📘 মুছত্বলাহুল হাদীছ > 📄 ভূমিকা

📄 ভূমিকা


যাবতীয় প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য। যিনি বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক। শান্তি অবতীর্ণ হোক শেষনবী রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উপর। ছাল্লা-ল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। পর-

হাদীছের ইলম অন্বেষণকারী প্রিয় ছাত্র ভাইয়েরা! রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর হাদীছের পবিত্র ও সুরভিত ফুল বাগানে তোমাদেরকে স্বাগতম!!

যারা রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছের ছাত্র, তারা সত্যিই সম্মানিত। একজন হাদীছের ছাত্র যতক্ষণ হাদীছ অধ্যয়ন করে, ততক্ষণ সে যেন এই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানব মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর সাথে থাকে। যার বাড়ীতে রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছের বই আছে, রাসূল (ছাঃ) যেন স্বয়ং তার বাড়ীতে কথা বলছেন। তাহলে যাদের জীবন-মরণ রাসূল (ছাঃ)- এর হাদীছ, যাদের মন-মগজ শুধু রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছকে পাগলপারা হয়ে খুঁজে বেড়ায়, রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছ মুখস্থ করতে, গবেষণা করতে, বুঝতে, অন্যকে বুঝাতে এবং রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছ দুনিয়ার বুকে বাস্তবায়ন করতে যারা নিজেদের জীবন পর্যন্ত মহান আল্লাহ্র রাস্তায় কুরবান করে দেয়, তারা কতই না মহান!! এক্ষেত্রে ইমাম মালেক, ইমাম শাফেঈ, ইমাম আহমাদ, ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম আবুদাউদ, ইমাম তিরমিযী, ইমাম ইবনু মাজাহ, ইমাম নাসাঈ, হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী, হাফেয যাহাবী, ইমাম বায়হাক্বী, ইমাম দারাকুনী, ইমাম আলবানী প্রমুখ রহিমাহুমুল্লাহ ইতিহাসখ্যাত। যারা প্রত্যেকেই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর হাদীছের মহান খাদেম হিসাবে বিশ্ব্যব্যাপী প্রসিদ্ধ।

হে হাদীছ নামক ফুল বাগানের শিক্ষার্থী ছাত্রবৃন্দ! হাদীছের একজন সম্মানিত ছাত্র হিসাবে তোমাদেরও অবশ্যই লক্ষ্য থাকতে হবে তাঁদের মত খাদেম হওয়ার। অতএব তোমাদেরকেও স্বপ্ন দেখতে হবে। যে স্বপ্ন হবে হাদীছ গবেষণায় আত্মনিয়োগ করার, জীবন বাজি রেখে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর হাদীছের জ্ঞান অর্জন করার, তদনুযায়ী আমল করার এবং দুনিয়ার বুকে তার যথাযথ বাস্তবায়ন করার জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত বিলিয়ে দেয়ার স্বপ্ন।

স্বপ্ন বাস্তবায়নে যা যরূরী:

যাদের অন্তরে এই সুপ্ত স্বপ্ন জাগরূক, যারা এই সকল মহান মনীষীর মত হওয়ার স্বপ্ন দেখে, তাদের উদ্দেশ্যে প্রথম কথা হচ্ছে, 'ঘুমের মধ্যে যা দেখা হয়, তা স্বপ্ন নয়; বরং স্বপ্ন তাই, যা বাস্তবায়নের চেষ্টা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না'। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য তিনটি কাজ করা অতীব যরূরী:

(ক) পাপমুক্ত থাকা: কুরআন-হাদীছের জ্ঞান এবং পাপ একসাথে থাকতে পারে না। ইমাম শাফেঈ (রহঃ) তাঁর উস্তাদ ইমাম ওয়াকী'কে একদা দুর্বল মুখস্থ শক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাঁকে চমৎকার একটি উত্তর দেন। পরবর্তীতে ইমাম শাফেঈ (রহঃ) বিষয়টি কবিতা আকারে উল্লেখ করেন এভাবে,

شَكَوْتِ إِلَى وَكِيعٍ سُوءَ حِفْظِي فَأَرْشَدَنِي إِلَى تَرْكِ الْمَعَاصِي وَأَخْبَرَنِي بِأَنَّ الْعِلْمَ نُورٌ وَنُورُ اللَّهِ لَا يُهْدَى لِعَاصِي.

অর্থাৎ 'আমি একদা ওয়াকি'কে আমার স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার বিষয়ে অভিযোগ করলাম। তিনি আমাকে গুনাহের কাজ ছাড়ার নির্দেশ দিলেন। তিনি বললেন, জেনে রাখ! নিশ্চয় ইলম হচ্ছে নূর বা জ্যোতি। আর মহান আল্লাহ্ নূর কোন পাপিকে দেওয়া হয় না'।১

(খ) অত্যধিক পরিশ্রম: পরিশ্রম সফলতার মূল চাবিকাঠি। পরিশ্রম ছাড়া কোন কিছু করা সম্ভব নয়। মহান আল্লাহ বলেন,

وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ إِلَّا مَا سَعَى.

অর্থাৎ 'মানুষ যা অর্জন করে তা পরিশ্রমের ফলেই করে' (নাজম ৫৩/৩৯)। অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন,

إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ.

অর্থাৎ 'আল্লাহ কোন সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যকক্ষণ তারা নিজের অবস্থা নিজে পরিবর্তন না করে' (রা'দ ১৩/১১)।

তাইতো শায়খ আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ প্রায়ই ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলে থাকেন, 'মিহনাত কিসি কো ধোকা নাহি দেতী'। অর্থাৎ 'পরিশ্রম কাউকে ফাঁকি দেয় না'। দুনিয়ার সবকিছুই আমাদের ফাঁকি দিতে পারে, কিন্তু পরিশ্রম কখনো ফাঁকি দিবে না। দুনিয়াতে যিনি যত মহান হয়েছেন, তিনি তার পরিশ্রমের বদৌলতেই হয়েছেন। তাই পরিশ্রমের কোন বিকল্প নেই।

(গ) আল্লাহ্র কাছে দু'আ করা: মহান আল্লাহ যদি কাউকে কিছু দিতে চান, তাহলে দুনিয়ার কেউ তা বাধা দিতে পারবে না। আল্লাহ যদি কাউকে কিছু না দিতে চান, তাহলে সমগ্র দুনিয়া একত্র হয়ে চেষ্টা করলেও তা দিতে পারবে না। তাই মহান আল্লাহর দরবারে কেঁদেই ইলম নিতে হবে।

একজন 'তালিবে ইলম'-এর বৈশিষ্ট্য:
১. ইখলাছের সাথে ইলম হাছিল করা। ইলম হাছিলের পিছনে দুনিয়া লক্ষ্য থাকলে ঠিকানা জাহান্নাম হতে পারে। আর ইখলাছ থাকলে যে কোন খেদমত আল্লাহ কবুল করবেন।
২. ইলম অনুযায়ী আমল করা। ইলম অনুযায়ী আমল করলে মহান আল্লাহ্ কবুলিয়াত পাওয়া যায়।
৩. সফর করা। উচ্চতর ইলম হাছিলের জন্য সফর করা অবশ্য কর্তব্য। সফর করলে ইলম বাড়বেই ইনশাআল্লাহ।
৪. পিতা-মাতা ও শিক্ষকগণকে সম্মান করা। শিক্ষকগণকে অসম্মান করলে ইলমে বরকত হয় না।
৫. নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকা।
৬. শিক্ষকের কাছে প্রশ্ন করা। জিজ্ঞেস করা জ্ঞানের অর্ধেক।
৭. দীর্ঘকাল যাবৎ ইলম হাছিলের পিছনে সময় ব্যয় করা। কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ বছর।
৮. স্মরণশক্তি ভাল হওয়া। যদিও স্মরণশক্তি মহান আল্লাহ্র দান, তারপরেও পরিশ্রম করলে, বেশী বেশী মুখস্থ করলে স্মরণশক্তির উন্নতি হয়।
৯. ইলম হাছিলের প্রতি আগ্রহী ও মনোযোগী হওয়া।
১০. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা। অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন থাকলে পড়ায় মন বসে না।

কৈফিয়ত:

অধমের লেখা 'হাদীছ তাহক্বীকে আলবানী (রহঃ)-এর মতপরিবর্তন: সর্বশেষ সিদ্ধান্ত ও কারণ বিশ্লেষণ' বইটি পড়ে অনেক ভাই মন্তব্য করেছেন যে, তারা উছুলে হাদীছের পরিভাষা ভালভাবে বুঝতে না পারার দরুণ এই লেখার অনেক কিছুই বুঝতে পারছেন না। তারা আমাকে 'উছুলে হাদীছ' বিষয়ে কিছু লেখার জন্য অনুরোধ করেন। মূলত তাদের অনুরোধের প্রেক্ষিতেই এই বিষয়ে কলম ধরতে উদ্বুদ্ধ হই।

অত্র বইয়ে সহজ ও সাবলীল ভাষায় উছুলে হাদীছের বিভিন্ন পরিভাষা ও প্রাথমিক মূলনীতি উল্লেখ করার চেষ্টা করা হয়েছে। যেহেতু প্রাথমিক পর্যায়ের ছাত্রদের জন্য লেখা, সেহেতুে মুহাদ্দিছগণের মতদ্বন্দ্ব ও ইলমী পর্যালোচনা থেকে যথাসম্ভব বিরত থাকা হয়েছে। শুধুমাত্র একজন প্রাথমিক পর্যায়ের ছাত্রদের জন্য যে পরিভাষাগুলো না জানলেই নয়, সেগুলোই আলোচনা করা হয়েছে। বইটি নির্দিষ্ট কোন বইয়ের অনুবাদ নয়, আবার নিজে থেকে লেখা মৌলিক গ্রন্থও নয়। আরবী ও উর্দু ভাষায় প্রাথমিক পর্যায়ের ছাত্রদের জন্য লিখিত প্রায় সব বইকে সামনে রেখে বইটি সাজানো হয়েছে। তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে:

(ক) নুযহাতুন নাযর- হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী।
(খ) তাইসীরু মুছত্বলাহিল হাদীছ- ডঃ মাহমূদ আত-ত্বাহ্হান।
(গ) মিন আতইয়াবিল মুনাহ- শায়খ আব্দুল মুহসিন আল-আব্বাদ।
(ঘ) তাইসীরু উলুমিল হাদীছ- সালীম।
(ঙ) আল বায়িছুল হাছীছ- আহমাদ শাকের।
(চ) আল মাদখাল- ইবনু আওযুল্লাহ।
(ছ) তাক্বরীব - ইবনু আওযুল্লাহ।
(ট) উসূলে হাদীছ- ডঃ হামীদুল্লাহ (উর্দু)।
(ঠ) শারহু নুখবাতিল ফিকার- সাঈদ আহমাদ পালানপুরী (উর্দু)।

মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে বইটি এখন পাঠকের হাতে, ফালিল্লাহিল হাম্দ। আশা করছি প্রাথমিক পর্যায়ের ছাত্রসহ যারা উছুলে হাদীছ সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান হাছিল করতে চাইবে, এই বইটি তাদের পথপ্রদর্শক ও দিশারীর ভূমিকা পালন করবে ইনশাআল্লাহ।

পরিশেষে একটি কথা না বললেই নয়, অত্র বইটি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর স্মৃতি বিজড়িত পবিত্র মদীনায় 'মসজিদে নববী'র লাইব্রেরীতে বসে লিখা। মহান আল্লাহর নিকট দু'আ করছি, আল্লাহ যেন অত্র বইটিকে কবুল করেন এবং ইলমে হাদীছ পিয়াসী সারা বিশ্বের সকল বাংলা ভাষাভাষী মানুষের ঘরে বইটিকে পৌঁছে দিন। বইটি রচনায় যারা উৎসাহ-অনুপ্রেরণা ও বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন, তাদের সকলের জন্য আল্লাহর নিকট উত্তম পারিতোষিক কামনা করছি। বইটির মধ্যে তথ্যগত ভুল-ত্রুটি ও অসংগতি পরিলক্ষিত হলে আমাদেরকে অবহিত করার অনুরোধ রইল। বইটি যেন আমার এবং আমার শ্রদ্ধেয় পিতা-মাতার জান্নাতুল ফেরদাউসের অসীলা হয়-আমীন!!

টিকাঃ
১. ইমাম শাফেঈ, দিওয়ানুশ শাফেঈ, তাহক্বীক্ব মুজাহিদ মুছত্বফা (দিমাশকু: দারুল কলম), পৃঃ ৭২; সুলায়মান ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু ওমর আল-বাজীরিমী আশ-শাফেঈ, তুহফাতুল হাবীব আল-শারহিল খত্নীব (বৈরূত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ ১৪১৭/১৯৯৬) ৩/৬৩ পৃঃ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00