📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 জ্ঞানবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে পশ্চিমা সুবিবেচকদের স্বীকৃতি

📄 জ্ঞানবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে পশ্চিমা সুবিবেচকদের স্বীকৃতি


ইউরোপীয় সুবিবেচকরা যেসব বিষয়ে তাদের ন্যায়পূর্ণ অভিমত ব্যক্ত করেছেন, সম্ভবত বিজ্ঞানই এর সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র। এটি প্রধানত দুটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে হয়েছে, এক. বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ইসলামি সভ্যতা ও মুসলিমদের অবদান। দুই. পশ্চিমা সুবিবেচকদের সেসব গোঁড়া ও উগ্র জাতীয়তাবাদীদের কথা প্রত্যাখ্যান করা, যারা মুসলিমদের সবরকমের আবিষ্কার ও উদ্ভাবনকে অস্বীকার করে। তা পরীক্ষামূলক জ্ঞানের যত বড় বিষয়ই হোক না কেন। যেমন, যন্ত্রকৌশল, প্রকৌশল, জ্যোতির্বিদ্যা ইত্যাদি।

নিচে সুবিবেচক ইউরোপীয়দের কিছু স্বীকৃতি তুলে ধরা হলো:
মার্কিন ঐতিহাসিক রবার্ট ব্রিফল্ট বলেন, ইউরোপীয় সভ্যতার যেকোনো চিত্র যেকোনো দিক থেকে লক্ষ করলে কেবল মুসলিমদের শ্রেষ্ঠত্বই প্রতিভাত হয়।

সিগরিড হুংকে বলেন, আরবজাতি গ্রিকদের থেকে প্রাপ্ত বৈজ্ঞানিক কাঁচামাল (তথা তথ্যসমূহকে) নিজেদের গবেষণার মাধ্যমে উন্নত করে তোলে। সেগুলোকে নতুন রূপ দান করে। প্রকৃতপক্ষে আরবজাতিই পরীক্ষাভিত্তিক প্রকৃত বৈজ্ঞানিক গবেষণাপদ্ধতি আবিষ্কার করে..। তারা যে শুধু গ্রিক সভ্যতাকে বিলুপ্তি থেকে রক্ষা করে তাকে নতুন বিন্যাসে সাজিয়ে ইউরোপীয়দের উপহারই দিয়েছে তা নয়; বরং তারা রসায়ন, পদার্থ, গণিত, বীজগণিত, প্রাণিবিদ্যা, ত্রিকোণমিতি, সমাজবিজ্ঞান ইত্যাদি শাস্ত্রে নিরীক্ষাপদ্ধতির উদ্ভাবক। এসব ছাড়াও বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তারা মৌলিক আবিষ্কার ও উদ্ভাবনে অপরিসীম অবদান রাখে। তাদের অধিকাংশ কৃতিত্বই ছিনিয়ে নিয়ে অন্যদের গলায় পরানো হয়েছে। আরবজাতি বিশ্ববাসীকে সবচেয়ে মূল্যবান যে উপহারে ভূষিত করেছে তা হলো বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাপদ্ধতি। যা পাশ্চাত্যের সামনে পদার্থবিদ্যার অনেক রহস্য উন্মোচনের পথ খুলে দেয় এবং পদার্থবিজ্ঞানের ওপর রাজত্ব করার সুযোগ এনে দেয়।

হুংকে আরও বলেন, প্রকৃতপক্ষে রজার বেকন বা ব্যাকফন ভারলাম, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি বা গ্যালিলিও-কেউই বিজ্ঞানে নিরীক্ষণপদ্ধতির আবিষ্কার করেননি। এই ক্ষেত্রে আরবরাই পথিকৃৎ। তা ছাড়া (ইউরোপীয়দের নিকট আল-হাযেন নামে পরিচিত) ইবনুল হাইসাম তার বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ও সূক্ষ্ম পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যা-কিছুর বাস্তব রূপ দিয়েছেন তা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান ছাড়া কিছু নয়।

সিগরিড হুংকে আরও বলেন, পাশ্চাত্যের সর্বাধিক প্রভাবশালী আরব শিক্ষকদের অন্যতম ছিলেন হাসান ইবনুল হাইসাম। পশ্চিমা বিশ্বে এই প্রতিভাবান আরব বিজ্ঞানীর প্রভাব ছিল অনেক। পদার্থবিজ্ঞান ও আলোকবিজ্ঞানে তার মতবাদ ইউরোপীয় জ্ঞানবিজ্ঞানের ওপর আমাদের এই আধুনিক কাল পর্যন্ত কর্তৃত্ব করেছে। ইবনুল হাইসামের আল-মানাযির গ্রন্থের উপর ভিত্তি করে ইংরেজ বিজ্ঞানী রজার বেকন থেকে শুরু করে জার্মান বিজ্ঞানী ভিটেলো পর্যন্ত আলোকবিদ্যা-সংক্রান্ত যাবতীয় তত্ত্ব ও বিদ্যার উদ্ভব ঘটে। ক্যামেরা অবস্কিউরা (Camera obscura), নলকূপ ও লেদমেশিনের আবিষ্কারক এবং প্রথম উড়োজাহাজ তৈরির দাবিদার ইতালীয় বিজ্ঞানী লিওনার্দো দা ভিঞ্চি সরাসরি আরবদের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। ইবনুল হাইসামের কীর্তি ও অবদান তাকে অনেক চিন্তা জুগিয়েছিল। গ্যালিলিও যে-সকল সূত্র ও তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে বড় অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে অজানা তারকারাজি আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছিলেন, ষোড়শ শতাব্দীতে জার্মানিতে কেপলার যখন সেসব সূত্র নিয়ে গবেষণা করেন, তার ওপর ইবনুল হাইসামের দীর্ঘ প্রভাব-ছায়া ছিল। বর্তমান সময়েও এই কঠিন গাণিতিক পদার্থবৈজ্ঞানিক সমস্যা বিদ্যমান। ইবনুল হাইসাম বীজগণিতে তার গভীর দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে চতুর্ঘাত সমীকরণের দ্বারা এই সমস্যার সমাধান করেছিলেন। আমরা আরও বলি, আতশি কাচের (Burning Mirror) মাধ্যমে আলো প্রতিফলনের ক্ষেত্রে আপতন কোণ ও প্রতিফলিত কোণ সর্বদা সমান হয়-এটিকে এখনো ইবনুল হাইসামের দিকে সম্বন্ধ করে ‘হাইসামি তত্ত্ব' বলা হয়।

ফ্লোরিয়ান কাজোরি তার পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাস গ্রন্থে বলেন, আরবের মুসলিম বিজ্ঞানীরা প্রথম যথাযথভাবে পরীক্ষামূলক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আবিষ্কার ও তার বিশুদ্ধতা রক্ষা করেছেন। এ পদ্ধতির আবিষ্কার তাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের অন্যতম অধ্যায়। পদার্থবিদ্যায় এর গুরুত্ব ও উপকারিতা তারাই প্রথম উপলব্ধি করতে পেরেছেন। তাদের অগ্রভাগে রয়েছেন ইবনুল হাইসাম।

ম্যাক্স ফ্যান্টিগো বলেন, সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণের আলোকে দৃঢ়তার সঙ্গে বলা যায় যে, পাশ্চাত্যের জ্ঞানবিজ্ঞান ইসলামি আরব সভ্যতার কাছে ঋণী। গবেষণা, পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষানিরীক্ষার উপর নির্ভরশীল আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানের ধারা এবং ইউরোপীয় পণ্ডিতদের যা কিছু অর্জন, তা স্পেনে আরব মুসলিমদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কল্যাণে ইসলামি জগতের সঙ্গে ইউরোপীয় পণ্ডিতদের মেলামেশা ও সংশ্লিষ্টতার ফসল।

রবার্ট ব্রিফল্ট বলেন, খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দী থেকে ইসলামি আরব সভ্যতার উৎকর্ষের সূচনা হয় এবং তা পুবে পারস্য ও পশ্চিমে স্পেন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সনাতন জ্ঞানবিজ্ঞানের এক বিরাট অংশের পুনরাবিষ্কার হয় এবং পদার্থ, রসায়ন ও গণিত ইত্যাদি শাখায় আবিষ্কারের নবধারা সৃষ্টি হয়। এভাবে অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো এখানেও আরবজাতি ইউরোপীয়দের শিক্ষকে পরিণত হয় এবং তারা এ মহাদেশে জ্ঞানবিজ্ঞানের রেনেসাঁসে অবদান রাখে।

জার্মান গবেষক ড. পিটার ই. পোরম্যান বলেন, বিশ্বে জ্ঞানবিজ্ঞান ও সংস্কৃতির প্রতিটি শাখায় মুসলিমদের অবদান অত্যন্ত সুস্পষ্ট। অধিকন্তু চিকিৎসাশাস্ত্রে তাদের অর্জন ও অবদান কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। এ ব্যাপারটিই আমাকে Medieval Islamic Medicine শীর্ষক গ্রন্থটি রচনা করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

তিনি আরও বলেন, এই গ্রন্থ রচনার আরেকটি কারণ এই যে, আমি একজন জার্মান খ্রিষ্টান হিসেবে আমার সংস্কৃতির বিরাট অংশে ইসলামি সংস্কৃতির যে অবদান রয়েছে তার কাছে ঋণী। আমি ব্যাপারটি স্পষ্ট করার এবং জোরালোভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। যদিও কতিপয় লোক ইউরোপে ও বিশ্বে মুসলিমরা যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে তা মুছে ফেলতে তৎপর। আমি এবং আমার গবেষণা-সহকারী এমিলি স্যাভেজ স্মিথ মধ্যযুগে চিকিৎসাশাস্ত্রে মুসলিমদের অবদান তুলে আনার ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ব্যয় করেছি।

তিনি আরও বলেন, ইসলামি হাসপাতালগুলো ইসলামি ওয়াকফ সম্পত্তি ছিল। এসব হাসপাতালে ধর্মবর্ণনির্বিশেষে সব মানুষের চিকিৎসা দেওয়া হতো। ইহুদি, খ্রিষ্টান, নক্ষত্রপূজারি, জরথুস্ত্রীয় সবাই চিকিৎসাসেবা পেত। ইসলামি হাসপাতালগুলো সবাইকে চিকিৎসাসেবা প্রদান করত। অমুসলিমদের সঙ্গে মুসলিমদের এ এক অনন্য উদারতা।

মুসলিমরা আধুনিক বিজ্ঞানের সাহায্যে অনেক জটিল রোগের চিকিৎসায় অবদান রেখেছে। ড. পোরম্যান বলেন, মুসলিমরা বহু কঠিন ও জটিল রোগের চিকিৎসা উদ্ভাবন করেছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জটিল হলো মনোরোগ মেলানকোলিয়া (melancholia, বিষাদ-বায়ু, বিমর্ষতা, দৌর্মনস্য)।

উইল ডুরান্ট বলেন, মুসলিমরাই রসায়নকে বিজ্ঞানের একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্রে রূপদান করেন। তারা এই ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষণপদ্ধতি ব্যবহার করেন এবং প্রাপ্ত ফলাফল যাচাই-বাছাইয়ে যত্নশীল হন। অথচ আমাদের জানামতে, এই ক্ষেত্রে গ্রিকদের অবদান কিছু শিল্প-অভিজ্ঞতা ও অস্পষ্ট ধারণানির্ভর তত্ত্বে সীমাবদ্ধ ছিল।

ডোনাল্ড আর. হিল বলেন, প্রকৃতপক্ষে আধুনিক রসায়নের প্রধান প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে আল-রাযি অনন্য ব্যক্তিত্ব। এটা তার তুলনামূলক পদ্ধতির অনুসরণ এবং আবশ্যকীয় পরীক্ষামূলক গবেষণায় নিরবচ্ছিন্নভাবে লেগে থাকার ফলে সম্ভব হয়েছিল।

এ বিষয়ে ডোনাল্ড আর. হিলের আরও একটি স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ইউরোপীয়দের বহু আগে মুসলিমরা আপেক্ষিক ভরের রেখাচিত্র সম্পর্কে অবগতি লাভ করে। অথচ ইউরোপ সপ্তদশ শতাব্দীতে এসে এ ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে শুরু করে। রবার্ট বয়েল (মৃ. ১৬৯১ খ্রি.)-এর সময়ে এসে তা চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত হয়। তিনি দুটি ভিন্ন পদ্ধতিতে পারদের আপেক্ষিক ভর নির্ধারণ করেন। পদ্ধতি দুটি থেকে প্রাপ্ত ভরের মান ছিল ১৩.৭৬ এবং ১৩.৩৫৭; উভয়টি খাযিনির নির্ধারিত মানের চেয়ে তুলনামূলক কম নিখুঁত। খাযিনির অধিকাংশ পরীক্ষাফলই ছিল চূড়ান্ত নিখুঁত।

গুস্তাভ লি বোঁ বলেন, জাবির ইবনে হাইয়ানের গ্রন্থাবলি থেকে একটি বিজ্ঞান বিশ্বকোষ রচিত হয়। তাতে তৎকালীন আরব মনীষীরা রসায়নশাস্ত্রে যে অবদান রেখেছিলেন তার নির্যাস তুলে ধরা হয়েছে। তা ছাড়া এসব বিশ্বকোষে রসায়নের অনেক যৌগিক মৌলের বর্ণনা রয়েছে, যা ইতিপূর্বে কোথাও উল্লেখিত হয়নি। যেমন নাইট্রিক এসিড। জাবির ইবনে হাইয়ানকে বাদ দিয়ে আমরা রসায়নশাস্ত্রের কল্পনাও করতে পারি না।

বিজ্ঞানবিষয়ক প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ফ্লোরিয়ান কাজোরি বলেন, বীজগণিতে আরব এবং মুসলিমদের অবদানের প্রতি লক্ষ করলে বিস্ময়াভিভূত হতে হয়। বীজগণিতের ওপর লেখা খাওয়ারিজমির গ্রন্থটি ছিল এক জ্ঞান-প্রস্রবণ, যেখান থেকে পরবর্তী মুসলিম ও ইউরোপীয় বিজ্ঞানীরা সমানভাবে আহরণ করেছেন, তাদের গবেষণাকর্মে এই গ্রন্থের ওপর নির্ভরশীল থেকেছেন এবং এখান থেকে বহু তত্ত্ব গ্রহণ করেছেন। অনেক মৌলিক নীতিমালা তারা এ বই থেকেই সংগ্রহ করেছেন। তাই এ কথা বলা যথার্থ যে, খাওয়ারিজমিই বীজগণিতশাস্ত্রকে তার সঠিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

জাঁ ফ্রিনেট বলেন, আমরা যখন এর নিপুণতা নিয়ে চিন্তা-ফিকির করলাম, দেখলাম যে গণিতশাস্ত্রে মুসলিমদের বৈজ্ঞানিক বিকাশের মূলনীতির সূচনা হয়েছে কুরআনুল কারিম থেকে। মিরাস বণ্টন-সম্পর্কিত যে জটিল বিধান কুরআনে বর্ণিত হয়েছে তাতে এসব মূলনীতি রয়েছে। খাওয়ারিজমিকে প্রথম মুসলিম গণিতশাস্ত্রবিদ মনে করা হয়। সকল বৈজ্ঞানিক বিষয় ও মানদণ্ডের জন্য আরবিতে প্রণালিবদ্ধ পদ্ধতি প্রণয়নে তিনি যে প্রচেষ্টা ব্যয় করেছেন তার জন্য আমরা তার কাছে ঋণী। যেমন আমরা স্প্যানিশ শব্দ 'গাওয়ারিজমি'-র জন্যও তার কাছে ঋণী। যার অর্থ সংখ্যায়ন। (সংখ্যা, সংখ্যার স্থানীয় মান ও শূন্য)। বীজগণিত ছিল খাওয়ারিজমির দ্বিতীয় কর্মক্ষেত্র। এটি গণিতশাস্ত্রের একটি শাখা। এটি তখনও পদ্ধতিমূলক গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল না।

ড্রেপার বলেন, পরীক্ষানিরীক্ষা এবং পর্যবেক্ষণ আরবদের স্বভাবগত বিষয়। জ্যামিতি ও গণিতকে তারা চিন্তা ও অনুমানের উপায় মনে করত। প্রণিধানযোগ্য বিষয় এই যে, যন্ত্রকৌশল, তরল পদার্থ ও আলোকবিদ্যা সম্পর্কে তারা যা লিখেছেন তাতে কেবল তত্ত্বের ওপর নির্ভর করেননি; বরং পরীক্ষানিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভরশীল হয়েছেন। এটা তাদের জন্য রসায়নশাস্ত্রকে কাজে লাগানোর পথ প্রস্তুত করে দিয়েছে। পরিশোধন ও বাষ্পীভবনের সরঞ্জাম এবং ভারী বস্তু উত্তোলন-যন্ত্র আবিষ্কারে তাদের পথপ্রদর্শন করেছে...। এর মাধ্যমে তাদের সামনে জ্যামিতি এবং ত্রিকোণমিতির উৎকর্ষ ও সমৃদ্ধি সাধনের বিশাল দুয়ার উন্মোচিত হয়।

ডেভিড ইউজিন স্মিথ তার গণিতশাস্ত্রের ইতিহাস গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে উল্লেখ করেছেন, ইউরোপীয়রা দাবি করে থাকে যে দোলক-নীতির আবিষ্কারক হলেন গ্যালিলিও। অথচ ইবনে ইউনুস তার আগেই এই নীতি পর্যবেক্ষণ করেন। কারণ, আরবের জ্যোতির্বিদগণ তারকা পর্যবেক্ষণকালে সময়ের হিসাব রাখার জন্য দোলক ব্যবহার করতেন।

জর্জ সার্টন তার Introduction to the History of Science গ্রন্থে সম্পূরকরূপে আরও বলেন, ইবনে ইউনুস সন্দেহাতীতভাবে খ্রিষ্টীয় একাদশ শতকের অন্যতম প্রতিভাবান মনীষী। তিনি মিশরের একজন মহান জ্যোতির্বিদ। তিনিই দোলকের আবিষ্কারক।

ইয়োহান গ্যোটে বলেন, আরবরা আমাদেরকে গ্রন্থ রচনা শিখিয়েছে। বারুদের ব্যবহার এবং কম্পাসও আবিষ্কার করেছে। আমাদের ভাবা উচিত, আরব সভ্যতার যেসব কীর্তি আমাদের হাতে পৌঁছেছে তা সক্রিয় ভূমিকা পালন না করলে আমাদের রেনেসাঁস সম্ভব হতো না।

শার্ল সেইনোবোস বলেন, আরবরা প্রাচ্যের প্রাচীন বিশ্ব (গ্রিস, পারস্য, ভারতবর্ষ ও চীন) থেকে প্রাপ্ত বিজ্ঞানের সব আবিষ্কার একত্র করেছে, সমন্বয় করেছে এবং তারাই তা আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছে। অনেক আরবি শব্দ আমাদের ভাষায় প্রবেশ করেছে। এটা সাক্ষ্য দেয় যে, আমরা তাদের থেকে বিজ্ঞানের অনেককিছু গ্রহণ করেছি। আরবদের কল্যাণেই বর্বর পাশ্চাত্য জগৎ সভ্যতার কাতারে প্রবেশ করতে পেরেছে। আমাদের চিন্তা এবং শিল্প ছিল সেকেলে। তখন জীবনকে সহজ ও স্বস্তিকর করার সব আবিষ্কার আরবদের থেকে আমাদের কাছে এসে হাজির হয়। ইউরোপীয়রা আরবদের থেকে অনেক শিল্পকৌশল শিখে নিয়েছিল; এগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল বস্ত্রশিল্প। ইতালির পিসার অধিবাসীরা আলজেরিয়ার বেজায়া শহরে যাত্রাবিরতি করত। সেখান থেকে তারা মোমবাতি বানানোর বিদ্যা আয়ত্ত করে নিয়েছিল। পরে এই বিদ্যা তারা নিজ দেশে ও ইউরোপে সরবরাহ করে।

রেসন বলেন, আবাদি এলাকায় আরবদের সাম্রাজ্য বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সমান দ্রুততায় তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতিরও বিকাশ ঘটে। তা আমাদের আরব সভ্যতা সম্পর্কে অবগত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। এই উন্নত সভ্যতা মধ্যযুগে ছিল বাইজান্টাইনীয় এবং পারস্যসভ্যতার মিশ্রিতরূপ। সভ্যতার এ ধরনের মিশ্রণ পরিপূর্ণতা পায় দুটি কারণে: এক. আরবদের ব্যবসাপ্রীতি; দুই. নগরায়ণের প্রতি তাদের অনুরাগ। তীক্ষ্ম মেধা এবং প্রত্যেক বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের সহজাত প্রেরণা তাদেরকে পদার্থবিদ্যা এবং গণিতশাস্ত্রে আত্মনিয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ করে। পৃথিবীর সকল জাতির ওপর আরবদের অশেষ অবদান রয়েছে। বিশেষ করে আরবি সংখ্যা, বীজগণিত উদ্ভাবন এবং জ্যামিতির সুষম রূপদানের ক্ষেত্রে।

এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকায় বলা হয়েছে, সত্য কথা এই যে, বর্তমান সময়ে প্রচলিত অনেক ওষুধের নাম, ওষুধের উপাদান এবং ওষুধ প্রস্তুতকরণপ্রণালি আরবদের সৃষ্টি; বরং বাস্তবতা এই যে, আধুনিক রাসায়নিক পরিবর্তন ও সংশোধন (Chemical modifications) ছাড়াও আধুনিক ওষুধবিজ্ঞানের ভিত্তি রচনা করেছেন আরবরা।

টিকাঃ
৪৩৮. সিগ্রিঃ হংকে, শামসুল আরাব তাসতাউ আলাল গারব, পৃ. ১১।
৪০৯. রবার্ট ব্রিফল্ট, The Making of Humanity, আনওয়ার আল-জুনদি, মুকাদ্দিমাতুল উলুম ওয়াল-মানাহিজ, খ. ৪, পৃ. ৭১০ থেকে উদ্ধৃত।
৪৪°. সিগরিড হুংকে: শামসুল আরাব তাসতাউ আলাল গারব, পৃ. ৪০১, ৪০২।
৪৪১. সিগরিড হুংকে: শামসুল আরাব তাসতাউ আলাল গারব, পৃ. ১৪৮, ১৪৯।
৪৪২. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫০।
৪৪৩. Florian Cajori, A History of Physics in its Elementary Branches (১৯১৭)।-অনুবাদক
৪৪৪. আলি আবদুল্লাহ দাফফা, আল-উলুমুল বাহতাহ ফিল-হাদারাতিল আরাবিয়‍্যাতিল ইসলামিয়া, পৃ. ৩০৩।
৪৪৫. ১৯৫৩ সালে ব্রিস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ইসলামি আরবসভ্যতা শীর্ষক সেমিনারে ম্যাক্স ফ্যান্টিগো এ কথা বলেন। দেখুন, শাওকি আবু খলিল, হানি মুবারক, দাওরুল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিন-নাহদাতিল উরুব্বিয়‍্যা, পৃ. ১২৫।
৪৪৬. রবার্ট ব্রিফল্ট, নাশআতুল ইনসানিয়‍্যা, পৃ. ৮৪।
৪৪৭. পিটার ই. পোরম্যান (Peter E. Pormann) ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্রুপদি ও গ্রিক-অ্যারাবিক স্টাডিজের অধ্যাপক। তিনি ও এমিলি স্মিথ যৌথভাবে Medieval Islamic Medicine গ্রন্থটি রচনা করেছেন। পিটা ই. পোরম্যানের আরেকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো The Philosophical Works of Al-Kindi।-অনুবাদক
৪৪৮. এমিলি স্যাভেজ স্মিথ (Emilie Savage-Smith): ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট এস কলেজের মহাফেজখানার তত্ত্বাবধায়ক।
৪৪৯. আল-আখবারুল মিসরিয়‍্যা (সংবাদপত্র), ১৩ এপ্রিল, ২০০৭।
৪৫০. আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়‍্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামি, পৃ. ৩৫৬।
৪৫১. ডোনাল্ড আর, হিল, আল-উলুমু ওয়াল-হানদাসাতু ফিল-হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, অনুবাদ: আহমাদ ফুয়াদ পাশা, পৃ. ১০২।
৪৫২. প্রাগুক্ত, পৃ. ৯৮।
৪৫৩. গুস্তাভ লি বোঁ, হাদারাতুল আরাব, পৃ. ৪৭৫।
৪৫৪. كتاب المختصر في حساب الجبر والمقابلة (The Compendious Book on Calculation by Completion and Balancing)।
৪৫৫. আলি আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা।
৪৫৬. জাঁ ফ্রিনেট, যোসেফ শ্যখট (Joseph Franz Schacht) ও ক্লিফোর্ড বসওয়থ (Clifford Edmund Bosworth) কর্তৃক সম্পাদিত The Legacy of Islam, আরবি অনুবাদ: تراث الاسلام, ৩য় অংশ, পৃ. ১৬৮।
৪৫৭. লক্ষণীয় বিষয় হলো, অধিকাংশ প্রাচ্যবিদ আরব বলে মুসলিম উদ্দেশ্য নেন। এখানেও তা-ই ঘটেছে।
৪৫৮. মুহাম্মাদ কুরদ আলি, আল-ইসলামু ওয়াল-হাদারাতুল আরাবিয়্যা, খ.১, পৃ. ৩২২-৩২৮।
৪৫৯. David Eugene Smith, History of Mathematics.
৪৬০. ইওরা ইউত। আবুল হাসান আলি ইবনে আবদুর রহমান ইবনে ইউনুস (মূ. ৩৯৯ হি./১০০৯ খ্রি)। জ্যোতিবিজ্ঞানী। উল্লেখযোগ্য রচনা আল-যিজুল হাকমি, যা যিজ ইবনে ইউনুস নামে পরিচিত। মিশরের ভূভাগে জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন আয়রেছে। অভাবী হির সময় পরমাপের জন্য তিনি দোলক ব্যাবহার করেছিলেন তিনি হলেন ইবনে ইউনুস। তেমুন, ইবনে আইকন, দাকায়াকুল অধ্যয়ন, খ. ২, পৃ. ৩৩
৪৬১. ফোরসাউলে আরাবিয়্যাইক ইংল্যামিয়া, আরও পিডিএফ বই ডাউনলোড করুন www.boimate.com
৪৬২. মুহাম্মাদ কুরদ আলি, আল-ইসলামু ওয়াল-হাদারাতুল আরাবিয়্যা, খ. ১, পৃ. ১৯৯।
৪৬৩. প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ২০০-২০১।
৪৬৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ২০১।
৪৬৫. এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, খ. ১৮, পৃ. ৪৬, ১১তম সংস্করণ।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 নীতি-নৈতিকতার ক্ষেত্রে পশ্চিমা সুবিবেচকদের স্বীকৃতি

📄 নীতি-নৈতিকতার ক্ষেত্রে পশ্চিমা সুবিবেচকদের স্বীকৃতি


নৈতিকতা ধর্ম থেকেই উৎসারিত। যে ধর্ম নৈতিকতায় উদ্বুদ্ধ করে, নৈতিক গুণাবলিতে ভূষিত হওয়ার আহ্বান জানায় এবং চারিত্রিক কদর্যতাকে ঘৃণিত করে তোলে, এমন ধর্মের বন্ধন না থাকলে নীতিমান হওয়া যায় না। ইসলামি সভ্যতায় নৈতিকতার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ প্রাচ্যবিদদের যে প্রশংসা ও স্বীকৃতি রয়েছে তার অধিকাংশ মূলত সামগ্রিক অর্থে ইসলামধর্মেরই প্রাপ্য।

পাশ্চাত্যের নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের সেরকম কিছু স্বীকৃতি ও প্রশংসাবাণী এখানে উল্লেখ করা হলো:

গ্লেন লিউনার্দ বলেন, ইসলামি বিধিবিধান মেনে চললে ইউরোপের অবস্থা আজ এমন জটিল সমীকরণ থেকে যোজন যোজন দূরে থাকত এবং চরম অকৃতজ্ঞতা ও হেয়জ্ঞান করার নীচু মানসিকতার পরিবর্তে চিরকৃতজ্ঞতার পরিবেশ তৈরি হতো। অথচ আজ পর্যন্ত ইউরোপ সত্যিকার অর্থে ও নিরপেক্ষ মানসিকতা নিয়ে মহান ইসলামধর্মের স্বীকৃতি দেয়নি, অথচ তারা ইসলামি শিক্ষা ও আরব সভ্যতার জন্য এই ধর্মের কাছে ঋণী। তবে তারা নিতান্ত অনাগ্রহ ও শৈথিল্যের সঙ্গে এই ধর্মের ঋণ স্বীকার করেছে শুধু সেই অন্ধকার যুগের জন্য যখন সমগ্র ইউরোপ হাবুডুবু খাচ্ছিল বর্বরতা ও অজ্ঞতার মহাসাগরে। ইসলামি সভ্যতায় আরবরা জ্ঞান ও নাগরিক সমৃদ্ধির শ্রেষ্ঠত্বে পৌঁছেছে এবং ইউরোপীয় সমাজব্যবস্থাকে জীবন দিয়েছে, তাকে অধঃপতনের কবল থেকে রক্ষা করেছে। সভ্যতা ও সংস্কৃতির শীর্ষ অবস্থানে থেকে আমাদের আত্মোপলব্ধি এই যে, যদি ইসলামি সংস্কৃতি ও আরব সভ্যতা এবং নাগরিক সমস্যা সমাধানে তাদের জ্ঞান ও শ্রেষ্ঠত্ব এবং তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উত্তম ব্যবস্থাপনা না থাকত, তাহলে আজ পর্যন্ত ইউরোপ মূর্খতার অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকত।

ইংরেজ ঐতিহাসিক এইচ. জি. ওয়েলস বলেন, যে ধর্ম নাগরিক সভ্যতার ক্রমবিকাশে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না, তাকে দেয়ালে ছুঁড়ে মারো। আমি যে সত্যধর্মকে নাগরিক সভ্যতার ক্রমবিকাশে তাল মিলিয়ে চলতে দেখেছি তা হচ্ছে ইসলামধর্ম।

কেউ প্রমাণ চাইলে কুরআন পড়ুক এবং কুরআনে বর্ণিত দৃষ্টিভঙ্গি, জ্ঞানের ধারা, সামাজিক রীতিনীতি লক্ষ করুক। সর্বোপরি এটা ধর্ম, বিজ্ঞান, সমাজ, নীতিশাস্ত্র, ইতিহাস ইত্যাদি সর্বজ্ঞানের এক কিতাব। কেউ যদি আমার কাছে সংক্ষেপে ইসলামের সংজ্ঞা চায়, তাহলে এক কথায় বলব, ‘ইসলাম মানেই হলো সভ্যতা’।

রবার্ট ব্রিফল্ট বলেন, রজার বেকন ছিলেন ইসলামি জ্ঞান ও রীতি-পদ্ধতিকে খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী ইউরোপে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে একজন দূত। তিনি স্পষ্ট ভাষায় এ কথা বলতে কখনো দ্বিধা করেননি যে, আরবি ভাষা ও আরবদের জ্ঞানবিজ্ঞান হলো সত্যে উপনীত হওয়ার একমাত্র পথ...।

ইসলামি সভ্যতা স্বাভাবিকভাবেই কুরআনের শিক্ষা থেকেই উৎসারিত। আর ইসলামি সভ্যতা যেভাবে ন্যায়পরায়ণতা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ এবং একত্ববাদের বিচারে থেকে মানবেতিহাসের অন্য সকল সভ্যতা থেকে ভিন্ন, তেমনই সহিষ্ণুতা, মানবিকতা ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের দিক থেকেও এই সভ্যতা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল।

আর গুস্তাভ লি বোঁ বলেন, নিঃসন্দেহে আরবীয় মুসলিম সভ্যতাই ইউরোপের বর্বর জাতিগুলোকে মানবিক জগতে প্রবেশ করিয়েছে। নিশ্চয় আরবরা আমাদের শিক্ষক। ...আর এটা সত্য যে পাশ্চাত্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আরবদের রচনাবলি ছাড়া জ্ঞানচর্চার জন্য অন্য কোনো উৎস খুঁজে পায়নি। সুতরাং বলা যায় আরবরাই ইউরোপকে সুসভ্য করেছে। সেটা বৈষয়িক দিক থেকে যেমন, তেমনই বুদ্ধিবৃত্তিক ও নীতি-নৈতিকতার দিক থেকেও। বিশ্ব-ইতিহাস আরবদের ন্যায় এমন স্বর্ণপ্রসবা জাতি আর প্রত্যক্ষ করেনি।... সভ্যতার ক্ষেত্রে ইউরোপ আরবদের কাছে ঋণী।... প্রথম আরবরাই বিশ্ববাসীকে শিক্ষা দিয়েছে যে, কীভাবে ধর্মের ওপর অবিচলতা এবং চিন্তার স্বাধীনতার মধ্যে সামঞ্জস্য ও ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়।... তারাই খ্রিষ্টান জাতিকে শিক্ষিত করে তুলেছে, বরং চাইলে বলতে পারো যে, তারাই খ্রিষ্টানজাতিকে মানবতার শ্রেষ্ঠ গুণ সহিষ্ণুতা ও উদারতা শিক্ষাদানের প্রয়াস পেয়েছে।... ইসলামের শুরুর যুগে মুসলিমদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও নৈতিক গুণাবলি বিশ্বের অন্য সকল জাতির চরিত্র-বৈশিষ্ট্য থেকে বহুগুণে শ্রেষ্ঠ ছিল।

এন্ড্রু ডিকসন হোয়াইট বলেন, হযরত উমরের যুগ ও তার পরবর্তী সময় থেকে মুসলিমবিশ্বে মানসিক প্রতিবন্ধীদের সঙ্গে অত্যন্ত মমতাপূর্ণ ও মানবিক আচরণ করা হয়। কিন্তু গোটা খ্রিষ্টীয় জগতের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রায় আট শতাব্দীব্যাপী এই অবস্থা বিরাজমান ছিল। সে সময়ে ইউরোপে মানসিক রোগীদের শয়তানের আছরগ্রস্ত মনে করা হতো। যে কারণে তাদের সঙ্গে চরম নিষ্ঠুর ও বর্বর আচরণ করা হতো।

তিনি আরও বলেন, পাদরি জন হার্ড অষ্টাদশ শতকে এবং অন্যান্য ইউরোপীয় পাদরি ও পরিব্রাজকেরা সে সময়ে এবং তারও পূর্বে পর্যবেক্ষণ করেন যে, মুসলিমগণ মানসিক প্রতিবন্ধীদের জন্য অত্যন্ত মানবিকতাপূর্ণ উপায় অবলম্বন করেন। এ ধরনের কোনো দৃষ্টান্ত তারা খ্রিষ্টীয় ইউরোপ-ভূমিতে দেখতে পাননি। সত্য এটাই যে মানসিক রোগীদের সঙ্গে দয়ার্দ্র ও মানবিকতাপূর্ণ আচরণের ক্ষেত্রে মুসলিমরা বহু পূর্বেই সচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন, অথচ ইউরোপে এর সূচনা ঘটেছে অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে।

ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু তার বিখ্যাত গ্রন্থ ডিসকভারি অব ইন্ডিয়াতে বলেন, ভারতের উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে মুসলিম বিজেতাদের আগমন ও ইসলামের প্রবেশ ভারতের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ভারতীয় সমাজে যে ব্যাধি ও পচন ছড়িয়ে পড়েছিল, ইসলাম তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। যে বর্ণভেদ, অদ্ভুত প্রথা ও বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার প্রবণতা ভারতবর্ষকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল ইসলামই তা চিহ্নিত করেছে। ইসলামি ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের যে দৃষ্টিভঙ্গি মুসলিমজাতি লালন করে ভারতীয়দের জনমনে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। এই প্রভাব সেসব দুর্ভাগা জনগোষ্ঠীর ওপরই ছিল সর্বাধিক, ভারতীয় সমাজব্যবস্থা যাদের সাম্য ও মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছিল।

প্রফেসর হকিং বলেন, জ্ঞানের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা ও জ্ঞানের ক্ষেত্রগুলোর প্রতি অনির্বাণ তৃষ্ণা ছিল আরবদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। এই বৈশিষ্ট্যই তাদের সৃজনশীল প্রতিভাকে প্রবলভাবে শাণিত করে তোলে। তারা ছিল স্বাধীনচেতা। সকল ধরনের স্থবিরতা ও পক্ষপাতিত্ব পরিহার করে সবসময় তারা শ্রেষ্ঠ ও উত্তম আদর্শের অভিলাষী ছিল। ... অচিরেই আমরা দেখতে পাব, যে অগ্নিময় ঝাঁপটা ও আত্মবিস্মৃতির ঘোর আরবদের আচ্ছন্ন করে রেখেছে, তা কেটে গেলে, জ্ঞানবিপ্লব ও বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্জাগরণের সুপ্ত উপাদানসমূহের উদ্গিরণ ঘটবে। ফলে আরবরা পুনরায় বিশ্বের বুকে তাদের মর্যাদাপূর্ণ আসন দখল করতে পারবে। প্রথম রেনেসাঁসের সময় আরবদের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তাদের রেখে যাওয়া অবিস্মরণীয় সব কীর্তি ও জ্ঞানভান্ডারই আমার কথার প্রমাণ।

টিকাঃ
৪০৬. মুহাম্মাদ কুরদ আলি, আল-ইসলাম ওয়াল-হাদারাতুল আরাবিয়্যা, পৃ. ৮২।
৪৬৭. আবদুল মুনয়িম নিমর, আল-ইসলাম ওয়াল-মাবাদিউল মুসতাওরিদা, পৃ. ৮৪।
৪৬৮. রজার বেকন (১২১৪-১২৯২ খ্রি.) মধ্যযুগের ইউরোপের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক, চিন্তাবিদ ও আধুনিক পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠার প্রয়াসে প্রথম পথিকৃৎ। রজার বেকন জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় পারদর্শী ছিলেন। তৎকালীন যাজক সম্প্রদায় কর্তৃক তিনি নানাভাবে নিগ্রহের শিকার হন। তাকে ধর্মদ্রোহীও ঘোষণা করে তারা। তিনি গ্রিক দার্শনিক ও আরব চিন্তাবিদদের চিন্তারাজিকে অধ্যয়ন করেন। জ্ঞানের ক্ষেত্রে ধর্মযাজকের বাণীর চেয়ে গ্রিক ও আরব দার্শনিকদের যুক্তি বেশি মূল্যবান ঘোষণা করায় যাজক সম্প্রদায় তার উপর ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তাকে দশ বছরেরও বেশি সময় নজরবন্দি করে রাখা হয়। সরদার ফজলুল করিম কৃত দর্শনকোষ অবলম্বনে, পৃ. ৭৪-৭৫।- অনুবাদক।
৪৬৯. রবার্ট ব্রিফল্ট, বিনাউল ইনসানিয়্যাহ, আনওয়ার জুনদি রচিত মুকাদ্দিমাতুল উলুম ওয়াল-মানাহিজ, খ. ৪, পৃ. ৭১০ থেকে উদ্ধৃত।
৪৭০. আবদুল মুতি আদ-দাল্লাতি, রাবিহতু মুহাম্মাদান ওয়া লাম আখসার আল-মাসিহ, পৃ. ১২৮।
৪৭১. গুস্তাভ লি বোঁ, হাদারাতুল আরাব, পৃ. ২৬, ২৭৬, ৪৩০, ৫৬৬।
৪৭২. এন্ড্রু ডিকসন হোয়াইট (Andrew Dickson White 1832-1918): আমেরিকান সিনেটর ও লেখক। তাকে নিউইয়র্কের কর্নেল ইউনিভার্সিটির প্রধান প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
৪৭৩. দেখুন, A. D. White, A history of the warfare of science with theology in Christendom, খ. ১১, পৃ. ১২৩।
৪৭৪. জওহরলাল নেহেরু (১৮৮৯-১৯৬৪ খ্রি.): ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা ও স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী।
৪৭৫. আবুল হাসান আলি নদবি, মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ১০৭ থেকে উদ্ধৃত।
৪৭৬. মাবাদিউস সিয়াসাতিল আলামিয়্যা, পৃ. ২৫; মুহাম্মাদ সাদিক আফিফি, তাতাউরুল ফিকরিল আলামিয়্যি ইনদাল মুসলিমিন, পৃ. ১৯ থেকে উদ্ধৃত।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 চিন্তার ক্ষেত্রে পশ্চিমা সুবিবেচকদের স্বীকৃতি

📄 চিন্তার ক্ষেত্রে পশ্চিমা সুবিবেচকদের স্বীকৃতি


ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি যে চিন্তা হলো এই দ্বীনের প্রতি ঈমানের অন্যতম স্তম্ভ। ইসলামি সভ্যতা যেসব স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এটি তার অন্যতম। আল্লাহ তাআলার চিন্তাযোগ্য কিতাবের মূল বক্তব্য এটিই, এটিই গোটা সৃষ্টিজগতের মূলকথা। পঠিত কিতাব (আল-কুরআনুল কারিম) তার বহু আয়াতে এই কিতাবে চিন্তাভাবনা করার আহ্বান জানিয়েছে...। অথচ বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, এতকিছু সত্ত্বেও এমন লোকদেরও আবির্ভাব ঘটেছে যারা চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মের প্রতি ইসলাম ও ইসলামি সভ্যতার গুরুত্বকে অস্বীকার করতে চায়!

তাদের অন্যায় দাবির খণ্ডনে স্বয়ং পাশ্চাত্যের কিছু ন্যায়বান মনীষীর সাক্ষ্য ও স্বীকৃতি জেনে নেওয়া যাক:

এতেইন্নে দিনেত (Etienne Dinet) বলেন, ইউরোপে চিন্তার স্বাধীনতা সরবরাহ করার ক্ষেত্রে প্রধান কৃতিত্ব যার তিনি হলেন আন্দালুসীয় মুসলিম দার্শনিক ইবনে রুশদ (১১২০-১১৯৮ খ্রি.)। অবশ্য আমাদের স্বাধীন চিন্তা ও নাস্তিক্যবাদের মধ্যে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। ইবনে রুশদ অ্যারিস্টটলের চিন্তা ও দর্শনের যে ব্যাখ্যা হাজির করেন তার প্রতি মধ্যযুগের ইউরোপের স্বাধীনচেতা ব্যক্তিরা অত্যন্ত উৎসাহী হয়ে ওঠেন। তার এসব ব্যাখ্যা শক্তিশালী ইসলামি ভাবপ্রবাহে ছিল। ইবনে রুশদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ গ্রহণের ফলে ইউরোপে যে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবাহ সৃষ্টি হয়েছিল, সেটাই পরবর্তী সময়ে তাদের ধর্মীয় সংস্কারের পথ উন্মুক্ত করার পাশাপাশি আধুনিক যুক্তিবাদী চিন্তাধারার উৎস ছিল। আমরা সত্যিকার অর্থে এভাবেই বিচারবিচেনা করতে পারি।

সিগরিড হুংকে বলেন, আরবজাতির বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ এবং তাদের হাতে নানান জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিমার্জন, বিন্যাস ও নিরীক্ষণ গোটা পাশ্চাত্যে জোয়ার সৃষ্টি করে...। বস্তুত সে সময়কার ইউরোপীয় জ্ঞানী মহলে এমন কোনো জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন না যিনি আরবীয় জ্ঞানভান্ডারে হাত বাড়াননি। সেখান থেকে তারা যা খুশি গ্রহণ করেছেন এবং সুমিষ্ট পানির ঝরনা থেকে পিপাসার্ত যেভাবে জলপান করে সেভাবে জ্ঞান আহরণ করেছেন।... তৎকালীন ইউরোপে রচিত এমন কোনো গ্রন্থ ছিল না যার পৃষ্ঠাসমূহে আরবীয় ঝরনাধারার প্রবল প্রবাহ পরিলক্ষিত হয় না। ইউরোপীয় প্রতিটি গ্রন্থই ছিল আরব জ্ঞানপ্রাচুর্যের মুখাভিনয়। সেগুলোতে আরবীয় প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট। শুধু আরবি শব্দ (ইউরোপীয় ভাষায়) অনুবাদের ছাপই নয়, বরং বিষয়বস্তু ও চেতনা প্রকাশেও সেই প্রভাবের সুস্পষ্ট ছাপ পরিলক্ষিত হয়।

তিনি আরও বলেন, শূন্য থেকে শুরু করে সভ্যতার ক্ষেত্রে আরবরা যে বিস্ময়কর অগ্রগতি অর্জন করেছে মানবেতিহাসের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে তা উল্লেখযোগ্য বিষয়। জ্ঞানের ময়দানে ধারাবাহিক বিজয় তাদের সকল সভ্যতার নেতৃত্বের আসনে বসিয়েছে; অন্যান্য সভ্যতার বিবেচনায় তা তুলনাহীন। আরবদের এই বিস্ময়কর অগ্রগতি আমাদেরকে অবাক করে দেয় যে ইতিহাসে তা কীভাবে ঘটল!

লুইস সিডিও বলেন, ইউরোপ যে ধরনের বিবেকহীনতা, চিন্তাগত দৈন্য, আত্মিক কলুষতা, জ্ঞান ও জ্ঞানীর সঙ্গে নির্দয় আচরণ প্রত্যক্ষ করেছে ইসলামি সভ্যতা তা প্রত্যক্ষ করেনি। ইতিহাস এটাও সাক্ষ্য দেয় যে ইউরোপে বত্রিশ হাজার জ্ঞানীগুণীকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে। এতে কোনো মতভেদ নেই যে, চিন্তার স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ইসলামি ইতিহাস এরকম জঘন্য অত্যাচারের সম্মুখীন হয়নি। বরং সে অন্ধকার যুগে একমাত্র মুসলিমরাই জ্ঞানবিজ্ঞানের সাধনা করত। এমনটি কখনো ঘটেনি যে কোনো ধর্ম-রাষ্ট্র ক্ষমতায় আরোহণ করেছে, আর আকিদা-বিশ্বাসে বিরুদ্ধবাদীদেরকে সর্বপ্রকার স্বাধীনতা দিয়ে সহায়তা করেছে, অথচ ইসলামি সভ্যতা সর্বদাই জনগণকে সব রকমের স্বাধীনতা প্রদান করেছে।

ফরাসি প্রাচ্যবিদ ব্যারন কারা ডি ভো বলেন, আরবরা বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন এবং জ্ঞানসংক্রান্ত গবেষণায় সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে এমন সময়ে যখন খ্রিষ্টজগৎ বর্বরতার করাল গ্রাস থেকে মুক্তির জন্য মরিয়া হয়ে সংগ্রাম করছে (যা পনেরো শতাব্দী পর্যন্ত অব্যাহত থাকে)। আরবরা নবম এবং দশম শতাব্দীতে তাদের উৎকর্ষ ও উন্নতির শীর্ষে পৌঁছে। দ্বাদশ শতাব্দীর পর থেকে প্রত্যেক বিজ্ঞানমনস্ক পশ্চিমা ব্যক্তির প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে মারাকেশ এবং মধ্যপ্রাচ্য। আর এ সময়ে ইউরোপীয়রা আরবদের জ্ঞানভান্ডার অনুবাদ করতে শুরু করে। যেভাবে আরবরা গ্রিকদের জ্ঞানভান্ডার অনুবাদ করেছিল।

মরিস বুকাইলি তার The Bible, The Qur'an and Science গ্রন্থে বলেন, আমরা জানি, ইসলামের দৃষ্টিতে ধর্ম এবং বিজ্ঞান জমজ দুই সন্তানের মতো। বিজ্ঞানকে পরিমার্জন করা শুরু থেকেই ইসলামের ধর্মীয় নির্দেশনার অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই বিধি প্রয়োগের ফলে ইসলামি সভ্যতার যুগে আশ্চর্যজনক বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্ব রেনেসাঁসের পূর্ব থেকেই তার দ্বারা উপকৃত হয়েছিল।

হিন্দুস্তানি জাতিসত্তা এবং ধর্মীয় পরিমণ্ডলের উপর ইসলামি একত্ববাদী বিশ্বাসের ভূমিকার কথা আলোচনা করতে গিয়ে মিশরে নিযুক্ত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত কে. এম. পানিক্কর (১৮৯৫-১৯৬৩ খ্রি.) বলেন, এটা সুস্পষ্ট যে, এই (ইসলামি) যুগে হিন্দুধর্মের ওপর ইসলামের গভীর প্রভাব ছিল। হিন্দুদের মধ্যে যে আল্লাহর ইবাদতের (ঈশ্বরের উপাসনার) চিন্তা তা ইসলামের ভাবধারাপ্রসূত। এই যুগে চিন্তা ও ধর্মের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা তাদের দেবতাদের ভিন্ন ভিন্ন নামে আখ্যায়িত করা সত্ত্বেও এক আল্লাহর ইবাদতের প্রতি আহ্বান করেছেন এবং স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে ইবাদতের উপযুক্ত উপাস্য একজনই, কেবল তারই কাছে মুক্তি ও সৌভাগ্য প্রার্থনা করা যায়। ইসলামি যুগে ভারতে যেসব ধর্মান্দোলনের উদ্ভব ঘটেছে সেগুলোর ওপর ইসলামি চিন্তাধারার প্রভাব ছিল স্পষ্ট। যেমন ভক্তি আন্দোলন এবং কবীর পরমেশ্বর আন্দোলন।

ফরাসি ঐতিহাসিক লুইস সিডিও ইসলামি সভ্যতার মৌলিক দিকগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে যাচাই-বাছাই করেন এবং অবশেষে এ কথা বলে তার বক্তব্যের সমাপ্তি টানেন, আধুনিক ইউরোপের ওপর ইসলামি সভ্যতার প্রভাব খুবই সুস্পষ্ট।

যাই হোক, ইসলামি সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রভাব সম্পর্কে এসব বক্তব্য ন্যায়নিষ্ঠ ও ইনসাফপরায়ণ পশ্চিমা ঐতিহাসিক ও প্রাচ্যবিদদের।

ব্রিটেনের প্রিন্স চার্লসের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করে এ অধ্যায়ের ইতি টানছি। তিনি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্রে (Oxford Centre for Islamic Studies) 'ইসলাম ও পাশ্চাত্য' শীর্ষক এই বক্তব্য দিয়েছিলেন। বক্তব্যটির চুম্বকাংশ নিচে দেওয়া হলো :
ইসলামের প্রকৃতি ও স্বভাব সম্পর্কে পাশ্চাত্যে ব্যাপক ভুল ধারণা রয়েছে। আমাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি ইসলামি বিশ্বের কাছে যে সমৃদ্ধি ও ঐশ্বর্যের কারণে ঋণী সে সম্পর্কেও আমাদের মধ্যে সমপরিমাণ অজ্ঞতা রয়েছে। মুসলিম শাসনামলে স্পেন শুধু রোমান ও গ্রিক সভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিক ঐশ্বর্যকে সংগ্রহ ও সংরক্ষণই করেনি, বরং সেই সভ্যতার বিস্তৃতি ও বিকাশ ঘটিয়েছে ব্যাপকভাবে। সে সময় স্পেন তার নিজের পক্ষ থেকে মানব-গবেষণার বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, আলজেব্রা-শাখাটি মূলত আরবি আইনবিদ্যা, ইতিহাস, চিকিৎসা, রসায়ন, আলোকবিজ্ঞান, কৃষি ও স্থাপত্যশিল্পে তাদের গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি রয়েছে।
দশম শতকে কর্ডোভা জ্ঞানবিজ্ঞানে ও সভ্যতা-সংস্কৃতিতে ইউরোপের সবচেয়ে সমৃদ্ধ নগরীতে পরিণত হয়। এখন আধুনিক ইউরোপ যেসব বৈশিষ্ট্য নিয়ে গর্ববোধ করে সেগুলো মূলত স্পেনে মুসলিম শাসনামলের গৌরব ও অবদানের স্মারকচিহ্ন। কূটনীতি, স্বাধীন ব্যবসানীতি, উন্মুক্ত সীমানা, প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা-পদ্ধতি, নৃবিজ্ঞান, শিষ্টাচার, পোশাকশিল্পের বিকাশ, বিকল্প চিকিৎসাব্যবস্থা (Alternative medicine) এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা-এ সবকিছু সেই সমৃদ্ধ নগরী (কর্ডোভা) থেকেই প্রাপ্ত।

এগুলোর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এই যে, ইসলাম আমাদের পৃথিবীতে সমঝোতার সঙ্গে জীবনযাপনের পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছে। এ ব্যাপারগুলো খ্রিষ্টধর্মে নেই এবং তা এই ধর্মকে দুর্বলতম স্থানে পৌঁছে দিয়েছে। সৃষ্টিজগতের প্রতি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা অনুসারেই পৃথিবীকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব। কেননা ইসলাম মানুষ ও প্রকৃতি, ধর্ম ও বিজ্ঞান, বিবেক ও জড়বস্তুর মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরিকে প্রশ্রয় দেয়নি; বরং এগুলোর মধ্যকার সম্পর্ককে জোরালো করেছে। একত্বের প্রতি এবং আমাদের চারপাশের পৃথিবীর পবিত্র ও আত্মিক প্রকৃতির সুরক্ষার প্রতি এমন প্রগাঢ় অনুভূতি এক অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা ইসলাম থেকে আমরা নতুন করে শিখতে পারি।

আধুনিক ইউরোপের রেনেসাঁসে ইসলামি সভ্যতার অবদান সম্পর্কে বিশদ বিবরণ জানতে লুইস সিডিও রচিত 'তারিখুল আরাবিল আম' গ্রন্থের ষষ্ঠ অধ্যায়ে 'ওয়াসফুল হাদারাতিল আবাবিয়্যাহ' শীর্ষক আলোচনা দেখুন। আরও দেখতে পারেন গুস্তাভ লি বোঁ-র হাদারাতুল আরাব গ্রন্থের পঞ্চম অধ্যায় এবং সিগরিড হুংকের 'শামসুল আরাব তাসতাউ আলাল গারব' গ্রন্থটি। এসব গ্রন্থগুলোতে পাশ্চাত্যসভ্যতার ওপর ইসলামি সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করা হয়েছে। উপরন্তু জর্জ সার্টন (George Sarton, 1884-1956) রচিত ‘মুকাদ্দামাতুন ফি তারিখিল উলুম’ গ্রন্থে যত উৎস ও তথ্যসূত্র উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো দেখা যেতে পারে।

এসব বর্ণনা সন্দেহাতীতভাবে ইসলামি সভ্যতার মৌলিকত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব, উন্নতি, সামগ্রিকতা ও ক্রমবিকাশ, বাস্তবতা ও উদারতা এবং মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রায় ও আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতার গোড়াপত্তনে বিরাট অবদানের প্রমাণ বহন করে।

সময় হয়েছে এখন নবজাগরণের প্রত্যাশায় ইসলামি সভ্যতার সেসব অবদান অনুধাবন করার।

টিকাঃ
৪৭৭. এতেইন্নে দিনেত (Etienne Dinet 1861-1929): ফরাসি প্রাচ্যবিদ, চিত্রকর। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখক।
৪৭৮. এতেইন্নে দিনেত, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ, পৃ. ৩৪৩।
৪৭৯. সিগরিড হুংকে, শামসুল আরাব তাসতাউ আলাল গারব, পৃ. ৩০৫, ৩০৬।
৪৮০. সিগরিড হুংকে, শামসুল আরাব তাসতাউ আলাল গারব, পৃ. ৩৫৪।
৪৮১. হাসসান শামসি পাশা, হাকাযা কানু ইয়াওমা কুন্না, পৃ. ৮০।
৪৮২. ব্যারন বার্নার্ড কারা ডি ভো (Baron Bernard Carra De Vaux): ফরাসি প্রাচ্যবিদ। ফরাসি ভাষাতেই লিখেছেন। তার আগ্রহের বিষয় ছিল আরবের জ্ঞানভান্ডার। মুসলিম বিজ্ঞানীদের কয়েকটি রচনা তিনি পুনর্নিরীক্ষণ ও সম্পাদনা করেছেন।
৪৮৩. বার্নার্ড কারা ডি ভো: টমাস আর্নল্ড সম্পাদিত তুরাসুল ইসলাম গ্রন্থে আল-ফালাক ওয়ার-রিয়াদিয়‍্যাত শীর্ষক প্রবন্ধ, পৃ. ৫৬৪।
৪৮৪. ওয়াহিদুদ্দিন খান, আল-ইসলাম ইয়াতাহাদ্দা, পৃ. ১৪।
৪৮৫. বক্তব্যটি ১৯৮২ সালের অক্টোবর মাসে নয়ডা সাহেবে অবস্থিত ইংল্যান্ডের দূতাবাস বক্তব্যটির আমাই অনুমোদ আর পার, পরবর্তী সময়ে প্রিন্স চার্লসের ঘরকে তা পুষ্টিতা আকারে প্রকাশ
৪৮৬. ফরাসি ঐতিহাসিক লুইস সিডিও ইসলামি সভ্যতার মৌলিক দিকগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে যাচাই-বাছাই করেন এবং অবশেষে এ কথা বলে তার বক্তব্যের সমাপ্তি টানেন, আধুনিক ইউরোপের ওপর ইসলামি সভ্যতার প্রভাব খুবই সুস্পষ্ট।
৪৮৮. 'ইসলাম ও পাশ্চাত্য' শীর্ষক বক্তৃতা, প্রিন্স চার্লস ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ অক্টোবর অক্সফোর্ড সেন্টার ফর ইসলামিক স্টাডিজ-এ এই বক্তৃতা প্রদান করেন। তারপর ব্রিটিশ দূতাবাস এই বক্তৃতার অনূদিত কপি দামেশকে বিতরণ করে। পরবর্তী সময়ে প্রিন্স চার্লসের অর্থায়নে তা একটি ছোট পুস্তিকায় মুদ্রিত হয়ে প্রকাশিত হয়।
৪৮৯. Histoire des Arabes (১৮৫৪), ফরাসি থেকে আরবি অনুবাদ করেছেন আদিল যুআইতার।
৪৯০. Introduction to the History of Science.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00