📄 শিষ্টাচার ও আচরণে ইসলামি সভ্যতার প্রভাব
জ্ঞানবিজ্ঞান, শিল্পকলা, কবিতা ও সাহিত্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে ইউরোপ ইসলামি সভ্যতা থেকে যা গ্রহণ করেছে তা স্পষ্ট ও সুবিদিত। কারণ এগুলো সম্পূর্ণরূপে বস্তুগত প্রভাব, সূক্ষ্ম ও স্পষ্টভাবে এগুলোর পর্যবেক্ষণ ও যাচাই-বাছাই সম্ভব। অন্যদিকে সামাজিক ও মানবিক প্রভাব (শিষ্টাচার ও আচরণ)-এর পর্যবেক্ষণ ততটা স্পষ্টভাবে সম্ভব নয়। কালগত দৃশ্যপট যত বিস্তৃত হয়, সামাজিক বিকাশও তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সামাজিক কার্যাবলি ও ঘটনাসমূহ স্বাভাবিকভাবেই সংস্কৃতি, দর্শন ও ধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ইসলাম ও পাশ্চাত্যের মধ্যে এগুলো এখনো পর্যন্ত দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের ক্ষেত্র। তাই এই অনুচ্ছেদে আমরা বহু তুলনামূলক বিষয় উল্লেখ করা থেকে বিরত থেকেছি। আমরা বাস্তবিক অর্থেই দেখেছি যে ইসলাম যেসব বিষয় প্রতিষ্ঠিত করেছে, পাশ্চাত্যসভ্যতা এখনো তার অধিকাংশেরই নাগাল পায়নি। কারণ দৃষ্টিভঙ্গি, ধ্যানধারণা ও দর্শনের পার্থক্য থেকেই গেছে। আমরা এখানে পাশ্চাত্যের এমন কিছু দিক উল্লেখ করব যা পরিপূর্ণরূপে ইসলামি সভ্যতার দ্বারা প্রভাবিত।
ফরাসি লেখক ফ্রাঁসোয়া জোলিভেট কান্তাও (François Jollivet-Castelot) তার 'কানুনুত তারিখ' (La Loi de l'Histoire, 1933) গ্রন্থে বলেছেন, ইউরোপ ওই যুগে যে উপকারী বায়ু-প্রবাহ ভোগ করেছে তার জন্য আরবীয় চিন্তা-চেতনার কাছে ঋণী। ইউরোপ এমন চারটি শতাব্দী কাটিয়েছে যখন সেখানে আরবসভ্যতা ছাড়া আর কোনো সভ্যতার অস্তিত্বই ছিল না। ইউরোপের জ্ঞানী-বিজ্ঞানীরাও আরবসভ্যতার উড্ডীয়মান ঝান্ডা বহন করেছে।
অত্যন্ত যৌক্তিক বিবেচনায় সমকালীন পাশ্চাত্যসভ্যতার যেকোনো দৃশ্যপটের উন্নতি ও বিকাশকে রোমান সভ্যতা থেকে আলাদা করে ওই মধ্যযুগের সঙ্গে অর্থাৎ ইসলামি সভ্যতাকালের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়। এই গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায়ে আমরা ইসলামি সভ্যতার এসব অবদান সম্পর্কে আলোকপাত করেছি। অধিকার, স্বাধীনতা, আচার-আচরণ, আখলাক-শিষ্টাচার, লেনদেন ইত্যাদি বিষয়ে ইসলামি সভ্যতার কী অবদান তার কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছি। এই অনুচ্ছেদে আমরা পাশ্চাত্যসভ্যতায় এসব অবদানের কী প্রভাব রয়েছে তা খতিয়ে দেখব।
৮৯০ খ্রিষ্টাব্দে আলফোনসো দা গ্রেট তার পুত্র যুবরাজের জন্য একজন শিক্ষাগুরু নিয়োগ করার ইচ্ছা করেন। এই দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি কর্ডোভার দুইজন মুসলিমকে আহ্বান জানান। কারণ তার পুত্রকে শিষ্টাচার শিক্ষাদানের জন্য উপযুক্ত কোনো খ্রিষ্টান তিনি খুঁজে পাননি।
মুসলিমরা যখন আন্দালুস জয় করলেন, খ্রিষ্টানদের একটি দল ইসলামি শাসনের ছায়াতলে বসবাস করতে চাইল না, তারা ফ্রান্সে চলে যাওয়াটাকেই ভালো মনে করল। টমাস আর্নল্ড যে-সকল খ্রিষ্টান ইসলামি রাজ্যে সন্তুষ্টচিত্তে বসবাস করেছে তারা মুসলিমদের থেকে কী আচরণ পেয়েছে সেই সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। এর সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে যারা ফ্রান্সে চলে গিয়েছিল তারা ওখানে কী আচরণের শিকার হয়েছিল সেটাও উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, যারা খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের শাসনাধীন বসবাস করার জন্য ফরাসি দেশে চলে গিয়েছিল তাদের অবস্থা বাস্তবিক বিচারে তাদের ধর্মীয় ভাইদের (যারা আন্দালুসে ইসলামি শাসনের ছায়াতলে থেকে গিয়েছিল তাদের) চেয়ে ভালো ছিল না। ৮১২ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রাঙ্কদের রাজা শার্লেমাইন (Charlemagne) স্পেন থেকে ফিরে আসেন। এ সময় যেসব দেশত্যাগী লোক তার সঙ্গে জড়ো হয়েছিল তাদেরকে সাম্রাজ্যের কর্মচারীদের হুমকি-ধমকি ও জুলুম-নির্যাতন থেকে বাঁচানোর জন্য তিনি নিজে হস্তক্ষেপ করেন। তিন বছর পর ফরাসি রাজা লুইস দা পাইয়াস (Louis the Pious) দেশত্যাগীদের অবস্থা উন্নয়নের জন্য একটি ডিক্রি জারি করতে বাধ্য হন। তা সত্ত্বেও তারা অভিজাত শ্রেণির লোকদের বিরুদ্ধে পুনরায় অভিযোগ না করে থাকতে পারেনি; কারণ অভিজাত শ্রেণির লোকেরা দেশত্যাগীদের নামে বরাদ্দ ভূমি দখল করে নিচ্ছিল। কিন্তু এসব দুর্বৃত্তদের দমনপ্রচেষ্টা কিছুদিনের মধ্যে অকেজো হয়ে পড়ল এবং নতুন করে অভিযোগের পাহাড় তৈরি হলো। এ সকল সহায়সম্বলহীন দুর্ভাগা দেশত্যাগীদের অবস্থা ভালো করার জন্য যেসব সরকারি ফরমান ও ডিক্রি জারি হয়েছিল তার কোনো হদিসই পাওয়া গেল না। পরবর্তী সময়ে ক্যাগোট (Cagots) সংখ্যালঘুরা অত্যন্ত নিকৃষ্ট আচরণের শিকার হয়েছিল। যেসব স্প্যানিশ কলোনি ইসলামি শাসনব্যবস্থা থেকে পালিয়ে গিয়েছিল এবং নিজেদের স্বগোত্রীয় খ্রিষ্টানদের করুণার ওপর ছুড়ে দিয়েছিল তাদের কথাও পুনরায় উল্লেখ করব। মুসলিমদের সঙ্গে ওঠাবসা ও লেনদেন যে খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের স্বভাবচরিত্রকে নম্র-ভদ্র করে তুলেছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় আন্দালুসের এক ঐতিহাসিক ইজিডোরের (Isidore of Seville) ক্রিয়াকলাপ থেকেও।
টমাস আর্নল্ড বর্ণনা করেছেন যে, ইজিডোর মুসলিম বিজেতাদের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ পোষণ করতেন। অথচ তিনি আবদুল আযিয ইবনে মুসা ইবনে নুসাইর যে সম্রাট রডারিকের বিধবা স্ত্রীকে বিয়ে করেছিলেন সেই ঘটনা পেশ করেছেন কোনো বিরূপ মন্তব্য ছাড়াই; এই ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি একটিও নেতিবাচক শব্দ ব্যবহার করেননি। আর্নল্ড আরও জানাচ্ছেন, এসব বিষয় ছাড়াও বহু খ্রিষ্টান তাদের নাম রেখেছিল আরবি শব্দে। বিভিন্ন ধর্মীয় বিধি পালনে তারা মুসলিম প্রতিবেশীদের অনুসরণও করত। ফলে অসংখ্য খ্রিষ্টান খতনা করিয়েছিল। খাদ্য ও পানীয়ের ক্ষেত্রেও তারা মুসলিমদের সংস্কার ও রীতিনীতি মেনে চলত।
ক্রুসেড যুদ্ধকালে যেসব ক্রুসেডার সিরিয়া (শাম ভূমি) দখল করে নিয়েছিল তারা ছিল পক্ষপাতিত্ব ও গোঁড়ামির উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। এমনকি উইলিয়াম মন্টগোমারি ওয়াট বিস্ময় বোধ করেছেন এবং বলেছেন, ক্রুসেডে অংশগ্রহণের জন্য যারা এসেছিল তাদের ধর্ম (খ্রিষ্টধর্ম) যে শান্তির ধর্ম এটা বিশ্বাস করা কঠিন ছিল।
কিন্তু মুসলিমদের সঙ্গে মেলামেশার পর তাদের মন-মানসিকতা পালটে গিয়েছিল। এই প্রসঙ্গে উইল ডুরান্ট বলেন, যে ইউরোপীয়রা এসব দেশে (সিরিয়া ও ফিলিস্তিনে, ক্রুসেডের সময়) তাদের আবাস তৈরি করে নিয়েছিল তারা ধীরে ধীরে প্রাচ্যীয় বেশভূষা ও আদব-আখলাক গ্রহণ করে...। এসব (বিজিত) এলাকায় যে-সকল মুসলিম বসবাস করত তাদের সঙ্গে ইউরোপীয়দের সম্পর্ক ও যোগাযোগ জোরালো হয়ে ওঠে। এতে দুটি জাতির মধ্যে যে রেষারেষি ও শত্রুতাভাব ছিল তা কমে যায়। মুসলিম ব্যবসায়ীরা পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে খ্রিষ্টীয় দেশগুলোতে প্রবেশ করতে শুরু করে এবং ওখানকার বাসিন্দাদের কাছে তাদের পণ্য বিক্রি করে। অন্যদিকে খ্রিষ্টান রোগীরা খ্রিষ্টান চিকিৎসকদের চেয়ে মুসলিম ও ইহুদি চিকিৎসকদের প্রাধান্য দেয়। খ্রিষ্টান ধর্মীয় নেতারা মুসলিমদের মসজিদগুলোতে ইমামতি ও ইবাদতের অনুমতি দেয়। খ্রিষ্টান অধ্যুষিত আন্তাকিয়ায় ও ত্রিপোলিতে অবস্থিত মাদরাসাগুলোতে মুসলিমরা তাদের সন্তানদের পাঠাতে ও কুরআন শেখাতে শুরু করে।
এসব ব্যাপার খ্রিষ্টানদের মৌলিক স্বভাবজাত ছিল না। কারণ ক্রুসেডাররা স্পেনে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে কী নির্মম আচরণ করেছিল তা আমরা দেখেছি। ওই সময় থেকে পাঁচ শতাব্দী কেটে যাওয়ার পর স্পেনে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে কী আচরণ করা হয়েছে তা বলাই বাহুল্য।
সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি বাইতুল মুকাদ্দাস স্বাধীন করার পর খ্রিষ্টানদের সঙ্গে যে মানবিক আচরণ করেছিলেন তা ছিল বিস্ময়কর। আশ্চর্যজনক হলেও সালাহুদ্দিন আইয়ুবির এমন আচরণের মূল্যায়নও রয়েছে, স্বীকৃতিও রয়েছে।
আমরা দেখি যে, ফরাসি মার্ক্সবাদী ইতিহাসবিদ ম্যাক্সিম রোডিনসন তার স্বীকারোক্তি লিপিবদ্ধ করেছেন এভাবে, সবচেয়ে বড় শত্রু সালাহুদ্দিন পশ্চিমাদের মধ্যে ব্যাপক বিস্ময়ের সৃষ্টি করলেন। তিনি মানবিকতা ও বীরত্বের দ্বারা যুদ্ধকে অলংকৃত করলেন; অথচ তার শত্রুদের মধ্য থেকে তার সঙ্গে এমন আচরণ খুব কম লোকই করেছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলেন ইংল্যান্ডের সম্রাট রিচার্ড দা লায়নহার্ট।
টমাস আর্নল্ড বলেছেন, এটা স্পষ্ট যে, সালাহুদ্দিন আইয়ুবির চারিত্রিক গুণাবলি ও তার বীরত্বপূর্ণ জীবন তার সমকালে খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের মন ও মগজে জাদুকরী প্রভাব সৃষ্টি করেছিল। এমনকি একদল খ্রিষ্টান বীরযোদ্ধা সালাহুদ্দিন আইয়ুবির প্রতি এতটাই আকর্ষণ অনুভব করেছিল যে তারা খ্রিষ্টধর্ম ত্যাগ করে এবং স্বজাতিকে ত্যাগ করে মুসলিমদের সঙ্গে গিয়ে মিশে।
খ্রিষ্টান ঐতিহাসিকদের মধ্যে সালাহুদ্দিনের মহত্ত্ব সম্পর্কে যে বিস্ময় ছড়িয়ে ছিল তা লিপিবদ্ধ করেছেন উইল ডুরান্ট, সালাহুদ্দিন নিজ ধর্মের প্রতি সীমাহীন অনুরাগী ছিলেন। নাইটস টেম্পলার ও নাইটস হসপিটালার্স-এর ওপর তীব্র কঠোরতাকে তিনি নিজের জন্য বৈধ ও সহনীয় করে নিয়েছিলেন। কিন্তু স্বভাবত তিনি দুর্বলদের প্রতি সহানুভূতিশীল ও পরাজিতদের প্রতি দয়াপরবশ ছিলেন। অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার মধ্য দিয়ে তিনি তার সকল শত্রুর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিলেন। এতে খ্রিষ্টান ঐতিহাসিকেরা বিস্ময় বোধ করেছেন যে, কীভাবে দ্বীনে ইসলাম-যা তাদের ধারণায় ভ্রান্ত-একজন ব্যক্তিকে এমনভাবে চারিত্রিক গুণাবলিতে ভূষিত করল যে, সে শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্বের এই পর্যায়ে পৌঁছে গেল।
এ তো গেলই, চৌদ্দ শতাব্দী পরও ইসলামি এই বিধান এখনো অটুট রয়েছে,
أَنْتُمْ بَنُو آدَمَ وَآدَمُ مِنْ تُرَابٍ، أَلَا لَا فَضْلَ لِعَرَبِي عَلَى أَعْجَمِيٌّ وَلَا لِعَجَمِي عَلَى عَرَبِي وَلَا لِأَحْمَرَ عَلَى أَسْوَدَ وَلَا أَسْوَدَ عَلَى أَحْمَرَ إِلَّا بِالتَّقْوَى
তোমরা আদমের সন্তান আর আদম মাটির তৈরি। সুতরাং অনারবদের ওপর আরবদের এবং আরবদের ওপর অনারবদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, গৌরবর্ণের ওপর কৃষ্ণবর্ণের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই এবং কৃষ্ণবর্ণের ওপর গৌরবর্ণের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তবে শ্রেষ্ঠত্ব নিরূপণ হবে তাকওয়ার ভিত্তিতে।
আব্রাহাম লিংকন উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে দাসশ্রেণির মুক্তির উদ্যোগ নেন। পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল এবং তিনি দাসশ্রেণির উপকারভোগী সম্প্রদায় থেকে এমন তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হন যে, তিনি এই উদ্যোগ থেকে সরে আসার উপক্রম করেছিলেন। তবে তিনি এ বিষয়ে রাষ্ট্রীয় আইন জারি করে দেন। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে, তিনি নিজেও জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে সমতায় বিশ্বাসী ছিলেন না।
সংগত কারণেই আমরা বলব, ইউরোপে এখনো আচার-আচরণে ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে বর্ণবাদ (রেসিজম) ও বর্ণবাদমূলক বৈষম্য রয়ে গেছে। বিশেষ করে ফ্রান্সে ও জার্মানিতে..। গুস্তাভ লি বোঁ জানিয়েছেন, আরবদের মধ্যে সাধারণ সমতার প্রেরণা সবসময়ই ছিল। তাদের রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোতেও তা প্রতিফলিত হয়েছে। ইউরোপে সমানাধিকার-নীতির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে বটে, তবে তা কাজে নয়, শুধু কথায়। এই মানবাধিকার-নীতি ইসলামি শরিয়ার স্বভাব-প্রকৃতিতে পরিপূর্ণভাবে বদ্ধমূল রয়েছে। যেসব সামাজিক শ্রেণির অস্তিত্ব পাশ্চাত্যে প্রাণঘাতী বিপ্লব-বিদ্রোহের সৃষ্টি করেছিল এবং এখনো করছে সেসব শ্রেণির প্রতি মুসলিমদের কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।
আর চৌদ্দ শতাব্দী পূর্বে ইসলাম বন্দিদের ব্যাপারে যে নির্দেশ দিয়েছে তা নিম্নরূপ,
فَإِمَّا مَنَّا بَعْدُ وَإِمَّا فِدَاءً
তারপর চাইলে (বন্দিদেরকে) মুক্তি দেবে অনুকম্পা দেখিয়ে অথবা মুক্তিপণ নিয়ে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন, «اسْتَوصُوا بالنِّسَاءِ خَيْرًا» তোমরা নারীদের সঙ্গে সদাচার করো বা তাদের কল্যাণকামী হও।
ইসলামের এমন নির্দেশনার চৌদ্দশ বছর পর জেনেভা কনভেনশন ১৯৪৯ সালে বন্দিদের ব্যাপারে নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এসব নীতিমালায় বন্দিদের অধিকার সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। তারপরও ইসলাম বন্দিদের যে অধিকার দিয়েছে তার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি। যুদ্ধ চলাকালে নাগরিকদের সঙ্গে আচরণ কেমন হবে তা নিয়ে ১৯৪৯ সালের ১২ আগস্ট জেনেভা কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্পর্কেও একই কথা বলা যায়। কারণ চৌদ্দ শতাব্দী পূর্বেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
اغْزُوا وَلَا تَغُلُوا، وَلَا تَغْدِرُوا، وَلَا تَمْتُلُوا، وَلَا تَقْتُلُوا وَلِيدًا»
তোমরা যুদ্ধ করো কিন্তু (যুদ্ধলব্ধ সম্পদে) খেয়ানত করো না, চুক্তি ভঙ্গ করো না, শত্রুদের বিকলাঙ্গ (হাত, পা, নাক, কান কর্তন) করো না এবং কোনো শিশুকে হত্যা করো না...।
আবু বকর সিদ্দিক রা. বলেছেন,
لَا تَعْصُوا، وَلَا تَغُلُّوا، وَلَا تَجْبُنُوا، ولا تهدموا بيعة، ولا تعزقُوا نَخْلًا، وَلَا تَحْرِقُوا زَرْعًا، وَلَا تَجَشروا بَهِيمَةً، وَلَا تَقْطَعُوا شَجَرَةً مُثْمِرَةً، وَلَا تَقْتُلُوا شَيْخًا كَبِيرًا، وَلَا صَبِيًّا صَغِيرًا، وَسَتَجِدُونَ أَقْوَامًا حَبَسُوا أَنْفُسَهُمْ لِلَّذِي حَبَسُوهَا فَذَرُوهُمْ وَمَا حَبَسُوا أَنْفُسَهُمْ لَهُ».
তোমরা যুদ্ধক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করো না, যুদ্ধলব্ধ সম্পদে খেয়ানত করো না, ভীরুতা প্রদর্শন করো না, গির্জা ধ্বংস করো না, খেজুরগাছ খুঁড়ে তুলে ফেলো না, ফসল পুড়িয়ে দিয়ো না, চতুষ্পদ জন্তুদের আটকে রেখো না, ফলদার বৃক্ষ কর্তন করো না, কোনো বৃদ্ধকে হত্যা করো না, ছোট শিশুদের হত্যা করো না। তোমরা এমন লোকদের দেখবে যারা নিজেদের কাজে ব্যস্ত রয়েছে (যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি), তোমরা তাদের ছেড়ে দিয়ো এবং তাদের কাজ করতে দিয়ো।
তালাকের প্রসঙ্গেও একই কথা প্রযোজ্য। চৌদ্দশ বছর পূর্বে ইসলাম তালাকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। অন্যদিকে ইউরোপে তালাকের বৈধতা জ্ঞাপন করে নাগরিক আইন পাশ হয়েছে মাত্র গত শতাব্দীতে। ব্রিটেনে ১৯৬৯ সালে তালাক প্রসঙ্গে নাগরিক আইন জারি করা হয়। নারীদের সঙ্গে বৈষম্য-নিরসনে যে আন্তর্জাতিক ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে তা ইসলামি শরিয়া দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত এবং এ ব্যাপারটি সবার কাছে অত্যন্ত স্পষ্ট। নারীর মালিকানা, উত্তরাধিকার, আইনগত সক্ষমতা (legal capacity) ইত্যাদি অধিকার প্রসঙ্গে ইসলামি ফিকহের গ্রন্থাবলিতে যা-কিছু রয়েছে তারই সারমর্ম ফুটে উঠেছে এই সনদের ধারাগুলোতে। আর এই ঘোষণাপত্র গৃহীত হয় ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দের ৭ নভেম্বর।
ইউরোপ আধুনিক যুগেও নারীর প্রতি চরম অবমাননা ও বৈষম্য প্রত্যক্ষ করেই উপর্যুক্ত ঘোষণাপত্র তৈরি করেছে। নারী অবমাননার অদ্ভুত সব ঘটনা রয়েছে এ আধুনিক যুগের। যেমন ১৭৯০ সালে গির্জা কর্তৃপক্ষ একজন নারীর ভরণপোষণের দায়িত্ব অতিরিক্ত বোঝা মনে করে, ফলে ওই নারীকে মাত্র দুই শিলিংয়ে বিক্রি করে দেয়। উনিশ শতকের শুরুতেও (১৮০৫ সালে) স্বামীর অধিকার ছিল স্ত্রীকে নির্ধারিত মূল্যে (৬ সেন্ট) বিক্রি করে দেওয়ার, অর্থাৎ স্ত্রী ছিল স্বামীর মালিকানাধীন বস্তু। ১৯৩১ সালে একজন ইংরেজ তার স্ত্রীকে বিক্রি করে দেয় এবং ১৮০৫ সালের পূর্ববর্তী আইনের আওতায় তাকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য একজন আইনজীবীও সে পেয়ে যায়। অবশেষে আদালত তাকে পনেরো মাসের কারাদণ্ড দেয়।
ইউরোপে নারী স্থাবর সম্পত্তির মালিকানা-অধিকারও লাভ করে উনিশ শতকের শেষের দিকে, ১৮৮২ সালে। এমনকি ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সে পাগল ও শিশুদের মতো নারীদেরকেও অক্ষম ও অপরিণত বলে মনে করা হতো।
টিকাঃ
৪০৪. ফ্রাঁসোয়া জোলিভেট কাস্তাও, La Loi de l'Histoire; মুহাম্মাদ কুরদ আলি, আল-ইসলামু ওয়াল-হাদারাতুল আরাবিয়্যা, পৃ. ৫৪৪ থেকে উদ্ধৃতি।
৪০৫. তৃতীয় আলফোনসো অব আস্তুরিয়াস (Alfonso III of Asturias 848-910), ৮৬৬ সাল থেকে মৃত্যু পর্যন্ত লিয়োঁ, গ্যালিসিয়া ও আস্তুরিয়াসের রাজা।-অনুবাদক
৪০৬. মুহাম্মাদ কুরদ আলি, আল-ইসলামু ওয়াল-হাদারাতুল আরাবিয়্যা, পৃ. ৫৪৮।
৪০৭. স্যার টমাস ওয়াকার আর্নল্ড (Sir Thomas Walker Arnold 1864-1930) ছিলেন বিখ্যাত ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ ও ঐতিহাসিক। ১৯২১ সাল থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কুল অব ওরিয়েন্টাল স্টাডিজ-এর আরবি ভাষা ও ইসলামি শিক্ষার অধ্যাপক ছিলেন। The Preaching of Islam: A History of the Propagation of the Muslim Faith তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।-অনুবাদক
৪০৮. টমাস আর্নল্ড, The Preaching of Islam: A History of the Propagation of the Muslim Faith, আরবি অনুবাদ, الدعوة الى الاسلام بحث في تاريخ نشر العقيدة الاسلامية, পৃ. ২০1।
৪০৯. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬০।
৪১০. প্রাগুক্ত।
৪১১. উইলিয়াম মন্টগোমারي ওয়াট (William Montgomery Watt 1909-2006) ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ ও ইসলামি স্টাডিজে বিশেষজ্ঞ। তিনি ১৯৬৪ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি ভাষা ও ইসলামশিক্ষা বিষয়ে অধ্যাপনা করেছেন। এ ছাড়াও তিনি ইউনিভার্সিটি অব টরেন্টো, কলেজ ডি ফ্রান্স এবং জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এবারডিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি সম্মানসূচক ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি স্কটিশ এপিস্কোপাল চার্চের ধর্মযাজক ছিলেন। ইসলামি দর্শন, তুলনামূলক ধর্ম, ইসলামি ইতিহাস ও ইসলামি সভ্যতা বিষয়ে তার ২০টি গ্রন্থ রয়েছে।- অনুবাদক।
৪১২. মন্টগোমারي ওয়াট, The Influence of Islam on Medieval Europe, আরবি অনুবাদ, فضل الإسلام على الحضارة الغربية, পৃ.২০২।
৪১৩. খ্রিষ্টানরা সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের যেসব এলাকা দখল করে নিয়েছিল সেগুলো উদ্দেশ্য। অন্যথায় এগুলো তাদের দেশ ছিল না।
৪১৪. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১৫, পৃ. ৩৪।
৪১৫. ম্যাক্সিম রোডিনসন (Maxime Rodinson 1915-2004) একজন ফরাসি প্রাচ্যবিদ ও ধর্মের ইতিহাস বিষয়ে উল্লেখযোগ্য পণ্ডিত। ইসলাম ও আরববিশ্ব সম্পর্কে একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ হলো, Muhammad (১৯৬০); Islam and Capitalism (১৯৬৬); Marxism and the Muslim world (১৯৭২); Europe and the Mystique of Islam (১৯৮০)।
৪১৬. ম্যাক্সিম রোডিনসন, আস-সুরাতুল গারবিয়্যাহ ওয়াদ-দিরাসাতুল গারবিয়্যাতু ওয়াল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৪১।
৪১৭. টমাস আর্নল্ড, The Preaching of Islam: A History of the Propagation of the Muslim Faith, আরবি অনুবাদ, الدعوة إلى الاسلام بحث في تاريخ نشر العقيدة الاسلامية ১১১।
৪১৮. নাইটস টেম্পলার : সুলাইমানের মন্দির এবং খ্রিষ্টের দরিদ্র সহযোগী-সৈনিকবৃন্দ (Poor Fellow-Soldiers of Christ and of the Temple of Solomon) সাধারণ মানুষের কাছে নাইট টেম্পলার নামে পরিচিত। এ ছাড়া একে অর্ডার অব দা টেম্পলও বলা হয়ে থাকে। খ্রিষ্টান সামরিক যাজক সম্প্রদায়গুলোর (অর্ডার) মধ্যে এটিই সবচেয়ে বিখ্যাত এবং পরিচিত। মধ্যযুগে প্রায় দুই শতকব্যাপী এই সংগঠনের অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল। ১০৯৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম ক্রুসেডের পরই এর সৃষ্টি হয় যার উদ্দেশ্য ছিল জেরুসালেমে আগত বিপুল সংখ্যক ইউরোপীয় তীর্থযাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। জেরুসালেম মুসলিমদের দখলে চলে যাওয়ার পর এই নিরাপত্তার প্রয়োজন দেখা দেয়। ১১২৯ খ্রিষ্টাব্দে চার্চ এই সংগঠনকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করে। এরপর থেকে যাজক সম্প্রদায়টি গোটা ইউরোপের সবচেয়ে জনপ্রিয় দাতব্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এর সদস্যসংখ্যা এবং ক্ষমতা বিপুল হারে বাড়তে থাকে। স্বতন্ত্র ধরনের লাল ক্রস-সংবলিত আলখাল্লা পরিধান করার কারণে যেকোনো টেম্পলার নাইটকে সহজেই চিহ্নিত করা যেত। তারা ছিল ক্রুসেডের সময়কার সর্বোৎকৃষ্ট অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত, সর্বোচ্চমানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং সর্বোচ্চ শৃঙ্খলাবিশিষ্ট যোদ্ধা দল।-অনুবাদক।
৪১৯. নাইটস হসপিটালার্স : নাইটস হসপিটালার (The Order of Knights of the Hospital of Saint John of Jerusalem) একটি ক্যাথলিক মিলিটারি অর্ডার। বিভিন্ন সময়ে এর হেডকোয়ার্টার জেরুসালেম, রোডস এবং মাল্টাতে ছিল। ১২শতকে great monastic reformation-এর সময় জেরুসালেমের মুরিস্তান জেলায় আমালফিটান হাসপাতালের সঙ্গে জড়িত লোকদের সংঘ হিসাবে হসপিটালারদের উত্থান হয়। পবিত্র ভূমিতে আসা খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের সেবার জন্য ১০২৩ সনে জন দি ব্যাপ্টিস্ট (ইয়াহয়া)-এর প্রতি উৎসর্গিত করে জেরার্ড থম (Gerard Thom) এটি প্রতিষ্ঠা করেন। অবশ্য কিছু বিদ্বান মনে করেন যে আমালফিটান হাসপাতাল থেকে জেরার্ড থমের অর্ডার ও হাসপাতাল ভিন্ন ছিল। প্রথম ক্রুসেড চলাকালে ১০৯৯ সনে জেরুসালেম অবরোধ সংস্থাটি একটি ধর্মীয় সংঘে এবং সামরিক সংঘে পরিণত হয় যার দায়িত্ব ছিল পবিত্র ভূমির প্রতিরক্ষা। মুসলিম শক্তি কর্তৃক পবিত্র ভূমি দখলের পর, নাইটরা রোডস থেকে তাদের কাজ পরিচালনা করত, যেখানে তাদের সার্বভৌমত্ব ছিল এবং আরও পরে মাল্টা থেকে, যেখানে তারা সিসিলির স্প্যানিশ ভাইসরয়ের অধীনে করদরাজ্য শাসন করত। হসপিটালাররা ১৭ শতকের এক সময় চারটি ক্যারিবীয় দ্বীপ দখল করেছিল যা তাদেরকে ১৬৬০ সনে ফ্যাসিদের কাছে ছেড়ে দিতে হয়।-অনুবাদক।
৪২০. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১৫, পৃ. ৪৫।
৪২১. মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২৩৫৩৬; তাবারানি, আল-মুজামুল কাবির, হাদিস নং ১৪৪৪৪; বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, হাদিস নং ৪৯২১।
৪২২. গুস্তাভ লি বোঁ, হাদারাতুল আরাব, পৃ. ৩৯১।
৪২৩. সুরা মুহাম্মাদ, আয়াত ৪।
৪২৪. তাবারানি, আল-মুজামুল কাবির, হাদিস নং ১৪৪৪৪; আল-মুজামুস সগির, হাদিস নং ৪০৯।
৪২৫. ইসলামের প্রাথমিক যুদ্ধগুলো থেকেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধ, যুদ্ধবন্দি ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদের ব্যাপারে নীতিমালা প্রণয়ন করেছিলেন। যেমন: যুদ্ধবন্দিদের পানাহার দানের বিষয়টি কুরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, 'আহারের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও তারা অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিকে আহার্য দান করে।' (সুরা দাহর: আয়াত ৮) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'তোমরা বন্দিদের সঙ্গে কল্যাণকর আচরণ করো।' (তাবারানি, আল-মুজামুল কাবির, হাদিস নং ৪০৯; কানযুল উম্মাল, হাদিস নং ১১০৩৬) এই হাদিস ব্যাপকার্থক, বন্দিদের শারীরিক ও মানসিক উভয় কল্যাণের কথা বোঝানো হয়েছে।-অনুবাদক।
৪২৬. ১২ আগস্ট ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের জেনেভা কনভেনশনের সঙ্গে ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দের ৮ জুন যে প্রটোকল (প্রটোকল ১) বর্ধিত করা হয়েছে তাতে বলা হয়েছে, বেসামরিক জনমণ্ডলী ও বেসামরিক বস্তুর প্রতি সম্মান ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সংঘর্ষমান পক্ষগুলো বেসামরিক জনমণ্ডলী ও যোদ্ধাদের মধ্যে এবং বেসামরিক বস্তু ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পার্থক্য নিশ্চিত করবে এবং সে অনুযায়ী তাদের অপারেশন কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুর উদ্দেশে পরিচালনা করবে। (ধারা ৪৮) অথচ চৌদ্দ শতাব্দী পূর্বে ইসলাম কী নির্দেশ দিয়েছে দেখুন: আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'গির্জায় ও আশ্রমে যারা রয়েছে তাদের হত্যা করো না।' (মুসনাদে আহমদ, ২৭২৮; আবু ইউসুফ, আল-খারাজ, পৃ. ২১২)। এই হাদিস থেকে দুটি ব্যাপার বোঝা যায়, ১. ইসলাম এই গোষ্ঠীটিকে, যারা ধর্মশালায় উপাসনায় লিপ্ত, সম্মান দেখিয়েছে এবং তাদের সঙ্গে দুরাচার করতে নিষেধ করেছে। যেসব যুবক যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে উপাসনালয়ে রয়ে গেছে তাদের ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। ২. যুদ্ধের সময় উপাসনালয় ও ধর্মশালাকে রক্ষা করতে হবে এবং সেগুলোর ওপর আক্রমণ করা বৈধ হবে না, যতক্ষণ না তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুদ্ধে মদদ জোগায়।- অনুবাদক।
৪২৭. মুসলিম, কিতাব: আল-জিহাদ ওয়াস-সিয়ার, বাব: তামিরুল ইমামিল উমারা, হাদিস নং ১৭৩১।
৪২৮. ইবনে আসাকির, তারিখে দিমাশক, খ. ২, পৃ. ৭৫।
৪২৯. Declaration on the Elimination of Discrimination against Women (DEDAW). ১৯৭৯ সালে গৃহীত হয় Convention on the Elimination of all Forms of Discrimination Against Women (CEDAW) (নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ)।-অনুবাদক।
৪৩০. আবদুল ওয়াদুদ শালবি, ফি মাহকামাতিত তারিখ, পৃ. ৬০ ও তার পরবর্তী।
📄 শিল্পকলায় ইসলামি সভ্যতার প্রভাব
ইসলামি সভ্যতা কীভাবে ও কোন পথে ইউরোপে অর্থাৎ পাশ্চাত্যে পৌছেছিল তা আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি। এসব পথ দিয়ে ইসলামি স্থাপত্যশিল্প ও অলংকরণশিল্পও ইউরোপে পৌছেছিল। প্রায়োগিক শিল্পকলার অধিকাংশ শৈলীই (ফর্ম) পৌঁছে গিয়েছিল পশ্চিমা দেশগুলোতে। ফলে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে পাশ্চাত্য সভ্যতায় ইসলামি শিল্পকলার প্রভাব সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইউরোপীয় চারুশিল্পের অনেক ক্ষেত্রে দর্শন ও রূপ উভয়টিই ইসলামি উৎস থেকে নেওয়া। কতিপয় বাস্তবতা এদিকেই ইঙ্গিত করে।
কিন্তু দুঃখের ব্যাপার এই যে, কিছু পশ্চিমা শিল্পী তাদের কাজের সঙ্গে পরিপূরকরূপে বা আলংকারিক উপায়ে ইসলামি শিল্পরূপের সংমিশ্রণ ঘটালেও আরবি লিখনের হরফসমূহের প্রতিলিপির সময় শাব্দিক অর্থ বোঝেননি এবং মুসলিম শিল্পীর উদ্দিষ্ট তাৎপর্য অনুধাবন করেননি। তারা আরবি লিপি ব্যবহার করেছেন, তার অর্থ নয়; নিরর্থক বাহ্যিক আলংকারিক বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তুলে চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার দিকটি বেছে নিয়েছেন।
এই প্রসঙ্গে গুস্তাভ লি বোঁ আরবি লিপিকলার পক্ষে সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, আরবি লিপিকলা আলংকারিক নান্দনিকতার এমন পর্যায়ে পৌছে গিয়েছিল যে, মধ্যযুগে ও রেনেসাঁসের কালে আরবি লেখার যে খণ্ড-বিশেষই খ্রিষ্টান শিল্পবোদ্ধাদের হস্তগত হতো, সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্দেশ্যে তাদের ধর্মীয় স্থাপনাসমূহে তার প্রতিলিপি স্থাপন করাতেন। এ কাজটি তারা অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ততা ও আবেগের সঙ্গে করতেন।
মশিয়ে ল্যাংব্রিয়েহ ও মশিয়ে লাভোইসসহ অনেকেই ইতালিতে সেগুলো প্রত্যক্ষ করেছেন। মশিয়ে লাভোইস এও দেখেন যে, মিলান ক্যাথিড্রালের মালপত্র রাখার জায়গায় পিকারিন নকশায় নির্মিত একটি দরজা, দরজার চারপাশে পাথরের কার্নিশ, কার্নিশের উপর একটি আরবি শব্দ কয়েকবার উৎকীর্ণ। সেন্ট পিটারস ব্যাসিলিকার (St. Peter's Basilica) দ্বারসমূহের উপর অঙ্কিত যিশুর মাথার চারপাশে আরবি লিপি রয়েছে। পোপ চতুর্থ ইউজিনের (Pope Eugene IV) নির্দেশে এই গির্জা নির্মাণ করা হয়েছিল। এখানে সেন্ট পিটার এবং সেন্ট পলের যে মূর্তি ছিল তার আলখাল্লায় দীর্ঘ কুফি লিপি উৎকীর্ণ ছিল।
এরপর তিনি বলেন, আমার আফসোস হলো, এসব আরবি লেখাগুলোর লেখক তার অনুবাদ করেনি। সম্ভবত যিশুর মাথার চারপাশের লেখাটি ছিল- لا إله إلا الله محمد رسول الله।
আরব-ইসলামিক অলংকরণশিল্প বহু ইউরোপীয় শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গি ও শৈলীকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল। কারণ আরবি লিপিকলা কতিপয় ইউরোপীয় শিল্পীর দর্শন ও চিত্রকর্মে প্রভাব ফেলেছিল। আরব-ইসলামি শিল্পকলার অন্যতম সৃষ্টি আরবি লিপিকলা, তার প্রকরণ ও ফর্মে রয়েছে সমৃদ্ধ বৈচিত্র্য এবং বহুবিধ আঙ্গিক ও শৈলীতে তার অলংকরণ সম্ভব। ইসলামি অলংকরণশিল্পের প্রভাব-বিস্তার শুরু হয় ক্রুসেডের সময় থেকে, যখন ইউরোপীয়রা আরবদের সংস্পর্শে আসার সুযোগ লাভ করে। এর শৈল্পিক ঐশ্বর্য ও সমৃদ্ধি তাদের উদ্দীপ্ত করে তোলে এবং তারা চরমভাবে আকর্ষিত হয়।
ফলে তারা তাদের শিল্পকর্মে এর ব্যবহার শুরু করে। তাদের ফলকচিত্রে আরবি লিপির ব্যবহারকারী প্রথম শিল্পীদের মধ্যে ফ্লোরেন্সীয় চিত্রকর জোত্তো দি বন্দোনে অন্যতম। ফ্লোরেন্সীয় চিত্রকর ফিলিপ্পো লিপ্পিও তার কর্মে আরবি লিপিকলার প্রয়োগ ঘটান। তিনি পঞ্চদশ শতাব্দীতে যে-সকল ব্যক্তির চিত্র অঙ্কন করেন তাদের পোশাকে দৃশ্যসজ্জা হিসেবে আরবি লিপি ব্যবহার করেন। আরেক ফ্লোরেন্সীয় চিত্রশিল্পী ভেরোচ্চিয়ো রাজাদের শ্রদ্ধার চিত্র চিত্রায়ণের ফলকে আরবি ক্যালিগ্রাফি ব্যবহার করে, যা ফ্লোরেন্সে সংরক্ষিত রয়েছে।
মোটকথা, ইসলামি শিল্পকলা তার অনন্য নান্দনিক উপাদানগুলোর মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় শিল্পীদের শিল্পচিন্তা ও শিল্পকর্মে প্রভাব বিস্তার করেছিল এবং এভাবে ইউরোপীয়দের মনোজাগতিক অনেক বিষয়কে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছিল। কারণ আরবি লিপিকলা ও আরবি নকশা-প্রকরণ আরাবিস্কে পর্যাপ্ত ছন্দ ও গতি বিদ্যমান থাকায় ইউরোপীয় শিল্পীরা তাদের শিল্পকর্মের জন্য সমৃদ্ধ আঙ্গিক ও শৈলীর উৎস খুঁজে পেয়েছিল এবং নানা জুতসই প্রাণবন্ত ছন্দ ও বৈশিষ্ট্যের নিত্যনতুন আকৃতি ও চিত্র অঙ্কন করতে সক্ষম হয়েছিল।
উপরিউক্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনা ও ইতিহাসের বাস্তবতা তুলে ধরার পর আমরা বলতে পারি, এমন অনন্য ও শাশ্বত অবদানের জন্য অবশ্যই ইসলামি সভ্যতাকে যথার্থ ও শ্রেষ্ঠ ঘোষণা দেওয়ার অধিকার আমাদের রয়েছে। আর এসব চিরন্তন অর্জন ও প্রভাব আমাদের ইসলামি সভ্যতার, যা মানবতার দিগন্তে নিকষ কালো অন্ধকারের পর মানবতাকে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত আলোকিত রেখেছিল।
টিকাঃ
৪০১. Dionisius A. Agius & Richard Hitchcock, The Arab Influence in Medieval Europe, আরবি অনুবাদ : التاثير العربي في أوربا العصور الوسطى ، পৃ. ৬৪
৪০২. ইনাস হুসনি, আসারুল ফন্নিল ইসলামিয়্যি আলাত তাসবিরি ফি আসরিন নাহদাতি, পৃ. ১২০।
৪৩১. গুস্তাত লি বোঁ, হাদারাতুল আরাব, পৃ. ৫৩১।
৪৩২. জোত্তো দি বন্দোনে (Giotto di Bondone) জোতো নামেই সমধিক পরিচিত। তিনি ইতালীয় রেনেসাঁসের প্রথম গড় শিল্পী হিসেবে পরিচিত। ১২৬৭ সালে ফ্লোরেন্সের কাছে কোল্লে দি ভেসপিনিয়ানোতে তাঁর জন্ম এবং ১৩৩৭ সালে ফ্লোরেন্সে মৃত্যু। অনুবাদক
৪০৫. ফিলিপ্পো লিপ্পি (Filippo Lippi) ১৪০৬ সালে ইতালির ফ্লোরেন্সে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বিশটিরও বেশি বিশ্ববিখ্যাত চিত্র অঙ্কন করেছেন। ১৪৬৯ সালে স্পোলেতোতে তার মৃত্যু হয়।-অনুবাদক।
৪০৬. ভেরোচ্চিয়ো (Andrea del Verrocchio) ১৪৩৫ সালে ইতালির ফ্লোরেন্সে জন্মগ্রহণ করেন। 'ম্যাডোনা উইথ সিটেড চাইল্ড', 'বাপ্টিজম অফ ক্রিস্ট', 'তোবিয়াস অ্যান্ড দা অ্যাঞ্জেল' তার বিখ্যাত চিত্রকর্ম। তিনি ১৪৮৮ সালে ভেনিসে মৃত্যুবরণ করেন।-অনুবাদক
৪০৭. ইনাস হুসনি, আসারুল ফন্নিল ইসলামিয়্যি আলাত তাসবিরি ফি আসরিন নাহদাতি, পৃ. ১২৯