📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 জ্ঞানবিজ্ঞানে ইসলামি সভ্যতার প্রভাব

📄 জ্ঞানবিজ্ঞানে ইসলামি সভ্যতার প্রভাব


পাশ্চাত্যের জ্ঞানবিজ্ঞানের সব ক্ষেত্রেই মুসলিমদের প্রভাব ছিল। পাশ্চাত্য সভ্যতায় চিকিৎসা, ওষুধবিজ্ঞান, গণিত, রসায়ন, চক্ষুবিজ্ঞান, ভূগোল, জ্যোতির্বিদ্যা ও বিজ্ঞানের অন্যান্য ক্ষেত্রে এই প্রভাবের নিদর্শন বিদ্যমান। বহু পশ্চিমা বস্তুনিষ্ঠ লেখকই স্বীকার করে নিয়েছেন যে মুসলিমরা ছয়শ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইউরোপের শিক্ষাগুরু ছিল!

ইসলামি সভ্যতার প্রভাবের একটি সাধারণ চিত্র ছিল এই যে, মুসলিম বিজ্ঞানীদের গ্রন্থাবলি একাধিকবার অনুবাদ করা হয় এবং জ্ঞানের মৌলিক উৎস হিসেবে সেগুলোর ওপর নির্ভর করা হয়। কয়েক শতাব্দীব্যাপী ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এসব অনূদিত গ্রন্থ জ্ঞানের ভিত হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সেই সময় (মধ্যযুগে) ইসলামি সভ্যতায় চিকিৎসাবিজ্ঞান উৎকর্ষের চূড়া স্পর্শ করেছিল। অথচ তখন গির্জার পক্ষ থেকে চিকিৎসাগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা ছিল। কারণ তাদের কাছে অসুস্থতা ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি! এরপর তারা ইবনে সিনা, আল-রাযি প্রমুখের গ্রন্থাবলি অনুবাদের পর চিকিৎসা ও আরোগ্যলাভ সম্পর্কে জানতে পারে। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, দ্বাদশ শতাব্দীতে ইবনে সিনার চিকিৎসা-বিষয়ক মহাগ্রন্থ আল-কানুন-এর অনুবাদ হয়। কয়েকবারই এটি মুদ্রিত হয়। ফ্রান্স ও ইতালির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান উৎস ছিল আল- কানুন।

ইউনেস্কো কুরিয়ার (UNESCO Courier) সাময়িকী ১৯৮০ সালে উল্লেখ করেছে যে, ইবনে সিনার চিকিৎসা-বিষয়ক গ্রন্থ 'কিতাবুল কানুন' ১৯০৯ সাল পর্যন্তও ইউনিভার্সিটি অব ব্রাসেলসে (Université libre de Bruxelles) পাঠ্য ছিল। এই প্রবন্ধের টীকায় লেখক ও চিকিৎসক স্যার উইলিয়াম অসলারের একটি মন্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, আল-কানুন চিকিৎসাবিজ্ঞানের একমাত্র উৎস হিসেবে অন্য যেকোনো গ্রন্থের চেয়ে দীর্ঘকাল পঠনপাঠনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ ত্রিশ বছরে আল-কানুন-এর মোট পনেরোটি মুদ্রণ প্রকাশিত হয়। অসলার আরও বলেন, ইবনে সিনা পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানীদের সক্ষম করে তুলেছিলেন চিকিৎসার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সূচনা করতে। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বৈজ্ঞানিক বিপ্লব কার্যকরভাবেই শুরু হয়। সপ্তদশ শতাব্দীতে এসে তা তার চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়।

'আল-কানুন'-এর মতো আরও অনূদিত হয় আল-রাযির 'আল-হাবি' ও 'আল-মানসুরি'। এটা ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষের দিকের ঘটনা। তার অবদানের স্বীকারোক্তি ও তার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে আমেরিকার প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে বড় বিভাগের নামকরণ করা হয় আল-রাযি নামে।

আবু রাইহান আল-বিরুনির বস্তুর আপেক্ষিক গুরুত্ব (Specific Gravity) নিয়ে যে গবেষণা তাও পশ্চিমা সভ্যতার বিজ্ঞানচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। বায়ুর ওজন ও ঘনত্ব এবং বায়ুসৃষ্ট চাপ সম্পর্কিত গবেষণায় ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী টরিসেলির তুলনায় আল-খাযিনি ছিলেন বৈজ্ঞানিক চাবিস্বরূপ। আল-খাযিনি একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন যার দ্বারা বায়ুতে ও পানিতে বস্তুর ওজন পরিমাপ করা যেত। ইউরোপ মধ্যযুগ পর্যন্ত আল-খাযিনির আবিষ্কৃত তত্ত্ব ও যন্ত্রের সাহায্য গ্রহণ করে, তারা বস্তুর আপেক্ষিক গুরুত্ব, বায়ুর ওজন, উত্তোলন-যন্ত্র, মহাকর্ষ ইত্যাদির ক্ষেত্রেও মুসলিমদের সূক্ষ্ম পরিমাপের সাহায্য গ্রহণ করে।

আল-খাযিনি কর্তৃক রচিত 'মিযানুল হিকমা' গ্রন্থটি ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয় এবং তা থেকে পশ্চিমা বিজ্ঞানীরা প্রভূত উপকার লাভ করেন।

জাবির ইবনে হাইয়ান, হাসান ইবনুল হাইসাম, আল-খাওয়ারিজমির গ্রন্থাবলিও ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয় এবং কয়েক শতাব্দীব্যাপী তাদের জ্ঞানের উৎস হিসেবে বিরাজমান থাকে।

প্রাচ্যবিদ লুইস সিডিও বলেন, শুরুর দিকে আরব থেকে লাতিন কী গ্রহণ করেছে তা অনুসন্ধান করলে আমরা দেখি যে, গার্বার্ট (Gerbert of Aurillac), যিনি দ্বিতীয় সিলভেস্টার (Pope Sylvester II) নামে পোপ হন, আন্দালুসে যে গণিতবিদ্যা শিখেছিলেন তা ৩৫৯ হি./৯৭০ খ্রি. থেকে ৩৬৯ হি./৯৮০ খ্রি. সালের মধ্যে আমাদের ভেতরে প্রবেশ করিয়ে দেন; অ্যাডেলার্ড অব বাথ ৪৯৩ হি./১১০০ খ্রি. থেকে ৫২২ হি./১১২৮ খ্রি. সালের মধ্যে আন্দালুস ও মিশর ভ্রমণ করেন এবং আরবি থেকে অনুবাদ করেন ইউক্লিডের এলিমেন্টস, এই গ্রন্থ সম্পর্কে পাশ্চাত্যের কোনো ধারণাই ছিল না; প্লেটো তিবুরটিনাস (Plato Tiburtinus) আরবি থেকে অনুবাদ করেন থিওডোসিয়াস (Theodosius of Bithynia) কর্তৃক রচিত আল-উকার (Sphaerics সিরিজ) গ্রন্থের; রুডলফ অব ব্রাজেস (Rudolf of Bruges) আরবি থেকে অনুবাদ করেন আল-জুগরাফিয়া ফিল-মামুর মিনাল-আরদ (Ptolemy's Geographia টলেমির জিয়োগ্রাফি) গ্রন্থের; লিওনার্দো অব পিসা ৫৯৬ হি./১২০০ খ্রি. সালের মধ্যে আলজেব্রার ওপর পুস্তিকা রচনা করেন, যা তিনি আরবদের থেকে শিখেছিলেন; ক্যাম্পানুস অব নোভারা (Campanus of Novara) ত্রয়োদশ শতাব্দীতে আরবি থেকে অনুবাদ করেন ইউক্লিডের গ্রন্থের, ভালো অনুবাদের পাশাপাশি তিনি ব্যাখ্যাও দেন; গেতলিওন অফ বলঙ্গা (Getlion of Bolonga) ওই শতাব্দীতেই হাসান ইবনুল হাইসামের চক্ষুবিজ্ঞানের ওপর লিখিত 'আল-বাসারিয়‍্যাত' গ্রন্থের অনুবাদ করেন; জেরার্ড অব ক্রেমোনা ওই শতাব্দীতে আরবি থেকে টলেমির আল-মাজেস্টের (Almagest), জাবির ইবনে হাইয়ানের আশ-শারহ... ইত্যাদি গ্রন্থের অনুবাদ করে বিশুদ্ধ জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রচার-প্রসার ঘটান। ৬৪৮ হি./১২৫০ খ্রিষ্টাব্দে ক্যাস্টাইলের রাজা আলফোনসো তার নামাঙ্কিত তারকা-সারণি প্রকাশের নির্দেশ দেন। সম্রাট প্রথম রজার সিসিলিতে আরবীয় জ্ঞানবিজ্ঞান অর্জনের ব্যাপারে মানুষকে উৎসাহিত করেছিলেন, বিশেষ করে তিনি ইদরিসির গ্রন্থরচনার জন্য পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিলেন। রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডেরিকও আরবীয় জ্ঞানবিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্য অধ্যয়নের ব্যাপারে কম উৎসাহ দেননি। ইবনে রুশদের পুত্ররা এই সম্রাটের রাজদরবারে অবস্থান করতেন, তারা তাকে উদ্ভিদ ও প্রাণীদের প্রকৃতি-ইতিহাস শিখিয়েছিলেন।

সিডিওর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, মুসলিমরা ইউরোপীয়দের জন্য কেবল তাদের জ্ঞানবিজ্ঞানই হস্তান্তর করেননি, বরং ইউরোপীয়দের তাদের গ্রিক পূর্বপুরুষদের সঙ্গে পরিচয় লাভের ক্ষেত্রেও তারা জোরালো ভূমিকা পালন করেছেন, যারা ছিল তাদের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। ইউরোপীয় জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রতিটি ক্ষেত্রে এমনই ছিল ইসলামি সভ্যতার অবদান।

ইউরোপে ইসলামি শিল্প কীভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল সেদিকে দৃষ্টি ফেরানো যাক। অবশ্য এ বিষয় বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কাগজশিল্পে মুসলিমদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল, তারা সেই সময় এই শিল্পকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। কাগজশিল্পের বিকাশ না ঘটলে জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা সামনে এগোত না, লিপিবদ্ধকরণের যে আন্দোলন তাও উদ্যম পেত না এবং ইউরোপও সভ্য হতে পারত না। মুসলিমরা খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের দিকে চীনের একদল বন্দিকে সমরকন্দে নিয়ে যান। এসব বন্দিদের মধ্যে কেউ কেউ ছিল যারা কাগজ ভালো বানাতে পারত। তাদের হাত ধরেই কাগজশিল্পের সূচনা ঘটে। সমরকন্দে কাগজশিল্প বিকশিত হয় এবং এতে আরও বেশি সুন্দর ও সূক্ষ্ম প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়। কাগজশিল্পের মৌলিক উপাদান হয়ে ওঠে কটন ও লিলেন। ফলে ফাইন পেপারের (Fine paper) উদ্ভব ঘটে, কাগজের মধ্যে এটিই উৎকৃষ্ট। তখন প্যাপিরাস ছিল অত্যন্ত দামি, তাই নতুন কাগজ কিনতে মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ল। এমনকি আব্বাসি খলিফা আল-মানসুর—যিনি সঞ্চয়প্রবণতা ও মিতব্যয়িতাপ্রীতির জন্য সুপরিচিত ছিলেন—তার গোটা রাজ্যে প্যাপিরাস ব্যবহার না করতে নির্দেশ দিলেন এবং সাধারণ কাগজ সস্তা হওয়ার কারণে কাগজের ব্যবহার এতেই সীমাবদ্ধ রাখতে বললেন।

খলিফা হারুনুর রশিদের শাসনামলে বাগদাদে কাগজকলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। তারপর দামেশক ও ত্রিপোলিতে কাগজকল চালু হয়। তারপর শুরু হয় ফিলিস্তিন ও মিশরে। কাগজশিল্প পৌঁছে যায় মরক্কোতে, সেখান থেকে পৌঁছে সিসিলিতে ও আন্দালুসে। তারপর ইউরোপ এই শিল্প সম্পর্কে জানতে পারে। বাস্তবিক অর্থেই এই শিল্প-সংস্কৃতি ও আত্মিক জীবনের একটি স্তম্ভ। এরই মধ্য দিয়ে মুসলিমরা এমন একটি যুগের সূচনা করেছিলেন যেখানে জ্ঞান মানুষের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং সমাজের সকলের জন্য মশাল হয়ে উঠেছিল এবং বুদ্ধিমানদের বুদ্ধিকে কাজে লাগাতে ও চিন্তাভাবনা করতে আহ্বান জানিয়েছিল। যেমন বলেছেন সিগরিড হুংকে।

পর্যটক, দর্শনার্থী, তীর্থযাত্রী, বণিকদল, বিদ্যার্থীরা তাদের ইউরোপের দেশগুলো থেকে বার্সেলোনা ও ভ্যালেন্সিয়ায় আসত। এখানে উৎকৃষ্ট কাগজ তৈরি হতো। ইদরিসি তার বর্ণনা দিয়েছেন। তারা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে এই কাগজ নিয়ে দেশে ফিরে যেত। পৃথিবীর কোথাও এই কাগজের তুলনা ছিল না।

সিগরিড হুংকে বলেছেন, কাগজের কল তৈরি করার দক্ষতা আরবদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল, তারা নিজেরাই এই দক্ষতা অর্জন করেছিল। সব ধরনের পানির ও বাতাসের কল দিয়ে তারা ইউরোপকে সাহায্য করেছিল।

কাগজশিল্প কেবল নয়, মুসলিমরা কম্পাসও আবিষ্কার করেছেন। কোনো কোনো ইউরোপীয় কম্পাস আবিষ্কারের কৃতিত্ব দিয়ে থাকেন ইতালীয় নাবিক ফ্ল্যাভিও জোয়া (Flavio Gioia)-কে। কিন্তু সিডরিড হুংকে এই মত প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এই ইতালীয় নাবিক মুসলিম আরবদের কাছে এই যন্ত্রের বিদ্যা শিখেছেন।

গবেষকরা এ ব্যাপারে মতবিরোধ করেছেন যে, আরবরাই কি প্রথম কম্পাস ব্যবহার করেছেন, নাকি তারা চীন থেকে তা নিয়েছেন... লুইস সিডিও চীনাদের পিক্সিস (Pyxis) ব্যবহারের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। যদিও তারা ১৮৫০ সাল পর্যন্ত বিশ্বাস করত যে ভূ-গোলকে দক্ষিণতম বিন্দু বা দক্ষিণ মেরু জ্বলজ্বল করছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, আরবরাই প্রথম কম্পাস ব্যবহার করে। জর্জ সার্টনও তার বক্তব্যে সিডিওকে সমর্থন করেছেন। আরবরাই প্রথম কম্পাস ব্যবহার করেছে ও ইউরোপীয়রা আরবদের থেকে পিক্সিসের ব্যবহার শিখেছে বলে সবাই জোরালো মত প্রকাশ করেছেন। کمپাস যে ইউরোপীয়দের জীবনে ব্যাপক অবদান রেখেছিল তা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই।

টিকাঃ
৩৬১. গুস্তাভ লি বোঁ, হাদারাতুল আরাব, পৃ. ৪৯০।
৩৬২. স্যার উইলিয়াম অসলার (Sir William Osler, 1st Baronet, 1849-1919) ছিলেন কানাডিয়ান চিকিৎসক, জন হপকিন্স হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর। তাকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক আখ্যায়িত করা হয়। চিকিৎসার পাশাপাশি তিনি সংস্কৃতি ও ইতিহাসচর্চাও করেছেন।
৩৬৩. ইউনেস্কো কুরিয়ার, অক্টোবর সংখ্যা, ১৯৮০ খ্রি.।
৩৬৪. মুস্তাফা সিবায়ি, মিন রাওয়ায়িয়ি হাদারাতিনা, পৃ. ৪২ থেকে উদ্ধৃত।
৩৬৫. মিশরীয় সভ্যতায় নীলনদের তীরে নলখাগড়া জাতীয় গাছ পাওয়া যেত। সেই গাছ কেটে প্রাপ্ত খোলকে পাথরচাপা দিয়ে রোদে শুকানো হতো। ফলে খোলগুলো শুকিয়ে যেত এবং পাথরের চাপে সোজা হয়ে লেখার উপযোগী হতো। পরে আঠা দিয়ে জোড়া দিয়ে রোল আকারে সংরক্ষণ করা হতো। এভাবে তৈরি প্রাচীন লেখার উপযোগী মাধ্যমকে প্যাপিরাস বলা হয়। বর্ণমালা সৃষ্টির ক্ষেত্রে মিশরীয়দের যেমন বিশেষ অবদান ছিল, তেমনই তারা আবিষ্কার করেছিলেন লেখার উপযোগী এই চমৎকার উপাদানটি।
৩৬৬. সিগরিড হুংকে, শামসুল আরাব তাসতাউ আলাল গারব, পৃ. ৪৬; হানি আল-মুবারাক ও শাওকি আবু খলিল, দাওরুল হাদারাতিল আরাবিয়্যা ফিন-নাহদাতিল উরুব্বিয়্যা, পৃ. ৫৭।
৩৬৭. সিগরিড হুংকে, শামসুল আরাব তাসতাউ আলাল গারব, পৃ. ৪৬।
৩৬৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৪।
৩৬৯. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৫।
৩৭০. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৭।
৩৭১. দক্ষিণ আকাশের একটি ছোট ও অনুজ্জ্বল নক্ষত্রমণ্ডল। পিক্সিস হলো পিক্সিস নটিকার (Pyxis Nautica) সংক্ষিপ্তরূপ। নাবিকদের কম্পাসের লাতিন নাম এটি।
৩৭২. আনওয়ার রিফায়ি, আল-ইনসানুল আরাবি ওয়াল-হাদারাতি, পৃ. ৪৮৭।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 ভাষা ও সাহিত্যে ইসলামি সভ্যতার প্রভাব

📄 ভাষা ও সাহিত্যে ইসলামি সভ্যতার প্রভাব


ইউরোপীয়রা-বিশেষ করে স্পেনের কবিরা-আরবি সাহিত্য দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছে। আরবি সাহিত্যের বীরত্বগাথা, রূপকথা, উচ্চমার্গীয় অলংকারপূর্ণ চিত্রকল্প পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রবেশ করেছে। আন্দালুসে আরবি সাহিত্যের মধ্য দিয়ে ব্যাপারটি ঘটেছে প্রকটভাবে। প্রখ্যাত স্প্যানিশ লেখক ভিসেন্ট ব্লাসকো ইবনেজ (Vicente Blasco Ibáñez) বলেন, আরবদের আন্দালুসে আগমন এবং দক্ষিণের অঞ্চলগুলোতে তাদের দুঃসাহসী সেনাপতি ও বীরযোদ্ধাদের ছড়িয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত ইউরোপ বীরত্ব সম্পর্কে কিছুই জানত না, এ সংক্রান্ত অপরিহার্য সাহিত্যজ্ঞানের খোঁজও তাদের ছিল না এবং সাহসিকতাপূর্ণ সম্মানবোধের আচরণও তাদের জানা ছিল না।

ইবনে হাযম আন্দালুসি ও তার বিখ্যাত গ্রন্থ তাওকুল হামামাহ ফিল-উলফাতি ওয়াল-উল্লাফ-এর ব্যাপক প্রভাব ছিল স্পেনের ও দক্ষিণ ফ্রান্সের কবিদের ওপর। খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংমিশ্রণের ফলে এটা ঘটেছিল। আরবি হয়ে উঠেছিল আন্দালুসের বিভিন্ন অঞ্চল ও অভিজাত শ্রেণির ভাষা। স্পেনের খ্রিষ্টান আমির-শাসিত এলাকাগুলোতে আমিরের দরবারে খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী কবিদের সঙ্গে মুসলিম কবিরা একত্র হতেন। যেমন স্যাঞ্চোর রাজদরবারে উভয় ধর্মের কবিদের সম্মিলন ঘটত। তিনি তার দরবারে তেরোজন আরব মুসলিম কবি এবং বারোজন খ্রিষ্টান ও একজন ইহুদি কবি জড়ো করেছিলেন। ক্যাস্টাইলের রাজা দশম আলফোনসোর (তার পিতার) সময়ের একটি পাণ্ডুলিপিও তিনি অনুসন্ধান করে উদ্ধার করেন। এই পান্ডুলিপিতে একটি তালিকাও পাওয়া যায়, যেখানে দুজন ভ্রাম্যমাণ কবির কথা বলা হয়েছে। এই কবিরা তার দরবারে একত্র হতেন এবং একসঙ্গে উদ বাজিয়ে গান গাইতেন। তাদের একজন ছিলেন আরব, আরেকজন ছিলেন ইউরোপীয়। আরও বিস্ময়কর হলো, সে সময়ের ইউরোপীয় কবিরা আরবি কবিতা রচনায় পারদর্শী ছিলেন। এ কারনেই হেনরি মারো বলেছেন, রোমান জাতিগুলোর সভ্যতার ওপর আরবদের প্রভাব কেবল নন্দনতাত্ত্বিক বিষয়ে বা শিল্পকলায় সীমাবদ্ধ নয়, এসব ক্ষেত্রে যেমন তাদের স্পষ্ট প্রভাব রয়েছে তেমনই সংগীত ও কবিতাতেও প্রভাব রয়েছে।

ডোজি তার ইসলাম-বিষয়ক গ্রন্থে স্প্যানিশ লেখক আলভ্যারোর (Álvaro) পুস্তিকা থেকে যে বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন তা থেকে পশ্চিমা কবি-সাহিত্যিকেরা আরবি ভাষা ও সাহিত্যের দ্বারা সে যুগে কী পরিমাণ প্রভাবিত হয়েছিলেন তা ভালোভাবেই বোঝা যায়। মানুষের মধ্যে লাতিন ও গ্রিক ভাষার প্রতি অবহেলা এবং মুসলিমদের ভাষার প্রতি প্রগাঢ় আগ্রহ দেখে আলভ্যারো তীব্র মনস্তাপে প্রায় রোদন করে উঠেছেন, তিনি বলেছেন, আরবি সাহিত্যের গুঞ্জরণ বিচক্ষণ ও রুচিশীল ব্যক্তিদের জাদুগ্রস্ত করে ফেলেছে, ফলে তারা লাতিন ভাষাকে হেয়জ্ঞান করেছে এবং তাদের দখলদারদের ভাষায় লিখতে শুরু করেছে। ব্যাপারটি তার সামসময়িক বলে তার জন্য আরও বেশি পীড়াদায়ক হয়ে উঠেছিল। তিনি স্বাজাত্যবোধের অহমিকায় যতটা গর্বিত ছিলেন তার সমকালীন লোকেরা তা ছিল না। তাই তিনি তিক্ত আফসোসে ভেঙে পড়েছেন। বলেছেন, আমার খ্রিষ্টধর্মীয় ভাইয়েরা আরবদের কবিতায় ও গল্পে মুগ্ধ-বিহ্বল হয়ে পড়ছে, তারা মুসলিম ফকিহ ও দার্শনিকদের লিখিত রচনারাশি গলাধঃকরণ করছে। তারা এই কাজ করছে সেগুলোকে অমূলক ও সস্তা প্রতিপন্ন করার জন্য নয়, বরং বিশুদ্ধ আরবীয় আঙ্গিক ও সাহিত্যরীতি গ্রহণের জন্য। আজ ধর্মীয় লোক ছাড়া আর মানুষেরা কোথায় যারা তাওরাত ও ইনজিলের ধর্মীয় ব্যাখ্যাগুলো পড়বে? তারা আজ কোথায় যারা ইনজিল ও নবী-রাসুলদের পুস্তিকাগুলো পাঠ করবে? ওহ, আফসোস! খ্রিষ্টানদের উঠতি মেধাবী প্রজন্ম আরবি ভাষা ও আরবি সাহিত্য ছাড়া কোনো ভাষা ও সাহিত্যই ভালোভাবে জানে না। তারা আরবদের গ্রন্থাবলি থেকে প্রেরণা লাভ করছে। প্রচুর দাম দিয়ে তাদের বই সংগ্রহ করে গ্রন্থাগারগুলো বোঝাই করছে। সব জায়গায় তারা আরবি সাহিত্যভান্ডারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠছে। অথচ তারা খ্রিষ্টধর্মীয় গ্রন্থাবলির নাম শুনলে সেদিকে ফিরেও তাকায় না, আগ্রহ তো দেখায়ই না। তারা জানিয়ে দিতে চায় যে খ্রিষ্টধর্মীয় গ্রন্থাবলি তাদের মনোযোগ পাওয়ার উপযুক্ত নয়। হায় আফসোস! খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীরা তাদের নিজেদের ভাষা ভুলে গেছে। আজ তুমি তাদের মধ্যে প্রতি হাজারে একজনকেও পাবে না যে তার বন্ধুকে নিজেদের ভাষায় চিঠি লেখে। বরং আরবি ভাষাতেই তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, আরবি ভাষার ঢং ও আঙ্গিক তারা চমৎকারভাবে রপ্ত করে নিয়েছে। তারা আরবি ভাষায় এমন সব কবিতা রচনা করছে যা শোভায়, সৌষ্ঠবে এবং ভাবপ্রকাশে খোদ আরবদের কবিতা থেকেও উৎকৃষ্ট।

ইউরোপীয় ভাষাগুলোর ওপর আরবি ভাষার প্রভাব সম্পর্কে ডিটার মেসনার বলেন, আইবেরিয়ান উপদ্বীপে কথ্য ভাষাগুলোর ওপর আরবি ভাষার-যা অ্যারাবিয়ান সুপারস্টেট ও আরব অভিজাতদের ভাষা-প্রভাব ক্যান্ডিলিয়ান, পর্তুগিজ ও কাতালান ভাষাগুলোকে রোমান্স ভাষাশ্রেণির মধ্যে একটি বিশেষ অবস্থান দিয়েছে। আরবি ভাষার প্রভাব কেবল আইবেরিয়ান উপদ্বীপে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এই উপদ্বীপের মধ্যস্থতার ফলে আরবির এসব প্রভাব ফরাসি ভাষার মতো অন্যান্য ভাষাতেও ছড়িয়ে পড়ে।

ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় জীবনের নানাদিক সম্পর্কে কী পরিমাণ আরবি শব্দ প্রবেশ করেছে তা এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। অনেক শব্দ তার আরবি মূলরূপও ধরে রেখেছে। যেমন : কুত্ন (Cotton), আল-হারিরুদ দিমাশকি (Damask), মিস্ক (Musk), শারাব (Syrup), জারা (Jar), লাইমুন (Lemon), সিফ্র (Medieval Latin: cifra), এমন আরও অসংখ্য শব্দ। আমাদের জন্য এখানে অধ্যাপক ম্যাকেইলের মন্তব্য উদ্ধৃত করাই যথেষ্ট, ইউরোপ তার উপন্যাস-সাহিত্যে আরবীয় দেশ ও সিরিয়ান-আরব নাজদে বসবাসকারী জাতি-গোষ্ঠীর কাছে ঋণী। বিশ্ব যে প্রেরণায় বুঁদ হয়েছিল তার থেকে ভিন্ন প্রেরণায় ও কল্পনায় ইউরোপীয় মধ্যযুগকে আলাদা করে দিয়েছিল (আরব থেকে প্রাপ্ত) কিছু উদ্দীপনামূলক শক্তি। ইউরোপ অনেকাংশে বা প্রধানত এসব শক্তির কাছে ঋণী।

ইউরোপীয় গল্প-সাহিত্য বিকাশকালে প্রভাবিত হয়েছে আরবদের মধ্যযুগীয় গল্পশিল্পের দ্বারা। মাকামাত, বীরত্বগাথা, মর্যাদা ও প্রণয়ের পথে দুঃসাহসী ব্যক্তিদের ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ গ্রহণ ইত্যাদি ছিল আরবদের গল্পশিল্পের বিষয়। খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ শতকে ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় আলফু লায়লা ওয়া লায়লা (আলিফ লায়লা)-এর অনুবাদ তাদের গল্প-সাহিত্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। ওই সময় থেকে নিয়ে এই পর্যন্ত ইউরোপীয় যাবতীয় ভাষায় আলিফ লায়লার তিন হাজারেরও বেশি মুদ্রণ প্রকাশিত হয়। এমনকি কয়েকজন ইউরোপীয় সমালোচক মনে করেন যে, জোনাথন সুইফ্ট রচিত গালিভারের ভ্রমণকাহিনি এবং ড্যানিয়েল ডিফো রচিত রবিনসন ক্রুসোর ভ্রমণবৃত্তান্ত আলিফ লায়লা ও আরব দার্শনিক ইবনে তুফাইলের হাই ইবনে ইয়াকযান পুস্তকটির কাছে ঋণী। বোক্কাচ্চো ১৩৪৯ খ্রিষ্টাব্দে দেকামেরন নামে তার গল্পগুলো রচনা করেন। গল্পগুলো লেখা হয়েছে আলিফ লায়লার অনুকরণে। উইলিয়াম শেক্সপিয়রও আলিফ লায়লা থেকে তার All's Well That Ends Well নাটকের প্লট গ্রহণ করেন। একইভাবে জার্মান লেখক ও নাট্যকার লেসিং (Gotthold Ephraim Lessing) তার Nathan der Weise নাটকের ধারণা গ্রহণ করেন আলিফ লায়লা থেকে। বোক্কাচ্চোর যুগে যারা তার থেকে প্রেরণা গ্রহণ করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ইংরেজি ভাষায় আধুনিক কাব্যের জনক জেফ্রি চসার। তিনি ইতালিতে গিয়ে বোক্কাচ্চোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এর পরপরই দা ক্যান্টারবেরি টেইল্স নামে তিনি তার বিখ্যাত গল্পগুলো রচনা করেন।

বহু সমালোচক জোর দিয়ে বলেছেন যে, দান্তে তার ডিভাইন কমেডিতে পরজগৎ ভ্রমণের যে বর্ণনা দিয়েছেন তাতে তিনি আরবি সাহিত্যের দুটি বিখ্যাত গ্রন্থের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। গ্রন্থ দুটির একটি হলো কবি ও দার্শনিক আবুল আলা মাআররি (৩৬৩-৪৫৯ হি./৯৭৩-১০৫৭ খ্রি.) রচিত রিসালাতুল গুফরান এবং অপরটি হলো কবি ও দার্শনিক ইবনুল আরাবি (৫৫৮-৬৩৮ হি./১১৬৪-১২৪০ খ্রি.) রচিত ওয়াসফুল জান্নাহ।

দান্তে সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডেরিকের শাসনকালে সিসিলিতে অবস্থান করছিলেন। ফ্রেডেরিক ছিলেন আরবি উৎসকে ভিত্তি করে ইসলামি সংস্কৃতি ও তার জ্ঞানচর্চার প্রতি উৎসাহী। অ্যারিস্টটলের মতবাদ নিয়ে ফ্রেডেরিক ও দান্তের মাঝে একাধিকবার বিতর্ক হয়। তন্মধ্যে কিছু বিতর্কের উৎস ছিল আরবি রচনাবলি।

এ ছাড়া নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনী সম্পর্কে দান্তের প্রচুর জানাশোনা ছিল। এ সূত্রে রাসুলের মিরাজ ও রাত্রিকালীন ভ্রমণ (আল-ইসরা) এবং আসমানের বিবরণ সম্পর্কে অবগত ছিলেন। এ ব্যাপারে সিগরিড হুংকে বলেছেন, দান্তে ও ইবনুল আরাবির মধ্যে সামঞ্জস্য বেশ ভালোভাবেই সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইবনুল আরাবি থেকে তার উপমাগুলো প্রায় দুইশ বছর পর গ্রহণ করেছেন দান্তে।

ইতালি ও ফ্রান্সে যখন আরবীয় সংস্কৃতির যুগ, সেই সময়টা যাপন করেছিলেন কবি পেত্রার্কা। তিনি শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন মঁপেলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় (University of Montpellier) ও প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ দুটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আরবদের রচনাবলি ও আন্দালুসের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষাপ্রাপ্ত তাদের ছাত্রদের ওপর ভিত্তি করে। এই কারণে পেত্রার্কা তার জাতির উদ্দেশে বলেছেন, কী আশ্চর্য! দেমোস্থিনিসের পর সিসেরো বাগ্মী হতে পেরেছেন এবং হোমারের পর ভার্জিল কবি হতে পেরেছেন। তাহলে কেন আমাদের এই দুর্ভাগ্য যে আমরা আরবদের পর কিছু লিখলাম না। আমরা ছিলাম গ্রিকদের ও সমস্ত জাতি-গোষ্ঠীর সমকক্ষ এবং মাঝে মাঝে আমরা তাদের থেকে এগিয়েও ছিলাম, কেবল আরবদের ব্যতিরেকে। আফসোস নির্বুদ্ধিতার জন্য! ভ্রান্তিবিলাসিতার জন্য আফসোস! আফসোস ইতালির ক্লান্ত নিস্তেজ প্রতিভার জন্য! এমনই ছিল আরবীয় ইসলামি সভ্যতার আলোকশিখা, যা ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে মানবতার আবাসগুলো আলোকিত করে তুলেছিল।

টিকাঃ
৩৭৩. মুস্তাফা সিবায়ি, মিন রাওয়ায়িয়ি হাদারাতিনা, পৃ. ৪২।
৩৭৪. স্যাঞ্চো (Sancho IV of Castile) ছিলেন দশম আলফোনসো ও ইওলান্দার পুত্র এবং তাকে এল ব্রাভো নামে ডাকা হতো। তিনি ১২৮৪ সাল থেকে আমৃত্যু ক্যাস্টাইল, লিয়ো ও গ্যালিসিয়া শাসন করেন।-অনুবাদক।
৩৭৫. উদ (oud /عود) : ছোট ঘাড়ের বীণাজাতীয় নাশপাতি-আকৃতির বাদ্যযন্ত্র।-অনুবাদক।
৩৭৬. হেনরি-ইরেনি মারো (Henri-Irénée Marrou 1904-1977) একজন ফরাসি ঐতিহাসিক ও খ্রিষ্টান মানবতাবাদী ভাবধারার চিন্তাবিদ। তার কাজের মূল ক্ষেত্র ছিল প্রাচীন কালের নিদর্শন এবং শিক্ষার ইতিহাস।-অনুবাদক।
৩৭৭. আহমদ দারবিশ, নাযরিয়‍্যাতুল আদাবিল মুকারান ওয়া তাজাল্লিয়্যাতুহা ফিল-আদাবিল আরাবি, পৃ. ১৯৪-১৯৫।
৩৭৮. রেইনহার্ট ডোজি (Reinhart Pieter Anne Dozy 1820-1883) ফরাসি বংশোদ্ভূত ডাচ পণ্ডিত ও প্রাচ্যবিদ। প্রোটেস্ট্যান খ্রিষ্টান ছিলেন। নেদারল্যান্ডের লেইডেনে জন্ম ও মৃত্যু। আরবি ভাষা, ইতিহাস ও সাহিত্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ছিলেন।
৩৭৯. Spanish Islam, A History of the Moslems in Spain (1913).-অনুবাদক।
৩৮০. মুস্তাফা সিবায়ি, মিন রাওয়ায়িয়ি হাদারাতিনা, পৃ. ৪৩।
৩৮১. ডিটার মেসনার (Dieter Messner) ইউনিভার্সিটি অব সালজবার্গের (Universität Salzburg) রোমান্স ভাষাবিজ্ঞানের অধ্যাপক।
৩৮২. রোমান্স 'Romance' নামটি প্রাকৃত লাতিন ক্রিয়াবিশেষণ romanice থেকে এসেছে, যা ধ্রুপদি লাতিনের romanicus (রোমানিকুস) শব্দ থেকে বিবর্তিত। রোমান্স বা রোমান্টিক উপন্যাসে ব্যবহৃত রোমান্স শব্দটির উৎপত্তিও একই। মধ্যযুগে ইউরোপে গুরুগম্ভীর রচনা লিখিত হতো মূলত লাতিনে; সাধারণ জনপ্রিয় প্রেমকাহিনি ও অন্যান্য লঘু রচনা রচিত হতো স্থানীয় প্রাকৃত ভাষায় এবং এগুলোকে রোমান্স বলে অভিহিত করা হতো। রোমান্স ভাষাসমূহ (Romance languages) ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা-পরিবারের একটি শাখা। রোমান সাম্রাজ্যের ভাষা, লাতিন থেকে উদ্ভূত সব ভাষা এই ভাষা-পরিবারের অন্তর্গত। এসব ভাষায় উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা ও বিশ্বের বিচ্ছিন্ন কিছু ক্ষুদ্র অঞ্চলের প্রায় ৭০ কোটি মানুষ কথা বলে থাকে। রোমান্স ভাষাগুলো প্রাকৃত লাতিন ভাষা (Vulgar Latin) থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে। রোমান সাম্রাজ্যের সেনা, বণিক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ লোকালয়ের মানুষেরা এই প্রাকৃত লাতিন ভাষায় কথা বলত। প্রাকৃত লাতিন ছিল ধ্রুপদি লাতিন থেকে বেশ আলাদা।-অনুবাদক।
৩৮৩. বিস্তারিত দেখুন, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়‍্যা ফিল-আন্দালুস, সালমা খাদরা জাইয়ুশি (সম্পাদনা), অধ্যায় : اللغة والأدب (Language and Literature), অনুচ্ছেদ : مزید من المفردات العربية وتصنيفاتها فى اللغات الرومانسية والأيبيرية (Further Listings and Categorisations of Arabic Words in Ibero-Romance), লেখক : ডিটার মেসনার, খ. ১, পৃ. ৬৫১।
৩৮৪. মুস্তাফা সিবায়ি, মিন রাওয়ায়িয়ি হাদারাতিনা, পৃ. ৪৪।
৩৮৫. কাব্য আকারে সাহিত্যমানসম্পন্ন কাল্পনিক গল্প।-সম্পাদক
৩৮৬. জোনাথন সুইফ্ট রচিত যুগান্তকারী বক্তব্যপ্রধান কাহিনি। ইংরেজি ভাষায় লেখা এই কাহিনি ভ্রমণবৃত্তান্তের আদলে রচিত। ১৭২১ সাল থেকে ১৭২৬ সালের মধ্যে সুইফ্ট এই লেখা শেষ করেন বলে মনে করা হয়। ১৭২৬ সালের ২৮ অক্টোবর এই বই প্রকাশিত হয়। অষ্টাদশ শতকে ইংল্যান্ডে এই ভ্রমণকাহিনি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। Gulliver's Travels মূলত বাজারে প্রচলিত ভ্রমণকাহিনিগুলোর প্যারডি বা ব্যঙ্গাত্মক রচনা। এর প্রতিটি অসম্ভব অভিযানের অন্তরালে প্রচলিত ভ্রমণকাহিনিগুলোর এক মর্মান্তিক ব্যঙ্গ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।- অনুবাদক।
৩৮৭. রবিনসন ক্রুসো (Robinson Crusoe) ইংরেজ ঔপন্যাসিক ড্যানিয়েল ডিফো রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ এবং ওই গ্রন্থের প্রধান চরিত্র। রচনাকাল ১৭১৯ সাল। স্কটল্যান্ডবাসী নাবিক আলেকজান্ডার সেলকার্কের (১৬৭৬-১৭২১ খ্রি.) দুঃসাহসিক অভিযান রবিনসন ক্রুসোর গল্পের উপাদান। রবিনসন ক্রুসো সমুদ্রযাত্রা করে জাহাজডুবিতে একটি নির্জন দ্বীপে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এই ঘটনা অবলম্বন করে ডিফো তিন খণ্ডে রবিনসন ক্রুসো রচনা সমাপ্ত করেন। প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে মানুষের শক্তির জয় এই গ্রন্থের মূল বিষয়। এই বইয়ের অনুকরণে সুইজারল্যান্ডের লেখক জোহান রুডোল্‌ল্ফ ভিস (Johann Rudolf Wyss) লেখেন তার বিখ্যাত বই ডের ভাইসেরিশে রোবিন্সন; মোট চার খণ্ডে রচিত এই বই সুইস ফ্যামিলি রবিনসন নামে ইংরেজি অনুবাদে পৃথিবীব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছে। দুটি বই-ই বাংলাভাষায় অনূদিত ও বহুল পরিচিত।-অনুবাদক।
৩৮৮. জাক সি রিসলার (Jacques C. Risler), LA CIVILISATION ARABE, আরবি অনুবাদ, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাহ, অনুবাদক গানিম আবদুন, আরবি অনুবাদ থেকে উদ্ধৃত, পৃ. ২২৩।
৩৮৯. জিওভান্নি বোক্কাচ্চো (Giovanni Boccaccio 1313-1375) একজন ইতালীয় লেখক ও কবি। চতুর্দশ শতকের সফলতম ইউরোপীয় ঔপন্যাসিক ও গল্পকারদের অন্যতম। -অনুবাদক।
৩৯০. দেকামেরোন (The Decameron বা দশ দিনের অপেরা) হলো চতুর্দশ শতকের জিওভান্নি বোক্কাচ্চোর লেখা একশটি গল্পের সংকলন। একে চতুর্দশ শতকে রচিত ইউরোপের প্রধান সাহিত্যকর্ম হিসেবে গণ্য করা হয়। বইটির গল্পগুলো বর্ণনা করে একদল তরুণ-তরুণী। এই সময়ে ফ্লোরেন্সে কালোমৃত্যুর প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল। তিনজন তরুণ ও সাতজন তরুণী কালোমৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য দশদিন শহরের বাইরে অবস্থান করে। সময় কাটানোর জন্য প্রত্যেক সদস্য প্রতিরাতে একটি করে গল্প বলে। এইভাবে দশদিনে গল্প বলে একশটি।-অনুবাদক।
৩৯১. দা ক্যান্টারবেরি টেইল্স (The Canterbury Tales) ইংরেজি সাহিত্যের এক শ্রেষ্ঠ কীর্তি। এর রচয়িতা চতুর্দশ শতাব্দীর জেফ্রি চসার (Geoffrey Chaucer, আনু. ১৩৪৫-১৪০০ খ্রি.) ছিলেন অসাধারণ গুণী মানুষ। সৃষ্টিশীল সাহিত্যিক, অনুবাদক, পণ্ডিত, যোদ্ধা, রাষ্ট্রদূত। সরকারি কর্মচারী জেফ্রি চসার মাতৃভাষা ইংরেজি ছাড়াও ফরাসি এবং লাতিন ভাষা খুব ভালো জানতেন। বহু দেশ ভ্রমণ করেছিলেন তিনি ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছিলেন স্বদেশ ও বিদেশের নানা জ্বরের নানা চরিত্রের নানান মানুষের সঙ্গে। বাস্তবিক জীবনের এই ঘনিষ্ঠ ও ব্যাপক অভিজ্ঞতা তার শ্রেষ্ঠ কাব্য ক্যান্টারবেরি টেইল্স-এ প্রতিফলিত হয়েছে।- অনুবাদক।
৩৯২. মুস্তাফা সিবায়ি, মিন রাওয়ায়িয়ি হাদারাতিনা, পৃ. ৪৪।
৩৯৩. দা ডিভাইন কমেডি (The Divine Comedy) ইতালীয় কবি দান্তে আলেগিয়েরি (Dante Alighieri 1265-1321) রচিত মহাকাব্য। কাব্যটির মূল নাম দিভিনা কোমেদিয়া (Divina Commedia); ইংরেজি পাঠক মহলে ডিভাইন কমেডি নামেই পরিচিত। একাধারে কবি, দার্শনিক, রাজনীতিবিদ ও যোদ্ধা দান্তে ছিলেন মধ্যযুগের পাশ্চাত্য সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লেখক। দান্তে ঠিক কবে দা ডিভাইন কমেডি লিখতে শুরু করেছিলেন তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে ১৩২১ সালে মৃত্যুর কিছুকাল আগে তিনি এ মহাকাব্য সমাপ্ত করেন। দান্তের বেশ কিছু রচনা আছে লাতিন ভাষায়; কিন্তু তার শ্রেষ্ঠ কীর্তি 'দিভিনা কোমেদিয়া' মহাকাব্যটি তিনি রচনা করেন তার মাতৃভাষা ইতালীয়তে।-অনুবাদক।
৩৯৪. এখানে তথ্যগত বিভ্রাট রয়েছে। দান্তের জন্ম হয়েছে সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডেরিকের মৃত্যুর পর। তাই তাদের মধ্যে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। - অনুবাদক
৩৯৫. মুস্তাফা শাক্ত, মাআলিমুল হাদারাতিল ইসলামিয়া, পৃ. ২৬৩-২৬৫।
৩৯৬. সিগরিড হুংকে, শামসুল আরাব তাসতাউ আলাল গারব, পৃ. ৫২১।
৩৯৭. ফ্রাঞ্চেসকো পেত্রার্কা (Francesco Petrarca 1304-1374) একজন লেখক, কবি ও মানবতাবাদী। পেত্রার্কাকে 'মানবতন্ত্রের জনক' বলা হয়। পিয়েত্রো বেম্বো (Pietro Bembo) ১৬শ শতাব্দীতে পেত্রার্কা, বোক্কাচ্চো ও দান্তের কাজের ওপর ভিত্তি করে আধুনিক ইতালীয় ভাষার একটি মডেল তৈরি করেন। রেনেসাঁসের যুগে পেত্রার্কার সনেটগুলো পুরো ইউরোপজুড়ে প্রশংসিত হয় এবং কবিদের অনুকরণীয় হয়ে ওঠে। লিরিক কবিতার মডেলে পরিণত হয়েছিল তার সনেট। 'অন্ধকার যুগ' প্রপঞ্চটির প্রবর্তক যারা ছিলেন পেত্রার্কা তাদের অগ্রগণ্য। - অনুবাদক।
৩৯৮. মুস্তাফা সিবায়ি, মিন রাওয়ায়িয়ি হাদারাতিনা, পৃ. ৪৪।
৩৯৯. দেমোস্থিনিস (Demosthenes 384-322 BC) ছিলেন প্রাচীন এথেন্সের রাষ্ট্রনায়ক ও বাগ্মী। তার বক্তৃতাগুলোতে সামসময়িক এথেনীয় বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা ও প্রতাপ প্রকাশ পেত। জীবনের একটি সময় তিনি পেশাদার বক্তৃতালেখক (লোগোগ্রাফার) হিসেবে কাটিয়েছেন। - অনুবাদক।
৪০০. মার্কাস টুলিয়াস সিসেরো (Marcus Tullius Cicero 106-43 BC) ছিলেন প্রাচীন রোমের বিখ্যাত বাগ্মী, কূটনীতিক, রাজনৈতিক তত্ত্ববিশারদ, আইনজ্ঞ এবং দার্শনিক। তাকে অনেকেই লাতিন ভাষার শ্রেষ্ঠ বাগ্মী এবং প্রবন্ধ-রচয়িতা হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন। - অনুবাদক।
৪০১. হোমার (Homer, আনু. খ্রিষ্টপূর্ব ১২-৯ শতক) প্রাচীন গ্রিক কবি ও ইউরোপের আদি কবি হিসেবে খ্যাত। গ্রিক ভাষায় তার নাম 'ওমেরোস্' হলেও আমাদের কাছে তিনি 'হোমার' নামেই পরিচিত। বিশ্বসাহিত্যের সেরা সম্পদ 'ইলিয়াড' ও 'অডিসি' মহাকাব্য দুটি তার রচনা। হোমারের জীবন, জন্মস্থান ও জন্মকাল সম্পর্কে সঠিক কিছুই জানা যায় না। এ নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ আছে। কারও কারও মতে হোমার নামে আসলে কেউ ছিলেনই না। আধুনিক গবেষকেরা অবশ্য হোমার এবং হোমারের সৃষ্টিকর্মকে স্বীকার করে নিয়েছেন। হোমার অন্ধ ছিলেন বলে কিংবদন্তি আছে। কিন্তু তার কাব্যে পৃথিবীর রূপ-রস ও সৌন্দর্যানুভূতির এমন আশ্চর্য সজীবতার প্রকাশ ঘটেছে যে গবেষকেরা মনে করেন, হোমার শেষ বয়সে দৃষ্টি হারিয়ে থাকলেও পারেন, তবে জন্মান্ধ ছিলেন না নিশ্চয়ই। প্রাচীন গ্রিসে হোমার জাতীয় কবির মর্যাদা পেয়েছিলেন। প্লেটো ও অ্যারিস্টটল উভয়েই তাদের রচনায় বারংবার হোমারের কাব্যরীতির উল্লেখ করেছেন।- অনুবাদক।
৪০২. ভার্জিল (Virgil, আনু. ৭০-১৯ খ্রিষ্টপূর্ব) প্রাচীন রোমক সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি বলে খ্যাত। তার অমর ও কালজয়ী মহাকাব্য ইনিদ-এর জন্য তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৭০ অব্দের ১৫ অক্টোবর ইতালির মাস্তোয়ার নিকটবর্তী আন্দেস নামক গ্রামের এক অবস্থাপন্ন কৃষকপরিবারে তার জন্ম। পুরো নাম পুলিউস ভের্গিলিউস্ মারো (Publius Vergilius Maro) হলেও ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের সূত্রে তিনি বাংলাদেশে ভার্জিল নামেই পরিচিত। জন্মসূত্রে ভার্জিল গ্রামকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন এবং ভালোও বেসেছিলেন অকৃত্রিমভাবে। তাই প্রথম জীবনে তিনি গ্রামীণ পরিবেশ ও জীবনভিত্তিক কবিতা রচনা করতে শুরু করেন। পরবর্তীকালে দীর্ঘ এগারো বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে ভার্জিল 'ইনিদ' মহাকাব্যটি রচনা করেন। রচনা শেষ করার পর এর গুণগত মানে তিনি পুরোপুরি তৃপ্ত হতে না পেরে কিছু দুর্বল অংশ আবার সংশোধন ও পুনর্লিখনের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এই কাজ শেষ করার আগেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মৃত্যুর আগে তিনি এই মহাকাব্য পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়ে যান। সম্রাট অগাস্টাস সিজারের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত অতৃপ্ত কবির এই নির্দেশ অগ্রাহ্য হয়।- অনুবাদক।
৪০৩. লুইস সিডিও, Histoire des Arabes (১৮৫৪), আরবি অনুবাদ, তারিখুল আরাব, অনুবাদক: আদিল যুআইতার, পৃ. ৫৬৯।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 শিষ্টাচার ও আচরণে ইসলামি সভ্যতার প্রভাব

📄 শিষ্টাচার ও আচরণে ইসলামি সভ্যতার প্রভাব


জ্ঞানবিজ্ঞান, শিল্পকলা, কবিতা ও সাহিত্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে ইউরোপ ইসলামি সভ্যতা থেকে যা গ্রহণ করেছে তা স্পষ্ট ও সুবিদিত। কারণ এগুলো সম্পূর্ণরূপে বস্তুগত প্রভাব, সূক্ষ্ম ও স্পষ্টভাবে এগুলোর পর্যবেক্ষণ ও যাচাই-বাছাই সম্ভব। অন্যদিকে সামাজিক ও মানবিক প্রভাব (শিষ্টাচার ও আচরণ)-এর পর্যবেক্ষণ ততটা স্পষ্টভাবে সম্ভব নয়। কালগত দৃশ্যপট যত বিস্তৃত হয়, সামাজিক বিকাশও তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সামাজিক কার্যাবলি ও ঘটনাসমূহ স্বাভাবিকভাবেই সংস্কৃতি, দর্শন ও ধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ইসলাম ও পাশ্চাত্যের মধ্যে এগুলো এখনো পর্যন্ত দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের ক্ষেত্র। তাই এই অনুচ্ছেদে আমরা বহু তুলনামূলক বিষয় উল্লেখ করা থেকে বিরত থেকেছি। আমরা বাস্তবিক অর্থেই দেখেছি যে ইসলাম যেসব বিষয় প্রতিষ্ঠিত করেছে, পাশ্চাত্যসভ্যতা এখনো তার অধিকাংশেরই নাগাল পায়নি। কারণ দৃষ্টিভঙ্গি, ধ্যানধারণা ও দর্শনের পার্থক্য থেকেই গেছে। আমরা এখানে পাশ্চাত্যের এমন কিছু দিক উল্লেখ করব যা পরিপূর্ণরূপে ইসলামি সভ্যতার দ্বারা প্রভাবিত।

ফরাসি লেখক ফ্রাঁসোয়া জোলিভেট কান্তাও (François Jollivet-Castelot) তার 'কানুনুত তারিখ' (La Loi de l'Histoire, 1933) গ্রন্থে বলেছেন, ইউরোপ ওই যুগে যে উপকারী বায়ু-প্রবাহ ভোগ করেছে তার জন্য আরবীয় চিন্তা-চেতনার কাছে ঋণী। ইউরোপ এমন চারটি শতাব্দী কাটিয়েছে যখন সেখানে আরবসভ্যতা ছাড়া আর কোনো সভ্যতার অস্তিত্বই ছিল না। ইউরোপের জ্ঞানী-বিজ্ঞানীরাও আরবসভ্যতার উড্ডীয়মান ঝান্ডা বহন করেছে।

অত্যন্ত যৌক্তিক বিবেচনায় সমকালীন পাশ্চাত্যসভ্যতার যেকোনো দৃশ্যপটের উন্নতি ও বিকাশকে রোমান সভ্যতা থেকে আলাদা করে ওই মধ্যযুগের সঙ্গে অর্থাৎ ইসলামি সভ্যতাকালের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়। এই গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায়ে আমরা ইসলামি সভ্যতার এসব অবদান সম্পর্কে আলোকপাত করেছি। অধিকার, স্বাধীনতা, আচার-আচরণ, আখলাক-শিষ্টাচার, লেনদেন ইত্যাদি বিষয়ে ইসলামি সভ্যতার কী অবদান তার কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছি। এই অনুচ্ছেদে আমরা পাশ্চাত্যসভ্যতায় এসব অবদানের কী প্রভাব রয়েছে তা খতিয়ে দেখব।

৮৯০ খ্রিষ্টাব্দে আলফোনসো দা গ্রেট তার পুত্র যুবরাজের জন্য একজন শিক্ষাগুরু নিয়োগ করার ইচ্ছা করেন। এই দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি কর্ডোভার দুইজন মুসলিমকে আহ্বান জানান। কারণ তার পুত্রকে শিষ্টাচার শিক্ষাদানের জন্য উপযুক্ত কোনো খ্রিষ্টান তিনি খুঁজে পাননি।

মুসলিমরা যখন আন্দালুস জয় করলেন, খ্রিষ্টানদের একটি দল ইসলামি শাসনের ছায়াতলে বসবাস করতে চাইল না, তারা ফ্রান্সে চলে যাওয়াটাকেই ভালো মনে করল। টমাস আর্নল্ড যে-সকল খ্রিষ্টান ইসলামি রাজ্যে সন্তুষ্টচিত্তে বসবাস করেছে তারা মুসলিমদের থেকে কী আচরণ পেয়েছে সেই সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। এর সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে যারা ফ্রান্সে চলে গিয়েছিল তারা ওখানে কী আচরণের শিকার হয়েছিল সেটাও উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, যারা খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের শাসনাধীন বসবাস করার জন্য ফরাসি দেশে চলে গিয়েছিল তাদের অবস্থা বাস্তবিক বিচারে তাদের ধর্মীয় ভাইদের (যারা আন্দালুসে ইসলামি শাসনের ছায়াতলে থেকে গিয়েছিল তাদের) চেয়ে ভালো ছিল না। ৮১২ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রাঙ্কদের রাজা শার্লেমাইন (Charlemagne) স্পেন থেকে ফিরে আসেন। এ সময় যেসব দেশত্যাগী লোক তার সঙ্গে জড়ো হয়েছিল তাদেরকে সাম্রাজ্যের কর্মচারীদের হুমকি-ধমকি ও জুলুম-নির্যাতন থেকে বাঁচানোর জন্য তিনি নিজে হস্তক্ষেপ করেন। তিন বছর পর ফরাসি রাজা লুইস দা পাইয়াস (Louis the Pious) দেশত্যাগীদের অবস্থা উন্নয়নের জন্য একটি ডিক্রি জারি করতে বাধ্য হন। তা সত্ত্বেও তারা অভিজাত শ্রেণির লোকদের বিরুদ্ধে পুনরায় অভিযোগ না করে থাকতে পারেনি; কারণ অভিজাত শ্রেণির লোকেরা দেশত্যাগীদের নামে বরাদ্দ ভূমি দখল করে নিচ্ছিল। কিন্তু এসব দুর্বৃত্তদের দমনপ্রচেষ্টা কিছুদিনের মধ্যে অকেজো হয়ে পড়ল এবং নতুন করে অভিযোগের পাহাড় তৈরি হলো। এ সকল সহায়সম্বলহীন দুর্ভাগা দেশত্যাগীদের অবস্থা ভালো করার জন্য যেসব সরকারি ফরমান ও ডিক্রি জারি হয়েছিল তার কোনো হদিসই পাওয়া গেল না। পরবর্তী সময়ে ক্যাগোট (Cagots) সংখ্যালঘুরা অত্যন্ত নিকৃষ্ট আচরণের শিকার হয়েছিল। যেসব স্প্যানিশ কলোনি ইসলামি শাসনব্যবস্থা থেকে পালিয়ে গিয়েছিল এবং নিজেদের স্বগোত্রীয় খ্রিষ্টানদের করুণার ওপর ছুড়ে দিয়েছিল তাদের কথাও পুনরায় উল্লেখ করব। মুসলিমদের সঙ্গে ওঠাবসা ও লেনদেন যে খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের স্বভাবচরিত্রকে নম্র-ভদ্র করে তুলেছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় আন্দালুসের এক ঐতিহাসিক ইজিডোরের (Isidore of Seville) ক্রিয়াকলাপ থেকেও।

টমাস আর্নল্ড বর্ণনা করেছেন যে, ইজিডোর মুসলিম বিজেতাদের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ পোষণ করতেন। অথচ তিনি আবদুল আযিয ইবনে মুসা ইবনে নুসাইর যে সম্রাট রডারিকের বিধবা স্ত্রীকে বিয়ে করেছিলেন সেই ঘটনা পেশ করেছেন কোনো বিরূপ মন্তব্য ছাড়াই; এই ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি একটিও নেতিবাচক শব্দ ব্যবহার করেননি। আর্নল্ড আরও জানাচ্ছেন, এসব বিষয় ছাড়াও বহু খ্রিষ্টান তাদের নাম রেখেছিল আরবি শব্দে। বিভিন্ন ধর্মীয় বিধি পালনে তারা মুসলিম প্রতিবেশীদের অনুসরণও করত। ফলে অসংখ্য খ্রিষ্টান খতনা করিয়েছিল। খাদ্য ও পানীয়ের ক্ষেত্রেও তারা মুসলিমদের সংস্কার ও রীতিনীতি মেনে চলত।

ক্রুসেড যুদ্ধকালে যেসব ক্রুসেডার সিরিয়া (শাম ভূমি) দখল করে নিয়েছিল তারা ছিল পক্ষপাতিত্ব ও গোঁড়ামির উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। এমনকি উইলিয়াম মন্টগোমারি ওয়াট বিস্ময় বোধ করেছেন এবং বলেছেন, ক্রুসেডে অংশগ্রহণের জন্য যারা এসেছিল তাদের ধর্ম (খ্রিষ্টধর্ম) যে শান্তির ধর্ম এটা বিশ্বাস করা কঠিন ছিল।

কিন্তু মুসলিমদের সঙ্গে মেলামেশার পর তাদের মন-মানসিকতা পালটে গিয়েছিল। এই প্রসঙ্গে উইল ডুরান্ট বলেন, যে ইউরোপীয়রা এসব দেশে (সিরিয়া ও ফিলিস্তিনে, ক্রুসেডের সময়) তাদের আবাস তৈরি করে নিয়েছিল তারা ধীরে ধীরে প্রাচ্যীয় বেশভূষা ও আদব-আখলাক গ্রহণ করে...। এসব (বিজিত) এলাকায় যে-সকল মুসলিম বসবাস করত তাদের সঙ্গে ইউরোপীয়দের সম্পর্ক ও যোগাযোগ জোরালো হয়ে ওঠে। এতে দুটি জাতির মধ্যে যে রেষারেষি ও শত্রুতাভাব ছিল তা কমে যায়। মুসলিম ব্যবসায়ীরা পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে খ্রিষ্টীয় দেশগুলোতে প্রবেশ করতে শুরু করে এবং ওখানকার বাসিন্দাদের কাছে তাদের পণ্য বিক্রি করে। অন্যদিকে খ্রিষ্টান রোগীরা খ্রিষ্টান চিকিৎসকদের চেয়ে মুসলিম ও ইহুদি চিকিৎসকদের প্রাধান্য দেয়। খ্রিষ্টান ধর্মীয় নেতারা মুসলিমদের মসজিদগুলোতে ইমামতি ও ইবাদতের অনুমতি দেয়। খ্রিষ্টান অধ্যুষিত আন্তাকিয়ায় ও ত্রিপোলিতে অবস্থিত মাদরাসাগুলোতে মুসলিমরা তাদের সন্তানদের পাঠাতে ও কুরআন শেখাতে শুরু করে।

এসব ব্যাপার খ্রিষ্টানদের মৌলিক স্বভাবজাত ছিল না। কারণ ক্রুসেডাররা স্পেনে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে কী নির্মম আচরণ করেছিল তা আমরা দেখেছি। ওই সময় থেকে পাঁচ শতাব্দী কেটে যাওয়ার পর স্পেনে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে কী আচরণ করা হয়েছে তা বলাই বাহুল্য।

সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি বাইতুল মুকাদ্দাস স্বাধীন করার পর খ্রিষ্টানদের সঙ্গে যে মানবিক আচরণ করেছিলেন তা ছিল বিস্ময়কর। আশ্চর্যজনক হলেও সালাহুদ্দিন আইয়ুবির এমন আচরণের মূল্যায়নও রয়েছে, স্বীকৃতিও রয়েছে।

আমরা দেখি যে, ফরাসি মার্ক্সবাদী ইতিহাসবিদ ম্যাক্সিম রোডিনসন তার স্বীকারোক্তি লিপিবদ্ধ করেছেন এভাবে, সবচেয়ে বড় শত্রু সালাহুদ্দিন পশ্চিমাদের মধ্যে ব্যাপক বিস্ময়ের সৃষ্টি করলেন। তিনি মানবিকতা ও বীরত্বের দ্বারা যুদ্ধকে অলংকৃত করলেন; অথচ তার শত্রুদের মধ্য থেকে তার সঙ্গে এমন আচরণ খুব কম লোকই করেছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলেন ইংল্যান্ডের সম্রাট রিচার্ড দা লায়নহার্ট।

টমাস আর্নল্ড বলেছেন, এটা স্পষ্ট যে, সালাহুদ্দিন আইয়ুবির চারিত্রিক গুণাবলি ও তার বীরত্বপূর্ণ জীবন তার সমকালে খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের মন ও মগজে জাদুকরী প্রভাব সৃষ্টি করেছিল। এমনকি একদল খ্রিষ্টান বীরযোদ্ধা সালাহুদ্দিন আইয়ুবির প্রতি এতটাই আকর্ষণ অনুভব করেছিল যে তারা খ্রিষ্টধর্ম ত্যাগ করে এবং স্বজাতিকে ত্যাগ করে মুসলিমদের সঙ্গে গিয়ে মিশে।

খ্রিষ্টান ঐতিহাসিকদের মধ্যে সালাহুদ্দিনের মহত্ত্ব সম্পর্কে যে বিস্ময় ছড়িয়ে ছিল তা লিপিবদ্ধ করেছেন উইল ডুরান্ট, সালাহুদ্দিন নিজ ধর্মের প্রতি সীমাহীন অনুরাগী ছিলেন। নাইটস টেম্পলার ও নাইটস হসপিটালার্স-এর ওপর তীব্র কঠোরতাকে তিনি নিজের জন্য বৈধ ও সহনীয় করে নিয়েছিলেন। কিন্তু স্বভাবত তিনি দুর্বলদের প্রতি সহানুভূতিশীল ও পরাজিতদের প্রতি দয়াপরবশ ছিলেন। অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার মধ্য দিয়ে তিনি তার সকল শত্রুর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিলেন। এতে খ্রিষ্টান ঐতিহাসিকেরা বিস্ময় বোধ করেছেন যে, কীভাবে দ্বীনে ইসলাম-যা তাদের ধারণায় ভ্রান্ত-একজন ব্যক্তিকে এমনভাবে চারিত্রিক গুণাবলিতে ভূষিত করল যে, সে শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্বের এই পর্যায়ে পৌঁছে গেল।

এ তো গেলই, চৌদ্দ শতাব্দী পরও ইসলামি এই বিধান এখনো অটুট রয়েছে,

أَنْتُمْ بَنُو آدَمَ وَآدَمُ مِنْ تُرَابٍ، أَلَا لَا فَضْلَ لِعَرَبِي عَلَى أَعْجَمِيٌّ وَلَا لِعَجَمِي عَلَى عَرَبِي وَلَا لِأَحْمَرَ عَلَى أَسْوَدَ وَلَا أَسْوَدَ عَلَى أَحْمَرَ إِلَّا بِالتَّقْوَى

তোমরা আদমের সন্তান আর আদম মাটির তৈরি। সুতরাং অনারবদের ওপর আরবদের এবং আরবদের ওপর অনারবদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, গৌরবর্ণের ওপর কৃষ্ণবর্ণের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই এবং কৃষ্ণবর্ণের ওপর গৌরবর্ণের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তবে শ্রেষ্ঠত্ব নিরূপণ হবে তাকওয়ার ভিত্তিতে।

আব্রাহাম লিংকন উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে দাসশ্রেণির মুক্তির উদ্যোগ নেন। পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল এবং তিনি দাসশ্রেণির উপকারভোগী সম্প্রদায় থেকে এমন তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হন যে, তিনি এই উদ্যোগ থেকে সরে আসার উপক্রম করেছিলেন। তবে তিনি এ বিষয়ে রাষ্ট্রীয় আইন জারি করে দেন। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে, তিনি নিজেও জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে সমতায় বিশ্বাসী ছিলেন না।

সংগত কারণেই আমরা বলব, ইউরোপে এখনো আচার-আচরণে ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে বর্ণবাদ (রেসিজম) ও বর্ণবাদমূলক বৈষম্য রয়ে গেছে। বিশেষ করে ফ্রান্সে ও জার্মানিতে..। গুস্তাভ লি বোঁ জানিয়েছেন, আরবদের মধ্যে সাধারণ সমতার প্রেরণা সবসময়ই ছিল। তাদের রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোতেও তা প্রতিফলিত হয়েছে। ইউরোপে সমানাধিকার-নীতির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে বটে, তবে তা কাজে নয়, শুধু কথায়। এই মানবাধিকার-নীতি ইসলামি শরিয়ার স্বভাব-প্রকৃতিতে পরিপূর্ণভাবে বদ্ধমূল রয়েছে। যেসব সামাজিক শ্রেণির অস্তিত্ব পাশ্চাত্যে প্রাণঘাতী বিপ্লব-বিদ্রোহের সৃষ্টি করেছিল এবং এখনো করছে সেসব শ্রেণির প্রতি মুসলিমদের কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।

আর চৌদ্দ শতাব্দী পূর্বে ইসলাম বন্দিদের ব্যাপারে যে নির্দেশ দিয়েছে তা নিম্নরূপ,

فَإِمَّا مَنَّا بَعْدُ وَإِمَّا فِدَاءً

তারপর চাইলে (বন্দিদেরকে) মুক্তি দেবে অনুকম্পা দেখিয়ে অথবা মুক্তিপণ নিয়ে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন, «اسْتَوصُوا بالنِّسَاءِ خَيْرًا» তোমরা নারীদের সঙ্গে সদাচার করো বা তাদের কল্যাণকামী হও।

ইসলামের এমন নির্দেশনার চৌদ্দশ বছর পর জেনেভা কনভেনশন ১৯৪৯ সালে বন্দিদের ব্যাপারে নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এসব নীতিমালায় বন্দিদের অধিকার সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। তারপরও ইসলাম বন্দিদের যে অধিকার দিয়েছে তার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি। যুদ্ধ চলাকালে নাগরিকদের সঙ্গে আচরণ কেমন হবে তা নিয়ে ১৯৪৯ সালের ১২ আগস্ট জেনেভা কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্পর্কেও একই কথা বলা যায়। কারণ চৌদ্দ শতাব্দী পূর্বেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

اغْزُوا وَلَا تَغُلُوا، وَلَا تَغْدِرُوا، وَلَا تَمْتُلُوا، وَلَا تَقْتُلُوا وَلِيدًا»
তোমরা যুদ্ধ করো কিন্তু (যুদ্ধলব্ধ সম্পদে) খেয়ানত করো না, চুক্তি ভঙ্গ করো না, শত্রুদের বিকলাঙ্গ (হাত, পা, নাক, কান কর্তন) করো না এবং কোনো শিশুকে হত্যা করো না...।

আবু বকর সিদ্দিক রা. বলেছেন,

لَا تَعْصُوا، وَلَا تَغُلُّوا، وَلَا تَجْبُنُوا، ولا تهدموا بيعة، ولا تعزقُوا نَخْلًا، وَلَا تَحْرِقُوا زَرْعًا، وَلَا تَجَشروا بَهِيمَةً، وَلَا تَقْطَعُوا شَجَرَةً مُثْمِرَةً، وَلَا تَقْتُلُوا شَيْخًا كَبِيرًا، وَلَا صَبِيًّا صَغِيرًا، وَسَتَجِدُونَ أَقْوَامًا حَبَسُوا أَنْفُسَهُمْ لِلَّذِي حَبَسُوهَا فَذَرُوهُمْ وَمَا حَبَسُوا أَنْفُسَهُمْ لَهُ».
তোমরা যুদ্ধক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করো না, যুদ্ধলব্ধ সম্পদে খেয়ানত করো না, ভীরুতা প্রদর্শন করো না, গির্জা ধ্বংস করো না, খেজুরগাছ খুঁড়ে তুলে ফেলো না, ফসল পুড়িয়ে দিয়ো না, চতুষ্পদ জন্তুদের আটকে রেখো না, ফলদার বৃক্ষ কর্তন করো না, কোনো বৃদ্ধকে হত্যা করো না, ছোট শিশুদের হত্যা করো না। তোমরা এমন লোকদের দেখবে যারা নিজেদের কাজে ব্যস্ত রয়েছে (যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি), তোমরা তাদের ছেড়ে দিয়ো এবং তাদের কাজ করতে দিয়ো।

তালাকের প্রসঙ্গেও একই কথা প্রযোজ্য। চৌদ্দশ বছর পূর্বে ইসলাম তালাকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। অন্যদিকে ইউরোপে তালাকের বৈধতা জ্ঞাপন করে নাগরিক আইন পাশ হয়েছে মাত্র গত শতাব্দীতে। ব্রিটেনে ১৯৬৯ সালে তালাক প্রসঙ্গে নাগরিক আইন জারি করা হয়। নারীদের সঙ্গে বৈষম্য-নিরসনে যে আন্তর্জাতিক ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে তা ইসলামি শরিয়া দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত এবং এ ব্যাপারটি সবার কাছে অত্যন্ত স্পষ্ট। নারীর মালিকানা, উত্তরাধিকার, আইনগত সক্ষমতা (legal capacity) ইত্যাদি অধিকার প্রসঙ্গে ইসলামি ফিকহের গ্রন্থাবলিতে যা-কিছু রয়েছে তারই সারমর্ম ফুটে উঠেছে এই সনদের ধারাগুলোতে। আর এই ঘোষণাপত্র গৃহীত হয় ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দের ৭ নভেম্বর।

ইউরোপ আধুনিক যুগেও নারীর প্রতি চরম অবমাননা ও বৈষম্য প্রত্যক্ষ করেই উপর্যুক্ত ঘোষণাপত্র তৈরি করেছে। নারী অবমাননার অদ্ভুত সব ঘটনা রয়েছে এ আধুনিক যুগের। যেমন ১৭৯০ সালে গির্জা কর্তৃপক্ষ একজন নারীর ভরণপোষণের দায়িত্ব অতিরিক্ত বোঝা মনে করে, ফলে ওই নারীকে মাত্র দুই শিলিংয়ে বিক্রি করে দেয়। উনিশ শতকের শুরুতেও (১৮০৫ সালে) স্বামীর অধিকার ছিল স্ত্রীকে নির্ধারিত মূল্যে (৬ সেন্ট) বিক্রি করে দেওয়ার, অর্থাৎ স্ত্রী ছিল স্বামীর মালিকানাধীন বস্তু। ১৯৩১ সালে একজন ইংরেজ তার স্ত্রীকে বিক্রি করে দেয় এবং ১৮০৫ সালের পূর্ববর্তী আইনের আওতায় তাকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য একজন আইনজীবীও সে পেয়ে যায়। অবশেষে আদালত তাকে পনেরো মাসের কারাদণ্ড দেয়।

ইউরোপে নারী স্থাবর সম্পত্তির মালিকানা-অধিকারও লাভ করে উনিশ শতকের শেষের দিকে, ১৮৮২ সালে। এমনকি ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সে পাগল ও শিশুদের মতো নারীদেরকেও অক্ষম ও অপরিণত বলে মনে করা হতো।

টিকাঃ
৪০৪. ফ্রাঁসোয়া জোলিভেট কাস্তাও, La Loi de l'Histoire; মুহাম্মাদ কুরদ আলি, আল-ইসলামু ওয়াল-হাদারাতুল আরাবিয়্যা, পৃ. ৫৪৪ থেকে উদ্ধৃতি।
৪০৫. তৃতীয় আলফোনসো অব আস্তুরিয়াস (Alfonso III of Asturias 848-910), ৮৬৬ সাল থেকে মৃত্যু পর্যন্ত লিয়োঁ, গ্যালিসিয়া ও আস্তুরিয়াসের রাজা।-অনুবাদক
৪০৬. মুহাম্মাদ কুরদ আলি, আল-ইসলামু ওয়াল-হাদারাতুল আরাবিয়্যা, পৃ. ৫৪৮।
৪০৭. স্যার টমাস ওয়াকার আর্নল্ড (Sir Thomas Walker Arnold 1864-1930) ছিলেন বিখ্যাত ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ ও ঐতিহাসিক। ১৯২১ সাল থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কুল অব ওরিয়েন্টাল স্টাডিজ-এর আরবি ভাষা ও ইসলামি শিক্ষার অধ্যাপক ছিলেন। The Preaching of Islam: A History of the Propagation of the Muslim Faith তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।-অনুবাদক
৪০৮. টমাস আর্নল্ড, The Preaching of Islam: A History of the Propagation of the Muslim Faith, আরবি অনুবাদ, الدعوة الى الاسلام بحث في تاريخ نشر العقيدة الاسلامية, পৃ. ২০1।
৪০৯. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬০।
৪১০. প্রাগুক্ত।
৪১১. উইলিয়াম মন্টগোমারي ওয়াট (William Montgomery Watt 1909-2006) ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ ও ইসলামি স্টাডিজে বিশেষজ্ঞ। তিনি ১৯৬৪ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি ভাষা ও ইসলামশিক্ষা বিষয়ে অধ্যাপনা করেছেন। এ ছাড়াও তিনি ইউনিভার্সিটি অব টরেন্টো, কলেজ ডি ফ্রান্স এবং জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এবারডিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি সম্মানসূচক ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি স্কটিশ এপিস্কোপাল চার্চের ধর্মযাজক ছিলেন। ইসলামি দর্শন, তুলনামূলক ধর্ম, ইসলামি ইতিহাস ও ইসলামি সভ্যতা বিষয়ে তার ২০টি গ্রন্থ রয়েছে।- অনুবাদক।
৪১২. মন্টগোমারي ওয়াট, The Influence of Islam on Medieval Europe, আরবি অনুবাদ, فضل الإسلام على الحضارة الغربية, পৃ.২০২।
৪১৩. খ্রিষ্টানরা সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের যেসব এলাকা দখল করে নিয়েছিল সেগুলো উদ্দেশ্য। অন্যথায় এগুলো তাদের দেশ ছিল না।
৪১৪. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১৫, পৃ. ৩৪।
৪১৫. ম্যাক্সিম রোডিনসন (Maxime Rodinson 1915-2004) একজন ফরাসি প্রাচ্যবিদ ও ধর্মের ইতিহাস বিষয়ে উল্লেখযোগ্য পণ্ডিত। ইসলাম ও আরববিশ্ব সম্পর্কে একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ হলো, Muhammad (১৯৬০); Islam and Capitalism (১৯৬৬); Marxism and the Muslim world (১৯৭২); Europe and the Mystique of Islam (১৯৮০)।
৪১৬. ম্যাক্সিম রোডিনসন, আস-সুরাতুল গারবিয়্যাহ ওয়াদ-দিরাসাতুল গারবিয়্যাতু ওয়াল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৪১।
৪১৭. টমাস আর্নল্ড, The Preaching of Islam: A History of the Propagation of the Muslim Faith, আরবি অনুবাদ, الدعوة إلى الاسلام بحث في تاريخ نشر العقيدة الاسلامية ১১১।
৪১৮. নাইটস টেম্পলার : সুলাইমানের মন্দির এবং খ্রিষ্টের দরিদ্র সহযোগী-সৈনিকবৃন্দ (Poor Fellow-Soldiers of Christ and of the Temple of Solomon) সাধারণ মানুষের কাছে নাইট টেম্পলার নামে পরিচিত। এ ছাড়া একে অর্ডার অব দা টেম্পলও বলা হয়ে থাকে। খ্রিষ্টান সামরিক যাজক সম্প্রদায়গুলোর (অর্ডার) মধ্যে এটিই সবচেয়ে বিখ্যাত এবং পরিচিত। মধ্যযুগে প্রায় দুই শতকব্যাপী এই সংগঠনের অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল। ১০৯৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম ক্রুসেডের পরই এর সৃষ্টি হয় যার উদ্দেশ্য ছিল জেরুসালেমে আগত বিপুল সংখ্যক ইউরোপীয় তীর্থযাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। জেরুসালেম মুসলিমদের দখলে চলে যাওয়ার পর এই নিরাপত্তার প্রয়োজন দেখা দেয়। ১১২৯ খ্রিষ্টাব্দে চার্চ এই সংগঠনকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করে। এরপর থেকে যাজক সম্প্রদায়টি গোটা ইউরোপের সবচেয়ে জনপ্রিয় দাতব্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এর সদস্যসংখ্যা এবং ক্ষমতা বিপুল হারে বাড়তে থাকে। স্বতন্ত্র ধরনের লাল ক্রস-সংবলিত আলখাল্লা পরিধান করার কারণে যেকোনো টেম্পলার নাইটকে সহজেই চিহ্নিত করা যেত। তারা ছিল ক্রুসেডের সময়কার সর্বোৎকৃষ্ট অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত, সর্বোচ্চমানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং সর্বোচ্চ শৃঙ্খলাবিশিষ্ট যোদ্ধা দল।-অনুবাদক।
৪১৯. নাইটস হসপিটালার্স : নাইটস হসপিটালার (The Order of Knights of the Hospital of Saint John of Jerusalem) একটি ক্যাথলিক মিলিটারি অর্ডার। বিভিন্ন সময়ে এর হেডকোয়ার্টার জেরুসালেম, রোডস এবং মাল্টাতে ছিল। ১২শতকে great monastic reformation-এর সময় জেরুসালেমের মুরিস্তান জেলায় আমালফিটান হাসপাতালের সঙ্গে জড়িত লোকদের সংঘ হিসাবে হসপিটালারদের উত্থান হয়। পবিত্র ভূমিতে আসা খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের সেবার জন্য ১০২৩ সনে জন দি ব্যাপ্টিস্ট (ইয়াহয়া)-এর প্রতি উৎসর্গিত করে জেরার্ড থম (Gerard Thom) এটি প্রতিষ্ঠা করেন। অবশ্য কিছু বিদ্বান মনে করেন যে আমালফিটান হাসপাতাল থেকে জেরার্ড থমের অর্ডার ও হাসপাতাল ভিন্ন ছিল। প্রথম ক্রুসেড চলাকালে ১০৯৯ সনে জেরুসালেম অবরোধ সংস্থাটি একটি ধর্মীয় সংঘে এবং সামরিক সংঘে পরিণত হয় যার দায়িত্ব ছিল পবিত্র ভূমির প্রতিরক্ষা। মুসলিম শক্তি কর্তৃক পবিত্র ভূমি দখলের পর, নাইটরা রোডস থেকে তাদের কাজ পরিচালনা করত, যেখানে তাদের সার্বভৌমত্ব ছিল এবং আরও পরে মাল্টা থেকে, যেখানে তারা সিসিলির স্প্যানিশ ভাইসরয়ের অধীনে করদরাজ্য শাসন করত। হসপিটালাররা ১৭ শতকের এক সময় চারটি ক্যারিবীয় দ্বীপ দখল করেছিল যা তাদেরকে ১৬৬০ সনে ফ্যাসিদের কাছে ছেড়ে দিতে হয়।-অনুবাদক।
৪২০. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১৫, পৃ. ৪৫।
৪২১. মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২৩৫৩৬; তাবারানি, আল-মুজামুল কাবির, হাদিস নং ১৪৪৪৪; বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, হাদিস নং ৪৯২১।
৪২২. গুস্তাভ লি বোঁ, হাদারাতুল আরাব, পৃ. ৩৯১।
৪২৩. সুরা মুহাম্মাদ, আয়াত ৪।
৪২৪. তাবারানি, আল-মুজামুল কাবির, হাদিস নং ১৪৪৪৪; আল-মুজামুস সগির, হাদিস নং ৪০৯।
৪২৫. ইসলামের প্রাথমিক যুদ্ধগুলো থেকেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধ, যুদ্ধবন্দি ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদের ব্যাপারে নীতিমালা প্রণয়ন করেছিলেন। যেমন: যুদ্ধবন্দিদের পানাহার দানের বিষয়টি কুরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, 'আহারের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও তারা অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিকে আহার্য দান করে।' (সুরা দাহর: আয়াত ৮) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'তোমরা বন্দিদের সঙ্গে কল্যাণকর আচরণ করো।' (তাবারানি, আল-মুজামুল কাবির, হাদিস নং ৪০৯; কানযুল উম্মাল, হাদিস নং ১১০৩৬) এই হাদিস ব্যাপকার্থক, বন্দিদের শারীরিক ও মানসিক উভয় কল্যাণের কথা বোঝানো হয়েছে।-অনুবাদক।
৪২৬. ১২ আগস্ট ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের জেনেভা কনভেনশনের সঙ্গে ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দের ৮ জুন যে প্রটোকল (প্রটোকল ১) বর্ধিত করা হয়েছে তাতে বলা হয়েছে, বেসামরিক জনমণ্ডলী ও বেসামরিক বস্তুর প্রতি সম্মান ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সংঘর্ষমান পক্ষগুলো বেসামরিক জনমণ্ডলী ও যোদ্ধাদের মধ্যে এবং বেসামরিক বস্তু ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পার্থক্য নিশ্চিত করবে এবং সে অনুযায়ী তাদের অপারেশন কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুর উদ্দেশে পরিচালনা করবে। (ধারা ৪৮) অথচ চৌদ্দ শতাব্দী পূর্বে ইসলাম কী নির্দেশ দিয়েছে দেখুন: আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'গির্জায় ও আশ্রমে যারা রয়েছে তাদের হত্যা করো না।' (মুসনাদে আহমদ, ২৭২৮; আবু ইউসুফ, আল-খারাজ, পৃ. ২১২)। এই হাদিস থেকে দুটি ব্যাপার বোঝা যায়, ১. ইসলাম এই গোষ্ঠীটিকে, যারা ধর্মশালায় উপাসনায় লিপ্ত, সম্মান দেখিয়েছে এবং তাদের সঙ্গে দুরাচার করতে নিষেধ করেছে। যেসব যুবক যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে উপাসনালয়ে রয়ে গেছে তাদের ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। ২. যুদ্ধের সময় উপাসনালয় ও ধর্মশালাকে রক্ষা করতে হবে এবং সেগুলোর ওপর আক্রমণ করা বৈধ হবে না, যতক্ষণ না তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুদ্ধে মদদ জোগায়।- অনুবাদক।
৪২৭. মুসলিম, কিতাব: আল-জিহাদ ওয়াস-সিয়ার, বাব: তামিরুল ইমামিল উমারা, হাদিস নং ১৭৩১।
৪২৮. ইবনে আসাকির, তারিখে দিমাশক, খ. ২, পৃ. ৭৫।
৪২৯. Declaration on the Elimination of Discrimination against Women (DEDAW). ১৯৭৯ সালে গৃহীত হয় Convention on the Elimination of all Forms of Discrimination Against Women (CEDAW) (নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ)।-অনুবাদক।
৪৩০. আবদুল ওয়াদুদ শালবি, ফি মাহকামাতিত তারিখ, পৃ. ৬০ ও তার পরবর্তী।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 শিল্পকলায় ইসলামি সভ্যতার প্রভাব

📄 শিল্পকলায় ইসলামি সভ্যতার প্রভাব


ইসলামি সভ্যতা কীভাবে ও কোন পথে ইউরোপে অর্থাৎ পাশ্চাত্যে পৌছেছিল তা আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি। এসব পথ দিয়ে ইসলামি স্থাপত্যশিল্প ও অলংকরণশিল্পও ইউরোপে পৌছেছিল। প্রায়োগিক শিল্পকলার অধিকাংশ শৈলীই (ফর্ম) পৌঁছে গিয়েছিল পশ্চিমা দেশগুলোতে। ফলে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে পাশ্চাত্য সভ্যতায় ইসলামি শিল্পকলার প্রভাব সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইউরোপীয় চারুশিল্পের অনেক ক্ষেত্রে দর্শন ও রূপ উভয়টিই ইসলামি উৎস থেকে নেওয়া। কতিপয় বাস্তবতা এদিকেই ইঙ্গিত করে।

কিন্তু দুঃখের ব্যাপার এই যে, কিছু পশ্চিমা শিল্পী তাদের কাজের সঙ্গে পরিপূরকরূপে বা আলংকারিক উপায়ে ইসলামি শিল্পরূপের সংমিশ্রণ ঘটালেও আরবি লিখনের হরফসমূহের প্রতিলিপির সময় শাব্দিক অর্থ বোঝেননি এবং মুসলিম শিল্পীর উদ্দিষ্ট তাৎপর্য অনুধাবন করেননি। তারা আরবি লিপি ব্যবহার করেছেন, তার অর্থ নয়; নিরর্থক বাহ্যিক আলংকারিক বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তুলে চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার দিকটি বেছে নিয়েছেন।

এই প্রসঙ্গে গুস্তাভ লি বোঁ আরবি লিপিকলার পক্ষে সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, আরবি লিপিকলা আলংকারিক নান্দনিকতার এমন পর্যায়ে পৌছে গিয়েছিল যে, মধ্যযুগে ও রেনেসাঁসের কালে আরবি লেখার যে খণ্ড-বিশেষই খ্রিষ্টান শিল্পবোদ্ধাদের হস্তগত হতো, সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্দেশ্যে তাদের ধর্মীয় স্থাপনাসমূহে তার প্রতিলিপি স্থাপন করাতেন। এ কাজটি তারা অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ততা ও আবেগের সঙ্গে করতেন।

মশিয়ে ল্যাংব্রিয়েহ ও মশিয়ে লাভোইসসহ অনেকেই ইতালিতে সেগুলো প্রত্যক্ষ করেছেন। মশিয়ে লাভোইস এও দেখেন যে, মিলান ক্যাথিড্রালের মালপত্র রাখার জায়গায় পিকারিন নকশায় নির্মিত একটি দরজা, দরজার চারপাশে পাথরের কার্নিশ, কার্নিশের উপর একটি আরবি শব্দ কয়েকবার উৎকীর্ণ। সেন্ট পিটারস ব্যাসিলিকার (St. Peter's Basilica) দ্বারসমূহের উপর অঙ্কিত যিশুর মাথার চারপাশে আরবি লিপি রয়েছে। পোপ চতুর্থ ইউজিনের (Pope Eugene IV) নির্দেশে এই গির্জা নির্মাণ করা হয়েছিল। এখানে সেন্ট পিটার এবং সেন্ট পলের যে মূর্তি ছিল তার আলখাল্লায় দীর্ঘ কুফি লিপি উৎকীর্ণ ছিল।

এরপর তিনি বলেন, আমার আফসোস হলো, এসব আরবি লেখাগুলোর লেখক তার অনুবাদ করেনি। সম্ভবত যিশুর মাথার চারপাশের লেখাটি ছিল- لا إله إلا الله محمد رسول الله।

আরব-ইসলামিক অলংকরণশিল্প বহু ইউরোপীয় শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গি ও শৈলীকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল। কারণ আরবি লিপিকলা কতিপয় ইউরোপীয় শিল্পীর দর্শন ও চিত্রকর্মে প্রভাব ফেলেছিল। আরব-ইসলামি শিল্পকলার অন্যতম সৃষ্টি আরবি লিপিকলা, তার প্রকরণ ও ফর্মে রয়েছে সমৃদ্ধ বৈচিত্র্য এবং বহুবিধ আঙ্গিক ও শৈলীতে তার অলংকরণ সম্ভব। ইসলামি অলংকরণশিল্পের প্রভাব-বিস্তার শুরু হয় ক্রুসেডের সময় থেকে, যখন ইউরোপীয়রা আরবদের সংস্পর্শে আসার সুযোগ লাভ করে। এর শৈল্পিক ঐশ্বর্য ও সমৃদ্ধি তাদের উদ্দীপ্ত করে তোলে এবং তারা চরমভাবে আকর্ষিত হয়।

ফলে তারা তাদের শিল্পকর্মে এর ব্যবহার শুরু করে। তাদের ফলকচিত্রে আরবি লিপির ব্যবহারকারী প্রথম শিল্পীদের মধ্যে ফ্লোরেন্সীয় চিত্রকর জোত্তো দি বন্দোনে অন্যতম। ফ্লোরেন্সীয় চিত্রকর ফিলিপ্পো লিপ্পিও তার কর্মে আরবি লিপিকলার প্রয়োগ ঘটান। তিনি পঞ্চদশ শতাব্দীতে যে-সকল ব্যক্তির চিত্র অঙ্কন করেন তাদের পোশাকে দৃশ্যসজ্জা হিসেবে আরবি লিপি ব্যবহার করেন। আরেক ফ্লোরেন্সীয় চিত্রশিল্পী ভেরোচ্চিয়ো রাজাদের শ্রদ্ধার চিত্র চিত্রায়ণের ফলকে আরবি ক্যালিগ্রাফি ব্যবহার করে, যা ফ্লোরেন্সে সংরক্ষিত রয়েছে।

মোটকথা, ইসলামি শিল্পকলা তার অনন্য নান্দনিক উপাদানগুলোর মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় শিল্পীদের শিল্পচিন্তা ও শিল্পকর্মে প্রভাব বিস্তার করেছিল এবং এভাবে ইউরোপীয়দের মনোজাগতিক অনেক বিষয়কে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছিল। কারণ আরবি লিপিকলা ও আরবি নকশা-প্রকরণ আরাবিস্কে পর্যাপ্ত ছন্দ ও গতি বিদ্যমান থাকায় ইউরোপীয় শিল্পীরা তাদের শিল্পকর্মের জন্য সমৃদ্ধ আঙ্গিক ও শৈলীর উৎস খুঁজে পেয়েছিল এবং নানা জুতসই প্রাণবন্ত ছন্দ ও বৈশিষ্ট্যের নিত্যনতুন আকৃতি ও চিত্র অঙ্কন করতে সক্ষম হয়েছিল।

উপরিউক্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনা ও ইতিহাসের বাস্তবতা তুলে ধরার পর আমরা বলতে পারি, এমন অনন্য ও শাশ্বত অবদানের জন্য অবশ্যই ইসলামি সভ্যতাকে যথার্থ ও শ্রেষ্ঠ ঘোষণা দেওয়ার অধিকার আমাদের রয়েছে। আর এসব চিরন্তন অর্জন ও প্রভাব আমাদের ইসলামি সভ্যতার, যা মানবতার দিগন্তে নিকষ কালো অন্ধকারের পর মানবতাকে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত আলোকিত রেখেছিল।

টিকাঃ
৪০১. Dionisius A. Agius & Richard Hitchcock, The Arab Influence in Medieval Europe, আরবি অনুবাদ : التاثير العربي في أوربا العصور الوسطى ، পৃ. ৬৪
৪০২. ইনাস হুসনি, আসারুল ফন্নিল ইসলামিয়্যি আলাত তাসবিরি ফি আসরিন নাহদাতি, পৃ. ১২০।
৪৩১. গুস্তাত লি বোঁ, হাদারাতুল আরাব, পৃ. ৫৩১।
৪৩২. জোত্তো দি বন্দোনে (Giotto di Bondone) জোতো নামেই সমধিক পরিচিত। তিনি ইতালীয় রেনেসাঁসের প্রথম গড় শিল্পী হিসেবে পরিচিত। ১২৬৭ সালে ফ্লোরেন্সের কাছে কোল্লে দি ভেসপিনিয়ানোতে তাঁর জন্ম এবং ১৩৩৭ সালে ফ্লোরেন্সে মৃত্যু। অনুবাদক
৪০৫. ফিলিপ্পো লিপ্পি (Filippo Lippi) ১৪০৬ সালে ইতালির ফ্লোরেন্সে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বিশটিরও বেশি বিশ্ববিখ্যাত চিত্র অঙ্কন করেছেন। ১৪৬৯ সালে স্পোলেতোতে তার মৃত্যু হয়।-অনুবাদক।
৪০৬. ভেরোচ্চিয়ো (Andrea del Verrocchio) ১৪৩৫ সালে ইতালির ফ্লোরেন্সে জন্মগ্রহণ করেন। 'ম্যাডোনা উইথ সিটেড চাইল্ড', 'বাপ্টিজম অফ ক্রিস্ট', 'তোবিয়াস অ্যান্ড দা অ্যাঞ্জেল' তার বিখ্যাত চিত্রকর্ম। তিনি ১৪৮৮ সালে ভেনিসে মৃত্যুবরণ করেন।-অনুবাদক
৪০৭. ইনাস হুসনি, আসারুল ফন্নিল ইসলামিয়্যি আলাত তাসবিরি ফি আসরিন নাহদাতি, পৃ. ১২৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00