📘 মুতাযিলা আকিদা 📄 মু'তাযিলী আকীদার উৎপত্তি ও বিকাশ

📄 মু'তাযিলী আকীদার উৎপত্তি ও বিকাশ


ইলমে কালাম শাস্ত্রে স্বাধীন চিন্তাধারা, যুক্তিবাদ ও কুরআন, হাদীস ও ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে যে চিন্তাধারার প্রবর্তন হয়েছে তার একটি মতবাদ হলো মু'তাযিলা। মু'তাযিলা শব্দটি ই'তিযাল থেকে এসেছে যার অর্থ হচ্ছে কোন ব্যক্তি বা দল থেকে বিচ্ছন্ন হয়ে যাওয়া। পবিত্র কুরআনে একটি আয়াত এসেছে :
وان لم تؤمنوا لي فاعتزلون -
অতএব মূসা তার জাতিকে বললেন, আর যদি তোমরা আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না কর তাহলে আমার নিকট হতে পৃথক হয়ে যাও।

মু'তাযিলা সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, চিন্তাধারা ও যুক্তির ভিত্তিতে সব কিছু বিশ্লেষণ করার কারণে তারা আহলি সুন্নাত ওয়াল জামা'আত এবং ইসলামের অন্যান্য দল ও সম্প্রদায় হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথক একটি মতবাদের জন্ম দিয়েছেন। এইজন্যই মু'তাযিলাগণ কুরআন ও হাদীসের বিভিন্ন বিষয়ে অর্থ ও ব্যাখ্যা সরাসরি গ্রহণ করার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে যুক্তি ভিত্তিক ব্যাখ্যা গ্রহণে আগ্রহী ছিলেন। মু'তাযিলা মতবাদের উৎপত্তি আশায়েরা মতবাদ অথবা বিশেষ কোন মতবাদের প্রতিক্রিয়ার ফল নয়। বিশেষ কোন রাজনৈতিক বা ধর্মীয় ঘটনা থেকে এ মতবাদের সৃষ্টি হয়নি। অন্যান্য দার্শনিক মতবাদের মত মু'তাযিলাদের চিন্তাধারা এবং মতবাদ সমূহ এর উৎস কুরআন ও হাদীসের থেকে এসেছে। এমনিভাবে মু'তাযিলা মতবাদের বিকাশও কুরআন ও হাদীসের বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে।

মু'তাযিলাগণ ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে মুক্ত চিন্তা এবং স্বাধীন মতামতের মাধ্যমে একটি পৃথক সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছে। যেমন ব্যক্তির ইচ্ছা ও স্বাধীনতা, আল্লাহর গুণাবলি চিরন্তন নয়, পবিত্র কুরআন সৃষ্ট, দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহকে দেখা সম্ভব নয়, ব্যক্তি তার কর্মের স্রষ্টা, পাপী মুসলমান ঈমান ও কুফরের মধ্যে অবস্থান করে, পরকালে শান্তি ও পুরস্কার প্রদান আল্লাহ তায়ালার জন্য ওয়াজিব, ন্যায়পরায়ণতা ইত্যাদি বিষয়ে মু'তাযিলাগণ কুরআন ও হাদীসের যুক্তি ভিত্তিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে থাকেন।

ইলমুল কালাম এর সাথে সম্পর্কিত আলিমগণ মু'তাযিলা সম্প্রদায়কে মু'তাযিলা নামে অভিহিত করলেও তারা নিজেদেরকে 'আহলুল আদল ওয়াত তাওহীদ' দাবি করে থাকেন। তারা মনে করেন তারা তাওহীদের মূল শিক্ষার ওপর রয়েছেন এবং আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদকে তারা প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। এজন্যই আল্লাহ তায়ালার গুণাবলিকে তারা চিরন্তন মনে করেন না কেননা তাহলে আল্লাহ তায়ালার সাথে অন্য সত্তাকে স্বীকার করে নেয়া হয়। মু'তাযিলাগণ নিজেদেরকে একনিষ্ঠ একত্ববাদী বলে মনে করে থাকেন। মু'তাযিলাগণ তাদের চিন্তাধারাগুলো কিছু মূলনীতির আলোকে আলোচনা করে থাকেন। তাঁদের পাঁচটি মূলনীতি রয়েছে। মূলনীতিগুলো হলো: ১. আল তাওহীদ, ২. আল' আদল, ৩. আল ওয়াদ ওয়া আল ওয়ীদ, ৪. আল আমর বিল মারুফ ওয়া আল নাহী আনিল মুনকার এবং ৫. আল মানযিলাতু বাইনা আল মানযিলাতাইন।

মু'তাযিলা সম্প্রদায়কে কেন এ নামে সম্বোধন করা হয়েছে এ ব্যাপারে ঐতিহাসিকগণের বিভিন্ন মতামত পাওয়া যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মত এ যে, খ্রিষ্টীয় ৭ম ও ৮ম শতকের মাঝামাঝি সময়ের একজন বড় ইসলামি চিন্তাবিদ ইমাম হাসান আল বসরী (৬৪২-৭২৮ খ্রি) এর সাথে তাঁর ছাত্র ওয়াসিল ইবন আতা এর মতপার্থক্য প্রেক্ষিতে এ নামের উদ্ভব ঘটে। একদিন ইমাম হাসান বসরী তাঁর ছাত্রদেরকে নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তিনি সাধারণত তাঁর ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ইসলামিক বিষয়ে যুক্তিপূর্ণ আলোচনা, দার্শনিক বিশ্লেষণ এবং সমকালীন বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা পেশ করতেন।

একদিন এরকম একটি আলোচনার মাহফিলে ওয়াসিল ইবন আতা দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন আমাদের মধ্যে এমন একটি সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়েছে যারা খারিজি নামে খ্যাত এবং বিশ্বাস হচ্ছে এ যে, কোন ব্যক্তি কবিরাহ গুনাহ করলে সে কাফের হয়ে যাবে। আবার অন্য আরকটি সম্প্রদায় যারা মুরযিয়া নামে পরিচিত, তাদের আকীদা হচ্ছে এই যে, কোন ব্যক্তি কবিরা গুনাহ করলে সে কাফের হয়ে যাবে না এবং তার গুনাহ এবং পাপের কারণে তার পরকালীন কোন ক্ষতি হবে না এবং তার ঈমানও নষ্ট হবে না। উপরিউক্ত অবস্থায় এ দুই সম্প্রদায়ের তথা খারিজি এবং মুরজিয়া এর মধ্য হতে কারা হকের ওপরে আছেন।

ইমাম হাসান বসরী প্রশ্নের প্রেক্ষিতে বললেন যে, কবিরা গুনাহকারী মুসলিম ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাবে না, তবে সে মুনাফিক বা ফাজীর তথা পাপাচারী মুসলীম। উক্ত জবাবের প্রেক্ষিতে ইমাম হাসান বসরীর ছাত্র ওয়াসিল ইবন আতা উল্লিখিত মতামতের ওপর সন্তুষ্ট হতে পারেননি এবং তিনি উক্ত মতটিকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন। ওয়াসিল ইবন আতা নতুন একটি চিন্তাধারা বা মতবাদ পেশ করলেন তা এই যে, কবীরা গুনাহকারী ব্যক্তি মুসলিম থাকবে না এবং কাফিরও হয়ে যাবে না বরং সে এ দুটির মাঝখানে বা মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করবেন। তা হচ্ছে আল মানযিলাতু বাইনা আল মানজিলাতাইনি। অর্থাৎ সে ঈমান ও কুফুরির মধ্যে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকবে।

ইমাম হাসান বসরী তাঁর ছাত্র ওয়াসিল ইবন আতা এর ব্যাখ্যাটিকে গ্রহণ করলেন না। এতে ওয়াসিল ইবন আতা উক্ত মাহফিল ত্যাগ করলেন এবং তিনি তাঁর নিজের মতকে স্বাধীনভাবে প্রচার করতে থাকেন এবং তিনি মসজিদের এক কোণে অবস্থান নিয়ে তাঁর সাথীদের মধ্যে তাঁর নতুন চিন্তাধারা প্রচার করতে থাকেন। সে প্রেক্ষিতে ইমাম হাসান বসরী বললেন, هذا الرجل اعتزل عنا অর্থাৎ এ লোকটি (ওয়াসিল ইবন আতা) আমাদের থেকে পৃথক হয়ে গিয়েছেন। ইমাম হাসান বসরীর উক্ত মন্তব্য থেকেই পরবর্তী সময়ে মু'তাযিলা শব্দটি এসেছে। ওয়াসিল ইবন আতা ইমাম হাসান বসরী থেকে পৃথক হয়ে স্বাধীন চিন্তা, যুক্তি, মতামতের প্রেক্ষিতে যে নতুন একটি মতবাদ তৈরি হয়েছে তাই মু'তাযিলা সম্প্রদায় নামে খ্যাতি লাভ করেছে।

ইবনে মানযুর তাঁর লিসানুল আরব গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, “মু'তাযিলা সম্প্রদায়ের লোকেরা মনে করত যে, তারা তাদের ধারণা অনুযায়ী পথভ্রান্ত দুটি সম্প্রদায় হতে পৃথক বা বিচ্ছিন্ন হয়েছে। উক্ত পথভ্রষ্ট সম্প্রদায় বলতে তারা আহলি সুন্নাহ ওয়াল জামা'আত এবং খারিজিদেরকে বুঝিয়েছেন” মুতাযিলা সম্প্রদায়ের নাম করণের কারণ সম্পর্কিত ইবন মানজুর এর মতামতটিকে বিশ্লেষণ করে বুঝা যায় যে, মু'তাযিলাগণ তারা নিজেরাই এ নামকে গ্রহণ করে নিয়েছেন। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, হিজরী ৩য় শতকে একজন বিখ্যাত মু'তাযিলা দার্শনিক তাঁদের মতবাদকে ই'তিযাল নামে আখ্যায়িত করেছেন এবং একটি সংজ্ঞা দিয়েছেন : কোন ব্যক্তি যতক্ষণ পর্যন্ত নিম্নোক্ত ৫টি বিষয়কে হক হিসাবে গ্রহণ না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে ই'তিযালের অনুসারী বিবেচিত হবে না : মূলনীতিগুলো হলো : ১. আল তাওহীদ বা একত্ববাদ, ২. আল' আদল বা ন্যায়পরায়ণতা, ৩. আল ওয়াদ ওয়া আল ওয়ীদ বা আখিরাতের শাস্তি ও পুরস্কারে বিশ্বাস, ৪. আল আমর বিল মারুফ ওয়া আন নাহী আনিল মুনকার বা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ এবং ৫. আল মানযিলাতু বাইনা আল মানযিলাতাইন বা ঈমান ও কুফুরি এর মধ্যবর্তী অবস্থান। যখন কোন ব্যক্তির মধ্যে উপরিউক্ত পাঁচটি মূলনীতি পাওয়া যাবে তখন তাকে মু'তাযিলা হিসাবে আখ্যায়িত করা যাবে।

মু'তাযিলা নামের উৎপত্তি সংক্রান্ত উপরিউক্ত ব্যাখ্যাগুলোর মধ্য থেকে কোনটিকেই নিশ্চিতরূপে ভ্রান্ত বলা যায় না। প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, আল্লামা যামাখশারী নিজেকে মু'তাযিলী হিসেবে পরিচয় দিতে তিনি গর্ববোধ করতেন। ইবনু খাল্লিকান বলেন:
انه كان إذا قصد صاحبا له واستأذنا عليه فى الدخول يقول لمن يأخذ له الإذن : قل له : أبو القاسم المعتزلي بالباب -
তিনি যখন তাঁর কোন সহপাঠীর সাথে সাক্ষাৎ করতে চাইতেন, তখন তিনি ভেতরে প্রবেশের জন্য অনুমতি বাহককে বলতেন, বল যে, আবুল কাসিম আল-মু'তাযিলী দরজায় এসেছে।

মু'তাযিলা নামটি উক্ত সম্প্রদায়ের লোকজন নিজের জন্য গ্রহণ করলেও তারা নিজেদেরকে আহলুল আদলী ওয়াত তাওহীদ তথা ন্যায়পরায়ণ ও একাত্ববাদের অনুসারী হিসেবে নিজেদেরকে পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন। কিন্তু বাস্তবে সমাজে তারা মু'তাযিলা নামেই খ্যাতি লাভ করেছেন। অনেকেই মনে করেন যে, খারিজি এবং মুরজিয়া সম্প্রদায়ের বিপরীতমুখী মতবাদের প্রেক্ষিতে মধ্যপন্থি মতাবাদ হিসেবে মু'তাযিলা মতবাদের আবির্ভাব ঘটেছে। কেননা খারিজীগণ পাপী মুসলমানদেরকে ইসলাম থেকে খারিজ করে দিত এবং তাদেরকে কাফের মনে করত। অপর দিকে মুরজিয়াগণ পাপী মুসলমানদেরকে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত মনে করত এবং তাদেরকে পাপের জন্য পরকালে পাকড়াও করা হবে না বলে মনে করত। উক্ত কঠিন ও সহজ মতবাদের মধ্যমপন্থি মতাবাদ হিসেবে মুতাযিলাগণ পাপী মুসলমানদেরকে কুফুরী ও ইসলাম এর মধ্যবর্তী তথা আল মানযিলু বাইনাল মানযিলা তাইনি মতবাদে বিশ্বাসী ছিল।

মু'তাযিলা সম্প্রদায়ের চিন্তাধারা, মূলনীতি, যুক্তিবাদিতা এবং কুরআন ও সুন্নাহ থেকে দলীল গ্রহণের কারণে সার্বিকভাবে মূল্যায়ন করলে বোঝা যায় যে, মুক্তচিন্তা এবং স্বাধীন মতামতসহ ইসলামের মূল শিক্ষা থেকেই এ মতবাদের উদ্ভব ঘটেছে। তবে পবিত্র কুরআনের মূলনীতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করলেও মু'তাযিলাগণ অনেক ক্ষেত্রে কুরআনের সরাসরি বক্তব্য গ্রহণ না করে বরং যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা দ্বারা কুরআনের আয়াতকে মূল্যায়ন করতেন।

তারা পবিত্র কুরআনের শিক্ষাকে আবেগবর্জিতভাবে এবং বাস্তব সম্মতভাবে গ্রহণ করতে আগ্রহী ছিলেন। যেমন আল্লাহ তায়ালার গুণাবলি, আল্লাহ তায়ালাকে দর্শন এর অসম্ভাব্যতা, ভাল মন্দ সৃষ্টির ক্ষমতা, কুরআনের মাখলুক হওয়া, বান্দার ইচ্ছার স্বাধীনতা ও কর্মের স্বাধীনতা ইত্যাদি বিষয়ে মু'তাযিলগণ যুক্তিবাদী মতামত উপস্থাপন করেছেন। এ ক্ষেত্রে তারা কুরআন এবং সুন্নাহ থেকে দলীল উপস্থাপন করে তাঁদের মতামতের আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন।

মু'তাযিলা মতবাদের উৎস, উত্থান এবং বিকাশ কুরআনের শিক্ষার ওপর-ই ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তবে আহলি সুন্নাত ওয়াল জামা'আত এর সাথে তাঁদের পার্থক্য মূলত ব্যাখ্যা গ্রহণের পদ্ধতির কারণে হয়েছে। সৈয়েদ আমীর আলী বলেন :
"The chief doctors of the Mutazelite school were educatd under the Fatimides and ther can hardly be anydoubt that the moderate Mutazelism represented the views of Caliph Ali and the most liberal of his early descendants and probably of Muhammed himself."
"মু'তাযিলা সম্প্রদায়ের প্রধান আলিমগণ ফাতেমীয়দের অধীনেই শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে, উদার পন্থি মু'তাযিলা মতবাদ খলিফা আলী (রা:) ও তাঁর নিকটবর্তী বংশধরগণ এবং মুহাম্মদ (সা:) এর চিন্তাধারার প্রতিনিধিত্ব করছিল "

মু'তাযিলা মতবাদের উৎপত্তি হিজরী ১ম শতক থেকেই শুরু হয়েছে। ইমাম হাসান আল বাসরী (মৃ. ১১০ হিঃ) এর যুক্তিপূর্ণ চিন্তাধারা এবং মতবাদ থেকে তা সূচনা হয়েছিল। হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীতে মু'তাযিলা মতবাদ প্রসার ও উন্নতি লাভ করেছিল। হিজরী ২২৫ সন পর্যন্ত মু'তাযিলা মতবাদ ব্যাপকতা লাভ করেছে। আব্বাসীয় খলীফা মামুন, মু'তাসীম এবং ওয়াসিক বিল্লাহ উক্ত মতবাদের প্রচার এবং প্রসারের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। যার ফলে তা মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল।

মু'তাযিলা মতবাদ এর প্রশংসায় বিখ্যাত মু'তাযিলি কবি সাফওয়ান আল আনসারী কবিতা রচনা করেন। কবি সাফওয়ান আল আনসারী বলেন :
“সকল জনপদে মু'তাযিলা মতবাদের প্রচারক ও আহবানকারীগণ অবস্থান গ্রহণ করিয়াছেন, সে সকল জনপদ তাঁদের জ্ঞান ও মহিমার কারণে সকল মানুষের আগমন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, বিশেষ করে ফাতওয়া ও তর্কশাস্ত্রের তত্ত্ব ও নিয়মাবলীর ক্ষেত্রে লোকেরা তাঁদের নিকট হতেই সঠিক দিক-নির্দেশনা লাভ করত।"

মু'তাযিলাগণ যুক্তিপূর্ণ তর্ক এবং আলোচনার ক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্ধী ছিলেন। তাঁদের যুক্তিপূর্ণ বির্তক আলোচনার কারণে সাধারণ মুসলমানগণ তাঁদের প্রতি আকৃষ্ট হত। অপর পক্ষে নাস্তিক, খ্রিষ্টান, অগ্নিউপাসকগণ তাঁদের যুক্তিপূর্ণ আক্রমণের লক্ষ্যস্থল হতো।

মু'তাযিলা সম্প্রদায়ের দুটি শাখা ছিল। এক. বাসরী ও দুই. বাগদাদী শাখা। তবে বাসরী শাখা ঐতিহাসিকভাবে অগ্রগামী ছিল এবং এ শাখায় মূলনীতি এবং বিষয়সমূহ নির্ধারণ করা হতো। বাগদাদী শাখা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাসরী শাখাকে অনুসরণ করত। বাসরী শাখার মু'তাযিলিগণের মধ্য হতে অন্যতম হলেন : ওয়াসিল ইবন আতা (মৃ. ১৩১/৭৪৮), 'আমর ইবন 'উবায়দ (মৃ. ১৪২/৫৫৯ সন), নাজ্জাম, জাহিজ, ও আল জুব্বাঈ। বাগদাদী শাখার বিখ্যাত মু'তাযিলিগণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আহমাদ ইবন আবি দাউদ, বিশর ইবন মু'তামার, ছুমামা ইবন আশরাস, আবুল হাসান আল খাইয়্যাত এবং আবু মূসা আল মারদার।

মু'তাযিলা সম্প্রদায়ের ক্রমবিকাশের ধারা উমাইয়া এবং আব্বাসীয় শাসনকাল থেকে শুরু করে প্রায় এক শতাব্দীকাল পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বে প্রভাব বিস্তার করেছিল। তৎকালীন সময়ে শাসক গোষ্ঠী থেকে শুরু করে আলিম, মুহাদ্দীস, মুফাস্সীর, ফকীহসহ সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে মু'তাযিলা আকীদার প্রভাব লক্ষণীয়। গ্রীক ও খ্রিষ্টীয় দর্শনের মুকাবেলায় মুসলমানদের জন্য মু'তাযিলাদের বিকল্প যুক্তিবাদী কোন গোষ্ঠী মুসলমানদের নিকট অনুপস্থিত ছিল। মু'তাযিলা সম্প্রদায়ের বিকাশের প্রথম দিকে কিছুটা প্রতিকূল পরিবেশ থাকলেও উমাইয়া খিলাফতের শেষ দিক থেকে তারা একটি শক্তিশালী সম্প্রদায় হিসেবে আবির্ভূত হয়। উমাইয়া খলিফা দ্বিতীয় ওয়ালিদের পুত্র তৃতীয় ইয়াজিদ মু'তাযিলা মতবাদকে সমর্থন করায় তারা রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। এতে মু'তাযিলা সম্প্রদায়ের বিকাশ ত্বরান্বিত হয়।

রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলেও সর্বস্তরের সাধারণ মুসলমানদের কাছ থেকে মু'তাযিলাগণ গ্রহণযোগ্যতা আদায় করতে পারেননি। আহলি সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের আলিম এবং মু'তাযিলা আলিমগণের মধ্যে তখন ইসলামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বাহাস চলতে থাকে। তবে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার কারণে মু'তাযিলাগণ সুবিধাজনক অবস্থান থেকে তাঁদের প্রচার ও প্রসারে আত্মনিয়োগ করেন।

আব্বাসীয় শাসকগণ পারস্যনীতি অনুসরণ করলে মু'তাযিলাদের ক্রমবিকাশের পথ আরো গতি লাভ করেন। আব্বাসীয় খলিফা আল মানসুর (৭৭৫ খ্রি:) কর্তৃক মু'তাযিলাদের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের কারণে তারা একটি গ্রহণযোগ্য সম্প্রদায়ে পরিণত হন। আব্বাসীয় খলিফা হারুন আর রশিদ এর শাসন আমলে তিনিও মু'তাযিলাদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা দান করেন। তাঁর সময়কালে বার্মাকি সম্প্রদায় মু'তাযিলাদের পক্ষে কাজ করে। এ সময়কালে মু'তাযিলাদের বড় আলিম আবুল হোযাইল আল আল্লাফ এবং ইব্রাহীম ইবন সাইয়ার মু'তাযিলা মতবাদের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

আব্বাসীয় খলিফা আল মামুন (৮১৩-৮৩৩ খ্রি.) এর সময়কাল ছিল মু'তাযিলা মতবাদের স্বর্ণযুগ। তাঁর সময়কালে তারা রাষ্টীয় মতবাদে পরিণত হন এবং রাষ্টীয় সকল ব্যবস্থাপনা এবং প্রচার মাধ্যমের সুযোগ তারা ব্যবহার করেন। এতে অতি দ্রুত সময়ে মু'তাযিলা মতবাদ আব্বসীয় খিলাফতের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। খলিফা মামুন আবুল হোযাইল আল আল্লাফ, আবু ইসহাক এবং নাজ্জাম এর মত বড় মু'তাযিলা আলিমদেরকে সভাসদরূপে গ্রহণ করেন। তিনি অনেক দূর থেকে আলিম, ফকিহ এবং সাহিত্যিকদেরকে ডেকে তাঁর রাজকীয় সভায় স্থান করে দিতেন এবং তাঁদের জন্য সম্মানজনক বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করতেন। এতে তাঁর সময়কালে আলিম ও চিন্তাবিদদের মধ্যে বাহাসের প্রেরণা জন্মে এবং যুক্তি বিজ্ঞানের প্রসার লাভ করে।

খলিফা মানুনের রাজসভায় মু'তাযিলা এবং অন্যান্য মতবাদের সকল আলিমদেরকে স্থান দেয়া হতো। প্রত্যেক সম্প্রদায় নিজ নিজ মতবাদের সমর্থনে গ্রন্থ রচনা করতেন। প্রত্যেক মঙ্গলবার রাজদরবারের একটি কক্ষকে বিশেষভাবে সজ্জিত করা হত এবং সর্বস্তরের আলিমদের তাঁর দরবারে আমন্ত্রণ করা হত এবং সেখানে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করা হত এবং খাওয়া দাওয়ার পর বাহাসের আয়োজন করা হত।

খলিফা মামুন আর রশিদ মৃত্যুর পর আব্বাসীয় খলিফা আল মু'তাসিম (৮৩৩-৮৪২ খ্রি.) এবং আল ওয়াসিক বিল্লাহ (৮৪২-৮৪৭ খ্রি.) মু'তাযিলা সম্প্রদায়ের প্রতি পৃষ্ঠপোষকতা এবং রাজকীয় আনুকূল্য অব্যাহত রাখেন। খলিফা আল মু'তাসিম খুব শিক্ষিত ছিলেন না কিন্তু তাঁর পুত্র ওয়াসিক বিল্লাহ্ ইলমুল কালাম চর্চা ভালোবাসতেন। তিনি কোন অনুকরণ মোটেই পছন্দ করতেন না। তাঁর সময়কালে আধুনিক ও প্রাচীন দার্শনিক মোতাকাল্লিমদের নিয়ে তাঁর রাজসভায় বিশেষ আলোচনা সভার আয়োজন করা হতো। তিনি মুতাকাল্লিম ও ফকিহদের বাহাস এর জন্য একটি সমিতি গঠন করেন। তাঁদের আহূত সভায় গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিষয় নিয়ে দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করা হত। বার্মাকি সম্প্রদায় ও তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে এবং তারাও মু'তাযিলা মতবাদ প্রসারে ভূমিকা রাখেন।

মু'তাযিলা মতবাদের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের পিছনে কিছু কারণ ছিল। এক. সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে ইখতিলাফ। রাসূল (সা:) পর হযরত আবু বকর, হযরত উমর, হযরত উসমান (রা:) পর্যন্ত সাহাবাগণের মধ্যে বড় কোন মতভেদ পরিলক্ষিত হয়নি। হযরত উসমান (রা:) এর সমকালের শেষ দিক থেকে শুরু করে হযরত আলী (রা:) এর সময়কাল পর্যন্ত সাহাবাগণের মধ্যে বড় ধরণের মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। হযরত আলী (রা:), হযরত আয়েশা (রা:) এবং হযরত মুয়াবিয়া (রা:) এর মধ্যে সংগঠিত উষ্ট্রী যুদ্ধ এবং সিফফীনের যুদ্ধে সাহাবাগণের মধ্যে বড় ধরণের মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। যুদ্ধ অংশ গ্রহণকারী উভয় দলের অধিকাংশই সাহাবি হওয়ায় পরবর্তীকালে এ বিষয়টি নিয়ে তাবেয়ী এবং তাবে তাবেয়ীগণদের মধ্যেও মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। তারা এ প্রশ্নের অবতারণা করলেন যে, যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী উভয় দলই কি হকের ওপর ছিলেন? না কি একটি দল হকের ওপরে ছিলেন। তাহলে কোনো একটি পক্ষকে অবশ্যই অন্যায়পন্থি বলে ধরে নিতে হয়। এর ফলে আমরা দেখতে পাই খারিজি এবং অন্যান্য দলের সৃষ্টি হয়েছিল।

দুই. গ্রীক ভাষায় রচিত গ্রন্থাবলির আরবী অনুবাদ এবং এর প্রচার। গ্রীক জ্ঞান-বিজ্ঞান তৎকালীন সময়ের জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তাঁদের যুক্তিপূর্ণ উপস্থাপনার কারণে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের দার্শনিক ও বুদ্ধিজীবীদের নিকট একটি গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছিল। উমাইয়া শাসক ও আব্বাসীয় খলিফাদের পৃষ্ঠপোষকতায় দর্শনশাস্ত্রের অনেক গ্রীক ভাষায় লিখিত গ্রন্থ আরবীতে অনুবাদ করা হয়েছিল। তার ফলে দার্শনিকদের মধ্যে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দর্শনের অনেক বিষয়ে গ্রীক দর্শনের প্রভাব পড়তে থাকে। দার্শনিক এবং আলিমদের মধ্যে বস্তু, উপাদান, সত্তা, পরমাণু, বস্তু ও ধর্ম ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা চলতে থাকে।

মু'তাযিলা সম্প্রদায়ের সূচনা লগ্নে মুরজিয়া এবং কাদরিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে, ঈমান, কুফর, জাবর বিষয়ে মতপার্থক্য ছিল। কাদরিয়াদের মতে মানুষ তাঁর কর্মে পূর্ণ স্বাধীন। তারা তাকদীরের ওপর বিশ্বাস করত না। অপর দিকে জাবরিয়াগণের মতে মানুষের কোন ক্ষমতাই নাই সে সৃষ্টিকর্তার আজ্ঞাবহ মাত্র। এমন একটি পরিস্থিতিতে যুক্তিবাদ দ্বারা পরিচালিত গ্রীকদর্শন মুসলমানদের মধ্যে প্রবেশ করায় তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্যগুলো আরো চরম আকার লাভ করে। তাকদীরের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাকদীরের ভাল-মন্দ সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়ে থাকলে মানুষকে কিভাবে তাঁর পাপের জন্য শাস্তি দেয়া যেতে পারে। এ বিষয়টি নিয়ে বির্তক শুরু হলে আলিমদের জ্ঞান চর্চার মজলিস সমূহে তাফসীর, হাদীস, ফিকাহ ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনার চেয়েও কালাম শাস্ত্রের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ের আলোচনা গুরুত্ব লাভ করে।

এ প্রেক্ষিতে আলিমদের দুটি দলের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়। একটি দল ইসলামের মৌলিক বিষয় তথা কুরআন ও হাদীসের আলোকে সকল বিষয়কে ব্যাখ্যা করতে থাকেন এবং অপর দলটি কুরআন হাদীসের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে যুক্তি ও বুদ্ধিকে প্রাধান্য দিতে থাকেন। দার্শনিক প্রশ্নাবলির ক্ষেত্রে প্রথম দল যুক্তি ও বুদ্ধির পরিবর্তে বিশ্বাসকে প্রাধান্য দিতে থাকেন। অপর দিকে অন্যদল বিশ্বাসের চেয়েও যুক্তি ও বুদ্ধিকে প্রাধান্য দিতে থাকেন। দ্বিতীয় দলটির সাথে মু'তাযিলাদের পদ্ধতিগত মিল থাকায় মু'তাযিলাগণ তাঁদেরকে নিজেদের পক্ষে টেনে আনতে সক্ষম হন।

মু'তাযিলাগণ যুক্তি ও বুদ্ধিকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণ হলো, তৎকালীন সময়ের গ্রীক দার্শনিক চিন্তার বিকাশ এবং খ্রিষ্টীয় দ্বিত্ববাদ ও ত্রিত্ববাদ এর মুকাবেলায় শিরক মুক্ত তাওহীদ বা একত্ববাদ প্রতিষ্ঠার জন্য এটাকে তারা প্রয়োজনীয় মনে করেছিল। কেননা তখন খ্রিষ্টানদের বিশ্বাস এর মুকাবেলায় একত্ববাদ প্রতিষ্ঠার জন্য যুক্তি ও বুদ্ধিকে প্রাধান্য দেয়া ব্যতীত শুধু বিশ্বাসের ভিত্তিতেই তা সম্ভব ছিল না এবং মুসলমানদের মধ্যে বিকল্প কোন সম্প্রদায় ছিল না যারা তাঁদের মুকাবেলা করতে পারে। এজন্যই মু'তাযিলাগণ আল্লাহ তায়ালার গুণাবলিকে চিরন্তন মনে করেন না। তাঁদের মতে আল্লাহ তায়ালার গুণাবলিকে চিরন্তন ধরে নেওয়া হলে পৃথক পৃথক সত্ত্বার অস্তিত্বের সম্ভাবনা তৈরি হয়।

তিন. অমুসলিমদের সাথে মুসলমানদের মেলামেশা ও মতবিনিময়ের সুযোগ। মু'তাযিলিগণ তাঁদের আকীদাসমূহ প্রচারের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি তাঁদেরকে সর্বাধিক সহায়তা করেছিল তা হলো, অমুসলিমগণের সাথে মুসলমানদের সম্পৃক্ততা। কেননা ঐ সমাজের অনেক নওমুসলিম তাঁদের পূর্বের ধর্মের ঐতিহ্য, সৃষ্টিকালচার এবং চিন্তাধারার উত্তরাধিকার সহ ইসলামে প্রবেশ করেছিলেন। ইসলাম গ্রহণ করার সত্ত্বেও তাঁদের মন মানসিকতা থেকে তাঁদের পূর্ব ধ্যান ধারণা সম্পূর্ণরূপে মুছে যায়নি। কেননা ইসলাম গ্রহণ করার পর ইসলামী শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদী পূর্ণাঙ্গ অনুশীলন ব্যতীত পরিশুদ্ধ ঈমানের অধিকারী হওয়া যায় না। খুবই কম সময়ের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করা সহজতর নয়। এর মধ্যে ছিল অগ্নিউপাসক, খ্রিষ্টান, ও বিভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী লোকজন। তাঁদের মধ্যে দ্বিত্ববাদ ও ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসী এবং নাস্তিকরাও ছিল। উপরিউক্ত অবস্থায় যুক্তি নির্ভর ও মুক্ত চিন্তায় বিশ্বাসী মুতাযিলাদের মতবাদের বীজ বপনের উপাদান সমূহ সমাজে প্রস্তুত ছিল। মুতাযিলাদের ধর্মীয় আন্দোলনের প্রভাবে এই সম্প্রদায়কে খুব সহজেই প্রভাবিত করা সম্ভব ছিল।

টিকাঃ
১ (পেজ ৭৭). আল কুরআন, সূরা ৪৪ আদ দুখান, আয়াত, ২১।
১ (পেজ ৭৮). ইসলামী বিশ্বকোষ, সম্পাদনা পরিষদ (ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ) ২০শ খণ্ড, পৃ. ৫৪।
১ (পেজ ৭৯). ইসলামী বিশ্বকোষ, প্রাগুক্ত, ২০শ খণ্ড, পৃ. ৫৪।
২. প্রাগুক্ত।
১ (পেজ ৮০). ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফাইয়াত আল আ'ইয়ান, প্রাগুক্ত, ৫ম খণ্ড, পৃ. ১৭০।
১ (পেজ ৮১). Syed Ameer Ali, The Spirit of Islam, (London : Chatto and windus, 1922), p.415.
২. ইসলামী বিশ্বকোষ, প্রাগুক্ত, ২০শ খণ্ড, পৃ. ৫৫।
৩. ইসলামী বিশ্বকোষ, প্রাগুক্ত, ২০শ খণ্ড, পৃ. ৫৫।
১ (পেজ ৮২). ইসলামী বিশ্বকোষ, প্রাগুক্ত, ২০শ খণ্ড, পৃ. ৫৫।
১ (পেজ ৮৩). ইসলামী বিশ্বকোষ, প্রাগুক্ত, ২০শ খণ্ড, পৃ. ৫৫।
২. আল্লামা শিবলী নু'মানী, ইসলামি দর্শন, (অনু: মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ, ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯৮১) পৃ. ৪৪।
১ (পেজ ৮৪). আল্লামা শিবলী নু'মানী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৭।
২. ইসলামী বিশ্বকোষ, প্রাগুক্ত, ২০শ খণ্ড, পৃ. ৫৫।
৩. ইসলামী বিশ্বকোষ, প্রাগুক্ত, ২০শ খণ্ড, পৃ. ৫৫।
১ (পেজ ৮৫). ইসলামী বিশ্বকোষ, প্রাগুক্ত, ২০শ খণ্ড, পৃ. ৫৬।

📘 মুতাযিলা আকিদা 📄 মু'তাযিলী আকীদার মূলনীতি

📄 মু'তাযিলী আকীদার মূলনীতি


মু'তাযিলাগণ নিজেদেরকে আহলুল আ'দলি ওয়াত তাওহীদ (اهل العدل والتوحيد) মনে করেন থাকেন। তাঁদের আকীদা সমূহের ৫টি মূলনীতি রয়েছে। যথা :
১. আততাওহীদ (التوحيد)
২. আল আদল (العدل)
৩. আল ওয়া'দ ওয়াল ওয়া'য়ীদ (الوعد والوعيد)
৪. আল মানযিলাতু বাইনাল মানযিলা তাইনি (المنزلة بين المنزلتين)
৫. আল আমর বিল মারুফ ওয়া নাহী আনিল মুনকার (الامر بالمعروف والنهي عن المنكر)

১. আততাওহীদ (التوحيد) :
মু'তাযিলাগণ আল্লাহ তায়ালার তাওহীদের ওপর একনিষ্ঠভাবে বিশ্বাসী ছিলেন। মু'তাযিলাদের আকীদার প্রথম মূলনীতি হচ্ছে আততাওহীদ (التوحيد) এজন্যই তারা আল্লাহ তায়ালার সাথে কাউকে শরিক করেন না এবং আল্লাহ তায়ালার গুণাবলিগুলোকেও স্বীকার করেন না। কেননা গুণাবলিগুলোকে স্বীকার করে নিলে ভিন্ন ভিন্ন সত্ত্বার অস্তিত্ব লাভ করে বলে তারা মনে করেন। তাঁদের তাওহীদের ভিত্তি হচ্ছে ليس كمثله شئ অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার সমকক্ষ কেউ নন। আল্লাহ তায়ালার কোন শারীরিক অস্তিত্ব নেই এবং সৃষ্টির সাথে কোন বিষয়ে তিনি তুলনার উর্ধ্বে।

আল্লাহ তায়ালার বাণী : الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَىٰ
তিনি পরম দয়াবান। (বিশ্ব-জাহানের) শাসন কর্তৃত্বের আসনে সমাসীন।
উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় الاستواء على العرش এর অর্থকে তারা রূপক অর্থে গ্রহণ করেছেন। যেমন বলা হয়, অমুক রাজা সিংহাসনে আরোহণ করেছেন। এর অর্থ হচ্ছে, তিনি রাজত্বের মালিক হয়েছেন। বাস্তবে সিংহাসনের (চেয়ারে) তিনি না বসলেও তিনি রাজত্বের মালিক। কখনো কখনো তার খ্যাতি, রাজত্ব, কর্তৃত্ব ও ক্ষমতাকে বোঝানোর জন্য শব্দটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তাই মু'তাযিলীগণ মনে করেন আল্লাহ তায়ালার আরশে সমাসীন এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার ক্ষমতা ও কর্তৃত্বকে বোঝানো।

আল্লাহ তায়ালার বাণী- وَلَا تَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آخَرَ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ ۚ لَهُ الْحُكْمُ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ
এবং আল্লাহর সাথে অন্য মাবুদদেরকে ডেকো না। তিনি ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই। সব জিনিসই ধ্বংস হবে কেবলমাত্র তাঁর সত্ত্বা ছাড়া। শাসন কর্তৃত্ব একমাত্র তাঁরই এবং তাঁরই দিকে তোমাদের সবাইকে ফিরে যেতে হবে।

وَيَبْقَىٰ وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ এবং তোমার মহীয়ান ও দয়াবান রবের সত্তাই অবশিষ্ট থাকবে।
উক্ত আয়াতে الوجه শব্দটি ব্যবহার হয়েছে। الوجه শব্দটি দ্বারা মু'তাযিলাগণ আল্লাহ তায়ালার সত্তাকে বুঝিয়েছেন। এখানে الوجه শব্দটির শাব্দিক অর্থ তারা গ্রহণ করেননি। কেননা এতে আল্লাহ তায়ালাকে সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য বা তুলনা করা হয়।

আল্লাহ তায়ালার বাণী: إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ ۚ فَمَن نَّكَثَ فَإِنَّمَا يَنكُثُ عَلَىٰ نَفْسِهِ ۖ وَمَنْ أَوْفَىٰ بِمَا عَاهَدَ عَلَيْهِ اللَّهَ فَسَيُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا
হে নবী যারা তোমার হাতে বাইয়াত করছিলো প্রকৃতপক্ষে তারা আল্লাহর কাছেই বাইয়াত করছিলো। তাদের হাতের ওপর ছিল আল্লাহর হাত। যে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করবে তার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করার অশুভ পরিণাম তার নিজের ওপরেই বর্তাবে। আর যে আল্লাহর সাথে কৃত এ প্রতিশ্রুতি পালন করবে, আল্লাহ অচিরেই তাকে বড় পুরস্কার দান করবেন।
উক্ত আয়াতে আল্লাহ তায়ালা يد বা হাত শব্দটি ব্যবহার করেছেন। মুতাযিলাগণ এ আয়াতের হাত শব্দটিকে ভাবার্থে, কাল্পনিক ও রূপকার্থে ব্যবহার করেছেন। কেননা আল্লাহ তায়ালা শারীরিক আকার-আকৃতি থেকে মুক্ত এবং মানুষের সাথে তাঁর কোন তুলনা হয় না। উক্ত আয়াতে যে হাত শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে তার অর্থ হলো এ যে, রাসূল (সা:) এর সাথে কৃত ওয়াদা পালনই আল্লাহ তায়ালার সাথে ওয়াদা পালনের সমতুল্য এবং রাসুলের আনুগত্যই আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য। যেমন অন্য আয়াতে বলা হয়েছে:
مَّن يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ ۖ وَمَن تَوَلَّى فَمَا أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا
যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করলো সে আসলে আল্লাহরই আনুগত্য করলো।

আল্লাহ তায়ালার বাণী:
وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ وَالْأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَالسَّمَاوَاتُ مَطْوِيَّاتٌ بِيَمِينِهِ ۚ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَىٰ عَمَّا يُشْرِكُونَ
আল্লাহকে যে মর্যাদা ও মূল্য দেয়া দরকার এসব লোক তা দেয়নি। (তাঁর অসীম ক্ষমতার অবস্থা এই যে,) কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবী তাঁর মুঠোর মধ্যে থাকবে আর আসমান তাঁর ডান হাতে পেঁচানো থাকবে।
উক্ত আয়াতে হাত শব্দটি মেজাজ বা রূপকার্থে ব্যবহার হয়েছে বলে মুতাযিলাগণ মনে করেন। কেননা আল্লাহ তায়ালা সকল প্রকার আকার ও আকৃতি থেকে মুক্ত।

আল্লাহ তায়ালার বাণী :
وَإِذْ قُلْتُمْ يَا مُوسَىٰ لَن نُّؤْمِنَ لَكَ حَتَّىٰ نَرَى اللَّهَ جَهْرَةً فَأَخَذَتْكُمُ الصَّاعِقَةُ وَأَنتُمْ تَنظুরُونَ
স্মরণ করো, যখন তোমরা মূসাকে বলেছিলে, “আমরা কখনো তোমার কথায় বিশ্বাস করবো না, যতক্ষণ না আমরা স্বচক্ষে আল্লাহকে তোমার সাথে প্রকাশ্যে (কথা বলতে) দেখবো।” সে সময় তোমাদের চোখের সামনে তোমাদের ওপর একটি ভয়াবহ বজ্রপাত হলো, তোমরা নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে গেলে।
উক্ত আয়াতের ভিত্তিতে মু'তাযিলাগণ মনে করে থাকেন আল্লাহ তায়ালাকে ইহকাল বা পরকালে দেখা সম্ভব নয়। তারা দলিল হিসেবে উপস্থাপন করে থাকেন : لَّا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ وَهُوَ يُدْرِكُ الْأَبْصَارَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ দৃষ্টিশক্তি তাঁকে দেখতে অক্ষম কিন্তু তিনি দৃষ্টিকে আয়ত্ব করে নেন। তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মদর্শী ও সর্বজ্ঞ।

আল্লাহ তায়ালার বাণী: الَّذِينَ يَحْمِلُونَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُونَ بِهِ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَّحْمَةً وَعِلْمًا فَاغْفِرْ لِلَّذِينَ تَابُوا وَاتَّبَعُوا سَبِيلَكَ وَقِهِمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ
আল্লাহর আরশের ধারক ফেরেশতাগণ এবং যারা আরশের চারপাশে হাজির থাকে তারা সবাই প্রশংসাসহ তাদের রবের পবিত্রতা বর্ণনা করে। তাঁর প্রতি ঈমান পোষণ করে এবং ঈমানদারদের জন্য দোয়া করে। তারা বলেঃ হে আমাদের রব, তুমি তোমার রহমত ও জ্ঞান দ্বারা সবকিছু পরিবেষ্টন করে আছো। তাই মাফ করে দাও এবং দোযখের আগুন থেকে রক্ষা করো যারা তাওবা করেছে এবং তোমার পথ অনুসরণ করছে তাদেরকে।
উক্ত আয়াতকে মু'তাযিলাগণ দলিল হিসেবে উপস্থাপন করে বলেন, আল্লাহ তায়ালার আরশ বহনকারী ফেরেশতাগণও তাঁর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেন। ফেরেশতাগণ স্বচক্ষে আল্লাহ তায়াকে দেখে থাকলে আল্লাহ তায়ালার প্রতি তাঁদের বিশ্বাসের বিষয়টি অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়তো। কেননা ঈমান হলো অদৃশ্যের প্রতি বিশ্বাস। উক্ত আয়াতের বিশ্লেষণে বুঝা যায় যে, ফেরেশতাগণ আল্লাহ তায়ালার আরশ বহন করার সত্ত্বেও আল্লাহ তায়ালাকে দেখতে পাননি বরং ফেরেশতারা আল্লাহ তায়ালার প্রতি ঈমান এনেছেন। এর দ্বারা আরও প্রমাণ হয় আল্লাহ তায়ালা সকল প্রকার আকার ও আকৃতির উর্ধ্বে।

মু'তাযিলাগণ আল্লাহ তায়ালার গুণাবলিকে অস্বীকার করেন। তারা মনে করেন আল্লাহ তায়ালা একক সত্ত্বা। তাঁর পৃথক কোন গুণাবলি নেই। আহলি সুন্নাত ওয়াল জামা'আতগণ যে বিষয়গুলোকে আল্লাহ তায়ালার গুণাবলি মনে করেন মুতাযিলাগণ সেই বিষয়গুলোকে তাঁর সত্তার অন্তর্ভুক্ত মনে করেন। তারা দলিল হিসেবে উপস্থাপন করেন : قَالَ رَبِّي يَعْلَمُ الْقَوْلَ فِي السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
রাসূল বললো, আমার রব এমন প্রত্যেকটি কথা জানেন যা আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে বলা হয়, তিনি সবকিছু শোনেন ও জানেন।

أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ ۚ إِنَّ ذَلِكَ فِي كِتَابٍ ۚ إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ
তুমি কি জানো না, আকাশ ও পৃথিবীর প্রত্যেকটি জিনিসই আল্লাহ জানেন?

ফَأَمَّا عَادٌ فَاسْتَكْبَرُوا فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَقَالُوا مَنْ أَشَدُّ مِنَّا قُوَّةً ۖ أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّ اللَّهَ الَّذِي خَلَقَهُمْ هُوَ أَشَدُّ مِنْهُمْ قُوَّةً ۖ وَكَانُوا بِآيَاتِنَا يَجْحَدُونَ
তাদের অবস্থা ছিল এই যে, পৃথিবীতে তারা অন্যায়ভাবে নিজেদেরকে বড় মনে করে বসেছিলো এবং বলতে শুরু করেছিল: আমাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী আর কে আছে ? তারা একথা বুঝলো না যে, যে আল্লাহ তাঁদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি তাঁদের অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী।
উক্ত আয়াতগুলোর প্রেক্ষিতে মু'তাযিলাগণ বলে থাকেন, আল্লাহ তায়ালার জ্ঞানের সাথে মানুষের জ্ঞানের তুলনা করা জায়েয নেই। কেননা মানুষের জ্ঞান মূর্খতার পর অর্জিত হয়েছে। মানুষ প্রথমে অজ্ঞ ছিল। তারপর তাঁর অবস্থার পরিবর্তন হয়ে সে জ্ঞানী হয়েছে। অপর দিকে আল্লাহ তায়ালা পরিবর্তন থেকে মুক্ত এবং তিনি সত্ত্বাগতভাবেই জ্ঞানী। জ্ঞান তাঁর সিফাত নয়।

মু'তাযিলাগণ মনে করে থাকেন কুরআন মাখলুক বা সৃষ্ট। আল কুরআন চিরন্তন নয় এবং আল্লাহ তায়ালার সিফাতও নয়। কেননা পবিত্র কুরআন অনেকগুলো আদেশ, নিষেধ, সংবাদ, উপদেশ এর সমষ্টি। তারা মনে করেন পবিত্র কুরআনকে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টি করেছেন এবং এটি একটি মু'জিযা। কেননা মানুষ এর অনুরূপ তৈরি করতে অক্ষম। এই বক্তব্যের সমর্থনে কুরআনের একটি আয়াতকে তারা দলিল হিসেবে পেশ করেন:
قُل لَّئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَن يَأْتُوا بِمِثْلِ هَذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا
বলে দাও, যদি মানুষ ও জিন সবাই মিলে কুরআনের মতো কোনো একটি জিনিস আনার চেষ্টা করে তাহলে তারা আনতে পারবে না, তারা পরস্পরের সাহায্যকারী হয়ে গেলেও।

২. আল আদল (العدل)
আল আদল (العدل) শব্দের অর্থ হচ্ছে ন্যায় বিচার। তারা মনে করেন আল্লাহ তায়ালা ন্যায় বিচারক তিনি জুলুম করতে পারেন না এবং তিনি বান্দার কল্যাণের জন্য সকল প্রকার ব্যবস্থা করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বান্দার অকল্যাণ করতে পারেন না। কাফেরগণ পরকালে শাস্তি ভোগ করবে তাঁদের কর্ম ফলের কারণে। এর দলিল হিসেবে তারা নিম্নোক্ত আয়াত উপস্থাপন করেন: وَقَالَ مُوسَىٰ رَبِّي أَعْلَمُ بِمَن جَاءَ بِالْهُدَى مِنْ عِندِهِ وَمَن تَكُونُ لَهُ عَاقِبَةُ الدَّارِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ
মূসা জবাব দিল, "আমার রব তার অবস্থা ভালো জানেন, যে তার পক্ষ থেকে পথ নির্দেশনা নিয়ে এসেছে এবং কার শেষ পরিণতি ভালো হবে তাও তিনিই ভালো জানেন, আসলে জালেম কখনো সফলকাম হয় না।

وَالَّذِينَ صَبَرُوا ابْتِغَاءَ وَجْهِ رَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَنفَقُوا مِمَّا رَزَقْنَاهُمْ سِرًّا وَعَلَانِيَةً وَيَدْرَءُونَ بِالْحَسَنَةِ السَّيِّئَةَ أُولَئِكَ لَهُمْ عُقْبَى الدَّارِ - جَنَّاتُ عَدْنٍ يَدْخُلُونَهَا وَمَن صَلَحَ مِنْ آبَائِهِمْ وَأَزْوَاجِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ وَالْمَلَائِكَةُ يَدْخُلُونَ عَلَيْهِم مِّن كُلِّ بَابٍ
তাদের অবস্থা হয় এই যে, নিজেদের রবের সন্তুষ্টির জন্য তারা সবর করে, নামাজ কায়েম করে, আমার দেয়া রিযিক থেকে প্রকাশ্যে ও গোপনে খরচ করে এবং ভালো দিয়ে মন্দ দূরীভূত করে। আখেরাতের গৃহ হচ্ছে তাঁদের জন্যই।

وَقَدْ مَكَرَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ فَلِلَّهِ الْمَكْرُ جَمِيعًا يَعْلَمُ مَا تَكْسিবُ كُلُّ نَفْسٍ وَسَيَعْلَمُ الْكُفَّارُ لِمَنْ عُقْبَى الدَّارِ
এদের আগে যারা অতিক্রান্ত হয়েছে তারাও বড় বড় চক্রান্ত করেছিল কিন্তু আসল সিদ্ধান্তকর কৌশল তো পুরোপুরি আল্লাহর হাতে রয়েছে।

আল্লাহ তায়ালার সকল কাজই প্রজ্ঞাময় এবং বান্দার জন্য কল্যাণকর। এর দলিল হিসেবে মুতাযিলাগণ বলেন যে, যে সকল বিষয় মানুষের জন্য অকল্যাণকর আল্লাহ তায়ালা ঐ সকল বিষয় থেকে মানুষকে নিষেধ করেছেন। মানুষের ওপর যা কিছু অকল্যাণ পতিত হয় তা তাঁর নিজের কর্মফলের কারণে।
আল্লাহ তায়ালার বাণী: وَاصْنَعِ الْফُلْكَ بِأَعْيُنِنَا وَوَحْيِنَا وَلَا تُخَاطِبْنِي فِي الَّذِينَ ظَلَمُوا ۚ إِنَّهُم مُّغْرَقُونَ
এবং আমার তত্ত্বাবধানে আমার অহী অনুযায়ী একটি নৌকা বানানো শুরু করে দাও। আর দেখো যারা জুলুম করেছে তাঁদের জন্য আমার কাছে কোন সুপারিশ করো না, এরা সবাই এখন ডুবে যাবে।

উক্ত আয়াতে আল্লাহ তায়ালা হযরত নূহ (আ:) কে তাঁর জাতির অমান্যকারী লোকদের ব্যাপারে কোন সুপারিশ করতে নিষেধ করেছেন। আল্লামা যামাখশারী উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, তাঁদের নাজাতের জন্য দোয়া করতে আল্লাহ তায়ালা কেন নিষেধ করলেন এবং তাঁদের বন্যার পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করার মধ্যে কি হেকমত রয়েছে? তিনি বলেন, তাঁদের ডুবে যাওয়ার মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে। কেননা তারা সীমালংঘন করছিল। যার প্রমাণ অন্য আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে: وَقَالَ نُوحٌ رَّبِّ لَا تَذَرْ عَلَى الْأَرْضِ مِنَ الْكَافِرِينَ دَيَّارًا - إِنَّكَ إِن تَذَرْهُمْ يُضِلُّوا عِبَادَكَ وَلَا يَلِدُوا إِلَّا فَاجِرًا كَفَّارًا
আর নূহ বললোঃ হে আমার রব, এ কাফেরদের কাউকে পৃথিবীর বুকে বসবাসের জন্য রেখো না। তুমি যদি এদের ছেড়ে দাও তাহলে এরা তোমার বান্দাদের বিভ্রান্ত করবে এবং এদের বংশে যারাই জন্মলাভ করবে তারাই হবে দুষ্কৃতকারী ও কাফের।

আল্লাহ তায়ালার বাণী-
وَلَوْلَا أَن يَكُونَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً لَّجَعَلْنَا لِمَن يَكْفُرُ بِالرَّحْمَنِ لِبُيُوتِهِمْ سُقُفًا مِّن فِضَّةٍ وَمَعَارِجَ عَلَيْهَا يَظْهَرُونَ - وَلِبُيُوتِهِمْ أَبْوَابًا وَسُرُرًا عَلَيْهَا يَتَّكِئُونَ - وَزُخْرُفًا ۚ وَإِن كُلُّ ذَلِكَ لَمَّا مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةُ عِندَ رَبِّكَ لِلْمُتَّقِينَ
সমস্ত মানুষ একই পথের অনুসারি হয়ে যাবে যদি এ আশংকা না থাকত তাহলে যারা দয়াময় আল্লাহর সাথে কুফরি করে আমি তাঁদের ঘরের ছাদ, যে সিঁড়ি দিয়ে তারা তাঁদের বালাখানায় ওঠে সেই সিঁড়ি, দরজাসমূহ এবং যে সিংহাসনের ওপর তারা বালিশে হেলান দিয়ে বসে তা সবই রৌপ্য এবং স্বর্ণের বানিয়ে দিতাম।
উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা যামাখশারী বলেন, আল্লাহ তায়ালা কাফেরদের জন্য দুনিয়ার সামগ্রী প্রশস্ত করে দেয়ার কারণ কি? অথচ তা কাফেরদের জন্য ফেতনা বৃদ্ধি করবে। অপর দিকে আল্লাহ তায়ালা মু'মিনদের জন্য তাঁদের নেকআমল করা সত্ত্বেও দুনিয়ার সামগ্রী প্রশস্ত করে দেয়ার কথা বলেনি। এর হেকমত হচ্ছে এ যে, আল্লাহ তায়ালা এর মাধ্যমে দুটি দল তৈরি করতে চান, ধনী ও গরিব এবং আল্লাহ তায়ালা গরিবদেরকে ধনীদের ওপর বিজয় দান করবেন। এর মাধ্যমে আল্লামা যামাখশারী প্রমাণ করতে চান যে, আল্লাহ তায়ালা বান্দার জন্য অকল্যাণ কিছু করেন না।

মু'তাযিলাগণের মতে আল্লাহ তায়ালা অকল্যাণের স্রষ্টা নন। এর দলিল হিসেবে নিম্নোক্ত আয়াত পেশ করেন:
وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُضِلَّ قَوْمًا بَعْدَ إِذْ هَدَاهُمْ حَتَّىٰ يُبَيِّنَ لَهُم مَّا يَتَّقُونَ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
লোকদেরকে হেদায়াত দান করার পর আবার গোমরাহীতে লিপ্ত করা আল্লাহর রীতি নয়, যতক্ষণ না তিনি তাঁদেরকে কোন জিনিস থেকে সংযত হয়ে চলতে হবে তা পরিষ্কার করে জানিয়ে দেন।

ফَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
না, হে মুহাম্মদ! তোমার রবের কসম, এরা কখনো মুমিন হতে পারে না যতক্ষণ এদের পারস্পরিক মতবিরোধের ক্ষেত্রে এরা তোমাকে ফায়সালাকারী হিসেবে মেনে না নেবে।

قُلْ إِنِّي نُهِيتُ أَنْ أَعْبُدَ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ لَمَّا جَاءَنِيَ الْبَيِّنَاتُ مِن رَّبِِّي وَأُمِرْتُ أَنْ أُسْلِمَ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ
হে নবী, এসব লোককে বলে দাও, আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা যাদেরকে ডাকো আমাকে সেসব সত্তার দাসত্ব করতে নিষেধ করা হয়েছে।

قَالَ أَتَعْبُدُونَ مَا تَنْحِتُونَ - وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُونَ
সে বললো, " তোমরা কি নিজেদেরই খোদাই করা জিনিসের পূজা করো ? অথচ আল্লাহই তোমাদেরকেও সৃষ্টি করেছেন এবং তোমরা যে জিনিসগুলো তৈরি করো তাঁদেরকেও।”

هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُم مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا ثُمَّ اسْتَوَىٰ إِلَى السَّمَاءِ فَسَوَّاهُنَّ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
তিনিই পৃথিবীতে তোমাদের জন্য সমস্ত জিনিস সৃষ্টি করলেন।

وَيَا قَوْمِ أَوْفُوا الْمِكْيَالَ وَالْمِيزَانَ بِالْقِسْطِ وَلَا تَبْخَسُوا النَّاسَ أَشْيَاءَهُمْ وَلَا تَعْثَوْا فِي الْأَرْضِ مُفْسِدِينَ
আর হে আমার সম্প্রদায়ের ভাইয়েরা! যথাযথ ইনসাফ সহকারে মাপো ও ওজন করো এবং লোকদেরকে তাঁদের প্রাপ্য সামগ্রী কম দিয়ো না।

قَالُوا تَقَاسَمُوا بِاللَّهِ لَنُبَيِّتَنَّهُ وَأَهْلَهُ ثُمَّ لَنَقُولَنَّ لِوَلِيِّهِ مَا شَهِدْنَا مَهْلِكَ أَهْلِهِ وَإِنَّا لَصَادِقُونَ
তারা পরস্পর বললো “আল্লাহর কসম খেয়ে শপথ করে নাও, আমরা সালেহ ও তাঁর পরিবার পরিজনদের ওপর নৈশ আক্রমণ চালাবো এবং তারপর তাঁর অভিভাবককে বলে দেবো আমরা তাঁর পরিবারের ধ্বংসের সময় উপস্থিত ছিলাম না।

মু’তাযিলাগণের মতে হারাম রিযিক নয়। আল্লাহ তায়ালা মানুষের কল্যাণ চান, অকল্যাণ চান না। এ জন্যই আল্লাহ তায়ালা মানুষকে হারাম রিযিক দান করেন না। মানুষ যা কিছু হারাম অর্জন করে তা নিজের কর্মের ফল। তিনি দলিল হিসেবে নিম্নোক্ত আয়াতকে পেশ করেন :
أَهُمْ يَقْسِمُونَ رَحْمَتَ رَبِّكَ نَحْنُ قَسَمْنَا بَيْنَهُم مَّعِيشَتَهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَرَفَعْنَا بَعْضَهُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِّيَتَّخِذَ بَعْضُهُم بَعْضًا سُخْرِيًّا وَرَحْمَتُ রَبِّكَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُونَ
তোমার রবের রহমত কি এরা বণ্টন করে? দুনিয়ার জীবনে এদের মধ্যে জীবন যাপনের উপায় উপকরণ আমি বণ্টন করেছি।

وَالَّذِينَ صَبَرُوا ابْتِغَاءَ وَجْهِ رَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَنفَقُوا مِمَّا رَزَقْنَاهُمْ سِرًّا وَعَلَانِيَةً وَيَدْرَءُونَ بِالْحَسَنَةِ السَّيِّئَةَ أُولَئِكَ لَهُمْ عُقْبَى الدَّارِ
তাদের অবস্থা হয় এ যে, নিজেদের রবের সন্তুষ্টির জন্য তারা সবর করে, নামাজ কায়েম করে, আমার দেয়া রিযিক থেকে প্রকাশ্যে ও গোপনে খরচ করে এবং ভালো দিয়ে মন্দ দূরীভূত করে।

ذَلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ
এটি আল্লাহর কিতাব, এর মধ্যে কোন সন্দেহ নেই। এটি হিদায়াত সেই ‘মুত্তাকী’দের জন্য।

মু'তাযিলাদের আকীদা হলো, বান্দা তাঁর ভাল ও মন্দ কর্মের স্রষ্টা। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে ভাল ও মন্দ উভয় পথকে দেখিয়েছেন। তাঁর ভাল কর্মের ফলে সে পুরস্কার পাবে এবং মন্দ কর্মের ফলে সে শাস্তি পাবে। এর দলিল হিসেবে তারা নিম্নোক্ত আয়াত পেশ করেন : قَالَ رَبِّ بِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأُزَيِّنَنَّ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَلَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ সে বললো, “হে আমার রব! তুমি যেমন আমাকে বিপথগামী করলে ঠিক তেমনিভাবে আমি পৃথিবীতে এদের জন্য প্রলোভন সৃষ্টি করে এদের সবাইকে বিপথগামী করবো,

وَمَا نُرِيهِم مِّنْ آيَةٍ إِلَّا هِيَ أَكْبَرُ مِنْ أُخْتِهَا ۖ وَأَخَذْنَاهُم بِالْعَذَابِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ আমি তাঁদেরকে একের পর এক এমন সব নিদর্শন দেখাতে থাকলাম যা আগেরটার চেয়ে বড় হতো। আমি তাঁদেরকে আযাবের মধ্যে লিপ্ত করলাম যাতে তারা তাঁদের আচরণ থেকে বিরত থাকে।

وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ لَجَعَلَ النَّاسَ أُمَّةً وَاحِدَةً ۖ وَلَا يَزَالُونَ مُخْتَلِفِينَ অবশ্য তোমার রব চাইলে সমগ্র মানব জাতিকে একই গোষ্ঠীভুক্ত করতে পারতেন, কিন্তু এখন তারা বিভিন্ন পথেই চলতে থাকবে।

মু'তাযিলগণ মনে করেন বান্দা তাঁর ইচ্ছা ও কর্মের ক্ষেত্রে স্বাধীন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর ওপর কোন কিছু জোর করে চাপিয়ে দেন না। ভাল-মন্দ কাজের ফলাফল তাঁর কর্মের দ্বারাই নির্ধারিত হবে। এর দলিল হলো:
وَيَوْمَ يَحْشُرُهُمْ وَمَا يَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ فَيَقُولُ أَأَنتُمْ أَضْلَلْتُمْ عِبَادِي هَؤُلَاءِ أَمْ هُمْ ضَلُّوا السَّبِيلَ - قَالُوا سُبْحَانَكَ مَا كَانَ يَنبَغِي لَنَا أَن نَّتَّخِذَ مِن دُونِكَ مِنْ أَوْلِيَاءَ وَلَكِن مَّتَّعْتَهُمْ وَآبَاءَهُمْ حَتَّىٰ نَسُوا الذِّكْرَ وَكَانُوا قَوْمًا بُورًا
আর সেইদিনই (তোমার রব) তাঁদেরকেও ঘিরে আনবেন এবং তাঁদের উপাস্যদেরও আল্লাহকে বাদ দিয়ে আজ তারা যাদের পূজা করছে। তারপর তিনি তাঁদের জিজ্ঞেস করবেন, "তোমরা কি আমার এ বান্দাদের গোমরাহ করেছিলে? অথবা এরা নিজেরাই সহজ সরল সত্যপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছিল?” তারা বলবে, "পাক পবিত্র আপনার সত্তা! আপনাকে ছাড়া অন্য কাউকে আমাদের প্রভুরূপে গ্রহণ করার ক্ষমতাও তো আমাদের ছিল না।

মু'তাযিলাদের আরেকটি আকীদা হলো, শয়তান মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতার ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। শয়তান মানুষের নিকট মন্দকে সুশোভিত করে উপস্থাপন করে মাত্র। অতঃপর মানুষই তাঁর স্বাধীন ইচ্ছার মাধ্যমে নিজের জন্য ভাল বা মন্দকে গ্রহণ করে। মু'তাযিলাগণ মনে করেন মানুষ তাঁর দুর্ভাগ্য বা সৌভাগ্যের নির্মাতা। সে তাঁর কর্মের ক্ষেত্রে স্বাধীন। আল্লামা যামাখশারী দলিল হিসেবে নিম্নোক্ত আয়াতে পেশ করেন :

وَقَالَ الشَّيْطَانُ لَمَّا قُضِيَ الْأَمْرُ إِنَّ اللَّهَ وَعَدَكُمْ وَعْدَ الْحَقِّ وَوَعَدتُّكُمْ فَأَخْلَفْتُكُمْ ۖ وَمَا كَانَ لِيَ عَلَيْكُم مِّن سُلْطَانٍ إِلَّا أَن دَعَوْتُكُمْ فَاسْتَجَبْتُمْ لِي فَلَا تَلُومُونِي وَلُومُوا أَنفُسَكُم مَّا أَنَا بِمُصْرِخِكُمْ وَمَا أَنتُم بِمُصْرِخِيَّ إِنِّي كَفَرْتُ بِمَا أَشْرَكْتُمُونِ مِن قَبْلُ إِنَّ الظَّالِمِينَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
আর যখন সবকিছুর মীমাংসা হয়ে যাবে তখন শয়তান বলবে "সত্যি বলতে কি আল্লাহ তোমাদের সাথে যে ওয়াদা করেছিলেন তা সব সত্যি ছিল এবং আমি যেসব ওয়াদা করেছিলাম তাঁর মধ্য থেকে একটিও পুরা করিনি। তোমাদের ওপর আমার তো কোন জোর ছিল না, আমি তোমাদের আমার পথের দিকে আহ্বান জানানো ছাড়া আর কিছুই করিনি এবং তোমরা আমার আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলে। এখন আমার নিন্দাবাদ করো না, নিজেরাই নিজেদের নিন্দাবাদ করো।

মু'তাযিলাগণ মনে করেন যে, আল্লাহ তায়ালা বান্দার ওপর তাঁর ক্ষমতার চেয়ে বেশি দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না। আল্লাহ তায়ালা ন্যায়পরায়ণ এবং বান্দার প্রতি অনুগ্রহকারী। তিনি যুগে যুগে মানুষের কল্যাণের জন্য দ্বীন ও শরীয়তসহ নবী ও রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন। অতপর মানুষ তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী হেদায়ের পথ অথবা কুফুরীর পথ গ্রহণ করেছে। এর দলিল হিসেবে পেশ করেন:
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ فَمِنْهُم مَّনْ هَدَى اللَّهُ وَمِنْهُم مَّنْ حَقَّتْ عَلَيْهِ الضَّلَالَةُ ۚ فَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانظੁਰُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ
প্রত্যেক জাতির মধ্যে আমি একজন রাসূল পাঠিয়েছি এবং তাঁর মাধ্যমে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছি যে, “আল্লাহর বন্দেগী করো এবং তাগূতের বন্দেগী পরিহার করো।” এরপর তাঁদের মধ্য থেকে কাউকে আল্লাহ সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছেন এবং কারোর ওপর পথভ্রষ্টতা চেপে বসেছে।

وَمَا أَرْسَلْنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ ۖ فَيُضِلُّ اللَّهُ مَن يَشَاءُ وَيَهْدِي مَن يَشَاءُ ۚ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
আমি নিজের বাণী পৌঁছাবার জন্য যখনই কোন রাসূল পাঠিয়েছি, সে তাঁর নিজের সম্প্রদায়েরই ভাষায় বাণী পৌঁছিয়েছে , যাতে সে তাঁদেরকে খুব ভালোভাবে পরিষ্কারভাবে বুঝাতে পারে।

৩. আল ওয়া'দ ওয়াল ওয়া'য়ীদ (الوعد والوعيد) :
আল ওয়া'দ ওয়াল ওয়া'য়ীদ (الوعد والوعيد) । এর মধ্যে الوعد শব্দটির অর্থ হচ্ছে ওয়াদা বা প্রতিশ্রুতি। আর الوعيد এর অর্থ হচ্ছে সতর্ক বাণী। উক্ত মূলনীতির আলোকে মুতাযিলাগণ মনে করেন পাপী তাওবা না করলে চিরস্থায়ী জাহান্নামে থাকবে এবং দুনিয়াতে যে ব্যক্তি তাওবা করবে তাঁকে ক্ষমা করা আল্লাহ তায়ালার জন্য ওয়াজিব। কাফের এবং পাপী তাওবা না করলে উভয়ই শাস্তির ক্ষেত্রে সমান। পাপীকে শাস্তি দেয়া এবং পূণ্যবানকে পুরস্কার দেয়া আল্লাহ তায়ালার জন্য ওয়াজিব এবং কিয়ামতের দিন শাফা'য়াত সাব্যস্ত হবে না।

ঈমানের সংজ্ঞা: মু'তাযিলাগণের মতে ঈমান বলতে অন্তরে বিশ্বাস, মৌখিক স্বীকৃতি এবং সেই অনুযায়ী আমল করাকে বুঝায়। সুতরাং যে ব্যক্তি মৌখিক স্বীকৃতি এবং আমল করবে কিন্তু অন্তরে বিশ্বাস করবে না সে হচ্ছে মুনাফিক। আর যে ব্যক্তি স্বীকৃতি দিবে না সে হলো কাফের। আর যে ব্যক্তি আমল করবে না সে হচ্ছে ফাসিক। তাঁদের মতে ঈমান এবং আনুগত্য উভয়ই ঈমানের অংশ। এর দলিল হিসেবে তারা পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত উল্লেখ করেন :
وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِّنْ أَمْرِنَا مَا كُنتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيمَانُ وَلَكِن جَعَلْنَاهُ نُورًا نَّهْدِي بِهِ مَن نَّشَاءُ مِنْ عِبَادِنَا وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيم
এভাবেই (হে মুহাম্মাদ), আমি আমার নির্দেশে তোমার কাছে এক রূহকে অহী করেছি। তুমি আদৌ জানতে না কিতাব কি এবং ঈমানই বা কি।

وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِّتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا ۖ وَمَا جَعَلْنَا الْقِبْلَةَ الَّتِي كُنتَ عَلَيْهَا إِلَّا لِنَعْلَمَ مَن يَتَّبِעُ الرَّسُولَ مِمَّن يَنقَلِبُ عَلَى عَقِبَيْهِ ۚ وَإِن كَانَتْ لَকَبِيرَةً إِلَّا عَلَى الَّذِينَ هَدَى اللَّهُ وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُضِيعَ إِيمَانَكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ بِالنَّاسِ لَرَءُوفٌ رَّحِيم
আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে একটি 'মধ্যপন্থী' উম্মাতে পরিণত করেছি, যাতে তোমরা দুনিয়াবাসীদের ওপর সাক্ষী হতে পারো এবং রাসূল হতে পারেন তোমাদের ওপর সাক্ষী।

وَلَا تَقْرَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّىٰ يَبْلُغَ أَشُدَّهُ ۖ وَأَوْفُوا الْكَيْلَ وَالْمِيزَانَ بِالْقِسْطِ لَا نُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا ۖ وَإِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَىٰ وَبِعَهْدِ اللَّهِ أَوْفُوا ذَلِكُمْ وَصَّاكُم بِهِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ
আর তোমরা প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত এতীমের সম্পদের ধারে কাছেও যেয়ো না, তবে উত্তম পদ্ধতিতে যেতে পারো। ওজন ও পরিমাপে পুরোপুরি ইনসাফ করো, প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর আমি ততটুকু দায়িত্বের বোঝা দিয়ে থাকি যতটুকু তাঁর সামর্থের মধ্যে রয়েছে।

ঈমান বাড়ে ও কমে : মু'তাযিলাগণের মতে ঈমান বাড়ে ও কমে। কেননা বিশ্বাস এবং আমলের সমষ্টি হলো ঈমান। তাই ঈমান বাড়ে ও কমে। যেহেতু আনুগত্য ঈমানের অংশ তাই আমলের হ্রাস-বৃদ্ধির ফলে ঈমানও হ্রাস বৃদ্ধি পায়। তাঁদের দলিল হলো :
(الَّذِينَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيمَانًا وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ) লোকেরা বললোঃ তোমাদের বিরুদ্ধে বিরাট সেনা সমাবেশ ঘটেছে। তাঁদেরকে ভয় করো, তা শুনে তাঁদের ঈমান আরো বেড়ে গেছে।

আল্লামা যামাখশারী কাশশাফ গ্রন্থে এ বিষয়ের দলিল হিসেবে কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করেছেন :
وعن ابن عمر : قلنا يا رسول الله إن الإيمان يزيد وينقص؟ قال نعم يزيد حتى يدخل صاحبه الجنة . وينقص حتى يدخل صاحبه النار -
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা:) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন আমরা রাসূল (সা:) কে জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা:) ঈমান কি বাড়ে ও কমে? তিনি বললেন হ্যাঁ, ঈমান বৃদ্ধি পায় এমন কি তা ঈমানদারকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেয় এবং ঈমান হ্রাস পায় এমনকি তা তাঁকে জাহান্নামে প্রবেশ করিয়ে দেয়।

وعن عمر رضي الله عنه : أنه كان يأخذ بيد الرجل فيقول : قم بنا نزدد إيمانا - হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা:) থেকে বর্ণিত। তিনি এক ব্যক্তির হাত ধরে বললেন, চল আমরা আমাদের ঈমান বৃদ্ধি করে নেই।

وعنه : لو وزن إيمان أبي بكر بايمان هذه الأمة لرجع به - হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা:) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন যদি আবু বকর (রা:) এর ঈমানকে এই উম্মতের ঈমানের সাথে ওজন করা হয় তাহলে তার পাল্লায় ভারী হবে।

কবীরা গুনাহকারী তাওবা ব্যতীত ক্ষমা পাবে না এবং সে চিরস্থায়ী জাহান্নামে থাকবে। তাওবা বিহীন পাপী এবং কাফের ক্ষমা না পাওয়ার ক্ষেত্রে সমান। এর দলিল হিসেবে নিম্নোক্ত আয়াত উল্লেখ করেন:
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا وَظَلَمُوا لَمْ يَكُنِ اللَّهُ لِيَغْفِرَ لَهُمْ وَلَا لِيَهْدِيَهُمْ طَرِيقًا
এভাবে যারা কুফরী ও বিদ্রোহের পথ অবলম্বন করে এবং জুলুম-নিপীড়ন চালায় , আল্লাহ তাঁদেরকে কখনো মাফ করবেন না।

কাফের আল্লাহ তায়ালার ক্রোধে পতিত হবে। যেমনিভাবে তাওবা বিহীন পাপীও আল্লাহ তায়ালার ক্রোধে পতিত হবে এবং এরা চিরস্থায়ী জাহান্নামী। এর দলিল হলো :
وَإِذْ قُلْتُمْ يَا مُوسَىٰ لَن نَّصْبِرَ عَلَىٰ طَعَامٍ وَاحِدٍ فَادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُخْرِجْ لَنَا مِمَّا تُنبِتُ الْأَرْضُ مِن بَقْلِهَا وَقِثَّائِهَا وَفُومِهَا وَعَدَسِهَا وَبَصَلِهَا ۖ قَالَ أَتَسْتَبْدِلُونَ الَّذِي هُوَ أَدْنَىٰ بِالَّذِي هُوَ خَيْرٌ اهْبِطُوا مِصْرًا فَإِنَّ لَكُم مَّا سَأَلْتُمْ وَضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذِّلَّةُ وَالْمَسْكَنَةُ وَبَاءُوا بِغَضَبٍ مِّنَ اللَّهِ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَانُوا يَكْفُرُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَيَقْتُلُونَ النَّبِيِّينَ بِغَيْرِ الْحَقِّ ذَلِكَ بِمَا عَصَوا وَّكَانُوا يَعْتَدُونَ
স্মরণ করো, যখন তোমরা বলেছিলে, “হে মূসা! আমরা একই ধরনের খাবারের ওপর সবর করতে পারি না, তোমার রবের কাছে দোয়া করো যেন তিনি আমাদের জন্য শাক-সবজি, গম, রসুন, পেঁয়াজ, ডাল ইত্যাদি কৃষিজাত দ্রব্যাদি উৎপন্ন করেন।” ... অবশেষে অবস্থা এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছলো যার ফলে লাঞ্ছনা , অধপতন, দুরবস্থা ও অনটন তাঁদের ওপর চেপে বসলো এবং আল্লাহর গযব তাঁদেরকে ঘিরে ফেললো।

وَأَخْذِهِمُ الرِّبَا وَقَدْ نُهُوا عَنْهُ وَأَكْلِهِمْ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ مِنْهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا
তাঁদের সুদ গ্রহণ করার জন্য যা গ্রহণ করতে তাঁদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল এবং অন্যায়ভাবে লোকদের ধন-সম্পদ গ্রাস করার জন্য... আর তাঁদের মধ্য থেকে যারা কাফের তাঁদের জন্য কঠিন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তৈরী করে রেখেছি।

الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِّ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا إِنَّمَا الْبَيْعُ مِثْلُ الرِّبَا وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا ফَمَن جَاءَهُ مَوْعِظَةٌ مِّن رَّبِّهِ فَانتَهَىٰ فَلَهُ مَا سَلَفَ وَأَمْرُهُ إِلَى اللَّهِ وَمَنْ عَادَ فَأُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ ۖ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
কিন্তু যারা সুদ খায় তাঁদের অবস্থা হয় ঠিক সেই লোকটির মতো যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল করে দিয়েছে। ... আর এ নির্দেশের পরও যে ব্যক্তি আবার এ কাজ করে , সে জাহান্নামের অধিবাসী। সেখানে সে থাকবে চিরকাল।

مِّمَّا خَطِيئَاتِهِمْ أُغْرِقُوا فَأُدْخِلُوا نَارًا فَلَمْ يَجِدُوا لَهُم مِّن دُونِ اللَّهِ أَنصَارًا
নিজেদের অপরাধের কারণেই তাঁদের নিমজ্জিত করা হয়েছিল তারপর আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়েছিল।

وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا
আর যে ব্যক্তি জেনে বুঝে মুমিনকে হত্যা করে , তাঁর শাস্তি হচ্ছে জাহান্নাম। সেখানে চিরকাল থাকবে।

ইِنَّ الَّذِينَ اتَّخَذُوا الْعِجْلَ سَيَنَالُهُمْ غَضَبٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَذِلَّةٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۚ وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُفْتَرِينَ وَالَّذِينَ عَمِلُوا السَّيِّئَاتِ ثُمَّ تَابُوا مِن بَعْدِهَا وَآمَنُوا إِنَّ رَبَّكَ مِن بَعْدِهَا لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ
(জওয়াবে বলা হলো) যারা বাছুরকে মাবুদ বানিয়েছে তারা নিশ্চয়ই নিজেদের রবের ক্রোধের শিকার হবেই এবং দুনিয়ার জীবন লাঞ্ছিত হবে। ... আর যারা খারাপ কাজ করে তারপর তাওবা করে নেয় এবং ঈমান আনে, এ ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে এ তাওবা ও ঈমানের পর তোমার রব ক্ষমাশীল ও করুণাময়।

কবীরা গুনাহ আমলকে ধ্বংস করে দেয়:
মু'তাযিলাগণের মতে কবীরা গুনাহ আমলকে ধ্বংস করে দেয়। যেমনিভাবে কবীরা গুনাহ কারী তাওবা ব্যতীত মৃত্যুবরণ করলে তাঁর আমল ধ্বংস হয়ে যাবে এবং সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে। এর দলিল হলো:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَلَا تُبْطِلُوا أَعْمَالَكُمْ
হে মু'মিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, রাসূলের আনুগত্য করো এবং নিজেদের আমল ধ্বংস করো না।

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُبْطِلُوا صَدَقَاتِكُم بِالْمَنِّ وَالْأَذَى كَالَّذِي يُنفِقُ مَالَهُ رِئَاءَ النَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَمَثَلُهُ كَمَثَلِ صَفْوَانِ عَلَيْهِ تُرَابٌ فَأَصَابَهُ وَابِلٌ فَتَرَكَهُ صَلْدًا لَّا يَقْدِرُونَ عَلَى شَيْءٍ مِّمَّا كَسَبُوا وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ
হে ঈমানদারগণ! তোমরা অনুগ্রহের কথা বলে বেড়িয়ে ও কষ্ট দিয়ে নিজেদের দান খয়রাতকে সেই ব্যক্তির মতো নষ্ট করে দিয়ো না যে নিছক লোক দেখাবার জন্য নিজের ধন-সম্পদ ব্যয় করে।

তাওবাকারীকে ক্ষমা করা ওয়াজিব:
মুতাযিলাদের মতে যেমনিভাবে কাফের এবং তাওবা বিহীন পাপীগণকে আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করবেন না। তেমনিভাবে তারা যদি তাওবা করেন তাহলে আল্লাহ তায়ালার জন্য তাঁদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া ওয়াজিব। কেননা এটা আল্লাহ তায়ালার ন্যায়পরায়ণতার দাবি। এর দলিল হলো: إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللَّهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُونَ مِن قَرِيبٍ فَأُولَئِكَ يَتُوبُ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا
তবে একথা জেনে রাখো, আল্লাহর কাছে তাওবা কবুল হবার অধিকার এক মাত্র তারাই লাভ করে যারা অজ্ঞতার কারণে কোন খারাপ কাজ করে বসে এবং তারপর অতি দ্রুত তাওবা করে।

পূণ্যবানকে প্রতিদান দেওয়া ওয়াজিব :
পূণ্যবানকে প্রতিদান দেওয়া আল্লাহ তায়ালার জন্য ওয়াজিব। আল্লাহ তায়ালা যেহেতু ন্যায়পরায়ণ এবং ওয়াদা রক্ষাকারী। তিনি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে নেককার ব্যক্তিদেরকে পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন এবং তাঁদের জন্য জান্নাতের ওয়াদা করেছেন। এ ওয়াদার প্রেক্ষিতে পরকালে পূণ্যবানদের প্রতিদান পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর আল্লাহ তায়ালা ওয়াদা খেলাফকারী নন। তাই পূণ্যবানকে তাঁর আমলের জন্য প্রতিদান দেওয়া ওয়াজিব। এর দলিল হলো:
ফِي بُيُوتٍ أَذِنَ اللَّهُ أَن تُرْفَعَ وَيُذْكَرَ فِيهَا اسْمُهُ يُسَبِّحُ لَهُ فِيهَا بِالْغُدُوِّ وَالْآصَالِ - رِجَالٌ لَّا تُلْهِيهِمْ تِجَارَةٌ وَلَا بَيْعٌ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَإِقَامِ الصَّلَاةِ وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ يَخَافُونَ يَوْمًا تَتَقَلَّبُ فِيهِ الْقُلُوبُ وَالْأَبْصَارُ - لِيَجْزِيَهُمُ اللَّهُ أَحْسَنَ مَا عَمِلُوا وَيَزِيدَهُم مِّن فَضْلِهِ وَاللَّهُ يَرْزُقُ مَن يَشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ
(তাঁর আলোর পথ অবলম্বনকারী) ঐ সব ঘরে পাওয়া যায়, যেগুলোকে উন্নত করার ও যেগুলোর মধ্যে নিজের নাম স্মরণ করার হুকুম আল্লাহ দিয়েছেন। ... (আর তারা এসব কিছু এ জন্য করে) যাতে আল্লাহ তাঁদেরকে তাঁদের সর্বোত্তম কর্মের প্রতিদান দেন এবং তদুপরি নিজ অনুগ্রহ দান করেন।

শাফায়াত সাব্যস্ত হবে না:
মু'তাযিলাদের মতে কিয়ামতের দিন শাফায়াত সাব্যস্ত হবে না। কেননা তা ন্যায় বিচারের পরিপন্থী। কোন পাপীকে সুপারিশের মাধ্যমে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া আল্লাহ তায়ালার জন্য সমীচীন হবে না। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে পাপীদের শাস্তির কথা উল্লেখ করেছেন। শাফায়াত প্রতিষ্ঠিত হলে আল্লাহ তায়ালা ওয়াদা খেলাফকারী বলে গণ্য হবেন যা অসম্ভব বিষয়। তাই শাফায়াত প্রতিষ্ঠিত হবে না। এর দলিল হলো:
وَإِذْ قَالَ مُوسَىٰ لِقَوْمِهِ يَا قَوْمِ إِنَّكُمْ ظَلَمْتُمْ أَنفُسَكُم بِاتِّخَاذِكُمُ الْعִجْلَ فَتُوبُوا إِلَىٰ بَارِئِكُمْ فَاقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ عِندَ بَارِئِكُمْ فَتَابَ عَلَيْكُمْ إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
স্মরণ করো যখন মূসা (এই নিয়ামত নিয়ে ফিরে এসে) নিজের জাতিকে বললো, “হে লোকেরা! তোমরা বাছুরকে উপাস্য বানিয়ে নিজেদের ওপর বড়ই যুলুম করেছো, কাজেই তোমরা নিজেদের স্রষ্টার কাছে তাওবা করো এবং নিজেদেরকে হত্যা করো।

وَاتَّقُوا يَوْمًا لَّا تَجْزِي نَفْسٌ عَن نَّفْسٍ شَيْئًا وَلَا يُقْبَلُ مِنْهَا شَفَاعَةٌ وَلَا يُؤْخَذُ مِنْهَا عَدْلٌ وَلَا هُمْ يُنصَرُونَ
আর ভয় করো সেই দিনকে যেদিন কেউ কারো সামান্যতমও কাজে লাগবে না, কারো পক্ষ থেকে সুপারিশ গৃহীত হবে না।

৪. আল মানযিলাতু বাইনাল মানযিলা তাইন (المنزلة بين المنزلتين):
আল মানযিলাতু বাইনাল মানযিলা তাইন (المنزلة بين المنزلتين) এর অর্থ হলো, দুইটি অবস্থার মধ্যবর্তী অবস্থা অর্থাৎ, ঈমান ও কুফরীর মধ্যবর্তী অবস্থান। মু'তাযিলাগণ মনে করেন কোন মু'মিন পাপ কাজ করলে সে মু'মিন থেকে বের হয়ে যায়। আবার সে কাফেরও হয়ে যায় না। তাঁর অবস্থান হলো ঈমান ও কুফরীর মধ্যবর্তী অবস্থান। তথা আল মানযিলাতু বাইনাল মানযিলা তাইন। দলিল হলো:
الْمُنَافِقُونَ وَالْمُنَافِقَاتُ بَعْضُهُم مِّن بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمُنكَرِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمَعْرُوفِ وَيَقْبِضُونَ أَيْدِيَهُمْ نَسُوا اللَّهَ فَنَسِيَهُمْ ۚ إِنَّ الْمُنَافِقِينَ هُمُ الْفَاسِقُونَ -
মুনাফিক পুরুষ ও নারী পরস্পরের দোসর। খারাপ কাজের হুকুম দেয়, ভাল কাজের নিষেধ করে এবং কল্যাণ থেকে নিজেদের হাত গুটিয়ে রাখে।

ইিনَّ هَذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ وَيُبَشِّرُ الْمُؤْمِنِينَ الَّذِينَ يَعْمَلُونَ الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ أَجْرًا كَبِيرًا وَأَنَّ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالْآخِرَةِ أَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا
আসলে এ কুরআন এমন পথ দেখায় যা একেবারেই সোজা। যারা একে নিয়ে ভাল কাজ করতে থাকে তাঁদেরকে সে সুখবর দেয় এ মর্মে যে তাঁদের জন্য বিরাট প্রতিদান রয়েছে।

৫. আল আমর বিল মা'রুফ ওয়ান নাহি ‘আনিল মুনকার (الامر با المعروف والنهي عن المنكر) :
এর অর্থ হচ্ছে সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করা। এটি মু'তাযিলা আকীদার পঞ্চম মূলনীতি। পবিত্র কুরআন এবং হাদিসে এই বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। আল্লামা যামাখশারী তাঁর গ্রন্থে এটিকে ফরযে কেফায়া বলে অবহিত করেছেন। এর দলিল হলো:
وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
তোমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক অবশ্যি থাকতে হবে , যারা নেকী ও সৎকর্মশীলতার দিকে আহবান জানাবে, ভালো কাজের নির্দেশ দেবে ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখবে। যারা এ দায়িত্ব পালন করবে তারাই সফলকাম হবে।

উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা যামাখশারী বলেন, ولتكن منكم أمة এর মধ্যে من শব্দটি التبعيض এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তাই কিছু সংখ্যক লোক আদেশ এবং নিষেধ বাস্তবায়ন করলে সকলের পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে। মারূফ এবং মুনকার বিষয়ে জ্ঞান না থাকলে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এর দলিল হলো:
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ ۚ وَلَوْ آمَنَ أَهْلُ الْكِتَابِ لَكَانَ خَيْرًا لَّهُم مِّنْهُمُ الْمُؤْمِنُونَ وَأَكْثَرُهُمُ الْفَاسِقُونَ
এখন তোমরাই দুনিয়ায় সর্বোত্তম দল। তোমাদের কর্মক্ষেত্রে আনা হয়েছে মানুষের হিদায়াত ও সংস্কার সাধনের জন্য। তোমরা নেকীর হুকুম দিয়ে থাকো, দুষ্কৃতি থেকে বিরত রাখো এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনো।

وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْনَ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطِيعُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُولَئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللَّهُ ۚ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী, এরা সবাই পরস্পরের বন্ধু ও সহযোগী। এরা ভাল কাজের হুকুম দেয় এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে।

📘 মুতাযিলা আকিদা 📄 আশায়েরা ও মু'তাযিলী আকীদা

📄 আশায়েরা ও মু'তাযিলী আকীদা


ইলমে কালামের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং আশায়েরীদের মতে, যে সব নীতি আহলে সুন্নাত এবং মু'তাযিলীদের মধ্যে ব্যবধানের সৃষ্টি করে, সেগুলো নিম্নে সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হলো :

১. আল্লাহ তায়ালা মানুষকে তাঁর শক্তি বহির্ভূত কাজের (تَكْلِيْفُ بِمَا لَا يُطَاقُ) প্রতিও আদেশ দিতে পারেন। এটা তাঁর জন্য বৈধ। মুতাযিলিগণ মনে করেন আল্লাহ তায়ালা ন্যায়পরায়ণ তিনি এটা করতে পারেন না।

২. কোন গুনাহ ছাড়াই আল্লাহ মানুষকে শাস্তি দিতে পারেন বা পুণ্য ছাড়াই প্রতিদান দিতে পারেন-এ অধিকার তাঁর রয়েছে। মু'তাযিলাগণ মনে করেন পাপীকে শাস্তি দেওয়া আল্লাহ তায়ালার জন্য ওয়াজিব এবং নেকআমলকারীকে পুরস্কার দেয়াও আল্লাহ তায়ালার জন্য ওয়াজিব। কেননা এটা না করলে আল্লাহ তায়ালা জালেম হিসেবে গণ্য হবেন।

৩. আল্লাহ আপন বান্দাদের প্রতি যা ইচ্ছা, তাই করতে পারেন। যা করা মানুষের জন্য আবশ্যক, তা করা আল্লাহর পক্ষে অবশ্য কর্তব্য নয়। কেননা তিনি মহাপরাক্রমশালী এবং সকল আদেশ ও নিষেধের ঊর্ধ্বে। মু'তাযিলাগণ মনে করেন আল্লাহ তায়ালা অন্যায় আদেশ দিতে পারেন না। কেননা তা ইনসাফ এর পরিপন্থী।

৪. শরীয়তের বিধিবিধান এর মাধ্যমে আল্লাহকে চেনা কর্তব্য; বুদ্ধির মাধ্যমে নয়। মু'তাযিলীগণ জ্ঞান ও বুদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে। তাঁদের মতে আল্লাহ তায়ালা কিতাব নাযিল ও রাসূল প্রেরণ না করলেও জ্ঞান ও বুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার প্রতি ঈমান আনয়ন ফরয।

৫. মিযান অর্থাৎ দাড়ি পাল্লা সত্য। আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের আমলনামায় লিখিত পাপ পূণ্যের ওজন করবেন।

৬. আশায়েরাগণের মতে, কুরআনের আয়াতে এটা প্রতীয়মান হয় যে, ধর্ম এবং দুনিয়ার সুবিধার প্রতি লক্ষ্য রাখা আল্লাহর জন্য আবশ্যক নয়।

৭. জীবন সঞ্চারের জন্য শরীরের প্রয়োজন নেই। আগুনকেও আল্লাহ বুদ্ধি, জীবন এবং বাক শক্তি প্রদান করতে পারেন। যেমন ইব্রাহীম (আ:) কে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপের পর আল্লাহ তায়ালা আগুনের প্রতি নির্দেশ জারি করেছিলেন, যেন ইব্রাহীম (আ:) এর জন্য তা ঠাণ্ডা ও শীতল হয়ে যায়। মু'তাযিলীগণ এ মতকে সমর্থন করেন না।

৮. এমনও সম্ভব হতে পারে, আমাদের সামনে উঁচু পাহাড় রয়েছে এবং প্রকট আওয়াজও সেদিক থেকে আসছে, অথচ আমরা কেউ দেখছি না এবং শুনছিও না। আবার এমনও সম্ভব যে, একজন অন্ধ প্রাচ্যে উপবিষ্ট রয়েছে এবং পশ্চিমা দেশে সে একটি মশা দেখতে পাচ্ছে। সংক্ষিপ্ত কথা হলো, ইমাম আশায়েরী প্রকৃতি এবং ইন্দ্রিয়ের ধরাবাঁধা নিয়ম ও ক্ষমতা মেনে নিতে অস্বীকার করেন। মু'তাযিলীগণ এই মতের বিরোধী।

এ আকীদাগুলো আশায়েরাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এ ছাড়া তাঁদের আরো অনেক বিশেষ বিশেষ আকীদা রয়েছে। ইমাম গাযালী 'ইহইয়াউল উলুম' গন্থের প্রারম্ভে একবার সেগুলো সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করেন।

আল্লাহর সত্তা: আল্লাহর সত্তা সম্বন্ধীয় দশটি মৌলিক নীতি: (১) আল্লাহ বিদ্যমান (২) একক (৩) চিরন্তন (৪) মূর্ত নন (৫) শরীরী নন (৬) পরমূর্ত নন (৭) সর্বদিকের ঊর্ধ্বে (৮) পাত্রের উর্ধ্বে (৯) দর্শনীয় (১০) চিরস্থায়ী।

আল্লাহর গুণাবলী সম্পর্কীয় দশটি মৌলিক নীতি: ১. আল্লাহ জীবিত, ২. জ্ঞাত, ৩. ক্ষমতাশীল, ৪. ইচ্ছার অধিকারী, ৫. শ্রবণকারী, ৬. চক্ষুষ্মান, ৭. বাকশীল, ৮. অবিনশ্বর, ৯. তাঁর বাণী চিরন্তন এবং ১০. জ্ঞানী ও ইচ্ছাময়।

আল্লাহর কর্ম সম্পর্কীয় দশটি মৌলিক নীতি: ১. আল্লাহ মানুষের সমস্ত কর্মের স্রষ্টা, ২. মানুষের কর্ম-ফল নিজেদেরই অর্জিত, ৩. আল্লাহর ইচ্ছানুসারে মানুষ সব কর্ম সম্পন্ন করে, ৪. যে কোন সৃষ্টি আল্লাহর দয়ার ওপর নির্ভরশীল, ৫. মানুষকে তাঁর শক্তি বহির্ভূত কর্মের প্রতি আদেশ করা আল্লাহর পক্ষে বৈধ, ৬. নিষ্পাপকে শাস্তি দেয়া আল্লাহর পক্ষে বৈধ, ৭. সৃষ্টিকুলের সুবিধা-অসুবিধার প্রতি লক্ষ্য রাখা আল্লাহর জন্য জরুরী নয়, ৮. কেবল সে আদেশই অবশ্য করণীয়, যা শরীয়তের পক্ষ থেকে তদরূপ বলে সাব্যস্ত, ৯. নবীদের প্রেরণ আল্লাহর জন্য অসম্ভব কিছু নয় এবং ১০. মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহর নুবুওয়াত ও মুজিযা প্রতিষ্ঠিত।

ওহীভিত্তিক প্রমাণে বিশ্বাস্য বিষয় সম্পর্কীয় দশটি মৌলিক নীতি : ১. কিয়ামত, ২. মুনকির নকীর, ৩. কবরের শাস্তি, ৪. রোজকিয়ামতের দাড়িপাল্লা, ৫. পুলসিরাত, ৬. বেহেশত-দোযখের অস্তিত্ব, ৭. ইমামত সম্বন্ধীয় নির্দেশ, ৮. খেলাফতের ক্রমানুসারে সাহাবীদের শ্রেষ্ঠত্ব, ৯. ইমামতের শর্তাবলী এবং ১০. নির্ধারিত ইমামের অনুপস্থিতিতে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সুলতানের নির্দেশ।

ইমাম আশয়ারীর পূর্বে মুতাকাল্লিমদের দুটি সম্প্রদায় ছিল : ওহীবাদী (আরবাব-ই-নক্ল) এবং বুদ্ধিবাদী (আরবাব-ই-আকল)। ইমাম আশয়ারী মধ্যপন্থা অবলম্বন করেন। তিনি যে সব আকীদা অবলম্বন করেন, তা ছিল বুদ্ধি এবং ওহীভিত্তিক মতবাদের এক সুসামঞ্জস্যরূপ। তিনি ওহীভিত্তিক চিন্তাধারার মধ্য দিয়ে তাঁর বিশেষ মতবাদে কি ভাবে উত্তীর্ণ হলেন, তার দু'একটি উদাহরণ হলো:

ওহীবাদিগণ আল্লাহর সাক্ষাত লাভে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু দার্শনিক ও মু'তাযিলাগণ তা অস্বীকার করেন। ওহীবাদিগণ কেবল আল্লাহর সাক্ষাত লাভেই বিশ্বাসী ছিলেন না, তাঁরা এটাও মনে করতেন যে, আল্লাহ তাঁর আরশে আসীন রয়েছেন। তিনি কোন একটি দিক জুড়ে রয়েছেন। তাঁর প্রতি ইঙ্গিতও করা যায়। ইমাম আশয়ারী দার্শনিক এবং মু'তাযিলাদের মতবাদ সমর্থন না করে ওহীবাদীদের আকীদাই অবলম্বন করেন। কিন্তু আল্লাহ কোন একটি স্থান জুড়ে রয়েছেন এবং তাঁর প্রতি ইঙ্গিত করাও সম্ভব নয়। কেননা, এসব হলো নশ্বরতার বৈশিষ্ট্য। অথচ আল্লাহর নশ্বর নন।

এ মতবাদ অবলম্বনের ফলে ইমাম আশায়েরার জন্য অন্য একটি সমস্যার উদ্ভব হয়। তা হলো, আল্লাহ যদি কোন বিশেষ স্থান জুড়ে না থাকেন, তবে তিনি দর্শনযোগাও হতে পারেন না। কারণ, যা স্থান অধিকার করে না, তা দেখাও যায় না। বাধ্য হয়ে ইমাম আশায়েরাকে মানতে হলো যে, কোন বস্তুর দৃষ্টিগোচর হবার জন্য তার কোন স্থানে অবস্থান করা বা ইঙ্গিতযোগ্য হবার প্রয়োজন নেই। ধীরে ধীরে ইমাম আশায়েরাকে বিতর্ক বিদ্যার সমস্ত নীতি বিসর্জন করতে হলো। আশায়েরার মতে, কোন বস্তু সমক্ষে না থাকলেও তা গোচরীভূত হতে পারে।

তৃতীয় সমস্যা হলো এই যে, আল্লাহ যদি দর্শনীয় হন, তবে সর্বক্ষণ তাঁর গোচরীভূত হওয়া উচিত। কারণ, তাঁর বিদ্যমানতাই যদি দর্শনের জন্য যথেষ্ট হয়, তবে কিয়ামত পর্যন্ত কেনইবা এর জন্য অপেক্ষা করতে হবে? তাই বাধ্য হয়ে ইমাম আশায়েরাকে এটাও বলতে হলো যে, কোন বস্তুও গোচরীভূত হওয়ার সমস্ত শর্ত পাওয়া গেলেও তাঁর অদৃশ্য হবার সম্ভাবনা থাকে।

ওহীবাদিগণ সাধারণভাবে মুজিযার সমর্থক ছিলেন। তারা হেতুবাদ অস্বীকার করতেন না, তবে বলতেন, মুজিযার বেলায় আল্লাহ 'কার্য-কারণ' সম্বন্ধ শিথিল করে দেন। ইমাম আশায়েরা এতটুকু নিশ্চয়ই জানতেন যে, কারণ যা হয়, কার্য তার বিপরীত হতে পারে না। তাই তিনি 'কার্য কারণ' সম্বন্ধকেই অস্বীকার করলেন। মোট কথা, এভাবে ধীরে ধীরে উপরিউক্ত সমস্ত আকাইদের সৃষ্টি হয়। ইমাম গাযালীর পূর্বেই ইলমে কালামের কাঠামো পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে যায়।

টিকাঃ
১ (পেজ ১১০). আল্লামা শিবলী নু'মানী, ইসলামী দর্শন, (অনু: মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ, ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯৮১) পৃ. ৫৭।
২. আল্লামা শিবলী নু'মানী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৮।
৩. আল্লামা শিবলী নু'মানী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৯।
১ (পেজ ১১১). আল্লামা শিবলী নু'মানী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৯।
২. আল্লামা শিবলী নু'মানী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬০।
১ (পেজ ১১২). আল্লামা শিবলী নু'মানী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬১।

📘 মুতাযিলা আকিদা 📄 মু'তাযিলী মতবাদের ব্যর্থতার কারণ

📄 মু'তাযিলী মতবাদের ব্যর্থতার কারণ


মু'তাযিলা মতবাদ মুক্ত বুদ্ধি এবং স্বাধীন চিন্তার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়ে অতিঅল্প সময়ের মধ্যে মুসলিম বিশ্বে প্রসার লাভ করলেও পরবর্তী সময়ে মুতাযিলা মতবাদ স্থায়িত্ব লাভ করতে পারেনি। তবে শতাব্দীকাল ব্যাপী মুসলিম বিশ্বে প্রভাব বিস্তার করেছিল। আব্বাসীয় খলিফা ওয়াসিক বিল্লাহ এর মৃত্যুর পর মুতাযিলীগণ রাষ্টীয় পৃষ্ঠপোষকতা হতে বঞ্চিত হন এবং ইতোমধ্যে আশায়েরা মতবাদ মুসলমানদের মধ্যে স্থান করে নেয়। মু'তাযিলাদের বেশি বেশি যুক্তি প্রদর্শনের মানসিকতার বিপরীতে আশায়েরাদের মধ্যম পন্থা অবলম্বনের কারণে মুসলমানদের মধ্যে তা তুলনামূলক অধিক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। পরবর্তী সময়ে আল গাযালী সুফীবাদকে মুসলিম দর্শনের সাথে একীভূত করে উপস্থাপনের ফলে মু'তাযিলা মতবাদের জনপ্রিয়তা হ্রাস পায়। মু'তাযিলা মতবাদের ব্যর্থতার কিছু কারণ উল্লেখ করা হলো :

১. আব্বাসীয় খলিফা ওয়াসিক বিল্লাহ এর মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত হওয়া। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলে মু'তাযিলা মতবাদে প্রচার ও প্রসারে বিঘ্ন ঘটে এবং রাষ্টীয় ব্যবস্থাপনার সুযোগ সুবিধা কাজে না লাগতে পারা এবং অর্থনৈতিক সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদী সময়ের জন্য মু'তাযিলগণ তাঁদের অবস্থানকে ধরে রাখতে পারেনি।

২. মু'তাযিলার আন্দোলনের ব্যর্থতার আরকটি কারণ হলো। তাঁদের বিরোধী পক্ষ তথা আশায়েরা আলিম, মুহাদ্দীস, মুফাসসীর, ফকীহগণ আমল আখলাক, তাকওয়া ও দ্বীনদারীর দিক থেকে তাঁদের তুলনায় অনেক ঊর্ধ্বে ছিলেন এবং তাঁদের নৈতিক প্রভাবও জনগণের মধ্যে বিস্তার লাভ করেছিল।

৩. মু'তাযিলাগণ তাঁদের মতবাদকে যুক্তির ভিত্তিতে উপস্থাপন করেছিলেন এবং রাজকীয় ক্ষমতার জোরে তা দীর্ঘস্থায়ী করতে চেয়েছিলেন এবং তাঁদের বিরোধী আলিম, ফকীহ, মুহাদ্দীস এবং বড় বড় ইমামগণকে নির্যাতন ও নিপিড়নের লক্ষ্য বস্তু বানিয়েছিলেন।

৪. মু'তাযিলাগণ তাঁদের আকীদাকে প্রমাণ করার জন্য বুদ্ধি ভিত্তিক যুক্তি প্রমাণকে কুরআন ও সুন্নাহ এর ওপরে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। সাধারণ মুসলমানগণ তা ভালোভাবে গ্রহণ করেননি।

৫. মু'তাযিলাদের সাথে আশায়েরা মতবাদের পার্থক্যগুলো ছিল মূলত দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য এবং ব্যাখ্যা প্রদানগত পার্থক্য। কিন্তু তারা এই মতবাদগুলোকে কুফুরী ও ইসলাম এবং তাওহীদ ও শিরক এর পার্থক্য বলে মনে করতেন।

৬. মু'তাযিলা মতবাদের তত্ত্ব এবং ব্যাখ্যা সমূহ খুবই সূক্ষ্ম ও কঠিন ছিল যা মুসলিম আলিম ও দার্শনিকগণের নিকট পেশ করা গেলেও সাধারণ মুসলমানগণ এর নিকট তাঁদের তত্ত্ব ও ব্যাখ্যা উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে।

৭. মু'তাযিলাগণ তাঁদের বিরোধী আলিম, ফকহী ও মুহাদ্দীসগণকে নিয়ে উপহাস করতেন এবং তাঁদের গ্রহণযোগ্য দলীল প্রমাণকে অস্বীকার করতেন। যদিও কুরআন ও হাদীসের দৃষ্টিতে তা সঠিক ছিল।

৮. মু'তাযিলাগণ আল্লাহ তায়ালার দর্শন লাভকে অস্বীকার করতেন। এমনকি জান্নাত, জাহান্নাম, ফেরেশতা এবং তারাবীহ এর নামাজ এর ন্যায় বিষয়সমূহকে নিয়ে তারা এরকম আকীদা পোষণ করতেন যে, তা আহলি সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত এর বিরোধী ছিল।

৯. মু'তাযিলা আন্দোলন ব্যর্থতার কারণ ছিল যে, আহলি সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত এর দুটি দল আশায়েরা এবং মাতুরীদিয়াগণ তাঁদের মতবাদকে সঠিক ও যুক্তিপূর্ণ দলীলের ভিত্তিতে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ইমাম গাযালী, ইমাম রাজী এবং ইমাম ইবনে তাইমীয়া উল্লেখযোগ্য।

টিকাঃ
১ (পেজ ১১৩). ইসলামী বিশ্বকোষ, প্রাগুক্ত, ২০শ খণ্ড, পৃ. ৬৫।

ফন্ট সাইজ
15px
17px