📘 মুছত্বলাহুল হাদীছ > 📄 খবারে আহাদ

📄 খবারে আহাদ


উছুলে হাদীছে বা মুছত্বলাহুল হাদীছের প্রায় সকল আলোচনা ও হুকুম-আহকাম খবারে আহাদের উপর ভিত্তি করে হয়ে থাকে。

'খবারে আহাদ'-এর পরিচয়: যে হাদীছকে এক বা একাধিক রাবী বর্ণনা করে, কিন্তু তা মুতাওয়াতিরের সীমা পর্যন্ত পৌঁছে না, সেই হাদীছকে 'খবারে আহাদ' বলা হয়।

'খবারে আহাদ'-এর হুকুম : খবারে আহাদ যদি ছহীহ হয়, তাহলে তা ইলম বা জ্ঞানের ফায়দা দিবে।
হুকুম-এর ব্যাখ্যা: (ক) যে খবারে আহাদ বুখারী-মুসলিমের হাদীছ এবং তার ছহীহ হওয়ার ব্যাপারে কোন মুহাদ্দিছের দ্বিমত নেই। (খ) যে খবারে আহাদের রাবীগণ ইমাম শাফেঈ, ইমাম মালেক (রহঃ) প্রমুখের মত হাফেযে হাদীছ। (গ) যে খবারে আহাদ মুস্তাফীয বা মাশহুর এবং তার ছহীহ হওয়ার ব্যাপারে কোন মুহাদ্দিছের কোন দ্বিমত নেই।

উপরের তিন প্রকারের খবারে আহাদের হাদীছ দ্বারা অর্জিত জ্ঞান মুতাওয়াতির হাদীছের মত ইলমে ইয়াক্বীন বা নিশ্চিত জ্ঞানের ফায়দা দেয়। তবে মূল মুতাওয়াতির হাদীছের সাথে দ্বন্দ্ব হলে মূল মুতাওয়াতির হাদীছই প্রাধান্য পাবে। যেমন-

(১) যে খবারে আহাদ উপরের তিন প্রকারের মধ্যে পড়ে না, কিন্তু সন্দেহাতীতভাবে এর সানাদ ছহীহ বা হাসান। (২) যে খবারে আহাদের ছহীহ ও যঈফ হওয়া নিয়ে মুহাদ্দিছগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, কিন্তু সঠিক মন্তব্য অনুযায়ী সানাদ ছহীহ।

এই দুই প্রকার খবারে আহাদ শুধু জ্ঞানের ফায়দা দিবে। অর্থাৎ মুতাওয়াতির দিবে নিশ্চিত জ্ঞানের ফায়দা আর এই দুই প্রকার দিবে শুধু জ্ঞানের ফায়দা। এককথায় মুতাওয়াতিরের চেয়ে নিম্নস্তরের জ্ঞানের ফায়দা দিবে।

উল্লেখ্য, খবারে আহাদ নিশ্চিতভাবে যঈফ অথবা যঈফ হওয়া নিয়ে ইখতিলাফ রয়েছে। কিন্তু যদি সঠিক মন্তব্য অনুযায়ী যঈফ হয়, তাহলে তা যন্ বা ধারণার ফায়দা দিবে।

নোট : মুতাকাল্লিমীন বা যুক্তিবিদগণের নিকটে খবারে আহাদ ধারণার ফায়দা দেয়। তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অনেক উছুলবিদগণও একই কথা বলেছেন। তাদের মতে, মুহাদ্দিছগণের নিকটে সকল খবারে আহাদ নিশ্চিত জ্ঞানের ফায়দা দেয়। এই কারণে তারা মুহাদ্দিছগণকে ফক্বীহ মনে করেন না। কিন্তু বাস্তবতা হল, মুহাদ্দিছগণই হাদীছের উপর সবচেয়ে বেশী অভিজ্ঞ। হাদীছ সম্পর্কে তাঁদের বিশ্লেষণ হয় সবচেয়ে সূক্ষ্ণ ও নির্ভরযোগ্য। যুক্তিবিদগণ মুহাদ্দিছগণ সম্পর্কে যে মন্তব্য করে থাকেন, তা অপবাদ বৈ কিছুই নয়। মুহাদ্দিছগণ 'আম' বা ব্যাপকভাবে সকল খবারে আহাদকে নিশ্চিত জ্ঞানের ফায়দা প্রদানকারী বলেননি। তাদের নিকটে খবারে আহাদ হাদীছের হুকুম তার সানাদের উপর নির্ভর করে। ছহীহ খাবারে আহাদ এক রকম ফায়দা দিবে। মুত্তাফাক্ব আলাইহ খবারে আহাদ আরেক রকম ফায়দা দিবে। যঈফ খবারে আহাদ অন্য রকম ফায়দা দিবে। সুতরাং খবারে আহাদ সরাসরি ধারণার ফায়দা দেয়- এই কথা বলার মাধ্যমে যুক্তিবিদগণ নিজেদের নির্বুদ্ধিতারই পরিচয় দিয়েছেন। উল্লেখ্য যে, অনেক উছুলবিদও খবারে আহাদ ظن- বা ধারণার ফায়দা দেয় বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু তাদের এই ظن- বা ধারণা দ্বারা 'ধারণা' উদ্দেশ্য নয়। বরং জ্ঞানই উদ্দেশ্য। কেননা তারা এ বিষয়ে একমত যে, খবারে আহাদের প্রতি আমল করা ওয়াজিব। তাহলে একটা ধারণা প্রসূত বিষয়ের উপর আমল করা কিভাবে ওয়াজিব হতে পারে। অন্যদিকে আরবী ভাষায় 'ظن যন' শব্দটি নিশ্চিত জ্ঞানের ক্ষেত্রেও ব্যবহার হয়ে থাকে। স্বয়ং মহান আল্লাহ 'ظنযন' শব্দটিকে নিশ্চিত জ্ঞানের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেন,

الَّذِينَ يَظُنُّونَ أَنَّهُمْ مُلَاقُو رَبِّهِمْ وَأَنَّهُمْ إِلَيْهِ رَاجِعُونَ.

অর্থাৎ 'যারা নিশ্চিত বিশ্বাস করে যে, তারা একদিন তাদের প্রতিপালকের সাথে মিলিত হবে এবং তারা তারই নিকটে ফিরে যাবে' (বাক্বারাহ ২/৪৬)।

অত্র আয়াতে মহান আল্লাহ নিশ্চিত বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ‘ظنযন’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। সুতরাং বর্তমান হাদীছ অস্বীকারকারীগণ • ظنযন' শব্দের অপব্যবহার করার মাধ্যমে হাদীছ অস্বীকার করার যে চোরাগলি খুঁজেন, তার কারণ মূলত আরবী ভাষার ক্ষেত্রে অদক্ষতা।

হাদীছের উপর মুহাদ্দিছগণ যে হুকুম আরোপ করেন তা নিশ্চিত হওয়ার পরই করেন। সুতরাং কিভাবে এটা সম্ভব যে, একটা বিষয়ে রাসূল (ছাঃ)-এর কথা নিশ্চিত হওয়ার পর মুহাদ্দিছগণ 'ছহীহ' হুকুম লাগাচ্ছেন আর আমি বলছি যে, এটা ধারণার ফায়দা দেয়। রাসূল (ছাঃ)-এর কথা নিশ্চিত হওয়ার পরেও কি করে তা ধারণার ফায়দা দিতে পারে!

তাইতো হানাফী মাযহাবের অনেক বড় আলেম আল্লামা সারাখসী, আবুবকর আল-জাছ্‌ছাছ এবং ঈসা ইবনু আবান (রহঃ) বলেছেন, খবারে আহাদ জ্ঞানের ফায়দা দেয়। কিন্তু তারা নিশ্চিত জ্ঞান ও অন্তরে প্রশান্তিদায়ক জ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তাদের মতে মুতাওয়াতির নিশ্চিত জ্ঞানের ফায়দা দেয়। আর খবারে আহাদ 'ইলমে তুমানীনাহ' বা 'প্রশান্তিদায়ক জ্ঞান'-এর ফায়দা দেয়। ১৪

আর এটা কেনইবা হবে না, যেখানে ইসলামের অনেক গুরুত্বপূর্ণ হুকুম-আহকাম তো খবারে আহাদের উপরই ভিত্তিশীল। যেমন- দাদীর জন্য মৃতের সম্পত্তিতে এক ষষ্ঠাংশ নির্ধারণ করা। শুধু হুকুম-আহকাম নয়, আক্বীদাগত বিষয়ও খবারে আহাদ দ্বারা সকল মাযহাবের আলেমগণ সাব্যস্ত করেছেন। যেমন- কবরের আযাব, মুনকার-নাকীরের প্রশ্ন, পরকালে মহান আল্লাহর দর্শন। এমনও খবারে আহাদ রয়েছে, যার দ্বারা সকল মাযহাবের আলেমগণ কুরআনের আয়াতকে মানসূখ করেছেন। যেমন- কুরআনে মহান আল্লাহ উত্তরাধিকারীদের জন্য অছিয়ত করার কথা বলেছেন (বাক্বারাহ ২/১৮০)। অন্যদিকে উত্তরাধিকারীদের জন্য নির্ধারিত অংশ কুরআনে অবতীর্ণ হলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَعْطَى كُلَّ ذِي حَقٌّ حَقَّهُ أَلَا لَا وَصِيَّةً لِوَارِثِ.

'নিশ্চয় মহান আল্লাহ সকল হক্কদারের হক্ব নির্ধারণ করেছেন। অতএব সাবধান! উত্তরাধিকারীদের জন্য কোন অছিয়ত নেই'। ১৫ রাসূল (ছাঃ)-এর এই খবারে আহাদ হাদীছ দিয়ে সকল মাযহাবের আলেমগণ অছিয়তের আয়াতকে মানসূখ বলেছেন। সুতরাং একথা দিনের আলোর ন্যায় স্পষ্ট যে, খবারে আহাদ ধারণা প্রসূত হতেই পারে না।

একটি সংশয় ও তার জবাব:

অভিযোগকারীদের প্রশ্ন হল, রাবী যতই মযবৃত হোক সে কি ভুল করতে পারে না? একজন সত্যবাদী কি সবসময় সত্য বলে? সে কি মিথ্যা বলতে পারে না? সুতরাং শুধু রাবীদের সত্য-মিথ্যা যাচাই করে কিভাবে হাদীছের সত্য-মিথ্যা যাচাই করা যায়?

জবাব: সত্যি বলতে কি, এই অভিযোগ যারা উত্থাপন করেন, তাদের মূলত ইলমে হাদীছের সাথে গভীর সম্পর্ক নেই। যাদের ইলমে হাদীছের সাথে সম্পর্ক আছে, তারা এই অভিযোগ আনতেই পারেন না। কেননা শত শত হাদীছকে মুহাদ্দিছগণ যঈফ বলেছেন। অথচ সেই হাদীছগুলো বাহ্যিকভাবে ছহীহ, যার রাবী শক্তিশালী ও ন্যায়পরায়ণ এবং সানাদ বিচ্ছিন্নও নয়। তারপরেও মুহাদ্দিছগণ যঈফ বলেছেন। কেন? সেই হাদীছের মধ্যে গোপনত্রুটি রয়েছে তাই। একজন স্বর্ণকার যেমন নিজের অভিজ্ঞতার বদৌলতে স্বর্ণ দেখলেই বলতে পারে নকল না আসল, তেমনি বিজ্ঞ মুহাদ্দিছগণ হাদীছ দেখলেই ধরতে পারেন হাদীছের কোথায় ত্রুটি। আয়নার সামনে যেমন মুখ ধরলে মুখের একটা ছোট্ট দাগও বুঝা যায়, তেমনি ইমাম আহমাদ ও বুখারী (রহঃ) প্রমুখদের সামনে হাদীছ ধরলে তারা হাদীছের ছোট্ট ত্রুটিও টের পেয়ে যান। এই গোপন ত্রুটিকে বলে 'ইল্লাত'। কোন হাদীছে ইল্লাত থাকলে মুহাদ্দিছগণ সেই হাদীছকে ছহীহ বলা থেকে বিরত থাকেন। সুতরাং রাবী মযবৃত হওয়ার পরেও যদি রাবীর পক্ষ থেকে কোন ত্রুটির আশংকা থাকে, তাহলে মুহাদ্দিছগণ অবশ্যই তা ধরতে পারবেন। অতএব মুহাদ্দিছগণ সর্বসম্মতিক্রমে যে হাদীছকে ছহীহ বলে থাকেন, সে হাদীছ রাসূল (ছাঃ)-এর কথা হওয়ার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকা উচিত নয়। যদি থাকে, তাহলে তো হাদীছ শাস্ত্র রক্ষার দুয়ার বন্ধ হয়ে যাবে। তাইতো সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা (রহঃ) বলেন,

مَا سَتَرَ اللهُ أَحَداً يَكْذُب فِي الْحَدِيْثِ.

অর্থাৎ 'হাদীছে মিথ্যারোপ করে এমন কারো গোপনীয়তা মহান আল্লাহ রক্ষা করেন না। অর্থাৎ মুহাদ্দিছগণের নিকট তা ধরা পড়েই'। ১৬

আল্লাহু আকবার! মহান আল্লাহ গোপন রাখবেনইবা কেমন করে? তিনিই তো সেই সত্তা, যিনি রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছ সংরক্ষণের ওয়াদা করেছেন। আল-হামদুলিল্লাহ! মহান আল্লাহ তাঁর এই ওয়াদা মুহাদ্দিছগণের দ্বারা পূরণ করেছেন। তাইতো তারাই এবং যুগের পর যুগ যারা তাদের অনুসরণ করে তারাই এই উম্মাতের মুক্তিপ্রাপ্ত জামা'আত, যাদের সর্ম্পকে রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,

لا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي ظَاهِرِينَ عَلَى الْحَقِّ لَا يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللَّهِ.

'ক্বিয়ামত পর্যন্ত আমার উম্মতের একটি জামা'আত হক্বের উপর টিকে থাকবে। কোন ষড়যন্ত্রকারী তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না'। ১৭ আহ! সেদিন কতই না গর্বের দিন হবে!! যেদিন মুহাদ্দিছগণ রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে থাকবেন। যারা রাসূলকে না দেখেও নিজেদের জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও তাঁর হাদীছকে সংরক্ষণ করেছেন, ক্ষুধার্ত থেকে, জেলে গিয়ে, চাবুকের আঘাত সহ্য করে রাসূল (ছাঃ)-এর মুখ নিঃসৃত বাণীর প্রচার ও প্রসার বন্ধ করেনি, তারা যেদিন সেই না দেখা মহামানবের সাথে দেখা করবেন, সেই দিনটা কতই না আনন্দের দিন হবে! হে আল্লাহ! সেইদিন আমরা যারা মুহাদ্দিছগণকে ভালবাসি, তাদেরকে এবং মুহাদ্দিছগণকে তাঁদের একমাত্র ইমাম মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর সাথে থাকার তাওফীক্ব দান করুন-আমীন! ছুম্মা আমীন!!

খবারে আহাদ তিন প্রকার। যথা: (১) মাশহুর (২) গরীব এবং (৩) আযীয। নিম্নে প্রকারগুলো সম্পর্কে নাতিদীর্ঘ আলোচনা করা হল:

'মাশহুর' (المشهور)-এর পরিচয়:

শাব্দিক অর্থে, যে হাদীছ মানুষের মাঝে প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ, যদিও হাদীছটি জাল হয় তা মাশহুর বা প্রসিদ্ধ হাদীছ। পারিভাষিক অর্থে, যে হাদীছের সানাদের প্রতি স্তরে তিন বা ততোধিক রাবী থাকে, তাকে 'মাশহুর' হাদীছ বলে।

উদাহরণ: 'দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ'। অত্র হাদীছটি খুবই প্রসিদ্ধ। অথচ হাদীছটি জাল ও ভিত্তিহীন। ১৮

মাশহুর হাদীছের গ্রন্থাবলী:

পারিভাষিক অর্থে যে হাদীছগুলো মাশহুর, সেগুলোকে আলাদাভাবে কোন মুহাদ্দিছ জমা করেছেন কি-না তা জানা যায় না, তবে মানুষের মাঝে প্রসিদ্ধ ও প্রচলিত হাদীছকে অনেক মুহাদ্দিছ জমা করেছেন। যেমন:

(ক) আল-মাক্বাছিদুল হাসানা ফীমাশতাহারা আলাল-আলসিনাহ (الْمَقَاصِدُ الْحَسَنَةُ فِيْمَا اسْتَهَرَ عَلَى الْألْسِنَةِ) গ্রন্থটির লেখক আল্লামা সাখাবী (রহঃ)। (খ) কাশফুল খাফা ওয়া মুযীলুল ইলবাস ফীমাশতাহারা মিনাল আহাদীছ (كَشْفُ الْخَفَا وَمُزِيْلُ الْإِلْبَاسِ فِيمَا اشْتَهَرَ مِنَ الْأَحَادِيثِ عَلَى أَلْسِنَةِ النَّاسِ) - আল্লামা আজলুনী (রহঃ) উক্ত গ্রন্থটি রচনা করেছেন।

'আযীয' (العزيز)-এর পরিচয়: শাব্দিক অর্থ শক্ত হওয়া, দুর্লভ হওয়া। পারিভাষিক অর্থে, যে হাদীছের বর্ণনাকারীর সংখ্যা কোন যুগে দুইজনের কম ছিল না, তাকে 'আযীয' হাদীছ বলা হয়। দুইজন রাবী থেকে আসার কারণে হাদীছটি শক্তি লাভ করে, তাই তাকে আযীয বলা হয়। দুর্লভ হওয়ার কারণেও তাকে আযীয বলা হয়।

নোট: (ক) মু'তাযিলা মতবাদের অন্যতম গুরু আবু আলী আল-জুব্বায়ীর মতে, হাদীছ ছহীহ হওয়ার জন্য আযীয হওয়া শর্ত। তথা প্রতি স্তরে নিম্ন পক্ষে দুইজন রাবী থাকা যরূরী। এই মূলনীতির মাধ্যমেই খবারে আহাদকে অস্বীকার করার যাত্রা শুরু হয়। এটি একটি ভ্রান্ত মূলনীতি। হাদীছ ছহীহ হওয়ার জন্য সংখ্যা কোন মানদণ্ড নয়; রাবীদের ন্যায়পরায়ণতাই হল মূল মানদণ্ড।

(খ) ইবনু হিব্বান (রহঃ) মু'তাযিলাদের প্রতিবাদে মন্তব্য করেন, 'হাদীছের ভাণ্ডারে আযীয হাদীছের কোন অস্তিত্বই নেই'। হাফেয ইবনু হাজার (রহঃ) তার এই কথাকে খণ্ডন করে আযীয হাদীছের উদাহরণ পেশ করেছেন। উদাহরণ: আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,

فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ. অর্থাৎ 'সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে। ততক্ষণ পর্যন্ত কোন ব্যক্তি মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকটে তার পিতা-মাতা ও সন্তানের চেয়ে ভালবাসার পাত্র হই'। ১৯

আযীয হাদীছের গ্রন্থাবলী: আযীয হাদীছকে জমা করে আলাদাভাবে কোন কিতাব মুহাদ্দিছগণের পক্ষ থেকে পাওয়া যায় না। এটা মূলত আযীয হাদীছের দুষ্প্রাপ্যতার কারণে।

'গরীব' (الغريب)-এর পরিচয়: শাব্দিক অর্থ অপরিচিত। পারিভাষিক অর্থে, যে হাদীছের সানাদে কোন এক স্তরের রাবী মাত্র একজন সেই হাদীছকে গরীব বলা হয়।

'গরীব' হাদীছের ব্যাখ্যা: গরীব হওয়ার জন্য হাদীছের সকল স্তরে একজন রাবী হওয়া শর্ত নয়। বরং সকল স্তরে যদি বহু সংখ্যক রাবী হয় কিন্তু কোন এক স্তরে একজন রাবী হয়, তাহলেই তা গরীব বলে গণ্য হবে। আযীয হাদীছের ক্ষেত্রেও অনুরূপ। কোন এক স্তরে দুইজন রাবী থাকলেই তা আযীয বলে গণ্য হবে, যদিও অন্য স্তরে শত রাবী থাকে।

কাল্পনিক উদাহরণ: মনে কর! আমাকে আব্দুর রহমান এবং ফরীদ নামের দুইজন এসে বলল, 'আপনি কি জানেন আজ না কাশিমপুর গ্রামের মাহমূদ মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে'? আমি বললাম, 'তোমরা কিভাবে জানলে'? তারা বলল, 'আমাদেরকে আল-আমীন বলেছে। তাকে না-কি মাহমূদের দুই বন্ধু যুবায়ের ও আকরাম বলেছে'।

এই ঘটনাটার সকল স্তরে দুইজন করে রাবী রয়েছে। শুরুর স্তরে আব্দুর রহমান ও ফরীদ। শেষ স্তরে যুবায়ের ও আকরাম। কিন্তু মাঝখানে শুধু আল-আমীন। এখন এই ঘটনার উপর আমরা কি হুকুম লাগাব? অবশ্যই গরীব। কেননা সকল স্তর আমাদের লক্ষ্য নয়। কোন এক স্তরে একজন রাবী হলেই তা গরীব বলে বিবেচিত হবে। তেমনি এই উদাহরণের সকল স্তরে যদি রাবীর সংখ্যা দুই-এর বেশী হয় কিন্তু কোন এক স্তরে গিয়ে শুধু দুই জন রাবী হয়, তাহলে তা আযীয বলে বিবেচিত হবে।

বাস্তব উদাহরণ: ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,

إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ.

অর্থাৎ 'নিশ্চয় প্রতিটি আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল'। ২০ অত্র হাদীছটি ওমর (রাঃ) থেকে শুধুমাত্র আলকামা বিন ওয়াক্কাস আল-লায়ছী বর্ণনা করেছেন। অতএব হাদীছটি গরীব।

যেসব গ্রন্থে গরীব হাদীছ বেশী পাওয়া যায়: )১) মুসনাদে বাযযার (مسند البزار)- ইমাম আহমাদ ইবনু আমর আল-বাযযার। )২) আল-মু'জামুল আওসাত্ব (المعجم الأوسط)-ইমাম সুলায়মান ইবনু আহমাদ আত-ত্বাবারাণী। )৩) গরায়েবে মালিক (غرائب مالك) - ইমাম দারাকুতনী।

নোট: কোন হাদীছ মাশহুর বা আযীয হলেই যে সে হাদীছ গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে, তা নয়। বরং য়ার উপর। তবে হ্যাঁ, মাশহুর ন্য পাবে।

টিকাঃ
১৪. উছুলুস সারাখসী (বৈরূত: দারুল কুতুবুল ইলমিইয়্যাহ, ১৯৯৩ খ্রীঃ) ১/২৯২ পৃঃ; উছুলুল বাযযাবী ১/১৫৮ পৃঃ।
১৫. ইবনু মাজাহ হা/২৭১৪; শায়খ আলবানী, ইরওয়াউল গালীল হা/১৬৩৫, সনদ ছহীহ।
১৬. মুহাম্মাদ খালাফ সালামা, লিসানুল মুহাদ্দিছীন ৩/১৪২ পৃঃ; জালালুদ্দীন আব্দুর রহমান ইবনু আবুবকর আস-সুয়ূত্বী (৮৪৯-৯১১ হিঃ), তাহযীরুল খাওয়াছ মিন আকা-যীবিল ক্বাছাছ (বৈরূত: মাকতাবাতুল ইসলামী, ১৩৯৪-১৯৭৪), পৃঃ ১৩১।
১৭. ছহীহ মুসলিম হা/৫০১৯।
১৮. الْوَطَنِ مِنَ الْإِيْمَانِ -ইমাম নাছিরুদ্দীন আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদিসিয যঈফাহ (রিয়ায দারিল মা'আরিফ, ১৯৯২ ইং( হা/৩৬।
১৯. ছহীহ বুখারী হা/১৪।
২০. ছহীহ বুখারী হা/১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00