📘 মুছত্বলাহুল হাদীছ > 📄 উছূলে হাদীছের ইতিহাস ও এ সম্পর্কিত কিছু বইয়ের পরিচয়

📄 উছূলে হাদীছের ইতিহাস ও এ সম্পর্কিত কিছু বইয়ের পরিচয়


হাদীছ সংশ্লিষ্ট ইলমসমূহ:

১- তাদবীনুস সুন্নাহ বা হাদীছ সংকলন (تَدْوِينُ السَّنَّةِ): হাদীছ কিভাবে আমাদের নিকট পৌঁছল, এত হাদীছ কারা, কিভাবে ও কোন্ সময়ে জমা করেছেন ইত্যাদি বিষয়ক ইলমকে 'ইলমু তাদবীনিস সুন্নাহ' বা হাদীছ সংকলনের জ্ঞান বলে।
২- হাদীছের প্রামাণিকতা (حَجَيَّةُ السُّنَّةِ): রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছ আমরা কেন মানব, এর দলীল কি, যারা হাদীছকে ইসলামী শরী'আতের দ্বিতীয় উৎস মানতে চায় না, তাদের দলীল এবং সেগুলোর জবাব কি ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর যেই বিষয়ের আলোচনাতে পাওয়া যায়, তাকে 'হুজিয়াতুস সুন্নাহ' বা হাদীছের প্রামাণিকতা সংক্রান্ত ইলম বলে।
৩- ইলমু মুছত্বলাহিল হাদীছ (عِلْمُ الْمُصْطَلَحِ): যে শাস্ত্রের মাধ্যমে হাদীছের 'সানাদ' ও 'মাতন' বিশ্লেষণ করতঃ তা গ্রহণীয় হওয়া বা না হওয়া বিষয়ক জ্ঞান লাভ করা যায়, তাকে ইলমু মুছত্বলাহিল হাদীছ বলে। আমাদের অত্র বইটি এই বিষয়ক ইলমের প্রাথমিক পর্যায়ের বই।
৪- ইলমুল জারহ ওয়াত-তাদীল (عِلْمُ الْجَرْحَ وَالتَّعْدِيلِ): হাদীছের রাবী বিষয়ে মুহাদ্দিছগণের বিভিন্ন মন্তব্যের ধরণ ও প্রকৃতি বিশ্লেষণ, মুহাদ্দিছগণের ব্যবহৃত শব্দের অর্থ ও স্তর নির্ণয় এবং সেই অনুযায়ী হুকুম আরোপের পদ্ধতি ইত্যাদি 'ইলমুল জারহ ওয়াত-তা'দীলে'র মূল আলোচ্য বিষয়।
৫. ইলমুর রিজাল (عِلْمُ الرّجال): হাদীছের রাবীদের জীবনী, তাদের জন্ম-মৃত্যু, তাদের শিক্ষক ও ছাত্রের পরিচয়, তাদের স্তর ইত্যাদি আলোচনা করা ইলমুর রিজালের মূল আলোচ্য বিষয়।
৬. ইলমু ফিকুহিল হাদীছ (عِلْمُ فِقْهِ الْحَدِيثِ): সালাফে-ছালেহীনের বুঝ অনুযায়ী হাদীছের অর্থ বিশ্লেষণ, হাদীছ থেকে বিভিন্ন আদাব, হুকুম-আহকাম ও হিকমাত নির্গত করা বিষয়ক জ্ঞানকে 'ইলমু ফিকহিল হাদীছ' বলে।
تاريخ أصول الحديث وتعارف بعض الكتب (المتعلقة بهذا الفن الجليل)

হাদীছ সংশ্লিষ্ট ইলমসমূহের অন্যতম হচ্ছে উছুলে হাদীছ বা মুছত্বলাহুল হাদীছ। এক্ষণে আমরা এই শাস্ত্রের ইতিহাস নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।

ইলমু মুছত্বলাহিল হাদীছ-এর পরিচয়:

যে শাস্ত্রের মাধ্যমে হাদীছের 'সানাদ' ও 'মাতন' বিশ্লেষণ করতঃ তা গ্রহণীয় হওয়া বা না হওয়া বিষয়ক জ্ঞান লাভ করা যায়, তাকে 'ইলমু মুছত্বলাহিল হাদীছ' বলে।

বিষয়বস্তু: হাদীছের সানাদ ও মাতন।

ফলাফল: এই বিষয়ে জ্ঞান হাছিল করার পর হাদীছের ভাণ্ডার থেকে ছহীহ-যঈফ পৃথক করতে পারা যায়।

উছুলে হাদীছের ইতিহাস:

উছুলে হাদীছের ইতিহাসকে আমরা তিনভাগে ভাগ করতে পারি। (ক) উৎপত্তি (খ) ক্রমবিকাশ ও (গ) স্বতন্ত্র শাস্ত্র। নিম্নে ধারাবাহিকভাবে নাতিদীর্ঘ আলোচনা উপস্থাপন করা হল:

ক. উছুলে হাদীছের উৎপত্তি: উছুলে হাদীছের মূল ভিত্তি মূলত কুরআনের একটি আয়াত ও রাসূল (ছাঃ)-এর একটি হাদীছ। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا. 'হে ঈমানদারগণ! যদি তোমাদের নিকট কোন ফাসেক ব্যক্তি সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা যাচাই-বাছাই করার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে নাও' (হুজুরাত ৪৯/৬)। প্রখ্যাত ছাহাবী মুগীরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী করীম (ছাঃ)- কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন,

إِنَّ كَذِبًا عَلَى لَيْسَ كَكَذِبٍ عَلَى أَحَدٍ مَنْ كَذَبَ عَلَى مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأُ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ. 'আমার উপর মিথ্যারোপ করা অন্যের উপর মিথ্যারোপ করার মত নয়। যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার প্রতি মিথ্যারোপ করল তার থাকার জায়গা জাহান্নাম'। ২ অত্র আয়াত এবং হাদীছই ইলমে হাদীছের মূলভিত্তি। তারপর ছাহাবীগণ (রাঃ)-এর যুগে এই ইলম কিছুটা হলেও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। বিশেষ করে আলী (রাঃ)-এর খিলাফতকালে যখন শী'আ ও খারেজী নামের দু'টি ভ্রান্ত ফিরকার আবির্ভাব হয়, তখন ছাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) হাদীছ বর্ণনাকারী সম্পর্কে যাচাই-বাছাই শুরু করেন। যেমন আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন,

إِنَّا كُنَّا مَرَّةً إِذَا سَمِعْنَا رَجُلًا يَقُولُ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ابْتَدَرَتْهُ أَبْصَارُنَا وَأَصْغَيْنَا إِلَيْهِ بِآذَانِنَا فَلَمَّا رَكِبَ النَّاسُ الصَّعْبَةَ والذُّلُولَ لَمْ نَأْخُذْ مِنَ النَّاسِ إِلَّا مَا نَعْرِفُ. 'যখনই আমরা কোন ব্যক্তিকে দেখতাম যে, সে বলছে, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, তখন আমরা চোখ-কান খাড়া করে তার কথা শুনতাম। কিন্তু যখন মানুষ ভাল-মন্দ মিশ্রিত করে বলতে লাগল, তখন আমরা আমাদের জ্ঞাত বিষয় ছাড়া গ্রহণ করতাম না'। মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন (৩৩-১১০ হিঃ) বলেন,

لَمْ يَكُونُوا يَسْأَلُونَ عَنِ الإِسْنَادِ فَلَمَّا وَقَعَتِ الْفِتْنَةُ قَالُوا سَمُّوا لَنا رِجَالَكُمْ فَيُنظَرُ إِلَى أَهْلِ السُّنَّةِ فَيُؤْخَذُ حَدِيثُهُمْ وَيُنظَرُ إِلَى أَهْلِ الْبِدَعِ فَلَا يُؤْخَذُ حَدِيثُهُمْ. 'জনগণ হাদীছের সানাদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করত না। কিন্তু যখন ফিৎনা সৃষ্টি হল তখন তারা বলতে লাগল, তোমরা হাদীছের বর্ণনাকারীদের পরিচয় বল। যদি লক্ষ্য করা যেত যে, তারা আহলেসুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত, তাহলে তাদের হাদীছ গ্রহণ করা হত। কিন্তু বিদ'আতীদের অন্তর্ভুক্ত হলে তাদের হাদীছ গ্রহণ করা হত না'।৪

খ. উছুলে হাদীছের ক্রমবিকাশ: রাসূল (ছাঃ) ও ছাহাবী (রাঃ)-এর যুগে ভিত্তি পাওয়া উছুলে হাদীছ পরবর্তীতে তাবেঈদের যুগে সাঈদ ইবনু মুসাইয়্যিব, হাসান বাছরী, আমীর শা'বী রহিমাহুমুল্লাহগণের হাত ধরে এবং তাবে' তাবেঈগণের যুগে সুফিয়ান ছাওরী, ইমাম মালেক, ইমাম আওযাঈ ও আব্দুল্লাহ ইবনু মুবারক প্রমুখ রহিমাহুমুল্লাহগণের সান্নিধ্য পেয়ে তার অগ্রযাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে। উছুলে হাদীছকে অলিখিত অবস্থা থেকে সর্বপ্রথম কলমের কালিতে বন্দি করেন ইমাম শাফেঈ (রহঃ) (মৃত ২০৪ হিঃ)। অত্র যুগে আরো অনেক মুহাদ্দিছ উছুলে হাদীছের বিভিন্ন মাসআলার উপর তাদের বিভিন্ন বইয়ে আলোচনা করেছেন। তবে সেগুলো কোনটিই উছুলে হাদীছের উপর পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ ছিল না। যেমন:

(১) কিতাবুল উম্ম ও কিতাবুর রিছালা: ইমাম শাফেঈ (রহঃ) তাঁর এই গ্রন্থদ্বয়ে উছুলে হাদীছ ও উছুলে ফিক্বহের বিভিন্ন মাসআলার উপর আলোচনা করেছেন।
(২) মুকাদ্দিমা ছহীহ মুসলিম: ইমাম মুসলিম (রহঃ)-এর ছহীহ মুসলিমের ভূমিকা। অত্র ভূমিকাতে তিনি উছুলে হাদীছের বিভিন্ন মাসআলার উপর জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করেছেন।
(৩) আল-ইলালুছ ছাগীর: ইমাম তিরমিযী (রহঃ) তাঁর সুনানে তিরমিযীর শেষে এই ছোট্ট লেখাটি যোগ করেছেন। অত্র প্রবন্ধে উছুলে হাদীছের বিভিন্ন মূলনীতির উপর ইলমী আলোচনা করেছেন।
(৪) রিছালা: ইমাম আবুদাউদের একটি চিঠি, যা তিনি মক্কাবাসীর নিকট প্রেরণ করেছিলেন। তাঁর সংকলিত সুনানে আবীদাউদের সংকলন পদ্ধতি, হাদীছের ধরণ ইত্যাদি বিষয়ের উপর অত্র চিঠিতে তিনি আলোচনা করেছেন।

গ. স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসাবে মুছত্বলাহুল হাদীছ: হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ)-এর মতে উছুলে হাদীছের উপর সর্বপ্রথম লিখিত আলাদা গ্রন্থ হচ্ছে 'আল-মুহাদ্দিছুল ফাছিল বাইনার রাবী ওয়াল ওয়াঈ', যা আল-হাসান ইবনু আব্দুর রহমান আল-খাল্লাদ আর-রামাহুরমুখী (মৃত ৩৬০ হিঃ) কর্তৃক প্রণীত।

গ্রন্থটির বৈশিষ্ট্যাবলী:
ক. অত্র গ্রন্থে তিনি রাবীগণের হাদীছ বর্ণনার বৈশিষ্ট্য, হাদীছ শ্রবণের যোগ্যতা, গুণ ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
খ. বিখ্যাত মুহাদ্দিছগণের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্যকে সানাদসহ সংকলন করেছেন।
গ. বইটি অধ্যায় ভিত্তিক সাজিয়েছেন।
ঘ. বইটি উছুলে হাদীছের উপর লিখিত প্রথম পৃথক গ্রন্থ, যদিও উছুলে হাদীছের সকল মাসআলা তাতে স্থান পায়নি।
এরপর ধীরে ধীরে উছুলে হাদীছের উপর আরো স্বতন্ত্র গ্রন্থ লিপিবদ্ধ হতে থাকে। তবে আমরা পৃথক ও স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসাবে আত্মপ্রকাশের যুগকে দুইভাগে ভাগ করতে পারি। (১) মুকাদ্দিমা ইবনুছ ছালাহের পূর্ববর্তী যুগ (২) মুকাদ্দিমা ইবনুছ ছালাহের পরবর্তী যুগ। যেমন-

ইবনুছ ছালাহ (রহঃ)-এর পূর্ববর্তী যুগে লিখিত অন্যতম গ্রন্থগুলো হচ্ছে:
)ক) মা'রেফাতু উলুমিল হাদীছ (مَعْرِفَةُ عُلُوْمِ الْحَدِيثِ) - ইমাম হাকেম (মৃত ৪০৫ হিঃ)
)খ) জুযউন ফী উলুমিল হাদীছ (جُزْءٌ فِي عُلُوْمِ الْحَدِيثِ)- আবু আমর আদ-দানী (মৃত ৪৪৪ হিঃ)
)গ) আল-কিফায়া ফী মা'রেফাতি উছুলি ইলমির রিওয়ায়াহ (الْكِفَايَةُ فِي مَعْرِفَةِ أُصُوْلِ عِلْمِ الرَّوَايَةِ) - খতীব বাগদাদী (মৃত ৪৬৩ হিঃ)
(ঘ) আল-ইলমা' ইলা মা'রেফাতি উচ্ছ্বলির রিওয়ায়াতি ওয়া তাক্বয়ীদিস সামাঈ )الإلماع إلى مَعْرِفَةِ أُصُولِ الرّوَايَةِ (وَتَقْيِيْدِ السَّمَاعِ কাযী ইয়ায (মৃত ৫৪৪ হিঃ)।
(ঙ) মা লা ইয়াসাউল মুহাদ্দিছ জাহলুহু )مَا لَا يَسَعُ الْمُحَدِّثَ جَهْلُهُ( - আবু হাফছ আল-মাইয়ানজি (মৃত ৫৮০ হিঃ)

উল্লেখ্য, উপরিউক্ত পাঁচটি গ্রন্থের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে নিম্নে তিনটি গ্রন্থের বৈশিষ্ট্যাবলী পেশ করা হল :
(এক) মা'রেফাতু উলুমিল হাদীছ )مَعْرِفَةُ عُلُوْمِ الْحَدِيثِ( :

ক- ইমাম হাকেম (রহঃ) সর্বপ্রথম অত্র বইয়ে এই শাস্ত্রকে 'উলূমুল হাদীছ' নামকরণ করেন।
খ- বইটিতে ইমাম হাকেম (রহঃ) ইলমে হাদীছের সাথে সংশ্লিষ্ট ৫২টি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন।
গ- অত্র বইয়ে প্রতিটি বিষয়কে তিনি 'নাউ' তথা প্রকার বলে উল্লেখ করেছেন।
ঘ- এটিকে উছুলে হাদীছের উপর লিখিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ বলা চলে।
৬- হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ)-এর মতে বইটি পূর্ণাঙ্গ হলেও তিনি সুন্দরভাবে সাজাতে পারেননি। ৬

(দুই) আল-কিফায়া ফী মা'রেফাতি উছুলি ইলমির রিওয়ায়াহ )الْكِفَايَةُ فِي مَعْرِفَةِ أُصُوْلِ عِلْمٍ الرَّوَايَةِ : প্রথমতঃ বলে নেওয়া উচিত যে, ইলমে হাদীছের সাথে সংশ্লিষ্ট এমন কোন বিষয় নেই, যে বিষয়ে খতীব বাগদাদী (রহঃ) আলাদা কোন গ্রন্থ লিপিবদ্ধ করেননি। খতীব বাগদাদী (রহঃ)-এর পরবর্তী সকল মুহাদ্দিছ ইলমে হাদীছ বিষয়ে তাঁর উপর নির্ভরশীল। বলা চলে, তিনিই ইলমে হাদীছকে পূর্ণতা দিয়েছেন। অত্র বইটি তাঁরই লিখিত একটি চমৎকার কিতাব। যেখানে উছুলে হাদীছের ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা স্থান পেয়েছে। নিম্নে বইটির কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হল:

ক. অত্র বইয়ে লেখক জারহ ও তা'দীলের মূলনীতি এবং হাদীছ ছহীহ ও যঈফ হওয়ার বিভিন্ন মূলনীতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
খ. তাদলীস ও মুরসাল হাদীছের হুকুমের উপর বিস্তর আলোচনা করেছেন।
গ. হাদীছ শ্রবণ ও বর্ণনার নিয়ম-পদ্ধতি আলোচনা করেছেন।
ঘ. বিখ্যাত মুহাদ্দিছগণের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্যকে সানাদ সহ জমা করেছেন।

(তিন) মা লা ইয়াসাউল মুহাদ্দিছ জাহলুহু )مَا لَا يَسَعُ الْمُحَدِّثَ جَهْلُهُ( : অত্র বইয়ের উপর মুহাদ্দিছগণ অনেক তানক্বীদ করেছেন। তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে-

(ক) বইটিতে উছুলে হাদীছের তেমন কোন আলোচনা নেই।
(খ) সাজানো-গোছানো নয়।
(গ) ছোট বই হওয়া সত্ত্বেও তাহক্বীকু ছাড়াই জাল ও যঈফ হাদীছে ভরপুর। যা একজন মুহাদ্দিছের শানে মানায় না।

নোট: উচ্ছ্বলে হাদীছের উপর স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা শুরু হলেও কোন কোন মুহাদ্দিছ তাঁদের অন্য বিষয়ে লিখিত বিভিন্ন গ্রন্থের অধীনে উচ্ছ্বলে হাদীছের উপর অনেক চমৎকার ও সারগর্ভ লেখা উপহার দিয়েছেন। যেমন: মুওয়াত্তা মালেকের ব্যাখ্যা গ্রন্থ 'আত-তামহীদে'র ভূমিকাতে ইমাম ইবনু আব্দিল বার (রহঃ) উছুলে হাদীছের বিভিন্ন মূলনীতির উপর অসাধারণ আলোচনা করেছেন। তেমনি শেষ যুগে এসে শায়খ আব্দুর রহমান মুবারকপুরী (রহঃ) তাঁর লিখিত জামে' তিরমিযীর ভাষ্যগ্রন্থ 'তুহফাতুল আহওয়াযী'র ভূমিকাতে ইলমে হাদীছের বিভিন্ন দিকের উপর বেনযীর আলোচনা করেছেন। যা হাদীছ শাস্ত্রের শিক্ষার্থীদের অনেক উপকারী।

টিকাঃ
২. ছহীহ বুখারী হা/১২৯১; ছহীহ মুসলিম হা/৫ 'রাসূল (ছাঃ)-এর উপর মিথ্যারোপ করার ভয়াবহতা' অনুচ্ছেদ-২, ভূমিকা দ্রষ্টব্য।
৩. ছহীহ মুসলিম হা/২১ 'যঈফ রাবীর হাদীছ বর্ণনা করা নিষিদ্ধ এবং হাদীছ সংগ্রহের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা' অনুচ্ছেদ-২, ভূমিকা দ্রষ্টব্য।
৪. ছহীহ মুসলিম হা/২৭ ভূমিকা দ্রষ্টব্য।
৫. হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী, নুযহাতুন নাযর (রিয়াদ: সাফীর প্রকাশনী), পৃঃ ৩১।
৬. আসক্বালানী, নুযহাতুন নাযর (রিয়াদ: সাফীর প্রকাশনী), পৃঃ ৩২।

📘 মুছত্বলাহুল হাদীছ > 📄 মুকাদ্দিমা ইবনুছু ছালাহ : উছূলে হাদীছ শাস্ত্রে বিপ্লব

📄 মুকাদ্দিমা ইবনুছু ছালাহ : উছূলে হাদীছ শাস্ত্রে বিপ্লব


ইমাম ইবনুছ ছালাহ (রহঃ)। মূল নাম আবু আমর ওছমান ইবনু আব্দির রহমান (মৃঃ ৬৪৩ হিঃ)। ৬ষ্ঠ শতাব্দী হিজরীতে আগত এই মুহাদ্দিছ উছুলে হাদীছ নামক শাস্ত্রটিকে পূর্ণতা দেওয়ার ক্ষেত্রে এক বিপ্লব নিয়ে আসেন। তিনি দিমাশক্বের মাদরাসা আশরাফিয়াতে নিয়মিত উচ্ছ্বলে হাদীছের উপর দারস প্রদান করতেন। এ সময় তিনি ছাত্রদেরকে উছুলে হাদীছের বিভিন্ন মাসআলা লিখিয়ে দিতেন। ছাত্রদের দ্বারা লিখানো সেই দারসই তার বিখ্যাত গ্রন্থ উলূমুল হাদীছ, যা 'মুকাদ্দিমা ইবনুছ ছালাহ' নামে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ।

মুকাদ্দিমার বৈশিষ্ট্য সমূহ:
(ক) অতীতে লিখিত উছুলে হাদীছ ও উছুলে ফিক্বহের বইয়ে সংকলিত প্রায় সকল তথ্যকে তিনি সন্নিবেশিত করেছেন। বিশেষ করে খত্নীব বাগদাদীর সকল কিতাবের সারনির্যাস একত্রিত করেছেন। ফলে তার কিতাবটি হাদীছ শাস্ত্রের ইমামে পরিণত হয়েছে।
(খ) বইটির শুরুতে তিনি চমৎকার একটি ভূমিকা লিপিবদ্ধ করেছেন।
(গ) অত্র বইয়ে হাদীছ শাস্ত্রের ৬৫ প্রকার বিষয়ের উপর আলোচনা করেছেন।
(ঘ) বিভিন্ন পরিভাষার প্রদত্ত সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করেছেন। আবার অনেক পরিভাষাকে সংজ্ঞায়িতও করেছেন।
(ঙ) মুহাদ্দিছগণের বিভিন্ন মন্তব্যের বিশ্লেষণ করতঃ মতভেদপূর্ণ মাসআলাগুলোতে নিজস্ব তাহক্বীক্ব অনুযায়ী কোন একটি মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

গ্রন্থটির বিভিন্ন রূপ:

'মুকাদ্দিমা ইবনুছ ছালাহ' গ্রন্থটি ওলামায়ে কেরামের মাঝে অসাধারণ গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। সেজন্য অনেক আলেমই তাঁর বইয়ের খেদমতকে গর্বের মনে করে থাকেন। হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী থেকে শুরু করে ইমাম নববী, ইমাম সুয়ূত্বী ও ইমাম ইবনু কাছীরের মত জগদ্বিখ্যাত ইমামগণ মুকাদ্দিমা ইবনুছ ছালাহের বিভিন্নভাবে খেদমত করেছেন। নিম্নে 'মুকাদ্দিমা ইবনুছ ছালাহে'র উপর সম্পাদিত বিভিন্ন ধরনের কাজের একটা সংক্ষিপ্ত রূপ পেশ করা হল:

ব্যাখ্যা:

মুকাদ্দিমা ইবনুছ ছালাহের এখন পর্যন্ত প্রায় তিনটি ব্যাখ্যা গ্রন্থ রচিত হয়েছে। যথা-
(১) আল-জাওয়াহিরুছ ছিহাহ ফী শারহি উলুমিল হাদীছ লি ইবনিছ ছালাহ: এটি ইমাম ইবনু জামা'আ-এর সুযোগ্য পুত্র আব্দুল আযীয কর্তৃক প্রণীত। যদিও গ্রন্থটি এখনো অপ্রকাশিত।
(২) আশ-শাযা আল-ফাইয়‍্যাহ মিন উলূমি ইবনিছ ছালাহ: উক্ত গ্রন্থের লেখক শায়খ বুরহানুদ্দীন আল-আবনাসী (মৃঃ ৮০২ হিঃ)।
(৩) মাহাসিনুল ইছতিলাহ গ্রন্থটির রচয়িতা হলেন ইমাম সিরাজুদ্দীন আল-বুলক্বিনী। অত্র গ্রন্থে ইমাম বুলক্বিনী ইবনুছ ছালাহের বইয়ে অনুল্লেখিত অনেক তথ্য সংযুক্ত করেছেন। বইয়ের শেষে নতুন ৫টি বিষয় যোগ করেছেন, যা ইবনুছ ছালাহের বইয়ে ছিল না। এছাড়া অনেক জায়গায় ইবনুছ ছালাহ (রহঃ)-এর বিভিন্ন মন্তব্যের সমালোচনাও করেছেন।

কবিতায়ন:
ইমাম ইবনুছ ছালাহের মুকাদ্দিমার গ্রহণযোগ্যতা এতই বেড়ে যায় যে, ছাত্রদের মুখস্থের সুবিধার জন্য অনেক মুহাদ্দিছ বইটিকে কবিতা আকারে সজ্জায়িত করেন। তন্মধ্যে দু'টির পরিচয় নিম্নে পেশ করা হল:

(এক) আলফিয়াতুল ইরাক্বী: মূল নাম 'আত-তাযকিরাহ ওয়াত-তাবছিরাহ'। লেখক- হাফেয যাইনুদ্দীন আল-ইরাক্বী (রহঃ)। ইবনুছ ছালাহের মুকাদ্দিমার উপর লিখিত কবিতাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। পরবর্তীতে ইরাক্বী (রহঃ) নিজেই আবার তাঁর এ কবিতার ব্যাখ্যা লিখেন। এছাড়া ইমাম সাখাবী (রহঃ)ও 'ফাৎহুল মুগীছ' নামে অত্র কবিতার ব্যাখ্যা গ্রন্থ লিখেছেন। ফাহুল মুগীছ নামের এই ব্যাখ্যাগ্রন্থটি মুহাদ্দিছগণের নিকটে অনেক উঁচু মর্যাদা পায়।

(দুই) আলফিয়াতুস সুয়ূত্বী: ইমাম সুয়ূত্বীও মুকাদ্দিমা ইবনুছ ছালাহকে কবিতায় রূপ দেন। অবশ্য তিনি তাঁর কবিতার মধ্যে মুকাদ্দিমার সকল তথ্য জমা করার পাশাপাশি ইরাক্বী (রহঃ) প্রদত্ত নতুন তথ্যও জমা করেছেন এবং নিজের পক্ষ থেকেও অনেক তথ্য সংযোজন করেছেন।

সংক্ষিপ্তকরণ :
(ক) ইরশাদু তুল্লাবিল হাক্বায়িত্ব: ইমাম নববী (রহঃ) মুকাদ্দিমা ইবনুছ ছালাহকে সংক্ষিপ্ত করে এই বইটি রচনা করেন। পরবর্তীতে তিনি নিজে আবার নিজের বইকে সংক্ষিপ্ত করেন। নাম দেন 'তাক্বরীব ওয়া তাইসীর লি মা'রেফাতি সুনানিল বাশীর ওয়ান-নাযীর'। এরপর ইমাম সুয়ূত্বী অত্র তাক্বরীবের ব্যাখ্যা লেখেন, যার নাম দেন 'তাদরীবুর রাবী শারহু তাক্বরীবিন নাবাবী'। ইমাম সুয়ূত্বীর এই ব্যাখ্যা গ্রন্থটি পৃথিবীব্যাপী অসাধারণ গ্রহণযোগ্যতা পায়। বর্তমানে উছুলে হাদীছের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ হিসাবে গণ্য করা হয় তাদরীবুর রাবীকে। পৃথিবীর প্রায় সকল ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উচ্চতর হাদীছ শিক্ষার জন্য বইটির পাঠ অপরিহার্য।

(খ) ইখতিছারু উলুমিল হাদীছ: বিখ্যাত তাফসীরকারক ইমাম ইবনু কাছীর (রহঃ) মুকাদ্দিমা ইবনুছ ছালাহকে সংক্ষিপ্ত করে অত্র বইটি লিখেন। পরবর্তীতে বিখ্যাত মুহাদ্দিছ ইমাম আহমাদ শাকের 'আল-বায়িসুল হাছীছ' নামে অত্র বইটির ব্যাখ্যা লিখেন। আহমাদ শাকের (রহঃ)-এর অত্র ব্যাখ্যার উপর ইমাম আলবানী (রহঃ) ও হাফেয যুবাইর আলী যাঈ (রহঃ) টীকা লিখেছেন।

(গ) আল-মুকুনি' ফী উলুমিল হাদীছ: উক্ত গ্রন্থটি মুকাদ্দিমা ইবনুছ ছালাহের সংক্ষিপ্তকরণ হিসাবে শায়খ সিরাজুদ্দীন ইবনুল মুলাক্কিন (মৃত ৮০৪ হিঃ) রচনা করেন।।

তানক্বীদ বা সমালোচনা:
মানুষ মাত্রই ভুল হওয়া স্বাভাবিক। যার খেদমত যত বেশী, তার ভুল ধরা হয় তত বেশী। তেমনি ইমাম ইবনুছ ছালাহ (রহঃ)-এর বইয়ের অনেক মুহাদ্দিছ সমালোচনা করেছেন। সমালোচনামূলক বিখ্যাত তিনটি বইয়ের নাম নিম্নে পেশ করা হল:

ক. ইছলাহু ইবনিছ ছালাহ: গ্রন্থটির রচয়িতা আলাউদ্দীন মুগলত্বঈ (মৃঃ ৭৬২ হিঃ)।
খ. আত-তাকুয়ীদ ওয়াল ইযাহ: হাফেয যাইনুদ্দীন আল-ইরাক্বী (রহঃ) (মৃত ৮০৬ হিঃ) উক্ত গ্রন্থের সমালোচনা করে গ্রন্থটি রচনা করেছেন।
গ. আন-নুকাত আলা মুকাদ্দিমা ইবনিছ ছালাহ: হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) (মৃঃ ৮৫২ হিঃ) বর্তমান কিছু প্রকাশনী আবু মু'আয তারেক্ব ইবনে আওযুল্লাহ-এর তাহক্বীকে মুকাদ্দিমা ইবনুছ ছালাহ এবং তার উপর আসক্বালানী ও ইরাক্বী (রহঃ)-এর তানকীদসহ তিনটি বইকে জমা করে একত্রে প্রকাশ করেছে, যা ত্বলিবুল ইলমদের জন্য অনেক উপকারী।

সারমম: উপরিউক্ত আলোচনাতে অবশ্যই স্পষ্ট হয়েছে যে, মুকাদ্দিমা ইবনুছ ছালাহ একটি মূল্যবান ও উঁচু মাপের উছুলে হাদীছের কিতাব। সুতরাং প্রতিটি তুলিবে ইলমে হাদীছের বইটি পড়া ও সেটাকে নিয়ে গবেষণায় রপ্ত হওয়া অবশ্য কর্তব্য।

📘 মুছত্বলাহুল হাদীছ > 📄 ৭ম শতাব্দী হিজরী থেকে বর্তমান যুগ

📄 ৭ম শতাব্দী হিজরী থেকে বর্তমান যুগ


এই যুগকে আমরা মুকাদ্দিমা ইবনুছ ছালাহ-এর পরবর্তী যুগ বলতে পারি। নিম্নে এই সময়ের মধ্যে লিখিত কিছু বিখ্যাত ও উপকারী বইয়ের নাম-পরিচয় পেশ করা হল:

(১) আল-ইকুতিরাহ লি বায়ানিল ইছত্বিলাহ (الإقتراح لبيان الإصطلاح) - বিখ্যাত ইমাম ইবনু দাক্বীকুল ঈদ (মৃঃ ৭০২ হিঃ) (রহঃ) গ্রন্থটির প্রণয়নকারী।
(২) আল-মুক্তিযাতু ফী ইলমি মুছত্বলাহিল হাদীছ (الموقظة في علم مصطلح الحديث) - হাফেয ইমাম যাহাবী (মৃঃ৭৪৮ হিঃ) উক্ত গ্রন্থের রচয়িতা।
(৩) তাওযীহুল আফকার লি মা'আনি তানক্বীহুল আনযার (توضيح الأفكار لمعاني تنقيح الأنظار) - উক্ত গ্রন্থটি রচনা করেছেন প্রখ্যাত ইমাম ছান'আনী (মৃঃ ৮৪০ হিঃ)।
(৪) নুখবাতুল ফিকার (نخبة الفكر) - হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) গ্রন্থটি প্রণয়ন করেছেন।
(৫) আত-তাযকিরাতু ফী উলুমিল হাদীছ (التذكرة في علوم الحديث) - শায়খ ইবনুল মুলাক্কিন হলেন উক্ত গ্রন্থের রচয়িতা।
(৬) আল-মানযূমা আল-বায়কুনিয়‍্যাহ (المنظومة البيقونية) - ওমর ইবনু মুহাম্মাদ আল-বাইকুনী।
(৭) কুওয়াঈদুত তাহদীছ (قواعد التحديث) - জামালুদ্দীন আল-ক্বাসেমী।
(৮) তাওযীহুন নাযর ইলা উচ্ছ্বলিল আছার (توضيح النظر إلى أصول الأثر) - তাহির আল-জাযায়িরী।
(৯) যফারুল আমানী (ظفر الأماني) - আব্দুল হাই লাক্ষ্মৌভী, তাহক্বীক্ব- আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ।
(১০) কুওয়া'ইদ ফী উলুমিল হাদীছ (قواعد في علوم الحديث) - জাফর আহমাদ থানভী।
(১১) ইছলাহুল ইছত্বিলাহ (إصلاح الإصطلاح) - শায়খ তারেক ইবনু আওযুল্লাহ। সম্মানিত লেখকের লিখিত উছুলে হাদীছ বিষয়ক আরো দু'টি চমৎকার কিতাব রয়েছে। তাহল- ক. তাক্বরীব খ. মাদখাল।
(১২) তাইসীরু মুছত্বলাহিল হাদীছ (تيسير مصطلح الحديث) - ড. মাহমূদ আত-ত্বাহহান।
(১৩) তাহরীরু উলুমিল হাদীছ (تحرير علوم الحديث) - আল্লামা জুদাঈ।
(১৪) আল-ওয়াসীত্ব ফী উলুমিল হাদীছ (الوسيط في علوم الحديث) - শায়খ আবু শাহবা।

নিম্নে উপরোল্লেখিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ৬টি গ্রন্থের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি পেশ করা হল:
(এক) নুখবাতুল ফিকার (نخبة الفكر) :

৭ম শতাব্দী হিজরীতে জন্ম নেয়া হাদীছ শাস্ত্রের মহান ইমাম হাফিযুল হাদীছ ও হাফিযুদ দুনিয়া হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ)-এর মাত্র দুই-তিন পৃষ্ঠার বই এটি। মাত্র দুই-তিন পৃষ্ঠার মধ্যে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পুরো উছুলে হাদীছকে সন্নিবেশিত করেছেন। তাঁর জীবদ্দশাতেই কয়েকজন আলেম তাঁর এ বইটির ব্যাখ্যা লিখেন। তন্মধ্যে কামালুদ্দীন আশ-শুমুন্নী (রহঃ)-এর লেখা 'নাতীজাতুন নাযা'র এখনো পাওয়া যায়। এটাকেই 'নুখবাতুল ফিকারে'র প্রথম লিখিত ব্যাখ্যা হিসাবে ধরা হয়। হাফেয (রহঃ) যখন দেখলেন, মানুষ তাঁর জীবদ্দশাতেই তাঁর বইয়ের ব্যাখ্যা লিখছেন, তখন তিনি ভাবলেন, বাড়ীর মালিকই ভাল জানে তার বাড়ীতে কি আছে। সুতরাং তাঁর বইয়ের ব্যাখ্যা তাঁর চেয়ে ভাল কেউ বুঝতে পারবে না। তাই তিনি ছাত্রদের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেই নিজের লিখিত বইয়ের ব্যাখ্যা লিখলেন। নাম দিলেন 'নুযহাতুন নাযার'। তাঁর এই 'নুযহাতুন নাযার' গ্রন্থটি বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ের উছুলে হাদীছের বই হিসাবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে পড়ানো হয়। সত্যিকার হাদীছের ছাত্রগণ পুরো বইকে মুখস্থ করে থাকেন। উল্লেখ্য যে, পরবর্তীতে হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ)-এর উক্ত বই ও তাঁর ব্যাখ্যার উপর অনেক কাজ হয়েছে। যেমন মোল্লা আলী ক্বারী হানাফী (রহঃ) 'নুখবাতুল ফিকারে'র ব্যাখ্যা লিখেছেন। অনেকেই টীকা লিখেছেন। অনেকেই কবিতা আকারে সাজিয়েছেন। উল্লেখ্য যে, হাফেয (রহঃ)-এর মূল গ্রন্থটি ও তার ব্যাখ্যা উভয়রই বাংলা ভাষায় অনুবাদ হয়েছে।

(দুই) আল-মানযূমা আল-বায়কুনিয়‍্যাহ (الْمَنْظُوْمَةُ الْبَيْقُوْنِيَّةُ) :

ইমাম বায়কুনীর কবিতা আকারে লিখিত মুছত্বলাহুল হাদীছের এই বইটি আরব ছাত্রদের নিকটে খুব প্রিয়। তারা তাদের উছুলে হাদীছের উপর শিক্ষা এই কবিতা মুখস্থ করার মাধ্যমেই শুরু করে থাকে। এই বইটিও মুহাদ্দিছগণের মাঝে এতটা প্রসিদ্ধ পায় যে, বহু আলেম-ওলামা এর ব্যাখ্যা লিখেছেন। তন্মধ্যে শায়খ ছালেহ আল-উছায়মীন ও ইমাম যারক্বানীর লেখা ব্যাখ্যা অন্যতম। অত্র কবিতার ব্যাখ্যার অনুবাদ বাংলা ভাষাতেও হয়েছে। শায়খ ছানাউল্লাহ নাযীর আহমাদের অনুবাদে ও শায়খ যাকারিয়ার সম্পাদনায় বইটি 'ইসলাম হাউজ' ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়।

(তিন) কুওয়া'ইদ ফী উলুমিল হাদীছ (قَوَاعِدُ فِي عُلُوْمِ الْحَدِيثِ) :

মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহঃ)-এর দিক-নির্দেশনায় জা'ফর আহমাদ থানভী অত্র বইটি লেখেন। বইটি মূলত থানভী প্রণীত বিখ্যাত বই 'ঈলাউছ সুনানে'র ভূমিকা। উছুলে হাদীছের বই হিসাবে বইটিকে চমৎকারই বলা চলে, কিন্তু বইটিতে নির্দিষ্ট মাযহাবপ্রীতির কারণে জমহুর মুহাদ্দিছগণের অনেক উচ্ছ্বল প্রাধান্য পায়নি। সেজন্য শায়খ যুবাইর আলী যাঈ বইটি সম্পর্কে বলেন, 'বইটি মূলত ক্বাওয়াঈদুদ দেওবান্দিয়ীন ফী উলূমিল হাদীছ'। অর্থাৎ দেওবান্দীগণের মতানুযায়ী উছুলে হাদীছ। পাকিস্তানের শায়খ বদীউদ্দীন শাহ রাশেদী অত্র বইয়ে উল্লেখিত ত্রুটিযুক্ত মূলনীতিগুলোর পর্যালোচনা করে একটি চমৎকার বই লিখেছেন। নাম দিয়েছেন 'নাকয ক্বাওয়াঈদি উলুমিল হাদীছ'। এছাড়া মাওলানা থানভীর লিখিত ঈলাউছু সুনানে তিনি যে সমস্ত ত্রুটিযুক্ত মূলনীতির আলোকে হাদীছের বিশ্লেষণ পেশ করেছেন, তার উপরেও পাকিস্তানের শায়খ ইরশাদুল হক্ব আছারী প্রণীত 'ঈলাউছু সুনান ফিল মীযান' নামে একটি উপকারী ও খুব প্রয়োজনীয় বই রয়েছে।

(চার) কুওয়া'ইদুত তাহদীছ ও তাওজীহুন নাযর (قَوَاعِدُ التَّحْدِيْثِ وِتَوْجِيهُ النظر) :

উছুলে হাদীছের উপর লেখা এখন পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ বই বলা চলে উপরের বই দু'টিকে। প্রথমটির লেখক সিরিয়ার জামালুদ্দীন ক্বাসেমী এবং দ্বিতীয়টির লেখক শায়খ তাহের আল-জাযায়িরী। 'তাওযীহুন নাযারে' শায়খ জাযায়েরী পুরো উছুলে হাদীছ শাস্ত্রকে জমা করেছেন। প্রতিটি মাসআলার উপর বিস্তর বাহাছ করেছেন। নিজস্ব তাহক্বীক্বও পেশ করেছেন। এই বইটি থেকে শুধুমাত্র মুহাদ্দিছগণ উপকার লাভ করতে পারেন। অন্যদিকে জামালুদ্দীন ক্বাসেমী তাঁর 'ক্বাওয়াঈদত তাহদীছে' সকল মাসআলাকে জমা করেছেন, কিন্তু চমৎকারভাবে সংক্ষিপ্ত করেছেন। সুন্দরভাবে অধ্যায় বিন্যাস করেছেন। ছাত্রদের জন্য বইটি অনেক উপকারী।

(পাঁচ) তাইসীরু মুছত্বলাহিল হাদীছ (تَيْسِيرُ مُصْطَلَحِ الْحَدِيثِ) :

এটি প্রাথমিক পর্যায়ের ছাত্রদের জন্য অত্যন্ত সহজ-সরল ও সাবলীল আরবী ভাষায় লিখিত চমৎকার একটি বই।

বইয়ের লেখক বইটিকে প্রশ্নোত্তর আকারে সাজিয়ে ছাত্রদের জন্য আরো সহজ করে দিয়েছেন। ফলে এটিকে হাদীছ শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে চমৎকার বই বলা চলে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00