📘 মুতাযিলা আকিদা 📄 আকীদা ও মাযহাব

📄 আকীদা ও মাযহাব


আল্লামা যামাখশারী 'আকীদাগত দিক দিয়ে মু'তাযিলী ছিলেন। আল্লামা যামাখশারী যে পরিবেশে বড় হয়েছিলেন সেই পরিবেশটিই ছিল মু'তাযিলা আকীদা দ্বারা বেষ্টিত। তাঁর উস্তাদ আবু মুদার আল দাব্বী আল ইস্পাহানী মু'তাযিলা আকীদায় বিশ্বাসী ছিলেন বিধায় আল্লামা যামাখশারী তার উস্তাদের আকীদা দ্বারা প্রচণ্ডভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন কেননা তার উস্তাদ ছিলেন মু'তাযিলা আকীদার বড় চিন্তাবিদ এবং তিনি খাওয়ারযিমে সর্বপ্রথম মু'তাযিলা আকীদাকে প্রতিষ্ঠিত করেন। যামাখশারী আরো একজন উস্তাদ আবু সাঈদ আল জাসীমিও মু'তাযিলার আকীদায় বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি যামাখশারীর তাফসীরের উস্তাদ ছিলেন। এজন্যই আমরা আল্লামা যামাখশারীকে তার কাশশাফ গ্রন্থের বিভিন্ন স্থানে মু'তাযিলা আকীদা প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট দেখতে পাই। তিনি নিজেকে মু'তাযিলী হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন। ইবনু খাল্লিকান বলেন :
إنه كان إذا قصد صاحبا له واستأذن عليه في الدخول يقول لمن يأخذ له الإذن : قل له : أبو القاسم الـمـعـتـزلـي بـالـبـاب -
তিনি যখন তাঁর কোন সহপাঠীর সাথে দেখা করতে চাইতেন, তখন ভেতরে প্রবেশের জন্য অনুমতি বাহককে বলতেন, বল, আবুল কাসিম আল-মু'তাযেলী দরজায় দাঁড়িয়ে।

তিনি মু'তাযিলী মতবাদের আলোকে আল কাশশাফ গ্রন্থটি প্রণয়ন করেন। এটি মু'তাযিলী 'আকীদা অনুসৃত কুরআনের একটি অনবদ্য তাফসীর গ্রন্থ। এর বিভিন্ন স্থানে মু'তাযিলী 'আকিদা ছড়িয়ে আছে।

'আল ইকলিলু শারহি মাদারিকুত তানযীল' এর গ্রন্থকার উল্লেখ করেন: আল্লামা যামাখশারী তাঁর শেষ জীবনে মু'তাযিলা মতবাদ হতে তওবা করে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'য়াতের মতবাদ গ্রহণ করেন। তিনি এ মতের সমর্থনে একটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করেন :
قال العلامة اكمل الدين في شرح الكشاف انه (اى الزمخشرى) قد تاب من مذهب الاعتزال وصنف نصائح الصغار ونصائح الكبار بعد توبته من الاعتزال -
“আল্লামা আকমালুদ্দীন কাশশাফের ব্যাখ্যা গ্রন্থে বলেন যে, তিনি (যামাখশারী) মু'তাযিলা মতবাদ হতে তওবা করেছিলেন এবং 'নাসায়িহুস সিগার ও নাসায়িহুল কিবার' গ্রন্থদ্বয় এ তওবার পরেই লিখেছিলেন।

পক্ষান্তরে আল্লামা খাওয়ানসারী উল্লেখ করেন, যামাখশারীর রবীউল আবরার গ্রন্থটি আদ্যোপান্ত পড়লে মনে হয় যে, তিনি মু'তাযিলা মতবাদ পরিহার করে শি'আ মতবাদ গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু আল্লামা মুকরী এসব অস্বীকার করেন। তিনি বলেন যামাখশারী তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত মু'তাযিলী আকীদায় বিশ্বাসী ছিলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও উদ্ধৃতি উল্লেখ করেন যে :
قال الراعي سمعت شيخنا ابا الحسن على قال سمعت الاندلسي يقول شيئان لا يصحان اسلام ابراهيم بن سهل وتوبة الزمخشرى من الاعتزال -
'আল-রাঈ বলেন আমি শাইখ আবুল হাসান 'আলীকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন আমি আল আন্দালুসীকে বলতে শুনেছি যে, দু'টি বিষয় সঠিক নয়। একটি হল ইব্রাহীম ইবন সহলের ইসলাম গ্রহণ এবং অপরটি হল যামাখশারীর মু'তাযিলা মতবাদ থেকে প্রত্যাবর্তন।

আল্লামা যামাখশারী হানাফী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। কেউ কেউ তাঁকে শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী বলেও দাবী করেছেন। কিন্তু তিনি শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন না। তিনি স্পষ্টভাবে নিজেকে একনিষ্ঠ হানাফী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি দিয়ানুল আদব গ্রন্থে বলেন :
ওয়াসন্দ দীনী ওয়া এতেক্বাদী ওয়া মাযহাবী * ইলা হুনফা উখতারাহুম ওয়া হানাইফা
হুনাইফা আদইয়া নাহুম হুনফিয়া * মাযাহিবুহুম লা ইয়াবতাগুনায যাওয়ায়িফা
“আমার ধর্ম, আকীদা ও মাযহাবকে সে সকল একনিষ্ঠদের সাথে সম্পৃক্ত করছি, যারা নির্বাচিত। তাদের ধর্ম ও মাযহাব বিশুদ্ধ, আর তারা কোন প্রকার হীনমন্যতার অনুসন্ধান করেন না"।

এছাড়াও তিনি স্বীয় আলকাশশাফ গ্রন্থে ফিকহী মাসআলার বর্ণনার ক্ষেত্রে হানাফী মাযহাবের মতামতকে বিশদভাবে পর্যালোচনা করেছেন এবং অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তাতে বুঝা যায় যে, তিনি 'আকীদাগত দিক থেকে মু'তাযিলী আকীদায় বিশ্বাসী এবং মাযহাবের দিক থেকে হানাফী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। তবে তিনি কোন মাযহাবের প্রতি সম্পূর্ণরূপে তাকলীদে বিশ্বাসী ছিলেন না। এ বিষয়ে তাফসীরে কাশশাফ গ্রন্থের ভূমিকায় একটি কবিতা উল্লেখ করা হয়েছে :
إذا سألوا عن مذهبي لم أبح به * واكتمه كتمانه لي أسلم
فإن خنفيا قلت قالوا باني * أبيح الطلا وهو الشراب المحرم
وإن مالكيا قلت قالوا باني * أبيح لهم أكل الكلاب وهم هم
وإن شافعيا قلت قالوا باني * أبيح نكاح البنت والبنت تحرم
وإن حنبليا قلت قالوا باني * ثقيل حلولي بغيض مجسم
وإن قلت من أهل الحديث وحزبه * يقولون تيس ليس يدرى ويفهم
تعجبت من هذا الزمان وأهله * فما أحد من ألسن الناس يسلم
وآخرنى دهري وقدم معشرا * على أنهم لا يعلمون وأعلم
ومذ أفلح الجهال أيقنت أنني * أنا اليم والأيام أفلح أعلم

টিকাঃ
১ (পেজ ৪০). ইয়াকূত আল হামুবী প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৫; ড. মুহাম্মদ বেলাল হোসেন প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭।
১ (পেজ ৪১). আল মুকরী, নাফহ আল তীব, ২য়খণ্ড (কায়রো : ১২৭৯ হি) পৃ. ৩৫২; ড. মুহাম্মদ বেলাল হোসেন প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮।
২ (পেজ ৪১). আল-খাওয়ানসারী, রওযাহ আল জান্নাহ (তেহরান: আলী আল হাজার, ১৩৬০হি.), পৃ. ৭২০; ড. মুহাম্মদ বেলাল হোসেন, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯।
৩ (পেজ ৪১). আল-খাওয়ানসারী, রওযাহ আল জান্নাহ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭২০; ড. মুহাম্মদ বেলাল হোসেন প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯; আযযাহাবী, আত তাফসীর ওয়াল মুফাসসীরুন প্রাগুক্ত, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪৭৪।
১ (পেজ ৪২). আল-খাওয়ানসারী, রওযাহ আল জান্নাহ (তেহরান : আলী আল হাজার, ১৩৬০ হি) পৃ. ৭২০; ড. মুহাম্মদ বেলাল হোসেন প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯; আযযাহাবী, আত তাফসীর ওয়াল মুফাসসিরুন প্রাগুক্ত, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪৭৪।
২ (পেজ ৪২). আল্লামা যামাখশারী, আল কাশশাফ, প্রাগুক্ত, ভূমিকা।

ফন্ট সাইজ
15px
17px