📘 মুছত্বলাহুল হাদীছ > 📄 ৭ম শতাব্দী হিজরী থেকে বর্তমান যুগ

📄 ৭ম শতাব্দী হিজরী থেকে বর্তমান যুগ


এই যুগকে আমরা মুকাদ্দিমা ইবনুছ ছালাহ-এর পরবর্তী যুগ বলতে পারি। নিম্নে এই সময়ের মধ্যে লিখিত কিছু বিখ্যাত ও উপকারী বইয়ের নাম-পরিচয় পেশ করা হল:

(১) আল-ইকুতিরাহ লি বায়ানিল ইছত্বিলাহ (الإقتراح لبيان الإصطلاح) - বিখ্যাত ইমাম ইবনু দাক্বীকুল ঈদ (মৃঃ ৭০২ হিঃ) (রহঃ) গ্রন্থটির প্রণয়নকারী।
(২) আল-মুক্তিযাতু ফী ইলমি মুছত্বলাহিল হাদীছ (الموقظة في علم مصطلح الحديث) - হাফেয ইমাম যাহাবী (মৃঃ৭৪৮ হিঃ) উক্ত গ্রন্থের রচয়িতা।
(৩) তাওযীহুল আফকার লি মা'আনি তানক্বীহুল আনযার (توضيح الأفكار لمعاني تنقيح الأنظار) - উক্ত গ্রন্থটি রচনা করেছেন প্রখ্যাত ইমাম ছান'আনী (মৃঃ ৮৪০ হিঃ)।
(৪) নুখবাতুল ফিকার (نخبة الفكر) - হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) গ্রন্থটি প্রণয়ন করেছেন।
(৫) আত-তাযকিরাতু ফী উলুমিল হাদীছ (التذكرة في علوم الحديث) - শায়খ ইবনুল মুলাক্কিন হলেন উক্ত গ্রন্থের রচয়িতা।
(৬) আল-মানযূমা আল-বায়কুনিয়‍্যাহ (المنظومة البيقونية) - ওমর ইবনু মুহাম্মাদ আল-বাইকুনী।
(৭) কুওয়াঈদুত তাহদীছ (قواعد التحديث) - জামালুদ্দীন আল-ক্বাসেমী।
(৮) তাওযীহুন নাযর ইলা উচ্ছ্বলিল আছার (توضيح النظر إلى أصول الأثر) - তাহির আল-জাযায়িরী।
(৯) যফারুল আমানী (ظفر الأماني) - আব্দুল হাই লাক্ষ্মৌভী, তাহক্বীক্ব- আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ।
(১০) কুওয়া'ইদ ফী উলুমিল হাদীছ (قواعد في علوم الحديث) - জাফর আহমাদ থানভী।
(১১) ইছলাহুল ইছত্বিলাহ (إصلاح الإصطلاح) - শায়খ তারেক ইবনু আওযুল্লাহ। সম্মানিত লেখকের লিখিত উছুলে হাদীছ বিষয়ক আরো দু'টি চমৎকার কিতাব রয়েছে। তাহল- ক. তাক্বরীব খ. মাদখাল।
(১২) তাইসীরু মুছত্বলাহিল হাদীছ (تيسير مصطلح الحديث) - ড. মাহমূদ আত-ত্বাহহান।
(১৩) তাহরীরু উলুমিল হাদীছ (تحرير علوم الحديث) - আল্লামা জুদাঈ।
(১৪) আল-ওয়াসীত্ব ফী উলুমিল হাদীছ (الوسيط في علوم الحديث) - শায়খ আবু শাহবা।

নিম্নে উপরোল্লেখিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ৬টি গ্রন্থের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি পেশ করা হল:
(এক) নুখবাতুল ফিকার (نخبة الفكر) :

৭ম শতাব্দী হিজরীতে জন্ম নেয়া হাদীছ শাস্ত্রের মহান ইমাম হাফিযুল হাদীছ ও হাফিযুদ দুনিয়া হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ)-এর মাত্র দুই-তিন পৃষ্ঠার বই এটি। মাত্র দুই-তিন পৃষ্ঠার মধ্যে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পুরো উছুলে হাদীছকে সন্নিবেশিত করেছেন। তাঁর জীবদ্দশাতেই কয়েকজন আলেম তাঁর এ বইটির ব্যাখ্যা লিখেন। তন্মধ্যে কামালুদ্দীন আশ-শুমুন্নী (রহঃ)-এর লেখা 'নাতীজাতুন নাযা'র এখনো পাওয়া যায়। এটাকেই 'নুখবাতুল ফিকারে'র প্রথম লিখিত ব্যাখ্যা হিসাবে ধরা হয়। হাফেয (রহঃ) যখন দেখলেন, মানুষ তাঁর জীবদ্দশাতেই তাঁর বইয়ের ব্যাখ্যা লিখছেন, তখন তিনি ভাবলেন, বাড়ীর মালিকই ভাল জানে তার বাড়ীতে কি আছে। সুতরাং তাঁর বইয়ের ব্যাখ্যা তাঁর চেয়ে ভাল কেউ বুঝতে পারবে না। তাই তিনি ছাত্রদের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেই নিজের লিখিত বইয়ের ব্যাখ্যা লিখলেন। নাম দিলেন 'নুযহাতুন নাযার'। তাঁর এই 'নুযহাতুন নাযার' গ্রন্থটি বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ের উছুলে হাদীছের বই হিসাবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে পড়ানো হয়। সত্যিকার হাদীছের ছাত্রগণ পুরো বইকে মুখস্থ করে থাকেন। উল্লেখ্য যে, পরবর্তীতে হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ)-এর উক্ত বই ও তাঁর ব্যাখ্যার উপর অনেক কাজ হয়েছে। যেমন মোল্লা আলী ক্বারী হানাফী (রহঃ) 'নুখবাতুল ফিকারে'র ব্যাখ্যা লিখেছেন। অনেকেই টীকা লিখেছেন। অনেকেই কবিতা আকারে সাজিয়েছেন। উল্লেখ্য যে, হাফেয (রহঃ)-এর মূল গ্রন্থটি ও তার ব্যাখ্যা উভয়রই বাংলা ভাষায় অনুবাদ হয়েছে।

(দুই) আল-মানযূমা আল-বায়কুনিয়‍্যাহ (الْمَنْظُوْمَةُ الْبَيْقُوْنِيَّةُ) :

ইমাম বায়কুনীর কবিতা আকারে লিখিত মুছত্বলাহুল হাদীছের এই বইটি আরব ছাত্রদের নিকটে খুব প্রিয়। তারা তাদের উছুলে হাদীছের উপর শিক্ষা এই কবিতা মুখস্থ করার মাধ্যমেই শুরু করে থাকে। এই বইটিও মুহাদ্দিছগণের মাঝে এতটা প্রসিদ্ধ পায় যে, বহু আলেম-ওলামা এর ব্যাখ্যা লিখেছেন। তন্মধ্যে শায়খ ছালেহ আল-উছায়মীন ও ইমাম যারক্বানীর লেখা ব্যাখ্যা অন্যতম। অত্র কবিতার ব্যাখ্যার অনুবাদ বাংলা ভাষাতেও হয়েছে। শায়খ ছানাউল্লাহ নাযীর আহমাদের অনুবাদে ও শায়খ যাকারিয়ার সম্পাদনায় বইটি 'ইসলাম হাউজ' ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়।

(তিন) কুওয়া'ইদ ফী উলুমিল হাদীছ (قَوَاعِدُ فِي عُلُوْمِ الْحَدِيثِ) :

মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহঃ)-এর দিক-নির্দেশনায় জা'ফর আহমাদ থানভী অত্র বইটি লেখেন। বইটি মূলত থানভী প্রণীত বিখ্যাত বই 'ঈলাউছ সুনানে'র ভূমিকা। উছুলে হাদীছের বই হিসাবে বইটিকে চমৎকারই বলা চলে, কিন্তু বইটিতে নির্দিষ্ট মাযহাবপ্রীতির কারণে জমহুর মুহাদ্দিছগণের অনেক উচ্ছ্বল প্রাধান্য পায়নি। সেজন্য শায়খ যুবাইর আলী যাঈ বইটি সম্পর্কে বলেন, 'বইটি মূলত ক্বাওয়াঈদুদ দেওবান্দিয়ীন ফী উলূমিল হাদীছ'। অর্থাৎ দেওবান্দীগণের মতানুযায়ী উছুলে হাদীছ। পাকিস্তানের শায়খ বদীউদ্দীন শাহ রাশেদী অত্র বইয়ে উল্লেখিত ত্রুটিযুক্ত মূলনীতিগুলোর পর্যালোচনা করে একটি চমৎকার বই লিখেছেন। নাম দিয়েছেন 'নাকয ক্বাওয়াঈদি উলুমিল হাদীছ'। এছাড়া মাওলানা থানভীর লিখিত ঈলাউছু সুনানে তিনি যে সমস্ত ত্রুটিযুক্ত মূলনীতির আলোকে হাদীছের বিশ্লেষণ পেশ করেছেন, তার উপরেও পাকিস্তানের শায়খ ইরশাদুল হক্ব আছারী প্রণীত 'ঈলাউছু সুনান ফিল মীযান' নামে একটি উপকারী ও খুব প্রয়োজনীয় বই রয়েছে।

(চার) কুওয়া'ইদুত তাহদীছ ও তাওজীহুন নাযর (قَوَاعِدُ التَّحْدِيْثِ وِتَوْجِيهُ النظر) :

উছুলে হাদীছের উপর লেখা এখন পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ বই বলা চলে উপরের বই দু'টিকে। প্রথমটির লেখক সিরিয়ার জামালুদ্দীন ক্বাসেমী এবং দ্বিতীয়টির লেখক শায়খ তাহের আল-জাযায়িরী। 'তাওযীহুন নাযারে' শায়খ জাযায়েরী পুরো উছুলে হাদীছ শাস্ত্রকে জমা করেছেন। প্রতিটি মাসআলার উপর বিস্তর বাহাছ করেছেন। নিজস্ব তাহক্বীক্বও পেশ করেছেন। এই বইটি থেকে শুধুমাত্র মুহাদ্দিছগণ উপকার লাভ করতে পারেন। অন্যদিকে জামালুদ্দীন ক্বাসেমী তাঁর 'ক্বাওয়াঈদত তাহদীছে' সকল মাসআলাকে জমা করেছেন, কিন্তু চমৎকারভাবে সংক্ষিপ্ত করেছেন। সুন্দরভাবে অধ্যায় বিন্যাস করেছেন। ছাত্রদের জন্য বইটি অনেক উপকারী।

(পাঁচ) তাইসীরু মুছত্বলাহিল হাদীছ (تَيْسِيرُ مُصْطَلَحِ الْحَدِيثِ) :

এটি প্রাথমিক পর্যায়ের ছাত্রদের জন্য অত্যন্ত সহজ-সরল ও সাবলীল আরবী ভাষায় লিখিত চমৎকার একটি বই।

বইয়ের লেখক বইটিকে প্রশ্নোত্তর আকারে সাজিয়ে ছাত্রদের জন্য আরো সহজ করে দিয়েছেন। ফলে এটিকে হাদীছ শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে চমৎকার বই বলা চলে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00