📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 শিরোনামের নান্দনিকতা

📄 শিরোনামের নান্দনিকতা


এই দ্বীনের ব্যাপারে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মানুষ তারাই যারা দ্বীন সম্পর্কে অধিক জানেন, তথা আলেম-উলামা। ফলে আমরা দেখি, ইসলামি সভ্যতার আলেমগণের মধ্যে সৌন্দর্যের প্রতি এমন অনন্য অনুভূতি বিদ্যমান ছিল, অন্যান্য সভ্যতার জ্ঞানী লোকেরা যে স্তরে পৌছতে সক্ষম হননি।

মুসলিম আলেম ও মনীষীদের রচিত ফিকহ, সিরাত, হাদিস, আকিদা, জীবনচরিত, স্তরবিন্যাসভিত্তিক জীবনচরিত ইত্যাদি বিষয়ক গ্রন্থাবলির মাধ্যমে আমরা মানবেতিহাসের ব্যাপারে অবগত হতে পারছি। বস্তুত এসব গ্রন্থের শিরোনামও সৌন্দর্যের একেকটি টুকরো হয়ে উঠেছে। (মানবসভ্যতার যুগযাত্রায় আগে এমনটি কখনো দেখা যায়নি।)

ইসলামি সভ্যতার আলেম ও মনীষীগণ তাদের রচনাবলির শিরোনামেও নান্দনিকতার প্রকাশ ঘটানোর প্রতি যত্নবান ছিলেন। এ ক্ষেত্রে তারা শিরোনামে শব্দ-বাক্যের সৌন্দর্য সৃষ্টি করার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। তারা দু-ভাগবিশিষ্ট অন্ত্যমিলযুক্ত শিরোনাম তৈরি করতেন, যেগুলোর একটি অপরটির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো, ফলে উচ্চারণের সময় একটি চমৎকার ধ্বনিসুষমার সৃষ্টি হতো। এমন শিরোনামের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। আমরা এখানে তার কিছু উল্লেখ করব। যেমন:

(الصارم المسلول على شاتم الرسول) (আস-সারিমুল মাসলুল আলা শাতিমির রাসুল)। এটি শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (মৃ. ৭২৮ হি.) কর্তৃক রচিত গ্রন্থের শিরোনাম। এতে তিনি সে-সমস্ত লোকের বিধান বর্ণনা করেছেন, যারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালি দেয়। ইমাম ইবনে কাইয়িম জাওযিয়্যাহ (মৃ. ৭৫১ হি.) গুনাহের প্রকারভেদ ও তার ক্ষতি সম্পর্কে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। যার শিরোনাম: الجواب الكافي لمن سأل عن الدواء الشافي (আল-জাওয়াবুল কাফি লি-মান সাআলা আনিদ-দাওয়ায়িশ শাফি)।

আন্দালুসীয় গ্রানাডা শহরের ইতিহাস নিয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন লিসানুদ্দিন ইবনুল খতিব (মৃ. ৭৭৬ হি.), যার নাম الإحاطة في أخبار غرناطة (আল-ইহাতাহ ফি আখবারি গারনাতাহ)।

তার সামসময়িক হাকিমুত তারিখ (ইতিহাস-প্রাজ্ঞ) ইবনে খালদুন (মৃ. ৮০৮ হি.) তার ইতিহাসগ্রন্থের নাম রেখেছেন العبر وديوان المبتدأ والخبر في تاريخ العرب والبربر ومن عاصرهم من ذوي الشأن الأكبر (আল-ইবার ওয়াদিওয়ানুল মুবতাদা'য়ি ওয়াল-খাবারি ফি তারিখিল আরাবি ওয়াল-বারবারি ওয়া মান আসারাহুম মিন যাবিশ শানিল আকবার)।

মিশরীয় ইতিহাসবিদ মাকরিযি (মৃ. ৮৪৫ হি.) কায়রোর স্থাপত্য ও নকশাশৈলী বর্ণনা করে যে গ্রন্থ রচনা করেছেন তার নাম المواعظ والاعتبار بذكر الخطط والآثار (আল-মাওয়ায়িযু ওয়াল-ইতিবার বি-যিকরিল খুতাতি ওয়াল-আসার)।

কালকাশান্দি (মৃ. ৮২১ হি.) রাষ্ট্রব্যবস্থা ও আইনকানুন সম্পর্কে আলোচনা করে যে গ্রন্থ রচনা করেছেন তার নাম مآثر الإنافة في معالم الخلافة (মাআসিরুল ইনাফাহ ফি মাআলিমিল খিলাফা)।

হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলোর মধ্যে আমরা পাই, ইবনে হাজার আসকালানি (মৃ. ৮৫২ হি.) কর্তৃক রচিত فتح الباري شرح صحيح البخاري (ফাতহুল বারি শারহু সহিহিল বুখারি) এবং ইমাম নববি (মৃ. ৬৭৬ হি.) কর্তৃক রচিত المنهاج شرح صحيح مسلم بن الحجاج (আল-মিনহাজ শারহু সহিহ মুসলিম ইবনিল হাজ্জাজ)। আরও পাই শামসুল হক আজিমাবাদি (মৃ. ১৩২৯ হি.) কর্তৃক রচিত عون المعبود شرح سنن أبي داود (আউনুল মাবুদ শারহু সুনানি আবি দাউদ) এবং আবদুর রহমান মুবারকপুরি (মৃ. ১৩৫৩ হি.) কর্তৃক রচিত تحفة الأحوذي شرح جامع الترمذي (তুহফাতুল আহওয়াযي শারহু জামিয়িত তিরমিযি)।

আকিদা এবং সে বিষয়ক বিতর্ক ও বাদানুবাদের ইতিহাস সম্পর্কে আমরা পাই ইমাম ইবনে হাযম আন্দালুসি (মৃ. ৪৫৬ হি.) কর্তৃক রচিত الفصل في الملل والأهواء والنحل (আল-ফাসলু ফিল-মিলাল ওয়াল-আহওয়ায়ি ওয়ান-নিহাল), হুজ্জাতুল ইসলাম গাযালি (মৃ. ৫০৫ হি.) কর্তৃক রচিত الاقتصاد في الاعتقاد (আল-ইকতিসাদ ফিল-ইতিকাদ); ইমাম আশআরি (মৃ. ৩২৪ হি.) কর্তৃক রচিত الإبانة عن أصول الديانة (আল-ইবানাহ আন উসুলিদ দিয়ানাহ)।

তদ্রূপ সাহাবায়ে কেরামের মাঝে ঘটে যাওয়া বিরোধ সম্পর্কে পাই ইমাম ইবনে হাজার হাইতামির (মৃ. ৯৭৩ হি.) গ্রন্থ تطهير الجنان واللسان عن ثلب معاوية بن أبي سفيان مع المدح الجلي وإثبات الحق لعلي (তাতহিরুল জানানি ওয়াল লিসানি আন তালবি মুআবিয়া বিন আবি সুফিয়ান মাআল মাদহিল জালি ওয়া ইসবাতিল হাক্কি লি-আলি)।

পরবর্তী শতাব্দীগুলোর মুসলিম আলেম ও মনীষীগণও তাদের রচিত গ্রন্থাবলিতে একই পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন।

তাদের রচিত গ্রন্থাবলির শিরোনামে আরও একটি দিক সৌন্দর্য ও নান্দনিকতা বৃদ্ধি করে। বস্তুত তারা কেবল সাংগীতিক ধ্বনির ক্ষেত্রেই গুরুত্বারোপ করেননি, বরং সেখানে শব্দের অর্থগত নান্দনিক চিত্রও ফুটিয়ে তুলতে গুরুত্ব প্রদান করেছেন। যেমন, তাদের গ্রন্থাবলির জন্য চয়নকৃত শিরোনামের মাঝে রয়েছে সোনা-রুপা, মণি-মুক্তা, তারকা-চাঁদ-সূর্য, সাগর-নদী-নালা, বৃক্ষ-ডালপালা, ফুল-ফল ইত্যাদি নান্দনিক শব্দের ব্যবহার। উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, এ সমস্ত নান্দনিক শব্দ সেসব গ্রন্থের শিরোনাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যেগুলোতে নিরেট তাত্ত্বিক আলোচনা ও একাডেমিক কথাবার্তা স্থান পেয়েছে; আর স্বভাবতই এ ধরনের গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কাঠখোট্টা ও নিরস প্রকৃতির হওয়া। এতৎসত্ত্বেও রচয়িতাদের সেই সৌন্দর্যচেতনা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুগুলোতেও ইসলাম যার প্রকাশ ঘটাতে চায়, তার প্রভাবে এসব কাঠখোট্টা আলোচনার চেহারাতেও সৌন্দর্যের ইসলামি আভিজাত্য উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। উদাহরণ হিসেবে আমরা এখানে কিছু গ্রন্থের নাম উল্লেখ করব। যথা :

**সোনা ও মণিমুক্তা ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার**
ইতিহাস ও বিভিন্ন দেশের ভৌগোলিক বিবরণ সম্পর্কে তারিখুত তাবারির পরে সবচেয়ে বড় বিশ্বকোষ হলো মাসউদি (মৃ. ৩৪৬ হি.) কর্তৃক রচিত গ্রন্থ (مروج الذهب ومعادن الجوهر ) (সোনার বাগিচা ও জহরের খনিরূপী গ্রন্থ)।

ইমাম আবদুর রহমান সাআলিবির (মৃ. ৪৭৫ হি.) তাফসিরগ্রন্থের নাম الجواهر الحسان في تفسير القرآن (কুরআন ব্যাখ্যায় সুদর্শন মাণিকের সমারোহ সৃষ্টিকারী গ্রন্থ)।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুদ্ধবিগ্রহ নিয়ে ইমাম ইবনে আবদুর বার (মৃ. ৪৬৩ হি.) একটি অনন্য গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার নাম الدرر في اختصار المغازي والسير (সংক্ষিপ্তসার যুদ্ধবিগ্রহের বর্ণনায় মণিমাণিক্যের সমারোহ সৃষ্টিকারী গ্রন্থ)।

আবদুল কাদির কুরাশি (মৃ. ৭৭৫ হি.) হানাফি মাজহাবের মনীষীদের জীবনচরিতমূলক একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার নাম الجواهر المضية في طبقات الحنفية (হানাফি আলেমদের স্তরবিন্যাসমূলক চরিতাভিধানে মণিমাণিক্যের সমাহার সৃষ্টিকারী গ্রন্থ)।

মামলুকি শাসনামল সম্পর্কে ইতিহাস লিখেছেন আবু বকর দাওয়াদারি (মৃ. ৭১৩ হি.)। তার গ্রন্থের শিরোনাম চমৎকার : كنز الدرر وجامع الغرر (মাণিক্যের ভান্ডার ও সমুজ্জ্বল নিদর্শন একীভূতকারী গ্রন্থ)।

ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি হিজরি অষ্টম শতকের মনীষীদের নিয়ে গ্রন্থ লিখেছেন, যার নাম الدرر الكامنة في أعيان المائة الثامنة (অষ্টম শতাব্দীর মনীষীদের চরিতাভিধানে সুপ্ত মণি-মুক্তার সমাহার সৃষ্টিকারী গ্রন্থ)।

ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতি (মৃ. ৯১১ হি.) কুরআনের তাফসির লিখে তার গ্রন্থের নাম দিয়েছেন الدر المنثور في التفسير بالمأثور (বর্ণনাত্মক তাফসির রচনায় ছড়ানো-ছিটানো মণি-মুক্তার সমাহার সৃষ্টিকারী গ্রন্থ)।

ইবনুল ইমাদ হাম্বলি (মৃ. ১০৮৯ হি.) ইতিহাস বিষয়ে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার নাম ( شذرات الذهب في أخبار من ذهب) (বিগতদের চরিত বর্ণনায় টুকরো-টুকরো সোনা একত্রকারী গ্রন্থ)।

ইমাম সুয়ুতির অন্য একটি গ্রন্থের নাম ( اللآلئ المصنوعة في الأحاديث ) (জাল হাদিস রচনায় বানোয়াট মণি-মুক্তার পরিচয় প্রদানকারী গ্রন্থ)।

সামিন হালাবির (মৃ. ৭৫৬ হি.) উলুমুল কুরআন বিষয়ে একটি গ্রন্থের নাম ( الدر المصون في علوم الكتاب المكنون) (সুরক্ষিত গ্রন্থের আলোচনায় সযত্নে রক্ষিত মোতিমালা প্রকাশকারী গ্রন্থ)।

আলাউদ্দিন মুত্তাকি হিন্দি (মৃ. ৯৭৫ হি.) কর্তৃক রচিত গ্রন্থের নাম ( کنز العمال في سنن الأقوال والأفعال) (সুন্নতের ওপর আমলকারীদের ধনভান্ডার)।

হানাফি মাজহাব বিষয়ে আবুল বারাকাত নাসাফি (মৃ. ৭১০ হি.) কর্তৃক রচিত গ্রন্থের নাম ( کنز الدقائق) (সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়াবলির ভান্ডার নির্দেশক গ্রন্থ)।

মুহাম্মাদ ফুয়াদ আবদুল বাকি (মৃ. ১৯৬৮ খ্রি.) কর্তৃক রচিত গ্রন্থের নাম ( اللؤلؤ والمرجان فيما اتفق عليه الشيخان) (শাইখানের গ্রন্থে একাত্মভাবে বর্ণিত হাদিসের উল্লেখে মণি-মুক্তা ও প্রবালের সমাহার সৃষ্টিকারী গ্রন্থ)।

**আলোক, আকাশ, তারা-নক্ষত্র ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার**
কালকাশান্দি সাহিত্য, ইতিহাস, রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে একটি বিশ্বকোষ রচনা করে তার নাম দিয়েছেন ( صبح الأعشى في صناعة الإنشا) ([দাপ্তরিক] রচনাকার্যে ক্ষীণদৃষ্টিসম্পন্নের জন্য প্রভাত সৃষ্টিকারী গ্রন্থ)।

ইবনে তাগরি বারদি (মৃ. ৮৭৪ হি.) ইতিহাস বিষয়ে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার নাম ( النجوم الزاهرة في ملوك مصر والقاهرة) কায়রো ও মিশরের রাজন্যদের চরিত রচনায় উজ্জ্বল নক্ষত্রের সমারোহ সৃষ্টিকারী গ্রন্থ)।

শামসুদ্দিন শিরবিনি (মৃ. ৯৭৭ হি.) কুরআনুল কারিমের যে তাফসির রচনা করেছেন তার নাম ( السراج المنير ) (সমুজ্জ্বল প্রদীপ-তুলনীয় গ্রন্থ)।

কুরআনের কেরাত বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন আবু হাফস সিরাজুদ্দিন নাশশার (মৃ. ৭৩৮ হি.), যার নাম البدور الزاهرة في القراءات العشر المتواترة )মুতাওয়াতির দশ কেরাত বর্ণনায় সমুজ্জ্বল চাঁদের সমাহার সৃষ্টিকারী গ্রন্থ)।

শাফিয়ি মাজহাবের ওপর 'আল-ফাতহুল আযিয ফি শারহিল ওয়াজিয' নামে গ্রন্থ রচনা করেছেন ইমাম আবুল কাসিম রাফিয়ي (মৃ. ৬২৩ হি.), এই গ্রন্থে যেসব হাদিস ও আসার উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলোর তাখরিজ (সূত্রনির্দেশ) করতে বড় ধরনের প্রচেষ্টা ব্যয় করেছেন ইমাম ইবনুল মুলাক্কিন (মৃ. ৮০৪ হি.)। তিনি তার এই প্রচেষ্টার নির্যাস তথা গ্রন্থের নাম البدر المنير في تخريج الأحاديث والآثار الواقعة في الشرح الكبير (শরহুল কাবির গ্রন্থে উল্লেখিত হাদিস ও আসারের সূত্রনির্দেশে সমুজ্জ্বল চাঁদের সমাহার সৃষ্টিকারী গ্রন্থ)।

ইমামুল হারামাইন জুওয়াইনি (মৃ. ৪৭৮ হি.) উসুলুল ফিকহ বিষয়ে 'আল-ওয়ারাকাত' নামে একটি পুস্তিকা রচনা করেছেন, এই গ্রন্থের ব্যাখ্যা রচনা করেছেন ইমাম শামসুদ্দিন মারিদিনি (মৃ. ৮৭১ হি.)। তার ব্যাখ্যাগ্রন্থের নাম ) الأنجم الزاهرات على حل ألفاظ الورقات (ওয়ারাকাত পুস্তিকার শব্দ বিশ্লেষণে আলোকিত নক্ষত্রমালা একত্রকারী গ্রন্থ)।

ইমাম ইবনুল কাইয়াল (মৃ. ৯২৯ হি.) সিকাহ (নির্ভরযোগ্য) হাদিস বর্ণনাকারীদের মধ্যে যাদেরকে অমূলকভাবে 'ইখতিলাতসম্পন্ন' (অর্থাৎ, তারা হাদিস একটির সঙ্গে অপরটি গুলিয়ে ফেলতেন) বলা হয়েছে, তাদের নিয়ে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। গ্রন্থটির নাম الكواكب النيرات في معرفة من ري بالاختلاط من الرواة الثقات (সিকাহ বর্ণনাকারীদের মাঝে যাদের ইখতিলাতসম্পন্ন বলা হয়েছে, তাদের পরিচয় প্রদানে জ্যোতির্ময় তারকামালার সমাবেশ সৃষ্টিকারী গ্রন্থ)।

ইমাম জালালুদ্দিন সুয়তি উসুলুল ফিকহকে কাব্যগ্রন্থ আকারে সংকলন করেছেন এবং তার নাম দিয়েছেন الكوكب الساطع نظم جمع الجوامع (জামউল জাওয়ামي গ্রন্থের কাব্যবিন্যাসে আলোঝলমল তারকার উদয় সৃষ্টিকারী গ্রন্থ)।

ইমাম সুয়ুতির আরেকটি গ্রন্থের নাম البدور السافرة في أمور الآخرة (আখেরাতের বিষয়াবলি আলোচনায় সুস্পষ্ট চাঁদের সমাবেশ সৃষ্টিকারী গ্রন্থ)।

ইমাম শামসুদ্দিন সাফফারিনি (মৃ. ১১৮৮ হি.) তার আকিদা বিষয়ক গ্রন্থের আকর্ষণীয় এক নাম রেখেছেন لوامع الأنوار البهية وسواطع الأسرار الأثرية لشرح الدرة المضية في عقد الفرقة المرضية (الدرة المضية في عقد الفرقة المرضية গ্রন্থের ব্যাখ্যায় মনোরমরূপে আলোকদীপ্ত ও আসারি আকিদার দুর্বোধ্য বিষয়াবলি সুস্পষ্টকারী গ্রন্থ)।

**সমুদ্র-নদী-নালা ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার**
আমাদের ইসলামি সভ্যতায় ইলম ও জ্ঞানের প্রাচর্য-গভীরতা বোঝানোর জন্য 'সমুদ্র' শব্দের ব্যবহার ব্যাপকভাবে প্রচলিত। জীবনচরিতের গ্রন্থাবলিতে বহু আলেম ও মনীষী ব্যক্তিকে 'সমুদ্র' বা এ জাতীয় শব্দ দ্বারা ভূষিত করা হয়েছে। যেমন, 'অমুক ইলমের সমুদ্র' বা 'অমুকের চারপাশ থেকে ইলমের ধারা উৎসারিত হয়'। এ ছাড়াও এ জাতীয় নানান নান্দনিক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন, 'ইলমের প্রস্রবণ' বা 'ইলমের ঝরনা' ইত্যাদি। এ ধরনের প্রাকৃতিক উপমার মাধ্যমে মূলত সেসব বস্তুর গভীরতা ও বিস্তৃতির অর্থটি উপমিত ব্যক্তির মাঝে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। ব্যক্তির পাশাপাশি বিভিন্ন গ্রন্থেও এমন উপমাময় শিরোনাম ব্যবহার করে গ্রন্থের মূল বিষয়কে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। যেমন:

ইমাম ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মাদ হালাবি (মৃ. ৯৫৬ হি.) হানাফি মাজহাব বিষয়ক একটি গ্রন্থ রচনা করেন এবং তার নান্দনিক শিরোনাম দেন : ملتقى الأبحر (সাগরসমূহের মিলনস্থলসদৃশ গ্রন্থ)।

আবদুর রহমান ইবনে মুহাম্মাদ শায়িখ যাদাহ (মৃ. ১০৭৮ হি.) এই গ্রন্থের ব্যাখ্যা করেন এবং তার নাম দেন مجمع الأنهر شرح ملتقى الأبحر (মুলতাকাল আবহুর গ্রন্থের ব্যাখ্যায় নদনদীর সমাবেশসদৃশ গ্রন্থ)।

ইমাম বদরুদ্দিন ইবনে জামাআহ (মৃ. ৭৩৩ হি.) হাদিসশাস্ত্র বিষয়ক যে গ্রন্থ রচনা করেছেন তার নাম রাখেন المنهل الروي في مختصر علوم الحديث النبوي )উলুমুল হাদিসের সংক্ষিপ্তসার প্রচেষ্টায় তৃষ্ণানিবারক ঝরনাসদৃশ গ্রন্থ)।

আবুল মাহাসিন ইউসুফ ইবনে তাগরি বারদি তার সমকালীন মনীষীদের জীবনচরিত সংকলন করে তার নাম দিয়েছেন المنهل الصافي والمستوفى بعد الوافي )ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত গ্রন্থের পর [বৈষয়িক] পরিপূর্ণতাদানকারী ও নির্মল ঝরনাতুল্য গ্রন্থ)।

ইমাম যাইনুদ্দিন ইবনে নুজাইম হানাফি (মৃ. ৯৭০ হি.) হানাফি মাজহাব বিষয়ক গ্রন্থ 'কানযুদ দাকায়িক'-এর ব্যাখ্যা রচনা করে, তার নাম দিয়েছেন البحر الرائق شرح كنز الدقائق )কানযুদ দাকায়িক গ্রন্থের ব্যাখ্যায় নির্মল সমুদ্রতুল্য গ্রন্থ)।

ইমাম আবু হাইয়ান আন্দালুসি কুরআনের তাফসির রচনা করে তার নাম দিয়েছেন البحر المحيط (মহাসাগর)। এই একই নামে ইমাম বদরুদ্দিন যারকাশিও (মৃ. ৭৯৪ হি.) উসুলুল ফিকহের একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন।

শাইখ শানকিতির (মৃ. ১৩৯৩ হি.) তাফসিরগ্রন্থ মুদ্রিত হয়েছে এই নামে العذب النمير من مجالس الشنقيطي في التفسير : তাফসির-মজলিস থেকে প্রাপ্ত স্বচ্ছ, সুমিষ্ট বিষয়াবলি একীভূতকারী গ্রন্থ)।

ইমাম সমরকন্দির একটি তাফসিরগ্রন্থ রয়েছে এই নামে بحر العلوم (ইলমের সাগর)।

**বাগান, ফুল, ফল ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার**

ইমাম ইবনে হিব্বান (মৃ. ৩৫৪ হি.) উপদেশ বিষয়ক ও আল্লাহর প্রতি হৃদয় গলানো-উপযোগী যে গ্রন্থ লিখেছেন তার নাম, روضة العقلاء ونزهة الفضلاء )জ্ঞানীগুণীদের জন্য বাগিচায় বিচরণ ও প্রমোদভ্রমণের অনুভূতি সৃষ্টিকারী গ্রন্থ)।

ইমাম সুহাইলি নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনচরিত ও বৈশিষ্ট্যাবলি সম্পর্কে যে গ্রন্থ রচনা করেছেন তার নাম, الروض الأنف (অবিচরিত বাগান)।

উপদেশমূলক ইবনুল জাওযির একটি গ্রন্থের নাম, بستان الواعظين ورياض السامعين )উপদেশদানকারী এবং উপদেশ শ্রবণকারীদের জন্য বাগানসদৃশ গ্রন্থ)।

নুরি সাম্রাজ্য ও সালাহি সাম্রাজ্যের ইতিহাস নিয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন শিহাবুদ্দিন আবু শামাহ (মৃ. ৬৬৫ হি.)। তিনি সেই গ্রন্থের নাম দিয়েছেন, الروضتين في أخبار الدولتين )দুই সাম্রাজ্যের ইতিবৃত্ত বর্ণনায় দুই বাগিচা সৃষ্টিকারী গ্রন্থ)।

ইমাম নববি (মৃ. ৬৭৬ হি.) রচিত একটি গ্রন্থে তিনি ইসলামি আমলসমূহের ফজিলত ও ইসলামি শিষ্টাচারসমূহ একত্র করার চেষ্টা করেছেন। তার এই গ্রন্থের নাম رياض الصالحين من كلام سيد المرسلين (নবীসর্দারের বাণী উল্লেখে সৎকর্মপরায়ণদের জন্য বহু বাগিচাসমন্বিত গ্রন্থ)।

এ ছাড়া শাফিয়ি মাজহাব বিষয়ে রচিত তার গ্রন্থের নাম, روضة الطالبين وعمدة المفتين )তালেবে ইলমের জন্য বাগানস্বরূপ এবং ফতোয়া প্রদানকারীদের জন্য খুঁটিতুল্য গ্রন্থ)।

আবু আবদুল্লাহ হিময়ারি (সম্ভাব্য মৃ. ৯০০ হি.) ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থ লিখে তার নাম দিয়েছেন, الروض المعطار في خبر الأقطار )অঞ্চলসমূহের ইতিবৃত্ত বর্ণনায় সুবাসিত বাগান সৃষ্টিকারী গ্রন্থ)।

আল্লাহর প্রতি মনগলানো উপদেশভিত্তিক গ্রন্থ রচনা করেছেন ইমাম ইবনুল কাইয়িম জাওযিয়্যাহ। তার গ্রন্থের নাম, روضة المحبين ونزهة المشتاقين )]আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের] প্রেমিকদের জন্য বাগানস্বরূপ ও [তাঁদের প্রতি] উৎসাহীদের জন্য প্রমোদভ্রমণের অনুভূতি সৃষ্টিকারী গ্রন্থ)।

এরূপ আরেকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন ইমাম ইবনুল জাযারি (মৃ. ৮৩৩ হি.), যার নাম (الزهر الفاتح في من تنزه عن الذنوب والقبائح), (যিনি গুনাহ ও মন্দাচার থেকে পবিত্রদের জন্য মুকুলিত পুষ্পের ন্যায় গ্রন্থ)।

খিজির আলাইহিস সালাম সম্পর্কে একটি গ্রন্থ লিখেছেন হাফিজুল হাদিস ইবনে হাজার আসকালানি। গ্রন্থটির নাম (الزهر النضر في أخبار الخضر) (খিজিরের বর্ণনায় সজীব পুষ্পতুল্য গ্রন্থ)।

ইমাম সুযুতি আবু বকর সিদ্দিক রা.-কে নিয়ে যে পুস্তিকা রচনা করেছেন তার নাম, (الروض الأنيق في فضل الصديق) (সিদ্দিকের মর্যাদা বর্ণনায় মনোরম বাগিচা সৃষ্টিকারী পুস্তিকা)।

মরক্কোর মিকনাস শহরের ইতিহাস নিয়ে গ্রন্থ লিখেছেন ইবনে গাজি মিকনাসি (মৃ. ৯১৯ হি.)। তিনি তার নাম দিয়েছেন (الروض الهتون في أخبار مكناسة الزيتون) (মিকনাসা যাইতুনের ইতিহাস রচনায় প্রচুর ফল-ফুলবিশিষ্ট বাগানসদৃশ গ্রন্থ)।

মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াস (মৃ. ৯৩০ হি.) ইতিহাস বিষয়ে যে গ্রন্থ লিখেছেন তার নাম, (بدائع الزهور في وقائع الدهور) (যুগ-যুগের ঘটনা বর্ণনায় অপূর্ব ফুলমালায় পূর্ণ গ্রন্থ)।

আহমাদ মাক্কারি (মৃ. ৭৫৮ হি.) আন্দালুসের ইতিহাসের ওপর গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার নাম, (نفح الطيب من غصن الأندلس الرطيب) (আন্দালুসের তাজা ডালপালা থেকে ছড়ানো সুবাসময় গ্রন্থ)।

হিজরি দ্বাদশ শতাব্দীতে মুহাম্মাদ ইবনে ঈসা ইবনে কান্নান (মৃ. ১১৫৩ হি.) খলিফা ও সুলতানদের রীতিনীতি ও আইনকানুনের ওপর গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার নাম, (حدائق الياسمين في ذكر قوانين الخلفاء والسلاطين) (খলিফা ও সুলতানদের আইনকানুনের উল্লেখে জেসমিন ফুলে সুশোভিত বহু বাগানতুল্য গ্রন্থ)।

মুহাম্মাদ সিদ্দিক খান কনৌজি (মৃ. ১৩০৭ হি.) কর্তৃক রচিত শিয়া যায়দি মাজহাবের ফিকহ বিষয়ক গ্রন্থের নাম, (الروضة الندية شرح الدرر البهية) (দুরারুল বাহিয়্যা গ্রন্থের ব্যাখ্যায় তাজা বাগানসদৃশ গ্রন্থ)।

উস্তাদ সাইয়িদ কুতুব তাফসিরগ্রন্থ রচনা করে তার নাম রাখেন, فى ظلال القرآن (কুরআনের ছায়ায়)।

এরকম অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। এমনকি শিরোনামে নান্দনিকতা চর্চার এই আধিক্য এ কথা প্রমাণ করে যে, ইসলামি জ্ঞানীগুণী সকলে এ ক্ষেত্রে প্রায় সর্বসম্মত মনোভাবের অধিকারী ছিলেন। পাশাপাশি এটি জগদ্বাসী সবার মনে প্রত্যয় সৃষ্টি করে যে, ইসলামি সভ্যতার মনীষীরা সৌন্দর্যচেতনায় ভাস্বর ছিলেন। বস্তুত কুরআন ও সুন্নাহর সৌন্দর্যচেতনার দীপ্তিই তাদের অন্তরকে এ ক্ষেত্রে আলোকিত করে তুলেছিল।

টিকাঃ
২৮০. এখানে শাইখান দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ইমাম বুখারি রহ. ও ইমাম মুসলিম রহ.। মুহাম্মাদ ফুয়াদ আবদুল বাকি রচিত গ্রন্থের নামটির মর্ম হচ্ছে, যে-সমস্ত হাদিস উভয় ইমাম নিজেদের গ্রন্থ তথা বুখারি ও মুসলিমে বর্ণনা করেছেন, সেগুলো চিহ্নিত করে গ্রন্থ রচনা।-সম্পাদক

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00