📄 শিল্পকলায় ইসলামি সভ্যতার প্রভাব
ইসলামি সভ্যতা কীভাবে ও কোন পথে ইউরোপে অর্থাৎ পাশ্চাত্যে পৌছেছিল তা আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি। এসব পথ দিয়ে ইসলামি স্থাপত্যশিল্প ও অলংকরণশিল্পও ইউরোপে পৌছেছিল। প্রায়োগিক শিল্পকলার অধিকাংশ শৈলীই (ফর্ম) পৌঁছে গিয়েছিল পশ্চিমা দেশগুলোতে। ফলে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে পাশ্চাত্য সভ্যতায় ইসলামি শিল্পকলার প্রভাব সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইউরোপীয় চারুশিল্পের অনেক ক্ষেত্রে দর্শন ও রূপ উভয়টিই ইসলামি উৎস থেকে নেওয়া। কতিপয় বাস্তবতা এদিকেই ইঙ্গিত করে।
কিন্তু দুঃখের ব্যাপার এই যে, কিছু পশ্চিমা শিল্পী তাদের কাজের সঙ্গে পরিপূরকরূপে বা আলংকারিক উপায়ে ইসলামি শিল্পরূপের সংমিশ্রণ ঘটালেও আরবি লিখনের হরফসমূহের প্রতিলিপির সময় শাব্দিক অর্থ বোঝেননি এবং মুসলিম শিল্পীর উদ্দিষ্ট তাৎপর্য অনুধাবন করেননি। তারা আরবি লিপি ব্যবহার করেছেন, তার অর্থ নয়; নিরর্থক বাহ্যিক আলংকারিক বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তুলে চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার দিকটি বেছে নিয়েছেন।
এই প্রসঙ্গে গুস্তাভ লি বোঁ আরবি লিপিকলার পক্ষে সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, আরবি লিপিকলা আলংকারিক নান্দনিকতার এমন পর্যায়ে পৌছে গিয়েছিল যে, মধ্যযুগে ও রেনেসাঁসের কালে আরবি লেখার যে খণ্ড-বিশেষই খ্রিষ্টান শিল্পবোদ্ধাদের হস্তগত হতো, সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্দেশ্যে তাদের ধর্মীয় স্থাপনাসমূহে তার প্রতিলিপি স্থাপন করাতেন। এ কাজটি তারা অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ততা ও আবেগের সঙ্গে করতেন।
মশিয়ে ল্যাংব্রিয়েহ ও মশিয়ে লাভোইসসহ অনেকেই ইতালিতে সেগুলো প্রত্যক্ষ করেছেন। মশিয়ে লাভোইস এও দেখেন যে, মিলান ক্যাথিড্রালের মালপত্র রাখার জায়গায় পিকারিন নকশায় নির্মিত একটি দরজা, দরজার চারপাশে পাথরের কার্নিশ, কার্নিশের উপর একটি আরবি শব্দ কয়েকবার উৎকীর্ণ। সেন্ট পিটারস ব্যাসিলিকার (St. Peter's Basilica) দ্বারসমূহের উপর অঙ্কিত যিশুর মাথার চারপাশে আরবি লিপি রয়েছে। পোপ চতুর্থ ইউজিনের (Pope Eugene IV) নির্দেশে এই গির্জা নির্মাণ করা হয়েছিল। এখানে সেন্ট পিটার এবং সেন্ট পলের যে মূর্তি ছিল তার আলখাল্লায় দীর্ঘ কুফি লিপি উৎকীর্ণ ছিল।
এরপর তিনি বলেন, আমার আফসোস হলো, এসব আরবি লেখাগুলোর লেখক তার অনুবাদ করেনি। সম্ভবত যিশুর মাথার চারপাশের লেখাটি ছিল- لا إله إلا الله محمد رسول الله।
আরব-ইসলামিক অলংকরণশিল্প বহু ইউরোপীয় শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গি ও শৈলীকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল। কারণ আরবি লিপিকলা কতিপয় ইউরোপীয় শিল্পীর দর্শন ও চিত্রকর্মে প্রভাব ফেলেছিল। আরব-ইসলামি শিল্পকলার অন্যতম সৃষ্টি আরবি লিপিকলা, তার প্রকরণ ও ফর্মে রয়েছে সমৃদ্ধ বৈচিত্র্য এবং বহুবিধ আঙ্গিক ও শৈলীতে তার অলংকরণ সম্ভব। ইসলামি অলংকরণশিল্পের প্রভাব-বিস্তার শুরু হয় ক্রুসেডের সময় থেকে, যখন ইউরোপীয়রা আরবদের সংস্পর্শে আসার সুযোগ লাভ করে। এর শৈল্পিক ঐশ্বর্য ও সমৃদ্ধি তাদের উদ্দীপ্ত করে তোলে এবং তারা চরমভাবে আকর্ষিত হয়।
ফলে তারা তাদের শিল্পকর্মে এর ব্যবহার শুরু করে। তাদের ফলকচিত্রে আরবি লিপির ব্যবহারকারী প্রথম শিল্পীদের মধ্যে ফ্লোরেন্সীয় চিত্রকর জোত্তো দি বন্দোনে অন্যতম। ফ্লোরেন্সীয় চিত্রকর ফিলিপ্পো লিপ্পিও তার কর্মে আরবি লিপিকলার প্রয়োগ ঘটান। তিনি পঞ্চদশ শতাব্দীতে যে-সকল ব্যক্তির চিত্র অঙ্কন করেন তাদের পোশাকে দৃশ্যসজ্জা হিসেবে আরবি লিপি ব্যবহার করেন। আরেক ফ্লোরেন্সীয় চিত্রশিল্পী ভেরোচ্চিয়ো রাজাদের শ্রদ্ধার চিত্র চিত্রায়ণের ফলকে আরবি ক্যালিগ্রাফি ব্যবহার করে, যা ফ্লোরেন্সে সংরক্ষিত রয়েছে।
মোটকথা, ইসলামি শিল্পকলা তার অনন্য নান্দনিক উপাদানগুলোর মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় শিল্পীদের শিল্পচিন্তা ও শিল্পকর্মে প্রভাব বিস্তার করেছিল এবং এভাবে ইউরোপীয়দের মনোজাগতিক অনেক বিষয়কে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছিল। কারণ আরবি লিপিকলা ও আরবি নকশা-প্রকরণ আরাবিস্কে পর্যাপ্ত ছন্দ ও গতি বিদ্যমান থাকায় ইউরোপীয় শিল্পীরা তাদের শিল্পকর্মের জন্য সমৃদ্ধ আঙ্গিক ও শৈলীর উৎস খুঁজে পেয়েছিল এবং নানা জুতসই প্রাণবন্ত ছন্দ ও বৈশিষ্ট্যের নিত্যনতুন আকৃতি ও চিত্র অঙ্কন করতে সক্ষম হয়েছিল।
উপরিউক্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনা ও ইতিহাসের বাস্তবতা তুলে ধরার পর আমরা বলতে পারি, এমন অনন্য ও শাশ্বত অবদানের জন্য অবশ্যই ইসলামি সভ্যতাকে যথার্থ ও শ্রেষ্ঠ ঘোষণা দেওয়ার অধিকার আমাদের রয়েছে। আর এসব চিরন্তন অর্জন ও প্রভাব আমাদের ইসলামি সভ্যতার, যা মানবতার দিগন্তে নিকষ কালো অন্ধকারের পর মানবতাকে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত আলোকিত রেখেছিল।
টিকাঃ
৪০১. Dionisius A. Agius & Richard Hitchcock, The Arab Influence in Medieval Europe, আরবি অনুবাদ : التاثير العربي في أوربا العصور الوسطى ، পৃ. ৬৪
৪০২. ইনাস হুসনি, আসারুল ফন্নিল ইসলামিয়্যি আলাত তাসবিরি ফি আসরিন নাহদাতি, পৃ. ১২০।
৪৩১. গুস্তাত লি বোঁ, হাদারাতুল আরাব, পৃ. ৫৩১।
৪৩২. জোত্তো দি বন্দোনে (Giotto di Bondone) জোতো নামেই সমধিক পরিচিত। তিনি ইতালীয় রেনেসাঁসের প্রথম গড় শিল্পী হিসেবে পরিচিত। ১২৬৭ সালে ফ্লোরেন্সের কাছে কোল্লে দি ভেসপিনিয়ানোতে তাঁর জন্ম এবং ১৩৩৭ সালে ফ্লোরেন্সে মৃত্যু। অনুবাদক
৪০৫. ফিলিপ্পো লিপ্পি (Filippo Lippi) ১৪০৬ সালে ইতালির ফ্লোরেন্সে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বিশটিরও বেশি বিশ্ববিখ্যাত চিত্র অঙ্কন করেছেন। ১৪৬৯ সালে স্পোলেতোতে তার মৃত্যু হয়।-অনুবাদক।
৪০৬. ভেরোচ্চিয়ো (Andrea del Verrocchio) ১৪৩৫ সালে ইতালির ফ্লোরেন্সে জন্মগ্রহণ করেন। 'ম্যাডোনা উইথ সিটেড চাইল্ড', 'বাপ্টিজম অফ ক্রিস্ট', 'তোবিয়াস অ্যান্ড দা অ্যাঞ্জেল' তার বিখ্যাত চিত্রকর্ম। তিনি ১৪৮৮ সালে ভেনিসে মৃত্যুবরণ করেন।-অনুবাদক
৪০৭. ইনাস হুসনি, আসারুল ফন্নিল ইসলামিয়্যি আলাত তাসবিরি ফি আসরিন নাহদাতি, পৃ. ১২৯