📄 বিচারকদের দায়িত্ব নির্ধারণ
একজন বিচারকের প্রধান দায়িত্ব ছিল, মামলামোকদ্দমা নিষ্পত্তি করা, বিরোধ নিরসন করা, পাওনা আদায়ে যে লোক টালবাহানা করছে তার কাছ থেকে প্রকৃত মালিকের কাছে সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া। আপন সম্পদের হস্তক্ষেপে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অর্থসম্পদ দেখাশোনা করা, অপরাধীদের ওপর দণ্ড প্রয়োগ করা। তার সাক্ষী ও আমিনদের পর্যবেক্ষণ করা, তার প্রতিনিধিদের নিয়োগ ও বিচারিক কাজে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদান ইত্যাদি। (৪২০)
শুধু তাই নয়, একজন বিচারকের দায়িত্ব এমন আরও অনেক ধর্মীয় বিষয়জুড়ে পরিব্যাপ্ত ছিল, বিচারিক কাজের সাথে যার কোনো সম্পর্ক নেই। শরিয়ত সম্পর্কে অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী হওয়ায় অধিকাংশ সময় বিচারকদেরই জামে মসজিদে নামাযের ইমামতি করা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান দেখাশোনা করা, অনুপস্থিত ও হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের সম্পদ দেখাশোনা করা, হজের বিষয়গুলো তদারকি করা এবং লোকদের থেকে খলিফার আনুগত্যের অঙ্গীকার গ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হতো। (৪২১)
জ্ঞানের গভীরতার কারণে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে অসামান্য মর্যাদার অধিকারী হওয়ায় অনেক প্রধান বিচারপতি উন্নতি করতে করতে উযিরের পদে অধিষ্ঠিত হন। মনসুর ইবনে আবু আমিরের শাসনামলে আন্দালুসের প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালনকারী আহমাদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে যাকওয়ানের জীবনবৃত্তান্তে নাবাহি বলেন, মনসুর ইবনে আবু আমির তাকে প্রধান বিচারপতির পাশাপাশি উযিরের দায়িত্ব প্রদান করেন। বনু আমিরের শাসনামলের শেষ পর্যন্ত তিনি সেই পদে বহাল ছিলেন। (৪২২)
মামলুক রাজবংশের শাসনামলে মিশরে বিচারকের পদটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী। বিচারকাজ সম্পাদনের পাশাপাশি আরও অনেক দায়িত্ব বিচারকদেরকেই সম্পাদন করতে হতো। আল-বিদায়া ওয়ান- নিহায়া গ্রন্থে তাজুদ্দিন ইবনে বিনতুল আআয-এর জীবনবৃত্তান্ত বর্ণনা করতে গিয়ে ইবনে কাসির রহ. লেখেন, তার হাতে একে একে সতেরোটি পদ ছিল। এর মধ্যে ছিল বিচারিক দায়িত্ব, জুমার ইমামতি, ওয়াকফকৃত সম্পত্তি দেখাশোনা, রাষ্ট্রীয় অর্থ তহবিল দেখাশোনা ইত্যাদি। (৪২৩)
ইসলামের স্বর্ণযুগে কাযি বা বিচারকগণ যে অসামান্য সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী ছিলেন এসব দায়িত্ব পালন তাদের মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। তাজুদ্দিন সুবকির বৃত্তান্তে বর্ণিত আছে যে, তিনি প্রথমে প্রধান বিচারপতি নির্বাচিত হন। এ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি শাফিয়ি মাযহারের ওপর ফিকহের দরস দিতেন, তুলুনের জামে মসজিদে জুমা ও ঈদের নামাযের ইমামতি করতেন, মাদরাসায়ে শাইখুনিয়ায় শিক্ষকতা করতেন, বিচারালয়ে ফতোয়া প্রদান করতেন। তা ছাড়া দামেশকের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তিনি শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করতেন। এতসব দায়িত্বের মাঝে সমন্বয় করতে গিয়ে তিনি যা করতেন তা হলো, মিশরে তিনি বিচারকাজ পরিচালনা করতেন এবং সুলতানের অনুমতিক্রমে দামেশকের মাদরাসাগুলোতে প্রতিনিধি হিসেবে কাউকে পাঠাতেন দরস দেওয়ার জন্য। (৪২৪)
টিকাঃ
৪২০. মাওয়ারদি, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, পৃ. ৫৩-৫৪; ইবনে খালদুন, আল-ইবার ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ২২১।
৪২১. আবদুল মুনয়িম মাজেদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ৪৮-৪৯।
৪২২. নাবাহি, তারিখু কুযাতিল উন্দুলুস, পৃ. ৮৬।
৪২৩. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ১৩, পৃ.৩৮০।
৪২৪. শামসুদ্দিন ইবনে তুলুন, কুযাতু দিমাশক, পৃ. ১০৪।
📄 বিশেষ বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন
ইসলামি সভ্যতায় বিচারব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত নিখুঁত ও সুসংগঠিত। বিশেষ গোষ্ঠী অথবা বিশেষ কোনো মোকদ্দমায় বিশেষ বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হতো। বেসামরিক ও সেনাবাহিনী উভয় গোষ্ঠীর বিচারপ্রক্রিয়া পৃথক রাখার জন্য আব্বাসি শাসনামলে সেনাবাহিনীর জন্য সামরিক আদালত গঠন করে সেজন্য স্বতন্ত্র বিচারক নিয়োগ করা হয়। বোঝা যায়, ইসলামি সভ্যতায় সামরিক আদালত অনেক আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। খলিফা হওয়ার পূর্বে আল-মাহদি নিজেই সৈনিকদের মধ্যে ঘটিত বিরোধ ও মামলা নিরসন করতেন। তেমনই খলিফা মামুনের মন্ত্রী হাসান ইবনে সাহল সেনাবিষয়ক বিশেষ বিচার ট্রাইব্যুনাল পরিচালনার জন্য ২০১ হিজরি সনে সাদ ইবনে ইবরাহিমকে নিয়োগ করেন। (৪২৫)
তা ছাড়া ইসলামি বিচারব্যবস্থায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ক্ষেত্রভেদে বাদী-বিবাদীর কল্যাণার্থে অনতিবিলম্বে মামলার নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। এর মধ্যে একটি ছিল স্থানীয়দের আগে মুসাফির ব্যক্তিদের মামলাগুলো নিষ্পত্তি করা। ইমাম শাফিয়ির বরাতে মাওয়ারদি লেখেন, (ইমাম শাফিয়ি বলেন,) আদালতে যদি স্থানীয় ও মুসাফির উভয় প্রকার লোক এসে হাজির হয়, তবে মুসাফিরদের সংখ্যা কম হলে তাদের মামলাগুলো আগে শেষ করতে হবে। বিচারক মুসাফিরদের জন্য আলাদা একটি দিন ধার্য করবেন। তবে স্থানীয়দের যেন কষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আর যদি মুসাফিরদের সংখ্যা বেশি হয়, যার ফলে স্থানীয় ও মুসাফিররা সংখ্যায় সমান হয় তবে সমতা বিধান করতে হবে যেন উভয় পক্ষের কারও কোনো কষ্ট না হয়। সবারই হক আছে। তবে মুসাফিরদের যেহেতু স্বদেশ ফেরার তাড়া আছে, সে হিসেবে মামলাগুলো বিলম্ব করলে তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সংখ্যায় কম হলে মুসাফিরদের মামলাগুলো অবশ্যই আগে শেষ করতে হবে। (৪২৬)
ভিসা বা অনুমতি নিয়ে অন্য ধর্মের মানুষও ইসলামি সাম্রাজ্যে অবাধে বসবাস করতে পারতেন। তাই ইসলামি বিচারবিভাগ তাদের জন্য পৃথক বিচার ট্রাইব্যুনালের ব্যবস্থা করেন। মুসলিম শাসনামলে স্ব স্ব ধর্মের পাদরি, যাজক, বিশপরাই তাদের মাঝে সংঘটিত মামলাগুলোর নিষ্পত্তি করতেন। মুসলিম বিচারকগণ সেখানে কোনোরকম হস্তক্ষেপ করতেন না। কারণ ফকিহগণও যিম্মিদের বিচারকাজ যিম্মি বিচারকদের ওপর ন্যস্ত করার বৈধতা দান করেছেন। সুবহুল আ'শা গ্রন্থে কালকাশান্দি রহ. যিম্মিদের বিচারব্যবস্থার নানা অনুষঙ্গ তুলে ধরেন। যাতে বোঝা যায়, যিম্মি বিচারকদের এই বিচারকাজ সম্পাদনের ক্ষমতা খলিফার অনুমতিক্রমেই প্রচলিত ছিল। অপরদিকে আন্দালুসে যেহেতু যিম্মিদের সংখ্যা ছিল প্রচুর, তাই মুসলিমগণ তাদের জন্য বিশেষ যিম্মি বিচারকের ব্যবস্থা করেন। তারা ভিন্ন ভিন্ন নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন। কেউ খ্রিষ্টানদের বিচারক, কেউ অনারবদের বিচারক। তবে মুসলিমের সঙ্গে কোনো যিম্মির বিরোধ ঘটলে মুসলিম বিচারকগণই তার মীমাংসা করতেন। তেমনই বিচারকগণ এক খ্রিষ্টানের বিপক্ষে অপর খ্রিষ্টানের সাক্ষ্য গ্রহণ করতেন। এক ইহুদির বিপক্ষে অপর ইহুদির সাক্ষ্য গ্রহণ করতেন। তবে মুসলিমের বিরুদ্ধে কোনো বিধর্মীর সাক্ষ্য তারা গ্রহণ করতেন না। (৪২৭)
টিকাঃ
৪২৫. ওয়াকি ইবনে খালাফ, আখবারুল কুযাতি, খ. ৩, পৃ. ২৬৯।
৪২৬. মাওয়ারদি, আদাবুল কাযি, খ. ২, পৃ. ২৮৪।
৪২৭. আবদুল মুনয়িম মাজেদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ৫৩-৫৪।
📄 বিচারব্যবস্থার ওপর নজরদারি
ইসলামি রাষ্ট্র ও শাসকশ্রেণি বিচারব্যবস্থাকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। বিচারবিভাগকে সকল প্রকার স্বার্থসিদ্ধির ঊর্ধ্বে রাখতে এবং যাবতীয় অন্যায় ও অবিচার থেকে মুক্ত রাখতে শাসকগণ বিচার কার্যক্রমের ওপর কঠোর নজরদারি আরোপ করেছেন। কোনো বিচারক দুর্নীতি, অবিচারের আশ্রয় নিলে তাকে পদচ্যুত করেছেন। বিশিষ্ট লেখক আল-কিন্দি লেখেন, ১০৫ হিজরি সনে ইয়াহইয়া ইবনে মাইমুনের বিচারিক অঞ্চলে একবার এক এতিমের মামলা সামনে আসে। ওই এতিমের বিষয়টি দেখার জন্য এতিমের গ্রামের একজন নেতাকে তিনি দায়িত্ব প্রদান করেন। এতিম ছেলেটি ওই নেতার প্রতিপালনেই বড় হচ্ছিল। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর ওই নেতার বিরুদ্ধে ইয়াহইয়া ইবনে মাইমুনের কাছে জুলুমের অভিযোগ করেও ন্যায়সম্মত প্রতিকার পায়নি। যার ফলে এতিম ছেলেটি একটি কবিতায় তার অভিযোগ লিখে ইয়াহইয়া ইবনে মাইমুনের কাছে পাঠায়। কবিতাটি ছিল :
ألا أبلغ أبا حسان عني * بأن الحكم ليس على هواكا حكمت بباطل لم تأت حقا * ولم يسمع بحكم مثل ذاكا وتزعم أنـهـا حـق وعدل * وأزعم أنها ليست كذاكا ألم تعلم بأن الله حق * وأنك حين تحكم قد يراكا
আবু হাসসান (ইয়াহইয়া ইবনে মাইমুন)-কে জানিয়ে দাও যে, বিচারব্যবস্থা তার প্রবৃত্তি অনুযায়ী চলবে না। আপনি অন্যায় বিচার করেছেন। তাতে ন্যায় বলতে কিছুই ছিল না। এরকম বিচার কখনো হয়েছে বলে লোকমুখে প্রসিদ্ধ নয়। আর আপনি ভাবছেন যে, আপনি সত্য ও সুবিচার করেছেন। আর আমি দেখছি, তা একেবারে ন্যায়-বহির্ভূত। আপনি কি বিশ্বাস করেন না যে মহান আল্লাহ সত্য, আপনি যখন বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করেন তখন তিনি আপনাকে দেখেন?!
কবিতাটি পড়ে ইয়াহইয়া ইবনে মাইমুন এতিম বালকটিকে কারাবন্দি করেন। শেষ পর্যন্ত এতিমের ইস্যুটি খলিফা হিশাম ইবনে আবদুল মালিকের কানে যায়। তিনি বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেন এবং ইয়াহইয়া ইবনে মাইমুনকে বিচারকের পদ থেকে অব্যাহতি দেন। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গভর্নর ওয়ালিদ ইবনে রিফাআর কাছে যে পত্রটি তিনি লেখেন তার ভাষা ছিল এই, লাঞ্ছিত ও বিতাড়িত করে ইয়াহইয়াকে পদচ্যুত করার ব্যবস্থা নিন। (৪২৮)
ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও অবিচার দমনে শাসকদের এরকম সুউচ্চ মনোবল ও অদম্য ইচ্ছা সমকালীন অন্য কোনো জাতি-গোষ্ঠীর ইতিহাসে একেবারেই বিরল। সাধারণ জনগণ এবং অনাথ শিশুদের অধিকার সংক্রান্ত ইস্যুগুলো শাসক ও খলিফাগণ যে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন, অন্য কোনো সভ্যতায় তার নজির পাওয়া যায় না। ইসলামি সভ্যতার যাত্রা এবং মানবতার কল্যাণ সাধনায় তার অবদান কত সুদূরপ্রসারী ছিল এর দ্বারা তারই প্রমাণ পাওয়া যায়।
ধীরে ধীরে এ বিভাগেরও উন্নতি ঘটে। একপর্যায়ে বিচারকদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো বিশেষভাবে তদন্ত করার জন্য প্রাদেশিক বিচারপতিদের সঙ্গে কাযিউল কুযাতগণ (প্রধান বিচারপতিগণ) যুক্ত হন। ফলে অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িত বিচারকদের তারা পদচ্যুত করতেন। অন্যথায় স্বপদে বহাল রাখতেন। অনেক সময় বিচারকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ষড়যন্ত্রমূলক হতো। কুযাতু কুরতুবা গ্রন্থে বর্ণিত আছে, শাসক আল-হাকামের পক্ষ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত একজন বিচারক জিয়ান অঞ্চলে কর্মরত ছিলেন। একবার স্থানীয় লোকজন তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অবিচারের অভিযোগ দায়ের করে। ফলে শাসক আল-হাকাম ওই বিচারকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের তদন্ত করতে কর্ডোভার কাযিউল জামাআ (প্রধান বিচারপতি) সাইদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে বশিরকে দায়িত্ব দেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে পদচ্যুত করার আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে স্বপদে বহাল রাখার নির্দেশ দেন। এরপর তিনি তদন্ত করে বিচারককে নির্দোষ পান। ফলে তাকে বলে দেন, আপনি আপনার দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করতে থাকুন। (৪২৯)
সে সময় আরও একটি স্বতন্ত্র আদালত প্রতিষ্ঠা হয়, যা অনেকটা আমাদের বর্তমান সময়ে প্রচলিত সুপ্রিম কোর্টের মতো। ওই আদালতকে বলা হতো খুততাতুর রদ (خطة الرد)। এই আদালতের বিচারকগণ শুধু বিচারব্যবস্থায় দায়িত্বরত বিচারকদের রায়গুলো পর্যবেক্ষণ করতেন ও সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন এবং সাধারণ বিচারকরা যে ক্ষেত্রে রায় দিতে ব্যর্থ হতেন সে ক্ষেত্রে রায় দিতেন। ওই আদালতের কাজ ছিল বিচারিক রায় ও বিচারকদের পর্যবেক্ষণ করা, স্থানীয় লোকদের গতিবিধি লক্ষ রাখা এবং বিচারক ও জনগণের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নজরদারি করা।
এই বিভাগের প্রধানের পদে যারা সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের অন্যতম হলেন আল-হাকাম মুস্তানসিরের (মৃ. ৩৬৬ হি.) শাসনামলে মুহাম্মাদ ইবনে তামলিখ আত-তামিমি এবং আবদুল মালিক ইবনে মুনযির ইবনে সাইদ। উক্ত আদালতের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারকের পদবি ছিল সাহিবুর রদ (صاحب الرد)। কারণ সকল অভিযোগ ও সংবিধান তাদের কাছে উত্থাপিত হতো। এই পদটি ছিল প্রধান বিচারপতি থেকে এক স্তর নিচের ও কাছাকাছি পর্যায়ের। (৪৩০)
টিকাঃ
৪২৮. আল-কিন্দি, আল-উলাত ওয়াল-কুযাত, পৃ. ৩৪১।
৪২৯. খুশানি, কুযাতু কুরতুবা, পৃ. ১৫।
৪৩০. নাবাহি, তারিখু কুযাতিল উন্দুলুস, পৃ. ৫।
ইসলামি রাষ্ট্র ও শাসকশ্রেণি বিচারব্যবস্থাকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। বিচারবিভাগকে সকল প্রকার স্বার্থসিদ্ধির ঊর্ধ্বে রাখতে এবং যাবতীয় অন্যায় ও অবিচার থেকে মুক্ত রাখতে শাসকগণ বিচার কার্যক্রমের ওপর কঠোর নজরদারি আরোপ করেছেন। কোনো বিচারক দুর্নীতি, অবিচারের আশ্রয় নিলে তাকে পদচ্যুত করেছেন। বিশিষ্ট লেখক আল-কিন্দি লেখেন, ১০৫ হিজরি সনে ইয়াহইয়া ইবনে মাইমুনের বিচারিক অঞ্চলে একবার এক এতিমের মামলা সামনে আসে। ওই এতিমের বিষয়টি দেখার জন্য এতিমের গ্রামের একজন নেতাকে তিনি দায়িত্ব প্রদান করেন। এতিম ছেলেটি ওই নেতার প্রতিপালনেই বড় হচ্ছিল। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর ওই নেতার বিরুদ্ধে ইয়াহইয়া ইবনে মাইমুনের কাছে জুলুমের অভিযোগ করেও ন্যায়সম্মত প্রতিকার পায়নি। যার ফলে এতিম ছেলেটি একটি কবিতায় তার অভিযোগ লিখে ইয়াহইয়া ইবনে মাইমুনের কাছে পাঠায়। কবিতাটি ছিল :
ألا أبلغ أبا حسان عني * بأن الحكم ليس على هواكا حكمت بباطل لم تأت حقا * ولم يسمع بحكم مثل ذاكا وتزعم أنـهـا حـق وعدل * وأزعم أنها ليست كذاكا ألم تعلم بأن الله حق * وأنك حين تحكم قد يراكا
আবু হাসসান (ইয়াহইয়া ইবনে মাইমুন)-কে জানিয়ে দাও যে, বিচারব্যবস্থা তার প্রবৃত্তি অনুযায়ী চলবে না। আপনি অন্যায় বিচার করেছেন। তাতে ন্যায় বলতে কিছুই ছিল না। এরকম বিচার কখনো হয়েছে বলে লোকমুখে প্রসিদ্ধ নয়। আর আপনি ভাবছেন যে, আপনি সত্য ও সুবিচার করেছেন। আর আমি দেখছি, তা একেবারে ন্যায়-বহির্ভূত। আপনি কি বিশ্বাস করেন না যে মহান আল্লাহ সত্য, আপনি যখন বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করেন তখন তিনি আপনাকে দেখেন?!
কবিতাটি পড়ে ইয়াহইয়া ইবনে মাইমুন এতিম বালকটিকে কারাবন্দি করেন। শেষ পর্যন্ত এতিমের ইস্যুটি খলিফা হিশাম ইবনে আবদুল মালিকের কানে যায়। তিনি বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেন এবং ইয়াহইয়া ইবনে মাইমুনকে বিচারকের পদ থেকে অব্যাহতি দেন। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গভর্নর ওয়ালিদ ইবনে রিফাআর কাছে যে পত্রটি তিনি লেখেন তার ভাষা ছিল এই, লাঞ্ছিত ও বিতাড়িত করে ইয়াহইয়াকে পদচ্যুত করার ব্যবস্থা নিন। (৪২৮)
ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও অবিচার দমনে শাসকদের এরকম সুউচ্চ মনোবল ও অদম্য ইচ্ছা সমকালীন অন্য কোনো জাতি-গোষ্ঠীর ইতিহাসে একেবারেই বিরল। সাধারণ জনগণ এবং অনাথ শিশুদের অধিকার সংক্রান্ত ইস্যুগুলো শাসক ও খলিফাগণ যে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন, অন্য কোনো সভ্যতায় তার নজির পাওয়া যায় না। ইসলামি সভ্যতার যাত্রা এবং মানবতার কল্যাণ সাধনায় তার অবদান কত সুদূরপ্রসারী ছিল এর দ্বারা তারই প্রমাণ পাওয়া যায়।
ধীরে ধীরে এ বিভাগেরও উন্নতি ঘটে। একপর্যায়ে বিচারকদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো বিশেষভাবে তদন্ত করার জন্য প্রাদেশিক বিচারপতিদের সঙ্গে কাযিউল কুযাতগণ (প্রধান বিচারপতিগণ) যুক্ত হন। ফলে অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িত বিচারকদের তারা পদচ্যুত করতেন। অন্যথায় স্বপদে বহাল রাখতেন। অনেক সময় বিচারকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ষড়যন্ত্রমূলক হতো। কুযাতু কুরতুবা গ্রন্থে বর্ণিত আছে, শাসক আল-হাকামের পক্ষ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত একজন বিচারক জিয়ান অঞ্চলে কর্মরত ছিলেন। একবার স্থানীয় লোকজন তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অবিচারের অভিযোগ দায়ের করে। ফলে শাসক আল-হাকাম ওই বিচারকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের তদন্ত করতে কর্ডোভার কাযিউল জামাআ (প্রধান বিচারপতি) সাইদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে বশিরকে দায়িত্ব দেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে পদচ্যুত করার আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে স্বপদে বহাল রাখার নির্দেশ দেন। এরপর তিনি তদন্ত করে বিচারককে নির্দোষ পান। ফলে তাকে বলে দেন, আপনি আপনার দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করতে থাকুন। (৪২৯)
সে সময় আরও একটি স্বতন্ত্র আদালত প্রতিষ্ঠা হয়, যা অনেকটা আমাদের বর্তমান সময়ে প্রচলিত সুপ্রিম কোর্টের মতো। ওই আদালতকে বলা হতো খুততাতুর রদ (خطة الرد)। এই আদালতের বিচারকগণ শুধু বিচারব্যবস্থায় দায়িত্বরত বিচারকদের রায়গুলো পর্যবেক্ষণ করতেন ও সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন এবং সাধারণ বিচারকরা যে ক্ষেত্রে রায় দিতে ব্যর্থ হতেন সে ক্ষেত্রে রায় দিতেন। ওই আদালতের কাজ ছিল বিচারিক রায় ও বিচারকদের পর্যবেক্ষণ করা, স্থানীয় লোকদের গতিবিধি লক্ষ রাখা এবং বিচারক ও জনগণের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নজরদারি করা।
এই বিভাগের প্রধানের পদে যারা সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের অন্যতম হলেন আল-হাকাম মুস্তানসিরের (মৃ. ৩৬৬ হি.) শাসনামলে মুহাম্মাদ ইবনে তামলিখ আত-তামিমি এবং আবদুল মালিক ইবনে মুনযির ইবনে সাইদ। উক্ত আদালতের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারকের পদবি ছিল সাহিবুর রদ (صاحب الرد)। কারণ সকল অভিযোগ ও সংবিধান তাদের কাছে উত্থাপিত হতো। এই পদটি ছিল প্রধান বিচারপতি থেকে এক স্তর নিচের ও কাছাকাছি পর্যায়ের। (৪৩০)
টিকাঃ
৪২৮. আল-কিন্দি, আল-উলাত ওয়াল-কুযাত, পৃ. ৩৪১।
৪২৯. খুশানি, কুযাতু কুরতুবা, পৃ. ১৫।
৪৩০. নাবাহি, তারিখু কুযাতিল উন্দুলুস, পৃ. ৫।
📄 খলিফা ও শাসকগণও বিচারের আওতাধীন
কোনো সন্দেহ নেই, মানবসভ্যতার ইতিহাসে অনেক আগে থেকেই বিচারবিভাগের স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতার ইতিবৃত্ত পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, বরং ইসলামি সভ্যতার যুগে আরও উৎকৃষ্ট ও সমুজ্জ্বলরূপে তা প্রতিষ্ঠিত হয়। ইউরোপ ও সমগ্র বিশ্ব গত দু-শতাব্দী ধরে যে স্বাধীন বিচারবিভাগের সঙ্গে পরিচিত, ইসলাম তা প্রতিষ্ঠা করেছে আরও বারো শতাব্দী পূর্বেই।
একবার আমিরুল মুমিনিন আলি ইবনে আবু তালিব রা. একটি ঢাল নিয়ে একজন খ্রিষ্টান ব্যক্তির সঙ্গে বিরোধের জের ধরে বিচারকের শরণাপন্ন হন। বিখ্যাত লেখক ইবনে কাসির রহ. সেই ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে লেখেন, আলি ইবনে আবু তালিব রা. তার হারিয়ে যাওয়া একটি ঢাল একজন খ্রিষ্টান ব্যক্তির কাছে খুঁজে পান। এরপর ওই খ্রিষ্টান ব্যক্তিকে নিয়ে তৎকালীন বিচারক শুরাইহ রা.-এর কাছে গিয়ে বিচার দাবি করে বলেন, এই ঢালটি আমার। ঢালটি তার কাছে পাওয়া গেছে। তার কাছে এটি আমি বিক্রিও করিনি আর তাকে দানও করিনি। তা শুনে শুরাইহ রা. ওই খ্রিষ্টান ব্যক্তিকে বললেন, আমিরুল মুমিনিন যা বলছেন সে ব্যাপারে তোমার কী মত? উত্তরে খ্রিষ্টান বলল, ঢালটি আমারই। আর আমিরুল মুমিনিনকে মিথ্যুক বলার সাহস আমার নেই। এরপর শুরাইহ রা. আলি ইবনে আবু তালিব রা.-এর দিকে তাকিয়ে বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন, আপনার কাছে কোনো প্রমাণ আছে? এ কথা শুনে আলি রা. হেসে ওঠেন এবং বলেন, শুরাইহ ঠিক ধরেছে, আমার কাছে তো কোনো প্রমাণ নেই। এরপর শুরাইহ রা. খ্রিষ্টান ব্যক্তির পক্ষে রায় দিয়ে দেন।
ইবনে কাসির রহ. লেখেন, এরপর ঢালটি নিয়ে খ্রিষ্টান লোকটি হেঁটে কিছুদূর চলে গিয়ে আবার ফিরে আসে এবং বলে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আজ যে নিরপেক্ষ বিচার-মীমাংসা করা হলো নিঃসন্দেহে এটি নবী-রাসুলদের বিচারব্যবস্থা। কী আশ্চর্য, একজন বিচারক স্বয়ং আমিরুল মুমিনিনের বিপক্ষে আমার জন্য রায় দিলেন। নিশ্চয় আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসুল। আল্লাহর শপথ! এই ঢালটি আপনারই হে আমিরুল মুমিনিন।(৪০১)
খ্রিষ্টান লোকটি বিচারবিভাগের এই স্বাতন্ত্র্য ও ক্ষমতা দেখে, এই ন্যায্য বিচার পেয়ে এবং বিচারক শুরাইহ রা. ও আমিরুল মুমিনিন আলি ইবনে আবু তালিব রা.-এর অবস্থান দেখে সে অভিভূত হয়ে যায়। তার আর বুঝতে বাকি থাকে না যে, এই সভ্যতা বড় সুন্দর ও অতিশয় মহান। তার বিচারব্যবস্থা অত্যন্ত ন্যায়সংগত। তাই তো দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গেই সে চিরদিনের জন্য এই সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্মের ও চিরন্তন সভ্যতায় আশ্রয় নেওয়ার ঘোষণা পাঠ করে।
আব্বাসি শাসনামলে বিচারবিভাগ ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও স্বাধীন। যার ফলে আমরা দেখি, অনেক বিচারক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী খলিফা বা সরকারি উচ্চপদস্থ লোকদের বিরুদ্ধে শক্ত ও কঠিন অবস্থান নিতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না। সুষ্ঠু ও ন্যায্য বিচার প্রতিষ্ঠায় তারা কারও হুমকি-ধমকির ও নিন্দাবাক্যের তোয়াক্কা করতেন না। একবার বিখ্যাত প্রতাপশালী আব্বাসি শাসক আবু জাফর মনসুর বসরার বিচারক সাওয়ার ইবনে আবদুল্লাহর কাছে পত্র লেখেন, অমুক জমি নিয়ে একজন সেনাপতি এবং একজন ব্যবসায়ীর মাঝে বিরোধ চলছে, সেই জমিটি আপনি সেনাপতির কাছে হস্তান্তর করুন। উত্তরে সাওয়ার লেখেন, উপযুক্ত প্রমাণ সাপেক্ষে আমার কাছে পরিষ্কার হয়েছে যে, জমিটি ওই ব্যবসায়ীর। তাই কোনো প্রমাণ ছাড়া তার কাছ থেকে আমি জমি নিয়ে সেনাপতিকে দিতে পারব না। প্রত্যুত্তরে বাদশা মনসুর লেখেন, ওই আল্লাহর শপথ! যিনি ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই, অবশ্যই আপনি ওই জমিটি সেনাপতির কাছে হস্তান্তর করবেন। এর উত্তরে সাওয়ার লেখেন, ওই আল্লাহর শপথ! যিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই, উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া জমিটি ব্যবসায়ীর হাতছাড়া করব না। এই পত্রটি পড়ে মনসুর বলেন, আল্লাহর শপথ, এই ভূখণ্ডকে আমি ন্যায়বিচার দিয়ে পরিপূর্ণ করেছি। আমার বিচারকগণ সত্য ও ন্যায়ের দিকে আমাকে ফিরিয়ে এনেছে। (৪০২)
বিচার, সাক্ষ্য ও দাবিদাওয়া প্রমাণের জন্য বিচারকগণ খলিফা ও শাসকদেরকে আদালতে হাজির করতেন। আর খলিফা ও বাদশাগণও স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা মেনে নিতেন। বিচারকের রায় মাথা পেতে মেনে নিতেন। এর ব্যতিক্রম ঘটনাও আছে। তবে সেগুলো নিতান্তই কম। বিচারবিভাগের রায় মানলে বা আদালতে উপস্থিত হতে অস্বীকার করলে খলিফাদেরকে সিংহাসন থেকে পদচ্যুত করার বা তাদের বিষয়টি জনগণের ওপর ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দিতেন বিচারকগণ। তবে সর্বাবস্থায় বিচারকদের রায়কে সম্মান করা হতো। পুরোপুরিভাবে তা কার্যকর করা হতো। জনগণ ও খলিফার মাঝে সংঘটিত যে মামলাগুলোর কথা ইতিহাসে পাওয়া যায়, তার মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলো বোদশা আবু জাফর মনসুরের শাসনামলে বাগদাদের বিচারপতি মুহাম্মাদ ইবনে ইমরান আত-তালহির কাছে দায়ের করা কুলিদের মামলা। ঘটনার সারমর্ম হলো, একবার খলিফা আবু জাফর মনসুর কুলিদেরকে শামে পাঠিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা করলেন। প্রচণ্ডরকম কষ্ট ও দুর্ভোগে পড়তে হবে বিধায় খলিফার এই ইচ্ছা কুলিদের মনঃপূত হয়নি। ফলে বিষয়টি তারা কাযি মুহাম্মাদ ইবনে ইমরানের কাছে উত্থাপন করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি খলিফা মনসুরকে আদালতে ডাকেন। লেখককে বলে দেন, কাঠগড়ায় ডাকার সময় খলিফা না বলে শুধু নাম দিয়ে তাকে সম্বোধন করতে। এরপর খলিফা মনসুর বিচারের মজলিসে উপস্থিত হলে খলিফার সম্মানে আসন ছেড়ে না দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের মতো আচরণ করেন। পরিশেষে তিনি কুলিদের পক্ষে রায় দেন। বিচারপ্রক্রিয়া সমাপ্ত হওয়ার পর তিনি উঠে গিয়ে মনসুরকে খলিফা ও আমিরুল মুমিনিন হিসেবে সালাম দেন। তার এই ন্যায়বিচার দেখে মনসুর খুশি হয়ে যান। সুষ্ঠু এই বিচারিক কর্মকাণ্ডের জন্য তার প্রশংসা জ্ঞাপন করেন। সাধুবাদ জানান এবং তাকে দশ হাজার দিনার পুরস্কার প্রদানের নির্দেশ দেন (৪০০)
বিচারকদের এই বলিষ্ঠ অবস্থানের কারণে খলিফাগণও তাদের অত্যন্ত সম্মান করতেন। বিচারবিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করতেন না। এমনকি বিচারকদের সামনে বিনয়ের সাথে সোজা দণ্ডায়মান হওয়ার যে সাধারণ নিয়ম, তা পালনেও তারা সামান্য ত্রুটি করতেন না। বর্ণিত আছে, খলিফা আল-মাহদি (ইনতেকাল ১৬৯ হি.) একবার কোনো এক মামলায় বিবাদীপক্ষকে সাথে নিয়ে বসরায় বিচারক আবদুল্লাহ ইবনে হাসান আল-আনবারির কাছে আসেন। বিচারক খলিফাকে আসতে দেখেও মাথা নিচু করে স্বাভাবিকভাবে নিজ আসনে নীরবে বসে থাকেন। এরপর খলিফা বিচারপ্রার্থীদের আসনে বিবাদী পক্ষের সাথে তিনি সাধারণ ব্যক্তিদের মতো বসে পড়েন। বিচারপ্রক্রিয়া শেষে কাযি আবদুল্লাহ উঠে গিয়ে খলিফাকে অভিবাদন দেওয়ার সময় খলিফা আল-মাহদি বলেন, আল্লাহর শপথ! আদালতে প্রবেশের সময় আমাকে দেখে যদি আপনি দাঁড়িয়ে যেতেন, তাহলে অবশ্যই আমি আপনাকে পদচ্যুত করতাম। আর বিচার শেষে যদি আপনি আসন ত্যাগ না করতেন, তাহলেও আমি আপনাকে পদচ্যুত করতাম। (৪০৪)
আব্বাসি শাসনামলে বিচারবিভাগের প্রভাব ও ক্ষমতা ছিল অপরিসীম। বিচারব্যবস্থা ছিল সকল স্বার্থসিদ্ধির ঊর্ধ্বে। বিচারবিভাগের কাছে সকল মানুষ ছিল সমান। বাগদাদের বিচারপতি আবু হামিদ আল-ইসফারায়িনি (মৃ. ৪০৬ হি.) একবার আব্বাসি খলিফার কাছে পত্র লেখেন। শরিয়া বিচার ব্যবস্থা কার্যকর করা না হলে এবং বিচারবিভাগের ওপর আস্থা প্রদর্শন না করলে তাকে খলিফার পদ থেকে বিচ্যুত করার হুমকি দেন। শুধু তাই নয়, পত্রে তিনি অনমনীয় ও শক্ত ভাষা প্রয়োগ করে লেখেন,
জেনে রাখবেন, মহান আল্লাহ আমাকে যে বিচারক বানিয়েছেন সেই পদ থেকে বিতাড়িত করার ক্ষমতা আপনার নেই। আর আমি ইচ্ছা করলে খোরাসানের উদ্দেশে দু-কথার ছোট পত্র লিখে আপনাকে খিলাফতের পদ থেকে বিচ্যুত করার ক্ষমতা রাখি। (৪০৫)
বক্তব্য শুনতে বা সাক্ষ্য প্রদান করতে আমির ও খলিফাদের বিচারালয়ে ডাকা হতো। এটিকে খলিফাগণও বিন্দুমাত্র অসম্মানজনক বা কলঙ্ক মনে করতেন না। যেমন আব্বাস ইবনে ফিরনাস (৪৩৬) ছিলেন আন্দালুসের বিখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানী। তার হাত ধরে বহু আবিষ্কার সাধন হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, ইতিহাসে তিনিই প্রথম আকাশে উড্ডয়নের প্রয়াস পেয়েছেন। তার এ যোগ্যতা ও বুদ্ধিবৃত্তি তাকে শাসক শ্রেণির সান্নিধ্যে নিয়ে যায়।
এই তাত্ত্বিক ব্যুৎপত্তি, ব্যাপক সুখ্যাতি ও খলিফাদের নিকট সম্মানিত হওয়ার কারণে হিংসুক ও নিন্দুক শ্রেণি তৈরি হয়। জাদু ও ভেলকি চর্চা করে এবং উদ্ভট ও আজব বিষয় নিয়ে সারাদিন ঘরে ও গবেষণার ল্যাবে পড়ে থাকে এ ধরনের অপবাদ আরোপ করতে থাকে তার বিরুদ্ধে। কারণ তিনি ক্যামিস্ট্রি নিয়ে গবেষণা করতেন। ফলে সবসময় তার বাড়ি থেকে এক প্রকার ধোঁয়া উঠতে দেখা যেত।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিচারের জন্য তাকে কর্ডোভার আদালতে ডাকা হয়। তখন খলিফা ছিলেন আবদুর রহমান ইবনে হাকাম ইবনে হিশাম উমাবি। তাকে বলা হয়, আপনি অনেক উদ্ভট বিষয় নিয়ে পড়ে থাকেন। এক বস্তুর সঙ্গে অপর বস্তু সংমিশ্রণ করে অদ্ভুত ও আজগুবি বিষয় আবিষ্কার করেন। এরকম তো আমরা আগে কখনো দেখিনি। এর উত্তরে তিনি বলেন, ধরুন আমি যদি পানির সঙ্গে আটা মিলিয়ে খামিরা তৈরি করি। এরপর আগুনের সাহায্যে ওই খামিরা থেকে রুটি বানাই, তাহলে কি সেটি জাদু হবে? সবাই বলল, না। বরং এই প্রক্রিয়া মহান আল্লাহই মানুষকে শিখিয়েছেন। এরপর তিনি বলেন, বাড়িতে আমি ঠিক এই কাজটিই করে থাকি। এক বস্তুর সঙ্গে অপর বস্তু সংমিশ্রণ করে আগুনের সাহায্যে এরকম অনেক বিষয় আবিষ্কার করি, যা মুসলিমদের উপকারে আসবে। তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে কাজে লাগবে। (৪০৭)
তার এই দাবির যথার্থতা সম্পর্কে আদালত সাক্ষী তলব করলে খলিফা আবদুর রহমান ইবনে হাকাম ইবনে হিশাম নিজেই আদালতে উপস্থিত হয়ে তার পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করেন, তিনি এরকম এরকম কাজ করেন (অর্থাৎ যা-কিছুই করেন, সেজন্য তিনি সুনির্দিষ্ট মূলনীতি অনুসরণ করেন)। আমাকে যা জানিয়েছেন, তিনি তাই করেছেন। আমি মনে করি তার কাজগুলো মুসলিমদের উপকারে আসবে। জাদুবিদ্যার সঙ্গে জড়িত কিছু করতে দেখলে সবার আগে আমিই তার ওপর দণ্ড প্রয়োগ করতাম।
রাষ্ট্রের কর্ণধার ও মুসলিম শাসক নিজেই আদালতে হাজির হয়ে ন্যায়ের সাক্ষ্য দিয়েছেন এই বিজ্ঞানীর পক্ষে। আর বিচারকও ইবনে ফিরনাসের পক্ষে রায় দিয়েছেন। সমকালীন ফকিহগণও তার প্রশংসা করে তার কর্মের স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। আরও বেশি করে উপকারী বিষয় আবিষ্কার করে যেন মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করতে পারেন, সে বিষয়ে তাকে নিয়মিত উৎসাহ প্রদান করছেন। এভাবেই সর্বমহলে তার মর্যাদা সুরক্ষিত হয়।
খলিফা, আমির, শাসকশ্রেণির উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের কেউ ভুল ও অন্যায় কিছু করলে বিচারকগণ তাদের আদালতে হাজির হতে বাধ্য করতেন। কুযাতু কুরতুবা গ্রন্থে আল-খুশানি লেখেন, একবার বিচারক আমর ইবনে আবদুল্লাহর কাছে কর্ডোভার একজন সাধারণ দুর্বল নাগরিক এসে আমির মুহাম্মাদের একজন প্রভাবশালী আমলার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। সরকারি স্তরে ওই আমলার বিরাট প্রভাব ও দাপট ছিল। নগরপতি হওয়ার মনোনয়ন পেয়েছিল। পরে এক সময় সে গভর্নর হয়ে যায়। ওই দুর্বল লোকটি আদালতে এসে মামলা দায়ের করে যে, বিচারক মহোদয়, অমুক ব্যক্তি আমার বাড়ি জবরদখল করেছে। বিচারক বললেন, আপনি জমির কাগজ নিয়ে তার কাছে যান। তা শুনে দুর্বল লোকটি বলল, আমার মতো দুর্বল ও সাধারণ নাগরিক তার কাছে যাবে জমির দলিল দেখাতে?! নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আমি শঙ্কিত। বিচারক বললেন, আমি যেভাবে বলেছি সেভাবে জমির কাগজ নিয়ে তার কাছে যান। দেখুন কী হয়। এরপর লোকটি বিচারকের নির্দেশমতো দলিলপত্র নিয়ে তার কাছে যায়। কিছুক্ষণ পর লোকটি ফিরে এসে বলল, বিচারক মহোদয়, আমি তার কাছে গিয়েছিলাম। দূর থেকে তাকে জমির কাগজ দেখিয়ে পালিয়ে এসেছি। বিচারক আমর বললেন, বসুন। সে আসবে এখানে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই আমলা সদলবলে এসে উপস্থিত হলো। তার সামনে ছিল অনেক অশ্বারোহী ও পদাতিক নিরাপত্তারক্ষী। এরপর তিনি পা ভাঁজ করে অশ্ব থেকে অবতরণ করলেন। এরপর মসজিদে প্রবেশ করে বিচারক ও মজলিসে বসা সকলকে সালাম দিলেন। এরপর যথারীতি দাম্ভিকতা প্রদর্শন করতে মসজিদের দেয়ালে টেক্কা দিয়ে দাঁড়ালেন।
বিচারক আমর ইবনে আবদুল্লাহ বললেন, আপনি ওখানে যান। বাদীর মুখোমুখি হয়ে ওই জায়গায় বসুন। উত্তরে ওই আমলা বললেন, বিচারককে আল্লাহ সংশোধন করুন। এটি মসজিদ। মসজিদে তো কোনো কাঠগড়া নেই। এখানে সব জায়গাই সমান। আমর বলেন, আমি যেভাবে বলেছি সেভাবে বাদীর সামনে গিয়ে বসুন। বিচারককে তার বক্তব্যে অনড় দেখে তিনি দুর্বল লোকটির সামনে বসতে বাধ্য হলেন।
এরপর বিচারক দুর্বল লোকটিকেও বললেন আমলার মুখোমুখি হয়ে বসতে। এরপর তিনি দুর্বল লোকটিকে বলেন, এবার আপনি আপনার বক্তব্য উপস্থাপন করুন। তিনি বললেন, আমার বক্তব্য হলো এই লোকটি আমার ঘর জবরদখল করেছেন। এরপর আমলার উদ্দেশে বললেন, এখন আপনি আপনার বক্তব্য তুলে ধরুন। তিনি বললেন, আমার বক্তব্য হলো, আমার মতো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে জবরদखলের অভিযোগ মানহানির শামিল। তার এ কথা শুনে বিচারক বললেন, এ ধরনের বক্তব্য কোনো পুণ্যবান ব্যক্তির মুখেই মানায়, আপনার মতো মানুষের জমি জবরদখলে বিখ্যাত ব্যক্তিদের মুখে নয়। এরপর বিচারক আদালতে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কয়েকজনকে বললেন, আপনারা তার সাথে যান। তার ব্যাপারে খেয়াল রাখুন, যদি লোকটিকে তার ঘর বুঝিয়ে দেয় তাহলে তো সমাধান হলো। তা না হলে তাকে গ্রেফতার করে আমার কাছে নিয়ে আসবেন। আমি নিজে আমিরের কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করব। তার সকল অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতির কথা বাদশাকে খুলে বলব। এরপর ওই আমলা পুলিশদের সাথে বের হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর পুলিশ ও দুর্বল ব্যক্তিটি ফিরে এলো। দুর্বল লোকটি বিচারককে বলল, আজ আপনি যে বিচার করলেন তার জন্য আপনাকে মহান আল্লাহ উত্তম বিনিময় দান করুন। ওই আমলা আমার বাড়ি ফিরিয়ে দিয়েছে। বিচারক বললেন, এবার নিরাপদে বাড়ি ফিরে যান। (৪৩৮)
এ ধরনের ন্যায্য বিচারের দ্বারা কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়:
এক. অভিযোগ দায়ের করা ব্যক্তিকে আদালতে ডাকা হতো বিভিন্ন নিয়মে এবং বিচারকাজ সম্পাদন করা হতো নানা পদ্ধতিতে।
দুই. ইসলামি সভ্যতায় বিচারবিভাগ ছিল স্বাধীন। তার প্রভাব ও ক্ষমতা ছিল অপরিসীম।
তিন. বিচারকের সামনে সবাই ছিল সমান। কে দুর্বল, কে সবল, কে প্রভাবশালী, কে আমলা, কে ধনী, কে গরিব এর কোনো তারতম্য ছিল না।
চার. রায় প্রদান ও সিদ্ধান্ত কার্যকর হতো খুব দ্রুত।
দুর্বল ওই লোকটির বাড়ি যেদিন জবরদখল করা হয়, ঠিক সেদিনই সে মামলা করে। আর সেদিনই ন্যায্য বিচার পেয়ে সে তার বাড়ি ফিরে পায়।
ইসলামি সভ্যতায় বিচারালয়ের এই অনিন্দ্যসুন্দর বৈশিষ্ট্য ও ন্যায্য বিচারের মাধ্যমে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, সুমহান এই বিচারব্যবস্থার ছত্রছায়ায় মুসলিম সমাজে ন্যায়, নিষ্ঠা ও ইনসাফের জয়জয়কার ছিল। এই স্বাধীন বিচারবিভাগের অধীনে মুসলিমগণ যে ন্যায়নিষ্ঠা ও সুবিচারের পরিবেশে বসবাস করতেন, ইসলামি সভ্যতার অগ্রযাত্রায় তা মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
টিকাঃ
৪০১. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ৮, পৃ. ৫।
৪০২. সুয়ুতি, তারিখুল খুলাফা, পৃ. ২২৯।
৪০০. প্রাগুক্ত, পৃ. ২২৯।
৪০৪. মাওয়ারদি, আদাবুল কাযি, খ. ১, পৃ. ২৪৮।
৪০৫. সুবকি, তাবাকাতুশ শাফিয়্যাতিল কুবরা, খ. ৪, পৃ. ৬৪।
৪০৬. আবুল কাসেম আব্বাস ইবনে ফিরনাস : বনু উমাইয়ার শাসনামলের অনারব মুসলিম কবি, দার্শনিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন। প্রথম পাথর থেকে কাচ আবিষ্কার করেন ও আকাশে উড্ডয়নের চেষ্টা করেন। এজন্য পালক পরে ও দুটি ডানা যুক্ত করে দীর্ঘ দূরত্ব পর্যন্ত ওড়েন। এরপর পড়ে গিয়ে পিঠে আঘাত পান। মৃত্যু ২৭৪ হি.। সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ১৬, পৃ. ৩৮০-৩৮১; মাক্কারি, নাফহুত তিব, খ. ৩, পৃ. ৩৭৪।
৪০৭. ইবনে সাইদ আল-মাগরিবি, আল-মুগরিব ফি হুলাল মাগরিব, পৃ. ২০৩।
৪৩৮. খুশানি, কুযাতু কুরতুবা, পৃ. ১৫০-১৫১।
কোনো সন্দেহ নেই, মানবসভ্যতার ইতিহাসে অনেক আগে থেকেই বিচারবিভাগের স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতার ইতিবৃত্ত পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, বরং ইসলামি সভ্যতার যুগে আরও উৎকৃষ্ট ও সমুজ্জ্বলরূপে তা প্রতিষ্ঠিত হয়। ইউরোপ ও সমগ্র বিশ্ব গত দু-শতাব্দী ধরে যে স্বাধীন বিচারবিভাগের সঙ্গে পরিচিত, ইসলাম তা প্রতিষ্ঠা করেছে আরও বারো শতাব্দী পূর্বেই।
একবার আমিরুল মুমিনিন আলি ইবনে আবু তালিব রা. একটি ঢাল নিয়ে একজন খ্রিষ্টান ব্যক্তির সঙ্গে বিরোধের জের ধরে বিচারকের শরণাপন্ন হন। বিখ্যাত লেখক ইবনে কাসির রহ. সেই ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে লেখেন, আলি ইবনে আবু তালিব রা. তার হারিয়ে যাওয়া একটি ঢাল একজন খ্রিষ্টান ব্যক্তির কাছে খুঁজে পান। এরপর ওই খ্রিষ্টান ব্যক্তিকে নিয়ে তৎকালীন বিচারক শুরাইহ রা.-এর কাছে গিয়ে বিচার দাবি করে বলেন, এই ঢালটি আমার। ঢালটি তার কাছে পাওয়া গেছে। তার কাছে এটি আমি বিক্রিও করিনি আর তাকে দানও করিনি। তা শুনে শুরাইহ রা. ওই খ্রিষ্টান ব্যক্তিকে বললেন, আমিরুল মুমিনিন যা বলছেন সে ব্যাপারে তোমার কী মত? উত্তরে খ্রিষ্টান বলল, ঢালটি আমারই। আর আমিরুল মুমিনিনকে মিথ্যুক বলার সাহস আমার নেই। এরপর শুরাইহ রা. আলি ইবনে আবু তালিব রা.-এর দিকে তাকিয়ে বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন, আপনার কাছে কোনো প্রমাণ আছে? এ কথা শুনে আলি রা. হেসে ওঠেন এবং বলেন, শুরাইহ ঠিক ধরেছে, আমার কাছে তো কোনো প্রমাণ নেই। এরপর শুরাইহ রা. খ্রিষ্টান ব্যক্তির পক্ষে রায় দিয়ে দেন।
ইবনে কাসির রহ. লেখেন, এরপর ঢালটি নিয়ে খ্রিষ্টান লোকটি হেঁটে কিছুদূর চলে গিয়ে আবার ফিরে আসে এবং বলে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আজ যে নিরপেক্ষ বিচার-মীমাংসা করা হলো নিঃসন্দেহে এটি নবী-রাসুলদের বিচারব্যবস্থা। কী আশ্চর্য, একজন বিচারক স্বয়ং আমিরুল মুমিনিনের বিপক্ষে আমার জন্য রায় দিলেন। নিশ্চয় আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসুল। আল্লাহর শপথ! এই ঢালটি আপনারই হে আমিরুল মুমিনিন।(৪০১)
খ্রিষ্টান লোকটি বিচারবিভাগের এই স্বাতন্ত্র্য ও ক্ষমতা দেখে, এই ন্যায্য বিচার পেয়ে এবং বিচারক শুরাইহ রা. ও আমিরুল মুমিনিন আলি ইবনে আবু তালিব রা.-এর অবস্থান দেখে সে অভিভূত হয়ে যায়। তার আর বুঝতে বাকি থাকে না যে, এই সভ্যতা বড় সুন্দর ও অতিশয় মহান। তার বিচারব্যবস্থা অত্যন্ত ন্যায়সংগত। তাই তো দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গেই সে চিরদিনের জন্য এই সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্মের ও চিরন্তন সভ্যতায় আশ্রয় নেওয়ার ঘোষণা পাঠ করে।
আব্বাসি শাসনামলে বিচারবিভাগ ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও স্বাধীন। যার ফলে আমরা দেখি, অনেক বিচারক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী খলিফা বা সরকারি উচ্চপদস্থ লোকদের বিরুদ্ধে শক্ত ও কঠিন অবস্থান নিতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না। সুষ্ঠু ও ন্যায্য বিচার প্রতিষ্ঠায় তারা কারও হুমকি-ধমকির ও নিন্দাবাক্যের তোয়াক্কা করতেন না। একবার বিখ্যাত প্রতাপশালী আব্বাসি শাসক আবু জাফর মনসুর বসরার বিচারক সাওয়ার ইবনে আবদুল্লাহর কাছে পত্র লেখেন, অমুক জমি নিয়ে একজন সেনাপতি এবং একজন ব্যবসায়ীর মাঝে বিরোধ চলছে, সেই জমিটি আপনি সেনাপতির কাছে হস্তান্তর করুন। উত্তরে সাওয়ার লেখেন, উপযুক্ত প্রমাণ সাপেক্ষে আমার কাছে পরিষ্কার হয়েছে যে, জমিটি ওই ব্যবসায়ীর। তাই কোনো প্রমাণ ছাড়া তার কাছ থেকে আমি জমি নিয়ে সেনাপতিকে দিতে পারব না। প্রত্যুত্তরে বাদশা মনসুর লেখেন, ওই আল্লাহর শপথ! যিনি ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই, অবশ্যই আপনি ওই জমিটি সেনাপতির কাছে হস্তান্তর করবেন। এর উত্তরে সাওয়ার লেখেন, ওই আল্লাহর শপথ! যিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই, উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া জমিটি ব্যবসায়ীর হাতছাড়া করব না। এই পত্রটি পড়ে মনসুর বলেন, আল্লাহর শপথ, এই ভূখণ্ডকে আমি ন্যায়বিচার দিয়ে পরিপূর্ণ করেছি। আমার বিচারকগণ সত্য ও ন্যায়ের দিকে আমাকে ফিরিয়ে এনেছে। (৪০২)
বিচার, সাক্ষ্য ও দাবিদাওয়া প্রমাণের জন্য বিচারকগণ খলিফা ও শাসকদেরকে আদালতে হাজির করতেন। আর খলিফা ও বাদশাগণও স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা মেনে নিতেন। বিচারকের রায় মাথা পেতে মেনে নিতেন। এর ব্যতিক্রম ঘটনাও আছে। তবে সেগুলো নিতান্তই কম। বিচারবিভাগের রায় মানলে বা আদালতে উপস্থিত হতে অস্বীকার করলে খলিফাদেরকে সিংহাসন থেকে পদচ্যুত করার বা তাদের বিষয়টি জনগণের ওপর ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দিতেন বিচারকগণ। তবে সর্বাবস্থায় বিচারকদের রায়কে সম্মান করা হতো। পুরোপুরিভাবে তা কার্যকর করা হতো। জনগণ ও খলিফার মাঝে সংঘটিত যে মামলাগুলোর কথা ইতিহাসে পাওয়া যায়, তার মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলো বোদশা আবু জাফর মনসুরের শাসনামলে বাগদাদের বিচারপতি মুহাম্মাদ ইবনে ইমরান আত-তালহির কাছে দায়ের করা কুলিদের মামলা। ঘটনার সারমর্ম হলো, একবার খলিফা আবু জাফর মনসুর কুলিদেরকে শামে পাঠিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা করলেন। প্রচণ্ডরকম কষ্ট ও দুর্ভোগে পড়তে হবে বিধায় খলিফার এই ইচ্ছা কুলিদের মনঃপূত হয়নি। ফলে বিষয়টি তারা কাযি মুহাম্মাদ ইবনে ইমরানের কাছে উত্থাপন করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি খলিফা মনসুরকে আদালতে ডাকেন। লেখককে বলে দেন, কাঠগড়ায় ডাকার সময় খলিফা না বলে শুধু নাম দিয়ে তাকে সম্বোধন করতে। এরপর খলিফা মনসুর বিচারের মজলিসে উপস্থিত হলে খলিফার সম্মানে আসন ছেড়ে না দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের মতো আচরণ করেন। পরিশেষে তিনি কুলিদের পক্ষে রায় দেন। বিচারপ্রক্রিয়া সমাপ্ত হওয়ার পর তিনি উঠে গিয়ে মনসুরকে খলিফা ও আমিরুল মুমিনিন হিসেবে সালাম দেন। তার এই ন্যায়বিচার দেখে মনসুর খুশি হয়ে যান। সুষ্ঠু এই বিচারিক কর্মকাণ্ডের জন্য তার প্রশংসা জ্ঞাপন করেন। সাধুবাদ জানান এবং তাকে দশ হাজার দিনার পুরস্কার প্রদানের নির্দেশ দেন (৪০০)
বিচারকদের এই বলিষ্ঠ অবস্থানের কারণে খলিফাগণও তাদের অত্যন্ত সম্মান করতেন। বিচারবিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করতেন না। এমনকি বিচারকদের সামনে বিনয়ের সাথে সোজা দণ্ডায়মান হওয়ার যে সাধারণ নিয়ম, তা পালনেও তারা সামান্য ত্রুটি করতেন না। বর্ণিত আছে, খলিফা আল-মাহদি (ইনতেকাল ১৬৯ হি.) একবার কোনো এক মামলায় বিবাদীপক্ষকে সাথে নিয়ে বসরায় বিচারক আবদুল্লাহ ইবনে হাসান আল-আনবারির কাছে আসেন। বিচারক খলিফাকে আসতে দেখেও মাথা নিচু করে স্বাভাবিকভাবে নিজ আসনে নীরবে বসে থাকেন। এরপর খলিফা বিচারপ্রার্থীদের আসনে বিবাদী পক্ষের সাথে তিনি সাধারণ ব্যক্তিদের মতো বসে পড়েন। বিচারপ্রক্রিয়া শেষে কাযি আবদুল্লাহ উঠে গিয়ে খলিফাকে অভিবাদন দেওয়ার সময় খলিফা আল-মাহদি বলেন, আল্লাহর শপথ! আদালতে প্রবেশের সময় আমাকে দেখে যদি আপনি দাঁড়িয়ে যেতেন, তাহলে অবশ্যই আমি আপনাকে পদচ্যুত করতাম। আর বিচার শেষে যদি আপনি আসন ত্যাগ না করতেন, তাহলেও আমি আপনাকে পদচ্যুত করতাম। (৪০৪)
আব্বাসি শাসনামলে বিচারবিভাগের প্রভাব ও ক্ষমতা ছিল অপরিসীম। বিচারব্যবস্থা ছিল সকল স্বার্থসিদ্ধির ঊর্ধ্বে। বিচারবিভাগের কাছে সকল মানুষ ছিল সমান। বাগদাদের বিচারপতি আবু হামিদ আল-ইসফারায়িনি (মৃ. ৪০৬ হি.) একবার আব্বাসি খলিফার কাছে পত্র লেখেন। শরিয়া বিচার ব্যবস্থা কার্যকর করা না হলে এবং বিচারবিভাগের ওপর আস্থা প্রদর্শন না করলে তাকে খলিফার পদ থেকে বিচ্যুত করার হুমকি দেন। শুধু তাই নয়, পত্রে তিনি অনমনীয় ও শক্ত ভাষা প্রয়োগ করে লেখেন,
জেনে রাখবেন, মহান আল্লাহ আমাকে যে বিচারক বানিয়েছেন সেই পদ থেকে বিতাড়িত করার ক্ষমতা আপনার নেই। আর আমি ইচ্ছা করলে খোরাসানের উদ্দেশে দু-কথার ছোট পত্র লিখে আপনাকে খিলাফতের পদ থেকে বিচ্যুত করার ক্ষমতা রাখি। (৪০৫)
বক্তব্য শুনতে বা সাক্ষ্য প্রদান করতে আমির ও খলিফাদের বিচারালয়ে ডাকা হতো। এটিকে খলিফাগণও বিন্দুমাত্র অসম্মানজনক বা কলঙ্ক মনে করতেন না। যেমন আব্বাস ইবনে ফিরনাস (৪৩৬) ছিলেন আন্দালুসের বিখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানী। তার হাত ধরে বহু আবিষ্কার সাধন হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, ইতিহাসে তিনিই প্রথম আকাশে উড্ডয়নের প্রয়াস পেয়েছেন। তার এ যোগ্যতা ও বুদ্ধিবৃত্তি তাকে শাসক শ্রেণির সান্নিধ্যে নিয়ে যায়।
এই তাত্ত্বিক ব্যুৎপত্তি, ব্যাপক সুখ্যাতি ও খলিফাদের নিকট সম্মানিত হওয়ার কারণে হিংসুক ও নিন্দুক শ্রেণি তৈরি হয়। জাদু ও ভেলকি চর্চা করে এবং উদ্ভট ও আজব বিষয় নিয়ে সারাদিন ঘরে ও গবেষণার ল্যাবে পড়ে থাকে এ ধরনের অপবাদ আরোপ করতে থাকে তার বিরুদ্ধে। কারণ তিনি ক্যামিস্ট্রি নিয়ে গবেষণা করতেন। ফলে সবসময় তার বাড়ি থেকে এক প্রকার ধোঁয়া উঠতে দেখা যেত।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিচারের জন্য তাকে কর্ডোভার আদালতে ডাকা হয়। তখন খলিফা ছিলেন আবদুর রহমান ইবনে হাকাম ইবনে হিশাম উমাবি। তাকে বলা হয়, আপনি অনেক উদ্ভট বিষয় নিয়ে পড়ে থাকেন। এক বস্তুর সঙ্গে অপর বস্তু সংমিশ্রণ করে অদ্ভুত ও আজগুবি বিষয় আবিষ্কার করেন। এরকম তো আমরা আগে কখনো দেখিনি। এর উত্তরে তিনি বলেন, ধরুন আমি যদি পানির সঙ্গে আটা মিলিয়ে খামিরা তৈরি করি। এরপর আগুনের সাহায্যে ওই খামিরা থেকে রুটি বানাই, তাহলে কি সেটি জাদু হবে? সবাই বলল, না। বরং এই প্রক্রিয়া মহান আল্লাহই মানুষকে শিখিয়েছেন। এরপর তিনি বলেন, বাড়িতে আমি ঠিক এই কাজটিই করে থাকি। এক বস্তুর সঙ্গে অপর বস্তু সংমিশ্রণ করে আগুনের সাহায্যে এরকম অনেক বিষয় আবিষ্কার করি, যা মুসলিমদের উপকারে আসবে। তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে কাজে লাগবে। (৪০৭)
তার এই দাবির যথার্থতা সম্পর্কে আদালত সাক্ষী তলব করলে খলিফা আবদুর রহমান ইবনে হাকাম ইবনে হিশাম নিজেই আদালতে উপস্থিত হয়ে তার পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করেন, তিনি এরকম এরকম কাজ করেন (অর্থাৎ যা-কিছুই করেন, সেজন্য তিনি সুনির্দিষ্ট মূলনীতি অনুসরণ করেন)। আমাকে যা জানিয়েছেন, তিনি তাই করেছেন। আমি মনে করি তার কাজগুলো মুসলিমদের উপকারে আসবে। জাদুবিদ্যার সঙ্গে জড়িত কিছু করতে দেখলে সবার আগে আমিই তার ওপর দণ্ড প্রয়োগ করতাম।
রাষ্ট্রের কর্ণধার ও মুসলিম শাসক নিজেই আদালতে হাজির হয়ে ন্যায়ের সাক্ষ্য দিয়েছেন এই বিজ্ঞানীর পক্ষে। আর বিচারকও ইবনে ফিরনাসের পক্ষে রায় দিয়েছেন। সমকালীন ফকিহগণও তার প্রশংসা করে তার কর্মের স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। আরও বেশি করে উপকারী বিষয় আবিষ্কার করে যেন মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করতে পারেন, সে বিষয়ে তাকে নিয়মিত উৎসাহ প্রদান করছেন। এভাবেই সর্বমহলে তার মর্যাদা সুরক্ষিত হয়।
খলিফা, আমির, শাসকশ্রেণির উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের কেউ ভুল ও অন্যায় কিছু করলে বিচারকগণ তাদের আদালতে হাজির হতে বাধ্য করতেন। কুযাতু কুরতুবা গ্রন্থে আল-খুশানি লেখেন, একবার বিচারক আমর ইবনে আবদুল্লাহর কাছে কর্ডোভার একজন সাধারণ দুর্বল নাগরিক এসে আমির মুহাম্মাদের একজন প্রভাবশালী আমলার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। সরকারি স্তরে ওই আমলার বিরাট প্রভাব ও দাপট ছিল। নগরপতি হওয়ার মনোনয়ন পেয়েছিল। পরে এক সময় সে গভর্নর হয়ে যায়। ওই দুর্বল লোকটি আদালতে এসে মামলা দায়ের করে যে, বিচারক মহোদয়, অমুক ব্যক্তি আমার বাড়ি জবরদখল করেছে। বিচারক বললেন, আপনি জমির কাগজ নিয়ে তার কাছে যান। তা শুনে দুর্বল লোকটি বলল, আমার মতো দুর্বল ও সাধারণ নাগরিক তার কাছে যাবে জমির দলিল দেখাতে?! নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আমি শঙ্কিত। বিচারক বললেন, আমি যেভাবে বলেছি সেভাবে জমির কাগজ নিয়ে তার কাছে যান। দেখুন কী হয়। এরপর লোকটি বিচারকের নির্দেশমতো দলিলপত্র নিয়ে তার কাছে যায়। কিছুক্ষণ পর লোকটি ফিরে এসে বলল, বিচারক মহোদয়, আমি তার কাছে গিয়েছিলাম। দূর থেকে তাকে জমির কাগজ দেখিয়ে পালিয়ে এসেছি। বিচারক আমর বললেন, বসুন। সে আসবে এখানে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই আমলা সদলবলে এসে উপস্থিত হলো। তার সামনে ছিল অনেক অশ্বারোহী ও পদাতিক নিরাপত্তারক্ষী। এরপর তিনি পা ভাঁজ করে অশ্ব থেকে অবতরণ করলেন। এরপর মসজিদে প্রবেশ করে বিচারক ও মজলিসে বসা সকলকে সালাম দিলেন। এরপর যথারীতি দাম্ভিকতা প্রদর্শন করতে মসজিদের দেয়ালে টেক্কা দিয়ে দাঁড়ালেন।
বিচারক আমর ইবনে আবদুল্লাহ বললেন, আপনি ওখানে যান। বাদীর মুখোমুখি হয়ে ওই জায়গায় বসুন। উত্তরে ওই আমলা বললেন, বিচারককে আল্লাহ সংশোধন করুন। এটি মসজিদ। মসজিদে তো কোনো কাঠগড়া নেই। এখানে সব জায়গাই সমান। আমর বলেন, আমি যেভাবে বলেছি সেভাবে বাদীর সামনে গিয়ে বসুন। বিচারককে তার বক্তব্যে অনড় দেখে তিনি দুর্বল লোকটির সামনে বসতে বাধ্য হলেন।
এরপর বিচারক দুর্বল লোকটিকেও বললেন আমলার মুখোমুখি হয়ে বসতে। এরপর তিনি দুর্বল লোকটিকে বলেন, এবার আপনি আপনার বক্তব্য উপস্থাপন করুন। তিনি বললেন, আমার বক্তব্য হলো এই লোকটি আমার ঘর জবরদখল করেছেন। এরপর আমলার উদ্দেশে বললেন, এখন আপনি আপনার বক্তব্য তুলে ধরুন। তিনি বললেন, আমার বক্তব্য হলো, আমার মতো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে জবরদखলের অভিযোগ মানহানির শামিল। তার এ কথা শুনে বিচারক বললেন, এ ধরনের বক্তব্য কোনো পুণ্যবান ব্যক্তির মুখেই মানায়, আপনার মতো মানুষের জমি জবরদখলে বিখ্যাত ব্যক্তিদের মুখে নয়। এরপর বিচারক আদালতে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কয়েকজনকে বললেন, আপনারা তার সাথে যান। তার ব্যাপারে খেয়াল রাখুন, যদি লোকটিকে তার ঘর বুঝিয়ে দেয় তাহলে তো সমাধান হলো। তা না হলে তাকে গ্রেফতার করে আমার কাছে নিয়ে আসবেন। আমি নিজে আমিরের কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করব। তার সকল অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতির কথা বাদশাকে খুলে বলব। এরপর ওই আমলা পুলিশদের সাথে বের হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর পুলিশ ও দুর্বল ব্যক্তিটি ফিরে এলো। দুর্বল লোকটি বিচারককে বলল, আজ আপনি যে বিচার করলেন তার জন্য আপনাকে মহান আল্লাহ উত্তম বিনিময় দান করুন। ওই আমলা আমার বাড়ি ফিরিয়ে দিয়েছে। বিচারক বললেন, এবার নিরাপদে বাড়ি ফিরে যান। (৪৩৮)
এ ধরনের ন্যায্য বিচারের দ্বারা কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়:
এক. অভিযোগ দায়ের করা ব্যক্তিকে আদালতে ডাকা হতো বিভিন্ন নিয়মে এবং বিচারকাজ সম্পাদন করা হতো নানা পদ্ধতিতে।
দুই. ইসলামি সভ্যতায় বিচারবিভাগ ছিল স্বাধীন। তার প্রভাব ও ক্ষমতা ছিল অপরিসীম।
তিন. বিচারকের সামনে সবাই ছিল সমান। কে দুর্বল, কে সবল, কে প্রভাবশালী, কে আমলা, কে ধনী, কে গরিব এর কোনো তারতম্য ছিল না।
চার. রায় প্রদান ও সিদ্ধান্ত কার্যকর হতো খুব দ্রুত।
দুর্বল ওই লোকটির বাড়ি যেদিন জবরদখল করা হয়, ঠিক সেদিনই সে মামলা করে। আর সেদিনই ন্যায্য বিচার পেয়ে সে তার বাড়ি ফিরে পায়।
ইসলামি সভ্যতায় বিচারালয়ের এই অনিন্দ্যসুন্দর বৈশিষ্ট্য ও ন্যায্য বিচারের মাধ্যমে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, সুমহান এই বিচারব্যবস্থার ছত্রছায়ায় মুসলিম সমাজে ন্যায়, নিষ্ঠা ও ইনসাফের জয়জয়কার ছিল। এই স্বাধীন বিচারবিভাগের অধীনে মুসলিমগণ যে ন্যায়নিষ্ঠা ও সুবিচারের পরিবেশে বসবাস করতেন, ইসলামি সভ্যতার অগ্রযাত্রায় তা মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
টিকাঃ
৪০১. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ৮, পৃ. ৫।
৪০২. সুয়ুতি, তারিখুল খুলাফা, পৃ. ২২৯।
৪০০. প্রাগুক্ত, পৃ. ২২৯।
৪০৪. মাওয়ারদি, আদাবুল কাযি, খ. ১, পৃ. ২৪৮।
৪০৫. সুবকি, তাবাকাতুশ শাফিয়্যাতিল কুবরা, খ. ৪, পৃ. ৬৪।
৪০৬. আবুল কাসেম আব্বাস ইবনে ফিরনাস : বনু উমাইয়ার শাসনামলের অনারব মুসলিম কবি, দার্শনিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন। প্রথম পাথর থেকে কাচ আবিষ্কার করেন ও আকাশে উড্ডয়নের চেষ্টা করেন। এজন্য পালক পরে ও দুটি ডানা যুক্ত করে দীর্ঘ দূরত্ব পর্যন্ত ওড়েন। এরপর পড়ে গিয়ে পিঠে আঘাত পান। মৃত্যু ২৭৪ হি.। সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ১৬, পৃ. ৩৮০-৩৮১; মাক্কারি, নাফহুত তিব, খ. ৩, পৃ. ৩৭৪।
৪০৭. ইবনে সাইদ আল-মাগরিবি, আল-মুগরিব ফি হুলাল মাগরিব, পৃ. ২০৩।
৪৩৮. খুশানি, কুযাতু কুরতুবা, পৃ. ১৫০-১৫১।