📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 বিচারক নিয়োগ ও যাচাই পদ্ধতি

📄 বিচারক নিয়োগ ও যাচাই পদ্ধতি


বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে এমন ব্যক্তিদের নির্বাচিত করা হতো, যাদের মধ্যে ন্যায়নিষ্ঠা, সুবিচার, সাম্য প্রতিষ্ঠার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা থাকার পাশাপাশি যথেষ্ট জ্ঞান, ধার্মিকতা, সততা ও চারিত্রিক স্বচ্ছতা ইত্যাদি গুণের সমাবেশ ঘটত। (৪০৯)

এ কারণেই খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বিচারক নিয়োগে তিনটি বৈশিষ্ট্যকে প্রাধান্য দিতেন। সেগুলো হলো, (এমন ব্যক্তি যে ঘুষ নেবে না। আত্মপ্রদর্শনের মোহে পড়বে না। লোভের পেছনে পড়বে না)। (৪১০)

যার ফলে আমরা দেখি, উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বিভিন্ন অঞ্চলের বিচারকদের গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। ইসলামি সভ্যতায় এসব গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনার ওপরই বিচারব্যবস্থার ভিত্তি রচিত হয়। পরবর্তীকালে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সেগুলো কার্যকর ভূমিকা পালন করে এবং নানা সমস্যার সমাধানে বিরাট অবদান রাখে।

খিলাফতে রাশেদার পর উমাইয়া খলিফাগণও বিচারক নিয়োগের বেলায় জ্ঞান, যোগ্যতা ও বিশ্বস্ততাকে প্রাধান্য দিতেন। বিখ্যাত উমাইয়া শাসক উমর ইবনে আবদুল আযিয রহ. মিশরের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেন ইবনে খাযামির সানআনিকে। কিন্তু এর আগেই তিনি ইবনে খাযামিরের যোগ্যতা, জ্ঞান, পরিপক্বতা, ধার্মিকতা ও দায়িত্ব গ্রহণে তার সামর্থ্যের পরিচয় পেয়ে যান। (ইবনে খাযামিরকে বিচারপতি নিয়োগের কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে ইবনে হাজার রহ. লেখেন, একবার মিশর থেকে একদল অভিযাত্রী খলিফা সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিকের কাছে আগমন করে। ওই দলের একজন ছিলেন ইবনে খাযামির। কথাপ্রসঙ্গে খলিফা সুলাইমান তাদের কাছে মরক্কোর অধিবাসীদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তারা সবাই মরক্কোবাসী সম্পর্কে নিজেদের মতামত ও মূল্যায়ন পেশ করেন। কিন্তু ইবনে খাযামির তাদের ব্যাপারে মূল্যায়ন করতে অস্বীকার করেন। সবাই বের হয়ে যাওয়ার পর উমর ইবনে আবদুল আযিয তাকে জিজ্ঞেস করেন, হে আবু মাসউদ, কেন তাদের ব্যাপারে আপনি মতামত দেননি? উত্তরে ইবনে খাযামির বলেন, আমার মুখ থেকে মিথ্যা কথা বের হয়ে যাবে এই ভয়ে কোনো মত দিইনি। এ ঘটনার পর থেকেই উমর তাকে চিনে রাখেন। এরপর তিনি যখন খলিফা হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন, তখন মিশরের গভর্নর আইয়ুব ইবনে শুরাহবিলের কাছে ইবনে খাযামিরকে মিশরের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগপত্র লেখেন। যার ফলে তিনি হিজরি ১০০ থেকে ১০৫ সন পর্যন্ত মিশরের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন)। (৪১১)

যোগ্য ব্যক্তি শনাক্ত করা এবং বিশেষ বিশেষ পদে তাদের নিয়োগ দেওয়া রাষ্ট্র পরিচালনায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এ কারণেই খলিফা সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিকের উযির থাকা অবস্থায় উমর ইবনে আবদুল আযিয যোগ্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করেন। দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠাবান ব্যক্তিদের যাচাই করেন। যার ফলে ওই ঘটনার পর থেকে উমর ইবনে আবদুল আযিয ইবনে খাযামিরকে ইসলামি সাম্রাজ্যের কোনো একটি অঞ্চলের বিচারক হিসেবে নিয়োগ প্রদানের জন্য মনস্থির করে রাখেন। পরে তিনি তা বাস্তবায়নও করেন। উমরের অনুমান বৃথা যায়নি। পাঁচ বছর বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি পুরো নিষ্ঠা ও দায়িত্বের সঙ্গে কাজ করেন। এ কারণেই ইবনে খাযামির সম্পর্কে ইবনে হাজার লেখেন, অনারবদের মধ্যে ইবনে খাযামিরই প্রথম মিশরের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। বিচারকার্য পরিচালনার বিনিময়ে এক দিরহাম বা এক দিনারও তিনি গ্রহণ করেননি। (৪১২)

যদিও উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর শাসনামল থেকেই বিচারব্যবস্থা পৃথক হয়ে যায়, যা উমাইয়া শাসনামলে পূর্ণতা লাভ করে, তারপরও আমরা দেখি বড় বড় ফকিহ ও বিখ্যাত জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গ বিচারপতির পদ লাভ করা থেকে অনীহা প্রদর্শন করতেন। আল্লাহর ভয়ে এবং আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানের পুরোপুরি বাস্তবায়ন ঘটাতে যদি কোনো ত্রুটি থেকে যায় এবং এর ফলে পরকালে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় এই আশঙ্কায়।

আখবারুল কুযাত গ্রন্থে ওয়াকি বলেন, মিশরের গভর্নর ইয়াযিদ ইবনে হাতেম (মৃ. ১৭৭ হি.) একবার মিশরের বিচারপতি নিয়োগের ইচ্ছা করলেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিবর্গ এবং রাজসভাসদদের পরামর্শ চাইলে তারা তিনজন ব্যক্তিকে বিচারক হিসেবে নিয়োগের পরামর্শ দেন। তারা হলেন যথাক্রমে, হাইওয়া ইবনে শুরাইহ, আবু খুযাইমা (ইবরাহিম ইবনে ইয়াযিদ) এবং আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস গাসসানি। ঘটনার দিন আবু খুযাইমা আলেকজান্দ্রিয়ায় অবস্থান করছিলেন। তাকে রাজপ্রাসাদে ডাকা হলে অনতিবিলম্বে তাকে গভর্নরের সামনে উপস্থিত করা হয়। প্রথম ডাক পড়ে হাইওয়া ইবনে শুরাইহের। তিনি বিচারপতির পদ গ্রহণে সাফ না করে দিলে শাস্তি দেওয়ার জন্য তরবারি ও চাবুক আনতে বলা হয়। পরিস্থিতি দেখে হাইওয়া নিজের সঙ্গে থাকা একটি চাবি বের করে বলেন, এটি আমার বাড়ির চাবি। আপনাদের কাছে রাখুন। কারণ আমি আমার পরকালে গমনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। সভাসদগণ যখন দেখলেন, কোনোভাবেই তাকে রাজি করানো সম্ভব নয়, তখন তাকে ছেড়ে দেন। তখন হাইওয়া বলেন, বাকি দুজনের কাছে আমার এ সিদ্ধান্ত ও অবস্থানের কথা বলবেন না। তাহলে তারাও আমার মতো অস্বীকার করতে পারেন। এরপর হাইওয়া রাজদরবার থেকে মুক্ত হয়ে বাড়ি ফিরে যান। (৪১৩)

অপরদিকে অনেক বিচারক বিচারকার্য পরিচালনার বিনিময়ে বেতন গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতেন। তারা ভাবতেন, এ মহান কাজের বিনিময় গ্রহণ করলে এ পদের অবমূল্যায়ন হবে। তাদের অন্যতম হলেন আন্দালুসের বিখ্যাত বিচারক ইবনে সাম্মাক হামাযানি। তার গুণাগুণ ও কীর্তি বর্ণনা করতে গিয়ে বিশিষ্ট লেখক নাবাহি তারিখু কুযাতিল উন্দুলুস গ্রন্থে লেখেন, কাযি ইয়ায ও অন্যান্য মনীষীর বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, ইবনে সাম্মাক নিজেই ড্রেন বা নালা পরিষ্কার করতেন। ঘরের দরজায় বসে লাকড়ি কাটতেন। আর এই অবস্থায়ই মানুষ তার কাছে মামলার নিষ্পত্তি করার জন্য হাজির হতো। তার কাছে সমাধান জিজ্ঞেস করত। তিনি শক্ত মোটা পশমের কাপড় পরিধান করতেন। যতদিন তিনি বিচারকের দায়িত্বে ছিলেন, ততদিন তিনি শহরে কোনো বাহনে আরোহণ করেননি। তার বসত ছিল দূরের গ্রামে। দিন শেষে যখন গ্রামে অবস্থিত তার বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হতেন তখন ক্ষীণগতির গাধার পিঠে চড়ে রওয়ানা হতেন। সামান্য উপার্জন থেকে যা আসত, তা দিয়েই তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। বিচারকের দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে তিনি কানাকড়িও গ্রহণ করতেন না। (৪১৪)

অনেক সময় বিচারক নিয়োগ হতো নির্বাচনের মাধ্যমে। গুরুত্বপূর্ণ এই পদের জন্য জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের একটি সুন্দর ঐতিহ্য ছিল এই পদ্ধতি। বুওয়াইহি নামক এক ব্যক্তির বরাত দিয়ে বিশিষ্ট দার্শনিক আল-কিন্দি বলেন, গভর্নর ইবনে তাহের একবার মিশরের জনগণকে এক জায়গায় সমবেত হওয়ার নির্দেশ দেন। সবাই এক জায়গায় একত্র হয়। সেদিন আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। আমরা ইবনে তাহেরের কাছে উপস্থিত হলাম। তার পাশেই ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল হাকাম। ইবনে তাহের ঘোষণা করলেন, এখানে আপনাদের জমায়েত করার পেছনে আমার উদ্দেশ্য হলো, আপনারা নিজেরাই পছন্দমতো একজনকে বিচারক হিসেবে নির্বাচন করুন। সেদিন প্রথম নিজের মতামত উপস্থাপন করেন ইয়াহইয়া ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে বুকাইর। তিনি বলেন, হে আমাদের আমির, আপনিই বরং একজনকে কাযি হিসেবে নির্বাচন করে দিন। তবে দু-ধরনের ব্যক্তিকে আমরা বিচারকের আসনে দেখতে চাই না। এক. অপরিচিত। দুই. পরনিন্দাকারী, যে একজনের কথা আরেকজনের কাছে বলে বেড়ায় আর শত্রুতা তৈরি করে। (৪১৫) ঘটনাটি ছিল হিজরি ২১২ সনের। বোঝা যায়, বিচারক নির্বাচনে মিশরের জনগণের মত প্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা ছিল।

বিচারক নিয়োগে খলিফাগণ সবসময় জ্ঞান, যোগ্যতা ও ধার্মিকতাকে প্রাধান্য দিতেন। যোগ্য হলে বয়স সেখানে কোনো বাধা হতো না। খতিবে বাগদাদি বলেন, ইয়াহইয়া ইবনে আকসাম যখন বসরার বিচারক নিযুক্ত হন তখন তার বয়স মাত্র বিশ বছর বা তার কাছাকাছি। তখন হিজরি ২০২ সন। বসরার অধিবাসীগণ তাকে অপরিপক্ব মনে করে জিজ্ঞেস করল, বিচারকের বয়স কত? উত্তর শুনে তারা তাকে অযোগ্য ও ছোট ভাবলে ইয়াহইয়া বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন আততাব ইবনে আসিদ রা.-কে মক্কার বিচারক হিসেবে পাঠান, তখন আততাবের বয়স ছিল আমার চেয়ে কম। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মুআয ইবনে জাবাল রা.-কে ইয়ামেনের বিচারক হিসেবে পাঠান, তখন মুআয রা.-এর বয়স ছিল আমার চেয়েও কম। উমর ইবনুল খাত্তাব রা. যখন কাব ইবনে সুরকে বসরার বিচারক হিসেবে পাঠান, তখন তার বয়সও ছিল আমার চেয়ে কম। ইয়াহইয়া এ উত্তরের মাধ্যমে যুক্তি উপস্থাপন করেন।(৪১৬)

এবার আসি আন্দালুসে। আন্দালুসের বিচারকগণ মালেকি মাযহাব অনুযায়ী রায় দিতেন। কারণ যিয়াদ ইবনে আবদুর রহমান ও ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহইয়ার মতো আন্দালুসের বড় ও বিখ্যাত জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গ ইমাম মালেক ইবনে আনাসের ছাত্র ছিলেন। আর হিশাম ইবনে আবদুর রহমানের মতো বনু উমাইয়ার শাসকগণও ইমাম মালেক রহ.-কে ভালোবাসতেন এবং তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন।(৪১৭)

কিন্তু মামলুক রাজবংশের শাসনামলে ব্যতিক্রমধর্মী একটি উদ্যোগ লক্ষ করা যায়। তখন চার মাযহাবের জন্য ভিন্ন ভিন্ন বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগে বিচারব্যবস্থা পরিচালিত হতো শুধু শাফিয়ি মাযহাব অনুসারে। বিশিষ্ট লেখক কালকাশান্দি সমকালীন বিচারব্যবস্থার স্তর বর্ণনা করতে গিয়ে লেখেন, ওই সময় দামেশকের মতো সর্বত্রই চার মাযহাবের বিচারকগণ ফয়সালা করতেন। তবে দামেশকে এই পদ্ধতির স্বাক্ষরিক সফল প্রচলন শুরু হওয়ার পরই তা সর্বত্র প্রয়োগ করা হয়। তবে মূল শহরের সকল কার্যালয়ে সব ধরনের রাষ্ট্রীয় কাজ সম্পাদন হতো শাফিয়ি মাযহাব অবলম্বনে। আর পুরো নগরজুড়ে অন্যান্য মাযহাব অনুযায়ী বিচারকাজ সম্পাদিত হতো। মিশর ও দামেশকেও একই পদ্ধতির সফল বাস্তবায়ন চলে আসছিল। (৪১৮)

প্রধান বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতো কঠিন পরীক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে। নতুন বিচারকের যোগ্যতা, দক্ষতা, পরিপক্বতা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে যাচাই করা হতো সেই পরীক্ষায়। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, খলিফা নিজেই এ পরীক্ষা গ্রহণ করতেন। সুলাইমান ইবনে সাদ আল-খুশানি কুযাতু কুরতুবা গ্রন্থে প্রধান বিচারপতি হিসেবে আহমাদ ইবনে বাকির নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিবরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমিরুল মুমিনিন তাকে এ পদের জন্য নিযুক্ত করেন। এরপর একে একে তাকে জায়েন, এলভিরা, টলেডো অঞ্চলের বিচারক হিসেবে মনোনীত করেন। সব দিক দিয়ে তাকে পরীক্ষা করেন। সকল পদ্ধতিতে তাকে যাচাই-বাছাই করেন। সব পরীক্ষায় তিনি সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। পরীক্ষায় আমিরুল মুমিনিন তাকে একনিষ্ঠ ও যোগ্য বিচারক হিসেবে বাছাই করেন। এরপর তাকে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব প্রদান করেন। (৪১৯)

টিকাঃ
৪০৯. মাওয়ারদি, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, পৃ. ৫৩-৫৪; ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ২২১।
৪১০. ওয়াকি ইবনে খালাফ, আখবারুল কুযাত, খ. ১, পৃ. ৭০।
৪১১. ইবনে হাজার, রফউল ইসরি আন কুযাতি মিসর, খ. ২, পৃ. ৩০৫।
৪১২. প্রাগুক্ত।
৪১৩. ওয়াকি ইবনে খালাফ, আখবারুল কুযাত, খ.৩, পৃ.২৩২-২৩৩; আবদুর রহমান মিশরি, ফুতুহু মিসর ওয়া আখবারুহা, পৃ. ২৬১।
৪১৪. নাবাহি, তারিখু কুযাতিল উন্দুলুস, পৃ. ৩২।
৪১৫. আল-কিন্দি, আল-উলাত ওয়াল-কুযাত, পৃ. ৪৩৩।
৪১৬. খতিবে বাগদাদি, তারিখে বাগদাদ, খ. ১৪. পৃ. ১৯৮-১৯৯।
৪১৭. খুশানি, কুযাতু কুরতুবা, পৃ. ১৭৩-১৭৪।
৪১৮. কালকাশান্দি, সুবহুল আ'শা, খ. ৪, পৃ. ২২৮।
৪১৯. খুশানি, কুযাতু কুরতুবা, পৃ. ১৭৩-১৭৪।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 বিচারকদের দায়িত্ব নির্ধারণ

📄 বিচারকদের দায়িত্ব নির্ধারণ


একজন বিচারকের প্রধান দায়িত্ব ছিল, মামলামোকদ্দমা নিষ্পত্তি করা, বিরোধ নিরসন করা, পাওনা আদায়ে যে লোক টালবাহানা করছে তার কাছ থেকে প্রকৃত মালিকের কাছে সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া। আপন সম্পদের হস্তক্ষেপে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অর্থসম্পদ দেখাশোনা করা, অপরাধীদের ওপর দণ্ড প্রয়োগ করা। তার সাক্ষী ও আমিনদের পর্যবেক্ষণ করা, তার প্রতিনিধিদের নিয়োগ ও বিচারিক কাজে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদান ইত্যাদি। (৪২০)

শুধু তাই নয়, একজন বিচারকের দায়িত্ব এমন আরও অনেক ধর্মীয় বিষয়জুড়ে পরিব্যাপ্ত ছিল, বিচারিক কাজের সাথে যার কোনো সম্পর্ক নেই। শরিয়ত সম্পর্কে অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী হওয়ায় অধিকাংশ সময় বিচারকদেরই জামে মসজিদে নামাযের ইমামতি করা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান দেখাশোনা করা, অনুপস্থিত ও হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের সম্পদ দেখাশোনা করা, হজের বিষয়গুলো তদারকি করা এবং লোকদের থেকে খলিফার আনুগত্যের অঙ্গীকার গ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হতো। (৪২১)

জ্ঞানের গভীরতার কারণে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে অসামান্য মর্যাদার অধিকারী হওয়ায় অনেক প্রধান বিচারপতি উন্নতি করতে করতে উযিরের পদে অধিষ্ঠিত হন। মনসুর ইবনে আবু আমিরের শাসনামলে আন্দালুসের প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালনকারী আহমাদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে যাকওয়ানের জীবনবৃত্তান্তে নাবাহি বলেন, মনসুর ইবনে আবু আমির তাকে প্রধান বিচারপতির পাশাপাশি উযিরের দায়িত্ব প্রদান করেন। বনু আমিরের শাসনামলের শেষ পর্যন্ত তিনি সেই পদে বহাল ছিলেন। (৪২২)

মামলুক রাজবংশের শাসনামলে মিশরে বিচারকের পদটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী। বিচারকাজ সম্পাদনের পাশাপাশি আরও অনেক দায়িত্ব বিচারকদেরকেই সম্পাদন করতে হতো। আল-বিদায়া ওয়ান- নিহায়া গ্রন্থে তাজুদ্দিন ইবনে বিনতুল আআয-এর জীবনবৃত্তান্ত বর্ণনা করতে গিয়ে ইবনে কাসির রহ. লেখেন, তার হাতে একে একে সতেরোটি পদ ছিল। এর মধ্যে ছিল বিচারিক দায়িত্ব, জুমার ইমামতি, ওয়াকফকৃত সম্পত্তি দেখাশোনা, রাষ্ট্রীয় অর্থ তহবিল দেখাশোনা ইত্যাদি। (৪২৩)

ইসলামের স্বর্ণযুগে কাযি বা বিচারকগণ যে অসামান্য সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী ছিলেন এসব দায়িত্ব পালন তাদের মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। তাজুদ্দিন সুবকির বৃত্তান্তে বর্ণিত আছে যে, তিনি প্রথমে প্রধান বিচারপতি নির্বাচিত হন। এ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি শাফিয়ি মাযহারের ওপর ফিকহের দরস দিতেন, তুলুনের জামে মসজিদে জুমা ও ঈদের নামাযের ইমামতি করতেন, মাদরাসায়ে শাইখুনিয়ায় শিক্ষকতা করতেন, বিচারালয়ে ফতোয়া প্রদান করতেন। তা ছাড়া দামেশকের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তিনি শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করতেন। এতসব দায়িত্বের মাঝে সমন্বয় করতে গিয়ে তিনি যা করতেন তা হলো, মিশরে তিনি বিচারকাজ পরিচালনা করতেন এবং সুলতানের অনুমতিক্রমে দামেশকের মাদরাসাগুলোতে প্রতিনিধি হিসেবে কাউকে পাঠাতেন দরস দেওয়ার জন্য। (৪২৪)

টিকাঃ
৪২০. মাওয়ারদি, আল-আহকামুস সুলতানিয়‍্যা, পৃ. ৫৩-৫৪; ইবনে খালদুন, আল-ইবার ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ২২১।
৪২১. আবদুল মুনয়িম মাজেদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ৪৮-৪৯।
৪২২. নাবাহি, তারিখু কুযাতিল উন্দুলুস, পৃ. ৮৬।
৪২৩. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ১৩, পৃ.৩৮০।
৪২৪. শামসুদ্দিন ইবনে তুলুন, কুযাতু দিমাশক, পৃ. ১০৪।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 বিশেষ বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন

📄 বিশেষ বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন


ইসলামি সভ্যতায় বিচারব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত নিখুঁত ও সুসংগঠিত। বিশেষ গোষ্ঠী অথবা বিশেষ কোনো মোকদ্দমায় বিশেষ বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হতো। বেসামরিক ও সেনাবাহিনী উভয় গোষ্ঠীর বিচারপ্রক্রিয়া পৃথক রাখার জন্য আব্বাসি শাসনামলে সেনাবাহিনীর জন্য সামরিক আদালত গঠন করে সেজন্য স্বতন্ত্র বিচারক নিয়োগ করা হয়। বোঝা যায়, ইসলামি সভ্যতায় সামরিক আদালত অনেক আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। খলিফা হওয়ার পূর্বে আল-মাহদি নিজেই সৈনিকদের মধ্যে ঘটিত বিরোধ ও মামলা নিরসন করতেন। তেমনই খলিফা মামুনের মন্ত্রী হাসান ইবনে সাহল সেনাবিষয়ক বিশেষ বিচার ট্রাইব্যুনাল পরিচালনার জন্য ২০১ হিজরি সনে সাদ ইবনে ইবরাহিমকে নিয়োগ করেন। (৪২৫)

তা ছাড়া ইসলামি বিচারব্যবস্থায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ক্ষেত্রভেদে বাদী-বিবাদীর কল্যাণার্থে অনতিবিলম্বে মামলার নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। এর মধ্যে একটি ছিল স্থানীয়দের আগে মুসাফির ব্যক্তিদের মামলাগুলো নিষ্পত্তি করা। ইমাম শাফিয়ির বরাতে মাওয়ারদি লেখেন, (ইমাম শাফিয়ি বলেন,) আদালতে যদি স্থানীয় ও মুসাফির উভয় প্রকার লোক এসে হাজির হয়, তবে মুসাফিরদের সংখ্যা কম হলে তাদের মামলাগুলো আগে শেষ করতে হবে। বিচারক মুসাফিরদের জন্য আলাদা একটি দিন ধার্য করবেন। তবে স্থানীয়দের যেন কষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আর যদি মুসাফিরদের সংখ্যা বেশি হয়, যার ফলে স্থানীয় ও মুসাফিররা সংখ্যায় সমান হয় তবে সমতা বিধান করতে হবে যেন উভয় পক্ষের কারও কোনো কষ্ট না হয়। সবারই হক আছে। তবে মুসাফিরদের যেহেতু স্বদেশ ফেরার তাড়া আছে, সে হিসেবে মামলাগুলো বিলম্ব করলে তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সংখ্যায় কম হলে মুসাফিরদের মামলাগুলো অবশ্যই আগে শেষ করতে হবে। (৪২৬)

ভিসা বা অনুমতি নিয়ে অন্য ধর্মের মানুষও ইসলামি সাম্রাজ্যে অবাধে বসবাস করতে পারতেন। তাই ইসলামি বিচারবিভাগ তাদের জন্য পৃথক বিচার ট্রাইব্যুনালের ব্যবস্থা করেন। মুসলিম শাসনামলে স্ব স্ব ধর্মের পাদরি, যাজক, বিশপরাই তাদের মাঝে সংঘটিত মামলাগুলোর নিষ্পত্তি করতেন। মুসলিম বিচারকগণ সেখানে কোনোরকম হস্তক্ষেপ করতেন না। কারণ ফকিহগণও যিম্মিদের বিচারকাজ যিম্মি বিচারকদের ওপর ন্যস্ত করার বৈধতা দান করেছেন। সুবহুল আ'শা গ্রন্থে কালকাশান্দি রহ. যিম্মিদের বিচারব্যবস্থার নানা অনুষঙ্গ তুলে ধরেন। যাতে বোঝা যায়, যিম্মি বিচারকদের এই বিচারকাজ সম্পাদনের ক্ষমতা খলিফার অনুমতিক্রমেই প্রচলিত ছিল। অপরদিকে আন্দালুসে যেহেতু যিম্মিদের সংখ্যা ছিল প্রচুর, তাই মুসলিমগণ তাদের জন্য বিশেষ যিম্মি বিচারকের ব্যবস্থা করেন। তারা ভিন্ন ভিন্ন নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন। কেউ খ্রিষ্টানদের বিচারক, কেউ অনারবদের বিচারক। তবে মুসলিমের সঙ্গে কোনো যিম্মির বিরোধ ঘটলে মুসলিম বিচারকগণই তার মীমাংসা করতেন। তেমনই বিচারকগণ এক খ্রিষ্টানের বিপক্ষে অপর খ্রিষ্টানের সাক্ষ্য গ্রহণ করতেন। এক ইহুদির বিপক্ষে অপর ইহুদির সাক্ষ্য গ্রহণ করতেন। তবে মুসলিমের বিরুদ্ধে কোনো বিধর্মীর সাক্ষ্য তারা গ্রহণ করতেন না। (৪২৭)

টিকাঃ
৪২৫. ওয়াকি ইবনে খালাফ, আখবারুল কুযাতি, খ. ৩, পৃ. ২৬৯।
৪২৬. মাওয়ারদি, আদাবুল কাযি, খ. ২, পৃ. ২৮৪।
৪২৭. আবদুল মুনয়িম মাজেদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ৫৩-৫৪।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 বিচারব্যবস্থার ওপর নজরদারি

📄 বিচারব্যবস্থার ওপর নজরদারি


ইসলামি রাষ্ট্র ও শাসকশ্রেণি বিচারব্যবস্থাকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। বিচারবিভাগকে সকল প্রকার স্বার্থসিদ্ধির ঊর্ধ্বে রাখতে এবং যাবতীয় অন্যায় ও অবিচার থেকে মুক্ত রাখতে শাসকগণ বিচার কার্যক্রমের ওপর কঠোর নজরদারি আরোপ করেছেন। কোনো বিচারক দুর্নীতি, অবিচারের আশ্রয় নিলে তাকে পদচ্যুত করেছেন। বিশিষ্ট লেখক আল-কিন্দি লেখেন, ১০৫ হিজরি সনে ইয়াহইয়া ইবনে মাইমুনের বিচারিক অঞ্চলে একবার এক এতিমের মামলা সামনে আসে। ওই এতিমের বিষয়টি দেখার জন্য এতিমের গ্রামের একজন নেতাকে তিনি দায়িত্ব প্রদান করেন। এতিম ছেলেটি ওই নেতার প্রতিপালনেই বড় হচ্ছিল। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর ওই নেতার বিরুদ্ধে ইয়াহইয়া ইবনে মাইমুনের কাছে জুলুমের অভিযোগ করেও ন্যায়সম্মত প্রতিকার পায়নি। যার ফলে এতিম ছেলেটি একটি কবিতায় তার অভিযোগ লিখে ইয়াহইয়া ইবনে মাইমুনের কাছে পাঠায়। কবিতাটি ছিল :
ألا أبلغ أبا حسان عني * بأن الحكم ليس على هواكا حكمت بباطل لم تأت حقا * ولم يسمع بحكم مثل ذاكا وتزعم أنـهـا حـق وعدل * وأزعم أنها ليست كذاكا ألم تعلم بأن الله حق * وأنك حين تحكم قد يراكا

আবু হাসসান (ইয়াহইয়া ইবনে মাইমুন)-কে জানিয়ে দাও যে, বিচারব্যবস্থা তার প্রবৃত্তি অনুযায়ী চলবে না। আপনি অন্যায় বিচার করেছেন। তাতে ন্যায় বলতে কিছুই ছিল না। এরকম বিচার কখনো হয়েছে বলে লোকমুখে প্রসিদ্ধ নয়। আর আপনি ভাবছেন যে, আপনি সত্য ও সুবিচার করেছেন। আর আমি দেখছি, তা একেবারে ন্যায়-বহির্ভূত। আপনি কি বিশ্বাস করেন না যে মহান আল্লাহ সত্য, আপনি যখন বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করেন তখন তিনি আপনাকে দেখেন?!

কবিতাটি পড়ে ইয়াহইয়া ইবনে মাইমুন এতিম বালকটিকে কারাবন্দি করেন। শেষ পর্যন্ত এতিমের ইস্যুটি খলিফা হিশাম ইবনে আবদুল মালিকের কানে যায়। তিনি বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেন এবং ইয়াহইয়া ইবনে মাইমুনকে বিচারকের পদ থেকে অব্যাহতি দেন। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গভর্নর ওয়ালিদ ইবনে রিফাআর কাছে যে পত্রটি তিনি লেখেন তার ভাষা ছিল এই, লাঞ্ছিত ও বিতাড়িত করে ইয়াহইয়াকে পদচ্যুত করার ব্যবস্থা নিন। (৪২৮)

ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও অবিচার দমনে শাসকদের এরকম সুউচ্চ মনোবল ও অদম্য ইচ্ছা সমকালীন অন্য কোনো জাতি-গোষ্ঠীর ইতিহাসে একেবারেই বিরল। সাধারণ জনগণ এবং অনাথ শিশুদের অধিকার সংক্রান্ত ইস্যুগুলো শাসক ও খলিফাগণ যে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন, অন্য কোনো সভ্যতায় তার নজির পাওয়া যায় না। ইসলামি সভ্যতার যাত্রা এবং মানবতার কল্যাণ সাধনায় তার অবদান কত সুদূরপ্রসারী ছিল এর দ্বারা তারই প্রমাণ পাওয়া যায়।

ধীরে ধীরে এ বিভাগেরও উন্নতি ঘটে। একপর্যায়ে বিচারকদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো বিশেষভাবে তদন্ত করার জন্য প্রাদেশিক বিচারপতিদের সঙ্গে কাযিউল কুযাতগণ (প্রধান বিচারপতিগণ) যুক্ত হন। ফলে অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িত বিচারকদের তারা পদচ্যুত করতেন। অন্যথায় স্বপদে বহাল রাখতেন। অনেক সময় বিচারকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ষড়যন্ত্রমূলক হতো। কুযাতু কুরতুবা গ্রন্থে বর্ণিত আছে, শাসক আল-হাকামের পক্ষ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত একজন বিচারক জিয়ান অঞ্চলে কর্মরত ছিলেন। একবার স্থানীয় লোকজন তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অবিচারের অভিযোগ দায়ের করে। ফলে শাসক আল-হাকাম ওই বিচারকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের তদন্ত করতে কর্ডোভার কাযিউল জামাআ (প্রধান বিচারপতি) সাইদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে বশিরকে দায়িত্ব দেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে পদচ্যুত করার আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে স্বপদে বহাল রাখার নির্দেশ দেন। এরপর তিনি তদন্ত করে বিচারককে নির্দোষ পান। ফলে তাকে বলে দেন, আপনি আপনার দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করতে থাকুন। (৪২৯)

সে সময় আরও একটি স্বতন্ত্র আদালত প্রতিষ্ঠা হয়, যা অনেকটা আমাদের বর্তমান সময়ে প্রচলিত সুপ্রিম কোর্টের মতো। ওই আদালতকে বলা হতো খুততাতুর রদ (خطة الرد)। এই আদালতের বিচারকগণ শুধু বিচারব্যবস্থায় দায়িত্বরত বিচারকদের রায়গুলো পর্যবেক্ষণ করতেন ও সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন এবং সাধারণ বিচারকরা যে ক্ষেত্রে রায় দিতে ব্যর্থ হতেন সে ক্ষেত্রে রায় দিতেন। ওই আদালতের কাজ ছিল বিচারিক রায় ও বিচারকদের পর্যবেক্ষণ করা, স্থানীয় লোকদের গতিবিধি লক্ষ রাখা এবং বিচারক ও জনগণের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নজরদারি করা।

এই বিভাগের প্রধানের পদে যারা সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের অন্যতম হলেন আল-হাকাম মুস্তানসিরের (মৃ. ৩৬৬ হি.) শাসনামলে মুহাম্মাদ ইবনে তামলিখ আত-তামিমি এবং আবদুল মালিক ইবনে মুনযির ইবনে সাইদ। উক্ত আদালতের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারকের পদবি ছিল সাহিবুর রদ (صاحب الرد)। কারণ সকল অভিযোগ ও সংবিধান তাদের কাছে উত্থাপিত হতো। এই পদটি ছিল প্রধান বিচারপতি থেকে এক স্তর নিচের ও কাছাকাছি পর্যায়ের। (৪৩০)

টিকাঃ
৪২৮. আল-কিন্দি, আল-উলাত ওয়াল-কুযাত, পৃ. ৩৪১।
৪২৯. খুশানি, কুযাতু কুরতুবা, পৃ. ১৫।
৪৩০. নাবাহি, তারিখু কুযাতিল উন্দুলুস, পৃ. ৫।

ইসলামি রাষ্ট্র ও শাসকশ্রেণি বিচারব্যবস্থাকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। বিচারবিভাগকে সকল প্রকার স্বার্থসিদ্ধির ঊর্ধ্বে রাখতে এবং যাবতীয় অন্যায় ও অবিচার থেকে মুক্ত রাখতে শাসকগণ বিচার কার্যক্রমের ওপর কঠোর নজরদারি আরোপ করেছেন। কোনো বিচারক দুর্নীতি, অবিচারের আশ্রয় নিলে তাকে পদচ্যুত করেছেন। বিশিষ্ট লেখক আল-কিন্দি লেখেন, ১০৫ হিজরি সনে ইয়াহইয়া ইবনে মাইমুনের বিচারিক অঞ্চলে একবার এক এতিমের মামলা সামনে আসে। ওই এতিমের বিষয়টি দেখার জন্য এতিমের গ্রামের একজন নেতাকে তিনি দায়িত্ব প্রদান করেন। এতিম ছেলেটি ওই নেতার প্রতিপালনেই বড় হচ্ছিল। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর ওই নেতার বিরুদ্ধে ইয়াহইয়া ইবনে মাইমুনের কাছে জুলুমের অভিযোগ করেও ন্যায়সম্মত প্রতিকার পায়নি। যার ফলে এতিম ছেলেটি একটি কবিতায় তার অভিযোগ লিখে ইয়াহইয়া ইবনে মাইমুনের কাছে পাঠায়। কবিতাটি ছিল :
ألا أبلغ أبا حسان عني * بأن الحكم ليس على هواكا حكمت بباطل لم تأت حقا * ولم يسمع بحكم مثل ذاكا وتزعم أنـهـا حـق وعدل * وأزعم أنها ليست كذاكا ألم تعلم بأن الله حق * وأنك حين تحكم قد يراكا

আবু হাসসান (ইয়াহইয়া ইবনে মাইমুন)-কে জানিয়ে দাও যে, বিচারব্যবস্থা তার প্রবৃত্তি অনুযায়ী চলবে না। আপনি অন্যায় বিচার করেছেন। তাতে ন্যায় বলতে কিছুই ছিল না। এরকম বিচার কখনো হয়েছে বলে লোকমুখে প্রসিদ্ধ নয়। আর আপনি ভাবছেন যে, আপনি সত্য ও সুবিচার করেছেন। আর আমি দেখছি, তা একেবারে ন্যায়-বহির্ভূত। আপনি কি বিশ্বাস করেন না যে মহান আল্লাহ সত্য, আপনি যখন বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করেন তখন তিনি আপনাকে দেখেন?!

কবিতাটি পড়ে ইয়াহইয়া ইবনে মাইমুন এতিম বালকটিকে কারাবন্দি করেন। শেষ পর্যন্ত এতিমের ইস্যুটি খলিফা হিশাম ইবনে আবদুল মালিকের কানে যায়। তিনি বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেন এবং ইয়াহইয়া ইবনে মাইমুনকে বিচারকের পদ থেকে অব্যাহতি দেন। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গভর্নর ওয়ালিদ ইবনে রিফাআর কাছে যে পত্রটি তিনি লেখেন তার ভাষা ছিল এই, লাঞ্ছিত ও বিতাড়িত করে ইয়াহইয়াকে পদচ্যুত করার ব্যবস্থা নিন। (৪২৮)

ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও অবিচার দমনে শাসকদের এরকম সুউচ্চ মনোবল ও অদম্য ইচ্ছা সমকালীন অন্য কোনো জাতি-গোষ্ঠীর ইতিহাসে একেবারেই বিরল। সাধারণ জনগণ এবং অনাথ শিশুদের অধিকার সংক্রান্ত ইস্যুগুলো শাসক ও খলিফাগণ যে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন, অন্য কোনো সভ্যতায় তার নজির পাওয়া যায় না। ইসলামি সভ্যতার যাত্রা এবং মানবতার কল্যাণ সাধনায় তার অবদান কত সুদূরপ্রসারী ছিল এর দ্বারা তারই প্রমাণ পাওয়া যায়।

ধীরে ধীরে এ বিভাগেরও উন্নতি ঘটে। একপর্যায়ে বিচারকদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো বিশেষভাবে তদন্ত করার জন্য প্রাদেশিক বিচারপতিদের সঙ্গে কাযিউল কুযাতগণ (প্রধান বিচারপতিগণ) যুক্ত হন। ফলে অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িত বিচারকদের তারা পদচ্যুত করতেন। অন্যথায় স্বপদে বহাল রাখতেন। অনেক সময় বিচারকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ষড়যন্ত্রমূলক হতো। কুযাতু কুরতুবা গ্রন্থে বর্ণিত আছে, শাসক আল-হাকামের পক্ষ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত একজন বিচারক জিয়ান অঞ্চলে কর্মরত ছিলেন। একবার স্থানীয় লোকজন তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অবিচারের অভিযোগ দায়ের করে। ফলে শাসক আল-হাকাম ওই বিচারকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের তদন্ত করতে কর্ডোভার কাযিউল জামাআ (প্রধান বিচারপতি) সাইদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে বশিরকে দায়িত্ব দেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে পদচ্যুত করার আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে স্বপদে বহাল রাখার নির্দেশ দেন। এরপর তিনি তদন্ত করে বিচারককে নির্দোষ পান। ফলে তাকে বলে দেন, আপনি আপনার দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করতে থাকুন। (৪২৯)

সে সময় আরও একটি স্বতন্ত্র আদালত প্রতিষ্ঠা হয়, যা অনেকটা আমাদের বর্তমান সময়ে প্রচলিত সুপ্রিম কোর্টের মতো। ওই আদালতকে বলা হতো খুততাতুর রদ (خطة الرد)। এই আদালতের বিচারকগণ শুধু বিচারব্যবস্থায় দায়িত্বরত বিচারকদের রায়গুলো পর্যবেক্ষণ করতেন ও সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন এবং সাধারণ বিচারকরা যে ক্ষেত্রে রায় দিতে ব্যর্থ হতেন সে ক্ষেত্রে রায় দিতেন। ওই আদালতের কাজ ছিল বিচারিক রায় ও বিচারকদের পর্যবেক্ষণ করা, স্থানীয় লোকদের গতিবিধি লক্ষ রাখা এবং বিচারক ও জনগণের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নজরদারি করা।

এই বিভাগের প্রধানের পদে যারা সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের অন্যতম হলেন আল-হাকাম মুস্তানসিরের (মৃ. ৩৬৬ হি.) শাসনামলে মুহাম্মাদ ইবনে তামলিখ আত-তামিমি এবং আবদুল মালিক ইবনে মুনযির ইবনে সাইদ। উক্ত আদালতের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারকের পদবি ছিল সাহিবুর রদ (صاحب الرد)। কারণ সকল অভিযোগ ও সংবিধান তাদের কাছে উত্থাপিত হতো। এই পদটি ছিল প্রধান বিচারপতি থেকে এক স্তর নিচের ও কাছাকাছি পর্যায়ের। (৪৩০)

টিকাঃ
৪২৮. আল-কিন্দি, আল-উলাত ওয়াল-কুযাত, পৃ. ৩৪১।
৪২৯. খুশানি, কুযাতু কুরতুবা, পৃ. ১৫।
৪৩০. নাবাহি, তারিখু কুযাতিল উন্দুলুস, পৃ. ৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00