📘 মুতাযিলা আকিদা 📄 বিবাহ

📄 বিবাহ


আল্লামা যামাখশারী জ্ঞান অর্জন ও অধ্যবসায়ে জীবনকে অতিবাহিত করেন। তিনি বিবাহ করেননি। পিতা-মাতা ও ভাই-বোনদের নিয়েই তাঁর সাংসারিক জীবন সীমাবদ্ধ ছিল। আল্লামা যামাখশারীর পিতা অর্থনৈতিকভাবে খুব বেশি সচ্ছল ছিলেন না। তাঁর ভাই-বোনের সংখ্যা বেশি ছিল বিধায় সাংসারিক অর্থসংকটে তিনি জীবন অতিবাহিত করেন। এ জন্যই আমরা দেখতে পাই তিনি কর্মজীবনে একটি সরকারি পদ লাভের জন্য সচেষ্ট ছিলেন। যদিও তিনি তা লাভ করতে পারেননি।

জ্ঞান সাধনা, জ্ঞান অর্জনের জন্য বিভিন্ন স্থানে সফর এবং দেশবিদেশের বিভিন্ন উস্তাদগণ এর সান্নিধ্যে সময় অতিবাহিত করার মধ্যেই তিনি জীবনের সার্থকতা খুঁজে পেয়েছেন এবং বিবাহ করার প্রয়োজনবোধ করেননি। এ বিষয়ে তিনি একটি কবিতায় বলেন,
رأيت أبا يشقى لتربية ابنه ويسعى لكن يدعى مكبا ومنجبا
أخو شقوة مازال مركب طفله فأصبح ذاك الطفل للناس مركبا
لذاك تركت النسل واخترت سيرة مسيحية أحسن بذلك مذهبا
“আমি আমার পিতাকে দেখেছি, তিনি তার সন্তানের লালন-পালনের জন্য নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। তিনি তাদের জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা রত, নিবেদিত এবং অনেক সন্তানের জনক। আমার ভাইকে দেখেছি, দুর্ভাগা হিসেবে তার শিশুকাল অতিবাহিত করতে। অতঃপর এ শিশুটি হয়ে গেল, মানুষের জন্য ভিন্ন চরিত্রের অধিকারী। এ জন্যই আমি সংসার ত্যাগ করেছি এবং ঈসা (আ:) এর আদর্শকে পছন্দ করেছি, যা অতি উত্তম পন্থা।”

আল্লামা যামাখশারী আরো বলেন- لا تخطب المرأة لحـسـنــا ولـكـن لـحـصـنـها فإن اجتمع الحصن والجبال فذاك هو الكمال وأكـمـلـهـن ذلك أن تعيش حصوراً وإن عمرت عصورا -
"তুমি কোন মহিলার প্রতি তার সৌন্দর্যের কারণে তাকে বিবাহের প্রস্তাব দিবে না বরং তার সততার জন্য তাকে বিবাহের প্রস্তাব দিবে। আর যদি তুমি সৌন্দর্য এবং সততা এক সাথে পাও, সেটা হবে তোমার জন্য পূর্ণতা। আরও অধিক পূর্ণতা হবে যদি তুমি নিস্পৃহ (নারীদের সঙ্গ থেকে বিরত) থাক। যদিও তুমি অনেক দিন বেঁচে থাক।

আল্লামা যামাখশারী বিবাহ না করার ক্ষেত্রে জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ ও সাধনা তাঁকে উৎসাহিত করেছে। আরো একটি কারণ হতে পারে, তিনি তাঁর পিতাকে অর্থসংকটের মধ্য দিয়ে সংসারের দায়িত্ব পালন করতে দেখেছেন। কেননা তাঁর অনেক ভাই-বোন ছিল এবং খুব বেশি সাচ্ছন্দে তারা জীবনকে অতিবাহিত করেননি। এছাড়া আল্লামা যামাখশারী একটি পা হারিয়েছিলেন। তাঁর পা কেটে ফেলতে হয়েছিল এবং তিনি তার পরিবর্তে একটি কাঠের পা ব্যবহার করতেন। এটাও তাঁর বিবাহ না করার কারণ হয়ে থাকতে পারে। তবে এ কারণে তাঁর জীবনে কোন হতাশা বা দুঃখবোধ লক্ষ্য করা যায়নি এবং তা তাঁর শিক্ষা জীবনকে আরও গতিশীল করেছে।

টিকাঃ
১. মাখতুত দেওয়ানুল আদব, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮।
২. আল্লামা যামাখশারী, কিতাবু আতওয়াকুয যাহাব ফীল মাওয়ায়িযি ওয়াল খুতাব, (মাতবা'আতু আস সা'আদা, ১৩২৮হি. পৃ. ১০৭; কামিল মুহাম্ম মুহাম্মদ আওয়্যিদাহ, প্রাগুক্ত, পৃ.৫৬।
৩. কামিল মুহাম্ম মুহাম্মদ আওয়্যিদাহ, প্রাগুক্ত, পৃ.৫৬-৫৭।

📘 মুতাযিলা আকিদা 📄 কর্ম জীবন

📄 কর্ম জীবন


আল্লামা যামাখশারী শিক্ষা জীবনের পর তিনি শিক্ষাদান ও সাহিত্য সাধনা ও তাফসীর চর্চায় তাঁর জীবনকে অতিবাহিত করেন। তিনি ছিলেন একজন পরহেজগার ও এবাদতগুজার ব্যক্তি। তিনি সারা জীবন ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে যেমন: তাফসীর, হাদীস, ফিকহ, অলংকার শাস্ত্র, উসূল, যুক্তি বিদ্যা, কবিতা ও সাহিত্য ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান চর্চা ও গ্রন্থ প্রণয়ন এবং ছাত্রদেরকে শিক্ষাদানের মাধ্যমে তাঁর জীবনকে অতিবাহিত করেন।

যামাখশারীর মধ্যে জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি সরকারী দপ্তরে উচ্চ পদ লাভের ইচ্ছা ছিল। তাই তিনি বুখারা হতে দেশে ফিরে এসে সুলতান মালিক শাহের প্রধান উযীর নিযামুল মুলকের শরণাপন্ন হন। যামাখশারী নিযামুল মুলকের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং সরকারী দপ্তরের উচ্চ পদে একটি চাকুরী প্রদানের জন্য তাঁকে অনুরোধ করেন। তিনি নিযামুল মুলকের প্রশংসায় কবিতা লিখেন :
إليك ريب الملك أشكر أنعما ليمناك هطالا على ربابها
ودائمة مني لك الدعوة التي تجوب السماوات العلى مستجابها
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত: তাঁর এ অনুরোধ বিবেচনা করা হয়নি। এতে তিনি নিজকে খুবই অপমানিতবোধ করেন এবং মর্মাহত হন। তাঁর এ গ্লানি দূর করার জন্য তিনি দেশ ত্যাগ করে খুরাসান গমনের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি দুঃখ, কষ্ট ও গ্লানি নিয়ে আরও একটি কবিতা লিখেন:
خليلي هل تجدى على فضائل إذا أنا لم أرفع على كل جاهল
“হে আমার বন্ধু! তুমি আমার ওপর কাউকে মর্যদাবান পেয়েছ? অথচ আমি মূর্খদের অবস্থান থেকে উর্ধ্বে উঠতে পারিনি”।

খুরাসান অবস্থানকালে তিনি অনেক সরকারী কর্মকর্তার সংস্পর্শে আসেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মুজীব আল দৌলা আবূ আল ফাতহ আলী ইবন হুসাইন আল-আরতাসতানী এবং মুয়াইয়িদ আল-মুলক 'উবাউদুল্লাহ ইবন নিযামুল মুলক। যামাখশারী এখানেও একটি সরকারী চাকুরী লাভের প্রচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন। আল্লামা যামাখশারী 'মুয়াইয়িদ আল-মুলক 'উবাউদুল্লাহ ইবন নিযামুল মুলক এর নিকট গমণ এবং সরকারি একটি পদ লাভের জন্য আবেদন করেন এবং এ বিষয়ে একটি কবিতা লিখেন:
فلا ترضى يا صدر الكفاة بأن ترى أعالي قوم الحقوا باسافل
ولا تجعلوني مثل همزة واصل فيسقطني حذف ولا راء واصل
فكل امرىء اماله عدد الحصى وهات نظيري في جميع المحافل
“হে মর্যাদার অধিকারী আমার উপর অসন্তুষ্ট হবেন না, আপনি দেখতে পাচ্ছেন না আমার জাতির পিছনের লোকেরা আমার চেয়েও উচ্চ মর্যাদায় আসীন। আমাকে হামযা ওয়াসেল এর মত রাখবেন না। যাতে আমাকে পিছন থেকে ছেটে ফেলা যায়। প্রত্যেক ব্যক্তি তার অনেক আশা আকাঙ্ক্ষা নিয়েই থাকে। আমার এ অবস্থা সকল মাহফিলেই!”

খুরাসানে সরকারী পদ লাভে ব্যর্থ হয়ে তিনি সেলজুকদের রাজধানী ইস্পাহানে গমন করেন। এখানে এসে তিনি সুলতান মালিক শাহ ও তার উত্তরাধিকারী সানজারের প্রশংসা গাঁথা রচনা করেন। তিনি বলেন:
محمد بن أبي الفتح الذي تركت
أوصاف لكتبة في كل منطيق
ابن السلاطين من أبناء سلجوق
وابن الغطارف منهم والغرانيق

৫১২ হিজরিতে আল্লামা যামাখশারী কঠিন রোগে আক্রান্ত হন। ফলে তিনি সরকারী চাকুরীর ইচ্ছা পরিহার করেন এবং বাকী জীবন শিক্ষাদান ও সাহিত্য সাধনায় কাটিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং আল্লাহর কাছে প্রতিজ্ঞা করেন যে, আল্লাহ যদি তাঁকে এ রোগ থেকে মুক্তি দান করেন তাহলে তিনি আর কোন বাদশাহী পদ এর আকাঙ্ক্ষা করবেন না এবং আর রাজা বাদশার প্রশংসা গাথা রচনা করবেন না।

অতঃপর আল্লামা যামাখশারী আল্লাহর রহমতে রোগ থেকে মুক্তি পান এবং মুক্তির পর তিনি কিছুদিন বাগদাদে অবস্থান করেন। তিনি বাকী সময়টুকু মক্কা ভূমিতে অতিবাহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে মক্কায় গমন করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন:
والله أكبر رحمة والله أكثر * نعمة وهو الكريم القادر
وأحق ما يشكو ابن ادم ذنبه * وأحق من يشكو إليه الغافر
فعسى المليك بفضله وبطوله * يكسو لباس البر من هو فاجر
يا من يسافر في البلاد منقبا * إني إلى البلد الحরাম مسافر
إن هاجر الإنسان عن أوطانه * فالله أولى من إليه يهاجر
وتجارة الأبرار تلك ومن يبع * بالدين دنياه فنعم التاجر

আল্লাহ মহান এবং অনুগ্রহশীল আল্লাহ অধিক নিয়ামত দাতা এবং তিনি হলেন শক্তিশালী ও মহান। আদমের সন্তান তাদের গুনাহ মাফের জন্য অভিযোগ করার ক্ষেত্রে তিনিই অধিক হকদার। আশা করছি, আল্লাহ মালিক তার অনুগ্রহ ও বদান্যতা দ্বারা পাপাচারিকে পূণ্যের পোশাক পরিয়ে দিবেন। পবিত্র ভূমির দিকে গমনকারী হে মুসাফির! আমিও পূণ্য ভূমি মক্কা শহরের উদ্দেশ্যে সফরকারী। কোন ব্যক্তি যদি তার নিজ জন্মভূমির থেকে হিজরত করে তাহলে আল্লাহই অধিক যোগ্য তাঁর দিকে হিজরত করার জন্য। এটাই পূণ্যবানদের ব্যবসা, যারা দুনিয়ার বিনিময়ে দ্বীনকে ক্রয় করে নিয়েছেন: তারা কতই না উত্তম ব্যবসায়ী।

মক্কায় দু'বছর অবস্থানের পর তিনি মাতৃভূমির টানে খাওয়ারিযমের উদ্দেশ্যে রওনা হন। দেশে ফেরার পর তিনি তৎকালীন খাওয়ারিযমের শাহ মুহাম্মদ ও তাঁর পুত্র আতসীজের প্রশংসা গাঁথা রচনা করেন। কিন্তু এতেও কোন ফল হয়নি। দারুণভাবে মর্মাহত হয়ে তিনি আবার মক্কায় গমনের সিদ্ধান্ত নেন। ৫২৬ হিজরীতে তিনি মক্কায় গমন করেন। মক্কায় তিন বছর অবস্থান করার পর পুনরায় তিনি স্বদেশে ফিরে আসেন এবং আমৃত্যু এখানেই অবস্থান করেন। তিনি কবিতার মাধ্যমে বলেন:
أحب بلاد الله شرقا وغربا * إلي التي فيها غذيت وليدا
ولكن تواسي بالكرامة غيرها * وهذي أرى فيها الهوان عتيدا

আমি পূর্ব পশ্চিমে আল্লাহর জমিনকে ভালোবাসি এবং আমি আমার মাতৃভূমিকেও ভালোবাসি যেখানে আমি ছোট থেকেও বড় হয়েছি। কিন্তু আমি আমার মাতৃভূমিকে বাদ দিয়ে অন্য স্থানে সম্মান ও মর্যাদা খুঁজেছি এবং আমি সেথায় অসম্মান দেখেছি।

টিকাঃ
১ (পেজ ২৮). কামিল মুহাম্মদ মুহাম্মদ আওয়িদাহ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০; দিওয়ানুল আদব, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩
২ (পেজ ২৮). প্রফেসর ফজলুর রহমান, প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৭।
৩ (পেজ ২৮). কামিল মুহাম্মদ মুহাম্মদ আওয়িদাহ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪১; দিওয়ানুল আদব, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৫।
১ (পেজ ২৯). Lufi Ibrahim," Al-Zamakhshari : His life and works, Islamic Studies, Vol-ixix No-1 (Pakistan : the Islamic Research institute, 1969), p.98.
২ (পেজ ২৯). কামিল মুহাম্মদ মুহাম্মদ আওয়িদাহ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪২; দিওয়ানি আদাব, প্রাগুক্ত, পৃ. ৯৫।
৩ (পেজ ২৯). কামিল মুহাম্মদ মুহাম্মদ আওয়িদাহ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৫; দিওয়ানি আদাব, প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৬।
১ (পেজ ৩০). কামিল মুহাম্মদ মুহাম্মদ আওয়িদাহ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৫; তাহলীলী জায়িযাহ প্রাগু, পৃ. ১৩০।
১ (পেজ ৩১). কামিল মুহাম্মদ মুহাম্মদ আওয়িদাহ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৬; দিওয়ানি আদাব, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৩।
২ (পেজ ৩১). ড. মুজিবুর রহমান, আল্লামা যামাখশারী (ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৪০০হিঃ/১৯৮০) পৃ. ১১; যাহাবী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫২; Lutfi Ibrahim, Ibid. p. 100.
৩ (পেজ ৩১). কামিল মুহাম্মদ মুহাম্মদ আওয়িদাহ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪২; দিওয়ানি আদাব, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৭।

📘 মুতাযিলা আকিদা 📄 ইন্তেকাল

📄 ইন্তেকাল


৫১২ হিজরিতে আল্লামা যামাখশারী কঠিন রোগে আক্রান্ত হন। ফলে তিনি সরকারী চাকুরীর ইচ্ছা পরিহার করেন এবং বাকী জীবন শিক্ষাদান ও সাহিত্য সাধনায় কাটিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং আল্লাহর কাছে প্রতিজ্ঞা করেন, যে আল্লাহ যদি তাঁকে এ রোগ থেকে মুক্তি দান করেন তাহলে তিনি আর কোন বাদশাহী পদ এর আকাঙ্ক্ষা করবেন না এবং আর রাজা বাদশার প্রশংসা গাথা রচনা করবেন না।

অতঃপর আল্লামা যামাখশারী আল্লাহর রহমতে রোগ থেকে মুক্তি পান এবং মুক্তির পর তিনি কিছুদিন বাগদাদে অবস্থান করেন। তিনি বাকী সময়টুকু মক্কায় দু'বছর অবস্থানের পর মাতৃভূমির টানে খাওয়ারিযমের উদ্দেশ্যে রওনা হন। ৫২৬ হিজরীতে তিনি মক্কায় গমন করেন। মক্কায় তিন বছর অবস্থান করার পর পুনরায় তিনি স্বদেশে ফিরে আসেন এবং আমৃত্যু এখানেই অবস্থান করেন।

আল্লামা যামাখশারী মক্কা হতে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের পর ৫৩৮ হিজরীর আরাফাতের রাতে খাওয়ারিযমের জিননুন নদীর তীরবর্তী জুরজানিয়া নামক গ্রামে ইন্তেকাল করেন। জুরজানিয়াতেই তাঁকে দাফন করা হয়।

টিকাঃ
১. কামিল মুহাম্মদ মুহাম্মদ আওয়িদাহ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫; ইবনে খাল্লিকান প্রাগুক্ত, ২য় খণ্ড পৃ. ১০৭
২. কামিল মুহাম্মদ মুহাম্মদ আওয়িদাহ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬; ইবনুল মুনির, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩২।

📘 মুতাযিলা আকিদা 📄 রচনাবলী

📄 রচনাবলী


আল্লামা যামাখশারী তাঁর জীবদ্দশায় জ্ঞান চর্চা ও শিক্ষাদান ছাড়াও অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি তাফসীর, হাদীস, ফিকহ, আরবী সাহিত্য গদ্য ও পদ্য, আরবী ব্যাকরণ, অংলকার শাস্ত্র, কালাম শাস্ত্র ইত্যাদি বিষয়ে অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন। আল্লামা যামাখশারীর মাতৃভাষা ফার্সী হওয়া সত্ত্বেও তিনি আরবী ভাষার পণ্ডিত ছিলেন। ধর্মতত্ত্বের দিক দিয়ে তিনি মু'তাযিলী আকীদার অনুসারী ছিলেন বিধায় তার প্রকাশিত গ্রন্থসমূহে এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। তিনি বেশ উল্লেখযোগ্য কিছু গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর গ্রন্থাবলীর বেশ কিছু প্রকাশিত হলেও অনেক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থাবলীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

১. আল কাশশাফ আন হাকায়িকি গাওয়ামিদিত তানযীল ওয়া উয়ুনুল আকাবীল ফী উযুহিত তাবী : এটি তাফসীর শাস্ত্রের একটি বিখ্যাত গ্রন্থ। তিনি মক্কায় অবস্থানকালীন সময়ে এ গ্রন্থটি রচনা করেছেন এবং এ গ্রন্থে অপূর্ব শব্দ চয়ন, অলংকার পূর্ণ বাক্যের ব্যবহার, শব্দের বিশ্লেষণ, ভাষাগত নৈপুণ্য এবং আরবী সাহিত্যের প্রাঞ্জল ব্যবহারের সমন্বয় ঘটিয়েছেন। এ সম্পর্কে আলোচনা আমরা যথাস্থানে উপস্থাপন করব।

২. আল মুফাসসাল ফীন নাহু : তিনি এ গ্রন্থে চারটি ভাগে যথা: আল আসমা, ওয়াল আফয়াল, ওয়াল হুরুফ, ওয়াল মুশতারাক এর বিস্তারিত ব্যাকরণ সম্পর্কিত আলোচনা করেছেন। আলেমগণ এ গ্রন্থটিকে কাশশাফের সমতুল্য হিসাবে মূল্যায়ন করে থাকেন। আল্লামা যামাখশারী এ গ্রন্থটি ৫১৩ হিজরী থেকে ৫১৫ হিজরী পর্যন্ত দুই বছরের মধ্যে সমাপ্ত করেন। এজন্য অনেক আলিম এর ব্যাখ্যা গ্রন্থ লিখেছেন। যেমন : শরহে ইবনুল বাকা' ইবনুল ইয়ায়ীশ, গ্রন্থটি লিপজেক থেকে ১৮৮২ সালে প্রকাশিত হয়েছে এবং ১৮৫৯ সালে খুরাস্তিয়ানিয়া থেকে এবং ১৮৯১ দিল্লী থেকে ১৩২৩ হিজরীতে কায়রো থেকে এবং ১২৯৮ হিজরীতে ইস্তামবুল থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

৩. আল ফায়িক ফিল গারিবিল হাদীস : আল্লামা যামাখশারী গ্রন্থটিকে হুরুফুল মু'জাম হিসেবে সাজিয়েছেন। তিনি ৫১৬ হিজরীর রবীউল আওয়াল মাসে গ্রন্থটি লেখা সমাপ্ত করেন। গ্রন্থটি ১৩২৪ হিজরীতে ভারতের হায়দারাবাদ থেকে প্রকাশিত হয়েছে এবং উস্তাদ মুহাম্মদ আবুল ফজল ইব্রাহীম ৩ খণ্ডে কায়রো থেকে প্রকাশ করেছেন।

৪. আসাসুল বালাগাহ : এটি আরবী সাহিত্যে একটি মু'জাম গ্রন্থ। ভাষা সাহিত্যের মাজায এবং ইস্তিয়া'রা বিশেষ বর্ণনা করেছেন। কাশফুয যুনুন গ্রন্থকার এ বিষয়ে বলেন : وهو كتاب كـبـير الـحـجـم ، عظيم الفحوي، من أركان فن الأدب بل هو أساسه ، ذكر فيه المجازات اللغوية ، والمزايا الأدبية ، وتعبيرات البلغاء ، على ترتيب كالمغرب -

৫. আল মুস্তাকসা ফিল আমসাল : এটি একটি আরবী উপমা সংক্রান্ত সংকলন। আল্লামা যামাখশারী ৪৯৯ হিজরীর রমজান মাসে গ্রন্থটি প্রণয়ন সম্পন্ন করেন। ভারত থেকে ১৯৬২ সালে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে।

৬. আল মুহাজার ও মুতাম্মিমু আরবাবিল হাযাত ফিল আহাজি ওয়াল আগলুতাতি : এটি একটি আরবী ব্যাকরণ সম্পর্কিত গ্রন্থ। বাগদাদ থেকে ১৯৭৩ সালে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে।

৭. আল কিসতাসু ফিল আরুজি : আল্লামা যুরযানী ৬৫৫ হিজরীতে গ্রন্থটির ব্যাখ্যা গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। ইরাক থেকে ১৯৬৯ সালে আল কিসতাসুল মুস্তাকিম নামে প্রকাশিত হয়েছে।

৮. মুকাদ্দামাতুল আদব : এটি একটি আরবী ফার্সী অভিধান। এটি তার সর্বশেষ গ্রন্থ হিসাবে বিবেচিত হয়। গ্রন্থটি ফার্সী ভাষাভাষী লোকদের আরবী শিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে।

৯. কিতাবুল আমাকিনা ওয়াল জিবাল ওয়াল মিয়াহ : গ্রন্থটি ভূগোল সম্পর্কিত মু'জাম গ্রন্থ। ১৮৫৬ সালে লেইডেন থেকে প্রকাশিত হয়েছে এবং ১৯৩৮ সালে বাগদাদ থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

১০. নাওয়াবিগুল কালিম : এটি আরবী ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কিত একটি গ্রন্থ। যামাখশারী মক্কায় গ্রন্থটি প্রণয়ন করে ১২৮৭ সালে গ্রন্থটি কায়রো থেকে প্রকাশিত হয়েছে এবং বৈরুত থেকে ১৩০৬ হিজরীতে প্রকাশিত হয়েছে এবং এর অনেকগুলো ব্যাখ্যা গ্রন্থ রয়েছে। এছাড়া ১৮৮৬ সালে গ্রন্থটি ফরাসী ভাষায় অনুদিত হয়েছে।

১১. কিতাবুন নাসয়েহ আল কুববার : গ্রন্থটি কায়রো থেকে ১৩১২ হিজরীতে প্রণয়ন হয়েছে। এটিকে মাকামাত গ্রন্থও বলা হয়।

১২. রাবিউল আবরার ও নুসুসুল আখবার : বাগদাদ থেকে ১৯৭৬ সালে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থটি আল্লামা যামাখশারী সফরের মধ্যে লিখেছেন।

১৩. আতওয়াকুয যাহাব ওয়া আননাসায়িহুস সিগার : এটি হচ্ছে ১০০টি মাকালাহ সম্পর্কিত সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ। দামিস্ক এবং বৈরুত থেকে গ্রন্থটি ১২৯৩ হিজরীতে প্রকাশিত হয়েছে এবং কায়রো থেকে ১৩৭০ হিজরীতে প্রকাশিত হয়েছে।

১৪. কিতাবু খাসাইসুল আশারাহ আল কিরামুল বারারাহ : গ্রন্থটি বাগদাদ থেকে ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত হয়েছে।

১৫. রিসালাতুল ফিল কালিমাতিল শাহাদাত : গ্রন্থটি মাসআলাতু ফি কালিমাতু শাহাদাত নামে বাগদাদ থেকে ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হয়েছে।

১৬. আল কাসীদাতুল বা'উদিয়াহ : গ্রন্থটিতে আল্লাহ এবং তার রাসূলের প্রশংসায় লিখা হয়েছে এবং গ্রন্থটির শেষে মশার গুণাগুণ বর্ণনা করা হয়েছে।

১৭. নুযহাতুল মুতাআন্নিস ওয়া নুহযাতুল মুক্বতাবিস।

১৮. আল মুফরাদ ওয়াল মুয়াল্লাফ ফিন নাহু।

১৯. রিসালাতুল ফিল মাজায ওয়াল ইসতি'য়ারাহ।

এছাড়াও তার আরও গ্রন্থাবলি রয়েছে যেগুলো তার জীবনীকারগণ লিপিবদ্ধ করেছেন।

২০. রিসলাতুল তাসাররুফাত।
২১. আল মিনহাজু ফী উসুলিদ্দীন।
২২. দিওয়ানু শি'রু আয যামাখশারী।
২৩. মুখতাসারু আল মুয়াফাকাতু বাইনা আহলিল বাইতি ওয়াস সাহাবা।
২৪. আল কাশফু ফিল ক্বিরাআত।
২৫. আ'জাবুল আযবি ফী সারহে লামইয়াতি আরব। গ্রন্থটি ১৩২৮ হিজরীতে বাগদাদে প্রকাশিত হয়েছে।
২৬. নুকাতিল ই'রাব ফী গারীবিল ই'রাব।
২৭. কাসিদাতুল ফী সুয়ালিল গাযালি আন জুলুসিল্লাহি আলাল আরশি ওয়া কুসুরিল মা'রিফাতি আল বাশারিয়াহ।
২৮. আদ্দুররু আদ্দায়িরুল মুনতাখাবু ফী কিনায়াতি ওয়া ইসতি'য়ারাতি ওয়া তাশবিহাতিল আরব।
২৯. কিতাবু মুতাশাবিহি আসামায়ি রু'য়াত।
৩০. তালিমুল মুকতাদা ওয়া ইর্শাদুল মুকতাদা।
৩১. রুউসু আল মাসায়িল।
৩২. শারহি আবিয়াতু কিতাবি সিবওয়াইহ।
৩৩. কিতাবু রিসালাতুল মুসাওমা।
৩৪. আররায়িদু ফিল ফারায়িয।
৩৫. মু'জামুল হুদুদ।
৩৬. দাল্লাতুন নাসিদ।
৩৭. কিতাবু আকলিলকুল।
৩৮. আল আমালি ফিন নাহু।
৩৯. জাওয়াহিরুল লুগাত।
৪০. কিতাবুল আজনাসি।
৪১. কিতাবুল আসমাই ফিল লুগাত।
৪২. রুহুল মাসায়িল।
৪৩. সারায়িরুল আমসাল।
৪৪. তাসলিয়াতু আদ্দারির।
৪৫. রিসালাতুল আসরার।
৪৬. দিউয়ানু আত তামসিল।
৪৭. শাকায়িকু আন নো'মান ফী মানাকিবিল ইমাম আবু হানিফা।

উল্লিখিত গ্রন্থাবলীতে তাঁর বিভিন্ন বিষয়ে পাণ্ডিত্য, যোগ্যতা ও চিন্তা-চেতনা সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে এবং এগুলো তাঁকে অমর করে রেখেছে। তবে কাশশাফ গ্রন্থই তাকে খ্যাতির শিখরে আরোহন করিয়েছে।

টিকাঃ
১ (পেজ ৩৩). কামিল মুহাম্মদ মুহাম্মদ আওয়িদাহ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭; ইবনুল মুনির, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৩।
২ (পেজ ৩৩). কামিল মুহাম্মদ মুহাম্মদ আওয়িদাহ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭; ইবনুল মুনির, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫; কাশফুশ যুনুন, প্রাগুত, খণ্ড ১, পৃ. ৭৪।
৩ (পেজ ৩৩). কামিল মুহাম্মদ মুহাম্মদ আওয়িদাহ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭; ইবনুল মুনির, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫; কাশফুশ যুনুন, প্রাগুত, খণ্ড ১, পৃ. ৭৮।
৪ (পেজ ৩৩). ইবনুল মুনির, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫। কাশফুশ যুনুন, প্রাগুক্ত, পৃ, ২য় খণ্ড ১৬৭।
৫ (পেজ ৩৩). আল যামাখশারী শায়িরান ও কাতিবান পৃ. ৭৮; মু'জাম আল উদাবা, পৃ. ১৩৩; ইবনুল মুনির, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫। কাশফুশ যুনুন, প্রাগুক্ত, পৃ, ২য় খণ্ড ১৬৭।
১ (পেজ ৩৪). আল যামাখশারী শায়িরান ও কাতিবান পৃ. ৭৮; মু'জাম আল উদাবা, পৃ. ১৩৩; ইবনুল মুনির, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫। কাশফুশ যুনুন, প্রাগুক্ত, পৃ, ২য় খণ্ড ১৬৭।
২ (পেজ ৩৪). আল যামাখশারী শায়িরান ও কাতিবান পৃ. ৭৮; মু'জাম আল উদাবা, পৃ. ১৩৩; ইবনুল মুনির প্রাগু, পৃ. ৩৪।
৩ (পেজ ৩৪). কামিল মুহাম্মদ মুহাম্মদ আওয়িদাহ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫; ইবনে খাল্লিকান প্রাগুক্ত, ২য় খণ্ড পৃ. ১০৭; ইবনুল মুনির প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫।
১ (পেজ ৩৫). আল যামাখশারী শায়িরান ও কাতিবান পৃ. ৭৮; মু'জাম আল উদাবা, পৃ. ১৩৩; ইবনুল মুনির, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫। কাশফুশ যুনুন, প্রাগুক্ত, পৃ, ২য় খণ্ড ১৬৭; ড. মুহাম্মদ বেলাল হোসেন, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৪।
১ (পেজ ৩৭). হেলাল নাজি, আয যামাখশারী হায়াতুহু ওয়া আসারুহু, মাজাল্লিত আলিম আল কুতুব, ৪র্থ সংখ্যা ১৪১১ হিজরী, পৃ. ৫১১-৫১৯; । আল যামাখশারী শায়িরান ও কাতিবান পৃ. ৭৮; মু'জাম আল উদাবা, পৃ. ১৩৩; ইবনুল মুনির, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫। কাশফুশ যুনুন, প্রাগুক্ত, পৃ, ২য় খণ্ড ১৬৭; ড. মুহাম্মদ বেলাল হোসেন, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৪; কামিল মুহাম্মদ মুহাম্মদ আওয়িদাহ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৫-৬৭।

ফন্ট সাইজ
15px
17px