📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 মুচকি হাসি, উজ্জ্বল চেহারা ও সুন্দর কথা

📄 মুচকি হাসি, উজ্জ্বল চেহারা ও সুন্দর কথা


মুচকি হাসি... গোটা বিশ্বের মানবিক ভাষা। সর্বোচ্চ সৌজন্যবোধের বহিঃপ্রকাশ। গ্রহণীয়তা, স্বচ্ছতা, সহৃদয়তা, মানবিক প্রেম—সবই বোঝানো যায় মুচকি হাসি দিয়ে।

ভাষা-পণ্ডিতদের বক্তব্য অনুযায়ী মুচকি হাসি হলো, হাসির মৃদু প্রকাশ ও চেহারার উজ্জ্বলতা এবং অভ্যন্তরীণ আনন্দের ফলে দাঁত প্রকাশিত হওয়া। কেবল আনন্দের বিষয় বোঝানোর জন্যও শব্দটি ব্যবহৃত হয়। যেমন আল্লাহ তাআলার বাণী, وَجُوهٌ يَوْمَئِذٍ مُسْفِرَةٌ ضَاحِكَةٌ مُسْتَبْشِرَةٌ
অনেক মুখমণ্ডল সেদিন হবে উজ্জ্বল, সহাস্য ও প্রফুল্ল।

উজ্জ্বল ও সহাস্য চেহারা কেবল মানুষেরই হয়ে থাকে, অন্য কোনো প্রাণীর মধ্যে তা পাওয়া যায় না। সুতরাং মুচকি হাসি মানবিক আচরণ ও চরিত্রের অন্যতম সৌন্দর্য।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল মুচকি হাসি; গোটা দিন, গোটা জীবন তিনি মুচকি হেসেছেন। তিনি সবচেয়ে বেশি মুচকি হাসতেন। তাঁর সাহাবিগণের সঙ্গে কৌতুক করতেন, হাস্যরস করতেন, কিন্তু জীবনে কখনো তিনি সত্য ব্যতীত অসত্য বলেননি। আবদুল্লাহ ইবনুল হারিস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

مَا رَأَيْتُ أَحَدًا أَكْثَرَ تَبَسُّمًا مِنْ رَسُولِ اللَّهِ»

আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বেশি মুচকি হাসতে আর কাউকে দেখিনি।

জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

مَا حَجَبَنِي النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُنْذُ أَسْلَمْتُ، وَلَا رَانِي إِلَّا تَبَسَّمَ فِي وَجْهِي

আমি ইসলাম গ্রহণের পর থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো আমাকে তাঁর কাছে আসতে বাধা দেননি। তা ছাড়া যখনই তিনি আমাকে দেখতেন মৃদু মুচকি হাসতেন।

নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অধিকাংশ হাসিই ছিল মুচকি হাসি। তিনি যখন মুচকি হাসতেন, শুভ্র মেঘের দানার মতো (তাঁর দাঁতগুলো) জ্বলজ্বল করত।

এই প্রসঙ্গে ইবনুল কাইয়িম জাওযিয়্যাহ বলেছেন, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অধিকাংশ হাসিই ছিল মুচকি হাসি। বরং সবই ছিল মুচকি হাসি। মাড়ির দাঁত প্রকাশ পাওয়া ছিল তাঁর হাসির চূড়ান্ত। হাসির কিছু ঘটলে তিনি হাসতেন। অর্থাৎ আশ্চর্যজনক কিছু বা দুর্লভ কিছু। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাসির দর্শন বর্ণনা করে ইবনুল কাইয়িম আরও বলেন, হাসির কয়েকটি কারণ রয়েছে। এই গেল একটি। আরেকটি হলো আনন্দের হাসি। আনন্দদায়ক কিছু দেখলে বা আনন্দের সংবাদ শুনলে মানুষ এই হাসি হাসে। তৃতীয় হলো ক্রোধের হাসি। ক্রুদ্ধ ব্যক্তি প্রচণ্ড ক্রোধের সময় এই হাসি হেসে থাকে। এখানে হাসির কারণ হলো ক্রোধের কারণ নিয়ে ক্রুদ্ধ ব্যক্তির বিস্ময়বোধ এবং প্রতিপক্ষের ওপর তার ক্ষমতা অধিক এবং সে তার হাতের মুঠোয় এই অনুভূতি। হাসি এ কারণেও হতে পারে যে, অত্যধিক ক্রোধের সময়ও সে নিজেকে সংযত রাখছে, যে তাকে রাগাচ্ছে তাকে পাত্তা দিচ্ছে না এবং তার প্রতি কোনো মনোযোগই দিচ্ছে না।

এ ব্যাপারটিরই জোরালো সমর্থন লক্ষ করি আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে। তিনি বলেন, كُنْتُ أَمْشِي مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَعَلَيْهِ بُرْدُ نَجْرَانِي غَلِيظُ الْحَاشِيَةِ، فَأَدْرَكَهُ أَعْرَابِيُّ فَجَبَذَ بِرِدَائِهِ جَبْدَةٌ شَدِيدَةٌ، قَالَ أَنَسٌ: فَنَظَرْتُ إِلَى صَفْحَةِ عَاتِقِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَقَدْ أَثَرَتْ بِهَا حَاشِيَةُ الرِّدَاءِ مِنْ شِدَّةِ جَبْدَتِهِ، ثُمَّ قَالَ: يَا مُحَمَّدُ مُرْ لِي مِنْ مَالِ اللَّهِ الَّذِي عِنْدَكَ، فَالْتَفَتَ إِلَيْهِ فَضَحِكَ ثُمَّ أَمَرَ لَهُ بِعَطَاءٍ»

আমি নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে হাঁটছিলাম। তখন তিনি নাজরানে প্রস্তুতকৃত মোটা পাড়ের চাদর পরিহিত ছিলেন। এক গ্রাম্য লোক তাঁকে কাছে পেয়ে তাঁর চাদর ধরে প্রচণ্ড জোরে টান দিলো। আমি লক্ষ করলাম, চাদর জোরে টানার কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাঁধে পাড়ের দাগ বসে গেছে। তারপর বেদুইন বলল, হে মুহাম্মাদ, আল্লাহর যে সম্পদ তোমার কাছে রয়েছে তা থেকে আমাকে কিছু দেওয়ার নির্দেশ দাও। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকটির দিকে তাকিয়ে হাসলেন এবং তাকে কিছু দেওয়ার নির্দেশ দিলেন।

এই মানবিক সৌন্দর্য প্রকাশের ক্ষেত্রে কেবল আদর্শ ব্যক্তি হয়েই ক্ষান্ত থাকেননি নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, বরং তিনি এই ব্যাপারে সবাইকে আহ্বান জানিয়েছেন এবং উৎসাহিত করেছেন। আবু যর গিফারি রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

تَبَسُّمُكَ فِي وَجْهِ أَخِيكَ لَكَ صَدَقَةٌ

তোমার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসাও তোমার জন্য সদকা।

এর অর্থ এই যে, অন্যদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় মুচকি হাসা, চেহারা উজ্জ্বল ও হাস্যময় রাখা। এতে তেমনই পুণ্য রয়েছে, যেমন সদকায় পুণ্য রয়েছে।

এসব সৌজন্যমূলক কাজ খুবই সহজ ও সাধারণ। চিন্তাও করতে হয় না, চেষ্টাও করতে হয় না, কিন্তু তা মানুষের ওপর জাদুকরী প্রভাব ফেলে। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি সৎকাজের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, যা-কিছু আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসুলকে সন্তুষ্ট করে এটিও তার একটি। আবু যর গিফারি রা. আরও বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

لا تَحْقِرَنَّ مِنَ الْمَعْرُوفِ شَيْئًا، وَلَوْ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ بِوَجْهِ طَلْقٍ

কোনো ভালো কাজকে তুচ্ছ মনে করো না, এমনকি তা হাস্যোজ্জ্বল চেহারা নিয়ে তোমার ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলেও। অর্থাৎ সহাস্য, সুন্দর, স্বাভাবিক উজ্জ্বল চেহারা নিয়ে।

মুচকি হাসি ও উজ্জ্বল চেহারা মানুষের হৃদয়ে প্রবেশের প্রথম পথ। এর দ্বারা মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, কল্যাণ ও মমতা ছড়িয়ে দেওয়া যায়। এতে সমাজে নিরাপত্তা, ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক প্রেম অনুভূত হয়। এরকম সমাজই ইসলামে কাম্য ও প্রার্থিত। এর জন্যই শরিয়ত প্রবর্তিত হয়েছে। এসব সাধারণ বিষয়গুলোও ঈমানের অংশ। মুমিন তিনিই, যিনি মানুষের কাছে প্রিয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

الْمُؤْمِنُ يَأْلَفُ وَيُؤْلَفُ، وَلَا خَيْرَ فِيمَنْ لَا يَأْلَفُ وَلَا يُؤْلَفُ، وَخَيْرُ النَّاسِ أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ»

মুমিন তো সে-ই, যে মানুষকে ভালোবাসে এবং মানুষও তাকে ভালোবাসে। যে মানুষকে ভালোবাসে না এবং মানুষ যাকে ভালোবাসে না, তার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই। মানুষের জন্য সবচেয়ে উপকারী ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠ মানুষ।

হাদিসটি কেবল এই ব্যাপারে উৎসাহ জোগাচ্ছে না যে মুমিন সবাইকে ভালোবাসবে এবং সকলের প্রিয় হবে, বরং ভালোবাসার বিপরীত ব্যাপারগুলোকে (হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা) নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, উপর্যুক্ত সৌজন্যমূলক বিষয়গুলো পরিত্যাগ করা ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়, এগুলো বাহুল্যও নয়, বরং জরুরি।

ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী সুন্দর কথাবার্তা সকল মানুষের জন্য হবে এবং সকলের সঙ্গে হবে। আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলকে নির্দেশনাদান করে বলেন, ﴾وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا﴿ - 'মানুষের সঙ্গে সদালাপ করবে'। আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلا يُؤْذِ جَارَهُ، وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ، وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ

যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।

এই হাদিসের টীকায় ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেন, হাদিসটির মূলকথা এই যে, যে লোক ঈমান ধারণ করে সে অবশ্যই আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি মমতাময় হবে, কল্যাণকর কথা বলবে, খারাপ কথা থেকে চুপ থাকবে, উপকারী কাজ করবে, ক্ষতিকর কাজ পরিত্যাগ করবে।

ইমাম ফখরুদ্দিন রাযি قُوْلُوْا لِلنَّاسِ حُسْنًا ﴿ - মানুষের সঙ্গে সদালাপ করবে এ আয়াতের তাফসিরে সদালাপ বা সুন্দর কথাবার্তার সারমর্ম তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন। তিনি দ্বীন ও দুনিয়ার যাবতীয় আদব ও শিষ্টাচারকে এর অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, বিশেষজ্ঞরা বলেন, মানুষের সঙ্গে মানুষের কথাবার্তা হয় দ্বীনি বিষয়ে হবে, নতুবা দুনিয়াবি বিষয়ে হবে। দ্বীনি বিষয়ে কথাবার্তা হলে সেটা হয়তো ঈমানের প্রতি দাওয়াত হবে এবং তা হবে অমুসলিমদের সঙ্গে; অথবা আল্লাহর আনুগত্য ও ইসলাম মানার প্রতি দাওয়াত হবে এবং তা হবে ফাসেকদের (পাপাচারীদের) সঙ্গে।

ঈমানের প্রতি দাওয়াত হলে সেটা অবশ্যই নরম ও সুন্দর কথাবার্তার সঙ্গে হতে হবে। যেমন আল্লাহ তাআলা মুসা ও হারুন আ.-কে নির্দেশ দিয়েছেন,

فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيْنَا لَعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَى

তোমরা তার সঙ্গে নম্র কথা বলবে, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।

আল্লাহ তাআলা তাদের দুইজনকে তাদের মর্যাদা ও মাহাত্ম্য এবং ফেরাউনের চূড়ান্ত কুফরি, ঔদ্ধত্য ও খোদাদ্রোহিতা সত্ত্বেও তার সঙ্গে নম্র-কোমল ভাষায় কথা বলার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেন,

وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ

যদি আপনি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হতেন তবে তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে পড়ত।

ফাসেক ও পাপাচারীদের দাওয়াতের ক্ষেত্রে সুন্দর কথাবার্তা বিবেচ্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, ﴿ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ) আপনি মানুষকে আপনার প্রতিপালকের প্রতি আহ্বান করেন হিকমত ও সদুপদেশের দ্বারা। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,

(ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ )
মন্দ प्रतिহত করুন উৎকৃষ্টের দ্বারা, ফলে আপনার সঙ্গে যার শত্রুতা আছে সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো।

দুনিয়াবি বিষয়ে কথাবার্তা হলে এটা অবশ্যই জানা কথা যে, কোমল ভাষা ও নম্র ব্যবহারের দ্বারা যদি কোনো উদ্দেশ্য বা কাজ হাসিল করা যায় তাহলে ভিন্ন পন্থা অবলম্বন সংগত ও সুন্দর নয়।

তাহলে প্রমাণিত হলো যে, দ্বীন ও দুনিয়ার যাবতীয় আদব ও শিষ্টাচার আল্লাহ তাআলার এই বাণী, ﴾وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا﴿ মানুষের সঙ্গে সদালাপ করবে'-এর অন্তর্ভুক্ত।

এসব শিক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রতিটি মুসলিমকে মুচকি হাসি, চেহারার উজ্জ্বলতা ও উত্তম কথাবার্তা সব ক্ষেত্রেই সুন্দর হতে হবে।

টিকাঃ
২০০. সুরা আবাসা: আয়াত ৩৮-৩৯।
২০১. যুবাইদি, তাজুল আরুস মিন জাওয়াহিরিল কামুস, ( ضحك ) মূল ধাতু, খ. ২৭, পৃ. ২৪৯-২৫০।
২০২. তিরমিযি, কিতাব: আল-মানাকিব, বাব: বাশাশাতুন নাবিয়্যি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হাদিস নং ৩৬৪১। মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ১৭৭৪০।
২০৩. বুখারি, কিতাব: আল-আদাব, বাব: আত-তাবাসসুমু ওয়াদ-দিক্, হাদিস নং ৫৭৩৯; মুসলিম, কিতাব: ফাদায়িলুস সাহাবাহ, বাব: ফাদায়িলু জারির ইবনে আবদুল্লাহ রা., হাদিস নং ২৪৭৫।
২০৪. তিরমিযি, আশ-শামায়িল, পৃ. ২০।
২০৫. ইবনুল কাইয়িম, যাদুল মাআদ, খ. ১, পৃ. ১৮২-১৮৩।
২০৬. বুখারি, কিতাব : আল-খুমুস, বাব : মা কানা লিন-নাবিয়্যি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইয়ুতিল মুআল্লাফাতা কুলুবুহুম..., হাদিস নং ২৯৮০; মুসলিম, কিতাব : আয-যাকাত, বাব: ই'তাউ মান ইয়াসআলু বি-ফুহশিন ও গিলযাহ, হাদিস নং ১০৫৭।
২০৭. তিরমিযি, কিতাব : আল-বিররু ওয়াস-সিলাহ, বাব : সানায়িউল মারুফ, হাদিস নং ১৯৫৬। তিনি বলেছেন, হাদিসটি হাসান গরিব। ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ৪৭৪, ৫২৯। শুআইব আরনাউত বলেছেন, হাদিসটি হাসান। আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস নং ৮৯১।
২০৮. মুবারকপুরি, তুহফাতুল আহওয়াযি বি-শারহি জামিয়িত তিরমিযি, খ. ৬, পৃ. ৭৫-৭৬।
২০৯. মুসলিম, কিতাব : আল-বিররু ওয়াস-সিলাহ, বাব : ইসতিহবাবু তালাকাতিল ওয়াজহি ইনদাল লিকা, হাদিস নং ১৪৪; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ১৫৯৯৭; ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ৪৬৮।
২১০. মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৯১৮৭; হাকিম, হাদিস নং ৫৯।
২১১. সুরা বাকারা: আয়াত ৮৩।
২১২. বুখারি, কিতাব: আল-আদাব, বাব: মান কানা ইয়ুমিনু বিল্লাহি ওয়াল-ইয়াওমিল আখিরি ফালা ইয়ুযি জারাহু, হাদিস নং ৫৬৭২; মুসলিম, কিতাব: আল-ঈমান, বাব: আল-হাসসু আলা ইকরামিল জার ওয়াদ-দায়ফ ওয়া লুযুমিস সামতি, হাদিস নং ৪৭।
২১৩. ইবনে হাজার, ফাতহুল বারি, খ. ১০, পৃ. ৪৪৬।
২১৪. সুরা বাকারা: আয়াত ৮৩।
২১৫. সুরা তহা: আয়াত ৪৪।
২১৬. সুরা আলে ইমরান: আয়াত ১৫৯।
২১৭. যাবতীয় বিষয়কে যথার্থ জ্ঞানের দ্বারা জানাকে হিকমত বলে।-অনুবাদক
২১৮. সুরা নাহল: আয়াত ১২৫।
২১৯. সুরা ফুসসিলাত: আয়াত ৩৪।
২২০. সুরা বাকারা: আয়াত ৮৩।
২২১. ফখরুদ্দিন রাযি, আত-তাফসিরুল কাবির, খ. ৩, পৃ. ৫৬৮।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 স্বচ্ছ মন ও মানবপ্রেম

📄 স্বচ্ছ মন ও মানবপ্রেম


মুচকি হাসি, চেহারার খোশভাব ও কোমল কথাবার্তার নির্দেশনাদানের ক্ষেত্রে ইসলাম একটি বিষয়ের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। তা এই যে, এসব কাজ হতে হবে অন্তরের অন্তস্তল থেকে; লৌকিকতা, অভিনয়, ভণিতা বা কপটতাবশত নয়।

এখানেই অন্যান্য সবকিছু থেকে ইসলাম ও তার শিক্ষা ব্যতিক্রম। কারণ তা কোনো লাভজনক সংস্থা বা কোম্পানি নয় যে, বেশি বেশি ক্লায়েন্ট (খরিদ্দার) পাওয়ার চেষ্টায় এসব করে। ইসলাম বরং মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সৌহার্দ্য ও কল্যাণ ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়েছে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের জানিয়েছেন যে, যার মন পরিষ্কার, অন্তর স্বচ্ছ সে শ্রেষ্ঠ মানুষ। আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে নিম্নরূপ হাদিস বর্ণিত হয়েছে,

قِيلَ لِرَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَيُّ النَّاسِ أَفْضَلُ؟ قَالَ: كُلُّ مَخْمُومِ الْقَلْبِ صَدُوقِ اللَّسَانِ. قَالُوا: صَدُوْقُ اللَّسَانِ نَعْرِفُهُ فَمَا تَخْمُومُ الْقَلْبِ؟ قَالَ: هُوَ النَّقِيُّ التَّقِيُّ لَا إِثْمَ عَلَيْهِ وَلَا بَغْيَ وَلَا غِلَّ وَلَا حَسَدَ»

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো, কোন মানুষ উত্তম? তিনি বললেন, প্রত্যেক এমন ব্যক্তি যার অন্তর নিষ্কলুষ এবং যে সত্যভাষী। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আমরা তো 'সত্যভাষী' বুঝি, কিন্তু 'নিষ্কলুষ অন্তর' কী? তিনি বললেন, নির্মল ও পবিত্র অন্তঃকরণ, যা পাপ করেনি, জুলুম করেনি ও যা হিংসা- বিদ্বেষ হতে মুক্ত।

নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা মানুষকে ক্ষমা করে দেবেন, তবে তাকে নয় যার অন্তরে তার ভাইয়ের প্রতি বিদ্বেষ ও শত্রুতা রয়েছে। কারণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানিয়ে দিয়েছেন,

تُفْتَحُ أَبْوَابُ الجَنَّةِ يَوْمَ الاثْنَيْنِ وَيَوْمَ الْخَمْيِسِ، فَيُغْفَرُ لِكُلِّ عَبْدٍ لَا يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيًْا، إِلَّا رَجُلاً كَانَتْ بينَهُ وَبَيْنَ أَخِيهِ شَحْنَاءُ، فَيُقَالُ: أَنْظِرُوا هُذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا أَنْظِرُوا هُذَينِ حَتَّى يَصْطَلِحَا»

প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়। এমন প্রত্যেক বান্দাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়, যে আল্লাহর সাথে কোনোকিছু শরিক করে না। কিন্তু এমন ব্যক্তিকে নয়, যার ভাই ও তার মধ্যে শত্রুতা বিদ্যমান। এরপর বলা হয়, এই দুজনকে আপস করার অবকাশ দাও, এই দুজনকে আপস করার অবকাশ দাও।

এমনকি যাদের মন স্বচ্ছ, অন্তর পবিত্র তারাই সবার আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

«أَوَّلُ زُمْرَةٍ تَلِجُ الْجَنَّةَ صُورَتُهُمْ عَلَى صُورَةِ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ، لَا يَبْصُقُونَ فِيهَا وَلَا يَمْتَخِطُونَ وَلَا يَتَغَوَّطُونَ، أَنِيَتُهُمْ فِيهَا الذَّهَبُ أَمْشَاطُهُمْ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ، وَتَجَامِرُهُمُ الْأَلُوَّةُ، وَرَشْحُهُمُ الْمِسْكُ، وَلِكُلِّ وَاحِدٍ مِنْهُمْ زَوْجَتَانِ، يُرَى مُخُ سُوقِهِمَا مِنْ وَرَاءِ اللَّحْمِ مِنَ الْحُسْنِ، لَا اخْتِلافَ بَيْنَهُمْ وَلَا تَبَاغُضَ، قُلُوبُهُمْ قَلْبٌ وَاحِدٌ، يُسَبِّحُونَ اللهَ بُكْرَةً وَعَشِيًّا»

জান্নাতে প্রথম যে দল প্রবেশ করবে তাদের চেহারা পূর্ণিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বল হবে। তারা সেখানে থুথু ফেলবে না, নাক ঝাড়বে না এবং পায়খানা করবে না। সেখানে তাদের পাত্র হবে সোনার, তাদের চিরুনি হবে সোনা ও রুপার, তাদের ধূপদানিতে থাকবে সুগন্ধ কাঠ। তাদের গায়ের ঘাম হবে মিশকের মতো সুবাসিত। তাদের প্রত্যেকের জন্য থাকবে দুজন স্ত্রী, সৌন্দর্যের ফলে গোশতের পেছনে তাদের পায়ের নলার হাড়ের মজ্জা পর্যন্ত দেখা যাবে। তাদের মধ্যে কোনো মতবিরোধ থাকবে না, কোনো শত্রুতা বা বিদ্বেষ থাকবে না। তাদের সকলের হৃদয় হবে একটিমাত্র হৃদয়। সকাল-সন্ধ্যায় তারা আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করবে।

মানুষের প্রতি কুধারণা থেকে মনকে পবিত্র রাখতে হবে। কারণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন,

إِيَّاكُمْ وَالظَّنَّ؛ فَإِنَّ الظَّنَّ أَكْذَبُ الْحَدِيثِ، وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا تَحَسَّسُوا وَلا تَبَاغَضُوا، وَكُونُوا إِخْوَانًا»

তোমরা ধারণা করা থেকে বেঁচে থাকো, কারণ ধারণাই সবচেয়ে বড় মিথ্যা। তোমরা অপরের গোয়েন্দাগিরি করো না, কারও পেছনে লেগো না এবং পরস্পর শত্রুতা পোষণ করো না। তোমরা পরস্পর ভাই হয়ে থেকো।

সৃষ্টিজগতের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার যে ফিতরাত তা এই যে, তিনি সবকিছু সৌন্দর্যের ওপর ভিত্তি করে সৃষ্টি করেছেন। সৌন্দর্যের অন্যতম দিক হলো মনের স্বচ্ছতা ও পবিত্রতা।

صنْعَ اللَّهِ الَّذِي أَتْقَنَ كُلَّ شَيْءٍ

এটাই আল্লাহর সৃষ্টি-নৈপুণ্য, যিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন সুষম। এ কারণেই মনের মধ্যে যদি হিংসা-বিদ্বেষ-কলুষতা থাকে তাহলে তা মনকে ক্লান্ত করে দেয়।

ইমাম ইবনে হাযম রহ. এ ব্যাপারটিই পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং বিস্মিত হয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমি অধিকাংশ মানুষকে দেখেছি—তবে আল্লাহ যাদের রক্ষা করেন তাদের কথা ভিন্ন এবং তাদের সংখ্যা খুব কম-দুনিয়াতে তারা নিজেদের জন্য অনিষ্ট, দুশ্চিন্তা ও ক্লান্তি ত্বরান্বিত করে এবং এমন বড় বড় পাপ করে, যার ফলে আখেরাতে জাহান্নামের আগুন আবশ্যক হয়ে পড়ে, অথচ এগুলোর দ্বারা তারা মূলত কোনো উপকারই লাভ করতে পারে না। তাদের নিয়ত ও মনোবাসনা অত্যন্ত খারাপ; মানুষের জন্য তারা ধ্বংসাত্মক মূল্যবৃদ্ধি কামনা করে, এমনকি ছোটদের জন্যও, যাদের কোনো অপরাধ নেই তাদের জন্যও; তারা যাদের অপছন্দ করে তাদের জন্য কামনা করে ভয়াবহ বিপদ। অথচ তারা নিশ্চিতভাবেই জানে যে, তাদের কুৎসিত মনোবাসনা তারা যা চাচ্ছে তার কিছুই এনে দেবে না অথবা তার 'ঘটা' অবশ্যম্ভাবী করে তুলবে না। যদি তারা তাদের নিয়ত পরিশুদ্ধ করত, তাদের মনোবাসনা হতো চমৎকার, তাহলে তারা মনে শান্তি পেত, অন্তরে স্বস্তি আসত। এর ফলে তারা ভালো ভালো কাজ করারও সুযোগ পেত। সৎকাজের জন্য উত্তম প্রতিদানও পরকালের জন্য তুলে রাখতে পারত। যদিও তা তাদের কাঙ্ক্ষিত কোনো বিষয়ে পিছিয়ে দিত না এবং তার 'ঘটা'-কে বাধাগ্রস্ত করত না। এই যে অবস্থার ব্যাপারে আমাদের সতর্ক করা হয়েছে তার চেয়ে বড় ক্ষতি ও লোকসান আর কী হতে পারে এবং যার প্রতি আমাদের আহ্বান জানানো হয়েছে তার চেয়ে বড় কল্যাণ ও সৌভাগ্য কী হতে পারে!

মনের স্বচ্ছতার চেয়েও মহৎ ব্যাপার হলো... মানুষের প্রতি ভালোবাসা বা মানবপ্রেম। তা আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যক্তিত্বের মধ্যে প্রত্যক্ষ করি, মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসার স্থান ছিল হৃদয়ের স্বচ্ছতারও উপরে। তাঁর অলংকারপূর্ণ ভাষায় এই ভালোবাসার আকুতি প্রকাশ পেয়েছে; তিনি নিজের ও তাঁর দাওয়াতের প্রেক্ষিতে মানুষের অবস্থান তুলে ধরেছেন চমকপ্রদ ভাষায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

إِنَّمَا مَثَلِي وَمَثَلُ النَّاسِ كَمَثَلِ رَجُلٍ اسْتَوْقَدَ نَارًا، فَلَمَّا أَضَاءَتْ مَا حَوْلَهُ جَعَلَ الْفَرَاشُ وَهُذِهِ الدَّوَابُّ الَّتِي تَقَعُ فِي النَّارِ يَقَعْنَ فِيهَا، فَجَعَلَ يَنْزِعُهُنَّ وَيَغْلِبْنَهُ فَيَقْتَحِمْنَ فِيهَا، فَأَنَا أَخُذُ بِحُجَزِكُمْ عَنِ النَّارِ وَهُمْ يَقْتَحِمُونَ فِيهَا

আমার ও লোকদের দৃষ্টান্ত এমন ব্যক্তির মতো যে আগুন জ্বালাল, ফলে চারদিক আলোকিত হয়ে উঠল, তখন পতঙ্গ ও যেসব প্রাণী আগুনে পড়ে সেগুলো তাতে পড়তে লাগল। ওই লোক তখন পতঙ্গ ও প্রাণীদের আগুন থেকে বাঁচানোর জন্য টানতে লাগল। কিন্তু সেগুলো লোকটিকে পরাজিত করে দিয়ে আগুনে পুড়ে মরল। আমি তোমাদের কোমরে ধরে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি, অথচ তারা তাতেই ঝাঁপিয়ে পড়ছে।

হৃদয়ে প্রভাব-সঞ্চারী এক চিত্র! যেন তা এক যুদ্ধ... এই যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষকে প্রতিহত করছেন আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়া থেকে; কিন্তু তারা তাঁকে পরাস্ত করে, তাঁকে ডিঙিয়ে গিয়ে আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ছে।

এটা কেবল দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া নয়, কেবল দায়িত্বপালন নয়, কেবল কল্যাণকামনা নয়... এটা যুদ্ধ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চেষ্টা করে যাচ্ছেন, মানুষের কোমর ধরে রেখেছেন, কিছু মানুষ তাঁকে পরাস্ত করে আগুনে পতিত হচ্ছে।

ইমাম বুখারি নিম্নবর্ণিত হাদিস বর্ণনা করেছেন,

أنه كانَ غُلامُ يَهُودِيُّ يَخْدُمُ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، فَمَرِضَ، فَأَتَاهُ النبي صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَعُودُهُ، فَقَعَدَ عِنْدَ رَأْسِهِ فَقَالَ لَهُ: أَسْلِمْ. فَنَظَرَ إِلَى أَبِيهِ وَهُوَ عِنْدَهُ، فَقَالَ لَهُ: أَطِعْ أَبَا الْقَاسِمِ. فَأَسْلَمَ، فَخَرَجَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ يَقُولُ: "الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَنْقَذَهُ مِنَ النَّارِ»

এক ইহুদি বালক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমত করত। সে একবার অসুস্থ হয়ে পড়ল। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে দেখার জন্য এলেন। তিনি বালকটির শিয়রে বসলেন এবং বললেন, তুমি ইসলাম গ্রহণ করো। বালকটি তার বাবার দিকে তাকাল, সে কাছেই ছিল। বাবা বলল, আবুল কাসিম যা বলছেন তা শোনো। ফলে বালকটি ইসলাম গ্রহণ করল। তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেরিয়ে এলেন এ কথা বলতে বলতে যে, সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করেছেন।

কত মহান এই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!! ওহুদের যুদ্ধি তিনি আহত হলেন, আহত হয়ে নিজের মুখমণ্ডল থেকে রক্ত মুছছিলেন এবং বলছিলেন,

رَبِّ اغْفِرْ لِقَوْنِي فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ

হে আমার প্রতিপালক, আমার কওমকে ক্ষমা করে দাও। কারণ তারা অজ্ঞ।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে সবচেয়ে ভয়াবহ দিনটিতে যা ঘটেছিল তা এই যে, তিনি মানুষের (কাফেরদের) ওপর তাদের নিজেদের চেয়েও বেশি মমতাশীল ও দয়াপরায়ণ ছিলেন। আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, ওহুদ যুদ্ধের চেয়ে কঠিন দিন কি আপনার জীবনে কখনো এসেছিল? তিনি যা বললেন তা নিম্নরূপ-

لَقَدْ لَقِيتُ مِنْ قَوْمِكِ مَا لَقِيتُ، وَكَانَ أَشَدَّ مَا لَقِيتُ مِنْهُمْ يَوْمَ الْعَقَبَةِ إِذْ عَرَضْتُ نَفْسِي عَلَى ابْنِ عَبْدِ يَالِيلَ بْنِ عَبْدِ كُلالٍ فَلَمْ يُجِبْنِي إِلَى مَا أَرَدْتُ، فَانْطَلَقْتُ وَأَنَا مَهْمُومٌ عَلَى وَجْهِي فَلَمْ أَسْتَفِقْ إِلَّا وَأَنَا بِقَرْنِ التّعَالِبِ، فَرَفَعْتُ رَأْسِي فَإِذَا أَنَا بِسَحَابَةٍ قَدْ أَظَلَّتْنِي، فَنَظَرْتُ فَإِذَا فِيهَا جِبْرِيلُ فَنَادَانِي فَقَالَ: إِنَّ اللهَ قَدْ سَمِعَ قَوْلَ قَوْمِكَ لَكَ وَمَا رَدُّوا عَلَيْكَ، وَقَدْ بَعَثَ إِلَيْكَ مَلَكَ الْجِبَالِ لِتَأْمُرَهُ بِمَا شِئْتَ فِيهِمْ. فَنَادَانِي مَلَكُ الْجِبَالِ فَسَلَّمَ عَلَيَّ، ثُمَّ قَالَ: يَا مُحَمَّدُ. فَقَالَ: ذُلِكَ فِيمَا شِئْتَ، إِنْ شِئْتَ أَنْ أُطْبِقَ عَلَيْهِمُ الْأَخْشَبَيْنِ. فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: بَلْ أَرْجُو أَنْ يُخْرِجَ اللَّهُ مِنْ أَصْلَابِهِمْ مَنْ يَعْبُدُ اللَّهَ وَحْدَهُ لَا يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا

আমি তোমার কওম থেকে যে বিপদের সম্মুখীন হয়েছি তা তো হয়েছিই। তাদের থেকে সবচেয়ে কঠিন বিপদের মুখোমুখি হয়েছি আকাবার দিন, যখন আমি নিজেকে ইবনে আবদে ইয়ালিল ইবনে আবদে কালালের কাছে পেশ করেছিলাম। আমি যা চেয়েছিলাম সে ব্যাপারে সে আমাকে সাড়া দেয়নি। ফলে বিষণ্ণ চেহারা নিয়ে ফিরে এলাম, কারনুস সাআলিব পর্যন্ত পৌঁছার আগে আমার দুশ্চিন্তা লাঘব হয়নি। এখানে এসে আমি আমার মাথা উপরের দিকে তুললাম, হঠাৎ দেখতে পেলাম এক খণ্ড মেঘ আমাকে ছায়া দিচ্ছে। আমি সেদিকে তাকালাম, দেখলাম তার মধ্যে জিবরাইল আ.। তিনি আমাকে ডেকে বললেন, আপনার কওম আপনাকে যা বলেছে এবং আপনার নিবেদনের প্রেক্ষিতে তারা যে প্রত্যুত্তর দিয়েছে নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তা শুনেছেন। তিনি আপনার কাছে পাহাড়ের (দায়িত্বে নিযুক্ত) ফেরেশতা পাঠিয়েছেন। এদের ব্যাপারে আপনার মন যা চায় আপনি এই ফেরেশতাকে নির্দেশ দিতে পারেন। তখন পাহাড়ের ফেরেশতা আমাকে ডাকলেন এবং আমাকে সালাম দিলেন। তারপর বললেন, হে মুহাম্মাদ, আপনি যা চাইবেন তা-ই হবে। আপনি চাইলে আমি এদের ওপর আখশাবাইন চাপিয়ে দেবো। জবাবে নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, (না, তা হতে পারে না) বরং আমি আশা করি, আল্লাহ তাদের থেকে এমন জাতি তৈরি করবেন যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মমতা কেবল মানুষের প্রতি নয়, অন্য প্রাণীদের প্রতিও ছিল। যা-কিছুর মধ্যে প্রাণ রয়েছে তার সেবা করাও যে ভালো কাজ তার দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গিয়েছেন। আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

بَيْنَا رَجُلٌ بِطَرِيقِ اشْتَدَّ عَلَيْهِ الْعَطَشُ فَوَجَدَ بِثْرًا، فَنَزَلَ فِيهَا فَشَرِبَ، ثُمَّ خَرَجَ فَإِذَا كُلْبُ يَلْهَثْ يَأْكُلُ الثَّرَى مِنَ الْعَطَشِ، فَقَالَ الرَّجُلُ: لَقَدْ بَلَغَ هُذَا الْكَلْبَ مِنَ الْعَطَشِ مِثْلُ الَّذِي كَانَ بَلَغَ مِنِّي. فَنَزَلَ الْبِثْرَ فَمَلا خُفَّهُ مَاءً فَسَقَى الْكَلْبَ، فَشَكَرَ اللهُ لَهُ فَغَفَرَ لَهُ. قالوا: يَا رَسُولَ اللهِ، وإن لنا في البهائم لأجرا؟ فقال: " فِي كُلِّ ذَاتِ كَبِدٍ رَطْبَةٍ أَجْرُ»

একদিন এক লোক চলার পথে প্রচণ্ড পিপাসার্ত হলো। একটি কূপ দেখতে পেয়ে সে তাতে নেমে পড়ল এবং পানি পান করল। লোকটি উপরে উঠে এসে দেখতে পেল, একটি কুকুর হাঁপাচ্ছে এবং পিপাসার কারণে ভেজা মাটি চেটে খাচ্ছে। তখন (মনে মনে) লোকটি বলল, এ কুকুরটির তেমনই পিপাসা পেয়েছে যেমনটা আমার পেয়েছিল। সে আবার কূপের মধ্যে নামল এবং তার মোজা ভরতি করে পানি এনে কুকুরটিকে পান করালো। আল্লাহ লোকটির এই কাজ কবুল করে নেন এবং তাকে ক্ষমা করে দেন। সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, পশুদের ব্যাপারেও কি আমাদের জন্য সওয়াব রয়েছে? তিনি বললেন, প্রাণিমাত্রের সেবার মধ্যেই সওয়াব রয়েছে।

এ সকল শিক্ষা ও নির্দেশনার মধ্য দিয়ে ইসলাম অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য নির্মাণ করেছে। মানুষের মধ্যে একদলকে করে তুলেছে সহৃদয়, মমতাময়, সজীব-কোমল মৃদু বাতাসের মতো; কেবল মুসলিমদের জন্য নয়, মানুষের জন্য নয়, বরং গোটা জীবজগতের জন্য।

টিকাঃ
২২২. ইবনে মাজাহ, কিতাব আয-যুহদ, বাব: আল-ওয়ারা ওয়াত-তাকওয়া, হাদিস নং ৪২১৬।
২২৩. মুসলিম, কিতাব: আল-বিররু ওয়াস-সিলাহ ওয়াল-আদাব, বাব: আন-নাহয় আনিশ শাহনা ওয়াত-তাহাজুর, হাদিস নং ২৫৬৫।
২২৪. বুখারি, কিতাব: বাদউল খালকি, বাব: সিফাতুল জান্নাতি ওয়া আন্নাহা মাখলুকাহ, হাদিস নং ৩০৭৩; মুসলিম, কিতাব: আল-জান্নাতু ওয়া সিফাতু নাইমিহা ও আহলিহা, বাব: আওয়ালু ঘুমরাতিন তাদখুলুল জান্নাতা আলা সুরাতিল কামার লাইলাতাল বাদ্‌দ্র.... হাদিস নং ২৮৩৪।
২২৫. বুখারি, কিতাব: আল-আদাব, বাব: মা ইয়ুনহা আনিত-তাহাসুদি ওয়াত-তাদাবুর, হাদিস নং ৫৭১৭; মুসলিম, কিতাব: আল-বিররু ওয়াস-সিলাহ ওয়াল-আদাব, বাব: তাহরিমুয যান্ন ওয়াত-তাজাসসুস ওয়াত-তানাফুস ওয়াত-তানাজুশ ওয়া নাহবিহা, হাদিস নং ২৫৬৩।
২২৬. সুরা নামল: আয়াত ৮৮।
২২৭. জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গিয়ে দুর্ভিক্ষে মরুক!-অনুবাদক
২২৮. ইবনে হায্য, রাসায়িলু ইবনে হায্য, খ. ১, পৃ. ৩৪১-৩৪২।
২২৯. বুখারি, কিতাব : আর-রিকাক, বাব : আল-ইনতিহা আনিল-মাআসি, হাদিস নং ৬১১৮; মুসলিম, কিতাব: আল-ফাদায়িল, বাব: শাফকাতুহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলা উম্মাতিহি ওয়া মুবালাগাতুহু ফি তাহযিরিহিম মিম্মা ইয়াদুররুহুম, হাদিস নং ২২৮৪।
২৩০. বুখারি, কিতাব: আল-জানায়িয, বাব: ইযা আসলামাস সাবিয়্যু ফামাতা হাল ইয়ুসাল্লা আলাইহি ওয়া হাল ইয়ুরাদু আলাস-সাবিয়্যিল ইসলাম, হাদিস নং ১২৯০।
২৩১. বুখারি, কিতাব: ইসতিতাবাতুল মুরতাদ্দিন ওয়াল-মুআনিদিন ওয়া কিতালুহুম, বাব: ইযা আররাদায যিম্মিয়্যু বি-সাব্বিন নাবিয়্যি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওয়া লাম ইয়ুসাররিহ, হাদিস নং ৬৫৩০; মুসলিম, আল-জিহাদ ওয়াস-সিয়ার, বাব : গাযওয়াতু উহুদ, হাদিস নং ১৭৯২।
২৩২. বুখারি, কিতাব : বাদউল খাল্ক, বাব: ইযা কালা আহাদুকুম আমিন ওয়াল-মালায়িকাতু ফিস- সামা ফাওয়াফাকাত ইহদাহুমাল উখরা, হাদিস নং ৩০৫৯; মুসলিম, কিতাব : আল-জিহাদ ওয়াস-সিয়ার, বাব : মা লাকিয়ান নাবিয়্যা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিন আযাল-মুশরিকিন ওয়াল-মুনাফিকিন, হাদিস নং ১৭৯৫।
২৩৩. বুখারি, কিতাব : আল-মাযালিম, বাব : আল-আবারু আলাত-তুরুকি ইযা লাম ইয়ুতাআযযা বিহা, হাদিস নং ২৩৩৪।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 উত্তম চরিত্র

📄 উত্তম চরিত্র


উত্তম চরিত্র এমন একটি গুণ, মানবজাতি যার অনুসন্ধানে বহু যুগ ব্যয় করেছে; প্রাচীন দার্শনিকদের বিকাশকাল থেকেই উত্তম চরিত্রের পিছু ছুটেছে মানবজাতি এবং তাদের মনে হয়েছে যে তারা এই গুণটির গলায় লাগাম পরিয়ে ফেলতে পেরেছে। তারা লিখেছে পবিত্র নগর (Virtuous City) ও এরকম অন্যান্য কল্পিত জিনিস সম্পর্কে। পরে তাদের মনে হয়েছে যে এগুলো দুঃস্বপ্ন ছাড়া কিছু নয়। ফলে বর্তমান বিশ্ব এই গুণটির নাম দিয়েছে 'মানবতা'।

পাশ্চাত্য অর্থে 'মানবতা' ইসলামি অভিধানে 'রহমত' বা 'দয়া' বলতে যা বোঝায় তার কাছাকাছি। আর ইসলামে 'দয়া' তার সবদিক নিয়ে উত্তম চরিত্রের একটি অংশমাত্র। কারণ উত্তম চরিত্র কথাটি 'দয়া' থেকে অত্যন্ত ব্যাপক। ধৈর্য, কষ্টসহিষ্ণুতা সত্যের সমর্থন সবই উত্তম চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত। হারিস মুহাসিবি রহ. বলেছেন, উত্তম চরিত্রের নিদর্শন হলো আল্লাহর ওয়াস্তে কষ্টসহিষ্ণুতা অবলম্বন করা, ক্রোধ সংবরণ করা, সত্যনিষ্ঠদের সত্যের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা, ক্ষমা করা এবং ভুলপথ এড়িয়ে চলা।

ইমাম গাযালি রহ. বলেছেন, উত্তম চরিত্র কষ্ট প্রতিহত করা নয়, বরং কষ্ট সহ্য করা।

আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুলের প্রশংসা করেছেন তাঁর উত্তম চরিত্রের কারণে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ
নিশ্চয় আপনি মহৎ চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত।

নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলিমদের মধ্যে উত্তম চরিত্রকে ঈমানের তফাত ও কমবেশির মানদণ্ড নির্ধারণ করেছেন; অর্থাৎ যার চরিত্র সবচেয়ে ভালো তার ঈমানই পরিপূর্ণ। ইমাম বাযযার আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

إِنَّ أَكْمَلَ الْمُؤْمِنِينَ إِيْمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا، وَإِنَّ حُسْنَ الْخُلُقِ لَيَبْلُغُ دَرَجَةَ الصَّوْمِ وَالصَّلاةِ

ঈমানের দিক থেকে পরিপূর্ণ মুমিন সেই ব্যক্তি যার চরিত্র উত্তম। উত্তম চরিত্রের মর্যাদা নামায ও রোযার মর্যাদার পর্যায়ে পৌছে।

এ কারনেই কিয়ামতের দিন এমন ব্যক্তিরাই নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সবচেয়ে প্রিয় হবে এবং মজলিসে তাঁর সবচেয়ে কাছে বসবে যাদের চরিত্র উত্তম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

إِنَّ مِنْ أَحَبِّكُمْ إِلَيَّ وَأَقْرَبِكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَحَاسِنَكُمْ أَخْلاقا»

তোমাদের মধ্যে যাদের চরিত্র উত্তম তারাই কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে প্রিয় হবে এবং আমার সবচেয়ে কাছে বসবে।

কিয়ামতের দিন মিযানের পাল্লায় উত্তম চরিত্র সবকিছুর চেয়ে ওজনে ভারী হবে,

مَا مِنْ شَيْءٍ يُوضَعُ فِي الْمِيزَانِ أَثْقَلُ مِنْ حُسْنِ الْخُلُقِ

কিয়ামতের দিন মিযানের পাল্লায় সবচেয়ে ভারী বস্তুটি হবে উত্তম চরিত্র।

উত্তম চরিত্র মানুষকে সবচেয়ে বেশি জান্নাতে নিয়ে যাবে,

أَكْثُرُ مَا يُدْخِلُ النَّاسَ الْجَنَّةَ تَقْوَى اللَّهِ وَحُسْنُ الْخُلُقِ، وَأَكْثُرُ مَا يُدْخِلُ النَّاسَ النَّارَ الْفَمُ وَالْفَرَجُ

আল্লাহভীতি ও উত্তম চরিত্র এই দুটি জিনিস মানুষকে সবচেয়ে বেশি জান্নাতে নিয়ে যাবে। মানুষকে সবচেয়ে বেশি জাহান্নামে নিয়ে যাবে দুটি জিনিস জিহ্বা ও লজ্জাস্থান।

বরং নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়াতে তাঁর দায়িত্ব কী তার সংক্ষিপ্তসার তুলে ধরেছেন এই হাদিসে,

«إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ»

আমি উত্তম চরিত্রের পরিপূর্ণতাদানের জন্য প্রেরিত হয়েছি।

যে রিসালাত জীবনেতিহাসের মধ্য দিয়ে তার পথরেখা অঙ্কন করেছে, যে রিসালাতের অধিকারী তার আলো ছড়িয়ে দিতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা ব্যয় করেছেন এবং সেই আলোর চারপাশে মানুষকে সমবেত করেছেন, তা মানুষের চারিত্রিক গুণাবলিকে শক্তিশালী করতে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে, তাদের চোখের সামনে পরিপূর্ণতার দিগন্তকে আলোকিত করে তুলেছে, যাতে তারা নিজেদের বুদ্ধিমত্তা ও দূরদৃষ্টির দ্বারা সেদিকে ধাবিত হতে পারে।

চরিত্রের সৌন্দর্য হলো যা জীবনকে নান্দনিকতায় রঙিন করে তোলে এবং যেখানে মানুষের সঙ্গে আচারব্যবহারের ভিত্তি হয় দয়া, সততা ও কল্যাণ। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই ইসলামের আবির্ভাব ঘটেছে। এই পথে চলতে গিয়েই নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কষ্ট ও যন্ত্রণা স্বীকার করেছেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন। চরিত্রের সৌন্দর্য রক্ষার্থেই ফরয বিধান ফরয করা হয়েছে এবং সুন্নত বিধানগুলো সুন্নত করা হয়েছে।

যেসব অকাট্য দলিল এই তাৎপর্য ব্যক্ত করেছে তার কয়েকটি নিম্নরূপ:

إِنَّ الصَّلاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ

নিশ্চয় নামায অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখে।

خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةٌ تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا

তাদের সম্পদ থেকে সদকা (যাকাত) গ্রহণ করবে। এর দ্বারা তুমি তাদের পবিত্র করবে এবং পরিশোধিত করবে।

كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

তোমাদের ওপর রোযা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর। যাতে তোমরা খোদাভীতি অবলম্বন করতে পারো।

مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ، فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةً فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ

যে লোক (রোযা রাখা অবস্থায়) মিথ্যা কথা ও মিথ্যা কাজ ছাড়েনি, তার খানাপিনা ছেড়ে দেওয়ায় আল্লাহ তাআলার কোনো প্রয়োজন নেই।

فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِي الْحَجِّ

তার জন্য হজের সময় স্ত্রী-সম্ভোগ, অন্যায় আচরণ ও কলহবিবাদ সংগত নয়।

আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

قَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللهِ إِنَّ فُلَانَةً تُذكَرُ مِنْ كَثْرَةِ صَلَاتِهَا وَصِيَامِهَا وَصَدَقَتِهَا غَيْرَ أَنَّهَا تُؤْذِي جِيرَانَهَا بِلِسَانِهَا. قَالَ: هِيَ فِي النَّارِ. قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ فَإِنَّ فُلَانَةً تُذْكَرُ قِلَّةَ صِيَامِهَا وَصَدَقَتِهَا وَصَلَاتِهَا وَإِنَّهَا تَصَدَّقُ بِالْأَنْوَارِ مِنَ الْأَقِطِ وَلَا تؤذي جِيرَانَهَا. قَالَ: هِيَ فِي الْجَنَّةِ»

একবার জনৈক লোক বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ, অমুক মহিলা অধিক নামায পড়া, রোযা রাখা ও দান-সদকা করার ব্যাপারে খ্যাতি লাভ করেছে। তবে সে তার মুখের দ্বারা তার প্রতিবেশীদের কষ্ট দেয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সে জাহান্নামি। লোকটি পুনরায় বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ, অমুক মহিলা-যার সম্পর্কে জনশ্রুতি আছে যে, সে কম রোযা রাখে, দান-সদকাও কম করে এবং নামাযও কম পড়ে। তার দানের পরিমাণ হলো পনিরের টুকরো বিশেষ। তবে সে তার মুখের দ্বারা আপন প্রতিবেশীদের কষ্ট দেয় না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সে জান্নাতি।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

لَيْسَ الصِّيَامُ مِنَ الأَكْلِ وَالشَّرْبِ، إِنَّمَا الصِّيَامُ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ، فَإِنْ سَابَّكَ أَحَدٌ، أَوْ جَهِلَ عَلَيْكَ، فَقُلْ: إِنِّي صَائِمٌ، إِنِّي صَائِمٌ»

পোনাহার ত্যাগ করা প্রকৃত রোযা নয়, প্রকৃত রোযা হলো অনর্থক কাজ ও অশ্লীল কথাবার্তা থেকে বিরত থাকা। কেউ তোমাকে গালি দিলে বা তোমার সঙ্গে মূর্খের মতো আচরণ করলে, তুমি বলো, আমি রোযাদার, আমি রোযাদার।

নিচের হাদিসটিতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কীভাবে ও কেন তিনবার কসম খেয়েছেন তা লক্ষ করুন এবং চিন্তা করুন। আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

«وَاللهِ لا يُؤْمِنُ، وَاللهِ لا يُؤْمِنُ، وَاللهِ لا يُؤْمِنُ. قيل: من يا رسول الله؟ قال: الَّذِي لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ»

আল্লাহর কসম, সে ঈমানদার নয়। আল্লাহর কসম, সে ঈমানদার নয়। আল্লাহর কসম, সে ঈমানদার নয়। জিজ্ঞেস করা হলো, ইয়া রাসুলাল্লাহ, সে কে? তিনি বললেন, যার প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তা বোধ করে না।

এই হাদিসে এমন ব্যক্তি থেকে ঈমান নাকচ করা হয়নি যে তার প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়, বরং এমন ব্যক্তি থেকে ঈমান নাকচ করা হয়েছে যার অনিষ্টের ব্যাপারে তার প্রতিবেশী নিরাপত্তা বোধ করে না। এই বক্তব্য মূলত উত্তম চরিত্রগুণ সম্পর্কে, অনিষ্ট সম্পর্কে নয়। কারণ এক প্রতিবেশী তার অপর প্রতিবেশীকে নিরাপদ মনে করবে কি করবে না তা সাধারণত নৈতিক ও চারিত্রিক একটি ব্যাপার। এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে লোক প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় তাকে উদ্দেশ করেননি, বরং এমন লোককে উদ্দেশ করেছেন যার চরিত্র তার প্রতিবেশীকে নিরাপত্তা বোধ করতে দেয় না, ফলে তারা তার অনিষ্টের ব্যাপারে আশঙ্কা করে।

মানবেতিহাসে এটা অভূতপূর্ব বাঁকবদল, এরূপ দৃষ্টান্ত কখনো দেখা যায়নি, মানুষের চিন্তায়ও আসেনি। হ্যাঁ, তা হলো আল্লাহর দ্বীন, আসমান থেকে প্রেরিত ওহি।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর উম্মতের এক ব্যক্তির চিত্র তুলে ধরেছেন যে নামায পড়ত, দানখয়রাত করত, রোযা রাখত; কিন্তু তার চরিত্র ভালো ছিল না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানিয়েছেন যে, সে কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে জান্নাতে প্রবেশের জন্য নয়, বরং জাহান্নামে প্রবেশের জন্য। আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: أَتَدْرُونَ مَا الْمُفْلِسُ قَالُوا: الْمُفْلِسُ فِينَا مَنْ لَا دِرْهَمَ لَهُ وَلَا مَتَاعَ فَقَالَ: إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي مَنْ يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَة بِصَلَاةٍ وَصِيَامٍ وَزَكَاةٍ وَيَأْتِي وَقَدْ شَتَمَ هُذَا وَقَذَفَ هُذَا. وَأَكَلَ مَالَ هُذَا. وَسَفَكَ دَمَ هُذَا وَضَرَبَ هُذَا فَيُعْطَى هُذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ وَهُذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يَقْضِيَ مَا عَلَيْهِ أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطْرِحَتْ عَلَيْهِ ثُمَّ طُرِحَ فِي النَّارِ»

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা কি জানো দরিদ্র কে? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আমাদের মধ্যে সেই তো দরিদ্র যার টাকাপয়সা ও ধনসম্পদ নেই। তখন তিনি বললেন, কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের মধ্যে ওই ব্যক্তিই (সবচেয়ে) দরিদ্র হবে, যে দুনিয়া থেকে নামায, রোযা ও যাকাত আদায় করে আসবে এবং সঙ্গে সঙ্গে ওইসব লোকও আসবে, যাদের কাউকে সে গালি দিয়েছে, কারও নামে অপবাদ রটিয়েছে, কারও সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, কাউকে হত্যা করেছে, কাউকে প্রহার করেছে। সুতরাং এই হকদারকে তার সওয়াব থেকে হক প্রদান করা হবে, ওই হকদারকে তার সওয়াব থেকে হক প্রদান করা হবে। এভাবে হকদারদের পাওনা পরিশোধ করার আগে যদি তার সওয়াব নিঃশেষ হয়ে যায় তখন তাদের গুনাহসমূহ ওই ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। তারপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে

না, সে চারিত্রিক গুণ অর্জন করতে পারেনি। শিশুরা কখনো কখনো নামাযের কার্যগুলো অনুশীলন করে, নামাযের কথাগুলো আওড়ায়, অভিনেতারা কখনো কখনো বিনয় প্রকাশে ও গুরুত্বপূর্ণ পালনীয় কাজ করতে সক্ষম হয়; কিন্তু শিশুদের ভাঙাচোরা অনুশীলন এবং অভিনেতার অভিনয়ের বাইরে এসে কিছু কাজ বিশ্বাসের বিশুদ্ধতা রক্ষায় ও মহৎ উদ্দেশ্য সাধনে কোনো ভূমিকা রাখে না।

এসব শিক্ষা ও নির্দেশনার মধ্য দিয়ে ইসলামি সভ্যতা জীবনকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছে, জীবনকে নান্দনিকতায় ভরিয়ে তুলেছে। এ ব্যাপারে মুসলিম মনীষীরা বলেছেন, সচ্চরিত্র মানুষ নিজে সুখে ও স্বস্তিতে থাকে, অন্যরাও তার থেকে নিরাপদ থাকে। অসচ্চরিত্র লোকের কারণে মানুষ বিপদে পড়ে এবং সে নিজেও থাকে যন্ত্রণায়-দুর্দশায়।

টিকাঃ
২০৪. হারিস মুহাসিবি, আদাবুন নুফুস, পৃ. ১৫৩।
২০৫. ইমাম গাযালি, ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, খ. ১, পৃ. ২৬৩।
২০৬. সুরা কালাম: আয়াত ৪।
২০৭. আবু দাউদ, কিতাব: আদ-দালিলু আলা যিয়াদাতিল ঈমান ওয়া নুকসানিহি, হাদিস নং ৪৬৮২; তিরমিযি, হাদিস নং ১১৬২। তিনি বলেছেন, হাদিসটি হাসান সহিহ। মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৭৩৯৬।
২০৮. তিরমিযি, কিতাব: আল-বিররু ওয়াস-সিলাহ, বাব: মাআনিল আখলাক, হাদিস নং ২০১৮; ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ৪৮২।
২০৯. তিরমিযি, কিতাব : আল-বিরু ওয়া আস-সিলাহ, বাব : হুসনুল খুলুক, হাদিস নং ২০০৩।
২৪০. মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৯০৮৫; বায়হাকি, শুআবুল ঈমান, হাদিস নং ৪৭১৮।
২৪১. মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৮৯৩৯; আল-হাকিম, হাদিস নং ৪২২১; বায়হাকি, আস-সুনানুল কুবরা, হাদিস নং ২১৩০১।
২৪২. মুহাম্মাদ গাযালি, খুলুকুল মুসলিম, পৃ. ৭।
২৪৩. সুরা আনকাবুত: আয়াত ৪৫।
২৪৪. সুরা তওবা: আয়াত ১০৩।
২৪৫. সুরা বাকারা: আয়াত ১৮৩।
২৪৬. বুখারি, কিতাব: আস-সাওম, বাব: মান লাম ইয়াদা কাওলায যুর ওয়াল-আমালা বিহি ফিস- সাওয়ম, হাদিস নং ১৮০৪; আবু দাউদ, হাদিস নং ২৩৬২; তিরমিযি, হাদিস নং ৭০৭।
২৪৭. সুরা বাকারা: ১৭৯।
২৪৮. মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৯৬৭০; হাকিম, হাদিস নং ৭৩০৪। তিনি বলেছেন, হাদিসটির সনদ সহিহ। যাহাবি তার সঙ্গে একমত। ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ৫৮৫৮।
২৪৯. হাকিম, হাদিস নং ১৫৭০। তিনি বলেছেন, এই হাদিস ইমাম মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহিহ, যদিও ইমাম বুখারি বা ইমাম মুসলিম হাদিসটি সংকলন করেননি। বাইহাকি, আস-সুনানুল- কুবরা, হাদিস নং ৮০৯৬; ইবনে খুযাইমা, হাদিস নং ১৯৯৬।
২৫০. বুখারি, কিতাব: আল-আদাব, বাব: ইসমু মান লা ইয়া'মানু জারুহু বাওয়ায়িকুহু, হাদিস নং ৫৬৭০; মুসলিম, কিতাব : আল-ঈমান, বাব: বায়ানু তাহরিমি ইযাইল-যার, হাদিস নং ৪৬।
২৫১. মুসলিম, কিতাব: আল-বিররু ওয়াস-সিলাহ ওয়াল-আদাব, বাব: তাহরিমুয যুলম; হাদিস নং- ২৫৮১, তিরমিযি, হাদিস নং ২৪১৮; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৮০১৬।
২৫২. মুহাম্মাদ গাযালি, খুলুকুল মুসলিম, পৃ. ১১।
২৫৩. মাওয়ারদি, আদাবুদ দুনয়া ওয়াদ-দ্বীন, পৃ. ২৫২।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 অনুপম রুচিবোধ

📄 অনুপম রুচিবোধ


আমরা ইতিপূর্বে বলেছি, রুচিবোধ বলতে বোঝায় স্বচ্ছ-নির্মল অভ্যন্তরীণ অনুভূতিকে, যার ফলে একজন ব্যক্তি অন্যদের অনুভূতি ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রতি যত্নশীল থাকে। মানুষের সঙ্গে আচার-আচরণের এটাই হলো আদবকেতা। অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে এটি সুন্দর বিদ্যা।

পূর্ববর্তী অধ্যায়ে আমরা সুন্দর রুচিবোধের বহিঃপ্রকাশ কীভাবে ঘটে তার কিছু নমুনা তুলে ধরেছি। ইসলামি সভ্যতা এসব রুচিশীলতার প্রবর্তন করেছে। এখন আমরা কিছু শিরোনাম উল্লেখ করব যেগুলো ইসলামি সভ্যতায় চারিত্রিক সৌজন্য ও রুচিবোধের সৌন্দর্য প্রকাশ করে।

**অন্যদের অনুভূতিকে আহত না করার ক্ষেত্রে সুন্দর রুচিবোধের পরিচয়:**
নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষকে সরাসরি তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করা থেকে বিরত থাকতেন। এই ক্ষেত্রে তিনি বলতেন, مَا بَالُ أَقْوَام-'লোকদের কী হলো...।'

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

إِذَا كُنْتُمْ ثَلَاثَةٌ فَلَا يَتَنَاجَى رَجُلانِ دُوْنَ الْآخَرِ، حَتَّى تَخْتَلِطُوا بِالنَّاسِ؛ أَجْلَ أَنْ يُحْزِنَهُ

যখন তোমরা তিনজন একসঙ্গে থাকবে তখন একজনকে বাদ দিয়ে দুজনে চুপে চুপে কথা বলবে না-অন্য লোকদের সঙ্গে মিলিত না হওয়া পর্যন্ত। এটা এ জন্য যে, তা তাকে দুশ্চিন্তায় ফেলতে পারে।

**বড়দের সম্মান, ছোটদের স্নেহ এবং মানুষকে যথোপযুক্ত মর্যাদাদানে সুন্দর রুচিবোধের পরিচয়:**

উবাদা ইবনে সামিত রা. বর্ণনা করেন, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيرَنَا وَيُوَفِّرْ كَبِيرَنَا

যে লোক আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান করে না সে আমাদের দলভুক্ত নয়।

**মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ক্ষেত্রে সুন্দর রুচিবোধের পরিচয়:**
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

لَا يَشْكُرُ اللَّهَ مَنْ لَا يَشْكُرُ النَّاسَ»

যে মানুষের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না সে আল্লাহরও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।

**কারও বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার ক্ষেত্রে সুন্দর রুচিবোধের পরিচয় :**
বেড়াতে যাওয়া-সংক্রান্ত আয়াতে দুটি শর্ত দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّى تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهَا ﴾

হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের ঘর ছাড়া অন্য কারও ঘরে ঘরবাসীদের অনুমতি না নিয়ে এবং তাদের সালাম না দিয়ে প্রবেশ করো না।

কারও বাড়িতে বা ঘরে প্রবেশের ক্ষেত্রে অনুমতি প্রার্থনা ইসলামের রুচিশীলতার একটি দিক। কিন্তু এই আয়াত মানুষের অভ্যন্তরীণ সৌজন্যবোধের কথাও বলছে, সেটা হলো ইসতিনাস বা যাদের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া হচ্ছে তাদের আগ্রহ বোঝার চেষ্টা করা। এটি অনুমতি প্রার্থনার চেয়ে সূক্ষ্ম ব্যাপার। এর অর্থ এই যে, বাড়ির মালিক বা লোকদের আগ্রহ ও অভিপ্রায় কী-মেহমানদের বেড়াতে যাওয়া নাকি না যাওয়া-সেটা অবহিত হওয়া ও অনুধাবন করা। গিয়ে সরাসরি অনুমতি চাওয়ার চেয়ে এতে বেশি সৌজন্যবোধ প্রকাশ পায়।

**অনুমতি প্রার্থনার ক্ষেত্রে আরেকটি রুচিবোধের পরিচয় :**
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে এটা করেছিলেন। একজন আনসারি সাহাবি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে খাওয়ার দাওয়াত দিয়েছিলেন। দাওয়াতে যাওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে একজন লোক গেল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাড়ির মালিককে বললেন,

إِنَّ هُذَا قَدْ تَبِعَنَا، فَإِنْ شِئْتَ أَنْ تَأْذَنَ لَهُ فَأْذَنْ لَهُ، وَإِنْ شِئْتَ أَنْ يَرْجِعَ رجَعَ. فقال: لا، بل قد أَذِنْتُ لَهُ»

এই লোকটাও আমাদের সঙ্গে এসেছে। তুমি তাকে অনুমতি দিতে চাইলে অনুমতি দিতে পারো। আর তুমি যদি চাও সে ফিরে যাক তাহলে সে ফিরে যাবে। মেযবান বললেন, না, আমি তাকে অনুমতি দিলাম।

**খাদেম ও পরিচারকদের ডাকার ক্ষেত্রে সুন্দর রুচিবোধের পরিচয়:**
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

لَا يَقُولَنَّ أَحَدُكُمْ: عَبْدِي وَأَمَتِي. كُلُّكُمْ عَبِيدُ اللَّهِ، وَكُلُّ نِسَائِكُمْ إِمَاءُ اللَّهِ، وَلَكِنْ لِيَقُلْ: غُلَامِي وَجَارِيَتِي، وَفَتَايَ وَفَتَاتِي

তোমাদের কেউ যেন কখনো 'আমার বান্দা', 'আমার বাঁদি' না বলে। কারণ তোমরা প্রত্যেকেই আল্লাহর বান্দা এবং তোমাদের নারীরা সবাই আল্লাহর বাঁদি। বরং তোমাদের বলা উচিত: আমার গোলাম (বেটা), আমার জারিয়া (বেটি), আমার খাদেম, আমার খাদেমা ইত্যাদি।

**নাম নির্বাচনের ক্ষেত্রে সুন্দর রুচিবোধের পরিচয়:**
আসরাম নামের একটি লোক ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করল, তোমার নাম কী? লোকটি বলল, আমি আসরাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, না, তুমি বরং যুরআহ।

এক লোক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হলো। তিনি লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম কী? লোকটি বলল, 'হাযন'। তিনি বললেন, তোমার নাম সাহল।

**স্ত্রীর সঙ্গে সুন্দর রুচিবোধের পরিচয়:**

এই প্রসঙ্গে কিছু কথা আমরা পূর্ববর্তী অধ্যায়ে বাহ্যিক রুচিবোধ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছি। এখানে আমরা নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়িশা রা. থেকে উম্মে যারআ-এর গল্প শোনার পর তার সঙ্গে কেমন সৌজন্যবোধের প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন তা উল্লেখ করব। উম্মে যারআ-এর গল্প নামে একটি প্রসিদ্ধ গল্প আছে। গল্পটি অনেক লম্বা। নবীজি মনোযোগ দিয়ে তা শুনলেন কিন্তু বিরক্ত হলেন না। অথচ তিনি ইসলামি রাষ্ট্রের নেতা, তাঁর মাথায় বিভিন্ন চিন্তা ও সমস্যা ঘুরপাক খায়। গল্প শোনা শেষে তিনি এমন মন্তব্য করলেন যা শুনতে আয়িশা রা. ভালোবাসেন। তা ছাড়া এমন মন্তব্য ছিল সর্বোচ্চ রুচিবোধের প্রকাশ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,

يَا عَائِشَةُ، كُنْتُ لَكِ كَأَبِي زَرْعٍ لأُمِّ زَرْعٍ، إِلَّا أَنَّ أَبَا زَرْعٍ طَلَّقَ، وَأَنَا لَا أُطلق

হে আয়িশা, আমি তোমার জন্য তেমনই যেমন ছিলেন উম্মে যারআর জন্য আবু যারআ। তবে আবু যারআ উম্মে যারআকে তালাক দিয়েছিল, আমি তোমাকে তালাক দেবো না।

**মুশকিল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে সুন্দর রুচিবোধের পরিচয়:**

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য তাঁর স্ত্রী উম্মে সালামার পক্ষ থেকে খাদ্যভরতি একটি পাত্র এলো। আয়িশা রা. সেই পাত্র উলটে ফেলে দিয়ে ভেঙে ফেললেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর স্ত্রী আয়িশার সঙ্গে কেমন প্রজ্ঞাপূর্ণ আচরণ করেছিলেন তা এখানে উল্লেখযোগ্য। আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عِنْدَ بَعْضِ نِسَائِهِ فَأَرْسَلَتْ إِحْدَى أُمَّهَاتِ الْمُؤْمِنِينَ بِصَحْفَةٍ فِيهَا طَعَامُ فَضَرَبَتِ الَّتِي النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي بَيْتِهَا يَدَ الْخَادِمِ فَسَقَطَتِ الصَّحْفَةُ فَانْفَلَقَتْ فَجَمَعَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِلَقَ الصَّحْفَةِ ثُمَّ جَعَلَ يَجْمَعُ فِيهَا الطَّعَامَ الَّذِي كَانَ فِي الصَّحْفَةِ وَيَقُولُ: غَارَتْ أُمُّكُمْ. ثُمَّ حَبَسَ الْخَادِمَ حَتَّى أُتِيَ بِصَحْفَةٍ مِنْ عِنْدِ الَّتِي هُوَ فِي بَيْتِهَا فَدَفَعَ الصَّحْفَةَ الصَّحِيحَةَ إِلَى الَّتِي كُسِرَتْ صَحْفَتُهَا وَأَمْسَكَ الْمَكْسُورَةَ فِي بَيْتِ الَّتِي كَسَرَتْ

একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কোনো স্ত্রীর ঘরে ছিলেন। এ সময় উম্মুল মুমিনিনদের অপর একজন বড় পাত্রে করে খাবার পাঠালেন। (এতে রাগ করে) নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যার ঘরে ছিলেন তিনি খাদেমের হাতে আঘাত করলেন, ফলে পাত্রটি পড়ে গিয়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাত্রের টুকরোগুলো একত্র করলেন, তারপর তাতে যে খাদ্য ছিল তা জমা করতে লাগলেন এবং বললেন, তোমাদের মা ঈর্ষান্বিত হয়েছেন। খাদেমকে তিনি আটকে রাখলেন, যতক্ষণ না তিনি যার ঘরে ছিলেন তার থেকে একটি আস্ত পাত্র আনা হলো। তিনি আস্ত পাত্রটি তাকে দিলেন যার পাত্র ভাঙা হয়েছিল এবং ভাঙাটি তার ঘরে রেখে দিলেন যিনি তা ভেঙেছিলেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাদেমের সামনে তাঁর স্ত্রী আয়িশা রা.-কে ধমক দিলেন না, কোনো কড়া কথা বলে তার ব্যক্তিত্ববোধকে আহত করলেন না; বরং 'তোমাদের মা ঈর্ষান্বিত হয়েছেন' বলে তার প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করলেন। লক্ষ করুন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শব্দচয়নেও আয়িশা রা.-এর প্রতি মূল্যায়ন প্রকাশ পেয়েছে; তিনি বলেছেন 'তোমাদের মা', অথচ 'এই মেয়ে তো ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েছে' বা 'আয়িশা ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েছে' এরকম কিছু বলেননি।

এ ছাড়াও আরও বহু বিষয় রয়েছে যেখানে ইসলামি সভ্যতা সুন্দর রুচিশীলতা ও চারিত্রিক সৌজন্যের প্রবর্তন ঘটিয়েছে। ইসলামের আগে বা পরে কোনো জীবনদর্শনেই এসব ব্যাপারে কোনো ধারণা ছিল না। ইসলামি সভ্যতার মানবিকতা, সৌন্দর্য ও মহত্ত্বেরই পরিচায়ক এসব বিষয়।

টিকাঃ
২৫৪. ইমাম বুখারি হাদিসটি বর্ণনা করেছেন- আয়িশা রা. বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি কাজ করলেন (অর্থাৎ, সফরে রোযা ভাঙলেন) এবং তা করার জন্য অন্যদেরও অনুমতি (রুখসত) দিলেন। তা সত্ত্বেও কিছু লোক রোযা ভাঙা থেকে বিরত থাকল। এই খবর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কানে পৌঁছল। ফলে তিনি খুতবা দিলেন, প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা করলেন, তারপর বললেন, 'সে-সকল লোকের কী হলো যারা আমি যে কাজ করি তা থেকে বিরত থাকে? আল্লাহর কসম, তাদের চেয়ে আমি আল্লাহকে বেশি জানি এবং তাদের চেয়ে তাঁকে বেশি ভয় করি।' (সুতরাং যে কাজ করতে আমি দ্বিধা করি না সে কাজ করতে সে দ্বিধা করবে কেন?) বুখারি, কিতাব: আল-আদাব, বাব: মান লাম ইয়ুওয়াজিহুন নাসা বিল-ইতাব, হাদিস নং ৬১০১। উদাহরণ হিসেবে আরও দেখা যেতে পারে, বুখারি, কিতাব, কিতাব আল-বুয়ু, বাব: ইযা ইশতারাতা শুরুতান ফিল-বাইয়ি লা তাহিলু, হাদিস নং ২০৬০; মুসলিম, কিতাব: আল-ইক, ইন্নামাল ওয়ালাউ লিমান আ'তাকা, হাদিস নং ১৫০৪।
২৫৫. বুখারি, বাব: ইযা কানু আকসারা মিন সালাসাতিন ফালা বা'সা বিল মুসাওয়াতি ওয়াল-মুনাজাতি, হাদিস নং ৫৯৩২; কিতাব : আস-সালাম, বাব : তারহিম মুনাজামুসাররাতি-ইসনাইনি দুনাস-সালিসি বিগাইরি রিদাহু, হাদিস নং ৩৮।
২৫৬. তিরমিযি, কিতাব: আল-বিররু ওয়াস-সিলাহ, বাব: রহমাতুস সিবয়ান, হাদিস নং ১৯১৯। তিনি বলেছেন, এটা গরিব হাদিস। আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৯৪৩; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৬৭৩৩; হাকিম, হাদিস নং ৪২১।
২৫৭. আবু দাউদ, কিতাব : আল-আদাব, বাব : শুক্রল মারুফ, হাদিস নং ৪৮১১; তিরমিযি, হাদিস নং ১৯৫৪; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৭৪৯৫; ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ৩৪০৭।
২৫৮. সুরা নুর: আয়াত ২৭।
২৫৯. আবু হাইয়ান, তাফসিরুল বাহরিল মুহিত, খ. ৬, পৃ. ৪৪৫, ৪৪৬।
২৬০. বুখারি, কিতাব: আল-বুয়ু, বাব: আস-সাহুলাহ ওয়াস-সামাহহি ফিশ-শিরা ওয়াল-বায়... হাদিস নং ১৯৭৫; মুসলিম, কিতাব: আল-আশরিবাহ, বাব: মা ইয়াফআলুদ-দাইফ ইযা তাবিআহু গাইরু মান দাআহু.., হাদিস নং ২০৩৬।
২৬১. বুখারি, আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত হাদিস, কিতাব: আল-ইত্ক, বাব: কারাহিয়্যাতুত তাতাউল আলার-রাকিক ওয়া কাওলিহি আবদি ওয়া আমাতি, হাদিস নং ২৪১৪; মুসলিম, কিতাব: আল-আলফায মিনাল আদাব ওয়া গাইরিহা, বাব: হুকমু ইতলাকি লাফযিল-আব্দ ওয়াল-আমাত, হাদিস নং ২২৪৯।
২৬২. আসরাম অর্থ কাটা বা কর্তিত। একই ধাতু থেকে সারিম, যার অর্থ কর্তিত ফসল বা যে-ভূমির ফসল কর্তন করা হয়েছে। শব্দটি কুলক্ষণযুক্ত ও হতাশাজনক। আর 'যুরআহ' অর্থ ফসল ও শস্য। এতে কল্যাণ ও বরকত রয়েছে।-অনুবাদক
২৬৩. আবু দাউদ, কিতাব: আল-আদাব, বাব: তাগয়িরুল-ইসমিল কাবিহ, হাদিস নং ৪৯৫৪।
২৬৪. হাযন অর্থ: কঠোর, শক্ত; সাহল অর্থ: কোমলতা, নম্রতা।-অনুবাদক
২৬৫. বুখারি, কিতাব: আল-আদাব, বাব: ইসমুল হায়ন, হাদিস নং ৫৮৩৬; আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৯৫৬; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২৩৭২৩।
২৬৬. বুখারি: কিতাব; আন নিকাহ, বাব; হুসনুল মুআশারাতি মাআল আহলি, হাদিস নং ৪৮৯৩। মুসলিম: কিতাব; ফাদায়িলুস সাহাবা, বাব; যিকরু হাদিসি উম্মে যারআ, হাদিস নং ২৪৪৮।
২৬৭. বুখারি, কিতাব: আন-নিকাহ, বাব: আল-গাইরাহ, হাদিস নং ৪৯২৭; আবু দাউদ, হাদিস নং ৩৫৬৭; নাসায়ি, হাদিস নং ৩৯৫৫; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ১২০৪৬।
২৬৮. একটি আরবীয় বাগধারা। এ কথা বলে স্নেহ-মমতা-ভালোবাসা-সহমর্মিতা প্রকাশ করা হয়।-অনুবাদক

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00