📄 হাসান লি-জাতিহী
দ্বিতীয় প্রকার- হাসান লি-যাতিহী (حسن لذاته)-এর পরিচয়: সংজ্ঞা: যে হাদীছের মাঝে হাদীছ ছহীহ হওয়ার ৪টি শর্ত পূর্ণরূপে পাওয়া যায়, কিন্তু রাবীর স্মরণশক্তিতে কোন ত্রুটি বা দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়, তখন তাকে 'হাসান লি-যাতিহী' বলা হয়।
নোট: হাসান হাদীছের সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ নিয়ে মুহাদ্দিছগণের মাঝে বিস্তর মতদ্বন্দ্ব আছে। আমরা এখানে হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ)-এর সংজ্ঞা ও প্রকারভেদের উপর নির্ভর করেছি।
উদাহরণ-১: আমরা ছহীহ লি-যাতিহীর উদাহরণে মাহমূদ নামটি ব্যবহার করেছিলাম। মনে করি, মাহমূদের প্রদত্ত সেই খবরটি শায়খুল হাদীছের পক্ষ থেকে নাঈম আমাদেরকে দিল। তার মধ্যে সকল গুণ পূর্ণরূপে পাওয়া যায়। অর্থাৎ সে একজন ন্যায়পরায়ণ, তাক্বওয়াশীল ব্যক্তি। শায়খুল হাদীছের ছাত্র। শায়খুল হাদীছের পক্ষ থেকে তার কোন খবর বর্ণনা করা অসম্ভব নয়। অতএব সানাদ মুত্তাছিল তথা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং সংযুক্ত। তার চেয়ে ভাল তার কোন পড়ার সাথী তার এই কথার বিরোধিতা করছে না। অতএব খবরটি শাযও নয়। তার বর্ণিত কথায় কোন ইল্লাতও নেই। কিন্তু সব ঠিক থাকলেও তার স্মৃতিশক্তি হালকা দুর্বল। একটা পড়া যেখানে মাহমূদের একবার দেখলেই মুখস্থ হয়ে যায়, সেখানে নাঈমের অন্ততঃপক্ষে দশবার দেখা লাগে। কিন্তু সে আবার এতই দুর্বল নয় যে দশবার দেখার পর যা মুখস্থ হয়, তা কিছুক্ষণ মনে থাকে, তারপর আবার ভুলে যায়। বরং দশবার দেখার পর যা মুখস্থ হয়ে যায়, তা আর ভুলে না। নাঈমের এই স্মৃতিশক্তির হালকা দুর্বলতার কারণে তার প্রদত্ত খবরকে 'হাসান লি-যাতিহী' বলা হবে।
বাস্তব উদাহরণ-২: রাসূল (ছাঃ) বলেন,
لَوْلا أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِي لأمَرْتُهُمْ بِالسَّوَاكِ عِنْدَ كُلِّ صَلَاةٍ.
অর্থাৎ 'যদি আমি আমার উম্মতের উপর কষ্টকর মনে না করতাম, তাহলে প্রতি ওয়াক্ত ছালাতের সময় মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম'। ২১
অত্র হাদীছটি তিরমিযীর সানাদে বর্ণিত সকল রাবী মযবৃত। একমাত্র মুহাম্মাদ বিন আমর আল-লায়ছীর স্মৃতিশক্তিতে হালকা সমস্যা আছে। সুতরাং হাদীছটি হাসান লি-যাতিহী।
টিকাঃ
২১. সুনানে তিরমিযী হা/২২।
📄 ছহীহ লি-গয়রিহী
তৃতীয় প্রকার- ছহীহ লি-গইরিহী (صحيح لغيره)-এর পরিচয়:
সংজ্ঞা: শাব্দিক অর্থে, যে নিজে নিজে ছহীহ হওয়ার যোগ্যতা রাখে না, বরং অন্যের সাহায্য নিয়ে ছহীহ হয়, তাকে ছহীহ লি-গইরিহী বলা হয়। পারিভাষিক অর্থে, যে হাদীছ রাবীর স্মরণশক্তির হালকা দুর্বলতার কারণে হাসান লি-যাতিহী হাদীছে পরিণত হয়েছে। সেই হাদীছ যখন বিভিন্ন সানাদ থেকে আসে, তখন হাদীছের দুর্বলতা দূরীভূত হয়ে যায় এবং তখন সে হাদীছকে 'ছহীহ লি-গইরিহী' বলা হয়।
উদাহরণ-১: নাঈমের মত হালকা দুর্বল স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছাত্র আমাদেরকে যে খবরটা দিল, সেই খবরটাই তার মত আরো দশটা ছাত্র দিচ্ছে। তাই আমাদের এটা বলার কোন অবকাশ নেই যে, নাঈমতো দুর্বল, তার কথার কোন ভরসা নেই। কেননা তার মত আরো দশজন একই খবর দেয়ার কারণে খবরটি আর দুর্বল নেই। বরং শক্তিশালী হয়ে গেছে। নাঈম হয়তো ভুলে যেতে পারে বা ভুল করতে পারে। তাই বলে কি দশজনই ভুলে যাবে? তারাও ভুল করবে? এটা সম্ভব নয়। সুতরাং এই রকম বিভিন্ন সানাদ থেকে আসা খবরকে ছহীহ লি-গইরিহী বলা হয়।
বাস্তব উদাহরণ-২: হাসান লি-যাতিহী হাদীছের উদাহরণে মিসওয়াকের যে হাদীছ আমরা পেশ করেছিলাম সেই হাদীছটি তিরমিযীর অত্র সানাদ ছাড়াও সুনানে ইবনু মাজাহ২২ সহ বিভিন্ন কিতাবে অনেক সানাদে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং হাদীছটি ছহীহ লি-গইরিহী।
টিকাঃ
২২. সুনানে ইবনে মাজাহ হা/৩০২; সুনানে আবিদাউদ হা/৪৭।
📄 হাসান লি-গয়রিহী
চতুর্থ প্রকার- হাসান লি-গইরিহী (حسن لغيره)-এর পরিচয়:
সংজ্ঞা: শাব্দিক অর্থে, যে নিজে নিজে হাসান হওয়ার যোগ্যতা রাখে না; বরং অন্যের সাহায্য নিয়ে হাসান হয়, তাকে হাসান লি-গইরিহী বলা হয়। পারিভাষিক অর্থে, যখন কোন যঈফ হাদীছ বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হওয়ার কারণে বর্জনের স্তর থেকে গ্রহণের যোগ্যতা লাভ করে, তখন তাকে 'হাসান লি-গইরিহী' হাদীছ বলা হয়।
নোট:
একটি যঈফ হাদীছ দু'টি শর্তে হাসান লি-গইরিহী হয়। যেমন-
(ক) হাদীছটির যঈফ হওয়ার কারণ অবশ্যই যেন রাবীর পাপ বা মিথ্যাচার না হয়। বরং হাদীছটি যেন রাবীর স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা নতুবা সানাদ বিচ্ছিন্ন হওয়া কিংবা রাবী মাসতুর হওয়া- এই জাতীয় ত্রুটির কারণে যঈফ হয়। (খ) যঈফ হাদীছের অন্যান্য সূত্রগুলো যেন তার চেয়ে দুর্বল না হয়। বরং তার সমপর্যায়ের বা তার চেয়ে বেশী শক্তিশালী হয়।
সতর্কতা:
বিভিন্ন সানাদ থেকে আসার কারণে যঈফ হাদীছকে 'হাসান' বলার কাজটি অনেক কঠিন। এক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য দক্ষ মুহাদ্দিছগণের শরণাপন্ন হওয়াই শেষ সমাধান।
উদাহরণ: রাসূল (ছাঃ) বলেন,
إِنَّمَا بُعِثْتُ بِالْحَنِيفِيَّةِ السَّمْحَةِ. অর্থাৎ 'আমি হানীফ তথা স্বচ্ছ, সহনশীল ও একনিষ্ঠ দ্বীন নিয়ে প্রেরিত হয়েছি'।
এই হাদীছে দু'জন যঈফ রাবী আছে। (এক) আলী বিন ইয়াযিদ আলহানী- হাফেয ইবনু হাজার (রহঃ) তাকে 'যঈফ' বলেছেন। (দুই) মুয়ান বিন রিফায়া- হাফেয ইবনু হাজার (রহঃ) তাকে 'লাইয়িনুল হাদীছ' বলেছেন।
এই হাদীছ আরো অন্যান্য সানাদে বর্ণিত হয়েছে। যেমন হাদীছটি আয়েশা (রাঃ)-এর সানাদেও বর্ণিত হয়েছে। ঐ সানাদকে আল্লামা আজলূনী হাসান বলেছেন। ২৩ এছাড়া পবিত্র কুরআনের ঐ সমস্ত আয়াতও এই হাদীছের শাহেদ বা সাক্ষ্য, যেখানে আল্লাহ বলেছেন, ইবরাহীম (আঃ) ছিলেন 'হানীফ'। এই সমস্ত আয়াত ও হাদীছকে সামনে রেখে আলবানী (রহঃ) হাদীছটিকে হাসান লি-গইরিহী বলেছেন। ২৪
টিকাঃ
২৩. কাশফুল খাফা ১/৬১ পৃঃ।
২৪. সিলসিলা ছহীহাহ হা/২৯২৪।