📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 খলিফা ও শাসকগণও বিচারের আওতাধীন

📄 খলিফা ও শাসকগণও বিচারের আওতাধীন


কোনো সন্দেহ নেই, মানবসভ্যতার ইতিহাসে অনেক আগে থেকেই বিচারবিভাগের স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতার ইতিবৃত্ত পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, বরং ইসলামি সভ্যতার যুগে আরও উৎকৃষ্ট ও সমুজ্জ্বলরূপে তা প্রতিষ্ঠিত হয়। ইউরোপ ও সমগ্র বিশ্ব গত দু-শতাব্দী ধরে যে স্বাধীন বিচারবিভাগের সঙ্গে পরিচিত, ইসলাম তা প্রতিষ্ঠা করেছে আরও বারো শতাব্দী পূর্বেই।

একবার আমিরুল মুমিনিন আলি ইবনে আবু তালিব রা. একটি ঢাল নিয়ে একজন খ্রিষ্টান ব্যক্তির সঙ্গে বিরোধের জের ধরে বিচারকের শরণাপন্ন হন। বিখ্যাত লেখক ইবনে কাসির রহ. সেই ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে লেখেন, আলি ইবনে আবু তালিব রা. তার হারিয়ে যাওয়া একটি ঢাল একজন খ্রিষ্টান ব্যক্তির কাছে খুঁজে পান। এরপর ওই খ্রিষ্টান ব্যক্তিকে নিয়ে তৎকালীন বিচারক শুরাইহ রা.-এর কাছে গিয়ে বিচার দাবি করে বলেন, এই ঢালটি আমার। ঢালটি তার কাছে পাওয়া গেছে। তার কাছে এটি আমি বিক্রিও করিনি আর তাকে দানও করিনি। তা শুনে শুরাইহ রা. ওই খ্রিষ্টান ব্যক্তিকে বললেন, আমিরুল মুমিনিন যা বলছেন সে ব্যাপারে তোমার কী মত? উত্তরে খ্রিষ্টান বলল, ঢালটি আমারই। আর আমিরুল মুমিনিনকে মিথ্যুক বলার সাহস আমার নেই। এরপর শুরাইহ রা. আলি ইবনে আবু তালিব রা.-এর দিকে তাকিয়ে বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন, আপনার কাছে কোনো প্রমাণ আছে? এ কথা শুনে আলি রা. হেসে ওঠেন এবং বলেন, শুরাইহ ঠিক ধরেছে, আমার কাছে তো কোনো প্রমাণ নেই। এরপর শুরাইহ রা. খ্রিষ্টান ব্যক্তির পক্ষে রায় দিয়ে দেন।

ইবনে কাসির রহ. লেখেন, এরপর ঢালটি নিয়ে খ্রিষ্টান লোকটি হেঁটে কিছুদূর চলে গিয়ে আবার ফিরে আসে এবং বলে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আজ যে নিরপেক্ষ বিচার-মীমাংসা করা হলো নিঃসন্দেহে এটি নবী-রাসুলদের বিচারব্যবস্থা। কী আশ্চর্য, একজন বিচারক স্বয়ং আমিরুল মুমিনিনের বিপক্ষে আমার জন্য রায় দিলেন। নিশ্চয় আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসুল। আল্লাহর শপথ! এই ঢালটি আপনারই হে আমিরুল মুমিনিন।(৪০১)

খ্রিষ্টান লোকটি বিচারবিভাগের এই স্বাতন্ত্র্য ও ক্ষমতা দেখে, এই ন্যায্য বিচার পেয়ে এবং বিচারক শুরাইহ রা. ও আমিরুল মুমিনিন আলি ইবনে আবু তালিব রা.-এর অবস্থান দেখে সে অভিভূত হয়ে যায়। তার আর বুঝতে বাকি থাকে না যে, এই সভ্যতা বড় সুন্দর ও অতিশয় মহান। তার বিচারব্যবস্থা অত্যন্ত ন্যায়সংগত। তাই তো দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গেই সে চিরদিনের জন্য এই সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্মের ও চিরন্তন সভ্যতায় আশ্রয় নেওয়ার ঘোষণা পাঠ করে।

আব্বাসি শাসনামলে বিচারবিভাগ ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও স্বাধীন। যার ফলে আমরা দেখি, অনেক বিচারক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী খলিফা বা সরকারি উচ্চপদস্থ লোকদের বিরুদ্ধে শক্ত ও কঠিন অবস্থান নিতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না। সুষ্ঠু ও ন্যায্য বিচার প্রতিষ্ঠায় তারা কারও হুমকি-ধমকির ও নিন্দাবাক্যের তোয়াক্কা করতেন না। একবার বিখ্যাত প্রতাপশালী আব্বাসি শাসক আবু জাফর মনসুর বসরার বিচারক সাওয়ার ইবনে আবদুল্লাহর কাছে পত্র লেখেন, অমুক জমি নিয়ে একজন সেনাপতি এবং একজন ব্যবসায়ীর মাঝে বিরোধ চলছে, সেই জমিটি আপনি সেনাপতির কাছে হস্তান্তর করুন। উত্তরে সাওয়ার লেখেন, উপযুক্ত প্রমাণ সাপেক্ষে আমার কাছে পরিষ্কার হয়েছে যে, জমিটি ওই ব্যবসায়ীর। তাই কোনো প্রমাণ ছাড়া তার কাছ থেকে আমি জমি নিয়ে সেনাপতিকে দিতে পারব না। প্রত্যুত্তরে বাদশা মনসুর লেখেন, ওই আল্লাহর শপথ! যিনি ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই, অবশ্যই আপনি ওই জমিটি সেনাপতির কাছে হস্তান্তর করবেন। এর উত্তরে সাওয়ার লেখেন, ওই আল্লাহর শপথ! যিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই, উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া জমিটি ব্যবসায়ীর হাতছাড়া করব না। এই পত্রটি পড়ে মনসুর বলেন, আল্লাহর শপথ, এই ভূখণ্ডকে আমি ন্যায়বিচার দিয়ে পরিপূর্ণ করেছি। আমার বিচারকগণ সত্য ও ন্যায়ের দিকে আমাকে ফিরিয়ে এনেছে। (৪০২)

বিচার, সাক্ষ্য ও দাবিদাওয়া প্রমাণের জন্য বিচারকগণ খলিফা ও শাসকদেরকে আদালতে হাজির করতেন। আর খলিফা ও বাদশাগণও স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা মেনে নিতেন। বিচারকের রায় মাথা পেতে মেনে নিতেন। এর ব্যতিক্রম ঘটনাও আছে। তবে সেগুলো নিতান্তই কম। বিচারবিভাগের রায় মানলে বা আদালতে উপস্থিত হতে অস্বীকার করলে খলিফাদেরকে সিংহাসন থেকে পদচ্যুত করার বা তাদের বিষয়টি জনগণের ওপর ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দিতেন বিচারকগণ। তবে সর্বাবস্থায় বিচারকদের রায়কে সম্মান করা হতো। পুরোপুরিভাবে তা কার্যকর করা হতো। জনগণ ও খলিফার মাঝে সংঘটিত যে মামলাগুলোর কথা ইতিহাসে পাওয়া যায়, তার মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলো বোদশা আবু জাফর মনসুরের শাসনামলে বাগদাদের বিচারপতি মুহাম্মাদ ইবনে ইমরান আত-তালহির কাছে দায়ের করা কুলিদের মামলা। ঘটনার সারমর্ম হলো, একবার খলিফা আবু জাফর মনসুর কুলিদেরকে শামে পাঠিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা করলেন। প্রচণ্ডরকম কষ্ট ও দুর্ভোগে পড়তে হবে বিধায় খলিফার এই ইচ্ছা কুলিদের মনঃপূত হয়নি। ফলে বিষয়টি তারা কাযি মুহাম্মাদ ইবনে ইমরানের কাছে উত্থাপন করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি খলিফা মনসুরকে আদালতে ডাকেন। লেখককে বলে দেন, কাঠগড়ায় ডাকার সময় খলিফা না বলে শুধু নাম দিয়ে তাকে সম্বোধন করতে। এরপর খলিফা মনসুর বিচারের মজলিসে উপস্থিত হলে খলিফার সম্মানে আসন ছেড়ে না দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের মতো আচরণ করেন। পরিশেষে তিনি কুলিদের পক্ষে রায় দেন। বিচারপ্রক্রিয়া সমাপ্ত হওয়ার পর তিনি উঠে গিয়ে মনসুরকে খলিফা ও আমিরুল মুমিনিন হিসেবে সালাম দেন। তার এই ন্যায়বিচার দেখে মনসুর খুশি হয়ে যান। সুষ্ঠু এই বিচারিক কর্মকাণ্ডের জন্য তার প্রশংসা জ্ঞাপন করেন। সাধুবাদ জানান এবং তাকে দশ হাজার দিনার পুরস্কার প্রদানের নির্দেশ দেন (৪০০)

বিচারকদের এই বলিষ্ঠ অবস্থানের কারণে খলিফাগণও তাদের অত্যন্ত সম্মান করতেন। বিচারবিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করতেন না। এমনকি বিচারকদের সামনে বিনয়ের সাথে সোজা দণ্ডায়মান হওয়ার যে সাধারণ নিয়ম, তা পালনেও তারা সামান্য ত্রুটি করতেন না। বর্ণিত আছে, খলিফা আল-মাহদি (ইনতেকাল ১৬৯ হি.) একবার কোনো এক মামলায় বিবাদীপক্ষকে সাথে নিয়ে বসরায় বিচারক আবদুল্লাহ ইবনে হাসান আল-আনবারির কাছে আসেন। বিচারক খলিফাকে আসতে দেখেও মাথা নিচু করে স্বাভাবিকভাবে নিজ আসনে নীরবে বসে থাকেন। এরপর খলিফা বিচারপ্রার্থীদের আসনে বিবাদী পক্ষের সাথে তিনি সাধারণ ব্যক্তিদের মতো বসে পড়েন। বিচারপ্রক্রিয়া শেষে কাযি আবদুল্লাহ উঠে গিয়ে খলিফাকে অভিবাদন দেওয়ার সময় খলিফা আল-মাহদি বলেন, আল্লাহর শপথ! আদালতে প্রবেশের সময় আমাকে দেখে যদি আপনি দাঁড়িয়ে যেতেন, তাহলে অবশ্যই আমি আপনাকে পদচ্যুত করতাম। আর বিচার শেষে যদি আপনি আসন ত্যাগ না করতেন, তাহলেও আমি আপনাকে পদচ্যুত করতাম। (৪০৪)

আব্বাসি শাসনামলে বিচারবিভাগের প্রভাব ও ক্ষমতা ছিল অপরিসীম। বিচারব্যবস্থা ছিল সকল স্বার্থসিদ্ধির ঊর্ধ্বে। বিচারবিভাগের কাছে সকল মানুষ ছিল সমান। বাগদাদের বিচারপতি আবু হামিদ আল-ইসফারায়িনি (মৃ. ৪০৬ হি.) একবার আব্বাসি খলিফার কাছে পত্র লেখেন। শরিয়া বিচার ব্যবস্থা কার্যকর করা না হলে এবং বিচারবিভাগের ওপর আস্থা প্রদর্শন না করলে তাকে খলিফার পদ থেকে বিচ্যুত করার হুমকি দেন। শুধু তাই নয়, পত্রে তিনি অনমনীয় ও শক্ত ভাষা প্রয়োগ করে লেখেন,
জেনে রাখবেন, মহান আল্লাহ আমাকে যে বিচারক বানিয়েছেন সেই পদ থেকে বিতাড়িত করার ক্ষমতা আপনার নেই। আর আমি ইচ্ছা করলে খোরাসানের উদ্দেশে দু-কথার ছোট পত্র লিখে আপনাকে খিলাফতের পদ থেকে বিচ্যুত করার ক্ষমতা রাখি। (৪০৫)

বক্তব্য শুনতে বা সাক্ষ্য প্রদান করতে আমির ও খলিফাদের বিচারালয়ে ডাকা হতো। এটিকে খলিফাগণও বিন্দুমাত্র অসম্মানজনক বা কলঙ্ক মনে করতেন না। যেমন আব্বাস ইবনে ফিরনাস (৪৩৬) ছিলেন আন্দালুসের বিখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানী। তার হাত ধরে বহু আবিষ্কার সাধন হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, ইতিহাসে তিনিই প্রথম আকাশে উড্ডয়নের প্রয়াস পেয়েছেন। তার এ যোগ্যতা ও বুদ্ধিবৃত্তি তাকে শাসক শ্রেণির সান্নিধ্যে নিয়ে যায়।

এই তাত্ত্বিক ব্যুৎপত্তি, ব্যাপক সুখ্যাতি ও খলিফাদের নিকট সম্মানিত হওয়ার কারণে হিংসুক ও নিন্দুক শ্রেণি তৈরি হয়। জাদু ও ভেলকি চর্চা করে এবং উদ্ভট ও আজব বিষয় নিয়ে সারাদিন ঘরে ও গবেষণার ল্যাবে পড়ে থাকে এ ধরনের অপবাদ আরোপ করতে থাকে তার বিরুদ্ধে। কারণ তিনি ক্যামিস্ট্রি নিয়ে গবেষণা করতেন। ফলে সবসময় তার বাড়ি থেকে এক প্রকার ধোঁয়া উঠতে দেখা যেত।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিচারের জন্য তাকে কর্ডোভার আদালতে ডাকা হয়। তখন খলিফা ছিলেন আবদুর রহমান ইবনে হাকাম ইবনে হিশাম উমাবি। তাকে বলা হয়, আপনি অনেক উদ্ভট বিষয় নিয়ে পড়ে থাকেন। এক বস্তুর সঙ্গে অপর বস্তু সংমিশ্রণ করে অদ্ভুত ও আজগুবি বিষয় আবিষ্কার করেন। এরকম তো আমরা আগে কখনো দেখিনি। এর উত্তরে তিনি বলেন, ধরুন আমি যদি পানির সঙ্গে আটা মিলিয়ে খামিরা তৈরি করি। এরপর আগুনের সাহায্যে ওই খামিরা থেকে রুটি বানাই, তাহলে কি সেটি জাদু হবে? সবাই বলল, না। বরং এই প্রক্রিয়া মহান আল্লাহই মানুষকে শিখিয়েছেন। এরপর তিনি বলেন, বাড়িতে আমি ঠিক এই কাজটিই করে থাকি। এক বস্তুর সঙ্গে অপর বস্তু সংমিশ্রণ করে আগুনের সাহায্যে এরকম অনেক বিষয় আবিষ্কার করি, যা মুসলিমদের উপকারে আসবে। তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে কাজে লাগবে। (৪০৭)

তার এই দাবির যথার্থতা সম্পর্কে আদালত সাক্ষী তলব করলে খলিফা আবদুর রহমান ইবনে হাকাম ইবনে হিশাম নিজেই আদালতে উপস্থিত হয়ে তার পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করেন, তিনি এরকম এরকম কাজ করেন (অর্থাৎ যা-কিছুই করেন, সেজন্য তিনি সুনির্দিষ্ট মূলনীতি অনুসরণ করেন)। আমাকে যা জানিয়েছেন, তিনি তাই করেছেন। আমি মনে করি তার কাজগুলো মুসলিমদের উপকারে আসবে। জাদুবিদ্যার সঙ্গে জড়িত কিছু করতে দেখলে সবার আগে আমিই তার ওপর দণ্ড প্রয়োগ করতাম।

রাষ্ট্রের কর্ণধার ও মুসলিম শাসক নিজেই আদালতে হাজির হয়ে ন্যায়ের সাক্ষ্য দিয়েছেন এই বিজ্ঞানীর পক্ষে। আর বিচারকও ইবনে ফিরনাসের পক্ষে রায় দিয়েছেন। সমকালীন ফকিহগণও তার প্রশংসা করে তার কর্মের স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। আরও বেশি করে উপকারী বিষয় আবিষ্কার করে যেন মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করতে পারেন, সে বিষয়ে তাকে নিয়মিত উৎসাহ প্রদান করছেন। এভাবেই সর্বমহলে তার মর্যাদা সুরক্ষিত হয়।

খলিফা, আমির, শাসকশ্রেণির উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের কেউ ভুল ও অন্যায় কিছু করলে বিচারকগণ তাদের আদালতে হাজির হতে বাধ্য করতেন। কুযাতু কুরতুবা গ্রন্থে আল-খুশানি লেখেন, একবার বিচারক আমর ইবনে আবদুল্লাহর কাছে কর্ডোভার একজন সাধারণ দুর্বল নাগরিক এসে আমির মুহাম্মাদের একজন প্রভাবশালী আমলার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। সরকারি স্তরে ওই আমলার বিরাট প্রভাব ও দাপট ছিল। নগরপতি হওয়ার মনোনয়ন পেয়েছিল। পরে এক সময় সে গভর্নর হয়ে যায়। ওই দুর্বল লোকটি আদালতে এসে মামলা দায়ের করে যে, বিচারক মহোদয়, অমুক ব্যক্তি আমার বাড়ি জবরদখল করেছে। বিচারক বললেন, আপনি জমির কাগজ নিয়ে তার কাছে যান। তা শুনে দুর্বল লোকটি বলল, আমার মতো দুর্বল ও সাধারণ নাগরিক তার কাছে যাবে জমির দলিল দেখাতে?! নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আমি শঙ্কিত। বিচারক বললেন, আমি যেভাবে বলেছি সেভাবে জমির কাগজ নিয়ে তার কাছে যান। দেখুন কী হয়। এরপর লোকটি বিচারকের নির্দেশমতো দলিলপত্র নিয়ে তার কাছে যায়। কিছুক্ষণ পর লোকটি ফিরে এসে বলল, বিচারক মহোদয়, আমি তার কাছে গিয়েছিলাম। দূর থেকে তাকে জমির কাগজ দেখিয়ে পালিয়ে এসেছি। বিচারক আমর বললেন, বসুন। সে আসবে এখানে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই আমলা সদলবলে এসে উপস্থিত হলো। তার সামনে ছিল অনেক অশ্বারোহী ও পদাতিক নিরাপত্তারক্ষী। এরপর তিনি পা ভাঁজ করে অশ্ব থেকে অবতরণ করলেন। এরপর মসজিদে প্রবেশ করে বিচারক ও মজলিসে বসা সকলকে সালাম দিলেন। এরপর যথারীতি দাম্ভিকতা প্রদর্শন করতে মসজিদের দেয়ালে টেক্কা দিয়ে দাঁড়ালেন।

বিচারক আমর ইবনে আবদুল্লাহ বললেন, আপনি ওখানে যান। বাদীর মুখোমুখি হয়ে ওই জায়গায় বসুন। উত্তরে ওই আমলা বললেন, বিচারককে আল্লাহ সংশোধন করুন। এটি মসজিদ। মসজিদে তো কোনো কাঠগড়া নেই। এখানে সব জায়গাই সমান। আমর বলেন, আমি যেভাবে বলেছি সেভাবে বাদীর সামনে গিয়ে বসুন। বিচারককে তার বক্তব্যে অনড় দেখে তিনি দুর্বল লোকটির সামনে বসতে বাধ্য হলেন।

এরপর বিচারক দুর্বল লোকটিকেও বললেন আমলার মুখোমুখি হয়ে বসতে। এরপর তিনি দুর্বল লোকটিকে বলেন, এবার আপনি আপনার বক্তব্য উপস্থাপন করুন। তিনি বললেন, আমার বক্তব্য হলো এই লোকটি আমার ঘর জবরদখল করেছেন। এরপর আমলার উদ্দেশে বললেন, এখন আপনি আপনার বক্তব্য তুলে ধরুন। তিনি বললেন, আমার বক্তব্য হলো, আমার মতো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে জবরদखলের অভিযোগ মানহানির শামিল। তার এ কথা শুনে বিচারক বললেন, এ ধরনের বক্তব্য কোনো পুণ্যবান ব্যক্তির মুখেই মানায়, আপনার মতো মানুষের জমি জবরদখলে বিখ্যাত ব্যক্তিদের মুখে নয়। এরপর বিচারক আদালতে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কয়েকজনকে বললেন, আপনারা তার সাথে যান। তার ব্যাপারে খেয়াল রাখুন, যদি লোকটিকে তার ঘর বুঝিয়ে দেয় তাহলে তো সমাধান হলো। তা না হলে তাকে গ্রেফতার করে আমার কাছে নিয়ে আসবেন। আমি নিজে আমিরের কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করব। তার সকল অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতির কথা বাদশাকে খুলে বলব। এরপর ওই আমলা পুলিশদের সাথে বের হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর পুলিশ ও দুর্বল ব্যক্তিটি ফিরে এলো। দুর্বল লোকটি বিচারককে বলল, আজ আপনি যে বিচার করলেন তার জন্য আপনাকে মহান আল্লাহ উত্তম বিনিময় দান করুন। ওই আমলা আমার বাড়ি ফিরিয়ে দিয়েছে। বিচারক বললেন, এবার নিরাপদে বাড়ি ফিরে যান। (৪৩৮)

এ ধরনের ন্যায্য বিচারের দ্বারা কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়:
এক. অভিযোগ দায়ের করা ব্যক্তিকে আদালতে ডাকা হতো বিভিন্ন নিয়মে এবং বিচারকাজ সম্পাদন করা হতো নানা পদ্ধতিতে।
দুই. ইসলামি সভ্যতায় বিচারবিভাগ ছিল স্বাধীন। তার প্রভাব ও ক্ষমতা ছিল অপরিসীম।
তিন. বিচারকের সামনে সবাই ছিল সমান। কে দুর্বল, কে সবল, কে প্রভাবশালী, কে আমলা, কে ধনী, কে গরিব এর কোনো তারতম্য ছিল না।
চার. রায় প্রদান ও সিদ্ধান্ত কার্যকর হতো খুব দ্রুত।

দুর্বল ওই লোকটির বাড়ি যেদিন জবরদখল করা হয়, ঠিক সেদিনই সে মামলা করে। আর সেদিনই ন্যায্য বিচার পেয়ে সে তার বাড়ি ফিরে পায়।

ইসলামি সভ্যতায় বিচারালয়ের এই অনিন্দ্যসুন্দর বৈশিষ্ট্য ও ন্যায্য বিচারের মাধ্যমে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, সুমহান এই বিচারব্যবস্থার ছত্রছায়ায় মুসলিম সমাজে ন্যায়, নিষ্ঠা ও ইনসাফের জয়জয়কার ছিল। এই স্বাধীন বিচারবিভাগের অধীনে মুসলিমগণ যে ন্যায়নিষ্ঠা ও সুবিচারের পরিবেশে বসবাস করতেন, ইসলামি সভ্যতার অগ্রযাত্রায় তা মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।

টিকাঃ
৪০১. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ৮, পৃ. ৫।
৪০২. সুয়ুতি, তারিখুল খুলাফা, পৃ. ২২৯।
৪০০. প্রাগুক্ত, পৃ. ২২৯।
৪০৪. মাওয়ারদি, আদাবুল কাযি, খ. ১, পৃ. ২৪৮।
৪০৫. সুবকি, তাবাকাতুশ শাফিয়্যাতিল কুবরা, খ. ৪, পৃ. ৬৪।
৪০৬. আবুল কাসেম আব্বাস ইবনে ফিরনাস : বনু উমাইয়ার শাসনামলের অনারব মুসলিম কবি, দার্শনিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন। প্রথম পাথর থেকে কাচ আবিষ্কার করেন ও আকাশে উড্ডয়নের চেষ্টা করেন। এজন্য পালক পরে ও দুটি ডানা যুক্ত করে দীর্ঘ দূরত্ব পর্যন্ত ওড়েন। এরপর পড়ে গিয়ে পিঠে আঘাত পান। মৃত্যু ২৭৪ হি.। সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ১৬, পৃ. ৩৮০-৩৮১; মাক্কারি, নাফহুত তিব, খ. ৩, পৃ. ৩৭৪।
৪০৭. ইবনে সাইদ আল-মাগরিবি, আল-মুগরিব ফি হুলাল মাগরিব, পৃ. ২০৩।
৪৩৮. খুশানি, কুযাতু কুরতুবা, পৃ. ১৫০-১৫১।

কোনো সন্দেহ নেই, মানবসভ্যতার ইতিহাসে অনেক আগে থেকেই বিচারবিভাগের স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতার ইতিবৃত্ত পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, বরং ইসলামি সভ্যতার যুগে আরও উৎকৃষ্ট ও সমুজ্জ্বলরূপে তা প্রতিষ্ঠিত হয়। ইউরোপ ও সমগ্র বিশ্ব গত দু-শতাব্দী ধরে যে স্বাধীন বিচারবিভাগের সঙ্গে পরিচিত, ইসলাম তা প্রতিষ্ঠা করেছে আরও বারো শতাব্দী পূর্বেই।

একবার আমিরুল মুমিনিন আলি ইবনে আবু তালিব রা. একটি ঢাল নিয়ে একজন খ্রিষ্টান ব্যক্তির সঙ্গে বিরোধের জের ধরে বিচারকের শরণাপন্ন হন। বিখ্যাত লেখক ইবনে কাসির রহ. সেই ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে লেখেন, আলি ইবনে আবু তালিব রা. তার হারিয়ে যাওয়া একটি ঢাল একজন খ্রিষ্টান ব্যক্তির কাছে খুঁজে পান। এরপর ওই খ্রিষ্টান ব্যক্তিকে নিয়ে তৎকালীন বিচারক শুরাইহ রা.-এর কাছে গিয়ে বিচার দাবি করে বলেন, এই ঢালটি আমার। ঢালটি তার কাছে পাওয়া গেছে। তার কাছে এটি আমি বিক্রিও করিনি আর তাকে দানও করিনি। তা শুনে শুরাইহ রা. ওই খ্রিষ্টান ব্যক্তিকে বললেন, আমিরুল মুমিনিন যা বলছেন সে ব্যাপারে তোমার কী মত? উত্তরে খ্রিষ্টান বলল, ঢালটি আমারই। আর আমিরুল মুমিনিনকে মিথ্যুক বলার সাহস আমার নেই। এরপর শুরাইহ রা. আলি ইবনে আবু তালিব রা.-এর দিকে তাকিয়ে বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন, আপনার কাছে কোনো প্রমাণ আছে? এ কথা শুনে আলি রা. হেসে ওঠেন এবং বলেন, শুরাইহ ঠিক ধরেছে, আমার কাছে তো কোনো প্রমাণ নেই। এরপর শুরাইহ রা. খ্রিষ্টান ব্যক্তির পক্ষে রায় দিয়ে দেন।

ইবনে কাসির রহ. লেখেন, এরপর ঢালটি নিয়ে খ্রিষ্টান লোকটি হেঁটে কিছুদূর চলে গিয়ে আবার ফিরে আসে এবং বলে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আজ যে নিরপেক্ষ বিচার-মীমাংসা করা হলো নিঃসন্দেহে এটি নবী-রাসুলদের বিচারব্যবস্থা। কী আশ্চর্য, একজন বিচারক স্বয়ং আমিরুল মুমিনিনের বিপক্ষে আমার জন্য রায় দিলেন। নিশ্চয় আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসুল। আল্লাহর শপথ! এই ঢালটি আপনারই হে আমিরুল মুমিনিন।(৪০১)

খ্রিষ্টান লোকটি বিচারবিভাগের এই স্বাতন্ত্র্য ও ক্ষমতা দেখে, এই ন্যায্য বিচার পেয়ে এবং বিচারক শুরাইহ রা. ও আমিরুল মুমিনিন আলি ইবনে আবু তালিব রা.-এর অবস্থান দেখে সে অভিভূত হয়ে যায়। তার আর বুঝতে বাকি থাকে না যে, এই সভ্যতা বড় সুন্দর ও অতিশয় মহান। তার বিচারব্যবস্থা অত্যন্ত ন্যায়সংগত। তাই তো দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গেই সে চিরদিনের জন্য এই সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্মের ও চিরন্তন সভ্যতায় আশ্রয় নেওয়ার ঘোষণা পাঠ করে।

আব্বাসি শাসনামলে বিচারবিভাগ ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও স্বাধীন। যার ফলে আমরা দেখি, অনেক বিচারক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী খলিফা বা সরকারি উচ্চপদস্থ লোকদের বিরুদ্ধে শক্ত ও কঠিন অবস্থান নিতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না। সুষ্ঠু ও ন্যায্য বিচার প্রতিষ্ঠায় তারা কারও হুমকি-ধমকির ও নিন্দাবাক্যের তোয়াক্কা করতেন না। একবার বিখ্যাত প্রতাপশালী আব্বাসি শাসক আবু জাফর মনসুর বসরার বিচারক সাওয়ার ইবনে আবদুল্লাহর কাছে পত্র লেখেন, অমুক জমি নিয়ে একজন সেনাপতি এবং একজন ব্যবসায়ীর মাঝে বিরোধ চলছে, সেই জমিটি আপনি সেনাপতির কাছে হস্তান্তর করুন। উত্তরে সাওয়ার লেখেন, উপযুক্ত প্রমাণ সাপেক্ষে আমার কাছে পরিষ্কার হয়েছে যে, জমিটি ওই ব্যবসায়ীর। তাই কোনো প্রমাণ ছাড়া তার কাছ থেকে আমি জমি নিয়ে সেনাপতিকে দিতে পারব না। প্রত্যুত্তরে বাদশা মনসুর লেখেন, ওই আল্লাহর শপথ! যিনি ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই, অবশ্যই আপনি ওই জমিটি সেনাপতির কাছে হস্তান্তর করবেন। এর উত্তরে সাওয়ার লেখেন, ওই আল্লাহর শপথ! যিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই, উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া জমিটি ব্যবসায়ীর হাতছাড়া করব না। এই পত্রটি পড়ে মনসুর বলেন, আল্লাহর শপথ, এই ভূখণ্ডকে আমি ন্যায়বিচার দিয়ে পরিপূর্ণ করেছি। আমার বিচারকগণ সত্য ও ন্যায়ের দিকে আমাকে ফিরিয়ে এনেছে। (৪০২)

বিচার, সাক্ষ্য ও দাবিদাওয়া প্রমাণের জন্য বিচারকগণ খলিফা ও শাসকদেরকে আদালতে হাজির করতেন। আর খলিফা ও বাদশাগণও স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা মেনে নিতেন। বিচারকের রায় মাথা পেতে মেনে নিতেন। এর ব্যতিক্রম ঘটনাও আছে। তবে সেগুলো নিতান্তই কম। বিচারবিভাগের রায় মানলে বা আদালতে উপস্থিত হতে অস্বীকার করলে খলিফাদেরকে সিংহাসন থেকে পদচ্যুত করার বা তাদের বিষয়টি জনগণের ওপর ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দিতেন বিচারকগণ। তবে সর্বাবস্থায় বিচারকদের রায়কে সম্মান করা হতো। পুরোপুরিভাবে তা কার্যকর করা হতো। জনগণ ও খলিফার মাঝে সংঘটিত যে মামলাগুলোর কথা ইতিহাসে পাওয়া যায়, তার মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলো বোদশা আবু জাফর মনসুরের শাসনামলে বাগদাদের বিচারপতি মুহাম্মাদ ইবনে ইমরান আত-তালহির কাছে দায়ের করা কুলিদের মামলা। ঘটনার সারমর্ম হলো, একবার খলিফা আবু জাফর মনসুর কুলিদেরকে শামে পাঠিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা করলেন। প্রচণ্ডরকম কষ্ট ও দুর্ভোগে পড়তে হবে বিধায় খলিফার এই ইচ্ছা কুলিদের মনঃপূত হয়নি। ফলে বিষয়টি তারা কাযি মুহাম্মাদ ইবনে ইমরানের কাছে উত্থাপন করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি খলিফা মনসুরকে আদালতে ডাকেন। লেখককে বলে দেন, কাঠগড়ায় ডাকার সময় খলিফা না বলে শুধু নাম দিয়ে তাকে সম্বোধন করতে। এরপর খলিফা মনসুর বিচারের মজলিসে উপস্থিত হলে খলিফার সম্মানে আসন ছেড়ে না দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের মতো আচরণ করেন। পরিশেষে তিনি কুলিদের পক্ষে রায় দেন। বিচারপ্রক্রিয়া সমাপ্ত হওয়ার পর তিনি উঠে গিয়ে মনসুরকে খলিফা ও আমিরুল মুমিনিন হিসেবে সালাম দেন। তার এই ন্যায়বিচার দেখে মনসুর খুশি হয়ে যান। সুষ্ঠু এই বিচারিক কর্মকাণ্ডের জন্য তার প্রশংসা জ্ঞাপন করেন। সাধুবাদ জানান এবং তাকে দশ হাজার দিনার পুরস্কার প্রদানের নির্দেশ দেন (৪০০)

বিচারকদের এই বলিষ্ঠ অবস্থানের কারণে খলিফাগণও তাদের অত্যন্ত সম্মান করতেন। বিচারবিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করতেন না। এমনকি বিচারকদের সামনে বিনয়ের সাথে সোজা দণ্ডায়মান হওয়ার যে সাধারণ নিয়ম, তা পালনেও তারা সামান্য ত্রুটি করতেন না। বর্ণিত আছে, খলিফা আল-মাহদি (ইনতেকাল ১৬৯ হি.) একবার কোনো এক মামলায় বিবাদীপক্ষকে সাথে নিয়ে বসরায় বিচারক আবদুল্লাহ ইবনে হাসান আল-আনবারির কাছে আসেন। বিচারক খলিফাকে আসতে দেখেও মাথা নিচু করে স্বাভাবিকভাবে নিজ আসনে নীরবে বসে থাকেন। এরপর খলিফা বিচারপ্রার্থীদের আসনে বিবাদী পক্ষের সাথে তিনি সাধারণ ব্যক্তিদের মতো বসে পড়েন। বিচারপ্রক্রিয়া শেষে কাযি আবদুল্লাহ উঠে গিয়ে খলিফাকে অভিবাদন দেওয়ার সময় খলিফা আল-মাহদি বলেন, আল্লাহর শপথ! আদালতে প্রবেশের সময় আমাকে দেখে যদি আপনি দাঁড়িয়ে যেতেন, তাহলে অবশ্যই আমি আপনাকে পদচ্যুত করতাম। আর বিচার শেষে যদি আপনি আসন ত্যাগ না করতেন, তাহলেও আমি আপনাকে পদচ্যুত করতাম। (৪০৪)

আব্বাসি শাসনামলে বিচারবিভাগের প্রভাব ও ক্ষমতা ছিল অপরিসীম। বিচারব্যবস্থা ছিল সকল স্বার্থসিদ্ধির ঊর্ধ্বে। বিচারবিভাগের কাছে সকল মানুষ ছিল সমান। বাগদাদের বিচারপতি আবু হামিদ আল-ইসফারায়িনি (মৃ. ৪০৬ হি.) একবার আব্বাসি খলিফার কাছে পত্র লেখেন। শরিয়া বিচার ব্যবস্থা কার্যকর করা না হলে এবং বিচারবিভাগের ওপর আস্থা প্রদর্শন না করলে তাকে খলিফার পদ থেকে বিচ্যুত করার হুমকি দেন। শুধু তাই নয়, পত্রে তিনি অনমনীয় ও শক্ত ভাষা প্রয়োগ করে লেখেন,
জেনে রাখবেন, মহান আল্লাহ আমাকে যে বিচারক বানিয়েছেন সেই পদ থেকে বিতাড়িত করার ক্ষমতা আপনার নেই। আর আমি ইচ্ছা করলে খোরাসানের উদ্দেশে দু-কথার ছোট পত্র লিখে আপনাকে খিলাফতের পদ থেকে বিচ্যুত করার ক্ষমতা রাখি। (৪০৫)

বক্তব্য শুনতে বা সাক্ষ্য প্রদান করতে আমির ও খলিফাদের বিচারালয়ে ডাকা হতো। এটিকে খলিফাগণও বিন্দুমাত্র অসম্মানজনক বা কলঙ্ক মনে করতেন না। যেমন আব্বাস ইবনে ফিরনাস (৪৩৬) ছিলেন আন্দালুসের বিখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানী। তার হাত ধরে বহু আবিষ্কার সাধন হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, ইতিহাসে তিনিই প্রথম আকাশে উড্ডয়নের প্রয়াস পেয়েছেন। তার এ যোগ্যতা ও বুদ্ধিবৃত্তি তাকে শাসক শ্রেণির সান্নিধ্যে নিয়ে যায়।

এই তাত্ত্বিক ব্যুৎপত্তি, ব্যাপক সুখ্যাতি ও খলিফাদের নিকট সম্মানিত হওয়ার কারণে হিংসুক ও নিন্দুক শ্রেণি তৈরি হয়। জাদু ও ভেলকি চর্চা করে এবং উদ্ভট ও আজব বিষয় নিয়ে সারাদিন ঘরে ও গবেষণার ল্যাবে পড়ে থাকে এ ধরনের অপবাদ আরোপ করতে থাকে তার বিরুদ্ধে। কারণ তিনি ক্যামিস্ট্রি নিয়ে গবেষণা করতেন। ফলে সবসময় তার বাড়ি থেকে এক প্রকার ধোঁয়া উঠতে দেখা যেত।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিচারের জন্য তাকে কর্ডোভার আদালতে ডাকা হয়। তখন খলিফা ছিলেন আবদুর রহমান ইবনে হাকাম ইবনে হিশাম উমাবি। তাকে বলা হয়, আপনি অনেক উদ্ভট বিষয় নিয়ে পড়ে থাকেন। এক বস্তুর সঙ্গে অপর বস্তু সংমিশ্রণ করে অদ্ভুত ও আজগুবি বিষয় আবিষ্কার করেন। এরকম তো আমরা আগে কখনো দেখিনি। এর উত্তরে তিনি বলেন, ধরুন আমি যদি পানির সঙ্গে আটা মিলিয়ে খামিরা তৈরি করি। এরপর আগুনের সাহায্যে ওই খামিরা থেকে রুটি বানাই, তাহলে কি সেটি জাদু হবে? সবাই বলল, না। বরং এই প্রক্রিয়া মহান আল্লাহই মানুষকে শিখিয়েছেন। এরপর তিনি বলেন, বাড়িতে আমি ঠিক এই কাজটিই করে থাকি। এক বস্তুর সঙ্গে অপর বস্তু সংমিশ্রণ করে আগুনের সাহায্যে এরকম অনেক বিষয় আবিষ্কার করি, যা মুসলিমদের উপকারে আসবে। তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে কাজে লাগবে। (৪০৭)

তার এই দাবির যথার্থতা সম্পর্কে আদালত সাক্ষী তলব করলে খলিফা আবদুর রহমান ইবনে হাকাম ইবনে হিশাম নিজেই আদালতে উপস্থিত হয়ে তার পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করেন, তিনি এরকম এরকম কাজ করেন (অর্থাৎ যা-কিছুই করেন, সেজন্য তিনি সুনির্দিষ্ট মূলনীতি অনুসরণ করেন)। আমাকে যা জানিয়েছেন, তিনি তাই করেছেন। আমি মনে করি তার কাজগুলো মুসলিমদের উপকারে আসবে। জাদুবিদ্যার সঙ্গে জড়িত কিছু করতে দেখলে সবার আগে আমিই তার ওপর দণ্ড প্রয়োগ করতাম।

রাষ্ট্রের কর্ণধার ও মুসলিম শাসক নিজেই আদালতে হাজির হয়ে ন্যায়ের সাক্ষ্য দিয়েছেন এই বিজ্ঞানীর পক্ষে। আর বিচারকও ইবনে ফিরনাসের পক্ষে রায় দিয়েছেন। সমকালীন ফকিহগণও তার প্রশংসা করে তার কর্মের স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। আরও বেশি করে উপকারী বিষয় আবিষ্কার করে যেন মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করতে পারেন, সে বিষয়ে তাকে নিয়মিত উৎসাহ প্রদান করছেন। এভাবেই সর্বমহলে তার মর্যাদা সুরক্ষিত হয়।

খলিফা, আমির, শাসকশ্রেণির উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের কেউ ভুল ও অন্যায় কিছু করলে বিচারকগণ তাদের আদালতে হাজির হতে বাধ্য করতেন। কুযাতু কুরতুবা গ্রন্থে আল-খুশানি লেখেন, একবার বিচারক আমর ইবনে আবদুল্লাহর কাছে কর্ডোভার একজন সাধারণ দুর্বল নাগরিক এসে আমির মুহাম্মাদের একজন প্রভাবশালী আমলার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। সরকারি স্তরে ওই আমলার বিরাট প্রভাব ও দাপট ছিল। নগরপতি হওয়ার মনোনয়ন পেয়েছিল। পরে এক সময় সে গভর্নর হয়ে যায়। ওই দুর্বল লোকটি আদালতে এসে মামলা দায়ের করে যে, বিচারক মহোদয়, অমুক ব্যক্তি আমার বাড়ি জবরদখল করেছে। বিচারক বললেন, আপনি জমির কাগজ নিয়ে তার কাছে যান। তা শুনে দুর্বল লোকটি বলল, আমার মতো দুর্বল ও সাধারণ নাগরিক তার কাছে যাবে জমির দলিল দেখাতে?! নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আমি শঙ্কিত। বিচারক বললেন, আমি যেভাবে বলেছি সেভাবে জমির কাগজ নিয়ে তার কাছে যান। দেখুন কী হয়। এরপর লোকটি বিচারকের নির্দেশমতো দলিলপত্র নিয়ে তার কাছে যায়। কিছুক্ষণ পর লোকটি ফিরে এসে বলল, বিচারক মহোদয়, আমি তার কাছে গিয়েছিলাম। দূর থেকে তাকে জমির কাগজ দেখিয়ে পালিয়ে এসেছি। বিচারক আমর বললেন, বসুন। সে আসবে এখানে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই আমলা সদলবলে এসে উপস্থিত হলো। তার সামনে ছিল অনেক অশ্বারোহী ও পদাতিক নিরাপত্তারক্ষী। এরপর তিনি পা ভাঁজ করে অশ্ব থেকে অবতরণ করলেন। এরপর মসজিদে প্রবেশ করে বিচারক ও মজলিসে বসা সকলকে সালাম দিলেন। এরপর যথারীতি দাম্ভিকতা প্রদর্শন করতে মসজিদের দেয়ালে টেক্কা দিয়ে দাঁড়ালেন।

বিচারক আমর ইবনে আবদুল্লাহ বললেন, আপনি ওখানে যান। বাদীর মুখোমুখি হয়ে ওই জায়গায় বসুন। উত্তরে ওই আমলা বললেন, বিচারককে আল্লাহ সংশোধন করুন। এটি মসজিদ। মসজিদে তো কোনো কাঠগড়া নেই। এখানে সব জায়গাই সমান। আমর বলেন, আমি যেভাবে বলেছি সেভাবে বাদীর সামনে গিয়ে বসুন। বিচারককে তার বক্তব্যে অনড় দেখে তিনি দুর্বল লোকটির সামনে বসতে বাধ্য হলেন।

এরপর বিচারক দুর্বল লোকটিকেও বললেন আমলার মুখোমুখি হয়ে বসতে। এরপর তিনি দুর্বল লোকটিকে বলেন, এবার আপনি আপনার বক্তব্য উপস্থাপন করুন। তিনি বললেন, আমার বক্তব্য হলো এই লোকটি আমার ঘর জবরদখল করেছেন। এরপর আমলার উদ্দেশে বললেন, এখন আপনি আপনার বক্তব্য তুলে ধরুন। তিনি বললেন, আমার বক্তব্য হলো, আমার মতো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে জবরদखলের অভিযোগ মানহানির শামিল। তার এ কথা শুনে বিচারক বললেন, এ ধরনের বক্তব্য কোনো পুণ্যবান ব্যক্তির মুখেই মানায়, আপনার মতো মানুষের জমি জবরদখলে বিখ্যাত ব্যক্তিদের মুখে নয়। এরপর বিচারক আদালতে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কয়েকজনকে বললেন, আপনারা তার সাথে যান। তার ব্যাপারে খেয়াল রাখুন, যদি লোকটিকে তার ঘর বুঝিয়ে দেয় তাহলে তো সমাধান হলো। তা না হলে তাকে গ্রেফতার করে আমার কাছে নিয়ে আসবেন। আমি নিজে আমিরের কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করব। তার সকল অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতির কথা বাদশাকে খুলে বলব। এরপর ওই আমলা পুলিশদের সাথে বের হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর পুলিশ ও দুর্বল ব্যক্তিটি ফিরে এলো। দুর্বল লোকটি বিচারককে বলল, আজ আপনি যে বিচার করলেন তার জন্য আপনাকে মহান আল্লাহ উত্তম বিনিময় দান করুন। ওই আমলা আমার বাড়ি ফিরিয়ে দিয়েছে। বিচারক বললেন, এবার নিরাপদে বাড়ি ফিরে যান। (৪৩৮)

এ ধরনের ন্যায্য বিচারের দ্বারা কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়:
এক. অভিযোগ দায়ের করা ব্যক্তিকে আদালতে ডাকা হতো বিভিন্ন নিয়মে এবং বিচারকাজ সম্পাদন করা হতো নানা পদ্ধতিতে।
দুই. ইসলামি সভ্যতায় বিচারবিভাগ ছিল স্বাধীন। তার প্রভাব ও ক্ষমতা ছিল অপরিসীম।
তিন. বিচারকের সামনে সবাই ছিল সমান। কে দুর্বল, কে সবল, কে প্রভাবশালী, কে আমলা, কে ধনী, কে গরিব এর কোনো তারতম্য ছিল না।
চার. রায় প্রদান ও সিদ্ধান্ত কার্যকর হতো খুব দ্রুত।

দুর্বল ওই লোকটির বাড়ি যেদিন জবরদখল করা হয়, ঠিক সেদিনই সে মামলা করে। আর সেদিনই ন্যায্য বিচার পেয়ে সে তার বাড়ি ফিরে পায়।

ইসলামি সভ্যতায় বিচারালয়ের এই অনিন্দ্যসুন্দর বৈশিষ্ট্য ও ন্যায্য বিচারের মাধ্যমে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, সুমহান এই বিচারব্যবস্থার ছত্রছায়ায় মুসলিম সমাজে ন্যায়, নিষ্ঠা ও ইনসাফের জয়জয়কার ছিল। এই স্বাধীন বিচারবিভাগের অধীনে মুসলিমগণ যে ন্যায়নিষ্ঠা ও সুবিচারের পরিবেশে বসবাস করতেন, ইসলামি সভ্যতার অগ্রযাত্রায় তা মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।

টিকাঃ
৪০১. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ৮, পৃ. ৫।
৪০২. সুয়ুতি, তারিখুল খুলাফা, পৃ. ২২৯।
৪০০. প্রাগুক্ত, পৃ. ২২৯।
৪০৪. মাওয়ারদি, আদাবুল কাযি, খ. ১, পৃ. ২৪৮।
৪০৫. সুবকি, তাবাকাতুশ শাফিয়্যাতিল কুবরা, খ. ৪, পৃ. ৬৪।
৪০৬. আবুল কাসেম আব্বাস ইবনে ফিরনাস : বনু উমাইয়ার শাসনামলের অনারব মুসলিম কবি, দার্শনিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন। প্রথম পাথর থেকে কাচ আবিষ্কার করেন ও আকাশে উড্ডয়নের চেষ্টা করেন। এজন্য পালক পরে ও দুটি ডানা যুক্ত করে দীর্ঘ দূরত্ব পর্যন্ত ওড়েন। এরপর পড়ে গিয়ে পিঠে আঘাত পান। মৃত্যু ২৭৪ হি.। সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ১৬, পৃ. ৩৮০-৩৮১; মাক্কারি, নাফহুত তিব, খ. ৩, পৃ. ৩৭৪।
৪০৭. ইবনে সাইদ আল-মাগরিবি, আল-মুগরিব ফি হুলাল মাগরিব, পৃ. ২০৩।
৪৩৮. খুশানি, কুযাতু কুরতুবা, পৃ. ১৫০-১৫১।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 অপরাধ ও দুর্নীতি দমন বিভাগ এবং তার উন্নয়ন

📄 অপরাধ ও দুর্নীতি দমন বিভাগ এবং তার উন্নয়ন


খিলাফতের ভূখণ্ডে মানুষের জীবনযাত্রার উপকরণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিচারকার্যক্রমের পাশাপাশি অপরাধ ও দুর্নীতি দমন কার্যক্রমের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ক্রমান্বয়ে এই কার্যক্রম বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিচারিক পদ হিসেবে এটি আত্মপ্রকাশ করে। এই বিভাগ গঠনের পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল যাবতীয় অন্যায়, অনাচার, অনিয়ম, দুর্নীতির করালগ্রাস থেকে সর্বস্তরের মানুষকে মুক্ত রাখা। বিচার কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত থাকায় বিচারকগণ এসব বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে পারতেন না। যার ফলে স্বয়ং খলিফা অথবা তার পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন গুরুত্বপূর্ণ কেউ এ বিভাগের কার্যক্রম সরাসরি দেখাশোনা করতেন। (৪০৯)

এই পদের গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে ইবনে খালদুন লেখেন, রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন অথবা ন্যায়বিচারের জন্য বিখ্যাত বিচারক শ্রেণি থেকে নির্বাচন করে এ পদে নিয়োগ দেওয়া হতো, এজন্য তিনি হতেন প্রবল প্রতাপী ও ক্ষমতাসম্পন্ন; যারা উভয় পক্ষের মধ্য হতে অন্যায়-অবিচারকারীকে দমন করতে পারেন। আসামিকে উপযুক্ত শাস্তি দিতে পারেন। সাধারণ বিচারকগণ যা কার্যকর করতে পারেন না, তারা সাহসের সঙ্গে তা কার্যকর করেন। তাদের দৃষ্টি থাকে প্রমাণ ও উভয় পক্ষের বিবৃতির ওপর। তারা নির্ভর করেন বিভিন্ন নিদর্শন ও আলামতের ওপর। অনেক সময় সত্য অনুসন্ধান করতে তারা রায় বিলম্বিত করেন। উভয় পক্ষের মাঝে শান্তিপূর্ণ সমাধান বা আপস করেন। সাক্ষীদেরকে হলফ করিয়ে থাকেন। আর এসব কাজ বিচারকদের ক্ষমতার ঊর্ধ্বে। (৪৪০)

বিখ্যাত লেখক মাওয়ারদি বলেন, অপরাধ ও দুর্নীতি দমন বিভাগের মূল দায়িত্ব ছিল ভীতি প্রদর্শন করে অপরাধ ও দুর্নীতির সাথে জড়িতদের ন্যায়সম্মত অবস্থান গ্রহণে বাধ্য করা। ভয় দেখিয়ে বাদী-বিবাদীর মুখ থেকে ঘটনার সত্যতা উদ্‌ঘাটন করা। তবে অপরাধ ও দুর্নীতি দমনকারী হবেন সম্মানিত, প্রচণ্ড প্রতাপশালী। দণ্ড কার্যকরে সক্ষম। প্রভাবশালী। সৎ। লোভ-লালসা থেকে মুক্ত। ধার্মিক। কারণ, অপরাধ ও দুর্নীতি দমনে সেনাপতিদের মতো প্রভাব ও বিচারকদের মতো সিদ্ধান্তে অনড় উভয় প্রকার যোগ্যতার সমাবেশ ঘটবে তার চরিত্রে। আর প্রচণ্ডরকম প্রভাবশালী ও মর্যাদাবান হওয়ার ফলে উভয় দিক থেকে দণ্ড বিধান করা তার জন্য সহজ হবে। (৪৪১) এ ছাড়াও এ বিভাগে কর্মরতদের আরও যেসব দায়িত্ব ছিল, জনগণের ওপর আমির ও গভর্নরদের অন্যায় আচরণ পর্যবেক্ষণ করা, অন্যায়ভাবে তাদের কাছ থেকে কিছু আদায় করে নিচ্ছে কি না সেদিকে নজর রাখা, বিভিন্ন শহর ও নগর থেকে আসা রাজস্ব ও কর গ্রহণের ব্যাপারে আমলারা দুর্নীতির আশ্রয় নিচ্ছে কি না, বিভিন্ন সরকারি বিভাগে কর্মরত কেরানিগণ যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করছে কি না, নিরাপত্তাবাহিনী, চাকরিজীবীদের, কর্মচারীদের বেতন-ভাতা আদায়ে কোনোরকম দুর্নীতি করছে কি না বা কালক্ষেপণ করছে কি না, তাদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করছে কি না এগুলো তদন্ত করা। তাদের আরও দায়িত্ব ছিল, অপহৃত বস্তুকে দ্রুত উদ্ধার করে প্রকৃত স্বত্বাধিকারীর কাছে তা ফিরিয়ে দেওয়া, ওয়াকফকৃত সম্পত্তি হলে ওয়াকফকারীর শর্ত অনুযায়ী যথাযথভাবে তা ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, না হয়ে থাকলে সে অনুযায়ী ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা, সাধ্যের বাইরে থাকায় বা রাষ্ট্রীয় কোনো বিষয় হওয়ায় বা প্রভাবশালী কেউ তাতে জড়িত থাকায় যেসব রায় সাধারণ বিচারকগণ প্রদান করতে পারছেন না, বিশেষ ক্ষমতাবলে সেসব রায় প্রদান করা। (৪৪২)

এখান থেকেই আমরা অনুমান করতে পারি যে, অপরাধ ও দুর্নীতি দমন বিভাগ ছিল অধিক প্রভাবশালী। দ্রুত আইন কার্যকর করতে সক্ষম ও ব্যাপক ক্ষমতাসম্পন্ন। অনেকটা বর্তমান সময়ের সুপ্রিম কোর্ট বা প্রশাসনিক, বিচার ট্রাইব্যুনাল Council of State-এর ক্ষমতার মতো। রায় কার্যকর ও শাস্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে অপরাধ ও দুর্নীতি দমন বিভাগ ও এর দায়িত্বশীল ব্যক্তির ছিল সর্বোচ্চ ক্ষমতা। এর বিচারব্যবস্থা ছিল যথার্থ। এ ব্যবস্থা সম্প্রতি অনেক দেশে চালু হলেও ইসলামি সভ্যতায় তা প্রায় বারো শতাব্দী আগে থেকেই চলমান। (৪৪৩)

এখানে আরেকটি বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা দরকার। আর তা হলো, অপরাধ ও দুর্নীতি দমন বিভাগটি আমাদের বর্তমান সময়ে আরববিশ্বের অনেক দেশে আন্তঃবিভাগীয় প্রশাসনিক বিচার ট্রাইব্যুনাল ব্যবস্থা নামে প্রচলিত আছে। মিশরে এ ব্যবস্থার বর্তমান নাম মাজলিসুদ দাওলা (مجلس الدولة - Council of State)। আর এই মাজলিসুদ দাওলা (প্রশাসনিক বিচার ট্রাইব্যুনাল) সমগ্র ইউরোপে, বিশেষত ফ্রান্সে চালু হয়েছে ফরাসি বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে। অথচ ফ্রান্সকে আজ সংবিধান ও আইন প্রণয়নের জন্য আদর্শ দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। অর্থাৎ আঠারো শতকের শেষদিকে ১৭৯৯ সনে প্রণীত সংবিধানের আলোকে প্রাথমিকভাবে তার প্রচলন হয়। আর বর্তমান রূপে এর প্রচলন ঘটে ১৮৭২ সাল থেকে। এর আগে ফরাসি সাম্রাজ্যে রাজসভা নামে একটি বিভাগ চালু ছিল। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন ইস্যুতে দিক-নির্দেশনা প্রদানের পাশাপাশি এই পরিষদের দায়িত্ব ছিল প্রশাসনিক বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করা। তবে ফরাসি আইন বিষয়ক ইতিহাসবিদদের বিবৃতি অনুযায়ী ওই বিভাগের কার্যক্রম ছিল লৌকিকতা প্রদর্শন ও ফরাসি গৌরবের প্রকাশ ঘটানোর জন্য, যাকে প্রশাসনিক বিচার কার্যক্রম পরিচালনায় কখনো দেখা যায়নি। অপরদিকে আমরা যখন উমাইয়া শাসনামলের ইতিহাসে এ কথা পড়ি যে, খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান (মৃ. ৮৬ হি.) অপরাধ ও দুর্নীতি দমনের বিচার কার্যক্রম পরিচালনার আসনে নিজে বসেছেন, তখন এ কথা ভেবে অবাক হয়ে যাই যে, আন্তঃবিভাগীয় প্রশাসনিক বিচার কার্যক্রম পরিচালনায় ইসলামি সভ্যতা সেই তেরো শতাব্দী আগেই সঠিক দিক-নির্দেশনা প্রণয়ন করে উত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছে। আর ফরাসি বুদ্ধিজীবীগণ তা আবিষ্কার করে বাস্তবায়ন শুরু করেছেন মাত্র এক বা দুই শতক হলো! (৪৪৪)

কোনো সন্দেহ নেই, দুর্নীতি ও আন্তঃবিভাগীয় অপরাধ পর্যবেক্ষণ করে সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে প্রথম উদ্যোগ নিয়েছেন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তবে সেটি উমাইয়া শাসনামলের মতো প্রাতিষ্ঠানিকরূপে নয়, বরং স্বভাবগত পদ্ধতিতে। কারণ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে ওই রকম বড় কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি, যার দরুন অপরাধ ও দুর্নীতি দমন বিভাগ গঠনের প্রয়োজন ছিল।

তবে কিছু কিছু প্রেক্ষাপটে যখন দুর্নীতি চোখে পড়েছে, সঙ্গে সঙ্গে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা শুধরে দিয়ে কঠোরভাবে উম্মতকে তা থেকে সতর্ক করেছেন। একবার ইবনুল উতবিয়া আযদি রহ. নামক এক সাহাবিকে তিনি বনু সুলাইম গোত্রের সদকা উসুলের দায়িত্ব দিয়ে পাঠান। আবু হামিদ সাইদির বর্ণনায় সে ঘটনার আদ্যোপান্ত উঠে এসেছে। তিনি বলেন, ওই সাহাবি সদকা উসুল করে নিয়ে আসার পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে হিসাব করে বলল, এই নিন আপনার অর্থ, আর এই হচ্ছে আমার অর্জিত হাদিয়া। তখন আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যদি তুমি সত্যবাদী হয়ে থাকো, তাহলে তোমার মা-বাবার ঘরে বসে থাকলে না কেন? সেখানেই তোমার কাছে হাদিয়া পৌঁছে যেত! এরপর তিনি আমাদের উদ্দেশে ভাষণ দিলেন। আল্লাহর প্রশংসা ও গুণ বর্ণনা করার পর তিনি বললেন, আমি তোমাদের কাউকে এমন কোনো কাজে নিয়োগ করি, যার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে আল্লাহ আমাকে মনোনীত করেছেন। কিন্তু সে কাজ শেষ করে এসে বলে, এই হলো তোমাদের মাল আর এ হলো আমাকে দেওয়া হাদিয়া। তাহলে সে কেন তার মা-বাবার ঘরেই বসে থাকল না, সেখানে এমনিতেই তার কাছে হাদিয়া পৌঁছে যেত! আল্লাহর কসম! তোমাদের মধ্যে যে কেউ অন্যায়ভাবে কোনোকিছু গ্রহণ করবে, সে কেয়ামতের দিন তা বহন করে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে। আমি তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিদের খুব ভালো করেই চিনতে পারব। সে আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবে উট বহন করে, আর উট আওয়াজ করতে থাকবে। অথবা গাভি বহন করে, আর সেটা হাম্বা হাম্বা করতে থাকবে। অথবা ছাগল বহন করে, আর সেটা ডাকতে থাকবে। (৪৪৫)

আল্লাহর রাসুলের ইনতেকালের পর ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর রা.-ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। যাবতীয় অনিয়ম ও অবিচার দূর করে ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি তার প্রথম ভাষণে বলেন,
হে লোকসকল, আমাকে আপনাদের আমির বানানো হয়েছে। তবে আমি আপনাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কেউ নই। আমি ন্যায়ের পক্ষে কাজ করলে আমাকে সহযোগিতা করবেন। অন্যায় কিছু করলে আমাকে শুধরে দেবেন। সততাই বিশ্বস্ততা, মিথ্যাই বিশ্বাসঘাতকতা। আপনাদের মধ্যে যে দুর্বল, তার হক যথাযথভাবে আদায় করার ব্যাপারে আমার কাছে সেই শক্তিশালী। আর আপনাদের মধ্যে যে শক্তিশালী, তার কাছ থেকে প্রকৃত অধিকার আদায় করার ব্যাপারে আমার কাছে সে অত্যন্ত দুর্বল। (৪৪৬)

খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর শাসনামল থেকে অপরাধ ও দুর্নীতি দমন কার্যক্রমের প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা হয়। প্রতিবার হজের মওসুমে বিভিন্ন শহর ও রাজ্যে নিয়োগপ্রাপ্ত আমির ও গভর্নরদের জমায়েত করে তাদের ব্যাপারে জনগণের অভিযোগ শুনতেন। শাসক ও গভর্নরদের মধ্যে কেউ অন্যায় কিছু করলে তাদের শাস্তি দিতেন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গভর্নরদের জবাবদিহিতার মুখোমুখি করার ব্যাপারে উমর ইবনুল খাত্তাব রা. অনুসরণীয় আদর্শ স্থাপন করেছেন। (ক্ষমতার অপব্যবহার রোধকল্পে তার গৃহীত পদক্ষেপ ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে নিম্নবর্ণিত ঘটনার মাধ্যমে)। মিশরের গভর্নর আমর ইবনুল আস রা.-এর এক পুত্র একবার এক মিশরীয়কে চপোটাঘাত করে, যে দৌড় প্রতিযোগিতায় তাকে হারিয়ে দিয়েছিল। সেই অন্যায়ের বিচার সংক্রান্ত ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে আনাস ইবনে মালিক রা. বলেন, একবার মিশর থেকে এক লোক এসে উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-কে বলল, হে আমিরুল মুমিনিন, আমি অন্যায় থেকে আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। উমর রা. বললেন, তুমি আশ্রয় পেয়ে গেছ। বলো তোমার অভিযোগ। সে বলল, আমি আমর ইবনুল আসের এক পুত্রের সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করি। একপর্যায়ে আমি জয়ী হয়ে গেলে সে আমাকে চাবুক দিয়ে পেটায় আর বলতে থাকে, আমি ইবনুল আকরামাইন (ক্ষেত সম্মানের অধিকারীর সন্তান)। এরপর উমর রা. পত্র লেখেন আমার ইবনুল আস রা.-এর কাছে। পরে তিনি তার ওই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে খিলাফতের রাজধানী মদিনায় উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেন। খলিফার নির্দেশমতো পুত্রকে নিয়ে তিনি দ্রুত মদিনায় চলে আসেন। উমর রা. বললেন, ওই মিশরীয় কোথায়? মিশরীয়কে উপস্থিত করা হলে তিনি বললেন, চাবুক হাতে নাও এবং আমারের পুত্রকে পেটাও। এরপর লোকটি তাকে পেটাতে লাগল। উমর বলতে লাগলেন, পেটাও পেটাও, ইবনুল আকরামাইনকে পেটাও। আনাস বলেন, এরপর লোকটি তাকে বেদম প্রহার করতে থাকে। আল্লাহর শপথ, সে তাকে চাবুক দিয়ে মারতে থাকে। আর আমরাও চাচ্ছিলাম তাকে মারুক (তার দম্ভ চূর্ণ হোক)। একপর্যায়ে মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত আমরা চাচ্ছিলাম এবার যেন ক্ষান্ত হয়। এরপর উমর রা. ওই মিশরীয়কে বললেন, চাবুকটি তুমি আমার ইবনুল আসের মাথায় রাখো। সে বলল, হে আমিরুল মুমিনিন, আমাকে প্রহার করেছে তার পুত্র। আর এখন আমি তার কাছ থেকে প্রতিশোধ নিয়ে নিয়েছি। এরপর উমর ইবনুল আস রা.-এর উদ্দেশে উমর রা. বললেন, কখন থেকে তোমরা মানুষকে দাস বানিয়ে ফেলেছ?! অথচ মায়েরা পৃথিবীর বুকে তাদের স্বাধীন করে জন্ম দিয়েছে! আমার রা. উত্তর দিলেন, হে আমিরুল মুমিনিন, এ ঘটনাটি আমার জানা ছিল না। বিচারের জন্যেও সে আমার কাছে আসেনি।

অন্য কোনো সভ্যতায় এরকম ঘটনা কিংবা এর কাছাকাছিও কোনো নজির খুঁজতে গেলে আমাদের কপালে-পরিস্তিতে হতে হয়। পিতার সামনে পুত্রের ওপর এরকম প্রতিশোধ নেওয়া হচ্ছে! তাও আবার যেমন তেমন পুত্রের নয়, মিশরের শাসকের পুত্র। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ ইসলাম ও ইসলামি সভ্যতার সামনে সকল মানুষ একসমান। ইসলাম জাতীয়তাবাদ ও বর্ণবাদে বিশ্বাসী নয়।

উমাইয়া শাসনামলে বিখ্যাত খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান এ বিভাগের প্রধান হিসেবে নিজের কাঁধে দায়িত্ব তুলে নেন। এখানে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। সেটি হলো, অপরাধ ও দুর্নীতি দমন বিভাগের প্রধান হতে গেলে তাকে শরিয়তের বিধিবিধান সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ হতে হবে। কুরআন-হাদিসের সরাসরি নস থেকে ইজতেহাদ করে নীতিমালা বের করার যোগ্যতা থাকতে হবে। তার মানে এই বিভাগের প্রধানকে হতে হবে বিজ্ঞ ফকিহ ও অভিজ্ঞ আলেম। ইসলামি সভ্যতায় যে-সকল খলিফা এ বিভাগের দায়িত্ব পালন করেছেন, তারা সবাই ফিকহ, তার শাখাগত মূলনীতি ও বিধানাবলি সম্পর্কে পুরোপুরি জ্ঞাত ছিলেন। উমাইয়া খলিফাদের মধ্যে যারা এ বিভাগের দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন, উমাইয়া শাসক আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের নামটি সেই তালিকায় প্রথম সারিতে থাকবে। এই শাসকগণ যথেচ্ছ ফতোয়া প্রদান করতেন না বা ফিকহের মূলনীতির বাইরে গিয়ে কোনো দণ্ড কার্যকর করতেন না।

এরপর উমর ইবনে আবদুল আযিযের শাসনামলে দুর্নীতি দমন বিভাগে আরও সম্প্রসারণ ঘটে। তার শাসনামলে একবার বসরার গভর্নর আদি ইবনে আরতাত (মৃ. ১০২ হি.) এক লোকের জমি জবরদখল করে। এরপর ওই লোক আদির ব্যাপারে অভিযোগ করতে সোজা উমাইয়া খিলাফতের রাজধানী দামেশকে চলে আসে। ইবনে আবদুল হাকাম সেই ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে লেখেন, একদিন উমর ইবনে আবদুল আযিয ঘর থেকে বের হলেন। এক লোক বাহনে করে তার বাড়ির সামনে এসে হাজির হলো। এরপর বাহনটি বসিয়ে ওই লোক নেমে এসে লোকদেরকে জিজ্ঞেস করল, উমর ইবনে আবদুল আযিয কোথায়? উত্তর এলো, তিনি একটু বাড়ির বাইরে গেছেন। এখনই চলে আসবেন। এরপর উমর চলে এলে লোকটি তার কাছে আদি ইবনে আরতাতের ব্যাপারে অভিযোগ করলেন। তা শুনে উমর বললেন, আল্লাহর শপথ! তার ওই কালো পাগড়ি দেখেই আমরা ধোঁকা খেয়েছি। আমি তার কাছে ওসিয়ত লিখেছিলাম, যে ব্যক্তি প্রমাণসহ তোমার কাছে আসবে, তার কাছে তুমি তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেবে। কিন্তু সেই ওসিয়ত থেকে সে বিচ্যুত হয়েছে এবং তোমাকে আমার কাছে আসতে বাধ্য করেছে। এরপর উমর ওই লোকের জমি ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে আবার তাকে পত্র লেখেন। পরক্ষণে লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, এ পর্যন্ত আসতে আপনার কত খরচ হয়েছে? সে বলল, হে আমিরুল মুমিনিন, আপনি আমার জমি ফিরিয়ে দিয়েছেন। এরপরও আমার পথখরচ জিজ্ঞেস করছেন! ওই জমিই তো আমার কাছে এক লাখ দিরহামের চেয়ে বেশি মূল্যবান। তখন উমর বললেন, যা আপনার প্রাপ্য ছিল সেটিই আপনাকে বুঝিয়ে দিয়েছি। এখন বলুন, এখানে আসতে কত খরচ হয়েছে? সে বলল, আমি তো হিসাব করিনি। উমর বললেন, অনুমান করুন। সে বলল, ষাট দিরহামের মতো হবে। এরপর উমর ইবনে আবদুল আযিয বাইতুল মাল থেকে তাকে ষাট দিরহাম প্রদানের নির্দেশ দেন। (৪৪৮)

এ ঘটনায় আমিরুল মুমিনিনের পদক্ষেপ দেখে অবাক হতে হয়। সাংস্কৃতিক, সামরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও অন্যান্য সব দিক থেকে সমৃদ্ধ একটি রাষ্ট্রের প্রধান হয়ে সাধারণ একজন নাগরিকের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাদেশিক গভর্নরের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণে তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। শুধু তাই নয়, বাদীকে রাজধানী দামেশক পর্যন্ত আসতে যে খরচ হয়েছে তাও তিনি রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে পরিশোধের ব্যবস্থা করেছেন। এটিই ইসলামি সভ্যতার সৌন্দর্য, এটিই ইসলামের কৃষ্টি। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের যথাযথ অধিকার বুঝিয়ে দেওয়া এবং তাদের প্রতি সৌহার্দ্য পোষণের এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ এ ঘটনা।

হিজরি পঞ্চম শতকে আব্বাসি শাসনামলে অপরাধ ও দুর্নীতি দমন বিভাগের অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটে। এ বিভাগের স্বতন্ত্র কার্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ঠিক আমাদের বর্তমান সময়ের মন্ত্রণালয়ের মতো। এ বিভাগের যে লোকবল ছিল বিখ্যাত লেখক মাওয়ারদি তার বিবরণ খুব সুন্দর করে তুলে ধরেছেন। তারা হলেন,
এক. বিশেষ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এদের কাজ ছিল ক্ষমতাশালী আসামিদের গ্রেফতার করে তাদেরকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা। সাহসী ও অভিজ্ঞ সেনাপতিগণ এ দায়িত্ব পালন করতেন। বিচারবিভাগের বিশেষ পুলিশ বাহিনীও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
দুই. বিচারক ও জজ। তারা প্রকৃত মালিকের অধিকার প্রমাণের জন্য তদন্ত কাজে নিয়োজিত থাকতেন। অপরাধ ও দুর্নীতি দমন বিভাগের দায়িত্বশীলগণ যেসব বিচারিক বিধি সম্পর্কে অজ্ঞ থাকতেন, সেসব বিধান তাদের জানানোই ছিল এদের কাজ।
তিন. ফকিহ শ্রেণি। যেসব বিষয় দুর্বোধ্য ও জটিল মনে হয় সেগুলো ফকিহদের কাছে পেশ করা হতো। তারাই এগুলোর সুষ্ঠু সমাধান দিতেন।
চার. লেখক শ্রেণি। বাদী-বিবাদীর মাঝে চলমান মামলার ধারা ও পারস্পরিক অধিকারগুলো লিপিবদ্ধ করার কাজ করতেন।
পাঁচ. সাক্ষী। যথাযথ অধিকার প্রমাণে সাক্ষ্য প্রদান করা ও বিধান প্রমাণের দায়িত্ব ছিল এই শ্রেণির।

আব্বাসি শাসক ও খলিফাগণও অপরাধ ও দুর্নীতি দমনে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। এ বিষয়ে বর্ণিত সবচেয়ে আশ্চর্যের ঘটনা হলো, একবার এক লোক আবু জাফর মনসুরের দরবারে এলো। আবু জাফর তখন আপন ভাই আবুল আব্বাস আস-সাফফাহের শাসনামলে আরমেনিয়ায় অপরাধ ও দুর্নীতি দমন বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। ওই লোকটি বলল, আমার একটি অভিযোগ আছে। অভিযোগটি বলার আগে আমি একটি উদাহরণ পেশ করতে চাই। আবু জাফর বললেন, বলুন। সে বলল, আমি আল্লাহকে ভয় করি। তিনি সকল সৃষ্টিকে অনেকগুলো স্তরে সৃষ্টি করেছেন। একটি শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর সবার আগে সে তার মাকেই চেনে। একমাত্র মায়ের কাছেই সবকিছু প্রার্থনা করে। ভয় পেলে দৌড়ে তার মায়ের কোলে আশ্রয় নেয়। এরপর সে পরবর্তী স্তরে পদার্পণ করে। তখন সে বুঝতে পারে মায়ের চেয়ে পিতার ক্ষমতা বেশি। তখন বিপদে পড়লে সে তার বাবার কাছে আশ্রয় নেয়। এরপর সে বড় হয়। পরিণত বয়সে পৌঁছে। তখন কোনো সমস্যায় জর্জরিত হলে সে বাদশার কাছে অভিযোগ করে। কেউ তার প্রতি অবিচার করলে বাদশার মাধ্যমে তার বিচার প্রার্থনা করে। তবে বাদশা নিজেই যদি তার প্রতি অন্যায় করে, তখন একমাত্র প্রতিপালকের কাছে আশ্রয় চাওয়া বা রবের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা ছাড়া তার আর কোনো উপায় থাকে না। আমার বেলায় ঠিক সেরকমটিই ঘটেছে। ইবনে নাহিক তার এলাকায় অবস্থিত আমার একটি জমির ব্যাপারে আমার প্রতি অবিচার করেছে। এখন আপনিই এর বিচার করুন। হৃত ভূসম্পত্তি আমাকে ফিরিয়ে দিন। তা না হলে মহান আল্লাহর কাছে অভিযোগ করা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় থাকবে না। এবার আপনার ইচ্ছা, চাইলে বিষয়টি তদন্ত করতে পারেন অথবা খারিজ করতে পারেন। তার কথা শুনে আবু জাফর বিচলিত হয়ে বলেন, তোমার অভিযোগটি আবার বলো। এরপর দ্বিতীয়বার অভিযোগটি পেশ করার পর আবু জাফর বললেন, প্রথম পদক্ষেপ হলো, সবার আগে ইবনে নাহিককে আমি রাজপ্রহরী প্রধানের পদ থেকে বিচ্যুত করছি। এরপর ইবনে নাহিককে ওই লোকের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। (৪৪৯)

*(সে সময় জনগণের জন্য শাসকের কাছে গিয়ে স্বয়ং শাসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করার অধিকার ছিল। এটি ছিল ইসলামি সভ্যতার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সুমহান দৃষ্টান্ত। মিসওয়ার ইবনে মিসাওয়ার নামক এক ব্যক্তি বলেন, একবার খলিফা আল-মাহদির একজন উকিল অন্যায়ভাবে আমার জমি দখল করে নেয়। এরপর সে বিষয়ে প্রতিকার চাইতে আমি তখনকার অপরাধ ও দুর্নীতি দমন বিভাগের প্রধান সাল্লামের কাছে অভিযোগ দায়ের করি এবং তাকে ছোট্ট একটি চিরকুট প্রদান করি। চিরকুটটি তিনি খলিফা আল-মাহদির কাছে পৌঁছান। সেই মুহূর্তে তার কাছে আপন চাচা আব্বাস ইবনে মুহাম্মাদ এবং বিচারক আল-আফিয়াত উপস্থিত ছিলেন। চিরকুট পড়ে আল-মাহদি বললেন, তাকে এখানে নিয়ে এসো। এরপর আমি রাজদরবারে উপস্থিত হলে আল-মাহদি আমাকে বললেন, কী হয়েছে বলুন! আমি বললাম, আপনি আমার প্রতি অন্যায় করেছেন। তিনি বললেন, এখানে দুজন বিচারক উপস্থিত আছেন (অর্থাৎ আব্বাস ইবনে মুহাম্মাদ এবং আফিয়াত আল-কাযি)। বিচারক হিসেবে এ দুজনকে আপনার পছন্দ হয়? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তাহলে আসুন। এরপর কাছে গিয়ে আমি রাজগালিচার ওপর বসি। তিনি বললেন, এবার আপনার অভিযোগ বলুন। আমি বললাম, আল্লাহ বিচারককে বিবাদ মেটানোর তাওফিক দিন। আমার অভিযোগ হলো, তিনি আমার ভূসম্পত্তির ব্যাপারে আমার প্রতি অবিচার করেছেন। বিচারক বললেন, আপনার মতামত বলুন হে আমিরুল মুমিনিন। তিনি বললেন, আমার অধিকারে যা আছে তা আমারই সম্পত্তি। আমি বললাম, আল্লাহ বিচারককে বিবাদ মেটানোর তাওফিক দিন! আপনি খলিফাকে জিজ্ঞেস করুন, তিনি কি খলিফা হওয়ার আগে থেকেই এই জমির মালিক ছিলেন, নাকি খলিফা হওয়ার পর? এরপর বিচারক খলিফাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, খলিফা হওয়ার পর মালিক হয়েছি। তখন বিচারক বললেন, এই জমি আপনি তাকে দিয়ে দিন। খলিফা বললেন, ঠিক আছে দিয়ে দিলাম। এরপর বিচারক আব্বাস ইবনে মুহাম্মাদ বললেন, আল্লাহর শপথ! হে আমিরুল মুমিনিন, এই মুহূর্তটি আমার কাছে বিশ লাখ দিরহামের চেয়েও বেশি মূল্যবান। (৪৫০)

ইসলামি সভ্যতা রাষ্ট্রের সকল নাগরিককে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। বিচার প্রয়োগের বেলায় ইসলামি শরিয়া ধর্ম, বর্ণ ও সামাজিক অবস্থানের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য করেনি যেমনটা করেছিল সমকালীন রোমান ও পারস্যসভ্যতা। অথচ ইসলামপূর্ব আরব সমাজেও সেই বর্ণবৈষম্য প্রকটভাবে বিদ্যমান ছিল। কিন্তু ইসলামি সভ্যতা আসার পর সেই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে। এমনকি স্বয়ং খলিফাও বিচারব্যবস্থার একজন সাধারণ নাগরিক বিবেচিত হতেন। আর যারা দণ্ড কার্যকরের দায়িত্ব পালন করতেন, তারাও ছিলেন সাধারণ মুসলিম, যারা হয়তো বড় কোনো গোত্রের বা পদের অধিকারী ছিলেন না। ইসলামি সভ্যতা কত উঁচু, কত মহান, সুবিচার প্রতিষ্ঠায় কত সফল, এর দ্বারা সেটিই প্রমাণ হয়। আরও প্রতীয়মান হয়, ইসলামি সভ্যতা রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের যথাযথ মর্যাদা দিতে সমর্থ হয়েছে। রাষ্ট্রের প্রতিটি দুর্বল ও নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে।

শুধু তাই নয়, আমরা দেখতে পাই, অনেক খলিফা অসুস্থ মায়ের সেবা- শুশ্রূষার চেয়ে অপরাধ ও দুর্নীতি দমন বিভাগের কার্যক্রম পরিচালনাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। বর্ণিত আছে, খলিফা আল-হাদি (মৃ. ১৭০ হি.) একদিন তার অসুস্থ মা খিযরানকে দেখতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাহনে চড়লেন। ঠিক সে সময় উমর ইবনে বাযি এসে বলল, হে আমিরুল মুমিনিন, আমি আপনার কাছে এমন একটি বিষয় পেশ করছি যার সেবা করা আপনার জন্য আরও বেশি দরকার। খলিফা জিজ্ঞেস করলেন, সেটি কোনটি? তিনি বললেন, দুর্নীতি দমন বিভাগের কার্যক্রম। তিন দিন হলো আপনি সেই বিভাগের কোনো মামলা দেখেননি। এরপর তিনি পদাতিক বাহিনীকে বললেন, ওই বিভাগের কার্যালয়ের উদ্দেশে যাত্রা করো। আর মা খিযরানের কাছে একজন সেবককে পাঠিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিলেন। তিনি বলে দিলেন, মাকে গিয়ে বলবে, আপনার কাছে আসার উদ্দেশ্যে বাহনে চেপেছিলাম, ঠিক সেই মুহূর্তে উমর ইবনে বাযি এসে এমন বিষয় উত্থাপন করল, যা সমাধান করা আপনাকে দেখতে আসার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই আজ আমরা সেই কাজ পূর্ণ করতে যাচ্ছি। ইনশাআল্লাহ আগামীকাল আমরা আপনাকে দেখতে আসছি। (৪৫১)

আব্বাসি খলিফা আল-মামুন সপ্তাহের প্রতি রোববার এ বিভাগের অধীনে দুর্নীতির মামলার তদন্তে বসতেন। একদিন তিনি মামলার অভিযোগ শোনার জন্য বসেছিলেন, এমন সময় জীর্ণ কাপড় পরিহিত এক নারী এসে কবিতার ভাষায় তার অনুযোগ পেশ করল,
يا خير منتصف يهدى له الرشد * ويا إماما به قد أشرق البلد تشكو إليك عميد الملك أرملة * عدا عليها فما تقوى به أسد فابتز منها ضياعا بعد منعتها * لما تفرق عنها الأهل والولد

যার সারমর্ম হলো, হে ন্যায়ের ঝান্ডাবাহী, শ্রেষ্ঠ সুবিচারক; হে দিগ্বিজয়ী শাসক, হে রাষ্ট্রের কর্ণধার, স্বামীহারা একজন নারী আপনার কাছে অনুযোগ করছে। এক ব্যক্তি তার প্রতি অবিচার করেছে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কথা বলার ক্ষমতা তার নেই। ওই নারীর পরিবার ও সন্তান যখন আলাদা হয়ে গেছে, তখন একাধিকবার নিষেধ করার পরও হুমকি-ধমকি দিয়ে ওই লোকটি তার জমি ছিনিয়ে নিয়েছে।

কবিতা শুনে খলিফা মামুন মাথা নিচু করে ফেললেন। একটু পর মাথা উঁচিয়ে বললেন,
من دون ما قلت عيل الصبر والجلد * وأقرح القلب هذا الحزن والكمد هذا أوان صلاة الظهر فانصر في * وأحضري الخصم في اليوم الذي أعد المجلس السبت إن يقض الجلوس لنا * أنصفك منه وإلا المجلس الأحد

আপনার অভিযোগ শুনে আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। প্রচণ্ড উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় হৃদয় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। ঠিক আছে, এখন যোহরের নামাযের সময়। আপনি ফিরে যান। যেদিন আমি বলি সেদিন বিবাদীকে নিয়ে আমার সামনে উপস্থিত হবেন। শনিবারের মজলিসে যদি সব মামলা নিষ্পত্তি হয়ে যায়, তাহলে আপনার বিষয়টি দেখব। অন্যথায় রোববারের মজলিসে এ বিষয়টি মীমাংসা করব।

এরপর ওই নারী চলে গেল। রোববার দিন সে সবার আগে চলে এলো। তাকে দেখে খলিফা আল-মামুন বললেন, বিবাদী কে? সে বলল, আপনার পাশে দাঁড়ানো আমিরুল মুমিনিনের পুত্র আব্বাস। এরপর খলিফা বিচারক ইয়াহইয়া ইবনে আকসামকে ডেকে বললেন, ওই নারীর সঙ্গে বসে মামলার নিষ্পত্তি করুন। এরপর খলিফার উপস্থিতিতে উভয়ের মাঝে বিচার সম্পাদনের একপর্যায়ে ওই নারী উচ্চ আওয়াজে কথা বলতে শুরু করলে রাজপ্রহরীগণ তাকে ধমক দেওয়ার চেষ্টা করল। তাদের দেখে খলিফা মামুন বললেন, তাকে হক কথা বলতে দাও। মিথ্যা আজ পরাভূত হবে। এরপর তিনি ওই নারীর হৃত ভূসম্পত্তি ফিরিয়ে দিতে বললেন।

এখানে খলিফা নিজে উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু বিচার নিষ্পত্তির ভার তুলে দিয়েছেন বিচারকের হাতে। এর দুটি কারণ হতে পারে। এক. এখানে বিচার সম্পাদন হচ্ছে নিজ পুত্রের। রায় তার পক্ষেও যেতে পারে আবার বিপক্ষেও। তবে খলিফা নিজে তার পুত্রের বিপক্ষে রায় প্রদান বৈধ হলে পক্ষে রায় প্রদান করলে সেটিতে নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করার আভাস পাওয়া যায়। আর পুত্রের বিপক্ষে রায় প্রদান বৈধ হলেও পক্ষে রায় প্রদান বৈধ নয়। দুই. এখানে বাদী যেহেতু একজন নারী, তাই খলিফা তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলা এড়িয়ে যেতে চাইলেন এবং প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটনে বেশি মনোযোগ দিলেন। (৪৫২)

অবিচারী ও দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা, কর্মচারী ও গভর্নরদের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করার লক্ষ্যে খলিফা মনসুর যখনই কোনো কমকর্তাকে পদচ্যুত করতেন, তার সমুদয় অর্থ ও পাওনা বাইতুল মালে হস্তান্তর করতেন। এটির নাম দিতেন দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্তদের অর্থ তহবিল। এরপর ওই অর্থের ওপর তার নামও লিখে দিতেন। (৪৫৩) তবে এই প্রক্রিয়া খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কারণ এর দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল কেবল গভর্নরদের ভয়ে রাখা এবং তাদের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। এ কারণেই খলিফা মনসুর শেষদিকে পুত্র আল-মাহদিকে ওসিয়ত করে যান, আমি তোমার জন্য একটি তালিক প্রস্তুত করেছি। যাদের অর্থ আমি বাইতুল মালে জমা করেছি, আমার মৃত্যুর পর তাদের সে অর্থ তুমি ফিরিয়ে দিয়ো। তাহলে তাদের কাছে এবং জনসাধারণের সামনে তোমার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। পিতার ওসিয়ত অনুযায়ী আল-মাহদি তাই করেন। (৪৫৪)

অপরদিকে আন্দালুসে এ বিভাগের পরিচিতি ঘটে خطة المظالم (দুর্নীতি দমন কমিশন) নামে। যা আন্দালুসে উমাইয়া শাসনামলের একেবারে গোড়ার দিকে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে সে বিভাগের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও পরিধি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় খিলাফত আমলের চতুর্থ শতাব্দীতে।

মরক্কো এবং আন্দালুসে এ বিভাগের ব্যতিক্রমধর্মী উন্নতি ও সমৃদ্ধি ঘটে। যা প্রাচ্যের উমাইয়া ও আব্বাসি শাসনামলে প্রচলিত পদ্ধতি থেকে অনেকটা ভিন্নরকম ছিল। কারণ সে বিভাগের পদটি ছিল প্রধান বিচারপতির পদের অব্যবহিত পরেই। প্রাচ্যে যাকে কাযিউল কুযাত বলা হতো। আর মরক্কো এবং আন্দালুসে কোনো আমির বা খলিফা এই পদের জন্য নির্বাচিত হননি। তবে ব্যতিক্রমও আছে। এ কারণেই সেখানে এ পদের জন্য নিয়োগপ্রাপ্তদের অধিকাংশই ছিলেন আলেম ও ফকিহ শ্রেণির। আফ্রিকায় এ পদে নিয়োজিত সবচেয়ে বিখ্যাত বিচারক ছিলেন মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ (মৃ. ৩৯৮ হি.)। যার ব্যাপারে ইবনে ইযারির মূল্যায়ন, দুর্বৃত্ত ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের জন্য তিনি ছিলেন ত্রাস। যত ক্ষমতাবান ও প্রতাপীই হোক, ধরে ধরে তাদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসতেন। প্রহার করতেন। হত্যা করতেন। হাত বা পা কেটে দিতেন। এ ব্যাপারে কারও হুমকি-ধমকির তোয়াক্কা করতেন না তিনি। (৫৫৫)

আন্দালুসে যারা এ বিভাগের দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের অনেকের সুনাম ও সুখ্যাতি সরকারি-বেসরকারি সব মহলে বিপুলভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের অনেকে আবার রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক পদে উন্নীত হন। আবু মুতাররিফ আবদুর রহমান ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইসা ইবনে ফাতিস অপরাধ ও দুর্নীতি দমন বিভাগের দায়িত্ব পান আল-মনসুর মুহাম্মাদ ইবনে আবু আমিরের শাসনামলে। তার নীতি ছিল খুবই কঠোর। সংকল্প ছিল অদম্য। দুর্বৃত্তি ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত লোকেরা তাকে মারাত্মকভাবে ভয় করত। উযিরদের সঙ্গেও তিনি মতামত শেয়ার করতেন। শেষ পর্যন্ত উন্নতি করতে করতে কর্ডোভার বিচারক পদে অধিষ্ঠিত হন। সঙ্গে মন্ত্রণালয় ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক বিভাগের দায়িত্বও ছিল তার কাঁধে। আন্দালুসে এর আগে খুব কম ব্যক্তিই এরকম বহু প্রতিভা ও একাধিক পদের অধিকারী হয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। (৪৫৬)

খলিফাদের অনুকরণে অনেক প্রাদেশিক গভর্নরও দুর্নীতি দমন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় মিশরের বিখ্যাত ইখশিদি শাসক আবুল মিসক আল-কাফুর সপ্তাহের প্রতি শনিবার এ বিভাগের বিচার-মীমাংসার জন্য বসতেন। আমৃত্যু তিনি এ রীতির ওপর অটল ছিলেন। (৪৫৭) তেমনই সেলজুক শাসকগণও একই রীতি অবলম্বন করেন। আমির তুঘরিল বেগ সপ্তাহের দুই দিন এ বিভাগের বিচার কার্যক্রম দেখশোনার জন্য নির্দিষ্ট করেন। সকল সেলজুক আমির নিজ নিজ রাজ্যে একই রীতির প্রচলন করেন। (৪৫৮) আইয়ুবি সাম্রাজ্যের সুলতান আল-আযিয প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার এ বিভাগের কার্যক্রম দেখাশোনা করতেন। (৪৫৯) মরক্কোর সাদি সাম্রাজ্যেও (৯৬১-১০৬৯ হি.) একই নিয়ম প্রচলিত ছিল। সুলতান আহমাদ আল-মনসুর (মৃ. ১০১১ হি.) এ বিভাগের কার্যক্রম দেখাশোনার জন্য স্বতন্ত্র একটি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করে তার নাম দেন 'আদ-দিওয়ান'। প্রতি বুধবার সেই দিওয়ান-সভা বসত এবং রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়ে সেখানে পরামর্শ হতো। যারা অন্য সময় সুলতানের সঙ্গে দেখা করতে পারত না, এ দিন তারাও সুলতানের কাছে তাদের অভিযোগ পেশ করার সুযোগ পেত। (৪৬০)

মামলুকি শাসকগণও দুর্নীতি দমন বিভাগকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে সেই বিভাগ পরিচালনার জন্য বিশিষ্ট বিচারক ও বিখ্যাত ফকিহদের দায়িত্ব প্রদান করেন। অনেক ক্ষেত্রে নিজেরাও তাতে হস্তক্ষেপ করতেন।

৬৬১ হিজরির ঘটনাসমগ্র বর্ণনা করতে গিয়ে মাকরিযি লেখেন, আলেকজান্দ্রিয়ার অধিবাসী দুই ব্যক্তি মিশরের সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্স আল-বুন্দুকদারির (মৃ. ৬৭৬ হি.) দরবারে এলো। তাদের একজনের নাম ছিল ইবনুল বাওরি আর দ্বিতীয়জনের নাম মুকাররম ইবনে যাইয়াত। তাদের সঙ্গে কিছু কাগজ ও নথি ছিল। তাতে আত্মসাৎকৃত অর্থ উদ্ধারের বিবরণ উল্লেখ ছিল। সুলতান মঙ্গলবার তার ষষ্ঠ যুবরাজ, সহযোগী, বিচারকবৃন্দ ও ফকিহদের ডাকলেন এবং তাদের সামনে সেই নথি পাঠ করার নির্দেশ দিলেন। এরপর নথি পড়া শুরু হলো। দুর্নীতির বিবরণ পড়ার সময় তা এড়িয়ে যেতে লাগলেন এবং জড়িতদের নির্দোষ আখ্যায়িত করতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত নথি পাঠ সমাপ্ত হলে সুলতান বললেন, মনে রাখবেন, নিশ্চয় আমি একমাত্র আল্লাহর জন্য ছয় লাখ দিনার অনুমোদন করেছি যা বিভিন্ন ব্যবহৃত বস্তু সংরক্ষণ ও সংশোধনের কাজে ব্যয় হয়েছে। পথিক, দাস, দাসিনী ও খেজুরবৃক্ষ প্রতিপালনের কাজে খরচ হয়েছে। ফলে মহান আল্লাহ এর চেয়ে বেশি অর্থ হালাল উপায়ে আমার জন্য ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আমি সকল বিভাগ থেকে অর্থের সুষ্ঠু ব্যয়ের হিসাব চেয়েছিলাম আর তা দুর্নীতির সকল অর্থ বাদ দিয়েও অনেক বেশি হয়েছে। যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য কিছু বর্জন করবে, মহান আল্লাহ এর চেয়ে উত্তম বস্তু দিয়ে তার বিনিময় দেবেন। সুলতান এরপর ইবনুল বাওরিকে সেই নথি প্রচার করার নির্দেশ দিলেন। (৪৬১)

উপর্যুক্ত ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সুলতান রাজ্যের সকল বিভাগ ও মন্ত্রণালয় থেকে হিসাব গ্রহণ করতেন। মন্ত্রী, আমলা, বিচারবিভাগ সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। তেমনই জনগণের অর্থসম্পদ নষ্ট করার ব্যাপারে ফকিহগণও তাদের কাছে কৈফিয়ত চাইতেন। বারবার তাদের স্মরণ করিয়ে দিতেন। সুলতান বিষয়টি নিজের অধিকারে নয় প্রমাণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার স্বর্ণমুদ্রা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ছেড়ে দেন। এর পেছনে তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল জনগণের অর্থের সুরক্ষা ও সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা। বরং যে দুই ব্যক্তি এ নথিপত্র নিয়ে আসেন তাদের একজনকে সুলতান পদচ্যুত করেন। তার ব্যাপারটি প্রচার করার জন্য এবং পুরো কায়রো শহরে তাকে লাঞ্ছিত করার জন্য সুলতান নির্দেশ প্রদান করেন। কারণ সুলতান তখন পর্যন্ত ঘটনার আদ্যোপান্ত জানতেন না।

জনগণের অর্থের ব্যাপারে অভিযোগ ও বিচার কার্যক্রম দেখাশোনা করতে মামলুকি সুলতানদের অনেকে সরকারি ক্ষেত্রগুলোতে চলে যেতেন। এমনই একজন ছিলেন সুলতান সাইফুদ্দিন বারকুক (মৃ. ৮০১ হি.)। ৭৯২ হিজরির ঘটনাসমগ্র বর্ণনা করতে গিয়ে মাকরিযি লেখেন, সুলতান বারকুক যথারীতি দুর্গের বাইরে এসে দুর্নীতির মামলা ও অভিযোগ শোনার জন্য জনগণের সামনে বসতেন। মানুষও তার কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ত। প্রচুর পরিমাণ অভিযোগ নিয়ে আসত। যার ফলে বড় বড় সরকারি মন্ত্রী-আমলাগণ সবসময় তটস্থ থাকতেন। কার বিরুদ্ধে কখন অভিযোগ চলে আসে সেজন্য সবাই সাবধান থাকতেন। (৪৬২)

ইসলামি সভ্যতার ইতিহাসে খলিফা ও শাসকদের এ মহান উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার দ্বারা এটিই প্রমাণ হয় যে, রাজ্যের কোনো মানুষই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। ভুল করলে এর শাস্তি তাকে পেতেই হবে, তা সে যত ক্ষমতার অধিকারীই হোক। এ ব্যাপারে কে আমির, কে সাধারণ নাগরিক, কে ধনি, কে গরিব এর কোনো তারতম্য ছিল না। উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কোনো মানুষই বিচারের আওতার বাইরে নয়, এমনকি আমির, গভর্নর, সেনাপতি, উযির, মন্ত্রী এবং রাজ্যের ক্ষমতাধর ব্যক্তিবর্গও বিচারের সম্মুখীন হয়েছেন। ইসলামি সভ্যতা কত মহান, কত ন্যায়পরায়ণ এ ঘটনাগুলোর দ্বারা তারই প্রমাণ মিলে। পারসিক সভ্যতা, রোমান সভ্যতা, এমনকি বর্তমান সময়ের আন্তর্জাতিক আদালতও ইসলামি সভ্যতার সমপর্যায়ের হওয়া তো দূরের কথা, ধারেকাছেও আসতে পারেনি। কারণ, জালিম যত বড় ও প্রতাপশালীই হোক, ইসলাম তার ওপর যথাযথ দণ্ড প্রয়োগ করে সবার জন্য তাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে। আজকের সভ্য (!) পৃথিবীতে এরকম নজির দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া যায় না।

এরপরও আমরা বলব, ইসলামি সভ্যতায় বিচারব্যবস্থা যেরকম স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য উপভোগ করত, তার বিশদ বিবরণ সামান্য কয়েক পৃষ্ঠায় সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়। এটি নিতান্তই দুঃসাধ্য কাজ। কিন্তু যেসব ঘটনা ও পদক্ষেপের বিবরণ আমরা এ কয়েক পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছি, তার দ্বারা এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামি সভ্যতাই বিচার সংক্রান্ত আধুনিক বিধিবিধান ও উন্নত দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার এমন সব সংবিধান ও নিয়মকানুন আবিষ্কার করেছে, যেগুলো বর্তমান সময়ের সংবিধান প্রণয়নকারী সংগঠন ও রাষ্ট্র পরিচালনাকারী সংস্থার জন্য উত্তম আদর্শ ও প্রধান ভিত্তি ছিল এবং দেশ পরিচালনার পথে সরল ও সুন্দর পদ্ধতি ছিল।

টিকাঃ
৪০৯. খুশানি, কযাতু কুরতুবা, পৃ. ৫৪।
৪৪০. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ২২২।
৪০. মাওয়ারদি, আল-আহকামুস সুলতানিয়‍্যা, পৃ. ৬৪।
৪৪২. প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৯-৭০।
৪৪৩. আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামি, পৃ. ১২৮।
৪৪৪. মুস্তাফা আল-বারুদি, আল-ওয়াজিয ফিল-হুকুকিল ইদারিয়্যা, পৃ. ৫৭-৫৮; যাফের কাসেমি, নিযامুল হুকমি ফি-শারিআতি ওয়াত-তারিখ, খ. ২, পৃ. ৫৫৫।
৪৪৫. বুখারি, হাদিস নং ৬৭৫৩; মুসলিম, হাদিস নং ১৮৩২।
৪৪৬. ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা, খ. ৬, পৃ. ৮৬।
৪৪৮. ইবনে আবদুল হাকাম, সিরাতু উমার ইবনে আবদুল আযিয, পৃ. ১৪৬-১৪৭।
৪৪৯. ইবনে আসাকির, তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, খ. ৩২, পৃ. ৩৯২।
৪৫০. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ৪, পৃ. ৫৮৬।
৪৫১. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ৪, পৃ. ৬১০।
৪০২. মাওয়ারদি, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, পৃ. ১৪৬-১৪৭।
৪৫০. ইবনুল আসির, আল-কামিল ফিত-তারিখ, খ. ৫, পৃ. ২২৪।
৪৫৪. প্রাগুক্ত।
৪৫৫. ইবনে ইযারি, আল-বায়ানুল মুগরিব, পৃ. ১১২।
৪৫৬. নাবাহি, তারিখু কুযাতিল উন্দুলুস, পৃ. ৮৬।
৪৫৭. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ৪, পৃ. ৩১৫।
৪৫৮. প্রাগুক্ত, খ. ৪, পৃ. ৩৮২।
৪৫৯. মাকরিযি, আস-সুলুক, খ. ১, পৃ. ২৪৭।
৪৬০. নাসিরি, আল-ইসতিকসা লি-আখবারিল মাগরিবিল আকসা, খ. ৫, পৃ. ১৮৮।
৪৮১. মাকরিযি, আস-সুলুক, খ. ১, পৃ. ৫৬০।
৪৬২. প্রাগুক্ত, খ. ৫, পৃ. ২৮৬।

খিলাফতের ভূখণ্ডে মানুষের জীবনযাত্রার উপকরণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিচারকার্যক্রমের পাশাপাশি অপরাধ ও দুর্নীতি দমন কার্যক্রমের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ক্রমান্বয়ে এই কার্যক্রম বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিচারিক পদ হিসেবে এটি আত্মপ্রকাশ করে। এই বিভাগ গঠনের পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল যাবতীয় অন্যায়, অনাচার, অনিয়ম, দুর্নীতির করালগ্রাস থেকে সর্বস্তরের মানুষকে মুক্ত রাখা। বিচার কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত থাকায় বিচারকগণ এসব বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে পারতেন না। যার ফলে স্বয়ং খলিফা অথবা তার পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন গুরুত্বপূর্ণ কেউ এ বিভাগের কার্যক্রম সরাসরি দেখাশোনা করতেন। (৪০৯)

এই পদের গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে ইবনে খালদুন লেখেন, রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন অথবা ন্যায়বিচারের জন্য বিখ্যাত বিচারক শ্রেণি থেকে নির্বাচন করে এ পদে নিয়োগ দেওয়া হতো, এজন্য তিনি হতেন প্রবল প্রতাপী ও ক্ষমতাসম্পন্ন; যারা উভয় পক্ষের মধ্য হতে অন্যায়-অবিচারকারীকে দমন করতে পারেন। আসামিকে উপযুক্ত শাস্তি দিতে পারেন। সাধারণ বিচারকগণ যা কার্যকর করতে পারেন না, তারা সাহসের সঙ্গে তা কার্যকর করেন। তাদের দৃষ্টি থাকে প্রমাণ ও উভয় পক্ষের বিবৃতির ওপর। তারা নির্ভর করেন বিভিন্ন নিদর্শন ও আলামতের ওপর। অনেক সময় সত্য অনুসন্ধান করতে তারা রায় বিলম্বিত করেন। উভয় পক্ষের মাঝে শান্তিপূর্ণ সমাধান বা আপস করেন। সাক্ষীদেরকে হলফ করিয়ে থাকেন। আর এসব কাজ বিচারকদের ক্ষমতার ঊর্ধ্বে। (৪৪০)

বিখ্যাত লেখক মাওয়ারদি বলেন, অপরাধ ও দুর্নীতি দমন বিভাগের মূল দায়িত্ব ছিল ভীতি প্রদর্শন করে অপরাধ ও দুর্নীতির সাথে জড়িতদের ন্যায়সম্মত অবস্থান গ্রহণে বাধ্য করা। ভয় দেখিয়ে বাদী-বিবাদীর মুখ থেকে ঘটনার সত্যতা উদ্‌ঘাটন করা। তবে অপরাধ ও দুর্নীতি দমনকারী হবেন সম্মানিত, প্রচণ্ড প্রতাপশালী। দণ্ড কার্যকরে সক্ষম। প্রভাবশালী। সৎ। লোভ-লালসা থেকে মুক্ত। ধার্মিক। কারণ, অপরাধ ও দুর্নীতি দমনে সেনাপতিদের মতো প্রভাব ও বিচারকদের মতো সিদ্ধান্তে অনড় উভয় প্রকার যোগ্যতার সমাবেশ ঘটবে তার চরিত্রে। আর প্রচণ্ডরকম প্রভাবশালী ও মর্যাদাবান হওয়ার ফলে উভয় দিক থেকে দণ্ড বিধান করা তার জন্য সহজ হবে। (৪৪১) এ ছাড়াও এ বিভাগে কর্মরতদের আরও যেসব দায়িত্ব ছিল, জনগণের ওপর আমির ও গভর্নরদের অন্যায় আচরণ পর্যবেক্ষণ করা, অন্যায়ভাবে তাদের কাছ থেকে কিছু আদায় করে নিচ্ছে কি না সেদিকে নজর রাখা, বিভিন্ন শহর ও নগর থেকে আসা রাজস্ব ও কর গ্রহণের ব্যাপারে আমলারা দুর্নীতির আশ্রয় নিচ্ছে কি না, বিভিন্ন সরকারি বিভাগে কর্মরত কেরানিগণ যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করছে কি না, নিরাপত্তাবাহিনী, চাকরিজীবীদের, কর্মচারীদের বেতন-ভাতা আদায়ে কোনোরকম দুর্নীতি করছে কি না বা কালক্ষেপণ করছে কি না, তাদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করছে কি না এগুলো তদন্ত করা। তাদের আরও দায়িত্ব ছিল, অপহৃত বস্তুকে দ্রুত উদ্ধার করে প্রকৃত স্বত্বাধিকারীর কাছে তা ফিরিয়ে দেওয়া, ওয়াকফকৃত সম্পত্তি হলে ওয়াকফকারীর শর্ত অনুযায়ী যথাযথভাবে তা ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, না হয়ে থাকলে সে অনুযায়ী ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা, সাধ্যের বাইরে থাকায় বা রাষ্ট্রীয় কোনো বিষয় হওয়ায় বা প্রভাবশালী কেউ তাতে জড়িত থাকায় যেসব রায় সাধারণ বিচারকগণ প্রদান করতে পারছেন না, বিশেষ ক্ষমতাবলে সেসব রায় প্রদান করা। (৪৪২)

এখান থেকেই আমরা অনুমান করতে পারি যে, অপরাধ ও দুর্নীতি দমন বিভাগ ছিল অধিক প্রভাবশালী। দ্রুত আইন কার্যকর করতে সক্ষম ও ব্যাপক ক্ষমতাসম্পন্ন। অনেকটা বর্তমান সময়ের সুপ্রিম কোর্ট বা প্রশাসনিক, বিচার ট্রাইব্যুনাল Council of State-এর ক্ষমতার মতো। রায় কার্যকর ও শাস্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে অপরাধ ও দুর্নীতি দমন বিভাগ ও এর দায়িত্বশীল ব্যক্তির ছিল সর্বোচ্চ ক্ষমতা। এর বিচারব্যবস্থা ছিল যথার্থ। এ ব্যবস্থা সম্প্রতি অনেক দেশে চালু হলেও ইসলামি সভ্যতায় তা প্রায় বারো শতাব্দী আগে থেকেই চলমান। (৪৪৩)

এখানে আরেকটি বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা দরকার। আর তা হলো, অপরাধ ও দুর্নীতি দমন বিভাগটি আমাদের বর্তমান সময়ে আরববিশ্বের অনেক দেশে আন্তঃবিভাগীয় প্রশাসনিক বিচার ট্রাইব্যুনাল ব্যবস্থা নামে প্রচলিত আছে। মিশরে এ ব্যবস্থার বর্তমান নাম মাজলিসুদ দাওলা (مجلس الدولة - Council of State)। আর এই মাজলিসুদ দাওলা (প্রশাসনিক বিচার ট্রাইব্যুনাল) সমগ্র ইউরোপে, বিশেষত ফ্রান্সে চালু হয়েছে ফরাসি বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে। অথচ ফ্রান্সকে আজ সংবিধান ও আইন প্রণয়নের জন্য আদর্শ দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। অর্থাৎ আঠারো শতকের শেষদিকে ১৭৯৯ সনে প্রণীত সংবিধানের আলোকে প্রাথমিকভাবে তার প্রচলন হয়। আর বর্তমান রূপে এর প্রচলন ঘটে ১৮৭২ সাল থেকে। এর আগে ফরাসি সাম্রাজ্যে রাজসভা নামে একটি বিভাগ চালু ছিল। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন ইস্যুতে দিক-নির্দেশনা প্রদানের পাশাপাশি এই পরিষদের দায়িত্ব ছিল প্রশাসনিক বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করা। তবে ফরাসি আইন বিষয়ক ইতিহাসবিদদের বিবৃতি অনুযায়ী ওই বিভাগের কার্যক্রম ছিল লৌকিকতা প্রদর্শন ও ফরাসি গৌরবের প্রকাশ ঘটানোর জন্য, যাকে প্রশাসনিক বিচার কার্যক্রম পরিচালনায় কখনো দেখা যায়নি। অপরদিকে আমরা যখন উমাইয়া শাসনামলের ইতিহাসে এ কথা পড়ি যে, খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান (মৃ. ৮৬ হি.) অপরাধ ও দুর্নীতি দমনের বিচার কার্যক্রম পরিচালনার আসনে নিজে বসেছেন, তখন এ কথা ভেবে অবাক হয়ে যাই যে, আন্তঃবিভাগীয় প্রশাসনিক বিচার কার্যক্রম পরিচালনায় ইসলামি সভ্যতা সেই তেরো শতাব্দী আগেই সঠিক দিক-নির্দেশনা প্রণয়ন করে উত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছে। আর ফরাসি বুদ্ধিজীবীগণ তা আবিষ্কার করে বাস্তবায়ন শুরু করেছেন মাত্র এক বা দুই শতক হলো! (৪৪৪)

কোনো সন্দেহ নেই, দুর্নীতি ও আন্তঃবিভাগীয় অপরাধ পর্যবেক্ষণ করে সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে প্রথম উদ্যোগ নিয়েছেন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তবে সেটি উমাইয়া শাসনামলের মতো প্রাতিষ্ঠানিকরূপে নয়, বরং স্বভাবগত পদ্ধতিতে। কারণ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে ওই রকম বড় কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি, যার দরুন অপরাধ ও দুর্নীতি দমন বিভাগ গঠনের প্রয়োজন ছিল।

তবে কিছু কিছু প্রেক্ষাপটে যখন দুর্নীতি চোখে পড়েছে, সঙ্গে সঙ্গে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা শুধরে দিয়ে কঠোরভাবে উম্মতকে তা থেকে সতর্ক করেছেন। একবার ইবনুল উতবিয়া আযদি রহ. নামক এক সাহাবিকে তিনি বনু সুলাইম গোত্রের সদকা উসুলের দায়িত্ব দিয়ে পাঠান। আবু হামিদ সাইদির বর্ণনায় সে ঘটনার আদ্যোপান্ত উঠে এসেছে। তিনি বলেন, ওই সাহাবি সদকা উসুল করে নিয়ে আসার পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে হিসাব করে বলল, এই নিন আপনার অর্থ, আর এই হচ্ছে আমার অর্জিত হাদিয়া। তখন আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যদি তুমি সত্যবাদী হয়ে থাকো, তাহলে তোমার মা-বাবার ঘরে বসে থাকলে না কেন? সেখানেই তোমার কাছে হাদিয়া পৌঁছে যেত! এরপর তিনি আমাদের উদ্দেশে ভাষণ দিলেন। আল্লাহর প্রশংসা ও গুণ বর্ণনা করার পর তিনি বললেন, আমি তোমাদের কাউকে এমন কোনো কাজে নিয়োগ করি, যার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে আল্লাহ আমাকে মনোনীত করেছেন। কিন্তু সে কাজ শেষ করে এসে বলে, এই হলো তোমাদের মাল আর এ হলো আমাকে দেওয়া হাদিয়া। তাহলে সে কেন তার মা-বাবার ঘরেই বসে থাকল না, সেখানে এমনিতেই তার কাছে হাদিয়া পৌঁছে যেত! আল্লাহর কসম! তোমাদের মধ্যে যে কেউ অন্যায়ভাবে কোনোকিছু গ্রহণ করবে, সে কেয়ামতের দিন তা বহন করে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে। আমি তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিদের খুব ভালো করেই চিনতে পারব। সে আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবে উট বহন করে, আর উট আওয়াজ করতে থাকবে। অথবা গাভি বহন করে, আর সেটা হাম্বা হাম্বা করতে থাকবে। অথবা ছাগল বহন করে, আর সেটা ডাকতে থাকবে। (৪৪৫)

আল্লাহর রাসুলের ইনতেকালের পর ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর রা.-ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। যাবতীয় অনিয়ম ও অবিচার দূর করে ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি তার প্রথম ভাষণে বলেন,
হে লোকসকল, আমাকে আপনাদের আমির বানানো হয়েছে। তবে আমি আপনাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কেউ নই। আমি ন্যায়ের পক্ষে কাজ করলে আমাকে সহযোগিতা করবেন। অন্যায় কিছু করলে আমাকে শুধরে দেবেন। সততাই বিশ্বস্ততা, মিথ্যাই বিশ্বাসঘাতকতা। আপনাদের মধ্যে যে দুর্বল, তার হক যথাযথভাবে আদায় করার ব্যাপারে আমার কাছে সেই শক্তিশালী। আর আপনাদের মধ্যে যে শক্তিশালী, তার কাছ থেকে প্রকৃত অধিকার আদায় করার ব্যাপারে আমার কাছে সে অত্যন্ত দুর্বল। (৪৪৬)

খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর শাসনামল থেকে অপরাধ ও দুর্নীতি দমন কার্যক্রমের প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা হয়। প্রতিবার হজের মওসুমে বিভিন্ন শহর ও রাজ্যে নিয়োগপ্রাপ্ত আমির ও গভর্নরদের জমায়েত করে তাদের ব্যাপারে জনগণের অভিযোগ শুনতেন। শাসক ও গভর্নরদের মধ্যে কেউ অন্যায় কিছু করলে তাদের শাস্তি দিতেন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গভর্নরদের জবাবদিহিতার মুখোমুখি করার ব্যাপারে উমর ইবনুল খাত্তাব রা. অনুসরণীয় আদর্শ স্থাপন করেছেন। (ক্ষমতার অপব্যবহার রোধকল্পে তার গৃহীত পদক্ষেপ ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে নিম্নবর্ণিত ঘটনার মাধ্যমে)। মিশরের গভর্নর আমর ইবনুল আস রা.-এর এক পুত্র একবার এক মিশরীয়কে চপোটাঘাত করে, যে দৌড় প্রতিযোগিতায় তাকে হারিয়ে দিয়েছিল। সেই অন্যায়ের বিচার সংক্রান্ত ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে আনাস ইবনে মালিক রা. বলেন, একবার মিশর থেকে এক লোক এসে উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-কে বলল, হে আমিরুল মুমিনিন, আমি অন্যায় থেকে আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। উমর রা. বললেন, তুমি আশ্রয় পেয়ে গেছ। বলো তোমার অভিযোগ। সে বলল, আমি আমর ইবনুল আসের এক পুত্রের সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করি। একপর্যায়ে আমি জয়ী হয়ে গেলে সে আমাকে চাবুক দিয়ে পেটায় আর বলতে থাকে, আমি ইবনুল আকরামাইন (ক্ষেত সম্মানের অধিকারীর সন্তান)। এরপর উমর রা. পত্র লেখেন আমার ইবনুল আস রা.-এর কাছে। পরে তিনি তার ওই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে খিলাফতের রাজধানী মদিনায় উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেন। খলিফার নির্দেশমতো পুত্রকে নিয়ে তিনি দ্রুত মদিনায় চলে আসেন। উমর রা. বললেন, ওই মিশরীয় কোথায়? মিশরীয়কে উপস্থিত করা হলে তিনি বললেন, চাবুক হাতে নাও এবং আমারের পুত্রকে পেটাও। এরপর লোকটি তাকে পেটাতে লাগল। উমর বলতে লাগলেন, পেটাও পেটাও, ইবনুল আকরামাইনকে পেটাও। আনাস বলেন, এরপর লোকটি তাকে বেদম প্রহার করতে থাকে। আল্লাহর শপথ, সে তাকে চাবুক দিয়ে মারতে থাকে। আর আমরাও চাচ্ছিলাম তাকে মারুক (তার দম্ভ চূর্ণ হোক)। একপর্যায়ে মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত আমরা চাচ্ছিলাম এবার যেন ক্ষান্ত হয়। এরপর উমর রা. ওই মিশরীয়কে বললেন, চাবুকটি তুমি আমার ইবনুল আসের মাথায় রাখো। সে বলল, হে আমিরুল মুমিনিন, আমাকে প্রহার করেছে তার পুত্র। আর এখন আমি তার কাছ থেকে প্রতিশোধ নিয়ে নিয়েছি। এরপর উমর ইবনুল আস রা.-এর উদ্দেশে উমর রা. বললেন, কখন থেকে তোমরা মানুষকে দাস বানিয়ে ফেলেছ?! অথচ মায়েরা পৃথিবীর বুকে তাদের স্বাধীন করে জন্ম দিয়েছে! আমার রা. উত্তর দিলেন, হে আমিরুল মুমিনিন, এ ঘটনাটি আমার জানা ছিল না। বিচারের জন্যেও সে আমার কাছে আসেনি।

অন্য কোনো সভ্যতায় এরকম ঘটনা কিংবা এর কাছাকাছিও কোনো নজির খুঁজতে গেলে আমাদের কপালে-পরিস্তিতে হতে হয়। পিতার সামনে পুত্রের ওপর এরকম প্রতিশোধ নেওয়া হচ্ছে! তাও আবার যেমন তেমন পুত্রের নয়, মিশরের শাসকের পুত্র। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ ইসলাম ও ইসলামি সভ্যতার সামনে সকল মানুষ একসমান। ইসলাম জাতীয়তাবাদ ও বর্ণবাদে বিশ্বাসী নয়।

উমাইয়া শাসনামলে বিখ্যাত খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান এ বিভাগের প্রধান হিসেবে নিজের কাঁধে দায়িত্ব তুলে নেন। এখানে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। সেটি হলো, অপরাধ ও দুর্নীতি দমন বিভাগের প্রধান হতে গেলে তাকে শরিয়তের বিধিবিধান সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ হতে হবে। কুরআন-হাদিসের সরাসরি নস থেকে ইজতেহাদ করে নীতিমালা বের করার যোগ্যতা থাকতে হবে। তার মানে এই বিভাগের প্রধানকে হতে হবে বিজ্ঞ ফকিহ ও অভিজ্ঞ আলেম। ইসলামি সভ্যতায় যে-সকল খলিফা এ বিভাগের দায়িত্ব পালন করেছেন, তারা সবাই ফিকহ, তার শাখাগত মূলনীতি ও বিধানাবলি সম্পর্কে পুরোপুরি জ্ঞাত ছিলেন। উমাইয়া খলিফাদের মধ্যে যারা এ বিভাগের দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন, উমাইয়া শাসক আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের নামটি সেই তালিকায় প্রথম সারিতে থাকবে। এই শাসকগণ যথেচ্ছ ফতোয়া প্রদান করতেন না বা ফিকহের মূলনীতির বাইরে গিয়ে কোনো দণ্ড কার্যকর করতেন না।

এরপর উমর ইবনে আবদুল আযিযের শাসনামলে দুর্নীতি দমন বিভাগে আরও সম্প্রসারণ ঘটে। তার শাসনামলে একবার বসরার গভর্নর আদি ইবনে আরতাত (মৃ. ১০২ হি.) এক লোকের জমি জবরদখল করে। এরপর ওই লোক আদির ব্যাপারে অভিযোগ করতে সোজা উমাইয়া খিলাফতের রাজধানী দামেশকে চলে আসে। ইবনে আবদুল হাকাম সেই ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে লেখেন, একদিন উমর ইবনে আবদুল আযিয ঘর থেকে বের হলেন। এক লোক বাহনে করে তার বাড়ির সামনে এসে হাজির হলো। এরপর বাহনটি বসিয়ে ওই লোক নেমে এসে লোকদেরকে জিজ্ঞেস করল, উমর ইবনে আবদুল আযিয কোথায়? উত্তর এলো, তিনি একটু বাড়ির বাইরে গেছেন। এখনই চলে আসবেন। এরপর উমর চলে এলে লোকটি তার কাছে আদি ইবনে আরতাতের ব্যাপারে অভিযোগ করলেন। তা শুনে উমর বললেন, আল্লাহর শপথ! তার ওই কালো পাগড়ি দেখেই আমরা ধোঁকা খেয়েছি। আমি তার কাছে ওসিয়ত লিখেছিলাম, যে ব্যক্তি প্রমাণসহ তোমার কাছে আসবে, তার কাছে তুমি তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেবে। কিন্তু সেই ওসিয়ত থেকে সে বিচ্যুত হয়েছে এবং তোমাকে আমার কাছে আসতে বাধ্য করেছে। এরপর উমর ওই লোকের জমি ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে আবার তাকে পত্র লেখেন। পরক্ষণে লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, এ পর্যন্ত আসতে আপনার কত খরচ হয়েছে? সে বলল, হে আমিরুল মুমিনিন, আপনি আমার জমি ফিরিয়ে দিয়েছেন। এরপরও আমার পথখরচ জিজ্ঞেস করছেন! ওই জমিই তো আমার কাছে এক লাখ দিরহামের চেয়ে বেশি মূল্যবান। তখন উমর বললেন, যা আপনার প্রাপ্য ছিল সেটিই আপনাকে বুঝিয়ে দিয়েছি। এখন বলুন, এখানে আসতে কত খরচ হয়েছে? সে বলল, আমি তো হিসাব করিনি। উমর বললেন, অনুমান করুন। সে বলল, ষাট দিরহামের মতো হবে। এরপর উমর ইবনে আবদুল আযিয বাইতুল মাল থেকে তাকে ষাট দিরহাম প্রদানের নির্দেশ দেন। (৪৪৮)

এ ঘটনায় আমিরুল মুমিনিনের পদক্ষেপ দেখে অবাক হতে হয়। সাংস্কৃতিক, সামরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও অন্যান্য সব দিক থেকে সমৃদ্ধ একটি রাষ্ট্রের প্রধান হয়ে সাধারণ একজন নাগরিকের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাদেশিক গভর্নরের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণে তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। শুধু তাই নয়, বাদীকে রাজধানী দামেশক পর্যন্ত আসতে যে খরচ হয়েছে তাও তিনি রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে পরিশোধের ব্যবস্থা করেছেন। এটিই ইসলামি সভ্যতার সৌন্দর্য, এটিই ইসলামের কৃষ্টি। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের যথাযথ অধিকার বুঝিয়ে দেওয়া এবং তাদের প্রতি সৌহার্দ্য পোষণের এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ এ ঘটনা।

হিজরি পঞ্চম শতকে আব্বাসি শাসনামলে অপরাধ ও দুর্নীতি দমন বিভাগের অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটে। এ বিভাগের স্বতন্ত্র কার্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ঠিক আমাদের বর্তমান সময়ের মন্ত্রণালয়ের মতো। এ বিভাগের যে লোকবল ছিল বিখ্যাত লেখক মাওয়ারদি তার বিবরণ খুব সুন্দর করে তুলে ধরেছেন। তারা হলেন,
এক. বিশেষ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এদের কাজ ছিল ক্ষমতাশালী আসামিদের গ্রেফতার করে তাদেরকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা। সাহসী ও অভিজ্ঞ সেনাপতিগণ এ দায়িত্ব পালন করতেন। বিচারবিভাগের বিশেষ পুলিশ বাহিনীও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
দুই. বিচারক ও জজ। তারা প্রকৃত মালিকের অধিকার প্রমাণের জন্য তদন্ত কাজে নিয়োজিত থাকতেন। অপরাধ ও দুর্নীতি দমন বিভাগের দায়িত্বশীলগণ যেসব বিচারিক বিধি সম্পর্কে অজ্ঞ থাকতেন, সেসব বিধান তাদের জানানোই ছিল এদের কাজ।
তিন. ফকিহ শ্রেণি। যেসব বিষয় দুর্বোধ্য ও জটিল মনে হয় সেগুলো ফকিহদের কাছে পেশ করা হতো। তারাই এগুলোর সুষ্ঠু সমাধান দিতেন।
চার. লেখক শ্রেণি। বাদী-বিবাদীর মাঝে চলমান মামলার ধারা ও পারস্পরিক অধিকারগুলো লিপিবদ্ধ করার কাজ করতেন।
পাঁচ. সাক্ষী। যথাযথ অধিকার প্রমাণে সাক্ষ্য প্রদান করা ও বিধান প্রমাণের দায়িত্ব ছিল এই শ্রেণির।

আব্বাসি শাসক ও খলিফাগণও অপরাধ ও দুর্নীতি দমনে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। এ বিষয়ে বর্ণিত সবচেয়ে আশ্চর্যের ঘটনা হলো, একবার এক লোক আবু জাফর মনসুরের দরবারে এলো। আবু জাফর তখন আপন ভাই আবুল আব্বাস আস-সাফফাহের শাসনামলে আরমেনিয়ায় অপরাধ ও দুর্নীতি দমন বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। ওই লোকটি বলল, আমার একটি অভিযোগ আছে। অভিযোগটি বলার আগে আমি একটি উদাহরণ পেশ করতে চাই। আবু জাফর বললেন, বলুন। সে বলল, আমি আল্লাহকে ভয় করি। তিনি সকল সৃষ্টিকে অনেকগুলো স্তরে সৃষ্টি করেছেন। একটি শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর সবার আগে সে তার মাকেই চেনে। একমাত্র মায়ের কাছেই সবকিছু প্রার্থনা করে। ভয় পেলে দৌড়ে তার মায়ের কোলে আশ্রয় নেয়। এরপর সে পরবর্তী স্তরে পদার্পণ করে। তখন সে বুঝতে পারে মায়ের চেয়ে পিতার ক্ষমতা বেশি। তখন বিপদে পড়লে সে তার বাবার কাছে আশ্রয় নেয়। এরপর সে বড় হয়। পরিণত বয়সে পৌঁছে। তখন কোনো সমস্যায় জর্জরিত হলে সে বাদশার কাছে অভিযোগ করে। কেউ তার প্রতি অবিচার করলে বাদশার মাধ্যমে তার বিচার প্রার্থনা করে। তবে বাদশা নিজেই যদি তার প্রতি অন্যায় করে, তখন একমাত্র প্রতিপালকের কাছে আশ্রয় চাওয়া বা রবের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা ছাড়া তার আর কোনো উপায় থাকে না। আমার বেলায় ঠিক সেরকমটিই ঘটেছে। ইবনে নাহিক তার এলাকায় অবস্থিত আমার একটি জমির ব্যাপারে আমার প্রতি অবিচার করেছে। এখন আপনিই এর বিচার করুন। হৃত ভূসম্পত্তি আমাকে ফিরিয়ে দিন। তা না হলে মহান আল্লাহর কাছে অভিযোগ করা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় থাকবে না। এবার আপনার ইচ্ছা, চাইলে বিষয়টি তদন্ত করতে পারেন অথবা খারিজ করতে পারেন। তার কথা শুনে আবু জাফর বিচলিত হয়ে বলেন, তোমার অভিযোগটি আবার বলো। এরপর দ্বিতীয়বার অভিযোগটি পেশ করার পর আবু জাফর বললেন, প্রথম পদক্ষেপ হলো, সবার আগে ইবনে নাহিককে আমি রাজপ্রহরী প্রধানের পদ থেকে বিচ্যুত করছি। এরপর ইবনে নাহিককে ওই লোকের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। (৪৪৯)

*(সে সময় জনগণের জন্য শাসকের কাছে গিয়ে স্বয়ং শাসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করার অধিকার ছিল। এটি ছিল ইসলামি সভ্যতার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সুমহান দৃষ্টান্ত। মিসওয়ার ইবনে মিসাওয়ার নামক এক ব্যক্তি বলেন, একবার খলিফা আল-মাহদির একজন উকিল অন্যায়ভাবে আমার জমি দখল করে নেয়। এরপর সে বিষয়ে প্রতিকার চাইতে আমি তখনকার অপরাধ ও দুর্নীতি দমন বিভাগের প্রধান সাল্লামের কাছে অভিযোগ দায়ের করি এবং তাকে ছোট্ট একটি চিরকুট প্রদান করি। চিরকুটটি তিনি খলিফা আল-মাহদির কাছে পৌঁছান। সেই মুহূর্তে তার কাছে আপন চাচা আব্বাস ইবনে মুহাম্মাদ এবং বিচারক আল-আফিয়াত উপস্থিত ছিলেন। চিরকুট পড়ে আল-মাহদি বললেন, তাকে এখানে নিয়ে এসো। এরপর আমি রাজদরবারে উপস্থিত হলে আল-মাহদি আমাকে বললেন, কী হয়েছে বলুন! আমি বললাম, আপনি আমার প্রতি অন্যায় করেছেন। তিনি বললেন, এখানে দুজন বিচারক উপস্থিত আছেন (অর্থাৎ আব্বাস ইবনে মুহাম্মাদ এবং আফিয়াত আল-কাযি)। বিচারক হিসেবে এ দুজনকে আপনার পছন্দ হয়? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তাহলে আসুন। এরপর কাছে গিয়ে আমি রাজগালিচার ওপর বসি। তিনি বললেন, এবার আপনার অভিযোগ বলুন। আমি বললাম, আল্লাহ বিচারককে বিবাদ মেটানোর তাওফিক দিন। আমার অভিযোগ হলো, তিনি আমার ভূসম্পত্তির ব্যাপারে আমার প্রতি অবিচার করেছেন। বিচারক বললেন, আপনার মতামত বলুন হে আমিরুল মুমিনিন। তিনি বললেন, আমার অধিকারে যা আছে তা আমারই সম্পত্তি। আমি বললাম, আল্লাহ বিচারককে বিবাদ মেটানোর তাওফিক দিন! আপনি খলিফাকে জিজ্ঞেস করুন, তিনি কি খলিফা হওয়ার আগে থেকেই এই জমির মালিক ছিলেন, নাকি খলিফা হওয়ার পর? এরপর বিচারক খলিফাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, খলিফা হওয়ার পর মালিক হয়েছি। তখন বিচারক বললেন, এই জমি আপনি তাকে দিয়ে দিন। খলিফা বললেন, ঠিক আছে দিয়ে দিলাম। এরপর বিচারক আব্বাস ইবনে মুহাম্মাদ বললেন, আল্লাহর শপথ! হে আমিরুল মুমিনিন, এই মুহূর্তটি আমার কাছে বিশ লাখ দিরহামের চেয়েও বেশি মূল্যবান। (৪৫০)

ইসলামি সভ্যতা রাষ্ট্রের সকল নাগরিককে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। বিচার প্রয়োগের বেলায় ইসলামি শরিয়া ধর্ম, বর্ণ ও সামাজিক অবস্থানের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য করেনি যেমনটা করেছিল সমকালীন রোমান ও পারস্যসভ্যতা। অথচ ইসলামপূর্ব আরব সমাজেও সেই বর্ণবৈষম্য প্রকটভাবে বিদ্যমান ছিল। কিন্তু ইসলামি সভ্যতা আসার পর সেই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে। এমনকি স্বয়ং খলিফাও বিচারব্যবস্থার একজন সাধারণ নাগরিক বিবেচিত হতেন। আর যারা দণ্ড কার্যকরের দায়িত্ব পালন করতেন, তারাও ছিলেন সাধারণ মুসলিম, যারা হয়তো বড় কোনো গোত্রের বা পদের অধিকারী ছিলেন না। ইসলামি সভ্যতা কত উঁচু, কত মহান, সুবিচার প্রতিষ্ঠায় কত সফল, এর দ্বারা সেটিই প্রমাণ হয়। আরও প্রতীয়মান হয়, ইসলামি সভ্যতা রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের যথাযথ মর্যাদা দিতে সমর্থ হয়েছে। রাষ্ট্রের প্রতিটি দুর্বল ও নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে।

শুধু তাই নয়, আমরা দেখতে পাই, অনেক খলিফা অসুস্থ মায়ের সেবা- শুশ্রূষার চেয়ে অপরাধ ও দুর্নীতি দমন বিভাগের কার্যক্রম পরিচালনাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। বর্ণিত আছে, খলিফা আল-হাদি (মৃ. ১৭০ হি.) একদিন তার অসুস্থ মা খিযরানকে দেখতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাহনে চড়লেন। ঠিক সে সময় উমর ইবনে বাযি এসে বলল, হে আমিরুল মুমিনিন, আমি আপনার কাছে এমন একটি বিষয় পেশ করছি যার সেবা করা আপনার জন্য আরও বেশি দরকার। খলিফা জিজ্ঞেস করলেন, সেটি কোনটি? তিনি বললেন, দুর্নীতি দমন বিভাগের কার্যক্রম। তিন দিন হলো আপনি সেই বিভাগের কোনো মামলা দেখেননি। এরপর তিনি পদাতিক বাহিনীকে বললেন, ওই বিভাগের কার্যালয়ের উদ্দেশে যাত্রা করো। আর মা খিযরানের কাছে একজন সেবককে পাঠিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিলেন। তিনি বলে দিলেন, মাকে গিয়ে বলবে, আপনার কাছে আসার উদ্দেশ্যে বাহনে চেপেছিলাম, ঠিক সেই মুহূর্তে উমর ইবনে বাযি এসে এমন বিষয় উত্থাপন করল, যা সমাধান করা আপনাকে দেখতে আসার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই আজ আমরা সেই কাজ পূর্ণ করতে যাচ্ছি। ইনশাআল্লাহ আগামীকাল আমরা আপনাকে দেখতে আসছি। (৪৫১)

আব্বাসি খলিফা আল-মামুন সপ্তাহের প্রতি রোববার এ বিভাগের অধীনে দুর্নীতির মামলার তদন্তে বসতেন। একদিন তিনি মামলার অভিযোগ শোনার জন্য বসেছিলেন, এমন সময় জীর্ণ কাপড় পরিহিত এক নারী এসে কবিতার ভাষায় তার অনুযোগ পেশ করল,
يا خير منتصف يهدى له الرشد * ويا إماما به قد أشرق البلد تشكو إليك عميد الملك أرملة * عدا عليها فما تقوى به أسد فابتز منها ضياعا بعد منعتها * لما تفرق عنها الأهل والولد

যার সারমর্ম হলো, হে ন্যায়ের ঝান্ডাবাহী, শ্রেষ্ঠ সুবিচারক; হে দিগ্বিজয়ী শাসক, হে রাষ্ট্রের কর্ণধার, স্বামীহারা একজন নারী আপনার কাছে অনুযোগ করছে। এক ব্যক্তি তার প্রতি অবিচার করেছে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কথা বলার ক্ষমতা তার নেই। ওই নারীর পরিবার ও সন্তান যখন আলাদা হয়ে গেছে, তখন একাধিকবার নিষেধ করার পরও হুমকি-ধমকি দিয়ে ওই লোকটি তার জমি ছিনিয়ে নিয়েছে।

কবিতা শুনে খলিফা মামুন মাথা নিচু করে ফেললেন। একটু পর মাথা উঁচিয়ে বললেন,
من دون ما قلت عيل الصبر والجلد * وأقرح القلب هذا الحزن والكمد هذا أوان صلاة الظهر فانصر في * وأحضري الخصم في اليوم الذي أعد المجلس السبت إن يقض الجلوس لنا * أنصفك منه وإلا المجلس الأحد

আপনার অভিযোগ শুনে আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। প্রচণ্ড উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় হৃদয় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। ঠিক আছে, এখন যোহরের নামাযের সময়। আপনি ফিরে যান। যেদিন আমি বলি সেদিন বিবাদীকে নিয়ে আমার সামনে উপস্থিত হবেন। শনিবারের মজলিসে যদি সব মামলা নিষ্পত্তি হয়ে যায়, তাহলে আপনার বিষয়টি দেখব। অন্যথায় রোববারের মজলিসে এ বিষয়টি মীমাংসা করব।

এরপর ওই নারী চলে গেল। রোববার দিন সে সবার আগে চলে এলো। তাকে দেখে খলিফা আল-মামুন বললেন, বিবাদী কে? সে বলল, আপনার পাশে দাঁড়ানো আমিরুল মুমিনিনের পুত্র আব্বাস। এরপর খলিফা বিচারক ইয়াহইয়া ইবনে আকসামকে ডেকে বললেন, ওই নারীর সঙ্গে বসে মামলার নিষ্পত্তি করুন। এরপর খলিফার উপস্থিতিতে উভয়ের মাঝে বিচার সম্পাদনের একপর্যায়ে ওই নারী উচ্চ আওয়াজে কথা বলতে শুরু করলে রাজপ্রহরীগণ তাকে ধমক দেওয়ার চেষ্টা করল। তাদের দেখে খলিফা মামুন বললেন, তাকে হক কথা বলতে দাও। মিথ্যা আজ পরাভূত হবে। এরপর তিনি ওই নারীর হৃত ভূসম্পত্তি ফিরিয়ে দিতে বললেন।

এখানে খলিফা নিজে উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু বিচার নিষ্পত্তির ভার তুলে দিয়েছেন বিচারকের হাতে। এর দুটি কারণ হতে পারে। এক. এখানে বিচার সম্পাদন হচ্ছে নিজ পুত্রের। রায় তার পক্ষেও যেতে পারে আবার বিপক্ষেও। তবে খলিফা নিজে তার পুত্রের বিপক্ষে রায় প্রদান বৈধ হলে পক্ষে রায় প্রদান করলে সেটিতে নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করার আভাস পাওয়া যায়। আর পুত্রের বিপক্ষে রায় প্রদান বৈধ হলেও পক্ষে রায় প্রদান বৈধ নয়। দুই. এখানে বাদী যেহেতু একজন নারী, তাই খলিফা তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলা এড়িয়ে যেতে চাইলেন এবং প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটনে বেশি মনোযোগ দিলেন। (৪৫২)

অবিচারী ও দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা, কর্মচারী ও গভর্নরদের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করার লক্ষ্যে খলিফা মনসুর যখনই কোনো কমকর্তাকে পদচ্যুত করতেন, তার সমুদয় অর্থ ও পাওনা বাইতুল মালে হস্তান্তর করতেন। এটির নাম দিতেন দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্তদের অর্থ তহবিল। এরপর ওই অর্থের ওপর তার নামও লিখে দিতেন। (৪৫৩) তবে এই প্রক্রিয়া খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কারণ এর দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল কেবল গভর্নরদের ভয়ে রাখা এবং তাদের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। এ কারণেই খলিফা মনসুর শেষদিকে পুত্র আল-মাহদিকে ওসিয়ত করে যান, আমি তোমার জন্য একটি তালিক প্রস্তুত করেছি। যাদের অর্থ আমি বাইতুল মালে জমা করেছি, আমার মৃত্যুর পর তাদের সে অর্থ তুমি ফিরিয়ে দিয়ো। তাহলে তাদের কাছে এবং জনসাধারণের সামনে তোমার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। পিতার ওসিয়ত অনুযায়ী আল-মাহদি তাই করেন। (৪৫৪)

অপরদিকে আন্দালুসে এ বিভাগের পরিচিতি ঘটে خطة المظالم (দুর্নীতি দমন কমিশন) নামে। যা আন্দালুসে উমাইয়া শাসনামলের একেবারে গোড়ার দিকে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে সে বিভাগের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও পরিধি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় খিলাফত আমলের চতুর্থ শতাব্দীতে।

মরক্কো এবং আন্দালুসে এ বিভাগের ব্যতিক্রমধর্মী উন্নতি ও সমৃদ্ধি ঘটে। যা প্রাচ্যের উমাইয়া ও আব্বাসি শাসনামলে প্রচলিত পদ্ধতি থেকে অনেকটা ভিন্নরকম ছিল। কারণ সে বিভাগের পদটি ছিল প্রধান বিচারপতির পদের অব্যবহিত পরেই। প্রাচ্যে যাকে কাযিউল কুযাত বলা হতো। আর মরক্কো এবং আন্দালুসে কোনো আমির বা খলিফা এই পদের জন্য নির্বাচিত হননি। তবে ব্যতিক্রমও আছে। এ কারণেই সেখানে এ পদের জন্য নিয়োগপ্রাপ্তদের অধিকাংশই ছিলেন আলেম ও ফকিহ শ্রেণির। আফ্রিকায় এ পদে নিয়োজিত সবচেয়ে বিখ্যাত বিচারক ছিলেন মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ (মৃ. ৩৯৮ হি.)। যার ব্যাপারে ইবনে ইযারির মূল্যায়ন, দুর্বৃত্ত ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের জন্য তিনি ছিলেন ত্রাস। যত ক্ষমতাবান ও প্রতাপীই হোক, ধরে ধরে তাদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসতেন। প্রহার করতেন। হত্যা করতেন। হাত বা পা কেটে দিতেন। এ ব্যাপারে কারও হুমকি-ধমকির তোয়াক্কা করতেন না তিনি। (৫৫৫)

আন্দালুসে যারা এ বিভাগের দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের অনেকের সুনাম ও সুখ্যাতি সরকারি-বেসরকারি সব মহলে বিপুলভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের অনেকে আবার রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক পদে উন্নীত হন। আবু মুতাররিফ আবদুর রহমান ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইসা ইবনে ফাতিস অপরাধ ও দুর্নীতি দমন বিভাগের দায়িত্ব পান আল-মনসুর মুহাম্মাদ ইবনে আবু আমিরের শাসনামলে। তার নীতি ছিল খুবই কঠোর। সংকল্প ছিল অদম্য। দুর্বৃত্তি ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত লোকেরা তাকে মারাত্মকভাবে ভয় করত। উযিরদের সঙ্গেও তিনি মতামত শেয়ার করতেন। শেষ পর্যন্ত উন্নতি করতে করতে কর্ডোভার বিচারক পদে অধিষ্ঠিত হন। সঙ্গে মন্ত্রণালয় ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক বিভাগের দায়িত্বও ছিল তার কাঁধে। আন্দালুসে এর আগে খুব কম ব্যক্তিই এরকম বহু প্রতিভা ও একাধিক পদের অধিকারী হয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। (৪৫৬)

খলিফাদের অনুকরণে অনেক প্রাদেশিক গভর্নরও দুর্নীতি দমন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় মিশরের বিখ্যাত ইখশিদি শাসক আবুল মিসক আল-কাফুর সপ্তাহের প্রতি শনিবার এ বিভাগের বিচার-মীমাংসার জন্য বসতেন। আমৃত্যু তিনি এ রীতির ওপর অটল ছিলেন। (৪৫৭) তেমনই সেলজুক শাসকগণও একই রীতি অবলম্বন করেন। আমির তুঘরিল বেগ সপ্তাহের দুই দিন এ বিভাগের বিচার কার্যক্রম দেখশোনার জন্য নির্দিষ্ট করেন। সকল সেলজুক আমির নিজ নিজ রাজ্যে একই রীতির প্রচলন করেন। (৪৫৮) আইয়ুবি সাম্রাজ্যের সুলতান আল-আযিয প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার এ বিভাগের কার্যক্রম দেখাশোনা করতেন। (৪৫৯) মরক্কোর সাদি সাম্রাজ্যেও (৯৬১-১০৬৯ হি.) একই নিয়ম প্রচলিত ছিল। সুলতান আহমাদ আল-মনসুর (মৃ. ১০১১ হি.) এ বিভাগের কার্যক্রম দেখাশোনার জন্য স্বতন্ত্র একটি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করে তার নাম দেন 'আদ-দিওয়ান'। প্রতি বুধবার সেই দিওয়ান-সভা বসত এবং রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়ে সেখানে পরামর্শ হতো। যারা অন্য সময় সুলতানের সঙ্গে দেখা করতে পারত না, এ দিন তারাও সুলতানের কাছে তাদের অভিযোগ পেশ করার সুযোগ পেত। (৪৬০)

মামলুকি শাসকগণও দুর্নীতি দমন বিভাগকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে সেই বিভাগ পরিচালনার জন্য বিশিষ্ট বিচারক ও বিখ্যাত ফকিহদের দায়িত্ব প্রদান করেন। অনেক ক্ষেত্রে নিজেরাও তাতে হস্তক্ষেপ করতেন।

৬৬১ হিজরির ঘটনাসমগ্র বর্ণনা করতে গিয়ে মাকরিযি লেখেন, আলেকজান্দ্রিয়ার অধিবাসী দুই ব্যক্তি মিশরের সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্স আল-বুন্দুকদারির (মৃ. ৬৭৬ হি.) দরবারে এলো। তাদের একজনের নাম ছিল ইবনুল বাওরি আর দ্বিতীয়জনের নাম মুকাররম ইবনে যাইয়াত। তাদের সঙ্গে কিছু কাগজ ও নথি ছিল। তাতে আত্মসাৎকৃত অর্থ উদ্ধারের বিবরণ উল্লেখ ছিল। সুলতান মঙ্গলবার তার ষষ্ঠ যুবরাজ, সহযোগী, বিচারকবৃন্দ ও ফকিহদের ডাকলেন এবং তাদের সামনে সেই নথি পাঠ করার নির্দেশ দিলেন। এরপর নথি পড়া শুরু হলো। দুর্নীতির বিবরণ পড়ার সময় তা এড়িয়ে যেতে লাগলেন এবং জড়িতদের নির্দোষ আখ্যায়িত করতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত নথি পাঠ সমাপ্ত হলে সুলতান বললেন, মনে রাখবেন, নিশ্চয় আমি একমাত্র আল্লাহর জন্য ছয় লাখ দিনার অনুমোদন করেছি যা বিভিন্ন ব্যবহৃত বস্তু সংরক্ষণ ও সংশোধনের কাজে ব্যয় হয়েছে। পথিক, দাস, দাসিনী ও খেজুরবৃক্ষ প্রতিপালনের কাজে খরচ হয়েছে। ফলে মহান আল্লাহ এর চেয়ে বেশি অর্থ হালাল উপায়ে আমার জন্য ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আমি সকল বিভাগ থেকে অর্থের সুষ্ঠু ব্যয়ের হিসাব চেয়েছিলাম আর তা দুর্নীতির সকল অর্থ বাদ দিয়েও অনেক বেশি হয়েছে। যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য কিছু বর্জন করবে, মহান আল্লাহ এর চেয়ে উত্তম বস্তু দিয়ে তার বিনিময় দেবেন। সুলতান এরপর ইবনুল বাওরিকে সেই নথি প্রচার করার নির্দেশ দিলেন। (৪৬১)

উপর্যুক্ত ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সুলতান রাজ্যের সকল বিভাগ ও মন্ত্রণালয় থেকে হিসাব গ্রহণ করতেন। মন্ত্রী, আমলা, বিচারবিভাগ সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। তেমনই জনগণের অর্থসম্পদ নষ্ট করার ব্যাপারে ফকিহগণও তাদের কাছে কৈফিয়ত চাইতেন। বারবার তাদের স্মরণ করিয়ে দিতেন। সুলতান বিষয়টি নিজের অধিকারে নয় প্রমাণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার স্বর্ণমুদ্রা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ছেড়ে দেন। এর পেছনে তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল জনগণের অর্থের সুরক্ষা ও সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা। বরং যে দুই ব্যক্তি এ নথিপত্র নিয়ে আসেন তাদের একজনকে সুলতান পদচ্যুত করেন। তার ব্যাপারটি প্রচার করার জন্য এবং পুরো কায়রো শহরে তাকে লাঞ্ছিত করার জন্য সুলতান নির্দেশ প্রদান করেন। কারণ সুলতান তখন পর্যন্ত ঘটনার আদ্যোপান্ত জানতেন না।

জনগণের অর্থের ব্যাপারে অভিযোগ ও বিচার কার্যক্রম দেখাশোনা করতে মামলুকি সুলতানদের অনেকে সরকারি ক্ষেত্রগুলোতে চলে যেতেন। এমনই একজন ছিলেন সুলতান সাইফুদ্দিন বারকুক (মৃ. ৮০১ হি.)। ৭৯২ হিজরির ঘটনাসমগ্র বর্ণনা করতে গিয়ে মাকরিযি লেখেন, সুলতান বারকুক যথারীতি দুর্গের বাইরে এসে দুর্নীতির মামলা ও অভিযোগ শোনার জন্য জনগণের সামনে বসতেন। মানুষও তার কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ত। প্রচুর পরিমাণ অভিযোগ নিয়ে আসত। যার ফলে বড় বড় সরকারি মন্ত্রী-আমলাগণ সবসময় তটস্থ থাকতেন। কার বিরুদ্ধে কখন অভিযোগ চলে আসে সেজন্য সবাই সাবধান থাকতেন। (৪৬২)

ইসলামি সভ্যতার ইতিহাসে খলিফা ও শাসকদের এ মহান উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার দ্বারা এটিই প্রমাণ হয় যে, রাজ্যের কোনো মানুষই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। ভুল করলে এর শাস্তি তাকে পেতেই হবে, তা সে যত ক্ষমতার অধিকারীই হোক। এ ব্যাপারে কে আমির, কে সাধারণ নাগরিক, কে ধনি, কে গরিব এর কোনো তারতম্য ছিল না। উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কোনো মানুষই বিচারের আওতার বাইরে নয়, এমনকি আমির, গভর্নর, সেনাপতি, উযির, মন্ত্রী এবং রাজ্যের ক্ষমতাধর ব্যক্তিবর্গও বিচারের সম্মুখীন হয়েছেন। ইসলামি সভ্যতা কত মহান, কত ন্যায়পরায়ণ এ ঘটনাগুলোর দ্বারা তারই প্রমাণ মিলে। পারসিক সভ্যতা, রোমান সভ্যতা, এমনকি বর্তমান সময়ের আন্তর্জাতিক আদালতও ইসলামি সভ্যতার সমপর্যায়ের হওয়া তো দূরের কথা, ধারেকাছেও আসতে পারেনি। কারণ, জালিম যত বড় ও প্রতাপশালীই হোক, ইসলাম তার ওপর যথাযথ দণ্ড প্রয়োগ করে সবার জন্য তাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে। আজকের সভ্য (!) পৃথিবীতে এরকম নজির দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া যায় না।

এরপরও আমরা বলব, ইসলামি সভ্যতায় বিচারব্যবস্থা যেরকম স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য উপভোগ করত, তার বিশদ বিবরণ সামান্য কয়েক পৃষ্ঠায় সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়। এটি নিতান্তই দুঃসাধ্য কাজ। কিন্তু যেসব ঘটনা ও পদক্ষেপের বিবরণ আমরা এ কয়েক পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছি, তার দ্বারা এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামি সভ্যতাই বিচার সংক্রান্ত আধুনিক বিধিবিধান ও উন্নত দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার এমন সব সংবিধান ও নিয়মকানুন আবিষ্কার করেছে, যেগুলো বর্তমান সময়ের সংবিধান প্রণয়নকারী সংগঠন ও রাষ্ট্র পরিচালনাকারী সংস্থার জন্য উত্তম আদর্শ ও প্রধান ভিত্তি ছিল এবং দেশ পরিচালনার পথে সরল ও সুন্দর পদ্ধতি ছিল।

টিকাঃ
৪০৯. খুশানি, কযাতু কুরতুবা, পৃ. ৫৪।
৪৪০. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ২২২।
৪০. মাওয়ারদি, আল-আহকামুস সুলতানিয়‍্যা, পৃ. ৬৪।
৪৪২. প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৯-৭০।
৪৪৩. আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামি, পৃ. ১২৮।
৪৪৪. মুস্তাফা আল-বারুদি, আল-ওয়াজিয ফিল-হুকুকিল ইদারিয়্যা, পৃ. ৫৭-৫৮; যাফের কাসেমি, নিযامুল হুকমি ফি-শারিআতি ওয়াত-তারিখ, খ. ২, পৃ. ৫৫৫।
৪৪৫. বুখারি, হাদিস নং ৬৭৫৩; মুসলিম, হাদিস নং ১৮৩২।
৪৪৬. ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা, খ. ৬, পৃ. ৮৬।
৪৪৮. ইবনে আবদুল হাকাম, সিরাতু উমার ইবনে আবদুল আযিয, পৃ. ১৪৬-১৪৭।
৪৪৯. ইবনে আসাকির, তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, খ. ৩২, পৃ. ৩৯২।
৪৫০. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ৪, পৃ. ৫৮৬।
৪৫১. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ৪, পৃ. ৬১০।
৪০২. মাওয়ারদি, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, পৃ. ১৪৬-১৪৭।
৪৫০. ইবনুল আসির, আল-কামিল ফিত-তারিখ, খ. ৫, পৃ. ২২৪।
৪৫৪. প্রাগুক্ত।
৪৫৫. ইবনে ইযারি, আল-বায়ানুল মুগরিব, পৃ. ১১২।
৪৫৬. নাবাহি, তারিখু কুযাতিল উন্দুলুস, পৃ. ৮৬।
৪৫৭. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ৪, পৃ. ৩১৫।
৪৫৮. প্রাগুক্ত, খ. ৪, পৃ. ৩৮২।
৪৫৯. মাকরিযি, আস-সুলুক, খ. ১, পৃ. ২৪৭।
৪৬০. নাসিরি, আল-ইসতিকসা লি-আখবারিল মাগরিবিল আকসা, খ. ৫, পৃ. ১৮৮।
৪৮১. মাকরিযি, আস-সুলুক, খ. ১, পৃ. ৫৬০।
৪৬২. প্রাগুক্ত, খ. ৫, পৃ. ২৮৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00