📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 পত্র ও রচনা বিভাগ

📄 পত্র ও রচনা বিভাগ


এই বিভাগের প্রধান দায়িত্ব ছিল লেখালেখি ও রাষ্ট্রীয় নথিপত্র তৈরি। যুগ যুগ ধরে লেখালেখি বা রচনার কাজ খলিফা পদের পর সবচেয়ে উন্নত ও মর্যাদাবান বলে বিবেচিত হতে থাকে। কারণ সমৃদ্ধির সকল পথের মিলন হয়েছে এ পদকে কেন্দ্র করে। মানুষের সকল আশা-আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলে এ পদ। ইসলামের আবির্ভাবের পর এই রচনা বিভাগের কাজ হয়ে ওঠে আরও গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও নব্য ইসলামি রাষ্ট্রের জন্য অনেক রচয়িতা বা লেখক নিযুক্ত করেন, বিশেষজ্ঞদের মতানুযায়ী বিশ্বনবীর নিযুক্ত লেখকদের সংখ্যা ত্রিশের অধিক। (১৮২)

বিশেষ করে খলিফা ও গভর্নরদের খুব প্রয়োজন দক্ষ লেখকদের। ফলে আমরা দেখি, সেই যুগে লেখকদের নিয়ে প্রচুর প্রশংসাগাথা তৈরি হয়। এ প্রসঙ্গে যুবাইর ইবনে বাক্কার বলেন, লেখকগণ হলেন রাজা আর সকল মানুষ প্রজা। (১৮৩) ইবনুল মুকাফফা বলেন, লেখকগণ শাসকদের মুখাপেক্ষী ঠিক, তবে এর চেয়ে বেশি শাসকগণ লেখকদের মুখাপেক্ষী। (১৮৪)

কালকাশান্দি (মৃ. ৮২১ হি.) রচনাশাস্ত্রের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন, চুক্তিনামা, শপথনামা, প্রাপ্তিস্বীকার, প্রত্যয়নপত্র, জামিননামা, দণ্ডাদেশ, শান্তিচুক্তি, আমানত গ্রহণ ও প্রদানপত্র, রাষ্ট্রীয় ফরমানসহ যেকোনো কথা ও ভাবকে লেখায় রূপান্তর করার নাম রচনাশাস্ত্র। (১৮৫)

উপরের এই বিবরণ থেকে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় যে, রচনা বিভাগের দায়িত্ব কেবল শাসক ও গভর্নরদের পত্র লেখার মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সেজন্য উপযুক্ত বাক্য নির্বাচন এবং কূটনৈতিক পরিভাষা ব্যবহারও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এ পদের লোকদের আমরা খলিফা বা গভর্নরের মুখপাত্র হিসেবে অভিহিত করতে পারি। এ ছাড়াও রাষ্ট্রের সকল গোপন নথি ও খলিফার সঙ্গে উযির ও গভর্নরদের সম্পর্কের বিস্তারিত দলিলপত্র তাদের কাছে জমা রাখা হতো। প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ও চুক্তির নথিও তাদের কাছে সংরক্ষিত থাকত।

কোনো সন্দেহ নেই, কালকাশান্দির এই বিবরণ থেকে বোঝা যায়, হিজরি অষ্টম ও নবম শতকে লেখালেখি ও রচনা বিভাগ পূর্ণাঙ্গ ও পরিপক্ব রূপ লাভ করে।

ইসলামি রাষ্ট্রের সূচনালগ্নে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথম বিশিষ্ট লেখকদের নিযুক্ত করেন। এ থেকেই ইসলামি সভ্যতায় লেখালেখির গুরুত্ব অনুমান করা যায়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাষ্ট্রের গভর্নর, যুদ্ধাভিযানে থাকা সেনানায়ক সাহাবিদের কাছে রাষ্ট্রীয় পত্র পাঠাতেন। প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের শাসক ও সরকারপ্রধানদের ইসলামের দিকে আহ্বান করে পত্র পাঠাতেন। সাহাবিদের রাষ্ট্রদূত বানিয়ে তাদের কাছে প্রেরণ করতেন। আমর ইবনে হাযমকে ইয়ামেনে নিযুক্ত করার সময় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উদ্দেশে শপথনামা লেখেন। নিযুক্ত তামিম দারি ও তার ভাইদের উদ্দেশে বিশ্বনবী শামে জায়গির প্রদান মর্মে পত্র লিখে পাঠান। হুদাইবিয়ার বছর তার ও কুরাইশ গোত্রের মাঝে সম্পাদিত শান্তিচুক্তি লেখান...।(১৮৬)

খুলাফায়ে রাশেদিনও বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেখানো এই পথে হাঁটেন। ফলে আমরা দেখি, খলিফা আবু বকরের জন্য উসমান ইবনে আফফান ও যায়দ ইবনে সাবিত লেখকের ভূমিকা পালন করেন। এরপর দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনে খাত্তাবের জন্য যায়দ ইবনে সাবিত ও আবদুল্লাহ ইবনে খালাফ লেখকের ভূমিকা পালন করেন। তৃতীয় খলিফা উসমান ইবনে আফফানের জন্য মারওয়ান ইবনুল হাকাম লেখকের দায়িত্ব পালন করেন। চতুর্থ খলিফা আলি ইবনে আবু তালিবের জন্য আবদুল্লাহ ইবনে রাফে ও সাইদ ইবনে নাজরান আল-হামদানি লেখকের ভূমিকা পালন করেন। এরপর পঞ্চম খলিফা হাসান ইবনে আলির জন্যও তারা লেখকের দায়িত্বে ছিলেন। (১৮৭)

বনু উমাইয়ার শাসনামলে খিলাফতের সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে লেখকদের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। রাজ্য ও গভর্নরদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় খলিফাদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ও পত্র আদান-প্রদানের হার বৃদ্ধি পায়। ফলে রচনা ও লেখালেখির গুরুত্ব ও কার্যকারিতা আরও ব্যাপক হয়। উমাইয়া শাসনামলে রচনা বিভাগে যারা কাজ করতেন তাদের মাঝে আরব লেখকদের পাশাপাশি ছিল দাস ও অনারব শ্রেণিও। খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের দাস আবুয যুআইযিআ এবং রুহ ইবনে যানবা আল-জুযামি ছিলেন খলিফার খুব কাছের লেখক। রুহ ইবনে যানবার রচনাদক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান তাকে ফারিসিয়্যুল কিতাবা (فارسي الكتابة) উপাধিতে ভূষিত করেন। (১৮৮)

সরকারি রচনা বিভাগের প্রধান হিসেবে নিয়োগ করা হতো বিখ্যাত ও বিশিষ্ট লেখকদের। তাদের দ্বারাই পরিচালিত হতো গুরুত্বপূর্ণ এসব বিভাগ। 'আবদুল হামিদ আল-কাতেব' উপাধি পাওয়া আবদুল হামিদ ইবনে ইয়াহইয়া আল আমেরি (মৃ. ১৩২ হি.) ছিলেন উমাইয়া খিলাফতের বিশিষ্ট একজন সরকারি লেখক। পুরো ইসলামি সভ্যতায় বিখ্যাত লেখকদের তালিকা করলে তাকে বাদ দেওয়ার কোনো উপায় নেই। তো উমাইয়া সাম্রাজ্যে তার উন্নত মর্যাদার দরুন বনু উমাইয়ার সর্বশেষ খলিফা মারওয়ান ইবনে মুহাম্মাদ (মৃ. ১৩২ হি.) তাকে নিজের একান্ত উযির হিসেবে নিয়োগ করেন। সে সময় তার প্রধান দায়িত্ব ছিল রচনা ও লেখালেখি।

একজন লেখকের মাঝে কী কী গুণ থাকা উচিত এবং রচনা বিষয়ে কী কী সাধারণ মূলনীতি অনুসরণ করা উচিত সেগুলো প্রথম আবদুল হামিদ আল-কাতেবের প্রণয়ন করা। এই শাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্যের কারণে তার উদ্দেশ্যে বলা হয়,
"فتحت الرسائل بعبد الحميد وختمت بابن العميد" পত্র লেখালেখির সূচনা হয় আবদুল হামিদ থেকে এবং সমাপ্তি ঘটে ইবনুল আমিদ পর্যন্ত এসে। (১৮৯)

এ কারনেই তার শিষ্যগণ রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ পদ লাভ করতে সক্ষম হন, বিশেষত খিলাফতের অঙ্গনে। তার অন্যতম শিষ্য ইয়াকুব ইবনে দাউদকে উযির হিসেবে নিয়োগ করেন আব্বাসি খলিফা আল- মাহদি। (১৯০)

আব্বাসি খিলাফতের পৃষ্ঠপোষকতায় এ বিভাগের ব্যাপক উন্নতি ও অগ্রগতি সাধিত হয়। রচনা বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে যে সুযোগ-সুবিধা ছিল, আব্বাসি খিলাফতের সময় তা আরও বাড়ানো হয়। এরকম বিশেষ সুবিধা ও মর্যাদার একটি ছিল স্বাক্ষর। অর্থাৎ তারা নানা প্রয়োজনে রাজদরবারে আসা মানুষদের আবেদনগুলো গুছিয়ে সংক্ষিপ্ত কথায় লিখে স্বাক্ষর করে খলিফার সামনে পেশ করতেন। খলিফা এক নজর চোখ বুলিয়ে এ বিষয়ে তার মত শুনে পত্রে স্বাক্ষর করতেন। এরপর সেগুলো রাজস্ব বিভাগ, অর্থ তহবিল বা সামাজিক উন্নয়ন বিভাগ ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠিয়ে দিতেন। ওই আবেদনপত্রেই খলিফা বা তার কাতেব মঞ্জুরিমূলক শব্দ লিখে স্বাক্ষর করতেন। এসব নির্দেশনামূলক শব্দ হতো সুসংক্ষিপ্ত ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভাষায়। তা দ্বারা স্বাক্ষরকারীর ব্যুৎপত্তি, বুদ্ধিবৃত্তি ও সুবচন নির্বাচনে তার দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া যেত। অধিকাংশ পণ্ডিত খলিফা হারুনুর রশিদের আমলের বিশিষ্ট সরকারি কার্যনির্বাহী ও বিল অনুমোদন বিভাগের প্রধান জাফর ইবনে ইয়াহইয়া আল-বারমাকির স্বাক্ষর গ্রহণের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ত। তার পাণ্ডিত্য ও রচনাশক্তি ছিল অনেক উঁচুমানের। এমনকি লোকমুখে প্রসিদ্ধ ছিল, তার একটি স্বাক্ষর এক দিনার মূল্যে বিক্রয় হতো। (১৯১)

আব্বাসি খিলাফতের যামানায় আমরা দেখতে পাই, খলিফাগণ এরকম লেখক ও রচয়িতাদের অনেক মর্যাদা দিতেন। আহমাদ ইবনে ইউসুফ ইবনে কাসেম (মৃ. ২১৩ হি.) ছিলেন খলিফা মামুনের শাসনামলে পত্র ও রচনা বিভাগের একজন প্রসিদ্ধ লেখক। রচনা বিভাগে তার দক্ষতা ও যোগ্যতা দেখে আহমাদ ইবনে আবু খালেদ আল-আহওয়ালের ইনতেকালের পর খলিফা মামুন তাকে উযির হিসেবে নিয়োগদান করেন। তার অগাধ পাণ্ডিত্য ও পত্র লেখায় পারদর্শিতার বিষয়ে একটি ঘটনা প্রসিদ্ধ আছে। খলিফা মামুন একবার রমযান মাসে রাতের বেলায় শহরের সব মসজিদের বাতির সংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রের সকল গভর্নর ও কর্মী বরাবর ফরমান লিখতে তাকে নির্দেশ দেন। আহমাদ ইবনে ইউসুফ ইবনে কাসেম বলেন, এ ব্যাপারে ইতিপূর্বে কেউ লেখেনি। কারও লেখা দেখে অনুসরণ করব সে সুযোগও নেই। কী লেখা যায়, কী লেখা যায়, এরকম চিন্তা করতে করতে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। স্বপ্নে দেখি, একজন আগন্তুক এসে আমাকে বলল, লিখুন,
فإن فيها أُنسًا للسابلة، وإضائة للمتهجدة، ونشاطا للمتعبدين، ونفيا لمكامن الريب، وتنزيها لبيوت الله عن وحشة الظلم

এতে করে পথিকদের জন্য সুবিধা হবে। তাহাজ্জুদ আদায়কারীগণ আলো পাবে। ইবাদতকারীদের জন্য প্রাণবন্ততা বয়ে আনবে। সন্দেহযুক্ত গোপন স্থান বলতে আর কিছুই থাকবে না। তা ছাড়া অন্ধকারের নির্জন পরিবেশ থেকে আল্লাহর ঘরগুলো পবিত্র থাকবে। (১৯২)

মোটকথা, নিখুঁত পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং অসামান্য রচনাশক্তিই আহমাদ ইবনে ইউসুফ ইবনুল কাসেমকে পরবর্তী সময় উযিরের পদে অধিষ্ঠিত করেছিল।

প্রায় ছয় শতাব্দীজুড়ে আব্বাসি শাসনামলে এমন অসংখ্য খ্যাতিমান ও বিদগ্ধ লেখকের জন্ম হয়েছে, যাদের দ্বারা আব্বাসি খিলাফত দুনিয়াজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছে। এ কারণেই আব্বাসি শাসনব্যবব্যবস্থার আদলে পরবর্তীকালে উবাইদি, আইয়ুবি, আন্দালুসি রাজবংশসহ স্বাধীন ইসলামি রাষ্ট্রসমূহের সুলতান ও আমিরগণও নিজ নিজ সাম্রাজ্যে স্বতন্ত্র রচনা বিভাগ চালু করেন, যা পত্র যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গণমাধ্যমের ভূমিকাও পালন করত।

খলিফা মামুনের রচনা বিভাগে কর্মরত এরকমই একজন বিখ্যাত লেখক হলেন আবু উসমান আল-জাহিয। কিন্তু সহকর্মীদের রাজকীয় পোশাক গ্রহণ ও কথাবার্তায় তাদের অতিউৎসাহী স্বভাব দেখে শেষ পর্যন্ত তিনি লেখালেখির পেশা বর্জন করে রাজবিভাগ থেকে বের হয়ে যান। তর্কশাস্ত্র, সাহিত্য, সমাজবিজ্ঞান, মানবপ্রকৃতি ও প্রাণিবিদ্যা নিয়ে লেখালেখি করতে তিনি বাগদাদ ছেড়ে বসরায় চলে আসেন।

মুরাবিতিন সাম্রাজ্যেও রচনা বিভাগ ছিল গুরুত্বপূর্ণ সরকারি এক বিভাগ। সার্বিক দেখাশোনা ও পরিচালনায় থাকতেন একজন বড় লেখক। মুরাবিতিন রাজবংশীয়গণ বড় বড় সাহিত্যিক থেকে বাছাই করে করে রাজলেখক নিয়োগ করতেন। এমনকি মধ্যযুগে রচনাশৈলী এমন উন্নত পর্যায়ে পৌছে, তর্কশাস্ত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও তাতে ঢাকা পড়ে যায়। সে সময় আমিরদের একসঙ্গে একাধিক রাজলেখক থাকত। তাদের মাঝে একজন থাকতেন প্রধান হিসেবে। মূলত তিনিই সরকারি রচনা বিভাগ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতেন। (১৯৩)

শাসকগণ রচনা বিভাগের লেখক নিয়োগের জন্য নানারকম নির্বাচন-প্রক্রিয়া ও পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন। সবচেয়ে বিজ্ঞ ও সুসাহিত্যিক ব্যক্তিকেই রচনা বিভাগের প্রধান করা হতো। তাকে মাননীয়-মহোদয় জাতীয় সম্মানসূচক উপাধিতে ভূষিত করা হতো। তিনিই সকল আবেদন ও নথিপত্র গ্রহণ করতেন। পরবর্তী সময়ে সেগুলো খলিফার সামনে পেশ করতেন। আবেদন গ্রহণ ও অগ্রাহ্য করার ব্যাপারে তিনিই বাকি লেখকদের নির্দেশনা দিতেন। খলিফা নিজেও রাষ্ট্রীয় সকল কাজে তার মতামত গুরুত্বের সঙ্গে নিতেন। যেকোনো সময় সাক্ষাৎ করতে চাইলে খলিফা নিষেধ করতেন না। আর এ সুযোগ অন্য কারও জন্য ছিল না। এমনকি অনেক সময় রাষ্ট্রীয় কাজের সুবাদে তিনি খলিফার কাছে কয়েক রাত পর্যন্ত অবস্থান করতেন। তার বেতন ছিল প্রতি মাসে একশ বিশ দিনার। এরকম মোটা অঙ্কের বেতন রাজদরবারে তাদের অসামান্য মর্যাদার কথা প্রমাণ করে। এ কারণেই জায়গির প্রদান সংক্রান্ত বিষয়, পোশাক প্রদান সংক্রান্ত, সরকারি ফি প্রবর্তন ও লেনদেন সংক্রান্ত বিষয়গুলো যারা দেখাশোনা করতেন তাদের প্রধান হিসেবে কাজ করতেন। লেখকগণ। রাজপ্রসাদে অবস্থিত তার দফতরে যাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না, এমনকি বিশিষ্ট রাজ ব্যক্তিবর্গ ছাড়া আর কেউ রাজলেখকদের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি পেত না। আমিরশ্রেণি থেকে তার জন্য হাজিব (সহযোগী) নির্ধারণ করা হতো। তার জন্য আলাদা পরিচ্ছন্নতাকর্মী থাকত। তার মর্যাদা ছিল অভাবনীয়। তার প্রাসাদে শোভা পেত রাজসরঞ্জাম, আসবাব, সোফা, উন্নত মসনদ ও লেখালেখির সব উন্নত উপাদান, খলিফার বিশিষ্ট লেখকগণই এগুলো সরবরাহ করতেন। (১৯৪)

সেই যুগের রচনা বিভাগের আলোচনা করতে গেলে বিখ্যাত লেখক কালকাশান্দির কথা বলতেই হবে। তিনি ভূগোল, ইতিহাস ও প্রশাসনিক বিষয়ের প্রসিদ্ধ বিশ্বকোষ সুবহুল আ'শা ফি সিনাআতিল ইনশা রচনা করেন। উক্ত গ্রন্থে তিনি স্বতন্ত্র রচনা বিভাগ, সেই বিভাগের জন্য যোগ্য লেখক নিয়োগের গুরুত্ব এবং একজন লেখকের মাঝে কী কী গুণ ও বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত সে বিষয়গুলো তিনি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, লেখক হবেন উজ্জ্বল ও লাবণ্যময় চেহারার অধিকারী। তার ভাষা হবে সহজ, শুদ্ধ ও পরিষ্কার। তিনি হবেন সেই দেশের নাগরিক। স্থানীয়ভাবে তিনি হবেন সকলের কাছে সমাদৃত। ভাবগাম্ভীর্যের অধিকারী। অত্যন্ত ভদ্র। দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম। নম্র ও সহনশীল। বাদশাকে সবসময় সঠিক পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করবেন। কখনো কৌশল অবলম্বন করবেন না। বাদশার ন্যায্য সিদ্ধান্ত, তার গৃহীত যেকোনো সুপরিকল্পনা ও পদক্ষেপের প্রচারপ্রসার করবেন। এ বিষয়গুলো জনগণের সামনে মহত্ত্ব ও অত্যন্ত সম্মানের সাথে উপস্থাপন করবেন। বারবার আলোচনা করবেন। জনগণকে বাদশার প্রশংসা ও তার প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায়ে উৎসাহিত করবেন। রাজদরবারে বা ভরা মজলিসে বাদশা যদি এমন কোনো কথা বলেন যা তার কাছে সঠিক মনে হয়নি, তাহলে তৎক্ষণাৎ প্রত্যুত্তর দেওয়া থেকে বিরত থাকবেন। বাদশার সম্মান ও ভাবমূর্তির কথা বিবেচনা করে নীরব থাকবেন। বড় ধরনের কোনো ভুল সিদ্ধান্ত হলে ধৈর্য ধারণ করে নির্জনে কথা বলার অপেক্ষায় থাকবেন। বাদশা যখন একা থাকেন, তখন বাদশার মেজাজ-মর্জি বুঝে অন্যান্য আলোচনার ফাঁকে সম্পূর্ণ নিরহংকারী মনোভাব নিয়ে প্রজ্ঞার সাথে সত্য ও সঠিক পরামর্শ বাদশার কাছে উপস্থাপন করবেন। এতে করে যেন বাদশার সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিকভাবে খণ্ডন না করা হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখবেন। নিজের মতামতের কারণে আহমিকা দেখাবেন না। শান্তি ও নিরাপত্তা-রক্ষা, সুবিচার স্থাপন, সমতা বিধান, ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং নিপীড়িত মানুষের অধিকার সুরক্ষায় সবসময় কথা ও পরামর্শ দিয়ে বাদশাকে সহযোগিতা করে যাবেন। (১৯৫)

মোটকথা, পত্র ও রচনা বিভাগ ছিল ইসলামি সভ্যতার অন্যতম উৎকর্ষের প্রতীক। এটি ছিল উন্নত ইসলামি ঐতিহ্য, যা ছিল জনগণের সকল চাহিদা পূরণে একটি সুষ্ঠু সরকারি কার্যালয় এবং অনিন্দ্যসুন্দর ইসলামি ব্যবস্থাপনা।

টিকাঃ
১৮২. ফাতহিয়্যা নাবরাবি, তারিখুন নুযুমি ওয়াল-হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৯৯।
১৮৩. কালকাশান্দি, সুবহুল আ'শা, খ. ১, পৃ. ৩৭।
১৮৪. প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৩৭।
১৮৫. প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৮৪।
১৮৬. কাত্তানি, আত-তারাতিবুল ইদারিয়‍্যা, খ. ১, পৃ. ১১৮।
১৮৭. ফাতহিয়্যা নাবরাবি, তারিখুন নুযুমি ওয়াল-হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১০১।
১৮৮. জাহশিয়ারি, আল-ওয়াযারাউ ওয়াল-কুততাব, পৃ. ৩৫।
১৮৯. যাহাবি, তারিখুল ইসলাম, খ. ৮, পৃ. ৪৭০-৪৭১।
১৯০. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ১০, পৃ. ৬০।
১৯১. খতিবে বাগদাদি, তারিখে বাগদাদ, খ. ৭, পৃ. ১৫২।
১৯২. কুদামা ইবনে জাফর, আল-খারাজ ওয়া সিনাআতুল কিতাবা, পৃ. ৩৭।
১৯৩. ইবরাহিম হারাকাত, আন-নিযামুস সিয়াসি ওয়াল-হারাবি ফি আহদিল মুরাবিতিন, পৃ. ৯০-৯৪।
১৯৪. মাকরিযি, আল-মাওয়ায়িযু ওয়াল-ইতিবার, খ. ১, পৃ. ৪০২।
১৯৫. কালকাশান্দি, সুবহুল আ'শা, খ. ১, পৃ. ১৩৯-১৪০।

এই বিভাগের প্রধান দায়িত্ব ছিল লেখালেখি ও রাষ্ট্রীয় নথিপত্র তৈরি। যুগ যুগ ধরে লেখালেখি বা রচনার কাজ খলিফা পদের পর সবচেয়ে উন্নত ও মর্যাদাবান বলে বিবেচিত হতে থাকে। কারণ সমৃদ্ধির সকল পথের মিলন হয়েছে এ পদকে কেন্দ্র করে। মানুষের সকল আশা-আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলে এ পদ। ইসলামের আবির্ভাবের পর এই রচনা বিভাগের কাজ হয়ে ওঠে আরও গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও নব্য ইসলামি রাষ্ট্রের জন্য অনেক রচয়িতা বা লেখক নিযুক্ত করেন, বিশেষজ্ঞদের মতানুযায়ী বিশ্বনবীর নিযুক্ত লেখকদের সংখ্যা ত্রিশের অধিক। (১৮২)

বিশেষ করে খলিফা ও গভর্নরদের খুব প্রয়োজন দক্ষ লেখকদের। ফলে আমরা দেখি, সেই যুগে লেখকদের নিয়ে প্রচুর প্রশংসাগাথা তৈরি হয়। এ প্রসঙ্গে যুবাইর ইবনে বাক্কার বলেন, লেখকগণ হলেন রাজা আর সকল মানুষ প্রজা। (১৮৩) ইবনুল মুকাফফা বলেন, লেখকগণ শাসকদের মুখাপেক্ষী ঠিক, তবে এর চেয়ে বেশি শাসকগণ লেখকদের মুখাপেক্ষী। (১৮৪)

কালকাশান্দি (মৃ. ৮২১ হি.) রচনাশাস্ত্রের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন, চুক্তিনামা, শপথনামা, প্রাপ্তিস্বীকার, প্রত্যয়নপত্র, জামিননামা, দণ্ডাদেশ, শান্তিচুক্তি, আমানত গ্রহণ ও প্রদানপত্র, রাষ্ট্রীয় ফরমানসহ যেকোনো কথা ও ভাবকে লেখায় রূপান্তর করার নাম রচনাশাস্ত্র। (১৮৫)

উপরের এই বিবরণ থেকে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় যে, রচনা বিভাগের দায়িত্ব কেবল শাসক ও গভর্নরদের পত্র লেখার মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সেজন্য উপযুক্ত বাক্য নির্বাচন এবং কূটনৈতিক পরিভাষা ব্যবহারও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এ পদের লোকদের আমরা খলিফা বা গভর্নরের মুখপাত্র হিসেবে অভিহিত করতে পারি। এ ছাড়াও রাষ্ট্রের সকল গোপন নথি ও খলিফার সঙ্গে উযির ও গভর্নরদের সম্পর্কের বিস্তারিত দলিলপত্র তাদের কাছে জমা রাখা হতো। প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ও চুক্তির নথিও তাদের কাছে সংরক্ষিত থাকত।

কোনো সন্দেহ নেই, কালকাশান্দির এই বিবরণ থেকে বোঝা যায়, হিজরি অষ্টম ও নবম শতকে লেখালেখি ও রচনা বিভাগ পূর্ণাঙ্গ ও পরিপক্ব রূপ লাভ করে।

ইসলামি রাষ্ট্রের সূচনালগ্নে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথম বিশিষ্ট লেখকদের নিযুক্ত করেন। এ থেকেই ইসলামি সভ্যতায় লেখালেখির গুরুত্ব অনুমান করা যায়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাষ্ট্রের গভর্নর, যুদ্ধাভিযানে থাকা সেনানায়ক সাহাবিদের কাছে রাষ্ট্রীয় পত্র পাঠাতেন। প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের শাসক ও সরকারপ্রধানদের ইসলামের দিকে আহ্বান করে পত্র পাঠাতেন। সাহাবিদের রাষ্ট্রদূত বানিয়ে তাদের কাছে প্রেরণ করতেন। আমর ইবনে হাযমকে ইয়ামেনে নিযুক্ত করার সময় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উদ্দেশে শপথনামা লেখেন। নিযুক্ত তামিম দারি ও তার ভাইদের উদ্দেশে বিশ্বনবী শামে জায়গির প্রদান মর্মে পত্র লিখে পাঠান। হুদাইবিয়ার বছর তার ও কুরাইশ গোত্রের মাঝে সম্পাদিত শান্তিচুক্তি লেখান...।(১৮৬)

খুলাফায়ে রাশেদিনও বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেখানো এই পথে হাঁটেন। ফলে আমরা দেখি, খলিফা আবু বকরের জন্য উসমান ইবনে আফফান ও যায়দ ইবনে সাবিত লেখকের ভূমিকা পালন করেন। এরপর দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনে খাত্তাবের জন্য যায়দ ইবনে সাবিত ও আবদুল্লাহ ইবনে খালাফ লেখকের ভূমিকা পালন করেন। তৃতীয় খলিফা উসমান ইবনে আফফানের জন্য মারওয়ান ইবনুল হাকাম লেখকের দায়িত্ব পালন করেন। চতুর্থ খলিফা আলি ইবনে আবু তালিবের জন্য আবদুল্লাহ ইবনে রাফে ও সাইদ ইবনে নাজরান আল-হামদানি লেখকের ভূমিকা পালন করেন। এরপর পঞ্চম খলিফা হাসান ইবনে আলির জন্যও তারা লেখকের দায়িত্বে ছিলেন। (১৮৭)

বনু উমাইয়ার শাসনামলে খিলাফতের সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে লেখকদের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। রাজ্য ও গভর্নরদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় খলিফাদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ও পত্র আদান-প্রদানের হার বৃদ্ধি পায়। ফলে রচনা ও লেখালেখির গুরুত্ব ও কার্যকারিতা আরও ব্যাপক হয়। উমাইয়া শাসনামলে রচনা বিভাগে যারা কাজ করতেন তাদের মাঝে আরব লেখকদের পাশাপাশি ছিল দাস ও অনারব শ্রেণিও। খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের দাস আবুয যুআইযিআ এবং রুহ ইবনে যানবা আল-জুযামি ছিলেন খলিফার খুব কাছের লেখক। রুহ ইবনে যানবার রচনাদক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান তাকে ফারিসিয়্যুল কিতাবা (فارسي الكتابة) উপাধিতে ভূষিত করেন। (১৮৮)

সরকারি রচনা বিভাগের প্রধান হিসেবে নিয়োগ করা হতো বিখ্যাত ও বিশিষ্ট লেখকদের। তাদের দ্বারাই পরিচালিত হতো গুরুত্বপূর্ণ এসব বিভাগ। 'আবদুল হামিদ আল-কাতেব' উপাধি পাওয়া আবদুল হামিদ ইবনে ইয়াহইয়া আল আমেরি (মৃ. ১৩২ হি.) ছিলেন উমাইয়া খিলাফতের বিশিষ্ট একজন সরকারি লেখক। পুরো ইসলামি সভ্যতায় বিখ্যাত লেখকদের তালিকা করলে তাকে বাদ দেওয়ার কোনো উপায় নেই। তো উমাইয়া সাম্রাজ্যে তার উন্নত মর্যাদার দরুন বনু উমাইয়ার সর্বশেষ খলিফা মারওয়ান ইবনে মুহাম্মাদ (মৃ. ১৩২ হি.) তাকে নিজের একান্ত উযির হিসেবে নিয়োগ করেন। সে সময় তার প্রধান দায়িত্ব ছিল রচনা ও লেখালেখি।

একজন লেখকের মাঝে কী কী গুণ থাকা উচিত এবং রচনা বিষয়ে কী কী সাধারণ মূলনীতি অনুসরণ করা উচিত সেগুলো প্রথম আবদুল হামিদ আল-কাতেবের প্রণয়ন করা। এই শাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্যের কারণে তার উদ্দেশ্যে বলা হয়,
"فتحت الرسائل بعبد الحميد وختمت بابن العميد" পত্র লেখালেখির সূচনা হয় আবদুল হামিদ থেকে এবং সমাপ্তি ঘটে ইবনুল আমিদ পর্যন্ত এসে। (১৮৯)

এ কারনেই তার শিষ্যগণ রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ পদ লাভ করতে সক্ষম হন, বিশেষত খিলাফতের অঙ্গনে। তার অন্যতম শিষ্য ইয়াকুব ইবনে দাউদকে উযির হিসেবে নিয়োগ করেন আব্বাসি খলিফা আল- মাহদি। (১৯০)

আব্বাসি খিলাফতের পৃষ্ঠপোষকতায় এ বিভাগের ব্যাপক উন্নতি ও অগ্রগতি সাধিত হয়। রচনা বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে যে সুযোগ-সুবিধা ছিল, আব্বাসি খিলাফতের সময় তা আরও বাড়ানো হয়। এরকম বিশেষ সুবিধা ও মর্যাদার একটি ছিল স্বাক্ষর। অর্থাৎ তারা নানা প্রয়োজনে রাজদরবারে আসা মানুষদের আবেদনগুলো গুছিয়ে সংক্ষিপ্ত কথায় লিখে স্বাক্ষর করে খলিফার সামনে পেশ করতেন। খলিফা এক নজর চোখ বুলিয়ে এ বিষয়ে তার মত শুনে পত্রে স্বাক্ষর করতেন। এরপর সেগুলো রাজস্ব বিভাগ, অর্থ তহবিল বা সামাজিক উন্নয়ন বিভাগ ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠিয়ে দিতেন। ওই আবেদনপত্রেই খলিফা বা তার কাতেব মঞ্জুরিমূলক শব্দ লিখে স্বাক্ষর করতেন। এসব নির্দেশনামূলক শব্দ হতো সুসংক্ষিপ্ত ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভাষায়। তা দ্বারা স্বাক্ষরকারীর ব্যুৎপত্তি, বুদ্ধিবৃত্তি ও সুবচন নির্বাচনে তার দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া যেত। অধিকাংশ পণ্ডিত খলিফা হারুনুর রশিদের আমলের বিশিষ্ট সরকারি কার্যনির্বাহী ও বিল অনুমোদন বিভাগের প্রধান জাফর ইবনে ইয়াহইয়া আল-বারমাকির স্বাক্ষর গ্রহণের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ত। তার পাণ্ডিত্য ও রচনাশক্তি ছিল অনেক উঁচুমানের। এমনকি লোকমুখে প্রসিদ্ধ ছিল, তার একটি স্বাক্ষর এক দিনার মূল্যে বিক্রয় হতো। (১৯১)

আব্বাসি খিলাফতের যামানায় আমরা দেখতে পাই, খলিফাগণ এরকম লেখক ও রচয়িতাদের অনেক মর্যাদা দিতেন। আহমাদ ইবনে ইউসুফ ইবনে কাসেম (মৃ. ২১৩ হি.) ছিলেন খলিফা মামুনের শাসনামলে পত্র ও রচনা বিভাগের একজন প্রসিদ্ধ লেখক। রচনা বিভাগে তার দক্ষতা ও যোগ্যতা দেখে আহমাদ ইবনে আবু খালেদ আল-আহওয়ালের ইনতেকালের পর খলিফা মামুন তাকে উযির হিসেবে নিয়োগদান করেন। তার অগাধ পাণ্ডিত্য ও পত্র লেখায় পারদর্শিতার বিষয়ে একটি ঘটনা প্রসিদ্ধ আছে। খলিফা মামুন একবার রমযান মাসে রাতের বেলায় শহরের সব মসজিদের বাতির সংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রের সকল গভর্নর ও কর্মী বরাবর ফরমান লিখতে তাকে নির্দেশ দেন। আহমাদ ইবনে ইউসুফ ইবনে কাসেম বলেন, এ ব্যাপারে ইতিপূর্বে কেউ লেখেনি। কারও লেখা দেখে অনুসরণ করব সে সুযোগও নেই। কী লেখা যায়, কী লেখা যায়, এরকম চিন্তা করতে করতে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। স্বপ্নে দেখি, একজন আগন্তুক এসে আমাকে বলল, লিখুন,
فإن فيها أُنسًا للسابلة، وإضائة للمتهجدة، ونشاطا للمتعبدين، ونفيا لمكامن الريب، وتنزيها لبيوت الله عن وحشة الظلم

এতে করে পথিকদের জন্য সুবিধা হবে। তাহাজ্জুদ আদায়কারীগণ আলো পাবে। ইবাদতকারীদের জন্য প্রাণবন্ততা বয়ে আনবে। সন্দেহযুক্ত গোপন স্থান বলতে আর কিছুই থাকবে না। তা ছাড়া অন্ধকারের নির্জন পরিবেশ থেকে আল্লাহর ঘরগুলো পবিত্র থাকবে। (১৯২)

মোটকথা, নিখুঁত পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং অসামান্য রচনাশক্তিই আহমাদ ইবনে ইউসুফ ইবনুল কাসেমকে পরবর্তী সময় উযিরের পদে অধিষ্ঠিত করেছিল।

প্রায় ছয় শতাব্দীজুড়ে আব্বাসি শাসনামলে এমন অসংখ্য খ্যাতিমান ও বিদগ্ধ লেখকের জন্ম হয়েছে, যাদের দ্বারা আব্বাসি খিলাফত দুনিয়াজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছে। এ কারণেই আব্বাসি শাসনব্যবব্যবস্থার আদলে পরবর্তীকালে উবাইদি, আইয়ুবি, আন্দালুসি রাজবংশসহ স্বাধীন ইসলামি রাষ্ট্রসমূহের সুলতান ও আমিরগণও নিজ নিজ সাম্রাজ্যে স্বতন্ত্র রচনা বিভাগ চালু করেন, যা পত্র যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গণমাধ্যমের ভূমিকাও পালন করত।

খলিফা মামুনের রচনা বিভাগে কর্মরত এরকমই একজন বিখ্যাত লেখক হলেন আবু উসমান আল-জাহিয। কিন্তু সহকর্মীদের রাজকীয় পোশাক গ্রহণ ও কথাবার্তায় তাদের অতিউৎসাহী স্বভাব দেখে শেষ পর্যন্ত তিনি লেখালেখির পেশা বর্জন করে রাজবিভাগ থেকে বের হয়ে যান। তর্কশাস্ত্র, সাহিত্য, সমাজবিজ্ঞান, মানবপ্রকৃতি ও প্রাণিবিদ্যা নিয়ে লেখালেখি করতে তিনি বাগদাদ ছেড়ে বসরায় চলে আসেন।

মুরাবিতিন সাম্রাজ্যেও রচনা বিভাগ ছিল গুরুত্বপূর্ণ সরকারি এক বিভাগ। সার্বিক দেখাশোনা ও পরিচালনায় থাকতেন একজন বড় লেখক। মুরাবিতিন রাজবংশীয়গণ বড় বড় সাহিত্যিক থেকে বাছাই করে করে রাজলেখক নিয়োগ করতেন। এমনকি মধ্যযুগে রচনাশৈলী এমন উন্নত পর্যায়ে পৌছে, তর্কশাস্ত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও তাতে ঢাকা পড়ে যায়। সে সময় আমিরদের একসঙ্গে একাধিক রাজলেখক থাকত। তাদের মাঝে একজন থাকতেন প্রধান হিসেবে। মূলত তিনিই সরকারি রচনা বিভাগ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতেন। (১৯৩)

শাসকগণ রচনা বিভাগের লেখক নিয়োগের জন্য নানারকম নির্বাচন-প্রক্রিয়া ও পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন। সবচেয়ে বিজ্ঞ ও সুসাহিত্যিক ব্যক্তিকেই রচনা বিভাগের প্রধান করা হতো। তাকে মাননীয়-মহোদয় জাতীয় সম্মানসূচক উপাধিতে ভূষিত করা হতো। তিনিই সকল আবেদন ও নথিপত্র গ্রহণ করতেন। পরবর্তী সময়ে সেগুলো খলিফার সামনে পেশ করতেন। আবেদন গ্রহণ ও অগ্রাহ্য করার ব্যাপারে তিনিই বাকি লেখকদের নির্দেশনা দিতেন। খলিফা নিজেও রাষ্ট্রীয় সকল কাজে তার মতামত গুরুত্বের সঙ্গে নিতেন। যেকোনো সময় সাক্ষাৎ করতে চাইলে খলিফা নিষেধ করতেন না। আর এ সুযোগ অন্য কারও জন্য ছিল না। এমনকি অনেক সময় রাষ্ট্রীয় কাজের সুবাদে তিনি খলিফার কাছে কয়েক রাত পর্যন্ত অবস্থান করতেন। তার বেতন ছিল প্রতি মাসে একশ বিশ দিনার। এরকম মোটা অঙ্কের বেতন রাজদরবারে তাদের অসামান্য মর্যাদার কথা প্রমাণ করে। এ কারণেই জায়গির প্রদান সংক্রান্ত বিষয়, পোশাক প্রদান সংক্রান্ত, সরকারি ফি প্রবর্তন ও লেনদেন সংক্রান্ত বিষয়গুলো যারা দেখাশোনা করতেন তাদের প্রধান হিসেবে কাজ করতেন। লেখকগণ। রাজপ্রসাদে অবস্থিত তার দফতরে যাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না, এমনকি বিশিষ্ট রাজ ব্যক্তিবর্গ ছাড়া আর কেউ রাজলেখকদের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি পেত না। আমিরশ্রেণি থেকে তার জন্য হাজিব (সহযোগী) নির্ধারণ করা হতো। তার জন্য আলাদা পরিচ্ছন্নতাকর্মী থাকত। তার মর্যাদা ছিল অভাবনীয়। তার প্রাসাদে শোভা পেত রাজসরঞ্জাম, আসবাব, সোফা, উন্নত মসনদ ও লেখালেখির সব উন্নত উপাদান, খলিফার বিশিষ্ট লেখকগণই এগুলো সরবরাহ করতেন। (১৯৪)

সেই যুগের রচনা বিভাগের আলোচনা করতে গেলে বিখ্যাত লেখক কালকাশান্দির কথা বলতেই হবে। তিনি ভূগোল, ইতিহাস ও প্রশাসনিক বিষয়ের প্রসিদ্ধ বিশ্বকোষ সুবহুল আ'শা ফি সিনাআতিল ইনশা রচনা করেন। উক্ত গ্রন্থে তিনি স্বতন্ত্র রচনা বিভাগ, সেই বিভাগের জন্য যোগ্য লেখক নিয়োগের গুরুত্ব এবং একজন লেখকের মাঝে কী কী গুণ ও বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত সে বিষয়গুলো তিনি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, লেখক হবেন উজ্জ্বল ও লাবণ্যময় চেহারার অধিকারী। তার ভাষা হবে সহজ, শুদ্ধ ও পরিষ্কার। তিনি হবেন সেই দেশের নাগরিক। স্থানীয়ভাবে তিনি হবেন সকলের কাছে সমাদৃত। ভাবগাম্ভীর্যের অধিকারী। অত্যন্ত ভদ্র। দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম। নম্র ও সহনশীল। বাদশাকে সবসময় সঠিক পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করবেন। কখনো কৌশল অবলম্বন করবেন না। বাদশার ন্যায্য সিদ্ধান্ত, তার গৃহীত যেকোনো সুপরিকল্পনা ও পদক্ষেপের প্রচারপ্রসার করবেন। এ বিষয়গুলো জনগণের সামনে মহত্ত্ব ও অত্যন্ত সম্মানের সাথে উপস্থাপন করবেন। বারবার আলোচনা করবেন। জনগণকে বাদশার প্রশংসা ও তার প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায়ে উৎসাহিত করবেন। রাজদরবারে বা ভরা মজলিসে বাদশা যদি এমন কোনো কথা বলেন যা তার কাছে সঠিক মনে হয়নি, তাহলে তৎক্ষণাৎ প্রত্যুত্তর দেওয়া থেকে বিরত থাকবেন। বাদশার সম্মান ও ভাবমূর্তির কথা বিবেচনা করে নীরব থাকবেন। বড় ধরনের কোনো ভুল সিদ্ধান্ত হলে ধৈর্য ধারণ করে নির্জনে কথা বলার অপেক্ষায় থাকবেন। বাদশা যখন একা থাকেন, তখন বাদশার মেজাজ-মর্জি বুঝে অন্যান্য আলোচনার ফাঁকে সম্পূর্ণ নিরহংকারী মনোভাব নিয়ে প্রজ্ঞার সাথে সত্য ও সঠিক পরামর্শ বাদশার কাছে উপস্থাপন করবেন। এতে করে যেন বাদশার সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিকভাবে খণ্ডন না করা হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখবেন। নিজের মতামতের কারণে আহমিকা দেখাবেন না। শান্তি ও নিরাপত্তা-রক্ষা, সুবিচার স্থাপন, সমতা বিধান, ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং নিপীড়িত মানুষের অধিকার সুরক্ষায় সবসময় কথা ও পরামর্শ দিয়ে বাদশাকে সহযোগিতা করে যাবেন। (১৯৫)

মোটকথা, পত্র ও রচনা বিভাগ ছিল ইসলামি সভ্যতার অন্যতম উৎকর্ষের প্রতীক। এটি ছিল উন্নত ইসলামি ঐতিহ্য, যা ছিল জনগণের সকল চাহিদা পূরণে একটি সুষ্ঠু সরকারি কার্যালয় এবং অনিন্দ্যসুন্দর ইসলামি ব্যবস্থাপনা।

টিকাঃ
১৮২. ফাতহিয়্যা নাবরাবি, তারিখুন নুযুমি ওয়াল-হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৯৯।
১৮৩. কালকাশান্দি, সুবহুল আ'শা, খ. ১, পৃ. ৩৭।
১৮৪. প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৩৭।
১৮৫. প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৮৪।
১৮৬. কাত্তানি, আত-তারাতিবুল ইদারিয়‍্যা, খ. ১, পৃ. ১১৮।
১৮৭. ফাতহিয়্যা নাবরাবি, তারিখুন নুযুমি ওয়াল-হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১০১।
১৮৮. জাহশিয়ারি, আল-ওয়াযারাউ ওয়াল-কুততাব, পৃ. ৩৫।
১৮৯. যাহাবি, তারিখুল ইসলাম, খ. ৮, পৃ. ৪৭০-৪৭১।
১৯০. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ১০, পৃ. ৬০।
১৯১. খতিবে বাগদাদি, তারিখে বাগদাদ, খ. ৭, পৃ. ১৫২।
১৯২. কুদামা ইবনে জাফর, আল-খারাজ ওয়া সিনাআতুল কিতাবা, পৃ. ৩৭।
১৯৩. ইবরাহিম হারাকাত, আন-নিযামুস সিয়াসি ওয়াল-হারাবি ফি আহদিল মুরাবিতিন, পৃ. ৯০-৯৪।
১৯৪. মাকরিযি, আল-মাওয়ায়িযু ওয়াল-ইতিবার, খ. ১, পৃ. ৪০২।
১৯৫. কালকাশান্দি, সুবহুল আ'শা, খ. ১, পৃ. ১৩৯-১৪০।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 ভাতা ও সৈনিক বিভাগ

📄 ভাতা ও সৈনিক বিভাগ


ভাতা ও সৈনিক বিভাগ চালু করার পেছনে প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সৈনিকদের সংখ্যা, তাদের নাম ও জাতীয়তা সংরক্ষণ করে তাদের জন্য উপযুক্ত ভাতা নির্ধারণ করা। সেই সঙ্গে কে কখন ভাতা গ্রহণ করবেন এবং কে কী ধরনের হাতিয়ার বহন করবেন তা নির্দিষ্ট করা। এতে করে যোদ্ধাদের সুবিধার পাশাপাশি তাদের পরিবার ও স্বজনদের জন্যও অনেক সহযোগিতা হতো। (১৯৬) এ ধরনের ভাতা বিভাগ প্রথম চালু করেন আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনুল খাত্তাব রা.। এ ব্যাপারে সকল ইতিহাসবিদ একমত।

আবু বকর রা.-এর ইনতেকালের পর মুসলিমদের আমির নিযুক্ত হন উমর ইবনে খাত্তাব রা.। আর রাষ্ট্র পরিচালনায় উমরের ছিল এক বিশেষ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি। বিশেষত অর্থনৈতিক বিষয়ে। এ কারণেই তিনি ভাতার জন্য স্বতন্ত্র বিভাগ চালু করেন। অন্যদিকে মহান আল্লাহর ইচ্ছা ও সহায়তায় খিলাফত যখন সম্প্রসারিত হচ্ছিল, তখন মুসলিমদের দখলে আসতে থাকে একের পর এক ভূখণ্ড এবং প্রচুর অর্থসম্পদ। এরই পরিপ্রেক্ষিতে উমর রা. চাচ্ছিলেন মানুষের মাঝে এসব অর্থসম্পদ সর্বোত্তম উপায়ে বণ্টন করতে। এর আগে আবু বকর রা. কে আগে মুসলিম হয়েছে আর কে পরে তা পার্থক্য না করে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সমহারে মানুষের মাঝে বণ্টন করে দিতেন। একদল সাহাবি এতে আপত্তি করলে তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কারা আগে মুসলিম হয়েছে আর কারা পরে এ নিয়ে আমার কিছু যায় আসে না, বরং এগুলো হলো মহান আল্লাহর অনুপম কৃপা ও অনুগ্রহ। এগুলো তাদের রিযিক। রেখে দেওয়ার চেয়ে এগুলো সমহারে তাদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়াই আমার কাছে ভালো মনে হয়েছে। (১৯৭) তবে উমর ইবনে খাত্তাব রা.-এর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল কিছুটা ব্যতিক্রম। বেতন-ভাতা নির্ধারণে তিনি কয়েকটি স্তর তৈরি করেন। যেমন, আল্লাহর রাসুলের বংশীয় লোকজন এক স্তরে। ইসলাম ও জিহাদে যারা অগ্রজ তারা এক স্তরে। যুদ্ধবিদ্যায় যারা দক্ষতা ও পারদর্শিতার স্বাক্ষর রেখেছেন তারা এক স্তরে। শত্রুপক্ষের কাছাকাছি সীমান্ত এলাকায় যারা বসবাস করেন তারা এক স্তরে। যারা দূরে অবস্থান করেন তারা এক স্তরে। এভাবে নানা শ্রেণি ও স্তর আবিষ্কার করে তাদের জন্য উপযুক্ত বেতন-ভাতা ধার্য করেন। (১৯৮)

উপর্যুক্ত মূলনীতির আলোকে স্তর নির্ণয়ের কারণে এর জন্য স্বতন্ত্র একটি বিভাগ চালু করা জরুরি হয়ে পড়ে। সৈনিকদের অধিকারের সুষ্ঠু ও সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে এরকম অভূতপূর্ব ভাতা ও সৈনিক বিভাগের প্রচলন ছিল ইসলামি সভ্যতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আমরা দেখতে পাই, সূচনালগ্ন থেকেই ভাতা বিভাগ অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং সুনিপুণভাবে পরিচালিত হয়। এমনকি উমর ইবনুল খাত্তাব রা. রাষ্ট্রের ছোট বড় কাউকেই ভাতা প্রদান থেকে বঞ্চিত করেননি, এমনকি নবজাতক শিশুকেও তিনি ভাতা প্রাপ্তদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন। আর এ বিভাগের পরিচালনানীতি সময় ও কালের পরিক্রমায় আরও সুসংগঠিত ও আধুনিক হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় পারস্য ও রোমান সৈনিকদের মধ্য থেকে ইসলাম গ্রহণ করা যোদ্ধাদেরও শেষ পর্যন্ত এই বিভাগের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। (১৯৯)

সাহাবিগণের মধ্যে অনেকে অধিক তাকওয়া অবলম্বন করার লক্ষ্যে ভাতাগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন। তাদের একজন হলেন হাকিম ইবনে হাযাম রা.। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উদ্দেশে বলেছিলেন,

يَا حَكِيمُ، إِنَّ هَذَا الْمَالَ خَضِرَةٌ حُلْوَةٌ، فَمَنْ أَخَذَهُ بِسَخَاوَةِ نَفْسٍ بُوْرِكَ لَهُ فِيْهِ، وَمَنْ أَخَذَهُ بِإِشْرَافِ نَفْسٍ لَمْ يُبَارَكْ لَهُ فِيْهِ»

হাকিম, এই (পার্থিব) অর্থসম্পদ খুব সবুজ-সতেজ ও মনোহর। অনীহা নিয়ে যে তা গ্রহণ করবে, তার জন্য তাতে বরকত দেওয়া হবে। আর যে লোভের বশবর্তী হয়ে আগ বেড়ে তা গ্রহণ করবে, তার জন্য তাতে বরকত দেওয়া হবে না। (২০০)

কোনো সন্দেহ নেই, এ ধরনের উপেক্ষানীতি ও লালসা-ত্যাগের ঘটনায় ওইসব উন্নত চরিত্রবান লোকদের পরিচয় পাওয়া যায়, যুগ যুগ ধরে কুরআন-সুন্নাহর আদর্শের ভিত্তিতে ইসলামি সভ্যতা যাদের সুনিপুণভাবে তৈরি করেছে।

উমাইয়া শাসনামলে আবদুল্লাহ ইবনে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিখ্যাত শাসক মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রা. ছিন্নমূল, বাস্তুহারা ও সর্বস্বান্তদের জন্য এই বিভাগ থেকে ভাতার ব্যবস্থা করেন। (২০১)

যুদ্ধবিদ্যায় দক্ষতা ও ইসলামের বিজয়াভিযানে সফলতার স্বাক্ষর রাখা সৈনিক ও সেনাপতিদের জন্য এই বিভাগ থেকে বিশেষ ভাতা ও সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ৮৩ হিজরিতে আফ্রিকা বিজয়ের পর সেনাপতি মুসা ইবনে নুসাইরকে বিশেষভাবে সম্মানিত করেন খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান। তেমনই আযরাকি খারেজি সম্প্রদায় দমনে অসামান্য অবদান রাখা মুহাল্লাব ইবনে আবু সাফরা ও তার সঙ্গীদেরও বিশেষভাবে সম্মানিত করে তাদের বেতন-ভাতা বাড়িয়ে দেন আরেক বিখ্যাত শাসক হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ। তাদের ব্যাপারে হাজ্জাজ বলেন, তারাই প্রকৃত কার্যনির্বাহী। তারাই অর্থসম্পদ লাভের সবচেয়ে বেশি অধিকারী। তারাই সীমান্ত শহরগুলো রক্ষা করে এবং শত্রুদের কোণঠাসা করে রাখে। (২০২)

এই বিভাগের গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে শাসকগণ সবসময় জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ লোকদের খুঁজে বের করে বিভাগ পরিচালনার দায়িত্ব দিতেন। এরই ধারাবাহিকতায় ইমাম লাইস ইবনে সাদকে এই বিভাগের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ করেন আবু জাফর আল-মনসুর। (২০৩) এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, ইসলামি রাজসভা জনগণের সুযোগ-সুবিধা ও উন্নতির কথা বিবেচনা করে সবসময় জ্ঞানী, যোগ্য, দক্ষ ও প্রশাসন পরিচালনায় অভিজ্ঞ লোকদেরকেই নিয়োগ দিতেন। অপরদিকে ভাতা ও সৈনিক বিভাগে কর্মরত লেখকের দায়িত্ব ছিল সকল প্রকার হিসাব, অশ্ব ও বাহনের প্রকার, সদস্যদের নাম, পদবি ও দায়িত্বের বিবরণগুলো সংরক্ষণ করা। (২০৪)

সৈনিক ও জনগণের বিষয়ে প্রশাসনিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ফলে এই বিভাগের অনেক প্রধানের পদোন্নতি ঘটে। এমনকি তাদের অনেকে সেনাবাহিনী প্রধানের পদেও উন্নীত হন। আব্বাসীয় খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা 'কারামেতা' সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য তৎকালীন সৈনিক ও ভাতা বিভাগের প্রধান মুহাম্মাদ ইবনে সুলাইমানকে সেনা প্রধানের দায়িত্ব দেন খলিফা মুকতাফি (মৃ. ২৯৫ হি.)। (২০৫)

সরকারি বিভিন্ন নথি সংরক্ষণে এই বিভাগের ছিল ঐতিহাসিক গুরুত্ব। যেমন, মানুষের মৃত্যুর সন-তারিখ সংরক্ষণ করা। এই বিভাগের সংরক্ষিত তালিকা থেকে অনেক সৈনিক ও মনীষীর মৃত্যুর তারিখ জানা যায়, যা অন্যত্র মৃত্যুবরণের কারণে আর কোনো ইতিহাসের গ্রন্থে পাওয়া যায়নি। সে হিসেবে এই বিভাগের ভূমিকা ছিল খিলাফতের প্রতিটি অঞ্চলের জাতীয় নাগরিকপঞ্জি সংরক্ষণের মতো। একবার শামের হিমসে এসে এক শাইখ স্থানীয় এক লোকের সঙ্গে কোনো এক বিষয় নিয়ে আলোচনারত ছিলেন। আলোচনার একপর্যায়ে বিখ্যাত মুজাহিদ খালেদ ইবনে মিদান আল-কুলায়ির মৃত্যু সন নিয়ে কথা ওঠে। স্থানীয় সেই লোকটি ছিল মুজাহিদ খালেদের খুব কাছের ব্যক্তি। সেই শাইখ দাবি করেন যে, ১০৮ হিজরি সনে আরমেনিয়ার যুদ্ধে মুজাহিদ খালেদ ইবনে মিদান আল- কুলায়ির সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎ করেছেন। কিন্তু মুজাহিদ খালেদের স্বজনদের বক্তব্য, তার ইনতেকাল হয়েছে ১০৪ হিজরিতে। বিষয়টি মীমাংসা করার জন্য তারা সৈনিক ও ভাতা বিভাগের শরণাপন্ন হলে সেখানে সংরক্ষিত নথি থেকে প্রমাণিত হয় আসলেই তিনি ১০৪ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন। (২০৬)

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, স্পেনে উমাইয়া শাসনামলে কবি ও ছড়াকারদেরও এই বিভাগ থেকে বিশেষ ভাতা দেওয়া হতো। কাব্যের মান অনুযায়ী তাদের জন্য ভাতা নির্ধারিত হতো। একবার হাজিব মনসুর ইবনে আবু আমিরের প্রশংসায় চমৎকার ভাষাশৈলী ব্যবহার করে কিছু কবিতা রচনা করেন কবি আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ আল-কাসতালি। কিন্তু তার ওই কবিতা আরেক বিখ্যাত কবি সাইদ ইবনুল হাসান আন্দালুসির রচিত কবিতার সাথে সাঙ্ঘর্ষিক হওয়ায় তার কবিতা নিয়ে লোকমুখে কুধারণা ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে তার প্রতি অপবাদের তির ছুড়ে দেয়। মনসুর ইবনে আমিরের আমলে কবিদের ভাতা নির্ধারণের জন্য আলাদা বিভাগ ছিল। কবিদের স্তর অনুযায়ী সেখান থেকে তাদের ভাতা মিলত। তো কুধারণায় পড়ে অনেকে মনসুরের কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ করে যে, এই লোকটি কাব্যচোর, অন্যের কবিতা আবৃত্তি করে নিজের বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা আছে তার। ভাতা বিভাগ থেকে কানাকড়িও পাওয়ার যোগ্য নয় সে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে একদিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাকে ডেকে পাঠান মনসুর। দিনটি ছিল ৩৮২ হিজরি সনের ৩ শাওয়াল। এরপর মনসুর তাকে কবিতা আবৃত্তি করতে বললে তিনি একের পর এক কবিতা আবৃত্তি করে মনসুরের সামনে তার কাব্যপ্রতিভা প্রমাণ করেন। ফলে সকল অপবাদের অবসান ঘটে। মনসুর তাকে নগদ একশ দিনার পুরস্কার প্রদান করেন এবং ভাতা বিভাগ থেকে তার জন্য মাসিক বেতনের ব্যবস্থা করে কবি হিসেবে তাকে বরণ করে নেন। (২০৭)

ইবনে খালদুনের বর্ণনা অনুযায়ী মামালিক সাম্রাজ্যে ভাতা বিভাগের প্রধানকে সেনাবাহিনী পর্যবেক্ষক উপাধিতে ডাকা হতো। বোঝা যায়, মামালিক বংশের রাজত্বকালে এই বিভাগের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছিল।

মোটকথা, ভাতা ও সৈনিক বিভাগ ছিল সমগ্র ইতিহাসজুড়ে ইসলামি সভ্যতার এক অনন্য প্রতীক। এই বিভাগের মাধ্যমেই ইসলামি রাষ্ট্র সাম্রাজ্যের সকল শ্রেণির বেতন-ভাতা ও সম্মানী নির্ধারণ করে সুনিপুণভাবে তা তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুমহান দায়িত্ব পালন করেছে।

টিকাঃ
১৯৬. আবদুর রহমান আমিরা, আল-ইসতিরাতিজিয়াতুল হারবিয়্যা ফি ইদারাতিল মাআরিকি ফিল-ইসলাম, পৃ. ৭৮।
১৯৭. আবু ইউসুফ, আল-খারাজ, পৃ. ৪২।
১৯৮. ফাতহিয়্যা নাবরাবি, তারিখুন নুযুমি ওয়াল-হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৮৩।
১৯৯. আকরাম আল-উমারি, আসরুল খিলাফাতির রাশিদাহ, পৃ. ৩৮০।
২০০. বুখারি, কিতাব: যাকাত, বাব : আল-ইসতিফাফ আনিল মুসাআলাতি, হাদিস নং ১৪০৩।
২০১. মুসআব যুবাইরি, নাসাবু কুরাইশ, পৃ. ১২৯।
২০২. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ৫, পৃ. ১৩৫।
২০৩. ইবনে আসাকির, তারিখু দিমাশক, খ. ৫০, পৃ. ৩৬৭।
২০৪. ইবনে কুতাইবা আদ-দিনাওয়ারি, আল-ইমামাতু ওয়াস-সিয়াসাতু, খ. ২, পৃ. ৩৩১।
২০৫. মাকরিযি, ইত্তিআযুল হুনাফা, পৃ. ৫১।
২০৬. ইবনুল আদিম, বুগয়াতুত তলাব ফি তারিখি হালব, খ. ৩, পৃ. ২৫৩।
২০৭. হুমাইদি, জাযওয়াতুল মুকতাবাস, পৃ. ৪০।

ভাতা ও সৈনিক বিভাগ চালু করার পেছনে প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সৈনিকদের সংখ্যা, তাদের নাম ও জাতীয়তা সংরক্ষণ করে তাদের জন্য উপযুক্ত ভাতা নির্ধারণ করা। সেই সঙ্গে কে কখন ভাতা গ্রহণ করবেন এবং কে কী ধরনের হাতিয়ার বহন করবেন তা নির্দিষ্ট করা। এতে করে যোদ্ধাদের সুবিধার পাশাপাশি তাদের পরিবার ও স্বজনদের জন্যও অনেক সহযোগিতা হতো। (১৯৬) এ ধরনের ভাতা বিভাগ প্রথম চালু করেন আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনুল খাত্তাব রা.। এ ব্যাপারে সকল ইতিহাসবিদ একমত।

আবু বকর রা.-এর ইনতেকালের পর মুসলিমদের আমির নিযুক্ত হন উমর ইবনে খাত্তাব রা.। আর রাষ্ট্র পরিচালনায় উমরের ছিল এক বিশেষ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি। বিশেষত অর্থনৈতিক বিষয়ে। এ কারণেই তিনি ভাতার জন্য স্বতন্ত্র বিভাগ চালু করেন। অন্যদিকে মহান আল্লাহর ইচ্ছা ও সহায়তায় খিলাফত যখন সম্প্রসারিত হচ্ছিল, তখন মুসলিমদের দখলে আসতে থাকে একের পর এক ভূখণ্ড এবং প্রচুর অর্থসম্পদ। এরই পরিপ্রেক্ষিতে উমর রা. চাচ্ছিলেন মানুষের মাঝে এসব অর্থসম্পদ সর্বোত্তম উপায়ে বণ্টন করতে। এর আগে আবু বকর রা. কে আগে মুসলিম হয়েছে আর কে পরে তা পার্থক্য না করে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সমহারে মানুষের মাঝে বণ্টন করে দিতেন। একদল সাহাবি এতে আপত্তি করলে তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কারা আগে মুসলিম হয়েছে আর কারা পরে এ নিয়ে আমার কিছু যায় আসে না, বরং এগুলো হলো মহান আল্লাহর অনুপম কৃপা ও অনুগ্রহ। এগুলো তাদের রিযিক। রেখে দেওয়ার চেয়ে এগুলো সমহারে তাদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়াই আমার কাছে ভালো মনে হয়েছে। (১৯৭) তবে উমর ইবনে খাত্তাব রা.-এর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল কিছুটা ব্যতিক্রম। বেতন-ভাতা নির্ধারণে তিনি কয়েকটি স্তর তৈরি করেন। যেমন, আল্লাহর রাসুলের বংশীয় লোকজন এক স্তরে। ইসলাম ও জিহাদে যারা অগ্রজ তারা এক স্তরে। যুদ্ধবিদ্যায় যারা দক্ষতা ও পারদর্শিতার স্বাক্ষর রেখেছেন তারা এক স্তরে। শত্রুপক্ষের কাছাকাছি সীমান্ত এলাকায় যারা বসবাস করেন তারা এক স্তরে। যারা দূরে অবস্থান করেন তারা এক স্তরে। এভাবে নানা শ্রেণি ও স্তর আবিষ্কার করে তাদের জন্য উপযুক্ত বেতন-ভাতা ধার্য করেন। (১৯৮)

উপর্যুক্ত মূলনীতির আলোকে স্তর নির্ণয়ের কারণে এর জন্য স্বতন্ত্র একটি বিভাগ চালু করা জরুরি হয়ে পড়ে। সৈনিকদের অধিকারের সুষ্ঠু ও সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে এরকম অভূতপূর্ব ভাতা ও সৈনিক বিভাগের প্রচলন ছিল ইসলামি সভ্যতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আমরা দেখতে পাই, সূচনালগ্ন থেকেই ভাতা বিভাগ অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং সুনিপুণভাবে পরিচালিত হয়। এমনকি উমর ইবনুল খাত্তাব রা. রাষ্ট্রের ছোট বড় কাউকেই ভাতা প্রদান থেকে বঞ্চিত করেননি, এমনকি নবজাতক শিশুকেও তিনি ভাতা প্রাপ্তদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন। আর এ বিভাগের পরিচালনানীতি সময় ও কালের পরিক্রমায় আরও সুসংগঠিত ও আধুনিক হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় পারস্য ও রোমান সৈনিকদের মধ্য থেকে ইসলাম গ্রহণ করা যোদ্ধাদেরও শেষ পর্যন্ত এই বিভাগের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। (১৯৯)

সাহাবিগণের মধ্যে অনেকে অধিক তাকওয়া অবলম্বন করার লক্ষ্যে ভাতাগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন। তাদের একজন হলেন হাকিম ইবনে হাযাম রা.। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উদ্দেশে বলেছিলেন,

يَا حَكِيمُ، إِنَّ هَذَا الْمَالَ خَضِرَةٌ حُلْوَةٌ، فَمَنْ أَخَذَهُ بِسَخَاوَةِ نَفْسٍ بُوْرِكَ لَهُ فِيْهِ، وَمَنْ أَخَذَهُ بِإِشْرَافِ نَفْسٍ لَمْ يُبَارَكْ لَهُ فِيْهِ»

হাকিম, এই (পার্থিব) অর্থসম্পদ খুব সবুজ-সতেজ ও মনোহর। অনীহা নিয়ে যে তা গ্রহণ করবে, তার জন্য তাতে বরকত দেওয়া হবে। আর যে লোভের বশবর্তী হয়ে আগ বেড়ে তা গ্রহণ করবে, তার জন্য তাতে বরকত দেওয়া হবে না। (২০০)

কোনো সন্দেহ নেই, এ ধরনের উপেক্ষানীতি ও লালসা-ত্যাগের ঘটনায় ওইসব উন্নত চরিত্রবান লোকদের পরিচয় পাওয়া যায়, যুগ যুগ ধরে কুরআন-সুন্নাহর আদর্শের ভিত্তিতে ইসলামি সভ্যতা যাদের সুনিপুণভাবে তৈরি করেছে।

উমাইয়া শাসনামলে আবদুল্লাহ ইবনে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিখ্যাত শাসক মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রা. ছিন্নমূল, বাস্তুহারা ও সর্বস্বান্তদের জন্য এই বিভাগ থেকে ভাতার ব্যবস্থা করেন। (২০১)

যুদ্ধবিদ্যায় দক্ষতা ও ইসলামের বিজয়াভিযানে সফলতার স্বাক্ষর রাখা সৈনিক ও সেনাপতিদের জন্য এই বিভাগ থেকে বিশেষ ভাতা ও সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ৮৩ হিজরিতে আফ্রিকা বিজয়ের পর সেনাপতি মুসা ইবনে নুসাইরকে বিশেষভাবে সম্মানিত করেন খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান। তেমনই আযরাকি খারেজি সম্প্রদায় দমনে অসামান্য অবদান রাখা মুহাল্লাব ইবনে আবু সাফরা ও তার সঙ্গীদেরও বিশেষভাবে সম্মানিত করে তাদের বেতন-ভাতা বাড়িয়ে দেন আরেক বিখ্যাত শাসক হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ। তাদের ব্যাপারে হাজ্জাজ বলেন, তারাই প্রকৃত কার্যনির্বাহী। তারাই অর্থসম্পদ লাভের সবচেয়ে বেশি অধিকারী। তারাই সীমান্ত শহরগুলো রক্ষা করে এবং শত্রুদের কোণঠাসা করে রাখে। (২০২)

এই বিভাগের গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে শাসকগণ সবসময় জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ লোকদের খুঁজে বের করে বিভাগ পরিচালনার দায়িত্ব দিতেন। এরই ধারাবাহিকতায় ইমাম লাইস ইবনে সাদকে এই বিভাগের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ করেন আবু জাফর আল-মনসুর। (২০৩) এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, ইসলামি রাজসভা জনগণের সুযোগ-সুবিধা ও উন্নতির কথা বিবেচনা করে সবসময় জ্ঞানী, যোগ্য, দক্ষ ও প্রশাসন পরিচালনায় অভিজ্ঞ লোকদেরকেই নিয়োগ দিতেন। অপরদিকে ভাতা ও সৈনিক বিভাগে কর্মরত লেখকের দায়িত্ব ছিল সকল প্রকার হিসাব, অশ্ব ও বাহনের প্রকার, সদস্যদের নাম, পদবি ও দায়িত্বের বিবরণগুলো সংরক্ষণ করা। (২০৪)

সৈনিক ও জনগণের বিষয়ে প্রশাসনিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ফলে এই বিভাগের অনেক প্রধানের পদোন্নতি ঘটে। এমনকি তাদের অনেকে সেনাবাহিনী প্রধানের পদেও উন্নীত হন। আব্বাসীয় খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা 'কারামেতা' সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য তৎকালীন সৈনিক ও ভাতা বিভাগের প্রধান মুহাম্মাদ ইবনে সুলাইমানকে সেনা প্রধানের দায়িত্ব দেন খলিফা মুকতাফি (মৃ. ২৯৫ হি.)। (২০৫)

সরকারি বিভিন্ন নথি সংরক্ষণে এই বিভাগের ছিল ঐতিহাসিক গুরুত্ব। যেমন, মানুষের মৃত্যুর সন-তারিখ সংরক্ষণ করা। এই বিভাগের সংরক্ষিত তালিকা থেকে অনেক সৈনিক ও মনীষীর মৃত্যুর তারিখ জানা যায়, যা অন্যত্র মৃত্যুবরণের কারণে আর কোনো ইতিহাসের গ্রন্থে পাওয়া যায়নি। সে হিসেবে এই বিভাগের ভূমিকা ছিল খিলাফতের প্রতিটি অঞ্চলের জাতীয় নাগরিকপঞ্জি সংরক্ষণের মতো। একবার শামের হিমসে এসে এক শাইখ স্থানীয় এক লোকের সঙ্গে কোনো এক বিষয় নিয়ে আলোচনারত ছিলেন। আলোচনার একপর্যায়ে বিখ্যাত মুজাহিদ খালেদ ইবনে মিদান আল-কুলায়ির মৃত্যু সন নিয়ে কথা ওঠে। স্থানীয় সেই লোকটি ছিল মুজাহিদ খালেদের খুব কাছের ব্যক্তি। সেই শাইখ দাবি করেন যে, ১০৮ হিজরি সনে আরমেনিয়ার যুদ্ধে মুজাহিদ খালেদ ইবনে মিদান আল- কুলায়ির সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎ করেছেন। কিন্তু মুজাহিদ খালেদের স্বজনদের বক্তব্য, তার ইনতেকাল হয়েছে ১০৪ হিজরিতে। বিষয়টি মীমাংসা করার জন্য তারা সৈনিক ও ভাতা বিভাগের শরণাপন্ন হলে সেখানে সংরক্ষিত নথি থেকে প্রমাণিত হয় আসলেই তিনি ১০৪ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন। (২০৬)

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, স্পেনে উমাইয়া শাসনামলে কবি ও ছড়াকারদেরও এই বিভাগ থেকে বিশেষ ভাতা দেওয়া হতো। কাব্যের মান অনুযায়ী তাদের জন্য ভাতা নির্ধারিত হতো। একবার হাজিব মনসুর ইবনে আবু আমিরের প্রশংসায় চমৎকার ভাষাশৈলী ব্যবহার করে কিছু কবিতা রচনা করেন কবি আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ আল-কাসতালি। কিন্তু তার ওই কবিতা আরেক বিখ্যাত কবি সাইদ ইবনুল হাসান আন্দালুসির রচিত কবিতার সাথে সাঙ্ঘর্ষিক হওয়ায় তার কবিতা নিয়ে লোকমুখে কুধারণা ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে তার প্রতি অপবাদের তির ছুড়ে দেয়। মনসুর ইবনে আমিরের আমলে কবিদের ভাতা নির্ধারণের জন্য আলাদা বিভাগ ছিল। কবিদের স্তর অনুযায়ী সেখান থেকে তাদের ভাতা মিলত। তো কুধারণায় পড়ে অনেকে মনসুরের কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ করে যে, এই লোকটি কাব্যচোর, অন্যের কবিতা আবৃত্তি করে নিজের বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা আছে তার। ভাতা বিভাগ থেকে কানাকড়িও পাওয়ার যোগ্য নয় সে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে একদিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাকে ডেকে পাঠান মনসুর। দিনটি ছিল ৩৮২ হিজরি সনের ৩ শাওয়াল। এরপর মনসুর তাকে কবিতা আবৃত্তি করতে বললে তিনি একের পর এক কবিতা আবৃত্তি করে মনসুরের সামনে তার কাব্যপ্রতিভা প্রমাণ করেন। ফলে সকল অপবাদের অবসান ঘটে। মনসুর তাকে নগদ একশ দিনার পুরস্কার প্রদান করেন এবং ভাতা বিভাগ থেকে তার জন্য মাসিক বেতনের ব্যবস্থা করে কবি হিসেবে তাকে বরণ করে নেন। (২০৭)

ইবনে খালদুনের বর্ণনা অনুযায়ী মামালিক সাম্রাজ্যে ভাতা বিভাগের প্রধানকে সেনাবাহিনী পর্যবেক্ষক উপাধিতে ডাকা হতো। বোঝা যায়, মামালিক বংশের রাজত্বকালে এই বিভাগের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছিল।

মোটকথা, ভাতা ও সৈনিক বিভাগ ছিল সমগ্র ইতিহাসজুড়ে ইসলামি সভ্যতার এক অনন্য প্রতীক। এই বিভাগের মাধ্যমেই ইসলামি রাষ্ট্র সাম্রাজ্যের সকল শ্রেণির বেতন-ভাতা ও সম্মানী নির্ধারণ করে সুনিপুণভাবে তা তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুমহান দায়িত্ব পালন করেছে।

টিকাঃ
১৯৬. আবদুর রহমান আমিরা, আল-ইসতিরাতিজিয়াতুল হারবিয়্যা ফি ইদারাতিল মাআরিকি ফিল-ইসলাম, পৃ. ৭৮।
১৯৭. আবু ইউসুফ, আল-খারাজ, পৃ. ৪২।
১৯৮. ফাতহিয়্যা নাবরাবি, তারিখুন নুযুমি ওয়াল-হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৮৩।
১৯৯. আকরাম আল-উমারি, আসরুল খিলাফাতির রাশিদাহ, পৃ. ৩৮০।
২০০. বুখারি, কিতাব: যাকাত, বাব : আল-ইসতিফাফ আনিল মুসাআলাতি, হাদিস নং ১৪০৩।
২০১. মুসআব যুবাইরি, নাসাবু কুরাইশ, পৃ. ১২৯।
২০২. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ৫, পৃ. ১৩৫।
২০৩. ইবনে আসাকির, তারিখু দিমাশক, খ. ৫০, পৃ. ৩৬৭।
২০৪. ইবনে কুতাইবা আদ-দিনাওয়ারি, আল-ইমামাতু ওয়াস-সিয়াসাতু, খ. ২, পৃ. ৩৩১।
২০৫. মাকরিযি, ইত্তিআযুল হুনাফা, পৃ. ৫১।
২০৬. ইবনুল আদিম, বুগয়াতুত তলাব ফি তারিখি হালব, খ. ৩, পৃ. ২৫৩।
২০৭. হুমাইদি, জাযওয়াতুল মুকতাবাস, পৃ. ৪০।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 ওয়াকফ বিভাগ

📄 ওয়াকফ বিভাগ


বিশ্বনবীর যুগ থেকে আজ পর্যন্ত সমাজসেবা, জনকল্যাণমূলক কাজ এবং আল্লাহর ইবাদত প্রতিষ্ঠায় পাল্লা দিয়ে এগিয়েছেন মুসলিমগণ। এর মধ্যে ওয়াকফ ছিল সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং মুসলিম জনসাধারণের বেশি উপকারে আসা উদ্যোগসমূহের একটি। ওয়াকফ ব্যবস্থা ছিল ওই ভিত্তি প্রস্তরের মতো, ইসলামি সভ্যতার পুরো ইতিহাসজুড়ে প্রতিটি সেবামূলক সংগঠন যা সুষ্ঠুরূপে পালন ও বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছে। মুসলিম সমাজের জাগরণ ও উন্নতি সাধনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে। সভ্যতা বিনির্মাণে এবং ইসলামি ওয়াকফ ব্যবস্থার গোড়াপত্তনে মুসলিম মানসে যে মূলমন্ত্র কাজ করেছিল এবং বিশ্বনবীর যুগ থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত মুসলিম হৃদয়ে যে প্রচেষ্টা নিজ গতিতে প্রবাহিত হয়ে চলে আসছিল, চিন্তাশীল মাত্রই তার মূল রহস্য জেনে অবাক হবেন। তা ছাড়া এ কথাও দিবালোকের মতো পরিষ্কার যে, ওয়াকফ ব্যবস্থা মানবতার কল্যাণ সাধনে গঠিত নির্ভেজাল একটি ইসলামি উদ্যোগ, ইসলামি সভ্যতার অভ্যুদয়ের প্রাক ও সমকালে অন্য কোনো সভ্যতায় এরকম নজির আছে বলে ইতিহাসে পাওয়া যায় না।

প্রথমে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকল স্তরের মুসলিমের জন্য ওয়াকফ ব্যবস্থার প্রচলন করেন। ইসলামে প্রথম ওয়াকফ সম্পত্তি ছিল সাহাবি মুখাইরিকের (২০৮) জমিসমূহ। তাবাকাতে ইবনে সাদ গ্রন্থে মুহাম্মাদ ইবনে কাব আল কুরাযির বরাতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যামানায় মদিনার সাতটি বাগান ওয়াকফ সম্পত্তিভুক্ত ছিল। সেগুলো হলো যথাক্রমে, আল-আওয়াফ, আস-সাফিয়া, আদ-দাল্লাল, আল-মাইসাব, বারকা, হাসনা এবং মাশরাবা উম্মে ইবরাহিম। ইবনে কাব বলেন, এরপর মুসলিমগণ তাদের পুত্র ও পৌত্রদের নামে সেগুলো ওয়াকফ করে দেন। (২০৯)

আল্লাহর রাসুলের জীবদ্দশায় এবং তার ওফাতের পর অধিকাংশ সাহাবি নিজেদের নামে কিছু না কিছু ওয়াকফ করে যান। এর মধ্যে উমর ইবনুল খাত্তাবের ওয়াকফ, উসমান ইবনে আফফানের ওয়াকফ, তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহর ওয়াকফ, আলি ইবনে আবু তালিবের ওয়াকফ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এ সকল ওয়াকফ সম্পত্তি জনসাধারণের সেবা ও কল্যাণের কাজে ব্যবহার করা হয়।

উমর ইবনুল খাত্তাব রা. ওয়াকফনামার বিবরণে লেখেন যে, তার এই ওয়াকফ সম্পত্তির লভ্যাংশ দরিদ্র, নিকটাত্মীয়, মুক্তিকামী দাস, আল্লাহর পথের মুজাহিদ, অতিথি এবং মুসাফির-ভিক্ষুকদের জন্য ব্যয় করা হবে। তবে এগুলো রক্ষণাবেক্ষণে দায়িত্বশীল ব্যক্তি সুষ্ঠু উপায়ে তা থেকে উপকৃত ব্যক্তি হতে পারবে এবং অধিকার প্রতিষ্ঠা না করে তা থেকে যেকোনো বন্ধুকেও খাওয়াতে পারবে। (২১০)

ওয়াকফকারীর মত অনুযায়ী ওয়াকফকৃত সম্পত্তি দেখাশোনার দায়িত্ব অর্পিত হয় উপকারভোগীদের ওপর, অথবা নির্দিষ্ট কমিটির ওপর। তবে প্রথম দিকে ইসলামি রাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপ সেখানে ছিল না। এরপর উমাইয়া খলিফা হিশাম ইবনে আবদুল মালিকের শাসনামলে কাযি তওবা ইবনে নামির আল-হাদরামি(২১১) মিশরের বিচারক পদে নিযুক্ত হলে তিনি লক্ষ করেন, ওয়াকফ সম্পত্তি ওয়াকফকারীর পরিবার ও সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বশীলদের মাঝেই সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। ফলে সম্পত্তির মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রকৃত ভোক্তা শ্রেণি। যার কারণে ওয়াকফের শর্তাবলি যথাযথভাবে পালন নিশ্চিত করতে তিনি নিজে ওয়াকফ সম্পত্তি দেখাশোনার দায়িত্ব নেন। এর ফলাফলও হাতেনাতে পায় মিশরের জনগণ। কাযি তওবার ইনতেকালের পরপরই ওয়াকফ সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ ও তার সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য মিশরে স্বতন্ত্র সরকারি বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। যার প্রধান হিসেবে থাকতেন একজন বিচারক। বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রে এ প্রক্রিয়ার সূচনা ঘটলে মিশরেই তা পূর্ণতা লাভ করে। এভাবেই একজন বিচারক সবসময় এ বিভাগের প্রধানের দায়িত্বে থেকে ওয়াকফের শর্তাবলি অনুযায়ী সম্পত্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতেন। তবে ওয়াকফকারীর শর্তমতে সম্পত্তির কোনো মুতাওয়াল্লি নির্দিষ্ট করা থাকলে তিনিই বিচারকের সহযোগিতা ও দিক-নির্দেশনা নিয়ে প্রকল্প দেখাশোনা করতেন। (২১২)

হিজরি চতুর্থ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। এ সময় আলাদা মুতাওয়াল্লি নিযুক্ত করে ওয়াকফ প্রকল্প দেখাশোনার সকল দায়দায়িত্ব তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হতো। তিনিই প্রকল্পের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন। ওয়াকফ বিভাগের দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী সম্পত্তির লভ্যাংশ গরিব-মিসকিন ও ভোক্তাদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। ওয়াকফ বিভাগ স্বতন্ত্র একটি বিভাগ হওয়ার পেছনে এটাই ছিল কারণ। এই বিভাগ নতুন হওয়া সত্ত্বেও দিন যতই গড়িয়েছে এ বিভাগের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বিভাগীয় প্রধানের ততই পদোন্নতি ঘটেছে। এমনকি তাদের অনেকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন বলেও ইতিহাসে পাওয়া যায়। মিশরে প্রধান বিচারপতির পদকেও ছাপিয়ে যায় ওয়াকফ বিভাগীয় প্রধানের পদ।

এরকম ঘটনাও প্রসিদ্ধ আছে, ঈদ বা জাতীয় উৎসবের মৌসুমে জনগণের পক্ষ থেকে সুলতানকে শুভেচ্ছা জানানোর অনুষ্ঠান পর্যবেক্ষণের জন্য মিশরের প্রধান বিচারপতি একবার তার সেবককে বলে পাঠালেন, যাও, রাজদরবারের গেটে দাঁড়িয়ে থাকো। ওয়াকফ বিভাগীয় প্রধান সুলতানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে চলে গেলে আমাকে এসে সংবাদ দিয়ো। এরপর ঠিকই ওয়াকফ বিভাগীয় প্রধান সুলতানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বিদায় হলে প্রধান বিচারপতি এসে সুলতানের প্রতি অভিনন্দন ব্যক্ত করেন। এ ঘটনার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লুমাউল কাওয়ানিনিল মুদিয়্যা ফি দাওয়াবিনিদ দিয়ারিল মিসরিয়‍্যা গ্রন্থকার নাবুলুসি (২১৩) বলেন, রাজদরবারে দুজন প্রভাবশালী রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিত্বের সমাবেশ এড়াতেই তিনি এ ঘটনার জন্ম দেন। যাই হোক, রাজদরবারে ওয়াকফ বিভাগের প্রধানের স্থান ছিল ঠিক সুলতানের বাঁ পাশেই। কারণ রাষ্ট্রীয়ভাবে তার ছিল অসামান্য গুরুত্ব এবং তিনি ছিলেন উন্নত মর্যাদার অধিকারী। মাকরিযি বলেন, ওয়াকফ বিভাগের প্রধান সরাসরি সকল সরকারি বিভাগসমূহে হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা রাখতেন। আর সেখানে কেবল একনিষ্ঠ ও মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য মুসলিম লেখকদেরকেই কাজের সুযোগ দেওয়া হতো। (২১৪)

তবে উসমানীয় খিলাফতের সময় সম্পূর্ণ নতুন ওয়াকফ ব্যবস্থার গোড়াপত্তন হয়। যেসব জমিতে ওয়াকফ ভবন নির্মাণ করা হবে এবং যে অর্থসম্পদে যাকাত ওয়াজিব হয় না এবং ব্যবসার জন্য নির্ধারিত নয় তবে তা প্রবৃদ্ধিমূলক কাজে ব্যবহার করা যায় এবং দায়িত্বশীলগণ তা ভাড়া দিয়ে অথবা তা থেকে অর্জিত লভ্যাংশ থেকে উপকৃত হন এরকম আধুনিক নিয়মনীতি এবং ওয়াকফ ভূমির ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত নীতিমালা ওই নতুন ওয়াকফ ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত হয়। আজ পর্যন্ত অনেক আরবরাষ্ট্রে ভূমির সেই বিভাজন ব্যবস্থা ও নীতিমালা পুরোপুরি অনুসরণ করা হচ্ছে। উসমানীয় শাসনতন্ত্রের প্রণয়ন করা ওয়াকফ-বিষয়ক আরেকটি ব্যবস্থা হলো 'নির্দেশনা ও দায়িত্ব প্রদান বিভাগ'। এই বিভাগের কাজ ছিল অলাভজনক ওয়াকফ সম্পত্তি দেখাশোনার জন্য সঠিক পেশা ও দায়িত্ব নির্ধারণ করা। ওয়াকফ সম্পত্তির মুতাওয়াল্লি হওয়ার জন্য আগ্রহীদের পরীক্ষা গ্রহণ করা। আগ্রহীদের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় ধর্মীয় পেশা প্রাধান্য পেত। যেমন মসজিদের ইমাম হওয়া, মুয়াজ্জিন হওয়া, খতিব হওয়া, ধর্মীয় শিক্ষক হওয়া ইত্যাদি। এভাবেই উসমানীয় খিলাফতের সময় থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত পুরো মুসলিম-বিশ্বজুড়ে অব্যাহত আছে এই ওয়াকফ ব্যবস্থা। অবশেষে ওয়াকফের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয়ও গঠন করা হয়। (২১৫)

আর ওয়াকফ ব্যবস্থাপনায় স্থান পায় গুরুত্বপূর্ণ সব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। মসজিদ নির্মাণ, লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা, হাসপাতাল নির্মাণ, সড়ক ও পথ নির্মাণ, নলকূপ স্থাপন, অতিথি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং মাদরাসা প্রতিষ্ঠাসহ ধর্মীয় ও মানবিক দিক থেকে ইসলামি সমাজের চাহিদা পূরণে কার্যকর এরকম অনেক প্রকল্পই ছিল ওয়াকফ ব্যবব্যবস্থার আওতাধীন।

ধর্মীয় ক্ষেত্রে ওয়াকফ ব্যবব্যবস্থার অসামান্য অবদান আমাদের চোখের সামনেই। আর মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাজারো মসজিদ প্রতিষ্ঠার পেছনে ওয়াকফকারীদের উদ্দেশ্য ছিল একটাই, মুসলিমদের জন্য জামাতে নামায আদায়ের সুব্যবস্থা করে আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন এবং পরকালে অফুরন্ত প্রতিদান লাভ।

শিক্ষাঙ্গনে আমরা মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ওয়াকফ ব্যবস্থায় নির্মিত শত শত মাদরাসা দেখতে পাই, যা হাজার বছর ধরে বিদগ্ধ মুসলিম মনীষী তৈরি করে বিশ্ব দরবারে মুসলিমজাতির ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে চলেছে, যার সওয়াব ওয়াকফকারীগণ অবিরাম পেয়ে আসছেন এবং পেতে থাকবেন।

শিক্ষাক্ষেত্রে ওয়াকফ ব্যবব্যবস্থার পুনর্জাগরণে অসামান্য অবদান রাখা সব থেকে বিখ্যাত সুলতান হলেন সালাহুদ্দিন আইয়ুবি রহ.। মিশরে তার ওয়াকফকীর্তির অন্যতম হলো, তিনি কায়রোতে অবস্থিত ইমাম হুসাইন ওয়াকফ আলি স্কয়ার হিসেবে খ্যাত সেই পবিত্র স্থানের পাশেই একটি বড় মাদরাসা নির্মাণ করে তা ওয়াকফ করে দেন। মিশরের জনগণের কল্যাণে নিবেদিত 'দারে সায়িদিস সুআদা' নামে একটি সর্বজনীন খানকা নির্মাণ করে তাও ওয়াকফ করে দেন। 'দারে আব্বাস ইবনুস সাল্লার' নামে একটি হানাফি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে তা ওয়াকফ করে দেন মিশরে শাফিয়ি মাযহাবের ওপর পড়াশোনার জন্য তিনি 'যাইনুন নাজ্জার' নামে বিখ্যাত মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে তা ওয়াকফ করে যান। তা ছাড়া মালেকি মাযহাবের ওপর পড়াশোনা করার জন্যেও তিনি মিশরে স্বতন্ত্র মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। (২১৬)

সামাজিক অঙ্গনে ওয়াকফ ব্যবস্থার অবদান হিসেবে পথঘাট নির্মাণ, দরিদ্র-নিকেতন ও অভাবগ্রস্তদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণসহ গরিব মিসকিনদের জন্য আরও অনেক ওয়াকফ প্রক্রিয়া চলমান ছিল, যা ইসলামের স্বর্ণযুগে প্রচলিত যৌথ সামাজিক উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় আমির নুরুদ্দিন মাহমুদ আলেপ্পোসহ সমগ্র মুসলিমবিশ্বে অসুস্থ, এতিম ও দরিদ্রদের জন্য নানাবিধ ওয়াকফ প্রকল্পের সূচনা করেন। পবিত্র নগরী মক্কায় একেবারে হারাম শরিফের কাছে নির্মিত বিরাট বাগানটি ৬৯৭ হিজরি সনে দরিদ্র, মিসকিন, মুসাফির ও হাজিদের জন্য ওয়াকফ করে দেন শাইখ আযুদুদ্দৌলা রাইহানুন্নাদা শিহাবি, যাকে সবাই হারাম শরিফের সেবকদের শাইখ বলে ডাকেন। (২১৭)

মামলুকি রাজবংশের সুলতান যাহের বারকুক জাবাল দুর্গে(২১৮) বসবাসরত এতিম শিশুদের জন্য কুরআন পাঠ ও হিফয করার একটি বড় মক্তব প্রতিষ্ঠা করে তা ওয়াকফ করে দেন। ওই দুর্গ থেকেই মিশর ও শামসহ সুলতানের অনুগত সকল অঞ্চল শাসন করা হতো। পূর্ববর্তীকালের বাদশা, সুলতান, ধনী ও মুসলিম সমাজসেবকগণ ওয়াকফের কাজে কী পরিমাণ অগ্রগামী ছিলেন, তা এই উদাহরণ থেকেই স্পষ্ট। এসব ওয়াকফ প্রকল্প মুসলিম সামাজিক জীবনের মানোন্নয়নে যে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

সিরিয়ার দামেশকেও এরকম অনেক ওয়াকফ প্রকল্প প্রচলিত ছিল যা ইসলামের সৌন্দর্য ও সৌহার্দ্যের প্রতীককে সমুন্নত করেছে। বিখ্যাত মুসলিম পর্যটক ইবনে বতুতা বড় আশ্চর্য ও বিস্ময় ভরা কণ্ঠে সেই ওয়াকফ প্রকল্পগুলোর বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দামেশকে আওকাফ প্রকল্পের সংখ্যা এবং এ খাতে ব্যয়ের বাজেট হিসাব করে শেষ করার মতো নয়। এর মধ্যে একটি ছিল অপারগ হাজিদের জন্য হজের ব্যয়ভার বহন করা। সেই তহবিল থেকে প্রয়োজন অনুপাতে প্রত্যেক হাজিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হতো। অন্য একটি প্রকল্প হলো, দরিদ্র পরিবারের বিয়ের উপযুক্ত মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা করে প্রসাধনী ও আসবাবপত্রসহ স্বামীর হাতে তুলে দেওয়া। এ ছাড়া অন্যান্য উল্লেখযোগ্য প্রকল্পের মধ্যে ছিল বন্দিমুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ। দুঃস্থ, অভাবী, পথিক, মুসাফিরদের জন্য সহযোগিতা প্রদান, এই প্রকল্প থেকে তাদের জন্য অন্নবস্ত্র ও নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজনীয় পাথেয়ের ব্যবস্থা করা হতো। আরও ছিল সড়ক ও ফুটপাত সংস্কার। তৎকালীন দামেশকের প্রধান সড়কগুলোর দুপাশে পথচারীদের হাঁটার জন্য ফুটপাতের ব্যবস্থা ছিল। এ ছাড়া দামেশকে আরও অনেক সেবামূলক কাজ প্রচলিত ছিল ওয়াকফ বিভাগের তত্ত্বাবধানে।(২১৯) যার সুফল দামেশকে বসবাসরত সকল মুসলিম-অমুসলিম সমানভাবে ভোগ করত।

ইবনে বতুতার বর্ণনা করা আরেক বিস্ময়কর বিবরণ হলো পাত্র মেরামত ওয়াকফ প্রকল্প। তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, একবার আমি দামেশকের একটি গলি পার হওয়ার সময় দেখি, অল্পবয়স্ক একজন দাসের হাত থেকে চীনের তৈরি দামি একটি থালা মাটিতে পড়ে ভেঙে যায়। তা দেখে আশপাশের মানুষেরা জড়ো হলে একজন বলতে থাকেন, বাসনের এই ভাঙা অংশগুলো নিয়ে গিয়ে পাত্র মেরামত ওয়াকফ বিভাগের দায়িত্বশীলকে দেখাও। এরপর দাস সেগুলো তাড়াতাড়ি উঠিয়ে ওই বিভাগে যায়। সঙ্গে যায় ওই লোকটিও। ওখানে গিয়ে বাসনের ভাঙা অংশগুলো দেখালে এরকম পাত্র কেনার মতো মূল্য সে দিয়ে দেয়। ফলে ওই ভৃত্য গিয়ে অনুরূপ নতুন আরেকটি বাসন কিনে নেয়। এটি খুব সুন্দর একটি উদ্যোগ। কারণ ভৃত্য হওয়ায় দামি একটি বাসন ভাঙার অপরাধে মনিব অবশ্যই তাকে গালমন্দ বা প্রহার করত, এতে বালকটি কষ্ট পেত। এরকম পাত্র মেরামত ওয়াকফ প্রকল্পের মতো সুন্দর উদ্যোগ মানুষের হৃদয় জয় করে নেয়। যারা এরকম অসাধারণ উদ্যোগ গ্রহণ করে সমাজসেবা করেছেন তাদের আল্লাহ ভরপুর প্রতিদান দিন সবসময়, আমরা এই দোয়াই করি।(২২০)

এমনকি একাধিক ইসলামি রাষ্ট্রে বিয়েশাদিতে কনের সাজগোজের জন্য দামি প্রসাধনী ও স্বর্ণালংকার ভাড়া দেওয়ার মতো ওয়াকফ প্রকল্পগুলোও ছিল উল্লেখযোগ্য। এতে করে বরকনে উভয়ের আনন্দ-উৎসবে ভিন্ন মাত্রা যোগ হতো। এরকম দামি অলংকার পরিয়ে স্ত্রীকে ঘরে তোলার মতো সাধ ও সাধ্য যাদের নেই, সেইসব দরিদ্র, অসহায় ও গরিবের জন্যই ছিল এই ওয়াকফ প্রকল্পের ব্যবস্থা। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে আবার সেগুলো ওয়াকফ কার্যালয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হতো। এভাবেই স্বামী-স্ত্রী উভয়ে পরমানন্দে বিয়ের অনুষ্ঠান উদ্যাপন করে উপলক্ষ্যটি সুখময় ও স্মৃতিবহ করে তুলত। (২২১)

তিউনিসিয়ায় ছিল দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য খতনার ওয়াকফ বিভাগ। খতনা করিয়ে শিশুকে নতুন পোশাক ও কিছু দিরহাম উপহার দেওয়া হতো। সেখানে রমযান মাসে বিনামূল্যে মিষ্টি বিতরণও ছিল একরকম ওয়াকফ উদ্যোগ। বছরের নির্দিষ্ট একটি সময়ে তিউনিসিয়ার সমুদ্রতীরে প্রচুর পরিমাণ মাছ ভেসে উঠত। এ কারণে সেখানে এক ধরনের ওয়াকফ প্রচলন ছিল, যার লভ্যাংশ দিয়ে প্রচুর পরিমাণ মাছ কিনে বিনামূল্যে দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা হতো। আরও একটি আশ্চর্যকর ওয়াকফের ব্যবস্থা ছিল সেখানে, কারও কাপড়ে প্রদীপের তেল পড়ে গেলে কিংবা কোনো কিছুর আঁচড়ে কাপড় ছিঁড়ে গেলে ওয়াকফ অফিসের শরণাপন্ন হলে সেখান থেকে কাপড়ের মূল্য দিয়ে দেওয়া হতো, তা দিয়ে সে অনায়াসে নতুন কাপড় কিনতে পারত। (২২২)

'দারুদ দুক্কা' নামে আরও আশ্চর্যকর এক ওয়াকফ ব্যবস্থার প্রচলন ছিল মরক্কোর মারাকেশ শহরে। স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদবশত রাগ করে যেসব নারী ঘর থেকে বের হয়ে যেত, তারা এই সংগঠনে এসে আশ্রয় নিতে পারত। স্বামীর সঙ্গে তাদের বিবাদ না মেটা পর্যন্ত যতদিন ইচ্ছা তারা সেখানে বিনামূল্যে পানাহার ও অবস্থান করতে পারত।

অপরদিকে হিজরি প্রথম শতাব্দী থেকেই স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে ওয়াকফ ব্যবস্থার ছিল নানা উদ্যোগ। প্রথমে বড় আকারে চিকিৎসাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন বিশিষ্ট উমাইয়া শাসক ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক। তিনি দামেশকে একটি হাসপাতাল নির্মাণ করে তা অসুস্থদের ফ্রি চিকিৎসার জন্য ওয়াকফ করে দেন। (২২৩) তা ছাড়া কুষ্ঠরোগীদের চিকিৎসায় তিনি বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করে তাদের জন্য সেবা ফ্রি করে দেন। কোনো অসুস্থ ব্যক্তিকে যেন চিকিৎসার জন্য কারও কাছে হাত পাততে না হয়, সেই ব্যবস্থা তিনি নিশ্চিত করেন। পুরো একটি শহর তাদের সেবা ও চিকিৎসার জন্য ওয়াকফ করে দেন। তা ছাড়া প্রত্যেক অবসরপ্রাপ্ত ও দুর্বল বয়োবৃদ্ধের জন্য তিনি একজন করে সেবক এবং প্রত্যেক অন্ধ প্রতিবন্ধীর জন্য একজন করে গাইড নিযুক্ত করেন। (২২৪)

বাগদাদে ওয়াকফসূত্রে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালগুলোর অন্যতম ছিল আল-আযুদি হাসপাতাল। বুওয়াইহি রাজবংশের অন্যতম শাসক আযুদুদ্দৌলা ৩৬৬ হিজরি/৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে বাগদাদ শহরের পশ্চিমাংশে তা নির্মাণ করেন। এই হাসপাতালে বিভিন্ন রোগচিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ চব্বিশজন ডাক্তার সবসময় কর্মরত থাকতেন। (২২৫) হাসপাতালটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে আযুদুদ্দৌলা বহুবিধ প্রবৃদ্ধিমূলক প্রকল্প ওয়াকফ করেন। এখানে রাষ্ট্রের সকল নাগরিক বিনামূল্যে চিকিৎসা পেত। রোগীরা এখানে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ছাড়াও বিভিন্ন সেবা লাভ করত। যেমন নতুন পোশাক, স্বাস্থ্যসম্মত বাহারি খাবার, জরুরি ওষুধ ইত্যাদি। সুস্থ হওয়ার পর বাড়ি পৌঁছার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ পাথেয় ও পথখরচও দিয়ে দেওয়া হতো তাদের। (২২৬)

হাসপাতালগুলোতে এত উন্নত, আরামদায়ক ও বিলাসবহুল স্বাস্থ্যসেবা ও দামি খাদ্যসামগ্রী প্রদান করা হতো যে, অনেকে এগুলো ভোগ করার জন্য অসুস্থতার ভান করে হাসপাতালে ভর্তি হতো। কোনো কোনো ডাক্তার তাদের এই বাহানা দেখে কখনো কখনো মুখ ফিরিয়ে নিতেন। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ খলিল ইবনে শাহিন যাহেরি(২২৭) বর্ণনা করেন, ৮৩১ হিজরি/১৪২৭ খ্রিষ্টাব্দে একবার তিনি দামেশকের একটি হাসপাতাল দেখতে যান। তার বর্ণনামতে, এরকম বিলাসবহুল চিকিৎসাকেন্দ্র তিনি পৃথিবীর আর কোথাও দেখেননি। সেখানে তিনি লক্ষ করেন, এক লোক অসুস্থতার ভান করে হাসপাতালে ভর্তি হয়। তিন দিন পার হওয়ার পর ডাক্তার তার চিকিৎসাপত্রে লিখে দেন, মেহমান কখনো তিন দিনের বেশি অবস্থান করেন না।(২২৮)

এরকম নানা আয়োজন আর বিচিত্র সব উদ্যোগের কারণে ইসলামি সভ্যতায় অনন্য হয়ে ওঠে এই ওয়াকফ ব্যবস্থা। ইসলামি সভ্যতার সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য বোঝার জন্য শুধু ওয়াকফ ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণাই যথেষ্ট বলে আমি মনে করি, যা মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সমাজের প্রতিটি মানুষের জন্য নিঃস্বার্থভাবে এবং সহানুভূতির সঙ্গে কাজ করে গেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এর আগে কোনো সভ্যতাই এরকম সংহতি, পরোপকার ও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জনসেবায় অংশগ্রহণের নজির স্থাপন করতে পারেনি।

টিকাঃ
২০৮. পুরো নাম মুখাইরিক আন-নাযরি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবি। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তিনি ছিলেন একজন বড় ইহুদি আলেম ও বিশিষ্ট শিল্পপতি। পরবর্তী সময় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তার সমুদয় অর্থসম্পদ বিশ্বনবীর জন্য ওসিয়ত করে যান। হিজরি তৃতীয় সনে সংঘটিত ঐতিহাসিক ওহুদের যুদ্ধে তিনি শহিদ হন। তার সম্পর্কে আরও জানতে দেখুন, ইবনে হাজার, আল-ইসাবা, খ. ৬, পৃ. ৫৭।
২০৯. ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, খ. ১, পৃ. ৫০৩।
২১০. বুখারি, কিতাবুশ শুরুত, বাব: আশ-শুরুত ফিল-ওয়াকফ, হাদিস নং ২৫৮৬, মুসলিম, কিতাবুল ওয়াকফ, বাব: আল-ওয়াকফ, হাদিস নং ১৬৩২।
২১১. পুরো নাম আবু মিহজান তওবা ইবনে নামির ইবনে হারমাল আল-হাদরামি। তিনি মিশরের বিচারক ছিলেন। তার সম্পর্কে ইবনে হাজার বলেন, স্থানীয় দায়িত্বশীলগণ নিজেদের বলে চালিয়ে দেবে বা উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে অন্তর্ভুক্ত করে ফেলবে এ আশঙ্কায় ওয়াকফ সম্পত্তি সরকারিভাবে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা তিনিই প্রথম চালু করেন। ১২০ হিজরি সনে তিনি ইনতেকাল করেন। আরও জানতে দেখুন, ইবনে হাজার, তাজিলুল মানফাআতি, পৃ. ৬১।
২১২. আল-কিন্দি, আল-উলাত ওয়াল-কুযাত, পৃ. ৩৯০; মুহাম্মাদ আবু যাহরা, মুহাদারাত ফিল-ওয়াকফ, পৃ. ১২।
২১৩. পুরো নাম উসমান ইবনে ইবরাহিম নাবুলুসি। অপর নাম ফখরুদ্দিন। আইয়ুবি সাম্রাজ্যের অন্যতম আমির। সুলতান নাজমুদ্দিন আইয়ুব আন-নযর ৬৩২ হিজরি সনে মিশরের দিওয়ানে তাকে অধিষ্ঠিত করেন। এই সুলতানের আদেশেই তিনি লুমাউল কাওয়ানিনিল মুদিয়্যা ফি দাওয়াবিনিদ দিয়ারিল মিসরিয়্যা রচনা করেন। ৬৮৫ হিজরিতে তিনি ইনতেকাল করেন। যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৪, পৃ. ২০২।
২১৪. মাকরিযি, আল-মাওয়ায়িয, খ. ২, পৃ. ২৯৫; কালকাশান্দি, সুবহুল আশা, খ. ৩, পৃ. ৫৬৭; নাবুলুসি, লুমাউল কাওয়ানিনিল মুদিয়্যা ফি দাওয়াবিনিদ দিয়ারিল মিসরিয়‍্যা, পৃ. ২৮; সামাররায়ি, আল-মুআসসাসাতুল ইদারিয়‍্যা ফিদ-দাওলাতিল আব্বাসিয়া, পৃ. ২৯৮-৩০৭।
২১৫. মুহাম্মাদ আবু যাহরা, মুহাদারাত ফিল-ওয়াকফ, পৃ. ২৬-২৭; ইকরামা সাবরি, আল-ওয়াকফুল ইসলামি, পৃ. ২১-২২।
২১৬. ইয়াফেয়ি, মিরআতুল জিনান ওয়া-ইবরাতুল ইয়াকযান ফি মারিফাতি হাওয়াদিসিয যামান, খ. ৩, পৃ. ৩৫১।
২১৭. ইবনুদ দিয়া, তারিখু মাক্কাতাল মুকাররামা ওয়াল-হারামিশ শারিফ, পৃ. ২৪৭।
২১৮. মাকরিযি, আস-সুলুক লি-মারিফাতি দুওয়ালিল মুলুক, খ. ৫, পৃ. ৪৪৮।
২১৯. ইবনে বতুতা, রিহলাতু ইবনে বতুতা, পৃ. ৯৯।
২২০. প্রাগুক্ত, পৃ. ১০০।
২২১. শাকিব আরসালান, হাদিরুল আলামিল ইসলামি, খ. ৩, পৃ. ৮।
২২২. শাওকি আবু খলিল, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৩৩৬-৩৩৭।
২২৩. যাহরানি, নিযামুল ওয়াক্ফ, পৃ. ২৪৮।
২২৪. ইবনুল আসির, আল-কামিল, খ. ৪, পৃ. ২৯২; ইবনে দুকমাক, আল-জাওহারুস সামিন, পৃ. ৬৫।
২২৫. এর দ্বারা বোঝা যায় হাসপাতালটি বিশাল আয়তনের ও বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিল।- অনুবাদক
২২৬. ইবনে আবি উসাইবিআ, উয়ুনুল আনবা ফি তাবাকাতিল আতিব্বা, খ. ১, পৃ. ৬৭; মুহাম্মাদ হুসাইন আলি, তারিখুল আরবি ওয়াল-মুসলিমিন, পৃ. ১৯৬; কাদরি হাফেজ তুকান, আল-উলুমু ইনদাল আরাবি ওয়াল-মুসলিমিন, পৃ. ৩২-৩৪।
২২৭. খলিল ইবনে শাহিন যাহেরি (৮১৩-৮৭৩ হি./১৪১০-১৪৬৮ খ্রি.)। ইবনে শাহিন নামে তিনি পরিচিত। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিদগ্ধ একজন গবেষক। তার অনেক গ্রন্থ মিশরে প্রসিদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে যুবদাতু কাশফিল মামালিক ওয়া বায়ানিত তুরুকি ওয়াল-মাসালিক অন্যতম। তার সম্পর্কে আরও জানতে পড়ুন, যিরিকলি, আল-আলাম, খ. ২, পৃ. ৩১৮।
২২৮. ইকরামা সাইদ সাবরি, আত-তামরিয ফিত-তারিখিল ইসলামি, পৃ. ২৯-৩০।

বিশ্বনবীর যুগ থেকে আজ পর্যন্ত সমাজসেবা, জনকল্যাণমূলক কাজ এবং আল্লাহর ইবাদত প্রতিষ্ঠায় পাল্লা দিয়ে এগিয়েছেন মুসলিমগণ। এর মধ্যে ওয়াকফ ছিল সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং মুসলিম জনসাধারণের বেশি উপকারে আসা উদ্যোগসমূহের একটি। ওয়াকফ ব্যবস্থা ছিল ওই ভিত্তি প্রস্তরের মতো, ইসলামি সভ্যতার পুরো ইতিহাসজুড়ে প্রতিটি সেবামূলক সংগঠন যা সুষ্ঠুরূপে পালন ও বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছে। মুসলিম সমাজের জাগরণ ও উন্নতি সাধনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে। সভ্যতা বিনির্মাণে এবং ইসলামি ওয়াকফ ব্যবস্থার গোড়াপত্তনে মুসলিম মানসে যে মূলমন্ত্র কাজ করেছিল এবং বিশ্বনবীর যুগ থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত মুসলিম হৃদয়ে যে প্রচেষ্টা নিজ গতিতে প্রবাহিত হয়ে চলে আসছিল, চিন্তাশীল মাত্রই তার মূল রহস্য জেনে অবাক হবেন। তা ছাড়া এ কথাও দিবালোকের মতো পরিষ্কার যে, ওয়াকফ ব্যবস্থা মানবতার কল্যাণ সাধনে গঠিত নির্ভেজাল একটি ইসলামি উদ্যোগ, ইসলামি সভ্যতার অভ্যুদয়ের প্রাক ও সমকালে অন্য কোনো সভ্যতায় এরকম নজির আছে বলে ইতিহাসে পাওয়া যায় না।

প্রথমে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকল স্তরের মুসলিমের জন্য ওয়াকফ ব্যবস্থার প্রচলন করেন। ইসলামে প্রথম ওয়াকফ সম্পত্তি ছিল সাহাবি মুখাইরিকের (২০৮) জমিসমূহ। তাবাকাতে ইবনে সাদ গ্রন্থে মুহাম্মাদ ইবনে কাব আল কুরাযির বরাতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যামানায় মদিনার সাতটি বাগান ওয়াকফ সম্পত্তিভুক্ত ছিল। সেগুলো হলো যথাক্রমে, আল-আওয়াফ, আস-সাফিয়া, আদ-দাল্লাল, আল-মাইসাব, বারকা, হাসনা এবং মাশরাবা উম্মে ইবরাহিম। ইবনে কাব বলেন, এরপর মুসলিমগণ তাদের পুত্র ও পৌত্রদের নামে সেগুলো ওয়াকফ করে দেন। (২০৯)

আল্লাহর রাসুলের জীবদ্দশায় এবং তার ওফাতের পর অধিকাংশ সাহাবি নিজেদের নামে কিছু না কিছু ওয়াকফ করে যান। এর মধ্যে উমর ইবনুল খাত্তাবের ওয়াকফ, উসমান ইবনে আফফানের ওয়াকফ, তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহর ওয়াকফ, আলি ইবনে আবু তালিবের ওয়াকফ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এ সকল ওয়াকফ সম্পত্তি জনসাধারণের সেবা ও কল্যাণের কাজে ব্যবহার করা হয়।

উমর ইবনুল খাত্তাব রা. ওয়াকফনামার বিবরণে লেখেন যে, তার এই ওয়াকফ সম্পত্তির লভ্যাংশ দরিদ্র, নিকটাত্মীয়, মুক্তিকামী দাস, আল্লাহর পথের মুজাহিদ, অতিথি এবং মুসাফির-ভিক্ষুকদের জন্য ব্যয় করা হবে। তবে এগুলো রক্ষণাবেক্ষণে দায়িত্বশীল ব্যক্তি সুষ্ঠু উপায়ে তা থেকে উপকৃত ব্যক্তি হতে পারবে এবং অধিকার প্রতিষ্ঠা না করে তা থেকে যেকোনো বন্ধুকেও খাওয়াতে পারবে। (২১০)

ওয়াকফকারীর মত অনুযায়ী ওয়াকফকৃত সম্পত্তি দেখাশোনার দায়িত্ব অর্পিত হয় উপকারভোগীদের ওপর, অথবা নির্দিষ্ট কমিটির ওপর। তবে প্রথম দিকে ইসলামি রাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপ সেখানে ছিল না। এরপর উমাইয়া খলিফা হিশাম ইবনে আবদুল মালিকের শাসনামলে কাযি তওবা ইবনে নামির আল-হাদরামি(২১১) মিশরের বিচারক পদে নিযুক্ত হলে তিনি লক্ষ করেন, ওয়াকফ সম্পত্তি ওয়াকফকারীর পরিবার ও সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বশীলদের মাঝেই সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। ফলে সম্পত্তির মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রকৃত ভোক্তা শ্রেণি। যার কারণে ওয়াকফের শর্তাবলি যথাযথভাবে পালন নিশ্চিত করতে তিনি নিজে ওয়াকফ সম্পত্তি দেখাশোনার দায়িত্ব নেন। এর ফলাফলও হাতেনাতে পায় মিশরের জনগণ। কাযি তওবার ইনতেকালের পরপরই ওয়াকফ সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ ও তার সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য মিশরে স্বতন্ত্র সরকারি বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। যার প্রধান হিসেবে থাকতেন একজন বিচারক। বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রে এ প্রক্রিয়ার সূচনা ঘটলে মিশরেই তা পূর্ণতা লাভ করে। এভাবেই একজন বিচারক সবসময় এ বিভাগের প্রধানের দায়িত্বে থেকে ওয়াকফের শর্তাবলি অনুযায়ী সম্পত্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতেন। তবে ওয়াকফকারীর শর্তমতে সম্পত্তির কোনো মুতাওয়াল্লি নির্দিষ্ট করা থাকলে তিনিই বিচারকের সহযোগিতা ও দিক-নির্দেশনা নিয়ে প্রকল্প দেখাশোনা করতেন। (২১২)

হিজরি চতুর্থ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। এ সময় আলাদা মুতাওয়াল্লি নিযুক্ত করে ওয়াকফ প্রকল্প দেখাশোনার সকল দায়দায়িত্ব তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হতো। তিনিই প্রকল্পের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন। ওয়াকফ বিভাগের দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী সম্পত্তির লভ্যাংশ গরিব-মিসকিন ও ভোক্তাদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। ওয়াকফ বিভাগ স্বতন্ত্র একটি বিভাগ হওয়ার পেছনে এটাই ছিল কারণ। এই বিভাগ নতুন হওয়া সত্ত্বেও দিন যতই গড়িয়েছে এ বিভাগের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বিভাগীয় প্রধানের ততই পদোন্নতি ঘটেছে। এমনকি তাদের অনেকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন বলেও ইতিহাসে পাওয়া যায়। মিশরে প্রধান বিচারপতির পদকেও ছাপিয়ে যায় ওয়াকফ বিভাগীয় প্রধানের পদ।

এরকম ঘটনাও প্রসিদ্ধ আছে, ঈদ বা জাতীয় উৎসবের মৌসুমে জনগণের পক্ষ থেকে সুলতানকে শুভেচ্ছা জানানোর অনুষ্ঠান পর্যবেক্ষণের জন্য মিশরের প্রধান বিচারপতি একবার তার সেবককে বলে পাঠালেন, যাও, রাজদরবারের গেটে দাঁড়িয়ে থাকো। ওয়াকফ বিভাগীয় প্রধান সুলতানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে চলে গেলে আমাকে এসে সংবাদ দিয়ো। এরপর ঠিকই ওয়াকফ বিভাগীয় প্রধান সুলতানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বিদায় হলে প্রধান বিচারপতি এসে সুলতানের প্রতি অভিনন্দন ব্যক্ত করেন। এ ঘটনার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লুমাউল কাওয়ানিনিল মুদিয়্যা ফি দাওয়াবিনিদ দিয়ারিল মিসরিয়‍্যা গ্রন্থকার নাবুলুসি (২১৩) বলেন, রাজদরবারে দুজন প্রভাবশালী রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিত্বের সমাবেশ এড়াতেই তিনি এ ঘটনার জন্ম দেন। যাই হোক, রাজদরবারে ওয়াকফ বিভাগের প্রধানের স্থান ছিল ঠিক সুলতানের বাঁ পাশেই। কারণ রাষ্ট্রীয়ভাবে তার ছিল অসামান্য গুরুত্ব এবং তিনি ছিলেন উন্নত মর্যাদার অধিকারী। মাকরিযি বলেন, ওয়াকফ বিভাগের প্রধান সরাসরি সকল সরকারি বিভাগসমূহে হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা রাখতেন। আর সেখানে কেবল একনিষ্ঠ ও মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য মুসলিম লেখকদেরকেই কাজের সুযোগ দেওয়া হতো। (২১৪)

তবে উসমানীয় খিলাফতের সময় সম্পূর্ণ নতুন ওয়াকফ ব্যবস্থার গোড়াপত্তন হয়। যেসব জমিতে ওয়াকফ ভবন নির্মাণ করা হবে এবং যে অর্থসম্পদে যাকাত ওয়াজিব হয় না এবং ব্যবসার জন্য নির্ধারিত নয় তবে তা প্রবৃদ্ধিমূলক কাজে ব্যবহার করা যায় এবং দায়িত্বশীলগণ তা ভাড়া দিয়ে অথবা তা থেকে অর্জিত লভ্যাংশ থেকে উপকৃত হন এরকম আধুনিক নিয়মনীতি এবং ওয়াকফ ভূমির ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত নীতিমালা ওই নতুন ওয়াকফ ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত হয়। আজ পর্যন্ত অনেক আরবরাষ্ট্রে ভূমির সেই বিভাজন ব্যবস্থা ও নীতিমালা পুরোপুরি অনুসরণ করা হচ্ছে। উসমানীয় শাসনতন্ত্রের প্রণয়ন করা ওয়াকফ-বিষয়ক আরেকটি ব্যবস্থা হলো 'নির্দেশনা ও দায়িত্ব প্রদান বিভাগ'। এই বিভাগের কাজ ছিল অলাভজনক ওয়াকফ সম্পত্তি দেখাশোনার জন্য সঠিক পেশা ও দায়িত্ব নির্ধারণ করা। ওয়াকফ সম্পত্তির মুতাওয়াল্লি হওয়ার জন্য আগ্রহীদের পরীক্ষা গ্রহণ করা। আগ্রহীদের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় ধর্মীয় পেশা প্রাধান্য পেত। যেমন মসজিদের ইমাম হওয়া, মুয়াজ্জিন হওয়া, খতিব হওয়া, ধর্মীয় শিক্ষক হওয়া ইত্যাদি। এভাবেই উসমানীয় খিলাফতের সময় থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত পুরো মুসলিম-বিশ্বজুড়ে অব্যাহত আছে এই ওয়াকফ ব্যবস্থা। অবশেষে ওয়াকফের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয়ও গঠন করা হয়। (২১৫)

আর ওয়াকফ ব্যবস্থাপনায় স্থান পায় গুরুত্বপূর্ণ সব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। মসজিদ নির্মাণ, লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা, হাসপাতাল নির্মাণ, সড়ক ও পথ নির্মাণ, নলকূপ স্থাপন, অতিথি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং মাদরাসা প্রতিষ্ঠাসহ ধর্মীয় ও মানবিক দিক থেকে ইসলামি সমাজের চাহিদা পূরণে কার্যকর এরকম অনেক প্রকল্পই ছিল ওয়াকফ ব্যবব্যবস্থার আওতাধীন।

ধর্মীয় ক্ষেত্রে ওয়াকফ ব্যবব্যবস্থার অসামান্য অবদান আমাদের চোখের সামনেই। আর মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাজারো মসজিদ প্রতিষ্ঠার পেছনে ওয়াকফকারীদের উদ্দেশ্য ছিল একটাই, মুসলিমদের জন্য জামাতে নামায আদায়ের সুব্যবস্থা করে আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন এবং পরকালে অফুরন্ত প্রতিদান লাভ।

শিক্ষাঙ্গনে আমরা মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ওয়াকফ ব্যবস্থায় নির্মিত শত শত মাদরাসা দেখতে পাই, যা হাজার বছর ধরে বিদগ্ধ মুসলিম মনীষী তৈরি করে বিশ্ব দরবারে মুসলিমজাতির ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে চলেছে, যার সওয়াব ওয়াকফকারীগণ অবিরাম পেয়ে আসছেন এবং পেতে থাকবেন।

শিক্ষাক্ষেত্রে ওয়াকফ ব্যবব্যবস্থার পুনর্জাগরণে অসামান্য অবদান রাখা সব থেকে বিখ্যাত সুলতান হলেন সালাহুদ্দিন আইয়ুবি রহ.। মিশরে তার ওয়াকফকীর্তির অন্যতম হলো, তিনি কায়রোতে অবস্থিত ইমাম হুসাইন ওয়াকফ আলি স্কয়ার হিসেবে খ্যাত সেই পবিত্র স্থানের পাশেই একটি বড় মাদরাসা নির্মাণ করে তা ওয়াকফ করে দেন। মিশরের জনগণের কল্যাণে নিবেদিত 'দারে সায়িদিস সুআদা' নামে একটি সর্বজনীন খানকা নির্মাণ করে তাও ওয়াকফ করে দেন। 'দারে আব্বাস ইবনুস সাল্লার' নামে একটি হানাফি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে তা ওয়াকফ করে দেন মিশরে শাফিয়ি মাযহাবের ওপর পড়াশোনার জন্য তিনি 'যাইনুন নাজ্জার' নামে বিখ্যাত মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে তা ওয়াকফ করে যান। তা ছাড়া মালেকি মাযহাবের ওপর পড়াশোনা করার জন্যেও তিনি মিশরে স্বতন্ত্র মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। (২১৬)

সামাজিক অঙ্গনে ওয়াকফ ব্যবস্থার অবদান হিসেবে পথঘাট নির্মাণ, দরিদ্র-নিকেতন ও অভাবগ্রস্তদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণসহ গরিব মিসকিনদের জন্য আরও অনেক ওয়াকফ প্রক্রিয়া চলমান ছিল, যা ইসলামের স্বর্ণযুগে প্রচলিত যৌথ সামাজিক উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় আমির নুরুদ্দিন মাহমুদ আলেপ্পোসহ সমগ্র মুসলিমবিশ্বে অসুস্থ, এতিম ও দরিদ্রদের জন্য নানাবিধ ওয়াকফ প্রকল্পের সূচনা করেন। পবিত্র নগরী মক্কায় একেবারে হারাম শরিফের কাছে নির্মিত বিরাট বাগানটি ৬৯৭ হিজরি সনে দরিদ্র, মিসকিন, মুসাফির ও হাজিদের জন্য ওয়াকফ করে দেন শাইখ আযুদুদ্দৌলা রাইহানুন্নাদা শিহাবি, যাকে সবাই হারাম শরিফের সেবকদের শাইখ বলে ডাকেন। (২১৭)

মামলুকি রাজবংশের সুলতান যাহের বারকুক জাবাল দুর্গে(২১৮) বসবাসরত এতিম শিশুদের জন্য কুরআন পাঠ ও হিফয করার একটি বড় মক্তব প্রতিষ্ঠা করে তা ওয়াকফ করে দেন। ওই দুর্গ থেকেই মিশর ও শামসহ সুলতানের অনুগত সকল অঞ্চল শাসন করা হতো। পূর্ববর্তীকালের বাদশা, সুলতান, ধনী ও মুসলিম সমাজসেবকগণ ওয়াকফের কাজে কী পরিমাণ অগ্রগামী ছিলেন, তা এই উদাহরণ থেকেই স্পষ্ট। এসব ওয়াকফ প্রকল্প মুসলিম সামাজিক জীবনের মানোন্নয়নে যে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

সিরিয়ার দামেশকেও এরকম অনেক ওয়াকফ প্রকল্প প্রচলিত ছিল যা ইসলামের সৌন্দর্য ও সৌহার্দ্যের প্রতীককে সমুন্নত করেছে। বিখ্যাত মুসলিম পর্যটক ইবনে বতুতা বড় আশ্চর্য ও বিস্ময় ভরা কণ্ঠে সেই ওয়াকফ প্রকল্পগুলোর বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দামেশকে আওকাফ প্রকল্পের সংখ্যা এবং এ খাতে ব্যয়ের বাজেট হিসাব করে শেষ করার মতো নয়। এর মধ্যে একটি ছিল অপারগ হাজিদের জন্য হজের ব্যয়ভার বহন করা। সেই তহবিল থেকে প্রয়োজন অনুপাতে প্রত্যেক হাজিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হতো। অন্য একটি প্রকল্প হলো, দরিদ্র পরিবারের বিয়ের উপযুক্ত মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা করে প্রসাধনী ও আসবাবপত্রসহ স্বামীর হাতে তুলে দেওয়া। এ ছাড়া অন্যান্য উল্লেখযোগ্য প্রকল্পের মধ্যে ছিল বন্দিমুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ। দুঃস্থ, অভাবী, পথিক, মুসাফিরদের জন্য সহযোগিতা প্রদান, এই প্রকল্প থেকে তাদের জন্য অন্নবস্ত্র ও নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজনীয় পাথেয়ের ব্যবস্থা করা হতো। আরও ছিল সড়ক ও ফুটপাত সংস্কার। তৎকালীন দামেশকের প্রধান সড়কগুলোর দুপাশে পথচারীদের হাঁটার জন্য ফুটপাতের ব্যবস্থা ছিল। এ ছাড়া দামেশকে আরও অনেক সেবামূলক কাজ প্রচলিত ছিল ওয়াকফ বিভাগের তত্ত্বাবধানে।(২১৯) যার সুফল দামেশকে বসবাসরত সকল মুসলিম-অমুসলিম সমানভাবে ভোগ করত।

ইবনে বতুতার বর্ণনা করা আরেক বিস্ময়কর বিবরণ হলো পাত্র মেরামত ওয়াকফ প্রকল্প। তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, একবার আমি দামেশকের একটি গলি পার হওয়ার সময় দেখি, অল্পবয়স্ক একজন দাসের হাত থেকে চীনের তৈরি দামি একটি থালা মাটিতে পড়ে ভেঙে যায়। তা দেখে আশপাশের মানুষেরা জড়ো হলে একজন বলতে থাকেন, বাসনের এই ভাঙা অংশগুলো নিয়ে গিয়ে পাত্র মেরামত ওয়াকফ বিভাগের দায়িত্বশীলকে দেখাও। এরপর দাস সেগুলো তাড়াতাড়ি উঠিয়ে ওই বিভাগে যায়। সঙ্গে যায় ওই লোকটিও। ওখানে গিয়ে বাসনের ভাঙা অংশগুলো দেখালে এরকম পাত্র কেনার মতো মূল্য সে দিয়ে দেয়। ফলে ওই ভৃত্য গিয়ে অনুরূপ নতুন আরেকটি বাসন কিনে নেয়। এটি খুব সুন্দর একটি উদ্যোগ। কারণ ভৃত্য হওয়ায় দামি একটি বাসন ভাঙার অপরাধে মনিব অবশ্যই তাকে গালমন্দ বা প্রহার করত, এতে বালকটি কষ্ট পেত। এরকম পাত্র মেরামত ওয়াকফ প্রকল্পের মতো সুন্দর উদ্যোগ মানুষের হৃদয় জয় করে নেয়। যারা এরকম অসাধারণ উদ্যোগ গ্রহণ করে সমাজসেবা করেছেন তাদের আল্লাহ ভরপুর প্রতিদান দিন সবসময়, আমরা এই দোয়াই করি।(২২০)

এমনকি একাধিক ইসলামি রাষ্ট্রে বিয়েশাদিতে কনের সাজগোজের জন্য দামি প্রসাধনী ও স্বর্ণালংকার ভাড়া দেওয়ার মতো ওয়াকফ প্রকল্পগুলোও ছিল উল্লেখযোগ্য। এতে করে বরকনে উভয়ের আনন্দ-উৎসবে ভিন্ন মাত্রা যোগ হতো। এরকম দামি অলংকার পরিয়ে স্ত্রীকে ঘরে তোলার মতো সাধ ও সাধ্য যাদের নেই, সেইসব দরিদ্র, অসহায় ও গরিবের জন্যই ছিল এই ওয়াকফ প্রকল্পের ব্যবস্থা। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে আবার সেগুলো ওয়াকফ কার্যালয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হতো। এভাবেই স্বামী-স্ত্রী উভয়ে পরমানন্দে বিয়ের অনুষ্ঠান উদ্যাপন করে উপলক্ষ্যটি সুখময় ও স্মৃতিবহ করে তুলত। (২২১)

তিউনিসিয়ায় ছিল দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য খতনার ওয়াকফ বিভাগ। খতনা করিয়ে শিশুকে নতুন পোশাক ও কিছু দিরহাম উপহার দেওয়া হতো। সেখানে রমযান মাসে বিনামূল্যে মিষ্টি বিতরণও ছিল একরকম ওয়াকফ উদ্যোগ। বছরের নির্দিষ্ট একটি সময়ে তিউনিসিয়ার সমুদ্রতীরে প্রচুর পরিমাণ মাছ ভেসে উঠত। এ কারণে সেখানে এক ধরনের ওয়াকফ প্রচলন ছিল, যার লভ্যাংশ দিয়ে প্রচুর পরিমাণ মাছ কিনে বিনামূল্যে দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা হতো। আরও একটি আশ্চর্যকর ওয়াকফের ব্যবস্থা ছিল সেখানে, কারও কাপড়ে প্রদীপের তেল পড়ে গেলে কিংবা কোনো কিছুর আঁচড়ে কাপড় ছিঁড়ে গেলে ওয়াকফ অফিসের শরণাপন্ন হলে সেখান থেকে কাপড়ের মূল্য দিয়ে দেওয়া হতো, তা দিয়ে সে অনায়াসে নতুন কাপড় কিনতে পারত। (২২২)

'দারুদ দুক্কা' নামে আরও আশ্চর্যকর এক ওয়াকফ ব্যবস্থার প্রচলন ছিল মরক্কোর মারাকেশ শহরে। স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদবশত রাগ করে যেসব নারী ঘর থেকে বের হয়ে যেত, তারা এই সংগঠনে এসে আশ্রয় নিতে পারত। স্বামীর সঙ্গে তাদের বিবাদ না মেটা পর্যন্ত যতদিন ইচ্ছা তারা সেখানে বিনামূল্যে পানাহার ও অবস্থান করতে পারত।

অপরদিকে হিজরি প্রথম শতাব্দী থেকেই স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে ওয়াকফ ব্যবস্থার ছিল নানা উদ্যোগ। প্রথমে বড় আকারে চিকিৎসাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন বিশিষ্ট উমাইয়া শাসক ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক। তিনি দামেশকে একটি হাসপাতাল নির্মাণ করে তা অসুস্থদের ফ্রি চিকিৎসার জন্য ওয়াকফ করে দেন। (২২৩) তা ছাড়া কুষ্ঠরোগীদের চিকিৎসায় তিনি বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করে তাদের জন্য সেবা ফ্রি করে দেন। কোনো অসুস্থ ব্যক্তিকে যেন চিকিৎসার জন্য কারও কাছে হাত পাততে না হয়, সেই ব্যবস্থা তিনি নিশ্চিত করেন। পুরো একটি শহর তাদের সেবা ও চিকিৎসার জন্য ওয়াকফ করে দেন। তা ছাড়া প্রত্যেক অবসরপ্রাপ্ত ও দুর্বল বয়োবৃদ্ধের জন্য তিনি একজন করে সেবক এবং প্রত্যেক অন্ধ প্রতিবন্ধীর জন্য একজন করে গাইড নিযুক্ত করেন। (২২৪)

বাগদাদে ওয়াকফসূত্রে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালগুলোর অন্যতম ছিল আল-আযুদি হাসপাতাল। বুওয়াইহি রাজবংশের অন্যতম শাসক আযুদুদ্দৌলা ৩৬৬ হিজরি/৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে বাগদাদ শহরের পশ্চিমাংশে তা নির্মাণ করেন। এই হাসপাতালে বিভিন্ন রোগচিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ চব্বিশজন ডাক্তার সবসময় কর্মরত থাকতেন। (২২৫) হাসপাতালটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে আযুদুদ্দৌলা বহুবিধ প্রবৃদ্ধিমূলক প্রকল্প ওয়াকফ করেন। এখানে রাষ্ট্রের সকল নাগরিক বিনামূল্যে চিকিৎসা পেত। রোগীরা এখানে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ছাড়াও বিভিন্ন সেবা লাভ করত। যেমন নতুন পোশাক, স্বাস্থ্যসম্মত বাহারি খাবার, জরুরি ওষুধ ইত্যাদি। সুস্থ হওয়ার পর বাড়ি পৌঁছার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ পাথেয় ও পথখরচও দিয়ে দেওয়া হতো তাদের। (২২৬)

হাসপাতালগুলোতে এত উন্নত, আরামদায়ক ও বিলাসবহুল স্বাস্থ্যসেবা ও দামি খাদ্যসামগ্রী প্রদান করা হতো যে, অনেকে এগুলো ভোগ করার জন্য অসুস্থতার ভান করে হাসপাতালে ভর্তি হতো। কোনো কোনো ডাক্তার তাদের এই বাহানা দেখে কখনো কখনো মুখ ফিরিয়ে নিতেন। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ খলিল ইবনে শাহিন যাহেরি(২২৭) বর্ণনা করেন, ৮৩১ হিজরি/১৪২৭ খ্রিষ্টাব্দে একবার তিনি দামেশকের একটি হাসপাতাল দেখতে যান। তার বর্ণনামতে, এরকম বিলাসবহুল চিকিৎসাকেন্দ্র তিনি পৃথিবীর আর কোথাও দেখেননি। সেখানে তিনি লক্ষ করেন, এক লোক অসুস্থতার ভান করে হাসপাতালে ভর্তি হয়। তিন দিন পার হওয়ার পর ডাক্তার তার চিকিৎসাপত্রে লিখে দেন, মেহমান কখনো তিন দিনের বেশি অবস্থান করেন না।(২২৮)

এরকম নানা আয়োজন আর বিচিত্র সব উদ্যোগের কারণে ইসলামি সভ্যতায় অনন্য হয়ে ওঠে এই ওয়াকফ ব্যবস্থা। ইসলামি সভ্যতার সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য বোঝার জন্য শুধু ওয়াকফ ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণাই যথেষ্ট বলে আমি মনে করি, যা মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সমাজের প্রতিটি মানুষের জন্য নিঃস্বার্থভাবে এবং সহানুভূতির সঙ্গে কাজ করে গেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এর আগে কোনো সভ্যতাই এরকম সংহতি, পরোপকার ও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জনসেবায় অংশগ্রহণের নজির স্থাপন করতে পারেনি।

টিকাঃ
২০৮. পুরো নাম মুখাইরিক আন-নাযরি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবি। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তিনি ছিলেন একজন বড় ইহুদি আলেম ও বিশিষ্ট শিল্পপতি। পরবর্তী সময় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তার সমুদয় অর্থসম্পদ বিশ্বনবীর জন্য ওসিয়ত করে যান। হিজরি তৃতীয় সনে সংঘটিত ঐতিহাসিক ওহুদের যুদ্ধে তিনি শহিদ হন। তার সম্পর্কে আরও জানতে দেখুন, ইবনে হাজার, আল-ইসাবা, খ. ৬, পৃ. ৫৭।
২০৯. ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, খ. ১, পৃ. ৫০৩।
২১০. বুখারি, কিতাবুশ শুরুত, বাব: আশ-শুরুত ফিল-ওয়াকফ, হাদিস নং ২৫৮৬, মুসলিম, কিতাবুল ওয়াকফ, বাব: আল-ওয়াকফ, হাদিস নং ১৬৩২।
২১১. পুরো নাম আবু মিহজান তওবা ইবনে নামির ইবনে হারমাল আল-হাদরামি। তিনি মিশরের বিচারক ছিলেন। তার সম্পর্কে ইবনে হাজার বলেন, স্থানীয় দায়িত্বশীলগণ নিজেদের বলে চালিয়ে দেবে বা উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে অন্তর্ভুক্ত করে ফেলবে এ আশঙ্কায় ওয়াকফ সম্পত্তি সরকারিভাবে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা তিনিই প্রথম চালু করেন। ১২০ হিজরি সনে তিনি ইনতেকাল করেন। আরও জানতে দেখুন, ইবনে হাজার, তাজিলুল মানফাআতি, পৃ. ৬১।
২১২. আল-কিন্দি, আল-উলাত ওয়াল-কুযাত, পৃ. ৩৯০; মুহাম্মাদ আবু যাহরা, মুহাদারাত ফিল-ওয়াকফ, পৃ. ১২।
২১৩. পুরো নাম উসমান ইবনে ইবরাহিম নাবুলুসি। অপর নাম ফখরুদ্দিন। আইয়ুবি সাম্রাজ্যের অন্যতম আমির। সুলতান নাজমুদ্দিন আইয়ুব আন-নযর ৬৩২ হিজরি সনে মিশরের দিওয়ানে তাকে অধিষ্ঠিত করেন। এই সুলতানের আদেশেই তিনি লুমাউল কাওয়ানিনিল মুদিয়্যা ফি দাওয়াবিনিদ দিয়ারিল মিসরিয়্যা রচনা করেন। ৬৮৫ হিজরিতে তিনি ইনতেকাল করেন। যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৪, পৃ. ২০২।
২১৪. মাকরিযি, আল-মাওয়ায়িয, খ. ২, পৃ. ২৯৫; কালকাশান্দি, সুবহুল আশা, খ. ৩, পৃ. ৫৬৭; নাবুলুসি, লুমাউল কাওয়ানিনিল মুদিয়্যা ফি দাওয়াবিনিদ দিয়ারিল মিসরিয়‍্যা, পৃ. ২৮; সামাররায়ি, আল-মুআসসাসাতুল ইদারিয়‍্যা ফিদ-দাওলাতিল আব্বাসিয়া, পৃ. ২৯৮-৩০৭।
২১৫. মুহাম্মাদ আবু যাহরা, মুহাদারাত ফিল-ওয়াকফ, পৃ. ২৬-২৭; ইকরামা সাবরি, আল-ওয়াকফুল ইসলামি, পৃ. ২১-২২।
২১৬. ইয়াফেয়ি, মিরআতুল জিনান ওয়া-ইবরাতুল ইয়াকযান ফি মারিফাতি হাওয়াদিসিয যামান, খ. ৩, পৃ. ৩৫১।
২১৭. ইবনুদ দিয়া, তারিখু মাক্কাতাল মুকাররামা ওয়াল-হারামিশ শারিফ, পৃ. ২৪৭।
২১৮. মাকরিযি, আস-সুলুক লি-মারিফাতি দুওয়ালিল মুলুক, খ. ৫, পৃ. ৪৪৮।
২১৯. ইবনে বতুতা, রিহলাতু ইবনে বতুতা, পৃ. ৯৯।
২২০. প্রাগুক্ত, পৃ. ১০০।
২২১. শাকিব আরসালান, হাদিরুল আলামিল ইসলামি, খ. ৩, পৃ. ৮।
২২২. শাওকি আবু খলিল, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৩৩৬-৩৩৭।
২২৩. যাহরানি, নিযামুল ওয়াক্ফ, পৃ. ২৪৮।
২২৪. ইবনুল আসির, আল-কামিল, খ. ৪, পৃ. ২৯২; ইবনে দুকমাক, আল-জাওহারুস সামিন, পৃ. ৬৫।
২২৫. এর দ্বারা বোঝা যায় হাসপাতালটি বিশাল আয়তনের ও বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিল।- অনুবাদক
২২৬. ইবনে আবি উসাইবিআ, উয়ুনুল আনবা ফি তাবাকাতিল আতিব্বা, খ. ১, পৃ. ৬৭; মুহাম্মাদ হুসাইন আলি, তারিখুল আরবি ওয়াল-মুসলিমিন, পৃ. ১৯৬; কাদরি হাফেজ তুকান, আল-উলুমু ইনদাল আরাবি ওয়াল-মুসলিমিন, পৃ. ৩২-৩৪।
২২৭. খলিল ইবনে শাহিন যাহেরি (৮১৩-৮৭৩ হি./১৪১০-১৪৬৮ খ্রি.)। ইবনে শাহিন নামে তিনি পরিচিত। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিদগ্ধ একজন গবেষক। তার অনেক গ্রন্থ মিশরে প্রসিদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে যুবদাতু কাশফিল মামালিক ওয়া বায়ানিত তুরুকি ওয়াল-মাসালিক অন্যতম। তার সম্পর্কে আরও জানতে পড়ুন, যিরিকলি, আল-আলাম, খ. ২, পৃ. ৩১৮।
২২৮. ইকরামা সাইদ সাবরি, আত-তামরিয ফিত-তারিখিল ইসলামি, পৃ. ২৯-৩০।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 ডাক ও যোগাযোগ বিভাগ

📄 ডাক ও যোগাযোগ বিভাগ


ডাক ও যোগাযোগের সকল উপায়-উপকরণ ও ব্যবস্থাপনার উন্নয়নকে অনেক গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে সেজন্য প্রয়োজনীয় সকল উপাদান নিশ্চিত করেছে ইসলামি সভ্যতা। ইসলামি রাষ্ট্র সম্প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এমন একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা ছিল সময়ের দাবি, যা খিলাফতের রাজধানীর সঙ্গে ইসলামি রাষ্ট্রের অন্যান্য শহরের, বিশেষ করে খলিফার সাথে প্রাদেশিক গভর্নরদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ নিশ্চিত করবে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে ওঠে ডাক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। সেজন্য পুরো একটি বিভাগ এবং স্বতন্ত্র একটি কার্যালয় গঠন করা হয়, যা ইসলামি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে এবং বিশ্বপরিস্থিতি সম্পর্কে সদা সতর্ক ও অবগত থাকতে বিরাট ভূমিকা পালন করে। ইসলামি সভ্যতা যে উন্নতি ও অগ্রগতির সর্বোচ্চ শৃঙ্গে আরোহণ করেছিল, তারই উজ্জ্বল প্রমাণ এই ডাক ও যোগাযোগ বিভাগ।

আরবি বারিদ শব্দের অর্থ ও তার আধুনিকায়ন:

برید শব্দের উৎপত্তি নিয়ে মতভেদ আছে ঠিক, তবে এটি যে নিখাদ আরবি শব্দ এ নিয়ে কারও মাঝে বিরোধ নেই। এ শব্দের অনেকগুলো অর্থের একটি হলো: দূত, বার্তাবাহক। আরবিতে একটি প্রবাদ আছে: «الْحُمَّى بَرِيْدُ الْمَوْتِ» জ্বর হলো মৃত্যুর দূত। অর্থাৎ জ্বর মৃত্যুর বার্তা নিয়ে আসে, জীবনাবসানের কথা মনে করিয়ে দেয়। রাজ্যে বলেন,

«رَأَيْتُ لِلْمَوْتِ بَرِيْدًا مُبْرَدًا» আমি মৃত্যুর বার্তাবাহককে আসতে দেখেছি।

সিংহের আগমনি বার্তা দেয় বিধায় সারসপাখিকেও আরবিভাষীগণ 'বারিদ' বলে থাকেন। (২২৯)

গাধা বা ঘোড়ার পিঠে চড়ে যারা বার্তা আদান-প্রদানের দায়িত্ব পালন করেন, তাদেরকেও 'বারিদ' বলা হয়। আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

إِذَا أَبْرَدْتُمْ إِلَيَّ بَرِيدًا، فَابْعَثُوهُ حَسَنَ الْوَجْهِ، حَسَنَ الْإِسْمِ»

আমার কাছে কোনো বার্তাবাহক পাঠানোর সময় তোমরা সুদর্শন ও সুন্দর নামের অধিকারী কাউকে পাঠিয়ো। (২৩০)

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন,

إِنِّي لَا أَخِيْسُ بِالْعَهْدِ، وَلَا أَحْبِسُ الْبُرْدِ»

আমি কখনো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করি না এবং কোনো দূতকে গ্রেফতার করি না। (২৩১)

যামাখশারি রহ. বলেন, "برید শব্দের راء-তে সাকিন করে পড়লে সেটি برید শব্দের বহুবচন ধরা হবে। তখন অর্থ হবে বার্তাবহক। رُسُلٌ শব্দটির سین এ যেমন পেশ ও সাকিন উভয়টাই চলে, তেমনই برید শব্দের বহুবচন بُرُد-এর راء-তে পেশ ও সাকিন উভয়টাই চলবে। (২৩২)

এ কারণেই পত্রবাহক জন্তুকেও বলা হয় বারিদ। তানুখি বলেন, পত্র বহন ও পৌছানোর দায়িত্বটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ও স্পর্শকাতর। কারণ একজন-দুজন নয়, পুরো একটি সংঘবদ্ধ দলকে কাজ করতে হতো এর জন্য। দরকার হতো দূরের পথ পাড়ি দেওয়ার বহু সরঞ্জাম ও ভ্রমণ পাথেয়ের। তাদের প্রধান দায়িত্ব ছিল পত্রবাহকদের চলাচলের পথগুলো সর্বক্ষণ পাহারা দিয়ে নিরাপদ রাখা। চোর-ডাকাত ও শত্রুদের আনাগোনা থেকে তা সুরক্ষিত রাখা। গোয়েন্দাদের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা। কারণ সীমান্তরক্ষীদের থেকে আসা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ চিঠিপত্র তাদেরকেই বহন করতে হতো। প্রাদেশিক অঞ্চল থেকে আসা বার্তাগুলো তাদেরকেই পুরোপুরি আমানতের সাথে দ্রুত ও সংক্ষিপ্ত পথ ধরে শাসকদের কাছে পৌঁছে দিতে হতো। আর এই দায়িত্ব পালন করার জন্য নির্বাচন করতে হতো দ্রুতগামী বাহন ও দূরদর্শী ব্যক্তিদের। পত্র বহনের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ শাসকদের কাছে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দাদের মর্যাদা পেতেন। কারণ শাসকগণ যদি তাদের প্রতি শৈথিল্য বা অবজ্ঞা প্রদর্শন করেন, তাহলে কিছুতেই বন্ধুমহল ও শত্রুপক্ষের সার্বিক খবরাখবর তিনি রাখতে পারবেন না। এসব ব্যক্তিবর্গের হাত ধরেই তার হস্তগত হতো পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রসমূহের সকল সংবাদ। ডাক যোগাযোগ বিষয়ে অনীহা প্রদর্শন করলে শাসকদের রাজনীতি দুর্বল হয়ে পড়বে এবং টের পাওয়ার আগেই তারা শত্রুপক্ষের আক্রমণের শিকার হয়ে পড়বে। (২৩৩)

ডাকবিভাগের প্রধান দায়িত্বশীলের কাজ হতো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিভাগের কাছে সকল সংবাদ ও তথ্য সরবরাহ করা। তারা ছিলেন সাংবাদিকের ভূমিকায়। রাষ্ট্রীয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও শাসক শ্রেণির কাছে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনসাধারণের সকল অবস্থা এবং সেখানকার সার্বিক পরিস্থিতির সংবাদ সরবরাহ করা এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চলমান সন্দেহজনক ষড়যন্ত্র, বড় কর্মকর্তা বা বিখ্যাত কোনো ব্যক্তি নিজ প্রচেষ্টায় কোনো অঞ্চল স্বাধীন বা রাষ্ট্র থেকে পৃথক করার চক্রান্তে লিপ্ত কি না এ জাতীয় সকল সংবাদ জানানোই ছিল এ বিভাগের দায়িত্বশীলদের মূল কাজ। (২৩৪)

ইসলামের সূচনালগ্নে পত্রবাহকদের দায়িত্ব ছিল শুধু খলিফাদের বার্তাগুলো প্রাদেশিক গভর্নর ও সরকারি দায়িত্বশীলদের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তাদের বার্তাগুলো খলিফার কাছে হস্তান্তর করা। ইসলামি রাষ্ট্রের সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে তাদের দায়িত্বও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত এ বিভাগের প্রধানকে খলিফার প্রধান গোয়েন্দা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। তিনিই খলিফার আদেশ-নিষেধগুলো বিভাগীয় কর্মকর্তাদের কাছে পত্রযোগে পাঠাতেন এবং তাদের কার্যক্রমের ওপর সবসময় সজাগ দৃষ্টি রেখে খলিফাকে সে সম্পর্কে অবহিত করতেন। তেমনই শত্রুদের গতিবিধির প্রতিও তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতেন। শত্রুদের হালচাল সম্পর্কে অবগত থাকতেন। তার দায়িত্ব ছিল অনেকটা বর্তমান সময়ের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা গোয়েন্দা শাখার মতো। সাহিব আলাউদ্দিন বলেন, তাদের মৌলিক কাজ ছিল আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে প্রতিটি স্থানে ডাকঘর স্থাপন করা এবং যথাস্থানে ত্বরিত সংবাদ পৌঁছে দেওয়া। (২৩৫) পত্র আদান-প্রদান ও চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করার বিষয়টি প্রথম দিকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলেও জনগণের কল্যাণের কথা চিন্তা করে পরবর্তী সময় এই সেবাটি সর্বসাধারণের জন্য অনুমোদন করা হয়। (২৩৬)

মুসলিমগণ এই যোগাযোগব্যবস্থার কল্যাণে প্রথম একক পথ ও পয়েন্ট তৈরি করেন। প্রতিটি পয়েন্টে দ্রুতগামী অশ্ব ও সুদক্ষ দায়িত্বশীলগণ অবস্থান করতেন। তারা পালাক্রমে পত্র বহনের দায়িত্ব পালন করতেন। ইবনুত তিকতাকি বলেন, বেশ কিছু পয়েন্টে কিছু দ্রুতগামী ঘোড়া ও দায়িত্বশীল রাখা হতো। নিকটবর্তী পয়েন্ট থেকে কেউ বার্তা নিয়ে এসে ক্লান্ত হয়ে পড়লে কালক্ষেপণ না করে উক্ত পয়েন্ট থেকে অপর দায়িত্বশীল দ্রুত সংবাদ পৌঁছানোর লক্ষ্যে নতুন ঘোড়া নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছুটতেন। এভাবেই তারা পালাক্রমে পত্র বহন ও পৌঁছানোর কাজ করতেন। (২৩৭)

ডাক ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন
এটা সুস্পষ্ট যে, ডাকব্যবস্থা একটি প্রাচীন যোগাযোগ ব্যবস্থা। পারস্য ও রোম সাম্রাজ্যেও এ ব্যবস্থার প্রচলন ছিল। (২৩৮) ইসলামের পূর্বে আরবদের মধ্যেও এ রীতির প্রচলন পাওয়া যায়। তাই স্বাভাবিকভাবেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের পরও এটি ছিল একটি প্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত বিষয়। এমনকি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও ইসলামের দাওয়াত প্রদানের লক্ষ্যে পার্শ্ববর্তী অনেক রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে দূত পাঠিয়ে পত্র আদান প্রদান করেছেন। বিষয়টি তিনি এতই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন যে, সুদর্শন ও সুন্দর নামের অধিকারী লোকদের এ কাজের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন। এরই ফলে পারস্যের সম্রাট খসরু, রোমসম্রাট কাইসার, মিশরের শাসনকর্তা মুকাওকিস, আবিসিনিয়ার বাদশা নাজাশির কাছে যেসব দূত পাঠিয়েছেন সবার মাঝেই এ বৈশিষ্ট্য সমানভাবে বিদ্যমান ছিল। কারণ তিনি জানতেন একজন দূত হলেন একটি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি। প্রেরকের আগ্রহ ও সিদ্ধান্তের প্রতিচ্ছবি। এর বিপরীত হলে উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। শূন্য হাতে ফিরে আসতে হবে দূতকে। (২৩৯)

তা ছাড়া বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পত্র ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি সিল বা আংটি তৈরির নির্দেশ দেন। কারণ তৎকালীন সম্রাটগণ রাষ্ট্রীয় সিল ছাড়া কোনো পত্র গ্রহণ করতেন না এবং সিলমোহরকে তারা প্রাপকের সম্মান বলে মনে করতেন। (২৪০)

প্রথম যুগের মুসলিমগণ যুদ্ধ-জিহাদকে যে পরিমাণ গুরুত্ব দিয়ে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েন, বিশেষত খুলাফায়ে রাশেদিনের যুগে অসংখ্য বিজয়ের বীরোচিত উপাখ্যান রচনা করে ইসলামি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি সমুজ্জ্বল করেন, তা ধরে রাখার জন্য এবং প্রাদেশিক গভর্নর ও সরকারি প্রতিনিধিদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করার জন্য ডাক ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তৎকালীন ইসলামি রাষ্ট্রের সৈনিকগণ জিহাদের গুরুদায়িত্ব পালনের সঙ্গে সঙ্গে পত্র বহন ও পৌছানোর দায়িত্বও সমানভাবে পালন করতেন। আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর কাছে বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধরত মুসলিম সেনাপতিদের পক্ষ থেকে নিয়মিত চিঠি আসত। যুদ্ধের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখতে আমিরুল মুমিনিন সবসময় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। বরং প্রতিটি পদক্ষেপ ও ঘটনা কেন্দ্রীয় প্রশাসনকে অবহিত করতে তাদের উদ্বুদ্ধ করতেন। যেন তারা একাকিত্ব বোধ না করেন, সবসময় আমিরুল মুমিনিন ও মুসলিমবিশ্ব তাদের পাশে আছে, তাদের বিজয়াভিযান ও দুঃখ-কষ্ট তাদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছে এই ধারণা যেন সবসময় তাদের হৃদয়ে বদ্ধমূল থাকে। তা ছাড়া সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ এবং প্রতিকূল অবস্থায় সাহায্য প্রেরণ যেন সম্ভব হয়, যোগাযোগ রক্ষার পেছনে সেটিও ছিল আমিরুল মুমিনিনের অন্যতম উদ্দেশ্য।

উমাইয়া শাসনামলে মুআবিয়া রা. ডাক ও যোগাযোগব্যবব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে বেশ কিছু পদ ও বিধি প্রণয়ন করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, রাষ্ট্রের প্রতিটি বিষয় পর্যবেক্ষণ করা। আর এভাবেই মুআবিয়া রা. ইসলামের ইতিহাসে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ডাক ও যোগাযোগব্যবব্যবস্থার গোড়াপত্তন করেন। এর জন্য স্বতন্ত্র কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করে রোম ও পারস্য থেকে সুদক্ষ কর্মী নিয়ে আসেন। (২৪১)

এরপর আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান এসে ডাকবিভাগের অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করে নতুন নতুন বিষয় তাতে অন্তর্ভুক্ত করেন। ফলে ইসলামি রাষ্ট্রের জন্য তা আরও কার্যকরী ও ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়। এর মধ্যে ছিল প্রতিটি ভূখণ্ডের জন্য সীমা নির্ধারণ করা এবং দামেশক থেকে জেরুজালেম পর্যন্ত বিস্তৃত স্বতন্ত্র চারটি পথ তৈরি করা। বাদশা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান দিনরাতের যেকোনো সময় পত্রবাহক এলে রাজপ্রাসাদে ঢুকতে কোনো প্রকার বাধা না দিতে প্রধান প্রহরীকে আদেশ দেন। বর্ণিত আছে, তিনি রাজপ্রহরী ইবনুদ দোগাইদাগাকে ডেকে বলেন, চার প্রকার লোক ছাড়া আমার দরজায় যে-ই আসবে, অবশ্যই তুমি তাদের পরীক্ষা করবে : এক. মুয়াজ্জিন, কারণ সে হলো আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী। তার ওপর কোনো বাধা চলে না। দুই. রাতের আগন্তুক। কারণ কঠিন বিপদে পড়েছে বলেই সে এসেছে। তা না হলে সে ঘুমিয়ে থাকত। তিন. পত্রবাহক। দিনরাতের যখনই সে আসবে, তাকে বারণ করবে না। কারণ বছরজুড়ে বিশৃঙ্খলায় পড়ে থাকা পুরো রাজ্যকে একটি সংবাদের মাধ্যমে মুহূর্তেই শান্ত করে দিতে পারেন একজন পত্রবাহক। চার. খাবার। যখনই আসবে, দরজা খুলে দেবে। সবাইকে খাবারে অংশগ্রহণ করার সুযোগ করে দেবে। (২৪২) বাদশা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের কাছে পত্রবাহকের কী পরিমাণ গুরুত্ব ছিল, এ ঘটনা থেকেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

বিখ্যাত উমাইয়া শাসক ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিকের শাসনামলে অর্থনৈতিক ও নাগরিক উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় ডাক ও যোগাযোগব্যবব্যবস্থার পরিধি আরও সম্প্রসারিত হয়। বিপুল পরিমাণ উট ও ঘোড়া বরাদ্দ করা হয় এ কাজের জন্য। রাষ্ট্রজুড়ে অনেকগুলো ডাকপয়েন্ট স্থাপন করা হয়। তার আমলে ডাক ও যোগাযোগব্যবব্যবস্থার অসামান্য উন্নতি সাধিত হয়, এমনকি কনস্টান্টিনোপল থেকে দামেশক পর্যন্ত দীর্ঘ পথে দায়িত্বরত বাহনগুলোকে স্বর্ণখচিত আবরণ পরানো হয়। এরকম আচ্ছাদন কেবল বড় বড় মসজিদ, মক্কা, মদিনা ও বাইতুল মুকাদ্দাসের দেয়ালগুলোতেই শোভা পেত। (২৪৩)

ডাকবিভাগের উন্নয়নে বিখ্যাত শাসক উমর ইবনে আবদুল আযিযও ব্যাপক অবদান রেখে যান। ডাকপয়েন্টগুলোর সম্প্রসারণ, বিশ্রামাগার তৈরি, এ কাজের জন্য ব্যবহৃত প্রতিটি সড়কে বাহনের পানের জন্য পানির হাউজ এবং খাদ্যশালা স্থাপন করেন। উমর ইবনে আবদুল আযিয ঘোষণা করে দেন, এই বাহনগুলো কেবল যেন মুসলিমদের সেবায় এবং পত্র বহনের কাজে ব্যবহৃত হয়। কারণ বাহনগুলো ছিল রাষ্ট্রীয় সম্পদ। একবার তিনি সরকারি এক কর্মীকে তার এলাকা থেকে মধু নিয়ে আসতে বলেন। ওই কর্মী ডাকবাহনের পিঠে করে সেই মধু নিয়ে আসে। উমর ইবনে আবদুল আযিয জিজ্ঞেস করেন, কীভাবে নিয়ে এসেছে? দরবারিগণ উত্তর দিলেন, ডাকবাহনের পিঠে করে। এ কথা শুনে তিনি ওই মধু বিক্রি করে তার মূল্য মুসলিমদের সাধারণ অর্থ তহবিলে জমা করার নির্দেশ দেন। আর ওই কর্মীকে বলেন, এই বাহনে করে এনে তুমি তোমার মধু নষ্ট করে ফেলেছ! (২৪৪)

ইতিহাসে দেখা যায় আব্বাসি খলিফাগণও ডাকব্যবব্যবস্থার উন্নয়নকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে তা প্রধান নিয়ামক হিসেবে গ্রহণ করেন। আবু জাফর মনসুর বলতেন, আমার ঘরে সবসময় চার প্রকার ব্যক্তির উপস্থিতি জরুরি। সবসময় তাদের দরকার হয় আমার। জিজ্ঞেস করা হলো, তারা কারা হে আমিরুল মুমিনিন? বললেন, তারা হলেন রাষ্ট্রের ভিত্তি। তাদের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্র অচল। ঠিক যেমন চৌকাঠের খুঁটি থাকে চারটি। একটি যদি অসম্পূর্ণ থাকে, তাহলে তা দুর্বল ও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যায়। এক. বিচারক, যিনি আল্লাহপ্রদত্ত বিচারব্যবব্যবস্থা কার্যকরে কারও হুমকি-ধমকির তোয়াক্কা করেন না। দুই. নিরাপত্তারক্ষী বা পুলিশ, যারা দুর্বল-সবল সবার প্রতি ন্যায্য আচরণ করেন। তিন. কর উসুলকারী, যিনি জনগণের ওপর জুলুম না করে সবার অবস্থা খতিয়ে দেখে কর আদায় করেন। এ ব্যাপারে কেউ জুলুম করলে আমি তা বরদাশত করব না। এরপর তিনি তিনবার দাঁতে শাহাদাত আঙুল চাপলেন। প্রতিবার তিনি আহ আহ বলে আওয়াজ করলেন। জিজ্ঞেস করা হলো, চতুর্থ ব্যক্তিটি কে হে আমিরুল মুমিনিন? তিনি বললেন, পত্রবাহক বা সংবাদবাহক, যিনি সঠিকভাবে সকলের সংবাদ লেখেন। (২৪৫)

ভন ক্রেমার বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গনের মূলে ছিলেন একজন ডাকবিভাগের কর্মী। গুরুত্বপূর্ণ সব সংবাদ সম্পর্কে খলিফাকে অবহিত করাই ছিল তার দায়িত্ব। বরং প্রাদেশিক গভর্নরদের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি করার দায়িত্বও ছিল তার ওপর। এক কথায় কেন্দ্রীয় সরকারের আস্থাভাজন ব্যক্তি ছিলেন তারা। খলিফাগণ ডাকবিভাগের কার্যক্রমকে রাষ্ট্র পরিচালনার কাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করতেন। তাদের সাহায্যেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে কি না তা শাসকগণ জানতে পারতেন। (২৪৬)

খলিফা হারুনুর রশিদ দ্রুত সংবাদ আদান-প্রদান এবং বিভাগীয় গভর্নরদের উদ্দেশে ত্বরিত ফরমান জারি করার লক্ষ্যে পুরো মুসলিম সাম্রাজ্যকে নিখুঁত ডাক-যোগাযোগের আওতাভুক্ত করেন। এজন্য ত্বরিত ব্যবস্থা নেন। অনেকগুলো ডাকপয়েন্ট স্থাপন করেন, প্রতিটি পয়েন্টে স্বতন্ত্র কর্মী ও অশ্ব বরাদ্দের ব্যবস্থা করে তাদের জন্য খাদ্য, পানীয় ও প্রয়োজনীয় সকল সরঞ্জামের উপস্থিতি নিশ্চিত করেন। (২৪৭)

১৬৬ হিজরি/৭৮২ খ্রিষ্টাব্দের ঘটনাসমগ্র বর্ণনা করতে গিয়ে ইবনে কাসির রহ. বলেন, মক্কা, মদিনা ও ইয়ামেনের মাঝে উন্নত ডাকব্যবস্থা স্থাপনের নির্দেশ দেন খলিফা মাহদি। এর আগে অন্য কেউ এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন বলে জানা যায় না। (২৪৮)

মামলুক রাজবংশের শাসনামলেও ডাকব্যবব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নতি ঘটে। বিশেষ করে সুলতান বাইবার্সের রাজত্বকালে। এ সময় স্থল ও সামুদ্রিক উভয় পরিমণ্ডলে ডাকপায়রার আনাগোনার জন্য তিনি সুবিস্তৃত নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করেন, যা ৫৭২ হিজরি/১১৭৬ খ্রিষ্টাব্দে সালাহুদ্দিন আইয়ুবির নির্মিত পশ্চিম কায়রোর জাবাল দুর্গকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হতো। সেখান থেকে তৈরি হয় চারটি স্থলকেন্দ্রিক পথ:

১। একটি পথ চলে যায় আফ্রিকা মহাদেশের সুদানে অবস্থিত কুসের দিকে। সেখান থেকে আসওয়ানের দিকে। এরপর সেখান থেকে সুদান ও ইথিউপিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে।
২। আরেকটি পথ চলে যায় কুস হয়ে লোহিত সাগরের তীরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ শহর আয়যাব ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে।
৩। আরেকটি পথ চলে যায় আলেকজান্দ্রিয়ার দিকে।
৪। চতুর্থ পথটি দিময়াত হয়ে গাজা শহর অভিমুখে।

সুলতান বাইবার্সের রাজত্বকালে প্রতি সপ্তাহে দুবার করে মিশরে ডাক আসত। আর ডাকবিষয়ক সকল-কিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন রচনা বিভাগের প্রধান। (২৪৯)

ইসলামি সভ্যতায় ডাক ও ডাক পরিভাষা ইসলামি সভ্যতায় ডাকব্যবব্যবস্থার বিচিত্র কিছু প্রকার ছিল, যা ইসলামি সভ্যতায় ডাকব্যবব্যবস্থার উন্নতি ও সামসময়িক যোগাযোগ ব্যবব্যবস্থার বিবরণ তুলে ধরে। নিচে আমরা কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ডাকব্যবব্যবস্থার কথা তুলে ধরছি:

১। স্থলপথে ব্যবহৃত ডাকব্যবস্থা স্থলপথে ডাকসেবা পরিচালনায় যারা দায়িত্ব পালন করতেন তাদের ফুযুজ বা সুআত নামে ডাকা হতো। বিরতিহীন ভ্রমণ ও নিরলস পরিশ্রমে তারা ছিলেন সুপরিচিত। মুসলিমগণ সে যুগে ডাকসেবা পরিচালনায় ব্যাপকভারে উট, ঘোড়া ব্যবহার করতেন। খচ্চরের প্রচলনও ছিল উল্লেখযোগ্য হারে। স্থলপথে অবস্থিত সকল শহর ও পয়েন্টে ডাকবাহন ও দায়িত্বশীলদের জন্য পৃথক পৃথক বিশ্রামাগার থাকত, সেখানে বাহনের খাবার ও বিশ্রামের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা হতো। প্রয়োজনে বাহন পালটে নতুন করে নেওয়ার মতো অনেক ঘোড়া ও গাধা সবসময় সেখানে প্রস্তুত থাকত। (২৫০) ডাকব্যবব্যবস্থায় 'শাহারা' নামক একপ্রকার দ্রুতগামী ঘোড়া ও 'নাজিব' নামক একপ্রকার দ্রুতগামী উট ব্যবহৃত হতো, যা অন্যসব ঘোড়া ও উট থেকে তুলনামূলক ক্ষিপ্র ও কষ্টসহিষ্ণু প্রকৃতির হতো। (২৫১)

ডাকব্যবব্যবস্থার পথ ও সীমা সুদূরপ্রসারী ও সুবিস্তৃত হওয়ায় নির্জলা মরুভূমির বালুকাময় প্রান্তর দিয়ে গমন করা ছিল খচ্চরের জন্য কঠিন ও দুঃসাধ্য, ফলে যথাসম্ভব মরুপ্রান্তর এড়িয়ে যেসব অঞ্চলে পানি ও বৃক্ষরাজির অস্তিত্ব পাওয়া যায় সেসব নিরাপদ ও শক্ত মাটি বিশিষ্ট প্রান্তরকে ডাকপথ হিসেবে বেছে নেওয়া হতো। (২৫২)

২। জলপথে ব্যবহৃত ডাকব্যবস্থা সমুদ্রপথে ডাক-যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত হতো উন্নত ও অত্যাধুনিক সব নৌযান। হাসান ইবনে আবদুল্লাহ বলেন, সামুদ্রিক অঞ্চলে দ্রুত ও হালকা নৌযান ব্যবহৃত হতো ডাক বাহন হিসেবে। (২৫৩) প্রথম হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ সমুদ্রে আলকাতরার আবরণে তৈরি শক্ত কাঠ ও লোহার পেরেক দ্বারা নির্মিত দ্রুতগামী নৌযান পরিচালনা করেন। (২৫৪)

৩। আকাশপথে ব্যবহৃত ডাকব্যবস্থা আকাশপথে ডাকব্যবস্থা পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত হতো ডাকপায়রা। ক্ষুদেবার্তা আদান-প্রদানের জন্য এটি ছিল একটি কার্যকর ব্যবস্থা। বার্তাটি ডাকপায়রার পিঠে, বা পালকের নিচে, অথবা পায়ে বেঁধে দেওয়া হতো। আর তা নিয়ে সে গন্তব্যের দিকে রওনা হতো। এ ধরনের পায়রাকে ডাকা হতো হাদি (الدي) নামে। (২৫৫)

মুসলিমগণ শুধু স্থল ও জলপথে ডাকসেবা নিশ্চিত করেই ক্ষান্ত হননি, বরং অপেক্ষাকৃত দ্রুত ও উন্নত ডাকব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নানামুখী পদক্ষেপ ও প্রকল্প হাতে নেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি ছিল ডাকপায়রা।

ডাকপথে ব্যবহৃত কবুতরের অনেক কদর ছিল এবং সে সময় তা চড়া দামে বিক্রি হতো। বিশেষত বসরা নগরীতে মানুষ তা কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ত। ডাকপায়রার জন্য সে সময় স্বতন্ত্র মার্কেট ছিল। এমনকি একটি পায়রার দাম সাতশ দিনার পর্যন্ত উঠত সেখানে। সুলতান নুরুদ্দিন যিনকির শাসনামলে এবং উবাইদি-ফাতেমি বংশের রাজত্বকালে এ ধরনের পায়রার ব্যবহার ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায়। সুদূর বসরা থেকে কায়রো পর্যন্ত এবং কায়রো থেকে দামেশক পর্যন্ত পায়রাযোগে পত্র আdan-প্রদানের রীতি চালু ছিল। পায়রার বিরতি গ্রহণ ও অবতরণের জন্য তখন স্বতন্ত্র উঁচু টাওয়ার নির্মিত হয়। টাওয়ার থেকে টাওয়ারে গমন করতে করতে শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট গন্তব্যের টাওয়ারে এসে অবতরণ করত ডাকপায়রা। দামেশকের টাওয়ারগুলোতে মিশরের পায়রা রাখা হতো এবং মিশরের টাওয়ারগুলোতে দামেশকের পায়রা রাখা হতো। সাধারণত একবার পত্র প্রেরণের জন্য দুটি চিঠি ও দুটি পায়রা প্রস্তুত করা হতো। একটি ওড়ানোর প্রায় দু-ঘণ্টা পর দ্বিতীয়টি ওড়ানো হতো। প্রথমটি পথ হারিয়ে ফেললে বা দুর্ঘটনায় মারা গেলে দ্বিতীয় পায়রাটি যেন গন্তব্যে পৌছে। বৃষ্টির সময় বা বৈরী আবহাওয়ার কালে সাধারণত পত্র পাঠানো হতো না। পেটভরতি আহার না করিয়ে কখনো পায়রা ছাড়া হতো না।(২৫৬)

পায়রাযোগে পাঠানো পত্রগুলো হতো অতি সংক্ষিপ্ত ও ইঙ্গিতবহ ভাষায় লেখা। এ ধরনের বার্তা যুদ্ধের সময় বেশি পাঠানো হতো। ছোট ও হালকা কাগজে সংক্ষিপ্ত করে লিখে বৃষ্টিবাদল বা ঝড় থেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য তা পায়রার পায়ে বা পালকের নিচে বেঁধে দেওয়া হতো। আর তাতে লেখা হতো খুবই চিকন ও হালকা অক্ষরে। (২৫৭)

এই ছিল আকাশপথে পরিচালিত মুসলিমদের ব্যবহৃত ডাক ও যোগাযোগব্যবব্যবস্থা, যা স্থলীয় ডাকব্যবব্যবস্থা থেকে কোনো অংশে কম গুরুত্বের ছিল না।

৪। অগ্নিসংযোগ করে সতর্কবার্তা প্রদান
উল্লিখিত ডাকব্যবব্যবস্থা ছাড়াও মুসলিমদের মাঝে প্রচলিত ছিল আগুন জ্বালিয়ে সতর্ক করার মতো ব্যবস্থাও। কালকাশান্দি বলেন, নির্দিষ্ট কিছু পয়েন্ট ও স্থাপনা ছিল, যেখানে রাতেরবেলা অগ্নি প্রজ্বলন করা হতো এবং দিনেরবেলা ধোঁয়া উত্তোলন করা হতো। এর জন্য কোনো এলাকায় পাহাড়ের চূড়ায়, আবার কোনো এলাকায় উঁচু ভবনের ওপর জায়গা নির্ধারণ করা হতো। সরকারি কর্মকর্তা ও নিরাপত্তারক্ষীদের মাঝে এ ধরনের সংকেত আদান-প্রদানের রীতি প্রচলিত ছিল। ইসলামি ভূখণ্ডের সর্বশেষ সীমান্ত এলভিরা ও রাহবা থেকে জাবাল দুর্গ পর্যন্ত এ সংকেতসীমা বিস্তৃত ছিল। ফলে ফুরাত নদীর তীরবর্তী এলাকায় (ইরাকে) কিছু ঘটলে রাতের মধ্যেই সে খবর মিশর পর্যন্ত চলে আসত। রাতে কিছু ঘটলে সকালের মধ্যেই সবাই তা জেনে যেতেন। বিচিত্র সাংকেতিক পদ্ধতি অবলম্বন করে আগুন প্রজ্বলন ও ধোঁয়া উত্তোলন করা হতো, যা দিয়ে শত্রুদের সর্বশেষ অবস্থা, তাদের গতিবিধি ও অপতৎপরতার খবর দেওয়া হতো, কখনো কখনো আক্রমণকারী শত্রুদের সংখ্যাও জানিয়ে দেওয়া হতো নানাভাবে আগুন জ্বালিয়ে। (২৫৮)

এসব বাতিঘরগুলো সমুদ্র উপকূলে নির্মিত হতো আর এতে দায়িত্বরত রক্ষীগণ সমুদ্রপথে শত্রুদের আগমন সম্পর্কে রাজধানীকে সতর্ক করার জন্য দিনরাত উপকূলীয় এলাকাগুলো পাহারা দিতেন। নিজেদের মধ্যে পরিচিত ভাষায় নানাভাবে আগুন জ্বালিয়ে সংকেত দিতেন। যখনই কোনো শত্রুপক্ষের আগমন টের পেতেন, রাতেরবেলা হলে সঙ্গে সঙ্গে আগুন জ্বালিয়ে পার্শ্ববর্তী বাতিঘরে দায়িত্বরত রক্ষীদের সংকেত দিতেন। আর দিনেরবেলা হলে ধোঁয়া উৎক্ষেপণ করে সাবধান করতেন। এজন্যই বলা হতো, আলোকবার্তা সুদূর মরক্কোর টাঙ্গিয়ার থেকে আলেকজান্দ্রিয়া পর্যন্ত মাত্র এক রাতের ব্যবধানে পৌঁছে যেত। প্রতিরক্ষা দুর্গগুলোর মাঝে দ্রুততম উপায়ে সংবাদ আদান-প্রদানের লক্ষ্যে উপকূলীয় চৌকিগুলোর মসজিদের মিনার থেকে আলোক-সংকেত পাঠানো হতো। এই পদ্ধতি বিশেষভাবে চালু ছিল আফ্রিকার তিউনিসিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলে। তন্মধ্যে প্রসিদ্ধ হলো সউসে শহরের মুনাস্তির (২৫৯) চৌকি। (২৬০)

কালকাশান্দি বাতিঘর সম্পর্কিত তার আলোচনার শেষে উল্লেখ করেন, সুবিশাল ইসলামি ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষাব্যব্যবস্থার দায়িত্বশীলগণ যে প্রজ্ঞা ও কৌশল উদ্ভাবন করেছেন, তা পরিমাপ করার মতো নয়। সংবাদ সরবরাহের ক্ষেত্রে তারা উন্নত ও আধুনিক সব ব্যবস্থা আবিষ্কার করেছেন। কারণ শুরুতে বাহনে করে পত্র আdan-প্রদান ছিল সবচেয়ে দ্রুত ব্যবস্থা। এর চেয়েও দ্রুত ডাকসেবা হয় পায়রা। এর চেয়েও আরও দ্রুত যোগাযোগ সেবা হয়ে ওঠে আলোক-সংকেত ব্যবস্থা। আপনি জেনে অবাক হবেন, ইরাক থেকে মিশর পর্যন্ত যেকোনো সংবাদ এক রাতের ব্যবধানে পৌঁছে যেত। কত দ্রুত ও উন্নত ডাকব্যবব্যবস্থা হলে এরকমটি সম্ভব! (২৬১)

উপর্যুক্ত বৃত্তান্তের আলোকে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়, ইসলামি সভ্যতা সামসময়িক যুগের সবচেয়ে উন্নত ও আধুনিক উপকরণ ব্যবহার করে ডাক ও যোগাযোগব্যবব্যবস্থার অগ্রগতি সাধন করেছে। এভাবে রাষ্ট্র সবসময় একজন নেতা বা খলিফার অধীনে পরিচালিত ছিল। তিনিই সবকিছু সম্পর্কে একের পর এক অবগত হতেন। আর এসব ব্যবস্থা ইউরোপীয় জাতি-গোষ্ঠীগুলো বহু যুগ ও বহু শতাব্দী পার হওয়ার পর আবিষ্কার করতে পেরেছে।

টিকাঃ
২২৯. ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব, মাদ্দাহ, برد, খ. ৩, পৃ. ৮৪।
২৩০. তাবারানি, আল-মুজামুল আওসাত, খ. ৭, পৃ. ৩৬৭। ইবনে হাজার আসকালানি, আল-মাতালিবুল আলিয়া, খ. ১১, পৃ. ৬৮৫ (২৬৮৫)।
২৩১. আবু দাউদ, হাদিস নং ২৭৫৮। ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ৪৮৭৭।
২৩২. যামাখশ্মরি, আল-ফায়িক ফি গারিবিল হাদিসি ওয়াল-আসার, খ. ১, পৃ. ৪০৫; ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব, মাদ্দাহ, برد, খ. ৩, পৃ. ৮৪।
২৩৩. তানুখি, আল-ফারাজু বা'দাশ শিদ্দাতি, খ. ১, পৃ. ৫০।
২৩৪. তারতুশি, সিরাজুল মুলুক, পৃ. ৪৯।
২৩৫. ইবনুত তিকতাকি, আল-ফাখরিয়্যু ফিল-আদাবিস সুলতানিয়্যা, পৃ. ১০৬।
২৩৬. আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামি, পৃ. ১৩৯।
২৩৭. ইবনুত তিকতাকি, আল-ফাখরিয়্যু ফিল-আদাবিস সুলতানিয়্যা, পৃ. ১০৬।
২৩৮. কালকাশান্দি, সুবহুল আশা, খ. ১৪, পৃ. ৪১২।
২৩৯. ইবরাহিম আলি আল-কাল্লা, নুযুমুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১০৪।
২৪০. আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত, একবার মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনারব জনগোষ্ঠী বরাবর পত্র লেখার ইচ্ছা করলে তাকে অবগত করা হলো যে, অনারবগণ সিল ছাড়া কোনো পত্র গ্রহণ করেন না। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি (সিল হিসেবে ব্যবহারের জন্য) রুপার একটি আংটি তৈরি করেন যাতে লেখা ছিল عمد رسول الله। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে বা আঙুলে সেই আংটি শোভা পেত। দেখুন, বুখারি, হাদিস নং ৬৫; মুসলিম, হাদিস নং ২০৯২।
২৪১. কালকাশান্দি, সুবহুল আশা ফি সিনাআতিল ইনশা, খ. ১৪, পৃ. ৪১৩; কামাল আনানি ইসমাইল, দিরাসাত ফি তারিখিন নুযুমিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১০৪-১০৫।
২৪২. কালকাশান্দি, সুবহুল আ'শা, খ. ১৪, পৃ. ৪১৩।
২৪৩. কালকাশান্দি, সুবহুল আশা, খ. ১৪, পৃ. ৪১৩।
২৪৪. ইবনুল জাওযি, সিরাতু ওয়া মানাকিবু উমর, পৃ. ২১০; আবু ইউসুফ ইয়াকুব ইবনে সুফিয়ান ফাসাবি, আল-মারিফাতু ওয়াত-তারিখু, খ. ১, পৃ. ৩৩৭।
২৪৫. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ৬, পৃ. ৩১৩।
২৪৬. আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামি, পৃ. ১৪১।
২৪৭. ইবরাহিম আলি আল-কাল্লা, নুযুমুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১০৫-১০৬।
২৪৮. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ১০, পৃ. ১৫৮।
২৪৯. আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামي, পৃ. ১৪৫।
২৫০. কালকাশান্দি, সুবহুল আ'শা, খ. ১৪, পৃ. ৩৭৭; জাওয়াদ আলি, আল-মুফাসসাল ফি তারিখিল আরবি কাবলাল ইসলাম, খ. ৯, পৃ. ৩২০।
২৫১. কামাল আনানি ইসমাইল, দিরাসাত ফি তারিখিন নুযুমিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১০৬।
২৫২. জাওয়াদ আলি, আল-মুফাসসাল ফি তারিখিল আরাবি কাবলাল ইসলাম, খ. ৯, পৃ. ৩২০-৩২১।
২৫৩. হাসান ইবনে আবদুল্লাহ, আসারুল উওয়াল ফি তারতিবিদ দুওয়াল, পৃ. ৮৯; মুহাম্মাদ যয়ফুল্লাহ, আল-হাদারাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৯৮ থেকে উদ্ধৃত।
২৫৪. জাহিয, আল-বায়ান ওয়াত-তিবয়ান, পৃ. ৩৬৪।
২৫৫. মুহাম্মাদ যয়ফুল্লাহ, আল-হাদারাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৯৮।
২৫৬. মুহাম্মাদ যয়ফুল্লাহ, আল-হাদারাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৯৮-১৯৯; আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামি, পৃ. ১৪৬।
২৫৭. কামাল আনানি ইসমাইল, দিরাসাত ফি তারিখিন নুযুমিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১০৭-১০৮।
২৫৮. কালকাশান্দি, সুবহুল আ'শা, খ. ১৪, পৃ. ৪৪৫।
২৫৯. মুনাস্তির শহরটি সউসে শহর থেকে ৩০ কি.মি দক্ষিণে অবস্থিত।
২৬০. দেখুন, সাদ যাগলুল গং, দিরাসাত ফি তারিখিল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৪৮০-৪৮১; কামাল আনানি ইসমাইল, দিরাসাত ফি তারিখিন নুযুমিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১০৮।
২৬১. কালকাশান্দি, সুবহুল আশা, খ. ১৪, পৃ. ৪৪৭।

ডাক ও যোগাযোগের সকল উপায়-উপকরণ ও ব্যবস্থাপনার উন্নয়নকে অনেক গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে সেজন্য প্রয়োজনীয় সকল উপাদান নিশ্চিত করেছে ইসলামি সভ্যতা। ইসলামি রাষ্ট্র সম্প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এমন একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা ছিল সময়ের দাবি, যা খিলাফতের রাজধানীর সঙ্গে ইসলামি রাষ্ট্রের অন্যান্য শহরের, বিশেষ করে খলিফার সাথে প্রাদেশিক গভর্নরদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ নিশ্চিত করবে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে ওঠে ডাক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। সেজন্য পুরো একটি বিভাগ এবং স্বতন্ত্র একটি কার্যালয় গঠন করা হয়, যা ইসলামি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে এবং বিশ্বপরিস্থিতি সম্পর্কে সদা সতর্ক ও অবগত থাকতে বিরাট ভূমিকা পালন করে। ইসলামি সভ্যতা যে উন্নতি ও অগ্রগতির সর্বোচ্চ শৃঙ্গে আরোহণ করেছিল, তারই উজ্জ্বল প্রমাণ এই ডাক ও যোগাযোগ বিভাগ।

আরবি বারিদ শব্দের অর্থ ও তার আধুনিকায়ন:

برید শব্দের উৎপত্তি নিয়ে মতভেদ আছে ঠিক, তবে এটি যে নিখাদ আরবি শব্দ এ নিয়ে কারও মাঝে বিরোধ নেই। এ শব্দের অনেকগুলো অর্থের একটি হলো: দূত, বার্তাবাহক। আরবিতে একটি প্রবাদ আছে: «الْحُمَّى بَرِيْدُ الْمَوْتِ» জ্বর হলো মৃত্যুর দূত। অর্থাৎ জ্বর মৃত্যুর বার্তা নিয়ে আসে, জীবনাবসানের কথা মনে করিয়ে দেয়। রাজ্যে বলেন,

«رَأَيْتُ لِلْمَوْتِ بَرِيْدًا مُبْرَدًا» আমি মৃত্যুর বার্তাবাহককে আসতে দেখেছি।

সিংহের আগমনি বার্তা দেয় বিধায় সারসপাখিকেও আরবিভাষীগণ 'বারিদ' বলে থাকেন। (২২৯)

গাধা বা ঘোড়ার পিঠে চড়ে যারা বার্তা আদান-প্রদানের দায়িত্ব পালন করেন, তাদেরকেও 'বারিদ' বলা হয়। আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

إِذَا أَبْرَدْتُمْ إِلَيَّ بَرِيدًا، فَابْعَثُوهُ حَسَنَ الْوَجْهِ، حَسَنَ الْإِسْمِ»

আমার কাছে কোনো বার্তাবাহক পাঠানোর সময় তোমরা সুদর্শন ও সুন্দর নামের অধিকারী কাউকে পাঠিয়ো। (২৩০)

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন,

إِنِّي لَا أَخِيْسُ بِالْعَهْدِ، وَلَا أَحْبِسُ الْبُرْدِ»

আমি কখনো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করি না এবং কোনো দূতকে গ্রেফতার করি না। (২৩১)

যামাখশারি রহ. বলেন, "برید শব্দের راء-তে সাকিন করে পড়লে সেটি برید শব্দের বহুবচন ধরা হবে। তখন অর্থ হবে বার্তাবহক। رُسُلٌ শব্দটির سین এ যেমন পেশ ও সাকিন উভয়টাই চলে, তেমনই برید শব্দের বহুবচন بُرُد-এর راء-তে পেশ ও সাকিন উভয়টাই চলবে। (২৩২)

এ কারণেই পত্রবাহক জন্তুকেও বলা হয় বারিদ। তানুখি বলেন, পত্র বহন ও পৌছানোর দায়িত্বটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ও স্পর্শকাতর। কারণ একজন-দুজন নয়, পুরো একটি সংঘবদ্ধ দলকে কাজ করতে হতো এর জন্য। দরকার হতো দূরের পথ পাড়ি দেওয়ার বহু সরঞ্জাম ও ভ্রমণ পাথেয়ের। তাদের প্রধান দায়িত্ব ছিল পত্রবাহকদের চলাচলের পথগুলো সর্বক্ষণ পাহারা দিয়ে নিরাপদ রাখা। চোর-ডাকাত ও শত্রুদের আনাগোনা থেকে তা সুরক্ষিত রাখা। গোয়েন্দাদের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা। কারণ সীমান্তরক্ষীদের থেকে আসা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ চিঠিপত্র তাদেরকেই বহন করতে হতো। প্রাদেশিক অঞ্চল থেকে আসা বার্তাগুলো তাদেরকেই পুরোপুরি আমানতের সাথে দ্রুত ও সংক্ষিপ্ত পথ ধরে শাসকদের কাছে পৌঁছে দিতে হতো। আর এই দায়িত্ব পালন করার জন্য নির্বাচন করতে হতো দ্রুতগামী বাহন ও দূরদর্শী ব্যক্তিদের। পত্র বহনের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ শাসকদের কাছে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দাদের মর্যাদা পেতেন। কারণ শাসকগণ যদি তাদের প্রতি শৈথিল্য বা অবজ্ঞা প্রদর্শন করেন, তাহলে কিছুতেই বন্ধুমহল ও শত্রুপক্ষের সার্বিক খবরাখবর তিনি রাখতে পারবেন না। এসব ব্যক্তিবর্গের হাত ধরেই তার হস্তগত হতো পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রসমূহের সকল সংবাদ। ডাক যোগাযোগ বিষয়ে অনীহা প্রদর্শন করলে শাসকদের রাজনীতি দুর্বল হয়ে পড়বে এবং টের পাওয়ার আগেই তারা শত্রুপক্ষের আক্রমণের শিকার হয়ে পড়বে। (২৩৩)

ডাকবিভাগের প্রধান দায়িত্বশীলের কাজ হতো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিভাগের কাছে সকল সংবাদ ও তথ্য সরবরাহ করা। তারা ছিলেন সাংবাদিকের ভূমিকায়। রাষ্ট্রীয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও শাসক শ্রেণির কাছে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনসাধারণের সকল অবস্থা এবং সেখানকার সার্বিক পরিস্থিতির সংবাদ সরবরাহ করা এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চলমান সন্দেহজনক ষড়যন্ত্র, বড় কর্মকর্তা বা বিখ্যাত কোনো ব্যক্তি নিজ প্রচেষ্টায় কোনো অঞ্চল স্বাধীন বা রাষ্ট্র থেকে পৃথক করার চক্রান্তে লিপ্ত কি না এ জাতীয় সকল সংবাদ জানানোই ছিল এ বিভাগের দায়িত্বশীলদের মূল কাজ। (২৩৪)

ইসলামের সূচনালগ্নে পত্রবাহকদের দায়িত্ব ছিল শুধু খলিফাদের বার্তাগুলো প্রাদেশিক গভর্নর ও সরকারি দায়িত্বশীলদের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তাদের বার্তাগুলো খলিফার কাছে হস্তান্তর করা। ইসলামি রাষ্ট্রের সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে তাদের দায়িত্বও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত এ বিভাগের প্রধানকে খলিফার প্রধান গোয়েন্দা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। তিনিই খলিফার আদেশ-নিষেধগুলো বিভাগীয় কর্মকর্তাদের কাছে পত্রযোগে পাঠাতেন এবং তাদের কার্যক্রমের ওপর সবসময় সজাগ দৃষ্টি রেখে খলিফাকে সে সম্পর্কে অবহিত করতেন। তেমনই শত্রুদের গতিবিধির প্রতিও তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতেন। শত্রুদের হালচাল সম্পর্কে অবগত থাকতেন। তার দায়িত্ব ছিল অনেকটা বর্তমান সময়ের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা গোয়েন্দা শাখার মতো। সাহিব আলাউদ্দিন বলেন, তাদের মৌলিক কাজ ছিল আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে প্রতিটি স্থানে ডাকঘর স্থাপন করা এবং যথাস্থানে ত্বরিত সংবাদ পৌঁছে দেওয়া। (২৩৫) পত্র আদান-প্রদান ও চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করার বিষয়টি প্রথম দিকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলেও জনগণের কল্যাণের কথা চিন্তা করে পরবর্তী সময় এই সেবাটি সর্বসাধারণের জন্য অনুমোদন করা হয়। (২৩৬)

মুসলিমগণ এই যোগাযোগব্যবস্থার কল্যাণে প্রথম একক পথ ও পয়েন্ট তৈরি করেন। প্রতিটি পয়েন্টে দ্রুতগামী অশ্ব ও সুদক্ষ দায়িত্বশীলগণ অবস্থান করতেন। তারা পালাক্রমে পত্র বহনের দায়িত্ব পালন করতেন। ইবনুত তিকতাকি বলেন, বেশ কিছু পয়েন্টে কিছু দ্রুতগামী ঘোড়া ও দায়িত্বশীল রাখা হতো। নিকটবর্তী পয়েন্ট থেকে কেউ বার্তা নিয়ে এসে ক্লান্ত হয়ে পড়লে কালক্ষেপণ না করে উক্ত পয়েন্ট থেকে অপর দায়িত্বশীল দ্রুত সংবাদ পৌঁছানোর লক্ষ্যে নতুন ঘোড়া নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছুটতেন। এভাবেই তারা পালাক্রমে পত্র বহন ও পৌঁছানোর কাজ করতেন। (২৩৭)

ডাক ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন
এটা সুস্পষ্ট যে, ডাকব্যবস্থা একটি প্রাচীন যোগাযোগ ব্যবস্থা। পারস্য ও রোম সাম্রাজ্যেও এ ব্যবস্থার প্রচলন ছিল। (২৩৮) ইসলামের পূর্বে আরবদের মধ্যেও এ রীতির প্রচলন পাওয়া যায়। তাই স্বাভাবিকভাবেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের পরও এটি ছিল একটি প্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত বিষয়। এমনকি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও ইসলামের দাওয়াত প্রদানের লক্ষ্যে পার্শ্ববর্তী অনেক রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে দূত পাঠিয়ে পত্র আদান প্রদান করেছেন। বিষয়টি তিনি এতই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন যে, সুদর্শন ও সুন্দর নামের অধিকারী লোকদের এ কাজের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন। এরই ফলে পারস্যের সম্রাট খসরু, রোমসম্রাট কাইসার, মিশরের শাসনকর্তা মুকাওকিস, আবিসিনিয়ার বাদশা নাজাশির কাছে যেসব দূত পাঠিয়েছেন সবার মাঝেই এ বৈশিষ্ট্য সমানভাবে বিদ্যমান ছিল। কারণ তিনি জানতেন একজন দূত হলেন একটি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি। প্রেরকের আগ্রহ ও সিদ্ধান্তের প্রতিচ্ছবি। এর বিপরীত হলে উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। শূন্য হাতে ফিরে আসতে হবে দূতকে। (২৩৯)

তা ছাড়া বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পত্র ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি সিল বা আংটি তৈরির নির্দেশ দেন। কারণ তৎকালীন সম্রাটগণ রাষ্ট্রীয় সিল ছাড়া কোনো পত্র গ্রহণ করতেন না এবং সিলমোহরকে তারা প্রাপকের সম্মান বলে মনে করতেন। (২৪০)

প্রথম যুগের মুসলিমগণ যুদ্ধ-জিহাদকে যে পরিমাণ গুরুত্ব দিয়ে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েন, বিশেষত খুলাফায়ে রাশেদিনের যুগে অসংখ্য বিজয়ের বীরোচিত উপাখ্যান রচনা করে ইসলামি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি সমুজ্জ্বল করেন, তা ধরে রাখার জন্য এবং প্রাদেশিক গভর্নর ও সরকারি প্রতিনিধিদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করার জন্য ডাক ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তৎকালীন ইসলামি রাষ্ট্রের সৈনিকগণ জিহাদের গুরুদায়িত্ব পালনের সঙ্গে সঙ্গে পত্র বহন ও পৌছানোর দায়িত্বও সমানভাবে পালন করতেন। আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর কাছে বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধরত মুসলিম সেনাপতিদের পক্ষ থেকে নিয়মিত চিঠি আসত। যুদ্ধের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখতে আমিরুল মুমিনিন সবসময় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। বরং প্রতিটি পদক্ষেপ ও ঘটনা কেন্দ্রীয় প্রশাসনকে অবহিত করতে তাদের উদ্বুদ্ধ করতেন। যেন তারা একাকিত্ব বোধ না করেন, সবসময় আমিরুল মুমিনিন ও মুসলিমবিশ্ব তাদের পাশে আছে, তাদের বিজয়াভিযান ও দুঃখ-কষ্ট তাদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছে এই ধারণা যেন সবসময় তাদের হৃদয়ে বদ্ধমূল থাকে। তা ছাড়া সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ এবং প্রতিকূল অবস্থায় সাহায্য প্রেরণ যেন সম্ভব হয়, যোগাযোগ রক্ষার পেছনে সেটিও ছিল আমিরুল মুমিনিনের অন্যতম উদ্দেশ্য।

উমাইয়া শাসনামলে মুআবিয়া রা. ডাক ও যোগাযোগব্যবব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে বেশ কিছু পদ ও বিধি প্রণয়ন করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, রাষ্ট্রের প্রতিটি বিষয় পর্যবেক্ষণ করা। আর এভাবেই মুআবিয়া রা. ইসলামের ইতিহাসে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ডাক ও যোগাযোগব্যবব্যবস্থার গোড়াপত্তন করেন। এর জন্য স্বতন্ত্র কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করে রোম ও পারস্য থেকে সুদক্ষ কর্মী নিয়ে আসেন। (২৪১)

এরপর আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান এসে ডাকবিভাগের অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করে নতুন নতুন বিষয় তাতে অন্তর্ভুক্ত করেন। ফলে ইসলামি রাষ্ট্রের জন্য তা আরও কার্যকরী ও ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়। এর মধ্যে ছিল প্রতিটি ভূখণ্ডের জন্য সীমা নির্ধারণ করা এবং দামেশক থেকে জেরুজালেম পর্যন্ত বিস্তৃত স্বতন্ত্র চারটি পথ তৈরি করা। বাদশা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান দিনরাতের যেকোনো সময় পত্রবাহক এলে রাজপ্রাসাদে ঢুকতে কোনো প্রকার বাধা না দিতে প্রধান প্রহরীকে আদেশ দেন। বর্ণিত আছে, তিনি রাজপ্রহরী ইবনুদ দোগাইদাগাকে ডেকে বলেন, চার প্রকার লোক ছাড়া আমার দরজায় যে-ই আসবে, অবশ্যই তুমি তাদের পরীক্ষা করবে : এক. মুয়াজ্জিন, কারণ সে হলো আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী। তার ওপর কোনো বাধা চলে না। দুই. রাতের আগন্তুক। কারণ কঠিন বিপদে পড়েছে বলেই সে এসেছে। তা না হলে সে ঘুমিয়ে থাকত। তিন. পত্রবাহক। দিনরাতের যখনই সে আসবে, তাকে বারণ করবে না। কারণ বছরজুড়ে বিশৃঙ্খলায় পড়ে থাকা পুরো রাজ্যকে একটি সংবাদের মাধ্যমে মুহূর্তেই শান্ত করে দিতে পারেন একজন পত্রবাহক। চার. খাবার। যখনই আসবে, দরজা খুলে দেবে। সবাইকে খাবারে অংশগ্রহণ করার সুযোগ করে দেবে। (২৪২) বাদশা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের কাছে পত্রবাহকের কী পরিমাণ গুরুত্ব ছিল, এ ঘটনা থেকেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

বিখ্যাত উমাইয়া শাসক ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিকের শাসনামলে অর্থনৈতিক ও নাগরিক উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় ডাক ও যোগাযোগব্যবব্যবস্থার পরিধি আরও সম্প্রসারিত হয়। বিপুল পরিমাণ উট ও ঘোড়া বরাদ্দ করা হয় এ কাজের জন্য। রাষ্ট্রজুড়ে অনেকগুলো ডাকপয়েন্ট স্থাপন করা হয়। তার আমলে ডাক ও যোগাযোগব্যবব্যবস্থার অসামান্য উন্নতি সাধিত হয়, এমনকি কনস্টান্টিনোপল থেকে দামেশক পর্যন্ত দীর্ঘ পথে দায়িত্বরত বাহনগুলোকে স্বর্ণখচিত আবরণ পরানো হয়। এরকম আচ্ছাদন কেবল বড় বড় মসজিদ, মক্কা, মদিনা ও বাইতুল মুকাদ্দাসের দেয়ালগুলোতেই শোভা পেত। (২৪৩)

ডাকবিভাগের উন্নয়নে বিখ্যাত শাসক উমর ইবনে আবদুল আযিযও ব্যাপক অবদান রেখে যান। ডাকপয়েন্টগুলোর সম্প্রসারণ, বিশ্রামাগার তৈরি, এ কাজের জন্য ব্যবহৃত প্রতিটি সড়কে বাহনের পানের জন্য পানির হাউজ এবং খাদ্যশালা স্থাপন করেন। উমর ইবনে আবদুল আযিয ঘোষণা করে দেন, এই বাহনগুলো কেবল যেন মুসলিমদের সেবায় এবং পত্র বহনের কাজে ব্যবহৃত হয়। কারণ বাহনগুলো ছিল রাষ্ট্রীয় সম্পদ। একবার তিনি সরকারি এক কর্মীকে তার এলাকা থেকে মধু নিয়ে আসতে বলেন। ওই কর্মী ডাকবাহনের পিঠে করে সেই মধু নিয়ে আসে। উমর ইবনে আবদুল আযিয জিজ্ঞেস করেন, কীভাবে নিয়ে এসেছে? দরবারিগণ উত্তর দিলেন, ডাকবাহনের পিঠে করে। এ কথা শুনে তিনি ওই মধু বিক্রি করে তার মূল্য মুসলিমদের সাধারণ অর্থ তহবিলে জমা করার নির্দেশ দেন। আর ওই কর্মীকে বলেন, এই বাহনে করে এনে তুমি তোমার মধু নষ্ট করে ফেলেছ! (২৪৪)

ইতিহাসে দেখা যায় আব্বাসি খলিফাগণও ডাকব্যবব্যবস্থার উন্নয়নকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে তা প্রধান নিয়ামক হিসেবে গ্রহণ করেন। আবু জাফর মনসুর বলতেন, আমার ঘরে সবসময় চার প্রকার ব্যক্তির উপস্থিতি জরুরি। সবসময় তাদের দরকার হয় আমার। জিজ্ঞেস করা হলো, তারা কারা হে আমিরুল মুমিনিন? বললেন, তারা হলেন রাষ্ট্রের ভিত্তি। তাদের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্র অচল। ঠিক যেমন চৌকাঠের খুঁটি থাকে চারটি। একটি যদি অসম্পূর্ণ থাকে, তাহলে তা দুর্বল ও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যায়। এক. বিচারক, যিনি আল্লাহপ্রদত্ত বিচারব্যবব্যবস্থা কার্যকরে কারও হুমকি-ধমকির তোয়াক্কা করেন না। দুই. নিরাপত্তারক্ষী বা পুলিশ, যারা দুর্বল-সবল সবার প্রতি ন্যায্য আচরণ করেন। তিন. কর উসুলকারী, যিনি জনগণের ওপর জুলুম না করে সবার অবস্থা খতিয়ে দেখে কর আদায় করেন। এ ব্যাপারে কেউ জুলুম করলে আমি তা বরদাশত করব না। এরপর তিনি তিনবার দাঁতে শাহাদাত আঙুল চাপলেন। প্রতিবার তিনি আহ আহ বলে আওয়াজ করলেন। জিজ্ঞেস করা হলো, চতুর্থ ব্যক্তিটি কে হে আমিরুল মুমিনিন? তিনি বললেন, পত্রবাহক বা সংবাদবাহক, যিনি সঠিকভাবে সকলের সংবাদ লেখেন। (২৪৫)

ভন ক্রেমার বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গনের মূলে ছিলেন একজন ডাকবিভাগের কর্মী। গুরুত্বপূর্ণ সব সংবাদ সম্পর্কে খলিফাকে অবহিত করাই ছিল তার দায়িত্ব। বরং প্রাদেশিক গভর্নরদের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি করার দায়িত্বও ছিল তার ওপর। এক কথায় কেন্দ্রীয় সরকারের আস্থাভাজন ব্যক্তি ছিলেন তারা। খলিফাগণ ডাকবিভাগের কার্যক্রমকে রাষ্ট্র পরিচালনার কাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করতেন। তাদের সাহায্যেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে কি না তা শাসকগণ জানতে পারতেন। (২৪৬)

খলিফা হারুনুর রশিদ দ্রুত সংবাদ আদান-প্রদান এবং বিভাগীয় গভর্নরদের উদ্দেশে ত্বরিত ফরমান জারি করার লক্ষ্যে পুরো মুসলিম সাম্রাজ্যকে নিখুঁত ডাক-যোগাযোগের আওতাভুক্ত করেন। এজন্য ত্বরিত ব্যবস্থা নেন। অনেকগুলো ডাকপয়েন্ট স্থাপন করেন, প্রতিটি পয়েন্টে স্বতন্ত্র কর্মী ও অশ্ব বরাদ্দের ব্যবস্থা করে তাদের জন্য খাদ্য, পানীয় ও প্রয়োজনীয় সকল সরঞ্জামের উপস্থিতি নিশ্চিত করেন। (২৪৭)

১৬৬ হিজরি/৭৮২ খ্রিষ্টাব্দের ঘটনাসমগ্র বর্ণনা করতে গিয়ে ইবনে কাসির রহ. বলেন, মক্কা, মদিনা ও ইয়ামেনের মাঝে উন্নত ডাকব্যবস্থা স্থাপনের নির্দেশ দেন খলিফা মাহদি। এর আগে অন্য কেউ এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন বলে জানা যায় না। (২৪৮)

মামলুক রাজবংশের শাসনামলেও ডাকব্যবব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নতি ঘটে। বিশেষ করে সুলতান বাইবার্সের রাজত্বকালে। এ সময় স্থল ও সামুদ্রিক উভয় পরিমণ্ডলে ডাকপায়রার আনাগোনার জন্য তিনি সুবিস্তৃত নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করেন, যা ৫৭২ হিজরি/১১৭৬ খ্রিষ্টাব্দে সালাহুদ্দিন আইয়ুবির নির্মিত পশ্চিম কায়রোর জাবাল দুর্গকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হতো। সেখান থেকে তৈরি হয় চারটি স্থলকেন্দ্রিক পথ:

১। একটি পথ চলে যায় আফ্রিকা মহাদেশের সুদানে অবস্থিত কুসের দিকে। সেখান থেকে আসওয়ানের দিকে। এরপর সেখান থেকে সুদান ও ইথিউপিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে।
২। আরেকটি পথ চলে যায় কুস হয়ে লোহিত সাগরের তীরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ শহর আয়যাব ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে।
৩। আরেকটি পথ চলে যায় আলেকজান্দ্রিয়ার দিকে।
৪। চতুর্থ পথটি দিময়াত হয়ে গাজা শহর অভিমুখে।

সুলতান বাইবার্সের রাজত্বকালে প্রতি সপ্তাহে দুবার করে মিশরে ডাক আসত। আর ডাকবিষয়ক সকল-কিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন রচনা বিভাগের প্রধান। (২৪৯)

ইসলামি সভ্যতায় ডাক ও ডাক পরিভাষা ইসলামি সভ্যতায় ডাকব্যবব্যবস্থার বিচিত্র কিছু প্রকার ছিল, যা ইসলামি সভ্যতায় ডাকব্যবব্যবস্থার উন্নতি ও সামসময়িক যোগাযোগ ব্যবব্যবস্থার বিবরণ তুলে ধরে। নিচে আমরা কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ডাকব্যবব্যবস্থার কথা তুলে ধরছি:

১। স্থলপথে ব্যবহৃত ডাকব্যবস্থা স্থলপথে ডাকসেবা পরিচালনায় যারা দায়িত্ব পালন করতেন তাদের ফুযুজ বা সুআত নামে ডাকা হতো। বিরতিহীন ভ্রমণ ও নিরলস পরিশ্রমে তারা ছিলেন সুপরিচিত। মুসলিমগণ সে যুগে ডাকসেবা পরিচালনায় ব্যাপকভারে উট, ঘোড়া ব্যবহার করতেন। খচ্চরের প্রচলনও ছিল উল্লেখযোগ্য হারে। স্থলপথে অবস্থিত সকল শহর ও পয়েন্টে ডাকবাহন ও দায়িত্বশীলদের জন্য পৃথক পৃথক বিশ্রামাগার থাকত, সেখানে বাহনের খাবার ও বিশ্রামের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা হতো। প্রয়োজনে বাহন পালটে নতুন করে নেওয়ার মতো অনেক ঘোড়া ও গাধা সবসময় সেখানে প্রস্তুত থাকত। (২৫০) ডাকব্যবব্যবস্থায় 'শাহারা' নামক একপ্রকার দ্রুতগামী ঘোড়া ও 'নাজিব' নামক একপ্রকার দ্রুতগামী উট ব্যবহৃত হতো, যা অন্যসব ঘোড়া ও উট থেকে তুলনামূলক ক্ষিপ্র ও কষ্টসহিষ্ণু প্রকৃতির হতো। (২৫১)

ডাকব্যবব্যবস্থার পথ ও সীমা সুদূরপ্রসারী ও সুবিস্তৃত হওয়ায় নির্জলা মরুভূমির বালুকাময় প্রান্তর দিয়ে গমন করা ছিল খচ্চরের জন্য কঠিন ও দুঃসাধ্য, ফলে যথাসম্ভব মরুপ্রান্তর এড়িয়ে যেসব অঞ্চলে পানি ও বৃক্ষরাজির অস্তিত্ব পাওয়া যায় সেসব নিরাপদ ও শক্ত মাটি বিশিষ্ট প্রান্তরকে ডাকপথ হিসেবে বেছে নেওয়া হতো। (২৫২)

২। জলপথে ব্যবহৃত ডাকব্যবস্থা সমুদ্রপথে ডাক-যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত হতো উন্নত ও অত্যাধুনিক সব নৌযান। হাসান ইবনে আবদুল্লাহ বলেন, সামুদ্রিক অঞ্চলে দ্রুত ও হালকা নৌযান ব্যবহৃত হতো ডাক বাহন হিসেবে। (২৫৩) প্রথম হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ সমুদ্রে আলকাতরার আবরণে তৈরি শক্ত কাঠ ও লোহার পেরেক দ্বারা নির্মিত দ্রুতগামী নৌযান পরিচালনা করেন। (২৫৪)

৩। আকাশপথে ব্যবহৃত ডাকব্যবস্থা আকাশপথে ডাকব্যবস্থা পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত হতো ডাকপায়রা। ক্ষুদেবার্তা আদান-প্রদানের জন্য এটি ছিল একটি কার্যকর ব্যবস্থা। বার্তাটি ডাকপায়রার পিঠে, বা পালকের নিচে, অথবা পায়ে বেঁধে দেওয়া হতো। আর তা নিয়ে সে গন্তব্যের দিকে রওনা হতো। এ ধরনের পায়রাকে ডাকা হতো হাদি (الدي) নামে। (২৫৫)

মুসলিমগণ শুধু স্থল ও জলপথে ডাকসেবা নিশ্চিত করেই ক্ষান্ত হননি, বরং অপেক্ষাকৃত দ্রুত ও উন্নত ডাকব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নানামুখী পদক্ষেপ ও প্রকল্প হাতে নেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি ছিল ডাকপায়রা।

ডাকপথে ব্যবহৃত কবুতরের অনেক কদর ছিল এবং সে সময় তা চড়া দামে বিক্রি হতো। বিশেষত বসরা নগরীতে মানুষ তা কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ত। ডাকপায়রার জন্য সে সময় স্বতন্ত্র মার্কেট ছিল। এমনকি একটি পায়রার দাম সাতশ দিনার পর্যন্ত উঠত সেখানে। সুলতান নুরুদ্দিন যিনকির শাসনামলে এবং উবাইদি-ফাতেমি বংশের রাজত্বকালে এ ধরনের পায়রার ব্যবহার ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায়। সুদূর বসরা থেকে কায়রো পর্যন্ত এবং কায়রো থেকে দামেশক পর্যন্ত পায়রাযোগে পত্র আdan-প্রদানের রীতি চালু ছিল। পায়রার বিরতি গ্রহণ ও অবতরণের জন্য তখন স্বতন্ত্র উঁচু টাওয়ার নির্মিত হয়। টাওয়ার থেকে টাওয়ারে গমন করতে করতে শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট গন্তব্যের টাওয়ারে এসে অবতরণ করত ডাকপায়রা। দামেশকের টাওয়ারগুলোতে মিশরের পায়রা রাখা হতো এবং মিশরের টাওয়ারগুলোতে দামেশকের পায়রা রাখা হতো। সাধারণত একবার পত্র প্রেরণের জন্য দুটি চিঠি ও দুটি পায়রা প্রস্তুত করা হতো। একটি ওড়ানোর প্রায় দু-ঘণ্টা পর দ্বিতীয়টি ওড়ানো হতো। প্রথমটি পথ হারিয়ে ফেললে বা দুর্ঘটনায় মারা গেলে দ্বিতীয় পায়রাটি যেন গন্তব্যে পৌছে। বৃষ্টির সময় বা বৈরী আবহাওয়ার কালে সাধারণত পত্র পাঠানো হতো না। পেটভরতি আহার না করিয়ে কখনো পায়রা ছাড়া হতো না।(২৫৬)

পায়রাযোগে পাঠানো পত্রগুলো হতো অতি সংক্ষিপ্ত ও ইঙ্গিতবহ ভাষায় লেখা। এ ধরনের বার্তা যুদ্ধের সময় বেশি পাঠানো হতো। ছোট ও হালকা কাগজে সংক্ষিপ্ত করে লিখে বৃষ্টিবাদল বা ঝড় থেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য তা পায়রার পায়ে বা পালকের নিচে বেঁধে দেওয়া হতো। আর তাতে লেখা হতো খুবই চিকন ও হালকা অক্ষরে। (২৫৭)

এই ছিল আকাশপথে পরিচালিত মুসলিমদের ব্যবহৃত ডাক ও যোগাযোগব্যবব্যবস্থা, যা স্থলীয় ডাকব্যবব্যবস্থা থেকে কোনো অংশে কম গুরুত্বের ছিল না।

৪। অগ্নিসংযোগ করে সতর্কবার্তা প্রদান
উল্লিখিত ডাকব্যবব্যবস্থা ছাড়াও মুসলিমদের মাঝে প্রচলিত ছিল আগুন জ্বালিয়ে সতর্ক করার মতো ব্যবস্থাও। কালকাশান্দি বলেন, নির্দিষ্ট কিছু পয়েন্ট ও স্থাপনা ছিল, যেখানে রাতেরবেলা অগ্নি প্রজ্বলন করা হতো এবং দিনেরবেলা ধোঁয়া উত্তোলন করা হতো। এর জন্য কোনো এলাকায় পাহাড়ের চূড়ায়, আবার কোনো এলাকায় উঁচু ভবনের ওপর জায়গা নির্ধারণ করা হতো। সরকারি কর্মকর্তা ও নিরাপত্তারক্ষীদের মাঝে এ ধরনের সংকেত আদান-প্রদানের রীতি প্রচলিত ছিল। ইসলামি ভূখণ্ডের সর্বশেষ সীমান্ত এলভিরা ও রাহবা থেকে জাবাল দুর্গ পর্যন্ত এ সংকেতসীমা বিস্তৃত ছিল। ফলে ফুরাত নদীর তীরবর্তী এলাকায় (ইরাকে) কিছু ঘটলে রাতের মধ্যেই সে খবর মিশর পর্যন্ত চলে আসত। রাতে কিছু ঘটলে সকালের মধ্যেই সবাই তা জেনে যেতেন। বিচিত্র সাংকেতিক পদ্ধতি অবলম্বন করে আগুন প্রজ্বলন ও ধোঁয়া উত্তোলন করা হতো, যা দিয়ে শত্রুদের সর্বশেষ অবস্থা, তাদের গতিবিধি ও অপতৎপরতার খবর দেওয়া হতো, কখনো কখনো আক্রমণকারী শত্রুদের সংখ্যাও জানিয়ে দেওয়া হতো নানাভাবে আগুন জ্বালিয়ে। (২৫৮)

এসব বাতিঘরগুলো সমুদ্র উপকূলে নির্মিত হতো আর এতে দায়িত্বরত রক্ষীগণ সমুদ্রপথে শত্রুদের আগমন সম্পর্কে রাজধানীকে সতর্ক করার জন্য দিনরাত উপকূলীয় এলাকাগুলো পাহারা দিতেন। নিজেদের মধ্যে পরিচিত ভাষায় নানাভাবে আগুন জ্বালিয়ে সংকেত দিতেন। যখনই কোনো শত্রুপক্ষের আগমন টের পেতেন, রাতেরবেলা হলে সঙ্গে সঙ্গে আগুন জ্বালিয়ে পার্শ্ববর্তী বাতিঘরে দায়িত্বরত রক্ষীদের সংকেত দিতেন। আর দিনেরবেলা হলে ধোঁয়া উৎক্ষেপণ করে সাবধান করতেন। এজন্যই বলা হতো, আলোকবার্তা সুদূর মরক্কোর টাঙ্গিয়ার থেকে আলেকজান্দ্রিয়া পর্যন্ত মাত্র এক রাতের ব্যবধানে পৌঁছে যেত। প্রতিরক্ষা দুর্গগুলোর মাঝে দ্রুততম উপায়ে সংবাদ আদান-প্রদানের লক্ষ্যে উপকূলীয় চৌকিগুলোর মসজিদের মিনার থেকে আলোক-সংকেত পাঠানো হতো। এই পদ্ধতি বিশেষভাবে চালু ছিল আফ্রিকার তিউনিসিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলে। তন্মধ্যে প্রসিদ্ধ হলো সউসে শহরের মুনাস্তির (২৫৯) চৌকি। (২৬০)

কালকাশান্দি বাতিঘর সম্পর্কিত তার আলোচনার শেষে উল্লেখ করেন, সুবিশাল ইসলামি ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষাব্যব্যবস্থার দায়িত্বশীলগণ যে প্রজ্ঞা ও কৌশল উদ্ভাবন করেছেন, তা পরিমাপ করার মতো নয়। সংবাদ সরবরাহের ক্ষেত্রে তারা উন্নত ও আধুনিক সব ব্যবস্থা আবিষ্কার করেছেন। কারণ শুরুতে বাহনে করে পত্র আdan-প্রদান ছিল সবচেয়ে দ্রুত ব্যবস্থা। এর চেয়েও দ্রুত ডাকসেবা হয় পায়রা। এর চেয়েও আরও দ্রুত যোগাযোগ সেবা হয়ে ওঠে আলোক-সংকেত ব্যবস্থা। আপনি জেনে অবাক হবেন, ইরাক থেকে মিশর পর্যন্ত যেকোনো সংবাদ এক রাতের ব্যবধানে পৌঁছে যেত। কত দ্রুত ও উন্নত ডাকব্যবব্যবস্থা হলে এরকমটি সম্ভব! (২৬১)

উপর্যুক্ত বৃত্তান্তের আলোকে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়, ইসলামি সভ্যতা সামসময়িক যুগের সবচেয়ে উন্নত ও আধুনিক উপকরণ ব্যবহার করে ডাক ও যোগাযোগব্যবব্যবস্থার অগ্রগতি সাধন করেছে। এভাবে রাষ্ট্র সবসময় একজন নেতা বা খলিফার অধীনে পরিচালিত ছিল। তিনিই সবকিছু সম্পর্কে একের পর এক অবগত হতেন। আর এসব ব্যবস্থা ইউরোপীয় জাতি-গোষ্ঠীগুলো বহু যুগ ও বহু শতাব্দী পার হওয়ার পর আবিষ্কার করতে পেরেছে।

টিকাঃ
২২৯. ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব, মাদ্দাহ, برد, খ. ৩, পৃ. ৮৪।
২৩০. তাবারানি, আল-মুজামুল আওসাত, খ. ৭, পৃ. ৩৬৭। ইবনে হাজার আসকালানি, আল-মাতালিবুল আলিয়া, খ. ১১, পৃ. ৬৮৫ (২৬৮৫)।
২৩১. আবু দাউদ, হাদিস নং ২৭৫৮। ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ৪৮৭৭।
২৩২. যামাখশ্মরি, আল-ফায়িক ফি গারিবিল হাদিসি ওয়াল-আসার, খ. ১, পৃ. ৪০৫; ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব, মাদ্দাহ, برد, খ. ৩, পৃ. ৮৪।
২৩৩. তানুখি, আল-ফারাজু বা'দাশ শিদ্দাতি, খ. ১, পৃ. ৫০।
২৩৪. তারতুশি, সিরাজুল মুলুক, পৃ. ৪৯।
২৩৫. ইবনুত তিকতাকি, আল-ফাখরিয়্যু ফিল-আদাবিস সুলতানিয়্যা, পৃ. ১০৬।
২৩৬. আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামি, পৃ. ১৩৯।
২৩৭. ইবনুত তিকতাকি, আল-ফাখরিয়্যু ফিল-আদাবিস সুলতানিয়্যা, পৃ. ১০৬।
২৩৮. কালকাশান্দি, সুবহুল আশা, খ. ১৪, পৃ. ৪১২।
২৩৯. ইবরাহিম আলি আল-কাল্লা, নুযুমুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১০৪।
২৪০. আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত, একবার মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনারব জনগোষ্ঠী বরাবর পত্র লেখার ইচ্ছা করলে তাকে অবগত করা হলো যে, অনারবগণ সিল ছাড়া কোনো পত্র গ্রহণ করেন না। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি (সিল হিসেবে ব্যবহারের জন্য) রুপার একটি আংটি তৈরি করেন যাতে লেখা ছিল عمد رسول الله। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে বা আঙুলে সেই আংটি শোভা পেত। দেখুন, বুখারি, হাদিস নং ৬৫; মুসলিম, হাদিস নং ২০৯২।
২৪১. কালকাশান্দি, সুবহুল আশা ফি সিনাআতিল ইনশা, খ. ১৪, পৃ. ৪১৩; কামাল আনানি ইসমাইল, দিরাসাত ফি তারিখিন নুযুমিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১০৪-১০৫।
২৪২. কালকাশান্দি, সুবহুল আ'শা, খ. ১৪, পৃ. ৪১৩।
২৪৩. কালকাশান্দি, সুবহুল আশা, খ. ১৪, পৃ. ৪১৩।
২৪৪. ইবনুল জাওযি, সিরাতু ওয়া মানাকিবু উমর, পৃ. ২১০; আবু ইউসুফ ইয়াকুব ইবনে সুফিয়ান ফাসাবি, আল-মারিফাতু ওয়াত-তারিখু, খ. ১, পৃ. ৩৩৭।
২৪৫. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ৬, পৃ. ৩১৩।
২৪৬. আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামি, পৃ. ১৪১।
২৪৭. ইবরাহিম আলি আল-কাল্লা, নুযুমুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১০৫-১০৬।
২৪৮. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ১০, পৃ. ১৫৮।
২৪৯. আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামي, পৃ. ১৪৫।
২৫০. কালকাশান্দি, সুবহুল আ'শা, খ. ১৪, পৃ. ৩৭৭; জাওয়াদ আলি, আল-মুফাসসাল ফি তারিখিল আরবি কাবলাল ইসলাম, খ. ৯, পৃ. ৩২০।
২৫১. কামাল আনানি ইসমাইল, দিরাসাত ফি তারিখিন নুযুমিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১০৬।
২৫২. জাওয়াদ আলি, আল-মুফাসসাল ফি তারিখিল আরাবি কাবলাল ইসলাম, খ. ৯, পৃ. ৩২০-৩২১।
২৫৩. হাসান ইবনে আবদুল্লাহ, আসারুল উওয়াল ফি তারতিবিদ দুওয়াল, পৃ. ৮৯; মুহাম্মাদ যয়ফুল্লাহ, আল-হাদারাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৯৮ থেকে উদ্ধৃত।
২৫৪. জাহিয, আল-বায়ান ওয়াত-তিবয়ান, পৃ. ৩৬৪।
২৫৫. মুহাম্মাদ যয়ফুল্লাহ, আল-হাদারাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৯৮।
২৫৬. মুহাম্মাদ যয়ফুল্লাহ, আল-হাদারাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৯৮-১৯৯; আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামি, পৃ. ১৪৬।
২৫৭. কামাল আনানি ইসমাইল, দিরাসাত ফি তারিখিন নুযুমিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১০৭-১০৮।
২৫৮. কালকাশান্দি, সুবহুল আ'শা, খ. ১৪, পৃ. ৪৪৫।
২৫৯. মুনাস্তির শহরটি সউসে শহর থেকে ৩০ কি.মি দক্ষিণে অবস্থিত।
২৬০. দেখুন, সাদ যাগলুল গং, দিরাসাত ফি তারিখিল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৪৮০-৪৮১; কামাল আনানি ইসমাইল, দিরাসাত ফি তারিখিন নুযুমিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১০৮।
২৬১. কালকাশান্দি, সুবহুল আশা, খ. ১৪, পৃ. ৪৪৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00