📄 ফোয়ারা
বাগানে পানির ব্যবহারে মুসলিম কৃষিবিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও শিল্পীর দক্ষতার অসাধারণ নজির হলো ইসলামি বাগানগুলোতে ফোয়ারার বিস্তার।
মুসলিমদের বাগানগুলোতে পানিকে বিভিন্নরূপে ব্যবহার করা হয়েছে: বৃক্ষরাজির ঘন ছায়াঢাকা কৃত্রিম জলাশয়রূপে; পানির পৃষ্ঠদেশের পরিবর্তন-সহায়ক ফোয়ারারূপে, ফলে পানি প্রতিবিম্বিত পৃষ্ঠদেশরূপে কাজ করে না; বা উঁচু নলের সারিরূপে, যা থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে এবং শ্রুতিমধুর কুলকুল ধ্বনি তোলে অথবা ঝরনারূপে।
আমরা লক্ষ করেছি, মুসলিমবিশ্বজুড়ে বাগানের বিস্তৃতি ছিল ব্যাপক এবং আমরা আরও লক্ষ করেছি, ঘরবাড়ির ভেতর-আঙিনাতেও বাগানের বিস্তৃতি ছিল। তাই আমরা বলতে পারি, মুসলিম শহরগুলোর প্রত্যেক বাগানে ফোয়ারার সংখ্যা অনুমান করার জন্য আমাদের পক্ষে এই চিন্তাকে দ্বিগুণ করে নেওয়া সম্ভব। কারণ ফোয়ারার সংখ্যা এত বেশি যে তা গোনা সম্ভব নয়।
মুসলিম সমাজের দরিদ্র ঘরগুলো সম্পর্কে বর্ণনা দিয়েছেন উইল ডুরান্ট। তিনি বলেছেন, তখনকার দিকে দরিদ্রদের ঘরগুলোও ছিল— এখনো যেমন রয়েছে— আয়তক্ষেত্রকার; মাটি দিয়ে সংযুক্ত ইটের কাঠামোতে তৈরি, ছাদে থাকত মাটির মিশ্রণ, উদ্ভিদের অংশ, গাছের ডাল, খেজুরগাছের ডাল ও খড়। এগুলোর চেয়ে উন্নত এক শ্রেণির ঘর ছিল, সেগুলোর ভেতর দিকে থাকত উন্মুক্ত উঠান, পানির ছোট হাউজ, কখনো কখনো গাছও থাকত। মাঝে মাঝে এসব ঘরে থাকত একগুচ্ছ কাঠের খুঁটি, ঘরের কামরাগুলো ও উঠানের মাঝ বরাবর থাকত বারান্দা।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, উসমানি খেলাফতের যুগে কেবল বেলগ্রেডেই ছিল ছয়শ পাবলিক ফোয়ারা।
গত কয়েক বছর ধরে মরোক্কান কর্তৃপক্ষ ফেজ শহরের প্রাচীন ফোয়ারাগুলোর সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করার উদ্যোগ নিয়েছে। যে পরিসংখ্যান বেরিয়েছে তাতে বলা হয়েছে, ফেজের সড়কগুলোতে সত্তরটি পাবলিক ফোয়ারা পাওয়া গেছে। পুরোনো আবাসিক ভবন, মসজিদ ও মাদরাসার অভ্যন্তরীণ আঙিনায় পাওয়া গেছে প্রায় চারশ ফোয়ারা। ঐতিহাসিক উৎসগুলো নির্দেশ করে যে, এই প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শহরে খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দী থেকে এসব ফোয়ারা ছিল। পানির জন্য সব মানুষ এসব ফোয়ারার ওপর নির্ভরশীল ছিল; নিজেরা পানি পান করত, পশুপাখিদের পান করাতো এবং বাগানেও পানি সেচ দিত। এটা বিশ্বাস করা হয় যে, প্রায় দশ শতাব্দী আগে ফেজ শহরে পানি-সরবরাহের যে জটিল সিস্টেম ছিল তার সঙ্গে এসব ফোয়ারার অস্তিত্ব ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
সেই সময় ফোয়ারা কেবল আভিজাত্য ও বিলাসিতার বিষয় ছিল না, বরং পানি ব্যবহারে ইসলামি সভ্যতার যে দর্শন তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও ছিল এটি। এই দর্শনের মূলকথা হলো, ব্যবহারিক দিকগুলোর সঙ্গে আত্মিক ও অনুভূতিগত উপভোগের দিকগুলোর সমন্বয় সাধন।
গ্রানাডার জান্নাতুল আরিফে ফোয়ারাগুলো থেকে পানি উচ্ছলিত ধারায় প্রবাহিত হতো। পানির হাউজের কিনারা-সংশ্লিষ্ট সর্বোচ্চ দক্ষতার ফলেই তা সম্ভব হয়েছিল। ফোয়ারার উচ্ছলিত পানি নিচের হাউজে পড়ার সময় অর্ধবৃত্তাকার তরঙ্গ সৃষ্টি করত। এই শিল্পরীতি একটি ইসলামি সংযোজন, ইতিপূর্বে এর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। পানির হাউজগুলোতে মাঝেমধ্যে নানা জাতের মাছ থাকত বা বিভিন্ন ধরনের পাখি থাকত, যেমন হাঁস। এসব হাউজের পাশে অবস্থিত ফোয়ারাগুলো পানির উপরিভাগে কীটপতঙ্গ জন্মাতে দিত না। এসব ফোয়ারা বাতাসে জলকণা ছড়িয়ে দেওয়ার কাজেও ব্যবহৃত হতো, সম্ভবপর সর্বনিম্ন পরিমাণ ছিটিয়ে দিয়ে বায়ুকে কোমল ও সজীব রাখত।
পাবলিক ফোয়ারাগুলো প্রতীকী, নন্দনতাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক—এই তিনটি দিকের সম্মিলন ঘটিয়েছিল। এগুলোতে পানির সবচেয়ে চমৎকার ব্যবহার চোখে পড়ত। এসব সৃজনশীল ও নান্দনিক কাজের সবচেয়ে সুন্দর জিনিসগুলো পাওয়া যেত মসজিদের চত্বরে। বলকান অঞ্চল যখন উসমানি খেলাফতের ছায়াতলে ছিল তখন সেখানে এসব নান্দনিক কাজের শ্রেষ্ঠ নমুনা তৈরি হয়েছে। যেমন: মুহাম্মাদ কুসকি পাশা মসজিদ, হারতাদাউস বেগ মসজিদ, কাইনাইনিচে অবস্থিত সিনান পাশা মসজিদ, বাইচায় অবস্থিত সুলতান ইসমি মসজিদ, স্কপিয়েতে অবস্থিত মুস্তাফা পাশা মসজিদ, সারায়েভোতে গাজি খসরু বেগ (হুরসেভ বেগ) মসজিদ, ফোচায় অবস্থিত আলাজা মসজিদ (Aladža Mosque)—এগুলোর ফোয়ারাসমূহ। ফোয়ারাকে বিশ্বজুড়ে মুসলিম শহরগুলোর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়, বিশেষ করে বলকানে। ফোয়ারাগুলোর পানি পানের উপযুক্ত, অজু ও গোসলের কথা তো বলাই বাহুল্য।
টিকাঃ
৯৫. ইয়াহইয়া ওয়াযিরি, আল-ইমারাতুল ইসলামিয়্যা ওয়াল-বিআহ, পৃ. ২১৭।
৯৬. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১৩, পৃ. ২৪১।
৯৭. সার্বিয়ার রাজধানী ও বৃহত্তম শহর।
৯৮. জারিদাতুশ শারকিল আওসাত, তারিখ: ২৫ শে নভেম্বর, ২০০৮।
৯৯. জারিদাতুশ শারকিল আওসাত, তারিখ: ২৭ শে অক্টোবর, ২০০২।
১০০. ইয়াহইয়া ওয়াযিরি, আল-ইমারাতুল ইসলামিয়্যা ওয়াল-বিআহ, পৃ. ২১৭।
১০১. সালমা খাদরা জাইয়ুশি, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা ফিল-আন্দালুস, খ. ২, পৃ. ১৪৩৩।
১০২. ইয়াহইয়া ওয়াযিরি, আল-ইমারাতুল ইসলামিয়্যা ওয়াল-বিআহ, পৃ. ২১৭-২১৮।
১০৩. বসনিয়া-হার্জেগোভেনিয়ার মোস্তার শহরে অবস্থিত। ১৬১৭ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত।-অনুবাদক
১০৪. উত্তর মেসিডোনিয়ার রাজধানী স্কপিয়ের পুরোনো বাজারে অবস্থিত।-অনুবাদক
১০৫. বসনিয়া-হার্জেগোভেনিয়ার রাজধানী।-অনুবাদক
১০৬. ফোচা (Foča): বসনিয়া-হার্জেগোভেনিয়ার একটি শহর।-অনুবাদক
১০৭. আবদুল বাকি খলিফা, আল-আসারুত তারিখিয়্যাহ ফিল-বালকান, জারিদাতুশ শারকিল আওসাত, তারিখ: ২৫ শে নভেম্বর, ২০০৮।