📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 সভ্যতার দৃষ্টিকোণ থেকে রাজনৈতিক মত গোলযোগ

📄 সভ্যতার দৃষ্টিকোণ থেকে রাজনৈতিক মত গোলযোগ


ইসলামি সভ্যতা রাজনৈতিক ফেতনা ও গোলযোগসমূহকে বিচিত্র ও অভাবনীয় পদ্ধতিতে সমাধান করেছে, ইতিপূর্বে অন্য কোনো সভ্যতার ইতিহাসে যা দেখা যায়নি। সবগুলো রাজনৈতিক দাঙ্গা ও গোলযোগকে ক্ষমতার দাপটে বা অস্ত্রের বলে প্রতিহত করেনি, বরং ফেতনাবিশেষে নানা পদ্ধতি অবলম্বন করে সেগুলো দমন করতে সক্ষম হয়েছে। পাশাপাশি ফেতনার সময় ব্যক্তিপর্যায়ে করণীয়-বর্জনীয় সম্পর্কেও হাদিসে নববিতে সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চারপাশে বসা ছিলাম। তখন তিনি বা অন্য কেউ ফেতনার কথা আলোচনা করলেন। তখন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

إِذَا رَأَيْتَ النَّاسَ قَدْ مَرِجَتْ عُهُودُهُمْ، وَخَفَّتْ أَمَانَاتُهُمْ، وَكَانُوا هَكَذَا»، وَشَبَّكَ بَيْنَ أَصَابِعِهِ، قَالَ: فَقُمْتُ إِلَيْهِ، فَقُلْتُ لَهُ: كَيْفَ أَفْعَلُ عِنْدَ ذَلِكَ، جَعَلَنِي اللهُ فِدَاكَ؟ قَالَ: «الْزَمْ بَيْتَكَ، وَامْلِكُ عَلَيْكَ لِسَانَكَ، وَخُذْ مَا تَعْرِفُ، وَدَعْ مَا تُنْكِرُ، وَعَلَيْكَ بِأَمْرِ خَاصَّةِ نَفْسِكَ، وَدَعْ عَنْكَ أَمْرَ الْعَامَّةِ

যখন দেখবে, মানুষের প্রতিশ্রুতিগুলো বিনষ্ট হয়ে গেছে, তাদের আমানতগুলো গুরুত্বহীন হয়ে গেছে এবং তারা সকলেই এরকম হয়ে গেছে (এ কথা বলার সময় তিনি হাতের আঙুলগুলো গুটিয়ে একত্র করে দেখান)। বর্ণনাকারী বলেন, এ কথা শুনে আমি উঠে তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল, আপনার জন্য আমার জীবন উৎসর্গ হোক! তখন আমি কী করব? তিনি বললেন, বেশিরভাগ সময় ঘরে অবস্থান করবে। জিহ্বা নিয়ন্ত্রণ করবে। যা ভালো মনে হয়, পালন করবে। যা মন্দ, তা বর্জন করবে। কেবল নিজের বিষয়ের প্রতি মনোযোগী থাকবে। জনগণের মাঝে ছড়িয়ে পড়া ফেতনার বিষয়ে একেবারেই মনোনিবেশ করবে না। (১১২)

এই হাদিসে নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, ফেতনার সময় যে মুসলিম ফেতনার ব্যাপারে কিছু করার ক্ষমতা রাখে না তার ভূমিকা কী হতে পারে। তার জন্য তিনি ফেতনায় মনোনিবেশ না করে ফেতনার উত্তাপ না ছড়িয়ে নিজ ঘরে অবস্থানের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

মুসলিমবিশ্বে ঘটিত সবগুলো গোলযোগে ইসলামি সভ্যতা বাস্তবসম্মত ও কল্যাণকর পদক্ষেপ উপহার দিয়েছে। মুসলিম উম্মাহ প্রথম যে ফেতনার মুখোমুখি হয়, তা ছিল আমিরুল মুমিনিন আলি রা.-এর সঙ্গে শামের গভর্নর মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানের মাঝে সদ্যপ্রয়াত খলিফা উসমান রা.-এর হত্যাবিচার নিয়ে সৃষ্ট ফেতনা। আমিরুল মুমিনিন হিসেবে আলি রা. চাচ্ছিলেন মুআবিয়া রা.-কে শামের গভর্নর পদ থেকে অব্যাহতি দিতে। আর মুআবিয়া রা. চাচ্ছিলেন যে করেই হোক উসমান রা.-এর হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করতে। এ নিয়ে দুপক্ষের মাঝে বিরোধ চরমে পৌছে। ফলে সংঘটিত হয় জামাল ও সিফফিনের মতো হৃদয়বিদারক যুদ্ধ। এরপর দেখা দেয় আরেক ফেতনা যা হলো আলি রা.-এর হত্যার ঘটনা। তখন পুরো মুসলিমবিশ্বের পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত ও অস্থিরতাপূর্ণ। এরকম জটিল ও কঠিন ফেতনাটি খলিফাতুল মুসলিমিন হাসান ইবনে আলি রা.-এর হাত ধরে খুব সুন্দর ও সঠিক সমাধানের মাধ্যমে নিঃশেষ হয়। নিহত হওয়ার আগে আলি রা. পুত্র হাসান ও আবদুল মুত্তালিব গোষ্ঠীকে এই বলে ওসিয়ত করে যান, হে আবদুল মুত্তালিবের বংশধর, এরপর আমি যেন আর তোমাদেরকে মুসলিমদের রক্ত নিয়ে খেলতে না দেখি। তোমরা বলতে পারো, আমিরুল মুমিনিন নিহত হয়েছেন। আমিরুল মুমিনিন নিহত হয়েছেন। সাবধান, এর বিচারে শুধু আমার হত্যাকারী ব্যক্তিকেই যেন হত্যা করা হয়। দেখো হাসান, আমি যদি এক আঘাতে নিহত হই, তাহলে তাকেও এক আঘাতে হত্যা করো। তার লাশ বিকৃত করো না। (১১৩) পুত্রের প্রতি এই নিষেধাজ্ঞা ছিল স্বয়ং নিহত হওয়া আলি রা.-এর। তার মৃত্যুর সময় যেমন অগণিত মুসলিমের রক্ত ঝরেছে, তার পর যেন আর কোনো মুসলিমের রক্ত না ঝরে, সে বিষয়ে তিনি হাসান ও গোটা আবদুল মুত্তালিব গোষ্ঠীকে ওসিয়ত করে যান। এরকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি করা থেকে কঠোরভাবে তাদের নিষেধ করেন।

আমিরুল মুমিনিন আলি রা. নিহত হওয়ার পর ৪০ হিজরি সনে গোটা উম্মাহ তার সুযোগ্য পুত্র হাসানের হাতে বাইআত গ্রহণ করে। আর আমিরুল মুমিনিন হিসেবে শপথ নেওয়ার পর হাসান রা. প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে মুসলিমদের রক্তপাত বন্ধ করার লক্ষ্যে তিনি প্রতিশোধের ইচ্ছা থেকে সরে আসার ঘোষণা দেন। তাকে এবং তার নিহত পিতাকে বিপৎকালে ধোঁকা দেওয়া ইরাকবাসীর প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপনের সিদ্ধান্ত নেন। এরপর শান্তিচুক্তি করার জন্য মুআবিয়া রা.-এর কাছে দূত পাঠান। শেষ পর্যন্ত সফলভাবে তাদের মাঝে সেই চুক্তি সম্পাদিত হয়। মুসলিমদের পবিত্র রক্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া ফেতনার দাবানল বন্ধ করতে মুআবিয়া রা.-এর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন হাসান ইবনে আলি রা.। (১১৪)

মুসলিম জনসাধারণের রক্তের সুরক্ষা ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বেচ্ছায় হাসান ইবনে আলি রা.-এর ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘটনা দ্বারা প্রমাণিত হয়, ইসলামি সভ্যতা একজন মুসলিমের যথাযথ মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে, যা অন্যসব সভ্যতায় বিরল। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক, রোমান সম্রাটগণ দাস ও হিংস্র প্রাণীর মাঝে লড়াইয়ের আয়োজন করত। এরপর হিংস্র প্রাণী যখন ভৃত্যকে পর্যুদস্ত করে তার বুক চিড়ে খেত, সম্রাট ও রাজকর্মচারীগণ খুব আনন্দের সঙ্গে সেই দৃশ্য উপভোগ করত। অট্টহাসিতে ফেটে পড়ত। অপরদিকে ইসলামি সভ্যতায় আমরা দেখতে পাই, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর পবিত্র মুখে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন যে, একজন মুসলিমের রক্তপাত ঘটানো আল্লাহর কাছে পবিত্র কাবাঘর ধ্বংস করা থেকেও জঘন্য হারাম। (১১৫)

ফেতনা ও রাষ্ট্রীয় গোলযোগের সময় নমনীয়তা অবলম্বনের কথা বলেছে শরিয়ত। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, «إن أُمر عليكم عبد حبشي مجدع فاسمعوا له وأطيعوا» একজন হাবশি প্রতিবন্ধীকেও যদি তোমাদের নেতা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়, তবুও তোমরা তার কথা শোনো। তার আদেশ মেনে চলো। (১১৬)

সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে যিনি নেতা হবেন, তাকেই একবাক্যে মেনে নিতে হবে এবং তার আদেশ সকলকে মেনে চলতে হবে, অধিকাংশ ফকিহ এমনটিই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর পেছনে উদ্দেশ্য, জনগণের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, মুসলিমদের ঐক্য ও ভাবমূর্তি সুরক্ষা করতে এবং সর্বোপরি ফেতনার দরজা চিরতরে বন্ধ করতে উম্মাহকে একজন শাসকের অধীনে ঐক্যবদ্ধ করা। আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা. এবং আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের মাঝে খিলাফত নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে তুমুল রক্তপাত ঘটে। তখন ইরাক, হেজায ও মিশর নিয়ে স্বাধীন হয়ে যান আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা.। আর আবদুল মালিকের নিয়ন্ত্রণে অবশিষ্ট ছিল কেবল শাম। সে সময় বড় বড় সাহাবায়ে কেরাম ও তাদের পুত্রগণ উম্মাহকে বিভক্তকারী এই ফেতনায় অংশগ্রহণ করা থেকে মানুষকে কঠিনভাবে বারণ করেন। যতক্ষণ তারা উভয়ে বিবদমান ও বিভক্ত থাকবেন, ততক্ষণ তাদের কোনো একজনের কাছে বাইআত করা থেকে মানুষকে নিষেধ করেছেন। শেষ পর্যন্ত আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের বিজয়ের মাধ্যমে এবং অধিকাংশ জনগণ তার সমর্থক হওয়ার কারণে ফেতনার পরিসমাপ্তি ঘটে। গোটা মুসলিম জাহান আবার একজন শাসকের অধীনে ঐক্যবদ্ধ হয়। অনেক বিখ্যাত ও বড় বড় সাহাবিও তার নেতৃত্ব মেনে নিয়ে তার আনুগত্য স্বীকার করে নেন। তাদের অন্যতম হলেন আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.। আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের কাছে তিনি চিঠি লিখে পাঠান, আমি আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের রীতি অনুযায়ী আমিরুল মুমিনিন হিসেবে মেনে নিচ্ছি। আমি যথাসম্ভব তাঁর কথা শুনব, তাঁর আদেশ মেনে চলব। আমার গোত্রের সবাই তা মেনে নিয়েছে। (১১৭)

ইসলামি শরিয়তে সবসময় যথাসম্ভব ফেতনা থেকে দূরে থাকার কথা বলা হয়েছে। এর পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল, সংঘাত ও রক্তপাত বন্ধ করা। ঐক্য, সমতা, আল্লাহর ধর্মের প্রচার ও ইবাদতের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে খিলাফত প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করা। ইসলামি সভ্যতার প্রধান উদ্দেশ্য আগেও যা ছিল এখনো তা-ই আছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামি শরিয়তের বিধি মোতাবেক সর্বজনস্বীকৃত খলিফার বর্তমানে দ্বিতীয় কেউ খিলাফতের বাইআত গ্রহণ করা শুরু করলে তাকে হত্যার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

إِذَا بُويعَ الخَلِيفَتَيْنِ، فَاقْتُلُوا الْآخَرَ مِنْهُمَا»

দুজন খলিফার বাইআত গ্রহণ করা হলে তাদের মধ্যে যার বাইআত পরে গ্রহণ করা হয়েছে তাকে হত্যা করো। (১১৮)

এই হাদিসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইমাম ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, একজন খলিফা নির্বাচন হওয়ার পর এবং সকলেই একবাক্যে তাঁকে খলিফা হিসেবে মেনে নেওয়ার পর দ্বিতীয় কেউ যদি বাইআত করা শুরু করে, তাহলে সে রাষ্ট্রদ্রোহী বলে বিবেচিত হবে। তাঁকে এবং তাঁর অনুসারী সকলকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার অপরাধে তাদের সাথে যুদ্ধ করা হবে। হাদিসে উল্লেখিত »فَاقْتُلُوا الْآخَرَ مِنْهُمَا দ্বারা প্রথমেই হত্যা করা উদ্দেশ্য নয় বরং উদ্দেশ্য হলো তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। তবে কোনো উপায় না থাকলে তাঁকে হত্যা করা বৈধ হবে। (১১৯)

ইসলামি সভ্যতা সবসময় মুসলিমদের ঐক্যকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। উদ্দেশ্য যদি হয় মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করা, তাহলে বিজয়ী ব্যক্তিকেই নেতা হিসেবে মেনে নিতে হবে। (১২০) এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ইউসুফ ইবনে তাশফিন। স্পেনের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অঞ্চল শাসন করত স্থানীয় গোত্রীয় রাজা-মহারাজাগণ। সবসময় তারা একে অন্যের বিরুদ্ধে লেগে থাকত। এক অঞ্চলের সাথে যুদ্ধের জন্য অন্য অঞ্চলের রাজাদের সহায়তা নিত। এরপর স্পেনে ইসলামের শত্রুদের নির্মূল করার পর এবং ৪৭৯ হিজরি সনে ঐতিহাসিক যাল্লাকা যুদ্ধে বিজয় অর্জন করার পর ইউসুফ ইবনে তাশফিন এসব বিচ্ছিন্ন অঞ্চলকে মুরাবিতিন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। সেনাপতিদের নির্দেশ দেন এসব অঞ্চলে অভিযান চালাতে। তার এই পদক্ষেপকে সমর্থন করেন তৎকালীন বিজ্ঞ ও বিশিষ্ট সব ওলামায়ে কেরাম। তাদের একজন হলেন হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযালি রহ.। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ইসলামি সভ্যতার দর্শন কী হতে পারে তা স্পষ্ট করেন বিখ্যাত এই মুসলিম মনীষী। তিনি বলেন, নেতৃত্ব ও বিজয়ের এই নিশানকে উঁচু করার জন্য ইউসুফ ইবনে তাশফিনের এই পদক্ষেপটি যথার্থ ছিল। মুসলিম অঞ্চল পুনরুদ্ধারে নামা প্রতিটি সেনাপতির কর্তব্যও তাই। এমনকি শাসকের পক্ষ থেকে তিনি স্পষ্ট কোনো নির্দেশ না পেলেও, অথবা কোনো প্রতিবন্ধকতার কারণে তার কাছে শাসকের বার্তা পৌঁছতে দেরি হলেও। (১২১)

ইসলামি সভ্যতা ফেতনা ও গোলযোগ নির্মূলে কার্যকর সমাধান দেখিয়েছে এবং বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছে, যা অন্য কোনো সভ্যতা পারেনি। ইসলামি স্কলারগণও সবসময় উম্মাহর একতা রক্ষার স্বার্থে তুলনামূলক শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও বিজয়ী খলিফার নেতৃত্ব মেনে নেওয়ার কথা বলেছেন। এসবের পেছনে একমাত্র উদ্দেশ্য হলো উম্মাহকে একই পতাকাতলে সমবেত করা, উম্মাহর ঐক্য ও অভিন্নতা রক্ষা করা। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে দলাদলি ও বিচ্ছিন্নতা থেকে মুসলিমদের হেফাজত করা। অন্যসব ধর্ম ও সভ্যতার সামনে ইসলামি সভ্যতার মর্যাদা ও ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখা।

টিকাঃ
১১২. আবু দাউদ, ৪৩৪৩; ইবনে মাজাহ, ৩৯৫৭; আহমাদ, ৬৯৮৭।
১১৩. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ৩, পৃ. ১৫৮।
১১৪. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ৩, পৃ. ১৬৭।
১১৫. আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একবার কাবাঘর তাওয়াফ করতে দেখি। কাবার উদ্দেশে তখন তিনি বলছিলেন, কত পবিত্র তুমি, কত পবিত্র তোমার সৌরভ! কত মহান তুমি, কত মহান তোমার গৌরব। যার হাতে আমার প্রাণ সেই প্রতিপালকের শপথ, অবশ্যই একজন মুমিনের মর্যাদা, সম্পদ ও রক্ত আল্লাহর কাছে তোমার চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান। মুমিনের প্রতি সবসময় সুধারণা পোষণ করা কর্তব্য। দেখুন, ইবনে মাজাহ, ৩৯৩২; তিরমিযি, ২০৩২।
১১৬. ইবনে মাজাহ, ২৮৬১; তিরমিযি, ১৭০৬; আহমাদ, ২৭৩০১।
১১৭. বুখারি, কিতাবুল আহকাম, বাব: কাইফা ইয়ুবায়িযুল ইমামুন নাসা, ৬৭৭৭।
১১৮. মুসলিম, কিতাবুল ইমারাহ, বাব: ইযা বুইয়া লি-খালিফাতাইন, ১৮৫৩।
১১৯. ইবনুল জাওযি, কাশফুল মুশকিল মিন হাদিসিস সাহিহাইন, খ. ১, পৃ. ৭৯৫।
১২০. মুহাম্মাদ রশিদ রেজা, আল-খিলাফা, পৃ. ৪৪।
১২১. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি, দাওলাতুল মুরাবিতিন, পৃ. ১২৩।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 শুরা (পরামর্শসভা)

📄 শুরা (পরামর্শসভা)


রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইসলামি সংগঠনের অবদানের কথা আলোচনা করতে গেলে এর সাংগঠনিক বৈশিষ্ট্যগুলো আগে তুলে ধরতে হবে। জেনে রাখা দরকার, জনহিতকর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গটি উপহার দিতে সক্ষম হয়েছে ইসলাম। আর তা হলো শুরা (شورى) পদ্ধতি। মুসলিমদের দৈনন্দিন জীবনে শুরা বা পরামর্শের গুরুত্বের দিকে লক্ষ করে কুরআনুল কারিমের একটি পূর্ণাঙ্গ সুরার নাম দেওয়া হয়েছে الشورى বলে।

শুরা পদ্ধতি কীভাবে এবং কতটুকু বাস্তবায়ন করতে হবে এ বিষয়ে ইসলামি আইনবিদগণ যদিও নানা মত প্রদান করেছেন, তবে মুসলিমদের মাঝে শুরা-রীতি প্রচলিত থাকা আবশ্যক, এ নিয়ে কারও কোনো দ্বিমত নেই। (১২২) কারণ মহান আল্লাহর নির্দেশ,

وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ

এবং কাজেকর্মে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করুন। (১২৩)

শুরা হলো জনপ্রতিনিধি বা স্থলবর্তী নির্বাচনে অথবা জনগণের সার্বিক কল্যাণের ইস্যুতে উপযুক্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ করা। (১২৪)

এ আয়াতের ওপর ভিত্তি করে মুসলিমগণ 'শুরা পদ্ধতিকে' শাসনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করেন। ফলে যার মাঝে যোগ্য নেতৃত্বের গুণাবলি লক্ষ করেন, তাকে নেতা হিসেবে প্রস্তাব করেন। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর সময় লিখিতভাবে কাউকে প্রতিনিধি বা শাসক হিসেবে নির্বাচন করে যাননি, বরং বিষয়টি ছেড়ে দিয়ে গেছেন শুরা পদ্ধতির ওপর। এ থেকেই শুরার গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুভব করা যায়। আবু ওয়ায়েল রা. বর্ণনা করে বলেন, একবার আলি ইবনে আবু তালিব রা.-কে প্রশ্ন করা হয়, আপনি কি আমাদের ওপর আপনার প্রতিনিধি নির্বাচন করে যাবেন না? উত্তরে তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল মৃত্যুর সময় কাউকে প্রতিনিধি নির্বাচন করে যাননি, তাহলে আমি কীভাবে প্রতিনিধি নির্বাচন করে যাব! তবে মানুষের জন্য মহান আল্লাহ মঙ্গলের ইচ্ছা করলে অবশ্যই সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে তাদের জন্য শাসক হিসেবে নির্বাচন করে দেবেন। ঠিক যেমন নবীর মৃত্যুর পর শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে মুসলিমদের শাসক করে দিয়েছিলেন। (১২৫)

এ থেকেই ইসলামের রাজনৈতিক অবকাঠামোতে শুরাব্যবস্থা একটি মৌলিক অংশ হিসেবে স্বীকৃত হয়, বরং মুসলিমদের প্রতিটি কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে এ পরামর্শব্যবব্যবস্থা। এ মহান ব্যবস্থা প্রণয়ন করে অধুনা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অনেক আগেই ছাপিয়ে গেছে ইসলামি রাজনৈতিক ব্যবস্থা। শাসক নির্বাচনে জনগণের ভোট লাগবে, রাষ্ট্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মতামত লাগবে, এ প্রক্রিয়ার গণতন্ত্র আবিষ্কার করা হয়েছে মাত্র কয়েক শতাব্দী হলো, কিন্তু সেই চৌদ্দ শতাব্দী আগেই ইসলাম এর থেকে শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি আবিষ্কার করে বিশ্ববাসীর সামনে এক আদর্শ ও সফল জীবনব্যবব্যবস্থা উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। এখান থেকেই ইসলামে জনগণের মতামত ও চাহিদার মূল্য এবং কার্যকারিতা সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা লাভ করা যায়। (১২৬)

কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, কাদের নিয়ে এই শুরা বোর্ড গঠিত হবে? কারা করবে শাসক নির্বাচন? এ ব্যাপারে মুসলিম আইনবিদ ও ইতিহাসবিদগণ যাদের কথা বলেছেন তারা কারা? কী তাদের পরিচয়? কারা আহলুল হাল্লি ওয়াল-আকদি?

মুসলিমদের নিয়ে একটি শুরা বোর্ড গঠিত হবে এ ব্যাপারে সকলেই একমত। তবে আইনবিদগণ শুরা বোর্ডে সদস্যদের মধ্যে কিছু শর্ত পরিপূর্ণভাবে থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। শর্তগুলো হলো: পূর্ণ ন্যায়পরায়ণতা, যথেষ্ট জ্ঞান ও প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, বিচক্ষণতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। এক কথায় বলা যায়, এ বোর্ডের সদস্যরা হবেন আলেম (জ্ঞানী), যোগ্য, নেতৃস্থানীয় এবং জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। (১২৭)

শাসক ও বিচারব্যবব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণকারীদের জন্য শুরা পদ্ধতি অবলম্বন করাকে ফরয করেছে ইসলাম। আমরা বলতে পারি, শুরাব্যবব্যবস্থা মুসলিমদের আত্মস্থ করা এক সুমহান নির্বাচন পদ্ধতি, যা মুসলিম সমাজে শতাব্দীর পর শতাব্দীজুড়ে প্রচলিত ছিল। বরং অন্যরাও এর মাধ্যমে প্রভাবিত হয়েছিল। বিশেষ করে খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ইউরোপও এ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। কারণ শুরাব্যবব্যবস্থা মূলত মানুষের মাঝে আল্লাহর ইচ্ছার প্রতিফলন। কেননা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

«إِنَّ أُمَّتِي لَا تَجْتَمِعُ عَلَى ضَلَالَةٍ» আমার উম্মত কখনো কোনো ভুল সিদ্ধান্তের ওপর একতাবদ্ধ হবে না। (১২৮)

এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। সেটা হলো, ইসলামি রাষ্ট্রে একজন খলিফা কখনো অধিকর্তা বা স্বেচ্ছাচারী হতে পারেন না। সকল বিষয়ে যথেচ্ছ হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা রাখেন না। নতুন কোনো শাসনব্যবব্যবস্থা প্রণয়নের অধিকার রাখেন না। বরং শাসনব্যবব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে আল্লাহপ্রদত্ত আইনের ওপর। তবে নতুন কোনো বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহে পরিষ্কারভাবে কিছু বলা না থাকলে তখন শাসক সমাজের শ্রেষ্ঠ ও বিজ্ঞ লোকদের ইজতিহাদ ও মতামতের ভিত্তিতে এর ফয়সালা করবেন। (১২৯) আর শাসক বা খলিফা নির্বাচন করবেন উম্মতের শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধিবৃন্দ।

বর্তমান পৃথিবীতে শাসক বা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের যতগুলো পদ্ধতি প্রচলিত আছে, সকল পদ্ধতির চেয়ে মহান ও সুন্দর পদ্ধতি হলো ইসলামের এই শুরাব্যবব্যবস্থা, যার বাস্তব উদাহরণ আমরা খুলাফায়ে রাশেদিনের যুগে দেখতে পাই। যেমন দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-কে যখন ছুরিকাঘাত করা হয়, তিনি যখন মৃত্যুশয্যায়, সাহাবিগণ তার কাছে পরবর্তী শাসক হিসেবে কারও নাম ঘোষণা করে যাওয়ার অনুরোধ করলেন। তিনি সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে উম্মতের শ্রেষ্ঠ ছয়জন সাহাবির সমন্বয়ে একটি শুরা কমিটি গঠন করে দিলেন। এই ছয়জনের শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে সকল মুসলিম ছিলেন একমত। এখান থেকেই উমর রা. শুরা পদ্ধতির প্রচলন করেন। তিনি ঘোষণা করেন,

তোমরা এই ছয় সদস্যের ওপর আস্থা রাখো। এই ছয়জনের জন্য আল্লাহর রাসুল জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করেছেন। আর সাইদ ইবনে যায়দ রা.-ও জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্তদের একজন। তবে আমি তাকে এই শুরা বোর্ডে রাখছি না। সদস্য ছয়জন হলো: আবদে মানাফ বংশের আলি রা. ও উসমান রা.। আবদুর রহমান ইবনে আওফ রা. (আল্লাহর রাসুলের মামা) ও সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা.। আল্লাহর রাসুলের বিশিষ্ট সঙ্গী ও ফুফাতো ভাই যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা. ও তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা.। এই ছয়জন মিলে পরামর্শের ভিত্তিতে একজনকে শাসক হিসেবে নির্বাচন করবে। নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে তোমরা নবনির্বাচিত শাসককে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মেনে নেবে। যথাযথভাবে কর্তব্য পালনে তাকে সহায়তা করবে। তোমাদের কাউকে সে কোনো দায়িত্ব দিলে সুষ্ঠুভাবে সেই দায়িত্ব পালনের প্রয়াস করবে। (১৩০)

এরপর উমর রা. ইনতেকাল করেন। তার কাফন-দাফন সম্পন্ন করে ছয় সদস্যের শুরা বোর্ড বৈঠকে বসেন। তিন দিন পরামর্শ ও মতামত গ্রহণের পর সুষ্ঠুভাবে শুরা কার্যক্রম শেষ হয়। উসমান ইবনে আফফান রা.-কে পরবর্তী শাসক হিসেবে নির্বাচনের ব্যাপারে সকলেই একমত হন। পাঠক! জেনে আশ্চর্য হবেন যে উসমান রা.-এর হাতে প্রথম বাইআত গ্রহণকারী হলেন এ নির্বাচনে তার নিকটতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আলি ইবনে আবু তালিব রা.। ইসলামি শুরাব্যবব্যবস্থা যে সবচেয়ে উন্নত নির্বাচনব্যবব্যবস্থা তার অন্যতম প্রমাণ হলো উল্লিখিত ঘটনা। কারণ, শুরাব্যবব্যবস্থার মূলকথাই হলো নেতা নির্বাচনে জনগণের স্বাধীন মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন।

মদিনাবাসী উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর নিয়োগ করা এই ছয় সদস্যের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখেন। এ নির্বাচনব্যবব্যবস্থা উমরের পক্ষ থেকে জাতির ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া কোনো প্রক্রিয়া ছিল না। এরপর ছয়জন বিশিষ্ট সাহাবিও উসমান ইবনে আফফান রা.-কে খলিফা হিসেবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্তে পৌঁছান। জাতির কল্যাণার্থে তাদেরই একজনকে খলিফা হিসেবে নির্বাচন করার ব্যাপারে তারা একমত হন। আর উসমান রা.-কে নির্বাচিত করার ক্ষেত্রে তারা শুধু নিজেদের ঐকমত্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন এমনটি নয়, বরং এ ব্যাপারে তারা মদিনায় বসবাস করা প্রত্যেক বিচারক, সেনাপ্রধান ও বিশিষ্ট ব্যক্তির মতামতও গ্রহণ করেছিলেন।(১৩১) এ কারণেই আনসার ও মুহাজির নির্বিশেষে পুরো জাতি উসমান রা.-কে আমিরুল মুমিনিন হিসেবে নিঃসংকোচে মেনে নেন এবং তার হাতে বাইআত গ্রহণ করেন।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার, বর্তমান কালের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবব্যবস্থা ইসলামি শুরাব্যবব্যবস্থার সঙ্গে বিভিন্ন দিক থেকে সাংঘর্ষিক। কেননা গণতন্ত্রের মূলকথা হলো জনগনের জন্য জনগনের শাসন (For the people by the people)। অর্থাৎ জাতিই নির্ধারণ করবে জাতির শাসননীতি, সংবিধান। আর সেই শাসননীতির আদলেই পরিচালিত হবে শাসনব্যবব্যবস্থা। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় আইন প্রণয়ন ও তা বিধিবদ্ধ করার ক্ষমতা জনগণের ওপর ন্যস্ত করা হয়। রাষ্ট্রব্যাপী মতামত বা ভোটগ্রহণের মাধ্যমে কিছু ব্যক্তিকে নির্বাচন করা হয় যাদের হাতে থাকে ক্ষমতা ব্যবহারের অবাধ অধিকার। সবকিছু তারাই নিয়ন্ত্রণ করেন। রাষ্ট্রীয় কোনো আইন মুছে ফেলা বা যেকোনো নতুন আইন প্রণয়ন করার পূর্ণ ক্ষমতা রাখেন এই জনপ্রতিনিধিবৃন্দ। যেকোনো ঊর্ধ্বতন সরকারি দায়িত্বশীলকে বরখাস্ত করার, কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার এমনকি প্রেসিডেন্টকে পর্যন্ত জবাবদিহির সম্মুখীন করার ক্ষমতা তাদেরকে দেওয়া হয়। পক্ষান্তরে ইসলামি শুরাব্যবব্যবস্থা এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।

শুরাব্যবব্যবস্থা এক সুমহান সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যার সারমর্ম হলো, শাসনব্যবব্যবস্থা পরিচালিত হবে একমাত্র আল্লাহপ্রদত্ত বিধান অনুযায়ী, যা ওহির মাধ্যমে তিনি তাঁর রাসুলের ওপর অবতীর্ণ করেছেন।

যা মেনে চলা ঈমানের অন্যতম মৌলিক দাবি। এই প্রক্রিয়ার নির্বাচক হবেন কেবল ইসলামি স্কলারগণ (বিজ্ঞ আলেম সম্প্রদায়)। তাদের নেতৃত্বেই গঠিত হবে শুরা বোর্ড। আল্লাহর প্রণীত কোনো বিধান পরিবর্তনের অধিকার কোনো আলেমের নেই। শুরা বোর্ডের একমাত্র কাজ হলো কুরআন-সুন্নাহর আলোকে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া। রাসুলের রাজনৈতিক জীবনকে সামনে রেখে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করা।

প্রকৃত বাস্তবতা হলো, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবব্যবস্থায় নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি করা খুব সহজ। যেমন, কোনো দল পাঁচ বছর ক্ষমতায় থেকে একটি আইন প্রণয়ন করল। পরবর্তী সময় নতুন কোনো দল ক্ষমতায় বসে সেই আইনকে পুরোপুরি বিলুপ্ত ঘোষণা করে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী আইন পাস করে জনগণের ওপর চাপিয়ে দিলো। অপরদিকে শুরাব্যবব্যবস্থায় রাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য আল্লাহর। আল্লাহর প্রণীত বিধানের ওপর চলবে মানুষের সকল আচার-অনুষ্ঠান। সকল নিয়মের ওপর প্রাধান্য পাবে আল্লাহর বিধান। শুরাব্যবব্যবস্থা শুধু এই সুমহান দায়িত্বটুকু এমন সব উপযুক্ত ব্যক্তির কাঁধে তুলে দেবে, যারা আল্লাহর বিধানের ছায়াতলে জীবনযাপন করেন। নিষ্ঠার সঙ্গে আল্লাহকে ভয় করেন। (১৩২)

আরও একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার, ইসলামি শাসনব্যবব্যবস্থার আবির্ভাব ঘটেছে এমন এক যুগে, যখন পারস্য, রোম, হিন্দুস্তান ও চীনসহ পৃথিবীর সব দেশে প্রচলিত ছিল চরম স্বেচ্ছাচারিতা ও একনায়কতন্ত্র। এই শুরা পদ্ধতির সঙ্গে মানুষ পরিচিত ছিল না। এমনকি পৃথিবীতে গণতন্ত্রও আবিষ্কার হয়েছে ইসলাম আগমনের প্রায় বারোশ বছর পর ফ্রান্সে রাজতন্ত্র বিলুপ্তির পরবর্তী সময়ে। এ থেকেই প্রতীয়মান হয়, শুরাব্যবব্যবস্থা ছিল বিশ্বমানবতার কল্যাণে মুসলিমদের রেখে যাওয়া অসামান্য অবদানগুলোর একটি।

যাই হোক, ইসলামি সভ্যতার সবগুলো অবদানের আলোচনা ও পূর্ণ বিশ্লেষণ এই ছোট্ট পরিসরে করা সম্ভব নয়। যেগুলো উল্লেখ করলাম, বিশ্বমানবতার কল্যাণে মুসলিমজাতির অসামান্য অবদানগুলো বোঝার জন্য এটুকুই যথেষ্ট বলে আমি মনে করি।

টিকাঃ
১২২. কুরতুবি, আল-জামি‘উ লি-আহকামিল কুরআন, খ. ২, পৃ. ২৪৮-২৫২; ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আযিম, খ. ২, পৃ. ১৫০; কাসানি, বাদায়িউস সানায়ি, খ. ৭, পৃ. ১২; কারাফি, আয-যাখিরাহ, খ. ১০, পৃ. ৭৫-৭৬; ইমাম শাফিয়ি, আল-উম্ম, খ. ৫, পৃ. ১৬৮; ইবনে কুদামা, আশ-শারহুল কাবির, খ. ১১, পৃ. ৩৯৯।
১২৩. সুরা আলে-ইমরান : ১৫৯।
১২৪. জাফর ইবনে আবদুস সালাম, নিযামুদ দাওলাতি ফিল-ইসলামি ওয়া আলাকাতুহা বিদ-দুয়ালিল উখরা, পৃ. ১৯৯।
১২৫. মুসতাদরাকে হাকেম, কিতাবু মারিফাতিস সাহাবা রা., বাব: আবু বকর সিদ্দিক রা., হাদিস নং ৪৪৬৩।
১২৬. ফাতহিয়্যা নাবরাবি, তারিখুন নুযুমি ওয়াল-হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ২৪-২৫।
১২৭. ইমাম নববি, আল-মিনহাজ, খ. ১২, পৃ. ৭৭।
১২৮. ইবনে মাজাহ, কিতাবুল ফিতান, বাব: আস-সাওয়াদুল আযম, ৩৫৯০; তিরমিযি, ২১৬৭; আবু দাউদ, ৪২৫৩; আহমাদ, ২৭২৬৭।
১২৯. আবদুর রাযযাক সানহুরি, ফিকহুল খিলাফা, পৃ. ১২২-১২৩।
১৩০. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ৩, পৃ. ২৯৩।
১৩১. প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ৪২২।
১৩২. আহমাদ আহমাদ গুলুশ, আন-নিযামুস সিয়াসি ফিল-ইসলাম, পৃ. ৬১-৬৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00