📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 ক্রুসেড যুদ্ধ

📄 ক্রুসেড যুদ্ধ


ক্রুসেড যুদ্ধ প্রায় দুই শতাব্দীব্যাপী অব্যাহত থাকে। হিজরি পঞ্চম শতকের/খ্রিস্টীয় একাদশ শতকের শেষের দিকে (৪৯০ হি./১০৯৭ খ্রি.) ক্রুসেডের সূচনা ঘটে এবং মামলুকদের হাতে ক্রুসেডারদের শেষ দুর্গটির পতনের মধ্য দিয়ে এর সমাপ্তি ঘটে (৬৯০হি./১২৯১ খ্রি.)। এই সময়সীমাকে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট বা প্রভাব-বিস্তার, স্থানান্তর ও আহরণের গুরুত্বপূর্ণ কাল বিবেচনা করা হয়। ক্রুসেডাররা ইসলাম-শাসিত প্রাচ্যে প্রবেশ করেছিল যুদ্ধ করার জন্য, জ্ঞান আহরণের জন্য নয়। তা সত্ত্বেও তারা মুসলিমদের সভ্যতা-সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। তাদের অবদান ও কীর্তির যা কিছু ইউরোপে নিয়ে যাওয়া সম্ভব তা নিয়ে গেছে। ইউরোপ তখন ছিল পশ্চাৎপদ ও অধঃপতিত।

এই প্রসঙ্গে গুস্তাভ লি বোঁ বলেছেন, প্রাচ্যের সঙ্গে পাশ্চাত্যের দুই শতাব্দীর যোগাযোগ ইউরোপে সভ্যতা বিকাশের একটি শক্তিশালী কারণ... কেউ যদি পাশ্চাত্যের ওপর প্রাচ্যের প্রভাব কী তা অনুধাবন করতে চায় তাহলে তাকে সেই সভ্যতা-সংস্কৃতির অবস্থাও অনুধাবন করতে হবে যা যাপন করছিল এই দুই জাতি। আরবদের কল্যাণে ও বদান্যতায় প্রাচ্য তখন উন্নত সভ্যতাসংস্কৃতি উপভোগ করছিল, অন্যদিকে পাশ্চাত্য ছিল বর্বরতা ও অসভ্যতার সমুদ্রে নিমজ্জিত।

এই প্রসঙ্গে মাকরিযি একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডেরিক বাইতুল মুকাদ্দাসে অভিযান চালানোর পর (৬২৬ হি./১২২৮ খ্রি.) তার দেশে ফেরার পথে আক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। এ সময় তিনি কিছু জটিল প্রকৌশলীয় ও গাণিতিক সমস্যার মুখোমুখি হন। সম্রাট এসব সমস্যার সমাধান চেয়ে আল-কামিল আল-আইয়ুবির কাছে লোক পাঠান। সুলতান আল-কামিল জ্ঞানবিজ্ঞান অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং জ্ঞানীগুণীদের তার সান্নিধ্যে নিয়ে আসতেন, তাদের পরীক্ষা করতেন এবং প্রচুর পরিমাণে উপহার-উপঢৌকন দিতেন। তিনি এসব সমস্যা তার সাম্রাজ্যের একজন বিজ্ঞানীর কাছে পেশ করেন। সেই বিজ্ঞানীর নাম শাইখ আলামুদ্দিন কাইসার। তিনি ছিলেন গণিতজ্ঞ ও প্রকৌশলী। আল-কামিল আল-আইয়ুবি সমস্যার সমাধানগুলো তার কাছ থেকে জেনে ফ্রেডেরিকের কাছে পাঠান। যেসব সমস্যা সম্রাট পাঠিয়েছিলেন তার মধ্যে দুটি নিম্নরূপ:
১. বর্শার কোনো অংশ পানিতে ডোবানোর পর তা সোজা না দেখিয়ে বাঁকা দেখায় কেন?
২. যাদের দৃষ্টিশক্তি কম তারা কেন তাদের চোখের সামনে মাছি বা মশার মতো রেখা দেখতে পায়?

যেসব ইউরোপীয়রা অবিশ্রান্ত তরঙ্গের মতো ইসলামি দেশগুলোতে এসেছিল, রক্তপাতে লিপ্ত হয়েছিল, নিরপরাধ মানুষের রক্তে নিজেদের নিমজ্জিত করেছিল, যাদের মনে কোনো মমতা বা ভালোবাসা কাজ করেনি, তারা যখন মুসলিম সৈনিকদের মুখোমুখি হলো, দেখল যে তাদের তরবারিগুলো সুশিক্ষিত, তাদের হৃদয় দয়ার্দ্র, তাদের স্বভাব নম্র ও ভদ্র। ফলে ক্রুসেডাররা সমতা, ইনসাফ ও ভ্রাতৃত্বের বিষয়গুলো অনুধাবন করল। ফলে তারা তাদের সামন্ততান্ত্রিক শাসন ও মানুষকে হেয়জ্ঞান করার যে সংস্কৃতি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করল। গির্জার খবরদারি ও দমনপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাল। তারা প্রাচ্যের ঐশ্বর্যকে কতিপয় নৃপতি ও সম্রাটদের দালালদের হাতে তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করল। তারা প্রাচ্যে জ্ঞানবিজ্ঞান, শিল্পকলা, সভ্যতা-সংস্কৃতি যা-কিছু পেল সব আঁজলা ভরে নিয়ে গেল। ফলে প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যে স্থানান্তরিত হয়ে গেল। নানাবিধ শিল্পসামগ্রী, উদ্ভিদ, ওষুধ, রঞ্জক পদার্থ, স্থাপত্যশিল্প, প্রকৌশলবিদ্যা, দুর্গনির্মাণকৌশল এবং আরও অনেক কিছু। তা ছাড়া পোশাক-আশাক, পানাহার, পারিবারিক শিষ্টাচার ইত্যাদি বিষয়ে মুসলিমদের কিছু ঐতিহ্যও পাশ্চাত্যে গেল। ক্রুসেডাররা বজ্রাহতের মতো অন্তরে অগ্নিশিখা নিয়ে নিজ নিজ দেশে ফিরে গেল। তারা এখন তাদের শোচনীয় অবস্থা ও চিন্তার গলদ সম্পর্কে সচেতন, তাদের সমাজের ভ্রান্তি সম্পর্কে সজাগ। ফলে জ্ঞানবিজ্ঞান অন্বেষণে ব্রতী হলো, সামাজিক সংস্কার চাইল, চিন্তার ও শিল্পের এবং নীতিনৈতিকতার অগ্রগতি প্রত্যাশা করল।

গুস্তাভ লি বোঁ বলেন, পাশ্চাত্যকে সভ্য ও সংস্কৃতিমান করে তোলার ক্ষেত্রে প্রাচ্যের বিশাল অবদান রয়েছে। এটা ঘটেছে ক্রুসেড যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। এই প্রভাব শিল্প, কারিগরি ও ব্যবসাবাণিজ্যে যতটা ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল জ্ঞানবিজ্ঞান ও সাহিত্যে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে ধারাবাহিক যোগাযোগ ও আনাগোনার ফলে বাণিজ্যিক সম্পর্কের যে অগ্রগতি ঘটেছে তার দিকে যদি তাকাই এবং ক্রুসেডারদের ও প্রাচ্যের জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক সংমিশ্রণের ফলে শিল্পে ও মননশীল বিষয়াবলিতে যে বিকাশ সাধিত হয়েছে তার দিকে যদি দৃষ্টিপাত করি তাহলে আমাদের কাছে প্রতিভাত হয় যে, প্রাচ্যের জনমণ্ডলীই পাশ্চাত্যকে বর্বরতা ও অসভ্যতা থেকে বের করে এনেছে। শুধু তা-ই নয়, আরবীয় জ্ঞানবিজ্ঞান ও সাহিত্যের বদান্যতায় অগ্রগতি ও উন্নতির প্রতি তাদের মনের জমিনকে প্রস্তুত করেছে। ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আরবীয় জ্ঞানবিজ্ঞান ও সাহিত্যের ওপরই নির্ভরশীল ছিল। এসবের ফলে ইউরোপে একদিন পুনর্জাগরণ ঘটে।

টিকাঃ
৩৪২. গুস্তাভ লি বোঁ, হাদারাতুল আরাব, পৃ. ৩৩৪।
৩৪৩. মাকরিযি, আস-সুলুক লি-মারিফাতি দুওয়ালিল মুলুক, খ. ১. পৃ. ৩৫৪।
৩৪৪. আল-কামিল আল-আইয়ুবি (আল-মালিক আল-কামিল নাসিরুদ্দিন মুহাম্মাদ ইবনে আল-আদিল সাইফুদ্দিন আহমাদ (৫৭৬-৬৩৫ হি./১১৭৭-১২৩৮ খ্রি.) ছিলেন মিশরের চতুর্থ আইয়ুবীয় সুলতান। পঞ্চম ক্রুসেডে তিনি খ্রিষ্টানদের পরাজিত করেন।-অনুবাদক।
৩৪৫. কাইসার আত-তাআসিফ নামে পরিচিত। ১১৭৮ সালে মিশরের আসফুনে জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন ১২৫১ সালে দামেশকে। গণিতজ্ঞ ও প্রকৌশলী হওয়ার পাশাপাশি তিনি সংগীতবিদ্যাও অর্জন করেন।- অনুবাদক।
৩৪৬. আবদুল্লাহ ইবনে আবদুর রহমান আর-রবিয়ি, আসারুশ শারকিল ইসলামি ফিল-ফিকরিল উরুব্বি খিলালাল হুরুবিস সলিবিয়্যা, পৃ. ৯৮।
৩৪৭. তাওফিক ইউসুফ আল-ওয়ায়ি, আল-হাদারাতুল ইসলামিয়্যা মুকারানাতান বিল-হাদারাতিল গারবিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৫৩১-৫৩২।
৩৪৮. গুস্তাভ লি বোঁ, হাদারাতুল আরাব, পৃ. ৩৩৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00