর ইচ্ছানুসারে মানুষ সব কর্ম সম্পন্ন করে, ৪. যে কোন সৃষ্টি আল্লাহর দয়ার ওপর নির্ভরশীল, ৫. মানুষকে তাঁর শক্তি বহির্ভূত কর্মের প্রতি আদেশ করা আল্লাহর পক্ষে বৈধ, ৬. নিষ্পাপকে শাস্তি দেয়া আল্লাহর পক্ষে বৈধ, ৭. সৃষ্টিকুলের সুবিধা-অসুবিধার প্রতি লক্ষ্য রাখা আল্লাহর জন্য জরুরী নয়, ৮. কেবল সে আদেশই অবশ্য করণীয়, যা শরীয়তের পক্ষ থেকে তদরূপ বলে সাব্যস্ত, ৯. নবীদের প্রেরণ আল্লাহর জন্য অসম্ভব কিছু নয় এবং ১০. মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহর নুবুওয়াত ও মুজিযা প্রতিষ্ঠিত।
ওহীভিত্তিক প্রমাণে বিশ্বাস্য বিষয় সম্পর্কীয় দশটি মৌলিক নীতি : ১. কিয়ামত, ২. মুনকির নকীর, ৩. কবরের শাস্তি, ৪. রোজকিয়ামতের দাড়িপাল্লা, ৫. পুলসিরাত, ৬. বেহেশত-দোযখের অস্তিত্ব, ৭. ইমামত সম্বন্ধীয় নির্দেশ, ৮. খেলাফতের ক্রমানুসারে সাহাবীদের শ্রেষ্ঠত্ব, ৯. ইমামতের শর্তাবলী এবং ১০. নির্ধারিত ইমামের অনুপস্থিতিতে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সুলতানের নির্দেশ।
ইমাম আশয়ারীর পূর্বে মুতাকাল্লিমদের দুটি সম্প্রদায় ছিল : ওহীবাদী (আরবাব-ই-নক্ল) এবং বুদ্ধিবাদী (আরবাব-ই-আকল)। ইমাম আশয়ারী মধ্যপন্থা অবলম্বন করেন। তিনি যে সব আকীদা অবলম্বন করেন, তা ছিল বুদ্ধি এবং ওহীভিত্তিক মতবাদের এক সুসামঞ্জস্যরূপ। তিনি ওহীভিত্তিক চিন্তাধারার মধ্য দিয়ে তাঁর বিশেষ মতবাদে কি ভাবে উত্তীর্ণ হলেন, তার দু'একটি উদাহরণ হলো:
ওহীবাদিগণ আল্লাহর সাক্ষাত লাভে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু দার্শনিক ও মু'তাযিলাগণ তা অস্বীকার করেন। ওহীবাদিগণ কেবল আল্লাহর সাক্ষাত লাভেই বিশ্বাসী ছিলেন না, তাঁরা এটাও মনে করতেন যে, আল্লাহ তাঁর আরশে আসীন রয়েছেন। তিনি কোন একটি দিক জুড়ে রয়েছেন। তাঁর প্রতি ইঙ্গিতও করা যায়। ইমাম আশয়ারী দার্শনিক এবং মু'তাযিলাদের মতবাদ সমর্থন না করে ওহীবাদীদের আকীদাই অবলম্বন করেন। কিন্তু আল্লাহ কোন একটি স্থান জুড়ে রয়েছেন এবং তাঁর প্রতি ইঙ্গিত করাও সম্ভব নয়। কেননা, এসব হলো নশ্বরতার বৈশিষ্ট্য। অথচ আল্লাহর নশ্বর নন।
এ মতবাদ অবলম্বনের ফলে ইমাম আশায়েরার জন্য অন্য একটি সমস্যার উদ্ভব হয়। তা হলো, আল্লাহ যদি কোন বিশেষ স্থান জুড়ে না থাকেন, তবে তিনি দর্শনযোগাও হতে পারেন না। কারণ, যা স্থান অধিকার করে না, তা দেখাও যায় না। বাধ্য হয়ে ইমাম আশায়েরাকে মানতে হলো যে, কোন বস্তুর দৃষ্টিগোচর হবার জন্য তার কোন স্থানে অবস্থান করা বা ইঙ্গিতযোগ্য হবার প্রয়োজন নেই। ধীরে ধীরে ইমাম আশায়েরাকে বিতর্ক বিদ্যার সমস্ত নীতি বিসর্জন করতে হলো। আশায়েরার মতে, কোন বস্তু সমক্ষে না থাকলেও তা গোচরীভূত হতে পারে।
তৃতীয় সমস্যা হলো এই যে, আল্লাহ যদি দর্শনীয় হন, তবে সর্বক্ষণ তাঁর গোচরীভূত হওয়া উচিত। কারণ, তাঁর বিদ্যমানতাই যদি দর্শনের জন্য যথেষ্ট হয়, তবে কিয়ামত পর্যন্ত কেনইবা এর জন্য অপেক্ষা করতে হবে? তাই বাধ্য হয়ে ইমাম আশায়েরাকে এটাও বলতে হলো যে, কোন বস্তুও গোচরীভূত হওয়ার সমস্ত শর্ত পাওয়া গেলেও তাঁর অদৃশ্য হবার সম্ভাবনা থাকে।
ওহীবাদিগণ সাধারণভাবে মুজিযার সমর্থক ছিলেন। তারা হেতুবাদ অস্বীকার করতেন না, তবে বলতেন, মুজিযার বেলায় আল্লাহ 'কার্য-কারণ' সম্বন্ধ শিথিল করে দেন। ইমাম আশায়েরা এতটুকু নিশ্চয়ই জানতেন যে, কারণ যা হয়, কার্য তার বিপরীত হতে পারে না। তাই তিনি 'কার্য কারণ' সম্বন্ধকেই অস্বীকার করলেন। মোট কথা, এভাবে ধীরে ধীরে উপরিউক্ত সমস্ত আকাইদের সৃষ্টি হয়। ইমাম গাযালীর পূর্বেই ইলমে কালামের কাঠামো পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে যায়।
টিকাঃ
১ (পেজ ১১০). আল্লামা শিবলী নু'মানী, ইসলামী দর্শন, (অনু: মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ, ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯৮১) পৃ. ৫৭।
২. আল্লামা শিবলী নু'মানী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৮।
৩. আল্লামা শিবলী নু'মানী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৯।
১ (পেজ ১১১). আল্লামা শিবলী নু'মানী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৯।
২. আল্লামা শিবলী নু'মানী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬০।
১ (পেজ ১১২). আল্লামা শিবলী নু'মানী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬১।
📄 মু'তাযিলী মতবাদের ব্যর্থতার কারণ
মু'তাযিলা মতবাদ মুক্ত বুদ্ধি এবং স্বাধীন চিন্তার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়ে অতিঅল্প সময়ের মধ্যে মুসলিম বিশ্বে প্রসার লাভ করলেও পরবর্তী সময়ে মুতাযিলা মতবাদ স্থায়িত্ব লাভ করতে পারেনি। তবে শতাব্দীকাল ব্যাপী মুসলিম বিশ্বে প্রভাব বিস্তার করেছিল। আব্বাসীয় খলিফা ওয়াসিক বিল্লাহ এর মৃত্যুর পর মুতাযিলীগণ রাষ্টীয় পৃষ্ঠপোষকতা হতে বঞ্চিত হন এবং ইতোমধ্যে আশায়েরা মতবাদ মুসলমানদের মধ্যে স্থান করে নেয়। মু'তাযিলাদের বেশি বেশি যুক্তি প্রদর্শনের মানসিকতার বিপরীতে আশায়েরাদের মধ্যম পন্থা অবলম্বনের কারণে মুসলমানদের মধ্যে তা তুলনামূলক অধিক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। পরবর্তী সময়ে আল গাযালী সুফীবাদকে মুসলিম দর্শনের সাথে একীভূত করে উপস্থাপনের ফলে মু'তাযিলা মতবাদের জনপ্রিয়তা হ্রাস পায়। মু'তাযিলা মতবাদের ব্যর্থতার কিছু কারণ উল্লেখ করা হলো :
১. আব্বাসীয় খলিফা ওয়াসিক বিল্লাহ এর মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত হওয়া। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলে মু'তাযিলা মতবাদে প্রচার ও প্রসারে বিঘ্ন ঘটে এবং রাষ্টীয় ব্যবস্থাপনার সুযোগ সুবিধা কাজে না লাগতে পারা এবং অর্থনৈতিক সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদী সময়ের জন্য মু'তাযিলগণ তাঁদের অবস্থানকে ধরে রাখতে পারেনি।
২. মু'তাযিলার আন্দোলনের ব্যর্থতার আরকটি কারণ হলো। তাঁদের বিরোধী পক্ষ তথা আশায়েরা আলিম, মুহাদ্দীস, মুফাসসীর, ফকীহগণ আমল আখলাক, তাকওয়া ও দ্বীনদারীর দিক থেকে তাঁদের তুলনায় অনেক ঊর্ধ্বে ছিলেন এবং তাঁদের নৈতিক প্রভাবও জনগণের মধ্যে বিস্তার লাভ করেছিল।
৩. মু'তাযিলাগণ তাঁদের মতবাদকে যুক্তির ভিত্তিতে উপস্থাপন করেছিলেন এবং রাজকীয় ক্ষমতার জোরে তা দীর্ঘস্থায়ী করতে চেয়েছিলেন এবং তাঁদের বিরোধী আলিম, ফকীহ, মুহাদ্দীস এবং বড় বড় ইমামগণকে নির্যাতন ও নিপিড়নের লক্ষ্য বস্তু বানিয়েছিলেন।
৪. মু'তাযিলাগণ তাঁদের আকীদাকে প্রমাণ করার জন্য বুদ্ধি ভিত্তিক যুক্তি প্রমাণকে কুরআন ও সুন্নাহ এর ওপরে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। সাধারণ মুসলমানগণ তা ভালোভাবে গ্রহণ করেননি।
৫. মু'তাযিলাদের সাথে আশায়েরা মতবাদের পার্থক্যগুলো ছিল মূলত দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য এবং ব্যাখ্যা প্রদানগত পার্থক্য। কিন্তু তারা এই মতবাদগুলোকে কুফুরী ও ইসলাম এবং তাওহীদ ও শিরক এর পার্থক্য বলে মনে করতেন।
৬. মু'তাযিলা মতবাদের তত্ত্ব এবং ব্যাখ্যা সমূহ খুবই সূক্ষ্ম ও কঠিন ছিল যা মুসলিম আলিম ও দার্শনিকগণের নিকট পেশ করা গেলেও সাধারণ মুসলমানগণ এর নিকট তাঁদের তত্ত্ব ও ব্যাখ্যা উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে।
৭. মু'তাযিলাগণ তাঁদের বিরোধী আলিম, ফকহী ও মুহাদ্দীসগণকে নিয়ে উপহাস করতেন এবং তাঁদের গ্রহণযোগ্য দলীল প্রমাণকে অস্বীকার করতেন। যদিও কুরআন ও হাদীসের দৃষ্টিতে তা সঠিক ছিল।
৮. মু'তাযিলাগণ আল্লাহ তায়ালার দর্শন লাভকে অস্বীকার করতেন। এমনকি জান্নাত, জাহান্নাম, ফেরেশতা এবং তারাবীহ এর নামাজ এর ন্যায় বিষয়সমূহকে নিয়ে তারা এরকম আকীদা পোষণ করতেন যে, তা আহলি সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত এর বিরোধী ছিল।
৯. মু'তাযিলা আন্দোলন ব্যর্থতার কারণ ছিল যে, আহলি সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত এর দুটি দল আশায়েরা এবং মাতুরীদিয়াগণ তাঁদের মতবাদকে সঠিক ও যুক্তিপূর্ণ দলীলের ভিত্তিতে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ইমাম গাযালী, ইমাম রাজী এবং ইমাম ইবনে তাইমীয়া উল্লেখযোগ্য।
টিকাঃ
১ (পেজ ১১৩). ইসলামী বিশ্বকোষ, প্রাগুক্ত, ২০শ খণ্ড, পৃ. ৬৫।
📄 মু'তাযিলী চিন্তাবিদ
১. ওয়াসিল ইবন আতা:
ওয়াসিল ইবন আতা আবু হুজাইফা আল গাযযাল ছিলেন মু'তাযিলা মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ৮০হি:/৬৯৯ সনে মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৩১ হিজরী/৭৪৮ সনে ইন্তেকাল করেন। তিনি মদীনা থেকে স্বদেশ ত্যাগ করে বসরায় গমণ করেন এবং হাসান আল বাসরীর সাহচর্য লাভ করেন এবং বসরায় বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিলেন জাহম ইবন সাফওয়ান এবং বাশশার ইবন নূরদ তবে তাঁদের সাথে তাঁর সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ওয়ালি ইবন আতা এর স্ত্রী আমর ইবন উবাইদ এর বোন ছিলেন। মু'তাযিলা মতবাদের প্রতিষ্ঠাতাগণ এর মধ্যে ওয়াসিল ইবন আতা এর পরেই আমর ইবন উবায়েদ এর স্থান ছিল।
ওয়াসিল ইবেন আতা চারটি বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন :১
১. আল্লাহ তায়ালার সিফাত বা গুণাবলি সমূহ চিরন্তন নয়।
২. মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতা রয়েছে এ বিষয়ে তিনি কাদরিয়াগণের সাথে একমত পোষণ করেন।
৩. কোন মুসলিম কবিরা গুনাহ করলে সে ইসলাম ও কুফরীর মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করে (আল মানযিলাতু বাইনাল মানযিলা তাইন)।
৪. হযরত ওসমান (রা:)-এর হত্যাকাণ্ডে ও উষ্ট্রীর যুদ্ধে এবং সিফফীনের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী উভয় দলের মধ্যে একটি দল নিশ্চয়ই ভ্রান্ত।
২. আবুল হুযায়েল আল আল্লাফ :
আবুল হুযায়েল আল আল্লাফ মু'তাযিলা চিন্তাবিদ ও ধর্মতত্ত্ববিদ ছিলেন। তাঁর পুরা নাম মুহাম্মদ ইবন হুযায়েল ইবন উবাইদুল্লাহ। তিনি বসরায় জন্মগ্রহন করেন তাঁর জন্মস্থান নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। কারো কারো মতে ১৩৫ হিজরী/৭৫২ সাল এবং কারো কারো মতে, ১৩১ হিজরী/৭৪৮ সনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বাগদাদে বসবাস করতে থাকেন এবং সেখানেই ২২৬ হিজরী/৮৪০ সনে ইন্তেকাল করেন। তিনি ধর্ম দর্শনের উন্নয়নে একনিষ্ঠভাবে কাজ করেন এবং এর ওপর প্রভাব বিস্তার করেন। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম হলেন আন নাজ্জাম, ইহইয়া ইবন বিশর ও আল শাহহাম এবং আল জুব্বাই অন্যতম। তাঁর মতে মানুষ পৃথিবীতে স্বাধীন কিন্তু পরকালে স্বাধীন নয়।
৩. নাযযাম:
আবুল হোযাইলের পর তাঁর শিষ্য ইবরাহীম ইবন সাইয়ার আন নাযযাম ইলমে কালামের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখেন। তিনি ছিলেন খলিফা মামুনুর রশিদের শিক্ষক। তিনি বসরায় ৮০৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং বাগদাদে ৮৪৫ সালে ইন্তেকাল করেন। তিনি ধর্মতত্ত্ববিদ, দার্শনিক ও মধ্যযুগের একজন বড় পণ্ডিত ছিলেন। তিনি মু'তাযিলা আকীদার বড় একজন চিন্তাবিদ ছিলেন। তবে শাহরিস্তানী 'মিলাল ও নিহাল' নামক গ্রন্থে তাঁর দর্শনজ্ঞান সম্পর্কে বলেন, “তিনি অনেক দর্শন গ্রন্থ পাঠ করেন এবং মু'তাযিলাপন্থী ইলমে কালামকে দর্শনের সাথে মিলিয়ে ফেলেন।'
নাযযাম স্বাধীন মুক্ত চিন্তার অধিকারী ছিলেন তবে তিনি ইজমা ও কিয়াসকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন না। মানুষের ইচ্ছা-স্বাধীনতায় তিনি বিশ্বাস করতেন। তিনি আরো মনে করতেন যে, আল্লাহ তায়ালা অন্যায় করতে পারেন না এবং মানুষের মন্দ ও অকল্যাণ এর জন্য মানুষ নিজেই দায়ী।
জড় পদার্থ কতগুলো গুণের যৌগিক। হিশাম ইবনুল হাকামের ন্যায় তিনিও এমত পোষণ করেন যে, রং-স্বাদ-সুগন্ধ সবই পদার্থ। নাযযাম অভিভাজ্য পরমাণুকেও অস্বীকার করেন। এ বিষয়ে তাঁর যুক্তি-তর্ক-দর্শনের প্রত্যেকটি গ্রন্থে স্থান লাভ করেছে।
ছুমামা ইবন আশরাস:
ছুমামা ইবন আশরাস একজন ধর্মতত্ত্ববিদ এবং মুক্তবুদ্ধির প্রবক্তা ছিলেন। তাঁর জ্ঞান ও মেধার কারণে খলিফা হারুনুর রশিদ ও মামুনুর রশিদ তাঁকে রাজদরবারে স্থান দিতেন। রক্ষণশীলদের প্রতি তিনি তাঁর সমালোচনার কারণে তাঁদের শত্রুতে পরিণত হন। তিনি মু'তাযিলা সম্প্রদায়ের বাগদাদ শাখার একজন পণ্ডিত ছিলেন। দার্শনিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তিনি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র মতামত প্রকাশ করতেন। যেমন তাঁর মতে আল্লাহ তায়ালা জগতকে স্বভাবতই সৃষ্টি করেছেন। বিশ্বজাহান সৃষ্টির প্রেরণা আল্লাহ তায়ালার সত্ত্বাগত, এটা তাঁর ইচ্ছার প্রতিফলন নয়।
টিকাঃ
১ (পেজ ১১৪). ইসলামী বিশ্বকোষ, প্রাগুক্ত, ৬ষ খণ্ড, পৃ. ২৮১।
১ (পেজ ১১৫). ইসলামী বিশ্বকোষ, প্রাগুক্ত, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ২৮১।
২ (পেজ ১১৫). ইসলামী বিশ্বকোষ, প্রাগুক্ত, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫০।
১ (পেজ ১১৭). আল্লামা শিবলী নু'মানী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৫; শাহরিস্তানী, 'আল মিলাল ও নিহাল' (লন্ডন, ১৮৪২ পৃ. ৪৯)।
২ (পেজ ১১৭). আল্লামা শিবলী নু'মানী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৬; আল্লামা তাফতাযানী, 'শরহে মাকাসিদ', পৃ. ২৯৮ ।
৩ (পেজ ১১৭). ইসলামী বিশ্বকোষ, প্রাগুক্ত, ১১শ খণ্ড, পৃ. ৮৫।
📄 মু'তাযিলী মতবাদের আকীদাসমূহ
মু'তাযিলাগণ ছিলেন যুক্তিবাদী এবং মুক্ত চিন্তার অধিকারী। ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের আলোকে বিচার বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করলেও তারা প্রত্যেকটি বিষয়কে যুক্তির কষ্টি পাথরে যাচাই করেছেন। তারা কুরআন ও সুন্নাহর সরাসরি বক্তব্য ও শাব্দিক অর্থকে মানবীয় জ্ঞান বুদ্ধির আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন। নিম্নে তাঁদের আকীদাসমূহ আলোচনা করা হলো
১. আল্লাহ তায়ালার গুণাবলি : তারা আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অত্যধিক কঠোর ছিলেন। এজন্যই তারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করতেন না। তারা মনে করতেন চিরন্তন সত্তার সাথে তাঁর গুণাবলি সমূহকে মিলানো সম্ভব নয়। তাতে আল্লাহ তায়ালার ভিন্ন ভিন্ন অস্তিত্বের সম্ভাবনা তৈরি হবে যা একত্ববাদ বিরোধী।
২. কুরআন মাখলুক বা সৃষ্ট : পবিত্র কুরআনকে চিরন্তন ধরে নেওয়া হলে, দুটি চিরন্তন সত্ত্বার আবির্ভাব মেনে নেওয়া হয়। একটি আল্লাহ তায়ালার চিরন্তন সত্ত্বা অপরটি আল কুরআন। দুটি চিরন্তন সত্ত্বা পাশাপাশি অবস্থান করলে আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদকে অস্বীকার করা হয়। সুতরাং কুরআন সৃষ্ট বা মাখলুক।
৩. আল্লাহর দর্শন: মু'তাযিলাগণ মনে করেন পৃথিবীতে আল্লাহ তায়ালাকে দেখা সম্ভব নয়। এমনকি পরকালেও আল্লাহ তায়ালাকে দেখা সম্ভব নয়। কারণ তারা মনে করেন কোন কিছুকে দর্শন করার জন্য তাঁর শরীর বা আকার আকৃতি থাকা বাধ্যতামূলক। আল্লাহ তায়ালা এ সবকিছুর ঊর্ধ্বে বিধায় তাঁকে দর্শন সম্ভব নয়।
৪. ইচ্ছার স্বাধীনতা : মুতাযিলাগণ মনে করেন মানুষ তাঁর স্বাধীন ইচ্ছার দ্বারা পরিচালিত। মু'তাযিলাদের যুক্তি হল মানুষকে তাঁর কর্মের স্বাধীনতা দেওয়া না হলে তাঁর ওপর আদেশ এবং নিষেধ আরোপ করা অর্থহীন এবং তাঁকে শাস্তি এবং পুরস্কার দেওয়া যুক্তি যুক্ত নয়।
৫. কবীরাহ গুনাহকারী মুসলমান কাফিরও নয় মুসলিমও নয় : মু'তাযিলাগণ মনে করে থাকেন কবীরাহ গুনাহকারী মুসলমান ঈমান থেকে বের হয়ে যায় না। আবার তাঁর মধ্যে ঈমানও থাকে না। অর্থাৎ সে কবীরা গুনাহ করা অবস্থায় কাফের নয় এবং মুসলমানও নয়। তাঁর অবস্থান হলো মানযিলাতু বাইনাল মানযিলাতাইন।
৬. আল্লাহ তায়ালা অকল্যাণকর কাজের স্রষ্টা নন : মু'তাযিলাদের আকীদা হলো আল্লাহ মানুষকে সৎকাজে আদেশ দেন এবং অসৎকাজে থেকে নিষেধ করেন। তিনি মানুষকে ভাল-মন্দ বিবেচনা করার ক্ষমতা দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে অশ্লীল, অন্যায় ও পাপ কাজের নির্দেশ প্রদান করেন না। সুতরাং ঐসকল পাপ কাজের স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালা নন।
৭. পরকালীন প্রতিদান দেওয়া ওয়াজিব : মু'তাযিলাগণের মতে পরকালীন প্রতিদান দেওয়া আল্লাহর জন্য ওয়াজিব বা বাধ্যতামূলক। কেননা তিনি ন্যায়পরায়ণ এবং ওয়াদা পূর্ণকারী। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৎকাজের আদেশ দিয়েছেন এবং এজন্য পুরস্কার নির্ধারণ করেছেন। পরকালীন প্রতিদান দেওয়া ওয়াজিব না হলে আল্লাহ তায়ালা ওয়াদা খেলাফকারী সাব্যস্ত হবেন।
৮. পাপীদের জন্য কোন শাফা'য়াত নেই : মু'তাযিলাদের মতে, কবীরা গুনাহকারী পাপীদের জন্য কিয়ামতের দিন কোন শাফা'য়াতের ব্যবস্থা থাকবে না। পাপীর জন্য সুপারিশের ব্যবস্থা থাকলে এটা তাঁকে পুরস্কৃত করার নামান্তর। যা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
৯. কবরের আযাব : মু'তাযিলাগণের মতে কবরের আযাব হবে না। তারা কবরের আযাব এবং মুনকার ও নাকির এর প্রশ্ন এবং উত্তরকে অস্বীকার করেন। কবরের আযাব সাব্যস্ত হলে বিচারের পূর্বেই শাস্তিদান অপরিহার্য হয়ে পড়ে। যা ন্যায় বিচারের পরিপন্থী।
১০. হারাম বস্তু রিযিক নয়: মু'তাযিলাদের মতে হারাম বস্তু রিযিক নয়। তাঁদের মতে হালালই একমাত্র রিযিক। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে হালাল উপার্জনের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন এবং হারাম উপার্জন বর্জন করতে বলেছেন। হারামকে রিযিক ধরা হলে আল্লাহ তায়ালা যে রিযিকদাতা তা অসম্মান করা হয়।
টিকাঃ
১ (পেজ ১২৩). মুসলিম ইবন হাজ্জাজ আল কুশাইরী, সহীহ মুসলিম (ঢাকা: বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, ১৯৯২, অনু. মাওনালা আফলাতুন কায়সার), কিতাবুল ঈমান, অনুচ্ছেদ: ২৪, গুনাহের দরুন ঈমানের ত্রুটি হয়, পরিপূর্ণ মু'মিন থাকে না; ১ম খণ্ড, হাদীস নং, ১১০, পৃ. ১৫১।