📄 বিচারকের ন্যায়প্রতিষ্ঠার সহায়ক কিছু পদ্ধতি
বিচারবিভাগ খিলাফতের গুরুত্বপূর্ণ একটি কার্যালয়। সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠায় এটাই ইসলামের সর্বোচ্চ বিভাগ। এই বিভাগের দায়িত্ব হলো কুরআন এবং সুন্নাহর আলোকে শরিয়তসম্মত বিধান মোতাবেক বাদী-বিবাদীর মাঝে সৃষ্ট বিরোধের মীমাংসা ও সমাধান করা। (৩৮৯)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ ছোট-বড়, শাসক-শাসিত সকলের সমস্যার ক্ষেত্রে আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ শরিয়ত অনুযায়ী বিচার বাস্তবায়নের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছে। পাশাপাশি বিচারকগণ যেন কথা ও কাজে সবসময় আল্লাহর ভয় লালন করেন, ইসলাম সেই দীক্ষা তাদের শুরু থেকেই দিয়ে আসছে। কারণ কোনো বিচারক যদি শরিয়তের গণ্ডির বাইরে গিয়ে বিচার সমাধা করেন, তবে তা বাদী-বিবাদীর প্রতি চরম অন্যায় বলে বিবেচিত হয়। আল্লাহর বিচারনীতি অবজ্ঞার ফলে দ্বিগুণ অপরাধী সাব্যস্ত হয়। এ কারনেই ইসলাম জুলুমকারী এবং সুবিচার বর্জনকারী বিচারকদের কঠোরভাবে সতর্ক করেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
الْقُضَاهُ ثَلاثَةُ قَاضِيَانِ فِي النَّارِ وَقَاضٍ فِي الْجَنَّةِ رَجُلٌ قَضَى بِغَيْرِ الْحَقِّ فَعَلِمَ ذَاكَ فَذَاكَ فِي النَّارِ وَقَاضٍ لا يَعْلَمُ فَأَهْلَكَ حُقُوقَ النَّاسِ فَهُوَ فِي النَّارِ وَقَاضٍ قَضَى بِالْحَقِّ فَذَلِكَ فِي الْجَنَّةِ»
বিচারক তিন প্রকারের। দুই প্রকারের বিচারক জাহান্নামি এবং এক প্রকারের বিচারক জান্নাতি। জেনেশুনে যে বিচারক অন্যায় রায় প্রদান করে সে জাহান্নামি। সত্যকে সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি না করেই যে বিচারক মানুষের অধিকারসমূহ বিনষ্ট করে দেয়, সেও জাহান্নামি। আর যে বিচারক ন্যায় বিচার করে সে জান্নাতের অধিকারী। (৩৯০)
এতে কোনো সন্দেহ নেই, সূক্ষ্মভাবে বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে মূল আস্থার জায়গা হচ্ছে কুরআন ও সুন্নাহ। এতে করে জাগতিক স্বার্থসিদ্ধির পথ বন্ধ হয়। পাশাপাশি ইসলামি সাম্রাজ্যের প্রতিটি অঞ্চলে একই বিচারনীতি প্রয়োগ হয় এবং দীর্ঘ সময়ের পরম্পরায় তার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
বিচারকার্যে যদিও প্রধান দুটি উৎস হলো কুরআন ও সুন্নাহ। তারপরও যেসব মোকাদ্দমা নিষ্পত্তিতে সরাসরি কুরআন ও সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস-এ চারটি মৌলিক উৎসে কোনো উদ্ধৃতি পাওয়া যায় না, তখন বিচারক সেসব বিষয়ে নিজে ইজতিহাদ বা গবেষণা করতে পারবেন। সেই ইজতিহাদে তিনি পুরস্কার লাভ করবেন। আমর ইবনুল আস রা. আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেন,
«إِذَا حَكَمَ الحَاكِمُ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَصابَ فَلَهُ أَجْرَانِ، وَإِذَا حَكَمَ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَخْطَأَ فَلَهُ أَجْرٌ»
একজন বিচারক বিচারকার্য সম্পন্ন করতে গিয়ে যখন ইজতিহাদের পথ অবলম্বন করে সঠিক রায় প্রদান করেন, তখন তার জন্য দুটি পুরস্কার লেখা হয়। আর ইজতিহাদ করতে গিয়ে যখন ভুল করেন তখন তার জন্য একটি পুরস্কার লেখা হয়। (৩৯১)
দুটি পুরস্কারের একটি হলো সত্য অনুসন্ধানে আন্তরিক প্রচেষ্টার এবং দ্বিতীয়টি হলো সত্য খুঁজে পেয়ে সে মতে বিচার সাধনের। আর যে বিচারক ভুল করবে, তার পুরস্কার এজন্য যে, সত্য অনুসন্ধানে তার চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিল না। সে ক্ষেত্রে বিচারক ভুল সিদ্ধান্ত দিলেও কোনো গুনাহ হবে না, কারণ তার মনের ইচ্ছা ছিল সৎ। তবে বিচারক ইজতিহাদ তখনই করতে পারবেন, যখন তার মাঝে ইজতিহাদ করার সব যোগ্যতা ও বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকবে।
বিচার-মীমাংসায় বিচারককে বাদী-বিবাদীর মাঝে পূর্ণ ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হতে হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলি রা.- কে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন,
إِذَا تَقَاضَى إِلَيْكَ رَجُلَانِ فَلَا تَقْضِ لِلأَوَّلِ حَتَّى تَسْمَعَ كَلَامَ الْآخِرِ فَإِنَّكَ إِذَا فَعَلْتَ ذَلِكَ تَبَيَّنَ لَكَ القَضَاء
তোমার কাছে যখন দুই ব্যক্তি বিচারের আবেদন করবে, তখন দ্বিতীয় পক্ষের বক্তব্য সম্পূর্ণ না শুনে প্রথম পক্ষের কথার ওপর ভিত্তি করে রায় প্রদান করো না। আর খুব শীঘ্রই জানতে পারবে, তুমি কীভাবে ফয়সালা করছ। (৩৯২)
তেমনই একজন বিচারকের জন্য আবশ্যক হলো, রাগের মাথায় রায় প্রদান না করা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
لَا يَقْضِيَنَّ حَكَمُ بَيْنَ اثْنَيْنِ وَهُوَ غَضْبَانُ কোনো বিচারক যেন রাগের মাথায় দুইজনের মাঝে ফয়সালা না করে। (৩৯৩)
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বিচারককে উপযুক্ত বেতন প্রদান করতে হবে। কোনো প্রকার উপঢৌকন গ্রহণ করা(৩৯৪) থেকে তাকে নিষেধ করতে হবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَنِ اسْتَعْمَلْنَاهُ عَلَى عَمَلٍ فَرَزَقْنَاهُ رِزْقًا، فَمَا أَخَذَ بَعْدَ ذَلِكَ فَهُوَ غُلُوْلُ» * বেতন ধার্য করে কাউকে আমরা কোনো কাজের দায়িত্ব প্রদান করার পর সে যদি তা থেকে অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করে, তাহলে সেটা চুরি বলে বিবেচিত হবে। (৩৯৫)
বিচার-মীমাংসার ক্ষেত্রে কখনো বিরোধপূর্ণ বিষয় সরাসরি দেখার প্রয়োজন পড়ে। সে ক্ষেত্রে বিচারক নিজেই তা নির্ধারণ করবেন। একাকীও যেতে পারেন। পরিদর্শন শেষে প্রাপ্ত ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে তিনি রায় দেবেন। উদাহরণ: একবার আনসার ও মুহাজিরদের মাঝে বিরোধ দেখা দেয়। তাদের আসার অপেক্ষা না করে বিরোধ মীমাংসায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে দ্রুত সেখানে ছুটে যান। কারণ, পরিস্থিতি ছিল খুবই নাজুক ও সংঘাতময়। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রা. বলেন, আমরা এক যুদ্ধে ছিলাম। একজন মুহাজির একজন আনসারির নিতম্বে আঘাত করে। প্রতিশোধের উদ্দেশ্যে সে আনসার গোষ্ঠীকে ডেকে বলে, কোথায় আনসার গোষ্ঠী? অপরদিকে মুহাজিরও ডাকতে থাকে, হে মুহাজির গোষ্ঠী! কিন্তু তাদের এ ডাকাডাকি আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শুনিয়ে দেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে? সবাই বলল, একজন মুহাজির একজন আনসারের নিতম্বে আঘাত করেছে। এরপর প্রতিশোধের উদ্দেশ্যে পরস্পরে আনসার ও মুহাজির গোষ্ঠীকে ডাকাডাকি শুরু করে। তখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এগুলো ছাড়ো। এ ধরনের ডাকাডাকি বড় দুর্গন্ধময়। (৩৯৬)
আরেকটি ঘটনা। মুহাম্মাদ ইবনে রুমহের বিবরণ অনুযায়ী আল-কিন্দি বলেন, বাড়ির প্রাচীর নিয়ে প্রতিবেশীর সাথে আমার বিরোধ চলছিল। আমার মা আমাকে বললেন, তুমি বিচারক মুফাদদাল ইবনে ফুদালার (১৭৪-১৭৭ হি. পর্যন্ত বিচারক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন) কাছে গিয়ে বলো, তিনি যেন এখানে উপস্থিত হয়ে বিষয়টি তদন্ত করেন। তখন তার কাছে গিয়ে আবেদন করলে তিনি বলেন, আসরের পর বসার ব্যবস্থা করো, আমি এসে এর মীমাংসা করব। তিনি এসে আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করে প্রাচীরটি দেখলেন। পরে প্রতিবেশীর বাড়িতে ঢুকে তা দেখলেন। অতঃপর এই বলে প্রস্থান করলেন যে, প্রাচীরটি তোমাদের প্রতিবেশীর। (৩৯৭)
এমনকি বিচারকের অধিকার আছে প্রয়োজন হলে কারও কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ করার। আলি রা. একবার অদ্ভুত এক মামলার এজলাসে ছিলেন। নিত্যনতুন যুক্তি-প্রমাণ পেশ করা হচ্ছিল। উত্তেজক জবানবন্দি রেকর্ড করা হচ্ছিল। ফলে মামলাটি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। তখন আলি রা. পুত্র হাসান রা.-এর কাছে পরামর্শ চান। এর দ্বারা বোঝা যায়, একজন বিচারক মামলার বিষয়ে অনায়াসে যে-কারও সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন। বিস্ময়কর এই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন ইবনুল কাইয়িম রহ. তার বিখ্যাত আত-তুরুকুল হুকমিয়্যা গ্রন্থে/ তিনি বলেন, একবার আমিরুল মুমিনিন আলি রা.-এর কাছে একজন লোককে গ্রেফতার করে নিয়ে আসা হয়। যাকে একজন রক্তাক্ত নিহত ব্যক্তির ঘটনাস্থলে হাতে রক্তমাখা ছুরিসহ পাওয়া গিয়েছিল। বিচারক তাকে জিজ্ঞেস করলে সে বলে, আমি হত্যা করেছি! আলি রা. রায় দেন, কেসাস হিসেবে তাকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করো। তাকে নিয়ে গেলে এক ব্যক্তি ছুটে এসে বলতে থাকে, হে আমার জাতি, তোমরা তাড়াহুড়া করো না বরং একে আলি রা.-এর কাছে নিয়ে চলো। তাকে আলি রা.-এর কাছে নিয়ে আসা হলে দ্বিতীয় লোকটি বলতে থাকে, হে আমিরুল মুমিনিন, সে হত্যাকারী নয়, বরং আমি হলাম প্রকৃত হত্যাকারী। তখন আলি রা. প্রথম লোকের উদ্দেশে বলেন, হত্যা না করেও কেন তুমি হত্যার দাবি করেছ? উত্তরে সে বলল, হে আমিরুল মুমিনিন, আমার আর কীই-বা করার ছিল! পুলিশ এসে আমাকে এমন অবস্থায় পেয়েছে যে, আমার হাতে তখন রক্তমাখা ছুরি এবং ঘটনাস্থল থেকে আমাকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। আমি যদি অস্বীকার করতাম, কেউ আমার কথা বিশ্বাস করত না। উপরন্তু ওই এলাকায় হত্যার ঘটনা সংঘটিত হওয়ার ফলে হত্যাকারী অজানা থাকায় বিচারকের সামনে এসে এলাকাবাসীকে কাসামা (৩৯৮) (শপথ) করতে হতো। এসব কিছু বিবেচনা করে আমি নিজেকে হত্যাকারী বলে স্বীকার করেছি। এর প্রতিদান আল্লাহর কাছে পাব বলে আশা করেছি। উত্তরে আলি রা. বলেন, তোমার কাজটি ভালো হয়নি। এখন বলো, রক্তমাখা ছুরি নিয়ে ওখানে তুমি কী করছিলে? উত্তরে সে বলল, পেশায় আমি একজন কসাই। ভোরের আবছা অন্ধকারে আমি দোকানের উদ্দেশে বের হই। এরপর একটি গরু জবাই করে তার চামড়া ছেলা শুরু করি। এমন সময় আমার প্রস্রাবের বেগ হলে দোকানের পাশে ঘটনাস্থলে প্রস্রাব করতে যাই। প্রস্রাব শেষে আমি দোকানের দিকে ফিরতে গিয়ে দেখি রক্তাক্ত অবস্থায় এক ব্যক্তি নিহত হয়ে পড়ে আছে। বিষয়টি আমাকে ভাবিয়ে তোলে। ছুরি হাতে নিয়েই আমি ঘটনা জানার জন্য দাঁড়িয়ে থাকি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আপনার বাহিনী এসে দাঁড়ায় এবং আমাকে গ্রেফতার করে। আশপাশের মানুষজনও বলতে থাকে, আর কেউ নয়, এই লোকই হত্যা করেছে। এরপর আমি নিশ্চিত হয়ে যাই যে, এতগুলো মানুষের সাক্ষ্যের সামনে আমার একার সাক্ষ্য কোনো কাজে আসবে না। তাই বাধ্য হয়ে, অপরাধ না করেও তা স্বীকার করে নিই। আলি রা. দ্বিতীয় ব্যক্তিকে বলেন, এবার তোমার বৃত্তান্ত বলো! সে বলল, ইবলিসের প্ররোচনায় অর্থের মোহে পড়ে ওই ব্যক্তিকে আমি হত্যা করেছি। এরপর নৈশ প্রহরীর আগমন টের পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে কেটে পড়ি। কসাই লোকটি যে বিবরণ দিয়েছে, পালানোর সময় ঠিক সেই অবস্থায়ই তাকে আমি সেখানে দেখতে পাই। নৈশ প্রহরী আসার আগেই আমি নিকটস্থ একটি জায়গায় আত্মগোপন করি। তখন প্রহরীরা তাকে ধরে আপনার কাছে নিয়ে আসে। আপনি যখন তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন, তখন ভাবলাম, আমি ইতিমধ্যে এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছি, এখন এ লোকটিও যদি আমার কারণে বিনা অপরাধে মারা যায়, তাহলে এর শাস্তিও পরকালে আমাকে ভোগ করতে হবে। তাই আমি অপরাধ স্বীকার করে নিচ্ছি। আলি রা. পুত্র হাসান রা.-এর কাছে পরামর্শ চাইলে তিনি বলেন, হে আমিরুল মুমিনিন, এই লোকটি যদিও একজনকে হত্যা করেছে। কিন্তু অপরদিকে সে একজন নিরপরাধ লোকের জীবন বাঁচিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,
﴿وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا
এবং যে ব্যক্তি কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সব মানুষের জীবন রক্ষা করে। (৩৯৯)
আলি রা. উভয়কে মুক্ত করে দিয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থ তহবিল থেকে এর দিয়ত (রক্তপণ) প্রদান করেন। এই ঘটনায় ইবনুল কাইয়িম রহ. টীকা যোগ করে বলেন, এখানে যদি নিহতের অভিভাবকদের সম্মতিতে রক্তপণ চুক্তি সম্পাদন হয়ে থাকে, তাহলে কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু যদি তাদের সম্মতি না থাকে, তাহলে ফকিহদের মতামত হলো, এই অবস্থায় কেসাস বহাল থাকবে। কারণ অপরাধী অপরাধ স্বীকার করে মৃত্যুদণ্ডের উপযুক্ত বিবেচিত হয়েছে। আর যেহেতু কেসাস প্রত্যাহার করার কোনো কার্যকারণ নেই, তাই কেসাস কার্যকর করা আবশ্যক হয়ে যায়। (৪০০)
মানুষের মাঝে বিচারবিভাগের ছিল সুউচ্চ মর্যাদা ও প্রভাব। বিচারক ও তার অবস্থানের সম্মানার্থে এজলাসে সকলের নীরবতাবলম্বন ছিল সাধারণ নিয়ম। তারিখু কুযাতিল উন্দুলুস গ্রন্থে ইবনে যাকওয়ানের বৃত্তান্ত বর্ণনায় লেখক বলেন, তিনি ছিলেন প্রবল ভাবমূর্তিসম্পন্ন একজন বিচারক। তার উপস্থিতিতে সকলেই ভীত-সন্ত্রস্ত থাকত। তার এজলাসের চেয়ে অধিক ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ এজলাস কখনো দেখিনি। এজলাসে বসলে সবাইকে মুগ্ধ করে দিতেন। তার সামনে বাদী-বিবাদী ছাড়া কেউ আওয়াজ করার দুঃসাহস করত না। তার এজলাসে উপস্থিত লোকেরা হাতের ইশারায় কথা বলত। মানুষ তার কথা শুনে অভিভূত হতো। (৪০১)
ইসলামি সমাজে বিচারবিভাগের অপরিসীম গুরুত্বের কথা চিন্তা করে মুসলিম জ্ঞানী-মনীষী ও বিজ্ঞজনেরা সমাজে সুবিচার ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় বিচারকদের উপদেশ দিতেন। আবু মুসা আশআরি রা.-কে কুফার বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে পাঠানোর সময় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রা. তার উদ্দেশে একটি নাতিদীর্ঘ উপদেশবাণী লেখেন। যার সারমর্ম ছিল,
পর সমাচার এই যে, মনে রাখবেন বিচারকাজ একটি চিরন্তন ফরয এবং অনুসৃত রীতি। আপনাকে যেহেতু এ কাজের দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হচ্ছে, তাই এ কাজটি আপনি ভালো করে উপলব্ধি করুন। কারণ বাস্তবায়ন ছাড়া শুধু মুখে বলে কোনো লাভ নেই। আপনার অবয়ব, আপনার ন্যায়বিচার এবং আপনার বিচারিক মজলিসের মাধ্যমে মানুষের মাঝে সুখ বিতরণ করুন। আপনার দুর্বলতা দেখে কোনো অসাধু ব্যক্তি যেন লোভের চিন্তা না করতে পারে এবং আপনার সুবিচার থেকে কোনো দুর্বল ব্যক্তি যেন হতাশ না হয়ে পড়ে। মনে রাখবেন, বাদীর কর্তব্য হলো উপযুক্ত প্রমাণ পেশ করা। আর বিবাদীর কর্তব্য হলো শপথ করা। মুসলিমদের মাঝে চুক্তি সম্পাদন করা বৈধ। তবে এমন কোনো চুক্তি করা যাবে না যা হারামকে হালাল করে অথবা কোনো হালালকে হারাম সাব্যস্ত করে। গতকালের করা ফয়সালা যদি আজ আপনার কাছে ভুল মনে হয়, তাহলে ওই রায় প্রত্যাহার করে নিতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হবেন না। কারণ সত্য চিরন্তন। আর মিথ্যা রায়ের ওপর অবিচল না থেকে সত্যের দিকে ফিরে আসাটাই উত্তম। কুরআন ও সুন্নাহর মাঝে যে বিষয়ের সমাধান আপনি খুঁজে পাবেন না, তার সমাধান আপনি আপনার বোধশক্তি, উপলব্ধি এবং হৃদয়ে উদিত হওয়া ফয়সালার ওপর ছেড়ে দেবেন। অনুরূপ মামলা ও মীমাংসার ওপর অনুমান করে রায় দিয়ে দেবেন। (৪০২)
টিকাঃ
৩৮৯. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ২২০।
৩৯০. তিরমিযি, হাদিস নং ১৩২২; আবু দাউদ, হাদিস নং ৩৫৭৩; ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২৩১৫।
৩৯১. বুখারি, হাদিস নং ৬৯১৯; মুসলিম, হাদিস নং ১৫।
৩৯২. তিরমিযি, হাদিস নং ১৩৩১; আহমাদ, হাদিস নং ১২১০।
৩৯৩. বুখারি, হাদিস নং ৬৭৩৯; মুসলিম, হাদিস নং ১৬।
৩৯৪. আবদুল মুনয়িম মাজেদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ৫৩।
৩৯৫. আবু দাউদ, হাদিস নং ২৯৪৩; ইবনে খুযাইমা, হাদিস নং ২৩৬৯; মুসতাদরাকে হাকেম, হাদিস নং ১৪৭২।
৩৯৬. বুখারি, হাদিস নং ৪৬২৪; মুসলিম, হাদিস নং ২৫৮৪।
৩৯৭. আল-কিন্দি, আল-উলাত ওয়াল-কুযাত, পৃ. ৩৭৮; যাফের কাসেমি, নিযামুল হুকমি ফিশ- শারিআতি ওয়াত-তারিখিল ইসলামি, খ. ২, পৃ. ৫১৫।
৩৯৮. কাসামার একটি পদ্ধতি হলো, হত্যাকারী অজানা থাকলে নিহত ব্যক্তির আত্মীয়দের মধ্যে পঞ্চাশজন ব্যক্তি বিচারকের সামনে হত্যার ক্ষতিপূরণ দাবি করে শপথ করবে। সংখ্যায় তারা পঞ্চাশজন না হলে যতজন উপস্থিত থাকবে, সবাই পঞ্চাশ বার শপথ করে এই দাবি করবে। তবে সেই পঞ্চাশজনের মাঝে নারী, শিশু, পাগল, দাস থাকা যাবে না। কাসামার দ্বিতীয় পদ্ধতি হলো, যাদের বিরুদ্ধে হত্যার অপবাদ এসেছে, তারা হত্যার সঙ্গে জড়িত নয় বলে উপর্যুক্ত নিয়মে শপথ করবে। এভাবে দাবিদারগণ যদি শপথ করে, তবে ক্ষতিপূরণ লাভ করবে। আর যদি অপবাদপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ শপথ করে, তাহলে ক্ষতিপূরণ আদায় করা থেকে মুক্ত হয়ে যাবে।
৩৯৯. সুরা মায়িদা : ৩২।
৪০০. ইবনুল কাইয়িম, আত-তুরুকুল হুকমিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৮২-৮৪।
৪০১. নাবাহি, তারিখু কুযাতিল উন্দুলুস, পৃ. ৮৪।
৪০২. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ.১, পৃ. ২২১।
📄 বিচারবিভাগ প্রতিষ্ঠা ও তার উন্নয়ন
হিজরি প্রথম দুই তিন শতকে ইসলামি রাষ্ট্র ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে। সেই বিস্তৃতির ফলে যেহেতু নানা দেশের নানা বর্ণের জাতি-গোষ্ঠীর মানুষ ইসলামি সভ্যতার শীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে, তাই শুরু থেকেই ইসলামি সাম্রাজ্যের জন্য এমন একটি সুগঠিত ও স্বতন্ত্র বিচারব্যবস্থা প্রণয়ন করা ছিল অতীব জরুরি, যা ইসলামি সাম্রাজ্যের সকল অঞ্চলের মানুষের মাঝে বিচারিক সমতা সাধন করবে। এরই ধারাবাহিকতায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগ থেকেই ইসলামি বিচারব্যবস্থা জন্মলাভ করে।
জীবদ্দশায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই সকল মোকদ্দমা নিষ্পত্তি করতেন। সকল ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা করতেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইনতেকালের পর ইসলামের সূচনালগ্নে খলিফাগণ সরাসরি বিচারকাজের ফয়সালা করতেন। এরপর যখন ইসলামি সাম্রাজ্যের ক্রমবিস্তার ঘটতে থাকে, অন্যসব সভ্যতার লোকদের সঙ্গে মুসলিমদের সংমিশ্রণ ঘটতে থাকে, খলিফার দায়িত্ব বেড়ে যায়, তখন মামলা মোকদ্দমা নিষ্পত্তির জন্য সরকারিভাবে স্বতন্ত্র বিচারকদের নিয়োগ দেওয়া হয়। উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর শাসনামল থেকেই বিচারক নিয়োগের ধারাবাহিকতা শুরু হয়। তখন মদিনার বিচারক হিসেবে আবু দারদা রা.-কে, বসরার বিচারক হিসেবে শুরাইহ রা.-কে এবং কুফার বিচারক হিসেবে আবু মুসা আশআরি রা.-কে নিয়োগ করা হয়। আবু মুসা আশআরি রা.-কে নিয়োগ দেওয়ার সময় খলিফা উমর রা. তার কাছে বিচারনীতি সংবলিত প্রসিদ্ধ সেই নাতিদীর্ঘ পত্র প্রেরণ করেন। (৪০৩)
এরপর উমাইয়া শাসনামলে বিচারবিভাগের আরও উন্নতি ঘটে। নতুন অনেক বিষয় তাতে সংযোজন করা হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং খুলাফায়ে রাশেদিনের অনুসরণে উমাইয়া শাসকগণও সরাসরি বিচারবিভাগ ও আদালত পরিচালনা করতেন। কিন্তু যুগ-চাহিদা ও সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে উমাইয়া শাসকগণ বিভিন্ন বিভাগকে পৃথক ও স্বতন্ত্র করে দেন। কিন্তু বিচারবিভাগ সংশ্লিষ্ট তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ তারা নিজেদের অধীনে রাখেন। সেগুলো হলো যথাক্রমে খিলাফতের রাজধানী দামেশকে সরাসরি বিচারক নিয়োগ করা, বিচারকদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের ওপর নজরদারি, সুষ্ঠু ও নিপুণভাবে বিচারকার্য সম্পাদনের বিষয়টি নিশ্চিত এবং বিচারক নিয়োগ ও অপসারণ বিষয়ক বিশেষ দিকগুলো তদারকি করা। এরপর ফৌজদারি বিধি, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের বিষয়ে ফয়সালা করার যে দায়িত্ব সেগুলো উমাইয়া শাসকগণ সরাসরি পরিচালনা করতেন। বিশেষ করে অপরাধদণ্ড ও ফৌজদারি মামলার বিচারগুলো সরাসরি উমাইয়া শাসকগণ দেখাশোনা করতেন এবং এজন্য তারা স্বতন্ত্র ইউনিট উদ্ভাবন করেন। (৪০৪)
এরপর আব্বাসীয় খিলাফতের সময় বিচারব্যবস্থার প্রশাসনিক অবকাঠামো উন্নতির শিখরে পৌঁছে। নানা শাখাপ্রশাখা ও ব্যবস্থাপনা তাতে অন্তর্ভুক্ত হয়। শাসনামল শুরু হওয়ার পর থেকেই আব্বাসীয় খলিফাগণ বিচারব্যবস্থার গুরুত্ব ও তাৎপর্য উপলব্ধি করে উমাইয়া শাসনামলের শেষদিকে এ বিভাগের যে দুর্বলতা ও ত্রুটিগুলো ধরা পড়েছিল, তা সংশোধন করেন। আব্বাসীয় খিলাফতের মূল প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে যাকে ধরা হয় সেই বিখ্যাত আব্বাসি খলিফা আবু জাফর মনসুর বিচারবিভাগকে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অপরিহার্য চারটি অনুষঙ্গের একটি মনে করতেন। (৪০৫)
খিলাফতের অঞ্চল ও প্রদেশ বেড়ে যাওয়ায় পরবর্তীকালে প্রাদেশিক গভর্নরগণ বিচারক নিয়োগ ও তাদের অব্যাহতি প্রদানের বিষয়টি দেখাশোনা করতেন। তবে আব্বাসি খিলাফতের পরিমণ্ডলে নতুন আরেকটা পদ যোগ হয়, যার নাম দেওয়া হয় 'কাযিউল কুযাত' (প্রধান বিচারপতি)। তিনি রাজধানী বাগদাদের প্রধান বিচারপতি হওয়ার পাশাপাশি সরকার তাকে আঞ্চলিক বিচারক নিয়োগ, বিচারকদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের ওপর নজরদারি, সুষ্ঠু ও নিপুণভাবে বিচারকাজ সম্পাদনের বিষয়টি নিশ্চিত করা এবং বিচারকদের পদচ্যুত করার দায়িত্ব প্রদান করেন। এ কারণেই আব্বাসীয় শাসনামলে বিচারবিভাগ পুরোপুরি স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য উপভোগ করে এবং উন্নতির শিখরে পৌছে।
আঞ্চলিক বিচারক নিয়োগ এবং বিচারকদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের ওপর নজরদারি করার জন্য প্রথম যাকে কাযিউল কুযাত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় তিনি হলেন বিখ্যাত কাযি ইমাম আবু ইউসুফ রহ.। তিনি ছিলেন খ্যাতনামা আব্বাসি খলিফা হারুনুর রশিদের পক্ষ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত কাযি এবং তার বিশিষ্ট উযির। তিনি বাগদাদের পাশাপাশি ইরাক, খোরাসান, মিশর এবং শামের বিচারক নিয়োগের অধিকার রাখতেন। (৪০৬)
বিচারবিভাগের পরিধি এবং অবকাঠামোতে ব্যাপক বিস্তার ঘটার ফলে আব্বাসীয় সরকার প্রধান বিচারপতি ও আঞ্চলিক বিচারপতিদের জন্য যোগ্য সহকারী নিয়োগ করে। তারা বিচারিক কাজে এবং মামলা নিষ্পত্তির কাজে বিচারপতিদের সহায়তা করতেন। তাদের পদগুলো ছিল:
এক. সহকারী বিচারপতি। তিনি বিভিন্ন শহরে ও দূরের গ্রাম্য এলাকায় বিচারকের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।
দুই. বিচারকের লেখক বা আদালতের লেখক। তিনি এজলাসে উভয় পক্ষের বক্তব্য, সাক্ষীদের সাক্ষ্য এবং বিচারকের রায় লিপিবদ্ধ করা, বাদী-বিবাদীর উপস্থিতি অনুসারে মামলা প্রস্তুত করা, এরপর বিচারকের সামনে তা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা এবং মুসাফির বা অচল ব্যক্তি ছাড়া কারও সঙ্গে অতিরিক্ত সম্প্রীতি না রাখা ইত্যাদি কাজগুলো তিনি পালন করতেন।
তিন. ঘোষক। তিনি বিচারকের পাশে দাঁড়িয়ে বিচারকের সম্মান ও মর্যাদা ঘোষণা করতেন। বাদী-বিবাদীর সম্মুখে বিভিন্ন ঘোষণা দিতেন।
চার. প্রহরী। তিনি মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত। বিচারকের কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে পালন করার জন্য তিনি শতভাগ নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতেন। বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষের লোকজন কে কোথায় বসবে সেগুলো নির্ণয় করতেন। এক পাশে নারী এবং অন্য পাশে পুরুষ বসার বিষয়টি নিশ্চিত করতেন।
পাঁচ. তদন্ত কর্মকর্তা। এ পদটির সংযোজন ঘটে আব্বাসীয় শাসনামলে। এটি উদ্ভাবনের পেছনে উদ্দেশ্য ছিল, বিচারকের সামনে যেসব বিষয় উত্থাপন করা হবে তার যথার্থতা তদন্ত করা। এ কাজের প্রথম উদ্ভাবক ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর সহচর ও বিশিষ্ট কাযি মুহাম্মাদ ইবনে আবদুর রহমান ইবনে আবু লাইলা। বিশিষ্ট দার্শনিক ও পণ্ডিত আল-কিন্দি বলেন, ১৭৪ হিজরি সনে মিশরের বিচারক পদে অধিষ্ঠিত হওয়া মুফাযযাল ইবনে ফুয়ালা তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করেন। তার কাজ ছিল সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা। সাক্ষীগণ কতটুকু সৎ তা যাচাই-বাছাই করা।
ছয়. বণ্টনকারী। তিনি নিজ নিজ অংশ হকদারদের মাঝে সুষ্ঠুরূপে বণ্টন করে দিতেন। জমি সংক্রান্ত মামলা হলে উভয় পক্ষের জন্য জমির পরিমাণ ও সীমা নির্ণয় করে দিতেন। কোনো কোনো অঞ্চলে তাকে ‘হাসসাব' বা হিসাবকারী বলেও ডাকা হতো। বিশিষ্ট লেখক মাওয়ারদি তার জন্য প্রযোজ্য শর্ত ও গুণাগুণের উল্লেখ পাওয়া যায়।
সাত. আমিন। এরকম কিছু লোককে এ কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়, যারা কাযিদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় সুষ্ঠুভাবে দেখাশোনা করবে। যেমন এতিম, অক্ষম-অপারগ, অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অনুপস্থিত লোকদের সম্পদ দেখাশোনা করা; উত্তরাধিকারীদের মাঝে বণ্টন করার আগ পর্যন্ত পরিত্যক্ত সম্পত্তি দেখভাল করা। কাযি সিওয়ার ইবনে আবদুল্লাহ প্রথম আমিন নিয়োগ প্রদান করে তাদেরকে এ কাজগুলো দেখাশোনার দায়িত্ব দেন।
আট. নথি সংরক্ষক। তিনি বিচারকের যাবতীয় নথি, কাগজ, দলিল-দস্তাবেজ নিরাপদ ও নির্দিষ্ট স্থানে সংরক্ষণ করতেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি পদ, সেটি হলো দোভাষী। বাদী-বিবাদী বা সাক্ষীদের কেউ ভিনদেশি বা অনারব হলে বিচারকের সামনে তাদের বক্তব্য অনুবাদ করার দায়িত্ব পালন করতেন। খিলাফতের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটায় এবং নানা জাতির ও নানা ভাষার মানুষ ইসলাম গ্রহণ করার ফলে আব্বাসি শাসনামলে দোভাষীদের সংখ্যা বেড়ে যায়। (৪০৭)
তা ছাড়া ইসলামি সভ্যতায় বিচারিক এজলাস বা আদালত প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের পদ্ধতিও ছিল ভিন্নরকম। এজলাসে বিচারকের সামনে প্রথমে বাদী বিবাদীকে ডাকা হতো। আন্দালুসে একটি সুন্দর পদ্ধতি প্রচলিত ছিল, যার নাম ছিল ‘তাবে’ পদ্ধতি। বিচারকের স্বাক্ষর ও সিল থাকা একটি কাগজের মাধ্যমে বাদী-বিবাদীকে ডাকা হতো। কে ধনী, কে গরিব, কে আমির, কে সাধারণ তার পরোয়া না করে সবাইকে একই নিয়মে বিচারকের সামনে উপস্থিত হতে হতো। (৪০৮)
টিকাঃ
৪০৩. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ২২১।
৪০৪. মুহাম্মাদ যুহাইলি, তারিখুল কাযা ফিল-ইসলাম, পৃ. ১৬৬-১৬৭।
৪০৫. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ৪, পৃ. ৫২০।
৪০৬. আরনুস : তারিখুল কাযা মুহাম্মাদ যুহাইলি রচিত (তারিখুল কাযা ফিল-ইসলাম থেকে উদ্ধৃত।) পৃ. ২২৭।
৪০৭. মুহাম্মাদ যুহাইলি, তারিখুল কাযা ফিল-ইসলাম, পৃ. ২৪৬-২৫০।
৪০৮. খুশানি, কুযাতু কুরতুবা, পৃ. ১৫০-১৫১।
📄 বিচারক নিয়োগ ও যাচাই পদ্ধতি
বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে এমন ব্যক্তিদের নির্বাচিত করা হতো, যাদের মধ্যে ন্যায়নিষ্ঠা, সুবিচার, সাম্য প্রতিষ্ঠার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা থাকার পাশাপাশি যথেষ্ট জ্ঞান, ধার্মিকতা, সততা ও চারিত্রিক স্বচ্ছতা ইত্যাদি গুণের সমাবেশ ঘটত। (৪০৯)
এ কারণেই খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বিচারক নিয়োগে তিনটি বৈশিষ্ট্যকে প্রাধান্য দিতেন। সেগুলো হলো, (এমন ব্যক্তি যে ঘুষ নেবে না। আত্মপ্রদর্শনের মোহে পড়বে না। লোভের পেছনে পড়বে না)। (৪১০)
যার ফলে আমরা দেখি, উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বিভিন্ন অঞ্চলের বিচারকদের গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। ইসলামি সভ্যতায় এসব গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনার ওপরই বিচারব্যবস্থার ভিত্তি রচিত হয়। পরবর্তীকালে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সেগুলো কার্যকর ভূমিকা পালন করে এবং নানা সমস্যার সমাধানে বিরাট অবদান রাখে।
খিলাফতে রাশেদার পর উমাইয়া খলিফাগণও বিচারক নিয়োগের বেলায় জ্ঞান, যোগ্যতা ও বিশ্বস্ততাকে প্রাধান্য দিতেন। বিখ্যাত উমাইয়া শাসক উমর ইবনে আবদুল আযিয রহ. মিশরের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেন ইবনে খাযামির সানআনিকে। কিন্তু এর আগেই তিনি ইবনে খাযামিরের যোগ্যতা, জ্ঞান, পরিপক্বতা, ধার্মিকতা ও দায়িত্ব গ্রহণে তার সামর্থ্যের পরিচয় পেয়ে যান। (ইবনে খাযামিরকে বিচারপতি নিয়োগের কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে ইবনে হাজার রহ. লেখেন, একবার মিশর থেকে একদল অভিযাত্রী খলিফা সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিকের কাছে আগমন করে। ওই দলের একজন ছিলেন ইবনে খাযামির। কথাপ্রসঙ্গে খলিফা সুলাইমান তাদের কাছে মরক্কোর অধিবাসীদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তারা সবাই মরক্কোবাসী সম্পর্কে নিজেদের মতামত ও মূল্যায়ন পেশ করেন। কিন্তু ইবনে খাযামির তাদের ব্যাপারে মূল্যায়ন করতে অস্বীকার করেন। সবাই বের হয়ে যাওয়ার পর উমর ইবনে আবদুল আযিয তাকে জিজ্ঞেস করেন, হে আবু মাসউদ, কেন তাদের ব্যাপারে আপনি মতামত দেননি? উত্তরে ইবনে খাযামির বলেন, আমার মুখ থেকে মিথ্যা কথা বের হয়ে যাবে এই ভয়ে কোনো মত দিইনি। এ ঘটনার পর থেকেই উমর তাকে চিনে রাখেন। এরপর তিনি যখন খলিফা হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন, তখন মিশরের গভর্নর আইয়ুব ইবনে শুরাহবিলের কাছে ইবনে খাযামিরকে মিশরের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগপত্র লেখেন। যার ফলে তিনি হিজরি ১০০ থেকে ১০৫ সন পর্যন্ত মিশরের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন)। (৪১১)
যোগ্য ব্যক্তি শনাক্ত করা এবং বিশেষ বিশেষ পদে তাদের নিয়োগ দেওয়া রাষ্ট্র পরিচালনায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এ কারণেই খলিফা সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিকের উযির থাকা অবস্থায় উমর ইবনে আবদুল আযিয যোগ্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করেন। দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠাবান ব্যক্তিদের যাচাই করেন। যার ফলে ওই ঘটনার পর থেকে উমর ইবনে আবদুল আযিয ইবনে খাযামিরকে ইসলামি সাম্রাজ্যের কোনো একটি অঞ্চলের বিচারক হিসেবে নিয়োগ প্রদানের জন্য মনস্থির করে রাখেন। পরে তিনি তা বাস্তবায়নও করেন। উমরের অনুমান বৃথা যায়নি। পাঁচ বছর বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি পুরো নিষ্ঠা ও দায়িত্বের সঙ্গে কাজ করেন। এ কারণেই ইবনে খাযামির সম্পর্কে ইবনে হাজার লেখেন, অনারবদের মধ্যে ইবনে খাযামিরই প্রথম মিশরের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। বিচারকার্য পরিচালনার বিনিময়ে এক দিরহাম বা এক দিনারও তিনি গ্রহণ করেননি। (৪১২)
যদিও উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর শাসনামল থেকেই বিচারব্যবস্থা পৃথক হয়ে যায়, যা উমাইয়া শাসনামলে পূর্ণতা লাভ করে, তারপরও আমরা দেখি বড় বড় ফকিহ ও বিখ্যাত জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গ বিচারপতির পদ লাভ করা থেকে অনীহা প্রদর্শন করতেন। আল্লাহর ভয়ে এবং আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানের পুরোপুরি বাস্তবায়ন ঘটাতে যদি কোনো ত্রুটি থেকে যায় এবং এর ফলে পরকালে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় এই আশঙ্কায়।
আখবারুল কুযাত গ্রন্থে ওয়াকি বলেন, মিশরের গভর্নর ইয়াযিদ ইবনে হাতেম (মৃ. ১৭৭ হি.) একবার মিশরের বিচারপতি নিয়োগের ইচ্ছা করলেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিবর্গ এবং রাজসভাসদদের পরামর্শ চাইলে তারা তিনজন ব্যক্তিকে বিচারক হিসেবে নিয়োগের পরামর্শ দেন। তারা হলেন যথাক্রমে, হাইওয়া ইবনে শুরাইহ, আবু খুযাইমা (ইবরাহিম ইবনে ইয়াযিদ) এবং আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস গাসসানি। ঘটনার দিন আবু খুযাইমা আলেকজান্দ্রিয়ায় অবস্থান করছিলেন। তাকে রাজপ্রাসাদে ডাকা হলে অনতিবিলম্বে তাকে গভর্নরের সামনে উপস্থিত করা হয়। প্রথম ডাক পড়ে হাইওয়া ইবনে শুরাইহের। তিনি বিচারপতির পদ গ্রহণে সাফ না করে দিলে শাস্তি দেওয়ার জন্য তরবারি ও চাবুক আনতে বলা হয়। পরিস্থিতি দেখে হাইওয়া নিজের সঙ্গে থাকা একটি চাবি বের করে বলেন, এটি আমার বাড়ির চাবি। আপনাদের কাছে রাখুন। কারণ আমি আমার পরকালে গমনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। সভাসদগণ যখন দেখলেন, কোনোভাবেই তাকে রাজি করানো সম্ভব নয়, তখন তাকে ছেড়ে দেন। তখন হাইওয়া বলেন, বাকি দুজনের কাছে আমার এ সিদ্ধান্ত ও অবস্থানের কথা বলবেন না। তাহলে তারাও আমার মতো অস্বীকার করতে পারেন। এরপর হাইওয়া রাজদরবার থেকে মুক্ত হয়ে বাড়ি ফিরে যান। (৪১৩)
অপরদিকে অনেক বিচারক বিচারকার্য পরিচালনার বিনিময়ে বেতন গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতেন। তারা ভাবতেন, এ মহান কাজের বিনিময় গ্রহণ করলে এ পদের অবমূল্যায়ন হবে। তাদের অন্যতম হলেন আন্দালুসের বিখ্যাত বিচারক ইবনে সাম্মাক হামাযানি। তার গুণাগুণ ও কীর্তি বর্ণনা করতে গিয়ে বিশিষ্ট লেখক নাবাহি তারিখু কুযাতিল উন্দুলুস গ্রন্থে লেখেন, কাযি ইয়ায ও অন্যান্য মনীষীর বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, ইবনে সাম্মাক নিজেই ড্রেন বা নালা পরিষ্কার করতেন। ঘরের দরজায় বসে লাকড়ি কাটতেন। আর এই অবস্থায়ই মানুষ তার কাছে মামলার নিষ্পত্তি করার জন্য হাজির হতো। তার কাছে সমাধান জিজ্ঞেস করত। তিনি শক্ত মোটা পশমের কাপড় পরিধান করতেন। যতদিন তিনি বিচারকের দায়িত্বে ছিলেন, ততদিন তিনি শহরে কোনো বাহনে আরোহণ করেননি। তার বসত ছিল দূরের গ্রামে। দিন শেষে যখন গ্রামে অবস্থিত তার বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হতেন তখন ক্ষীণগতির গাধার পিঠে চড়ে রওয়ানা হতেন। সামান্য উপার্জন থেকে যা আসত, তা দিয়েই তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। বিচারকের দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে তিনি কানাকড়িও গ্রহণ করতেন না। (৪১৪)
অনেক সময় বিচারক নিয়োগ হতো নির্বাচনের মাধ্যমে। গুরুত্বপূর্ণ এই পদের জন্য জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের একটি সুন্দর ঐতিহ্য ছিল এই পদ্ধতি। বুওয়াইহি নামক এক ব্যক্তির বরাত দিয়ে বিশিষ্ট দার্শনিক আল-কিন্দি বলেন, গভর্নর ইবনে তাহের একবার মিশরের জনগণকে এক জায়গায় সমবেত হওয়ার নির্দেশ দেন। সবাই এক জায়গায় একত্র হয়। সেদিন আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। আমরা ইবনে তাহেরের কাছে উপস্থিত হলাম। তার পাশেই ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল হাকাম। ইবনে তাহের ঘোষণা করলেন, এখানে আপনাদের জমায়েত করার পেছনে আমার উদ্দেশ্য হলো, আপনারা নিজেরাই পছন্দমতো একজনকে বিচারক হিসেবে নির্বাচন করুন। সেদিন প্রথম নিজের মতামত উপস্থাপন করেন ইয়াহইয়া ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে বুকাইর। তিনি বলেন, হে আমাদের আমির, আপনিই বরং একজনকে কাযি হিসেবে নির্বাচন করে দিন। তবে দু-ধরনের ব্যক্তিকে আমরা বিচারকের আসনে দেখতে চাই না। এক. অপরিচিত। দুই. পরনিন্দাকারী, যে একজনের কথা আরেকজনের কাছে বলে বেড়ায় আর শত্রুতা তৈরি করে। (৪১৫) ঘটনাটি ছিল হিজরি ২১২ সনের। বোঝা যায়, বিচারক নির্বাচনে মিশরের জনগণের মত প্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা ছিল।
বিচারক নিয়োগে খলিফাগণ সবসময় জ্ঞান, যোগ্যতা ও ধার্মিকতাকে প্রাধান্য দিতেন। যোগ্য হলে বয়স সেখানে কোনো বাধা হতো না। খতিবে বাগদাদি বলেন, ইয়াহইয়া ইবনে আকসাম যখন বসরার বিচারক নিযুক্ত হন তখন তার বয়স মাত্র বিশ বছর বা তার কাছাকাছি। তখন হিজরি ২০২ সন। বসরার অধিবাসীগণ তাকে অপরিপক্ব মনে করে জিজ্ঞেস করল, বিচারকের বয়স কত? উত্তর শুনে তারা তাকে অযোগ্য ও ছোট ভাবলে ইয়াহইয়া বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন আততাব ইবনে আসিদ রা.-কে মক্কার বিচারক হিসেবে পাঠান, তখন আততাবের বয়স ছিল আমার চেয়ে কম। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মুআয ইবনে জাবাল রা.-কে ইয়ামেনের বিচারক হিসেবে পাঠান, তখন মুআয রা.-এর বয়স ছিল আমার চেয়েও কম। উমর ইবনুল খাত্তাব রা. যখন কাব ইবনে সুরকে বসরার বিচারক হিসেবে পাঠান, তখন তার বয়সও ছিল আমার চেয়ে কম। ইয়াহইয়া এ উত্তরের মাধ্যমে যুক্তি উপস্থাপন করেন।(৪১৬)
এবার আসি আন্দালুসে। আন্দালুসের বিচারকগণ মালেকি মাযহাব অনুযায়ী রায় দিতেন। কারণ যিয়াদ ইবনে আবদুর রহমান ও ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহইয়ার মতো আন্দালুসের বড় ও বিখ্যাত জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গ ইমাম মালেক ইবনে আনাসের ছাত্র ছিলেন। আর হিশাম ইবনে আবদুর রহমানের মতো বনু উমাইয়ার শাসকগণও ইমাম মালেক রহ.-কে ভালোবাসতেন এবং তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন।(৪১৭)
কিন্তু মামলুক রাজবংশের শাসনামলে ব্যতিক্রমধর্মী একটি উদ্যোগ লক্ষ করা যায়। তখন চার মাযহাবের জন্য ভিন্ন ভিন্ন বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগে বিচারব্যবস্থা পরিচালিত হতো শুধু শাফিয়ি মাযহাব অনুসারে। বিশিষ্ট লেখক কালকাশান্দি সমকালীন বিচারব্যবস্থার স্তর বর্ণনা করতে গিয়ে লেখেন, ওই সময় দামেশকের মতো সর্বত্রই চার মাযহাবের বিচারকগণ ফয়সালা করতেন। তবে দামেশকে এই পদ্ধতির স্বাক্ষরিক সফল প্রচলন শুরু হওয়ার পরই তা সর্বত্র প্রয়োগ করা হয়। তবে মূল শহরের সকল কার্যালয়ে সব ধরনের রাষ্ট্রীয় কাজ সম্পাদন হতো শাফিয়ি মাযহাব অবলম্বনে। আর পুরো নগরজুড়ে অন্যান্য মাযহাব অনুযায়ী বিচারকাজ সম্পাদিত হতো। মিশর ও দামেশকেও একই পদ্ধতির সফল বাস্তবায়ন চলে আসছিল। (৪১৮)
প্রধান বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতো কঠিন পরীক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে। নতুন বিচারকের যোগ্যতা, দক্ষতা, পরিপক্বতা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে যাচাই করা হতো সেই পরীক্ষায়। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, খলিফা নিজেই এ পরীক্ষা গ্রহণ করতেন। সুলাইমান ইবনে সাদ আল-খুশানি কুযাতু কুরতুবা গ্রন্থে প্রধান বিচারপতি হিসেবে আহমাদ ইবনে বাকির নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিবরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমিরুল মুমিনিন তাকে এ পদের জন্য নিযুক্ত করেন। এরপর একে একে তাকে জায়েন, এলভিরা, টলেডো অঞ্চলের বিচারক হিসেবে মনোনীত করেন। সব দিক দিয়ে তাকে পরীক্ষা করেন। সকল পদ্ধতিতে তাকে যাচাই-বাছাই করেন। সব পরীক্ষায় তিনি সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। পরীক্ষায় আমিরুল মুমিনিন তাকে একনিষ্ঠ ও যোগ্য বিচারক হিসেবে বাছাই করেন। এরপর তাকে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব প্রদান করেন। (৪১৯)
টিকাঃ
৪০৯. মাওয়ারদি, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, পৃ. ৫৩-৫৪; ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ২২১।
৪১০. ওয়াকি ইবনে খালাফ, আখবারুল কুযাত, খ. ১, পৃ. ৭০।
৪১১. ইবনে হাজার, রফউল ইসরি আন কুযাতি মিসর, খ. ২, পৃ. ৩০৫।
৪১২. প্রাগুক্ত।
৪১৩. ওয়াকি ইবনে খালাফ, আখবারুল কুযাত, খ.৩, পৃ.২৩২-২৩৩; আবদুর রহমান মিশরি, ফুতুহু মিসর ওয়া আখবারুহা, পৃ. ২৬১।
৪১৪. নাবাহি, তারিখু কুযাতিল উন্দুলুস, পৃ. ৩২।
৪১৫. আল-কিন্দি, আল-উলাত ওয়াল-কুযাত, পৃ. ৪৩৩।
৪১৬. খতিবে বাগদাদি, তারিখে বাগদাদ, খ. ১৪. পৃ. ১৯৮-১৯৯।
৪১৭. খুশানি, কুযাতু কুরতুবা, পৃ. ১৭৩-১৭৪।
৪১৮. কালকাশান্দি, সুবহুল আ'শা, খ. ৪, পৃ. ২২৮।
৪১৯. খুশানি, কুযাতু কুরতুবা, পৃ. ১৭৩-১৭৪।
📄 বিচারকদের দায়িত্ব নির্ধারণ
একজন বিচারকের প্রধান দায়িত্ব ছিল, মামলামোকদ্দমা নিষ্পত্তি করা, বিরোধ নিরসন করা, পাওনা আদায়ে যে লোক টালবাহানা করছে তার কাছ থেকে প্রকৃত মালিকের কাছে সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া। আপন সম্পদের হস্তক্ষেপে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অর্থসম্পদ দেখাশোনা করা, অপরাধীদের ওপর দণ্ড প্রয়োগ করা। তার সাক্ষী ও আমিনদের পর্যবেক্ষণ করা, তার প্রতিনিধিদের নিয়োগ ও বিচারিক কাজে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদান ইত্যাদি। (৪২০)
শুধু তাই নয়, একজন বিচারকের দায়িত্ব এমন আরও অনেক ধর্মীয় বিষয়জুড়ে পরিব্যাপ্ত ছিল, বিচারিক কাজের সাথে যার কোনো সম্পর্ক নেই। শরিয়ত সম্পর্কে অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী হওয়ায় অধিকাংশ সময় বিচারকদেরই জামে মসজিদে নামাযের ইমামতি করা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান দেখাশোনা করা, অনুপস্থিত ও হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের সম্পদ দেখাশোনা করা, হজের বিষয়গুলো তদারকি করা এবং লোকদের থেকে খলিফার আনুগত্যের অঙ্গীকার গ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হতো। (৪২১)
জ্ঞানের গভীরতার কারণে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে অসামান্য মর্যাদার অধিকারী হওয়ায় অনেক প্রধান বিচারপতি উন্নতি করতে করতে উযিরের পদে অধিষ্ঠিত হন। মনসুর ইবনে আবু আমিরের শাসনামলে আন্দালুসের প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালনকারী আহমাদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে যাকওয়ানের জীবনবৃত্তান্তে নাবাহি বলেন, মনসুর ইবনে আবু আমির তাকে প্রধান বিচারপতির পাশাপাশি উযিরের দায়িত্ব প্রদান করেন। বনু আমিরের শাসনামলের শেষ পর্যন্ত তিনি সেই পদে বহাল ছিলেন। (৪২২)
মামলুক রাজবংশের শাসনামলে মিশরে বিচারকের পদটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী। বিচারকাজ সম্পাদনের পাশাপাশি আরও অনেক দায়িত্ব বিচারকদেরকেই সম্পাদন করতে হতো। আল-বিদায়া ওয়ান- নিহায়া গ্রন্থে তাজুদ্দিন ইবনে বিনতুল আআয-এর জীবনবৃত্তান্ত বর্ণনা করতে গিয়ে ইবনে কাসির রহ. লেখেন, তার হাতে একে একে সতেরোটি পদ ছিল। এর মধ্যে ছিল বিচারিক দায়িত্ব, জুমার ইমামতি, ওয়াকফকৃত সম্পত্তি দেখাশোনা, রাষ্ট্রীয় অর্থ তহবিল দেখাশোনা ইত্যাদি। (৪২৩)
ইসলামের স্বর্ণযুগে কাযি বা বিচারকগণ যে অসামান্য সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী ছিলেন এসব দায়িত্ব পালন তাদের মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। তাজুদ্দিন সুবকির বৃত্তান্তে বর্ণিত আছে যে, তিনি প্রথমে প্রধান বিচারপতি নির্বাচিত হন। এ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি শাফিয়ি মাযহারের ওপর ফিকহের দরস দিতেন, তুলুনের জামে মসজিদে জুমা ও ঈদের নামাযের ইমামতি করতেন, মাদরাসায়ে শাইখুনিয়ায় শিক্ষকতা করতেন, বিচারালয়ে ফতোয়া প্রদান করতেন। তা ছাড়া দামেশকের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তিনি শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করতেন। এতসব দায়িত্বের মাঝে সমন্বয় করতে গিয়ে তিনি যা করতেন তা হলো, মিশরে তিনি বিচারকাজ পরিচালনা করতেন এবং সুলতানের অনুমতিক্রমে দামেশকের মাদরাসাগুলোতে প্রতিনিধি হিসেবে কাউকে পাঠাতেন দরস দেওয়ার জন্য। (৪২৪)
টিকাঃ
৪২০. মাওয়ারদি, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, পৃ. ৫৩-৫৪; ইবনে খালদুন, আল-ইবার ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ২২১।
৪২১. আবদুল মুনয়িম মাজেদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ৪৮-৪৯।
৪২২. নাবাহি, তারিখু কুযাতিল উন্দুলুস, পৃ. ৮৬।
৪২৩. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ১৩, পৃ.৩৮০।
৪২৪. শামসুদ্দিন ইবনে তুলুন, কুযাতু দিমাশক, পৃ. ১০৪।