📄 ইন্তেকাল
৫১২ হিজরিতে আল্লামা যামাখশারী কঠিন রোগে আক্রান্ত হন। ফলে তিনি সরকারী চাকুরীর ইচ্ছা পরিহার করেন এবং বাকী জীবন শিক্ষাদান ও সাহিত্য সাধনায় কাটিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং আল্লাহর কাছে প্রতিজ্ঞা করেন, যে আল্লাহ যদি তাঁকে এ রোগ থেকে মুক্তি দান করেন তাহলে তিনি আর কোন বাদশাহী পদ এর আকাঙ্ক্ষা করবেন না এবং আর রাজা বাদশার প্রশংসা গাথা রচনা করবেন না।
অতঃপর আল্লামা যামাখশারী আল্লাহর রহমতে রোগ থেকে মুক্তি পান এবং মুক্তির পর তিনি কিছুদিন বাগদাদে অবস্থান করেন। তিনি বাকী সময়টুকু মক্কায় দু'বছর অবস্থানের পর মাতৃভূমির টানে খাওয়ারিযমের উদ্দেশ্যে রওনা হন। ৫২৬ হিজরীতে তিনি মক্কায় গমন করেন। মক্কায় তিন বছর অবস্থান করার পর পুনরায় তিনি স্বদেশে ফিরে আসেন এবং আমৃত্যু এখানেই অবস্থান করেন।
আল্লামা যামাখশারী মক্কা হতে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের পর ৫৩৮ হিজরীর আরাফাতের রাতে খাওয়ারিযমের জিননুন নদীর তীরবর্তী জুরজানিয়া নামক গ্রামে ইন্তেকাল করেন। জুরজানিয়াতেই তাঁকে দাফন করা হয়।
টিকাঃ
১. কামিল মুহাম্মদ মুহাম্মদ আওয়িদাহ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫; ইবনে খাল্লিকান প্রাগুক্ত, ২য় খণ্ড পৃ. ১০৭
২. কামিল মুহাম্মদ মুহাম্মদ আওয়িদাহ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬; ইবনুল মুনির, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩২।
📄 রচনাবলী
আল্লামা যামাখশারী তাঁর জীবদ্দশায় জ্ঞান চর্চা ও শিক্ষাদান ছাড়াও অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি তাফসীর, হাদীস, ফিকহ, আরবী সাহিত্য গদ্য ও পদ্য, আরবী ব্যাকরণ, অংলকার শাস্ত্র, কালাম শাস্ত্র ইত্যাদি বিষয়ে অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন। আল্লামা যামাখশারীর মাতৃভাষা ফার্সী হওয়া সত্ত্বেও তিনি আরবী ভাষার পণ্ডিত ছিলেন। ধর্মতত্ত্বের দিক দিয়ে তিনি মু'তাযিলী আকীদার অনুসারী ছিলেন বিধায় তার প্রকাশিত গ্রন্থসমূহে এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। তিনি বেশ উল্লেখযোগ্য কিছু গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর গ্রন্থাবলীর বেশ কিছু প্রকাশিত হলেও অনেক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থাবলীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
১. আল কাশশাফ আন হাকায়িকি গাওয়ামিদিত তানযীল ওয়া উয়ুনুল আকাবীল ফী উযুহিত তাবী : এটি তাফসীর শাস্ত্রের একটি বিখ্যাত গ্রন্থ। তিনি মক্কায় অবস্থানকালীন সময়ে এ গ্রন্থটি রচনা করেছেন এবং এ গ্রন্থে অপূর্ব শব্দ চয়ন, অলংকার পূর্ণ বাক্যের ব্যবহার, শব্দের বিশ্লেষণ, ভাষাগত নৈপুণ্য এবং আরবী সাহিত্যের প্রাঞ্জল ব্যবহারের সমন্বয় ঘটিয়েছেন। এ সম্পর্কে আলোচনা আমরা যথাস্থানে উপস্থাপন করব।
২. আল মুফাসসাল ফীন নাহু : তিনি এ গ্রন্থে চারটি ভাগে যথা: আল আসমা, ওয়াল আফয়াল, ওয়াল হুরুফ, ওয়াল মুশতারাক এর বিস্তারিত ব্যাকরণ সম্পর্কিত আলোচনা করেছেন। আলেমগণ এ গ্রন্থটিকে কাশশাফের সমতুল্য হিসাবে মূল্যায়ন করে থাকেন। আল্লামা যামাখশারী এ গ্রন্থটি ৫১৩ হিজরী থেকে ৫১৫ হিজরী পর্যন্ত দুই বছরের মধ্যে সমাপ্ত করেন। এজন্য অনেক আলিম এর ব্যাখ্যা গ্রন্থ লিখেছেন। যেমন : শরহে ইবনুল বাকা' ইবনুল ইয়ায়ীশ, গ্রন্থটি লিপজেক থেকে ১৮৮২ সালে প্রকাশিত হয়েছে এবং ১৮৫৯ সালে খুরাস্তিয়ানিয়া থেকে এবং ১৮৯১ দিল্লী থেকে ১৩২৩ হিজরীতে কায়রো থেকে এবং ১২৯৮ হিজরীতে ইস্তামবুল থেকে প্রকাশিত হয়েছে।
৩. আল ফায়িক ফিল গারিবিল হাদীস : আল্লামা যামাখশারী গ্রন্থটিকে হুরুফুল মু'জাম হিসেবে সাজিয়েছেন। তিনি ৫১৬ হিজরীর রবীউল আওয়াল মাসে গ্রন্থটি লেখা সমাপ্ত করেন। গ্রন্থটি ১৩২৪ হিজরীতে ভারতের হায়দারাবাদ থেকে প্রকাশিত হয়েছে এবং উস্তাদ মুহাম্মদ আবুল ফজল ইব্রাহীম ৩ খণ্ডে কায়রো থেকে প্রকাশ করেছেন।
৪. আসাসুল বালাগাহ : এটি আরবী সাহিত্যে একটি মু'জাম গ্রন্থ। ভাষা সাহিত্যের মাজায এবং ইস্তিয়া'রা বিশেষ বর্ণনা করেছেন। কাশফুয যুনুন গ্রন্থকার এ বিষয়ে বলেন : وهو كتاب كـبـير الـحـجـم ، عظيم الفحوي، من أركان فن الأدب بل هو أساسه ، ذكر فيه المجازات اللغوية ، والمزايا الأدبية ، وتعبيرات البلغاء ، على ترتيب كالمغرب -
৫. আল মুস্তাকসা ফিল আমসাল : এটি একটি আরবী উপমা সংক্রান্ত সংকলন। আল্লামা যামাখশারী ৪৯৯ হিজরীর রমজান মাসে গ্রন্থটি প্রণয়ন সম্পন্ন করেন। ভারত থেকে ১৯৬২ সালে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে।
৬. আল মুহাজার ও মুতাম্মিমু আরবাবিল হাযাত ফিল আহাজি ওয়াল আগলুতাতি : এটি একটি আরবী ব্যাকরণ সম্পর্কিত গ্রন্থ। বাগদাদ থেকে ১৯৭৩ সালে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে।
৭. আল কিসতাসু ফিল আরুজি : আল্লামা যুরযানী ৬৫৫ হিজরীতে গ্রন্থটির ব্যাখ্যা গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। ইরাক থেকে ১৯৬৯ সালে আল কিসতাসুল মুস্তাকিম নামে প্রকাশিত হয়েছে।
৮. মুকাদ্দামাতুল আদব : এটি একটি আরবী ফার্সী অভিধান। এটি তার সর্বশেষ গ্রন্থ হিসাবে বিবেচিত হয়। গ্রন্থটি ফার্সী ভাষাভাষী লোকদের আরবী শিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে।
৯. কিতাবুল আমাকিনা ওয়াল জিবাল ওয়াল মিয়াহ : গ্রন্থটি ভূগোল সম্পর্কিত মু'জাম গ্রন্থ। ১৮৫৬ সালে লেইডেন থেকে প্রকাশিত হয়েছে এবং ১৯৩৮ সালে বাগদাদ থেকে প্রকাশিত হয়েছে।
১০. নাওয়াবিগুল কালিম : এটি আরবী ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কিত একটি গ্রন্থ। যামাখশারী মক্কায় গ্রন্থটি প্রণয়ন করে ১২৮৭ সালে গ্রন্থটি কায়রো থেকে প্রকাশিত হয়েছে এবং বৈরুত থেকে ১৩০৬ হিজরীতে প্রকাশিত হয়েছে এবং এর অনেকগুলো ব্যাখ্যা গ্রন্থ রয়েছে। এছাড়া ১৮৮৬ সালে গ্রন্থটি ফরাসী ভাষায় অনুদিত হয়েছে।
১১. কিতাবুন নাসয়েহ আল কুববার : গ্রন্থটি কায়রো থেকে ১৩১২ হিজরীতে প্রণয়ন হয়েছে। এটিকে মাকামাত গ্রন্থও বলা হয়।
১২. রাবিউল আবরার ও নুসুসুল আখবার : বাগদাদ থেকে ১৯৭৬ সালে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থটি আল্লামা যামাখশারী সফরের মধ্যে লিখেছেন।
১৩. আতওয়াকুয যাহাব ওয়া আননাসায়িহুস সিগার : এটি হচ্ছে ১০০টি মাকালাহ সম্পর্কিত সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ। দামিস্ক এবং বৈরুত থেকে গ্রন্থটি ১২৯৩ হিজরীতে প্রকাশিত হয়েছে এবং কায়রো থেকে ১৩৭০ হিজরীতে প্রকাশিত হয়েছে।
১৪. কিতাবু খাসাইসুল আশারাহ আল কিরামুল বারারাহ : গ্রন্থটি বাগদাদ থেকে ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত হয়েছে।
১৫. রিসালাতুল ফিল কালিমাতিল শাহাদাত : গ্রন্থটি মাসআলাতু ফি কালিমাতু শাহাদাত নামে বাগদাদ থেকে ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হয়েছে।
১৬. আল কাসীদাতুল বা'উদিয়াহ : গ্রন্থটিতে আল্লাহ এবং তার রাসূলের প্রশংসায় লিখা হয়েছে এবং গ্রন্থটির শেষে মশার গুণাগুণ বর্ণনা করা হয়েছে।
১৭. নুযহাতুল মুতাআন্নিস ওয়া নুহযাতুল মুক্বতাবিস।
১৮. আল মুফরাদ ওয়াল মুয়াল্লাফ ফিন নাহু।
১৯. রিসালাতুল ফিল মাজায ওয়াল ইসতি'য়ারাহ।
এছাড়াও তার আরও গ্রন্থাবলি রয়েছে যেগুলো তার জীবনীকারগণ লিপিবদ্ধ করেছেন।
২০. রিসলাতুল তাসাররুফাত।
২১. আল মিনহাজু ফী উসুলিদ্দীন।
২২. দিওয়ানু শি'রু আয যামাখশারী।
২৩. মুখতাসারু আল মুয়াফাকাতু বাইনা আহলিল বাইতি ওয়াস সাহাবা।
২৪. আল কাশফু ফিল ক্বিরাআত।
২৫. আ'জাবুল আযবি ফী সারহে লামইয়াতি আরব। গ্রন্থটি ১৩২৮ হিজরীতে বাগদাদে প্রকাশিত হয়েছে।
২৬. নুকাতিল ই'রাব ফী গারীবিল ই'রাব।
২৭. কাসিদাতুল ফী সুয়ালিল গাযালি আন জুলুসিল্লাহি আলাল আরশি ওয়া কুসুরিল মা'রিফাতি আল বাশারিয়াহ।
২৮. আদ্দুররু আদ্দায়িরুল মুনতাখাবু ফী কিনায়াতি ওয়া ইসতি'য়ারাতি ওয়া তাশবিহাতিল আরব।
২৯. কিতাবু মুতাশাবিহি আসামায়ি রু'য়াত।
৩০. তালিমুল মুকতাদা ওয়া ইর্শাদুল মুকতাদা।
৩১. রুউসু আল মাসায়িল।
৩২. শারহি আবিয়াতু কিতাবি সিবওয়াইহ।
৩৩. কিতাবু রিসালাতুল মুসাওমা।
৩৪. আররায়িদু ফিল ফারায়িয।
৩৫. মু'জামুল হুদুদ।
৩৬. দাল্লাতুন নাসিদ।
৩৭. কিতাবু আকলিলকুল।
৩৮. আল আমালি ফিন নাহু।
৩৯. জাওয়াহিরুল লুগাত।
৪০. কিতাবুল আজনাসি।
৪১. কিতাবুল আসমাই ফিল লুগাত।
৪২. রুহুল মাসায়িল।
৪৩. সারায়িরুল আমসাল।
৪৪. তাসলিয়াতু আদ্দারির।
৪৫. রিসালাতুল আসরার।
৪৬. দিউয়ানু আত তামসিল।
৪৭. শাকায়িকু আন নো'মান ফী মানাকিবিল ইমাম আবু হানিফা।
উল্লিখিত গ্রন্থাবলীতে তাঁর বিভিন্ন বিষয়ে পাণ্ডিত্য, যোগ্যতা ও চিন্তা-চেতনা সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে এবং এগুলো তাঁকে অমর করে রেখেছে। তবে কাশশাফ গ্রন্থই তাকে খ্যাতির শিখরে আরোহন করিয়েছে।
টিকাঃ
১ (পেজ ৩৩). কামিল মুহাম্মদ মুহাম্মদ আওয়িদাহ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭; ইবনুল মুনির, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৩।
২ (পেজ ৩৩). কামিল মুহাম্মদ মুহাম্মদ আওয়িদাহ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭; ইবনুল মুনির, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫; কাশফুশ যুনুন, প্রাগুত, খণ্ড ১, পৃ. ৭৪।
৩ (পেজ ৩৩). কামিল মুহাম্মদ মুহাম্মদ আওয়িদাহ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭; ইবনুল মুনির, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫; কাশফুশ যুনুন, প্রাগুত, খণ্ড ১, পৃ. ৭৮।
৪ (পেজ ৩৩). ইবনুল মুনির, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫। কাশফুশ যুনুন, প্রাগুক্ত, পৃ, ২য় খণ্ড ১৬৭।
৫ (পেজ ৩৩). আল যামাখশারী শায়িরান ও কাতিবান পৃ. ৭৮; মু'জাম আল উদাবা, পৃ. ১৩৩; ইবনুল মুনির, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫। কাশফুশ যুনুন, প্রাগুক্ত, পৃ, ২য় খণ্ড ১৬৭।
১ (পেজ ৩৪). আল যামাখশারী শায়িরান ও কাতিবান পৃ. ৭৮; মু'জাম আল উদাবা, পৃ. ১৩৩; ইবনুল মুনির, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫। কাশফুশ যুনুন, প্রাগুক্ত, পৃ, ২য় খণ্ড ১৬৭।
২ (পেজ ৩৪). আল যামাখশারী শায়িরান ও কাতিবান পৃ. ৭৮; মু'জাম আল উদাবা, পৃ. ১৩৩; ইবনুল মুনির প্রাগু, পৃ. ৩৪।
৩ (পেজ ৩৪). কামিল মুহাম্মদ মুহাম্মদ আওয়িদাহ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫; ইবনে খাল্লিকান প্রাগুক্ত, ২য় খণ্ড পৃ. ১০৭; ইবনুল মুনির প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫।
১ (পেজ ৩৫). আল যামাখশারী শায়িরান ও কাতিবান পৃ. ৭৮; মু'জাম আল উদাবা, পৃ. ১৩৩; ইবনুল মুনির, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫। কাশফুশ যুনুন, প্রাগুক্ত, পৃ, ২য় খণ্ড ১৬৭; ড. মুহাম্মদ বেলাল হোসেন, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৪।
১ (পেজ ৩৭). হেলাল নাজি, আয যামাখশারী হায়াতুহু ওয়া আসারুহু, মাজাল্লিত আলিম আল কুতুব, ৪র্থ সংখ্যা ১৪১১ হিজরী, পৃ. ৫১১-৫১৯; । আল যামাখশারী শায়িরান ও কাতিবান পৃ. ৭৮; মু'জাম আল উদাবা, পৃ. ১৩৩; ইবনুল মুনির, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫। কাশফুশ যুনুন, প্রাগুক্ত, পৃ, ২য় খণ্ড ১৬৭; ড. মুহাম্মদ বেলাল হোসেন, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৪; কামিল মুহাম্মদ মুহাম্মদ আওয়িদাহ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৫-৬৭।
📄 ছাত্রবৃন্দ
আল্লামা যামাখশারী জ্ঞান অর্জন এবং ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে গ্রন্থ প্রণয়নের পাশাপাশি শিক্ষাদানে সময় অতিবাহিত করেছেন এজন্যই তার যোগ্য ছাত্র তৈরি হয়েছে যারা বিশ্বব্যাপী খ্যাতি লাভ করেছেন। যামাখশারীর যশ-খ্যাতি অল্প দিনের মধ্যেই মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। ফলে তিনি যখন যেখানেই গমন করতেন এবং অবস্থান করতেন সেখানেই অনেক শিক্ষার্থী ভিড় করতো এবং তার নিকট হতে দ্বীনের বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করে তাঁর ছাত্রত্ব গ্রহণ করতো।
নিম্নে তাঁর কয়েকজন উল্লেখযোগ্য ছাত্রের নাম উল্লেখ করা হলো :
১. আবুল হাসান আলী ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আলী ইবনে আহমাদ ইবনে মারওয়ান আল ইমরানী আল খাওয়ারিযমী। তিনি মু'তাযিলা মতবাদে বিশ্বাসী একজন বড় আলিম ছিলেন। তিনি আল্লামা যামাখশারীর নিকট আরবী সাহিত্যে জ্ঞান অর্জন করেন এবং তার বড় একজন সহচরে পরিণত হন এবং আরবী সাহিত্যে অনেক কিতাব রচনা করেন। তিনি ৫৬০ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন।
২. আবুল মু'য়াইয়্যদ আল মুওয়াফফেক আহমাদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবি সাঈদ ইসহাক আল মাক্কী। তিনি একজন ফকিহ এবং একজন আরবী সাহিত্যিক ছিলেন। তিনি খাওয়ারিযমি যামাখশারীর নিকট আরবী সাহিত্যে জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি ৪৮৪ হিজরী জন্মগ্রহণ করেন এবং ৫৬৮ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন।
৩. মুহাম্মদ ইবন আবিল কাসিম বাইজুক আবু আল-ফাদল আল ইয়া'কিলী আল-খাওয়ারিযমী। তিনি যামাখশারীর নিকট আরবী ভাষা ও ব্যাকরণ অধ্যয়ন করেন। তিনি একজন আরবী সাহিত্যের অগ্রজ ছিলেন এবং হাম্বলি মাযহাবের ফকিহ ও মুফাসসীর ছিলেন। তিনি ৪৯০ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৫৬২ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন।
৪. আবূ ইউসূফ ইয়াকূব ইবন আলী ইবন মুহাম্মদ ইবন আল জা'ফর আল-বালখী আল জানদালী। তিনি যামাখশারীর নিকট আরবী ব্যাকরণ এবং সাহিত্য অধ্যয়ন করেন। তিনি আরবী সাহিত্য এবং ব্যাকরণের বড় একজন ইমাম ছিলেন। তার ইন্তেকালের সাল জানা যায়নি।
৫. আবু তাইয়িব আলী ইবন ঈসা' হামযা ইবন ওয়াহহাস। তিনি তৎকালীন সময়ে মক্কার আমীর ছিলেন। আল্লামা যামাখশারী মক্কায় অবস্থান কালে তিনি তার জ্ঞান চর্চায় মুগ্ধ হয়ে তাঁর ছাত্রত্ব গ্রহণ করেন। তার আরবী গদ্য ও পদ্যের অনেকগুলো গ্রন্থ রয়েছে। তিনি ৫৫৯ হিজরীতে মক্কায় ইন্তেকাল করেন।
৬. আল কাজী আবুল মা'য়ালি ইয়াহইয়া ইবন আব্দুর রহমান ইবন আলী আল শাইবানি। তিনি মক্কার কাজী ছিলেন এবং তিনি হেরেম শরীফে যামাখশারীর নিকট কাশশাফ গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন।
৭. আবু বকর ইয়াহইয়া ইবন সা'য়াদান ইবন তামাম আল আযাদি আল কুরতুবী। তিনি ৪৮৬ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ইস্পাহান ও খাওয়ারযিমে আল্লামা যামাখশারীর নিকট অধ্যয়ন করেন। তিনি ৫৬৭ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন।
৮. উম্মুল মুআইয়্যিদ যাইনাব বিনতে আব্দুর রহমান ইবনুল হাসান আল জুরযানি আশশা'রী। তিনি ফকিহ ছিলেন এবং হাদীস বিশারদ ছিলেন। তিনি ৫২৪ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৬১৫ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন।
৯. আল হাফিজ আবু তাহের আহমাদ ইবন মুহাম্মদ আসসালাফি। তিনি শাফি'য়ী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। তিনি ইসকান্দারিয়া থেকে আল্লামা যামাখশারীর নিকট ইজাজত চেয়ে চিঠি লিখেছিলেন তখন আল্লামা যামাখশারী মক্কায় অবস্থান করছিলেন। আল্লামা যামাখশারী তাকে ইজাজত দিয়েছেন। তিনি ইসকান্দারিয়াতে ৫৭৬ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন।
১০. আবু' উমার আমির ইবন আল হাসান আল সাম্মার; তিনি যামাখশারের অধিবাসী এবং যামাখশারীর চাচাত ভাই ছিলেন।
১১. আবূ আল-মাহাসিন ইসমাঈল ইবন 'আব্দিল্লাহ আল তাবিল। তিনি তাবারিস্থানের অধিবাসী ছিলেন।
১২. আবু আল মাহাসিন 'আব্দুর রহমান ইবন আব্দিল্লাহ আল-যাযযাম। তিনি ইবয়াদের অধিবাসী ছিলেন। তিনি যামাখশারীর নিকট থেকে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেন।
১৩. আবু সা'দ আহমদ ইবন মাহমুদ আল-সাতি। তিনি সমরখন্দের অধিবাসী ছিলেন।
১৪. আবু তাহির সামান ইবন আব্দিল মালিক আল ফকীহ ইবন আহমদ ইবন আবী সা'ঈদ। তিনি আইন শাস্ত্র ও আরবী সাহিত্যে অভিজ্ঞ ছিলেন।
১৫. মুহাম্মদ ইবন মুহাম্মদ ইবন আব্দুল জালীল ইবন আব্দুল মালিক আল-বালখী। তিনি একাধারে একজন কবি, সাহিত্যিক এবং লেখক ছিলেন। তিনি খাওয়ারিযমে ৫৭৩ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন।
মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে আল্লামা যামাখশারী ছাত্রগণ ছড়িয়ে আছেন এবং তারা বিভিন্ন বিষয়ে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছেন এবং অনেক গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন। তার ছাত্র সংখ্যা নির্ণয় করা প্রায় অসম্ভব। এখানে তার বিখ্যাত ছাত্রদের নাম তুলে ধরা হলো মাত্র।
টিকাঃ
১. আল যামাখশারী শায়িরান ও কাতিবান পৃ. ৭৮; মু'জাম আল উদাবা, পৃ. ১৩৩; ইবনুল মুনির, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫। কাশফুশ যুনুন, প্রাগুক্ত, পৃ, ২য় খণ্ড ১৬৭; ড. মুহাম্মদ বেলাল হোসেন, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৪; Lutfi Ibrahim, Ibid, pp. 97-98। বুগইয়াতুল ও'য়াত, প্রাগুক্ত, ১ম খণ্ড, পৃ. ২১৫; শাযরাতুয যাহাব, প্রাগুক্ত, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৬৩; তাযক্বিরাতুল হুফফায, প্রাগুপ্ত, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১২৯৮।
📄 আকীদা ও মাযহাব
আল্লামা যামাখশারী 'আকীদাগত দিক দিয়ে মু'তাযিলী ছিলেন। আল্লামা যামাখশারী যে পরিবেশে বড় হয়েছিলেন সেই পরিবেশটিই ছিল মু'তাযিলা আকীদা দ্বারা বেষ্টিত। তাঁর উস্তাদ আবু মুদার আল দাব্বী আল ইস্পাহানী মু'তাযিলা আকীদায় বিশ্বাসী ছিলেন বিধায় আল্লামা যামাখশারী তার উস্তাদের আকীদা দ্বারা প্রচণ্ডভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন কেননা তার উস্তাদ ছিলেন মু'তাযিলা আকীদার বড় চিন্তাবিদ এবং তিনি খাওয়ারযিমে সর্বপ্রথম মু'তাযিলা আকীদাকে প্রতিষ্ঠিত করেন। যামাখশারী আরো একজন উস্তাদ আবু সাঈদ আল জাসীমিও মু'তাযিলার আকীদায় বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি যামাখশারীর তাফসীরের উস্তাদ ছিলেন। এজন্যই আমরা আল্লামা যামাখশারীকে তার কাশশাফ গ্রন্থের বিভিন্ন স্থানে মু'তাযিলা আকীদা প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট দেখতে পাই। তিনি নিজেকে মু'তাযিলী হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন। ইবনু খাল্লিকান বলেন :
إنه كان إذا قصد صاحبا له واستأذن عليه في الدخول يقول لمن يأخذ له الإذن : قل له : أبو القاسم الـمـعـتـزلـي بـالـبـاب -
তিনি যখন তাঁর কোন সহপাঠীর সাথে দেখা করতে চাইতেন, তখন ভেতরে প্রবেশের জন্য অনুমতি বাহককে বলতেন, বল, আবুল কাসিম আল-মু'তাযেলী দরজায় দাঁড়িয়ে।
তিনি মু'তাযিলী মতবাদের আলোকে আল কাশশাফ গ্রন্থটি প্রণয়ন করেন। এটি মু'তাযিলী 'আকীদা অনুসৃত কুরআনের একটি অনবদ্য তাফসীর গ্রন্থ। এর বিভিন্ন স্থানে মু'তাযিলী 'আকিদা ছড়িয়ে আছে।
'আল ইকলিলু শারহি মাদারিকুত তানযীল' এর গ্রন্থকার উল্লেখ করেন: আল্লামা যামাখশারী তাঁর শেষ জীবনে মু'তাযিলা মতবাদ হতে তওবা করে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'য়াতের মতবাদ গ্রহণ করেন। তিনি এ মতের সমর্থনে একটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করেন :
قال العلامة اكمل الدين في شرح الكشاف انه (اى الزمخشرى) قد تاب من مذهب الاعتزال وصنف نصائح الصغار ونصائح الكبار بعد توبته من الاعتزال -
“আল্লামা আকমালুদ্দীন কাশশাফের ব্যাখ্যা গ্রন্থে বলেন যে, তিনি (যামাখশারী) মু'তাযিলা মতবাদ হতে তওবা করেছিলেন এবং 'নাসায়িহুস সিগার ও নাসায়িহুল কিবার' গ্রন্থদ্বয় এ তওবার পরেই লিখেছিলেন।
পক্ষান্তরে আল্লামা খাওয়ানসারী উল্লেখ করেন, যামাখশারীর রবীউল আবরার গ্রন্থটি আদ্যোপান্ত পড়লে মনে হয় যে, তিনি মু'তাযিলা মতবাদ পরিহার করে শি'আ মতবাদ গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু আল্লামা মুকরী এসব অস্বীকার করেন। তিনি বলেন যামাখশারী তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত মু'তাযিলী আকীদায় বিশ্বাসী ছিলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও উদ্ধৃতি উল্লেখ করেন যে :
قال الراعي سمعت شيخنا ابا الحسن على قال سمعت الاندلسي يقول شيئان لا يصحان اسلام ابراهيم بن سهل وتوبة الزمخشرى من الاعتزال -
'আল-রাঈ বলেন আমি শাইখ আবুল হাসান 'আলীকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন আমি আল আন্দালুসীকে বলতে শুনেছি যে, দু'টি বিষয় সঠিক নয়। একটি হল ইব্রাহীম ইবন সহলের ইসলাম গ্রহণ এবং অপরটি হল যামাখশারীর মু'তাযিলা মতবাদ থেকে প্রত্যাবর্তন।
আল্লামা যামাখশারী হানাফী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। কেউ কেউ তাঁকে শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী বলেও দাবী করেছেন। কিন্তু তিনি শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন না। তিনি স্পষ্টভাবে নিজেকে একনিষ্ঠ হানাফী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি দিয়ানুল আদব গ্রন্থে বলেন :
ওয়াসন্দ দীনী ওয়া এতেক্বাদী ওয়া মাযহাবী * ইলা হুনফা উখতারাহুম ওয়া হানাইফা
হুনাইফা আদইয়া নাহুম হুনফিয়া * মাযাহিবুহুম লা ইয়াবতাগুনায যাওয়ায়িফা
“আমার ধর্ম, আকীদা ও মাযহাবকে সে সকল একনিষ্ঠদের সাথে সম্পৃক্ত করছি, যারা নির্বাচিত। তাদের ধর্ম ও মাযহাব বিশুদ্ধ, আর তারা কোন প্রকার হীনমন্যতার অনুসন্ধান করেন না"।
এছাড়াও তিনি স্বীয় আলকাশশাফ গ্রন্থে ফিকহী মাসআলার বর্ণনার ক্ষেত্রে হানাফী মাযহাবের মতামতকে বিশদভাবে পর্যালোচনা করেছেন এবং অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তাতে বুঝা যায় যে, তিনি 'আকীদাগত দিক থেকে মু'তাযিলী আকীদায় বিশ্বাসী এবং মাযহাবের দিক থেকে হানাফী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। তবে তিনি কোন মাযহাবের প্রতি সম্পূর্ণরূপে তাকলীদে বিশ্বাসী ছিলেন না। এ বিষয়ে তাফসীরে কাশশাফ গ্রন্থের ভূমিকায় একটি কবিতা উল্লেখ করা হয়েছে :
إذا سألوا عن مذهبي لم أبح به * واكتمه كتمانه لي أسلم
فإن خنفيا قلت قالوا باني * أبيح الطلا وهو الشراب المحرم
وإن مالكيا قلت قالوا باني * أبيح لهم أكل الكلاب وهم هم
وإن شافعيا قلت قالوا باني * أبيح نكاح البنت والبنت تحرم
وإن حنبليا قلت قالوا باني * ثقيل حلولي بغيض مجسم
وإن قلت من أهل الحديث وحزبه * يقولون تيس ليس يدرى ويفهم
تعجبت من هذا الزمان وأهله * فما أحد من ألسن الناس يسلم
وآخرنى دهري وقدم معشرا * على أنهم لا يعلمون وأعلم
ومذ أفلح الجهال أيقنت أنني * أنا اليم والأيام أفلح أعلم
টিকাঃ
১ (পেজ ৪০). ইয়াকূত আল হামুবী প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৫; ড. মুহাম্মদ বেলাল হোসেন প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭।
১ (পেজ ৪১). আল মুকরী, নাফহ আল তীব, ২য়খণ্ড (কায়রো : ১২৭৯ হি) পৃ. ৩৫২; ড. মুহাম্মদ বেলাল হোসেন প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮।
২ (পেজ ৪১). আল-খাওয়ানসারী, রওযাহ আল জান্নাহ (তেহরান: আলী আল হাজার, ১৩৬০হি.), পৃ. ৭২০; ড. মুহাম্মদ বেলাল হোসেন, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯।
৩ (পেজ ৪১). আল-খাওয়ানসারী, রওযাহ আল জান্নাহ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭২০; ড. মুহাম্মদ বেলাল হোসেন প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯; আযযাহাবী, আত তাফসীর ওয়াল মুফাসসীরুন প্রাগুক্ত, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪৭৪।
১ (পেজ ৪২). আল-খাওয়ানসারী, রওযাহ আল জান্নাহ (তেহরান : আলী আল হাজার, ১৩৬০ হি) পৃ. ৭২০; ড. মুহাম্মদ বেলাল হোসেন প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯; আযযাহাবী, আত তাফসীর ওয়াল মুফাসসিরুন প্রাগুক্ত, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪৭৪।
২ (পেজ ৪২). আল্লামা যামাখশারী, আল কাশশাফ, প্রাগুক্ত, ভূমিকা।