📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 ইসলামি বাগানগুলোর অনন্যতা

📄 ইসলামি বাগানগুলোর অনন্যতা


জেমস ডিকি স্বীকার করে নিয়েছেন যে, ইসলামি বাগানগুলোর নকশা ও নির্মাণ ইসলামি স্থাপত্যকলার মর্যাদা রাখে। পাশ্চাত্যের অভিধা ও পরিভাষা ব্যবহার করে এর বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা সম্ভব নয়। কারণ তা কেবল পাশ্চাত্যের ঐতিহাসিক অগ্রগতির ঘটনাপঞ্জির বাইরের বিষয় নয়, বরং তা বিভিন্ন চিন্তাগত ঐক্যসূত্রের ফল। তিনি সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, ইসলামি শিল্প কোনোদিনই উর্বরতাসমৃদ্ধ পরস্পরবিরোধী ভাবধারার সম্মোহনের নিচে চাপা পড়েনি, অথচ ইউরোপীয় নন্দনতত্ত্বের মূল ভিত্তিই এটি।

ড. ইয়াহইয়া ওয়াযিরি তার আল-ইমারাতুল ইসলামিয়্যা ওয়াল-বিআহ গ্রন্থে ইসলামি অনন্য বাগানসমূহের কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। তার কয়েকটি নিম্নরূপ:

**১. কুরআন ও সুন্নাহ থেকে অনুপ্রেরণা**

ইসলামি বাগানগুলো কুরআন ও সুন্নাহে জান্নাতের যেসব বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে তা থেকে অনুপ্রেরণাজাত। গাছ, পানি, নালা, আসন, মজলিস, ঘ্রাণ ইত্যাদির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বর্ণনারও অনুকরণ করা হয়েছে।

আল-কুরআনের যেসব আয়াত থেকে মুসলিমরা পার্থিব উদ্যান ও বাগান তৈরি করার জন্য 'আদর্শমূলক স্থানে'র চিন্তা ও অনুপ্রেরণা লাভ করেছেন তার অন্যতম হলো আল্লাহ তাআলার এই বাণী,

وَمَثَلُ الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمُ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ وَتَثْبِيْتًا مِنْ أَنْفُسِهِمْ كَمَثَلِ جَنَّةٍ بِرَبْوَةٍ أَصَابَهَا وَابِلٌ فَأَتَتْ أُكُلَهَا ضِعْفَيْنِ فَإِنْ لَمْ يُصِبْهَا وَابِلٌ فَطَلُّ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ

আর যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করার জন্য এবং নিজেদের আত্মা বলিষ্ঠ করার জন্য তাদের সম্পদ ব্যয় করে তাদের উপমা কোনো উচ্চ ভূমিতে অবস্থিত একটি উদ্যান, যাতে মুষলধারে বৃষ্টি হয়, ফলে তার ফলমূল দ্বিগুণ জন্মে। যদি মুষলধারে বৃষ্টি নাও হয় তবে হালকা বৃষ্টিই যথেষ্ট। তোমরা যা করো আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।

মুসলিমরা এখানে একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিতের প্রতি লক্ষ করেছেন। অর্থাৎ কুরআনের আয়াতে কারিমা স্পষ্টভাবে বলছে যে, বাগান ও উদ্যানের জন্য আদর্শ স্থান কেবল ভূমি থেকে উঁচু জায়গাতেই হতে পারে। আয়াতে 'রাবওয়া' শব্দটি এসেছে, এর অর্থ উঁচু জায়গা, উঁচু ভূমি। উঁচু জায়গায় গাছ রোপণ করলে তা গাছের শেকড়কে ভূমির অভ্যন্তরীণ পানির সংস্পর্শে আসতে দেয় না। কারণ ভূমির অভ্যন্তরীণ পানি গাছের বর্ধনকে বাধাগ্রস্ত করে। একইভাবে উঁচু জায়গা অতিরিক্ত পানি ভালোভাবে সরিয়ে দিতে সাহায্য করে।

গাছের পরিচর্যার প্রতি গুরুত্ব ও মনোযোগ এত বেশি ছিল যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে গাছের গুঁড়িতে সোনার পাত বাঁধিয়ে দেওয়া হতো। খুমারাওয়াইহ ইবনে আহমাদ ইবনে তুলুন তার প্রাসাদের বাগানগুলোর এত বেশি যত্ন নিতেন যে খেজুরগাছের শেকড়কে সোনার গিলটি করা তামার পাত দিয়ে মুড়িয়ে দিয়েছিলেন। মুসলিমরা এই বৃক্ষের পরিচর্যার ক্ষেত্রে এই নীতিটি পেয়েছেন নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস থেকে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

مَا فِي الْجَنَّةِ شَجَرَةٌ إِلَّا وَسَاقُهَا مِنْ ذَهَبٍ

জান্নাতে প্রতিটি গাছেরই গুঁড়ি হবে স্বর্ণের।

**২. স্বর্গীয় দৃষ্টিভঙ্গি**
ইসলামি স্থাপত্যকলা যে অনন্য বৈশিষ্ট্যে মণ্ডিত তাকে আমরা 'স্বর্গীয় দৃষ্টিভঙ্গি' বলে আখ্যায়িত করতে পারি। প্রতিকূল আবহাওয়ায় দুর্যোগ-কবলিত পরিবেশে পার্থিব বাগান ও উদ্যান তৈরিতে যে প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়েছে তাতে এই দৃষ্টিভঙ্গিই ফুটে উঠেছে। বাগান তৈরির উদ্দেশ্য ছিল এই পরিবেশকে আরও সুন্দর ও পরিপাটি করে তোলা। ইসলামি শিল্পকলা ও স্থাপত্যকলার উৎকর্ষ ও বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বাগানের নকশা তৈরি ও নির্মাণের প্রবণতাকে আরও রুচিশীল, অভিজাত ও জাঁকজমকপূর্ণ করার চেষ্টা অব্যাহত থেকেছে, সেই সৌন্দর্য ও নান্দনিকতাকে উজ্জ্বল করে তোলার জন্য, কুরআন তাকে পৃথিবীর উদ্যানসমূহ বলে চিহ্নিত করেছে।

فَأَنْبَتْنَا بِهِ حَدَائِقَ ذَاتَ بَهْجَةٍ

তারপর এর দ্বারা আমি মনোরম উদ্যান সৃষ্টি করি...।

**৩. উদ্যানের ফটকগুলোতে ও দেয়ালগাত্রে উৎকীর্ণ করা হয়েছে কুরআনের আয়াত বা হাদিসের অংশ বা অন্যান্য ইসলামি বাণী।**

**৪. বাড়িগুলোতে প্রচুর বাগান থাকত।**
আর এ বাগানগুলো হতো বাড়ির ভেতর-আঙিনায়, যাতে গোপনীয়তা যথার্থভাবে বজায় থাকে এবং বাড়িগুলোতে যেন বড় চত্বর, উদ্যান ও গণমাঠের বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে ওঠে।

**৫. ইসলামি যুগে বাগানগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল গোপনীয়তা।**
এ কারণেই বাগানগুলো ঘেরাও দেওয়া থাকত উঁচু প্রাচীর দিয়ে বা চারপাশে থাকত খেজুরগাছ, যাতে অভ্যন্তরীণ দৃশ্য বাইরে থেকে দেখা না যায়।

বাগানের প্রতি ইসলামি ও পাশ্চাত্য দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে মৌলিক পর্যবেক্ষণের দিকটি উল্লেখ করে এই অনুচ্ছেদ শেষ করাটা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই পর্যবেক্ষণ থেকে ইসলামি দর্শনের ও পাশ্চাত্য দর্শনের সারমর্ম স্পষ্ট হয়েছে; ইসলামি দর্শন সৌন্দর্য ও নান্দনিকতার প্রতি আবেগ ও আগ্রহের দিকটি গুরুত্ব দেয়, অন্যদিকে পাশ্চাত্য দর্শন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় বস্তুগত দিক ও ব্যবহারিক উপযোগিতাকে। এই পর্যবেক্ষণ আমাদের নয়, জেমস ডিকির। তার এই পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে তিনি 'ইসলামি বাগানচর্চার ঐতিহ্য হত্যা'র কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, (আন্দালুসীয়-আরব বাগানের মৃত্যুর কারণ হলো একটি অনুমেয় প্রস্তাব, যা জনসংখ্যাতত্ত্ব ও নন্দনতত্ত্বের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ স্থানে রয়েছে। আমরা যে অনুমেয় প্রস্তাব এখানে পেশ করছি, অর্থাৎ বাগানের নকশা ও নির্মাণশিল্প কৃষিবিজ্ঞানেরই একটি সম্প্রসারিত অংশ এবং এরই ওপর বাগানচর্চা নির্ভরশীল ছিল তা যদি সত্য হয়,) তা হলে মোরিস্কোদের বিতাড়ন অবশ্যই স্পেনে ইসলামি বাগানচর্চার ঐতিহ্যকে হত্যা করছিল, এমনকি (খ্রিস্টান শক্তি কর্তৃক) গ্রানাডার দখলও (ইউরোপীয়) রেনেসাঁসের দ্বারা প্রবর্তিত রুচি ও ফ্যাশনের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেনি। ইউরোপীয় রেনেসাঁস বাগানকে স্থাপত্যকলার সম্পূরক হিসেবে দেখেছে, যেখানে মুসলিমরা প্রাসাদকে বাগানের অনুগামী হিসেবে দেখার প্রবণতা দেখিয়েছেন। এই দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সংশ্লেষ ঘটানো বা সামঞ্জস্য বিধান করা সম্ভব ছিল না। (এ ছাড়া যেকোনো রূপে ইসলামিক আর্টের পৃষ্ঠপোষকতা ব্যক্তিকে ইনকুইজিশন-এ নিযুক্ত লোকদের চোখে সন্দেহভাজন করে তুলছিল।)

টিকাঃ
৮৭. সালমা খাদরা জাইয়ুশি, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়‍্যা ফিল-আন্দালুস, খ. ২, পৃ. ১৪৩৫। তাতে জেমস ডিকির আলোচনা ( الحديقة الاندلسية دراسة في مدلولاتها الرمزية ) শিরোনামে উল্লেখ করা হয়েছে।
৮৮. ইয়াহইয়া ওয়াযিবি, আল ইমারাতুল ইসলামিয়্যা ওয়াল-বিআহ, পৃ. ২১৪ ও এর পরের পৃষ্ঠাগুলো।
৮৯. সুরা বাকারা: আয়াত ২৬৫।
৯০. তিরমিযি, আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, কিতাব: সিফাতুল জান্নাহ আন রাসুলিল্লাহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, বাব: সিফাতু শাজারিল জান্নাহ, হাদিস নং ২৫২৫।
৯১. সুরা নামল: আয়াত ৬০।
৯২. মোরিস্কো (Morisco) একটি স্প্যানিশ কাতালান শব্দ। স্পেনে ইসলামি শাসনব্যবস্থার পতনের পর খ্রিষ্টীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। স্পেনে তখন যেসব মুসলিম ছিল তারা মর্মন্তুদ নির্যাতনের শিকার হয়। রোমান ক্যাথলিক চার্চ ও স্প্যানিশ রাজপরিবার তাদের মৃত্যুর হুমকির মুখে খ্রিধর্ম গ্রহণে বা স্বনির্বাসনে বাধ্য করে। বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রকাশ্যে ধর্মপালনও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এসব মুসলিমকেই মোরিস্কো বলে আখ্যায়িত করা হয়।- অনুবাদক
৯৩. ইনকুইজিশন (the Inquisition) অর্থ নির্দয় ধর্মীয় বিচার। স্পেনের মুসলিমদের ইনকুইজিশনের মুখোমুখি করে নির্যাতন ও বিভিন্নভাবে হত্যা করা হতো।- অনুবাদক
৯৪. সালমা খাদরা জাইয়ুশি, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা ফিল-আন্দালুস, খ. ২, পৃ. ১৪৩৫। এই অংশটি আমি মূল ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছি।- অনুবাদক

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 ফোয়ারা

📄 ফোয়ারা


বাগানে পানির ব্যবহারে মুসলিম কৃষিবিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও শিল্পীর দক্ষতার অসাধারণ নজির হলো ইসলামি বাগানগুলোতে ফোয়ারার বিস্তার।

মুসলিমদের বাগানগুলোতে পানিকে বিভিন্নরূপে ব্যবহার করা হয়েছে: বৃক্ষরাজির ঘন ছায়াঢাকা কৃত্রিম জলাশয়রূপে; পানির পৃষ্ঠদেশের পরিবর্তন-সহায়ক ফোয়ারারূপে, ফলে পানি প্রতিবিম্বিত পৃষ্ঠদেশরূপে কাজ করে না; বা উঁচু নলের সারিরূপে, যা থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে এবং শ্রুতিমধুর কুলকুল ধ্বনি তোলে অথবা ঝরনারূপে।

আমরা লক্ষ করেছি, মুসলিমবিশ্বজুড়ে বাগানের বিস্তৃতি ছিল ব্যাপক এবং আমরা আরও লক্ষ করেছি, ঘরবাড়ির ভেতর-আঙিনাতেও বাগানের বিস্তৃতি ছিল। তাই আমরা বলতে পারি, মুসলিম শহরগুলোর প্রত্যেক বাগানে ফোয়ারার সংখ্যা অনুমান করার জন্য আমাদের পক্ষে এই চিন্তাকে দ্বিগুণ করে নেওয়া সম্ভব। কারণ ফোয়ারার সংখ্যা এত বেশি যে তা গোনা সম্ভব নয়।

মুসলিম সমাজের দরিদ্র ঘরগুলো সম্পর্কে বর্ণনা দিয়েছেন উইল ডুরান্ট। তিনি বলেছেন, তখনকার দিকে দরিদ্রদের ঘরগুলোও ছিল— এখনো যেমন রয়েছে— আয়তক্ষেত্রকার; মাটি দিয়ে সংযুক্ত ইটের কাঠামোতে তৈরি, ছাদে থাকত মাটির মিশ্রণ, উদ্ভিদের অংশ, গাছের ডাল, খেজুরগাছের ডাল ও খড়। এগুলোর চেয়ে উন্নত এক শ্রেণির ঘর ছিল, সেগুলোর ভেতর দিকে থাকত উন্মুক্ত উঠান, পানির ছোট হাউজ, কখনো কখনো গাছও থাকত। মাঝে মাঝে এসব ঘরে থাকত একগুচ্ছ কাঠের খুঁটি, ঘরের কামরাগুলো ও উঠানের মাঝ বরাবর থাকত বারান্দা।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, উসমানি খেলাফতের যুগে কেবল বেলগ্রেডেই ছিল ছয়শ পাবলিক ফোয়ারা।

গত কয়েক বছর ধরে মরোক্কান কর্তৃপক্ষ ফেজ শহরের প্রাচীন ফোয়ারাগুলোর সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করার উদ্যোগ নিয়েছে। যে পরিসংখ্যান বেরিয়েছে তাতে বলা হয়েছে, ফেজের সড়কগুলোতে সত্তরটি পাবলিক ফোয়ারা পাওয়া গেছে। পুরোনো আবাসিক ভবন, মসজিদ ও মাদরাসার অভ্যন্তরীণ আঙিনায় পাওয়া গেছে প্রায় চারশ ফোয়ারা। ঐতিহাসিক উৎসগুলো নির্দেশ করে যে, এই প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শহরে খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দী থেকে এসব ফোয়ারা ছিল। পানির জন্য সব মানুষ এসব ফোয়ারার ওপর নির্ভরশীল ছিল; নিজেরা পানি পান করত, পশুপাখিদের পান করাতো এবং বাগানেও পানি সেচ দিত। এটা বিশ্বাস করা হয় যে, প্রায় দশ শতাব্দী আগে ফেজ শহরে পানি-সরবরাহের যে জটিল সিস্টেম ছিল তার সঙ্গে এসব ফোয়ারার অস্তিত্ব ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

সেই সময় ফোয়ারা কেবল আভিজাত্য ও বিলাসিতার বিষয় ছিল না, বরং পানি ব্যবহারে ইসলামি সভ্যতার যে দর্শন তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও ছিল এটি। এই দর্শনের মূলকথা হলো, ব্যবহারিক দিকগুলোর সঙ্গে আত্মিক ও অনুভূতিগত উপভোগের দিকগুলোর সমন্বয় সাধন।

গ্রানাডার জান্নাতুল আরিফে ফোয়ারাগুলো থেকে পানি উচ্ছলিত ধারায় প্রবাহিত হতো। পানির হাউজের কিনারা-সংশ্লিষ্ট সর্বোচ্চ দক্ষতার ফলেই তা সম্ভব হয়েছিল। ফোয়ারার উচ্ছলিত পানি নিচের হাউজে পড়ার সময় অর্ধবৃত্তাকার তরঙ্গ সৃষ্টি করত। এই শিল্পরীতি একটি ইসলামি সংযোজন, ইতিপূর্বে এর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। পানির হাউজগুলোতে মাঝেমধ্যে নানা জাতের মাছ থাকত বা বিভিন্ন ধরনের পাখি থাকত, যেমন হাঁস। এসব হাউজের পাশে অবস্থিত ফোয়ারাগুলো পানির উপরিভাগে কীটপতঙ্গ জন্মাতে দিত না। এসব ফোয়ারা বাতাসে জলকণা ছড়িয়ে দেওয়ার কাজেও ব্যবহৃত হতো, সম্ভবপর সর্বনিম্ন পরিমাণ ছিটিয়ে দিয়ে বায়ুকে কোমল ও সজীব রাখত।

পাবলিক ফোয়ারাগুলো প্রতীকী, নন্দনতাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক—এই তিনটি দিকের সম্মিলন ঘটিয়েছিল। এগুলোতে পানির সবচেয়ে চমৎকার ব্যবহার চোখে পড়ত। এসব সৃজনশীল ও নান্দনিক কাজের সবচেয়ে সুন্দর জিনিসগুলো পাওয়া যেত মসজিদের চত্বরে। বলকান অঞ্চল যখন উসমানি খেলাফতের ছায়াতলে ছিল তখন সেখানে এসব নান্দনিক কাজের শ্রেষ্ঠ নমুনা তৈরি হয়েছে। যেমন: মুহাম্মাদ কুসকি পাশা মসজিদ, হারতাদাউস বেগ মসজিদ, কাইনাইনিচে অবস্থিত সিনান পাশা মসজিদ, বাইচায় অবস্থিত সুলতান ইসমি মসজিদ, স্কপিয়েতে অবস্থিত মুস্তাফা পাশা মসজিদ, সারায়েভোতে গাজি খসরু বেগ (হুরসেভ বেগ) মসজিদ, ফোচায় অবস্থিত আলাজা মসজিদ (Aladža Mosque)—এগুলোর ফোয়ারাসমূহ। ফোয়ারাকে বিশ্বজুড়ে মুসলিম শহরগুলোর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়, বিশেষ করে বলকানে। ফোয়ারাগুলোর পানি পানের উপযুক্ত, অজু ও গোসলের কথা তো বলাই বাহুল্য।

টিকাঃ
৯৫. ইয়াহইয়া ওয়াযিরি, আল-ইমারাতুল ইসলামিয়‍্যা ওয়াল-বিআহ, পৃ. ২১৭।
৯৬. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১৩, পৃ. ২৪১।
৯৭. সার্বিয়ার রাজধানী ও বৃহত্তম শহর।
৯৮. জারিদাতুশ শারকিল আওসাত, তারিখ: ২৫ শে নভেম্বর, ২০০৮।
৯৯. জারিদাতুশ শারকিল আওসাত, তারিখ: ২৭ শে অক্টোবর, ২০০২।
১০০. ইয়াহইয়া ওয়াযিরি, আল-ইমারাতুল ইসলামিয়্যা ওয়াল-বিআহ, পৃ. ২১৭।
১০১. সালমা খাদরা জাইয়ুশি, আল-হাদারাতুল আরাবিয়‍্যাতুল ইসলামিয়্যা ফিল-আন্দালুস, খ. ২, পৃ. ১৪৩৩।
১০২. ইয়াহইয়া ওয়াযিরি, আল-ইমারাতুল ইসলামিয়্যা ওয়াল-বিআহ, পৃ. ২১৭-২১৮।
১০৩. বসনিয়া-হার্জেগোভেনিয়ার মোস্তার শহরে অবস্থিত। ১৬১৭ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত।-অনুবাদক
১০৪. উত্তর মেসিডোনিয়ার রাজধানী স্কপিয়ের পুরোনো বাজারে অবস্থিত।-অনুবাদক
১০৫. বসনিয়া-হার্জেগোভেনিয়ার রাজধানী।-অনুবাদক
১০৬. ফোচা (Foča): বসনিয়া-হার্জেগোভেনিয়ার একটি শহর।-অনুবাদক
১০৭. আবদুল বাকি খলিফা, আল-আসারুত তারিখিয়্যাহ ফিল-বালকান, জারিদাতুশ শারকিল আওসাত, তারিখ: ২৫ শে নভেম্বর, ২০০৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00