📄 শরীরের সৌন্দর্য
এ ব্যাপারটি কারও অজানা নয় যে পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা এবং এগুলোর ব্যাপারে গুরুত্বপ্রদান মানবসভ্যতার সবচেয়ে উজ্জ্বল একটি দিক। ইন্দ্রিয়গত সৌন্দর্য বা বাহ্যিক সৌন্দর্য বলতে যা-কিছু বোঝায় তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা।
বাস্তবতা এই যে, ইসলাম এই ক্ষেত্রে এক অলৌকিক জীবনধারার প্রবর্তন করেছে। এই জীবনধারায় শরীর, মন ও সমাজই সুরক্ষিত থাকে না কেবল, বরং গোটা মানবতাই সুরক্ষিত থাকে। এমনকি কুরআনুল কারিম নির্দেশনা দিচ্ছে যে,
(يُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ)
যারা পবিত্র থাকে আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন।
(يُحِبُّ الْمُتَطَّهِّرِينَ)
পবিত্রতা অর্জনকারীদের আল্লাহ পছন্দ করেন।
অর্থাৎ, যারা নোংরা-ময়লা ও অশুচিতা থেকে পবিত্র থাকে আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন।
এ ছাড়াও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীকৃতি দিয়েছেন যে, «الطُّهُورُ شَطْرُ الْإِيْمَانِ» পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক।
এই হাদিসের ব্যাপারে উলামায়ে কেরাম যা-কিছু বলেছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বক্তব্য এই যে, পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতার জন্য ঈমানের যে সওয়াব তার অর্ধেক পর্যন্ত সওয়াব দেওয়া হবে।
এখানে একটি বিষয়ে সবার দৃষ্টি আর্কষণ করা সংগত মনে করি, ইসলামের এসব নির্দেশনা ছিল এমন যুগে যখন নোংরামি ও অপরিচ্ছন্নতা ছিল ইউরোপীয় জীবনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। ইউরোপের লোকেরা তখন বছরে একবার বা দুইবারের বেশি গোসল করত না! নোংরামি এই পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে দেহে ও কাপড়চোপড়ে লেগে থাকা ময়লা-আবর্জনাকে ‘বরকত’ মনে করা হতো এবং ভাবা হতো যে এসব ময়লা শরীরের শক্তিবর্ধক।
ঠিক এই সময়টাতে ইসলামি জীবনপদ্ধতি প্রবর্তিত হয়, তা মুসলিমদের পবিত্রতা, ক্ষেত্রভেদে গোসলের আবশ্যকতা ও মুস্তাহাব হওয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়। অর্থাৎ, ক্ষেত্রভেদে গোসল ছাড়া তাদের শরীরের পবিত্রতা অর্জিত হবে না এবং অজু ছাড়া নামায হবে না। আর অজু দৈনিক পাঁচবার করতে হতে পারে।
জানাবাতের সময় ও ঋতুস্রাব শেষে এবং অন্যান্য কিছু সময়ে গোসল আবশ্যক। দুই ঈদ, হজের জন্য ইহরাম বাঁধা ও অন্যান্য সময়ে গোসল মুস্তাহাব। জুমআর দিন গোসল ওয়াজিব (আবশ্যক) নাকি মুস্তাহাব-এ ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে প্রণিধানযোগ্য মত এই যে, জুমআর দিন গোসল করা মুস্তাহাব। আবু সাইদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
«غُسْلُ يَوْمِ الْجُمُعَةِ عَلَى كُلِّ مُحْتَلِمٍ، وَسِوَاكَ، وَيَمَسُّ مِنَ الطَّيِّبِ مَا قَدَرَ عَلَيْهِ»
জুমআর দিন প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির কর্তব্য হলো গোসল করা ও মিসওয়াক করা এবং যথাসাধ্য সুগন্ধি ব্যবহার করা।
এমনকি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুই গোসলের মাঝখানে সর্বোচ্চ কতদিন সময় থাকবে তা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
حَقُّ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ أَنْ يَغْتَسِلَ فِي كُلِّ سَبْعَةِ أَيَّامٍ يَوْمًا، يَغْسِلُ فِيْهِ رَأْسَهُ وَجَسَدَهُ
প্রত্যেক মুসলমানের ওপর (আল্লাহ তাআলার) হক এই যে, প্রতি সাত দিনে একদিন সে গোসল করবে, সেদিন সে তার মাথা ও শরীর ধুয়ে নেবে।
কতিপয় ফকিহ বিভিন্ন প্রকারের গোসলের কথা বলেছেন, এমনকি তারা সতেরো প্রকারের গোসল নিয়ে দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। এতে গোসলের গুরুত্বের ব্যাপারটি বোঝা যায়। ইসলাম শরীরের বিভিন্ন অঙ্গকে অধিকতর পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র রাখতে আহ্বান জানিয়েছে, যেসব অঙ্গে রোগ-ব্যাধি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি এবং যেগুলো বেশি বেশি নোংরা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে সেগুলোর পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেছে।
পবিত্রতার ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনাকে আমরা তিনটি পর্যায়ে ভাগ করতে পারি: এক. ময়লা ও অপরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা; দুই. পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতার নির্দেশ এবং তিন. পরিপাট্য ও সাজসজ্জার ব্যাপারে নির্দেশনা, এটা পরিচ্ছন্নতারও অধিক।
মুসলিমরা জানে যে পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা অর্জনের ব্যাপারে অবহেলা ও শিথিলতা দেখানো শাস্তির কারণ। একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। কবর দুটিতে তাদের বাসিন্দাদের ওপর কী ঘটছে তা তিনি তার সঙ্গীদের জানালেন। তার বক্তব্য আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে,
إِنَّهُمَا لَيُعَذِّبَانِ وَمَا يُعَذِّبَانِ فِي كَبِيرٍ؛ أَمَّا أَحَدُهُمَا فَكَانَ لَا يَسْتَتِرُ مِنَ الْبَوْلِ، وَأَمَّا الْآخَرُ فَكَانَ يَمْشِي بِالنَّمِيمَةِ
নিশ্চয় এই দুইজনকে শান্তি দেওয়া হচ্ছে। তবে বড় কোনো বিষয়ে তাদের শান্তি দেওয়া হচ্ছে না, তাদের একজন পেশাব থেকে নিজেকে পবিত্র রাখত না এবং অপর মানুষের গিবত (পরচর্চা) করে বেড়াত।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার একটি লোককে দেখলেন যে, তার মাথার চুল উশকোখুশকো এবং দাড়ি অপরিপাটি। তিনি লোকটিকে 'বেরিয়ে যাও' বলে হাত দিয়ে ইঙ্গিত করলেন। যেন তিনি তাকে চুল-দাড়ি ঠিক করে আসতে বললেন। লোকটি চলে গেল এবং চুল ও দাড়ি সুন্দর করে পরিপাটি করে আবার এলো। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
«أَلَيْسَ هَذَا خَيْرًا مِنْ أَنْ يَأْتِيَ أَحَدُكُمْ ثَائِرَ الرَّأْسِ كَأَنَّهُ شَيْطَانٌ
তোমাদের কারও শয়তানের মতো উশকোখুশকো মাথা নিয়ে আসার চেয়ে এভাবে (পরিপাটি হয়ে) আসাই কি ভালো না!
একইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শরীরের সেসব জায়গাও পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র রাখতে আহ্বান জানিয়েছেন যেখানে ঘাম ও ময়লা জমে এবং রোগজীবাণুর জন্ম হয়। বরং তিনি এটিকে মানুষের স্বভাবজাত রীতি বা সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
خَمْسُ مِنَ الْفِطْرَةِ : الْخِتَانُ، وَالاسْتِحْدَادُ، وَتَقْلِيمُ الأَظْفَارِ، وَنَتْفُ الإبط، وَقَصُّ الشَّارِبِ»
পাঁচটি বিষয় মানুষের স্বভাবজাত : খতনা করা, নাভির তলদেশের পশম পরিষ্কার করা, নখ কাটা, বগলের পশম পরিষ্কার করা এবং মোচ ছোট রাখা।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে কতটা গুরুত্ব দিয়েছেন তা বোঝা যায় নিম্নলিখিত হাদিস থেকে,
لَوْلَا أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِي لَأَمَرْتُهُمْ بِالسَّوَاكِ عِنْدَ كُلِّ وُضُوءٍ»
যদি আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর মনে না করতাম তাহলে তাদের জন্য প্রতিবার অজুর সময় মেসওয়াক করা বাধ্যতামূলক করে দিতাম।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন, মেসওয়াক করার ব্যাপারে আমরা এত বেশি নির্দেশ পেতাম যে, আমাদের মনে হলো এ ব্যাপারে কুরআনের আয়াত নাযিল হবে।
এতকিছুর পর এ ব্যাপারে আমাদের আশ্চর্যান্বিত হওয়ার কিছু নেই যে, ইসলামি সভ্যতার যুগে শহরগুলোর সব প্রান্তে গণগোসলখানা নির্মাণ করা হয়। যা এসব শহরের স্থাপত্যের দিকটি আলাদাভাবে ফুটিয়ে তোলে।
জার্মান প্রাচ্যবিদ সিগরিড হুংকে এই ব্যাপারে ওই সময়ের ইসলামি সভ্যতা এবং ইউরোপের অবস্থার মধ্যে একটি তুলনামূলক পর্যবেক্ষণ উপস্থিত করেছেন। তিনি বলেছেন, আন্দালুসীয় ফকিহ তারতুশি ফিরিঙ্গিদের (ইউরোপের) দেশগুলো ভ্রমণকালে যেসব অবস্থার মুখোমুখি হয়েছেন তা শুনলে গা শিউরে ওঠে। তিনি একজন মুসলিম, যার জন্য গোসল এবং দৈনিক পাঁচবেলা অজু করার বিধান রয়েছে। তারতুশি কী বলছেন শুনুন, তুমি কখনো এদের চেয়ে বেশি নোংরা কাউকে পাবে না। এরা নিজেদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখে না, শীতল পানি দিয়ে বছরে বড়জোর একবার বা দুইবার গোসল করে। এরা এদের কাপড়চোপড় পরিধানের পর আর কখনো ধৌত করে না, এই অবস্থাতেই কাপড়গুলো জীর্ণ ব্যবহার-অনুপযোগী হয়ে পড়ে। সিগরিড হুংকে আরও বলেছেন, নোংরামির এই ব্যাপারগুলো সংস্কৃতিমান ও রুচিশীল আরবদের পক্ষে বোধগম্য করা কিছুতেই সম্ভব নয় এবং তারা নিতেও পারবে না। কারণ আরবদের জন্য শরীরকে পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র রাখা কেবল ধর্মীয় দিক থেকে আবশ্যক নয়, বরং গরম আবহাওয়ায় বসবাসের ফলেও তা অতি জরুরি। তারপর তিনি উল্লেখ করেছেন যে, খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দীতে বাগদাদে হাজার হাজার গরম জলের গোসলখানা ছিল। গোসলখানাগুলোতে ছিল পর্যাপ্ত কর্মচারী। তারা আগন্তুকদের খেজুরগাছের ছোবড়া দিয়ে দলাইমলাই করত এবং চুল কেটে পরিপাটি করে সাজিয়ে দিত।
আমরা বলতে পারি, গরম আবহাওয়ায় যে অবস্থা বিরাজমান থাকে তার জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা আবশ্যক, তবে নদীনালা ও পানির উৎস না থাকার বিষয়টি সামগ্রিক পরিচ্ছন্নতা অর্জনের সাপ্তাহিক ও দৈনিক শৃঙ্খলার ওপর কঠোর জোর না দেওয়ার জন্য একটি যৌক্তিক প্রেক্ষাপট তৈরি করে। অন্যদিকে ইউরোপের পুরো অঞ্চলটা শীতপ্রধান নয়। উষ্ণ ও নাতিশীতোষ্ণ এলাকাও রয়েছে। গোটা ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে প্রচুর নদীনালা ও খালবিল। তারপরও তারা অপরিচ্ছন্নতাকে তাদের মূলনীতি বানিয়ে নিয়েছিল এবং ময়লা-আবর্জনা ছিল গর্বের বিষয়।
ইসলাম কেবল পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা নয়, তারও অধিক পরিপাট্য ও সাজসজ্জা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে। এ ব্যাপারে বিভিন্ন নির্দেশ করা হয়েছে।
নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা দিয়েছেন যে, তিনি সুগন্ধি ভালোবাসেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
حُبِّبَ إِلَيَّ مِنْ دُنْيَاكُمُ النِّسَاءُ وَالطِيبُ، وجُعِلَتْ قُرَّةُ عَيْنِي فِي الصَّلاةِ
তোমাদের দুনিয়ার মধ্য থেকে আমার কাছে প্রিয় হলো নারী ও সুগন্ধি। আর নামাযে রয়েছে আমার চোখের শীতলতা।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অভ্যাস ছিল এই যে, إِذَا أُتِيَ بِطِيبٍ لَمْ يَرُدُّهُ-তাকে সুগন্ধি দেওয়া হলে তিনি তা ফিরিয়ে দিতেন না। বরং তিনি এ ব্যাপারে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন। বলেন,
مَنْ عُرِضَ عَلَيْهِ رَيْحَانُ فَلَا يَرُدُّهُ فَإِنَّهُ خَفِيفُ الْمَحْمِلِ طَيِّبُ الرِّيحِ
কাউকে সুগন্ধি (উপহার) দেওয়া হলে সে যেন তা ফিরিয়ে না দেয়। কারণ, সুগন্ধি বহন করা সহজসাধ্য এবং ঘ্রাণও চমৎকার।
একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য একটি কালো চাদর বানানো হলো। তিনি তা পরিধান করলেন। পরে তার শরীর ঘামলে চাদর থেকে পশমের গন্ধ বের হলো। তিনি তা ছুড়ে ফেলে দিলেন।
নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খাদেম আনাস ইবনে মালিক রা. তাঁর শারীরিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন এভাবে,
وَلَا مَسِسْتُ دِيبَاجَةٌ وَلَا حَرِيرَةً أَلْيَنَ مِنْ كَفَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَلا شَمِمْتُ مِسْكَةٌ وَلاَ عَنْبَرَةً أَطْيَبَ مِنْ رَائِحَةِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ»
আমি এমন কোনো রেশমি বস্ত্র স্পর্শ করিনি যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতের তালু থেকে নরম এবং এমন কোনো মিশক ও আম্বরের ঘ্রাণ গ্রহণ করিনি যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের (শরীরের) ঘ্রাণের চেয়ে উত্তম।
এসব কারণেই পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা মুসলিমদের কাছে একটি দ্বীনি বিষয়। এর বাস্তবায়ন করে তারা প্রতিদান ও সওয়াবের আশা করেন এবং তারা মনে করেন যে, এভাবে তারা তাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ করেন।
টিকাঃ
১১৪. সুরা বাকারা: আয়াত ২২২।
১১৫. সুরা তাওবা: আয়াত ১০৮।
১১৬. ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আযিম, খ. ১, পৃ. ৫৮৮।
১১৭. মুসলিম, কিতাব: তাহারাত, বাব: ফাদলুল অজু, হাদিস নং ২২৩; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২২৩৫৩।
১১৮. ইমাম নববি, আল-মিনহাজ, খ. ৩, পৃ. ১০০।
১১৯. সিগরিড হুংকে, শামসুল আরাব তাসতাউ আলাল গারব, পৃ. ৫৪।
১২০. শরীরের এমন অবস্থা যখন শরয়ি ও ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে গোসল ফরয বা আবশ্যক।
১২১. এগুলোর বিধান ওয়াজিব নয়, বরং সুন্নত। দেখুন, ইমাম নববি, আল-মিনহাজ ফি শারহি সহিহি মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ, খ. ৬, পৃ. ১৩৫; আল-মুনাবি, ফাইদুল কাদির, খ. ৪, পৃ. ৫৪১।
১২২. বুখারি, কিতাব: আল-জুমুআ, বাব আত-তিবু লিল জুমুআতি, হাদিস নং ৮৪০; মুসলিম, কিতাব: আল-জুমুআ, বাব: আত-তিব ওয়াস-সিওয়াক ইয়াওমাল জুমুআ, হাদিস নং ৮৪৬।
১২৩. বুখারি, আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত হাদিস, কিতাব আল-জুমুআ, বাব হাল আলা মান লা ইয়াশহাদিল জুমুআ গুস্স.., হাদিস নং ৮৫৬; মুসলিম, কিতাব আল-জুমুআ, বাব: আত-তিব ওয়াস-সিওয়াক ইয়াওমাল জুমুআ, হাদিস নং ৮৪৯।
১২৪. বুখারি, কিতাব: আল-অজু, বাব: মিনাল কাবাইরি আল-লা ইয়াসতাতিরা মিন বাওলিহি, হাদিস নং ২১৩; মুসলিম, কিতাব আত-তাহারা, বাব: আদ-দালিল আলা নাজাসাতিল باওলি ওয়া উজুবিল ইসতিবরাই মিনহু, হাদিস নং ২৯২।
১২৫. মালিক ইবনে আনাস, আল-মুআত্তা, ইয়াহইয়া লাইসি থেকে বর্ণিত, হাদিস নং ১৭০২।
১২৬. বুখারি, আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত হাদিস, কিতাব: আল-লিবাস, বাব: কাসসুশ শারিব, হাদিস নং ৫৫৫০; মুসলিম, কিতাব: আত-তাহারা, বাব: খিসালুল ফিতরা, হাদিস নং ২৫৭।
১২৭. বুখারি, আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত হাদিস, কিতাব: আল-জুমুআ, বাব: আস-সিওয়াক ইয়াওমাল জুমুআ, হাদিস নং ৮৪৭; আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৭; তিরমিযি, হাদিস নং ২২; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৭৮৪০।
১২৮. ইবনে আবি শাইবা তার মুসান্নাফে বর্ণনা করেছেন, হাদিস নং ১৭৯৩।
১২৯. সিগরিড হুংকে, শামসুল আরাব তাসতাউ আলাল গারব, পৃ. ৫৪।
১৩০. নাসায়ি, কিতাব: ইশরাতুন নিসা, বাব: হুব্বুন নিসা, হাদিস নং ৩৯৪০; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ১৪০৬৯।
১৩১. নাসায়ি, কিতাব: জিনাত, বাব: আত-তিব, হাদিস নং ৫২৫৮। মুসনাদে আহমাদ, ১২১৯৭।
১৩২. মুসলিম, আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত হাদিস, কিতাব: আল-আলফায মিনাল-আদাব ও গাইরিহা, বাব: ইসতি'মালুল মিসক..., হাদিস নং ২২৫৩; তিরমিযি, হাদিস নং ২৭৯১।
১৩৩. আবু দাউদ, কিতাব: আল-লিবাস, বাব: আস-সাওয়াদ, হাদিস নং ৪০৭৪।
১০৪. মুসলিম, কিতাব: আল-ফাযায়িল, বাব: তিবু রায়িহাতিন নাবিয়্যি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওয়া লিনি মাসসিহি ওয়াত-তাবাররুক বি-মাসহিহি, হাদিস নং ২৩৩০।
📄 পোশাকের সৌন্দর্য
পরিধেয় বস্ত্র বা পোশাকের ব্যাপারেও ইসলাম যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে। সুন্দর পরিচ্ছন্ন পোশাক যেমন তার মালিকের জন্য ভালো, তেমনই তার পাশে যারা রয়েছে তাদের জন্যও ভালো। বরং অপরিচিত ব্যক্তিরা যারা তাকে দেখে তাদের জন্যও ভালো।
কুরআনুল কারিম পোশাকের নেয়ামত সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছে যে পোশাক লজ্জাস্থান আবরিত রাখে এবং তা শোভাও।
মানুষের স্বভাবই এমন যে তা সবসময় শরীরের গোপনীয় অংশ ঢেকে রাখতে উদ্গ্রীব। তবে পশুপাখির মধ্যে এ ব্যাপারটি নেই। মানুষের এই স্বভাব কেবল সুন্দর বিষয় নয়, প্রয়োজনীয়ও বটে। আদম আ. ও তার স্ত্রী গাছের ফল খাওয়ার পর তাদের শরীর অনাবৃত হয়ে পড়ে। যখন হুঁশ ফিরে পান,
۞طَفِقَا يَخْصِفْنِ عَلَيْهِمَا مِنْ وَرَقِ الْجَنَّةِ۞
জান্নাতের পাতা দ্বারা তারা নিজেদেরকে আবৃত করতে লাগলেন।
এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, আদি পিতা ও মাতা পাতা দিয়ে শরীরের এমন গোপনীয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আবৃত করছিলেন যা প্রকাশিত হয়ে পড়লে মানুষ স্বভাবগত কারণেই লজ্জা পায়। মানুষের এই স্বভাবে বিপর্যয় ঘটলেই কেবল তারা নিজেদের নগ্ন ও উন্মোচিত করতে পারে।
সুতরাং, পোশাক মানুষের অন্তরে বদ্ধমূল স্বভাবগত বিষয় এবং জীবনযাপনের অতি আবশ্যক উপাদানগুলোর অন্যতম। তা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নেয়ামতও বটে। কিন্তু আল্লাহ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন যে, পোশাক যেমন বাহ্যিক সৌন্দর্য প্রকাশ করে, উপরন্তু অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য গ্রহণের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿ يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنْزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا وَلِبَاسُ التَّقْوَى ذَلِكَ خَيْرٌ ﴾
হে বনি আদম, তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকার ও বেশভূষার জন্য আমি তোমাদের পরিচ্ছদ দিয়েছি এবং তাকওয়ার পরিচ্ছদ, এটাই সর্বোৎকৃষ্ট।
শুরুর দিকে কুরআনের যেসব আয়াত নাযিল হয়েছে সেগুলোর মধ্যে আমরা পাই, ﴾وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ﴿ 'তোমার পরিচ্ছদ পবিত্র রাখো। যেদিন কুরআন মানুষের জন্য প্রথম নাযিল হয়েছে সেদিন থেকেই ইসলাম মানুষের বাহ্যিক অবস্থার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে, যেমন অভ্যন্তরীণ অবস্থার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে। কুরআন তাওহিদকে মানুষের পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে সম্পৃক্ত করে দিয়েছে, বলছে,
﴿ وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ ﴾
এবং তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো। তোমার পরিচ্ছদ পবিত্র রাখো।
এখানে পবিত্রতা বাহ্যিকভাবে পোশাকের ক্ষেত্রে যেমন জরুরি, তেমনই পাপাচার ও অন্যায়ের ক্ষেত্রে জরুরি। ইবনে কাসির রহ. বলেছেন, আয়াতটি অন্তরের পবিত্রতার পাশাপাশি সব ধরনের পবিত্রতাকে অন্তর্ভুক্ত করে। কারণ আরবরা পোশাক বলতে সব ধরনের পবিত্রতা বুঝে থাকে।
আল্লাহ তাআলা সাজসজ্জা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا
হে বনি আদম, প্রত্যেক মসজিদে প্রবেশের সময় তোমরা সুন্দর পোশাক পরিধান করবে, আহার করবে ও পান করবে কিন্তু অপচয় করবে না।
পরবর্তী আয়াতে যারা আল্লাহ যা-কিছু শোভনীয় করেছেন তা নিষিদ্ধ করতে চায় তাদের প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করা হয়েছে,
قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ
বলো, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যেসব শোভার বস্তু ও বিশুদ্ধ জীবিকা সৃষ্টি করেছেন তা কে হারাম করেছে?
কতিপয় আলেম আয়াতটি বোঝার ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন করেছেন। তারা শর্ত দিয়েছেন যে, শরীরের নাপাকি গোলাপজল দিয়ে ধৌত করতে হবে। যেমন ইমাম ফখরুদ্দিন রাযি তার তাফসিরগ্রন্থে তাদের এরূপ বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। তাদের বক্তব্যের ব্যাখ্যায় তারা বলেছেন, আল্লাহর এই أَقِيمُوا الصَّلَاةَ﴿ 'তোমরা নামায কায়েম করো' বাণীতে আমাদের নামায পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সালাত বা নামায বলতে দোয়া বোঝায়। তা তো করাই হয়, কারণ আদিষ্ট বিষয় আদায়ের দ্বারাই দায়িত্ব পালন করা হয়। এই দলিলের দাবি এই যে, নামাযের শুদ্ধতা সতর বা লজ্জাস্থান ঢাকার ওপর নির্ভরশীল নয়। (যেহেতু এই আয়াতে শুধু নামাযের কথা বলা হয়েছে, পোশাকের কথা বলা হয়নি।) তবে আমরা এই অর্থ (পোশাক পরিধানের বিধান) গ্রহণ করেছি আল্লাহ তাআলার এই বাণীর ওপর আমল করার জন্য,
خُذُوا زِيْنَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ
প্রত্যেক সালাতের সময় তোমরা সুন্দর পোশাক পরিধান করবে।
পরিচ্ছন্নতার চূড়ান্ত পর্যায় মেনে নিয়ে গোলাপজল দিয়ে ধোয়া পোশাক পরিধানের অর্থ হলো সাজ গ্রহণ বা শোভামণ্ডিত হওয়া। সুতরাং এমন পোশাক পরিধানই নামাযের শুদ্ধতার জন্য যথেষ্ট হওয়া আবশ্যক। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি লোককে ময়লা কাপড়ে দেখলেন। দেখে বললেন, أَمَا كَانَ هَذَا يَجِدُ مَاءً يَغْسِلُ بِهِ ثَوْبَهُ ؟! এই লোক তার কাপড় ধোয়ার মতো কোনো পানি পায়নি? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাদা পোশাক পরিধান করতেন। এ ব্যাপারে তিনি বিশেষ নির্দেশও দিয়েছেন, الْبَسُوا الثِيَابَ الْبِيضَ، فَإِنَّهَا أَطْهَرُ وَأَطْيَبُ তোমরা সাদা পোশাক পরিধান করো, কারণ তা অধিকতর পবিত্র ও চমৎকার।
নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনচরিতে দুটি অবস্থান রয়েছে যা নিয়ে চিন্তাভাবনা জরুরি, এমন ব্যক্তির অবস্থান যিনি সৌন্দর্য অত্যন্ত ভালোবাসেন এবং এ ব্যাপারে এতটা উৎসাহী যে এই আশঙ্কাও করেন তা অহংকারের পর্যায়ে পড়ে কি না, আরেক ব্যক্তির অবস্থান যিনি সে ব্যাপারে ভ্রুক্ষেপ করেন না।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, لا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার রয়েছে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।
তখন এক ব্যক্তি বলল, যে লোক পছন্দ করে যে তার পোশাক চমৎকার হোক, তার জুতা সুন্দর হোক, সেও কি এই শ্রেণিতে পড়বে? তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِنَّ اللَّهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ، وَغَمْطُ النَّاسِ»
নিশ্চয় আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্য ভালোবাসেন। অহংকার হলো সত্য অস্বীকার করা ও মানুষকে অবজ্ঞা করা।
ইসলাম একটি সূক্ষ্ম সমীকরণ প্রস্তুত করেছে, সৌন্দর্য ও সাজসজ্জার প্রতি আকুলতা এবং একইসঙ্গে তা যেন আত্মার ওপর প্রভাব না ফেলে এবং অহংকারের দিকে ঠেলে না দেয় সে ব্যাপারে ব্যাকুলতা। অহংকার হলো অন্যদের তুচ্ছ দৃষ্টিতে দেখা ও হেয়জ্ঞান করা এবং নিজেকে অন্যদের বিবেচনায় বড় মনে করা। আপনি সৌন্দর্যের প্রতিভূ হতে পারেন, এতে কোনো বাধা নেই, কারণ আল্লাহ তাআলা সৌন্দর্য ভালোবাসেন; কিন্তু আপনাকে অবশ্যই অণু পরিমাণ অহংকার থেকে বেঁচে থাকতে হবে। কারণ এক অণু অহংকারও আপনার জন্য জান্নাতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেবে।
তবে এই ব্যাপারে এতটা ভীতি ও সতর্কতা থাকা ঠিক নয় যা সৌন্দর্য ও সাজসজ্জাকে পরিপূর্ণরূপে পরিত্যাগ করতে বাধ্য করে। এখানে আমরা রাসুলের জীবনচরিতের দ্বিতীয় অবস্থানটি তুলে ধরছি। আবুল আহওয়াস আওফ তার পিতা মালিক ইবনে নাদলাহ রা. থেকে বর্ণনা করেন, আমি জীর্ণ পোশাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এলাম। তিনি বললেন, أَلَكَ مَالُ؟-'তোমার কি ধনসম্পদ নেই?'
আমি বললাম, 'জি, আছে।'
তিনি বললেন, مِنْ أَي الْمَالِ؟ -'কী কী ধনসম্পদ আছে?'
আমি বললাম, 'উট, ভেড়া-ছাগল, ঘোড়া, দাস-দাসী সবই আছে।' তখন তিনি বলেন,
فَإِذَا آتَاكَ اللهُ مَالاً ، فَلْيُرَ عَلَيْكَ أَثَرُ نِعْمَةِ اللَّهِ وَكَرَامَتِهِ
আল্লাহ যখন তোমাকে মাল দিয়েছেন তখন তোমার গায়ে যেন আল্লাহর নেয়ামত ও বদান্যতার আলামত প্রকাশ পায়।
ইসলাম এভাবে শিথিলতা ও কঠোরতা এবং অহংকার ও নোংরামির মধ্যে সীমারেখা টেনে দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা সুন্দর, তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। তিনি চান তার বান্দাদের গায়ে তার নেয়ামতের নিদর্শন থাকুক। কিন্তু তিনি যার অন্তরে বিন্দুমাত্র অহংকার রয়েছে তার জন্য জান্নাতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেবেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবচেয়ে সুন্দর ও উত্তম পোশাক পরিধান করতেন। এ ব্যাপারটি আমরা জেনেছি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর বক্তব্য থেকে। তিনি আলি ইবনে আবু তালিব রা.-এর পক্ষ থেকে দূত হিসেবে হারুরিয়্যা খারিজিদের সঙ্গে আলোচনা করতে এবং সত্যটাকে তাদের বুঝিয়ে দিতে গিয়েছিলেন। তিনি এই দায়িত্ব পালনের জন্য তার কাছে থাকা শ্রেষ্ঠ পোশাকটি বাছাই করেছিলেন। ইমাম আবু দাউদ ইবনে আব্বাস রা. থেকে এই ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, হারুরিয়্যা খারিজিরা বিদ্রোহ করলে আমি আলি রা.-এর কাছে এলাম। তিনি বললেন, তুমি এই দলটির কাছে যাও এবং তাদের সঙ্গে আলোচনা করো। তখন ইয়ামেনের সবচেয়ে সুন্দর পোশাক পরিধান করলাম।- আবু ঘুমাইল (সিমাক ইবনুল ওয়ালিদ আল-হানাফি) জানিয়েছেন, ইবনে আব্বাস ছিলেন সুদর্শন ও শুভ্রোজ্জ্বল মানুষ।-ইবনে আব্বাস রা. বলেন, আমি তাদের কাছে এলাম। তারা আমাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলল, তোমাকে স্বাগতম হে ইবনে আব্বাস। এই পোশাকটি কী? আমি বললাম, (এত সুন্দর ও দামি পোশাকের জন্য) তোমরা আমাকে দোষারপ করো না। আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সবচেয়ে সুন্দর পোশাক পরতে দেখেছি।
পেশার-পরিজন ও তার পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব এতটা বেশি ছিল যে নবী করিম সত্যবৃত আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো মুসলমানের ময়লা কাপড়ে সমারে জাল, বিশেষ করে জুমআর নামাযে আসা অপছন্দ করতেন। এমনকি যারা সপ্তাহজুড়ে কাজ করে এবং কাজের ফলে জামাকাপড় ময়লা হয়ে যায় তিনি তাদের ব্যাপারে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন। তারা যেন জুমআর নামাযের জন্য আলাদা পরিচ্ছন্ন পোশাক রাখে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, জুমআ
مَا عَلَى أَحَدِكُمْ لَوِ اتَّخَذَ ثَوْبَيْنِ لِجُمُعَتِهِ سِوَى ثَوْنِيْ مَهْنَتِهِ؟»
তোমাদের কেউ যদি তার জুমআর দিনে দৈনন্দিন পরিধানের কাপড় দুটি ছাড়া ভিন্ন দুটি কাপড় পরে তাহলে সমস্যা কী?
ফকিহগণ কাপড়ে কোনো ধরনের নাপাকি (নাপাক বস্তু) লাগার দ্বারা কাপড়কে নাপাক বিবেচনা করেন। যেমন: পেশাব, পায়খানা, রক্ত। নাপাক দূর করা (ভালো করে ধোয়া) ব্যতীত এমন পোশাক পরে নামায সহিহ-শুদ্ধ হবে না। এমনকি নাপাকির পরিমাণ অল্প হলেও এই বিধান প্রযোজ্য হবে। আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেছেন, যে কাপড়ে পেশাব বা পায়খানা লেগেছে এমন কাপড় পরে নামায পড়লে নামায পুনরায় পড়তে হবে, সেই নাপাকির পরিমাণ কম হোক বা বেশি।
ইমাম মুনাবি এই প্রসঙ্গের একটি উপসংহার টেনেছেন এবং বলেছেন, পোশাক ও শরীরের পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি শরয়ি দিক থেকে যেমন, তেমনই বিবেক ও প্রথার দিক থেকেও জরুরি...। শাইখুল ইসলাম বুরহান ইবনে আবু শরিফ রহ.-এর পোশাক ও কাপড়চোপড় থাকত অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি ও শুভ্র; তা এতটা বেশি যে, তখনকার যুগে রাজা-নৃপতিরাও এত শুভ্র ও পরিপাটি পোশাক পরতেন না। পোশাকের সঙ্গে তাকে মনে হতো একটি আলোকখণ্ড।
পরিচ্ছন্নতা মানুষের চোখে সমীহ বাড়িয়ে দেয়, তাদের মনে শ্রদ্ধা বৃদ্ধি করে। 'দরিদ্রদের' একটি শ্রেণি পরিচ্ছন্নতার দিকটি উপেক্ষা করে চলে, গুরুত্বই দেয় না। তাদের কারও কারও কাপড়চোপড় এতটাই নোংরা হয়ে পড়ে যে, বিবেক ও প্রথা উভয় দিক থেকে তার নিন্দা করা যায়। শয়তান তাদের কাছে পরিচ্ছন্নতার দিকটি অপ্রয়োজনীয় করে তোলে এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হতে দেয় না। শয়তান মন্ত্রণা দেয়, আগে অন্তর পরিষ্কার করো, তারপর পোশাক পরিষ্কার করা যাবে। শয়তান তো এদের কল্যাণ চায় না, বরং আল্লাহর ও তাঁর রাসুলের নির্দেশ মান্য করা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, তাদের সঙ্গে যারা ওঠাবসা করে তাদের হক আদায় করতে দেয় না এবং মজলিসের সৌজন্য সে রক্ষা করতে পারে না, যেহেতু মজলিসে পরিচ্ছন্নতাই কাম্য। তারা যদি যাচাই করে দেখত তাহলে বুঝতে পারত যে বাহ্যিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভ্যন্তরীণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতারই নিয়ামক। বর্ণিত হয়েছে যে, এ কারণে মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পোশাক কখনো নোংরা হতো না। বলা হয়ে থাকে যে, তাঁর শরীর থেকে সবসময় ঘ্রাণ বের হতো।
টিকাঃ
১০৫. সুরা আরাফ: আয়াত ২২।
১০৬. সাইয়িদ কুতুব, তাফসির ফি যিলালিল কুরআন, খ. ৩, পৃ. ১২৬৯।
১৩৭. তাকওয়ার পরিচ্ছদ অর্থাৎ সৎকাজ ও আল্লাহভীতি।
১৩৮. সুরা আরাফ: আয়াত ২৬।
১৩৯. সুরা মুদ্দাসসির: আয়াত ৪।
১৪০. সুরা মুদ্দাসসির: আয়াত ৩-৪।
১৪১. ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, খ. ৮, পৃ. ২৬৩।
১৪২. সুরা আরাফ: আয়াত ৩১।
১৪৩. সুরা আরাফ: আয়াত ৩২।
১৪৪. সুরা আরাফ: আয়াত ৩১।
১৪৫. ইমাম রাযি, আত-তাফসিরুল কাবির, খ. ১৪, পৃ. ২৩২।
১৪৬. আবু দাউদ, কিতাব আল-লিবাস, বাব: গুসলুস সাওব ওয়াল-খুলকান, হাদিস নং ৪০৬২।
১৪৭. মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২০১৬৬, ২০২১৩, ২০২৩১।
১৪৮. মুসলিম, কিতাব: আল-ঈমান, বাব: তাহরিমুল কির ওয়া বায়ানুহু, হাদিস নং ৯১।
১৪৯. সবটির ভিতর কার বিদাত এর গুল জালাজিল, হাদিস নং ৫২২৪।
১৫০. ইরাকের হারুরা এলাকার নামের সঙ্গে সংগতি রেখে খারিজিদের এ নামেও ডাকা হয়।
১৫১. কল দিবস, এব পিরাসুল গালিষ, হাদিস নং ৪০৩৭।
১৫২. আবু দাউদ, কিতাব : আস-সালাহ, বাব : আল-লুবসু লিল-জুমু'আহ, হাদিস নং ১০৭৮; ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ১০৯৬।
১৫৩. দেখুন, মাসায়িলুল ইমাম আহমাদ, পৃ. ৪১। তিনি ছাড়া অন্যান্য ইমাম ও ফকিহের মতও এটি।
১৫৪. মুনাবি, ফয়জুল কাদির, খ. ২, পৃ. ২৮৫।
📄 ঘরবাড়ি, পথ ও শহরের সৌন্দর্য
বাড়িঘর, পথ ও শহর মিলে একটি পরিমণ্ডল তৈরি করে, যেখানে মানুষ বসবাস করে। আজকের যুগের মানবসভ্যতা এই পরিমণ্ডলকে 'পরিবেশ' নামে জানে।
এখানে একটি ব্যাপার আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তা এই যে, আল্লাহ তাআলা এই পরিমণ্ডলের সৌন্দর্যকে পৃথিবীতে মানব-অস্তিত্বের অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে স্থির করেছেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী সালিহ আ.-এর জবানিতে বলেন,
«هُوَ أَنْشَأَكُمْ مِّنَ الْأَرْضِ وَاسْتَعْمَرَكُمْ فِيهَا»
তিনি তোমাদেরকে ভূমি হতে সৃষ্টি করেছেন এবং তাতেই তিনি তোমাদেরকে বসবাস করিয়েছেন।
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে কাসির রহ. বলেন, অর্থাৎ, আল্লাহ তোমাদের পৃথিবীতে আবাদকারী বানিয়েছেন, তোমরা পৃথিবীর মাটি আবাদ করবে এবং ফসল ফলাবে।
যায়দ ইবনে আসলাম বলেছেন, 'তিনি তোমাদের বসবাস করিয়েছেন' কথাটির অর্থ এই যে, পৃথিবীতে বসবাসের জন্য তোমাদের যা-কিছু প্রয়োজন-ঘরবাড়ি নির্মাণ, গাছপালা রোপণ, বীজ বোনা ও ফসল ফলানো-এ সবকিছু করার নির্দেশ তিনি তোমাদের দিয়েছেন। এটাও বলা হয় যে, তিনি তোমাদের মনের মধ্যে গাছপালা রোপণ ও ফসল ফলানো এবং নদীনালা খনন ও অন্যান্য কাজের প্রেরণা জুগিয়েছেন।
মুসলিমদের অন্তরে প্রোথিত ঈমানের সঙ্গে পথের একটি সামান্য সৌন্দর্যের বিষয়কে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চলার পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানোকে ঈমানের একটি অংশ বলে আখ্যায়িত করেছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
«الإِيْمَانُ بِضْعُ وَسَبْعُونَ، أَوْ بِضْعُ وَسِتُونَ شُعْبَةً؛ فَأَفْضَلُهَا قَوْلُ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الْأَذِى عَنِ الطَّرِيقِ»
ঈমান সত্তরটিরও বেশি বা ষাটটিরও বেশি শাখায় বিভক্ত, শ্রেষ্ঠ শাখা হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলা এবং সর্বনিম্ন শাখা হলো চলার পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া।
রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানোর অর্থ হলো যা-কিছু পথচারীকে কষ্ট দেয় বা কষ্ট দিতে পারে তা সরিয়ে রাখা বা দূরে ফেলে দেওয়া। তা হতে পারে পাথর বা ইটের টুকরো, হতে পারে কাঁটা বা অন্যকিছু।
কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়ার সওয়াব সদকার সওয়াবের অনুরূপ। আবু হুরাইরা রা. নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন,
«يُمِيطُ الأَذِى عَنِ الطَّرِيقِ صَدَقَةٌ»
রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানো সদকা।
কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া বরং এমন একটি কাজ, যার দ্বারা আল্লাহ তাঁর বান্দার গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং তাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন। ব্যাপারটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের জানিয়েছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
«بَيْنَمَا رَجُلٌ يَمْشِي بِطَرِيقٍ وَجَدَ غُصْنَ شَوْكٍ عَلَى الطَّرِيقِ، فَأَخَّرَهُ، فَشَكَرَ اللَّهُ لَهُ فَغَفَرَ لَهُ»
এক লোক রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল, সে পথের ওপর একটি কাঁটাযুক্ত ডাল পেল, ডালটি সে সরিয়ে দিলো। আল্লাহ তাআলা তার কাজটি কবুল করে নিলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন।
ইবনে মাজাহর বর্ণনায় রয়েছে, «كَانَ عَلَى الطَّرِيقِ غُصْنُ شَجَرَةٍ يُؤْذِي النَّاسَ، فَأَمَاطَهَا رَجُلٌ، فَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ»
পথের ওপর একটি গাছের ডাল পড়ে ছিল, মানুষকে তা কষ্ট দিচ্ছিল। একজন লোক তা সরিয়ে দিলো। ফলে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হলো।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী চলার পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠ কাজ, «عُرِضَتْ عَلَيَّ أَعْمَالُ أُمَّتِي حَسَنُهَا وَسَيِّئُهَا، فَوَجَدْتُ فِي مَحَاسِنِ أَعْمَالِهَا الْأَذِى يُمَاطُ عَنِ الطَّرِيقِ»
আমার সামনে আমার উম্মতের আমলসমূহ পেশ করা হলো, ভালো আমলও, খারাপ আমলও। আমি তাদের ভালো কাজের মধ্যে রাস্তা থেকে 'কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া'-ও পেলাম।
প্রখ্যাত সাহাবি আবু বুরযাহ আসলামি রা. একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ভালো কাজের কথা জানতে চাইলেন। বললেন, হে আল্লাহর নবী, আমাকে এমন কাজের কথা বলুন, যার দ্বারা উপকৃত হব। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জবাব ছিল এরূপ,
«إِزَالَةُ الْأَذَى عَنْ طَرِيقِ الْمُسْلِمِينَ»
মুসলিমদের চলার পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দাও।
আমরা আরও বেশি হতবাক হয়ে যাই যারা পথের এই বিধান লঙ্ঘন করে তাদের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সতর্কবাণী শুনে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
«مَنْ آذَى الْمُسْلِمِينَ فِي طُرُقِهِمْ، وَجَبَتْ عَلَيْهِ لَعْنَتُهُمْ»
যে লোক মুসলিমদের চলার পথে কষ্ট দেয়, তার ওপর তাদের অভিসম্পাত আবশ্যক হয়ে যায়।
ভেবে দেখেছেন কি! 'চলার পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া' প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ থেকে সাতটি দলিল এখনে সন্নিবিষ্ট হয়েছে। এই প্রসঙ্গে সবগুলো দলিলই আমরা সন্নিবিষ্ট করেছি তা বোঝাচ্ছি না। আমরা কোনো ধর্মাদর্শ, কোনো নীতি ও দর্শনের কথা জানি না, যা পথের সৌন্দর্যের ব্যাপারে এই পরিমাণ গুরুত্ব দিয়েছে। তর্কের খাতিরে যদি মেনেও নিই যে, এরকম কিছু ঘটেছে (অন্য কোনো ধর্মাদর্শ বা দর্শন রাস্তার পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যের ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়েছে), তবুও কেউ কি বলতে পারবে, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা রাখা ও যত্নশীল হওয়া গুনাহ মাফের ও জান্নাতে প্রবেশের কারণ হবে?
এখানে আরও একটি কাহিনি অনুধাবন করা যাক। একজন নারী সাহাবি, তার সম্পর্কে এতটুকুই জানি যে তিনি মসজিদ পরিষ্কার করতেন। একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার খোঁজ করলেন, তার সম্পর্কে জানতে চাইলেন। যখন জানলেন এই নারী মারা গেছেন, তিনি তাঁর সাহাবিদের তিরস্কার করলেন। কারণ, তারা সেই নারীর ব্যাপারটিকে তুচ্ছভাবে দেখেছেন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার মৃত্যুসংবাদ জানাননি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
«أَفَلَا كُنْتُمْ آذَنْتُمُونِي... دُلُّونِي عَلَى قَبْرِهَا. فَدُلُّوهُ، فَصَلَّى عَلَيْهَا»
তোমরা আমাকে তার খবর দিলে না কেন? আমাকে তার কবরটা দেখিয়ে দাও। সাহাবিরা মহিলাটির কবরটি দেখিয়ে দিলেন। নবীজি (তার কবরের কাছে গেলেন এবং) তার জানাযার নামায আদায় করলেন।
ইসলামের ইতিহাস এই নারীকে স্মরণীয় করে রেখেছে এবং তিনি সুনানের (হাদিসের) গ্রন্থাবলিতে অমর হয়ে রয়েছেন। তার কীর্তি তেমন কিছু নয়, তিনি শুধু মসজিদের পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে যত্নশীল ছিলেন। তাই তিনি-কেবল ইসলামি জীবনদর্শনে-অমরত্ব লাভের অধিকার পেয়েছেন; নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ব্যাপারে সাহাবিদের তিরস্কার করেছেন এবং মৃত্যুর পর তার জানাযার নামায পড়েছেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের চলাফেরার জায়গায় মলমূত্র ত্যাগ করতে নিষেধ করেছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, «اتَّقُوا اللَّعَانَيْنِ. قَالُوا: وَمَا اللَّعَانَانِ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: الَّذِي يَتَخَلَّى فِي طَرِيقِ النَّاسِ أَوْ فِي ظِلِّهِمْ»
তোমরা লানতের দুটি কাজ থেকে বিরত থাকো। সাহাবিরা বললেন, সে দুটি কাজ কী, ইয়া রাসুলাল্লাহ? তিনি বললেন, মানুষের চলাচলের পথে বা তাদের (বিশ্রাম নেওয়ার) ছায়ায় মলমূত্র ত্যাগ করা।
এই হাদিসের অর্থ এই যে, যে লোক মানুষের চলাচলের জায়গায় বা মানুষ যেখানে বসে ও বিশ্রাম নেয় সেখানে মলমূত্র ত্যাগ করে সে নিজের অভিসম্পাত ডেকে আনে। ইমাম সুলাইমান খাত্তাবি বলেছেন, লানতের দুটি কাজের দ্বারা উদ্দেশ্য হলো এমন দুটি বিষয় যা লানত টেনে আনে, মানুষকে লানত করতে উদ্বুদ্ধ করে ও আহ্বান জানায়।
কোনো বিশেষ জায়গা হলে সেখানকার পরিচ্ছন্নতার গুরুত্বও ছিল অত্যধিক, যেমন মসজিদ। এমনকি এ ব্যাপারে নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
«الْبُزَاقُ فِي الْمَسْجِدِ خَطِيئَةٌ، وَكَفَّارَتُهَا دَفْنُهَا»
মসজিদে থুথু ফেলা গুনাহের কাজ। তার কাফফারা হলো তা (মাটির সঙ্গে) মিটিয়ে দেওয়া।
ইহুদিরা তাদের বাড়িঘর-আঙিনা পরিষ্কার রাখত না। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাহাবিদের এ কথা বলে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন,
طَهِّرُوا أَفْنِيَتَكُمْ؛ فَإِنَّ الْيَهُودَ لَا تُطَهِّرُ أَفْنِيَتَهَا
তোমরা তোমাদের ঘরবাড়ির আঙিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখো, কারণ ইহুদিরা তাদের আঙিনা পরিচ্ছন্ন রাখে না।
অন্য একটি রেওয়ায়েতে আছে,
نَظِفُوا أَفْنِيَتَكُمْ؛ فَإِنَّ الْيَهُودَ أَنْتَنُ النَّاسِ
তোমরা তোমাদের আঙিনা পরিচ্ছন্ন রাখো, কারণ ইহুদিরা সবচেয়ে নোংরা মানুষ।
এই বিশেষ নির্দেশ প্রমাণ করে যে, ইসলামে সৌন্দর্যচর্চা একটি মৌলিক বিষয়, তা উষ্ণ পরিবেশের প্রভাবের ফল ছিল না-যেমনটি বিশ্বাস করেন কতিপয় পশ্চিমা গবেষক এবং পূর্ববর্তী কোনো ধর্মাদর্শ বা জীবনাদর্শের প্রভাবও ছিল না।
ইসলাম নফল নামায ঘরে আদায় করতে উৎসাহিত করেছে। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
«إِذَا قَضَى أَحَدُكُمُ الصَّلَاةَ فِي مَسْجِدِهِ، فَلْيَجْعَلْ لِبَيْتِهِ نَصِيبًا مِنْ صَلَاتِهِ؛ فَإِنَّ اللَّهَ جَاعِلٌ فِي بَيْتِهِ مِنْ صَلَاتِهِ خَيْرًا»
তোমাদের কেউ যখন মসজিদে (ফরয) নামায আদায় করে, সে যেন তার কিছু নামায (সুন্নত ও নফল) বাড়িতেও আদায় করে। কারণ আল্লাহ তাআলা তার বাড়িতে আদায় করা কিছু নামাযের মধ্যে কল্যাণ রেখেছেন।
এই হাদিসের দ্বারা ঘরগুলোও ভিন্ন ধরনের ছোট ছোট মসজিদে পরিণত হয়েছিল। তাই ঘরগুলোর পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা ছিল অপরিহার্য, যাতে নামায শুদ্ধ হয়। এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর উম্মতকে নির্দেশ দিয়েছেন। সামুরা ইবনে জুন্দুব রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের বাড়িতে মসজিদ (নামায পড়ার নির্দিষ্ট জায়গা) বানিয়ে নিতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গোসলের জায়গায় পেশাব করতে নিষেধ করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
«لَا يَبُولَنَّ أَحَدُكُمْ فِي مُسْتَحَمِّهِ، ثُمَّ يَتَوَضَّأُ فِيهِ»
এমন যেন না হয় যে, তোমাদের কেউ তার গোসলখানায় পেশাব করল, অতঃপর সে সেখানেই অজু করল।
এই হলো বাড়িতে বা পথে অপরিচ্ছন্নতা ও নোংরামির ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞামূলক কিছু হাদিস।
চারপাশের পরিমণ্ডল ও পরিবেশের ব্যাপারে কেবল নিষেধাজ্ঞাই আসেনি, বরং ইসলাম বৃক্ষরোপণের প্রতিও উৎসাহিত করেছে। আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَغْرِسُ غَرْسًا أَوْ يَزْرَعُ زَرْعًا، فَيَأْكُلُ مِنْهُ طَيْرُ أَوْ إِنْسَانُ أَوْ بَهِيمَةُ، إِلَّا كَانَ لَهُ بِهِ صَدَقَةٌ. وفي رواية مسلم: وَمَا سُرِقَ مِنْهُ لَهُ صَدَقَةٌ... وَلَا يَرْزَؤُهُ أَحَدٌ إِلَّا كَانَ لَهُ صَدَقَةٌ
যে মুসলিম একটি গাছ রোপণ করবে বা কোনো বীজ বপন করবে, তারপর তা থেকে কোনো পাখি বা মানুষ বা চতুষ্পদ জন্তু খাবে, এর জন্য সে সদকার সওয়াব পাবে।
মুসলিমের একটি রেওয়ায়েতে রয়েছে, তা থেকে কিছু চুরি হলে সেটাও সদকা এবং কেউ তা নষ্ট করলেও সে সদকার সওয়াব পাবে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বরং কিয়ামত সন্নিকট হলেও বৃক্ষরোপণের নির্দেশ দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
«إِنْ قَامَتِ السَّاعَةُ وَفِي يَدِ أَحَدِكُمْ فَسِيلَةٌ، فَإِنِ اسْتَطَاعَ أَنْ لَا يَقُومَ حَتَّى يَغْرِسَهَا فَلْيَغْرِسْهَا»
কিয়ামত এসে গেছে, এই সময়েও যদি তোমাদের কারও হাতে খেজুরের একটি চারাগাছ থাকে এবং সে তা রোপণ করতে সক্ষম হয়, তাহলে যেন চারাটি রোপণ করে দেয়।
বৃক্ষরোপণ ও ফসল ফলানোর প্রতি উৎসাহদান ও উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে এর চেয়ে শক্তিশালী কোনো হাদিস নেই। কারণ তা মুসলিম ব্যক্তির সৃষ্টিশীল ও কল্যাণসাধক ফিতরাত বা স্বভাবের পরিচায়ক, সে স্বভাবগত দিক থেকেই জীবন ও প্রাণ বিকাশে একজন উদার কর্মী। প্রবহমান প্রস্রবণের মতো। কখনো শুকায় না, কখনো থেমে যায় না। সে দিতেই থাকে, কাজ করতেই থাকে, এমনকি জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগ পর্যন্ত কাজ করে যায়। যদি কিয়ামত ঘটার উপক্রম হয় তাহলেও সে বৃক্ষরোপণ করে যাবে, বীজ বুনে যাবে। সে নিজে কিছুতেই তার রোপিত গাছের ফল খেতে পারবে না, সে ছাড়া পরে অন্য কেউ খেতে পারবে তাও নয়। কারণ মহাপ্রলয় তার দুন্দুভি বাজাচ্ছে অথবা এক্ষুনি তার শিঙায় ফুঁক দেওয়া হবে। এখানে কর্মই কর্মের উদ্গাতা, কারণ তা একপ্রকারের ইবাদত এবং শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত জমিনের বুকে আল্লাহর খেলাফতের দায়িত্বপালনের প্রয়াস।
ইসলামি ফিকহে ভূমিকে আবাদ করা-সংশ্লিষ্ট পরিভাষাটি মৃত জমিনে প্রাণ সঞ্চার করা নামে পরিচিত। মৃত জমিন হলো অনুর্বর পরিত্যক্ত ভূমি। এই ব্যাখ্যা নেওয়া হয়েছে নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিম্নবর্ণিত হাদিস থেকে,
«مَنْ أَحْيَا أَرْضًا مَيِّتَةً فَهِيَ لَهُ»
যে লোক পরিত্যক্ত ভূমিতে চাষাবাদ করল তা তার।
ইসলাম একদিকে পরিচ্ছন্নতার নির্দেশ দিয়েছে এবং যেকোনো ধরনের অপরিচ্ছন্নতা ও নোংরামি থেকে বিরত থাকতে বলেছে, অন্যদিকে বৃক্ষরোপণ করতে বলেছে। এ কারণেই ইসলামের স্বর্ণযুগে মুসলিমদের বাড়িঘর ও শহর সৌন্দর্য ও নান্দনিকতার একেকটি টুকরো ছিল।
টিকাঃ
১৫৫. সুরা হুদ: আয়াত ৬১।
১৫৬. আবু হাইয়ান আন্দালুসি, তাফসিরুল বাহরিল মুহিত, খ. ৫, পৃ. ২৩৬।
১৫৭. ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আযিম, খ. ৪, পৃ. ৩৩১।
১৫৮. মুসলিম, আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত হাদিস, কিতাব: আল-ঈমান, বাব: বায়ানু আদাদি শুআবিল ঈমান ওয়া আফদালুহা ওয়া আদনাহা, হাদিস নং ৫৮; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৮৯১৩; ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ১৬৬।
১৫৯. বুখারি, কিতাব: আল-জিহাদ ওয়াস-সিয়ার, বাব: মান আখাযা বির-রিকাব ওয়া নাহবিহি, হাদিস নং ২৮২৭।
১৬০. বুখারি, কিতাব: আল-মাযালিম, বাব: মান আখাযাল গুসনা ওয়া-মা ইয়ুযিন নাসা ফিত-তারিকি ফা-রামা বিহি, হাদিস নং ২৩৪০; মুসলিম, কিতাব : আল-ইমারাহ, বাব: বায়ানুশ শুহাদা, হাদিস নং ১৯১৪।
১৬১. ইবনে মাজাহ, কিতাব: আল-আদাব, বাব: ইমাতাতুল আযা আনিত তারিক, হাদিস নং ২৬৮২।
১৬২. মুসলিম, কিতাব: আল-মাসাজিদ ওয়া মাওয়াদিউস-সালাহ, বাব: আন-নাহয় আনিল বুসাকি ফিল-মাসজিদি ফিস-সালাতি ওয়া-গাইরিহা, হাদিস নং ৫৫৩।
১৬৩. মুসলিম, কিতাব: আল-বিররু ওয়াস-সিলাহ ওয়াল-আদাব, বাব: ইযালাতুল আযা আনিত-তারিক, হাদিস নং ২৬১৮।
১৬৪. তাবারানি, আল-মুজামুল কাবির, হাদিস নং ৩০৫১।
১৬৫. বুখারি, আবওয়াবুল মাসাজিদ, বাব: কানসুল মাসজিদি ওয়ালতিকাতুল খিরাকি ওয়াল-কাযা ওয়াল-ঈমান; হাদিস নং ৪৪৬, মুসলিম, কিতাব: আল-জানায়িয, বাব: আস-সালাতু আলাল-কার, হাদিস নং ৯৫৬। উদ্ধৃত হাদিসটি মুসলিম থেকে।
১৬৬. মুসলিম, কিতাব: আত-তাহারাহ, বাব: আন-নাহয় আনিত-তাখাল্লি ফিত-তুরুকি ওয়ায-যিলাল, হাদিস নং ২৬৯।
১৬৭. আবু সুলাইমান খাত্তাবি (৩১৯-৩৮৮ হি./৯৩১-৯৯৮ খ্রি.): হামদ ইবনে ইবরাহিম ইবনুল খাত্তাব বাসতি। ফকিহ ও মুহাদ্দিস। আফগানিস্তানের বাস্ত এলাকার অধিবাসী। যায়দ ইবনুল খাত্তাবের বংশধর। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: মাআলিমুস সুনান। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ২, পৃ. ২৭৩।
১৬৮. নববি, আল-মিনহাজ, খ. ৩, পৃ. ১৬১।
১৬৯. বুখারি, আবওয়াবুল মাসাজিদ, বাব: কাফফারাতুল বুযাকি ফিল-মাসজিদ, হাদিস নং ৪০৫; মুসলিম, কিতাব: আল-মাসাজিদ ওয়া মাওয়াদিউস সালাত, বাব: আন-নাহয় আনিল বুযাকি ফিল-মাসজিদি ফিস-সালাত ওয়া গাইরিহা, হাদিস নং ৫৫২।
১৭০. তাবারানি, আল-মুজামুল আওসাত, খ. ৪, পৃ. ২৩১।
১৭১. তিরমিযি, সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস থেকে বর্ণিত হাদিস, কিতাব: আল-আদাব, বাব: আন- নাযাফাহ, হাদিস নং ২৭৯৯; মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদিস নং ৭৯০।
১৭২. মুসলিম, কিতাব: আল-হাজ্জ, বাব: ইসতিহবাবু রামই জামরাতিল আকাবাহ ইয়াওমান নাহরি রাকিবান... হাদিস নং ১২৯৮।
১৭৩. আবু দাউদ, কিতাব: আস-সালাত, বাব: ইত্তিখাযুল মাসাজিদ ফিদ-দুর, হাদিস নং ৪৫৬; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২০১৯৬; তিরমিযি, হাদিস নং ৫৯৪; ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ৭৫৯; ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ১৬৩৪।
১৭৪. আবু দাউদ, কিতাব: আত-তাহারা, বাব: আল-বাউলু ফিল-মুস্তাহাম হাদিস নং ২৭, নাসায়ি, হাদিস নং ৩৬, ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ৫০৪।
১৭৫. কুরতুবি, কিতাব আল-জুবারাআ, বাব: ফাদলুস যারা ওয়াল-গারাসি ইযা আকালা মিনহু, হাদিস নং ১৬৯১।
১৭৬. ইমাম বুখারি, আল-আদাবুল-মুফরাদ, হাদিস নং ৪৭৯।
১৭৭. ইউসুফ কারযাভি, রিআয়াতুল বিআতি ফি শরিআতিল ইসলাম, পৃ. ৬৩।
১৭৮. আবু দাউদ, কিতাব : আল-খারাজ, বাব : ইহইয়াউল মাওয়াত, হাদিস নং ৩০৭৩; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ১৪৩১০। উমর রা. থেকে ইমাম বুখারি মাওকুফরূপে বর্ণনা করেছেন, হাদিস নং ২৩৩৫।
📄 সুন্দর রুচিবোধ
রুচিবোধ বলতে বোঝায় স্বচ্ছ-নির্মল অভ্যন্তরীণ অনুভূতিকে, এর ফলে একজন ব্যক্তি অন্যদের অনুভূতি ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রতি যত্নশীল থাকে। মানুষের সঙ্গে আচার-আচরণের এটাই হলো আদবকেতা। অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে এটি সুন্দর বিদ্যা।
রুচিবোধের বিষয়টি যেমন বাহ্যিক হতে পারে তেমনই অভ্যন্তরীণ বা মানসিকও হতে পারে। এখানে রুচিবোধের কিছু বহিঃপ্রকাশ নিয়ে আলোচনা করব। এসব ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশনা রয়েছে এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও এসব নির্দেশ দিয়েছেন। এসব ক্ষেত্রে তিনিই আমাদের আদর্শ ও নমুনা।
**a. চলাচলের পথে ও কণ্ঠস্বরের ক্ষেত্রে সুন্দর রুচিবোধের প্রকাশ:**
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا
রহমান-এর বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদেরকে যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, ‘সালাম’।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
وَلَا تُصَعِّرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُوْرٍ وَاقْصِدْ فِي مَشْيِكَ وَاغْضُضْ مِنْ صَوْتِكَ إِنَّ أَنْكَرَ الْأَصْوَاتِ لَصَوْتُ الْحَمِيْرِ
অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে বিচরণ করো না। নিশ্চয় আল্লাহ কোনো উদ্ধত, অহংকারীকে পছন্দ করেন না। তুমি পদচারণায় মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো এবং তোমার কণ্ঠস্বর সংযত রাখো, নিশ্চয় সুরের মধ্যে গর্দভের সুরই সবচেয়ে অপ্রীতিকর।
ইবনে কাসির উপর্যুক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, আওয়াজের ক্ষেত্রে গাধার সঙ্গে তুলনার কারণে তা নিষিদ্ধ ও চূড়ান্ত তিরস্কারের উপযুক্ত হওয়ার কথা। কারণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
لَيْسَ لَنَا مَثَلُ السَّوْءِ الَّذِي يَعُودُ فِي هِبَتِهِ كَالْكَلْبِ يَرْجِعُ فِي قَيْنِهِ
নিকৃষ্ট উপমা দেওয়া আমাদের জন্য শোভনীয় নয় (তবু বলতে হয়), যে দান করে ফিরিয়ে নেয় সে ওই কুকুরের মতো যে বমি করে আবার তা খায়।
**২. অন্যদের বিরক্ত না করার ক্ষেত্রে সুন্দর রুচিবোধের প্রকাশ :**
আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ يُنَادُونَكَ مِنْ وَرَاءِ الْحُجُرَاتِ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ)
যারা ঘরের বাইরে থেকে আপনাকে উচ্চৈঃস্বরে ডাকে তাদের অধিকাংশই নির্বোধ।
এই আয়াত কিছু গ্রাম্য লোকের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। এদের দুর্ব্যবহার ও অসৌজন্যমূলক আচরণের কথা আল্লাহ তাআলা তুলে ধরেছেন। আল্লাহ তাঁর রাসুলের ওপর যা নাযিল করেছেন তার সীমারেখা না জানাটা তাদের জন্য সংগত। প্রতিনিধি হিসেবে তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছিল। তারা তাকে তার ঘরে, কোনো এক স্ত্রীর কামরায় পেল। আদবও দেখাল না, ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করল না যে, তিনি নিজ থেকে বাইরে বেরিয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করবেন। বরং চিৎকার করে ডাকতে লাগল, মুহাম্মাদ, হে মুহাম্মাদ! বেরিয়ে এসো! তাই আল্লাহ তাদের বুদ্ধি-বিবেক নেই বলে নিন্দা করলেন। আল্লাহর রাসুলের সঙ্গে কীভাবে আদব-তমিজ ও সম্মান দেখাতে হবে তা তারা বোঝেইনি। কারণ আদবকেতা ও সৌজন্যবোধ বুদ্ধিমত্তা ও বিবেকেরই পরিচায়ক।
**৩. পথ ও রাস্তার ক্ষেত্রে সুন্দর রুচিবোধের প্রকাশ:**
আবু সাইদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِيَّاكُمْ وَالْجُلُوسَ بِالطُّرُقَاتِ. فقالوا: يا رسول الله، ما لنا من مجالسنا بد، نتحدث فيها. فقال: "إِذْ أَبَيْتُمْ إِلَّا الْمَجْلِسَ فَأَعْطُوا الطَّرِيقَ حَقَّهُ. قالوا: وما حق الطريق يا رسول الله؟ قال: غَضُ الْبَصَرِ، وَكَفُ الأَذَى، وَرَدُّ السَّلامِ، وَالْأَمْرُ بِالْمَعْرُوفِ، وَالنَّهْيُ عَنِ الْمُنْكَرِ»
তোমরা রাস্তার ওপর বসা থেকে বিরত থাকো। তারা (সাহাবিগণ) বললেন, আমাদের তো রাস্তার ওপর বসা ছাড়া গত্যন্তর নেই। কারণ, রাস্তায় আমরা প্রয়োজনীয় কথাবার্তা সমাধা করি। তিনি বললেন, যদি তোমরা সেখানে বসতে একান্ত বাধ্যই হও তবে রাস্তার হক আদায় করবে। তারা বললেন, রাস্তার হক কী, ইয়া রাসুলুল্লাহ? তিনি বললেন, দৃষ্টি নিচু রাখা, কাউকে (পথচারীকে) কষ্ট না দেওয়া, সালামের জবাব দেওয়া, সৎকাজের আদেশ করা ও অসৎকাজে নিষেধ করা।
**৪. আতিথ্যগ্রহণ ও অনুমতিগ্রহণের ক্ষেত্রে সুন্দর রুচিবোধের প্রকাশ:**
আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَدْخُلُواْ بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّىٰ تَسْتَأْنِسُواْ وَتُسَلِّمُواْ عَلَىٰ أَهْلِهَا ۚ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ لَّعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ﴾
হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের ঘর ছাড়া অন্য কারও ঘরে ঘরবাসীদের অনুমতি না নিয়ে এবং তাদের সালাম না দিয়ে প্রবেশ করো না। তা-ই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, «الْاسْتِئْذَانُ ثَلَاثٌ؛ فَإِنْ أُذِنَ لَكَ، وَإِلَّا فَارْجِعُ»
অনুমতি চাইবে তিন বার; অনুমতি দিলে তো ভালোই, অন্যথায় ফিরে আসবে।
**৫. স্ত্রীর সঙ্গে সদাচারে সুন্দর রুচিবোধের প্রকাশ :**
সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
وَلَسْتَ تُنْفِقُ نَفَقَةً تَبْتَغِي بِهَا وَجْهَ اللَّهِ إِلَّا أُجِرْتَ بِهَا حَتَّى اللُّقْمَةَ تَجْعَلُهَا فِي فِي امْرَأَتِكَ
তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে যা-কিছু দান করবে তার বিনিময়ে প্রতিদান পাবে, এমনকি তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে যে লোকমা তুলে দাও তার বিনিময়েও।
সাইয়িদা আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
كُنْتُ أَشْرَبُ وَأَنَا حَائِضٌ ثُمَّ أُنَاوِلُهُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَيَضَعُ فَاهُ عَلَى مَوْضِعِ فِي فَيَشْرَبُ وَأَتَعَرَّقُ الْعَرْقَ وَأَنَا حَائِضُ ثُمَّ أُنَاوِلُهُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَيَضَع فَاه على موضع في
আমি ঋতুমতী অবস্থায় পানি পান করতাম, তারপর তা (পানির পাত্রটি) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দিতাম, তিনি আমার মুখের জায়গায় মুখ লাগিয়েই পান করতেন। আমি ঋতুমতী অবস্থায় হাড়ের গোশত খেতাম, তারপর তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দিতাম। তিনি আমার মুখের জায়গায় মুখ রেখেই খেতেন।
**৬. হাঁচি দেওয়ার ক্ষেত্রে সুন্দর রুচিবোধের প্রকাশ:**
আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হাঁচি দিতেন তাঁর হাত বা কাপড় মুখের ওপর রাখতেন এবং এভাবে হাঁচির আওয়াজ ছোট করতেন।
**৭. হাঁচিদাতার সঙ্গে আচরণে সুন্দর রুচিবোধের প্রকাশ :**
আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
عطَسَ رَجُلانِ عِنْدَ النَّبِيِّ، فَشَمَّتَ أَحَدَهُمَا وَلَمْ يُشَمِّتِ الْآخَرَ، فَقِيلَ لَهُ، فَقَالَ: هُذَا حَمِدَ اللَّهَ وَهُذَا لَمْ يَحْمَدِ اللَّهَ
একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে দুই লোক হাঁচি দিলো। তিনি তাদের একজনের জবাব দিলেন, আরেকজনের জবাব দিলেন না। তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, এই লোক আলহামদুলিল্লাহ বলেছে, আর ওই লোক আলহামদুলিল্লাহ বলেনি।
**৮. হাই তোলার ক্ষেত্রে সুন্দর রুচিবোধের প্রকাশ :**
আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
«التَّقَاؤُبُ مِنَ الشَّيْطَانِ، فَإِذَا تَثَاءَبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَرُدَهُ مَا اسْتَطَاعَ»
হাই আসে শয়তানের থেকে, তাই তোমাদের হাই আসলে সে যেন তা যথাসম্ভব রোধ করে।
**৯. ঘ্রাণের ক্ষেত্রে সুন্দর রুচিবোধের প্রকাশ :**
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
«مَنْ أَكَلَ مِنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ - يُرِيدُ الثَّومَ - فَلَا يَغْشَانَا فِي مَسَاجِدِنَا»
কেউ এই গাছ-অর্থাৎ রসুন-খেয়ে থাকলে সে যেন মসজিদে আমাদের সঙ্গে না মেশে।
মুসলিমের রেওয়ায়েতে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে স্পষ্ট বর্ণিত হয়েছে যে, এই নিষেধাজ্ঞা গন্ধের কারণে। ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
«مَنْ أَكَلَ مِنْ هَذِهِ الْبَقْلَةِ، فَلَا يَقْرَبَنَّ مَسَاجِدَنَا حَتَّى يَذْهَبَ رِيحُهَا»
যে লোক এই সবজি (রসুন) খাবে, সে যেন এর গন্ধ দূর না হওয়া পর্যন্ত আমাদের মসজিদের নিকটবর্তী না হয়।
**১০. মুসাফাহার ক্ষেত্রে সুন্দর রুচিবোধের প্রকাশ:**
আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কারও সঙ্গে মুসাফাহা করতেন, অপর লোক রাসুলুল্লাহর হাত না ছাড়া পর্যন্ত তিনি তার হাত ছেড়ে দিতেন না।
**১১. সফর থেকে ফিরে আসার ক্ষেত্রে সুন্দর রুচিবোধের প্রকাশ :**
কোনো পুরুষ সফর থেকে ফিরে এসে হুট করে তার স্ত্রীর কাছে যাবে না। কারণ সে স্ত্রীকে এমন অবস্থায় দেখতে পারে, যা তার পছন্দ নয়। এ ব্যাপারে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত হাদিস রয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ، لا تَطْرُقُوا النِّسَاءَ لَيْلاً، وَلَا تَغْتَرُوهُنَّ
হে লোকেরা, তোমরা (সফর থেকে ফিরে এসে) রাতেরবেলা তোমাদের স্ত্রীদের সঙ্গে (তাদের জানান না দিয়ে) সাক্ষাৎ করো না এবং তাদের আত্মপ্রবঞ্চনায় ফেলো না।
**১২. বসার ক্ষেত্রে সুন্দর রুচিবোধের প্রকাশ:**
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুই ব্যক্তির মাঝে তাদের অনুমতি ব্যতীত কাউকে বসতে নিষেধ করেছেন।
এই হলো সুন্দর রুচিবোধের বহিঃপ্রকাশের কিছু ক্ষেত্র, এসব ব্যাপারে ইসলাম গভীর ও সূক্ষ্ম নির্দেশনা দিয়েছে। পাশাপাশি ব্যাখ্যাও রয়েছে।
কখনোই কোনো মতবাদের উদ্গাতা, কোনো ধর্মাদর্শের প্রবর্তক বা কোনো আইন-প্রণেতা এসব বিষয়ে সচেতন ছিলেন না। এটাই আল্লাহ তাআলার বিধান ও মানুষের বিধানের মধ্যে পার্থক্য, ইসলাম এবং অন্যান্য মতাদর্শ ও দর্শনের মধ্যকার ভিন্নতা। এভাবে পার্থক্য সূচিত হয় আমাদের সভ্যতার ও অন্যান্য সভ্যতার মধ্যে।
টিকাঃ
১৭৯. শান্তি কামনা করে, তর্কে লিপ্ত হয় না।- অনুবাদক
১৮০. সুরা ফুরকান: আয়াত ৬৩।
১৮১. সুরা লুকমান: আয়াত ১৮-১৯।
১৮২. বুখারি, কিতাব: আল-হিবাহ ওয়া ফাদলুহা, বাব: লা ইয়াহিলু লি-আহাদিন আন ইয়ারজিআ ফি হিবাতিহি ওয়া সাদাকাতিহি, হাদিস নং ২৪৭৯।
১৮৩. ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আযিম, খ. ৬, পৃ. ৩৩৯।
১৮৪. বনু তামিমের একটি দল নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসে। তখন তিনি তাঁর কামরায় অবস্থান করছিলেন। তারা কামরার পেছন থেকে চিৎকার করে তাকে ডাকতে থাকে। আয়াতটি এই ঘটনার প্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়। এতে এবং এই সুরার আরও কিছু আয়াতে সামাজিক শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।- অনুবাদক
১৮৫. সুরা হুজুরাত: আয়াত ৪।
১৮৬. আস-সাদি, তাইসিরুল কারিমির রাহমান ফি তাফসিরি কালামিল মান্নান (তাফসিরে সাদি), পৃ. ৭৯৯।
১৮৭. বুখারি, আবু সাঈদ আল-খুদরি রা. থেকে বর্ণিত হাদিস, কিতাব : আল-মাযালিম, বাব : আফনিয়াতুদ দুর ওয়াল-জুলুসি ফিহা ওয়াল-জুলুসি আলাস-সুউদাত, হাদিস নং ২৩৩৩; মুসলিম, কিতাব : আল-লিবাস ওয়ায-যিনাহ, বাব: আন-নাহয় আনিল-জুলুসি ফিত-তুরুকাত ওয়া ই'তাউত তারিকি হাক্কাহু, হাদিস নং ১১৪।
১৮৮. সুরা নুর: আয়াত ২৭।
১৮৯. বুখারি, কিতাব: আল-ইসতিযান, বাব: আত-তাসলিম ওয়াল-ইসতিযান সালাসান, হাদিস নং ৫৮৯১; মুসলিম, কিতাব আল-আদাব, বাব: আল-ইসতিযান, হাদিস নং ৩৪।
১৯০. বুখারি, কিতাব: আল-মাগাযি, বাব হাজ্জাতুল বিদা, হাদিস নং ৪১৪৭; মুসলিম, কিতাব: আল-ওয়াসিয়্যাহ, বাব: আল-ওয়াসিয়্যাতু বিস-সুলুস, হাদিস নং ১৬২৮।
১৯১. মুসলিম, কিতাব: আল-হায়দ, বাব: জাওয়াযু গুসলি রাসি যাওজিহা ওয়া তারজিলিহি... হাদিস নং ৩০০; নাসায়ি, হাদিস নং ২৮২; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২৫৬৩৫।
১৯২. আবু দাউদ, কিতাব: আল-আদাব, বাব : ফিল-উতাস, হাদিস নং ৫০২৯; তিরমিযি, হাদিস নং ২৭৪৫।
১৯৩. বুখারি, কিতাব: আল-আদাব, আল-হামদু লিল-আতিসি, হাদিস নং ৫৮৬৭; মুসলিম, কিতাব : আয-যুহদ ওয়ার-রাকায়িক, বাব: তাশমিতুল আতিস ওয়া কারাহাতুত তাসাউব, হাদিস নং ২৯৯১।
১৯৪. বুখারি, কিতাব: বাদউল খাল্ক, বাব : সিফাতু ইবলিস ওয়া জুনুদিহি, হাদিস নং ৩১১৫; মুসলিম, কিতাব: আয-যুহ্দ ওয়ার-রাকায়িক, বাব: তাশমিতুল আতিসি ওয়া কারাহাতুত তাসাউব, হাদিস নং ২৯৯৪।
১৯৫. বুখারি, কিতাব: সিফাতুস সালাত, বাব: মাজাআ ফিসসুমিন নিয়্যি ওয়াল-বাসাল ওয়াল-কুররাস, হাদিস নং ৮১৬; মুসলিম, কিতাব: আল-মাসাজিদ ওয়া মাওয়াদিউস সালাত, বাব: নাহয়ু মান আকালা সুমান আও বাসালান আও কুররাসান আও নাহওয়াহা, হাদিস নং ৫৬৪। হাদিসটি বুখারি থেকে উদ্ধৃত।
১৯৬. মুসলিম, কিতাব : আল-মাসাজিদ ওয়া মাওয়াদিউস সালাত, বাব : নাহয়ু মান আকালা সুমান আও বাসালান আও কুররাসান আও নাহওয়াহা, হাদিস নং ৫৬১।
১৯৭. তিরমিযি : সিফাতুল কিয়ামা ওয়ার-রাকায়িক ওয়াল-ওয়ারা, হাদিস নং ২৪৯০; ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ৩৭১৬।
১৯৮. দারিমি, বাব : তাজিলু উকুবাতি মান বালাগাহু আনিন নাবিয়্যি হাদিসুন ফালাম ইয়ুআযযিমহু, হাদিস নং ৪৪৪; আবু ইয়ালা, হাদিস নং ১৮৪৩; হাকিম, হাদিস নং ৭৭৯৮।
১৯৯. আবু দাউদ, কিতাব : আল-আদব, বাব : আর-রাজুলু ইয়াজলিসু বাইনার রাজুলাইনি বিগাইরি ইযনিহা, হাদিস নং ৪৮৪৪; তিরমিযি, হাদিস নং ২৭৫২; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৬৯৯৯।