📄 সিসিলি
সিসিলিও ইউরোপে ইসলামি সভ্যতা পৌছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ রুট ও সংযোগস্থল হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। ইউরোপের সঙ্গে সঙ্গে তা দক্ষিণ ইতালিতেও ইসলামি সভ্যতা বিস্তার করেছে। মুসলিমরা ২১৬ হিজরি/৮৩১ খ্রিষ্টাব্দে সিসিলির রাজধানী পালেরমো জয় করেন এবং ৪৮৫ হিজরি/১০৯২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অর্থাৎ প্রায় দুইশ ষাট বছর সিসিলি শাসন করেন। এই দীর্ঘ সময়ে সিসিলিতে মানুষের জীবন ইসলামি-আরবীয় স্বভাব-প্রকৃতির ছাঁচে গড়ে ওঠে। মুসলিমরা এই সময়ে নগরায়ণ ও সমৃদ্ধির প্রতি জোর দেন, সেখানে ইসলামি সভ্যতার নিদর্শন স্থাপন করেন। মসজিদ, প্রাসাদ, অট্টালিকা, গণগোসলখানা, হাসপাতাল, বাজার, দুর্গ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করেন। এই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পও সিসিলিতে বিকাশ লাভ করে। যেমন: কাগজ, রেশম, জাহাজ, খনিজ পদার্থ উত্তোলন ইত্যাদি। ফলে জ্ঞানবিজ্ঞান ও অন্যান্য শাস্ত্রচর্চায় অগ্রগতি ঘটে। ইউরোপের বিভিন্ন এলাকা থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে পড়াশোনা করতে আসে। এরপর সিসিলি পাশ্চাত্যে ইসলামি সভ্যতা-সংস্কৃতি প্রেরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। সিসিলিতেও আরবি থেকে লাতিনে অনুবাদের আন্দোলন শুরু হয়, আন্দালুসের যেমন অনুবাদ-বিপ্লব ঘটেছিল তেমনই।
একাদশ শতাব্দীর শেষের দিকেই সিসিলি দ্বীপে ইসলামি শাসনের সমাপ্তি ঘটে। তা সত্ত্বেও মুসলিমদের নরমান উত্তরসূরিদের ছত্রছায়ায় ইসলামি সভ্যতার অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকে। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় কয়েকজন মুসলিম বিজ্ঞানী-মনীষী তাদের কাজ চালিয়ে যান। যেমন ভূগোলবিদ মুহাম্মাদ আল-ইদরিসি। তিনি সিসিলির নরমান সম্রাট দ্বিতীয় রজারের (Roger II of Sicily 1130-1145) জন্য তৎকালীন পরিচিত বিশ্বের একটি মানচিত্র অঙ্কন করেন। একটি গোলাকার সমতল রুপার চাকতিতে তিনি এই মানচিত্র আঁকেন। সম্রাট রজারের জন্যই তিনি রচনা করেন ‘নুযহাতুল মুশতাক ফি ইফতিরাকিল আফাক’ গ্রন্থটি। এই গ্রন্থে তিনি উপর্যুক্ত মানচিত্রের বিস্তারিত বিবরণ দেন। রুশ-সোভিয়েত প্রাচ্যবিদ ও আরবি ভাষাবিদ ইগন্যাটি ক্র্যাচকোস্কি তার তারিখুল আদাবিল জুগরাফিয়্যিল আরাবি গ্রন্থে আল-ইদরিসির কাজ সম্পর্কে মূল্যায়নধর্মী মন্তব্য করেন। রজার সম্পর্কে ক্র্যাচকোস্কি বলেন, তিনি একজন আরবীয় বিজ্ঞানীকে তৎকালীন পরিচিত বিশ্বের বিবরণ তৈরির জন্য দায়িত্ব দেন। সেই যুগে ইসলামি সভ্যতা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিল এবং তা সবাই মেনে নিয়েছিল, এই ঘটনা তার স্পষ্ট প্রমাণ। সিসিলির নরমান রাজদরবার অর্ধেকের বেশি না হলেও অর্ধেকই ছিল প্রাচ্যীয়।
নতুন ইসলামি সভ্যতা-সংস্কৃতি ইউরোপীয়দের আকর্ষিত করে। নরমঁদি শাসনামলেও ইসলামি সংস্কৃতির প্রভাব অব্যাহত থাকে। সিসিলির রাজকীয় জীবন-বিশেষ করে দ্বিতীয় রজার ও দ্বিতীয় ফ্রেডেরিকের যুগে-যে শানশওকত ও আভিজাত্যমণ্ডিত ছিল তাকে কর্ডোভার রাজকীয় জীবনের সমকক্ষ বিবেচনা করা হয়। এই সম্রাট দুজন আরবীয় পোশাক ও আরবীয় জীবনপ্রণালি অবলম্বন করেন। সিসিলির নরমঁদি শাসকদের উপদেষ্টাবৃন্দ ও কর্মকর্তাদের অনেকেই ছিলেন আরব মুসলিম। তাদের ছত্রছায়ায় এসেছিলেন বাগদাদ ও সিরিয়ার অনেক আলেম ও বিজ্ঞানী। এসবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এই যে, সিসিলির তিনজন নরমঁদি সম্রাট আরবি উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। দ্বিতীয় রজার মু'তায বিল্লাহ উপাধি ধারণ করেন। প্রথম উইলিয়ামের উপাধি ছিল হাদি বি-আমরিল্লাহ এবং দ্বিতীয় উইলিয়াম যে উপাধি ধারণ করেন তা হলো মুসতাইয বিল্লাহ। এসব উপাধি তাদের ব্যাজে উৎকীর্ণ ছিল।
দ্বিতীয় ফ্রেডেরিক (১১৯৪-১২৩০ খ্রি.) পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের মুকুট পরিধান করেন ১২২০ সালে। কিন্তু তিনি সিসিলিতে বসবাস করবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন। জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রতি তার আলাদা কদর ছিল। তিনি বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক তর্কবিতর্ককে উৎসাহিত করেছেন। তিনিই ১২২৪ সালে ইতালির নেপল্স বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু আরবি পাণ্ডুলিপি রয়েছে। ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ইসলামি সংস্কৃতির প্রসার ঘটে। কারণ প্যারিস ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়েও যথেষ্ট পরিমাণ আরবি পাণ্ডুলিপি ছিল। আরবি থেকে লাতিনে অসংখ্য গ্রন্থ অনূদিত হয়। অনুবাদকদের মধ্যে কয়েকজন হলেন স্টিফেন অব অ্যান্টিওক (তিনি ১১২৭ সালে আলি ইবনে আব্বাস আল-মাজুসি কর্তৃক রচিত চিকিৎসা-বিষয়ক গ্রন্থ আল-কিতাবুল মালাকি লাতিনে অনুবাদ করেন); অ্যাডেলার্ড অব বাথ (তিনি ১০৭ সাল থেকে ১১৩৩ সালের মধ্যে তার গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদকর্মগুলো সম্পাদন করেন); তারপর আসেন মাইকেল স্কট, তিনি সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডেরিকের পৃষ্ঠপোষকতায় বহু গ্রন্থ অনুবাদ করেন, উল্লেখযোগ্যভাবে অনুবাদ করেন ইবনে রুশদের গ্রন্থাবলি।
নেপলসের প্রথম চার্লস আরবি চিকিৎসাবিষয়ক গ্রন্থাবলিকে লাতিন ভাষায় অনুবাদের ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এবং সেখানে সক্রিয় অনুবাদকদের যুক্ত করেন। তাদের মধ্যে রয়েছে ফারাজ বেন সালিম, মোসেস বেন সলোমোন অব সালের্নো। অনুবাদকদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন প্রতিলিপিকার ও সংশোধকদের একটি দল। চিকিৎসাবিদ আল-রাযির 'আল-হাবি' ও ইবনে জাযলার 'তাকউইমুল আবদান ফি তাদবিরিল ইনসান' গ্রন্থের অনুবাদ সম্পন্ন হয় এখানেই।
সিসিলি প্রাচীন ও আধুনিক চিন্তাধারা স্থানান্তরের একটি উর্বর ক্ষেত্র ছিল। এখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে আরবিভাষী যেমন ছিল, তেমনই গ্রিকভাষীও ছিল। আরও কিছু সংস্কৃতিমনা ব্যক্তি ছিলেন যারা লাতিন জানতেন। সিসিলি বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল একসময়, তাই এখানে গ্রিক সংস্কৃতির কিছু নিদর্শনও ছিল। তিনটি ভাষার পাশাপাশি সহাবস্থান আরবীয় জ্ঞানবিজ্ঞানের স্থানান্তর বেশ সহজ করে দিয়েছিল। এর আগে সালের্নোর চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (Schola Medica Salernitana) প্রায় তিন শতাব্দীব্যাপী (৯০০-১২০০ খ্রি.) চিকিৎসাবিষয়ক পড়াশোনার কেন্দ্র ছিল। প্রতিষ্ঠানটি দক্ষিণ ইতালিতে অবস্থিত এবং সিসিলির সঙ্গে এর সম্পর্ক বেশ দৃঢ়। এই মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন কনস্টান্টাইন দি আফ্রিকান। তিনি ছিলেন আরব বংশোদ্ভূত। জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিউনিসে। ১০৬৫ সাল থেকে ১০৮৫ সাল পর্যন্ত তিনি সবচেয়ে উর্বর সময় যাপন করেন এবং বহু চিকিৎসা-বিষয়ক গ্রন্থ আরবি থেকে লাতিনে অনুবাদ করেন। তিনি চল্লিশটি গ্রন্থের অনুবাদ করেছেন বলে ধারণা করা হয়ে থাকে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে আলি ইবনে আব্বাস আল-মাজুসি (মৃ. ৯৮২ বা ৯৯৪ খ্রি.) কর্তৃক রচিত 'কামিলুস সিনাআতিত তিব্বিয়্যাহ' ও 'আল-কিতাবুল মালাকি'-এর অনুবাদ এবং ইবনুল জাযযার, ইসহাক ইবনে ইমরান ও ইসহাক ইবনে সুলাইমানের গ্রন্থাবলির অনুবাদ। শেষোক্ত তিনজনেরই মাতৃভূমি ছিল তিউনিসিয়া।
কনস্টান্টাইন দি আফ্রিকান কয়েকটি আরবি গ্রন্থের মূল লেখকের নাম উল্লেখ করার ব্যাপারে গুরুত্ব দেখাননি। এর বেশ কিছু কারণ রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার গুরুত্ব কমে না। কারণ তিনিই ছিলেন প্রথম অনুবাদক যিনি আরবীয় জ্ঞানবিজ্ঞান ইউরোপে পৌঁছে দিয়েছিলেন এবং সালের্নোর চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ের উন্নতি তিনিই সাধন করেছিলেন। এই মহাবিদ্যালয়ে পঠনপাঠনের অন্যতম ভাষা ছিল আরবি। আরব মুসলিমদের বড় বড় লেখক ও চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের সামসময়িক ছিল এই মহাবিদ্যালয়। আবু বকর আল-রাযি (মৃ. ৯২৫ খ্রি.), ইবনুল জাযযার (মৃ. ৯৭৫ খ্রি.) ও আলি ইবনে আব্বাস (মৃ. ৯৮২ বা ৯৯৪ খ্রি.)-এর জীবৎকালে এই মহাবিদ্যালয় সক্রিয় ছিল।
অধ্যাপক কোয়েল ইয়ং সিসিলির ব্যাপারে বলেন, গ্রিক, লাতিন ও আরব বার্বারদের ভাষা ও জ্ঞানবিজ্ঞানের মুক্ত সম্মিলনের ময়দান ছিল সিসিলি। ফলে এখানে সংমিশ্রিত বা যৌথ সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল। দ্বিতীয় রজার ও দ্বিতীয় ফ্রেডেরিকের উৎসাহদান ও পৃষ্ঠপোষকতার বদান্যতায় ইসলামি সভ্যতাসংস্কৃতির উৎকৃষ্ট অংশকে ইতালির পথ ধরে ইউরোপে পৌঁছে দিতে বড় ভূমিকা পালন করেছিল সিসিলি। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে সিসিলির পালের্মো শহরটি অনুবাদ ও আরবি গ্রন্থাবলিকে লাতিনে রূপান্তরিত করার কেন্দ্র হিসেবে দ্বাদশ শতাব্দীর টলেডো হয়ে উঠেছিল।
নরমান শাসকেরা কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন মুসলিমদেরকে পেশাগত সুরক্ষা দিয়ে তাদের কাছেই রেখে দিয়েছিলেন। কারণ তারা এসব মুসলমানের প্রতি অত্যন্ত বিশ্বস্ত ছিলেন। মুসলিমরা যেসব অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেগুলোও তারা অটুট রেখেছিলেন। দিওয়ানুত তাহকিক ও দিওয়ানুল মা'মুর থেকে শুরু করে দিওয়ানুল ফাওয়ায়িদ পর্যন্ত তারা বহাল রেখেছিলেন। এসব দিওয়ান বা বিভাগের নথিপত্র লেখা হতো আরবি ভাষায়।
নরমান শাসকেরা সামরিক বিভাগেও মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত করেন এবং কয়েকজন মুসলিমকে সেনাবাহিনীর উচ্চতর পদে নিযুক্ত করেন। কেবল আরবীয় যুদ্ধের অভিজ্ঞতার বিস্তার নয়, যুদ্ধের যন্ত্রপাতি, যেমন মানজানিক ও অবরোধ-দুর্গ নির্মাণের কৌশল ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তা এক সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করে।
এভাবেই সিসিলি ও দক্ষিণ ইতালি ইউরোপে ইসলামি সভ্যতা স্থানান্তরের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ রুট ও গমনপথ ছিল।
টিকাঃ
৩২১. নরমান জাতি ছিল স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে আগত ভাইকিং দস্যুর দল। এরা নবম শতকের প্রথমভাগে উত্তর ফ্রান্সের নরমদিতে বাস করা শুরু করে। সেখান থেকে এরা ইংল্যান্ড, দক্ষিণ ইতালি ও সিসিলি দ্বীপ বিজয় করে। একাদশ শতকের শুরুতে একদল নরমান দক্ষিণ ইতালিতে এসে উপস্থিত হয়। তারা ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে সালের্নোর মুসলিম আরবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সেখানে যায়। আরও বেশি সংখ্যায় নরমানরা আসার পর তারা বলপ্রয়োগ করে তাদের ইতালীয় প্রতিবেশী ও চাকুরিদাতাদের জমি দখল করে নেয়। এই নরমান অভিযাত্রীদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ওতভিলের ডিউক তক্রে (Tancred Puteville 980-1041), যিনি ১০৪২ সালে আপুলিয়া দখল করেন। ১০৫৩ সালে নরমানরা পোপ নবম লিয়ো (Pope Leo IX)-র সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে। পোপ তাদেরকে আপুলিয়া ও কালাব্রিয়ার দখলকৃত জায়গাগুলো দিয়ে দেন ও শান্তি স্থাপন করেন। ১০৭১ সালে সমগ্র দক্ষিণ ইতালি নরমানদের দখলাধীনে চলে আসে। উক্রের এক ছেলে ডিউক রবার্ট গিস্কার্ড (Robert Guiscard 1015-1085) এ সময় ইতালির নরমানদের নেতা ছিলেন। রবার্ট গিষ্কার্ডের ভাই প্রথম রজার আরবদের কাছ থেকে সিসিলি দ্বীপ দখলের কাজ শুরু করেন। তিনি প্রথমে উত্তর-পূর্ব সিসিলির মেসসিনা শহর দখলে সক্ষম হন। কিন্তু সমগ্র সিসিলি বিজয়ে আরও প্রায় ৩০ বছর সময় লেগে যায়। দ্বিতীয় রজার দক্ষিণ ইতালি ও সিসিলি দ্বীপে নরমানদের ভূমিগুলো একত্র করেন এবং ১১৩০ সালে সিসিলির প্রথম রাজা হন। এরপর সময়ের আবর্তে নরমানরা ইতালির স্থানীয় জনগণের সঙ্গে ধীরে ধীরে মিশে যেতে থাকে এবং পরবর্তীকালে আলাদা নরমান সংস্কৃতি ধরে রাখতে পারেনি। (অনুবাদক)
৩২২. Tabula Rogeriana (The Map of Roger) নামেও গ্রন্থটি পরিচিত।
৩২৩. ইগন্যাটি ক্র্যাচকোস্কি (Ignaty Krachkovsky) ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে লিথুয়ানিয়ার রাজধানী ভিলনিয়াসে জন্মগ্রহণ করেন। ক্লাসিক গ্রিক ভাষাগুলো শিক্ষা করেন। এরপর নিজে নিজে আরবি ভাষা শিখতে ব্রতী হন। সেন্ট পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচ্যীয় ভাষা অনুষদে ইসলামি ইতিহাস অধ্যয়ন করেন। এখানে তার গুরু ছিলেন ইসলামি ইতিহাস-বিশেষজ্ঞ প্রাচ্যবিদ ভেসিলি বারটোল্ড (Vasily Bartold)।
৩২৪. মুস্তাফা আস-সিবায়ি, মিন রাওয়ায়িয়ি হাদারাতিনা, পৃ. ২৮ থেকে উদ্ধৃত। নুযহাতুল মুশতাক ফি ইখতিরাকিল আফাক রচনার ইতিবৃত্ত জানতে আরও দেখুন, সিগরিড হুংকে, শামসুল আরাব তাসতাউ আলাল গারব, পৃ. ৪১৬-৪১৭।
৩২৫. আযিয আহমাদ, তারিখু সাকলিয়া, পৃ. ৭৬।
৩২৬. Frederick II, Holy Roman Emperor.
৩২৭. University of Naples Federico II.
৩২৮. Stephen of Antioch. Stephen of Pisa ও Stephen the Philosopher নামেও পরিচিত।
৩২৯. অ্যাডেলার্ড অব বাথ (Adelard of Bath 1080-1152) ছিলেন গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিদ ও দার্শনিক। লাতিন, গ্রিক ও আরবি ভাষায় পণ্ডিত ছিলেন। ইউরোপে আরবি ভাষার বিস্তারে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তিনি ইংল্যান্ডের বাথ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ফ্রান্সের তুর, আন্দালুস ও সিসিলিতে জ্ঞান অর্জন করেন। ইংল্যান্ডে ফিরে আসার পর তাকে কাউন্ট হেনরির শিক্ষক নিযুক্ত করা হয়। তার এই ছাত্রই পরবর্তীকালের সম্রাট দ্বিতীয় হেনরি।
৩৩০. নজিব আকিকি, আল-মুসতাশরিকুন, খ. ১, পৃ. ১১১।
৩৩১. মাইকেল স্কট (Michael Scot 1175-1232) ছিলেন স্কটিশ গবেষক, গণিতজ্ঞ, চিকিৎসক ও জ্যোতির্বিদ। অ্যারিস্টটলের কয়েকটি গ্রন্থ আরবি ও হিব্রু থেকে অনুবাদ করেন। আরবদের সঙ্গে আন্দালুসে পড়াশোনা করেন এবং সিসিলিতে সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডেরিকের রাজদরবারে কাজ করেন। ইবনে রুশদের গ্রন্থাবলি লাতিনে অনুবাদ করেন।
৩৩২. প্রথম চার্লস (Charles I, 1227-1285) সাধারণভাবে Charles of Anjou নামে পরিচিত।
৩৩৩. Constantine the African বা Constantinus Africanus.
৩৩৪. মুহাম্মাদ আল-জালিলি, তাসিরুত তিব্বিল আরাবি ফিল-হাদারাতিল উরুব্বিয়্যা, https://bit.ly/345rcoS
৩৩৫. মুস্তাফা সিবায়ি, মিন রাওয়ায়িয়ি হাদারাতিনা, পৃ. ২৮ থেকে উদ্ধৃত।
৩০৬. আযিয আহমাদ, তারিখু সাকলিয়্যা, পৃ. ২৯৮।
৩০৭. সিসিলির অর্থ-প্রশাসন বিভাগ।
৩০৮. অর্থ-প্রশাসন বিভাগের একটি অংশ, বাইতুল মাল বা কোষাগার-সংশ্লিষ্ট।
৩০৯. ভূমি-বিক্রয় বিভাগ।
৩১০. এল জিনওয়ার্দি, আদ-দাফাতিরুন নুরমানিয়্যা, খ. ১, পৃ. ১৫৯-১৬৪।
৩১১. আযিয আহমাদ, তারিখু সাকলিয়্যা, পৃ. ৭৬ (ঈষৎ পরিমার্জিত)।
📄 ক্রুসেড যুদ্ধ
ক্রুসেড যুদ্ধ প্রায় দুই শতাব্দীব্যাপী অব্যাহত থাকে। হিজরি পঞ্চম শতকের/খ্রিস্টীয় একাদশ শতকের শেষের দিকে (৪৯০ হি./১০৯৭ খ্রি.) ক্রুসেডের সূচনা ঘটে এবং মামলুকদের হাতে ক্রুসেডারদের শেষ দুর্গটির পতনের মধ্য দিয়ে এর সমাপ্তি ঘটে (৬৯০হি./১২৯১ খ্রি.)। এই সময়সীমাকে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট বা প্রভাব-বিস্তার, স্থানান্তর ও আহরণের গুরুত্বপূর্ণ কাল বিবেচনা করা হয়। ক্রুসেডাররা ইসলাম-শাসিত প্রাচ্যে প্রবেশ করেছিল যুদ্ধ করার জন্য, জ্ঞান আহরণের জন্য নয়। তা সত্ত্বেও তারা মুসলিমদের সভ্যতা-সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। তাদের অবদান ও কীর্তির যা কিছু ইউরোপে নিয়ে যাওয়া সম্ভব তা নিয়ে গেছে। ইউরোপ তখন ছিল পশ্চাৎপদ ও অধঃপতিত।
এই প্রসঙ্গে গুস্তাভ লি বোঁ বলেছেন, প্রাচ্যের সঙ্গে পাশ্চাত্যের দুই শতাব্দীর যোগাযোগ ইউরোপে সভ্যতা বিকাশের একটি শক্তিশালী কারণ... কেউ যদি পাশ্চাত্যের ওপর প্রাচ্যের প্রভাব কী তা অনুধাবন করতে চায় তাহলে তাকে সেই সভ্যতা-সংস্কৃতির অবস্থাও অনুধাবন করতে হবে যা যাপন করছিল এই দুই জাতি। আরবদের কল্যাণে ও বদান্যতায় প্রাচ্য তখন উন্নত সভ্যতাসংস্কৃতি উপভোগ করছিল, অন্যদিকে পাশ্চাত্য ছিল বর্বরতা ও অসভ্যতার সমুদ্রে নিমজ্জিত।
এই প্রসঙ্গে মাকরিযি একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডেরিক বাইতুল মুকাদ্দাসে অভিযান চালানোর পর (৬২৬ হি./১২২৮ খ্রি.) তার দেশে ফেরার পথে আক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। এ সময় তিনি কিছু জটিল প্রকৌশলীয় ও গাণিতিক সমস্যার মুখোমুখি হন। সম্রাট এসব সমস্যার সমাধান চেয়ে আল-কামিল আল-আইয়ুবির কাছে লোক পাঠান। সুলতান আল-কামিল জ্ঞানবিজ্ঞান অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং জ্ঞানীগুণীদের তার সান্নিধ্যে নিয়ে আসতেন, তাদের পরীক্ষা করতেন এবং প্রচুর পরিমাণে উপহার-উপঢৌকন দিতেন। তিনি এসব সমস্যা তার সাম্রাজ্যের একজন বিজ্ঞানীর কাছে পেশ করেন। সেই বিজ্ঞানীর নাম শাইখ আলামুদ্দিন কাইসার। তিনি ছিলেন গণিতজ্ঞ ও প্রকৌশলী। আল-কামিল আল-আইয়ুবি সমস্যার সমাধানগুলো তার কাছ থেকে জেনে ফ্রেডেরিকের কাছে পাঠান। যেসব সমস্যা সম্রাট পাঠিয়েছিলেন তার মধ্যে দুটি নিম্নরূপ:
১. বর্শার কোনো অংশ পানিতে ডোবানোর পর তা সোজা না দেখিয়ে বাঁকা দেখায় কেন?
২. যাদের দৃষ্টিশক্তি কম তারা কেন তাদের চোখের সামনে মাছি বা মশার মতো রেখা দেখতে পায়?
যেসব ইউরোপীয়রা অবিশ্রান্ত তরঙ্গের মতো ইসলামি দেশগুলোতে এসেছিল, রক্তপাতে লিপ্ত হয়েছিল, নিরপরাধ মানুষের রক্তে নিজেদের নিমজ্জিত করেছিল, যাদের মনে কোনো মমতা বা ভালোবাসা কাজ করেনি, তারা যখন মুসলিম সৈনিকদের মুখোমুখি হলো, দেখল যে তাদের তরবারিগুলো সুশিক্ষিত, তাদের হৃদয় দয়ার্দ্র, তাদের স্বভাব নম্র ও ভদ্র। ফলে ক্রুসেডাররা সমতা, ইনসাফ ও ভ্রাতৃত্বের বিষয়গুলো অনুধাবন করল। ফলে তারা তাদের সামন্ততান্ত্রিক শাসন ও মানুষকে হেয়জ্ঞান করার যে সংস্কৃতি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করল। গির্জার খবরদারি ও দমনপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাল। তারা প্রাচ্যের ঐশ্বর্যকে কতিপয় নৃপতি ও সম্রাটদের দালালদের হাতে তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করল। তারা প্রাচ্যে জ্ঞানবিজ্ঞান, শিল্পকলা, সভ্যতা-সংস্কৃতি যা-কিছু পেল সব আঁজলা ভরে নিয়ে গেল। ফলে প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যে স্থানান্তরিত হয়ে গেল। নানাবিধ শিল্পসামগ্রী, উদ্ভিদ, ওষুধ, রঞ্জক পদার্থ, স্থাপত্যশিল্প, প্রকৌশলবিদ্যা, দুর্গনির্মাণকৌশল এবং আরও অনেক কিছু। তা ছাড়া পোশাক-আশাক, পানাহার, পারিবারিক শিষ্টাচার ইত্যাদি বিষয়ে মুসলিমদের কিছু ঐতিহ্যও পাশ্চাত্যে গেল। ক্রুসেডাররা বজ্রাহতের মতো অন্তরে অগ্নিশিখা নিয়ে নিজ নিজ দেশে ফিরে গেল। তারা এখন তাদের শোচনীয় অবস্থা ও চিন্তার গলদ সম্পর্কে সচেতন, তাদের সমাজের ভ্রান্তি সম্পর্কে সজাগ। ফলে জ্ঞানবিজ্ঞান অন্বেষণে ব্রতী হলো, সামাজিক সংস্কার চাইল, চিন্তার ও শিল্পের এবং নীতিনৈতিকতার অগ্রগতি প্রত্যাশা করল।
গুস্তাভ লি বোঁ বলেন, পাশ্চাত্যকে সভ্য ও সংস্কৃতিমান করে তোলার ক্ষেত্রে প্রাচ্যের বিশাল অবদান রয়েছে। এটা ঘটেছে ক্রুসেড যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। এই প্রভাব শিল্প, কারিগরি ও ব্যবসাবাণিজ্যে যতটা ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল জ্ঞানবিজ্ঞান ও সাহিত্যে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে ধারাবাহিক যোগাযোগ ও আনাগোনার ফলে বাণিজ্যিক সম্পর্কের যে অগ্রগতি ঘটেছে তার দিকে যদি তাকাই এবং ক্রুসেডারদের ও প্রাচ্যের জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক সংমিশ্রণের ফলে শিল্পে ও মননশীল বিষয়াবলিতে যে বিকাশ সাধিত হয়েছে তার দিকে যদি দৃষ্টিপাত করি তাহলে আমাদের কাছে প্রতিভাত হয় যে, প্রাচ্যের জনমণ্ডলীই পাশ্চাত্যকে বর্বরতা ও অসভ্যতা থেকে বের করে এনেছে। শুধু তা-ই নয়, আরবীয় জ্ঞানবিজ্ঞান ও সাহিত্যের বদান্যতায় অগ্রগতি ও উন্নতির প্রতি তাদের মনের জমিনকে প্রস্তুত করেছে। ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আরবীয় জ্ঞানবিজ্ঞান ও সাহিত্যের ওপরই নির্ভরশীল ছিল। এসবের ফলে ইউরোপে একদিন পুনর্জাগরণ ঘটে।
টিকাঃ
৩৪২. গুস্তাভ লি বোঁ, হাদারাতুল আরাব, পৃ. ৩৩৪।
৩৪৩. মাকরিযি, আস-সুলুক লি-মারিফাতি দুওয়ালিল মুলুক, খ. ১. পৃ. ৩৫৪।
৩৪৪. আল-কামিল আল-আইয়ুবি (আল-মালিক আল-কামিল নাসিরুদ্দিন মুহাম্মাদ ইবনে আল-আদিল সাইফুদ্দিন আহমাদ (৫৭৬-৬৩৫ হি./১১৭৭-১২৩৮ খ্রি.) ছিলেন মিশরের চতুর্থ আইয়ুবীয় সুলতান। পঞ্চম ক্রুসেডে তিনি খ্রিষ্টানদের পরাজিত করেন।-অনুবাদক।
৩৪৫. কাইসার আত-তাআসিফ নামে পরিচিত। ১১৭৮ সালে মিশরের আসফুনে জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন ১২৫১ সালে দামেশকে। গণিতজ্ঞ ও প্রকৌশলী হওয়ার পাশাপাশি তিনি সংগীতবিদ্যাও অর্জন করেন।- অনুবাদক।
৩৪৬. আবদুল্লাহ ইবনে আবদুর রহমান আর-রবিয়ি, আসারুশ শারকিল ইসলামি ফিল-ফিকরিল উরুব্বি খিলালাল হুরুবিস সলিবিয়্যা, পৃ. ৯৮।
৩৪৭. তাওফিক ইউসুফ আল-ওয়ায়ি, আল-হাদারাতুল ইসলামিয়্যা মুকারানাতান বিল-হাদারাতিল গারবিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৫৩১-৫৩২।
৩৪৮. গুস্তাভ লি বোঁ, হাদারাতুল আরাব, পৃ. ৩৩৯।