📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 কুরআন ও সুন্নাহ থেকে সৌন্দর্য-বিষয়ক আলোচনা

📄 কুরআন ও সুন্নাহ থেকে সৌন্দর্য-বিষয়ক আলোচনা


গাছ, লতাপাতা, উদ্ভিদ, ফল ও ফসল সৃষ্টির পেছনে যে প্রজ্ঞা নিহিত তা কেবল আমাদের পরিচিত প্রাণিজগতের জন্য অপরিহার্য উপকারিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অর্থাৎ, তা কেবল মানুষ ও প্রাণীর খাদ্য নয় অথবা কেবল প্রকৃতির শ্বাস নেওয়ার ফুসফুস নয়। বরং আল্লাহ তাআলা তার পবিত্র কিতাবে এদিকে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, বৃক্ষরাজি ও উদ্যানসমূহ মানবজীবনে আরও একটি ভূমিকা পালন করে, মানবহৃদয়ে আনন্দ ও সজীবতা এবং উদ্যম ও প্রাণোচ্ছলতা জাগরূক রাখে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

أَمَّنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَأَنْزَلَ لَكُمْ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَنْبَتْنَا بِهِ حَدَائِقَ ذَاتَ بَهْجَةٍ مَا كَانَ لَكُمْ أَنْ تُنْبِتُوا شَجَرَهَا أَإِلَهٌ مَعَ اللَّهِ بَلْ هُمْ قَوْمٌ يَعْدِلُونَ﴾

বরং তিনি, যিনি সৃষ্টি করেছেন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং আকাশ থেকে তোমাদের জন্য বর্ষণ করেন বৃষ্টি, তারপর এর দ্বারা আমি মনোরম উদ্যান সৃষ্টি করি, তার বৃক্ষরাজি উদ্‌গত করার ক্ষমতা তোমাদের নেই। আল্লাহর সঙ্গে আর কোনো ইলাহ আছে কি? তবু তারা এমন এক সম্প্রদায় যারা সত্যবিচ্যুত হয়।

যে নান্দনিক বৈশিষ্ট্য প্রকৃতিকে তার ভিন্ন ভিন্ন অজস্র উপাদান সত্ত্বেও অনন্য ও অসাধারণ করে তুলেছে তা আল্লাহ তাআলা কর্তৃক নির্ধারিত একটি সাধারণ রীতিরই বাস্তবিক রূপ। পৃথিবীর প্রতিটি ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য। তিনি তার বান্দাদের জন্য এটাই পছন্দ করেন যে তারা এই নীতিকে তাদের চরিত্রে ধারণ করবে। তা হলো সৌন্দর্যের নীতি (সৌন্দর্যতত্ত্ব)! আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

«إِنَّ اللَّهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ»

নিশ্চয় আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্য ভালোবাসেন।

কুরআনুল কারিমে যে বৃক্ষরাজি, ফল ও ফসল এবং বাগান ও উদ্যান সম্পর্কে অনেক আলোচনা রয়েছে তা সম্ভবত সকলেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। যেমন: আল-কুরআনে শাজার (গাছ) শব্দটি তার থেকে ব্যুৎপন্ন শব্দসহ ছাব্বিশবার এসেছে; সামার (ফল) শব্দটি তার থেকে ব্যুৎপন্ন শব্দসহ এসেছে বাইশবার; নাবাত (তৃণ ও উদ্ভিদ) শব্দটি তার থেকে ব্যুৎপন্ন শব্দসহ এসেছে ছাব্বিশবার; হাদিকাহ (বাগান) শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছে তিনবার; জান্নাত (উদ্যান) শব্দটি একবচন ও বহুবচনসহ বর্ণিত হয়েছে একশ আটত্রিশবার।

বরং কুরআনুল কারিমে মানুষ ও প্রাণিকুলের খাদ্য হিসেবে গাছ ও ফলের প্রসঙ্গ যতবার এসেছে, সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যগত সৌন্দর্যের দিকটিও এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

فَلْيَنظُرِ الْإِنسَانُ إِلَى طَعَامِهِ ، أَنَّا صَبَبْنَا الْمَاءَ صَبًّا ، ثُمَّ شَقَقْنَا الْأَرْضَ شَقًّا فَأَنْبَتْنَا فِيهَا حَبًّا وَعِنَبًا وَقَضَبًا وَزَيْتُونَا وَنَخْلًا وَحَدَائِقَ غُلْبًا وَفَاكِهَةٌ وَأَبًّا مَّتَعَاتَكُمْ وَلِأَنْعَيمَكُمْ)

মানুষ তার খাদ্যের দিকে লক্ষ করুক! আমিই প্রচুর বারি বর্ষণ করি, তারপর আমি ভূমি উৎকৃষ্টরূপে বিদারিত করি; এবং তাতে আমি উৎপন্ন করি শস্য; আঙুর, শাকসবজি, যাইতুন, খেজুর, বহুবৃক্ষশোভিত উদ্যান, ফল এবং গবাদি খাদ্য, তা তোমাদের ও তোমাদের প্রাণীদের ভোগের জন্য।

বৃক্ষরাজিশোভিত ও ফলরাশিপূর্ণ উদ্যান সৃষ্টির পেছনে যে নন্দনতাত্ত্বিক প্রজ্ঞা, তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এমন চমৎকার পদ্ধতিতে। এর পাশাপাশি কুরআন মাজিদ ও পবিত্র সুন্নাহ জান্নাত বা উদ্যানের যে চিত্রাঙ্কন করেছে সেখানেও রয়েছে মানসিক সুখ ও ইন্দ্রিয়তৃপ্তির নানা উপকরণ। পরিবেশের সঙ্গে জীবনযাপনে এই অনন্য চিত্রায়ণের অনুকরণ করতে মুসলিমদের উদ্বুদ্ধকরণে শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছে এসব বিষয়।

কুরআনুল কারিমে উদ্যানের যেসব দৃশ্যের বর্ণনা রয়েছে তার কিছু ফুটে উঠেছে আল্লাহ তাআলার এই বাণীতে,

﴿وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ذَوَاتَا أَفْنَانٍ فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ فِيهِمَا عَيْنَانِ تَجْرِيَانِ فَبِأَيِّ آلاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ فِيهِمَا مِنْ كُلِّ فَاكِهَةٍ زَوْجَانِ فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ مُتَّكِبِينَ عَلَى فُرُشٍ بَطَابِنُهَا مِنْ إِسْتَبْرَقٍ وَجَنَى الْجَنَّتَيْنِ دَانٍ فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ فِيهِنَّ قَاصِرَاتُ الطَّرْفِ لَمْ يَطْمِثْهُنَّ إِنْسٌ قَبْلَهُمْ وَلَا جَانٌّ فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ كَأَنَّهُنَّ الْيَاقُوتُ وَالْمَرْجَانُ فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ هَلْ جَزَاءُ الْإِحْسَانِ إِلَّا الْإِحْسَانُ فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ وَمِنْ دُونِهِمَا جَنَّتَانِ فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ مُدْهَا مَتَانِ فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ فِيهِمَا عَيْنَانِ نَضَّاخَتَانِ فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ فِيهِمَا فَاكِهَةٌ وَنَخْلٌ وَرُمَّانٌ فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ فِيهِنَّ خَيْرَاتٌ حِسَانٌ فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ حُورٌ مَقْصُورَاتٌ فِي الْخِيَامِ فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ لَمْ يَطْمِثْهُنَّ إِنْسٌ قَبْلَهُمْ وَلَا جَانٌّ فَبِأَتِ الَآءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ مُتَّكِبِينَ عَلَى رَفْرَفٍ خُضْرٍ وَعَبْقَرِي حِسَانٍ﴾

আর যে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে, তার জন্য রয়েছে দুটি উদ্যান। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? উভয়ই বহু শাখা- পল্লববিশিষ্ট। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? উভয় উদ্যানে রয়েছে প্রবহমান দুটি প্রস্রবণ। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? উভয় উদ্যানে রয়েছে প্রত্যেক ফল দুই দুই প্রকার। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? সেখানে তারা হেলান দিয়ে বসবে পুরু রেশমের আস্তরবিশিষ্ট ফরাশে, দুই উদ্যানের ফল হবে নিকটবর্তী।

সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? সেইসবের মাঝে রয়েছে বহু আনত-নয়না, যাদেরকে পূর্বে কোনো মানুষ বা জিন স্পর্শ করেনি। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? তারা যেন পদ্মরাগ ও প্রবাল। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? উত্তম কাজের জন্য উত্তম পুরস্কার ব্যতীত আর কী হতে পারে? সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? এই উদ্যান দুটি ছাড়া আরও দুটি উদ্যান রয়েছে। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? ঘন সবুজ এই উদ্যান দুটি।

সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? উভয় উদ্যানে আছে উচ্ছলিত দুই প্রস্রবণ। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? যেখানে রয়েছে ফলমূল-খেজুর ও আনার। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? সেই উদ্যানসমূহে রয়েছে সুশীলা, সুন্দরীরা। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? তারা হুর, তাঁবুতে সুরক্ষিতা। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? তাদেরকে ইতিপূর্বে কোনো মানুষ বা জিন স্পর্শ করেনি। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? তারা হেলান দিয়ে বসবে সবুজ তাকিয়ায় ও সুন্দর গালিচার ওপর।

এ ছাড়াও কুরআনের আরও অনেক আয়াতে অনুরূপ চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসসমূহ দ্বিতীয় উৎস, যেখান থেকে মুসলিমরা প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রতি তাদের দর্শন ও দৃষ্টিভঙ্গিকে শাণিত করেছেন। কয়েকটি উদাহরণ নিম্নরূপ :

আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

قُلْنَا: يَا رَسُولَ اللهِ، حَدِّثْنَا عَنِ الْجَنَّةِ مَا بِنَاؤُهَا؟ قَالَ: لَبِنَةُ ذَهَبٍ وَلَبِنَهُ فِضَّةٍ، وَمِلاَحُهَا الْمِسْكُ الأَذْفَرُ، وَحَصْبَاؤُهَا اللُّؤْلُؤُ وَالْيَاقُوتُ، وَتُرَابُهَا الزَّعْفَرَانُ، مَنْ يَدْخُلُهَا يَنْعَمُ وَلا يَبْأَسُ، وَيَخْلُدُ وَلَا يَمُوتُ، لَا تَبْلَى ثِيَابُهُ وَلَا يَفْنَى شَبَابُه»

আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, জান্নাত সম্পর্কে আমাদের কাছে বর্ণনা করুন, তার নির্মাণ কী দিয়ে? তিনি বললেন, জান্নাতের একটি ইট রুপার, আরেকটি ইট সোনার। তার প্রলেপ (প্লাস্টার) সুরভিত মিসকের। মুক্তা ও পদ্মরাগ হলো তার কঙ্কর। তার মাটি হলো জাফরান। যে ব্যক্তি সেখানে প্রবেশ করবে সে সুখে ও স্বাচ্ছন্দ্যে থাকবে, কখনো কষ্ট পাবে না। সে সেখানে হবে চিরঞ্জীব, কখনো তার মৃত্যু হবে না। তার পোশাক জীর্ণ হবে না, কখনো ফুরাবে না তার যৌবনকাল।

আবু মুসা আশআরি রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

إِنَّ لِلْمُؤْمِنِ فِي الْجَنَّةِ لَخَيْمَةً مِنْ لُؤْلُؤَةٍ وَاحِدَةٍ مُجَوَّفَةٍ، طُولُهَا سِتُّونَ مِيْلاً، لِلْمُؤْمِنِ فِيهَا أَهْلُونَ، يَطُوفُ عَلَيْهِمُ الْمُؤْمِنُ فَلَا يَرَى بَعْضُهُمْ بَعْضًا

নিশ্চয় মুমিনের জন্য জান্নাতে একটি শূন্যগর্ভ বা ফাঁপা মুক্তা দিয়ে তৈরি তাঁবু থাকবে। তাঁবুটির দৈর্ঘ্য হবে ষাট মাইল। মুমিন বান্দার জন্য সেখানে হুর-বালা থাকবে। মুমিন বান্দা তাদের কাছে যাবে, কিন্তু তাদের একজন অপরজনকে দেখতে পাবে না।

আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

إِنَّ فِي الْجَنَّةِ لَشَجَرَةً يَسِيرُ الرَّاكِبُ فِي ظِلِّهَا مِائَةَ عَامٍ لَا يَقْطَعُهَا

নিশ্চয় জান্নাতে এত বড় গাছ থাকবে, অশ্বারোহী তার ছায়ায় একশ বছর ভ্রমণ করেও তা অতিক্রম করতে পারবে না।

আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

بَيْنَمَا أَنَا أَسِيرُ فِي الْجَنَّةِ إِذَا أَنَا بِنَهَرٍ حَافَتَاهُ قِبَابُ الدُّرِّ الْمُجَوَّفِ، قُلْتُ: مَا هَذَا يَا جِبْرِيلُ؟ قَالَ: هَذَا الْكَوْثَرُ الَّذِي أَعْطَاكَ رَبُّكَ. فَإِذَا طِينُهُ أَوْ طِيبُهُ مِسْكُ أَذْفَرُ

আমি জান্নাতে ভ্রমণ করছিলাম, এ সময় একটি ঝরনার কাছে এলে দেখি তার দুই ধারে ফাঁপা মুক্তার গম্বুজ রয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা কী হে জিবরাইল? তিনি বললেন, এই কাউসারই আপনাকে দিয়েছেন আপনার প্রতিপালক। তার মাটি (বা তার ঘ্রাণ) সৌরভময় মিসক।

এই নান্দনিকতা ও সৌন্দর্য প্রসঙ্গে কুরআন ও সুন্নাহে প্রচুর দলিল রয়েছে। সর্বজনীন ইসলামি চেতনার কাঠামো নির্মিত হয়েছে এমন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও উপভোগ্য উপকরণের প্রতি কৌতূহলের ওপর ভিত্তি করে, তাই মুসলিমরা কুরআন ও সুন্নাহর উপর্যুক্ত অনন্য চিত্র অনুকরণ করে মানবসভ্যতাকে দুহাত ভরে উপহার দিয়েছেন।

টিকাঃ
৪৬. সূরা নামল: আয়াত ৬০।
৪৭. মুসলিম, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত হাদিস, কিতাব : আল-ঈমান, বাব : তাহরিমুল কির ওয়া বায়ানুহু, হাদিস নং ৯১; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৩৭৮৯; ইবনে হিব্বان, হাদিস নং ৫৪৬৬।
৪৮. সুরা আবাসা: আয়াত ২৪-৩২।
৪৯. সুরা রহমান: আয়াত ৪৬-৭৬।
৫০. মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৮০৩০। শুআইব আরনাউত বলেছেন, হাদিসটি সহিহ।
৫১. বুখারি, কিতাব: আত-তাফসির, বাব: তাফসিরু সুরাতির রাহমান, হাদিস নং ৪৫৯৮; মুসলিম, কিতাব: আল-জান্নাতু ওয়া সিফাতু নাইমিহা ওয়া আহলিহা, বাব: সিফাতু খিয়ামিল জান্নাতি ওয়া মা লিল মুমিনিনা ফিহা মিনাল আহলিনা, হাদিস নং ২৮৩৮।
৫২. বুখারি, কিতাব: বাদউল খালকি, বাব: সিফাতুল জান্নাতি ওয়া আন্নাহা মাখলুকাহ, হাদিস নং ৩০৭৯; মুসলিম, কিতাব: আল-জান্নাতু ওয়া সিফাতু নাইমিহা ও আহলিহা, বাব: ইন্না ফিল জান্নাতি শাজারাতান ইয়াসিরু রাকিবু ফি যিল্লিহা মিআতা আমিন লা ইয়াকতাউহা, হাদিস নং ২৮২৭।
৫৩. বুখারি, আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত, কিতাব: আর-রিকাক, বাব: আল-হাউদ, হাদিস নং ৬২১০; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ১৩০১২।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 ইসলামি সভ্যতায় বাগানের বিস্তার

📄 ইসলামি সভ্যতায় বাগানের বিস্তার


বাগানের দৃশ্য বুকের মধ্যে আনন্দ, প্রফুল্লতা, উদ্যম ও প্রাণশক্তি সৃষ্টি করে। এই আনন্দের অনুভূতি এবং সজীব-সপ্রাণ সৌন্দর্যের চিন্তা হৃদয়কে পুনরুজ্জীবিত করে তোলায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। বাগানে-উদ্যানে অসাধারণ নৈসর্গিক নিদর্শন-সম্পর্কিত ভাবনা সেই স্রষ্টার বড়ত্ব ও মহত্ত্ব প্রকাশ করে, যিনি এই বিস্ময়কর সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছেন। একটিমাত্র ফুলকে রঞ্জিত ও সুসজ্জিত করে প্রাণময় করে তোলা মানবজাতির সমস্ত বড় শিল্পীর পক্ষেও সম্ভব নয়। একটি ফুলে রঙের বিস্তার ও বৈচিত্র্য, আঁকিবুকির কারুকাজ ও পাপড়িগুলোর বিন্যাস এমন মুজিযা ও অলৌকিকতা প্রকাশ করে যার সামনে প্রাচীন কালের ও আধুনিক কালের যাবতীয় শিল্পপ্রতিভাই অক্ষম। বৃক্ষরাজিতে যে বর্ধনশীল প্রাণের অস্তিত্ব তার কথা তো বলাই বাহুল্য, কারণ তা এমন অদ্ভুত রহস্য যা মানুষের পক্ষে বোঝা দুঃসাধ্য...।

কুরআন ও সুন্নাহ চোখ ধাঁধানো দীপ্তিময় চিত্ররাশি দ্বারা পরিপূর্ণ, তার বাস্তবিক প্রতিফলন ঘটেছে ইসলামি সভ্যতার ওপর। প্রাচ্যে ও মাগরিবে ইসলামের এমন কোনো সভ্যতা নেই যেখানে নয়নাভিরাম বাগান ও উদ্যান রচিত হয়নি, এসব বাগান ও উদ্যানে চাকচিক্য ও উজ্জ্বলতা ছড়িয়েছে ইসলামি স্থাপত্য-চেতনা। আন্দালুস, তুরস্ক, সিরিয়া (শাম), পারস্য, মিশর, সমরকন্দ, মরক্কো, তিউনিসিয়া, ইয়ামেন, ওমান, ভারত ও অন্যান্য এলাকায় এসব বাগান ও উদ্যানের ছড়াছড়ি ছিল।

**আন্দালুসে**
**কর্ডোভা :** আবদুর রহমান আদ-দাখিল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন 'আর-রুসাফা' (রুসাফা আল-আন্দালুস)। ইসলামের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বড় উদ্যান হিসেবে বিবেচিত হয়। সিরিয়ায় (শামে) যে রুসাফাটি ছিল তার অনুকরণেই তিনি এটি তৈরি করেছিলেন। সিরিয়ার রুসাফাটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার দাদা হিশাম ইবনে আবদুল মালিক। দাদার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কর্ডোভার শহরতলিতে আবদুর রহমান তৈরি করেন তৎকালীন দুনিয়ার সবচেয়ে বড় উদ্যান। তিনি উদ্যানটির জন্য সব এলাকা থেকে বিস্ময়কর সব উদ্ভিদ ও মহামূল্য সব গাছ সংগ্রহ করেন। ইয়াযিদ ইবনে আবদুল মালিক যেসব গাছের সংগ্রহ গড়ে তুলেছিলেন সেগুলোও তিনি এই উদ্যানে নিয়ে আসেন। তার দুইজন দূত গোটা সিরিয়া ভ্রমণ করে বাছাই করা বীজ ও দুর্লভ দানা সংগ্রহ করেন। এগুলো ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও যথাযথ পরিচর্যার ফলে কিছুকালের ব্যবধানেই মনোরম গাছগাছালিতে পরিণত হয়। গাছগুলোতে ফলে আশ্চর্যজনক সব ফল। কয়েক বছরের মধ্যেই এসব গাছ গোটা আন্দালুসে ছড়িয়ে পড়ে। অন্যান্য গাছের তুলনায় এগুলোর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়।

**গ্রানাডা :** গ্রানাডার নগরপ্রাচীর ঘিরে চতুর্দিকে উদ্যান আর বাগান চোখে পড়ে। এগুলোকেও আরেকটি প্রাচীর মনে হয়। এটা হলো শহরের বাইরের দৃশ্য। শহরের ভেতরে প্রাসাদগুলোতেও বাগান ছিল। আল-হামরা প্রাসাদের বাগানগুলোকে ইসলামি সভ্যতার বাগানগুলোর মধ্যে উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হিসেবে পেশ করা যায়।

গ্রানাডায় আরও আছে 'জান্নাতুল আরিফ' বাগান। বাগানটি নির্মাণ করা হয়েছে পাহাড়ের উপরে, মুসলিম শিল্পীরা এটিকে স্তরে স্তরে বিন্যস্ত করে সাজিয়েছেন। বাগানটির প্রশস্ততা প্রায় তেরো মিটার এবং স্তর প্রায় ছয়টি। এই বাগানে পানি একটি মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। বাগানটির উপরের স্তর থেকে ঝরনার মধ্য দিয়ে পানি নেমে আসছে এবং কয়েকটি নালা দিয়ে গাছগাছালির ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে বয়ে যাচ্ছে। এই বাগানের কারিগরেরা যে কুরআনের এই আয়াত, ﴾وَمَاءٍ مَسْكُوبٍ﴿ 'সদা প্রবহমান পানি' -এর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন তার স্পষ্ট প্রমাণ মেলে।

কর্ডোভার স্বর্ণযুগ যখন শেষ হয়ে গেল এবং তায়িফা আমিরদের যুগ শুরু হলো, তখনও বাগান নির্মাণের ধারা অব্যাহত ছিল। এক্সপির‍্যাসিওন গার্সিয়া সানচেজ আন্দালুসের বাগানগুলোর চিত্র তুলে ধরে বলেছেন, খেলাফত যখন ভেঙে গেল এবং তায়িফা নৃপতিদের উদ্ভব ঘটল, নতুন শাসকরা পদচ্যুত খলিফাদের রীতিনীতি অনুকরণ করতে কিছুমাত্র পিছপা হলো না। ফলে ওইসব কৃত্রিম বাগানের আধিক্য দেখা গেল, নতুন নৃপতিদের প্রাসাদগুলোর প্রত্যেকটিতেই একাধিক বাগান তৈরি হলো। এসব বাগানের প্রতিটিতে থাকতেন একজন কৃষিবিদ, যিনি বাগানটির তত্ত্বাবধান করতেন।

আন্দালুসে বাগান ছিল বাড়ির সমান সংখ্যক। প্রত্যেক বাড়িতে ছোট করে হলেও একটি বাগান থাকত। জেমস ডিকি গ্রানাডার ছোট ছোট বাড়ি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে স্বীকার করেছেন যে, অধিকাংশ বাড়ি ছোট হওয়া সত্ত্বেও সেগুলোর প্রত্যেকটিতেই ছিল প্রবহমান জল, অজস্র ফুল, সৌরভময় গোলাপরাশি, তরুগুল্ম এবং আরাম ও সুখ লাভের সব উপকরণ। এসব বিষয় প্রমাণ করে যে, এই পৃথিবী যখন মুরদের (আরবদের) হাতে ছিল তখন আজকে যেমন আছে তার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর ছিল।

**ইসলাম বুল (কনস্টান্টিনোপল)**

যদি আমরা ইসলামি মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ভ্রমণ করতে শুরু করি তাহলে আমরা উসমানি খেলাফতের রাজধানীতে পৌঁছে যাব। আমরা দেখব যে, সেখানে কেবল ইসলাম প্রবেশের ফলেই দেশের সর্বত্র বাগান ও উদ্যানের বিস্তার ঘটেছে। আনাতোলিয়ান বাগানগুলোর বৈশিষ্ট্য ছিল অন্যরকম, প্রথমে বাগানের নকশা তৈরি করা হতো, তারপর সেই নকশা অনুযায়ী বাগান তৈরি করা হতো। এ কারণেই ইস্তাম্বুলের প্রাসাদগুলোর নাম ছিল 'হাদিকাহ' বা বাগান। যদিও প্রাসাদগুলো থাকত বাগানের অভ্যন্তরীণ অংশে। এসব বাগান বিনোদন, সামাজিক অনুষ্ঠান ও সরকারি সভার কাজে ব্যবহৃত হতো। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাগানগুলো তৈরি করা হয়েছে সমুদ্রের তীর ঘেঁষে, যেমন ইস্তাম্বুলে।

উসমানি খেলাফতের যুগে মসজিদগুলোর স্থাপত্য কাঠামোতে সবুজ চত্বর রাখা হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি থেকে মসজিদগুলোকে সুরক্ষাদানের জন্য এসব চত্বর নির্মাণ করা হতো। যেমন ইস্তাম্বুলের সুলাইমানিয়া মসজিদ। জনশ্রুতি ছিল যে, যেসব বাড়িঘর কাঠ দিয়ে তৈরি করা হতো সেগুলোতে আগুন লাগত, সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ত পার্শ্ববর্তী মসজিদগুলোতে। বিষয়টি স্থপতি সিনানকে ভাবিয়ে তোলে। তিনি জামে মসজিদ ও তার সংলগ্ন অংশগুলোকে বহিঃপ্রাচীর দিয়ে ঘেরাও করে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। বহিঃপ্রাচীর ও মসজিদের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর মধ্যবর্তী স্থানে থাকবে বড় বড় চত্বর, এসব চত্বরে লাগানো হবে অসংখ্য গাছ। বিভিন্ন জাতের নানা ধরনের ফুল। মসজিদকে পার্শ্ববর্তী বাড়িঘর থেকে আলাদা রাখবে এগুলো। ওই সময়েই এসব বাগানের অনন্য নন্দনতাত্ত্বিক মূল্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

উসমানি যুগে বড় বড় মসজিদের প্রাচীরবেষ্টিত অঙ্গনে বৃক্ষ রোপণ করা হতো। এসব মসজিদের উদাহরণ হলো পবিত্র মসজিদে নববি ও তুরস্কের মসজিদে বাইজিদ।

তোপকাপি প্যালেসের বাগানগুলোকে অনন্য বিবেচনা করা হয়। তোপকাপি প্যালেসের নির্মাণকাজ শুরু হয় সুলতান মুহাম্মাদ আল-ফাতিহের যুগে। হিজরি দশম শতক থেকে ত্রয়োদশ শতক (খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতক থেকে উনবিংশ শতক) পর্যন্ত এই প্যালেস ছিল উসমানি সুলতানদের আবাসস্থল। প্রাসাদটির চারপাশে উনসত্তর হাজার বর্গমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃতি ছিল সেসব বাগানের। জায়গার মোট আয়তন ছিল পাঁচ বর্গ কিলোমিটার। বাগানের মধ্য দিয়ে রেখা টানার মতো ছিল উন্মুক্ত চলার পথ, এসব পথ প্রাসাদটিকে উত্তর, পশ্চিম ও পূর্ব দিক থেকে ঘিরে রেখেছিল। এসব বাগানের মধ্যে ফল ও সবজির বাগানও ছিল। শিকারের জন্যেও একটি বিশাল জায়গা রেখে দেওয়া হয়েছিল।

**মিশর**
ফুসতাত ছিল ইসলামি মিশরের প্রথম রাজধানী। 'বিরকাতুল হাবাশ' হলো ফুসতাতের একটি অংশ। এই বিরকাতুল হাবাশের বর্ণনা দিয়েছেন ইবনে সাইদ। তিনি বলেছেন, বিরকাতুল হাবাশ ছিল তুলুন পরিবারের উজির আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনে আলি মাদরায়ির রাজ্যের আওতাধীন। পূর্ব প্রান্তের বাগানগুলো ব্যতীত এখানকার যাবতীয় ফসলি খেত, বাগান ও উদ্যানও ছিল তার মালিকানাধীন। আমি ধারণা করি, পূর্ব প্রান্তের বাগানগুলো ছিল ওয়াহাব ইবনে সাদাকার, যিনি আল-হাবাশ নামে পরিচিত ছিলেন। এই বিরকাহর পূর্ব প্রান্ত শেষ হয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তরে গিয়ে, ওই উন্মুক্ত প্রান্তর পর্যন্তই রয়েছে হাবাশের বাগানগুলো। বিরকাতুল হাবাশের আগে রয়েছে কাতাদা ইবনে কাইস ইবনে হাবাশ সাদাফির বাগানগুলো। তিনি মিশর বিজয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তার নামেই বাগানগুলোও বিরকাহ পরিচিতি পেয়েছে।

খুমারাওয়াইহ ইবনে আহমাদ ইবনে তুলুনের শাসনামলে (৮৮৪-৮৯৬ খ্রি.)-তুলুনি রাজবংশের যুগে-কিছুকালের জন্য মিশরের রাজধানী ছিল আল-কাতায়ি। মিশরীয় ঐতিহাসিক আল-মাকরিযি (১৩৬৪-১৪৪২ খ্রি.) এই রাজধানীর নিসর্গ সম্পর্কে বলেন, খুমারাওয়াইহ ইবনে আহমাদ তার পিতার প্রাসাদে আসেন এবং প্রাসাদটিকে সংস্কার ও বড় করেন। তার পিতার যে বিশাল ময়দান ছিল তার পুরোটাকে উদ্যানে রূপান্তরিত করেন। উদ্যানে রোপণ করেন নানা জাতের সুগন্ধ গুল্ম ও ফুল, বিভিন্ন রকমের গাছ। তিনি উদ্যানটির জন্য সুন্দর সুন্দর চারা নিয়ে আসেন, এগুলোতে যেসব ফল ফলেছিল দাঁড়িয়েই সেগুলোর নাগাল পাওয়া যেত। বিভিন্ন উৎকৃষ্ট জাতের খেজুরগাছ ছিল, বসে থেকে হাত বাড়ালেই এসব খেজুর ছেঁড়া যেত। উদ্যানের জন্য আরও নিয়ে আসেন অদ্ভুত ও মনোরম সব গাছ, সব ধরনের গোলাপ। এখানে জাফরানও চাষ করেন তিনি। খুমারাওয়াইহ খেজুরগাছের দেহে পরিয়ে দেন চমৎকার করে বানানো সোনালি পাত দিয়ে মোড়া তামার কাঠামো। তামার কাঠামো ও খেজুরগাছের দেহের মাঝখানে বসিয়ে দেন সিসার তৈরি নালি। তিনি এতে প্রবাহিত করিয়ে দেন নিয়ন্ত্রিত জলের ধারা। খেজুরগাছের দীর্ঘ কাঠামোর খাঁজ বেয়ে নেমে আসত পানির ঝরনা এবং তা পতিত হতো কৃত্রিম ফোয়ারাবিশিষ্ট হাউজে; হাউজ থেকে পানি প্রবাহিত হতো বিভিন্ন ধারায়, ধারাগুলো বাগানকে সিঞ্চিত করত। উদ্যানে তিনি কৃত্রিম পত্রপল্লব ও নকশার (খোদাইকর্ম ও ভাস্কর্য) ওপর রোপণ করেছিলেন সুগন্ধ ফুল ও লতাগুল্ম। বাগানের মালি কাঁচি দিয়ে নিয়মিত এগুলোর পাতা কেটে দিত, যাতে পাতার ওপর পাতা জড়িয়ে না যায়। কৃত্রিম জলাশয়ে জলপদ্মের চাষও তিনি করেছিলেন। লাল, নীল ও হলুদ রঙের জলপদ্ম বাগানটির শোভা বাড়িয়ে দিয়েছিল...। আল-মাকরিযি এভাবেই ওইসব নয়নাভিরাম দৃশ্যের বর্ণনা দিতে থাকেন।

**বাগদাদ**

আব্বাসি খলিফা আবু জাফর আবদুল্লাহ আল-মানসুর ১৪৫ হিজরি থেকে ১৪৯ হিজরির মধ্যে বাগদাদ শহর নির্মাণ করেন। একে আব্বাসি খেলাফতের রাজধানী ঘোষণা করেন। বাগদাদে তার প্রাসাদের নাম দেন 'আল-খুলদ'। খতিব বাগদাদি বলেন, আল-মানসুরের প্রাসাদের নাম 'আল-খুলদ' রাখা হয় কুরআনে বর্ণিত 'জান্নাতুল খুলদ' নামানুসারে। কারণ এই প্রাসাদে ছিল অপরূপ সব দৃশ্য, চমৎকার সব বস্তু এবং খলিফার আশ্চর্যজনক ও অদ্ভুত সব চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছিল এখানে।

আব্বাসি খলিফাদের যুগে বাগদাদ ছিল গোটা পৃথিবীর বৃহৎ ও শ্রেষ্ঠ শহর। সভ্যতা, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যকলার দিক থেকে তা ছিল গোটা বিশ্বের রাজধানী। বাগদাদের পর আরও অনেক শহর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে... কর্ডোভা, কায়রো, কনস্টান্টিনোপল ইত্যাদি। এরপর অন্যান্য শহরের কথাও উল্লেখ করা যায়।

ইয়াকুত হামাবি প্রাচীন বাগদাদের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বাগদাদ হলো পৃথিবীর জান্নাত, শান্তির শহর, ইসলামের চূড়া, আগন্তুকদের মিলনমেলা, অন্য শহরগুলোর ললাট, ইরাকের চোখ, দারুল খিলাফা, ভালো ও উত্তম সবকিছুর সমাবেশস্থল, দৃষ্টিনন্দন ও চিত্তাকর্ষক বস্তুরাশির খনি; বাগদাদে ছিল সব শাস্ত্রের সীমাহীন প্রতিভাবানদের বসবাস, সব বিষয়ের যুগশ্রেষ্ঠ মনীষীদের আবাস। আবু ইসহাক আয-যুজাজ বলতেন: বাগদাদ হলো পৃথিবীর নগরী, তা বাদে সবকিছু গ্রাম ও মরুভূমি।

যাকারিয়া কাযবিনি আব্বাসি খলিফা আল-মুকতাদির বিল্লাহর প্রাসাদ-উদ্যানের বর্ণনা দিয়ে বলেন, আল-মুকতাদির বিল্লাহর (২৮২-৩২০ হি.) ভবনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো বৃক্ষভবন (দারুশ শাজারাহ)। ভবনটি বেশ প্রশস্ত, চারপাশে বাগান দ্বারা বেষ্টিত। ভবনটির ফটকের সামনে রয়েছে একটি বড় কৃত্রিম জলাশয়। জলাশয়ের ঠিক মাঝখানে রয়েছে একটি বৃক্ষ, বৃক্ষটি তৈরি করা হয়েছে সোনা ও রুপা দিয়ে। বৃক্ষের শরীরে রয়েছে সোনা ও রুপার তৈরি আঠারোটি ডাল। প্রতিটি ডালে রয়েছে অসংখ্য শাখা, শাখাগুলো ফলের আকারে বিভিন্ন ধরনের অলংকারে শোভিত। ডালগুলোতে আরও রয়েছে সোনা-রুপার তৈরি নানা জাতের রং-বেরঙের পাখি। বাতাস বয়ে গেলে শোনা যায় সুরেলা ধ্বনি ও গুঞ্জরণ। এই বৃক্ষের জন্যই ভবনটির নামকরণ হয়েছে বৃক্ষভবন।

অক্ষের নীতি মেনে, যা

আগ্রাতেই অবস্থিত ই'তিমাদুদ দাওলার সমাধিসৌধের উদ্যানটিও এরূপ নকশায় তৈরি করা হয়েছে। সমাধিসৌধটি চতুর্ভুজ আকৃতির উদ্যানের কেন্দ্রস্থলে একটি উঁচু চত্বরের ওপর নির্মিত। সমাধিসৌধের বহির্ভাগে চারদিকে রয়েছে চারটি চৌবাচ্চা। উদ্যানটি চারটি অংশে বিভক্ত, চারটি অংশ সবুজ প্রাকৃতিক দৃশ্য ও গাছপালায় শোভিত।

দিল্লিতে অবস্থিত সম্রাট হুমায়ুনের সমাধিসৌধেও একইরকম নকশা লক্ষ করা যায়। সমাধিটি উদ্যানের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। উদ্যানে রয়েছে পানির হাউজ ও নালা, এগুলো অক্ষীয় চতুর্ভুজ আকৃতিতে বিন্যস্ত।

**মাগরিব**

মুওয়াহহিদিনদের শাসনামলে (আল-মুহাদ রাজবংশের যুগে) উদ্যান ও বাগান সবচেয়ে বেশি ছিল মারাকেশে, আঙুর ও অন্যান্য সব ধরনের ফলের বাগান ছিল প্রচুর। মারাকেশের বাগানগুলোর মধ্যে দুটি ছিল বেশ বিখ্যাত : বুসতানুল মাসাররাহ ও বুসতানুস সালিহিয়্যাহ। বাগান দুটি নির্মাণ করেন আবদুল মুমিন ইবনে আলি। কয়েকটি বড় লেক বা কৃত্রিম জলাশয়ও ছিল এই শহরে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ইয়াকুব আল-মানসুরের তৈরি লেক। এটির দৈর্ঘ্য ছিল ৩৮০ গজ। লেকটির একপাশে রয়েছে চারশ কমলালেবুগাছ। প্রতি দুই কমলালেবু গাছের মাঝে রয়েছে একটি লেবুগাছ বা ফুল গাছ।

মারাকেশের বাগানগুলোই মাগরিবের একমাত্র বাগান ছিল না। অন্যান্য শহরেও বাগান ও উদ্যান ছিল। যেমন: মিকনাস (Meknes), ফাস (ফেজ), আল-মাকারমিদাহ, তাযারাইন (Tazzarine), সালা (Salé) ও সাবতাহ (Ceuta)।

ইবনে ফাদলুল্লাহ উমারি (১৩০০-১৩৮৪ খ্রি.) সাবতাহর বাগানগুলো সম্পর্কে বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, বিররুল আওদায় অবকাশযাপনের বেশ কিছু স্থান ছিল। স্থানগুলো সবার চিত্তাকর্ষণ করত, চোখ ধাঁধিয়ে দিত দর্শকদের। সমুদ্রের কূল ঘেঁষে সাবতাহর উপকণ্ঠে বেলিওনেচ-এ রয়েছে উদ্যান ও বিনোদনকেন্দ্র। এটির নকশা ও নির্মাণ অত্যন্ত চমৎকার। এখানকার পানি এক শ্রুতিমধুর গুঞ্জরণ তুলে পাথরের ওপর গিয়ে আছড়ে পড়ে, রয়েছে দৃষ্টিনন্দন বৃক্ষরাজি...।

পরিশেষে এ কথা বলা যায় যে, ইসলামি সভ্যতার উদ্যান ও বাগানগুলোতে এই আনন্দময় ভ্রমণ এই সভ্যতার মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাসকেই দৃঢ় করে। ইসলামি সভ্যতার এসব উত্তরাধিকার আজ পর্যন্ত মানবিক ও পরিবেশগত উৎকর্ষের মাইলফলক হয়ে আছে। দ্বীনে ইসলাম ও মানবস্বভাবের মধ্যে যে সাদৃশ্য ও সম্পর্ক বিদ্যমান, এসব বিষয় তারই অকাট্য প্রমাণ। কারণ মানবহৃদয় স্বাভাবিকভাবেই সবুজ রং এবং ঘনবিন্যস্ত বৃক্ষরাজি ও ফলরাশির প্রতি আকর্ষিত হয়।

টিকাঃ
৫৪. সাইয়িদ কুতুব, তাফসির ফি যিলালিল কুরআন, খ. ৫, পৃ. ৩৯০।
৫৫. বর্তমানে মাগরিব কথাটি দিয়ে মরক্কো, আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়ার সমগ্র অঞ্চলকে বোঝানো হয়; ব্যাপকতর অর্থে লিবিয়া ও মোরিতানিয়াকেও এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অতীতকালে আরবি ভাষায় মাগরিব বলতে অবশ্য দেশ তিনটির যেসব অংশ সুউচ্চ অ্যাটলাস পর্বতমালার উত্তরে ও ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত ছিল, সেগুলোকে বোঝানো হতো। কোনো কোনো ইতিহাসবিদ স্পেন, পর্তুগাল, সিসিলি দ্বীপ এবং মাল্টা দ্বীপপুঞ্জকেও মাগরিবের অন্তর্ভুক্ত করেন। মাল্টা দ্বীপপুঞ্জে আজও আরবি ভাষার একটি মাগরিবীয় উপভাষা প্রধান ভাষা হিসেবে প্রচলিত। অ্যাটলাস পর্বতমালা এবং সাহারা মরুভূমির কারণে মাগরিব অঞ্চলটি আফ্রিকার বাকি অংশ থেকে আংশিকভাবে বিচ্ছিন্ন। জলবায়ু, ভূমিরূপ, অর্থনীতি ও ঐতিহাসিক দিক থেকে এটি ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গেই বেশি সম্পৃক্ত। অনুবাদক
৫৬. বিস্তারিত দেখুন, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা ফিল-আন্দালুস, সালমা খাদরা জাইয়ুশি (সম্পাদনা), অধ্যায় : العلم والتكنولوجيا والزراعة )Science, Technology and Agriculture), অনুচ্ছেদ : أولوية في مدلولاتها الرمزية الحديقة الأندلسية : دراسة )The Hispano-Arab Gerden: Notes towards A Typology), লেখক : জেমস ডিকি (James Dickie), খ. ২, পৃ. ১৪১১ ও তার পরবর্তী।
৫৭. ইয়াযিদ ইবনে আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান ইবনুল হাকাম ইবনে আবুল আস (৬৮৭-৭২৪ খ্রি.) ছিলেন আবদুর রহমানের দাদার ভাই এবং উমাইয়া খেলাফতের নবম খলিফা। তিনি দ্বিতীয় ইয়াযিদ নামেও পরিচিত।-অনুবাদক
৫৮. আহমাদ মুহাম্মাদ আল-মাক্কারি, নাফহুত তিব, খ. ১, পৃ. ৪৬৭।
৫৯. ইবনে খতিব, আল-ইহাতা ফি আখবারি গারনাতা, অনুচ্ছেদ: ওয়াসফু হাদাইকি গারনাতা, পৃ. ১১৫ ও তার পরবর্তী।
৬০. প্রাগুক্ত।
৬১. বর্তমানে এটি Generalife নামে পরিচিত।
৬২. সুরা ওয়াকিআ: আয়াত ৩১।
৬৩. ইয়াহইয়া ওয়াযিরি, আল-ইমারাতুল ইসলামিয়্যা ওয়াল-বিআহ, পৃ. ২২৩।
৬৪. ৪২২ হিজরিতে/১০০১ খ্রিষ্টাব্দে উজির আবুল হাযম ইবনে জাহওয়ার আন্দালুসে উমাইয়া খেলাফতের পতনের ঘোষণা দেন। ফলে এলাকাগুলো কোনো একচ্ছত্র কর্তৃত্বের অধীন না থেকে আমিরদের স্বাধীন আমিরাত বা রাজ্যভূমিতে পরিণত হয়। তাদেরকে তায়িফা আমির বা গোত্রভিত্তিক আমির বলা হতো।-অনুবাদক
৬৫. এক্সপির‍্যাসিওن গার্সিয়া সানচেজ (Expiración García Sánchez): গ্রানাডা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামি ইতিহাসের অধ্যাপিকা এবং মাদ্রিদে অবস্থিত স্প্যানিশ ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলের (Consejo Superior de Investigaciones Científicas, CSIC) আরবি ভাষা বিভাগের গবেষক।
৬৬. বিস্তারিত দেখুন, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা ফিল-আন্দালুস, সালমা খাদরা জাইয়ুশি (সম্পাদনা), অধ্যায় : العلم والتكنولوجيا والزراعة (Science, Technology and Agriculture), অনুচ্ছেদ : الزراعة في إسبانيا المسلمة (Agriculture in Muslim Spain), লেখক: এক্সপির‍্যাসিওন গার্সিয়া সানচেজ, খ. ২, পৃ. ১৩৭০।
৬৭. জেমস ডিকি (ইয়াকুব যাকি): আন্দালুস বা ইসলামি স্পেনের ইতিহাস এবং ইসলামি শরিয়ায় বিশেষজ্ঞ পেশাজীবী পণ্ডিত। পণ্ডিত হিসেবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কাজ করেছেন ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে, লানকাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে ও যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটিতে (ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি)। ইসলামিক ওয়ার্ল্ড কনফারেন্স ১৯৭৪-১৯৭৬-এ তিনি উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭৫ সালে তিনি কায়রো থেকে ইবনে শুহাইদ আল-আন্দালুসীর নৃবিজ্ঞানের ওপর একটি রচনার অনুবাদ প্রকাশ করেন।
৬৮. বিস্তারিত দেখুন, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা ফিল-আন্দালুস, সালমা আল- খাদরা আল-জাইয়ুশি (সম্পাদনা), অধ্যায়: আত্‌তারিখ (Histoy),অনুচ্ছেদ : গ্রানাডা.. মিছাল মিন (Granada : A Case Study of Arab Arbanism in Muslim) আল্‌মাদিনাতুল আরাবীয়্যা ফিল আন্দালুস Spain), লেখক: জেমস ডিকি (James Dickie), খ. ১, পৃ. ১৭৬।
৬৯. ইসলাম বুল অর্থ ইসলামের শহর। জয় করার পর কনস্টান্টিনোপলকে উসমানিরা এই নামেই ডাকত। বর্তমানে শহরটির নাম ইস্তাম্বুল।
৭০. শাসনকাল ১৪৪৪-১৪৪৬ খ্রি. এবং ১৪৫১-১৪৮১ খ্রি.। জন্ম ১৪২৯ খ্রিষ্টাব্দে এবং মৃত্যু ১৪৮১ খ্রিষ্টাব্দে।-অনুবাদক
৭১. ইয়াহইয়া ওয়াযিরি, আল-ইমারাতুল ইসলামিয়্যা ওয়াল-বিআহ, পৃ. ২২৪-২২৬।
৭২. আহমাদ আদিল কামাল, আতলাসু তারিখিল কাহেরা, পৃ. ৩৫ থেকে উদ্ধৃত। তিনি উদ্ধৃত করেছেন ইবনে দুকমাক রচিত আল-ইনতিসার লিওয়াসিতাতি আকদিল আমসার থেকে।
৭৩. মূল বইয়ে এখানে মুদ্রণপ্রমাদ রয়েছে।-অনুবাদক
৭৪. মাকরিযি, আল-মাওয়ায়িয ওয়াল-ইতিবারি বিযিকরিল খুতাতি ওয়াল-আসার, খ. ১, পৃ. ৮৭২।
৭৫. দ্বিতীয় আব্বাসি খলিফা। রাজত্বকাল ১৩৬ হি. থেকে ১৫৮ হি.।
৭৬. খতিব বাগদাদি, তারিখু বাগদাদ, খ. ১, পৃ. ৭৩।
৭৭. ইয়াকুত হামাবি, মুজামুল বুলদান, খ. ১, পৃ. ৪৬১।
৭৮. কাযবিনি, যাকারিয়া ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে মাহমুদ, আসারুল বিলাদি ওয়া আখবারুল ইবাদ, খ. ১, পৃ. ১২৭।
৭৯. তাজমহলের সামনের চত্বরে একটি বড় চারবাগ (মুঘল বাগান পূর্বে চার অংশে বিভক্ত থাকত) করা হয়েছিল। ৩০০ মিটার × ৩০০ মিটার জায়গার বাগানের প্রতি চতুর্থাংশ উঁচু পথ ব্যবহার করে ভাগগুলোকে ১৬টি ফুলের বাগানে ভাগ করা হয়। মাজার অংশ এবং দরজার মাঝামাঝি অংশে এবং বাগানের মধ্যখানে একটি উঁচু মার্বেল পাথরের পানির চৌবাচ্চা বসানো আছে এবং উত্তর-দক্ষিণে একটি সরলরৈখিক চৌবাচ্চা আছে যাতে তাজমহলের প্রতিফলন দেখা যায়। এ ছাড়া বাগানে আরও বেশ কিছু বৃক্ষশোভিত রাস্তা এবং ঝরনা আছে। চারবাগ বাগান ভারতে প্রথম করেছিলেন প্রথম মুঘল সম্রাট বাবর, যা পারস্যের বাগানের মতো করে নকশা করা হয়েছিল। চারবাগ মানেই যাতে স্বর্গের বাগানের প্রতিফলন ঘটবে। প্রায় সব মুঘল চারবাগ চতুর্ভুজাকৃতির, যার বাগানের মধ্যখানে মাজার বা শিবির থাকে। কিন্তু তাজমহল এ ব্যাপারটিতে অন্যগুলোর থেকে আলাদা, কারণ এর মাজার অংশটি বাগানের মধ্যখানে হওয়ার বদলে বাগানের একপ্রান্তে অবস্থিত। যমুনা নদীর অপর প্রান্তে নতুন আবিষ্কৃত মাহতাব বাগ অন্যরকম তথ্যের আভাস দেয়, যমুনা নদীটি বাগানের নকশায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল যাতে তা স্বর্গের নদী হিসেবে অর্থবহ হয়। মুঘল সম্রাটদের উত্তরোত্তর অবক্ষয়ের সঙ্গে সঙ্গে বাগানেরও অবক্ষয় ঘটে। ইংরেজ শাসনামলে তাজমহলের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ইংরেজরা নেয়। তারা এ প্রাকৃতিক ভূ-দৃশ্যকে পরিবর্তন করে বাগানের চেহারা পালটে দেয়।-অনুবাদক
৮০. ইয়াহইয়া ওয়াযিরি, আল-ইমারাতুল ইসলামিয়্যা ওয়াল-বিআহ, পৃ. ২২৭-২২৮।
৮১. মুহাম্মাদ বিন আবদুল হাদি আল-মানুনি, হাদারাতুল মুওয়াহহিদিন, পৃ. ১৬২।
৮২. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬২।
৮৩. ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝে আফ্রিকার উত্তর উপকূলে অবস্থিত একটি স্প্যানিশ স্বায়ত্তশাসিত শহর। শহরটি মরক্কো দ্বারা বেষ্টিত।-অনুবাদক
৮৪. হাসান আলি হাসান, আল-হাদারাতুল ইসলামিয়্যা ফিল-মাগরিব ওয়াল-উদ্ন্দুলুস আসরুল মুরাবিতিন ওয়াল-মুওয়াহিহিদিন, পৃ. ৪২৮ ও তার পরবর্তী।
৮৫. Belyounech (بليونش). সাবতাহ থেকে সাত কিলোমিটার দূরে সাগরের কূল ঘেঁষে অবস্থিত একটি পাহাড়ি এলাকা।- অনুবাদক
৮৬. শিহাবুদ্দিন আহমাদ ইবনে ফাদলুল্লাহ উমারি, মাসালিকুল আবসার ফি মামালিকিল আমসার, খ. ৩, পৃ. ১১৭, (হাসান আলি হাসান, আল-হাদারাতুল ইসলামিয়্যা ফিল-মাগরিব ওয়াল-উন্দুলুস আসরুল মুরাবিতিন ওয়াল-মুওয়াহিহিদিন, পৃ. ৪২৯ থেকে উদ্ধৃত।)

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 ইসলামি বাগানগুলোর অনন্যতা

📄 ইসলামি বাগানগুলোর অনন্যতা


জেমস ডিকি স্বীকার করে নিয়েছেন যে, ইসলামি বাগানগুলোর নকশা ও নির্মাণ ইসলামি স্থাপত্যকলার মর্যাদা রাখে। পাশ্চাত্যের অভিধা ও পরিভাষা ব্যবহার করে এর বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা সম্ভব নয়। কারণ তা কেবল পাশ্চাত্যের ঐতিহাসিক অগ্রগতির ঘটনাপঞ্জির বাইরের বিষয় নয়, বরং তা বিভিন্ন চিন্তাগত ঐক্যসূত্রের ফল। তিনি সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, ইসলামি শিল্প কোনোদিনই উর্বরতাসমৃদ্ধ পরস্পরবিরোধী ভাবধারার সম্মোহনের নিচে চাপা পড়েনি, অথচ ইউরোপীয় নন্দনতত্ত্বের মূল ভিত্তিই এটি।

ড. ইয়াহইয়া ওয়াযিরি তার আল-ইমারাতুল ইসলামিয়্যা ওয়াল-বিআহ গ্রন্থে ইসলামি অনন্য বাগানসমূহের কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। তার কয়েকটি নিম্নরূপ:

**১. কুরআন ও সুন্নাহ থেকে অনুপ্রেরণা**

ইসলামি বাগানগুলো কুরআন ও সুন্নাহে জান্নাতের যেসব বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে তা থেকে অনুপ্রেরণাজাত। গাছ, পানি, নালা, আসন, মজলিস, ঘ্রাণ ইত্যাদির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বর্ণনারও অনুকরণ করা হয়েছে।

আল-কুরআনের যেসব আয়াত থেকে মুসলিমরা পার্থিব উদ্যান ও বাগান তৈরি করার জন্য 'আদর্শমূলক স্থানে'র চিন্তা ও অনুপ্রেরণা লাভ করেছেন তার অন্যতম হলো আল্লাহ তাআলার এই বাণী,

وَمَثَلُ الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمُ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ وَتَثْبِيْتًا مِنْ أَنْفُسِهِمْ كَمَثَلِ جَنَّةٍ بِرَبْوَةٍ أَصَابَهَا وَابِلٌ فَأَتَتْ أُكُلَهَا ضِعْفَيْنِ فَإِنْ لَمْ يُصِبْهَا وَابِلٌ فَطَلُّ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ

আর যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করার জন্য এবং নিজেদের আত্মা বলিষ্ঠ করার জন্য তাদের সম্পদ ব্যয় করে তাদের উপমা কোনো উচ্চ ভূমিতে অবস্থিত একটি উদ্যান, যাতে মুষলধারে বৃষ্টি হয়, ফলে তার ফলমূল দ্বিগুণ জন্মে। যদি মুষলধারে বৃষ্টি নাও হয় তবে হালকা বৃষ্টিই যথেষ্ট। তোমরা যা করো আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।

মুসলিমরা এখানে একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিতের প্রতি লক্ষ করেছেন। অর্থাৎ কুরআনের আয়াতে কারিমা স্পষ্টভাবে বলছে যে, বাগান ও উদ্যানের জন্য আদর্শ স্থান কেবল ভূমি থেকে উঁচু জায়গাতেই হতে পারে। আয়াতে 'রাবওয়া' শব্দটি এসেছে, এর অর্থ উঁচু জায়গা, উঁচু ভূমি। উঁচু জায়গায় গাছ রোপণ করলে তা গাছের শেকড়কে ভূমির অভ্যন্তরীণ পানির সংস্পর্শে আসতে দেয় না। কারণ ভূমির অভ্যন্তরীণ পানি গাছের বর্ধনকে বাধাগ্রস্ত করে। একইভাবে উঁচু জায়গা অতিরিক্ত পানি ভালোভাবে সরিয়ে দিতে সাহায্য করে।

গাছের পরিচর্যার প্রতি গুরুত্ব ও মনোযোগ এত বেশি ছিল যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে গাছের গুঁড়িতে সোনার পাত বাঁধিয়ে দেওয়া হতো। খুমারাওয়াইহ ইবনে আহমাদ ইবনে তুলুন তার প্রাসাদের বাগানগুলোর এত বেশি যত্ন নিতেন যে খেজুরগাছের শেকড়কে সোনার গিলটি করা তামার পাত দিয়ে মুড়িয়ে দিয়েছিলেন। মুসলিমরা এই বৃক্ষের পরিচর্যার ক্ষেত্রে এই নীতিটি পেয়েছেন নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস থেকে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

مَا فِي الْجَنَّةِ شَجَرَةٌ إِلَّا وَسَاقُهَا مِنْ ذَهَبٍ

জান্নাতে প্রতিটি গাছেরই গুঁড়ি হবে স্বর্ণের।

**২. স্বর্গীয় দৃষ্টিভঙ্গি**
ইসলামি স্থাপত্যকলা যে অনন্য বৈশিষ্ট্যে মণ্ডিত তাকে আমরা 'স্বর্গীয় দৃষ্টিভঙ্গি' বলে আখ্যায়িত করতে পারি। প্রতিকূল আবহাওয়ায় দুর্যোগ-কবলিত পরিবেশে পার্থিব বাগান ও উদ্যান তৈরিতে যে প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়েছে তাতে এই দৃষ্টিভঙ্গিই ফুটে উঠেছে। বাগান তৈরির উদ্দেশ্য ছিল এই পরিবেশকে আরও সুন্দর ও পরিপাটি করে তোলা। ইসলামি শিল্পকলা ও স্থাপত্যকলার উৎকর্ষ ও বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বাগানের নকশা তৈরি ও নির্মাণের প্রবণতাকে আরও রুচিশীল, অভিজাত ও জাঁকজমকপূর্ণ করার চেষ্টা অব্যাহত থেকেছে, সেই সৌন্দর্য ও নান্দনিকতাকে উজ্জ্বল করে তোলার জন্য, কুরআন তাকে পৃথিবীর উদ্যানসমূহ বলে চিহ্নিত করেছে।

فَأَنْبَتْنَا بِهِ حَدَائِقَ ذَاتَ بَهْجَةٍ

তারপর এর দ্বারা আমি মনোরম উদ্যান সৃষ্টি করি...।

**৩. উদ্যানের ফটকগুলোতে ও দেয়ালগাত্রে উৎকীর্ণ করা হয়েছে কুরআনের আয়াত বা হাদিসের অংশ বা অন্যান্য ইসলামি বাণী।**

**৪. বাড়িগুলোতে প্রচুর বাগান থাকত।**
আর এ বাগানগুলো হতো বাড়ির ভেতর-আঙিনায়, যাতে গোপনীয়তা যথার্থভাবে বজায় থাকে এবং বাড়িগুলোতে যেন বড় চত্বর, উদ্যান ও গণমাঠের বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে ওঠে।

**৫. ইসলামি যুগে বাগানগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল গোপনীয়তা।**
এ কারণেই বাগানগুলো ঘেরাও দেওয়া থাকত উঁচু প্রাচীর দিয়ে বা চারপাশে থাকত খেজুরগাছ, যাতে অভ্যন্তরীণ দৃশ্য বাইরে থেকে দেখা না যায়।

বাগানের প্রতি ইসলামি ও পাশ্চাত্য দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে মৌলিক পর্যবেক্ষণের দিকটি উল্লেখ করে এই অনুচ্ছেদ শেষ করাটা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই পর্যবেক্ষণ থেকে ইসলামি দর্শনের ও পাশ্চাত্য দর্শনের সারমর্ম স্পষ্ট হয়েছে; ইসলামি দর্শন সৌন্দর্য ও নান্দনিকতার প্রতি আবেগ ও আগ্রহের দিকটি গুরুত্ব দেয়, অন্যদিকে পাশ্চাত্য দর্শন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় বস্তুগত দিক ও ব্যবহারিক উপযোগিতাকে। এই পর্যবেক্ষণ আমাদের নয়, জেমস ডিকির। তার এই পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে তিনি 'ইসলামি বাগানচর্চার ঐতিহ্য হত্যা'র কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, (আন্দালুসীয়-আরব বাগানের মৃত্যুর কারণ হলো একটি অনুমেয় প্রস্তাব, যা জনসংখ্যাতত্ত্ব ও নন্দনতত্ত্বের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ স্থানে রয়েছে। আমরা যে অনুমেয় প্রস্তাব এখানে পেশ করছি, অর্থাৎ বাগানের নকশা ও নির্মাণশিল্প কৃষিবিজ্ঞানেরই একটি সম্প্রসারিত অংশ এবং এরই ওপর বাগানচর্চা নির্ভরশীল ছিল তা যদি সত্য হয়,) তা হলে মোরিস্কোদের বিতাড়ন অবশ্যই স্পেনে ইসলামি বাগানচর্চার ঐতিহ্যকে হত্যা করছিল, এমনকি (খ্রিস্টান শক্তি কর্তৃক) গ্রানাডার দখলও (ইউরোপীয়) রেনেসাঁসের দ্বারা প্রবর্তিত রুচি ও ফ্যাশনের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেনি। ইউরোপীয় রেনেসাঁস বাগানকে স্থাপত্যকলার সম্পূরক হিসেবে দেখেছে, যেখানে মুসলিমরা প্রাসাদকে বাগানের অনুগামী হিসেবে দেখার প্রবণতা দেখিয়েছেন। এই দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সংশ্লেষ ঘটানো বা সামঞ্জস্য বিধান করা সম্ভব ছিল না। (এ ছাড়া যেকোনো রূপে ইসলামিক আর্টের পৃষ্ঠপোষকতা ব্যক্তিকে ইনকুইজিশন-এ নিযুক্ত লোকদের চোখে সন্দেহভাজন করে তুলছিল।)

টিকাঃ
৮৭. সালমা খাদরা জাইয়ুশি, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়‍্যা ফিল-আন্দালুস, খ. ২, পৃ. ১৪৩৫। তাতে জেমস ডিকির আলোচনা ( الحديقة الاندلسية دراسة في مدلولاتها الرمزية ) শিরোনামে উল্লেখ করা হয়েছে।
৮৮. ইয়াহইয়া ওয়াযিবি, আল ইমারাতুল ইসলামিয়্যা ওয়াল-বিআহ, পৃ. ২১৪ ও এর পরের পৃষ্ঠাগুলো।
৮৯. সুরা বাকারা: আয়াত ২৬৫।
৯০. তিরমিযি, আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, কিতাব: সিফাতুল জান্নাহ আন রাসুলিল্লাহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, বাব: সিফাতু শাজারিল জান্নাহ, হাদিস নং ২৫২৫।
৯১. সুরা নামল: আয়াত ৬০।
৯২. মোরিস্কো (Morisco) একটি স্প্যানিশ কাতালান শব্দ। স্পেনে ইসলামি শাসনব্যবস্থার পতনের পর খ্রিষ্টীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। স্পেনে তখন যেসব মুসলিম ছিল তারা মর্মন্তুদ নির্যাতনের শিকার হয়। রোমান ক্যাথলিক চার্চ ও স্প্যানিশ রাজপরিবার তাদের মৃত্যুর হুমকির মুখে খ্রিধর্ম গ্রহণে বা স্বনির্বাসনে বাধ্য করে। বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রকাশ্যে ধর্মপালনও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এসব মুসলিমকেই মোরিস্কো বলে আখ্যায়িত করা হয়।- অনুবাদক
৯৩. ইনকুইজিশন (the Inquisition) অর্থ নির্দয় ধর্মীয় বিচার। স্পেনের মুসলিমদের ইনকুইজিশনের মুখোমুখি করে নির্যাতন ও বিভিন্নভাবে হত্যা করা হতো।- অনুবাদক
৯৪. সালমা খাদরা জাইয়ুশি, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা ফিল-আন্দালুস, খ. ২, পৃ. ১৪৩৫। এই অংশটি আমি মূল ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছি।- অনুবাদক

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 ফোয়ারা

📄 ফোয়ারা


বাগানে পানির ব্যবহারে মুসলিম কৃষিবিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও শিল্পীর দক্ষতার অসাধারণ নজির হলো ইসলামি বাগানগুলোতে ফোয়ারার বিস্তার।

মুসলিমদের বাগানগুলোতে পানিকে বিভিন্নরূপে ব্যবহার করা হয়েছে: বৃক্ষরাজির ঘন ছায়াঢাকা কৃত্রিম জলাশয়রূপে; পানির পৃষ্ঠদেশের পরিবর্তন-সহায়ক ফোয়ারারূপে, ফলে পানি প্রতিবিম্বিত পৃষ্ঠদেশরূপে কাজ করে না; বা উঁচু নলের সারিরূপে, যা থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে এবং শ্রুতিমধুর কুলকুল ধ্বনি তোলে অথবা ঝরনারূপে।

আমরা লক্ষ করেছি, মুসলিমবিশ্বজুড়ে বাগানের বিস্তৃতি ছিল ব্যাপক এবং আমরা আরও লক্ষ করেছি, ঘরবাড়ির ভেতর-আঙিনাতেও বাগানের বিস্তৃতি ছিল। তাই আমরা বলতে পারি, মুসলিম শহরগুলোর প্রত্যেক বাগানে ফোয়ারার সংখ্যা অনুমান করার জন্য আমাদের পক্ষে এই চিন্তাকে দ্বিগুণ করে নেওয়া সম্ভব। কারণ ফোয়ারার সংখ্যা এত বেশি যে তা গোনা সম্ভব নয়।

মুসলিম সমাজের দরিদ্র ঘরগুলো সম্পর্কে বর্ণনা দিয়েছেন উইল ডুরান্ট। তিনি বলেছেন, তখনকার দিকে দরিদ্রদের ঘরগুলোও ছিল— এখনো যেমন রয়েছে— আয়তক্ষেত্রকার; মাটি দিয়ে সংযুক্ত ইটের কাঠামোতে তৈরি, ছাদে থাকত মাটির মিশ্রণ, উদ্ভিদের অংশ, গাছের ডাল, খেজুরগাছের ডাল ও খড়। এগুলোর চেয়ে উন্নত এক শ্রেণির ঘর ছিল, সেগুলোর ভেতর দিকে থাকত উন্মুক্ত উঠান, পানির ছোট হাউজ, কখনো কখনো গাছও থাকত। মাঝে মাঝে এসব ঘরে থাকত একগুচ্ছ কাঠের খুঁটি, ঘরের কামরাগুলো ও উঠানের মাঝ বরাবর থাকত বারান্দা।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, উসমানি খেলাফতের যুগে কেবল বেলগ্রেডেই ছিল ছয়শ পাবলিক ফোয়ারা।

গত কয়েক বছর ধরে মরোক্কান কর্তৃপক্ষ ফেজ শহরের প্রাচীন ফোয়ারাগুলোর সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করার উদ্যোগ নিয়েছে। যে পরিসংখ্যান বেরিয়েছে তাতে বলা হয়েছে, ফেজের সড়কগুলোতে সত্তরটি পাবলিক ফোয়ারা পাওয়া গেছে। পুরোনো আবাসিক ভবন, মসজিদ ও মাদরাসার অভ্যন্তরীণ আঙিনায় পাওয়া গেছে প্রায় চারশ ফোয়ারা। ঐতিহাসিক উৎসগুলো নির্দেশ করে যে, এই প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শহরে খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দী থেকে এসব ফোয়ারা ছিল। পানির জন্য সব মানুষ এসব ফোয়ারার ওপর নির্ভরশীল ছিল; নিজেরা পানি পান করত, পশুপাখিদের পান করাতো এবং বাগানেও পানি সেচ দিত। এটা বিশ্বাস করা হয় যে, প্রায় দশ শতাব্দী আগে ফেজ শহরে পানি-সরবরাহের যে জটিল সিস্টেম ছিল তার সঙ্গে এসব ফোয়ারার অস্তিত্ব ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

সেই সময় ফোয়ারা কেবল আভিজাত্য ও বিলাসিতার বিষয় ছিল না, বরং পানি ব্যবহারে ইসলামি সভ্যতার যে দর্শন তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও ছিল এটি। এই দর্শনের মূলকথা হলো, ব্যবহারিক দিকগুলোর সঙ্গে আত্মিক ও অনুভূতিগত উপভোগের দিকগুলোর সমন্বয় সাধন।

গ্রানাডার জান্নাতুল আরিফে ফোয়ারাগুলো থেকে পানি উচ্ছলিত ধারায় প্রবাহিত হতো। পানির হাউজের কিনারা-সংশ্লিষ্ট সর্বোচ্চ দক্ষতার ফলেই তা সম্ভব হয়েছিল। ফোয়ারার উচ্ছলিত পানি নিচের হাউজে পড়ার সময় অর্ধবৃত্তাকার তরঙ্গ সৃষ্টি করত। এই শিল্পরীতি একটি ইসলামি সংযোজন, ইতিপূর্বে এর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। পানির হাউজগুলোতে মাঝেমধ্যে নানা জাতের মাছ থাকত বা বিভিন্ন ধরনের পাখি থাকত, যেমন হাঁস। এসব হাউজের পাশে অবস্থিত ফোয়ারাগুলো পানির উপরিভাগে কীটপতঙ্গ জন্মাতে দিত না। এসব ফোয়ারা বাতাসে জলকণা ছড়িয়ে দেওয়ার কাজেও ব্যবহৃত হতো, সম্ভবপর সর্বনিম্ন পরিমাণ ছিটিয়ে দিয়ে বায়ুকে কোমল ও সজীব রাখত।

পাবলিক ফোয়ারাগুলো প্রতীকী, নন্দনতাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক—এই তিনটি দিকের সম্মিলন ঘটিয়েছিল। এগুলোতে পানির সবচেয়ে চমৎকার ব্যবহার চোখে পড়ত। এসব সৃজনশীল ও নান্দনিক কাজের সবচেয়ে সুন্দর জিনিসগুলো পাওয়া যেত মসজিদের চত্বরে। বলকান অঞ্চল যখন উসমানি খেলাফতের ছায়াতলে ছিল তখন সেখানে এসব নান্দনিক কাজের শ্রেষ্ঠ নমুনা তৈরি হয়েছে। যেমন: মুহাম্মাদ কুসকি পাশা মসজিদ, হারতাদাউস বেগ মসজিদ, কাইনাইনিচে অবস্থিত সিনান পাশা মসজিদ, বাইচায় অবস্থিত সুলতান ইসমি মসজিদ, স্কপিয়েতে অবস্থিত মুস্তাফা পাশা মসজিদ, সারায়েভোতে গাজি খসরু বেগ (হুরসেভ বেগ) মসজিদ, ফোচায় অবস্থিত আলাজা মসজিদ (Aladža Mosque)—এগুলোর ফোয়ারাসমূহ। ফোয়ারাকে বিশ্বজুড়ে মুসলিম শহরগুলোর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়, বিশেষ করে বলকানে। ফোয়ারাগুলোর পানি পানের উপযুক্ত, অজু ও গোসলের কথা তো বলাই বাহুল্য।

টিকাঃ
৯৫. ইয়াহইয়া ওয়াযিরি, আল-ইমারাতুল ইসলামিয়‍্যা ওয়াল-বিআহ, পৃ. ২১৭।
৯৬. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১৩, পৃ. ২৪১।
৯৭. সার্বিয়ার রাজধানী ও বৃহত্তম শহর।
৯৮. জারিদাতুশ শারকিল আওসাত, তারিখ: ২৫ শে নভেম্বর, ২০০৮।
৯৯. জারিদাতুশ শারকিল আওসাত, তারিখ: ২৭ শে অক্টোবর, ২০০২।
১০০. ইয়াহইয়া ওয়াযিরি, আল-ইমারাতুল ইসলামিয়্যা ওয়াল-বিআহ, পৃ. ২১৭।
১০১. সালমা খাদরা জাইয়ুশি, আল-হাদারাতুল আরাবিয়‍্যাতুল ইসলামিয়্যা ফিল-আন্দালুস, খ. ২, পৃ. ১৪৩৩।
১০২. ইয়াহইয়া ওয়াযিরি, আল-ইমারাতুল ইসলামিয়্যা ওয়াল-বিআহ, পৃ. ২১৭-২১৮।
১০৩. বসনিয়া-হার্জেগোভেনিয়ার মোস্তার শহরে অবস্থিত। ১৬১৭ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত।-অনুবাদক
১০৪. উত্তর মেসিডোনিয়ার রাজধানী স্কপিয়ের পুরোনো বাজারে অবস্থিত।-অনুবাদক
১০৫. বসনিয়া-হার্জেগোভেনিয়ার রাজধানী।-অনুবাদক
১০৬. ফোচা (Foča): বসনিয়া-হার্জেগোভেনিয়ার একটি শহর।-অনুবাদক
১০৭. আবদুল বাকি খলিফা, আল-আসারুত তারিখিয়্যাহ ফিল-বালকান, জারিদাতুশ শারকিল আওসাত, তারিখ: ২৫ শে নভেম্বর, ২০০৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00