📄 ইসলামি সভ্যতায় হাসপাতাল
বিশ্বসভ্যতায় স্বাস্থ্যক্ষেত্রে মুসলমানদের গৌরবোজ্জ্বল অবদান হলো বিশ্বের প্রথমবারের মতো হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা। তারা বরং অন্যান্য জাতি থেকে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নয়শ বছরেরও বেশি সময় এগিয়ে রয়েছে!
উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিকের শাসনামলে প্রথম ইসলামি হাসপাতাল নির্মিত হয়। (৪৬৬) তার শাসনকাল ছিল ৮৬ হি./৭০৫ খ্রি. থেকে ৯৬ হি./৭১৫ খ্রি. পর্যন্ত। এই হাসপাতাল ছিল কুষ্ঠরোগের জন্য বিশেষায়িত। এটির পরপরই ইসলামি বিশ্বে বেশ কয়েকটি হাসপাতাল নির্মিত হয়। এগুলোর কোনো-কোনোটি অত্যন্ত অগ্রগতি লাভ করে। এ হাসপাতালগুলো চিকিৎসা ও জ্ঞানের দুর্গ বলে বিবেচিত হতো। এগুলোই বিশ্বের প্রথম মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়। বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, ইসলামি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার নয়শ বছরেরও বেশি সময় পরে প্যারিসে প্রথম ইউরোপীয় হাসপাতাল তৈরি করা হয়!
ইসলামি বিশ্বে হাসপাতালগুলো বিমারিস্তান অর্থাৎ রোগী সেবাকেন্দ্র নামে পরিচিত ছিল। স্থায়ী হাসপাতাল যেমন ছিল, তেমনই ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালও ছিল। স্থায়ী হাসপাতাল বলতে বোঝাচ্ছে যেগুলো শহরে ও নগরে নির্মিত হয়েছিল। মুসলিম নগরী খুব কমই ছিল যেখানে হাসপাতাল নির্মিত হয়নি। এমনকি ছোট ছোট শহরেও হাসপাতাল ছিল। ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল হলো যেগুলো প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে, মরুভূমিতে ও পাহাড়ি এলাকায় ঘুরে বেড়াত।
ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল একদল উটের ওপর বহন করে নিয়ে যাওয়া হতো। উটের সংখ্যা কখনো কখনো পৌঁছত চল্লিশে। এগুলো সুলতান মাহমুদ আস-সালজুকির শাসনামলের ঘটনা। তার শাসনকাল ছিল ৫১১ হি./১১১৭ খ্রি. থেকে ৫২৫ হি./১৩০১ খ্রি. পর্যন্ত। ভ্রাম্যমাণ কাফেলাগুলোর সঙ্গে থাকত পর্যাপ্ত চিকিৎসা-সরঞ্জাম ও ওষুধপত্র। কয়েকজন চিকিৎসক থাকতেন তাদের সঙ্গে। মুসলিম উম্মাহর সকলের নাগালে পৌঁছে যেত এসব চিকিৎসা-কাফেলা। (৪৬৭)
বড় শহরগুলোতে স্থায়ী হাসপাতাল সংখ্যায় ও গুণেমানে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছিল। এগুলোর মধ্যে বিখ্যাত ছিল বাগদাদের আল-আদুদি হাসপাতাল, প্রতিষ্ঠাকাল ৩৭১ হি./৯৮১ খ্রি.; দামেশকের আন-নুরি হাসপাতাল, প্রতিষ্ঠাকাল ৫৪৯ হি./১১৫৪ খ্রি.; কায়রোর আল-মানসুরি বড় হাসপাতাল, প্রতিষ্ঠাকাল ৬৮৩ হি./১২৮৪ খ্রি.। কেবল কর্ডোভাতেই পঞ্চাশটির বেশি হাসপাতাল ছিল। (৪৬৮)
বিশেষায়ণের বিবেচনায় এসব বিশাল বিশাল হাসপাতালকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। কিছু বিভাগ ছিল দেহের অভ্যন্তরীণ রোগের চিকিৎসার জন্য, শল্যচিকিৎসার জন্য ছিল কিছু বিভাগ। চর্মরোগের জন্য যেমন আলাদা বিভাগ ছিল, তেমনই চক্ষুরোগের চিকিৎসার জন্যও ছিল ভিন্ন বিভাগ। ছিল মনোরোগ বিদ্যাবিভাগ, অর্থোপেডিক বা হাড়ভাঙার চিকিৎসার জন্যও আলাদা বিভাগ ছিল। আরও বিভিন্ন ধরনের বিভাগ ছিল।
এসব হাসপাতাল কেবল আরোগ্যকেন্দ্র ছিল না, প্রকৃতপক্ষে বরং উন্নতমানের চিকিৎসা-মহাবিদ্যালয় ছিল। যতটা চিকিৎসাসেবা হতো তার চেয়ে বেশি মাত্রায় হতো চিকিৎসাবিদ্যার পড়াশোনা। বিশেষজ্ঞ প্রধান চিকিৎসক, যিনি আল-উস্তাদ বা অধ্যাপক নামে পরিচিত হতেন, প্রতিদিন সকালে ঘুরে ঘুরে রোগীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতেন। প্রাথমিক স্তরের চিকিৎসকগণ থাকতেন তার সঙ্গে। তিনি তাদের শেখাতেন এবং কী পর্যবেক্ষণ করছেন তার নোট নিতে বলতেন। সাথে সাথে চিকিৎসার পদ্ধতি বলে দিতেন, তারা সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং শিখতেন। তারপর অধ্যাপক একটি বড় হলঘরে গিয়ে উপস্থিত হতেন, তাকে ঘিরে বসত শিক্ষার্থীরা। তিনি চিকিৎসাবিদ্যার গ্রন্থ থেকে তাদের পাঠ করে শোনাতেন, যতটুকু পাঠ করতেন তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণও করতেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের জবাব দিতেন। প্রতিটি শিক্ষা-কার্যক্রম শেষ হওয়ার পরে তিনি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ব্যবস্থা করতেন। যারা শিক্ষা-কার্যক্রম শেষ করেছে তারা পরীক্ষায় অংশ নিত। বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হতো তাদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সনদ দিতেন।
ইসলামি হাসপাতালগুলোর অভ্যন্তরে থাকত বড় বড় গ্রন্থাগার, গ্রন্থাগারগুলোতে থাকত অসংখ্য গ্রন্থ। যেসব বিষয়ের গ্রন্থ এখানে স্থান পেত তা হলো চিকিৎসাবিজ্ঞান, ওষুধবিজ্ঞান, ওষুধপ্রস্তুতপ্রণালি, শারীরস্থান বা অঙ্গব্যবচ্ছেদবিদ্যা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কার্যাবলি, চিকিৎসা- সংক্রান্ত ফিকহি বিষয়াবলি। চিকিৎসকের প্রয়োজনীয় অন্যান্য জ্ঞানশাখার গ্রন্থাবলিও স্থান পেত হাসপাতালের গ্রন্থাগারে।
হাসপাতালগুলোতে কত বড় বড় গ্রন্থাগার ছিল তা বোঝার জন্য এখানে একটি উদাহরণ পেশ করা যেতে পারে। কায়রোতে অবস্থিত ইবনে তুলুন হাসপাতালের গ্রন্থাগারে এক লাখেরও বেশি গ্রন্থ ছিল।
হাসপাতালের পার্শ্ববর্তী জমিগুলোতে ওষুধি বড় বড় বাগান ছিল। এসব বাগানে ওষুধি বৃক্ষ ও তৃণলতার চাষ হতো। হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহের জন্য এসব বাগান তৈরি করা হতো।
রোগের সংক্রমণ যাতে না ঘটে বা না ছড়ায় তার জন্য হাসপাতালে যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো তা ছিল এক কথায় অনন্য ও বিস্ময়কর। কোনো রোগী হাসপাতালে প্রবেশ করামাত্রই তার পরনের পোশাক পালটে নতুন পোশাক দেওয়া হতো। নতুন পোশাক দেওয়া হতো সম্পূর্ণ বিনা পয়সায়। এটা করা হতো যাতে তার পরনের পোশাক থেকে সে যে রোগে আক্রান্ত হয়েছে তা না ছড়ায়। তারপর প্রত্যেক রোগী সংশ্লিষ্ট রোগের জন্য নির্ধারিত ওয়ার্ডে প্রবেশ করত। কোনো রোগীর নির্ধারিত ওয়ার্ড ব্যতীত অন্য ওয়ার্ডে প্রবেশের অনুমতি ছিল না। রোগের সংক্রমণ যাতে না ঘটে সে জন্যই এই নিষেধাজ্ঞা ছিল। প্রত্যেক রোগীই ঘুমাত তার জন্য নির্ধারিত খাটে। খাটে দেওয়া হতো নতুন বিছানা-বালিশ ও নির্ধারিত সরঞ্জামাদি।
এসব ইসলামি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার নয় শতাব্দীরও বেশি সময় পরে প্যারিসে যে হাসপাতাল তৈরি করা হয়েছিল তার সঙ্গে এগুলোর তুলনা করলে আমাদের সামনে এগুলোর মহত্ত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠবে। ইসলামি হাসপাতালগুলোতে যেসব ব্যবস্থা ও শৃঙ্খলা ছিল তা ছিল অতি উচ্চমানের, অথচ প্যারিসের হাসপাতালে ছিল অপরিচ্ছন্নতা, রোগীরা থাকত ঠাসাঠাসি করে, বিশৃঙ্খলা ছিল চোখে পড়ার মতো। একেকটি ছোট খাটে তিন বা চারজন রোগী ঘুমাত। তারা সবাই যে একই রোগে আক্রান্ত হতো তা-ও নয়। রোগিণীরা সন্তান প্রসব করত রোগীদের মধ্যখানেই! পুরুষ ও নারী উভয়েই ছিল যেন মিলেমিশে একাকার। একটি শিশু কান্না করলে ঘুম ভেঙে যেত অন্যসব রোগীর! দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত চারদিকে!
চিত্র নং-৭ মানসুরি বড় হাসপাতাল
ইসলামের ইতিহাসে আরও একটি বিশাল হাসপাতালের উদাহরণ হলো আল-মানসুরি বড় হাসপাতাল। হাসপাতালটি কায়রোতে ৬৮৩ হিজরিতে/১২৮৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেন বাদশাহ মানসুর সাইফুদ্দিন কালাউন। যথার্থতায়, শৃঙ্খলায় ও পরিচ্ছন্নতায় আল-মানসুরি হাসপাতাল ছিল পৃথিবীর আশ্চর্যজনক বস্তুগুলোর অন্যতম। এই হাসপাতাল এত বিশাল ছিল যে এখানে দৈনিক চার হাজারেরও বেশি রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হতো।
এই প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে মারাকেশ হাসপাতালের কথা ভুলে গেলে চলবে না। এই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আল-মানসুর আবু ইউসুফ ইয়াকুব। তিনি মরক্কোয় আল-মুওয়াহ্হিদ (আল-মোহাদ) খিলাফতের (রাজ্যের) শাসক ছিলেন। তার শাসনকাল ছিল ৫৮০ হি./১১৮৪ খ্রি. থেকে ৫৯৫ হি./১১৯৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। মারাকেশ হাসপাতালের নির্মাণশৈলী ছিল নয়নাভিরাম ও মনোমুগ্ধকর। নৈসর্গিক পরিবেশও এখানে তার ঔজ্জ্বল্য ছড়িয়ে ছিল। হাসপাতালের এরিয়ায় সব ধরনের গাছ ও লতাগুল্ম রোপণ করা হয়েছিল। তৈরি করা হয়েছিল চারটি ছোট কৃত্রিম জলাশয় বা লেক। হাসপাতালটির চিকিৎসাব্যবস্থাও ছিল অতি উন্নত। ছিল আধুনিক ওষুধপত্র ও দক্ষ চিকিৎসকবৃন্দ। (৪৭০) ইসলামি সভ্যতার ললাটে মারাকেশ হাসপাতাল ছিল সত্যিকার অর্থেই একটি মূল্যবান রত্ন।
এখানে বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর কথা উল্লেখ না করলেই নয়। বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর একেকটিতে নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসা দেওয়া হতো। যেমন চক্ষু হাসপাতাল, কুষ্ঠরোগের হাসপাতাল, মানসিক হাসপাতাল ইত্যাদি।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ও অভিনব ব্যাপার এই যে, কোনো কোনো বড় মুসলিম নগরীতে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা-পল্লিই ছিল। আন্দালুসীয় ভূগোলবিদ ও পর্যটক ইবনে জুবায়ের তার ৫৮০ হিজরি/১১৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ভ্রমণবৃত্তান্তে এ ব্যাপারে যে ঘটনা বর্ণনা করেছেন তা অতি চমকপ্রদ। তিনি আব্বাসি খিলাফতের রাজধানী বাগদাদে একটি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা-পল্লি পর্যবেক্ষণ করেছেন। এটি একটি ছোট শহরের সমান। এই পল্লির মধ্যবর্তী স্থানে রয়েছে একটি বিশাল জাঁকজমকপূর্ণ অট্টালিকা। অট্টালিকাটির চারপাশে রয়েছে বাগান এবং বেশ কিছু ঘর। এ-সবকিছুই রোগীদের জন্য ওয়াকফকৃত। বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ এই চিকিৎসা-পল্লি পরিচালনা করতেন। আরও ছিল ওষুধ প্রস্তুতকারী (ফর্মুলেশন) বিজ্ঞানীদের দল, ছিল চিকিৎসাবিদ্যার বহু শিক্ষার্থী। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সকলের খরচ বহন করা হতো। উম্মাহর ধনী ব্যক্তিরা দরিদ্র ও নিঃসহায় রোগীদের চিকিৎসার জন্য যেসব সম্পত্তি ওয়াক্ফ করেছিলেন তা থেকেও আসত খরচের একটি বড় অংশ। (৪৭১)
টিকাঃ
৪৬৬. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ৪, পৃ. ২৯।
৪৬৭. ইবনুল আল-কিফতি, তারিখুল হুকামা, পৃ. ৪০৫।
৪৬৮. মাহমুদ আল-হাজ কাসিম, আত-তিকন্তু ইনদাল আরব ওয়াল মুসলিমিন, পৃ. ৩২৮-৩২৯।
৪৭০. মুস্তাফা আস-সিবায়ি, মিন রাওয়ায়িয়ি হাদারাতিনা, পৃ. ১১০-১১৮।
৪৭১. মুস্তাফা আস-সিবায়ি, মিন রাওয়ায়িয়ি হাদারাতিনা, পৃ. ১০১।
📄 অসুস্থের সেবা ও মানবিক বন্ধন
ইতিপূর্বে আমরা যা আলোচনা করেছি, তা তো গেলই। এখন আমরা ইসলামি সভ্যতার যুগে মুসলমানদের চিকিৎসাসেবার আরেকটি দিক সম্পর্কে আলোচনা করব। সেটা হলো মানবিক বন্ধন। সাধারণভাবে মানুষের প্রতি সম্মান এবং তাদের দুঃখকষ্ট ও রোগ-ব্যাধি-যখম দূর করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ব্যয়ের মধ্য দিয়ে এই বন্ধন দৃশ্যমান হয়। মানুষটা কে এবং তার সমস্যা কী সেদিকে দৃষ্টিপাত করা হয় না।
মুসলিম চিকিৎসকেরা অসুস্থদের সেবাদানের ক্ষেত্রে মানবিক বন্ধনের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাদের জন্য এটা কোনো অভিনব ব্যাপার ছিল না। কারণ ইসলামি শরিয়ার আইনকানুনই এই অসাধারণ নৈতিক দায়িত্ববোধের কথা বার বার উচ্চারণ করেছে। ইসলাম অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখেছে বিপদ্গ্রস্ত ও সংকটাপন্ন মানুষ হিসেবে, এ কারণেই কে তার পাশে দাঁড়াবে, তার হাত ধরবে, তার ভয় ও শঙ্কা দূর করবে এবং তার শারীরিক ও মানসিক দুঃখকষ্ট লাঘব করবে তার জন্য এমন মানুষের প্রয়োজন।
ইসলামি শরিয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা হলো যেকোনো উপায়ে অসুস্থের সংকট দূর করা এবং যতটুকু সম্ভব তার দুঃখ-যন্ত্রণা লাঘব করা। তাই তো ইসলামি শরিয়া অসুস্থকে রমযানে রোযা ভাঙার অনুমতি দিয়েছে। কারও হজ পালনের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যগত বাধা থাকলে তার হজ পালনের দরকার নেই। এ কারণে তার কোনো গুনাহ হবে না। যে অসুস্থ ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবে নামায পড়তে পারে না তাকে তার জন্য উপযোগী অবস্থায় নামায পড়ার অনুমোদন দিয়েছে। সে বসে অথবা শুয়ে বা এমনকি চোখের ইশারায় (৪৭২) নামায পড়তে পারে! যে অসুস্থ ব্যক্তি পানি ব্যবহারে অক্ষম তার জন্য অজুর বদলে তায়াম্মুম করার অনুমতি রয়েছে। কেউ যদি কোনো কারণে অজু বা তায়াম্মুম কোনোটাই করতে না পারে তাহলে সে এই অবস্থাতেই নামায পড়বে। (৪৭৩) শরিয়তের পরিভাষায় তাকে ‘ফাকিদুত তাহুরাইন’ (দুটি পদ্ধতিতেই পবিত্রতা অর্জনে অক্ষম) বলে! এমনকি আল্লাহর পথে জিহাদের মুহূর্তে রুগ্ন ব্যক্তি থেকে ইসলামি শরিয়া বাধ্যবাধকতা উঠিয়ে দিয়েছে। ফলে সে জিহাদ না করলেও তার কোনো গুনাহ হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَيْسَ عَلَى الْأَعْمَى حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْأَعْرَجِ حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْمَرِيضِ حَرَجٌ
অন্ধের জন্য গুনাহ নেই, ল্যাংড়ার জন্য গুনাহ নেই, রুগ্ন ব্যক্তির জন্য কোনো গুনাহ নেই। (৪৭৪)
ইসলামি শরিয়া কেবল কিছু বিধান উঠিয়ে নিয়ে ও কতিপয় ফরয ইবাদতে রুখসত (ছাড়) দিয়ে ক্ষান্ত থাকেনি, বরং অসুস্থের পাশে থেকে তার সেবা-শুশ্রূষা করতে এবং তার মানসিক স্বস্তি ও প্রশান্তির ব্যবস্থা করতে বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অসুস্থকে তার বাড়িতে বা হাসপাতালে দেখতে যাওয়া মুসলমানদের একটি অধিকার বলে সাব্যস্ত করেছেন। আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
حَقُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ سِتَّ ..... وَذَكَرَ مِنْهَا: وَإِذَا مَرِضَ فَعُدْهُ
মুসলমানের ওপর মুসলমানের হক ছয়টি, ... (ছয়টির মধ্যে একটি এই যে,) যখন সে অসুস্থ হবে তাকে দেখতে যাবে। (৪৭৫)
যে ব্যক্তি অসুস্থকে দেখতে যাবে তার জন্য জান্নাত লাভের সুসংবাদ দিয়েছেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আবু হুরাইরা রা. বর্ণনা করেন,
مَنْ عَادَ مَرِيضًا نَادَى مُنَادٍ مِنَ السَّمَاءِ: طِبْتَ وَطَابَ مَمْشَاكَ، وَتَبَوَأْتَ مِنَ الْجَنَّةِ مَنْزِلاً
যে ব্যক্তি অসুস্থকে দেখতে যায় তার জন্য আকাশ থেকে একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করে, তোমার কল্যাণ হোক, কল্যাণ হোক তোমার আগমনের, তুমি তো জান্নাতে একটি ঘর তৈরি করে নিয়েছ। (৪৭৬)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অসুস্থ ব্যক্তির কাছে ভালো ভালো ও কল্যাণের কথা বলতে নির্দেশ দিয়েছেন। তার মানসিক শক্তিকে বৃদ্ধি করতে বলেছেন। সে দ্রুতই সুস্থ হয়ে উঠবে এবং দীর্ঘজীবী হবে, এমন আশাদানের নির্দেশ দিয়েছেন। আবু সাইদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِذَا دَخَلْتُمْ عَلَى الْمَرِيضِ فَنَفَسُوْا لَهُ فِي الْأَجْلِ؛ فَإِنَّ ذُلِكَ لَا يَرُدُّ شَيْئًا، وَهُوَ يَطِيبُ نَفْسَ الْمَرِيضِ
তোমরা অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গেলে তাকে আয়ু ও রোগমুক্তির ব্যাপারে আশান্বিত করো (৪৭৭)। এটা (তাকদিরে নির্ধারিত) কোনো কিছু প্রতিহত করবে না বটে, কিন্তু অসুস্থ ব্যক্তির চিত্তকে প্রশান্ত করবে। (৪৭৮)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বরং অসুস্থের আত্মবিশ্বাস ও মনোবলকে আসমানি বিষয়ের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন, যখন তিনি জানিয়েছেন যে, ধৈর্যধারণ-সাপেক্ষে রোগ-ব্যাধি ও অসুস্থতা হলো তার পাপের কাফফারা বা প্রায়শ্চিত্ত ও আখেরাতে মুক্তির কারণ। ইমাম বুখারি আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَا يُصِيبُ المُسْلِمَ، مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ، وَلَا هَمْ وَلَا حُزْنٍ وَلَا أَذًى وَلَا غَمَّ، حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا، إِلَّا كَفَرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ
মুসলিমের ওপর যেসব ক্লান্তি ও রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুঃখ, কষ্ট ও উদ্বেগ আপতিত হয়, এমনকি যে কাঁটা তার দেহে বিঁধে, এসবের দ্বারা আল্লাহ তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন। (৪৭৯)
ইমাম বুখারি আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে এ বিষয়ে আরেকটি হাদিস বর্ণনা করেছেন,
إِنَّ اللَّهَ قَالَ : إِذَا ابْتَلَيْتُ عَبْدِي بِحَبِيبَتَيْهِ فَصَبَرَ عَوَّضْتُهُ مِنْهُمَا الْجَنَّةَ
নিশ্চয় আল্লাহ বলেন, আমি যদি আমার বান্দাকে তার দুটি অতিপ্রিয় জিনিসের ব্যাপারে পরীক্ষায় ফেলি এবং সে তাতে ধৈর্য ধারণ করে, তাহলে আমি তাকে সে দুটি জিনিসের বিনিময়ে জান্নাত দান করি। (৪৮০)
অসুস্থ মুমিন বান্দার আত্মবিশ্বাস এভাবেই আকাশ পর্যন্ত পৌছে যায়। ফলে সমাজে সে নিজেকে অক্ষম-অপদার্থ ও ফেলনা মনে করে না। বরং বিশ্বাস করে যে, সবাই তাকে গুরুত্ব দেয় এবং যত্ন নেয়।
ইসলামের এই উন্নত মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি কেবল মুসলিম রোগীদের জন্য নয়, বরং যেকোনো অসুস্থ ব্যক্তির জন্য তা প্রযোজ্য, তার ধর্মাদর্শ যা-ই হোক না কেন। পবিত্র কুরআনের আয়াত থেকে এটাই বোঝা যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ ...
আমি তো আদমসন্তানকে মর্যাদা দান করেছি...। (৪৮১)
সাধারণভাবে সব মানুষই সম্মানিত। এ কারণেই কেউ অসুস্থ হলে তার সেবাযত্ন করতে হবে এবং রোগাক্রান্ত হলে চিকিৎসা করতে হবে, সে মুসলিম না হলেও। একটি ইহুদি বালক অসুস্থ হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। (৪৮২) এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ইমাম বুখারি রহ. তার সহিহে একটি বাব (অনুচ্ছেদ) রচনা করেছেন, বাবটির নাম: ইয়াদাতুল মুশরিক (মুশরিক অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া)।
এই গভীর মানবিক বন্ধনের শেকড় আমাদের মধ্যে প্রোথিত করে দিয়েছে ইসলামি শরিয়া। এর ফলেই ইসলামি সভ্যতার যুগে যুগে মুসলিম চিকিৎসকরা রোগীদের সঙ্গে তাদের ‘মানুষ’ ভেবেই আচরণ করতেন, তাদের ‘অনুভূতিহীন বস্তু’ মনে করতেন না। অথবা এটাও মনে করতেন না যে, রোগীরা হলো টাকাপয়সা রোজগারের হাতিয়ার, তাদের থেকে টাকাপয়সা খসানোর ফন্দি বের করতে পারলেই হয়! বরং রোগীদের মনে করা হতো বিপদ্গ্রস্ত ও সংকটাপন্ন মানুষ বলে, যাদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে ও পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্য-সহযোগিতা করা উচিত। শুধু চিকিৎসা ও সেবামূলক সাহায্য নয়, বরং মানসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য সহযোগিতাও এর অন্তর্ভুক্ত।
এমন মহৎ অনুভূতি ও প্রেরণা নিয়েই মুসলিম চিকিৎসকেরা তাদের রোগীদের সেবা দিতেন। ইসলামি রাষ্ট্রে ধনী-নির্ধন, আরব-অনারব, সাদা-কালো, শাসক-শাসিত, রাজাপ্রজা, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সবাইকে অতি উন্নত চিকিৎসাসেবা দেওয়া হতো। অধিকাংশ সময়ই সকলের জন্য চিকিৎসা ছিল সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। রোগীদের সামাজিক অবস্থান ও স্তরভেদ যা-ই হোক না কেন, তারা সবাই একই মানের চিকিৎসাসেবা পেত।
আসুন আমরা ইসলামি সভ্যতায় হাসপাতালগুলোর ব্যবস্থা ও শৃঙ্খলার দিকটি দেখি, তাহলেই আমরা মানবিক বন্ধন সম্পর্কে একটি ধারণা পাব।
কোনো রোগী হাসপাতালে প্রবেশ করামাত্রই একটি বহিঃকক্ষে তার প্রাথমিক পরীক্ষানিরীক্ষা করা হতো। তার রোগ বা অসুস্থতা হালকা পর্যায়ের হলে তাকে ব্যবস্থাপত্র লিখে দেওয়া হতো। সে চিকিৎসাপত্র দেখিয়ে হাসপাতালের ওষুধালয় থেকে ওষুধ নিয়ে যেত। রোগীর শারীরিক অবস্থা খারাপ ও হাসপাতালে ভর্তির উপযোগী হলে তার নাম রেজিস্ট্রি করা হতো। তারপর তাকে গোসলের জন্য গোসলখানায় ঢুকিয়ে দেওয়া হতো এবং তার পরনের পোশাক খুলে নিয়ে একটি বিশেষ বস্ত্রভান্ডারে রাখা হতো। তারপর তাকে দেওয়া হতো হাসপাতালের বিশেষ এক প্রস্থ নতুন পোশাক। এরপর তাকে তার মতো রোগীদের জন্য নির্ধারিত ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। নতুন বিছানা-বালিশে সজ্জিত একটি খাট পেত সে। তার মানসিক দিকটি বিবেচনা করেই এই খাটে অন্যকোনো রোগীর অবস্থানের অনুমতি ছিল না।
রোগী ইসলামী হাসপাতালে প্রবেশের পর চিকিৎসক তাকে যে ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন সে অনুযায়ী ওষুধ দেওয়া হতো। তার স্বাস্থ্যের উপযোগী খাদ্য ও পথ্যও দেওয়া হতো নির্ধারিত পরিমাণে। রোগীরা সাধারণত যে প্রকারের খাবার খায় তাদের সেসব খাবার খেতে বাধ্য করা হতো না। বরং উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হতো তাদের। রোগীদের খাদ্য-তালিকার মধ্যে ছিল খাসি ও গরুর গোশত এবং পাখি ও মুরগির গোশত। খাবারের পরিমাণের ক্ষেত্রেও কোনো কৃপণতা ছিল না এবং রোগীদের কষ্ট দেওয়া হতো না। বরং একজন রোগীর সুস্থতার আলামত ছিল এই যে, সে একই বৈঠকে পুরো একটি রুটি ও একটি আস্ত মুরগি খেয়ে শেষ করবে!
রোগী যখন আরোগ্যলাভের পর্যায়ে পৌঁছে যেত, তাকে আরোগ্য লাভকারীদের জন্য নির্ধারিত ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। এখানে তার পরিপূর্ণ আরোগ্যলাভের পর তাকে আরেক প্রস্থ নতুন পোশাক দেওয়া হতো সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। শুধু তা-ই নয়, তাকে পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থও দেওয়া হতো, যাতে সে কর্মক্ষম হওয়া পর্যন্ত খরচ চালিয়ে নিতে পারে! অর্থাৎ, সে যেন পরিপূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠার আগে কাজ করতে বাধ্য না হয়, কারণ এতে তার স্বাস্থ্য আবার ভেঙে পড়তে পারে। (৪৮৩)
এখন আপনার প্রশ্ন করার প্রয়োজন নেই যে ইসলামি সমাজে দরিদ্র মানুষেরা কী পরিমাণ স্বস্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য ভোগ করত। যেহেতু তারা জানতই যে অসুস্থ হলে এই পর্যায়ের চিকিৎসাসেবা, যত্ন-আত্তি ও সাহায্য-সহযোগিতা পাবে। এমন চিকিৎসা ও সাহায্য পাওয়ার জন্য তাদের কপালের ঘাম ঝরানোর প্রয়োজন হতো না, প্রয়োজন হতো না কারও সুপারিশের বা কারও মধ্যস্থতার। আর চিকিৎসা পরিপূর্ণ করার আবেদন জানিয়ে কাকুতিমিনতি করা তো দূরেরই কথা!
মহান চিকিৎসক আবু বকর রাযি তার ছাত্রদের উদ্দেশে যে নির্দেশনা দিয়েছিলেন তা কত চমৎকার। তিনি তাদের বিশেষ নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, তাদের প্রধান উদ্দেশ্য হবে রোগীদের সুস্থ করে তোলা, তাদের থেকে পারিশ্রমিক গ্রহণ নয় এবং তারা আমির-উমারা ও ধনী ব্যক্তিদের চিকিৎসা যতটা গুরুত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে করবে, ততটাই আন্তরিকতা ও গুরুত্বের সঙ্গে করবে দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের চিকিৎসা; তারা নিজেরা বিশ্বাস না করলেও রোগীদের বোঝাবে যে তারা আরোগ্যলাভ করবে, সুস্থ হয়ে উঠবে। (৪৮৪) কারণ শারীরিক অবস্থার ওপর মানসিক অবস্থারই প্রতিফলন ঘটে।
স্বাস্থ্যসেবার এমন উন্নত ব্যবস্থা কেবল বড় বড় শহর ও নগরে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং ইসলামি রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলের লোকেরাও সমান গুরুত্বের সঙ্গে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পেত। ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালগুলো তাদের চিকিৎসাসেবার আঞ্জাম দিত। আগের অনুচ্ছেদে আমরা এসব হাসপাতাল সম্পর্কে বলেছি। ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালগুলো সাধারণভাবে গ্রামাঞ্চল, ছোট পল্লি, পাহাড়ি জনপদ ও দূরবর্তী এলাকাগুলোয় ঘুরে বেড়াত।
ইসলামি রাষ্ট্র স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে সকলের প্রতি সমান দৃষ্টি দিয়েছে; পরিবেশ, সামাজিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক ভিন্নতা ইত্যাদিকে আমলে নেয়নি। সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করলে যে-কেউ এরূপ সাক্ষ্য দিতে বাধ্য হবেন।
অসুস্থের প্রতি ইসলামের মমতাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি বরং সমাজের সকল স্তরের প্রতিই সমানভাবে বিস্তৃত ছিল; এর অন্তর্ভুক্ত ছিল জেলখানার কয়েদিরা, যারা মুসলিম সমাজের অনিষ্ট করেছে! এসব কয়েদিও পরিপূর্ণ চিকিৎসাসেবা পেত। কারণ তারাও মানুষ। যেকোনোভাবেই হোক, তারাও সমাজের সন্তান। তাদের যে কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছে এবং শাস্তি দেওয়া হচ্ছে তা তাদের সংশোধনের জন্যই, ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার জন্য নয়। অথচ আজকের বিশ্বে অসংখ্য কারাগারের বন্দিদের সঙ্গে এমনই আচরণ করা হচ্ছে, তাদেরকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
উজির আলি ইবনে ঈসা ইবনে জাররাহ বাগদাদের প্রধান চিকিৎসক (সিভিল সার্জন) সিনান ইবনে সাবিতকে চিঠি লিখে জানান, আমি জেলখানার কয়েদিদের ব্যাপারে ভেবেছি। তাদের সংখ্যাধিক্য এবং পরিবেশের রুক্ষতার কারণে তাদের রোগাক্রান্ত হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাই আপনার উচিত কয়েদিদের জন্য কয়েকজন চিকিৎসক নির্ধারণ করা, যারা প্রতিদিন গিয়ে তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবেন, ওষুধপত্র ও পথ্য দেবেন, গোটা জেলখানা ঘুরে ঘুরে দেখবেন এবং অসুস্থ কয়েদিদের চিকিৎসা করবেন। (৪৮৫)
মানবিকতার এই তরঙ্গ ইসলামি সভ্যতায় যুগ যুগ ধরে প্রবহমান ছিল। কারণ এর পেছনে সক্রিয় ছিল মুসলিম উম্মাহর সন্তানদের উদারচিত্তে ও মুক্তহস্তে দান, এই দান ছিল অবিরাম প্রস্রবণের মতো এবং তা ছিল ইসলামি রাষ্ট্রের জন্যও সহায়ক। আমি এখানে জনকল্যাণমূলক ওয়াক্ফ-ব্যবস্থার কথা বোঝাতে চাচ্ছি। অসুস্থদের স্বাস্থ্যসেবা, যত্ন ও আপ্যায়ন এবং তাদের সম্মান জানানোর ক্ষেত্রে ওয়াক্ফ-ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। উন্নত হাসপাতালগুলো সম্পূর্ণরূপে ওয়াক্ফকৃত সম্পত্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল, মুসলমানদের মধ্য থেকে একজন দায়িত্বশীল এসব সম্পত্তির দেখভাল করতেন। কখনো কখনো স্বয়ং বিচারকও এই দায়িত্ব পালন করতেন। ওয়াক্ফকৃত সম্পত্তির আয় থেকেই হাসপাতালগুলোর ব্যয়ভার নির্বাহ করা হতো। রোগীদের প্রয়োজনীয় খরচ, চিকিৎসকদের বেতন-ভাতা, বিছানাপত্র ও খাদ্য ক্রয়, ওষুধি বাগান তৈরি, ওষুধ প্রস্তুতকরণ-সবকিছুর খরচ আসত ওয়াক্ফকৃত সম্পত্তি থেকে। এমনকি হাসপাতালে অনুশীলনরত মেডিকেল শিক্ষার্থীদের খরচাদিও মেটাত এ থেকে!
এই ক্ষেত্রে একটি প্রসিদ্ধ নমুনা হলো কায়রোতে অবস্থিত আল-মানসুরি বড় হাসপাতাল। বাদশাহ মানসুর সাইফুদ্দিন কালাউন ৬৮৩ হিজরি ১২৮৪ খ্রিষ্টাব্দে এই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। হাসপাতালটির বার্ষিক খরচ মেটানোর মতো সম্পত্তিও ওয়াক্ফ করেন। যা আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি।
জনকল্যাণমূলক ওয়াক্ফ এবং তা মুসলমানদের মানবিক ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তা উল্লেখ করা হলো। এ সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয়ের ওপর কিছুটা আলোকপাত করা জরুরি। তা এই যে, রোগীর মন-মানসিকতা সজীব ও সতেজ রাখার কিছু অভিনব ও অভূতপূর্ব কৌশল অবলম্বন করা হতো। ওয়াক্ফকৃত সম্পত্তির একটি অংশের আয় নির্দিষ্ট ছিল এমন দুজন লোককে বেতন দেওয়ার জন্য, যারা প্রতিদিন হাসপাতালে ঘুরে বেড়াবে এবং রোগীদের অন্তরালে দাঁড়িয়ে তাদের শুনিয়ে শুনিয়ে তাদের সুস্থতার ব্যাপারে কথা বলবে। অর্থাৎ তারা রোগীর পাশে থেকে নিচুস্বরে কথা বলবে এমনভাবে যে, রোগী তাদের কথা শুনতে পেলেও তাদের দেখতে পাবে না। তারা নিজেদের কথাবার্তার মধ্য দিয়ে রোগীকে তার আরোগ্যলাভ ও সুস্থতার কথা জানান দেবে! ওয়াকফকৃত সম্পত্তির এই অংশটির নাম ছিল ওয়াকফু খিদায়িল মারিদ (রোগীর মন ভোলানোর জন্য ওয়াক্বফিয়া সম্পত্তি)। রোগীর মন সতেজ ও মনোবল চাঙা করে তোলার জন্যই এ পদ্ধতি অবলম্বন করা হতো। ফলে দেখা যেত রোগী খুব দ্রুতই সুস্থ হয়ে উঠছে! (৪৮৬)
রোগীদের সঙ্গে আচার-ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই দৃঢ় মানবিক বন্ধন ব্যক্তিগত আচরণে সীমাবদ্ধ ছিল না যে, কতিপয় চিকিৎসকই তা চর্চা করেছেন এবং তা কেবল জনগণের হৃদয় থেকে উৎসারিত জাতীয়তাভিত্তিক মমতা ও কল্যাণার্থে, বরং এমন আচরণ ছিল সর্বজনীন ও সামগ্রিক, রাষ্ট্রীয় নীতিই এমন আচরণের ভিত তৈরি করে দিয়েছিল। উম্মাহর সকল সদস্য-রাজা ও প্রজা এবং শাসক ও শাসিত সবাই-এই নীতি অবলম্বন করত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খলিফা বা আমির নিজে এসে রোগীদের খোঁজখবর নিতেন এবং তাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করা হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখতেন। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, মানসুর মুওয়াহহিদি (মরক্কোর মুওয়াহহিদি রাজ্যের সুলতান) সাপ্তাহিক রুটিনমাফিক মারাকেশে মানসুরি হাসপাতাল পরিদর্শনে যেতেন। প্রতি সপ্তাহে জুমআর নামাযের পর হাসপাতালটি পরিদর্শন করতেন এবং রোগীদের অবস্থা দেখে-শুনে নিশ্চিন্ত হতেন। (৪৮৭)
ইসলামি চিকিৎসাব্যবস্থায় রোগীদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে আরেকটি মানবিক দিক বিবেচনায় রাখা হতো। ইসলামি শরিয়া এ ব্যাপারে তাকিদ দিয়েছে। তা হলো রোগীর সম্মান রক্ষা করা ও তার লজ্জা হেফাজত করা। ফলে রোগীর ব্যক্তিত্ববোধ ও আত্মসম্মান যাতে ক্ষুণ্ণ না হয় সেদিকে লক্ষ রেখেই যাবতীয় পরীক্ষানিরীক্ষা ও চিকিৎসা করা হতো।
উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে যে, ইসলামি শরিয়ার বিধান অনুযায়ী প্রয়োজন ছাড়া রোগীর ছতর উন্মোচন করা জায়েয নয়। পরীক্ষা বা অস্ত্রোপচার করতে যতটুকু অংশ উন্মোচিত করা প্রয়োজন ততটুকু উন্মোচিত করা যাবে, এর বেশি নয়। বাইরের কারও জন্যে রোগীর পরীক্ষানিরীক্ষার ব্যাপারগুলো দেখা জায়েয নয়, আর যদি তারা হয় ভিন্ন লিঙ্গের তাহলে তো কথাই নেই। একইভাবে মাহরাম পুরুষের (৪৮৮) অথবা অন্য নারীর (যেমন নার্স) উপস্থিতি ব্যতিরেকে কোনো পুরুষ চিকিৎসক কোনো মহিলা রোগীর সঙ্গে নিভৃতে সাক্ষাৎ করতে পারবেন না, এটা তার জন্য কোনোভাবেই জায়েয নয়। এ কারণেই ইসলামি সভ্যতায় হাসপাতালগুলোর অভ্যন্তরে নারী ও পুরুষের আলাদা আলাদা বিভাগ ছিল।
ইসলামি চিকিৎসা-ব্যবস্থায় রোগীদের সাথে আরও একটি মানবিক দিককে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়েছে। শরিয়া আইন চিকিৎসাগ্রহণের ক্ষেত্রে রোগীদের অধিকারকে সুরক্ষা দিয়েছে। অর্থাৎ, পুরুষ চিকিৎসকের জন্য মহিলা রোগীর চিকিৎসা করার অনুমোদন রয়েছে এবং একইভাবে নারী চিকিৎসকের জন্যও পুরুষ রোগীর চিকিৎসা করার অনুমোদন রয়েছে। এই অনুমোদন তখনই কার্যকর হবে যখন সমলিঙ্গের অভিজ্ঞ চিকিৎসক না পাওয়া যাবে যিনি পূর্ণরূপে দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবেন। যাতে রোগীদের-পুরুষ হোক বা নারী-সঠিক চিকিৎসার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে না যায়। এমনকি শরিয়া এই অনুমতিও দিয়েছে যে, মুসলিম রোগী অমুসলিম চিকিৎসকের কাছেও চিকিৎসা নিতে পারবে, যখন তার যথার্থ চিকিৎসা করতে পারে এমন মুসলিম ডাক্তার পাওয়া দুষ্কর হবে। রোগীদের স্বাস্থ্য ও জীবন সুরক্ষার জন্যই শরিয়ার এই অনুমতি।
যে কথাটি বলে আমরা এই অধ্যায় শেষ করতে চাই তা এই যে, ইসলামি সভ্যতায় স্বাস্থ্য-সংস্থাগুলোর ভিত্তি ছিল নিখাদ ইসলামি সম্পর্ক ও মানবিক বন্ধন; ইতিহাসে যার কোনো নজির নেই। এই ব্যাপারটার সঙ্গে পাশ্চাত্যের এখনো পরিচয় ঘটেনি। ইসলামি স্বাস্থ্য-সংস্থাগুলো রোগীদেরকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, পথ্য ও খাদ্য দিত তো বটে, দরিদ্র রোগীদেরকে উট বা অন্যান্য পশু এবং নিজের খরচের অর্থও দিত। যাতে তারা পরিপূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠতে পারে এবং কর্মক্ষম হয়ে কাজ করে খেতে পারে এবং এভাবে দৈনন্দিন জীবন অতিবাহিত করতে পারে।
ইসলামি সভ্যতায় এই মানবিক প্রবণতা সর্বজনীনতা ও সর্বোচ্চ চূড়া স্পর্শ করেছিল।
টিকাঃ
৪৭২. এ মতটি শাফেয়ি, মালেকি ও হাম্বলি মাযহাবের। তবে আমাদের দেশের প্রচলিত ও সারাবিশ্বের সর্ববহুল চর্চিত হানাফি মাযহাবমতে চোখের ইশারায় নামাযের অনুমতি নেই। তাই মাথার ইশারায় নামায পড়তে সক্ষম হলে মাথার ইশারাতেই নামায পড়বে। অন্যথায় অক্ষম হলে চোখের ইশারায় নামায পড়বে না। বরং সক্ষমতা ফিরে পেলে ছুটে যাওয়া নামাযগুলো আদায় করে নেবে। রাসুলের হাদিস থেকেও এমনটিই বুঝে আসে। ইবনে উমর রা. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمْ أَنْ يَسْجُدَ فَلْيَسْجُدْ وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَلَا يَرْفَعُ إِلَى جَبْهَتِهِ شَيْئًا يَسْجُدُ عَلَيْهِ وَلْيَكُنْ رُكُوْعُهُ وَسُجُودُهُ يُؤْمِنُ بِرَأْسِهِ তোমাদের মধ্যে যে সেজদা করতে সক্ষম, সে যেন সেজদা করে। যে অক্ষম সে যেন সেজদা করার জন্য কপাল বরাবর কোনো বস্তু না ওঠায়, তবে সে রুকু-সেজদা আদায়ার্থে মাথা দিয়ে ইশারা করবে। দেখুন, আল-মুজামুল কাবির, হাদিস নং ১৩৩৫৮; নাসবুর রায়া, খ. ২, পৃ. ১৭৬ (দারুল কিবলা, জেদ্দা); হিদায়া, খ. ১, পৃ. ১৪১; আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যাতুল কুয়েতিয়্যা, খ. ২৭, পৃ. ২৬৪।-সম্পাদক
৪৭৩. ইমাম শাফিয়ি রহ.-এর মতে তাকে এ অবস্থায় নামাযও পড়তে হবে, পরবর্তী সময়ে অজু বা তায়াম্মুমে সক্ষম হলে কাযাও করতে হবে। ইমাম মালেক রহ.-এর মতে তাকে নামাযও পড়তে হবে না, কাযাও করতে হবে না। হাম্বলি মাযহাবে এ বিষয়ে একাধিক মত রয়েছে। তবে হানাফি মাযহাবের নির্ভরযোগ্য মত অনুযায়ী সে নামাযের নিয়ত ব্যতীত নামাযের সাদৃশ্য অবলম্বন করবে ও পরে অজু বা তায়াম্মুমে সক্ষম হলে কাযা পড়ে নেবে। কারণ পবিত্রতাবিহীন নামায গ্রহণযোগ্য নয়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস থেকেও এমনটি বুঝে আসে। ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, لا تقبل صَلَاءٌ بِغَيْرِ طَهُورٍ পবিত্রতাবিহীন নামায গ্রহণযোগ্য নয়। দেখুন, সুনানে তিরমিযি, হাদিস নং ১; মাআরেফুস সুনান, খ. ১, পৃ. ৩১-৩২; রদ্দুল মুহতার, খ. ১, পৃ. ২৫২-২৫৩।-সম্পাদক
৪৭৪. সুরা নূর: আয়াত ৬১।
৪৭৫. বুখারি, কিতাব: আল-জানায়িয, বাব: আল-আমরু বিত্তিবায়িল জানায়িয, হাদিস নং ১১৮৩; মুসলিম, কিতাব: আস-সালাম, বাব: এক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের অধিকার হলো সালামের জবাব দেওয়া, হাদিস নং ২১৬২।
৪৭৬. তিরমিযি, কিতাব: আল-বিররু ওয়াস-সিলাহ, বাব: যিয়ারাতুল ইখওয়ান, হাদিস নং ২০০৮, ইমাম তিরমিযি হাদিসটিকে হাসান গরিব বলেছেন। ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ১৪৪৩; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৮৫১৭; ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ২৯৬১।
৪৭৭. ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, খ. ১০, পৃ. ১২১-১২২; তুহফাতুল আহওয়াযি বি-শাবহ জামি আত-তিরমিযি, খ. ৬, পৃ. ২৬৩।
৪৭৮. তিরমিযি, কিতাব : আত-তিব্ব, তিনি বলেছেন, এটি গরিব হাদিস, হাদিস নং ২০৮৭। ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ১৪৩৮; ইবনে আবি শাইবা, হাদিস নং ১০৮৫১; বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, হাদিস নং ৯২১৩; আবু নুআইম, হিলয়াতুল আওলিয়া, খ. ২, পৃ. ২০৮।
৪৭৯. বুখারি, কিতাব : আল-মারদা, বাব : মা জাআ ফি সাওয়ারিল মারাদ, হাদিস নং ৫৩১৮; মুসলিম, কিতাব : আল-বিররু ওয়াস-সিলাহ ওয়াল-আদাব, বাব : সাওয়াবুল মুমিন ফি-মা ইয়ুসিবুহু মিন মারাদ আও হুযন, হাদিস নং ২৫৭৩।
৪৮০. বুখারি, কিতাব: আল-মারদা, বাব: ফাদলু মান যাহাবা বাসারুহু, হাদিস নং ৫৩২৯; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ১২৪৯০; আবু ইয়ালা, হাদিস নং ৩৭১১; তাবারানি, আল-আওসাত, হাদিস নং ২৫০; বায়হাকি, শুআবুল ঈমান, হাদিস নং ৯৯৫৮।
৪৮১. সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ৭০।
৪৮২. বুখারি, আনাস ইবনে মালিক থেকে বর্ণিত হাদিস, কিতাব: আল-মারদা, বাব: ইয়াদাতুল মুশরিক, হাদিস নং ৫৩৩৩।
৪৮৩. মুস্তাফা আস-সিবায়ি, মিন রাওয়ায়িয়ি হাদারাতিনা, পৃ. ১১০।
৪৮৪. আবদুল মুনয়িম সাঈদ, তা'লিমুত তিব্ব ইনদাল আরাব, আবহাসুন নাদওয়াতি ইলমিয়্যাহ লিল-জামইয়্যাতিস সুরিয়্যাহ লি-তারিখিল উলুম, পৃ. ২৭৯।
৪৮৫. ইবনুল কিফতি, তারিখুল হুকামা, পৃ. ১৪৮।
৪৮৬. মুস্তাফা আস-সিবায়ি, মিন রাওয়ায়িয়ি হাদারাতিনা, পৃ. ১১২।
৪৮৭. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১১৬।
৪৮৮. স্বামী অথবা বাবা, ভাই, ছেলে, ভাগনে, ভাতিজা... অর্থাৎ যাদের সঙ্গে বিয়ে হারাম।