📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 কর্ডোভায় অবস্থিত সভ্যতার নিদর্শন

📄 কর্ডোভায় অবস্থিত সভ্যতার নিদর্শন


এই আলোচনার মাধ্যমে আমরা বিশেষত কর্ডোভা নগরী এবং ব্যাপকভাবে গোটা আন্দালুসের উন্নতি, সমৃদ্ধি ও সভ্যতা নির্দেশক নানা নিদর্শন সম্পর্কে জানব। বস্তুত মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রায় ইসলামের অবদান কী, এর মাধ্যমে আমরা সে ব্যাপারেও কিছুটা আঁচ করতে পারব।

**কর্ডোভার সেতু**

সেখানকার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন ছিল কর্ডোভা-সেতু, যা গোয়াদেল কুইভার নদীর ওপর অবস্থিত। এটি 'জিসর' (সেতু) নামে, অদ্রূপ 'কানতারাতুদ দাহর' (যুগের সেতু) নামেও পরিচিত। সেতুটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় চারশ মিটার, প্রন্থ চল্লিশ মিটার এবং উচ্চতা ত্রিশ মিটার!

উমর ইবনে মুযাফফার ইবনুল ওয়ারদি (মৃ. ৭৪৯ হি.) এবং শরিফ ইদরিসি (মৃ. ৫৫৯ হি.) কর্ডোভা-সেতুর ব্যাপারে বলেন, এই সেতু তার নির্মাণশৈলী ও মজবুতি-উভয় দিক থেকেই সকল সেতুর ওপর শ্রেষ্ঠত্বের গৌরব অর্জন করে।

এই সেতুর খিলান-সংখ্যা ছিল সতেরোটি, একেকটি খিলান থেকে অপর খিলানের দূরত্ব ছিল বারো মিটার। প্রতিটি খিলানের (এক মাথা থেকে অন্য মাথা পর্যন্ত লম্বালম্বিভাবে) প্রশস্ততা ছিল বারো মিটার এবং (নিজস্ব) প্রন্থ ছিল প্রায় সাত মিটার। নদীর জলসীমা থেকে খিলানগুলোর উচ্চতা ছিল পনেরো মিটার।

উপর্যুক্ত দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতা ছিল এমন একটি সেতুর যা নির্মিত হয়েছিল হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীতে (১০১ হিজরি)। অর্থাৎ প্রায় চৌদ্দশ বছর পূর্বে! সেটা ছিল এমন একসময়, যখন মানুষের নিকট ঘোড়া-গাধা- খচ্চর ছাড়া পরিবহনব্যবস্থার আর কোনো মাধ্যম ছিল না। এ ছাড়া নির্মাণকাজের জন্য উন্নতমানের পদ্ধতি, যন্ত্রপাতি ও উপাদানও ছিল না। ফলে এই কাঠামোতে নির্মিত সেতুটি হয়ে উঠেছিল ইসলামি সভ্যতার এক মহাগৌরবের বিষয়।

**কর্ডোভার জামে মসজিদ**

আল-জামিউল কাবির মসজিদটিকে এখন পর্যন্ত বিদ্যমান কর্ডোভার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন ও ঐতিহাসিক চিহ্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্প্যানিশ ভাষায় এর নাম মেজকুইটা (Mezquita)। এ শব্দটি মসজিদ শব্দের বিকৃত উচ্চারণ। এই মসজিদ আন্দালুসের সবচেয়ে বিখ্যাত মসজিদ ছিল (বস্তুত এ কারণেই এটি এখন খ্রিষ্টান ক্যাথিড্রালরূপে অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে)। পাশাপাশি এটি ইউরোপের সবচেয়ে বড় মসজিদ হওয়ারও গৌরব অর্জন করে। ১৭০ হিজরি মোতাবেক ৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদটির নির্মাণকাজ শুরু করেন আন্দালুসীয় উমাইয়া শাসক আবদুর রহমান দাখিল এবং নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেন তার পুত্র প্রথম হিশাম। পরবর্তীকালে আন্দালুসের সব সুলতান ও খলিফাই আয়তন ও সৌন্দর্যে মসজিদটিকে সমৃদ্ধ করেন। ফলে এটি কর্ডোভার সবচেয়ে সুন্দর মসজিদ হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠে সে সময়ের সবচেয়ে বড় মসজিদও।

আর-রাওযুল মিতার গ্রন্থকার আবু আবদুল্লাহ হিময়ারي (সম্ভাব্য মৃ. ৯০০ হি.) মসজিদটির বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেন, কর্ডোভায় ছিল বিখ্যাত জামে মসজিদ। সুপ্রশস্ত আয়তন, মজবুত নির্মাণ, অপূর্ব শৈলী এবং নিখুঁত কাঠামোর দিক থেকে এটি ছিল গোটা দুনিয়ার সর্বোল্লেখযোগ্য মসজিদ। মারওয়ানি খলিফাগণ মসজিদটির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেন। তারা বার বার এর আয়তন বৃদ্ধি ও এর পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে মসজিদটির চূড়ান্ত নিখুঁত রূপ পরিদৃষ্ট হয়। এর দিকে তাকালে চক্ষু বিস্ফারিত হতো, বর্ণনার মাধ্যমে এর সৌন্দর্য প্রকাশ করা সম্ভব হতো না। কারুকার্য ও নকশায় এবং দৈর্ঘ্য-প্রন্থে মুসলিমদের কোনো মসজিদই এই মসজিদের সমকক্ষ ছিল না।

মসজিদটি দৈর্ঘ্যে ছিল একশ আশি ‘বা’। এর অর্ধেক ছিল ছাদযুক্ত অংশ এবং অপর অর্ধেক ছিল ছাদহীন চত্বর। ছাদযুক্ত অংশের খিলান সংখ্যা ছিল চৌদ্দটি। ভবনসমূহের ছাদযুক্ত অংশের স্তম্ভ, ছোট-বড় গম্বুজগুলোর স্তম্ভ, বড় মিহরাবের ও তার আশপাশের স্তম্ভ-সব মিলিয়ে স্তম্ভের সংখ্যা ছিল এক হাজার। মসজিদটিকে আলোকিত করার জন্য ছিল একশ তেরোটি বাতির ঝাড়। সবচেয়ে বড় ঝাড়টি এক হাজার বাতি ধারণ করতে পারত, সবচেয়ে ছোট ঝাড়টির ধারণক্ষমতা ছিল বারোটি।

মসজিদে যেসব কাঠ ব্যবহৃত হয়েছিল তার সবই ছিল তরতুশা পাইন গাছের কাঠ। ঘরের ওপরের বিমগুলোর প্রন্থ ছিল এক বিঘত বাই তিন আঙুল কম এক বিঘত। দৈর্ঘ্যে প্রতিটি বিম ছিল সাঁইত্রিশ বিঘত। প্রতিটি বিমের মাঝে ছিল এক বিমের পুরুত্ব পরিমাণ দূরত্ব। মসজিদের ছাদে ছিল বিভিন্ন ধরনের কারুকার্য ও নকশা, যেগুলোর একটির সঙ্গে অপরটির কোনো মিল ছিল না। নকশা ও কারুকার্য বসানোর বিন্যাস ছিল যথাযথ। লাল, নীল, সাদা, সবুজ, সুরমা ইত্যাদি নানা রঙের মিশেলে সেগুলো অপরূপ ছিল। মসজিদটির অনন্য শোভা চোখ ধাঁধিয়ে দিত। এর অনুপম নকশা ও এতে বিভিন্ন রঙের শৈল্পিক ব্যবহার চিত্তকে মোহিত করত। ছাদের একেকটি প্রস্তরফলকের প্রশস্ততা ছিল তেত্রিশ বিঘত, এক খুঁটি থেকে আরেক খুঁটির দূরত্ব ছিল পনেরো বিঘত এবং প্রতিটি খুঁটির মাথা ও ভিত্তিমূলটি ছিল মার্বেল পাথরের।

এই জামে মসজিদের যে মিহরাব ছিল তার (সৌন্দর্যের) বর্ণনা দেওয়া কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর পক্ষেই সম্ভব নয়। এর নিখুঁত নকশা ও কারুকার্য মানুষকে হতবুদ্ধি করে দিত। মিহরাবে সোনার পাত ও স্ফটিকের মোজাইক ব্যবহার করা হয়েছিল। এগুলো দা গ্রেট কনস্টান্টিনোপলের সম্রাট মুসলিম শাসক আবদুর রহমান নাসির লি-দ্বীনিল্লাহকে উপহার পাঠিয়েছিলেন। মিহরাবের দুইপাশে চারটি স্তম্ভ ছিল। দুটি স্তম্ভ সবুজ রঙের, অপর দুটি যুরযুরি পাখির রংবিশিষ্ট; সম্পদের মাধ্যমে এগুলোর মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। মিহরাবের শিরোভাগে ছিল মার্বেল পাথরের ব্লক, পাথরের একটি টুকরোতে সোনা ও নীলকান্তমণির চুমকি এবং নানা ধরনের রং ব্যবহার করে অলংকরণ করা হয়েছিল। মিহরাবটিকে ঘিরে ছিল কাঠের বেষ্টনী, এতে খোদিত ছিল অভূতপূর্ব সব নকশা। মিহরাবের ডান দিকে ছিল মিম্বার, পৃথিবীতে এমন শৈল্পিক রীতিতে নির্মিত মিম্বার আর একটিও নেই। মিম্বারটিতে ব্যবহৃত হয়েছিল আবলুস কাঠ, বক্সকাঠ (boxwood) এবং কয়লাকাঠ। কথিত আছে, মিম্বারটি তৈরি করতে সাত বছর সময় লাগে। জোগালেদের হিসাব ছাড়াই ছয়জন মিস্ত্রি প্রধানরূপে এর নির্মাণকার্য সম্পন্ন করে!

মিহরাবের উত্তর পাশে ছিল একটি ঘর। সেখানে বিভিন্ন ধরনের আসবাব ও সোনা, রুপা, কীলক দিয়ে নির্মিত পট ছিল। পটগুলোতে রমজানের সাতাশ তারিখে মোমবাতি জ্বালানো হতো। এই সংরক্ষণাগারে একটি মুসহাফ (কুরআন মাজিদ) ছিল। এটি এত ভারী ছিল যে, তা তুলতে দুজন লোকের প্রয়োজন হতো। এতে উসমান ইবনে আফফান রা.-এর মুসহাফের চারটি পাতাও ছিল, যা তিনি নিজ হাতে লিখেছিলেন। সেখানে তার রক্তের ফোঁটার চিহ্ন ছিল। প্রতিদিন সকালে এ মুসহাফটি বের করা হতো। মসজিদের দায়িত্বশীল লোকদের একটি দল কাজটির তদারকি করত। মুসহাফের জন্য অদ্ভুত সব নকশা খচিত চমৎকার একটি গিলাফ এবং তা রাখার জন্য একটি তেপায়া ছিল। (মুসহাফ বের করার পর) ইমাম সাহেব অর্ধেক হিযব পড়তেন, তারপর মুসহাফটি যথাস্থানে নিয়ে যাওয়া হতো।

মিহরাব ও মিম্বারের ডানদিকে একটি দরজা ছিল। মসজিদের দুই দেয়ালের ছাদের নিচে বিদ্যমান এই পথ দিয়ে প্রাসাদে প্রবেশ করা যেত। ছাদবিশিষ্ট এই পথের দুই পাশে আটটি দরজা ছিল, চারটি দরজা প্রাসাদ থেকে বন্ধ করা যায় এবং বাকি চারটি দরজা বন্ধ করা যায় মসজিদ থেকে। মসজিদটির বিশটি ফটক ছিল। ফটকের পাল্লাগুলো ছিল পিতল দ্বারা আস্তৃত এবং এগুলোর ওপরে ছিল পিতলের তৈরি তারা। প্রতিটি ফটকে ছিল অত্যন্ত মজবুত দুটি কড়া। ফটকের ওপরের দেয়ালগাত্রে ছিল মসৃণ লাল ইটের তৈরি নানা প্রকারের বুদ্বুদ-চিহ্ন। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের নকশা ও কারুকার্যও ছিল।

মসজিদের উত্তর পাশে ছিল দৃষ্টিনন্দন অভূতপূর্ব নির্মাণশৈলীর এক মিনার। অসাধারণ কাঠামোর তুলনাহীন এক সৃষ্টি। গোটা মিনারটির উচ্চতা ছিল একশ হাত (প্রতি হাতের পরিমাণ ছিল তিন বিঘত করে)। যে স্থানটিতে দাঁড়িয়ে মুয়াজ্জিন আজান দিতেন তার উচ্চতা ছিল আশি হাত। আর সেখান থেকে এর চূড়া পর্যন্ত ছিল আরও বিশ হাত। দুটি সিঁড়ি দিয়ে এই মিনারের চূড়ায় ওঠা যেত। পশ্চিম দিক থেকে একটি সিঁড়ি, পূর্ব দিক থেকে আরেকটি সিঁড়ি। মিনারটির নিচ থেকে সিঁড়িগুলো আলাদা, তবে চূড়ায় গিয়ে সিঁড়ি দুটি একত্রে মিলিত হয়েছিল। মিনারটির চূড়া আস্তর করা হয়েছিল কাযযান (ছোট ছোট কোমনীয় পাথর) দিয়ে। ভূমিসংলগ্ন অংশ থেকে চূড়া পর্যন্ত মিনারটিকে বিভিন্ন রকমের কারুকার্য ও চারুলিপি দ্বারা সুসজ্জিত করা হয়েছিল।

মিনারটির চতুষ্পার্শ্বে ছিল খিলানের দুটি সারি। খিলানগুলো মার্বেল পাথরের বন্ধনীর ওপর গোলাকারে নির্মিত ছিল। (মিনারের ছিল) বন্ধ চার দরজাবিশিষ্ট একটি ঘর। ঘরটিতে প্রতিদিনই দুইজন মুয়াজ্জিন রাত্রিযাপন করতেন। মিনারের চূড়ায় ছিল তিনটি সোনার আপেল, দুটি রুপার আপেল এবং আইরিস ফুলের পাতা। এখানকার সবচেয়ে বড় আপেলটিতে ষাট রিতল পরিমাণ তেল ধরত। ষাটজন লোক প্রতিনিয়ত মসজিদটির খাদেম হিসেবে কাজ করতেন। আর তাদের জন্য ছিলেন একজন তত্ত্বাবধায়ক।

এরই কাছাকাছি বর্ণনা দিয়েছেন ইবনুল ওয়ারদি তার খারিদাতুল আজায়িব ওয়া ফারিদাতুল গারায়িব গ্রন্থে।

মসজিদ চত্বরে প্রচুর পরিমাণে কমলা ও আনার গাছ ছিল। বিভিন্ন এলাকা থেকে কর্ডোভায় আগত মানুষজন ক্ষুধার্ত হলে এসব গাছ থেকে ফল খেতে পারত।

কিন্তু এ কারণে হৃদয়ে বেদনার ঝড় ওঠে এবং দুই চোখ অশ্রুতে প্লাবিত হয় যে, আন্দালুসের পতনের পরপরই মসজিদটি ক্যাথিড্রালে রূপান্তরিত হয় এবং খ্রিষ্টানদের গির্জার অনুষঙ্গ হয়ে যায়-যদিও নামটি অক্ষত থাকে। ইসলামি বৈশিষ্ট্য আড়াল করার জন্য সুউচ্চ মিনারটিকে টাওয়ারের রূপ দেওয়া হয়। তার চূড়ায় টাঙিয়ে দেওয়া হয় গির্জার ঘণ্টা। মসজিদটির মজবুত প্রাচীরগুলোতে এখনো কুরআনের আয়াত উৎকীর্ণ রয়েছে, যা অসাধারণ শিল্পপ্রতিভার পরিচায়ক। এটি বর্তমানে গোটা বিশ্বের অন্যতম প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক স্থান।

**কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়**

কর্ডোভা জামে মসজিদের ভূমিকা কেবল ইবাদত-বন্দেগির ওপরই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তখনকার দিনে এটি ছিল বিশ্বের বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্যতম এবং ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ জ্ঞানকেন্দ্র। এই জ্ঞানকেন্দ্রের মধ্য দিয়ে আরবীয় জ্ঞানবিজ্ঞান ইউরোপীয় দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক শতাব্দীব্যাপী এর জ্ঞানবিস্তার অব্যাহত থাকে।

কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানের সব শাখার পঠনপাঠন ছিল। এখানে পাঠদানের জন্য শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের মনোনীত করা হতো। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য থেকে সমানভাবে বিদ্যার্থীরা এখানে জ্ঞান অর্জন করতে আসত। মুসলিম শিক্ষার্থী যেমন ছিল, তেমনই ছিল অমুসলিম শিক্ষার্থীও। পাঠদান ও জ্ঞানচর্চার আসরগুলো মসজিদের অর্ধেকটারও বেশি দখল করে রাখত। শিক্ষকদের জন্য মোটা অঙ্কের বেতনভাতা ছিল, যেন তারা পাঠদান ও লেখালেখির জন্য আত্মনিবেদন করতে পারেন। ছাত্রদের জন্যও বৃত্তির ব্যবস্থা ছিল। গরিবদের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করা হতো।

সে সময়কার পরিবেশে জ্ঞানচর্চার এরকম উন্নত ব্যবস্থা জ্ঞানচর্চামূলক সমাজ গঠনে লক্ষণীয় ভূমিকা রাখে। কর্ডোভা শহর মুসলিমদের জন্য তো বটেই, গোটা বিশ্বের জন্য সর্ব শাখায় অসংখ্য জ্ঞানীগুণীর জন্ম দেয়।

উদাহরণ হিসেবে কয়েকজনের নাম এখানে উল্লেখ করা যায়: আবুল কাসিম যাহরাবি (৩২৫-৪০৪ হি./৯৩৬-১০১৩ খ্রি.), তিনি ছিলেন খ্যাতিমান শল্যবিদ, চিকিৎসক, ভেষজবিজ্ঞানী ও ওষুধ প্রস্তুতপ্রণালিতে বিশেষজ্ঞ। আরও আছেন (বহুশাস্ত্রজ্ঞ) ইবনে বাজাহ (১০৮৫-১১৩৮ খ্রি.); (চিকিৎসাবিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও দার্শনিক) ইবনে তুফাইল (১১০৫-১১৮৫ খ্রি.); চক্ষুবিজ্ঞানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ গাফিকি (মৃ. ১১৬৬ খ্রি.); ইবনে আবদুল বার (৯৭৮-১০৭১ খ্রি.); ইবনে রুশদ (১১২৬-১১৯৮ খ্রি.); শরিফ ইদরিসি (১১০০-১১৬৫ খ্রি.); আবু বকর ইয়াহইয়া ইবনে সাদুন ইবনে তাম্মাম আযদি (১০৯৩-১১৭২ খ্রি.); আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ কাজি কুরতুবি নাহবি (মৃ. ৩৪৫ হি.); হাফেয কুরতুবি; আবু জাফর কুরতুবি (৫২৮-৫৯৬ হি.) এবং আরও অনেকে।

টিকাঃ
২৮৬. ইবনুল ওয়ারদি, খারিদাতুল আজায়িব ওয়া ফারিদাতুল গারায়িব, পৃ. ১২; ইদরিসি, নুযহাতুল মুশতাক, খ. ২, পৃ. ৫৭৯।
২৮৭. মাক্কারি, নাফহুত তিব, খ. ১, পৃ. ৪৮২।
২৮৮. এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছিল সামহ ইবনে মালিক খাওলানির হাতে, যিনি উমর ইবনে আবদুল আযিয রহ.-এর পক্ষ থেকে আন্দালুসের গভর্নর ছিলেন।
২৮৯. ১ 'বা' = প্রসারিত দুই বাহুর পরিমাণ। -অনুবাদক
২৯০. তরতুশা (Tortosa): তৎকালীন আন্দালুসের ও বর্তমানে স্পেনের একটি শহর। এ শহরে জন্মানো গাছের দিকে সম্পৃক্ত করে এই কাঠকে তরতুশি বলা হয়েছে।
২৯১. الرُّرْزُورُ (Starling) হলো প্যাসারিফর্মিস বর্গের পাখি। আকারে চড়ুই থেকে বড়। পালকগুলো সবুজাভ-বেগুনি। অথবা হালকা উজ্জ্বল বেগুনি। অথবা তা কোমল সাদা পাথর। রুসেট বা হলুদও হতে পারে। হতে পারে হালকা ধাতব রঙের।
২৯২. উজ্জ্বল নীল রঙের পাথর; আরবি শব্দ লাজাবর্দ; azurite বা lapis lazuli।-অনুবাদক
২৯৩. জোগালে, যে ব্যক্তি নির্মাণসামগ্রী হাতের কাছে এনে দিয়ে রাজমিস্ত্রিকে সাহায্য করে।-সম্পাদক
২৯৪. কুরআনে রয়েছে ত্রিশ পারা, প্রতি পারা দুই হিযবে বিভক্ত। অর্থাৎ কুরআনে মোট ষাট হিযব রয়েছে।-অনুবাদক
২৯৫. হিময়ারي, আর-রওযুল মিতার ফি খবারিল আকতার, খ. ১, পৃ. ৪৫৬-৪৫৭।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 কর্ডোভা : এক আধুনিক শহর

📄 কর্ডোভা : এক আধুনিক শহর


কর্ডোভা সমাজ ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে আমাদের অবগতির ওপর ভিত্তি করে প্রতীয়মান হয় যে, হিজরি চতুর্থ শতকের (খ্রিষ্টীয় দশম শতকের) মাঝামাঝি সময়ে কর্ডোভা একটি আধুনিক শহরে পরিণত হয়েছিল, যাকে এই তৃতীয় সহস্রাব্দের আন্তর্জাতিক শহরগুলোর সঙ্গে তুলনা করা যায়।

বস্তুত এতে বিস্ময়বোধ করার কিছু নেই। কেননা, জনমানুষের শিক্ষার জন্য সেখানে বিদ্যালয়ের বিস্তার ঘটেছিল। অসংখ্য ব্যক্তিগত ও গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এমনকি পৃথিবীর মধ্যে কর্ডোভাতেই তখন সবচেয়ে বেশি গ্রন্থ ছিল! এ ছাড়া শহরটি পরিণত হয়েছিল সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থলে। সর্বপ্রকার জ্ঞানের সম্মিলন ঘটেছিল এ শহরে। অন্যান্য ক্ষেত্রেও এটি ছিল নেতৃস্থানীয় শহর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দরিদ্র শিক্ষার্থীরা বিনা খরচে পড়াশোনা করতে পারত। শাসকরা নিজেদের অর্থ থেকে তাদের খরচ বহন করত। তাই এ দাবিতে বিস্ময়ের কিছু নেই যে, তথাকার জনগোষ্ঠী সকলেই সাক্ষর ছিল। কর্ডোভায় এমন একটি লোকও পাওয়া যেত না, যে ভালোভাবে পড়ালেখা জানত না। অথচ সেই সময়ে ইউরোপে মুষ্টিমেয় ধর্মীয় পণ্ডিত ছাড়া সম্ভ্রান্ত লোকেরাও অশিক্ষিত ছিল!

উল্লেখযোগ্য বিষয় যে, কর্ডোভা নগরীতে সে সময় শুধু জ্ঞানবিজ্ঞান ও সংস্কৃতিগত বিপ্লবই সংঘটিত হয়নি, বরং তার সঙ্গে যুক্ত হয় প্রশাসনিক অবকাঠামোগত বিপ্লবও। তখন রাষ্ট্রে তৈরি হয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও উন্নত প্রশাসনব্যবস্থা। যার মধ্যে ছিল আমিরশাসিত প্রদেশব্যবস্থা ও মন্ত্রিপরিষদ। বিচারব্যবস্থা, পুলিশবিভাগ, 'হিসবাহবিভাগ' ও অন্যান্য বিভাগেরও বিকাশ ঘটে।

এ ছাড়া বড় ধরনের শিল্পবিপ্লবও ঘটে। বিভিন্ন ধরনের শিল্পের উন্নতি সাধিত হয়। সেখানকার অনেক শিল্প প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। যেমন : চামড়াশিল্প, জাহাজশিল্প, কৃষি যন্ত্রপাতি নির্মাণশিল্প, ওষুধশিল্প ইত্যাদি। তা ছাড়া খনি থেকে সোনা, রুপা ও পিতল উত্তোলনেও উন্নতি ঘটে।

আমরা যদি কর্ডোভার নাগরিক জীবন ও তার আধুনিকতার প্রতি দৃষ্টিপাত করি তাহলে দেখতে পাই, এই নগরী পাঁচটি ছোট ছোট শহরে বিভক্ত ছিল। যেন তা পাঁচটি বড় বড় পল্লি। মাক্কারি জানাচ্ছেন, এক শহর থেকে অপর শহরের মাঝে বৃহদায়তন দুর্ভেদ্য প্রাচীর ছিল। প্রতিটি শহরই ছিল আলাদা ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। প্রত্যেক শহরের শহরবাসীর জন্য যথেষ্ট পরিমাণ গণগোসলখানা, হাটবাজার ও শিল্প উৎপাদনব্যবস্থা ছিল।

মুজামুল বুলদান গ্রন্থে উল্লেখিত ইয়াকুত হামাবির বর্ণনা অনুযায়ী কর্ডোভার আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল এরূপ, সেখানকার বাজারগুলো সব ধরনের পণ্য ও খাদ্যদ্রব্যে পরিপূর্ণ থাকত। আর প্রত্যেক শহরের বাজার ছিল আলাদা আলাদা।

এ পর্যায়ে মাক্কারির বরাত দিয়ে কর্ডোভার স্থাপত্যকীর্তি সম্পর্কে কিছু পরিসংখ্যান উল্লেখ করছি :

মসজিদ: আবদুর রহমান দাখিলের যুগে কর্ডোভার মসজিদ-সংখ্যা চারশ নব্বইয়ে উন্নীত হয়েছিল। তারপর এই সংখ্যা পৌঁছে তিন হাজার আটশ সাঁইত্রিশে।
জনসাধারণের গৃহ : দুই লাখ তেরো হাজার সাতাত্তরটি।
অভিজাত গৃহ : ষাট হাজার তিনশটি।
দোকান (স্টোর ও অন্যান্য): আশি হাজার চারশ পঞ্চান্নটি।
গণগোসলখানা: নয়শটি।
উপশহর: আটাশটি।

অবশ্য রাজনৈতিক পরিস্থিতির ভিন্নতার কারণে বা ঐতিহাসিকদের বর্ণনার বিভিন্নতার কারণে এসব জিনিসের সংখ্যায় তারতম্য দেখা যায়। কিন্তু এতে কিছু যায়-আসে না। কারণ এসব ভিন্নতা আভিজাত্য, গৌরব ও সৌন্দর্যের মাত্রাকে কেন্দ্র করে ঘটেছে, এসব বিষয়ের অস্তিত্ব ও বাস্তবতা নিয়ে নয়।

ইসলামি শাসনামলে কর্ডোভার জনসংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ লাখ। অথচ বর্তমানে কর্ডোভাবাসীর সংখ্যা মাত্র তিন লাখ দশ হাজারের কাছাকাছি!

টিকাঃ
২৯৬. মুহাম্মাদ মাহির হাম্মাদাহ, আল-মাকতাবাত ফিল-ইসলাম, পৃ. ৯৯।
২৯৭. কালকাশান্দি, সুবহুল আ'শা, খ. ৫, পৃ. ২১৮।
২৯৮. মাক্কারি, নাফহুত তিব মিন গুসনি আন্দালুসির রাতিব, খ. ১, পৃ. ৫৫৮।
২৯৯. ইয়াকুত হামাবি, মুজামুল বুলদান, খ. ৪, পৃ. ৩২৪।
৩০০. মাক্কারি, নাফহুত তিব, খ. ১, পৃ. ৫৪০।
৩০১. মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ইনান, আল-আসার সিয়্যাতুল বাকিক ফি আসবানিয়া ওয়াল- বুরতুগাল, পৃ. ১৯।
৩০২. http://ar.w ia.org. (২০ লাখ পঁচিশ হা অনুবাদক) না জনসংখ্যা তিন

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 আলেম-উলামা ও জ্ঞানী-সাহিত্যিকদের চোখে কর্ডোভা

📄 আলেম-উলামা ও জ্ঞানী-সাহিত্যিকদের চোখে কর্ডোভা


মসুলের ব্যবসায়ী আবুল কাসিম মুহাম্মাদ ইবনে হাওকাল (মৃ. ৩৬৭ হি.) ৩৫০ হিজরি/৯৬১ খ্রিষ্টাব্দের দিকে কর্ডোভা ভ্রমণ করেন। এরপর তিনি এভাবে তার বর্ণনা দেন, আন্দালুসের অন্যতম বড় শহর কর্ডোভা। জনসংখ্যা ও আয়তনের দিক থেকে কর্ডোভার মতো শহর মাগরিব অঞ্চলে একটিও নেই। বলা হয়ে থাকে, এটি দুই পার্শ্ববিশিষ্ট বাগদাদের একটি পার্শ্বের সাথে তুলনীয়। তবে কর্ডোভা যদি সেরকম নাও হয়ে থাকে, তবু তার কাছাকাছি তো অবশ্যই! গোটা নগরীটি পাথরের দ্বারা নির্মিত মজবুত প্রাচীরে বেষ্টিত। সেই প্রাচীরের গায়ে দুটি উন্মুক্ত ফটক রয়েছে। ফটকের দরজাগুলোর পথ রুসাফা এলাকার তীরবর্তী গোয়াদেল কুইভার নদীর দিকে চলে গেছে। আর রুসাফা হলো শহরের উঁচু অংশে নির্মিত বাসস্থানময় এলাকা, যার নিচে আছে ঘন বৃক্ষমালা। রুসাফার ভবনগুলো চতুর্দিক থেকে পরস্পর সংলগ্ন। তো (প্রাচীরের সেই পথটি) চলে গেছে গোয়াদেল কুইভার নদী পর্যন্ত। পথের আশপাশে আছে বাজার ও বেচাকেনার বিখ্যাত স্থান। সাধারণ মানুষের বাসস্থান (রুসাফার নিম্নবর্তী) ঘন গাছবিশিষ্ট স্থানে। সেখানকার মানুষেরা সম্পদশালী ও বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন নাগরিক।

কর্ডোভার নাগরিকদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, মানুষের মাঝে তারা অভিজাত শ্রেণি, মর্যাদাশালী এবং আলেম-উলামা ও জ্ঞানীগুণী সম্প্রদায়। এ প্রসঙ্গে শরিফ ইদরিসি বলেন, কর্ডোভায় সবসময়ই বড় বড় আলেম-উলামা ও শ্রেষ্ঠ জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিদের বসবাস ছিল। এখানকার ব্যবসায়ীরা ছিল অত্যন্ত ধনবান। তারা খুবই অবস্থাসম্পন্ন এবং বিপুল পরিমাণ সম্পদের অধিকারী ছিল। তাদের উন্নতমানের জাহাজ ছিল। উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল তাদের বৈশিষ্ট্য।

হিময়ারি বলেন, কর্ডোভা ছিল আন্দালুসের মূল ঘাঁটি এবং প্রধান শহর। উমাইয়া খেলাফতের কেন্দ্রস্থল ছিল এই শহর। তাদের নিদর্শন ও স্মৃতিচিহ্ন এখানে সুস্পষ্টরূপে বিদ্যমান। কর্ডোভার শ্রেষ্ঠত্ব ও তার খলিফাদের কৃতিত্ব এত প্রসিদ্ধ যে তা উল্লেখ করা নিষ্প্রয়োজনীয় বিষয়। তারা ছিলেন দেশের অভিজাত শ্রেণি ও শ্রেষ্ঠ মানুষ। বিশুদ্ধ মতাদর্শ, হালাল উপার্জন, সুন্দর বেশভূষা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আখলাক ও শিষ্টাচারের জন্য তারা ছিলেন বিখ্যাত। কর্ডোভায় বসবাস করতেন বড় বড় আলেম ও নেতৃস্থানীয় জ্ঞানীগুণী ব্যক্তি।

কর্ডোভা সম্পর্কে ইয়াকুত হামাবিও বলেন, কর্ডোভা ছিল আন্দালুসের শ্রেষ্ঠ শহর, দেশের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। সম্রাটের (খলিফার) আবাসস্থল ও শাসনকেন্দ্র। বনি উমাইয়ার সম্রাটগণ (খলিফাগণ) কর্ডোভাতেই বসবাস করতেন। এই শহর ছিল জ্ঞানীগুণীদের খনি ও প্রস্রবণের সাথে তুলনীয়।

আবুল হাসান আলি ইবনে বাসসাম শান্তারিনি (৪৫০-৫৪২ হি.) কর্ডোভা সম্পর্কে বলেন, (আন্দালুসে) কর্ডোভা ছিল চূড়ান্ত গন্তব্য, পতাকার কেন্দ্র, প্রধান নগরী, মর্যাদাবান ও আল্লাহভীরু ব্যক্তিদের আবাসস্থল, জ্ঞানীগুণীদের ভূমি, রাজ্যের হৃৎপিণ্ড, জ্ঞানবিজ্ঞানের অবিরাম প্রস্রবণ, ইসলামের গম্বুজস্বরূপ, মহামান্য ইমামতুল্য, সুস্থ বিবেকবুদ্ধির গন্তব্যস্থল, অন্তরের জন্য ফলবাগানতুল্য, মেধা নিঃসৃত মণিমুক্তার সাগর। কর্ডোভার দিগন্ত থেকে উদিত হয়েছে পৃথিবীর তারকারা, উড্ডীন হয়েছে জগতের নিশানতুল্য ব্যক্তিবর্গ, বিকশিত হয়েছে গদ্য ও পদ্যের যোদ্ধারা। এখানে রচিত হয়েছে শ্রেষ্ঠ রচনাবলি, লিখিত হয়েছে অমূল্য গ্রন্থরাজি। এসবের-এবং প্রাচীন কালে ও বর্তমান কালে এখানকার বাসিন্দাদের অন্য মানুষদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের-কারণ এই যে, তাদের নগরী তথা কর্ডোভার দিগন্তজুড়ে সবসময়ই বিভিন্ন শাস্ত্রের গবেষক ও জ্ঞান-অন্বেষকদের আবাসস্থল ছিল। মোটকথা, এই দিগন্তের অধিকাংশ মানুষ, বিশেষভাবে কর্ডোভার মানুষ এবং ব্যাপকভাবে গোটা আন্দালুসের মানুষ ছিল আন্দালুসবিজয়ী প্রাচ্যের শ্রেষ্ঠ আরবগণ এবং এ অঞ্চলে আবাস নির্মাণকারী শাম ও ইরাকের মহান সেনাপতিবৃন্দ, এরপর তাদের অভিজাত বংশধররাই এতদঞ্চলের অধিবাসীরূপে অবস্থান গ্রহণ করে। তাই আন্দালুসে এমন কোনো শহর ছিল না, যেখানে দক্ষ লেখক বা স্বনামধন্য কোনো কবি ছিল না।

ইবনুল ওয়ারদি তার খারিদাতুল আজায়িব গ্রন্থে কর্ডোভা ও তার অধিবাসী সম্পর্কে বলেন, কর্ডোভাবাসীরা ছিল গোটা দেশের শ্রেষ্ঠ মানুষ। খাদ্য-পানীয়, বাহন, উচ্চাকাঙ্ক্ষা-সব দিক থেকে তারা ছিল অভিজাত ও সেরা। কর্ডোভাতেই ছিলেন সেরা আলেমগণ, নেতৃস্থানীয় জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিবর্গ, বীর সেনাপতিগণ এবং দুঃসাহসী যোদ্ধারা। এরপর তিনি কর্ডোভার জামে মসজিদ ও সেতুর বর্ণনা দিয়ে বলেন, এই শহরের সৌন্দর্য ও নান্দনিকতা এত বেশি যে তা বর্ণনা করা সম্ভব নয়।

মোটকথা, ইসলামি সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহরের নাম হলো কর্ডোভা, যা মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রায় এবং তার চাকাকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। তবে বাস্তবিকতা এই যে, সেই যুগে এরূপ শহর একমাত্র কর্ডোভাই ছিল না; বরং আমরা চাইলে বাগদাদ, দামেশক, কায়রো, বসরা বা অন্যান্য শহর সম্পর্কেও এমন আলোচনা করতে পারি। সেসব শহরও কর্ডোভার মতো বিস্ময়কর ছিল অথবা বলা যায় তার চেয়েও বেশি। না, এতে আশ্চর্যান্বিত হওয়ার কিছু নেই! কেননা এটা হলো মুসলিম সভ্যতার নিদর্শন, যা দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সভ্যতা এবং দীর্ঘ মানবেতিহাসের ললাটে এক গৌরবপূর্ণ শুভ্রচিহ্ন।

টিকাঃ
৩০৩. ইয়াকুত হামাবি, মুজামুল বুলদান, খ. ৪, পৃ. ৩২৪।
৩০৪. ইদরিসি, নুজহাতুল মুশতাক ফি ইখতিরাকিল আফাক, খ. ২, পৃ. ৫৭৫।
৩০৫. হিময়ারি, আর-রওযুল মিতার ফি খবারিল আকতার, পৃ. ৪৫৬।
৩০৬. ইয়াকুত হামাবি, মুজামুল বুলদান, খ. ৪, পৃ. ৩২৪।
৩০৭. আবুল হাসান ইবনে বাসসাম, আয-যাখিরা ফি মাহাসিনি আহলিল জাযিরা, খ. ১, পৃ. ৩৩।
৩০৮. ইবনুল ওয়ারদি, খারিদাতুল আজায়িব ওয়া ফারিদাতুল গারায়িব, পৃ. ১২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00