📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 সামরিক বিভাগ

📄 সামরিক বিভাগ


আরবি ভাষায় (الجيش) জাইশ শব্দটি সৈন্যবাহিনী অর্থেও ব্যবহৃত হয়, আবার যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত একদল সশস্ত্র যোদ্ধা অর্থেও ব্যবহৃত হয়। একটি মতে, কোনো যুদ্ধ সংঘটিত করার জন্য অথবা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজে সশস্ত্র অংশগ্রহণের জন্য যে সামরিক বাহিনী তৈরি করা হয় তাকেই বলা হয় জাইশ। ইসলামের সূচনালগ্নে সেনাবাহিনী গঠন ও বিন্যাসের বিষয়টি ছিল একেবারেই প্রাথমিক স্তরের। কিন্তু সময় যতই গড়িয়েছে, ততই তা আরও আধুনিক ও সুসংগঠিত হয়েছে। সেজন্য স্বতন্ত্র সামরিক নীতিমালাও প্রণীত হয়েছে।

বাস্তবতা হলো, ইসলাম আগমনের পূর্বে আরবদের সুসংগঠিত কোনো সামরিক নীতিমালা ছিল না। সবাই অস্ত্র বহন করতে পারত। যখনই যুদ্ধের ডাক আসত, নিজ গোত্রের পক্ষ থেকে প্রতিরোধ করার জন্য সকলেই তির, তলোয়ার, ধনুক নিয়ে শত্রুদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ত। গোত্রের একজন যুদ্ধপ্রিয় দুর্ধর্ষ ও সাহসী যোদ্ধা তাদের নেতৃত্ব দিতেন। বেশিরভাগ সময় তিনি হতেন গোত্রাধিপতি। (৩৪১)

ইসলাম আসার পর মুসলিমদের জন্য আল্লাহর পথে কিতাল ও জিহাদের বিধান অবতীর্ণ হয়। শহরে তা প্রচলন করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। বাইতুল মুকাদ্দাস অধিকার করার পর ক্রুসেডারদের কর্তৃক সেখানকার বিচারিক নীতিমালা সংক্রান্ত গ্রন্থ রচনা করে এর নাম দেওয়া হয় আন-নুযুমুল কাযায়িয়্যা লি-বাইতিল মুকাদ্দাস। এই বিচারিক নীতিমালা গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, মুحتাসিব শপথ করবেন যে, সবসময় তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবেন। বাদশার অধিকার যথাযথভাবে রক্ষা করবেন। মুحتাসিবের পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি প্রতিদিন সকালে বাজারে গিয়ে মাংস বিক্রয়ের দোকান ও নানা খাদ্যসামগ্রী ও পানীয়ের বিপণীগুলোতে গিয়ে অনুসন্ধান করবেন। সাধারণ বিক্রেতা ও ফেরিওয়ালারা তাদের পণ্যে কোনো ধোঁকা বা প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছে কি না তা তদন্ত করবেন। মার্কেটে রুটির দোকানগুলোতে গিয়ে দেখবেন রুটিগুলো পর্যাপ্ত পরিমাপে আছে কি না। এবং সরকার কর্তৃক নির্ধারিত পরিমাপের সঙ্গে রুটির ওজনের মিল আছে কি না। (৩৩৯)

জনগণের সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য, প্রশান্তি, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ও নানা সংকট, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থেকে মুক্ত রাখতে আগ্রহী এবং সমাজকে আধ্যাত্মিক, শিষ্টাচার ও বস্তুগত দিকসীমা ও শর্তের ঊর্ধ্বে (তবে নিরাপত্তাধর্মী ও বৈধ রুচিগত সীমা তো মেনে নিতেই হবে) ব্যাপকভাবে সুরক্ষিত করতে আগ্রহী দূরদর্শী একজন শাসকের চিন্তার চূড়ান্ত ফসল ইসলামের 'হিসবাহ' ব্যবস্থা হতে পারে বলে নির্দ্বিধায় বলা যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক বিশ্বের কোনো রাষ্ট্রের কোনো শাসক এমন নেই যিনি, হিসবাহ ও মুحتাসিবের মতো সুনির্দিষ্ট কোনো পদের আদলে জনগণের সুরক্ষার এমন কোনো কর্মপদ্ধতি বাস্তবায়নের সৎসাহস রাখেন। (৩৪০)

ইসলামি সভ্যতায় এভাবেই বিচারবিভাগ এবং তার অধীনে থাকা সকল পদ ও দায়িত্বের লোকজন ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় অবিরাম কাজ করে গেছেন। জনগণের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর পরিশ্রম করে গেছেন। যার নজির পূর্বের ও সমকালের যেকোনো সভ্যতা ও জনগোষ্ঠীর মাঝে খুব কমই পরিলক্ষিত হয়েছে।

টিকাঃ
৩১১. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ২২৫।
৩১২. সুরা আলে-ইমরান: ১০৪।
৩১৩. মাওয়ারদি, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, পৃ. ২১১ ও এর পরের পৃষ্ঠাগুলো; ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ২২৫; আবদুন মুনয়িম মাজিদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ৫৭।
৩১৪. মুসলিম, হাদিস নং ১০২; আবু দাউদ, হাদিস নং ৩৪৫২; তিরমিযি, হাদিস নং ১৩১৫; ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২২২৪; আহমাদ, হাদিস নং ৭২৯০।
৩১৫. ইবনে আবদুল বার, আল-ইসতিআব, খ. ১, পৃ. ১৮৫।
৩১৬. প্রাগুক্ত, খ. ৪, পৃ. ১৮৬৩।
৩১৭. ইবনুল জাওযি, সিরাতু উমর ইবনুল খাত্তাব, পৃ. ৪১।
৩১৮. যাফের কাসেমি, নিযামুল হুকমি ফিশ-শারিআতি ওয়াত-তারিখিল ইসলামي, খ. ২, পৃ. ৫৯২।
৩১৯. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ২, পৃ. ৫৭৮।
৩২০. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি, আদ-দাওলাতুল উমাবিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৩১৫।
৩২১. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ৪, পৃ. ৪৮০।
৩২২. ইবনে আবি উসাইবিআ, উয়ুনুল আনবায়ি ফি তাবাকাতিল আতিব্বায়ি, খ. ১, পৃ. ১১২।
৩২৩. নিজামুল মুলক, সিয়াসাতনামা, পৃ. ৮০-৮১।
৩২৪. তাহাবি, মুশকিলুল আছার, হাদিস নং ৪২০৯।
৩২৫. ইবনুল ইখওয়া, নিহায়াতুর রুতবাতি ফি তলাবিল হিসবাতি, পৃ. ৭৮।
৩২৬. মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল মালিক আল-হামাযানি, তাকমিলাতু তারিখিত তাবারি, পৃ. ২১।
৩২৭. মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল মালিক আল-হামাযানি, তাকমিলাতু তারিখিত তাবারি, পৃ. ২১।
৩২৮. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ১১, পৃ. ৮৯।
৩২৯. সুরা তহা: ৪৪।
৩৩০. আজলানি, আবকারিয়্যাতুল ইসলাম ফি উসুলিল হুকমি, পৃ. ৩৪৩; তিনি বর্ণনা করেছেন কুসাই আল-হুসাইনের লেখা মিন মাআলিমিল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৯৪।
৩৩১. ইবনুল ইখওয়া, মাআলিমুল কুরবাতি ফি তলাবিল হিসবাতি, পৃ. ১৫০।
৩৩২. মাক্কারি, নাফহুত তিব, খ. ১, পৃ. ২১৯।
৩৩৩. ইবনুল খতিব, আল-ইহাতাতু ফি আখবারি গারনাতাহ, খ. ১, পৃ. ৪১৩।
৩৩৪. ইবনে হাজার আসকালানি, ইনবাউল গুম্ম বি আবনায়িল উম্ম ফিত-তারিখ, খ. ১, পৃ. ৩০৯-৩১০।
৩৩৫. মাকরিযি, আস-সুলুক, খ. ৬, সে হিসেবে প্রতিটি মুসলিমই একেকজন সেনা। ধর্মের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ও অসামান্য ভালোবাসা এবং আল্লাহর পথে শহিদ হওয়ার বাসনাই তাদেরকে জিহাদের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। (৩৪২)

চিত্র নং-২ তরবারি

অপরদিকে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই ছিলেন মুসলিম সেনাপ্রধান। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইনতেকালের পর যখন ইসলাম আরব উপদ্বীপ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সম্প্রসারিত হতে থাকে, যুদ্ধের পটভূমি বাড়তে থাকে, নানা অঞ্চলে যুদ্ধের জন্য একাধিক সেনাদল তৈরি হয়ে যায়, তখন স্বয়ং খলিফার একার পক্ষে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করা কঠিন ও দুষ্কর হয়ে পড়ে। ফলে এই পদের জন্য যোগ্য, সাহসী, দূরদর্শী, যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী ও সুসমন্বয়কারী একজনকে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব দেন। সকল যোদ্ধার ওপর আবশ্যক ছিল সেই সেনানায়কদের দিক-নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন করা। প্রস্তুতি ও যুদ্ধাস্ত্র পরীক্ষার লক্ষ্যে প্রতিটি যুদ্ধের আগে এবং প্রতিবার শত্রুদের মুখোমুখি হওয়ার পূর্বে সেনাপতিগণ সৈনিকদের কুচকাওয়াজ করাতেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তাই করতেন। আর যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সেনাপতির দায়িত্ব ছিল সেনাদের প্রস্তুতি, ট্রেনিং, অস্ত্রশস্ত্র আরও নিখুঁত ও কার্যকর করা এবং আরও বেশি উন্নত করা। (৩৪৩)

খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রা. সৈনিকদের কল্যাণের বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি স্বতন্ত্র সামরিক বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। যার বিবরণ আমরা ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছি। সৈনিকদের নাম, পদবি, দায়িত্ব, ভাতা ইত্যাদি আলাদা করে রেজিস্ট্রেশন করা এবং সেনাদের সকল বিষয় সুবিন্যস্তরূপে সম্পাদন করাই ছিল ওই বিভাগের কাজ। এরপর যখন একের পর এক মুসলিমদের বিজয় অর্জিত হতে থাকে, খিলাফতের রাজধানীতে যুদ্ধলব্ধ অর্থ ও সম্পদের প্রাচুর্য ঘটতে থাকে, পুরো পৃথিবীজুড়ে মুসলিমদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, বিভিন্ন শহরে মুসলিমগণ স্থায়ীভাবে বসবাস করা শুরু করেন, তখন উমর ইবনুল খাত্তাব রা. আশঙ্কা করেন যে, এভাবে চলতে থাকলে একসময় সকল যোদ্ধা জিহাদ থেকে হাত ধুয়ে বসে পড়বে, অবসর গ্রহণ করে অর্থ উপার্জন ও বিলাসিতায় মগ্ন হয়ে যাবে। ফলে তিনি সবাইকে আবারও জিহাদের দিকে ফিরে আসার আহ্বান জানান। সৈনিকদের পরিবারের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভাতার ব্যবস্থা করেন। কোনো যোদ্ধা বিনা অজুহাতে জিহাদ বর্জন করলে তাকে তিরস্কৃত করতেন।

তা ছাড়া শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের উদ্দেশ্যে বের হওয়া মুজাহিদ বাহিনীর বিশ্রামের জন্য উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বিভিন্ন প্রদেশের নির্দিষ্ট পয়েন্টে পয়েন্টে বড় বড় দুর্গ ও সেনানিবাস স্থাপন করেন। বিভিন্ন শহর স্থাপন করেন। যেমন বসরা, কুফা, ফুসতাত। এগুলো সেনাবাহিনীর বিশ্রামের পাশাপাশি শত্রুদের আক্রমণ প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখত।

সৈনিকদের কল্যাণের জন্য উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর যে অবদান ছিল, উমাইয়া শাসনামলে তাতে আরও অনেক বিষয় যুক্ত হয়। সামরিক বিভাগকে তারা আরও বিন্যস্ত ও সুসংগঠিত করেন। দেশ বিজয়ের পর অনেক সেনা অবসর গ্রহণ করলে খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনী গঠন ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করেন। (৩৪৪)

ঠিক তেমনই মুসলিমগণ আবিষ্কার করেন নানা সামরিক কৌশল এবং যুদ্ধবিদ্যার নানা পদ্ধতি। জাহিলিয়া যুগে আরবদের মাঝে যুদ্ধবিদ্যার সুবিন্যস্ত কোনো রূপরেখা ছিল না। অনিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিই ছিল তাদের একমাত্র ভরসা। ইসলামের আগমনের পর যখন এই আয়াত অবতীর্ণ হলো,
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِهِ صَفًّا كَأَنَّهُمْ بُنْيَانٌ مَرْصُوصٌ

আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন, যারা তার পথে সারিবদ্ধভাবে লড়াই করে, যেন তারা সিসাঢালা প্রাচীর। (৩৪৫)

তখন মুসলিমগণ সেনাবাহিনী পুনর্গঠনে মনোনিবেশ করলেন। বিশেষ করে যখন ক্রমান্বয়ে বিজয় অর্জিত হতে থাকে এবং পারসিক ও রোমানদের মতো সুবিশাল বাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার প্রয়োজন হয়, যাদের সেনাবাহিনী ছিল পূর্ব থেকেই সুবিন্যস্ত ও সুসংগঠিত।

চিত্র নং-৩ সামরিক পোশাক (বর্ম)

যুদ্ধের সারি ও কাতার প্রস্তুত করতে মুসলিমগণ পরিচিত হন ইউনিট ব্যবস্থার সঙ্গে। যার ফলে যেকোনো যুদ্ধে সেনাবাহিনীকে প্রধানত পাঁচটি ইউনিটে ভাগ করা হতো। সেগুলো ছিল যথাক্রমে, অগ্রবর্তী সেনাদল, ডানদিকের সেনাদল, বাঁ দিকের সেনাদল, মধ্যবর্তী সেনাদল এবং একেবারে পেছনে পশ্চাৎবর্তী সেনাদল। (৩৪৬)

ইয়ারমুক, কাদেসিয়া, আজনাদিন এই যুদ্ধগুলো ছিল সেনাবাহিনী গঠন ও শ্রেষ্ঠ কমান্ডিং বিবেচনায় মুসলিমদের জন্য সবচেয়ে আদর্শ যুদ্ধ। ইয়ারমুক যুদ্ধে খালেদ ইবনে ওয়ালিদ রা. যে সমরপদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন এবং যুদ্ধের জন্য উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করেছিলেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ঠিক সেই পদ্ধতি অবলম্বন করে ইউরোপীয় মিত্রবাহিনী। (৩৪৭)

মুসলিম যোদ্ধাদের জন্য অস্ত্রশস্ত্রসহ যাবতীয় যুদ্ধসরঞ্জাম সরবরাহ করত ইসলামি রাষ্ট্র। দু-ধরনের সৈনিকদের মাধ্যমে সেনাবাহিনী গঠিত হতো, অশ্বারোহী ও পদাতিক। তাদের অস্ত্র ছিল একাধিক। ব্যক্তিগতভাবে সবার সঙ্গেই থাকত তরবারি, তির, ধনুক ও বর্শ পৃ. ৪৯৫-৪৯৬।
৩৩৬. পুরো নাম উমর ইবনে আহমাদ ইবনে হিবাতুল্লাহ ইবনে আবি জারাদাহ আল-উকাইলি (৫৮৮-৬৬০ হি./১১৯২-১২৬২ খ্রি.)। আলেপ্পোয় তার জন্ম। এরপর তিনি ক্রমান্বয়ে দামেশক, ফিলিস্তিন, হেজায ও ইরাক সফর করেন। শেষ পর্যন্ত তার ইনতেকাল হয় কায়রোয়। তার অন্যতম গ্রন্থ বুগয়াতুত তলাব ফি তারিখি হালাব। তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৫. পৃ. ৪০।
৩৩৭. ইবনুল আদিম, বুগয়াতুত তলাব ফি তারিখি হালাব, খ. ১, পৃ. ৮৪।
৩৩৮. ইবনে হাজার, ইনবাউল গুম্ম বি আবনায়িল উম্ম ফিত-তারিখ, খ. ৭, পৃ. ১১০।
৩৩৯. আল-হিসবা ওয়াল-মুহতাসিব, পৃ. ৩৯-৪১; যাফের কাসেমি, নিযামুল হুকমি ফিশ-শারিআতি ওয়াত-তারিখিল ইসলামي, খ. ২, পৃ. ৬১২-৬১৩।
৩৪০. মুস্তাফা আশ-শাকআ, মাআলিমুল হাযারাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৮৪।

আরবি ভাষায় (الجيش) জাইশ শব্দটি সৈন্যবাহিনী অর্থেও ব্যবহৃত হয়, আবার যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত একদল সশস্ত্র যোদ্ধা অর্থেও ব্যবহৃত হয়। একটি মতে, কোনো যুদ্ধ সংঘটিত করার জন্য অথবা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজে সশস্ত্র অংশগ্রহণের জন্য যে সামরিক বাহিনী তৈরি করা হয় তাকেই বলা হয় জাইশ। ইসলামের সূচনালগ্নে সেনাবাহিনী গঠন ও বিন্যাসের বিষয়টি ছিল একেবারেই প্রাথমিক স্তরের। কিন্তু সময় যতই গড়িয়েছে, ততই তা আরও আধুনিক ও সুসংগঠিত হয়েছে। সেজন্য স্বতন্ত্র সামরিক নীতিমালাও প্রণীত হয়েছে।

বাস্তবতা হলো, ইসলাম আগমনের পূর্বে আরবদের সুসংগঠিত কোনো সামরিক নীতিমালা ছিল না। সবাই অস্ত্র বহন করতে পারত। যখনই যুদ্ধের ডাক আসত, নিজ গোত্রের পক্ষ থেকে প্রতিরোধ করার জন্য সকলেই তির, তলোয়ার, ধনুক নিয়ে শত্রুদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ত। গোত্রের একজন যুদ্ধপ্রিয় দুর্ধর্ষ ও সাহসী যোদ্ধা তাদের নেতৃত্ব দিতেন। বেশিরভাগ সময় তিনি হতেন গোত্রাধিপতি। (৩৪১)

ইসলাম আসার পর মুসলিমদের জন্য আল্লাহর পথে কিতাল ও জিহাদের বিধান অবতীর্ণ হয়। সে হিসেবে প্রতিটি মুসলিমই একেকজন সেনা। ধর্মের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ও অসামান্য ভালোবাসা এবং আল্লাহর পথে শহিদ হওয়ার বাসনাই তাদেরকে জিহাদের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। (৩৪২)

চিত্র নং-২ তরবারি

অপরদিকে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই ছিলেন মুসলিম সেনাপ্রধান। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইনতেকালের পর যখন ইসলাম আরব উপদ্বীপ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সম্প্রসারিত হতে থাকে, যুদ্ধের পটভূমি বাড়তে থাকে, নানা অঞ্চলে যুদ্ধের জন্য একাধিক সেনাদল তৈরি হয়ে যায়, তখন স্বয়ং খলিফার একার পক্ষে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করা কঠিন ও দুষ্কর হয়ে পড়ে। ফলে এই পদের জন্য যোগ্য, সাহসী, দূরদর্শী, যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী ও সুসমন্বয়কারী একজনকে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব দেন। সকল যোদ্ধার ওপর আবশ্যক ছিল সেই সেনানায়কদের দিক-নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন করা। প্রস্তুতি ও যুদ্ধাস্ত্র পরীক্ষার লক্ষ্যে প্রতিটি যুদ্ধের আগে এবং প্রতিবার শত্রুদের মুখোমুখি হওয়ার পূর্বে সেনাপতিগণ সৈনিকদের কুচকাওয়াজ করাতেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তাই করতেন। আর যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সেনাপতির দায়িত্ব ছিল সেনাদের প্রস্তুতি, ট্রেনিং, অস্ত্রশস্ত্র আরও নিখুঁত ও কার্যকর করা এবং আরও বেশি উন্নত করা। (৩া। পাশাপাশি সম্মিলিত ব্যবহারের জন্য ছিল ভারী অস্ত্র ও গোলাবারুদ। যেমন মানজানিক (ক্ষেপণাস্ত্র) ও ট্যাংক। ট্যাংকের ভেতরে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত হয়ে সৈনিকগণ যুদ্ধ পরিচালনা করত। তা ছাড়া শত্রুদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে তাদের ছিল নানা অস্ত্র। যেমন শিরস্ত্রাণ, বর্ম, ঢাল ইত্যাদি। রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহারও প্রচলিত ছিল মুসলিমদের মাঝে। গ্রিক পদ্ধতিতে গোলা ব্যবহারেও মুসলিমগণ দক্ষতার পরিচয় দেন এবং আরও আধুনিকায়ন করে এই পদ্ধতিকে অধিকতর কার্যকর করে তোলেন। সেজন্য তারা আবিষ্কার করেন বিস্ফোরকদ্রব্য। সে সময় ইসলামি সেনাবাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ছিল ঘোড়া, সেজন্য ঘোড়া প্রতিপালন ও যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষিত করার বিষয়টি তারা গুরুত্বের সঙ্গে নেন। যুদ্ধের সময় ঘোড়াগুলোর সুরক্ষার প্রতিও তারা মনোযোগী থাকতেন। শত্রুদের আক্রমণ ও আঘাত থেকে রক্ষা করতে অশ্বগুলোকে তাজফিক নামক বিশেষ এক ধরনের পোশাক পরিয়ে নিতেন। (৩৪৮)

চিত্র নং-৪ শিরস্ত্রাণ

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগ থেকেই মুসলিমগণ বিশেষ এক ধরনের ট্যাংক ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিলেন। এই যুদ্ধযানটি সাধারণত দুর্গের প্রাচীর বিধ্বস্ত ও ছিদ্র করার জন্য ব্যবহৃত হতো। আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া গ্রন্থে ইবনে কাসির রহ. বলেন, একদল সাহাবি ট্যাংকের ভেতরে প্রবেশ করে তায়েফবাসীর প্রাচীর জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য দুর্গে আক্রমণ করেন। (৩৪৯)

বনু উমাইয়ার শাসকগণ মানজানিক (ক্ষেপণাস্ত্রবিশেষ) আবিষ্কার ও আধুনিকায়নকে গুরুত্বের সঙ্গে নেন। হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ 'আরুস' নামক বিশেষ এক ধরনের মানজানিক আবিষ্কার করেন, যা তত্ত্বাবধান ও পরিচালনা করতে পাঁচশ যোদ্ধার প্রয়োজন হতো। ভ্রাতুষ্পুত্র মুহাম্মাদ ইবনে কাসিমকে (৩৫০) এ ধরনের কয়েকটি মানজানিক দিয়ে এশিয়া অভিযানে পাঠান। ৮৯ হিজরি সনে সেই অভিযানে তিনি দেবল (করাচি)-সহ সিন্ধু উপত্যকার বেশ কয়েকটি শহর জয় করেন। (৩৫১)

চিত্র নং-৫ ক্ষেপণাস্ত্রের নমুনা

মুসলিম সামরিক শক্তি 'নাফফাতা' নামক বিশেষ এক বাহিনী গঠন করে, যারা রণাঙ্গনে ঘোড়ার ওপর থেকে জ্বালানি বিস্ফোরক ব্যবহার করতেন। অথবা বিশেষ এক পাত্রে জ্বালানি ভরতি করে তা শত্রুদের উদ্দেশে ছুড়ে মারতেন। আব্বাসীয় শাসনামলে এই নাফফাতা বাহিনী বিরাট কদর পায়। ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এই বাহিনীর ওপর নির্ভরতা এবং তাদের কার্যকারিতা বহুগুণ বেড়ে যায়। ৫৮৬ হিজরির ঘটনাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে ইবনে কাসির রহ. বলেন, বিশিষ্ট আব্বাসি খলিফা আন-নাসির লি-দ্বীনিল্লাহ (মৃ. ৬২২ হি.) সালাহুদ্দিন আইয়ুবির সাহায্যার্থে বেশ কিছু জ্বালানি ও বর্শা বোঝাই করা যুদ্ধযান প্রেরণ করেন। সাথে জ্বালানি ব্যবহারে অভ্যস্ত এবং সুড়ঙ্গ তৈরিতে দক্ষ একদল দুর্ধর্ষ যোদ্ধা পাঠান। (৩৫২)

এর চেয়েও বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, মুসলিম বাহিনীই প্রথম বারুদের ব্যবহার নিশ্চিত করেন। পশ্চিমাদের আবির্ভাবের বহু আগে থেকেই মুসলিমগণ বারুদ ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিলেন। অনেক প্রাচ্যবিদের ধারণা ছিল, ইউরোপ মুসলিমদের আগে বিভিন্ন যুদ্ধে বারুদের ব্যবহার আবিষ্কার করেছে। কিন্তু এ ধারণাটি ছিল সম্পূর্ণ ভুল। প্রথম বারুদের ব্যবহার ঘটে মিশরে। কারণ প্রাকৃতিকভাবেই মিশরে বিপুল পরিমাণ ন্যাট্রনের অস্তিত্ব ছিল। ৭২৭ হিজরি সনের ঘটনাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ মাকরিযি বলেন, মিশরের বিখ্যাত সুলতান আন-নাসির মুহাম্মাদ ইবনে কা৪৩)

খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রা. সৈনিকদের কল্যাণের বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি স্বতন্ত্র সামরিক বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। যার বিবরণ আমরা ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছি। সৈনিকদের নাম, পদবি, দায়িত্ব, ভাতা ইত্যাদি আলাদা করে রেজিস্ট্রেশন করা এবং সেনাদের সকল বিষয় সুবিন্যস্তরূপে সম্পাদন করাই ছিল ওই বিভাগের কাজ। এরপর যখন একের পর এক মুসলিমদের বিজয় অর্জিত হতে থাকে, খিলাফতের রাজধানীতে যুদ্ধলব্ধ অর্থ ও সম্পদের প্রাচুর্য ঘটতে থাকে, পুরো পৃথিবীজুড়ে মুসলিমদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, বিভিন্ন শহরে মুসলিমগণ স্থায়ীভাবে বসবাস করা শুরু করেন, তখন উমর ইবনুল খাত্তাব রা. আশঙ্কা করেন যে, এভাবে চলতে থাকলে একসময় সকল যোদ্ধা জিহাদ থেকে হাত ধুয়ে বসে পড়বে, অবসর গ্রহণ করে অর্থ উপার্জন ও বিলাসিতায় মগ্ন হয়ে যাবে। ফলে তিনি সবাইকে আবারও জিহাদের দিকে ফিরে আসার আহ্বান জানান। সৈনিকদের পরিবারের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভাতার ব্যবস্থা করেন। কোনো যোদ্ধা বিনা অজুহাতে জিহাদ বর্জন করলে তাকে তিরস্কৃত করতেন।

তা ছাড়া শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের উদ্দেশ্যে বের হওয়া মুজাহিদ বাহিনীর বিশ্রামের জন্য উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বিভিন্ন প্রদেশের নির্দিষ্ট পয়েন্টে পয়েন্টে বড় বড় দুর্গ ও সেনানিবাস স্থাপন করেন। বিভিন্ন শহর স্থাপন করেন। যেমন বসরা, কুফা, ফুসতাত। এগুলো সেনাবাহিনীর বিশ্রামের পাশাপাশি শত্রুদের আক্রমণ প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখত।

সৈনিকদের কল্যাণের জন্য উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর যে অবদান ছিল, উমাইয়া শাসনামলে তাতে আরও অনেক বিষয় যুক্ত হয়। সামরিক বিভাগকে তারা আরও বিন্যস্ত ও সুসংগঠিত করেন। দেশ বিজয়ের পর অনেক সেনা অবসর গ্রহণ করলে খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনী গঠন ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করেন। (৩৪৪)

ঠিক তেমনই মুসলিমগণ আবিষ্কার করেন নানা সামরিক কৌশল এবং যুদ্ধবিদ্যার নানা পদ্ধতি। জাহিলিয়া যুগে আরবদের মাঝে যুদ্ধবিদ্যার সুবিন্যস্ত কোনো রূপরেখা ছিল না। অনিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিই ছিল তাদের একমাত্র ভরসা। ইসলামের আগমনের পর যখন এই আয়াত অবতীর্ণ হলো,

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِهِ صَفًّا كَأَنَّهُمْ بُنْيَانٌ مَرْصُوصٌ

আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন, যারা তার পথে সারিবদ্ধভাবে লড়াই করে, যেন তারা সিসাঢালা প্রাচীর। (৩৪লাউনের কন্যার বিয়ের অনুষ্ঠানে জ্বালানি দ্রব্যের পাশাপাশি বারুদের ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়। তিনি বলেন, আমির কাজলিস দুর্গে বারুদ ও জ্বালানি দ্রব্যের একটি টাওয়ার নির্মাণ করেন। (৩৫৩)

মোটকথা, ওই সময়ের আরও বহু আগে থেকেই মুসলিমগণ বারুদের সঙ্গে পরিচিত। ইবনে খালদুন বর্ণনা করেন, মরক্কোয় মারিনি সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনী বিভিন্ন যুদ্ধে বারুদ ব্যবহার করেছিলেন। বিশেষ করে সিজিলমাসা নগর বিজয়ের সময়। তিনি লেখেন, মারিনি সুলতান ইয়াকুব ইবনে আবদুল হক নগরের প্রাচীর ধ্বংস করতে খাঁটি জ্বালানি দ্রব্যভরতি কামান স্থাপন করেন, যার ভেতর থেকে গোলা ছোড়া হতো। বারুদের সাহায্যে প্রজ্বলিত আগুন থেকে উৎপাত হতো গোলা। যা লক্ষ্যভেদ করতে এবং শত্রুদের কোণঠাসা করতে দারুণ কার্যকর ছিল। (৩৫৪)

এটি ছিল ৬৭২ হিজরি সনের ঘটনা। এ থেকে বোঝা যায়, যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলিমগণ সপ্তম শতাব্দী থেকেই কামানের সঙ্গে পরিচিত। তখন থেকেই রণক্ষেত্রে বারুদ থেকে উৎসারিত বোমার ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিল মুসলিম বাহিনী। এ কারণেই ইবনে খালদুন তা বর্ণনা করতে গিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

মামলুক রাজবংশের শাসনামলেও প্রচুর পরিমাণে কামানের ব্যবহারের কথা পাওয়া যায়। তারা নানা শক্তির, নানা বৈশিষ্ট্যের কামান আবিষ্কার করতে সক্ষম হন। এর মধ্যে কিছু ছিল ছোট প্রকৃতির, আর কিছু বড় প্রকৃতির কামান। সুবহুল আ'শা গ্রন্থে কালকাশান্দি রহ. সেই কামান ও বারুদের ব্যবহার সম্পর্কে লেখেন, জ্বালানি দ্রব্য পরিচালিত কামান ছিল নানা প্রকৃতির। কিছু কামান থেকে বড় আকারের তির বা গোলা ছোড়া হতো। যা পাথরকে পর্যন্ত ভেদ করে ছাড়ত। আর কিছু কামান থেকে মিশরে প্রচলিত রিতিল মতে দশ রিতিল থেকে শুরু করে একশ রিতিল পরিমাণ ওজনের লৌহধাতু নিক্ষেপ করা হতো। আশরাফি সাম্রাজ্যের বিখ্যাত আমির সালাহুদ্দিন ইবনে আরামের সহযোগী শাবান ইবনে হুসাইনের শাসনামলে আলেকজান্দ্রিয়ায় তামা ও সিসা দিয়ে বিশেষ এক ধরনের কামান তৈরি করা হয়, যা লোহার শিকল দিয়ে বেষ্টিত ছিল। একটি উন্মুক্ত প্রান্তরে তা থেকে বিশাল আকারের ভারী গোলা ছোড়া হতো যা আলেকজান্দ্রিয়ায় অবস্থিত বাবুল বাহার নামক কবরস্থানের বাহিরে অবস্থিত বাহরুস সিলাসিলা নামক সাগরের একেবারে গভীরে গিয়ে পড়ত। যার দূরত্ব নেহাত কম ছিল না। (৩৫৫)

কালকাশান্দির উক্ত বিবৃতি থেকে আমরা বুঝতে পারি, সে সময় দু-ধরনের কামানের প্রচলন ছিল। একপ্রকার কামান থেকে বিশাল৫)

তখন মুসলিমগণ সেনাবাহিনী পুনর্গঠনে মনোনিবেশ করলেন। বিশেষ করে যখন ক্রমান্বয়ে বিজয় অর্জিত হতে থাকে এবং পারসিক ও রোমানদের মতো সুবিশাল বাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার প্রয়োজন হয়, যাদের সেনাবাহিনী ছিল পূর্ব থেকেই সুবিন্যস্ত ও সুসংগঠিত।

চিত্র নং-৩ সামরিক পোশাক (বর্ম)

যুদ্ধের সারি ও কাতার প্রস্তুত করতে মুসলিমগণ পরিচিত হন ইউনিট ব্যবস্থার সঙ্গে। যার ফলে যেকোনো যুদ্ধে সেনাবাহিনীকে প্রধানত পাঁচটি ইউনিটে ভাগ করা হতো। সেগুলো ছিল যথাক্রমে, অগ্রবর্তী সেনাদল, ডানদিকের সেনাদল, বাঁ দিকের সেনাদল, মধ্যবর্তী সেনাদল এবং একেবারে পেছনে পশ্চাৎবর্তী সেনাদল। (৩৪৬)

ইয়ারমুক, কাদেসিয়া, আজনাদিন এই যুদ্ধগুলো ছিল সেনাবাহিনী গঠন ও শ্রেষ্ঠ কমান্ডিং বিবেচনায় মুসলিমদের জন্য সবচেয়ে আদর্শ যুদ্ধ। ইয়ারমুক যুদ্ধে খালেদ ইবনে ওয়ালিদ রা. যে সমরপদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন এবং যুদ্ধের জন্য উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করেছিলেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ঠিক সেই পদ্ধতি অবলম্বন করে ইউরোপীয় মিত্রবাহিনী। (৩৪৭)

মুসলিম যোদ্ধাদের জন্য অস্ত্রশস্ত্রসহ যাবতীয় যুদ্ধসরঞ্জাম সরবরাহ করত ইসলামি রাষ্ট্র। দু-ধরনের সৈনিকদের মাধ্যমে সেনাবাহিনী গঠিত হতো, অশ্বারোহী ও পদাতিক। তাদের অস্ত্র ছিল একাধিক। ব্যক্তিগতভাবে সবার সঙ্গেই থাকত তরবারি, তির, ধনুক ও বর্শা। পাশাপাশি সম্মিলিত ব্যবহারের জন্য ছিল ভারী অস্ত্র ও গোলাবারুদ। যেমন মানজানিক (ক্ষেপণাস্ত্র) ও ট্যাংক। ট্যাংকের ভেতরে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত হয়ে সৈনিকগণ যুদ্ধ পরিচালনা করত। তা ছাড়া শত্রুদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে তাদের ছিল নানা অস্ত্র। যেমন শিরস্ত্রাণ, বর্ম, ঢাল ইত্যাদি। রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহারও প্রচলিত ছিল মুসলিমদের মাঝে। গ্রিক পদ্ধতিতে গোলা ব্যবহারেও মুসলিমগণ দক্ষতার পরিচয় দেন এবং আরও আধুনিকায়ন করে এই পদ্ধতিকে অধিকতর কার্যকর করে তোলেন। সেজন্য তারা আবিষ্কার করেন বিস্ফোরকদ্রব্য। সে সময় ইসলামি সেনাবাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ছিল ঘোড়া, সেজন্য ঘোড়া প্রতিপালন ও যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষিত করার বিষয়টি তারা গুরুত্বের সঙ্গে নেন। যুদ্ধের সময় ঘোড়াগুলোর সুরক্ষার প্রতিও তারা মনোযোগী থাকতেন। শত্রুদের আক্রমণ ও আঘাত থেকে রক্ষা করতে অশ্বগুলোকে তাজফিক নামক বিশেষ এক ধরনের পোশাক পরিয়ে নিতেন। (৩৪৮)

চিত্র নং-৪ শিরস্ত্রাণ

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগ থেকেই মুসলিমগণ বিশেষ এক ধরনের ট্যাংক ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিলেন। এই যুদ্ধযানটি সাধারণত দুর্গের প্রাচীর বিধ্বস্ত ও ছিদ্র করার জন্য ব্যবহৃত হতো। আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া গ্রন্থে ইবনে কাসির রহ. বলেন, একদল সাহাবি ট্যাংকের ভেতরে প্রবেশ করে তায়েফবাসীর প্রাচীর জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য দুর্গে আক্রমণ করেন। (৩৪৯)

বনু উমাইয়ার শাসকগণ মানজানিক (ক্ষেপণাস্ত্রবিশেষ) আবিষ্কার ও আধুনিকায়নকে গুরুত্বের সঙ্গে নেন। হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ 'আরুস' নামক বিশেষ এক ধরনের মানজানিক আবিষ্কার করেন, যা তত্ত্বাবধান ও পরিচালনা করতে পাঁচশ যোদ্ধার প্রয়োজন হতো। ভ্রাতুষ্পুত্র মুহাম্মাদ ইবনে কাসিমকে (৩৫০) এ ধরনের কয়েকটি মানজানিক দিয়ে এশিয়া অভিযানে পাঠান। ৮৯ হিজরি সনে সেই অভিযানে তিনি দেবল (করাচি)-সহ সিন্ধু উপত্যকার বেশ কয়েকটি শহর জয় করেন। (৩৫১)

চিত্র নং-৫ ক্ষেপণাস্ত্রের নমুনা

মুসলিম সামরিক শক্তি 'নাফফাতা' নামক বিশেষ এক বাহিনী গঠন করে, যারা রণাঙ্গনে ঘোড়ার ওপর থেকে জ্বালানি বিস্ফোরক ব্যবহার করতেন। অথবা বিশেষ এক পাত্রে জ্বালানি ভরতি করে তা শত্রুদের উদ্দেশে ছুড়ে মারতেন। আব্বাসীয় শাসনামলে এই নাফফাতা বাহিনী বিরাট কদর পায়। ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এই বাহিনীর ওপর নির্ভরতা এবং তাদের কার্যকারিতা বহুগুণ বেড়ে যায়। ৫৮৬ হিজরির ঘটনাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে ইবনে কাসির রহ. বলেন, বিশিষ্ট আব্বাসি খলিফা আন-নাসির লি-দ্বীনিল্লাহ (মৃ. ৬২২ হি.) সালাহুদ্দিন আইয়ুবির সাহায্যার্থে বেশ কিছু জ্বালানি ও বর্শা বোঝাই করা যুদ্ধযান প্রেরণ করেন। সাথে জ্বালানি ব্যবহারে অভ্যস্ত এবং সুড়ঙ্গ তৈরিতে দক্ষ একদল দুর্ধর্ষ যোদ্ধা পাঠান। (৩৫২)

এর চেয়েও বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, মুসলিম বাহিনীই প্রথম বারুদের ব্যবহার নিশ্চিত করেন। পশ্চিমাদের আবির্ভাবের বহু আগে থেকেই মুসলিমগণ বারুদ ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিলেন। অনেক প্রাচ্যবিদের ধারণা ছিল, ইউরোপ মুসলিমদের আগে বিভিন্ন যুদ্ধে বারুদের ব্যবহার আবিষ্কার করেছে। কিন্তু এ ধারণাটি ছিল সম্পূর্ণ ভুল। প্রথম বারুদের ব্যবহার ঘটে মিশরে। কারণ প্রাকৃতিকভাবেই মিশরে বিপুল পরিমাণ ন্যাট্রনের অস্তিত্ব ছিল। ৭২৭ হিজরি সনের ঘটনাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ মাকরিযি বলেন, মিশরের বিখ্যাত সুলতান আন-নাসির মুহাম্মাদ ইবনে কালাউনের কন্যার বিয়ের অনুষ্ঠানে জ্বালানি দ্রব্যের পাশাপাশি বারুদের ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়। তিনি বলেন, আমির কাজলিস দুর্গে বারুদ ও জ্বালানি দ্রব্যের একটি টাওয়ার নির্মাণ আকারের তির ছোড়া হতো যা ক্ষিপ্র গতিতে লক্ষ্যভেদ করত। আরেক প্রকার কামান থেকে জ্বলন্ত লৌহ ধাতুর গোলা নিক্ষেপ করা হতো। উভয় প্রকার কামানই তীব্র গতিতে দূরবর্তী গন্তব্যে আঘাত হানত। কালকাশান্দি নিজে ওই ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন সেই ৭৭৫ হিজরি সনে। এ থেকেই বোঝা যায়, মুসলিমগণ নানা যুদ্ধ সরঞ্জাম ও ক্ষেপণাস্ত্র আবিষ্কার করে সেগুলো প্রয়োগ করে আসছেন বহু আগে থেকেই।

মুসলিমগণ শক্তি-সামর্থ্য ও সেনাবাহিনীর সংখ্যার বিচারে এগিয়ে থাকা অনেক সামরিক শক্তিকে আকাশ থেকে মাটিতে নামিয়ে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে তাদের নামনিশানা মুছে দিয়েছে। মুসলিমজাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, বিজয়ের উপাখ্যান সম্পর্কে যারা অবগত আছেন এ বিষয়টি তারা ভালোভাবেই জানেন। এখান থেকেই অনুমান করা যায়, বুদ্ধিবৃত্তিক সমন্বয় রক্ষা, দূরদর্শী পরিকল্পনা প্রণয়ন, সামরিক প্রস্তুতি ও অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র উদ্ভাবনের বিচারে ইসলামি সভ্যতায় মুসলিম সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি কতটা উজ্জ্বল ছিল।

যুদ্ধবিষয়ক নতুন তত্ত্ব
অন্য সব সামরিক শক্তি থেকে মুসলিম সেনাবাহিনী ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তাদের প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নরকম। ইসলামপূর্ব পৃথিবীর ইতিহাসে অন্য কোনো সভ্যতার সমরকৌশলেও নব্যসভ্যতার সামরিক শক্তিতে সেই বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি পাওয়া যায় না। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যোদ্ধাদের ঈমানি শক্তি। আল্লাহর পথে জিহাদ ও সংগ্রামের জন্য তাদের প্রাণপণ চেষ্টা। এ বিষয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। যত দামি ও মূল্যবান বস্তুই হোক, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তা প্রদান করতে কুরাইশ গোত্রের প্রায় সকল নেতা একমত হয়ে তাকে ইসলামের মর্মবাণী প্রচার থেকে বিরত হওয়ার প্রস্তাব করেন। তাদের এই প্রস্তাব শুনে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাচা আবু তালিবকে বলেন, চাচাজান, আল্লাহর শপথ করে বলছি, যদি তারা সূর্যকে আমার ডান হাতে আর চাঁদকে আমার বাঁ হাতে এনে দিয়ে বলে, এই নাও, এখন থেকে এ দুটোই তোমার। তুমি যেভাবে ইচ্ছা তা পরিচালনা করবে। কিন্তু এর বিনিময়ে তুমি তোমার এ বাণী প্রচার থেকে বিরত থাকো, তারপরও কিছুতেই আমি এ বাণী প্রচার থেকে বিরত হব না। (৩৫৬)

তেমনই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইনতেকালের পর কিছু মুসলিম যাকাত প্রদানে অস্বীকার করলে তৎকালীন খলিফা আবু বকর রা. ঠিক একই ভূমিকা পালন করেন। তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ! এখন যদি কেউ আল্লাহর রাসুলের কাছে আদায় করা একটি রশিও যাকাত প্রদান করতে অস্বীকার করে, তাহলে আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব। যাকাত অবশ্যই সম্পদের অধিকার। নামায ও যাকাত এ দুটোকে যে আলাদা করে দেখবে আমি তারও বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামব। (৩৫৭)

এরকম ইস্পাতকঠিন মনোবল এবং বলিষ্ঠ প্রাণশক্তি নিয়েই মুসলিম সেনানীরা ইসলামের বিজয়ইতিহাস রচনা করেছেন। আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য জীবন উৎসর্গ করা ছিল তাদের জীবনের সর্বোচ্চ বাসনা। প্রায় সকল সামরিক অভিযানে বিজয় অর্জনের পেছনে এটিই ছিল তাদের মূল চালিকাশক্তি। তাদের মনে এই বিশ্বাস জাগ্রত ছিল যে, বিজয় একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। মহান আল্লাহই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন,

وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ

আর বিজয় একমাত্র পরাক্রান্ত, মহাজ্ঞানী আল্লাহর পক্ষ থেকেই। (৩৫৮)

ইসলামি সভ্যতায় যুদ্ধ কখনো শত্রুতা ও বিদ্বেষবশত ছিল না। হত্যা, লুণ্ঠন, অপহরণের উদ্দেশ্যে ছিল না। ছিল না তাতে জাগতিক কোনো অভিসন্ধিও। বরং জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়ার পেছনে তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল মহান আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করা। এ কারণেই পর্বতসম সকল দুঃসাধ্য কাজও মুজাহিদদের জন্য সহজ হয়ে যেত। তাদের সুউচ্চ মনোবলের সামনে কঠিন ও শক্ত পাথরও চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যেত। মহান আল্লাহ বলেন,

وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ

আর লড়াই করো আল্লাহর জন্য তাদের বিরুদ্ধে, যারা লড়াই করে তোমাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু কারও প্রতি বাড়াবাড়ি করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না। (৩৫৯)

এই উন্নত অভিলাষ এবং অসীম মনোবলই বিজয়ের সবচেয়ে বড় নিয়ামকের কাজ করেছে মুসলিম সেনাবাহিনীর মধ্যে। এ কারণেই কিবতি সাম্রাজ্যের প্রবল প্রতাপী সম্রাট মুকাওকিসের সামনে বিশিষ্ট সাহাবি ও মুসলিম সেনাপতি উবাদা ইবনে সামিত রা. উচ্চারণ করেছিলেন,

আমাদের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর জন্য জিহাদ করা। আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে এগিয়ে যাওয়া। আল্লাহর বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ শত্রুর বিরুদ্ধে আমরা জাগতিক কোনো স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যে লড়াই করি না। এ পৃথিবীতে শুধু অর্থের প্রাচুর্য ঘটানো আমাদের উদ্দেশ্য নয়। তবে হ্যাঁ, মহান আল্লাহ সেই অর্থ আমাদের অধিকারে এনেছেন। সুতরাং যুদ্ধে আমরা যে সম্পদ লাভ করি তা আমাদের জন্য হালাল। করেন। (৩৫৩)

মোটকথা, ওই সময়ের আরও বহু আগে থেকেই মুসলিমগণ বারুদের সঙ্গে পরিচিত। ইবনে খালদুন বর্ণনা করেন, মরক্কোয় মারিনি সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনী বিভিন্ন যুদ্ধে বারুদ ব্যবহার করেছিলেন। বিশেষ করে সিজিলমাসা নগর বিজয়ের সময়। তিনি লেখেন, মারিনি সুলতান ইয়াকুব ইবনে আবদুল হক নগরের প্রাচীর ধ্বংস করতে খাঁটি জ্বালানি দ্রব্যভরতি কামান স্থাপন করেন, যার ভেতর থেকে গোলা ছোড়া হতো। বারুদের সাহায্যে প্রজ্বলিত আগুন থেকে উৎপাত হতো গোলা। যা লক্ষ্যভেদ করতে এবং শত্রুদের কোণঠাসা করতে দারুণ কার্যকর ছিল। (৩৫৪)

এটি ছিল ৬৭২ হিজরি সনের ঘটনা। এ থেকে বোঝা যায়, যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলিমগণ সপ্তম শতাব্দী থেকেই কামানের সঙ্গে পরিচিত। তখন থেকেই রণক্ষেত্রে বারুদ থেকে উৎসারিত বোমার ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিল মুসলিম বাহিনী। এ কারণেই ইবনে খালদুন তা বর্ণনা করতে গিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

মামলুক রাজবংশের শাসনামলেও প্রচুর পরিমাণে কামানের ব্যবহারের কথা পাওয়া যায়। তারা নানা শক্তির, নানা বৈশিষ্ট্যের কামান আবিষ্কার করতে সক্ষম হন। এর মধ্যে কিছু ছিল ছোট প্রকৃতির, আর কিছু বড় প্রকৃতির কামান। সুবহুল আ'শা গ্রন্থে কালকাশান্দি রহ. সেই কামান ও বারুদের ব্যবহার সম্পর্কে লেখেন, জ্বালানি দ্রব্য পরিচালিত কামান ছিল নানা প্রকৃতির। কিছু কামান থেকে বড় আকারের তির বা গোলা ছোড়া হতো। যা পাথরকে পর্যন্ত ভেদ করে ছাড়ত। আর কিছু কামান থেকে মিশরে প্রচলিত রিতিল মতে দশ রিতিল থেকে শুরু করে একশ রিতিল পরিমাণ ওজনের লৌহধাতু নিক্ষেপ করা হতো। আশরাফি সাম্রাজ্যের বিখ্যাত আমির সালাহুদ্দিন ইবনে আরামের সহযোগী শাবান ইবনে হুসাইনের শাসনামলে আলেকজান্দ্রিয়ায় তামা ও সিসা দিয়ে বিশেষ এক ধরনের কামান তৈরি করা হয়, যা লোহার শিকল দিয়ে বেষ্টিত ছিল। একটি উন্মুক্ত প্রান্তরে তা থেকে বিশাল আকারের ভারী গোলা ছোড়া হতো যা আলেকজান্দ্রিয়ায় অবস্থিত বাবুল বাহার নামক কবরস্থানের বাহিরে অবস্থিত বাহরুস সিলাসিলা নামক সাগরের একেবারে গভীরে গিয়ে পড়ত। যার দূরত্ব নেহাত কম ছিল না। (৩৫৫)

কালকাশান্দির উক্ত বিবৃতি থেকে আমরা বুঝতে পারি, সে সময় দু-ধরনের কামানের প্রচলন ছিল। একপ্রকার কামান থেকে বিশাল আকারের তির ছোড়া হতো যা ক্ষিপ্র গতিতে লক্ষ্যভেদ করত। আরেক প্রকার কামান থেকে জ্বলন্ত লৌহ ধাতুর গোলা নিক্ষেপ করা হতো। উভয় প্রকার কামানই তীব্র গতিতে দূরবর্তী গন্তব্যে আঘাত হানত। কালকাশান্দি নিজে ওই ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন সেই ৭৭৫ হিজরি সনে। এ থেকেই বোঝা যায়, মুসলিমগণ নানা যুদ্ধ সরঞ্জাম ও ক্ষেপণাস্ত্র আবিষ্কার করে সেগুলো প্রয়োগ করে আসছেন বহু আগে থেকেই।

মুসলিমগণ শক্তি-সামর্থ্য ও সেনাবাহিনীর সংখ্যার বিচারে এগিয়ে থাকা অনেক সামরিক শক্তিকে আকাশ থেকে মাটিতে নামিয়ে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে তাদের নামনিশানা মুছে দিয়েছে। মুসলিমজাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, বিজয়ের উপাখ্যান সম্পর্কে যারা অবগত আছেন এ বিষয়টি তারা ভালোভাবেই জানেন। এখান থেকেই অনুমান করা যায়, বুদ্ধিবৃত্তিক সমন্বয় রক্ষা, দূরদর্শী পরিকল্পনা প্রণয়ন, সামরিক প্রস্তুতি ও অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র উদ্ভাবনের বিচারে ইসলামি সভ্যতায় মুসলিম সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি কতটা উজ্জ্বল ছিল।

যুদ্ধবিষয়ক নতুন তত্ত্ব
অন্য সব সামরিক শক্তি থেকে মুসলিম সেনাবাহিনী ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তাদের প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নরকম। ইসলামপূর্ব পৃথিবীর ইতিহাসে অন্য কোনো সভ্যতার সমরকৌশলেও নব্যসভ্যতার সামরিক শক্তিতে সেই বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি পাওয়া যায় না। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যোদ্ধাদের ঈমানি শক্তি। আল্লাহর পথে জিহাদ ও সংগ্রামের জন্য তাদের প্রাণপণ চেষ্টা। এ বিষয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। যত দামি ও মূল্যবান বস্তুই হোক, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাই আমাদের মাঝে কে স্বর্ণের অট্টালিকা তৈরি করে ফেলল আর কে শুধু এক দিরহাম নিয়ে পড়ে থাকল এতে কারও কিছু যায় আসে না। সেদিকে আমাদের বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। এ পৃথিবীতে ক্ষুধা নিবারণের জন্য যতটুকু খাদ্যের প্রয়োজন, শরীর ঢাকার জন্য যতটুকু কাপড়ের প্রয়োজন, এর বাইরে আমরা কিছুই আশা করি না। ওইটুকু ছাড়া যদি আর কিছু আমাদের না থাকে, তাহলে সেটুকুই আমাদের জন্য যথেষ্ট।

আমাদের কারও যদি অঢেল সোনা-রুপা থাকে, তবে সে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে তা ব্যয় করে নিজের জন্য যতটুকু না হলেই নয়, ততটুকু নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে। আর পৃথিবীতে যে অর্থ তার অধিকারে আসার কথা, সেটি কোনো-না-কোনোভাবে তার অধিকারে আসবেই, এ নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, পৃথিবীর ধনসম্পদ প্রকৃত ধনসম্পদ নয়। পৃথিবীর ভোগবিলাস আসল ভোগবিলাস নয়। প্রকৃত ধনসম্পদ ও ভোগবিলাস আখেরাতে। আর আখেরাতের সেই চিরস্থায়ী ধনসম্পদ ও ভোগবিলাস অধিকার করতেই মহান আল্লাহ আমাদের আদেশ করেছেন। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেদিকেই আমাদের পথনির্দেশ করেছেন।

ঠিক যতটুকু হলে আমাদের ক্ষুধা নিবারণ হয় এবং শরিয়ত নির্ধারিত সতর পরিমাণ দেহ আবৃত হয়, এর চেয়ে বেশি অর্জন করা যেন আমাদের উদ্দেশ্য না হয়; আমাদের যেন একমাত্র লক্ষ্য হয় প্রতিপালকের সন্তুষ্টি অর্জন করে আমৃত্যু শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদে অবিচল থাকা; এ বিষয়ে তিনি আমাদের প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন।

মহান আল্লাহ যেন শাহাদত নসিব করেন, আর যেন বাড়ি ফিরে যেতে না হয়, দেশে প্রত্যাবর্তন করতে না হয়, পরিবার ও সন্তানদের কাছে ফিরে যেতে না হয়, আমাদের এ বাহিনীর সবাই সকাল-সন্ধ্যা শুধু এ প্রার্থনাই করে থাকেন। পেছনে কী রয়ে গেছে সেদিকে আমাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। পরিবার ও সন্তানদের আমরা আল্লাহর কাছে সমর্পণ করেছি, তাঁর কাছে গচ্ছিত রেখেছি। আমরা শুধু সামনের দিকে তাকাই। আখেরাতের দিকে চেয়ে থাকি। (৩৬০)

ইসলামি সেনাবাহিনীর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, তাদের মাঝে সমন্বয় ও একতা বজায় ছিল। আর মুসলিম সমাজের প্রতিটি নাগরিকের প্রধান দায়িত্ব হলো সেই ঐক্য সুরক্ষা করা। মহান আল্লাহ বলেন,

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا

আর তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো। একে অন্যের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ো না। (৩৬১)

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

يَدُ اللَّهِ مَعَ الْجَمَاعَةِ»

ঐক্যবদ্ধ জনগোষ্ঠীর পক্ষেই আল্লাহর সাহায্য অবতীর্ণ হয়।

বদর যুদ্ধে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সঙ্গীদের নিয়ে প্রথমে বদর কূপের সন্নিকটে এক স্থানে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু বিশিষ্ট সাহাবি হুবাব ইবনুল মুনযির রা.-এর কাছে বিষয়টি মনঃপূত হয়নি। যেহেতু মুসলিমদের অবস্থানকৃত জায়গাটি শত্রুদের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে না বলে তার মনে হচ্ছিল। তিনি গিয়ে মুসলিম সেনাপতি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি কি আল্লাহর আদেশে এ জায়গাটি বেছে নিয়েছেন, এখানে কিন্তু সামনে-পেছনে যাওয়ার কোনো অবকাশ নেই, নাকি রণকৌশল হিসাবে আপনি এই জায়গাটি পছন্দ করেছেন? বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এটা স্রেফ রণকৌশল। এ কথা শোনার পর হুবাব রা. বললেন, এই জায়গায় অবস্থান করাটা আমি সমীচীন মনে করছি না। আমাদের আরও এগিয়ে যেতে হবে। কুরাইশ বাহিনীর অবস্থানের সবচেয়ে নিকটবর্তী কূপ আমাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। তা ছাড়া অন্যান্য কূপগুলো বন্ধ করে দেবো। তাহলে ফল দাঁড়াবে এই, যুদ্ধ শুরু হলে আমরা পানি পান করতে পারব আর কুরাইশ বাহিনী পানির অভাবে ছটফট করবে। হুবাব রা.-এর এই সুহি ওয়া সাল্লামকে তা প্রদান করতে কুরাইশ গোত্রের প্রায় সকল নেতা একমত হয়ে তাকে ইসলামের মর্মবাণী প্রচার থেকে বিরত হওয়ার প্রস্তাব করেন। তাদের এই প্রস্তাব শুনে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাচা আবু তালিবকে বলেন, চাচাজান, আল্লাহর শপথ করে বলছি, যদি তারা সূর্যকে আমার ডান হাতে আর চাঁদকে আমার বাঁ হাতে এনে দিয়ে বলে, এই নাও, এখন থেকে এ দুটোই তোমার। তুমি যেভাবে ইচ্ছা তা পরিচালনা করবে। কিন্তু এর বিনিময়ে তুমি তোমার এ বাণী প্রচার থেকে বিরত থাকো, তারপরও কিছুতেই আমি এ বাণী প্রচার থেকে বিরত হব না। (৩৫৬)

তেমনই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইনতেকালের পর কিছু মুসলিম যাকাত প্রদানে অস্বীকার করলে তৎকালীন খলিফা আবু বকর রা. ঠিক একই ভূমিকা পালন করেন। তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ! এখন যদি কেউ আল্লাহর রাসুলের কাছে আদায় করা একটি রশিও যাকাত প্রদান করতে অস্বীকার করে, তাহলে আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব। যাকাত অবশ্যই সম্পদের অধিকার। নামায ও যাকাত এ দুটোকে যে আলাদা করে দেখবে আমি তারও বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামব। (৩৫৭)

এরকম ইস্পাতকঠিন মনোবল এবং বলিষ্ঠ প্রাণশক্তি নিয়েই মুসলিম সেনানীরা ইসলামের বিজয়ইতিহাস রচনা করেছেন। আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য জীবন উৎসর্গ করা ছিল তাদের জীবনের সর্বোচ্চ বাসনা। প্রায় সকল সামরিক অভিযানে বিজয় অর্জনের পেছনে এটিই ছিল তাদের মূল চালিকাশক্তি। তাদের মনে এই বিশ্বাস জাগ্রত ছিল যে, বিজয় একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। মহান আল্লাহই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন,

وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ

আর বিজয় একমাত্র পরাক্রান্ত, মহাজ্ঞানী আল্লাহর পক্ষ থেকেই। (৩৫৮)

ইসলামি সভ্যতায় যুদ্ধ কখনো শত্রুতা ও বিদ্বেষবশত ছিল না। হত্যা, লুণ্ঠন, অপহরণের উদ্দেশ্যে ছিল না। ছিল না তাতে জাগতিক কোনো অভিসন্ধিও। বরং জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়ার পেছনে তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল মহান আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করা। এ কারণেই পর্বতসম সকল দুঃসাধ্য কাজও মুজাহিদদের জন্য সহজ হয়ে যেত। তাদের সুউচ্চ মনোবলের সামনে কঠিন ও শক্ত পাথরও চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যেত। মহান আল্লাহ বলেন,

وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ

আর লড়াই করো আল্লাহর জন্য তাদের বিরুদ্ধে, যারা লড়াই করে তোমাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু কারও প্রতি বাড়াবাড়ি করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না। (৩৫৯)

এই উন্নত অভিলাষ এবং অসীম মনোবলই বিজয়ের সবচেয়ে বড় নিয়ামকের কাজ করেছে মুসলিম সেনাবাহিনীর মধ্যে। এ কারণেই কিবতি সাম্রাজ্যের প্রবল প্রতাপী সম্রাট মুকাওকিসের সামনে বিশিষ্ট সাহাবি ও মুসলিম সেনাপতি উবাদা ইবনে সামিত রা. উচ্চারণ করেছিলেন,

আমাদের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর জন্য জিহাদ করা। আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে এগিয়ে যাওয়া। আল্লাহর বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ শত্রুর বিরুদ্ধে আমরা জাগতিক কোনো স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যে লড়াই করি না। এ পৃথিবীতে শুধু অর্থের প্রাচুর্য ঘটানো আমাদের উদ্দেশ্য নয়। তবে হ্যাঁ, মহান আল্লাহ সেই অর্থ আমাদের অধিকারে এনেছেন। সুতরাং যুদ্ধে আমরা যে সম্পদ লাভ করি তা আমাদের জন্য হালাল। আমাদের মাঝে কে স্বর্ণের অট্টালিকা তৈরি করে ফেলল আর কে শুধু এক দিরহাম নিয়ে পড়ে থাকল এতে কারও কিছু যায় আসে না। সেদিকে আমাদের বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। এ পৃথিবীতে ক্ষুধা নিবারণের জন্য যতটুকু খাদ্যের প্রয়োজন, শরীর ঢাকার জন্য যতটুকু কাপড়ের প্রয়োজন, এর বাইরে আমরা কিছুই আশা করি না। ওইটুকু ছাড়া যদি আর কিছু আমাদের না থাকে, তাহলে সেটুকুই আমাদের জন্য যথেষ্ট।

আমাদের কারও যদি অঢেল সোনা-রুপা থাকে, তবে সে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে তা ব্যয় করে নিজেরপরামর্শ আল্লাহর রাসুলের দারুণ পছন্দ হলো। তিনি খুশি হয়ে বললেন, তুমি সঠিক পরামর্শ দিয়েছ। এরপর তিনি সহযোদ্ধাদের নিয়ে এগিয়ে চললেন। মাঝরাতে শত্রুদের অবস্থানের কাছাকাছি কূপের কাছে পৌঁছে তাঁবু খাটালেন। এরপর সাহাবিগণ হাউজ বানালেন, তাতে পানি ভরতি করে পানি উত্তোলনের সহজতার জন্য তাতে পাত্র ফেলে রাখলেন এবং বাকি সব কূপ বন্ধ করে দিলেন। (৩৬২)

তাবুক যুদ্ধে সেনাবাহিনী পাঠানোর সময় মদিনায় যে অভাব ও দুর্ভিক্ষ চলছিল, সেই জটিল ও কঠিন মুহূর্তে মুসলিম সমাজের অবিচ্ছেদ্য ঐক্য-প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সামরিক মিশন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আল্লাহর পথে অকাতরে অর্থসম্পد বিলিয়ে দেওয়ার যে নজির মুসলিমগণ স্থাপন করেন তার নজির অন্য কোনো সভ্যতায় খুঁজে পাওয়া যায় না। যুদ্ধের ব্যয়ভার বহনের জন্য সেনাপ্রধান মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবাইকে নিজ নিজ সাধ্য অনুপাতে অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহিত করেন। সাহাবিগণ আল্লাহর পথে ধনসম্পদ বিলিয়ে দিতে প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেন। ঠিক সে সময় বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে সিরিয়ায় পাঠানোর জন্য দুইশ উট প্রস্তুত করেছিলেন উসমান ইবনে আফফান রা.। কিন্তু জিহাদের পথে খরচের ডাক আসায় সেই দুইশ উট সাজসরঞ্জামসহ আল্লাহর পথে সদকা করে দেন। এরপর অনুরূপ আরও একশ উট দান করেন। এরপর এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা এনে আল্লাহর রাসুলের সামনে পেশ করেন। এরপর আরও দান করেন, আরও সদকা করেন। শেষ পর্যন্ত একা উসমান ইবনে আফফান রা.-এর দেওয়া দানের পরিমাণ দাঁড়ায় নয়শ উট, একশ সামরিক অশ্ব। নগদ অর্থের কথা আলাদা। আবদুর রহমান ইবনে আওফ রা. (প্রায়) দুইশ উকিয়া চব্বিশ হাজার চারশ চুরানব্বই গ্রাম রৌপ্য দান করেন। আবু বকর রা. তার অধিকারে থাকা সমুদয় অর্থ আল্লাহর রাসুলের সামনে উপস্থাপন করেন, যার পরিমাণ ছিল চার হাজার দিরহাম। পরিবারের জন্য শুধু আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে রেখে আসেন। তার দানটাই ছিল প্রথম। উমর ইবনুল খাত্তাব রা. তার পুরো অর্থের অর্ধেক দান করেন। আব্বাস রা. প্রচুর দান করেন। তালহা, সাদ ইবনে উবাদা, মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা রা. প্রমুখ সাহাবিও দানের জন্য প্রচুর অর্থ নিয়ে আসেন। আসেম ইবনে আদি রা. প্রদান করেন নব্বই ওয়াসাক (সতেরো টন ছয়শ আটান্ন গ্রাম প্রায়) খেজুর। এ ছাড়াও সবাই নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী অংশগ্রহণ করেন। কেউ অল্প, কেউ অধিক, এভাবে সবাই দানে শরিক হন। এমনকি অনেকে সামর্থ্যের অভাবে এক মুদ (৮১৭.৬৫ গ্রাম প্রায়), দুই মুদ (১৬৩৫.৩০ গ্রাম প্রায়) পরিমাণও দান করেন। নারী সাহাবিগণও নিজ নিজ সক্ষমতা অনুযায়ী সুগন্ধي, বালা, অলংকার, পায়ে পরিধানের গহনা, কানের দুল, আংটি, জমানো মুদ্রার থলে ইত্যাদি দান করে জিহাদে অংশগ্রহণ করেন। (৩৬৩)

মুসলিম সামরিক বাহিনীতে সেনাপ্রধান ও সৈনিকদের মাঝে যে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আস্থার সম্পর্ক ছিল, তা যুদ্ধাভিযানে মুসলিমদের বিজয় রচনায় বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবসময় যোদ্ধাদের সঙ্গে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখতেন। প্রিয় নাম ধরে সবাইকে সম্বোধন করতেন। আবু উবাইদা রা.-এর উদ্দেশে তিনি বলেন,

لِكُلِّ أُمَّةٍ أَمِينٌ وَأَمِينُ هَذِهِ الْأُمَّةِ أَبُو عُبَيْدَةَ بْنُ الْجَرَّاحِ

* প্রত্যেক জাতির মাঝে একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি থাকে। এই উম্মতের সেই বিশ্বস্ত ব্যক্তিটি আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ। (৩৬৪)

* যুবাইর ইবনুল আওয়ام রা.-এর উদ্দেশে বলেন,

لِكُلِّ نَبِيَّ حَوَارِيُّ، وَحَوَارِيَّ الزُّبَيْرُ»

প্রত্যেক নবীর কিছু একান্ত সহযোগী থাকে, আমার সেই সহযোগী যুবাইর।

রণক্ষেত্রে শত্রুদের আক্রমণ ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে একজন সেনাপ্রধান হিসেবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও অংশগ্রহণ করতেন। আহযাব তথা খন্দকের যুদ্ধে এমন জন্য যতটুকু না হলেই নয়, ততটুকু নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে। আর পৃথিবীতে যে অর্থ তার অধিকারে আসার কথা, সেটি কোনো-না-কোনোভাবে তার অধিকারে আসবেই, এ নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, পৃথিবীর ধনসম্পদ প্রকৃত ধনসম্পদ নয়। পৃথিবীর ভোগবিলাস আসল ভোগবিলাস নয়। প্রকৃত ধনসম্পদ ও ভোগবিলাস আখেরাতে। আর আখেরাতের সেই চিরস্থায়ী ধনসম্পদ ও ভোগবিলাস অধিকার করতেই মহান আল্লাহ আমাদের আদেশ করেছেন। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেদিকেই আমাদের পথনির্দেশ করেছেন।

ঠিক যতটুকু হলে আমাদের ক্ষুধা নিবারণ হয় এবং শরিয়ত নির্ধারিত সতর পরিমাণ দেহ আবৃত হয়, এর চেয়ে বেশি অর্জন করা যেন আমাদের উদ্দেশ্য না হয়; আমাদের যেন একমাত্র লক্ষ্য হয় প্রতিপালকের সন্তুষ্টি অর্জন করে আমৃত্যু শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদে অবিচল থাকা; এ বিষয়ে তিনি আমাদের প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন।

মহান আল্লাহ যেন শাহাদত নসিব করেন, আর যেন বাড়ি ফিরে যেতে না হয়, দেশে প্রত্যাবর্তন করতে না হয়, পরিবার ও সন্তানদের কাছে ফিরে যেতে না হয়, আমাদের এ বাহিনীর সবাই সকাল-সন্ধ্যা শুধু এ প্রার্থনাই করে থাকেন। পেছনে কী রয়ে গেছে সেদিকে আমাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। পরিবার ও সন্তানদের আমরা আল্লাহর কাছে সমর্পণ করেছি, তাঁর কাছে গচ্ছিত রেখেছি। আমরা শুধু সামনের দিকে তাকাই। আখেরাতের দিকে চেয়ে থাকি। (৩৬০)

ইসলামি সেনাবাহিনীর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, তাদের মাঝে সমন্বয় ও একতা বজায় ছিল। আর মুসলিম সমাজের প্রতিটি নাগরিকের প্রধান দায়িত্ব হলো সেই ঐক্য সুরক্ষা করা। মহান আল্লাহ বলেন,

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا

আর তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো। একে অন্যের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ো না। (৩৬১)

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

يَدُ اللَّهِ مَعَ الْجَمَاعَةِ»

ঐক্যবদ্ধ জনগোষ্ঠীর পক্ষেই আল্লাহর সাহায্য অবতীর্ণ হয়।

বদর যুদ্ধে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সঙ্গীদের নিয়ে প্রথমে বদর কূপের সন্নিকটে এক স্থানে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু বিশিষ্ট সাহাবি হুবাব ইবনুল মুনযির রা.-এর কাছে বিষয়টি মনঃপূত হয়নি। যেহেতু মুসলিমদের অবস্থানকৃত জায়গাটি শত্রুদের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে না বলে তার মনে হচ্ছিল। তিনি গিয়ে মুসলিম সেনাপতি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি কি আল্লাহর আদেশে এ জায়গাটি বেছে নিয়েছেন, এখানে কিন্তু সামনে-পেছনে যাওয়ার কোনো অবকাশ নেই, নাকি রণকৌশল হিসাবে আপনি এই জায়গাটি পছন্দ করেছেন? বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এটা স্রেফ রণকৌশল। এ কথা শোনার পর হুবাব রা. বললেন, এই জায়গায় অবস্থান করাটা আমি সমীচীন মনে করছি না। আমাদের আরও এগিয়ে যেতে হবে। কুরাইশ বাহিনীর অবস্থানের সবচেয়ে নিকটবর্তী কূপ আমাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। তা ছাড়া অন্যান্য কূপগুলো বন্ধ করে দেবো। তাহলে ফল দাঁড়াবে এই, যুদ্ধ শুরু হলে আমরা পানি পান করতে পারব আর কুরাইশ বাহিনী পানির অভাবে ছটফট করবে। হুবাব রা.-এর এই সুপরামর্শ আল্লাহর রাসুলের দারুণ পছন্দ হলো। তিনি খুশি হয়ে বললেন, তুমি সঠিক পরামর্শ দিয়েছ। এরপর তিনি সহযোদ্ধাদের নিয়ে এগিয়ে চললেন। মাঝরাতে শত্রুদের অবস্থানের কাছাকাছি কূপের কাছে পৌঁছে তাঁবু খাটালেন। এরপর সাহাবিগণ হাউজ বানালেন, তাতে পানি ভরতি করে পানি উত্তোলনের সহজতার জন্য তাতে পাত্র ফেলে রাখলেন এবং বাকি সব কূপ বন্ধ করে দিলেন। (৩৬২)

তাবুক যুদ্ধে সেনাবাহিনী পাঠানোর সময় মদিনায় যে অভাব ও দুর্ভিক্ষ চলছিল, সেই জটিল ও কঠিন মুহূর্তে মুসলিম সমাজের অবিচ্ছেদ্য ঐক্য-প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সামরিক মিশন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আল্লাহর পথে অকাতরে অর্থসম্পদ বিলিয়ে দেওয়ার যে নজির মুসলিমগণ স্থাপন করেন তার নজির অন্য কোনো সভ্যতায় খুঁজে পাওয়া যায় না। যুদ্ধের ব্যয়ভার বহনের জন্য সেনাপ্রধান মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবাইকে নিজ নিজ সাধ্য অনুপাতে অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহিত করেন। সাহাবিগণ আল্লাহর পথে ধনসম্পদ বিলিয়ে দিতে প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেন। ঠিক সে সময় বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে সিরিয়ায় পাঠানোর জন্য দুইশ উট প্রস্তুত করেছিলেন উসমান ইবনে আফফান রা.। কিন্তু জিহাদের পথে খরচের ডাক আসায় সেই দুইশ উট সাজসরঞ্জামসহ আল্লাহর পথে সদকা করে দেন। এরপর অনুরূপ আরও একশ উট দান করেন। এরপর এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা এনে আল্লাহর রাসুলের সামনে পেশ করেন। এরপর আরও দান করেন, আরও সদকা করেন। শেষ পর্যন্ত একা উসমান ইবনে আফফান রা.-এর দেওয়া দানের পরিমাণ দাঁড়ায় নয়শ উট, একশ সামরিক অশ্ব। নগদ অর্থের কথা আলাদা। আবদুর রহমান ইবনে আওফ রা. (প্রায়) দুইশ উকিয়া চব্বিশ হাজার চারশ চুরানব্বই গ্রাম রৌপ্য দান করেন। আবু বকর রা. তার অধিকারে থাকা সমুদয় অর্থ আল্লাহর রাসুলের সামনে উপস্থাপন করেন, যার পরিমাণ ছিল চার হাজার দিরহাম। পরিবারের জন্য শুধু আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে রেখে আসেন। তার দানটাই ছিল প্রথম। উমর ইবনুল খাত্তাব রা. তার পুরো অর্থের অর্ধেক দান করেন। আব্বাস রা. প্রচুর দান করেন। তালহা, সাদ ইবনে উবাদা, মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা রা. প্রমুখ সাহাবিও দানের জন্য প্রচুর অর্থ নিয়ে আসেন। আসেম ইবনে আদি রা. প্রদান করেন নব্বই ওয়াসাক (সতেরো টন ছয়শ আটান্ন গ্রাম প্রায়) খেজুর। এ ছাড়াও সবাই নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী অংশগ্রহণ করেন। কেউ অল্প, কেউ অধিক, এভাবে সবাই দানে শরিক হন। এমনকি অনেকে সামর্থ্যের অভাবে এক মুদ (৮১৭.৬৫ গ্রাম প্রায়), দুই মুদ (১৬৩৫.৩০ গ্রাম প্রায়) পরিমাণও দান করেন। নারী সাহাবিগণও নিজ নিজ সক্ষমতা অনুযায়ী সুগন্ধি, বালা, অলংকার, পায়ে পরিধানের গহনা, কানের দুল, আংটি, জমানো মুদ্রার থলে ইত্যাদি দান করে জিহাদে অংশগ্রহণ করেন। (৩৬৩)

মুসলিম সামরিক বাহিনীতে সেনাপ্রধান ও সৈনিকদের মাঝে যে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আস্থার সম্পর্ক ছিল, তা যুদ্ধাভিযানে মুসলিমদের বিজয় রচনায় বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবসময় যোদ্ধাদের সঙ্গে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখতেন। প্রিয় নাম ধরে সবাইকে সম্বোধন করতেন। আবু উবাইদা রা.-এর উদ্দেশে তিনি বলেন,

لِكُلِّ أُمَّةٍ أَمِينٌ وَأَمِينُ هَذِهِ الْأُمَّةِ أَبُو عُبَيْدَةَ بْنُ الْجَرَّاحِ
* প্রত্যেক জাতির মাঝে একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি থাকে। এই উম্মতের সেই বিশ্বস্ত ব্যক্তিটি আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ। (৩৬৪)

* যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা.-এর উদ্দেশে বলেন,
لِكُلِّ نَبِيَّ حَوَارِيُّ، وَحَوَارِيَّ الزُّبَيْرُ»

প্রত্যেক নবীর কিছু একান্ত সহযোগী থাকে, আমার সেই সহযোগী যুবাইর।

রণক্ষেত্রে শত্রুদের আক্রমণ ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে একজন সেনাপ্রধান হিসেবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও অংশগ্রহণ করতেন। আহযাব তথা খন্দকের যুদ্ধে এমনটিই আমরা দেখতে পাই। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইনতেকালের পর যারা মুসলিমদের শাসক হয়েছেন, নেতা হয়েছেন, সেনাপ্রধান হয়েছেন সৈনিকদের সঙ্গে নম্রতা ও ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক বজায় রাখার আন্তরিক অভিপ্রায় তাদের মাঝেও আমরা দেখতে পাই। এ কারণেই কিবতি সম্রাট মুকাওকিসের পাঠানো দূতের বিবৃতিতে মুসলিমদের পরিচয় খুব ভালোভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি বলেন, আমি এমন এক জনগোষ্ঠী দেখে এসেছি, যাদের কাছে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুবরণ করা বেশি প্রিয়। মর্যাদার অধিকারী হওয়ার চেয়ে বিনম্র থাকা যাদের ভূষণ। জাগতিক বিষয়ে তাদের কোনো আগ্রহ-অভিলাষ নেই। তারা মাটিতে বসেন। হাঁটুর ওপর ভর করে তারা খাবার আহরণ করেন। তাদের নেতা তাদের মতোই একজন সাধারণ মানুষ। তাদের মাঝে কে উচ্চমর্যাদার আর কে সাধারণ, কে নেতা আর কে দাস তা বোঝার কোনো উপায় নেই। (৩৬৫)

যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলিমদের যত উদ্ভাবন
সমরাস্ত্র আবিষ্কারের মতো অত্যাধুনিক যুদ্ধকৌশল উদ্ভাবন ও প্রয়োগে মুসলিম বাহিনীর রয়েছে বিরাট সাফল্য। ঐতিহাসিক কাদেসিয়ার ঘটনাটি সামরিক কৌশল উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। ময়দানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথম দিনই মুসলিমগণ এক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। পারসিক বাহিনীর সম্মুখভাগে হস্তিবাহিনী দেখে মুসলিমগণ কিছুটা বিচলিত হয়ে যান। মুসলিমদের ঘোড়াগুলো হাতির বিশালাকার দেহ ও বিকট আওয়াজে ভয় পেয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। কিন্তু সাহস না হারিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সেনাপতিগণ রণপরিকল্পনা পালটে হাতিগুলোকে পরাস্ত করার নিখুঁত প্ল্যান তৈরি করেন। সেজন্য সাদ রা. আসেম ইবনে আমর তামিমি রা.-এর কাছে লোক পাঠান। তখন আসেম ইবনে আমর রা. তামিমি গোত্রের লোকদের নিকট গিয়ে ঘোষণা করেন, হে তামিম গোত্রের মুসলিম, উট ও অশ্ব চালনায় তোমরাই তো আরবের বিখ্যাত গোত্র! এই হাতিগুলো দমনে তোমাদের কাছে কি কোনো কৌশল নেই? তারা উত্তরে বলল, আল্লাহর শপথ! অবশ্যই আছে। এরপর নিজ গোত্রের সুদক্ষ ধনুর্বিদদের সামনে ঘোষণা করেন, হে তিরন্দাজ দুঃসাহসী যোদ্ধাগণ, প্রচণ্ড তিরের আক্রমণে শত্রুবাহিনীর সম্মুখভাগে থাকা হস্তি আরোহীদের তোমরা বিচ্ছিন্ন করে দাও। আরেকদল দুর্ধর্ষ যোদ্ধার উদ্দেশ্যে তিনি ঘোষণা করেন, হে দুর্ধর্ষ মুজাহিদগণ, তোমরা হাতিগুলোর পিছু ধাওয়া করে তাদের বন্ধনীগুলো কেটে দাও। যেন তাতে সংযুক্ত সৈনিকবাহী কাঠের বাক্সগুলো মাটিতে পড়ে যায়। এরপর তাদেরকে উদ্দীপ্ত করতে তাদের সাথে তিনি নিজেও আক্রমণে বেরিয়ে পড়েন। তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। অদূরেই অবস্থান করছিল ডানদিকের ও বাঁ দিকের সেনাদল। আসেম রা.-এর সঙ্গীরা এসে হাতিগুলোর ওপর আক্রমণ করেন। হাতির লেজ কর্তন করেন। এরপর দ্রুত হাতির পিঠে বহন করা কাঠের বক্সগুলোর সকল বাঁধন কেটে দেন। এতে করে হাতিগুলো প্রচণ্ড চিৎকার করতে থাকে। সকল হাতিই সেদিন আহত হয়ে চিৎকার করতে থাকে এবং হস্তীসৈনিক সকলে নিহত হয়। (৩৬৬)

ইসলামের ইতিহাসে মুসলিমদের উদ্ভাবিত অত্যাধুনিক আরও একটি যুদ্ধপরিকল্পনা ও কৌশল আমরা দেখতে পাই বিখ্যাত উসমানীয় সুলতান মুহাম্মাদ আল-ফাতিহের কনস্টান্টিনোপল অভিযানে। বিশাল আকারের কামানবাহী রণতরীগুলো নিয়ে তিনি কনস্টান্টিনোপল অভিযান শুরু করেন। দার্দানেলিস প্রণালি পর্যন্ত এসে দেখেন, নৌপথে শত্রুপক্ষের আক্রমণ প্রতিহত করতে বাইজান্টাইন বাহিনী দুই উপকূলের মাঝে মজবুত ও বিশাল আকারের লোহার শিকল স্থাপন করেছে। কিন্তু তাতেও দমে যাননি মহান সেনাপতি সুলতান মুহাম্মাদ। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন ও দুঃসাধ্য যুদ্ধ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ও নৌবহর বহনের সিদ্ধান্ত নেন। স্থলপথে কাঠ দিয়ে পথ তৈরি করে লোহার শিকল দিয়ে সেই পথে রণতরীগুলো টেনে এনে অপর প্রান্তে থাকা সমুদ্রের পানিতে অবতরণ করানোর মতো অকল্পনীয় ও দুরূহ কাজটি করে মুসলিম সেনাবাহিনী। মুসলিম সেনাদের এ অভিনব উদ্ভাবন ও রণকৌশল দেখে বাইজান্টাইন বাহিনী ভড়কে যায়। ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো কোনো সেনাপতি স্থলপথে রণতরী টেনে আনার ও সেই রণতরীগুলো শিকল দিয়ে পাহাড়ের ওপর পর্যন্ত টেনেটিই আমরা দেখতে পাই। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইনতেকালের পর যারা মুসলিমদের শাসক হয়েছেন, নেতা হয়েছেন, সেনাপ্রধান হয়েছেন সৈনিকদের সঙ্গে নম্রতা ও ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক বজায় রাখার আন্তরিক অভিপ্রায় তাদের মাঝেও আমরা দেখতে পাই। এ কারণেই কিবতি সম্রাট মুকাওকিসের পাঠানো দূতের বিবৃতিতে মুসলিমদের পরিচয় খুব ভালোভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি বলেন, আমি এমন এক জনগোষ্ঠী দেখে এসেছি, যাদের কাছে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুবরণ করা বেশি প্রিয়। মর্যাদার অধিকারী হওয়ার চেয়ে বিনম্র থাকা যাদের ভূষণ। জাগতিক বিষয়ে তাদের কোনো আগ্রহ-অভিলাষ নেই। তারা মাটিতে বসেন। হাঁটুর ওপর ভর করে তারা খাবার আহরণ করেন। তাদের নেতা তাদের মতোই একজন সাধারণ মানুষ। তাদের মাঝে কে উচ্চমর্যাদার আর কে সাধারণ, কে নেতা আর কে দাস তা বোঝার কোনো উপায় নেই। (৩৬৫)

যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলিমদের যত উদ্ভাবন
সমরাস্ত্র আবিষ্কারের মতো অত্যাধুনিক যুদ্ধকৌশল উদ্ভাবন ও প্রয়োগে মুসলিম বাহিনীর রয়েছে বিরাট সাফল্য। ঐতিহাসিক কাদেসিয়ার ঘটনাটি সামরিক কৌশল উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। ময়দানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথম দিনই মুসলিমগণ এক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। পারসিক বাহিনীর সম্মুখভাগে হস্তিবাহিনী দেখে মুসলিমগণ কিছুটা বিচলিত হয়ে যান। মুসলিমদের ঘোড়াগুলো হাতির বিশালাকার দেহ ও বিকট আওয়াজে ভয় পেয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। কিন্তু সাহস না হারিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সেনাপতিগণ রণপরিকল্পনা পালটে হাতিগুলোকে পরাস্ত করার নিখুঁত প্ল্যান তৈরি করেন। সেজন্য সাদ রা. আসেম ইবনে আমর তামিমি রা.-এর কাছে লোক পাঠান। তখন আসেম ইবনে আমর রা. তামিমি গোত্রের লোকদের নিকট গিয়ে ঘোষণা করেন, হে তামিম গোত্রের মুসলিম, উট ও অশ্ব চালনায় তোমরাই তো আরবের বিখ্যাত গোত্র! এই হাতিগুলো দমনে তোমাদের কাছে কি কোনো কৌশল নেই? তারা উত্তরে বলল, আল্লাহর শপথ! অবশ্যই আছে। এরপর নিজ গোত্রের সুদক্ষ ধনুর্বিদদের সামনে ঘোষণা করেন, হে তিরন্দাজ দুঃসাহসী যোদ্ধাগণ, প্রচণ্ড তিরের আক্রমণে শত্রুবাহিনীর সম্মুখভাগে থাকা হস্তি আরোহীদের তোমরা বিচ্ছিন্ন করে দাও। আরেকদল দুর্ধর্ষ যোদ্ধার উদ্দেশ্যে তিনি ঘোষণা করেন, হে দুর্ধর্ষ মুজাহিদগণ, তোমরা হাতিগুলোর পিছু ধাওয়া করে তাদের বন্ধনীগুলো কেটে দাও। যেন তাতে সংযুক্ত সৈনিকবাহী কাঠের বাক্সগুলো মাটিতে পড়ে যায়। এরপর তাদেরকে উদ্দীপ্ত করতে তাদের সাথে তিনি নিজেও আক্রমণে বেরিয়ে পড়েন। তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। অদূরেই অবস্থান করছিল ডানদিকের ও বাঁ দিকের সেনাদল। আসেম রা.-এর সঙ্গীরা এসে হাতিগুলোর ওপর আক্রমণ করেন। হাতির লেজ কর্তন করেন। এরপর দ্রুত হাতির পিঠে বহন করা কাঠের বক্সগুলোর সকল বাঁধন কেটে দেন। এতে করে হাতিগুলো প্রচণ্ড চিৎকার করতে থাকে। সকল হাতিই সেদিন আহত হয়ে চিৎকার করতে থাকে এবং হস্তীসৈনিক সকলে নিহত হয়। (৩৬৬)

ইসলামের ইতিহাসে মুসলিমদের উদ্ভাবিত অত্যাধুনিক আরও একটি যুদ্ধপরিকল্পনা ও কৌশল আমরা দেখতে পাই বিখ্যাত উসমানীয় সুলতান মুহাম্মাদ আল-ফাতিহের কনস্টান্টিনোপল অভিযানে। বিশাল আকারের কামানবাহী রণতরীগুলো নিয়ে তিনি কনস্টান্টিনোপল অভিযান শুরু করেন। দার্দানেলিস প্রণালি পর্যন্ত এসে দেখেন, নৌপথে শত্রুপক্ষের আক্রমণ প্রতিহত করতে বাইজান্টাইন বাহিনী দুই উপকূলের মাঝে মজবুত ও বিশাল আকারের লোহার শিকল স্থাপন করেছে। কিন্তু তাতেও দমে যাননি মহান সেনাপতি সুলতান মুহাম্মাদ। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন ও দুঃসাধ্য যুদ্ধ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ও নৌবহর বহনের সিদ্ধান্ত নেন। স্থলপথে কাঠ দিয়ে পথ তৈরি করে লোহার শিকল দিয়ে সেই পথে রণতরীগুলো টেনে এনে অপর প্রান্তে থাকা সমুদ্রের পানিতে অবতরণ করানোর মতো অকল্পনীয় ও দুরূহ কাজটি করে মুসলিম সেনাবাহিনী। মুসলিম সেনাদের এ অভিনব উদ্ভাবন ও রণকৌশল দেখে বাইজান্টাইন বাহিনী ভড়কে যায়। ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো কোনো সেনাপতি স্থলপথে রণতরী টেনে আনার ও সেই রণতরীগুলো শিকল দিয়ে পাহাড়ের ওপর পর্যন্ত টেনে ওঠানো, এরপর সেগুলো নিখুঁতভাবে পানিতে অবতরণ করানোর মতো দুঃসাধ্য কাজটি সাধন করলেন। সেই রণতরীগুলো হালকা ছিল না, বরং তাতে বোঝাই ছিল যুদ্ধসরঞ্জাম, বিশাল আকৃতির কামান ও গোলা। এর ফলাফলও হাতেনাতে পায় মুসলিম বাহিনী। খুব বেশি ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই পুরো কনস্টান্টিনোপল শহর মুসলিমদের অধিকারে চলে আসে। (৩৬৭)

এই ছিল ইসলামি সামরিক শক্তির উদ্ভাবিত কিছু রণকৌশলের নমুনামাত্র। যার মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামি সভ্যতা সমকালীন সকল সভ্যতাকে ছাপিয়ে এক অনন্য আসন তৈরি করেছিল। বিশ্বের বুকে মুসলিমদের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও ভাবমূর্তি সমুজ্জ্বল করেছিল।

নৌপথে মুসলিমদের অভিযান
ইসলাম আগমনের পূর্বে ও তার সূচনালগ্নে নৌপথে ভ্রমণ এবং সামুদ্রিক অভিযানের সঙ্গে খুব বেশি পরিচিত ছিল না আরবরা। কারণ মরুভূমিতে বসবাসের অভ্যস্ত আরবদের ব্যবসাবাণিজ্য সবই ছিল স্থলপথকেন্দ্রিক। বিশিষ্ট সাহাবি আলা ইবনুল হাযরামি রা. উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর শাসনামলে প্রথম নৌপথে অভিযান পরিচালনা করেন। পারস্যে ইসলামের পতাকা উড্ডীন করতে হিজরি ১৭ সনে বাহরাইনের অধিবাসী মুসলিমদের প্রতি আহ্বান জানান। তারা তার আহ্বানে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া দেয়। এরপর তাদেরকে নিয়ে তিনি পারস্য অভিযানে বের হন। খলিফা উমর রা.-এর অনুমতি ছাড়াই তিনি তাদেরকে নিয়ে নৌযানে করে আরব উপসাগর পাড়ি দেন। এরপর পারস্য আক্রমণ করে সেখান থেকে প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ নিয়ে বসরায় ফিরে আসেন। কিন্তু নৌযানগুলো আর নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। বিষয়টি খলিফা উমর রা.-কে বেশ পীড়া দেয়। শুরু থেকেই তিনি নৌপথে অভিযানের বিরোধী ছিলেন। এ কারণে আলা ইবনুল হাযরামি রা.-কে তিনি গভর্নরের পদ থেকে অব্যাহতি প্রদান করেন। (৩৬৮)

এরপর যখন আরব উপদ্বীপের চতুর্দিকে ইসলামের বিজয় পতাকা উড়তে থাকে, একের পর এক দেশ মুসলিমদের অধিকারে আসতে থাকে, সিরিয়া বিজয় হয়, মিশর বিজয় হয়, তখন রোমানদের মতো নৌপথকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে মুসলিম সাম্রাজ্যের উপকূলগুলো সুরক্ষিত করা এবং রোমানদের আক্রমণ থেকে তীরবর্তী অঞ্চল ও অন্যান্য বিজিত অঞ্চলসমূহ নিরাপদ রাখার প্রতি মনোযোগ দেন মুসলিম বাহিনী। এরই ধারাবাহিকতায় হিমসে অবস্থানরত মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রা. নৌপথে রোম আক্রমণের অভিপ্রায় ব্যক্ত করে পত্র লেখেন খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর কাছে। কিন্তু উমর রা. তাতে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন। উমর রা.-কে এ ব্যাপারে রাজি করানোর জন্য অনুনয়বিনয় করে মুআবিয়া রা. দ্বিতীয়বার পত্র লেখেন, হিমসের একটি গ্রামে বসবাসরত মানুষ রোমানদের এত কাছাকাছি যে, সেই এলাকা থেকে কুকুর আওয়াজ করলে, মোরগ ডাক দিলে এই গ্রাম থেকে শোনা যায়। মুসলিম সাম্রাজ্যে বাস করা লোকজন এতটাই নিকটে যে, যেকোনো সময় রোমানদের আক্রমণের মুখে পড়তে পারে। পত্রের মাধ্যমে খলিফাকে এ কথাই বোঝানো উদ্দেশ্য ছিল মুআবিয়া রা.-এর। এইবার উমর রা. বিষয়টি একটু গভীরভাবে নেন। আমর ইবনুল আস রা.-এর কাছে পত্রযোগে সমুদ্র অভিযানের ব্যাপারে পরামর্শ চাইলে আমর উত্তরে লেখেন, আমি মনে করি বিশাল সমুদ্রের বুকে তুলনামূলক ছোট বাহিনী নিয়ে অভিযানে বের হওয়ার মাঝে উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশি। সেখানে শুধু পানি ও আকাশ, তৃতীয় কোনো উপায় নেই। সাগর শান্ত হলে বাহিনীটি আতঙ্কিত হবে আর অশান্ত হলে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। নৌপথে নিরাপদে ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। আশঙ্কা প্রবল। সেখানে অভিযানে নামলে সেটা হবে বিশাল কাঠের টুকরায় ছোট্ট পোকার মতো। একটু উনিশ-বিশ হলেই পানিতে নিমজ্জিত হওয়ার সম্ভাবনা গুরুতর। আর যদি বেঁচে ফেরে, তবে সেটা হবে এক অবাক বিস্ময়ের ব্যাপার। (৩৬৯) আমর ইবনুল আস রা.-এর এ প্রত্যুত্তর পেয়ে খলিফা উমর রা. মুআবিয়া রা.-কে উত্তর দেন, ওই সত্তার শপথ! যিনি মুহাম্মাদকে সত্য দিয়ে পাঠিয়েছেন, নৌপথে অভিযানের জন্য কোনো মুসলিমকে আমি অনুমতি দেবো না। আমি তো সমুদ্র অভিযানের বিষয়ে আমার অসম্মতির কথা আপনাকে পূর্বেই জানিয়েছি। আল্লাহর শপথ! পুরো রোম সাম্রাজ্যের তুলনায় একজন মুসলিমের জীবনের নিরাপত্তা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমার এ সিদ্ধান্ত জানানোর পর দ্বিতীয়বার আপনি আর আমাকে নৌপথে অভিযানের প্রস্তাব দেবেন না। আমি তো সমুদ্র অভিযানের বিষয়ে আমার সম্মতির কথা আপনাকে পূর্বেই জানিয়েছি। অনুমতি ছাড়া আলা ইবনুল হাযরামি সমুদ্রপথে অভিযান পরিচালনা করে যে বিচারের মুখোমুখি হয়েছে, নিশ্চয় আপনি তা জানেন। তাকে কিন্তু আমার অসম্মতির কথা পূর্বে জানাইনি। (৩৭০)

এর ফলে উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর শাসনামলের শেষ পর্যন্ত মুসলিমগণ নৌপথে কোনো যুদ্ধ পরিচালনা করেননি। তিনি বাইজান্টাইনদের আক্রমণ ইস্যুতে সবসময় প্রতিরক্ষামূলক নীতি অবলম্বনের পক্ষে ছিলেন। সীমান্ত ও উপকূলীয় এলাকায় অনেক দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন এবং পাহারা জোরদার করেছিলেন।

উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর শাহাদাতের পর যখন উসমান ইবনে আফফান রা. খলিফা হন, তখন মুআবিয়া রা. খলিফা উসমান রা.-এর কাছেও সেই বিষয়টি উত্থাপন করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত উসমান রা. নৌপথে অভিযানের অনুমতি প্রদান করেন। তবে তিনি মুআবিয়া রা.-কে বলে দেন, আপনি নিজের মতো করে মানুষকে নির্বাচন করবেন না। নৌপথে অভিযানে যোগদানের জন্য লটারি করবেন না। তাদের ইচ্ছা ও স্বাধীনতা দিন। স্বতঃস্ফূর্তভাবে যারা সামুদ্রিক অভিযানে অংশগ্রহণ করতে চায়, তাদেরকেই শুধু আপনার সঙ্গে নিন ও তাদেরকে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করুন। খলিফা উসমান রা.-এর নির্দেশনামতো তিনি তাই করেন। (৩৭১)

এরপর যখন মুসলিমদের বিজয়ার্জন হয়, তাদের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, সবাই মুসলিমদের সামনে নতি স্বীকার করে, সকল-কিছুর উদ্ভাবন ও আবিষ্কার এবং শিল্প ঘটতে থাকে মুসলিমদের কেন্দ্র করে, খ্যাতিমান ও সুদক্ষ নাবিকদের ব্যবহার করতে থাকে সামুদ্রিক প্রয়োজনে, নৌপথে যুদ্ধ পরিচালনা ও বাণিজ্যিক আমদানি-রপ্তানির ব্যাপক ব্যবহার ঘটতে থাকে, নৌ-বিদ্যা ও চর্চায় উৎকর্ষ হতে থাকে তখন মুসলিমগণ পরিপক্ব নাবিক তৈরিতে মনোনিবেশ করেন, নৌপথে জিহাদ পরিচালনায় মনোযোগ দেন, বড় বড় নৌযান ও রণতরী তৈরি করেন। সামুদ্রিক অভিযানের জন্য নৌবাহিনী ও বিশেষ অস্ত্রে সজ্জিত নৌবহর উদ্ভাবন করেন। সমুদ্রপথে অভিযানের জন্য সাগরপাড়ের যোদ্ধা ও সৈন্যরাই নৌবহরকে যাত্রার মাধ্যমরূপে ব্যবহার করেন। সিরিয়া, আফ্রিকা, মরক্কো, স্পেন ইত্যাদি সমুদ্রবর্তী অঞ্চল এবং উপকূলে বাস করা বিজ্ঞ যোদ্ধারাই বিশেষত কাজটি আঞ্জাম দেন। (৩৭২)

মুসলিমদের পরিচালিত প্রথম নৌ অভিযানগুলো ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। কুবরুস অভিযান এবং ৩৪ হি./৬৫৪ খ্রিষ্টাব্দে পরিচালিত 'যাতুস সাওয়ারি' অভিযান মুসলিমদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। এই অভিযানগুলোর পর নৌ ইতিহাসের গতি পালটে যায়, ভূমধ্যসাগরের পুরো নিয়ন্ত্রণ ও অধিকার মুসলিমদের হাতে চলে আসে। পৃথিবীর বুকে মুসলিম নৌবাহিনী নতুন এক অদম্য পরা ওঠানো, এরপর সেগুলো নিখুঁতভাবে পানিতে অবতরণ করানোর মতো দুঃসাধ্য কাজটি সাধন করলেন। সেই রণতরীগুলো হালকা ছিল না, বরং তাতে বোঝাই ছিল যুদ্ধসরঞ্জাম, বিশাল আকৃতির কামান ও গোলা। এর ফলাফলও হাতেনাতে পায় মুসলিম বাহিনী। খুব বেশি ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই পুরো কনস্টান্টিনোপল শহর মুসলিমদের অধিকারে চলে আসে। (৩৬৭)

এই ছিল ইসলামি সামরিক শক্তির উদ্ভাবিত কিছু রণকৌশলের নমুনামাত্র। যার মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামি সভ্যতা সমকালীন সকল সভ্যতাকে ছাপিয়ে এক অনন্য আসন তৈরি করেছিল। বিশ্বের বুকে মুসলিমদের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও ভাবমূর্তি সমুজ্জ্বল করেছিল।

নৌপথে মুসলিমদের অভিযান
ইসলাম আগমনের পূর্বে ও তার সূচনালগ্নে নৌপথে ভ্রমণ এবং সামুদ্রিক অভিযানের সঙ্গে খুব বেশি পরিচিত ছিল না আরবরা। কারণ মরুভূমিতে বসবাসের অভ্যস্ত আরবদের ব্যবসাবাণিজ্য সবই ছিল স্থলপথকেন্দ্রিক। বিশিষ্ট সাহাবি আলা ইবনুল হাযরামি রা. উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর শাসনামলে প্রথম নৌপথে অভিযান পরিচালনা করেন। পারস্যে ইসলামের পতাকা উড্ডীন করতে হিজরি ১৭ সনে বাহরাইনের অধিবাসী মুসলিমদের প্রতি আহ্বান জানান। তারা তার আহ্বানে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া দেয়। এরপর তাদেরকে নিয়ে তিনি পারস্য অভিযানে বের হন। খলিফা উমর রা.-এর অনুমতি ছাড়াই তিনি তাদেরকে নিয়ে নৌযানে করে আরব উপসাগর পাড়ি দেন। এরপর পারস্য আক্রমণ করে সেখান থেকে প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ নিয়ে বসরায় ফিরে আসেন। কিন্তু নৌযানগুলো আর নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। বিষয়টি খলিফা উমর রা.-কে বেশ পীড়া দেয়। শুরু থেকেই তিনি নৌপথে অভিযানের বিরোধী ছিলেন। এ কারণে আলা ইবনুল হাযরামি রা.-কে তিনি গভর্নরের পদ থেকে অব্যাহতি প্রদান করেন। (৩৬৮)

এরপর যখন আরব উপদ্বীপের চতুর্দিকে ইসলামের বিজয় পতাকা উড়তে থাকে, একের পর এক দেশ মুসলিমদের অধিকারে আসতে থাকে, সিরিয়া বিজয় হয়, মিশর বিজয় হয়, তখন রোমানদের মতো নৌপথকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে মুসলিম সাম্রাজ্যের উপকূলগুলো সুরক্ষিত করা এবং রোমানদের আক্রমণ থেকে তীরবর্তী অঞ্চল ও অন্যান্য বিজিত অঞ্চলসমূহ নিরাপদ রাখার প্রতি মনোযোগ দেন মুসলিম বাহিনী। এরই ধারাবাহিকতায় হিমসে অবস্থানরত মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রা. নৌপথে রোম আক্রমণের অভিপ্রায় ব্যক্ত করে পত্র লেখেন খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর কাছে। কিন্তু উমর রা. তাতে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন। উমর রা.-কে এ ব্যাপারে রাজি করানোর জন্য অনুনয়বিনয় করে মুআবিয়া রা. দ্বিতীয়বার পত্র লেখেন, হিমসের একটি গ্রামে বসবাসরত মানুষ রোমানদের এত কাছাকাছি যে, সেই এলাকা থেকে কুকুর আওয়াজ করলে, মোরগ ডাক দিলে এই গ্রাম থেকে শোনা যায়। মুসলিম সাম্রাজ্যে বাস করা লোকজন এতটাই নিকটে যে, যেকোনো সময় রোমানদের আক্রমণের মুখে পড়তে পারে। পত্রের মাধ্যমে খলিফাকে এ কথাই বোঝানো উদ্দেশ্য ছিল মুআবিয়া রা.-এর। এইবার উমর রা. বিষয়টি একটু গভীরভাবে নেন। আমর ইবনুল আস রা.-এর কাছে পত্রযোগে সমুদ্র অভিযানের ব্যাপারে পরামর্শ চাইলে আমর উত্তরে লেখেন, আমি মনে করি বিশাল সমুদ্রের বুকে তুলনামূলক ছোট বাহিনী নিয়ে অভিযানে বের হওয়ার মাঝে উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশি। সেখানে শুধু পানি ও আকাশ, তৃতীয় কোনো উপায় নেই। সাগর শান্ত হলে বাহিনীটি আতঙ্কিত হবে আর অশান্ত হলে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। নৌপথে নিরাপদে ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। আশঙ্কা প্রবল। সেখানে অভিযানে নামলে সেটা হবে বিশাল কাঠের টুকরায় ছোট্ট পোকার মতো। একটু উনিশ-বিশ হলেই পানিতে নিমজ্জিত হওয়ার সম্ভাবনা গুরুতর। আর যদি বেঁচে ফেরে, তবে সেটা হবে এক অবাক বিস্ময়ের ব্যাপার। (৩৬৯) আমর ইবনুল আস রা.-এর এ প্রত্যুত্তর পেয়ে খলিফা উমর রা. মুআবিয়া রা.-কে উত্তর দেন, ওই সত্তার শপথ! যিনি মুহাম্মাদকে সত্য দিয়ে পাঠিয়েছেন, নৌপথে অভিযানের জন্য কোনো মুসলিমকে আমি অনুমতি দেবো না। আমি তো সমুদ্র অভিযানের বিষয়ে আমার অসম্মতির কথা আপনাকে পূর্বেই জানিয়েছি। আল্লাহর শপথ! পুরো রোম সাম্রাজ্যের তুলনায় একজন মুসলিমের জীবনের নিরাপত্তা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমার এ সিদ্ধান্ত জানানোর পর দ্বিতীয়বার আপনি আর আমাকে নৌপথে অভিযানের প্রস্তাব দেবেন না। আমি তো সমুদ্র অভিযানের বিষয়ে আমার সম্মতির কথা আপনাকে পূর্বেই জানিয়েছি। অনুমতি ছাড়া আলা ইবনুল হাযরামি সমুদ্রপথে অভিযান পরিচালনা করে যে বিচারের মুখোমুখি হয়েছে, নিশ্চয় আপনি তা জানেন। তাকে কিন্তু আমার অসম্মতির কথা পূর্বে জানাইনি। (৩৭০)

এর ফলে উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর শাসনামলের শেষ পর্যন্ত মুসলিমগণ নৌপথে কোনো যুদ্ধ পরিচালনা করেননি। তিনি বাইজান্টাইনদের আক্রমণ ইস্যুতে সবসময় প্রতিরক্ষামূলক নীতি অবলম্বনের পক্ষে ছিলেন। সীমান্ত ও উপকূলীয় এলাকায় অনেক দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন এবং পাহারা জোরদার করেছিলেন।

উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর শাহাদাতের পর যখন উসমান ইবনে আফফান রা. খলিফা হন, তখন মুআবিয়া রা. খলিফা উসমান রা.-এর কাছেও সেই বিষয়টি উত্থাপন করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত উসমান রা. নৌপথে অভিযানের অনুমতি প্রদান করেন। তবে তিনি মুআবিয়া রা.-কে বলে দেন, আপনি নিজের মতো করে মানুষকে নির্বাচন করবেন না। নৌপথে অভিযানে যোগদানের জন্য লটারি করবেন না। তাদের ইচ্ছা ও স্বাধীনতা দিন। স্বতঃস্ফূর্তভাবে যারা সামুদ্রিক অভিযানে অংশগ্রহণ করতে চায়, তাদেরকেই শুধু আপনার সঙ্গে নিন ও তাদেরকে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করুন। খলিফা উসমান রা.-এর নির্দেশনামতো তিনি তাই করেন। (৩৭১)

এরপর যখন মুসলিমদের বিজয়ার্জন হয়, তাদের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, সবাই মুসলিমদের সামনে নতি স্বীকার করে, সকল-কিছুর উদ্ভাবন ও আবিষ্কার এবং শিল্প ঘটতে থাকে মুসলিমদের কেন্দ্র করে, খ্যাতিমান ও সুদক্ষ নাবিকদের ব্যবহার করতে থাকে সামুদ্রিক প্রয়োজনে, নৌপথে যুদ্ধ পরিচালনা ও বাণিজ্যিক আমদানি-রপ্তানির ব্যাপক ব্যবহার ঘটতে থাকে, নৌ-বিদ্যা ও চর্চায় উৎকর্ষ হতে থাকে তখন মুসলিমগণ পরিপক্ব নাবিক তৈরিতে মনোনিবেশ করেন, নৌপথে জিহাদ পরিচালনায় মনোযোগ দেন, বড় বড় নৌযান ও রণতরী তৈরি করেন। সামুদ্রিক অভিযানের জন্য নৌবাহিনী ও বিশেষ অস্ত্রে সজ্জিত নৌবহর উদ্ভাবন করেন। সমুদ্রপথে অভিযানের জন্য সাগরপাড়ের যোদ্ধা ও সৈন্যরাই নৌবহরকে যাত্রার মাধ্যমরূপে ব্যবহার করেন। সিরিয়া, আফ্রিকা, মরক্কো, স্পেন ইত্যাদি সমুদ্রবর্তী অঞ্চল এবং উপকূলে বাস করা বিজ্ঞ যোদ্ধারাই বিশেষত কাজটি আঞ্জাম দেন। (৩৭২)

মুসলিমদের পরিচালিত প্রথম নৌ অভিযানগুলো ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। কুবরুস অভিযান এবং ৩৪ হি./৬৫৪ খ্রিষ্টাব্দে পরিচালিত 'যাতুস সাওয়ারি' অভিযান মুসলিমদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। এই অভিযানগুলোর পর নৌ ইতিহাসের গতি পালটে যায়, ভূমধ্যসাগরের পুরো নিয়ন্ত্রণ ও অধিকার মুসলিমদের হাতে চলে আসে। পৃথিবীর বুকে মুসলিম নৌবাহিনী নতুন এক অদম্য পরাশক্তিরূপে আত্মপ্রকাশ করে। যে ভূমধ্যসাগরকে সবাই ‘রোম সাগর’ বা ‘রোম উপসাগর’ নামে চিনত, এরপর থেকে তার নাম হয়ে যায় ‘ইসলামি উপসাগর’। এরপর মুসলিমগণ যখন স্পেন বিজয় করেন, তখন এই অঞ্চলের সমুদ্রসীমায় মুসলিম নৌবাহিনীর একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। যার ফলে সিরিয়া, মিশর, পশ্চিমে স্পেনের নৌপথগুলো মুসলিমদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ হয়ে ওঠে।

জলযান তৈরি
যখন থেকে মুসলিমগণ সামুদ্রিক অভিযানের গুরুত্ব অনুধাবন করেন, বিশেষত ‘যাতুস সাওয়ারি' (Battle of the Masts) অভিযানে বিজয় অর্জন করেন, তখন থেকেই তারা নানাপ্রকার যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ কারখানা তৈরি শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ৫৪ হি./৬৭৪ খ্রিষ্টাব্দে মিশরের ‘আর-রাওযা’ দ্বীপে প্রথম যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের জন্য বিশেষ কারখানা তৈরি করে তার নাম দেওয়া হয় دَارُ الصَّنَاعَةِ। তেমনই বিশেষ রণতরী নির্মাণের জন্য সিরিয়ার ভূমধ্যসাগর আক্কা (বর্তমানে এটি ভূমধ্যসাগর ও ফিলিস্তিনের উত্তর বা পশ্চিমাংশে ও বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে ১৮১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত) এবং সুর অঞ্চলেও কারখানা নির্মিত হয়। এরপর একে একে আফ্রিকা এবং স্পেনেও এরকম বহু কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। সুলতান আবদুর রহমান নাসিরের শাসনামলে স্পেনের নৌবহরে যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা দুইশতে গিয়ে পৌঁছে। আফ্রিকার নৌবহরেও প্রায় সমান সংখ্যক রণতরী যুক্ত হয়। (৩৭৩)

যুদ্ধের নৌবহর নির্মাণের পাশাপাশি বাণিজ্যিক নৌবহর তৈরিতেও মনোযোগ দেন মুসলিমগণ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অঙ্গনে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মুসলিমগণ পশ্চিম ও দক্ষিণের সামুদ্রিক অঞ্চলে বাণিজ্যিক যাতায়াত বৃদ্ধি করেন। সমুদ্র ও নৌপথের প্রয়োজন বুঝে নানা ধরনের ইসলামি বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজ নির্মিত হতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় মুসলিমগণ একে একে তৈরি করেন শাওনা, হারবাকা, (এক প্রকার জাহাজ, যাতে অগ্নি নিক্ষেপের অনেকগুলো জায়গা থাকত, যেগুলো থেকে সমুদ্রে শত্রু পক্ষকে অগ্নি নিক্ষেপ করা হতো), বাতসা, গুরার, শালানদিয়া, হামমালা, তরিদা। একেকটির ধরণ, প্রকৃতি ও গতি ছিল একেকরকম। الشونة (শাওনা) নামক রণতরী ছিল আকারে সবচেয়ে বিশাল। তাতে ভারী অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং সেনাবাহিনী অবস্থান করত। সবচেয়ে ছোট নৌযান ছিল الطريدة (তরিদা) যা দ্রুত চলাচল করত। আর সামুদ্রিক অভিযানে ব্যবহৃত বিশেষ অস্ত্রের মধ্যে ছিল کلالیب (কালালিব), যাতুস সাওয়ারি অভিযানে মুসলিমগণ তাদের রণতরীগুলো রোমানদের যুদ্ধজাহাজের সঙ্গে বেঁধে রাখার কাজে ব্যবহার করেন। তা ছাড়া মুসলিমগণ النقاطة (নাফফাতা) নামক দাহ্য পদার্থ মিশ্রিত বিশেষ এক ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করতেন। জাহাজের সম্মুখভাবে একটি খুঁটি স্থাপিত হতো, সেখান থেকে গোলা নিক্ষেপ করা হতো। একে গ্রিক আগুন নামেও ডাকা হতো। উপর্যুক্ত এ যুদ্ধাস্ত্র ও সরঞ্জাম ব্যবহার হতো কেবল সামুদ্রিক অভিযানে। এ ছাড়াও স্থলপথে ব্যবহারের প্রচলিত অন্যান্য অস্ত্রও ছিল। (৩৭৪)

নৌশিল্পে মুসলিমদের যে বলিষ্ঠ ভূমিকা ও অসামান্য অবদান, এই বিষয়ে লেখা মুসলিম মনীষীদের গ্রন্থের তালিকা থেকেও বড় ধারণা পাওয়া যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলো হলো, আসাদুল বাহর তথা সমুদ্রের সিংহ খ্যাত ইবনে মাজেদের (মৃ. ৯০৪ হি./১৪৯৮ খ্রি.) লেখা الْفَوَائِدُ فِي حَاوِيَة أُصُولِ عِلْمِ الْبَحْرِ وَالْقَوَاعِدِ এবং রয়েছে مُعَلِّمُ الْبَحْرِ (সমুদ্রবিষয়ক শিক্ষক) খ্যাত সুলাইমান আল-মাহরি (মৃ. ৯৬১ হি./১৫৫৪ ختصار فِي أُصُولِ عِلْمِ الْبِحَارِ (৩৭৫)

তেমনই সমুদ্রবিষয়ক অভিধানও ইসলামি নৌ-পরিভাষায় ভরপুর, যা কালের পরিক্রমায় ইউরোপীয়রা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে Admiral শব্দটি মূলত أُمِيرُ الْبَحْرِ-এর পরিবর্তিত রূপ। Cable শব্দটি মূলত حَبْلٌ শব্দের পরিবর্তিত রূপ। Resif শব্দটি মূলত رَصِيفُ-এর পরিবর্তিত রূপ। এবং Darsinal শব্দটি মূলত دَارُ الصَّنَاعَةِ-এর পরিবর্তিত রূপ।

সামরিক চারিত্রিক নীতি যুদ্ধ এবং সচ্চরিত্রের মাঝে প্রথম মেলবন্ধন তৈরি করেছে মুসলিমজাতি। আর এ কথা জেনে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সামরিক নীতিতে কখনোই সমকালীন পারসিক ও রোমান সেনাবাহিনীর আচরণ অনুসরণ করেনি মুসলিম সেনাবাহিনী। কোনো সন্দেহ নেই, বিশ্বমানবতার জন্য ইসলামি সভ্যতার এ এক বড় অবদান। ইসলাম সবসময় মানুষের অন্তর ও স্বভাব পরিবর্তনের ওপর জোর দেয়। সামরিক বা বেসামরিক সবার সঙ্গেই আচরণের ক্ষেত্রে মানবিক ও চারিত্রিক গুণাবলিকে অগ্রাধিকার দেয়।

সমকালীন রোম ও পারস্য সামরিক শক্তি, যুদ্ধ ইস্যুতে যে গণহারে রক্তপাত ও নির্বিচারে নিরপরাধ মানুষ হত্যার নীতি গ্রহণ করেছে, তাতারজাতি যেভাবে ছোট-बড়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষদের হত্যা করেছে, গর্ভবতী নারীর পেট ছিঁড়ে শিশুকে বের করে হত্যা করেছে, পশু হত্যায় নির্মমতার পরিচয় দিয়েছে এবং এ ছাড়া আরও অনেক নির্দয়, মর্মন্তুদ, পাশবিক ও অমানবিক ঘটনার জন্ম দিয়েছে, ইসলামি সভ্যতা শুরুশক্তিরূপে আত্মপ্রকাশ করে। যে ভূমধ্যসাগরকে সবাই ‘রোম সাগর’ বা ‘রোম উপসাগর’ নামে চিনত, এরপর থেকে তার নাম হয়ে যায় ‘ইসলামি উপসাগর’। এরপর মুসলিমগণ যখন স্পেন বিজয় করেন, তখন এই অঞ্চলের সমুদ্রসীমায় মুসলিম নৌবাহিনীর একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। যার ফলে সিরিয়া, মিশর, পশ্চিমে স্পেনের নৌপথগুলো মুসলিমদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ হয়ে ওঠে।

জলযান তৈরি
যখন থেকে মুসলিমগণ সামুদ্রিক অভিযানের গুরুত্ব অনুধাবন করেন, বিশেষত ‘যাতুস সাওয়ারি' (Battle of the Masts) অভিযানে বিজয় অর্জন করেন, তখন থেকেই তারা নানাপ্রকার যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ কারখানা তৈরি শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ৫৪ হি./৬৭৪ খ্রিষ্টাব্দে মিশরের ‘আর-রাওযা’ দ্বীপে প্রথম যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের জন্য বিশেষ কারখানা তৈরি করে তার নাম দেওয়া হয় دَارُ الصَّنَاعَةِ। তেমনই বিশেষ রণতরী নির্মাণের জন্য সিরিয়ার ভূমধ্যসাগর আক্কা (বর্তমানে এটি ভূমধ্যসাগর ও ফিলিস্তিনের উত্তর বা পশ্চিমাংশে ও বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে ১৮১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত) এবং সুর অঞ্চলেও কারখানা নির্মিত হয়। এরপর একে একে আফ্রিকা এবং স্পেনেও এরকম বহু কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। সুলতান আবদুর রহমান নাসিরের শাসনামলে স্পেনের নৌবহরে যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা দুইশতে গিয়ে পৌঁছে। আফ্রিকার নৌবহরেও প্রায় সমান সংখ্যক রণতরী যুক্ত হয়। (৩৭৩)

যুদ্ধের নৌবহর নির্মাণের পাশাপাশি বাণিজ্যিক নৌবহর তৈরিতেও মনোযোগ দেন মুসলিমগণ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অঙ্গনে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মুসলিমগণ পশ্চিম ও দক্ষিণের সামুদ্রিক অঞ্চলে বাণিজ্যিক যাতায়াত বৃদ্ধি করেন। সমুদ্র ও নৌপথের প্রয়োজন বুঝে নানা ধরনের ইসলামি বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজ নির্মিত হতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় মুসলিমগণ একে একে তৈরি করেন শাওনা, হারবাকা, (এক প্রকার জাহাজ, যাতে অগ্নি নিক্ষেপের অনেকগুলো জায়গা থাকত, যেগুলো থেকে সমুদ্রে শত্রু পক্ষকে অগ্নি নিক্ষেপ করা হতো), বাতসা, গুরার, শালানদিয়া, হামমালা, তরিদা। একেকটির ধরণ, প্রকৃতি ও গতি ছিল একেকরকম। الشونة )শাওনা) নামক রণতরী ছিল আকারে সবচেয়ে বিশাল। তাতে ভারী অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং সেনাবাহিনী অবস্থান করত। সবচেয়ে ছোট নৌযান ছিল الطريدة )তরিদা) যা দ্রুত চলাচল করত। আর সামুদ্রিক অভিযানে ব্যবহৃত বিশেষ অস্ত্রের মধ্যে ছিল کلالیب )কালালিব(, যাতুস সাওয়ারি অভিযানে মুসলিমগণ তাদের রণতরীগুলো রোমানদের যুদ্ধজাহাজের সঙ্গে বেঁধে রাখার কাজে ব্যবহার করেন। তা ছাড়া মুসলিমগণ النقاطة )নাফফাতা) নামক দাহ্য পদার্থ মিশ্রিত বিশেষ এক ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করতেন। জাহাজের সম্মুখভাবে একটি খুঁটি স্থাপিত হতো, সেখান থেকে গোলা নিক্ষেপ করা হতো। একে গ্রিক আগুন নামেও ডাকা হতো। উপর্যুক্ত এ যুদ্ধাস্ত্র ও সরঞ্জাম ব্যবহার হতো কেবল সামুদ্রিক অভিযানে। এ ছাড়াও স্থলপথে ব্যবহারের প্রচলিত অন্যান্য অস্ত্রও ছিল। (৩৭৪)

নৌশিল্পে মুসলিমদের যে বলিষ্ঠ ভূমিকা ও অসামান্য অবদান, এই বিষয়ে লেখা মুসলিম মনীষীদের গ্রন্থের তালিকা থেকেও বড় ধারণা পাওয়া যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলো হলো, আসাদুল বাহর তথা সমুদ্রের সিংহ খ্যাত ইবনে মাজেদের (মৃ. ৯০৪ হি./১৪৯৮ খ্রি.) লেখা الْفَوَائِدُ فِي حَاوِيَة أُصُولِ عِلْمِ الْبَحْرِ وَالْقَوَاعِدِ এবং রয়েছে مُعَلِّمُ الْبَحْرِ (সমুদ্রবিষয়ক শিক্ষক) খ্যাত সুলাইমান আল-মাহরি (মৃ. ৯৬১ হি./১৫৫৪ খ্রি.) রচিত দুটি গ্রন্থ : আল-মিনহাজুল ফাখির ফি ইলমিল বাহরিয যাখির এবং আল-উমদাতুল মাহরিয়‍্যা ফি যাবতিল উলুমিল রাহরিয়‍্যা। (৩৭৬) (৩৭৫)

তেমনই সমুদ্রবিষয়ক অভিধানও ইসলামি নৌ-পরিভাষায় ভরপুর, যা কালের পরিক্রমায় ইউরোপীয়রা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে Admiral শব্দটি মূলত أُمِيرُ الْبَحْرِ-এর পরিবর্তিত রূপ। Cable শব্দটি মূলত حَبْلٌ শব্দের পরিবর্তিত রূপ। Resif শব্দটি মূলত رَصِيفُ-এর পরিবর্তিত রূপ। এবং Darsinal শব্দটি মূলত دَارُ الصَّنَاعَةِ-এর পরিবর্তিত রূপ।

সামরিক চারিত্রিক নীতি যুদ্ধ এবং সচ্চরিত্রের মাঝে প্রথম মেলবন্ধন তৈরি করেছে মুসলিমজাতি। আর এ কথা জেনে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সামরিক নীতিতে কখনোই সমকালীন পারসিক ও রোমান সেনাবাহিনীর আচরণ অনুসরণ করেনি মুসলিম সেনাবাহিনী। কোনো সন্দেহ নেই, বিশ্বমানবতার জন্য ইসলামি সভ্যতার এ এক বড় অবদান। ইসলাম সবসময় মানুষের অন্তর ও স্বভাব পরিবর্তনের ওপর জোর দেয়। সামরিক বা বেসামরিক সবার সঙ্গেই আচরণের ক্ষেত্রে মানবিক ও চারিত্রিক গুণাবলিকে অগ্রাধিকার দেয়।

সমকালীন রোম ও পারস্য সামরিক শক্তি, যুদ্ধ ইস্যুতে যে গণহারে রক্তপাত ও নির্বিচারে নিরপরাধ মানুষ হত্যার নীতি গ্রহণ করেছে, তাতারজাতি যেভাবে ছোট-বড়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষদের হত্যা করেছে, গর্ভবতী নারীর পেট ছিঁড়ে শিশুকে বের করে হত্যা করেছে, পশু হত্যায় নির্মমতার পরিচয় দিয়েছে এবং এ ছাড়া আরও অনেক নির্দয়, মর্মন্তুদ, পাশবিক ও অমানবিক ঘটনার জন্ম দিয়েছে, ইসলামি সভ্যতা শুরু থেকেই সেই নীতি বর্জন করে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের নজির স্থাপন করে ধর্মের প্রচার-প্রসার ঘটিয়েছে।

এ কারণেই আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধ বিষয়ে তাঁর সঙ্গীদের দিক-নির্দেশনা দিতে গিয়ে বলেছেন, لَا تَتَمَنَّوْا لِقَاءَ الْعَدُوِّ، وَسَلُوا اللَّهَ الْعَافِيَةَ শত্রুুদের মুখোমুখি হয়ে রক্তপাত ঘটানোর প্রত্যাশা করো না, আল্লাহর কাছে মুক্তি কামনা করো। (৩৭৭)

কুরআনুল কারিম এবং সুন্নাতে নববির আলোকে চারিত্রিক শিক্ষা ও যে স্বভাবের ওপর একজন মুসলিম বেড়ে ওঠে, সেই স্বভাব হত্যা, খুন, রাহাজানিকে ঘৃণা করে। আগ বেড়ে কখনোই অন্যকে সে হত্যা করতে যায় না। মানবতার কল্যাণ সাধনে সবসময় সে চায় যথাসম্ভব যুদ্ধ ও খুনাখুনি এড়িয়ে যেতে।

এ কারনেই আমরা দেখতে পাই, যুদ্ধক্ষেত্রে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ন্যায়পরায়ণতা ছিল এই যে, কেবল লড়াই করতে আসা যোদ্ধাদেরকেই হত্যা করতেন। যুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকা নিরপরাধ মানুষদের তিনি হত্যা করতেন না। ষষ্ঠ হিজরির শাবান মাসে দুমাতুল জান্দাল এলাকায় বাস করা খ্রিষ্টান কালব গোত্রের উদ্দেশে আবদুর রহমান ইবনে আওফ রা.-কে পাঠানোর সময় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ওসিয়ত করেন,

اغْزُوا جَمِيعًا فِي سَبِيلِ اللَّهِ، فَقَاتِلُوا مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ، لَا تَغُلُوْا، وَلَا تَغْدِرُوْا، وَلَا تُمَثَّلُوْا، وَلَا تَقْتُلُوا وَلِيْدًا

তোমরা সকলেই আল্লাহর পথে সংগ্রাম করবে। যারা আল্লাহর প্রতি কুফরি লালন করে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। তবে যুদ্ধে কিছু চুরি বা দুর্নীতি করবে না। বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। লাশ বিকৃত করবে না। নবজাতক শিশুকে হত্যা করবে না। (৩৭৮)

অমুসলিমদের বিরুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর সংঘটিত প্রতিটি যুদ্ধে এসব নীতিই ছিল মুসলিমদের প্রধান সমরনীতি। ইসলামের যুগে সংঘটিত যুদ্ধসমূহের বৈশিষ্ট্য হলো, মুসলিমদের যুদ্ধগুলোতে রক্তপাত এড়িয়ে যাওয়ার হার অন্যসব জাতি-গোষ্ঠীর যুদ্ধসমূহ থেকে বহুগুণ বেশি। মুসলিম সেনাপতিগণ সবসময় সম্মুখ লড়াই এড়িয়ে মানুষের জীবন রক্ষা করার সুযোগ খুঁজতেন। এ বিষয়ে তাদের আদর্শ হলেন রাসুল আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় যতটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, সবকটি যুদ্ধে মুসলিম- অমুসলিম নিহতের সংখ্যা হিসাব করে বর্তমান সময়ে সংঘটিত যুদ্ধগুলোর সঙ্গে এর তুলনা করলে বড় বিস্ময়কর ফল বেরিয়ে আসে।

মদিনায় হিজরত করার পর দশ বছর যাবৎ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেসব যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন, তাতে মুসলিমদের মধ্যে সর্বমোট শহিদ হন ২৬২ জন এবং শত্রুপক্ষের নিহত হয় ১০২২ জন। এই পরিসংখ্যান বের করতে গিয়ে যেসব নিহত হওয়ার ঘটনা রণক্ষেত্রে নয়, শুধু বিচ্ছিন্নভাবে সংঘটিত হয়েছে সেগুলোকেও আমি অন্তর্ভুক্ত করেছি। তুলনামূলক আকর্ষণীয় ফলাফল বের করতে ও ন্যূনতম পরিসংখ্যান তুলে ধরার জন্য অনেকে দুর্বল ও অনির্ভরযোগ্য বর্ণনা উল্লেখ করে থাকেন, (৩৭৯) তা না করে আমি শুধু নির্ভরযোগ্য সূত্র ঘেঁটেই এই পরিসংখ্যান বের করেছি। (৩৮০)

এভাবে মহানবীর জীবদ্দশায় সকল যুদ্ধে মুসলিম-অমুসলিম উভয় পক্ষের সর্বমোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১২৮৪ জনে।

নিহতের সংখ্যা কম হওয়ার কারণ হিসেবে অনেকে বলতে পারেন যে, সৈনিকদের সংখ্যা তখন কম ছিল। তাই নিহতও কম হয়েছে। এটা বের করতে গিয়ে আমি ওই দশ বছরে সংঘটিত সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা সৈনিকদের সংখ্যা গণনা করি। এরপর ওই সংখ্যা থেকে নিহতের শতকরা হার দেখে অবাক হয়ে যাই। দেখি মুসলিমদের মধ্যে শতকরা এক ভাগ নিহত হয়েছেন। আর শত্রুপক্ষের নিহত হয়েছে শতকরা দুই ভাগ। তাহলে উভয় পক্ষ মিলিয়ে গড়ে নিহত হয়েছে মাত্র ১.৫%!!

পঁচিশ কি সাতাশটির মতো যুদ্ধে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে অংশগ্রহণ করেছেন এবং ৩৮টি যুদ্ধে তিনি নিজে অংশগ্রহণ না করে সৈনিকদের প্রস্তুত করে অভিযানে পাঠিয়েছেন। সব মিলে মোট যুদ্ধাভিযানের সংখ্যা ৬৩টি। এতগুলো যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা মাত্র ১.৫%?!! এতেই বোঝা যায়, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে যে যুদ্ধগুলো সংঘটিত হয়েছে, তাতে রক্তপাত ও খুনাখুনির হার ছিল অনেক কম। মুসলিমগণ যুদ্ধ এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধান বের করে মানুষের জীবন সুরক্ষার বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিতেন।

বর্তমান সময়ে যতগুলো সভ্যতার কথা আমরা জানি, সেসব সভ্যতার মাঝে সংঘটিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহতের সংখ্যার দিকে যদি আমরা তাকাই, বিশেষ করে তাতে অংশগ্রহণ করা যেসব দেশ এখনো নিজেদের সভ্যতার ধ্বজাধারী বলে দাবি করে এবং কথায় কথায় মানবাধিকারের বুলি আওড়ায়, এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা সৈনিকদের সংখ্যার সঙ্গে নিহতের সংখ্যা তুলনা করি তাহলে আমরা হতবাক হয়ে যাই। সভ্যতার এই যুদ্ধে নিহতের সহস্রাংশের হার ছিল ৩৫১%!!

এ পরিসংখ্যান মিথ্যা নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়া সেনাদের মোট সংখ্যা ছিল ১৫,৬০০,০০০ (এক কোটি ছাপ্পান্ন লাখ)। কিন্তু এই যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ছিল ৫৪,৮০০,০০০ (পাঁচ কোটি আটচল্লিশ লাখ) মানুষ। অর্থাৎ সেনাবাহিনীর সংখ্যার চেয়ে আরও তিন গুণ বেশি মানুষ নিহত হয়। নিহতের সংখ্যা বেশি হওয়ার পেছনে মূল কারণ ছিল, প্রতিটি সেনাদল নিরপরাধ বেসামরিক মানুষদের নির্বিচারে হত্যা করেছে। হাজার হাজার টন বোমা ও বিস্ফোরক তারা বিভিন্ন শহর ও জনবসতির ওপর নিক্ষেপ করে মানুষের বাড়িঘর ধ্বংস করে, অর্থনৈতিকভাবে তাদের পঙ্গু করে এবং সাধারণ মানুষদের দেশান্তর করে জাতিগতভাবে তাদের নির্মূল করার অপপ্রয়াস চালিয়েছে।

কোনো সন্দেহ নেই, সব দিক থেকেই এটি ছিল চরম মানবিক বিপর্যয়। আর সেই যুদ্ধে প্রধান ভূমিকায় থাকা জাতি-গোষ্ঠীগুলোই ছিল তৎকালীন উন্নত সভ্যতার দাবিদার। যেমন ফ্রান্স, আমেরিকা, সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, জার্মানি, ইতালি, জাপান।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইনতেকালের পর মুসলিমগণ তাঁর দেখানো পথেই হাঁটেন। তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। মহানবীর আদর্শের ওপর অবিচল থাকার ব্যাপারে সবচেয়ে কঠোর সাহাবি সিদ্দিকে আকবর রা. শাম অভিযানে বের হওয়া সেনাবাহিনীর উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেন, তোমরা নৈরাজ্য সৃষ্টি করো না। এ কথাটির মাধ্যমে প্রশংসাযোগ্য সকল কর্ম সম্পাদনের নির্দেশ দিয়েছেন। এ কথার মাধ্যমে তিনি সকল প্রকার নির্যাতন, নিপীড়ন, অত্যাচার ও সীমালঙ্ঘন থেকে সৈনিকদের সাবধান করে দেন। উক্ত ভাষণে তিনি আরও বলেন, وَلَا تُغْرِ থেকেই সেই নীতি বর্জন করে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের নজির স্থাপন করে ধর্মের প্রচার-প্রসার ঘটিয়েছে।

এ কারণেই আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধ বিষয়ে তাঁর সঙ্গীদের দিক-নির্দেশনা দিতে গিয়ে বলেছেন, لَا تَتَمَنَّوْا لِقَاءَ الْعَدُوِّ، وَسَلُوا اللَّهَ الْعَافِيَةَ

শত্রুদের মুখোমুখি হয়ে রক্তপাত ঘটানোর প্রত্যাশা করো না, আল্লাহর কাছে মুক্তি কামনা করো। (৩৭৭)

কুরআনুল কারিম এবং সুন্নাতে নববির আলোকে চারিত্রিক শিক্ষা ও যে স্বভাবের ওপর একজন মুসলিম বেড়ে ওঠে, সেই স্বভাব হত্যা, খুন, রাহাজানিকে ঘৃণা করে। আগ বেড়ে কখনোই অন্যকে সে হত্যা করতে যায় না। মানবতার কল্যাণ সাধনে সবসময় সে চায় যথাসম্ভব যুদ্ধ ও খুনাখুনি এড়িয়ে যেতে।

এ কারনেই আমরা দেখতে পাই, যুদ্ধক্ষেত্রে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ন্যায়পরায়ণতা ছিল এই যে, কেবল লড়াই করতে আসা যোদ্ধাদেরকেই হত্যা করতেন। যুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকা নিরপরাধ মানুষদের তিনি হত্যা করতেন না। ষষ্ঠ হিজরির শাবান মাসে দুমাতুল জান্দাল এলাকায় বাস করা খ্রিষ্টান কালব গোত্রের উদ্দেশে আবদুর রহমান ইবনে আওফ রা.-কে পাঠানোর সময় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ওসিয়ত করেন,

اغْزُوا جَمِيعًا فِي سَبِيلِ اللَّهِ، فَقَاتِلُوا مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ، لَا تَغُلُوْا، وَلَا تَغْدِرُوْا، وَلَا تُمَثَّلُوْا، وَلَا تَقْتُلُوا وَلِيْدًا

তোমরা সকলেই আল্লাহর পথে সংগ্রাম করবে। যারা আল্লাহর প্রতি কুফরি লালন করে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। তবে যুদ্ধে কিছু চুরি বা দুর্নীতি করবে না। বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। লাশ বিকৃত করবে না। নবজাতক শিশুকে হত্যা করবে না। (৩৭৮)

অমুসলিমদের বিরুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর সংঘটিত প্রতিটি যুদ্ধে এসব নীতিই ছিল মুসলিমদের প্রধান সমরনীতি। ইসলামের যুগে সংঘটিত যুদ্ধসমূহের বৈশিষ্ট্য হলো, মুসলিমদের যুদ্ধগুলোতে রক্তপাত এড়িয়ে যাওয়ার হার অন্যসব জাতি-গোষ্ঠীর যুদ্ধসমূহ থেকে বহুগুণ বেশি। মুসলিম সেনাপতিগণ সবসময় সম্মুখ লড়াই এড়িয়ে মানুষের জীবন রক্ষা করার সুযোগ খুঁজতেন। এ বিষয়ে তাদের আদর্শ হলেন রাসুল আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় যতটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, সবকটি যুদ্ধে মুসলিম- অমুসলিম নিহতের সংখ্যা হিসাব করে বর্তমান সময়ে সংঘটিত যুদ্ধগুলোর সঙ্গে এর তুলনা করলে বড় বিস্ময়কর ফল বেরিয়ে আসে।

মদিনায় হিজরত করার পর দশ বছর যাবৎ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেসব যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন, তাতে মুসলিমদের মধ্যে সর্বমোট শহিদ হন ২৬২ জন এবং শত্রুপক্ষের নিহত হয় ১০২২ জন। এই পরিসংখ্যান বের করতে গিয়ে যেসব নিহত হওয়ার ঘটনা রণক্ষেত্রে নয়, শুধু বিচ্ছিন্নভাবে সংঘটিত হয়েছে সেগুলোকেও আমি অন্তর্ভুক্ত করেছি। তুলনামূলক আকর্ষণীয় ফলাফল বের করতে ও ন্যূনতম পরিসংখ্যান তুলে ধরার জন্য অনেকে দুর্বল ও অনির্ভরযোগ্য বর্ণনা উল্লেখ করে থাকেন, (৩৭৯) তা না করে আমি শুধু নির্ভরযোগ্য সূত্র ঘেঁটেই এই পরিসংখ্যান বের করেছি। (৩৮০)

এভাবে মহানবীর জীবদ্দশায় সকল যুদ্ধে মুসলিম-অমুসলিম উভয় পক্ষের সর্বমোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১২৮৪ জনে।

নিহতের সংখ্যা কম হওয়ার কারণ হিসেবে অনেকে বলতে পারেন যে, সৈনিকদের সংখ্যা তখন কম ছিল। তাই নিহতও কম হয়েছে। এটা বের করতে গিয়ে আমি ওই দশ বছরে সংঘটিত সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা সৈনিকদের সংখ্যা গণনা করি। এরপর ওই সংখ্যা থেকে নিহতের শতকরা হার দেখে অবাক হয়ে যাই। দেখি মুসলিমদের মধ্যে শতকরা এক ভাগ নিহত হয়েছেন। আর শত্রুপক্ষের নিহত হয়েছে শতকরা দুই ভাগ। তাহলে উভয় পক্ষ মিলিয়ে গড়ে নিহত হয়েছে মাত্র ১.৫%!!

পঁচিশ কি সাতাশটির মতো যুদ্ধে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে অংশগ্রহণ করেছেন এবং ৩৮টি যুদ্ধে তিনি নিজে অংশগ্রহণ না করে সৈনিকদের প্রস্তুত করে অভিযানে পাঠিয়েছেন। সব মিলে মোট যুদ্ধাভিযানের সংখ্যা ৬৩টি। এতগুলো যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা মাত্র ১.৫%?!! এতেই বোঝা যায়, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে যে যুদ্ধগুলো সংঘটিত হয়েছে, তাতে রক্তপাত ও খুনাখুনির হার ছিল অনেক কম। মুসলিমগণ যুদ্ধ এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধান বের করে মানুষের জীবন সুরক্ষার বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিতেন।

বর্তমান সময়ে যতগুলো সভ্যতার কথা আমরা জানি, সেসব সভ্যতার মাঝে সংঘটিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহতের সংখ্যার দিকে যদি আমরা তাকাই, বিশেষ করে তাতে অংশগ্রহণ করা যেসব দেশ এখনো নিজেদের সভ্যতার ধ্বজাধারী বলে দাবি করে এবং কথায় কথায় মানবাধিকারের বুলি আওড়ায়, এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা সৈনিকদের সংখ্যার সঙ্গে নিহতের সংখ্যা তুলনা করি তাহলে আমরা হতবাক হয়ে যাই। সভ্যতার এই যুদ্ধে নিহতের সহস্রাংশের হার ছিল ৩৫১%!!

এ পরিসংখ্যান মিথ্যা নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়া সেনাদের মোট সংখ্যা ছিল ১৫,৬০০,০০০ (এক কোটি ছাপ্পান্ন লাখ)। কিন্তু এই যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ছিল ৫৪,৮০০,০০০ (পাঁচ কোটি আটচল্লিশ লাখ) মানুষ। অর্থাৎ সেনাবাহিনীর সংখ্যার চেয়ে আরও তিন গুণ বেশি মানুষ নিহত হয়। নিহতের সংখ্যা বেশি হওয়ার পেছনে মূল কারণ ছিল, প্রতিটি সেনাদল নিরপরাধ বেসামরিক মানুষদের নির্বিচারে হত্যা করেছে। হাজার হাজার টন বোমা ও বিস্ফোরক তারা বিভিন্ন শহর ও জনবসতির ওপর নিক্ষেপ করে মানুষের বাড়িঘর ধ্বংস করে, অর্থনৈতিকভাবে তাদের পঙ্গু করে এবং সাধারণ মানুষদের দেশান্তর করে জাতিগতভাবে তাদের নির্মূল করার অপপ্রয়াস চালিয়েছে।

কোনো সন্দেহ নেই, সব দিক থেকেই এটি ছিল চরম মানবিক বিপর্যয়। আর সেই যুদ্ধে প্রধান ভূমিকায় থাকা জাতি-গোষ্ঠীগুলোই ছিল তৎকালীন উন্নত সভ্যতার দাবিদার। যেমন ফ্রান্স, আমেরিকা, সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, জার্মানি, ইতালি, জাপান।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইনতেকালের পর মুসলিমগণ তাঁর দেখানো পথেই হাঁটেন। তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। মহানবীর আদর্শের ওপর অবিচল থাকার ব্যাপারে সবচেয়ে কঠোর সাহাবি সিদ্দিকে আকবর রা. শাম অভিযানে বের হওয়া সেনাবাহিনীর উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেন, তোমরা নৈরাজ্য সৃষ্টি করো না। এ কথাটির মাধ্যমে প্রশংসাযোগ্য সকল কর্ম সম্পাদনের নির্দেশ দিয়েছেন। এ কথার মাধ্যমে তিনি সকল প্রকার নির্যাতন, নিপীড়ন, অত্যাচার ও সীমালঙ্ঘন থেকে সৈনিকদের সাবধান করে দেন। উক্ত ভাষণে তিনি আরও বলেন, وَلَا تُغْرِقُنَّ نَخْلًا وَلَا تَحْرِقُنَّهَا، وَلَا تَعْقِرُوا بَهِيمَةً، وَلَا شَجَرَةً تُثْمِرُ، وَلَا تَهْدِمُوا بَيْعَةً ....

কখনো কোনো খেজুরগাছ তোমরা নষ্ট করবে না। বৃক্ষে আগুন দেবে না। যৌক্তিক কারণ ব্যতীত কোনো পশু হত্যা করবে না। ফলদায়ক কোনো গাছ তোমরা বিনষ্ট করবে না। কোনো গির্জা বা উপাসনালয় ধ্বংস করবে না। (৩৮১)

এসব বিবরণ বিশৃঙ্খলা না করার মর্মে আবু বকর রা.-এর প্রদত্ত ওসিয়তের উদ্দেশ্যকে সুস্পষ্ট করেছে যাতে কোনো সেনাপতি এ কথা ভাবতে না পারে যে, প্রতিপক্ষের সাথে শত্রুতাস্বরূপ কিছু বিশৃঙ্খলা করা যেতে পারে। কারণ যাবতীয় বিশৃঙ্খলা ইসলামে বর্জনীয়।

যুদ্ধে সেনাবাহিনী পাঠানোর সময় দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রা. প্রথমেই সৈনিকদের তাকওয়ার উপদেশ দিতেন। প্রতিটি কাজ ও পদক্ষেপে আল্লাহর নির্দেশ লঙ্ঘন হয়ে যাচ্ছে কি না অন্তরে এ ভয় লালন করার ওপর গুরুত্বারোপ করতেন। এরপর মুসলিম বাহিনীর অগ্রভাগে সেনাপতির অবস্থান নির্দেশক ঝান্ডা বেঁধে দেওয়ার সময় বলতেন, بسم الله وعلى عون الله، وامضوا بتأييد الله بالنصر، وبلزوم الحق والصبر، فقاتلوا في سبيل الله من كفر بالله، ﴿وَلَا تَعْتَدُّوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ، لا تجبنوا عند اللقاء، ولا تمثلوا عند القدرة، ولا تسرفوا عند الظهور، ولا تقتلوا هرما ولا امرأة ولا وليدا، وتوقوا قتلهم إذا التقى الزحفان، وفي شن الغارات، ولا تغلوا عند الغنائم، ونزهوا الجهاد عن عرض الدنيا، وأبشروا بالرباح في البيع الذي بايعتم به، وذلك هو الفوز العظيم

আল্লাহর নাম নিয়ে ও তাঁর সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে শুরু করছি। বিজয়ের ব্যাপারে আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা রেখে এবং সত্য ও ধৈর্যের চেতনা লালন করে রওয়ানা করো। যারা আল্লাহর প্রতি কুফরি লালন করে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। আর কখনো সীমালঙ্ঘন করবে না। নিশ্চয় মহান আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না। (৩৮২)قُنَّ نَخْلًا وَلَا تَحْرِقُنَّهَا، وَلَا تَعْقِرُوا بَهِيمَةً، وَلَا شَجَرَةً تُثْمِرُ، وَلَا تَهْدِمُوا بَيْعَةً ....
কখনো কোনো খেজুরগাছ তোমরা নষ্ট করবে না। বৃক্ষে আগুন দেবে না। যৌক্তিক কারণ ব্যতীত কোনো পশু হত্যা করবে না। ফলদায়ক কোনো গাছ তোমরা বিনষ্ট করবে না। কোনো গির্জা বা উপাসনালয় ধ্বংস করবে না। (৩৮১)

এসব বিবরণ বিশৃঙ্খলা না করার মর্মে আবু বকর রা.-এর প্রদত্ত ওসিয়তের উদ্দেশ্যকে সুস্পষ্ট করেছে যাতে কোনো সেনাপতি এ কথা ভাবতে না পারে যে, প্রতিপক্ষের সাথে শত্রুতাস্বরূপ কিছু বিশৃঙ্খলা করা যেতে পারে। কারণ যাবতীয় বিশৃঙ্খলা ইসলামে বর্জনীয়।

যুদ্ধে সেনাবাহিনী পাঠানোর সময় দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রা. প্রথমেই সৈনিকদের তাকওয়ার উপদেশ দিতেন। প্রতিটি কাজ ও পদক্ষেপে আল্লাহর নির্দেশ লঙ্ঘন হয়ে যাচ্ছে কি না অন্তরে এ ভয় লালন করার ওপর গুরুত্বারোপ করতেন। এরপর মুসলিম বাহিনীর অগ্রভাগে সেনাপতির অবস্থান নির্দেশক ঝান্ডা বেঁধে দেওয়ার সময় বলতেন, بسم الله وعلى عون الله، وامضوا بتأييد الله بالنصر، وبلزوم الحق والصبر، فقاتلوا في سبيل الله من كفر بالله، ﴿وَلَا تَعْتَدُّوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ، لا تجبنوا عند اللقاء، ولا تمثلوا عند القدرة، ولا تسرفوا عند الظهور، ولا تقتلوا هرما ولا امرأة ولا وليدا، وتوقوا قتلهم إذا التقى الزحفان، وفي شن الغارات، ولا تغلوا عند الغنائم، ونزهوا الجهاد عن عرض الدنيا، وأبشروا بالرباح في البيع الذي بايعتم به، وذلك هو الفوز العظيم
আল্লাহর নাম নিয়ে ও তাঁর সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে শুরু করছি। বিজয়ের ব্যাপারে আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা রেখে এবং সত্য ও ধৈর্যের চেতনা লালন করে রওয়ানা করো। যারা আল্লাহর প্রতি কুফরি লালন করে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। আর কখনো সীমালঙ্ঘন করবে না। নিশ্চয় মহান আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না। (৩৮২) রণাঙ্গনে শত্রুদের মুখোমুখি হওয়ার পর কাপুরুষতা দেখাবে না। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও লাশ বিকৃত করবে না। বিজয়ের মুহূর্তেও সীমালঙ্ঘন করবে না। বৃদ্ধ, নারী ও নবজাতককে হত্যা করবে না। তাদের হত্যা থেকে বিরত থাকবে রণাঙ্গনে শত্রুদের মুখোমুখি হওয়ার সময় এবং আক্রমণ করার মুহূর্তে। যুদ্ধলব্ধ সম্পদে চুরি, দুর্নীতি করবে না। জিহাদের মতো মহান ইবাদতকে তোমরা পার্থিব হীন উদ্দেশ্য থেকে পবিত্র রাখবে এবং আল্লাহর সঙ্গে যে লেনদেন হয়েছে তার সুফল ও চিরস্থায়ী লাভের সুসংবাদ গ্রহণ করো। এটিই তো মহা সাফল্য। (৩৮৩)

যুদ্ধে অংশগ্রহণ হোক বা শান্তিপূর্ণ সমাধান, সব ক্ষেত্রেই ইসলাম ও তার সভ্যতা উন্নত চরিত্র অবলম্বনের যে বাস্তব প্রতিফলন দেখিয়েছে, এর মাধ্যমে ফুটে উঠেছে, ইসলামি সভ্যতা নামক বৃক্ষের শিকড় হলো উন্নত চরিত্র, কাণ্ড হলো দয়া, ডালপালা হলো ক্ষমা, ফল হলো ভ্রাতৃত্ব। কারণ অদম্য পরাশক্তি এবং বিশ্বমানচিত্রে সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরও ইসলাম কখনো বিধর্মী জাতি-গোষ্ঠীকে লাঞ্ছিত করেনি। কখনো তাদের প্রতি অবিচার প্রদর্শন করেনি। ইসলাম সবসময় তাদের বিশ্বাসকে সম্মান দিয়েছে। (তারা কুফরি বিশ্বাস লালন করা সত্ত্বেও তাদের বিশ্বাসে ইসলাম কোনো বাধা দেয়নি)। ইসলামি ভূখণ্ডে মুসলিম নাগরিকদের মতো তাদেরকেও অবাধ ও স্বাধীনভাবে বিচরণ করার সুযোগ দিয়েছে।

এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো, ক্রুসেডারদের দখল থেকে জেরুজালেম উদ্ধারকারী বিখ্যাত মুসলিম সেনাপতি সালাহুদ্দিন আইয়ুবি রহ.-এর আচরণ। ক্রুসেডার বন্দিদের ও সেনাপতিদের সঙ্গে তিনি যে ক্ষমা ও দয়ার আচরণ করেন, নিরপেক্ষ খ্রিষ্টান জ্ঞানী ও জাতি-গোষ্ঠী আজও তা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে থাকে।

টিকাঃ
৩৪১. আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামي, পৃ. ১৫০।
৩৪২. প্রাগুক্ত।
৩৪৩. আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামি, পৃ. ১৫৩।
৩৪৪. আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামি, পৃ. ১৫০-১৫১।
৩৪৫. সুরা সফ : ৪।
৩৪৬. কামাল আনানি ইসমাইল, দিরাসাত ফি তারিখিন নুযুমিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৬৭।
৩৪৭. আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামি, পৃ. ১৫৯।
৩৪৮. কামাল আনানি ইসমাইল, দিরাসাত ফি তারিখিন নুযুমিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৭২-১৭৭।
৩৪৯. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ৪, পৃ. ৩৯৯।
৩৫০. পুরো নাম মুহাম্মাদ ইবনে কাসিম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে হাকাম ইবনে আবু উকাইল আস-সাকাফি (৬২-৯৮ হি./৬৮১-৭১৭ খ্রি.) সিন্ধু এলাকার পার্শ্ববর্তী নগরগুলো বিজয় করে সেখানে ইসলামের সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পড়ুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৬, পৃ. ৩৩৪।
৩৫১. শাওকি আবু খলিল, আল-হাদারাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৩৬২।
৩৫২. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ১২, পৃ. ৪০৯।
৩৫৩. মাকরিযি, আস-সুলুক লি-মারিফাতি দুওয়ালিল মুলুক, খ. ৩, পৃ. ১০১।
৩৫৪. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ৭, পৃ. ১৮৮।
৩৫৫. কালকাশান্দি, সুবহুল আ'শা, খ. ২, পৃ. ১৫৩।
৩৫৬. ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা, খ. ৩, পৃ. ১০১।
৩৫৭. আবু রবি আন্দালুসি, আল-ইকতিফাউ বিমা তাযমানুহু মিন মাগাযি রাসুলিল্লাহ ওয়াস-সালাসাতিল খুলাফা, খ. ৩, পৃ. ৭।
৩৫৮. সুরা আলে-ইমরান: ১২৬।
৩৫৯. সুরা বাকারা: ১৯০।
৩৬০. ইবনে তাগরি বারদি, আন-নুযুমুয যাহিরা ফি মুলুকি মিসর ওয়াল-কাহিরা, খ. ১, পৃ. ৪।
৩৬১. সুরা আলে-ইমরান: ১০৩।
৩৬২. ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়‍্যা, খ. ১, পৃ. ২৬০; ইবনে কাসির, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৪০২; সুহাইলি, আর-রওযুল উনুফ, খ. ৩, পৃ. ৬২; তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ২, পৃ. ২৯।
৩৬৩. ইবনে কাসির, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা, খ. ৪, পৃ. ৬ (সামান্য পরিমার্জনসহ)।
৩৬৪. বুখারি, হাদিস নং ৪১২১।
৩৬৫. ইবনে তাগরি বারদি, আন-নুযুমুয যাহিরা ফি মুলুকি মিসর ওয়াল-কাহিরা, খ. ১, পৃ. ১১।
৩৬৬. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ২, পৃ. ৪১২।
৩৬৭. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি, আদ-দাওলাতুল উসমানিয়্যা আওয়ামিলুন নুহুদ ওয়া আসবাবুস সুকুত, পৃ. ৮৮।
৩৬৮. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ৭, পৃ. ৯৬-৯৭।
৩৬৯. ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, খ. ২, পৃ. ১৩০।
৩৭০. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ৩, পৃ. ৩১৬।
৩৭১. প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ৩১৭।
৩৭২. ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, খ. ১, পৃ. ২৫৩।
৩৭৩. ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, খ. ১, পৃ. ২৫৩।
৩৭৪. আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামি, পৃ. ১৬৯-১৭০; কামাল আনানি ইসমাইল, দিরাসাত ফি তারিখিন নুযুমিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৮৩-১৮৭।
৩৭৫. যিরিকলি, আল-আলাম, খ. ১, পৃ. ২০১।
৩৭৬. যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৩, পৃ. ১২১।
৩৭৭. বুখারি, হাদিস নং ২৮০৪; মুসলিম, হাদিস নং ১৭৪২।
৩৭৮. মুসলিম, হাদিস নং ১৭৩১; আবু দাউদ, হাদিস নং ২৬১৩; তিরমিযি, হাদিস নং ১৪০৮; ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২৮৫৭; দারেমি, হাদিস নং ২৪৩৯; আহমাদ, হাদিস নং ১৮১১৯; মুসতাদরাকে হাকেম, হাদিস নং ৮৬২৩।
৩৭৯. এই পরিসংখ্যান বের করতে গিয়ে আমি আশ্রয় নিয়েছি প্রথমে সিহাহ সিত্তার ওপর। এরপর সুনান ও মুসনাদসমূহের ওপর। এরপর বিশুদ্ধতা যাচাইপূর্বক সিরাত বিষয়ক গ্রন্থের ওপর। যেমন সিরাতে ইবনে হিশাম, উয়ুনুল আসার, যাদুল মাআদ, সিরাতুন নাবাবিয়্যা (ইবনে কাসির এবং তাবারি রচিত)।
৩৮০. যেমন অনেকে বিরে মাউনা ট্রাজেডিতে শহিদের সংখ্যা বলেন ২৭ জন। কিন্তু সঠিক সংখ্যা হলো ৭০ জন। আবার অনেকে বনু কুরাইযায় নিহতদের সংখ্যা উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকেন। যুক্তি হিসেবে তারা বলেন যে, বনু কুরাইযার অধিবাসী ইহুদিগণ নিজেদের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে এই করুণ পরিণতি বরণ করেছে। তবে উচিত হলো, তাদের নিহতের সংখ্যাও এখানে উল্লেখ করা। কারণ সেটিও ছিল একটি যুদ্ধ। যুদ্ধের মৌলিক কারণ যাই হোক না কেন এভাবে নানা যুক্তিতে নিহতদের পরিসংখ্যান ছোট করার চেষ্টা করা হয়।
৩৮১. বাইহাকি, আস-সুনানুল কুবরা, হাদিস নং ১৭৯০৪।
৩৮২. সুরা বাকারা : ১৯০।
৩৮৩. ইবনে কুতাইবা, উয়ুনুল আখবার, খ. ১, পৃ. ১০৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00