📄 আরবি লিপিকলা
**আরবি লিপির নন্দনতাত্ত্বিক মূল্য**
আরবি লিপিকলা একটি বিশুদ্ধ ইসলামি শিল্প। এটি ইসলামধর্মের অন্যতম সৃষ্টি। আরবি লিপিকলার সঙ্গে ইসলামের পবিত্র গ্রন্থের দৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে। আল-কুরআন নাযিল হওয়ার আগে কোনো জাতির মধ্যেই বর্ণ ও বর্ণমালা কোনো দৃশ্যমান শিল্প (দৃশ্যকলা) ছিল না। যদিও প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ভাষা ছিল, ভাষা লেখার বিভিন্ন রীতি ছিল। তাদের ভাষার লেখ্য রীতি কেবল ভাষার অন্তর্গত ভাবকেই প্রকাশ করেছে, কারণ ভাষার লিখিত রূপ নিহিত ভাবেরই দৃশ্যমান প্রতীক। কিন্তু এসব প্রতীক বা চিহ্ন (বা বর্ণমালা) নন্দনতাত্ত্বিক বিচারে শিল্পের মর্যাদায় উন্নীত হয়নি। তাদের ক্ষেত্রে এ ব্যাপারটি ঘটেনি। কিন্তু আরবি বর্ণমালার ক্ষেত্রে এ ব্যাপারটিই ঘটেছে যথাযথভাবে, কারণ আল-কুরআন আরবি ভাষাকে মর্যাদার চাদরে মুড়িয়ে দিয়েছে।
ড. ইসমাইল ফারুকি বলেছেন, ওইসব সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত কোনো জাতি-গোষ্ঠীর কেউ-ই-অর্থাৎ মেসোপটেমিয়ান জাতিসমূহ, হিব্রু জাতিসমূহ, ভারতীয় জাতিসমূহ, তাদের মতো গ্রিক ও রোমান জাতি-গোষ্ঠী... আরবরাও তাদের অন্তর্ভুক্ত-ভাষার দৃশ্যমান প্রতীকের সৌন্দর্য আবিষ্কারের চেষ্টা করেনি। 'লিখন' ছিল একটি স্থূল ব্যাপার, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে এখনো রয়েছে। একে ঘিরে বিশ্বের সংস্কৃতিগুলোতে কোনো নন্দনতাত্ত্বিক প্রচেষ্টা দানা বাঁধেনি। ভারতে, বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে, খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী পশ্চিমে 'লিখন' কেবল ভাব-প্রকাশের দায়িত্ব পালন করেই ক্ষান্ত থেকেছে, অর্থাৎ ভাবের দৃশ্যমান প্রতীকরূপেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। হিন্দুধর্মে ও খ্রিষ্টধর্মে ফিগারেটিভ আর্ট মূর্ত শিল্পকলার ক্ষেত্রে 'লিখন' একটি পরিপূরক ভূমিকা পালন করেছে। অর্থাৎ, তা কেবল ভাব-প্রকাশক প্রতীকরূপে শিল্পকর্মের বিষয়বস্তুকে প্রকাশ করেছে...। কিন্তু ইসলামের আবির্ভাব শৈল্পিক অভিব্যক্তি প্রকাশের উপাদান হিসেবে বর্ণমালা ও শব্দের সামনে নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে দেয়। এই ক্ষেত্রে ইসলামি প্রতিভা সত্যিই অপ্রতিদ্বন্দ্বী। আরবি লিপিকলা আরাবিস্কের একটি প্রকরণ হিসেবে তার স্থান দখল করে নিয়েছে। ফলে আমাদের জন্য একে স্বতন্ত্র শিল্পকর্ম চিহ্নিত করা সহজ হয়েছে। এটি অবিমিশ্র ইসলামি শিল্পকলা। লিপিকলার চৈন্তিক বিষয়বস্তুর দিকে দৃষ্টিপাত না করেই এ কথা বলা যায়।
ড. মুস্তাফা আবদুর রহিম এ বিষয়টি জোরালোভাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, আরবি লিপিকলা একমাত্র শিল্প যার উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে আরবে; এটি অবিমিশ্র আরব শিল্প, যা কোনোকিছুর প্রভাবে প্রভাবিত হয়নি, যার সঙ্গে কোনোকিছুর সংশ্লেষ ঘটেনি...। কতিপয় প্রাচ্যবিদ বলেছেন, তুমি যদি ইসলামি আর্ট সম্পর্কে জানতে চাও, তাহলে সরাসরি আরবি লিপিকলার প্রতি মনোযোগ দেওয়া উচিত।
আরবি তথ্যসূত্রগুলো, যেমন: আল-ইকদুল ফারিদ, খুলাসাতুল আসার, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, আল-কামিল ফিত-তারিখ, আল-ফিহরিসত, সুবহুল আশা ও অন্যান্য উৎসগ্রন্থ এ ব্যাপারে একমত যে, আরবি লিপিকলা মুসলিমদের কাছে যে যত্ন ও পরিচর্যা লাভ করেছে এবং শৈল্পিক উৎকর্ষে মণ্ডিত হয়েছে, অন্যকোনো সভ্য জাতির বেলায় এটা ঘটেনি।
অল্প কালের মধ্যেই মুসলিম শিল্পীরা আরবি বর্ণমালাকে তার শ্রুত কর্তব্যের পাশাপাশি একটি দৃশ্যমান কর্তব্যে ভূষিত করেন। আরবি বর্ণমালা এই নান্দনিক ময়দানে প্রবেশ করামাত্রই তার বিকাশ দ্রুত এগিয়ে যায়। অলংকরণশিল্পের নকশা ও রেখাগুলোর সঙ্গে তার মিশ্রণ ঘটে, তা বরং অলংকরণশিল্পকে অনেক এগিয়ে দেয়। আরবি লিপিকলা ও অলংকরণশিল্পের মধ্যে রয়েছে দৃঢ় সহযোগিতামূলক সম্পর্ক।
এই মৌলিক শিল্পের প্রতি মুসলিমদের যে মনোযোগ ও পরিচর্যা এবং তাদের যে বহুবিধ উৎকর্ষ সাধন তার সবকিছু এখানে আমি উল্লেখ করতে পারব না। উদাহরণ হিসেবে কয়েকটি লিপির উল্লেখ করছি: কুফি লিপি, নাসখি লিপি, সুলুস লিপি, আন্দালুসি লিপি, রুকআ লিপি, দিওয়ানি লিপি, তা'লিক (ফার্সি) লিপি, ইজাযা লিপি ইত্যাদি।
এসব লিপির বহু শাখালিপি রয়েছে, যা আরবি লিপিকলাকে সমৃদ্ধ ও ঐশ্বর্যমণ্ডিত করেছে। ফলে আরবি লিপির রয়েছে মানিয়ে নেওয়ার যোগ্যতা, তা সর্বাবস্থায় ও সব জায়গায় নিজের ভূমিকা পালন করতে পারে। শাখালিপির কয়েকটি উদাহরণ উল্লেখ করা যায়। কুফি লিপির শাখালিপি হলো কুফি আল-মুওয়াররাক, কুফি আল-মুযহির, কুফি আল-মুনহাসির, কুফি আল-মুআশশাক বা আল-মুযাফফার বা আল-মুওয়াশশাহ। দিওয়ানি লিপির একটি শাখালিপি হলো জালি আদ-দিওয়ানি। সুলুস লিপির শাখালিপি হলো জালি আস-সুলুস। অন্য লিপিগুলোরও শাখালিপি রয়েছে।
**মুসলিম শিল্পীদের সৃজনশীলতা**
মুসলিম শিল্পীরা কখনো কখনো একাধিক লিপিকে একই পটে সাজিয়েছেন। এতে লিপির সৌন্দর্য ও চাকচিক্য আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে এই শিল্প সৃজনশীলতায় নতুনত্ব ও অভিনবত্বের দিকে এগিয়ে গেছে। লিপিশিল্পে যে প্রতিযোগিতা ছিল তা একে পূর্ণতা দিয়েছে, এর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে, নান্দনিক উৎকর্ষের চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছে।
লিপিকলায় মুসলিম শিল্পীরা কেবল হরফ-বিন্যাস ও তার সৌন্দর্য-বর্ধনে ক্ষান্ত থাকেননি; বরং আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে অভিনবত্বের সৃষ্টি করেছেন, সৃজনশীলতা ও মৌলিকতার পরিচয় দিয়েছেন। তারা স্বয়ং হরফকেই অলংকরণের উপাদান হিসেবে প্রস্তুত করেছেন। ফলে লিপির পটগুলো নান্দনিক আলংকারিক পটে রূপান্তরিত হয়েছে। মুসলিম শিল্পীরা পটের ওপর কী অসীম দক্ষতা ও নিয়ন্ত্রণের পরিচয় দিয়েছেন তাতে আপনি অবশ্যই বিস্মিত হবেন। তারা হরফকে দিয়ে একই সময়ে দুটি কাজ করিয়ে নিয়েছেন। একটি হলো ভাব প্রকাশের কাজ, অপরটি হলো অলংকরণের কাজ। তারা দ্বিতীয় কাজকে প্রথম কাজের সাজরূপে উপস্থাপন করেছেন!
মুসলিম শিল্পীরা আরবি লিপিকলায় অভিনবত্ব ও সৃজনশীলতার শিখরে পৌঁছেও ক্ষান্ত থাকেননি, তারা হরফের ডানায় চড়ে শিল্পের নতুন নতুন দিগন্তে ভ্রমণ করেছেন। হরফ এখানে কাঠামোগত শিল্পের (ফিগারেটিভ আর্টের) হাতিয়ার হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। চাকচিক্যময় নান্দনিক শিল্পের কার্যকরী উপাদানে পরিণত হয়েছে। লিপির আলংকারিক পটের ওপর চোখ পড়ামাত্র প্রথম মুহূর্তে পটে আপনি একটি চিত্র দেখতে পাবেন, সেটা হতে পারে পাখির, হতে পারে কোনো প্রাণীর, ফলের বা প্রদীপের। কিন্তু আপনি একটু খুঁটিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবেন যে চিত্রটি আরবি হরফ ও শব্দ ছাড়া কিছু নয়। এগুলো শিল্পীদেরই আবিষ্কার। বাহ্যিক চিত্রের সঙ্গে এসব শব্দ ও হরফের অর্থগত সামঞ্জস্য থাকে। এটাই অভিনবত্ব।
আরবি লিপিকলার ক্ষেত্রে মুসলিমদের ঐতিহ্য এমনই ঐশ্বর্যপূর্ণ। তাদের এমন কৃতিত্ব ও সৃজনশীলতা আরবি লিপিকলাকে ইসলামি সভ্যতার জন্য যুগ যুগ ধরে ও ইসলামি বিশ্বের সব ভূখণ্ডে এক অনন্য শিল্পরূপে ভাস্বর করে তুলেছে।
টিকাঃ
১৭. সালেহ আহমাদ শামি, আল-ফননুল ইসলামি ইলতিযাম ওয়া ইবদা, পৃ. ১৯৬।
১৮. ড. ইসমাইল ফারুকি (১৩৩৯-১৪০৬ হি./১৯২১-১৯৮৬ খ্রি.): বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামি পণ্ডিত। ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত। দর্শনশাস্ত্রে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পড়াশোনা করেছেন আমেরিকায় ও পাকিস্তানে। আমেরিকায় অবস্থিত International Institute of Islamic Thought-এর প্রধান ছিলেন।
১৯. মাজাল্লাতুল মুসলিমিল মুআসির, সংখ্যা ২৫, ১৪০১ হি.।
২০. পরিশিষ্ট, আল-আনবাউল কুয়েতিয়্যাহ, সংখ্যা ৫১৭, তারিখ: ১৬/০৭/১৯৮৬ খ্রি.।
২১. নাজি যাইনুদ্দিন, মুসাওয়ারুল খাত্তিল আরাবি, পৃ. ৩১৫।
২২. সালেহ আহমাদ শামি, আল-ফননুল ইসলামি ইলতিযام ওয়া ইবদা, পৃ. ১৯৮।
২৩. মুসলিম বিজেতারা তাদের দ্বীন ও শরিয়তের প্রচারের জন্য এই লিপিকেই মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর পূর্বে লিখিত মুসহাফগুলো কুফি লিপিতেই লেখা হয়েছে। কুফার আলেমগণই কুফি লিপির উৎকর্ষ সাধন করেন। দেখুন, নাজি যাইনুদ্দিন, মুসাওয়ারুল খাত্তিল আরাবি, পৃ. ৩৩৯।
২৪. সালেহ আহমাদ শামি, আল-ফননুল ইসলামি ইলতিযাম ওয়া ইবদা, পৃ. ১৯৮-১৯৯।
২৫. সালেহ আহমাদ শামি, আল-ফননুল ইসলামি ইলতিযাম ওয়া ইবদা, পৃ. ১৯৯।
২৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ২০০-২০৭।