📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 আলেম-উলামা ও জ্ঞানী-সাহিত্যিকদের চোখে কর্ডোভা

📄 আলেম-উলামা ও জ্ঞানী-সাহিত্যিকদের চোখে কর্ডোভা


মসুলের ব্যবসায়ী আবুল কাসিম মুহাম্মাদ ইবনে হাওকাল (মৃ. ৩৬৭ হি.) ৩৫০ হিজরি/৯৬১ খ্রিষ্টাব্দের দিকে কর্ডোভা ভ্রমণ করেন। এরপর তিনি এভাবে তার বর্ণনা দেন, আন্দালুসের অন্যতম বড় শহর কর্ডোভা। জনসংখ্যা ও আয়তনের দিক থেকে কর্ডোভার মতো শহর মাগরিব অঞ্চলে একটিও নেই। বলা হয়ে থাকে, এটি দুই পার্শ্ববিশিষ্ট বাগদাদের একটি পার্শ্বের সাথে তুলনীয়। তবে কর্ডোভা যদি সেরকম নাও হয়ে থাকে, তবু তার কাছাকাছি তো অবশ্যই! গোটা নগরীটি পাথরের দ্বারা নির্মিত মজবুত প্রাচীরে বেষ্টিত। সেই প্রাচীরের গায়ে দুটি উন্মুক্ত ফটক রয়েছে। ফটকের দরজাগুলোর পথ রুসাফা এলাকার তীরবর্তী গোয়াদেল কুইভার নদীর দিকে চলে গেছে। আর রুসাফা হলো শহরের উঁচু অংশে নির্মিত বাসস্থানময় এলাকা, যার নিচে আছে ঘন বৃক্ষমালা। রুসাফার ভবনগুলো চতুর্দিক থেকে পরস্পর সংলগ্ন। তো (প্রাচীরের সেই পথটি) চলে গেছে গোয়াদেল কুইভার নদী পর্যন্ত। পথের আশপাশে আছে বাজার ও বেচাকেনার বিখ্যাত স্থান। সাধারণ মানুষের বাসস্থান (রুসাফার নিম্নবর্তী) ঘন গাছবিশিষ্ট স্থানে। সেখানকার মানুষেরা সম্পদশালী ও বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন নাগরিক।

কর্ডোভার নাগরিকদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, মানুষের মাঝে তারা অভিজাত শ্রেণি, মর্যাদাশালী এবং আলেম-উলামা ও জ্ঞানীগুণী সম্প্রদায়। এ প্রসঙ্গে শরিফ ইদরিসি বলেন, কর্ডোভায় সবসময়ই বড় বড় আলেম-উলামা ও শ্রেষ্ঠ জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিদের বসবাস ছিল। এখানকার ব্যবসায়ীরা ছিল অত্যন্ত ধনবান। তারা খুবই অবস্থাসম্পন্ন এবং বিপুল পরিমাণ সম্পদের অধিকারী ছিল। তাদের উন্নতমানের জাহাজ ছিল। উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল তাদের বৈশিষ্ট্য।

হিময়ারি বলেন, কর্ডোভা ছিল আন্দালুসের মূল ঘাঁটি এবং প্রধান শহর। উমাইয়া খেলাফতের কেন্দ্রস্থল ছিল এই শহর। তাদের নিদর্শন ও স্মৃতিচিহ্ন এখানে সুস্পষ্টরূপে বিদ্যমান। কর্ডোভার শ্রেষ্ঠত্ব ও তার খলিফাদের কৃতিত্ব এত প্রসিদ্ধ যে তা উল্লেখ করা নিষ্প্রয়োজনীয় বিষয়। তারা ছিলেন দেশের অভিজাত শ্রেণি ও শ্রেষ্ঠ মানুষ। বিশুদ্ধ মতাদর্শ, হালাল উপার্জন, সুন্দর বেশভূষা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আখলাক ও শিষ্টাচারের জন্য তারা ছিলেন বিখ্যাত। কর্ডোভায় বসবাস করতেন বড় বড় আলেম ও নেতৃস্থানীয় জ্ঞানীগুণী ব্যক্তি।

কর্ডোভা সম্পর্কে ইয়াকুত হামাবিও বলেন, কর্ডোভা ছিল আন্দালুসের শ্রেষ্ঠ শহর, দেশের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। সম্রাটের (খলিফার) আবাসস্থল ও শাসনকেন্দ্র। বনি উমাইয়ার সম্রাটগণ (খলিফাগণ) কর্ডোভাতেই বসবাস করতেন। এই শহর ছিল জ্ঞানীগুণীদের খনি ও প্রস্রবণের সাথে তুলনীয়।

আবুল হাসান আলি ইবনে বাসসাম শান্তারিনি (৪৫০-৫৪২ হি.) কর্ডোভা সম্পর্কে বলেন, (আন্দালুসে) কর্ডোভা ছিল চূড়ান্ত গন্তব্য, পতাকার কেন্দ্র, প্রধান নগরী, মর্যাদাবান ও আল্লাহভীরু ব্যক্তিদের আবাসস্থল, জ্ঞানীগুণীদের ভূমি, রাজ্যের হৃৎপিণ্ড, জ্ঞানবিজ্ঞানের অবিরাম প্রস্রবণ, ইসলামের গম্বুজস্বরূপ, মহামান্য ইমামতুল্য, সুস্থ বিবেকবুদ্ধির গন্তব্যস্থল, অন্তরের জন্য ফলবাগানতুল্য, মেধা নিঃসৃত মণিমুক্তার সাগর। কর্ডোভার দিগন্ত থেকে উদিত হয়েছে পৃথিবীর তারকারা, উড্ডীন হয়েছে জগতের নিশানতুল্য ব্যক্তিবর্গ, বিকশিত হয়েছে গদ্য ও পদ্যের যোদ্ধারা। এখানে রচিত হয়েছে শ্রেষ্ঠ রচনাবলি, লিখিত হয়েছে অমূল্য গ্রন্থরাজি। এসবের-এবং প্রাচীন কালে ও বর্তমান কালে এখানকার বাসিন্দাদের অন্য মানুষদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের-কারণ এই যে, তাদের নগরী তথা কর্ডোভার দিগন্তজুড়ে সবসময়ই বিভিন্ন শাস্ত্রের গবেষক ও জ্ঞান-অন্বেষকদের আবাসস্থল ছিল। মোটকথা, এই দিগন্তের অধিকাংশ মানুষ, বিশেষভাবে কর্ডোভার মানুষ এবং ব্যাপকভাবে গোটা আন্দালুসের মানুষ ছিল আন্দালুসবিজয়ী প্রাচ্যের শ্রেষ্ঠ আরবগণ এবং এ অঞ্চলে আবাস নির্মাণকারী শাম ও ইরাকের মহান সেনাপতিবৃন্দ, এরপর তাদের অভিজাত বংশধররাই এতদঞ্চলের অধিবাসীরূপে অবস্থান গ্রহণ করে। তাই আন্দালুসে এমন কোনো শহর ছিল না, যেখানে দক্ষ লেখক বা স্বনামধন্য কোনো কবি ছিল না।

ইবনুল ওয়ারদি তার খারিদাতুল আজায়িব গ্রন্থে কর্ডোভা ও তার অধিবাসী সম্পর্কে বলেন, কর্ডোভাবাসীরা ছিল গোটা দেশের শ্রেষ্ঠ মানুষ। খাদ্য-পানীয়, বাহন, উচ্চাকাঙ্ক্ষা-সব দিক থেকে তারা ছিল অভিজাত ও সেরা। কর্ডোভাতেই ছিলেন সেরা আলেমগণ, নেতৃস্থানীয় জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিবর্গ, বীর সেনাপতিগণ এবং দুঃসাহসী যোদ্ধারা। এরপর তিনি কর্ডোভার জামে মসজিদ ও সেতুর বর্ণনা দিয়ে বলেন, এই শহরের সৌন্দর্য ও নান্দনিকতা এত বেশি যে তা বর্ণনা করা সম্ভব নয়।

মোটকথা, ইসলামি সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহরের নাম হলো কর্ডোভা, যা মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রায় এবং তার চাকাকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। তবে বাস্তবিকতা এই যে, সেই যুগে এরূপ শহর একমাত্র কর্ডোভাই ছিল না; বরং আমরা চাইলে বাগদাদ, দামেশক, কায়রো, বসরা বা অন্যান্য শহর সম্পর্কেও এমন আলোচনা করতে পারি। সেসব শহরও কর্ডোভার মতো বিস্ময়কর ছিল অথবা বলা যায় তার চেয়েও বেশি। না, এতে আশ্চর্যান্বিত হওয়ার কিছু নেই! কেননা এটা হলো মুসলিম সভ্যতার নিদর্শন, যা দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সভ্যতা এবং দীর্ঘ মানবেতিহাসের ললাটে এক গৌরবপূর্ণ শুভ্রচিহ্ন।

টিকাঃ
৩০৩. ইয়াকুত হামাবি, মুজামুল বুলদান, খ. ৪, পৃ. ৩২৪।
৩০৪. ইদরিসি, নুজহাতুল মুশতাক ফি ইখতিরাকিল আফাক, খ. ২, পৃ. ৫৭৫।
৩০৫. হিময়ারি, আর-রওযুল মিতার ফি খবারিল আকতার, পৃ. ৪৫৬।
৩০৬. ইয়াকুত হামাবি, মুজামুল বুলদান, খ. ৪, পৃ. ৩২৪।
৩০৭. আবুল হাসান ইবনে বাসসাম, আয-যাখিরা ফি মাহাসিনি আহলিল জাযিরা, খ. ১, পৃ. ৩৩।
৩০৮. ইবনুল ওয়ারদি, খারিদাতুল আজায়িব ওয়া ফারিদাতুল গারায়িব, পৃ. ১২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00