📄 স্থাপত্যকলা
ইসলামি স্থাপত্যের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও চরিত্র রয়েছে। সাধারণ দৃষ্টিতেই তা প্রতিভাত হয়। সামগ্রিক নকশা বা স্বতন্ত্র স্থাপত্য-শৈলি অথবা ব্যবহৃত অলংকরণের বা মেটিফের কারণে এটা হয়ে থাকে。
মুসলিম স্থপতিরা স্থাপত্য-প্রকৌশলে অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। তারা প্রাথমিক মাপজোকের পাশাপাশি নির্মাণের জন্য আবশ্যক নকশা প্রণয়ন, সূক্ষ্ম বিবরণ প্রদান ও ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি করেছেন। কোনো সন্দেহ নেই যে, এগুলোর জন্য প্রয়োজন হলো প্রকৌশল, গণিত ও নির্মাণকলায় গভীর জ্ঞান অর্জন। এসব জ্ঞানশাখায় মুসলিমরা অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ইতিপূর্বে আমরা এ বিষয়ে আলোচনা করেছি। এখন আমরা ইসলামি স্থাপত্যকলার কয়েকটি প্রযুক্তি ও নির্মাণকৌশল নিয়ে আলোচনা করব। যাতে এগুলোর গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় এবং এগুলোর উদ্ভাবন ও বিকাশে মুসলিমরা কী অবদান রেখেছেন তা অনুধাবন করা যায়।
**গম্বুজের নির্মাণকলা**
বড় বড় গম্বুজ নির্মাণে মুসলিমরা অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন এবং এগুলোর জটিল পরিমাপে সফলতা দেখিয়েছেন। এসব পরিমাপ খোলস-কাঠামো (শেল স্ট্রাকচার) বিশ্লেষণের পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। জটিল ও উন্নত খোলস-কাঠামোর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো বাইতুল মুকাদ্দাসের কুব্বাতুস সাখরা (Dome of the Rock) এবং আস্তানা, কায়রো ও আন্দালুসের মসজিদগুলোর গম্বুজ। এসব গম্বুজ জটিল গাণিতিক হিসাবনিকাশের ওপর নির্ভরশীল। মসজিদগুলোকে অনুপম নান্দনিক কাঠামো দিয়েছে এসব গম্বুজ। এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে
**মাশরাবিয়াত নির্মাণকলা**
মাশরাবিয়াতের অপর নাম শানশুল বা রুশান। ইসলামি স্থাপত্যশিল্পের বহিঃগাত্রীয় প্রদর্শনমূলক অংশ হলো মাশরাবিয়াত। বাড়িঘরে দুই ধরনের মাশরাবিয়াত নির্মাণ করা হতো: ছিদ্রযুক্ত ও অলংকৃত। মাশরাবিয়াত বৃত্তাকার হলে তার নাম হতো চাঁদনি (কামারিয়্যাহ) এবং বৃত্তাকার না হলে নাম হতো সৌরীয় (শামসিয়্যাহ)। এগুলো হতো কাঠের তৈরি, যাতে জানালার পর্দার মতো শেপ বা আকার দেওয়া হতো। মাশরাবিয়াতের উপকার ছিল অনেক, রোদের তাপ নিয়ন্ত্রণে রাখত, কমিয়ে রাখত আলোর তেজ এবং মহিলারা বাইরের দৃশ্য দেখতে পেত, যদিও তাদের কেউ বাইরে থেকে দেখতে পেত না। মাশরাবিয়াত ছিল ইসলামি সভ্যতায় নির্মিত বাড়িঘরের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য।
**স্থাপত্যে ধ্বনি-পরিবেশন নির্মাণকলা :**
মুসলিমরা ধ্বনিবিজ্ঞানের (Acoustics) প্রয়োগ ঘটিয়ে শ্রুত্য প্রকৌশল ও প্রযুক্তির ব্যবহার ও উন্নতি সাধন করেছিলেন। যা বর্তমানে স্থাপত্যে ধ্বনি-পরিবেশন প্রযুক্তি (architectural acoustics technology) নামে পরিচিত। ধ্বনিবিজ্ঞানের উদ্ভব ও তার বিশুদ্ধ পদ্ধতিগত নীতিমালার প্রতিষ্ঠায় মুসলিমদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তারা জানতেন যে, ধ্বনি অবতল (ভেতরের দিকে ধনুকের মতো বক্রতাযুক্ত) পৃষ্ঠদেশ থেকে প্রতিধ্বনিত হয় এবং একটি নির্দিষ্ট পার্শ্বস্থ অবলম্বে এসে কেন্দ্রীভূত হয়। ব্যাপারটি অবতল দর্পণতল থেকে আলোর প্রতিবিম্বিত হওয়ার মতোই।
মুসলিম প্রযুক্তিবিদরা শব্দের কেন্দ্রীভবনের (Focusing of sound) বৈশিষ্ট্যকে নির্মাণকলা ও স্থাপত্যশিল্পে কাজে লাগিয়েছেন। বিশেষ করে বড় বড় জামে মসজিদে তারা এ কাজটি করেছেন। যাতে জুমআর দিন ও ঈদের দিন ইমাম ও খতিবের আওয়াজ উচ্চকিত হয় ও সমভাবে পরিবেশিত হয়। যেমন : ইস্পাহানের প্রাচীন জামে মসজিদ, আলেপ্পোর আল-আদিলিয়্যাহ মসজিদ, বাগদাদের কয়েকটি প্রাচীন মসজিদ। এ মসজিদগুলোর ছাদ ও দেয়াল অবতল পৃষ্ঠদেশের আকারে নির্মাণ করা হয়েছে এবং তা মসজিদের মূল অংশে ও কোণগুলোতে যথার্থ বিন্যাসে ছড়িয়ে রয়েছে। ফলে ধ্বনি ও আওয়াজ মসজিদের সর্বত্র সমান পরিমাপে পরিবেশিত হয়।
এসব ইসলামি কীর্তি স্থাপত্যশিল্পে ধ্বনি-পরিবেশন প্রকৌশল ও প্রযুক্তিতে ইসলামি সভ্যতার বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বের শ্রেষ্ঠ সাক্ষী হিসেবে আজও বিদ্যমান। প্রখ্যাত মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী ও স্থাপত্য শ্রুতিবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা ওয়ালেস সি. সাবিন (Wallace Clement Sabine, ১৮৬৮-১৯১৯ খ্রি.) ১৯০০ সালের দিকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার হলের দুর্বল ধ্বনি-পরিবেশন ব্যবস্থা ও শ্রুতিগুণের সমস্যা ও কারণ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তা ছাড়া তিনি মিউজিক রুম ও হলঘরের ধ্বনি-সরঞ্জামের (Acoustical properties) কার্যাবলি নিয়েও গবেষণা করেন।
স্থাপত্যশিল্পে ধ্বনি-পরিবেশন প্রযুক্তির উন্নতিতে মুসলিমদের অবদান কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝার জন্য ধ্বনির কেন্দ্রীভবনের বৈশিষ্ট্যের প্রতি ইঙ্গিত করাই যথেষ্ট। মুসলিমরা তার প্রায়োগিক উপকারিতার প্রতি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছেন। সমকালীন সভ্যতায় ধ্বনির কেন্দ্রীভবনের এই বৈশিষ্ট্য স্থাপত্যে ধ্বনি-পরিবেশন প্রকৌশলের (architectural acoustics engineering) একটি মৌলিক অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বড় বড় নাট্যশালা ও বিশাল বিশাল সম্মেলন কক্ষ সজ্জিত হয় গোপনীয় অবতল দেওয়ালে, যা শব্দের প্রতিধ্বনি ও অধিকতর স্পষ্টীকরণে ভূমিকা পালন করে থাকে।
**খিলান নির্মাণকলা**
ইসলামি স্থাপত্য-সম্পর্কিত ঐতিহাসিক গবেষণা ও তথ্যসূত্র থেকে নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, মুসলিমদের স্থাপত্য প্রকৌশল ও প্রযুক্তির প্রথম যে কাঠামো ও উপাদান দৃষ্টি আকর্ষণ করে তা হলো ফাঁপা খিলান। ৮৭ হিজরিতে/৭০৬ খ্রিষ্টাব্দে দামেশকের মসজিদে উমাইয়াতে প্রথম ফাঁপা খিলান ব্যবহার করা হয়। তারপর এর ব্যবহার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে এটি ইসলামি স্থাপত্যের একটি অনন্য উপাদানে পরিণত হয়। বিশেষ করে মরক্কোয় ও আন্দালুসে ফাঁপা খিলানের ব্যবহার চোখে পড়ে।
তারপর ইউরোপীয় স্থপতিরা এই নকশা গ্রহণ করেন এবং তা তাদের স্থাপত্যশিল্পে বিশেষ করে গির্জায় ও অট্টালিকায় ব্যবহার করেন।
মুসলিমরা তিনটি ফাঁকযুক্ত বা গহ্বরবিশিষ্ট খিলান নির্মাণের প্রযুক্তিতেও উন্নতি সাধন করেন। গণিতভিত্তিক প্রকৌশলীয় চিন্তাভাবনার ফসল এটি। আন্দালুসের আয-যাহরা শহরের ধ্বংসাবশেষে প্রাপ্ত দেয়ালের নকশা থেকে গবেষকেরা তা প্রমাণ করেছেন। স্প্যানিশ, ফরাসি ও ইতালীয় গির্জাগুলোতেও এ ধরনের খিলান নির্মাণ করা হয়েছিল।
**মাল্টিফয়েল খিলানের নির্মাণকলা**
এই খিলানের অভ্যন্তরীণ বা নিচের প্রান্ত অর্ধবৃত্তের মালার আকারে গঠিত। সম্ভবত এই অর্ধবৃত্তের মালার নকশা এসেছে শঙ্খের পার্শ্বদেশের আকার থেকে। তবে তা মুসলিমদের হাতে ইসলামি স্থাপত্যের একটি বিশুদ্ধ প্রকৌশলীয় রূপ নিয়েছে। হিজরি দ্বিতীয় শতক (খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতক)-এ নির্মিত স্থাপত্যের যা-কিছু অবশিষ্ট রয়েছে তাতে এই উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। এর যাবতীয় জ্যামিতিক বা প্রকৌশলীয় বৈশিষ্ট্য ২২১ হিজরিতে/৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত কায়রাওয়ান জামে মসজিদের গম্বুজ। নির্মাণে সম্পূর্ণরূপে প্রতিভাত হয়। মাল্টিফয়েল খিলান তার বিকাশ ও উন্নতির পথে জ্যামিতিক চেহারা ধরে রেখেছে বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করা সত্ত্বেও। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে মাল্টিফয়েল খিলান আরও জটিল রূপ ধারণ করে, ফয়েলের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং ছোট আকৃতি ধারণ করে, এতে ফুল ও গোলাপের নকশা দেওয়া হয়। এভাবে তা এক মনোমুগ্ধকর ও নয়নাভিরাম অলংকরণখচিত কাঠামোতে পরিণত হয়। এগুলোর দ্বারা সজ্জিত হয় মিহরাব ও আজানখানা।
ইসলামি স্থাপত্যকলায় এসব খিলানের পাশাপাশি আরও নানান আকারের খিলানের দেখা মেলে। যেমন: সূচ্যগ্র খিলান (acute-arch), অন্ধ খিলান (blind arch), ভোঁতা কৌণিক খিলান (obtuse angle arch) ইত্যাদি। ভোঁতা কৌণিক খিলানের ব্যবহার প্রাচ্যে যেমন, তেমনই পাশ্চাত্যেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপীয় স্থাপত্যে এর বহু উদাহরণ মেলে। যেমন প্রচলিত আছে যে, ভোঁতা কৌণিক খিলানের প্রথম ব্যবহার শুরু হয় ব্রিটিশ স্থাপত্যে, তারপর ষোড়শ শতাব্দীতে এর ব্যবহার ব্যাপকতা লাভ করে। খিলানটির নামও পালটে যায়, তখন এটির নাম হয় টিউডার খিলান (Tudor arch)। কিন্তু ইউরোপে ব্যবহারের পাঁচ শতাব্দীরও বেশি পূর্বে এই খিলান ইসলামি স্থাপত্যকলায় ব্যবহৃত হয়েছে। বিভিন্ন মসজিদে তার উজ্জ্বল সাক্ষ্য রয়েছে। যেমন: উজির বদরুদ্দিন আল-জামালি (মৃ. ৪৮৭ হি./১০৯৪ খ্রি.) কর্তৃক নির্মিত কায়রোর আল-জুয়ুশি মসজিদ, উজির আল-মামুন আল-বাতায়িহি (মৃ. ১১২৫ খ্রি.) কর্তৃক নির্মিত কায়রোর আল-আকমার মসজিদ এবং আল-আযহার জামে মসজিদ।
**বাঁধ ও পুল নির্মাণকলা**
এখানে উল্লেখ্য যে, ইসলামি স্থাপত্য প্রকৌশলের নান্দনিকতা ছিল অনেক ব্যাপক; জলবন্ধক, পুল, কৃত্রিম খাল ও নালাগুলোও এর অন্তর্ভুক্ত। এগুলোর নির্মাণকলা ছিল অত্যন্ত নান্দনিক, নকশার ক্ষেত্রে যেমন, তেমনই বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও। তা নদী ও নালায় প্রবহমান পানিতে যোগ করেছিল সৌন্দর্যের নতুন মাত্রা, দর্শক তাতে অভিভূত হয়ে পড়ত।
ইসলামি সভ্যতার উৎকর্ষের যুগে মুসলিম স্থাপত্য এবং তার প্রকৌশলীয় ও নান্দনিক নির্মাণকলা ছিল একটি স্বাভাবিক অনুষঙ্গ।
**প্রাচীর নির্মাণকলা**
ইসলামি স্থাপত্য কৌশলবিজ্ঞানের (মেকানিক্স) প্রায়োগিক দিকগুলোর ওপর নির্ভরশীল ছিল। উঁচু-উঁচু মসজিদ ও লম্বা-লম্বা মিনার নির্মাণে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নদীনালার উপরে বড় বড় বাঁধ ও বিশাল পুল নির্মাণ থেকেও তা স্পষ্ট হয়। যেমন: নাহরাওয়ান (নদীর ওপর) বাঁধ, রাস্তান বাঁধ, ফুরাত নদীর ওপর বাঁধ। সালাহুদ্দিন আইয়ুবির যুগে কায়রোতে নির্মিত উঁচু জলপ্রাচীর থেকেও তা প্রমাণিত হয়। এই জলপ্রাচীর নীলনদের উপর দিয়ে ফামুল খলিজ থেকে মুকাত্তাম পাহাড়ের ওপর নির্মিত দুর্গ পর্যন্ত পানি পৌঁছে দিত।
প্রাণীদের দ্বারা একটি জলসেচক যন্ত্র ঘোরানো হতো যা দশ মিটার উঁচু পর্যন্ত পানি তুলতে পারত। এই যন্ত্রের দ্বারা প্রাচীরের উপর থেকে নালায় জলের প্রবাহ অব্যাহত রাখা হতো।
**দুর্গ নির্মাণকলা**
ইসলামি সভ্যতায় আরব দুর্গগুলো ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। পাশ্চাত্যের স্থপতিরা এসব দুর্গের নকশা ও নির্মাণকৌশল গ্রহণ করেছিলেন। সিগরিড হুংকে এ ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছেন। দুর্গ নির্মাণে বৃত্তাকার নকশা ছাড়া পাশ্চাত্য সমাজের আর কিছু জানা ছিল না। মুসলিমরা প্রথমে প্রবেশ করল আন্দালুসে, তারপর গেল সিসিলিতে, তারপর ক্রুসেড যুদ্ধে মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে সংশ্লেষ ঘটল। এরপর থেকেই ইউরোপীয় স্থাপত্যকলার নমুনাগুলো নির্মিত হতে শুরু করল আরব স্থাপত্যকলার নমুনাগুলোর অনুসারে। আরব স্থাপত্যে দুর্গের নির্মাণকলায় প্রাধান্য ছিল বর্গাকারের নকশার, যার কোণগুলোতে থাকত পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরক্ষা টাওয়ার। দুর্গের পার্শ্বদেশেও কখনো কখনো এসব টাওয়ার নির্মিত হতো।
কোনো সভ্যতার স্থাপত্যকলার সৌষ্ঠব ও নান্দনিকতা ওই সভ্যতারই শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্বকে প্রমাণ করে। এটি একটি ঐতিহাসিক নীতি। যেমন ইবনে খালদুন বলেছেন, রাষ্ট্র এবং নগরায়ণ একটি মৌল বস্তুর চিত্রের মতো, রাষ্ট্রের অস্তিত্বের সুরক্ষার জন্য এটাই যথার্থ কাঠামো। একটির থেকে আরেকটি বিচ্ছিন্ন করা অসম্ভব। প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞান থেকে তা-ই প্রমাণিত হয়। নগরায়ণ ছাড়া রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না। তেমনই রাষ্ট্র ছাড়া নগরায়ণও দুঃসাধ্য। তাই এদের একটিতে অসামঞ্জস্য ও সমস্যার সৃষ্টি হলে অন্যটিতে তা অনিবার্য। একইভাবে এদের একটির অনস্তিত্ব অন্যটির অনস্তিত্বকে আবশ্যক করে তোলে।
টিকাঃ
২. ড. আহমাদ ফুয়াদ পাশা, আত-তুরাসুল ইলমিয়্যিল ইসলামিয়্যি.. শাইউন মিনাল মাযি আম যাদুন লিল-আতি, পৃ. ৩৯-৪৭।
৪. ড. আবদুল মুনয়িম মাজিদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ২৬৮-২৬৯।
*. Robert Jacobus Forbes ও Eduard Jan Dijksterhuis, A History of Science and Technology, পৃ. ৬৮।
৬. ড. আহমাদ ফুয়াদ পাশা, আত-তুরাসুল ইলমিয়্যিল ইসলামিয়্যি, পৃ. ৪১।
৭. কায়রোর একটি এলাকার নাম।
৮. সিগরিড হুংকে, শামসুল আরাব তাসতাউ আলাল গারব, পৃ. ৪৪০ ও তার পরবর্তী।
*. ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, খ. ১, পৃ. ৩৭৬। দেখুন, আদিল ইওয়াজ, আল-মাদিনাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা ওয়াল-মাদিনাতুল উরুব্বিয়্যাহ, মাজাল্লাতুল ইলম ওয়াত-তিকনুলুজিয়া, সংখ্যা ২৭, ১৯৯২ খ্রি. পৃ. ৩২।
📄 অলংকরণ-শিল্প
মুসলিম শিল্পীরা নতুন নতুন শিল্পবিশ্বের প্রতি মনোযোগী হয়েছিলেন, যেখানে মানুষ ও প্রাণীর চিত্রাঙ্কন ঠাঁই পায়নি এবং প্রকৃতিকে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করারও প্রয়োজন পড়েনি। এখানেই তাদের প্রতিভার স্ফূরণ ঘটেছে, তাদের উদ্ভাবনশক্তি, চিন্তার সক্রিয়তা, সূক্ষ্ম অনুভূতি ও মৌলিক রুচিবোধের উজ্জ্বল প্রকাশ ঘটেছে। এসব নতুন বিশ্বের একটি হলো অলংকরণ-বিশ্ব।
সৌন্দর্য সৃষ্টিই ছিল ইসলামি আর্ট বা শিল্পের দায়িত্ব। সৌন্দর্য সৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর অন্যতম হলো অলংকরণ। অলংকরণ এমন নির্ভেজাল শিল্পকর্ম, যার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো সৌন্দর্য সৃষ্টি। এখানে শিল্পকর্মের কাঠামো তার বিষয়বস্তুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিলে গেছে এবং উভয়টি মিলে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য সৃষ্টির এক সুসংগত ঐক্যের সৃষ্টি করেছে। এই ব্যাপারটি আমরা শিল্পের আর কোনো প্রকারে পাই না।
**ইসলামি অলংকরণ-শিল্পের বৈশিষ্ট্য**
ইসলামি অলংকরণ-শিল্প অনন্য বৈশিষ্ট্যাবলির অধিকারী, মুসলিমদের জাগরণের সভ্যতাকেন্দ্রিক উপস্থিতি তুলে ধরতে এর প্রভাব ছিল ব্যাপক। তা ছাড়া ইসলামি অলংকরণ-শিল্প উচ্চ মাত্রায় উৎকর্ষ লাভ করেছে। নকশা ও নির্মাণের দিক থেকে যেমন, তেমনই বিষয়বস্তু ও শৈলীর দিক থেকেও।
মুসলিম প্রযুক্তিবিদরা অনুপম গঠনযুক্ত ও দৃশ্যমানতায় উজ্জ্বল আলংকারিক রেখা ব্যবহার করেছেন এবং সামগ্রিকতার বিচারে অলংকরণের এমনসব নমুনা তৈরি করেছেন যেখানে তাদের ভাবনা স্পর্শ করেছে অন্তিমতাকে, যেখানে রয়েছে পৌনঃপুনিকতা, নতুনত্ব, অনুবর্তন ও বিজড়ন। তারা উদ্ভাবন করেছেন তারকা-বহুভুজ (star polygon) এবং পাতা-কাটা নকশার নানা আঙ্কিক। আরবীয় লতানো ও ফুলেল অলংকরণের আরও কিছু শৈলী তারা উদ্ভাবন করেছিলেন, ইউরোপীয়রা যার নাম দিয়েছে আরাবেস্ক (Arabesque)। আরাবেস্কের প্রথম প্রকাশ ঘটে হিজরি চতুর্থ/খ্রিস্টীয় দশম শতকে ফাতিমীয় অলংকরণ-শিল্পে আল-আযহার জামে মসজিদে। তারপর থেকে অলংকরণের এই আরবীয় শৈলী বেশ কয়েকটি দেশে অত্যন্ত সমাদর পায়। ইসলামি স্থাপত্যের অলংকরণবিদরা কাঠ, পাথর ও মার্বেলের ওপর সমতল ও নিমজ্জিত খোদাইচিত্রে শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় দেন এবং রঙিন উপকরণের ব্যবহার ও নকশার অভিনবত্বেও পরিচয় দেন অসাধারণ দক্ষতার।
উদ্ভিজ্জ উপাদান ও জ্যামিতিক উপাদানকে এই শিল্পের বিনির্মাণে মৌলিক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এসব উপাদানের মধ্যে কখনো সহযোগিতামূলক সংশ্লেষ ঘটেছে এবং কখনো সম্পূর্ণ আলাদারূপে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে অলংকরণ-শিল্পের দুটি ফর্ম বা শৈলী দাঁড়িয়ে গেছে : একটি হলো ফুলেল ও লতায়িত অলংকরণ এবং অপরটি হলো জ্যামিতিক অলংকরণ।
**ফুলেল ও লতায়িত অলংকরণ**
ফুলেল ও লতায়িত অলংকরণ বিভিন্ন উদ্ভিদের পাতা ও নানা ধরনের ফুলের তৈরি মোটিফের ওপর নির্ভরশীল। ফুলেল ও লতায়িত অলংকরণ কয়েকটি শৈলীতেই উৎকর্ষ লাভ করেছে; যেমন: একক ও জোড়া অলংকরণ, মুখোমুখি ও আলিঙ্গনাত্মক অলংকরণ। একক অলংকরণ অধিকাংশ সময় একগুচ্ছ উদ্ভিজ্জাতীয় উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত হয়, যা আন্তঃপ্রবিষ্ট, আন্তঃবিজড়িত ও পারস্পরিক অনুরূপ, একটি শৃঙ্খলিত রূপ নিয়ে যার পুনরাবৃত্তি ঘটে থাকে।
মুসলিম শিল্পীরা তাদের কল্পনাশক্তির প্রয়োগ ঘটিয়েছেন বলে তারা অলংকরণশিল্পে প্রকৃতির অনুকরণ থেকে অনেকটা বেরিয়ে আসতেও সক্ষম হন। ফলে পাতা ও ফুলের নকশাগুলো জ্যামিতিক কারুকার্যের রূপ নেয়, যেখানে জীবিত উপাদানের মৃত্যু ঘটে। বিমূর্ত রীতির ধারণাটি এখানে সক্রিয় থাকে। দেয়াল ও গম্বুজের অলংকরণে ফুলেল ও লতানো অলংকরণের ব্যবহার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন শিল্পকর্মে (যেমন : তামা ও কাঁচের তৈজসপত্র ও চীনামাটির বাসনকোসন) এবং বইয়ের পৃষ্ঠা ও বাঁধাইয়ে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় এই অলংকরণ।
**জ্যামিতিক অলংকরণ**
ইসলামি অলংকরণশিল্পের এটি আরেকটি প্রকার। জ্যামিতিক রেখার ব্যবহারে ও রুচিস্নিগ্ধ শৈল্পিক কাঠামো প্রকাশের ক্ষেত্রে মুসলিমরা অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। বিভিন্ন ধরনের বহুভুজ, তারকা-আকৃতি, আন্তঃপ্রবিষ্ট বৃত্ত ইত্যাদি অলংকরণের বিস্তার ঘটে। এসব অলংকরণে ভবন ও অট্টালিকা সজ্জিত হয়ে ওঠে। কাঠ ও পিতলের শিল্পকর্মে এবং ছাদ ও দরজার নির্মাণেও জ্যামিতিক অলংকরণ ব্যবহার করা হয়। মুসলিমরা যে জ্যামিতিক জ্ঞানে প্রাগ্রসর ছিলেন, এটা তারই প্রমাণ।
মুসলিমরা অলংকরণশিল্পে নানা ধরনের বৃত্তাকার জ্যামিতিক আকৃতি উদ্ভাবনে সক্ষম হয়েছিলেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ষড়ভুজ, অষ্টভুজ ও দশভুজ। এগুলোর সঙ্গে আরও রয়েছে ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ ও পঞ্চভুজ। এসব আকৃতির আন্তঃপ্রবেশন ঘটিয়ে অলংকরণের নতুন নতুন প্যাটার্ন তৈরি করা হয়েছে। কিছু জায়গা পূরণ করা হয়েছে এবং কিছু ফাঁকা রাখা হয়েছে এভাবে ক্রমান্বয়ে অংশ থেকে পূর্ণতায়, আংশিক পূর্ণতা থেকে পরিপূর্ণ পূর্ণতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, ফলে এসব মনোমুগ্ধকর ও নয়নাভিরাম অলংকরণের অসংখ্য রূপ তৈরি হয়েছে।
মুসলিম শিল্পীদের চিন্তাভাবনা ও ধ্যানজ্ঞান ছিল নতুন ও অভিনব কাঠামো তৈরি করা, যার মূলে থাকবে কোণ-ছেদকের জটিল জড়াজড়ি বা জ্যামিতিক কাঠামোর জোড়। এতে আরও বেশি শান্ত ও পরিমিত সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটবে।
বহুল ব্যবহৃত জ্যামিতিক আকৃতিগুলোর মধ্যে রয়েছে : সংলগ্ন বৃত্ত ও আন্তঃপ্রবিষ্ট বা জোড় বৃত্ত, বিনুনি, ভাঙা-ভাঙা রেখা ও জড়াজড়ি রেখা।
যেসব আঙ্কিকের জ্যামিতিক অলংকরণ ইসলামি শিল্পকে বিশিষ্টতা দিয়েছে তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো : বিভিন্ন সংখ্যক ভুজবিশিষ্ট তারকা-আকৃতি, গঠিত ফর্ম বা কাঠামোকে বলা হয় তারকা প্লেট (Stellar plates)। অলংকরণের এই আঙ্কিকটিকে কাষ্ঠ ও ধাতব শিল্পকর্মে, কুরআন ও গ্রন্থাবলির সোনালি রঙে গিলটি করা পৃষ্ঠায় এবং ছাদের নকশায় ব্যবহৃত হয়।
ফরাসি শিল্প-ঐতিহাসিক ও শিল্প-সমালোচক অঁরি ফকিলোন (Henri Focillon) ইসলামিক আর্ট সম্পর্কে গভীর পর্যবেক্ষণধর্মী সূক্ষ্ম মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, আমি এমনকিছু ভাবতে পারি না যা প্রাণকে তার বাহ্যিক আবরণ থেকে মুক্ত করে নিতে পারে এবং আমাদেরকে তার নিহিত বিষয়বস্তুর প্রতি আকর্ষিত করতে পারে। অথচ ইসলামি অলংকরণশিল্পে জ্যামিতিক কারুকার্য ও নকশাগুলোর ক্ষেত্রে এ ব্যাপারটিই ঘটেছে। এসব কারুকার্য ও নকশা সূক্ষ্ম গণিতভিত্তিক চিন্তার ফসল। এই গণিত মূলত দার্শনিক চিন্তা ও আধ্যাত্মিক ব্যঞ্জনার বর্ণনাত্মক অলংকরণের একটি শৈলীতে পরিণত হয়েছে। তবে আমাদের এ কথা বলতেই হবে যে, এই বস্তুনিরপেক্ষ অলংকরণশৈলীতে রেখা ও নকশার মধ্যে উচ্ছল প্রাণের উন্মেষ ঘটেছে। রেখা ও নকশার কাঠামোগুলোতে আনুপাতিক হারে বেড়েছে; কখনো কখনো আলাদা-আলাদাভাবে রয়েছে এবং কখনো কখনো জড়াজড়ি করে রয়েছে। যেন এখানে এক উচ্ছল প্রাণশক্তি রয়েছে এবং সেটাই এসব কাঠামোর মধ্যে সংশ্লেষ ঘটিয়েছে, আবার দূরত্বও তৈরি করেছে; তারপর আবার নতুন করে সেগুলোর মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়েছে। অলংকরণের প্রতিটি কাঠামোকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, ব্যাখ্যাটা নির্ভর করে মানুষ এটিকে কোন দৃষ্টিতে দেখছে এবং দেখার সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যে কী ভাব উদিত হচ্ছে তার ওপর। এসব কাঠামো একই সময়ে একটি রহস্যের জন্ম দিচ্ছে এবং একটি রহস্যকে উন্মোচিত করছে, যা অনিঃশেষ শক্তি ও সম্ভাবনার পরিচয় বহন করে।
ইসলামি অলংকরণশিল্পে গুরুত্বপূর্ণ শৈলীগুলোর মধ্যে কয়েকটি নিম্নরূপ: আত-তারসি', আত-তাকফিত, আত-তালবিস, আত-তাশিক, আত-তাতইম, আত-তাজসিস, আল-কারনাসা, আত-তাযবিক, আত-তাসফিহ, আত-তাওশি'।
অলংকরণশিল্পে ব্যবহৃত উপাদানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: মার্বেল পাথর, চুন, কাঠ, ধাতব বস্তু, ইট, মোজাইক, চিত্রিত মৃৎপাত্র ও চিনামাটির পাত্র।
অলংকরণশিল্প এবং এর উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্যাবলির বর্ণনায় ফরাসি দার্শনিক রোজার গারাউডি (Roger Garaudy) যে মন্তব্য করেছেন তা এখানে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, আরব অলংকরণশিল্পকে আলংকারিক ধারণার একটি বৈশিষ্ট্যসূচক ও প্রতিনিধিমূলক প্রকাশ বলে বোধ হয়। তা একই সময়ে বিমূর্ততা ও মূর্ততার মধ্যে সংশ্লেষ ঘটিয়েছে। আরব অলংকরণশিল্পের গাঠনিক উপাদানগুলোর মধ্যে সবসময়ই সমন্বয় সাধন করেছে সংগীত-প্রকৃতির দ্যোতনা ও বৌদ্ধিক জ্যামিতির ব্যঞ্জনা।
টিকাঃ
১০. সালেহ আহমাদ শামি, আল-ফননুল ইসলামি ইলতিযাম ওয়া ইবদা, পৃ. ১৬৯।
১১. ডালপালা, পাতা, ফুল, সর্পিল বস্তু ইত্যাদির কারুকার্যময় নকশা।
১২. ড. আহমাদ ফুয়াদ পাশা, আত-তুরাসুল ইলমিয়্যিল ইসলামিয়্যি.. শাইউন মিনাল মাযি আম যাদুন লিল-আতি, পৃ. ৪৪।
১৩. ড. আহমাদ ফুয়াদ পাশা, আত-তুরাসুল ইলমিয়্যিল ইসলামিয়্যি.. শাইউন মিনাল মাযি আম যাদুন লিল-আতি, পৃ. ১৭০-১৭৩।
১৪. সারওয়াত উকাশা, আল-কিয়ামুল জামালিয়্যা ফিল-ইমারাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৩৯।
১৫. রোজার গারাউডি: (১৩৩১ হি./১৯১৩ খ্রি.) ফরাসি দার্শনিক। সাংস্কৃতিক, ইতিহাস, সাহিত্য ও মানব বিজ্ঞানে বিশেষজ্ঞ উঁচুমানের গবেষক। বিভিন্ন দর্শন গবেষণার পর ইসলাম গ্রহণ করেন। বিভিন্ন রচনার মাধ্যমে তিনি জায়নবাদী রাজনীতির বিরোধিতা করেন।
১৬. রোজার গারাউডি, ফি সাবিলি হিওয়ারিল হাদারাত, পৃ. ১৭৪।
📄 আরবি লিপিকলা
**আরবি লিপির নন্দনতাত্ত্বিক মূল্য**
আরবি লিপিকলা একটি বিশুদ্ধ ইসলামি শিল্প। এটি ইসলামধর্মের অন্যতম সৃষ্টি। আরবি লিপিকলার সঙ্গে ইসলামের পবিত্র গ্রন্থের দৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে। আল-কুরআন নাযিল হওয়ার আগে কোনো জাতির মধ্যেই বর্ণ ও বর্ণমালা কোনো দৃশ্যমান শিল্প (দৃশ্যকলা) ছিল না। যদিও প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ভাষা ছিল, ভাষা লেখার বিভিন্ন রীতি ছিল। তাদের ভাষার লেখ্য রীতি কেবল ভাষার অন্তর্গত ভাবকেই প্রকাশ করেছে, কারণ ভাষার লিখিত রূপ নিহিত ভাবেরই দৃশ্যমান প্রতীক। কিন্তু এসব প্রতীক বা চিহ্ন (বা বর্ণমালা) নন্দনতাত্ত্বিক বিচারে শিল্পের মর্যাদায় উন্নীত হয়নি। তাদের ক্ষেত্রে এ ব্যাপারটি ঘটেনি। কিন্তু আরবি বর্ণমালার ক্ষেত্রে এ ব্যাপারটিই ঘটেছে যথাযথভাবে, কারণ আল-কুরআন আরবি ভাষাকে মর্যাদার চাদরে মুড়িয়ে দিয়েছে।
ড. ইসমাইল ফারুকি বলেছেন, ওইসব সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত কোনো জাতি-গোষ্ঠীর কেউ-ই-অর্থাৎ মেসোপটেমিয়ান জাতিসমূহ, হিব্রু জাতিসমূহ, ভারতীয় জাতিসমূহ, তাদের মতো গ্রিক ও রোমান জাতি-গোষ্ঠী... আরবরাও তাদের অন্তর্ভুক্ত-ভাষার দৃশ্যমান প্রতীকের সৌন্দর্য আবিষ্কারের চেষ্টা করেনি। 'লিখন' ছিল একটি স্থূল ব্যাপার, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে এখনো রয়েছে। একে ঘিরে বিশ্বের সংস্কৃতিগুলোতে কোনো নন্দনতাত্ত্বিক প্রচেষ্টা দানা বাঁধেনি। ভারতে, বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে, খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী পশ্চিমে 'লিখন' কেবল ভাব-প্রকাশের দায়িত্ব পালন করেই ক্ষান্ত থেকেছে, অর্থাৎ ভাবের দৃশ্যমান প্রতীকরূপেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। হিন্দুধর্মে ও খ্রিষ্টধর্মে ফিগারেটিভ আর্ট মূর্ত শিল্পকলার ক্ষেত্রে 'লিখন' একটি পরিপূরক ভূমিকা পালন করেছে। অর্থাৎ, তা কেবল ভাব-প্রকাশক প্রতীকরূপে শিল্পকর্মের বিষয়বস্তুকে প্রকাশ করেছে...। কিন্তু ইসলামের আবির্ভাব শৈল্পিক অভিব্যক্তি প্রকাশের উপাদান হিসেবে বর্ণমালা ও শব্দের সামনে নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে দেয়। এই ক্ষেত্রে ইসলামি প্রতিভা সত্যিই অপ্রতিদ্বন্দ্বী। আরবি লিপিকলা আরাবিস্কের একটি প্রকরণ হিসেবে তার স্থান দখল করে নিয়েছে। ফলে আমাদের জন্য একে স্বতন্ত্র শিল্পকর্ম চিহ্নিত করা সহজ হয়েছে। এটি অবিমিশ্র ইসলামি শিল্পকলা। লিপিকলার চৈন্তিক বিষয়বস্তুর দিকে দৃষ্টিপাত না করেই এ কথা বলা যায়।
ড. মুস্তাফা আবদুর রহিম এ বিষয়টি জোরালোভাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, আরবি লিপিকলা একমাত্র শিল্প যার উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে আরবে; এটি অবিমিশ্র আরব শিল্প, যা কোনোকিছুর প্রভাবে প্রভাবিত হয়নি, যার সঙ্গে কোনোকিছুর সংশ্লেষ ঘটেনি...। কতিপয় প্রাচ্যবিদ বলেছেন, তুমি যদি ইসলামি আর্ট সম্পর্কে জানতে চাও, তাহলে সরাসরি আরবি লিপিকলার প্রতি মনোযোগ দেওয়া উচিত।
আরবি তথ্যসূত্রগুলো, যেমন: আল-ইকদুল ফারিদ, খুলাসাতুল আসার, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, আল-কামিল ফিত-তারিখ, আল-ফিহরিসত, সুবহুল আশা ও অন্যান্য উৎসগ্রন্থ এ ব্যাপারে একমত যে, আরবি লিপিকলা মুসলিমদের কাছে যে যত্ন ও পরিচর্যা লাভ করেছে এবং শৈল্পিক উৎকর্ষে মণ্ডিত হয়েছে, অন্যকোনো সভ্য জাতির বেলায় এটা ঘটেনি।
অল্প কালের মধ্যেই মুসলিম শিল্পীরা আরবি বর্ণমালাকে তার শ্রুত কর্তব্যের পাশাপাশি একটি দৃশ্যমান কর্তব্যে ভূষিত করেন। আরবি বর্ণমালা এই নান্দনিক ময়দানে প্রবেশ করামাত্রই তার বিকাশ দ্রুত এগিয়ে যায়। অলংকরণশিল্পের নকশা ও রেখাগুলোর সঙ্গে তার মিশ্রণ ঘটে, তা বরং অলংকরণশিল্পকে অনেক এগিয়ে দেয়। আরবি লিপিকলা ও অলংকরণশিল্পের মধ্যে রয়েছে দৃঢ় সহযোগিতামূলক সম্পর্ক।
এই মৌলিক শিল্পের প্রতি মুসলিমদের যে মনোযোগ ও পরিচর্যা এবং তাদের যে বহুবিধ উৎকর্ষ সাধন তার সবকিছু এখানে আমি উল্লেখ করতে পারব না। উদাহরণ হিসেবে কয়েকটি লিপির উল্লেখ করছি: কুফি লিপি, নাসখি লিপি, সুলুস লিপি, আন্দালুসি লিপি, রুকআ লিপি, দিওয়ানি লিপি, তা'লিক (ফার্সি) লিপি, ইজাযা লিপি ইত্যাদি।
এসব লিপির বহু শাখালিপি রয়েছে, যা আরবি লিপিকলাকে সমৃদ্ধ ও ঐশ্বর্যমণ্ডিত করেছে। ফলে আরবি লিপির রয়েছে মানিয়ে নেওয়ার যোগ্যতা, তা সর্বাবস্থায় ও সব জায়গায় নিজের ভূমিকা পালন করতে পারে। শাখালিপির কয়েকটি উদাহরণ উল্লেখ করা যায়। কুফি লিপির শাখালিপি হলো কুফি আল-মুওয়াররাক, কুফি আল-মুযহির, কুফি আল-মুনহাসির, কুফি আল-মুআশশাক বা আল-মুযাফফার বা আল-মুওয়াশশাহ। দিওয়ানি লিপির একটি শাখালিপি হলো জালি আদ-দিওয়ানি। সুলুস লিপির শাখালিপি হলো জালি আস-সুলুস। অন্য লিপিগুলোরও শাখালিপি রয়েছে।
**মুসলিম শিল্পীদের সৃজনশীলতা**
মুসলিম শিল্পীরা কখনো কখনো একাধিক লিপিকে একই পটে সাজিয়েছেন। এতে লিপির সৌন্দর্য ও চাকচিক্য আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে এই শিল্প সৃজনশীলতায় নতুনত্ব ও অভিনবত্বের দিকে এগিয়ে গেছে। লিপিশিল্পে যে প্রতিযোগিতা ছিল তা একে পূর্ণতা দিয়েছে, এর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে, নান্দনিক উৎকর্ষের চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছে।
লিপিকলায় মুসলিম শিল্পীরা কেবল হরফ-বিন্যাস ও তার সৌন্দর্য-বর্ধনে ক্ষান্ত থাকেননি; বরং আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে অভিনবত্বের সৃষ্টি করেছেন, সৃজনশীলতা ও মৌলিকতার পরিচয় দিয়েছেন। তারা স্বয়ং হরফকেই অলংকরণের উপাদান হিসেবে প্রস্তুত করেছেন। ফলে লিপির পটগুলো নান্দনিক আলংকারিক পটে রূপান্তরিত হয়েছে। মুসলিম শিল্পীরা পটের ওপর কী অসীম দক্ষতা ও নিয়ন্ত্রণের পরিচয় দিয়েছেন তাতে আপনি অবশ্যই বিস্মিত হবেন। তারা হরফকে দিয়ে একই সময়ে দুটি কাজ করিয়ে নিয়েছেন। একটি হলো ভাব প্রকাশের কাজ, অপরটি হলো অলংকরণের কাজ। তারা দ্বিতীয় কাজকে প্রথম কাজের সাজরূপে উপস্থাপন করেছেন!
মুসলিম শিল্পীরা আরবি লিপিকলায় অভিনবত্ব ও সৃজনশীলতার শিখরে পৌঁছেও ক্ষান্ত থাকেননি, তারা হরফের ডানায় চড়ে শিল্পের নতুন নতুন দিগন্তে ভ্রমণ করেছেন। হরফ এখানে কাঠামোগত শিল্পের (ফিগারেটিভ আর্টের) হাতিয়ার হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। চাকচিক্যময় নান্দনিক শিল্পের কার্যকরী উপাদানে পরিণত হয়েছে। লিপির আলংকারিক পটের ওপর চোখ পড়ামাত্র প্রথম মুহূর্তে পটে আপনি একটি চিত্র দেখতে পাবেন, সেটা হতে পারে পাখির, হতে পারে কোনো প্রাণীর, ফলের বা প্রদীপের। কিন্তু আপনি একটু খুঁটিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবেন যে চিত্রটি আরবি হরফ ও শব্দ ছাড়া কিছু নয়। এগুলো শিল্পীদেরই আবিষ্কার। বাহ্যিক চিত্রের সঙ্গে এসব শব্দ ও হরফের অর্থগত সামঞ্জস্য থাকে। এটাই অভিনবত্ব।
আরবি লিপিকলার ক্ষেত্রে মুসলিমদের ঐতিহ্য এমনই ঐশ্বর্যপূর্ণ। তাদের এমন কৃতিত্ব ও সৃজনশীলতা আরবি লিপিকলাকে ইসলামি সভ্যতার জন্য যুগ যুগ ধরে ও ইসলামি বিশ্বের সব ভূখণ্ডে এক অনন্য শিল্পরূপে ভাস্বর করে তুলেছে।
টিকাঃ
১৭. সালেহ আহমাদ শামি, আল-ফননুল ইসলামি ইলতিযাম ওয়া ইবদা, পৃ. ১৯৬।
১৮. ড. ইসমাইল ফারুকি (১৩৩৯-১৪০৬ হি./১৯২১-১৯৮৬ খ্রি.): বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামি পণ্ডিত। ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত। দর্শনশাস্ত্রে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পড়াশোনা করেছেন আমেরিকায় ও পাকিস্তানে। আমেরিকায় অবস্থিত International Institute of Islamic Thought-এর প্রধান ছিলেন।
১৯. মাজাল্লাতুল মুসলিমিল মুআসির, সংখ্যা ২৫, ১৪০১ হি.।
২০. পরিশিষ্ট, আল-আনবাউল কুয়েতিয়্যাহ, সংখ্যা ৫১৭, তারিখ: ১৬/০৭/১৯৮৬ খ্রি.।
২১. নাজি যাইনুদ্দিন, মুসাওয়ারুল খাত্তিল আরাবি, পৃ. ৩১৫।
২২. সালেহ আহমাদ শামি, আল-ফননুল ইসলামি ইলতিযام ওয়া ইবদা, পৃ. ১৯৮।
২৩. মুসলিম বিজেতারা তাদের দ্বীন ও শরিয়তের প্রচারের জন্য এই লিপিকেই মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর পূর্বে লিখিত মুসহাফগুলো কুফি লিপিতেই লেখা হয়েছে। কুফার আলেমগণই কুফি লিপির উৎকর্ষ সাধন করেন। দেখুন, নাজি যাইনুদ্দিন, মুসাওয়ারুল খাত্তিল আরাবি, পৃ. ৩৩৯।
২৪. সালেহ আহমাদ শামি, আল-ফননুল ইসলামি ইলতিযাম ওয়া ইবদা, পৃ. ১৯৮-১৯৯।
২৫. সালেহ আহমাদ শামি, আল-ফননুল ইসলামি ইলতিযাম ওয়া ইবদা, পৃ. ১৯৯।
২৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ২০০-২০৭।