📘 মুতাযিলা আকিদা 📄 মূল্যায়ন

📄 মূল্যায়ন


আল্লামা যামাখশারী রচিত আল কাশশাফ গ্রন্থটি পবিত্র কুরআনের একটি অনন্য তাফসীর গ্রন্থ। এর প্রণেতা আল্লামা যামাখশারী (রহ:) অপূর্ব শব্দ চয়ন, ভাষার প্রাঞ্জল ব্যবহার, উপমার যথাযথ উপস্থাপন এবং অলংকার পূর্ণ বাক্যের ব্যবহারের মাধ্যমে আল কুরআনের প্রতিটি আয়াতের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ, ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ, শব্দের উৎস বিশ্লেষণ ও ভাষাগত ব্যবহারের ক্ষেত্রে অসাধারণ প্রতিভার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। ফলে এটি শুধু তাফসীরের ক্ষেত্রেই নয়, আরবী সাহিত্যের ক্ষেত্রেও একটি নতুন সংযোজন ঘটিয়েছে। তাই এ গ্রন্থখানির পরিচিতি শুধু ষষ্ঠ হিজরী শতাব্দীতে সীমিত হয়নি বরং যুগযুগ ধরে এটি সুধী মহলে সমাদৃত হয়ে আসছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আলিম ও দার্শনিকগণ এর সাহিত্যিক মর্যাদা স্বীকার করেছেন। আল্লামা আস সাম'আনী বলেন:
كان يضـرب بـه الـمـثـل فـي علم الأدب والنحو ، لقى الأفاضل والكبار، وصنف تصانيف في الفسير ، وشرح الأحاديث، وفي اللغة -

তিনি আরবী সাহিত্য ও ব্যাকরণের উদাহরণ পেশ করেছেন। অনেক বড় ও সম্মানিত ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন এবং তাফসীর গ্রন্থ, হাদীসের ব্যাখ্যা ও ভাষা বিজ্ঞানের ওপর প্রণয়ন করেছেন।

আল্লামা যামাখশারী (রহ:) আল-কাশশাফ গ্রন্থে ই'জায এর ভিত্তিতে আদর্শিক মাপকাঠির আলোকে কুরআনের প্রতিটি আয়াতের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন। ফলে পূর্ববর্তী সকল তাফসীরকারকে অতিক্রম করে তিনি তাফসীর জগতে ভাষা অলংকার ও ই'জায নামে নতুন দু'টি অভিনব ধারার প্রবর্তনকারী হিসেবে সমধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেন। আয়াতের ব্যাখ্যায় 'ইলমুল বদী', বয়ান, ইস্তে'আরা, মাজায, ই'জায, ইতনাব এবং আয়াতের ব্যাকরণ ও শব্দগত বিশ্লেষণে প্রাচীন আরবী কবিতার প্রয়োগ বিধি এ গ্রন্থকে অভিনব সাজে সাজিয়েছে। তাই এটি যুগ শ্রেষ্ঠ বিদ্বান ও দার্শনিকদের অভীষ্ট লক্ষস্থলে পরিণত হয়।

মিসরের আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রফেসর ডঃ মুহাম্মদ হোসাইন আল-যাহাবী এ গ্রন্থটির বিজ্ঞান ভিত্তিক মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, তাফসীর আল কাশশাফের প্রতি অনুসন্ধানী দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে সর্ব প্রথমেই যা দৃষ্টিগোচর হয়, তা হল আল-কুরআনের অন্তর্নিহিত অলংকার সম্পদ আবিষ্কারে আল্লামা যামাখশারী (রহ:) কুরআনের প্রকাশ ভঙ্গি এবং অনবদ্য রচনা শৈলীতে অভিনব আবরণে প্রকাশ করার প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। অন্যান্য এ তাফসীর গ্রন্থ অধ্যয়ন করলে প্রতীয়মান হয় যে, আল-কুরআনের অন্তর্নিহিত ইলমুল মা'আনী ও 'ইলমুল বায়ান এর অলংকারপূর্ণ সম্পদ আবিষ্কারে তাফসীরকারগণ যে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়েছেন তা যামাখশারীর (রহ:) আল কাশশাফের তুলনায় অতি নগণ্য।

তাফসীর আল-কাশশাফের সাহিত্যিক দিক পর্যালোচনা করলে মনে হয় যে, এটি নিঃসন্দেহে আরবী সাহিত্যে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। তাই এটি অনারব দেশগুলোর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সিলেবাসভুক্ত। কিন্তু মু'তাযিলা আকীদার ভিত্তিতে রচিত হওয়ায় এর পঠন পাঠন 'আরব বিশ্বে সীমিত। কেননা আল-কুরআন ব্যাখ্যার মূলনীতিকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে এর রচয়িতা আল্লামা যামাখশারী এ গ্রন্থে মু'তাযিলী মতবাদ প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে মুক্ত চিন্তাধারা এবং বিবেকপ্রসূত যুক্তির আশ্রয় নিয়েছেন। মু'তাযিলাদের পঞ্চ মূলনীতির আলোকে তিনি এ গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। তাঁদের এ নীতিমালা অনুযায়ী তাঁরা আল্লাহর গুণাবলীকে চিরন্তন মনে করেন না। পঞ্চ মূলনীতি হলোঃ ক. আত তাওহীদ, খ. আল' আদল, গ. আল ওয়াদ ওয়া আল ওয়ীদ, ঘ. আল আমার বিল মারুফ ওয়া আন নাহী আল মুনকার, ঙ. আল মানযিলাতু বাইনা আল মানযিলাতাইন।

এছাড়া তিনি আল্লাহর দর্শনকে অস্বীকার করেছেন। এ উদ্দেশ্যে হযরত মূসা (আ:) এর আল্লাহর দর্শন লাভের ঘটনা সম্বলিত আয়াতের ব্যাখায় তিনি লিখেছেন যে, এখানে দর্শন বলতে অনুভবকে বুঝানো হয়েছে। আল্লাহর দর্শন লাভ মূলত: মূসা (আ:) এর উদ্দেশ্য ছিল না বরং তিনি স্বীয় সহচরদের প্রচণ্ড দাবীর মুখে আল্লাহর দর্শন লাভের প্রবণতা ব্যক্ত করেছিলেন। কেননা আল্লাহর দর্শন লাভ অসম্ভব। আল্লাহর দর্শন লাভ সম্পর্কে আল কাশশাফ গ্রন্থে বেশ কিছু স্থানে আল্লামা যামাখশারীর এ ধরনের চিন্তাধারার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। তাঁর এ 'আকীদা ভ্রান্ত এবং আহলি সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের 'আকীদার পরিপন্থী। এ ভ্রান্ত 'আকীদা আল কাশশাফের যত্রে তত্রে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যাতে পরবর্তীকালে এ গ্রন্থটির যথেষ্ট সাহিত্যিক মূল্য থাকা সত্ত্বেও তা ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হয়।

এ গ্রন্থের প্রথমেই তিনি উল্লেখ করেন আল কুরআন 'সৃষ্ট'। এরূপ মু'তাযিলী চিন্তাধারা থাকা সত্ত্বেও এ গ্রন্থখানি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের অনুসারীগণের নিকট সমাদৃত।

তিনি হাদীসের প্রতি তেমন একটা মনোযোগ প্রদান করেননি বরং নিজস্ব 'আকীদা ভিত্তিক দার্শনিক প্রকৃতির ব্যাখ্যা প্রদানে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। ব্যাকরণ সম্পর্কিত ব্যাখ্যা সমূহ ছাড়াও তিনি ভাষার সাবলিলতা, প্রাঞ্জলতা ও অলংকারিক সৌন্দর্যের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি প্রদান করেছেন। এভাবে তিনি আল-কুরআনের ই'জায বা অলৌকিকত্ব প্রমাণ করেন। এ গ্রন্থে তিনি আভিধানিক বিষয়ের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেন এবং প্রাচীন কাব্য হতে অগণিত কবিতাংশ উদ্ধৃতি দিয়ে তাঁর ব্যাখ্যার সমর্থনে প্রমাণ পেশ করেন।

তাঁর মতে ই'জায শাস্ত্রের উৎপত্তি হয়েছে কুরআনে ব্যবহৃত শব্দসমূহের অন্তর্নিহিত স্বাভাবিক তাৎপর্য এবং ব্যবহারের ধরন থেকে। আল-কুরআনের ই'জাযকে সম্যক অনুধাবন করাই হলো অলংকার শাস্ত্রের একটি অবশ্যম্ভাবী দিক। তাই একজন তাফসীরকারের প্রতিটি পদক্ষেপেই যে এ শাস্ত্রের প্রয়োজন তা সর্বজনবিদিত। অতীতের তাফসীরকারগণ আল কুরআনের যে সকল ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন, তারা অধিকাংশই এ অলংকারশাস্ত্রকে ততটা গুরুত্বপ্রদান করেননি। কিন্তু যামাখশারী কুরআনের প্রতিটি আয়াতকেই ই'জাযের দৃষ্টান্ত দিয়ে পেশ করেছেন। এ দৃষ্টিকোণের মাপকাঠিতে তিনি প্রতিটি আয়াতকে যাচাই করেছেন এবং অলংকার শাস্ত্রের আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে অভিনিবেশ সহকারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। এদিক থেকে প্রকৃতই তিনি প্রশংসার দাবিদার।

'আল্লামা যামাখশারী তাঁর তাফসীরে Rationalism বা যুক্তিবাদিতার মতবাদকে খুব জোর দিয়ে বুঝাতে চেষ্টা করেছেন। তাঁর মতে অলংকার শাস্ত্রে সুগভীর ব্যুৎপত্তি অর্জন করা ব্যতীত রাসূল (সা.) এর পক্ষে এ চিরন্তন মু'জিযাকে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। তিনি প্রমাণ করেন যে, কুরআনের এ অমর মু'জিযা সকল যুগে, সকল সময়ে, সকল স্থানের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য। তাই এর চিরন্তন চ্যালেঞ্জের জবাব যেমনভাবে ইসলাম পূর্বযুগের আরবগণ দিতে পারেননি, তেমনি সুদূর ভবিষ্যতেও কেউ কোনদিন দিতে পারবে না।

টিকাঃ
১. আবু সাঈয়াদ আব্দুল করিম ইবন মুহাম্মদ ইবন আবিল মুজাফফর আস সাম'আনী আল খুরাসানী, আল আনসাব, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ২৫৭
২. ড. মুহাম্মদ বেলাল হোসেন প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬।
১ (পেজ ৭৪). ড. মুহাম্মদ হোসাইন আয যাহাবী, আল তাফসীর ওয়া আল মুফাসসিরুন, (দার আল কুতুব আল হাদীসাহ, ১৯৮৬) পৃ. ৪২৩।
২. কাসিম আল কাইসী, তারীখ আল তাফসীর, (ইরাক মাতবাআহ আল মাজমা আল ইরাকী, তা: বিঃ) পৃ. ৫৯; ড. মুহাম্মদ বেলাল হোসেন প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬।
১ (পেজ ৭৫). ড. মুজিবুর রহমান, কুরআনের চিরন্তন মু'জিযা (ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ১৯৮০ খৃঃ) পৃ. ১৯৫।

ফন্ট সাইজ
15px
17px