📄 ইসলামি সভ্যতায় মন্ত্রনালয়ের মহত্ব
অনেক মুসলিম মনীষী ও ইতিহাসবিদ মন্ত্রণালয়ের গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিয়ে কথা বলেছেন। মাওয়ারদি বলেন, জনগণের সকল ইস্যু নিয়ে কাজ করা এবং সকল-কিছু সমাধা করা, এ জাতীয় কাজগুলো একা শাসকের পক্ষে সম্পাদন করা সম্ভব নয়। সেজন্য তার দরকার হয় সহযোগী ও সুপরামর্শদাতার। একা সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেয়ে বরং বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ লোকদের মতামতের ভিত্তিতে কোনো কাজ সমাধা করলে তা সঠিক ও যথাযথ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বেশি। পদস্খলন বা ত্রুটিবিচ্যুতির আশঙ্কা অনেকাংশেই কমে যায়। অন্যের সহযোগিতা নিয়ে কাজ করলে কাজে সফলতার নিশ্চয়তাও বেড়ে যায়। (১৪১) গুরুত্বপূর্ণ এ মন্ত্রণালয়ের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে ইবনে খালদুন রহ. বলেন, মন্ত্রণালয় হলো রাজসভার প্রধান পরিকল্পনা প্রণয়নকারী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগকারী পরিষদ। কারণ মন্ত্রণালয়ের আরবি (وزرة) (বিযারা) শব্দের মূল অর্থেই লুকিয়ে আছে সহযোগিতার মর্মকথা। (১৪২)
ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর রা.-এর শাসনামলে উমর ইবনুল খাত্তাব রা. ছিলেন রাজ্যের প্রধান উপদেষ্টার ভূমিকায়। সকল কাজে তিনি খলিফা আবু বকর রা.-কে সহযোগিতা করতেন। সুপরামর্শ দিতেন। ওহির সম্মানিত লেখক সাহাবিদের কাছে বিক্ষিপ্তভাবে থাকা কুরআনের সুরা ও আয়াতগুলো একত্র করার মতো গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শটিও উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর দেওয়া। কারণ ঐতিহাসিক ইয়ামামার যুদ্ধে অধিকাংশ হাফেয ও কারি (১৪৩) শহিদ হয়ে যাওয়ায় খলিফা আবু বকর রা.-এর কাছে তিনি কুরআন বিলুপ্তির আশঙ্কা ব্যক্ত করেন। পবিত্র কুরআন একত্র করার কাজে প্রধান ভূমিকা পালনকারী যায়দ ইবনে সাবিত রা.-এর বিবৃতিতে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে: ইয়ামামার যুদ্ধের পর আমিরুল মুমিনিন আবু বকর রা. আমাকে ডেকে পাঠান। গিয়ে দেখি উমর ইবনুল খাত্তাব রা. তার কাছে উপস্থিত। আবু বকর রা. আমাকে বললেন, উমর আমার কাছে এসে বললেন, ইয়ামামার যুদ্ধে অনেক কুরআনের কারি ও হাফেয শহিদ হয়েছেন। আমার আশঙ্কা, এভাবে বিভিন্ন যুদ্ধে কুরআনের কারিগণ শহিদ হয়ে গেলে কুরআনের অনেক অংশ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। আমার পরামর্শ, আপনি কুরআন একত্র করার উদ্যোগ গ্রহণ করুন। এ কথা শুনে আমি উমর রা.-কে বললাম, যে কাজ আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করে যাননি তা আপনি কীভাবে করবেন? তা শুনে উমর রা. বললেন, আল্লাহর শপথ, এ উদ্যোগের ফলে অনেক কল্যাণ সাধন হবে। এরপর উমর বারবার আমার কাছে বিষয়টি উত্থাপন করতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত মহান আল্লাহ এ কাজের জন্য আমার অন্তর খুলে দিলেন। আমিও উমরের মতো বিষয়টি ভাবতে লাগলাম। যায়দ রা. বলেন, এরপর আবু বকর রা. আমাকে বললেন, আপনি একজন বিবেকবান যুবক পুরুষ, আপনার প্রতি আমরা পূর্ণ আস্থাশীল। এমনকি আপনি ছিলেন আল্লাহর রাসুলের ওপর অবতীর্ণ ওহির অন্যতম লেখক। তাই আমার সিদ্ধান্ত, আপনি কুরআনের অংশগুলো খুঁজে খুঁজে সংগ্রহ করে সবগুলো একত্র করুন। (১৪৪)
এ থেকেই বোঝা যায়, মন্ত্রিত্বের বিষয়টি আব্বাসীয় শাসনামলের আবিষ্কার বা ইসলামধর্মে পারসিক সভ্যতার অনুপ্রবেশ নয়, বরং বিশ্বনবীর জীবনী ও তার বক্তব্যসমগ্র থেকে এবং খুলাফায়ে রাশেদিনের শাসনামলের দিকে তাকালেই আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারি, মন্ত্রিত্বের বিষয়টি ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই প্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত একটি বিষয়।
তবে যাই হোক, উমাইয়া শাসনামলে মন্ত্রণালয় বা মন্ত্রিত্বের পদগুলোতে অনেক উন্নতি ও অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। রাজ্য সম্প্রসারণ, মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধি ও নতুন নতুন ঐতিহ্য ও সভ্যতা নিয়ন্ত্রণে আবশ্যকভাবে বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সুপরামর্শ দরকার হতো খলিফাদের। এরই ধারাবাহিকতায় আমরা লক্ষ করি, বিখ্যাত খলিফা মুআবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান রা. উযির (মন্ত্রী) হিসেবে নিয়োগ করেন আরেক বিখ্যাত সাহাবি আমর ইবনুল আস রা.-কে। যদিও তখন মন্ত্রিত্ব শব্দটি ব্যবহৃত হতো না। একবার আমর ইবনুল আস রা. মুআবিয়া রা.-এর উদ্দেশে বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন, আমি কি আপনাকে সুপরামর্শ ও উপদেশ দিয়ে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করি না? উত্তরে মুআবিয়া রা. বলেন, এর ফলেই তো আজ আমি যা অর্জন করার, তা অর্জন করতে পেরেছি। (১৪৫)
উযির শব্দের সরাসরি প্রচলন উমাইয়া শাসনামলে যে প্রচলিত ছিল এ বিষয়টি পরিষ্কার করতে গিয়ে বিখ্যাত ইতিহাসবিদ তাবারি একটি ঘটনা বর্ণনা করেন, হিশাম ইবনে আবদুল মালিকের (মৃ. ১২৫ হি.) শাসনামলে একবার মিশরের অধিবাসীগণ তাদের দেশে নিযুক্ত গভর্নরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে রাজদরবারে উপস্থিত হলো। অনেক চেষ্টা করেও তারা খলিফার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারল না। দীর্ঘদিন সেখানে অবস্থান করে যখন তাদের আসবাব ও রসদ শেষ হয়ে এলো, তখন কয়েকটি ছোট্ট কাগজে তাদের নামগুলো লিখে উযিরদের (মন্ত্রীদের) কাছে দিয়ে বলল, এগুলো আমাদের নাম ও বংশপরিচয়। নামগুলো পড়ে আমিরুল মুমিনিন যদি আমাদের খোঁজ করেন তাহলে আমাদের খবর দেবেন। (১৪৬) উপরের ঘটনাতে বিবৃত উযিরগণ (মন্ত্রিগণ) খলিফা হিশাম ইবনে আবদুল মালিকের নিকটস্থ ব্যক্তিবর্গ এবং রাজ্যের কার্যনির্বাহী শ্রেণি ছিল এটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
বরং তাবারির বর্ণিত ৮৫ হিজরি সনের ঘটনাসমগ্রে আমরা পরিষ্কার জানতে পারি যে, সে সময় কাবিসা ইবনে যুআইবের ভূমিকা ছিল আমাদের বর্তমান সময়ের সরকারি মন্ত্রীদের মতো। যার ফলে খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান বলতেন, দিন হোক, রাত হোক কাবিসা যেন কখনো আমার চোখের আড়াল না হয়। আমি নির্জনে থাকি, কারও সাথে নীরবে সংলাপ করি, বা স্ত্রীদের সঙ্গে থাকি, সবসময় যেন তাকে আমার কাছে আসার সুযোগ দেওয়া হয়। কাবিসা কোথায় আছে সে খবর যেন সবসময় আমার কাছে সরবরাহ করা হয়। রাষ্ট্রীয় সিলমোহর ও মুদ্রা তৈরির নকশা তার কাছেই থাকত। খলিফার পক্ষ থেকে সবসময় তার কাছে সংবাদ আসত। খলিফার আগে তিনিই চিঠিপত্র পড়ে নিতেন। খলিফা আবুদল মালিকের কাছে তিনিই পত্র খুলে নিয়ে আসতেন। (১৪৭)
উপর্যুক্ত বিবরণ থেকে পরিষ্কার, উমাইয়া শাসনামলে মন্ত্রিত্বের প্রচলন ছিল। সে যুগে মন্ত্রিপরিষদের দায়িত্ব ছিল কেবল খলিফাকে পরামর্শ দেওয়া। তখন মন্ত্রিগণ রাষ্ট্রীয়ভাবে সরাসরি ক্ষমতা বাস্তবায়নের অধিকার রাখতেন না। তবে কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও ছিল, যেমনটি উমাইয়া শাসনামলের সর্বশেষ খলিফা মারওয়ান ইবনে মুহাম্মাদের উযির (মন্ত্রী) বিখ্যাত লেখক আবদুল হামিদের বেলায় আমরা দেখতে পাই।
তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, আব্বাসি শাসনামলে মন্ত্রণালয় ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি হয়। আব্বাসি খিলাফতে উযির নিয়োগের ব্যাপারটি ছিল খুব জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আবু সালাম আল-খাল্লাল নামে খ্যাত হাফস ইবনে সুলাইমানকে (মৃ. ১৩২ হি./৭৫০ খ্রি.) ইসলামের ইতিহাসে প্রথম উযির (মন্ত্রী) উপাধি পাওয়া ব্যক্তি ধরা হয়। 'মুহাম্মাদ বংশের উযির (মন্ত্রী)' বলে তিনি পরিচিত ছিলেন। আব্বাসি খিলাফত প্রতিষ্ঠার প্রচারে তিনি বিপুল অর্থ খরচ করেন। (১৪৮)
আবু জাফর আল-মনসুর ছিলেন আব্বাসীয় শাসনামলের দ্বিতীয় খলিফা। তিনি আবু আইয়ুব আল-মুরিয়ানি নামে খ্যাত সুলাইমান ইবনে মুখাল্লাদকে সরকারি দফতর সংরক্ষণের পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রদান করেন। ইবনে কাসির রহ. তার ব্যাপারে লেখেন, তিনি ছিলেন রচনা ও প্রকাশনা বিভাগের প্রধান। (১৪৯)
আব্বাসীয় শাসনামলে উযিরের (মন্ত্রীর) ক্ষমতা ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে। এমনকি রাজ্যের ও জনগণের সকল বিষয় তদারকির একমাত্র দায়িত্ব বর্তায় মন্ত্রণালয়ের অধীনে। বারমাকি পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রে এমনটিই আমরা লক্ষ করি। যেমন ইয়াহইয়া ইবনে খালেদ আল-বারমাকিকে রাজ্যের যেকোনো বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অবাধ ক্ষমতা প্রদান করা হয়। ফলে রাজ্যের সকল-কিছুতে আদেশ-নিষেধের কর্তৃত্ব তার হাতে চলে যায়। ইবনে কাসির রহ. উল্লেখ করেন, হারুনুর রশিদ খলিফা হওয়ার পর ইয়াহইয়া ইবনে খালেদের অধিকারকে তিনি নির্দ্বিধায় মেনে নেন। তাকে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সব পদের দায়িত্ব প্রদান করেন। বারমাকিগণ যতদিন রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন, ততদিন তাদের এই ক্ষমতা ও অধিকার বলবৎ ছিল।(১৫০)
আব্বাসীয় খলিফাগণ সবসময় শ্রেষ্ঠ ও যোগ্যতাসম্পন্ন উযিরদের সন্ধানে থাকতেন। এমনকি বিখ্যাত আব্বাসি শাসক মামুনুর রশিদ উযির পদে নিয়োগের জন্য কিছু শর্ত ও মানদণ্ড আরোপ করেন বলে ইতিহাসে পাওয়া যায়। তিনি বলেন, আমি আমার রাজ্যের যাবতীয় বিষয় দেখেশোনার জন্য এমন একজন লোকের সন্ধান করছি যিনি হবেন সকল উৎকৃষ্ট গুণের অধিকারী। যিনি হবেন একাধারে সচ্চরিত্র। নিজের দায়িত্ব পালনে অটল ও নিষ্ঠাবান। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সকল বৈশিষ্ট্য ও অভিজ্ঞতায় যিনি সমৃদ্ধ। তার কাছে গোপনীয় কিছু বলা হলে তিনি তার গোপনীয়তা রক্ষা করবেন। গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হলে আন্তরিকভাবে তা পালন করবেন। তিনি নীরব থাকবেন বিচক্ষণতার সাথে। কথা বলবেন প্রজ্ঞার সাথে। সুযোগকে কাজে লাগাবেন। শত্রুদের রক্তচক্ষুর প্রতি তিনি ভ্রুক্ষেপ করবেন না। তার মাঝে থাকবে আমিরদের ভূষণ। বিদ্বান ব্যক্তিদের শিষ্টাচার। বিদগ্ধ লোকদের বিনম্র স্বভাব। তার থাকবে বিশেষজ্ঞদের মতো বিবেক। তার প্রতি সদাচরণ করা হলে তিনি কৃতজ্ঞ হবেন। দুর্ব্যবহারের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হলে তিনি ধৈর্যের পথ বেছে নেবেন। আজকের সামান্য কিছুর বিনিময়ে আগামীর অপার সম্ভাবনাকে তিনি বেচে দেবেন না। ভাষার মাধুর্য ও কথার জাদু দিয়ে তিনি মানুষের অন্তর জয় করে নেবেন।(১৫১)
উপর্যুক্ত গুণাবলির বিচারে ফযল ইবনে সাহলকে (মৃ. ২০২ হি.) খলিফা মামুন উযির (মন্ত্রী) হিসেবে নিয়োগ দেন। ইসলামের ইতিহাসে ফযল ছিলেন বিখ্যাত ও মহান উযিরদের একজন। তার মর্যাদা ও বিচারবুদ্ধি দেখে রাষ্ট্রীয় সকল বিষয়ের ভার তার ওপর ন্যস্ত করে তার নাম দেন ذو الرياستين বা দুই ক্ষমতার অধিকারী।(১৫২) কারণ লেখালেখি ও রচনা বিভাগের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ও যুদ্ধবিষয়ক অধিদপ্তরের দায়িত্বও তাঁর কাঁধে। রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা উভয় বিষয়ের সকল ইস্যু দেখাশোনা ও পরিচালনা করতেন তিনি। এমন যুগপৎ গুণাবলি তাঁর আগে কোনো মন্ত্রীর ছিল না। ঠিক তেমনই মঙ্গোলদের এই মহান দায়িত্ব লিখিতভাবে বিশেষ সম্মানের সঙ্গে তাঁকে প্রদান করা হয়। এটি ছিল রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রদত্ত এক বিরল সম্মাননা। এটি সুস্পষ্ট হয় পদের বিবরণ থেকে। খলিফা মামুর রশিদের পক্ষ থেকে প্রেরিত সেই লিখিত পত্রে বিবরণ ছিল : আমি আপনাকে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিচ্ছি, যে পদের অধিকারী ব্যক্তি কাউকে কোনো আদেশ করলে অবশ্যই তাকে তা পালন করতে হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে এ পদের চেয়ে বড় আর কোনো পদ নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করবেন, সুষ্ঠুভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন, ততদিন আপনার এই অধিকার বলবৎ থাকবে। আল্লাহকে সাক্ষী রেখে আপনাকে এসব ক্ষমতা প্রদান করছি। এই অধিকার রক্ষার জন্য মহান আল্লাহকেই একমাত্র তত্ত্বাবধায়ক মেনে নিচ্ছি। ১৯৮ হিজরি সনের সফর মাসে এই অধিকার প্রদানপত্র লেখা সম্পন্ন হলো। (১৫৩)
হিজরি চতুর্থ শতকের প্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত উজির (মন্ত্রী) হলেন ইবনুল আমিদ আলি ইবনে মুহাম্মাদ ইবনুল হুসাইন (মৃ. ৩৬০ হি.)। বুওয়াইহি রাজবংশের (১৫৪) উজির হওয়া সত্ত্বেও আমরা দেখতে পাই, খিলাফতের রাজসভায় তাঁর বন্দনা হতো। তাঁকে বিরাট মর্যাদা দেওয়া হতো। এরই পরিপ্রেক্ষিতে খলিফা তায়ি লিল্লাাহ তাঁকে যুল-কিফায়াতাইন নামকরণ করেন। অর্থাৎ তিনি রচনা ও লেখালিখির পাশাপাশি যুদ্ধবিষয়ক কার্যক্রমও সমানভাবে পরিচালনা করতেন। (১৫৫)
উযির (মন্ত্রী) ইবনুল আমিদের প্রতি বিখ্যাত আব্বাসি খলিফা তায়ি লিল্লাহর এই অগাধ শ্রদ্ধা ও মর্যাদাদানের বিষয়টি কাকতালীয় কিছু ছিল না। কারণ ইবনুল আমিদ সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করতেন। রণাঙ্গনে সশরীরে অংশগ্রহণ করতেন। তিনি ছিলেন বীরত্বের প্রতীক। স্বল্পভাষী। কেউ জিজ্ঞেস না করলে অথবা কথা বললে উপকার হবে না এরকম জায়গায় কথা বলা থেকে বিরত থাকতেন। সচ্চরিত্র ও পবিত্র আচরণে তিনি ছিলেন বিখ্যাত। সুসাহিত্যিক বা বিশেষজ্ঞ কোনো আলেম তার কাছে এলে মন দিয়ে তিনি তাদের কথা শুনতেন। তারপরও রাষ্ট্রীয় বিদ্রোহ ও গোলযোগের কারণে বাগদাদে যে শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হয়েছিল, স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়েছিল, তা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন। এ কারণেই তার সংক্ষিপ্ত মন্ত্রিত্বের আমলে তিনি বিরাট মর্যাদার অধিকারী হয়ে যান। চারিদিকে তার প্রশংসা ও স্তুতি ছড়িয়ে পড়ে। তার হস্তক্ষেপে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ফিরে আসে। বিজ্ঞ ও বিদগ্ধ ব্যক্তিবর্গ যথাযথ মর্যাদা লাভ করেন। তার এই অভাবনীয় উন্নতি দেখে বুওয়াইহি রাজবংশের লোকেরা রাজত্ব ও ক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে তাকে হত্যা করে ফেলে। (১৫৬)
মন্ত্রণালয়ের বিষয়টি ছিল খুবই সূক্ষ্ম, তাৎপর্যপূর্ণ ও দীর্ঘ পরিশ্রমের বিষয়। ইতিহাসবিদ শাবুশতি(১৫৭) উল্লেখ করেছেন, বিখ্যাত উযির সাইদ ইবনে মুখাল্লাদ (মৃ. ২৭৫ হি.) রাত জেগে নামাযে মশগুল থাকতেন। সূর্যোদয় হওয়া পর্যন্ত নামায আদায়ে মগ্ন থাকতেন। এরপর অপেক্ষমাণ মানুষদের সাক্ষাতের অনুমতি দিতেন। নানা প্রয়োজনে আসা জনসাধারণ সালাম দিয়ে তার কক্ষে ঢুকত। এরপর খিলাফতের রাজসিংহাসনে উপবেশন করে প্রায় চার ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করে মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজন ও অভিযোগ শুনে সেগুলোর ফয়সালা করতেন। সেখান থেকে ঘরে ফিরে যোহর পর্যন্ত আবারও মানুষের দাবিদাওয়া ও আবেদনগুলো দেখতেন। উপস্থিত-অনুপস্থিত সকলের খোঁজখবর নিতেন। যোহরের নামায আদায় করে তিনি দুপুরের খাবার সারতেন। এরপর ঘুমিয়ে পড়তেন। সন্ধ্যায় রাজদরবারের বৈঠকে বসে মধ্যরাত পর্যন্ত অর্থ ও হিসাবসংক্রান্ত কাজগুলো শেষ করতেন। তার নিত্যদিনের কাজ এই রুটিন অনুযায়ী চলত। দৈনন্দিন কোনো রাষ্ট্রীয় কাজই তার অজানা থাকত না। এরপর আর্থিক ঘাটতি ও ক্ষতির বিষয়গুলো সামনে নিয়ে তার কারণ ও প্রতিকার নির্ণয়ে মনোনিবেশ করতেন এবং প্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে তার কার্যনির্বাহী পরিষদের কাছে যেতেন। এরপর সঙ্গীদের সঙ্গে আলাপচারিতার মাধ্যমে মনোরঞ্জন শেষ করে ঘুমিয়ে যেতেন। (১৫৮)
ইসলামি সভ্যতায় এমন অনেক উযির-মন্ত্রীই ছিলেন, যারা রাজনৈতিক বিভাগ ও দপ্তরগুলো পরিচালনার সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় শিষ্টাচার প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক ছিলেন। ইসলামি সভ্যতা বিনির্মাণে তাদের ছিল বিরাট অবদান। এমনই একজন হলেন সেলজুক সাম্রাজ্যের বিখ্যাত উযির (মন্ত্রী) নিজামুল মুলক হাসান ইবনে আলি ইবনে ইসহাক। ইমাম যাহাবি রহ. বলেন, তিনিই বড় বড় মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন বাগদাদে, নিশাপুরে, ইরানের বিখ্যাত শহর-তুসে। ইলম ও জ্ঞানের প্রচার প্রসারে তিনি ছিলেন যথেষ্ট আন্তরিক। ছাত্র ও শিষ্যদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন। হাদিস রচনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ফলে তার সুনাম-সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে পুরো মুসলিম-বিশ্বজুড়ে। (১৫৯)
বড় মাদরাসা বলতে ইমাম যাহাবি রহ. এখানে বাগদাদের মাদরাসায়ে নেজামিয়া উদ্দেশ্য করেছেন। শুনে অবাক হবেন, তিনি বাগদাদের মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করার সাথে সাথে মাদরাসায়ে নেজামিয়াতে যেতেন হাদিসের দরস দিতে। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনুল আসিরের বর্ণনায়, মাদরাসায়ে নেজামিয়ায় প্রবেশ করে লাইব্রেরিতে বই নিয়ে অধ্যয়নে বসেন নিজামুল মুলক। সেখানে অসংখ্য গ্রন্থ পাঠ করেন। মানুষ তার কাছ থেকে হাদিসের কিছু অংশ গ্রহণ করে এবং আরও কিছু অংশের শ্রুতলিপি লেখান। (১৬০)
সাহাবি যুগের পর ইসলামি সভ্যতায় নিজামুল মুলক সর্বশ্রেষ্ঠ না হলেও ছিলেন বিখ্যাত উযিরদের (মন্ত্রীদের) একজন। আলেম তথা জ্ঞানী ও বিদ্বান ব্যক্তিদের তিনি ভালোবাসতেন। তাদের যথাযথ মর্যাদা দিতেন। ইমাম আবুল কাসেম আল-কুশাইরি এবং ইমাম আবুল মাআলি আল-জুওয়াইনি যখন নিজামুল মুলকের দরবারে যেতেন, তখন তাদের সম্মানে তিনি দাঁড়িয়ে যেতেন। নিজ সিংহাসনে তাদের বসাতেন। আরেক বিখ্যাত আলেম আবু আলি আল-ফারমাযি তার দরবারে এলেও একই রকম করতেন। রাজ আসনে তাকে স্থান দিয়ে তিনি তার সামনে নিচে বসে যেতেন। তার সামনে এরকম কেন করেন এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এ দুজনের (জুওয়াইনি ও কুশাইরি) মতো অনেক আলেম রয়েছেন, যারা আমার দরবারে এসে আমাকে প্রশংসার সাগরে ভাসিয়ে দেন। অতিমাত্রায় স্তুতি ও গুণগান করেন। তাদের কথা শুনে আমি অবাক হয়ে যাই। হতাশা আমাকে গ্রাস করে ফেলে। কিন্তু এই শাইখ (ফারমাযি) এসে চোখে আঙুল দিয়ে আমার দোষত্রুটি ধরিয়ে দেন। কারও প্রতি কোনো অবিচার করলে আমাকে সাবধান করে দেন। তা শুনে আমার অন্তর নরম হয়। অহমিকা দূর হয়। সেই ত্রুটিগুলো সংশোধন করে নিই। (১৬১)
ইলম ও জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রতি নিদারুণ অনুরাগ থেকেই নিজামুল মুলক রচনা করেন যথাক্রমে সিয়াসতনামা অথবা সিয়ারুল মুলুক নামক বিখ্যাত গ্রন্থ। এটি তিনি (৪৮৯ হি.) সেলজুক সুলতান মালিকশাহ ইবনে মুহাম্মাদের উদ্দেশে রচনা করেন। এর পেছনে তার লক্ষ্য ছিল পূর্ববর্তী সফল রাষ্ট্রনায়কদের বৃত্তান্ত তুলে ধরে দেশ পরিচালনার সঠিক ও যথার্থ পদ্ধতিগুলো তার সামনে উপস্থাপন করা। যেন সেলজুক সাম্রাজ্য সেই রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক নীতি ও পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করে সফলতার শীর্ষচূড়ায় আরোহণ করতে পারে। নিজামুল মুলক তার এই উদ্দেশ্য পাঠকদের কাছে স্পষ্ট করেছেন এভাবে, এ কারণেই আমি আমার সারা জীবনের দেখা ও বিজ্ঞজনদের কাছ থেকে শেখা অভিজ্ঞতাগুলো পঞ্চাশটি পরিচ্ছেদে সবিস্তারে বর্ণনা করার প্রয়াস পেয়েছি। (১৬২) কোনো সন্দেহ নেই গ্রন্থটি সুলতানের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত হয়। পরবর্তীকালে পাঠকদের কাছেও বইটি বিরাট গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। এসবের দ্বারা প্রতীয়মান হয়, ইসলামি সভ্যতায় মন্ত্রণালয় নিছক সাংগঠনিক পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা পূর্ববর্তী কালের মহাপুরুষদের রেখে যাওয়া প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার আলোয় আলোকিত ছিল।
ইসলামি সভ্যতায় মন্ত্রণালয়ের গুরুত্ব ও তাৎপর্য-সংক্রান্ত আলোচনায় আন্দালুসের ইতিহাস আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। মুসলিমবিশ্বের সর্বপশ্চিমে অবস্থিত এই সাম্রাজ্যে মন্ত্রণালয়ের অবকাঠামো ছিল অনেকটা বর্তমান সময়ে প্রচলিত মন্ত্রিপরিষদের মতো। শুরুতে খলিফা নিজেই প্রধান মন্ত্রীর ভূমিকা পালন করতেন। এরপর ধীরে ধীরে তা হালনাগাদ হয়ে শেষ পর্যন্ত ‘হাজিব’ হন প্রধান মন্ত্রী। হাজিব একটি পদ, যার স্থান ছিল খলিফার ঠিক পরই। আন্দালুসের ইসলামি রাষ্ট্রে মন্ত্রণালয় অবকাঠামোর বিবরণ দিতে গিয়ে ইবনে খালদুন বলেন, শুরুতে আন্দালুসের উমাইয়া শাসনামলে উযির নামটি যথাযথ অর্থেই ব্যবহার হতো। পরবর্তীকালে তা বিভিন্ন বিভাগে বিভক্ত করা হয় এবং প্রতিটি বিভাগের জন্য আলাদা উযির (মন্ত্রী) নিযুক্ত করা হয়। অর্থনৈতিক বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য একজন মন্ত্রী। ডাক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা দেখানোর জন্য একজন মন্ত্রী। নির্যাতিত ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের জন্য একজন মন্ত্রী। অপরাধী ও বিদ্রোহীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য একজন মন্ত্রী।
আর প্রত্যেক মন্ত্রণালয়ের জন্য আলাদা কক্ষ বা দপ্তর নির্ধারণ করা হয়, সেখানে মন্ত্রীদের বসার জন্য উন্নত গালিচা ও সোফা বসানো হয়। সকল বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ে নিযুক্ত কর্মীগণ নিজ নিজ কার্যক্রম যথাযথভাবে সম্পাদন করতেন। আর তাদের ও খলিফার মাঝে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের জন্য একজন দায়িত্বশীল রাখা হতো। প্রতিনিয়ত খলিফাকে কাজের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে সে অবহিত করত। এ কারণে এই দায়িত্বশীলের পদমর্যাদা অনেক উন্নত ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর নাম দেওয়া হয় হাজিব। আন্দালুসে মুসলিম শাসনামলের শেষ দিনটি পর্যন্ত সেখানে একই নিয়ম প্রচলিত ছিল। সকল সরকারি পদ ছাপিয়ে এই পদটি সবার কাছে হয়ে ওঠে বেশ মূল্যবান। এমনকি স্পেনে খিলাফত বিলুপ্ত হওয়ার পর আন্দালুসের বিভক্ত ইসলামি ভূখণ্ডগুলো স্বাধীনভাবে পরিচালনাকারী ‘তাইফা’ রাজবংশীয়রা এই উপাধিকে নিজেদের বলে দাবি করতে থাকে। যার ফলে তাদের অধিকাংশের নামের মধ্যে হাজিব শব্দের উপস্থিতি পাওয়া যায়। (১৬৩)
ইবনে খালদুনের বর্ণনা করা উপরের বিশ্লেষণে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় যে, আন্দালুসের ইসলামি সভ্যতাকেই গ্রহণ করেছে বর্তমান যুগের সকল জাতি ও রাষ্ট্র। স্পেনের বুকে মুসলিমদের আবিষ্কার করা মন্ত্রিপরিষদ- ব্যবস্থাকেই আদর্শ হিসেবে মেনে নিয়ে তারা রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে চলেছে। কারণ আন্দালুসে উমাইয়া শাসনামলের সূচনা হয় ১৩৮ হিজরি সনে আবদুর রহমান ইবনে মুআবিয়া ইবনে হিশাম আদ-দাখিলের স্পেনে প্রবেশের মাধ্যমে। অর্থমন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়... মন্ত্রিপরিষদের এ জাতীয় বিভক্তি ও বিন্যাস সেখান থেকেই শুরু। এরপর 'হাজিব' উপাধিতে ভূষিত মন্ত্রিপ্রধানের পদ এবং মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকের জন্য আলাদা দপ্তর, এ জাতীয় সুশৃঙ্খল বিন্যাস মুসলিমদের আগমনের পর থেকে আন্দালুসেই প্রথম শুরু হয়েছে। মুসলিম বিজ্ঞানী ও মনীষীগণই এসবের আবিষ্কারক।
স্পেনের মুসলিম শাসনামলের ইতিহাসে সবচেয়ে খ্যাতিমান উযিরদের তালিকা করা হলে প্রথমেই চলে আসবে মনসুর ইবনে আবু আমির মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহর নাম। তিনি ছিলেন দারুণ প্রতিভাসম্পন্ন। শুরুতে তিনি ছিলেন রাষ্ট্রের সাধারণ কর্মচারী। সেখান থেকে উন্নতি করতে করতে একপর্যায়ে পুলিশপ্রধানের পদ গ্রহণ করেন। এরপর কনিষ্ঠ খলিফা হিশাম ইবনুল হাকামের ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর হাজিব পদে উন্নীত হন। এরপর মন্ত্রিপ্রধানের পদ লাভ করেন।
বাস্তব কথা হলো, মনসুর ইবনে আবু আমির নামক এই প্রধান মন্ত্রী কখনোই নিজ সংকল্প ও অভিপ্রায় কার্যকরের ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতেন না। বরং তিনি ছিলেন আল্লাহর পথে সংগ্রামী এক সাহসী বীরপুরুষ। ৩৭৩ হিজরি সনে তিনি নিজে লিওন রাজ্য অভিযান করেন। এরপর ৩৭৪ হিজরি সনে বার্সেলোনা বিজয় করেন। ৩৮৬ হিজরি সনে মরক্কোকে আন্দালুসের উমাইয়া শাসনের অধিভুক্ত করেন। মনসুর হাজিব থাকাকালে স্পেনের মুসলিম সাম্রাজ্যের এত বেশি বিস্তৃতি ঘটেছে, যেরকমটি আগে কখনো ঘটেনি। (১৬৪)
ইসলামের ইতিহাসে মন্ত্রণালয়ের বিন্যাস ও পদগুলো ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা ইসলামি রাষ্ট্রের শক্তিমত্তা ও ভাবমূর্তি উন্নত করতে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। এমনকি খিলাফত ও ইসলামি সাম্রাজ্যের দুর্বল ও জরাগ্রস্ত পরিস্থিতিতেও এমন অসংখ্য উযির বর্তমান ছিলেন, যারা তখনও ইসলামি সাম্রাজ্যের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। জেনে অবাক হবেন, খিলাফত যতই বিপন্ন ও দুর্দশাগ্রস্ত হোক, এসব বিখ্যাত উযিরগণ কখনোই খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেননি। আন্দালুসে মনসুর ইবনে আবু আমিরের অসামান্য কীর্তি এবং বাগদাদে ইবনুল আমিরের (মৃ. ৩৬০ হি.) অনবদ্য ভূমিকা থেকে এ কথাই আমরা জানতে পারি। (১৬৫)
টিকাঃ
১৩৮. তিরমিযি, কিতাবুল মানাকিব, বাব: ফি মানাকিবি আবি বকর রা. ওয়া উমর রা., হাদিস নং ৩৬৮০। এই হাদিসটিকে তিনি হাসান গরিব বলেছেন। মুসতাদরাকে হাকেম, ৩০৪৬; তিনি এই হাদিসটিকে সহিহুল ইসনাদ বলেছেন, তবে তাখরিজ করেননি। ইমাম যাহাবিও তার সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন।
১৩৯. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ২, পৃ. ২৪৩।
১৪০. আবদুল আযিয আদ-দুরি, আন-নুযুমুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৮৪।
১৪১. মাওয়ারদি, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, পৃ. ৩২।
১৪২. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ২৩৬।
১৪৩. তারা শুধু কারি ও হাফেযই ছিলেন না, বরং উঁচুমানের আলেমও ছিলেন।-সম্পাদক।
১৪৪. বুখারি, কিতাব: ফাজায়িলুল কুরআন, বাব: জামউল কুরআন, ৪৭০১।
১৪৫. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ৪, পৃ. ২৪৭।
১৪৬. প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ৩১৩।
১৪৭. প্রাগুক্ত, খ. ৫, পৃ. ২০৭।
১৪৮. যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ২, পৃ. ২৬৩।
১৪৯. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ১০, পৃ. ১১০।
১৫০. প্রাগুক্ত, খ. ১০, পৃ. ২০৪।
১৫১. মাওয়ারদি, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, পৃ. ৩০-৩১।
১৫২. খতিবে বাগদাদি, তারিখে বাগদাদ, খ. ১৪, পৃ. ২২৯।
১৫৩. জাহশিয়ারি, আল-ওয়াযারাউ ওয়াল-কুততাব, পৃ. ১৮৩।
১৫৪. পারস্যের শিয়া মতাবলম্বী একটি রাজবংশ। ৩২০ হি./৯৩২ খ্রি. থেকে ৪৪৭ হি./১০৫৫ খ্রি. পর্যন্ত পারস্য ও ইরাক শাসন করে।
১৫৫. জাহশিয়ারি, আল-ওয়াযারাউ ওয়াল-কুততাব, পৃ. ১৮৩।
১৫৬. অ্যাডাম মেজ, আল-হাদারাতুল ইসলামিয়্যা ফিল-কারনির রাবিয়িল হিজরি, খ. ১, পৃ. ১৮৭-১৮৮; ইহসান আব্বাস, শাযারাতুন মিন কুতুবিন মাফকুদাতিন, খ. ২, পৃ. ২৪০।
১৫৭. শাবুশতি: পুরো নাম আবুল হাসান আলি ইবনে মুহাম্মাদ আশ-শাবুশতি। মৃ. ৩৯০ হি., ১০০০ খ্রি.। একজন বিখ্যাত লেখক। তিনি মিশরের আযিয বিল্লাহ ফাতেমির রাষ্ট্রীয় প্রকাশনা বিভাগের দায়িত্ব পালন করেন। তার লিখিত কিতাব হলো আদ-দিয়ারাত, মারাতিবুল ফুকাহা। ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৩, পৃ. ৩১৯।
১৫৮. শাবুশতি, আদ-দিয়ারাত, পৃ. ৬৬।
১৫৯. যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ১৯, পৃ. ৯৬।
১৬০. ইবনুল আসির, আল-কামিল, খ. ৮, পৃ. ৪৪৯।
১৬১. ইবনুল আসির, আল-কামিল, খ. ৮, পৃ. ৪৮১।
১৬২. নিজামুল মুলক, সিয়াসাতনামা, পৃ. ৪৪।
১৬৩. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ২৪০।
১৬৪. দেখুন, হুসাইন মুনিস, মাওসুআতু তারিখিল উন্দুলুস, খ. ১, পৃ. ৩৬৩-৩৭২।
১৬৫. অ্যাডাম মেজ, আল-হাদারাতুল ইসলামিয়্যা ফিল-কারনির রাবিয়িল হিজরি খ. ১, পৃ. ১৮৫-১৮৮।
📄 মন্ত্রনালয় ব্যবস্থাপনায় মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান
আব্বাসীয় শাসনামলের প্রথম দিন থেকেই মন্ত্রণালয় ব্যবস্থার সূচনা হয়। আর তাই ইসলামি আইনবিদদের রচিত ওযারাত বা মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত অনেক রচনা ও গ্রন্থ আমাদের চোখে পড়ে, যেগুলোতে ফিকহি মূলনীতি অথবা এমন সাধারণ কিছু নিয়মপদ্ধতি উল্লেখ করা হয়েছে যেগুলো প্রত্যেক উযিরের মধ্যে থাকা উচিত। এ তালিকায় যারা অগ্রজের ভূমিকা পালন করেছেন তাদের অন্যতম হলেন ইবনুল মুকাফফা। তিনি বলেন, উযির বা সহযোগী ছাড়া একজন সুলতান কখনো নিজের কাজগুলো ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারবেন না। আর উযিরদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে কেবল সম্প্রীতি ও উপদেশের মাধ্যমেই। (১৬৬)
অপরদিকে ইবনে আবু রবি(১৬৭) তার বিখ্যাত সুলুকুল মালিক ফি তাদবিরিল মামালিক গ্রন্থে লেখেন, জেনে রাখুন একজন খলিফা বা শাসকের জন্য এমন উযিরের প্রয়োজন, যে খলিফার কাজগুলোর বিন্যাস করে দেবে। রাষ্ট্রীয় গোলযোগ ও বিশৃঙ্খলার মুহূর্তে তাকে সহযোগিতা করবে। সঠিক সিদ্ধান্ত ও মতামত তার সামনে উপস্থাপন করবে। আপনি কি আমাদের বিশ্বনবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনচরিত পড়েননি?! মহান আল্লাহ তাকে সুস্পষ্ট সব নিদর্শন দিয়ে পাঠান। অলৌকিক সব গুণ দিয়ে তাকে সমৃদ্ধ করেন। ইসলামের এই সুমহান জীবনব্যবব্যবস্থাকে সকল ধর্মের ওপর বিজয়ী করার প্রতিশ্রুতি দেন। এরপর তাকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা প্রদান করেন। সত্য পথের সন্ধান দেন। এত কিছুর পরও তিনি আলি ইবনে আবি তালিব রা.-কে তার উযির বলে সম্বোধন করেন। আলি রা.-কে উদ্দেশ্য করে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
«أَنْتَ مِنِّي بِمَنْزِلَةِ هَارُوْنَ مِنْ مُوْسَى»
মুসার জন্য হারুন যেমন, আমার জন্য তুমিও তেমন। (১৬৮), (১৬৯)
অন্যের সহযোগিতা বা সুপরামর্শ গ্রহণ যদি তুচ্ছ কোনো বিষয় হতো, তাহলে বিশ্বনবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং মুসা আ.-এর মতো উন্নত মানবীয় গুণে সমৃদ্ধ ব্যক্তিবর্গ উযির বা সহযোগী গ্রহণ থেকে নির্মুখাপেক্ষী থাকতেন। সুতরাং বোঝা গেল, উযির হলেন রাষ্ট্র পরিচালনায় খলিফার প্রধান সহযোগী। রাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলো সুরক্ষার প্রধান নীতিনির্ধারক। কাজে ও বক্তব্যের মাধ্যমে সকল-কিছুর ব্যবস্থাপক। (১৭০)
অপরদিকে ইসলামি রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যারা কলম ধরেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন মাওয়ারদি। তিনি তার অনবদ্য আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা গ্রন্থে মন্ত্রণালয়ব্যবস্থার বিস্তারিত আলোকপাত করেন। স্বতন্ত্র অধ্যায়ে এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন। সেখানে ওযারত বা মন্ত্রণালয়কে তিনি দুভাগে বিভক্ত করেন। এক. ওয়াযারাতু তাফবিয (وزارة تفويض) । দুই. ওয়াযারাতু তানফিয (وزارة تنفيذ)। ওয়াযারাতু তাফবিয হলো মন্ত্রীদেরকে নিজ চিন্তা ও গবেষণার আলোকে নানা রাষ্ট্রীয় অধ্যাদেশ জারি করা এবং বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার অবাধ ক্ষমতা প্রদান। (১৭১) কোনো সন্দেহ নেই এ ধরনের ক্ষমতা প্রদান খিলাফত ও ইসলামি রাজনৈতিক অঙ্গনের দারুণ কুশলতার পরিচয় বহন করে। অর্থাৎ ছোট-বড় সব বিষয়ের সমাধানের জন্য একই বিভাগের শরণাপন্ন হয়ে মানুষ যেন ভোগান্তিতে না পড়ে, সে লক্ষ্যে বিভিন্ন সেক্টর ও দপ্তরভিত্তিক বিন্যাসে মন্ত্রণালয়কে সাজানো হয়। এরকম অবাধ স্বাধীন মন্ত্রিত্ব যারা লাভ করেছেন, তাদের মধ্যে জাফর ইবনে ইয়াহইয়া আল-বারমাকি অন্যতম। আব্বাসি খলিফা হারুনুর রশিদের শাসনামলে তাকে সুলতান উপাধি দেওয়া হয়। কারণ খলিফার মতো রাষ্ট্রের সকল-কিছুতে স্বাধীনভাবে হস্তক্ষেপ করার এবং সকল আদেশ-নিষেধ জারি করার একচ্ছত্র অধিকার তারও ছিল। (১৭২) এ তালিকায় আরও যাদের নাম এসে যায়, তাদের মধ্যে বাগদাদে ইসলামি সভ্যতা বিনির্মাণের অগ্রনায়ক নিজামুল মুলক এবং স্পেনের ইসলামি কৃষ্টিতে অবদান রাখা মনসুর ইবনে আবু আমির অন্যতম। এ দুজন সম্পর্কে একটু আগে আমরা জেনে এসেছি।
সে তুলনায় ওয়াযারাতু তানফিয কিছুটা কম মর্যাদার। কারণ এটি কেবল খলিফার আদেশ মান্য করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সে ক্ষেত্রে খলিফার নির্দেশ যথাযথ পালন করা এবং সে অনুযায়ী কর্মসূচি সাজানোর দায়িত্ব পেতেন এরকম উযিরগণ। (১৭৩) ইসলামি সভ্যতায় বেশিরভাগ উযিরের দায়িত্বই ছিল এ প্রকৃতির। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক ইস্যুতে খলিফার আদেশ যথাযথভাবে পালন করার জন্য তাদেরকে নিয়োগ দেওয়া হতো।
সিরাজুল মুলুক গ্রন্থে উযির ও তাদের বৈশিষ্ট্য নিয়ে স্বতন্ত্র একটি অধ্যায় রচনা করেন তারতুশি। একজন উযিরের কাছ থেকে খলিফা কী আশা করেন উক্ত গ্রন্থে তিনি তা স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, একজন উযিরের প্রধান দুটি দায়িত্ব হলো: এক. অজানা বিষয়গুলো তিনি খলিফাকে জানাবেন। দুই. খলিফা আগে থেকে যা জানতেন উযির তা আরও স্পষ্ট ও জোরালো করবেন। (১৭৪) তা ছাড়া মন্ত্রণালয়ের পদে নিন্দিত কোনো ব্যক্তিকে বসানো থেকে সতর্ক করেন তারতুশি। তার গ্রন্থে তিনি বলেন, নিন্দিত বা বিতর্কিত কেউ উন্নত পদে নিয়োগ পেলে তার সহযোগী কমে যাবে। তার ভালো কাজগুলো সন্দেহের চোখে দেখা হবে। তিনিও নন্দিত ব্যক্তিদের হালকা চোখে দেখবেন। গুণধর ব্যক্তিদের ওপর তিনি অহংবোধ করবেন। এরপর এ বক্তব্যের পক্ষে প্রমাণ পেশ করতে গিয়ে তিনি সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিক এবং উমর ইবনে আবদুল আযিযের মাঝে সংঘটিত একটি ঘটনা টেনে আনেন, সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিক যখন হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের ব্যক্তিগত পত্রলেখক ইয়াযিদ ইবনে আবু মুসলিমকে নিজের পত্রলেখক হিসেবে নিয়োগ দিতে চাইলেন, তখন উমর ইবনে আবদুল আযিয তাকে বলেন, হে আমিরুল মুমিনিন, আল্লাহর দোহাই দিচ্ছি, এই লোকটিকে আপনার পত্রলেখক হিসেবে নিয়োগ করে হাজ্জাজের আলোচনা আবার জাগিয়ে তুলবেন না। উত্তরে তিনি বলেন, হে আবু হাফস, আমি তার বিরুদ্ধে এক দিনার বা এক দিরহাম পরিমাণও দুর্নীতির অভিযোগ পাইনি। তা শুনে উমর বললেন, দিরহাম-দিনারের আলোচনা যখন উঠল, তাহলে আপনাকে আমি দিরহাম-দিনার ব্যবহারে তার চেয়েও সৎ একজনের কথা বলব কি? সুলাইমান জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কে? উত্তরে উমর বললেন, ইবলিস! জীবনেও সে কোনো দিনার বা দিরহাম স্পর্শ করেননি, কিন্তু সে ঠিকই পুরো মানবজাতিকে ধ্বংস করে ছেড়েছে। (১৭৫)
আরেক বিখ্যাত ইতিহাসবেত্তা শাইযারি (মৃ. ৫৮৯ হি.) আল-মানহাজুল মাসলুক ফি সিয়াসাতিল মুলুক গ্রন্থে মাওয়ারদির মতোই মন্ত্রণালয়ের দাপ্তরিক ও বিভাগীয় বিন্যাসের বিবরণ উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়াও একজন উযিরের মধ্যে দশটি অপরিহার্য গুণ থাকার কথা বলেছেন শাইযারি। সেগুলো হলো যথাক্রমে : যথেষ্ট জ্ঞান, পরিণত বয়স, সততা, সত্যবাদিতা, অল্পেতুষ্টি, শান্তি ও সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় পারদর্শিতা, উপদেশ গ্রহণের মানসিকতা, প্রখর মেধা ও স্মৃতিশক্তি, স্বেচ্ছাচারহীনতা এবং সকল-কিছু নিজেই মীমাংসা করতে পারার মতো যোগ্যতা। (১৭৬)
অন্যদিকে মুহাম্মাদ ইবনে আলি আল-কালয়ি (মৃ. ৬৩০ হি.) রচনা করেন বিখ্যাত তাহযিবুর রিয়াসাতি ওয়া তারতিবুস সিয়াসা গ্রন্থ। বিশাল কলেবরের এ বইয়ে পূর্ববর্তী শাসকদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকে সুষ্ঠু ও সুনিপুণভাবে রাজ্য পরিচালনার জন্য খলিফা, গভর্নর ও শাসকদের জন্য উপকারী সব ঘটনা ও অভিজ্ঞতার বিবরণ দেন। গ্রন্থটি তিনি প্রধান দুটি ভাগে বিভক্ত করেন। প্রথম ভাগে তিনি প্রজ্ঞাবানদের নির্বাচিত বাণী ও ভাষাপণ্ডিতদের দুর্লভ সংলাপের বিবরণ দিয়ে সেগুলোকে বিচিত্র উপমা ও বিভিন্ন বর্ণনার মাধ্যমে সাজিয়ে তোলেন। দ্বিতীয় ভাগে তিনি খলিফা, উযির, গভর্নর, সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারী ও কার্যনির্বাহীদের জন্য শিক্ষণীয় বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরেন। এসব ঘটনা থেকে তাদের মানমর্যাদা, সদাচরণ, সচ্চরিত্র ও মনুষ্যত্বের গুণাবলির প্রমাণ পাওয়া যায়। (১৭৭) মন্ত্রণালয়ের আলোচনা করতে গিয়ে প্রজ্ঞাবান ও বিদগ্ধ ব্যক্তিদের দেওয়া নানা উপমা ও প্রজ্ঞার কথা উল্লেখ করেন। তা ছাড়া ওযারত ও উযিরদের নিয়ে লেখা বিভিন্ন কবিতাও তিনি সেখানে বর্ণনা করেন।
অপরদিকে আবদুর রহমান ইবনে খালদুন (মৃ. ৮০৮ হি.) তার বিখ্যাত আল-মুকাদ্দিমায় বিশ্বনবীর যুগ থেকে শুরু করে তার যুগ পর্যন্ত ইসলামি সভ্যতায় মন্ত্রণালয় ব্যবস্থাপনার অভূতপূর্ব উন্নতির ঐতিহাসিক বিবরণ দেন। ঐতিহাসিক বর্ণনার আলোকে কোনো রাষ্ট্রের বা আমলের মন্ত্রণালয়ের অগ্রগতি ও অবনতির বিস্তারিত বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা তুলে ধরেন। এ বইয়ের মাধ্যমে ইসলামি রাজনৈতিক বিষয়ে ইবনে খালদুনের গভীর জ্ঞান ও অসামান্য পাণ্ডিত্যের পরিচয় পাওয়া যায়। বনি উমাইয়ার শাসনামলে মন্ত্রিত্বের গুরুত্বের কথা আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, সে যুগে পুরো বনি উমাইয়া সাম্রাজ্যে সবচেয়ে মূল্যবান ও উন্নত পদ ছিল মন্ত্রিত্ব। সরকারি সকল বিষয় দেখাশোনা ও পরিচালনা এবং নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা-বিষয়ক সকল ইস্যুতে একমাত্র উযিরগণই হস্তক্ষেপ করতেন। তা ছাড়া সামরিক ইস্যু এবং নাগরিকদের ভাতা প্রদান, এ জাতীয় বিষয়গুলো তারাই পরিচালনা করতেন। (১৭৮) এতে কোনো সন্দেহ নেই তার রচিত রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং তার প্রদর্শিত ইসলামি রাষ্ট্রসমূহের সাংস্কৃতিক রূপকেই পরবর্তীকালে সমাজবিজ্ঞান নামে অভিহিত করা হয়েছে।
অপরদিকে শামসুদ্দিন ইবনুল আযরাক আল-গারনাতি (মৃ. ৮৯৬ হি.) তার রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শনের বিবরণ দিতে গিয়ে ইবনে খালদুনের দেখানো পথেই অগ্রসর হয়েছেন। তার লেখা বাদায়িউস সিলকি ফি তাবায়িয়িল মুলকি গ্রন্থে ‘যেসব কর্মসূচির আলোকে গড়ে একজন রাষ্ট্রনায়কের সকল দায়িত্ব’ শীর্ষক একটি অধ্যায় রচনা করে উযির নিয়োগের কাজকে শাসকের প্রথম দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেন। সেজন্য যৌক্তিক ও শরয়ি সকল প্রমাণ উপস্থাপন করে তার এই দাবিকে জোরালো করে তোলেন। তার এ গ্রন্থের বিন্যাস অনেকটা দর্শন ও তর্কশাস্ত্রীয় বইয়ের মতো। (১৭৯)
এ সংক্ষিপ্ত আলোচনায় আশা করি পাঠক মন্ত্রণালয় ব্যবস্থাপনায় মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানের মহত্ত্ব সম্পর্কে অবগত হয়েছেন। তা ছাড়া এটাও জেনে রাখা দরকার, ইউরোপীয় কোনো জাতি এবং ইসলামপূর্ব কোনো জনগোষ্ঠী মন্ত্রণালয় ব্যবস্থাপনায় কোনো অবদান রেখেছে বলে আদৌ প্রমাণিত নয়।
টিকাঃ
১৬৬. ইবনুল মুকাফফা, আল-আদাবুস সগির, পৃ. ৩২।
১৬৭. পুরো নাম আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আবু রবি (২১৮-২৭২ হি./৮৩৩-৮৮৫ খ্রি.)। তিনি ছিলেন সাহিত্যিক এবং আব্বাসীয় খলিফা মুতাসিমের অন্যতম উযির। তার অনেকগুলো গ্রন্থের মধ্যে সুলুকুল মালিক ফি তাদবিরিল মামালিক অন্যতম। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ১, পৃ. ২০৫।
১৬৮. অন্য একটি বাক্যেও হাদিসটি বর্ণিত : ألا ترضى أن تكون مني بمنزلة هارون من موسى : দেখুন, বুখারি, কিতাবুল মাগাযি, বাব: গাযওয়াতু তাবুক ওয়া হিয়া গাযওয়াতুল উসরাতি, হাদিস নং ৪১৫৪। মুসলিম, কিতাবু ফাযায়িলিস সাহাবা, বাব: মিন ফাযায়িলি আলি ইবনে আবি তালিব, হাদিস নং ২৪০৪।
১৬৯. ইবনে আবু রবির উচিত ছিল আবু বকর, উমর ও উসমানের ওযারত (মন্ত্রিত্ব) নিয়ে আলোচনা করা। এরপর আলি ইবনে আবু তালিবের কথা উল্লেখ করা। কারণ এ ক্ষেত্রে তার অবস্থান তাদের পরে।
১৭০. ইবনে আবু রবি, সুলুকুল মালিকি ফি তাদবিরিল মামালিক গ্রন্থে যাফের কাসেমি রচিত নিযামুল হুকমি ফিশ শারিআতি ওয়াত-তারিখিল ইসলামি গ্রন্থের উদ্ধৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। দেখুন, খ. ১, পৃ. ৪২২-৪২৩।
১৭১. মাওয়ারদি, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, পৃ. ২৪-২৫।
১৭২. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ২৩৮।
১৭৩. প্রাগুক্ত, ২৬। মুনির আল-আজলানি, আবকারিয়্যাতুল ইসলামি ফি উসুলিল হুকমি, পৃ. ২২৩।
১৭৪. তারতুশি, সিরাজুল মুলুক, পৃ. ৫৬।
১৭৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৭।
১৭৬. দেখুন, শাইযারি, আল-মানহাজুল মাসলুক ফি সিয়াসাতিল মুলুক, পৃ. ২০৭-২১০।
১৭৭. কালয়ি, তাহযিবুর রিয়াসাতি, পৃ. ৬০।
১৭৮. ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, পৃ. ২৩৮।
১৭৯. ইবনুল আযরাক, বাদায়িউস যিলকি ফি তাবায়িয়িল মুলকি, পৃ. ২৪