📄 শিল্প-সামগ্রীর সৃজনশীলতা
নান্দনিকতার ক্ষেত্রে শিল্পসামগ্রীর মূল্য তেমন কোনো প্রভাব রাখে না। কারণ এখানে সামগ্রীটির যে সৌন্দর্য ও নান্দনিকতা রয়েছে তারই আলোচনা হয়, তার মূল্যের নয়। অকিঞ্চিৎকর সামগ্রীর মধ্যেও সৌন্দর্যের এমন নমুনা পাওয়া যায় যা জনজীবনের সবচেয়ে সূক্ষ্ম বিষয়কে ফুটিয়ে তোলে, তাদের শৈল্পিক নির্মাতাদের জ্ঞানজগৎকে মূল্যায়ন এবং তাদের উদ্ভাবক ও সংগ্রাহকদের প্রয়োজন অনুধাবনে সাহায্য করে।
গুস্তাভ লি বোঁ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, আরবদের মধ্যে সব জায়গাতেই শিল্পকলার বিস্তৃতি ঘটেছিল। আরবরা যেসব বস্তু প্রস্তুত করেছে, চমৎকারিত্ব ও অনন্য বৈশিষ্ট্যের আদলে সেগুলোকে গড়েছে। যা থেকে প্রমাণিত হয় যে, তাদের সামান্যতম নির্মাণও শৈল্পিক রুচির পরিচয় বহন করে।
ইসলামি শিল্পকলায় শোভা ও অলংকারের অশেষ আঙ্গিক ও রীতি সব স্থানেই পাওয়া যায়, তা কেবল কুরআনুল কারিমের পৃষ্ঠাগুলোতে অলংকৃত লিপির অনন্য উদাহরণগুলোতেই সীমাবদ্ধ নয়। গল্প-সংকলন বা কবিতা- সংকলনের যেসব কপি খলিফাদের বা আমিরদের উপহার দেওয়া হতো অনুরূপ আঙ্গিকে অলংকারে শোভিত থাকত। উৎকর্ষপূর্ণ ও শিখরস্পর্শী অলংকরণশিল্পের অস্তিত্ব কেবল মসজিদে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা পান্থশালা, মাদরাসা ও আবাসগৃহেও তার উজ্জ্বলতা ছড়িয়েছে।
একইভাবে সংখ্যাহীন শৈল্পিক আঙ্গিক কেবল মসজিদে কুরআন শরিফের কপি রাখার তেপায়াকে আচ্ছাদিতকরণেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং একজন মুসলিম যেসব পাত্র থেকে খাদ্য গ্রহণ করত তাতেও পাওয়া যেত। পাওয়া যেত সৈনিকের বর্মে, তার তরবারিতে এবং মাথা ঢাকার রুমালেও। অলংকরণগুলো হতো একই পদ্ধতি মেনে। এ কারণে এটাই সবচেয়ে সংগত যে আমরা ইসলামি শিল্পকে একটি অনন্য ও অসাধারণ প্রকরণ হিসেবে বিবেচনা করব। সকল শোভামণ্ডিত বস্তু ও নান্দনিক সামগ্রীর ক্ষেত্রে যেরূপ ব্যবহারের জন্য এগুলো প্রস্তুত করা হয়েছে তা থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েও এ কথা বলা যায়।
ইসলামি শিল্পসামগ্রীতে, সেগুলোর গুরুত্ব যত কমই হোক না কেন, নান্দনিকতার বিস্তার একটি বিষয়, ইসলামি সভ্যতার মর্যাদা প্রকাশে এর আলাদা প্রদর্শনীর প্রয়োজন নেই।
নান্দনিকতার সূচনা ঘটেছে ইসলামের শুরুর যুগেই। বর্ণিত হয়েছে যে, ওহুদ যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু দুজানাকে যে তরবারিটি দিয়েছিলেন তার একপাশে খচিত ছিল নিম্নরূপ পঙ্ক্তি:
في الجبن عار وفي الإقبال مكرمة والمرء بالجبن لا ينجو من القدر
ভীরুতায় রয়েছে কলঙ্ক, এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই রয়েছে সম্মান। মানুষ ভীরুতা অবলম্বন করে তার ভাগ্যলিপি থেকে মুক্তি পায় না।
কবিতা হলো সেই জাদু যার জন্য আরবেরা সবসময় ছিল উল্লসিত ও পাগলপারা।
এরপর থেকেই ইসলামি শিল্পসামগ্রীর উৎকর্ষ সাধিত হতে থাকে এবং অবশেষে নান্দনিকতার এক আশ্চর্যজনক পর্যায়ে পৌঁছায়। একইসঙ্গে ইসলামি রাজ্যগুলোতে তার সাংস্কৃতিক বিস্তৃতিও ঘটে।
গুস্তাভ লি বোঁ তো ইসলামি শিল্পকলাকে পর্যবেক্ষণ করে বিস্ময়বিহ্বল হয়ে পড়েছেন; তিনি শিল্পকৌশল, অলংকরণ ও নকশাখচিত করা প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, কোনো কোনো বিষয় তাদের এতটাই আয়ত্তে এসেছিল এবং তারা এতটা দক্ষ হয়ে উঠেছিল যে আমাদের এ যুগেও সেই পর্যায়ে পৌঁছা অসম্ভব মনে হয়।
যাবতীয় ইসলামি শিল্পসামগ্রীই মহৎ শিল্পকর্মে রূপান্তরিত হয়েছে : তরবারি, বর্ম, বর্শা, কিরিচ, খঞ্জর, শিরস্ত্রাণ, চিঠি আদান-প্রদানের নল বা বেলন; গৃহের তৈজসপত্র ও সাজসরঞ্জাম, যেমন: চেয়ার, টেবিল, অলংকারের বাক্স, বিভিন্ন জিনিস সংরক্ষণের সিন্দুক, খাবারের পাত্র ও থালা, জগ, পানপাত্র ও কাপ, চীনামাটির বাসনকোসন, দোয়াত এবং দরজা ও জানালা, কাপড়, পোশাক-পরিচ্ছদ, বিছানা-বালিশ, ঘোড়ার জিন, মসজিদের বাতি, মিম্বার, মোমদানি, দাঁড়িপাল্লা, চাবি, তালা, দরজার চৌকাঠ, কুঠার, লেখার যন্ত্রপাতি, চিকিৎসার যন্ত্রপাতি, এমনকি হুক্কাও। এগুলো তো বটেই, এ ছাড়াও এমনকিছু শিল্পসামগ্রী রয়েছে যেগুলোর মধ্যে খচিত নকশা ও অলংকরণই মৌলিক উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। যেমন: কানের দুল, গলার হার, হাতের আংটি, পাগড়ির প্রান্ত, নূপুর ইত্যাদি। এগুলো ছাড়াও রয়েছে অলংকরণের আরও বিভিন্ন উপকরণ।
উইল ডুরান্ট সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, আরবরা তাদের পূর্ববর্তীদের যেসব শিল্পের আয়ত্তীকরণ করেছে, তা তারা যথার্থভাবে আয়ত্তীকরণ করেছে, অনুকৃতি বা নকল করা নয়। আয়ত্তীকরণের মধ্য দিয়ে তারা নতুন নতুন ও মৌলিক বহু কিছু উদ্ভাবন করেছে। তিনি বলছেন, বরং তাদের শিল্পকলায় বিভিন্ন কাঠামো ও আকৃতির মধ্যে সৃজনশীল ও উজ্জ্বল সমন্বয় ঘটেছে। মুসলিমরা অন্যান্য জাতি থেকে যা-কিছু গ্রহণ করেছে তাতে এর মর্যাদা হ্রাস পায় না। যে ইসলামি শিল্পকলা ছড়িয়ে পড়েছে আন্দালুসের আল-হামরা প্রাসাদ থেকে ভারতের তাজমহল পর্যন্ত তা অতিক্রম করেছে স্থানের ও কালের সকল সীমা। উপাদান ও জাতির মধ্যে স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে গিয়ে তা মূলত কৌতুক করেছে এবং এক অনন্য শৈলীর জন্ম দিয়েছে। কিন্তু সেই শৈলীর বিভিন্ন প্রকরণ রয়েছে। ইসলামি শিল্পকলা মানবাত্মাকে প্রকাশ করেছে অফুরন্ত সৌষ্ঠব ও রুচিবোধের মধ্য দিয়ে, যাকে ওই সময় পর্যন্ত কোনোকিছু ছাড়িয়ে যেতে পারেনি।
'আতলাসুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা' গ্রন্থের প্রণেতাদ্বয় (ড. ইসমাইল রাযি ফারুকি ও ড. লুইস লামিয়া ফারুকি) মনে করেন, ইসলামি অলংকরণ তার অশেষ প্রকরণ ও রীতির মধ্য দিয়ে একটি বিষয় প্রকাশ করার ক্ষেত্রে যত্নশীল থেকেছে, তা হলো একত্ববাদ বা তাওহিদ। সবকিছুতে ইসলামি অলংকরণের বিস্তৃতি ইসলামি চিন্তাকেই প্রতিফলিত করেছে। একজন মুসলিমের প্রতিটি উদ্যোগ ও কর্ম হবে আবশ্যিকভাবে ইসলামি চিন্তাধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটাই ইসলামি চিন্তার দাবি।
এ কারণেই উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যখন মুসলিম শিল্পী লেখালেখির সরঞ্জামাদি রাখার কাঠের একটি সাধারণ বাক্স অলংকরণ করেন, তা তিনি অলংকৃত করেন হাতির দাঁত, ঝিনুক ও রঞ্জিত কাঠের টুকরো দিয়ে; ফলে কাঠের মূল কাঠামোটি কেবল যে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে তা নয়, অপরিচিতও হয়ে ওঠে। ফলে বোঝাই যায় না এটি কি ওক কাঠ, না সেগুন, না মেহগনি।
বড় বড় প্রাসাদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য, যেখানে নির্মাণের মূল উপাদানগুলো অলংকরণ-স্তরের নিচে পুরোপুরিই ঢাকা পড়ে গেছে। যে চিন্তা মৌলিক উপাদানরাশির বস্তুগত মূল্যের প্রতি গুরুত্বারোপ করে না তা-ই এখানে সৌন্দর্যকে বস্তুগত মূল্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত না করার মধ্য দিয়ে মূর্ত হয়ে উঠেছে; এটাই সাধারণ ইসলামি চিন্তার নির্যাস, যে চিন্তা বস্তুগত মূল্যের ক্ষেত্রে বিমুখ। এই চিন্তার ফলে সৌন্দর্য তার ঔজ্জ্বল্য ও চাকচিক্য ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে সাধারণ ও বস্তুগত দিক থেকে নগণ্যমূল্য জিনিসের মধ্যেও। এ সবকিছু প্রথমত নান্দনিকতা ও সৌন্দর্যকে তার মূল্য দিয়েছে এবং সবচেয়ে বড় মূল্য দিয়েছে মানবের অস্তিত্বকে।
এই যে দৃষ্টিভঙ্গি—যা ইসলামের শিল্পদর্শনকে মূর্ত করে তোলে তা নিজেই একটি বড় অবদান, দীর্ঘ সময় নিয়ে তার সামনে দাঁড়ানো উচিত। ইসলামি ভাবপ্রবণতাকে কাঠামোবদ্ধ রূপদান এবং প্রকৃতি ও স্রষ্টা, জীবন ও বিশ্বের জন্য মানবিক বোধ নির্মাণে তা কী গভীর অবদান রেখেছে তা পুঙ্খানুরূপে যাচাই করা উচিত।
নিচের চিত্রগুলো থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, ইসলামি শিল্পসামগ্রীতে—তার মূল্য যত কমই হোক না কেন—সৌন্দর্য ও নান্দনিকতা ছিল একটি মৌলিক উপাদান এবং তার উপস্থিতি সব ধরনের সামগ্রীতেই ছিল।
টিকাঃ
৩৯. গুস্তাভ লি বোঁ, হাদারাতুল আরাব, পৃ. ৫০৭।
৪০. ড. ইসমাইল রাযি ফারুকি ও ড. লুইস লামিয়া ফারুকি, আতলাসুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৫৩৯।
৪১. ফারুকি, আস-সিরাতুল হালাবিয়্যাহ, খ. ২, পৃ. ৪৯৭।
৪২. গুস্তাভ লি বোঁ, হাদারাতুল আরাব, পৃ. ৫১১।
৪৩. উইল ডুরান্ট, The Story of Civilization, আরবি অনুবাদ: কিসসাতুল হাদারাহ থেকে উদ্ধৃত, খ. ১৩, পৃ. ২৪০।
৪৪. গ্রন্থটির মূল নাম The Cultural Atlas of Islam। আরবি অনুবাদ: ড. আবদুল ওয়াহিদ লু'লু। -অনুবাদক
৪৫. ড. ইসমাইল রাযি ফারুকি ও ড. লুইস লামিয়া ফারুকি, আতলাসুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৫৪০ ও তার পরবর্তী।