📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 পরবর্তী খলিফা নির্বাচন

📄 পরবর্তী খলিফা নির্বাচন


পরবর্তী খলিফা নির্বাচন প্রক্রিয়া ইসলামি রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আধুনিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত। সূচনালগ্নে ইসলামি বিশ্ব যেরকম দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, একের পর এক দেশ বিজয়, নতুন নতুন সভ্যতার সঙ্গে পরিচয় ঘটছিল, নানা বর্ণের নানা জাতের নানা ভাষার মানুষ দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিচ্ছিল, তখন বাস্তবেই যোগ্য নেতৃত্ব গঠনের স্বার্থে এরকম নতুন ও আধুনিক ব্যবস্থা প্রণয়ন জরুরি হয়ে পড়েছিল।

'অলিয়ে আহদ' হলেন সেই ব্যক্তি, যাকে বর্তমান খলিফা বা শাসক তার মৃত্যুর পর শাসক হিসেবে নিযুক্ত করবেন। এরকম মনোনীত ব্যক্তি একজনও হতে পারেন, ক্রমান্বয়ে একাধিকও হতে পারেন। খলিফা কর্তৃক তার কোনো পুত্র অথবা পিতাকে পরবর্তী শাসক হিসেবে ঘোষণা করা অনেক ফিকহি মাযহাবেও স্বীকৃত। কারণ বর্তমান খলিফা হলেন আমিরুল মুমিনিন। তার আনুগত্য জনগণের ওপর ফরয। তিনি নিজে কাউকে খলিফা হিসেবে নিযুক্ত করলে অন্য কারও এখানে দ্বিমত করার অবকাশ থাকবে না। তার রেখে যাওয়া আমানতের ব্যাপারে কোনোপ্রকার অপবাদের সুযোগ থাকবে না। বিরুদ্ধাচরণ করার উপায় থাকবে না। (৪৮)

ولاية العهد বা পরবর্তী খলিফা নির্বাচন প্রক্রিয়ার উদ্ভাবক হলেন খলিফা মুআবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান রা. (মৃ. ৬০ হি.)। এটি ছিল তার 'ইজতিহাদি' উদ্ভাবন। এর পেছনে কারণও ছিল যথেষ্ট। কেননা পুত্র ইয়াযিদকে পরবর্তী খলিফা হিসেবে নিযুক্ত না করে গেলে রাষ্ট্রে গোলযোগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। ভয় ছিল যে, বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে গোটা রাষ্ট্র, পরবর্তী সময়ে যা পুরো মুসলিমজাতির জন্য সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে। কারণ তখন শামের অধিবাসী মুসলিম জনগোষ্ঠীই ছিলেন রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড এবং তারা ছিলেন খলিফা মুআবিয়া এবং তার পুত্র ইয়াযিদের সমর্থক। (৪৯)

বাস্তবতা হলো, পুত্র ইয়াযিদের বাইআতের জন্য মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান সকল অঞ্চলের নেতৃবৃন্দ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। শুধু তিনজন সাহাবি ও সাহাবিপুত্র এতে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন। (৫০) তবে এ ব্যাপারে তিনি ইজমায়ে উম্মত (সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত) অর্জনে সক্ষম হন। এর পেছনে তার মূল উদ্দেশ্য ছিল উম্মতকে বিরোধ, বিশৃঙ্খলা ও বিপর্যয় থেকে রক্ষা করা। আর এটাই ছিল তার কাছে সবকিছু থেকে অগ্রগণ্য।

যদিও মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রা.-এর হাতে ولاية العهد বা পরবর্তী খলিফা নির্বাচনব্যবস্থার গোড়াপত্তন হয়, তবে সেখানেও নতুন শাসকের জন্য বাইআত ব্যবস্থা বা জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সন্তুষ্টি ও আস্থা অর্জনের প্রক্রিয়া স্বমহিমায় বিদ্যমান ছিল। এ কারণেই মুআবিয়া থেকে শুরু করে পরবর্তী সকল উমাইয়া খলিফা শাসনকর্তার জন্য উন্নত চরিত্র ও অপরিহার্য সকল গুণের উপস্থিতিকে তারা জরুরি মনে করতেন। যাদের মাঝে এসব গুণ ও শর্ত অনুপস্থিত থাকত, তাদেরকে এড়িয়ে যেতেন। গুরুত্বপূর্ণ পদ প্রদানে তাদের বারণ করতেন। তাদের কাছে বাইআত গ্রহণ করতে মানুষও অনীহা প্রকাশ করত। এ কারণেই আমরা দেখতে পাই, খলিফা বা শাসকের মাঝে কী কী গুণ ও বৈশিষ্ট্য থাকা আবশ্যক, সেগুলো মুআবিয়া রা. আগেই সবিস্তারে বর্ণনা করে গেছেন। যেমন সত্যবাদিতা, বদান্যতা, সহনশীলতা, নিষ্কলুষতা, বীরত্ব। (৫১) পাশাপাশি সহিষ্ণুতা ও দানশীলতার গুণ থাকাও অপরিহার্য বলে মনে করতেন। কারণ সহিষ্ণুতা বিরোধিতা থেকে রক্ষা করবে। ঐক্যের পথ সুগম করবে। এ কারণেই তিনি ইয়াযিদকে বলতেন; পুত্র আমার! সহিষ্ণুতা অবলম্বন করলে কখনো অনুশোচনায় পড়তে হবে না তোমাকে। (৫২)

বড় পুত্রকেই পরবর্তী শাসক হিসেবে নিয়োগ করতে হবে এমন কোনো লিখিত নিয়ম ছিল না। তবে খলিফাগণ পুত্রদের মধ্যে সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিকেই পরবর্তী খলিফার পদের জন্য মনোনীত করতেন। আবার কখনো রাজপরিবারের বাইরের লোককেও পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনয়ন দিতেন।

যাই হোক, সকল খলিফাই ইসলামের মৌলিক আদর্শ প্রতিষ্ঠা ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সফল ছিলেন। ইয়াযিদ ইবনে মুআবিয়াই প্রথম তৎকালীন রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে অভিযান পরিচালনা করেন। যে অভিযানের ব্যাপারে স্বয়ং নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। সেই অভিযানে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধাদের তিনি প্রশংসা করে বলেছেন,
أَوَّلُ جَيْشٍ مِنْ أُمَّتِي يَغْزُوْنَ مَدِينَةَ قَيْصَرَ مَغْفُوْرٌ لَهُمْ

রোমসম্রাটের শহর অভিযানকারী আমার উম্মতের প্রথম সেনাবহর আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমাপ্রাপ্ত। (৫৩)

এ প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত একজন খলিফা হলেন আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান। তিনি উমাইয়া খিলাফত সাম্রাজ্যে দীর্ঘ ৬৫ হি. থেকে ৮৬ হি. পর্যন্ত শাসন করেন। ইসলামি রাষ্ট্র তার আমলে বিশাল বিস্তৃতি লাভ করে। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে ইসলাম। তার আমলে যথাক্রমে মাসলামা ইবনে আবদুল মালিক (৫৪) চীন বিজয় করেন। কুতাইবা ইবনে মুসলিম আল-বাহেলি (৫৫) সমরকন্দ ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলো বিজয় করেন। মুহাম্মাদ ইবনে কাসিম হিন্দুস্তান বিজয় করেন। মুসা ইবনে নুসাইর (৫৬) প্রথমে উত্তর আফ্রিকা ও পরে আন্দালুস বিজয় করেন। শুনে অবাক হতে হয়, উমাইয়া শাসনামলেই ইসলামের এত সব বিজয় সম্পন্ন হয়। ফলে এসব অঞ্চলের মানুষের মধ্যে দ্রুত ইসলামি সভ্যতা ছড়িয়ে পড়ে। (৫৭)

৯৯ হিজরিতে ইনতেকাল করা খলিফা সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিক পরবর্তী খলিফা হিসেবে উমর ইবনে আবদুল আযিযের (মৃ. ১০১ হি.) নাম ঘোষণা করেন। অথচ তখন পরবর্তী খলিফা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল তার ভাই হিশাম ইবনে আবদুল মালিকের (মৃ. ১২৬ হি.)। (৫৮) এ থেকেই বোঝা যায়, পরবর্তী খলিফা নির্বাচন নিজ পরিবার বা আপনজন থেকেই করতে হবে এরকম কোনো লিখিত নিয়ম ছিল না।

সেরকমই আরেকটি দৃষ্টান্ত আমরা দেখতে পাই আবদুর রহমান ইবনে মুআবিয়া আদ-দাখিলের (মৃ. ১৭২ হি.) ঘটনা থেকে। তার দুই পুত্র হিশাম ও সুলাইমান উভয়েই ছিলেন খলিফা হওয়ার যোগ্য আর সুলাইমান ভাইদের মধ্যে বড় ছিল। তৃতীয় পুত্র ও তাদের আরেক ভাই আবদুল্লাহকে তাদের মধ্যে খিলাফতের দায়িত্ব অর্পণে সালিস নির্ধারণ করেন। খলিফা আবদুর রহমান ছিলেন তখন মৃত্যুশয্যায়। পুত্র হিশাম তখন মারদা (৫৯) অঞ্চলের গভর্নর। অপর পুত্র সুলাইমান টলেডো (৬০) অঞ্চলের প্রশাসক। অন্তিম মুহূর্তে তিনি পুত্র আবদুল্লাহকে বললেন, তোমার দুই ভাইয়ের মধ্যে যে তোমার কাছে আগে এসে পৌঁছবে, তার হাতেই তুমি আংটি (সিল) ও নেতৃত্ব তুলে দেবে। হিশাম যদি আগে আসে তবে সে ধার্মিকতা ও সচ্চরিত্রে অতুলনীয়। সকলেই তাকে একবাক্যে মেনে নেবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর যদি সুলাইমান আগে আসে, তবে বয়সের দিক থেকে পরিণত হওয়ায় এবং শামবাসীদের কাছে জনপ্রিয় হওয়ায় সেও যথেষ্ট উপযুক্ত। এরপর সুলাইমানের আগে ছোট পুত্র হিশাম এসে কর্ডোভার নিকটবর্তী রাসাফায় অবতরণ করেন। ছোট ভাই আবদুল্লাহ কর্ডোভায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় তার ব্যাপারে হিশাম যথেষ্ট শঙ্কিত ছিলেন; কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে আবদুল্লাহ তার ভাই হিশামের কাছে ছুটে যান। পিতার ওসিয়তমতো হিশামের হাতে খিলাফত ও আংটি হস্তান্তর করে তাকে রাজপ্রাসাদে নিয়ে আসেন। (৬১)

এ থেকেই প্রতীয়মান হয়, স্পেনের খলিফা আবদুর রহমান আদ-দাখিল তার পুত্রদের মধ্যে সবচেয়ে যোগ্য ও উপযুক্ত ব্যক্তিকেই খলিফা হিসেবে মনোনীত করেন। তিনি জানতেন, তার পুত্রদের মধ্যে পরবর্তী খলিফা হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে হিশাম। কারণ খোদাভীতি, দক্ষতা, যোগ্যতা, প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে তার পারদর্শিতাসহ খলিফা হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সকল শর্তই তার মাঝে বিদ্যমান ছিল; কিন্তু তারপরও নিজ পুত্রদের মাঝে সংঘাত তৈরি হোক, খিলাফত নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হোক, এটা তিনি চাননি। কারণ প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বড় ছেলে সুলাইমানই পরবর্তী পদের অধিকারী হওয়ার কথা; কিন্তু সেই সংঘাত এড়াতে সুকৌশলে তিনি পুত্র আবদুল্লাহকে সঠিক নির্দেশনা প্রদান করেন। কর্ডোভায় যে আগে পৌঁছবে তার হাতেই খিলাফতের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেবে বলে পুত্র আবদুল্লাহকে ওসিয়ত করেন। এরপর আবদুর রহমান আদ-দাখিলের অনুমান সত্যি হয়। পুত্র হিশামই কর্ডোভায় আগে পৌঁছে যান। আর তিনিই ছিলেন পরবর্তী খলিফা হওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি।

কোনো সন্দেহ নেই, পরবর্তী খলিফা নির্বাচনব্যবস্থাটি ইসলামি সভ্যতায় একটি সুসংগঠিত ও বাস্তবিক প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। ইসলামি ভূখণ্ড যতই বিস্তৃত হয়েছে, ততই সেটি আরও জোরালোভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এর সবচেয়ে বড় সুফল ছিল উম্মত বা জাতি হিসেবে মুসলিমদের একতা সুরক্ষা, যা ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে উসমানীয় খিলাফতের পতনের আগ পর্যন্ত গোটা মুসলিমবিশ্বে বিদ্যমান ছিল।

টিকাঃ
৪৮. মাওয়ারদি, আল-আহকামুস সুলতানিয়‍্যা, পৃ. ১৩।
৪৯. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি, আদ-দাওলাতুল উমাবিয়‍্যা, খ. ১, পৃ. ৪৪৫।
৫০. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ৩, পৃ. ২৪৮। তারা হলেন, হুসাইন ইবনে আলি, আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর, আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর রা.।
৫১. নুওয়াইরি, নিহায়াতুল আরাব, খ. ৬, পৃ. ৪।
৫২. ইবনুত তিকতাকি, আল-ফাখারিয়্যু ফিল-আদাবিস সুলতানিয়্যা, পৃ. ১০৫।
৫৩. বুখারি: কিতাবুল জিহাদ ওয়াস-সিয়ার, বাব: মা কি-লা ফি কিতালির রুম, ২৭৬৬।
৫৪. মাসলামা ইবনে আবদুল মালিক (৬৬ হি.-১২০ হি./৬৮৫ খ্রি.-৭৩৮ খ্রি.)। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা দামেশকে। যুদ্ধবিষয়ক অনেক ঘটনা তার থেকে বর্ণিত রয়েছে। দেখুন, তাহযিবুল কামাল, খ. ২৭, পৃ. ৫২৩।
৫৫. কিংবদন্তি সেনানায়ক, সুমহান বীরপুরুষ তিনি। খাওয়ারিজম ও বুখারার মতো এলাকাগুলো তার হাতেই বিজিত হয়। এরপর ফারগানা ও তুর্কি দেশসমূহও মুসলিমদের করতলগত করেন তিনি। দেখুন, ইমাম যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ৪, পৃ. ৪১০।
৫৬. ৯৭ হিজরিতে ইনতেকাল করা এ সেনানায়কের বেড়ে ওঠা দামেশকে। খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক ৮৮ হিজরিতে তাকে উত্তর আফ্রিকার গভর্নর হিসেবে মনোনীত করেন। তারেক ইবনে যিয়াদের সঙ্গে মাত্র এক বছরের কম সময়ের মধ্যে তিনি স্পেন বিজয় সম্পন্ন করেন। তার ইনতেকাল হয় মদিনায়। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ৪, পৃ. ৪৯৬; ইবনে খাল্লিকান, ওফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৫, পৃ. ৩১৮।
৫৭. ইউসুফ আল কারযাবি, তারিখুনাল মুফতারা আলাইহি, পৃ. ৮২।
৫৮. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ৪, পৃ. ৭৪।
৫৯. ফিলিস্তিনের একটি শহর।
৬০. স্পেনের একটি প্রাচীন শহর।
৬১. ইবনে ইযারি, আল-বায়ানুল মুগরিব, খ. ২, পৃ. ৬১।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 জনগণের সঙ্গে শাসকের সম্পর্ক

📄 জনগণের সঙ্গে শাসকের সম্পর্ক


ইসলামি সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্বের আরেকটি কারণ হলো তা সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের মাঝে বৈষম্য দূর করতে সক্ষম হয়েছে। সমাজের সকল স্তরের মানুষের মাঝে এ ধারণা বদ্ধমূল করতে পেরেছে যে, তাদের ও শাসক শ্রেণির মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। বরং শাসকবর্গ তাদের সেবক ও হিতৈষী। একজন শাসক সচ্ছলতা ও বিপদের মুহূর্তে জনগণের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক অটুট রাখবেন সেই মহান শিক্ষা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে উম্মতকে শিখিয়ে গেছেন। মদিনায় হিজরতের পর ইসলামি রাষ্ট্রের সূচনালগ্নে 'মসজিদে নববি' নির্মাণের কাজে তিনি সাহাবিদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেন। সেই ঘটনার জীবন্ত বর্ণনা উরওয়া রা.-এর বিবৃতিতে উঠে এসেছে। তিনি বলেন, তখন আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে সাহাবিদের সঙ্গে ইট বহনের কাজে অংশ নেন। ইট বহনের সময় তিনি বলছিলেন,

هَذَا الْحِمَالُ لَا حِمَالَ خَيْبَرَ، هَذَا أَبَرُّ رَبَّنَا وَأَطْهَرُ

আজকের এই ইট বহনের কাজটি খাইবার অঞ্চলের সাধারণ ইট বহনের মতো কোনো কাজ নয়। বরং এটি আমাদের মহান প্রতিপালকের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য ও পবিত্র একটি কাজ। তিনি আরও বলছিলেন,

اللَّهُمَّ إِنَّ الْأَجْرَ أَجْرُ الْآخِرَةِ، فَارْحَمِ الْأَنْصَارَ وَالْمُهَاجِرَةَ

হে আল্লাহ, আখেরাতের পুরস্কারই শ্রেষ্ঠ ও বড় পুরস্কার। তাই আনসার ও মুহাজির সম্প্রদায়ের প্রতি আপনার দয়া অব্যাহত রাখুন। (৬২)

কঠিন বিপদের মুহূর্তেও সাথিদের সঙ্গে থেকে তিনি তাদের মনোবল বাড়ানোর কাজ করেন। তাদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন। খন্দক যুদ্ধে তিনি নিজে খননকাজে অংশ নেন। তখন তার মুখে উচ্চারিত হচ্ছিল ইবনে রাওয়াহার রচিত বিখ্যাত কাব্যমালা। তিনি মাটি অপসারণের কাজ করছিলেন। এমনকি কাজের চাপে তার পেটের সাদা অংশ মাটিতে লেপটে যায়। (৬৩) এ ধরনের স্বতঃস্ফূর্ততা ও নিরহংকারী চরিত্রের প্রভাব পড়ে সাহাবিদের মাঝে। যা ওই যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে তাদের ভেতর টনিকের মতো কাজ করে। তাদের সাহস ও মনোবল বাড়াতে তা বড় সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ফলে শত্রুদের পৌঁছার আগেই তারা সবরকম প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে সক্ষম হন। এই ঘটনা থেকে আমরা বুঝতে পারি, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন একজন আদর্শ সেনাপতি, জনগণের বিপদের সময় যিনি নিজেকে উজাড় করে দিয়ে তাদের সঙ্গে একই সারিতে কাজ করে তাদের দুঃখ-দুর্দশা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।

বিশ্বনবীর পর তাঁর প্রতিনিধি হওয়া খুলাফায়ে রাশেদিনের মাঝেও আমরা সেই আদর্শ ও চরিত্রের প্রতিবিম্ব লক্ষ করি। বিশ্বনবীর তখন ইনতেকাল হয়ে গেছে। মুসলিমদের শাসক তখন আবু বকর রা.। উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর ভাষায়, মদিনার উপকণ্ঠে বাস করত এক প্রতিবন্ধী বৃদ্ধা। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি, সেই অন্ধ বৃদ্ধার জন্য আমি পানির ব্যবস্থা করব। তার প্রয়োজন পূরণ করব। সেজন্য যখনই আমি তার কাছে আসতাম, দেখতাম আমার আগে কে যেন তার সকল প্রয়োজন পূরণ করে চলে গেছেন। প্রতিদিন আমার আগে কে এসে এই বৃদ্ধার প্রয়োজন পূরণ করে দেন তা দেখার জন্য একদিন আমি আগেভাগে এসে পাশের এক জায়গায় আত্মগোপন করে রইলাম। দেখি আবু বকর এসে বৃদ্ধার প্রয়োজন পূরণ করছেন। আর আবু বকর তখন আমিরুল মুমিনিন। তা দেখে উমর বলে উঠলেন, খোদার কসম! আপনিই তাহলে সেই লোক। (৬৪)

জনগণের জীবনযাত্রার উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য তারা ছিলেন সদা তৎপর। এমনকি যুদ্ধের ময়দানেও সাধারণ মানুষের প্রতি যত্ন ও তাদের কল্যাণের জন্য শাসকদের কী পরিমাণ মনোযোগ ছিল, নোমান ইবনে মুকরিন রা.-এর প্রতি উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর লেখা চিঠি থেকে এর প্রমাণ মেলে। চিঠির ভাষা ছিল এমন:

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। এটি আল্লাহর বান্দা আমিরুল মুমিনিন উমরের পক্ষ থেকে নোমান ইবনে মুকরিনের প্রতি। আসসালামু আলাইকুম। প্রথমে আমি আপনার কাছে আল্লাহর প্রশংসা শোনাচ্ছি। যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। পরকথা এই, নিহাওয়ান্দ শহরে বেশ কিছু অনারব জাতি-গোষ্ঠী আপনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সমবেত হয়েছে বলে আমি জানতে পেরেছি। আমার চিঠি পাওয়ামাত্রই আপনি আল্লাহর নাম নিয়ে রওয়ানা হয়ে যাবেন। আল্লাহর সাহায্য ও মদদ আপনার এবং আপনার সঙ্গে থাকা মুসলিমদের সাথে আছে। কোনো দুর্গম প্রান্তর বা গহিন অরণ্য দিয়ে যাবেন না। তাহলে সাধারণ মুসলিমদের কষ্ট হবে। তাদের অধিকার নষ্ট করবেন না, নয়তো প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। তাদের নিয়ে ঘন বৃক্ষলতায় ভরা জঙ্গলে প্রবেশ করবেন না। কারণ একজন মুসলিম আমার কাছে এক লক্ষ দিনারের চেয়েও বেশি মূল্যবান। আসসালামু আলাইকুম। (৬৫)

উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর অন্য একটি ঘটনায় বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। ১৭ হিজরির শেষ দিকে মদিনায় খাদ্যাভাব ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। সে বছর বৃষ্টিবাদল কম হওয়ায় মদিনার সকল ফসলি জমি ও চাষাবাদের ভূমি শুকিয়ে ফেটে যায়। তাবাকাতে ইবনে সাদ-এ উল্লেখিত আছে, সে বছর একবার উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর কাছে মাখন মেশানো রুটি আনা হলে তিনি একজন বেদুইনকে সঙ্গে নিয়ে খাবার খেতে বসেন। বেদুইন প্লেটের একপাশ থেকে বড় বড় লুকমায় দ্রুত রুটি খেতে থাকে। তা দেখে উমর রা. বললেন, তুমি দেখছি বড় বড় লুকমায় সব রুটি মুহূর্তেই সাবাড় করে ফেলছ! বেদুইন বলল, বহুদিন হলো তেল আর মাখন-চোখে পড়ে না। অনেক দিন ধরে কাউকে এসব খাবার খেতে দেখি না। এ ঘটনার পর উমর রা. শপথ করেন, যতদিন না মানুষের এই দুর্দশার পরিবর্তন হচ্ছে ততদিন কোনো মাখন বা মাংস তিনি স্পর্শ করবেন না।

উমর রা. ছিলেন একজন খাঁটি আরব। মাখন আর দুধই ছিল তার প্রথম পছন্দ। মানুষ দুর্ভিক্ষে পড়ায় এসব খাবার তিনি নিজের জন্য নিষিদ্ধ করে নেন। অনাহারে-অর্ধাহারে সে বছর তার গায়ের রং ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। এভাবেই তিনি জনগণের দুঃখ-দুর্দশা নিজের গায়ে সয়ে নিয়ে অন্যসব শাসকের জন্য শ্রেষ্ঠ উদাহরণ স্থাপন করেন। সন্ধ্যায় শুধু তেল মাখানো রুটি দিয়েই খাবার সারতেন। একদিন একটি উট জবাই করে গোশত পাকিয়ে মানুষকে খাওয়ানো হয়। তার সামনে সেই উটের কুঁজ ও কলিজার সামান্য অংশ নিয়ে আসা হলে তিনি জিজ্ঞেস করেন, এগুলো কীসের? সবাই বলল, হে আমিরুল মুমিনিন, আজ যে উট জবাই হয়েছে সেই উটের। তা শুনে তিনি বললেন, উঠিয়ে নাও, সরিয়ে নাও। আমি খাব নরম গোশত ও কলিজা আর মানুষ খাবে হাড্ডি, তা কখনো হবে না। এ খাবার সরিয়ে সাধারণ খাবার নিয়ে এসো আমার জন্য। এরপর রুটি আর তেল আনা হলে তিনি রুটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে তেলের সঙ্গে মাখিয়ে খেয়ে নেন। এরপর বললেন হে ইয়ারফা, এই খাবার তুমি 'ছামাগ' (৬৬) গ্রামে থাকা আমার পরিবারের লোকদের দিয়ে এসো। তিন দিন হলো তাদের জন্য আমি কোনো খাবার পাঠাতে পারিনি। মনে হয় তারা এবার পেট ভরে খেতে পারবে। এগুলো তাদের দিয়ে এসো। (৬৭)

জনগণের প্রতি মুসলিম শাসকদের দরদ কেমন ছিল তার আরেকটি উদাহরণ আব্বাসি খলিফা মুতাসিম বিল্লাহর (মৃ. ২২৭ হি.) অভিযান থেকে বোঝা যায়। রোমান সৈন্যবাহিনী একজন মুসলিম নারীকে বন্দি করলে সে চিৎকার করে সাহায্য চায়, হে মুতাসিম!! খলিফা মুতাসিমের কানে সে সংবাদ পৌঁছলে তিনি সিংহাসনে বসেই সেই আবেদনে সাড়া দেন, বলে ওঠেন, আমি প্রস্তুত, আমি প্রস্তুত। আর তৎক্ষণাৎ সিংহাসন ছেড়ে প্রাসাদে উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করেন, আন-নাফির, আন-নাফির। (যুদ্ধের ডাক এসেছে। বেরিয়ে পড়ো সবাই।) এরপর তিনি বাহনে উঠে জিজ্ঞেস করেন, রোমানদের সবচেয়ে শক্তিশালী ও দুর্ভেদ্য কেল্লা কোনটি? সবাই বলল, আম্মুরিয়ার দুর্গ। ইসলামের সূচনালগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত কেউ তাতে আক্রমণ করেনি। এটি খ্রিষ্টানদের মূল ভূমি। কনস্টান্টিনোপলের চেয়েও তাদের কাছে এটি বেশি পবিত্র। এরপর মুতাসিম যুদ্ধের জন্য এত বিপুল পরিমাণ সেনা, অস্ত্র, খাদ্য ও পানীয়সামগ্রী, প্রয়োজনীয় আসবাব প্রস্তুত করলেন, যা ইতিপূর্বে কোনো যুদ্ধের জন্য কোনো খলিফা করেননি। এরপর অভিযান শুরু করে ৬ রমযান (২২৩ হিজরি) তিনি সেই স্থানে পৌছেন। ৫৫ দিন সেখানে অবস্থান করে সকল বন্দিকে মুক্ত করেন। এরপর তারাসুস অভিমুখে রওয়ানা হন। (৬৮)

এগুলো মুসলিম শাসকদের থেকে সংঘটিত কাকতালীয় কোনো ঘটনা নয়, বরং যে নীতি আদর্শের সংস্পর্শে এসে তারা এসব ঘটনার জন্ম দিয়েছেন, সেই আদর্শের কেন্দ্রস্থল হচ্ছে ইসলামি সভ্যতা। পৃথিবীর ইতিহাসে যার কোনো জুড়ি নেই। খলিফা হিশামের সেনাপতি আল-হাজিব আল-মনসুর মাত্র তিনজন মুসলিম নারীকে উদ্ধার করতে বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে অভিযান চালান। এ তিন নারী স্পেনের বেস্কিউ রাজ্যে গির্জায় কারাবন্দি ছিল। একবার মনসুরের পক্ষ থেকে একজন রাজদূত সেই গির্জা পরিদর্শনে গেলে বহুদিনের কারাবন্দি এক নারীকে তার কাছে নিয়ে আসা হয়। এরপর ওই নারী দূতকে নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন, মনসুর কি শুধু নিজেই ভোগবিলাসে মত্ত থাকবে আর আমাদের দুঃখদুর্দশার কথা ভুলে যাবে? নিজে রাজকীয় পোশাক পরবে আর আমরা নোংরা পোশাকে অপবিত্র হয়ে দিনযাপন করব? আর কত বছর পর্যন্ত বিধর্মীদের এ কারাগারে আমাদের থাকতে হবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়ে। আল্লাহর নামের দোহাই দিয়ে তার কাছে আবেদন করেন, যেন সে তার এই গ্লানির জীবনের অবসান ও কষ্ট-যন্ত্রণাকর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের ব্যবস্থা করেন এবং এ মর্মে তার থেকে শক্ত শপথ ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে আশ্বস্ত হন। এরপর এই দূত মনসুরের কাছে গিয়ে যাবতীয় প্রয়োজনীয় বিষয় ও তথ্য তাকে অবহিত করেন। মনসুর তার কথা শেষ পর্যন্ত মন দিয়ে শোনেন। মনসুর আবার জিজ্ঞেস করেন, তোমার কাছে অস্বস্তিকর ঠেকেছে এরকম কিছু দেখেছ সেখানে? নাকি তেমন কিছু তুমি সেখানে পাওনি! এরপর দূত মনসুরকে ওই নারীর ঘটনা ও তাকে দেওয়া অঙ্গীকার সম্পর্কে অবহিত করেন। বন্দি নারীর সকল অভিযোগ ও শপথবাক্য হুবহু মনসুরের সামনে উপস্থাপন করেন। তা শুনে মনসুর দূতকে তিরস্কার করে বলেন, এ কথা তুমি প্রথমেই বলোনি কেন?! এরপর মনসুর ওই নারীসহ সকল মুসলিম নারীকে উদ্ধার করতে বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করেন।(৬৯)

ইসলামি সভ্যতার ইতিহাসে এমনই ছিল শাসকদের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক। যে সম্পর্কের ভিত্তি ছিল সহানুভূতি, দয়া, উপকার সাধন ও আন্তরিকভাবে জনগণের কল্যাণে নিবেদিত হওয়া। ক্ষমতার লোভ বা কোনো স্বার্থ হাসিলের জন্য নয়।

টিকাঃ
৬২. বুখারি, ৪১৮; মুসলিম, ৫২৪।
৬৩. ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৪৯৫। ইবনে কাসির, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩০৬; সুহাইলি, আর-রওযুল উনুফ, খ. ২, পৃ. ৩৩৬।
৬৪. সুয়ুতি, তারিখুল খুলাফা, খ. ১, পৃ. ৭৪।
৬৫. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ২, পৃ. ৩৬৫।
৬৬. মদিনার নিকটবর্তী এক জায়গার নাম।
৬৭. ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, খ. ৩, পৃ. ৩১২।
৬৮. ইবনুল আসির, আল-কামিল ফিত-তারিখ, খ. ৬, পৃ. ৪৫।
৬৯. মাক্কারি, নাফহুত তিব, খ. ১, পৃ. ৪০৪।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 শাসনব্যবস্থায় মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান

📄 শাসনব্যবস্থায় মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান


ইসলামি সভ্যতা যুগ যুগ ধরে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে গমন করলেও মুসলিম স্কলারগণ হাত গুটিয়ে বসে থাকেননি। আর তাই তাদের লেখা অসংখ্য বইপুস্তক আমরা দেখতে পাই যার মাধ্যমে তারা ইসলামি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিষয়কে আরও সুসংহত ও সমৃদ্ধ করতে বিপুল অবদান রেখে গেছেন। এসব রচনাসম্ভার মূলত তাদের প্রশাসনিক অবস্থার বাস্তব বিবরণ আমাদের সামনে তুলে ধরে। চোখে আঙুল দিয়ে শাসকদের নেতিবাচক দিকগুলো দেখিয়ে সংশোধনের পথ বাতলে দেয়।

এ কারণেই ইসলামি সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই মুসলিম মনীষীগণ বইপুস্তক রচনার গুরুত্ব অনুধাবন করেন। ইসলামি রাজনৈতিক বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গন এবং বাস্তব প্রেক্ষাপটের সঙ্গে এর সম্পর্কের কথা যাদের লেখনীতে উঠে এসেছে তাদের অন্যতম হলেন বিখ্যাত ফিকহ বিশারদ আবু ইউসুফ রহ.(৭০)। তিনি ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর শিষ্য। الخراج আল-খারাজ গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি শাসক ও জনগণের মাঝে কীরকম সম্পর্ক থাকবে এ বিষয়ে সাধারণ ইজতিহাদের গণ্ডি পেরিয়ে বেশ কিছু গঠনমূলক নির্দেশনা প্রদান করেন। ইমামের পূর্ণ আনুগত্যের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। বেশ কিছু হাদিস উল্লেখ করে তিনি তার বক্তব্যের পক্ষে প্রমাণ পেশ করেন। এর মধ্যে একটি হাদিস হলো:

إِنْ أُمَّرَ عَلَيْكُمْ عَبْدُ حَبْشِيٌّ مُجَدَّعُ فَاسْمَعُوْا لَهُ وَأَطِيعُوا»

নাক/কান কাটা একজন হাবশিকেও যদি তোমাদের নেতা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়, তবুও তোমরা তার কথা শোনো। তার আদেশ মেনে চলো। (৭১)

এরপর হাসান বসরি রহ.-এর একটি বক্তব্য উল্লেখ করে এ বিষয়টি আরও জোরালো করে তোলেন, তোমরা শাসকদের নিন্দা করো না। ভালো কাজ করলে তারা পুরস্কার পাবে, আর তোমরা তাদের কৃতজ্ঞতা জানাবে। মন্দ কাজ করলে এর বোঝা তাকেই বহন করতে হবে, আর তোমরা শুধু ধৈর্য ধারণ করবে। (৭২)

আবু ইউসুফ রহ. আরও বলেন, একজন শাসকের উচিত জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া। জনগণের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা। তাদের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা। তিনি তার বক্তব্যের সমর্থনে একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। একবার আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-কে উপদেশ দিতে এসে এক ব্যক্তি বলল, اتق الله-আল্লাহকে ভয় করুন। মজলিসে উপস্থিত একজন ব্যক্তিটির স্পর্ধা দেখে তাকে ধমক দিলে উমর রা. তাকে বললেন, জনগণ যদি আমাদের কিছু না বলতে আসে তাহলে এ ধরনের জনগণের মাঝে কোনো কল্যাণ নেই। আর আমরা যদি তাদের মতামত না শুনি, তাহলে আমাদের মাঝেও কোনো কল্যাণ নেই। (৭৩)

এর দ্বারা বোঝা যায়, ইসলামি রাজনীতির বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে উন্নতি ও অগ্রগতির প্রধান সূত্র হলো হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তবে যাই হোক, এটি হলো মতামত গ্রহণ ও উপদেশ প্রদানের আদলে রাজনৈতিক বিষয়ের একেবারে প্রাথমিক পদক্ষেপ। (৭৪)

এ কারণেই আমরা লক্ষ করি, হিজরি ৩য় শতকের গোড়া থেকেই লেখালেখি ও রচনা তৈরি রাজনীতিকে উন্নত ও সমৃদ্ধিশালী করার একমাত্র উপকরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। সে সময় ইবনে কুতাইবা আদ- দিনাওয়ারি তার বিখ্যাত গ্রন্থ আল-ইমামাতু ওয়াস-সিয়াসাতু রচনা করেন। বইয়ের এই শিরোনামটিই সেই শতাব্দীতে নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক ইস্যুতে মুসলিম মনীষীদের গভীর জ্ঞানের পরিচয় দেওয়ার জন্য যথেষ্ট বলে আমরা মনে করি। ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই রাজনীতিকে মুসলিমগণ কেমন গুরুত্বের সঙ্গে নিতেন এবং তারা কীরকম দক্ষ ও অভিজ্ঞ রাজনীতিক উপহার দিয়েছিলেন এই বইয়ে তার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় এবং পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় যে ইসলাম শুধু ভ্রাতৃত্ব ও উদারতার ধর্ম নয়, রাজনীতি ও নেতৃত্বেরও ধর্ম।

ইবনে কুতাইবা গ্রন্থের সূচনা করেন ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর রা.-এর খিলাফত ইস্যু দিয়ে। আর ইতি টানেন খলিফা মামুনের বিবরণ দিয়ে। প্রত্যেক খলিফার বৃত্তান্ত ও খলিফাকেন্দ্রিক বর্ণনাগুলো পৃথকভাবে উল্লেখ করার মধ্য দিয়ে বইয়ের বিন্যাস ঘটান। যেসব ইতিহাসগ্রন্থে লেখকের কোনো সংযোজন ছাড়া শুধু রেওয়ায়েত বা বর্ণনাকারীদের বিবৃতি সংকলন করা হয় এটি সেরকমই একটি বই। অনেকটা তারিখে তবারি এবং সিরাতে ইবনে হিশাম-এর মতো।

এর পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী দুই শতকে লেখা রাজনীতিকেন্দ্রিক বই বিশেষত খিলাফত ও খলিফাদের নিয়ে লেখা রচনাসমূহ আরও উন্নত ও পরিপক্ব চিন্তাধারার প্রকাশ ঘটিয়েছে। খিলাফত ও শাসনব্যবস্থা বিষয়ক স্বনামধন্য লেখক ইমাম মাওয়ারদি রহ.-এর লেখা আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা ওয়াল-বিলায়াতু দ্বীনিয়া (الأحكام السلطانية والولايات الدينية ) বইটি সে কালের খুবই গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ বলে বিবেচিত হতো। বইটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও বাস্তবিক উভয় ক্ষেত্রেই সমান তাৎপর্যপূর্ণ বলে অভিহিত হয়। এ ছাড়াও ইমাম মাওয়ারদির সমকালীন আরও অনেকের লেখা এ বিষয়ে আলো ছড়িয়েছে। যেমন হেলাল ইবনে মুহসিন আস-সাবির (৭৫) লেখা রুসুমুল খিলাফা। তবে এ বইটি এত গভীরভাবে বিশ্লেষণে যেতে পারেনি। আরও পরিষ্কার করে বললে একটি ইসলামি সমাজকে সুনিপুণভাবে নেতৃত্ব দেওয়া এবং উন্নতি ও অগ্রগতির শিখরে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যেসব উপায়-উপকরণের বর্ণনা ইমাম মাওয়ারদির লেখায় পাওয়া যায়, সেরকমটি রুসুমুল খিলাফাতে পাওয়া যায়নি।

মোটকথা, স্বসময়ে প্রধান বিচারপতির পদে দায়িত্বরত মাওয়ারদি নামের এই মহান পুরুষ তৎকালীন আব্বাসীয় খলিফা আল-কায়েম বি- আমরিল্লাহর একান্ত কাছের লোক ছিলেন। খলিফা ও বুওয়াই সাম্রাজ্যের (Buyid Dynasty) মাঝে দূত হিসেবে কাজ করতেন। ফলে রাজনৈতিক পটভূমিতে বহু দিনের কাজের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে তিনি তার অনবদ্য আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা ওয়াল-বিলায়াতুদ দ্বীনিয়্যা গ্রন্থটি রচনার ইচ্ছা করেন।

চিত্র নং-১ মাওয়ারদি রচিত 'আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা'

এ গ্রন্থে খিলাফত ও রাজনীতি সংক্রান্ত সকল কিছুর বিস্তারিত বিবরণ ও বিধি উল্লেখ করেন। নেতা নির্বাচন থেকে শুরু করে অপরাধ ও ফৌজদারি বিধির সকল আইনকানুন সুস্পষ্টরূপে বিবৃত করেন। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিয়োগ পাওয়া প্রতিটি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিশেষ দায়িত্ব ও কর্তব্য তাতে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে উল্লেখ করেন। কারণ রাজনৈতিক এসব পদে কর্মরত মানুষগুলোই পুরো মুসলিমজাতির জন্য মেরুদণ্ডের মতো।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ইমাম মারওয়ারদি বলেন, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা মূলত নেতা, শাসক ও গভর্নরদের উদ্দেশ্যে লেখা। এ বইটি অধ্যয়ন করলে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রণকারী এ শ্রেণি অনেক রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান খুঁজে পাবে। রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা বিশেষভাবে সেখানে উল্লেখ করেছি। যেন ইসলামি আইনবিদগণ এ বই থেকে উপকৃত হতে পারেন এবং যে বিষয়গুলো আমি এতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারিনি, সেগুলো রচনার কাজে হাত দিতে পারেন। এ বই লেখার পেছনে আমার উদ্দেশ্য ছিল শাসকশ্রেণি যেন বইটি পড়ে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠায় মনোযোগ দেন। ইনসাফ কায়েম বা সুচারুরূপে বিচারকার্য সম্পাদনে আত্মনিয়োগ করেন। (৭৬)

তবে যাইহোক, মাওয়ারদি রহ. খিলাফত ও ইমামতকে একই অর্থে নিয়ে এর সংজ্ঞা করেছেন এভাবে,

«الإمامة موضوعة لخلافة النبوة في حراسة الدين وسياسة الدنيا، وعقدها لمن يقوم بها في الأمة واجب بالإجماع»

ইমামত (ইসলামি শাসক নির্ধারণ প্রক্রিয়া) প্রতিষ্ঠা হয়েছে নবুয়তের প্রতিনিধি হিসেবে দ্বীনের সুরক্ষা এবং ভূপৃষ্ঠের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে। আর এ মহান দায়িত্ব যে ব্যক্তি ভালোভাবে পালন করতে পারে তাকে নেতা হিসেবে মেনে নেওয়ার লক্ষ্যে ইমাম বা খলিফা নির্ধারণ করা ওয়াজিব। (৭৭)

উম্মতের মহান আইনবিদগণ খিলাফতের যেসব সংজ্ঞা ও শর্ত উল্লেখ করেছেন, তাদের সুরে সুর মিলিয়ে একজন নির্ভেজাল আইনজ্ঞের মতো তিনিও খিলাফত প্রতিষ্ঠার বিষয়কে ইজমায়ে উম্মতের (সকল মুসলিম স্কলারদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের) ভিত্তিতে ওয়াজিব হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে এখানে তিনি পরিষ্কারভাবে খিলাফত শব্দের উল্লেখ করেননি। কারণ ওই সময় প্রকৃত অর্থে খিলাফতের পটভূমি অবশিষ্ট ছিল না। শুরা পদ্ধতির বদলে তখন প্রচলিত ছিল বাইআত ও বংশানুক্রমিক ইমাম নির্বাচন প্রক্রিয়া।

এখানে মাওয়ারদির বিশ্লেষণ কয়েকটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে আবির্ভূত। সবগুলোকে সমন্বয় করলে সারকথা এই দাঁড়ায় যে, ইমামত বা শাসক নির্বাচন শুধু যুক্তির নিরিখে নয়, বরং শরিয়তের ভিত্তিতে ওয়াজিব। আর সেটি হবে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। শাসক নির্বাচনে প্রস্তাবিত ব্যক্তিবর্গ অবশ্যই কুরাইশ বংশের হবেন। সামসময়িক সকল ধর্মীয় নেতা এবং ইজতিহাদের স্তরে উপনীত সকল আইনজ্ঞ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার হাতে বাইআত গ্রহণ করবেন। মাওয়ারদির বক্তব্য থেকে আরও স্পষ্ট, তুলনামূলক কম মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তিকেও ইমাম হিসেবে নির্বাচন করা যাবে। তাই বলে একসঙ্গে দুজনকে শাসক বানানো যাবে না। পরবর্তী শাসনকর্তা হিসেবে মনোনীত ব্যক্তি বা যুবরাজ ইচ্ছা করলে যুবরাজ হিসেবে নির্ধারিত অন্য ব্যক্তিদেরকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতে পারবেন। তবে এটি ছিল নিছক মাওয়ারদির ইজতেহাদপ্রসূত মত। ইমাম শাফিয়ি রহ.-এর মতও এরূপ বলে তিনি দাবি করেন। (৭৮)

ইসলামি রাজনৈতিক ইস্যুতে লেখা আরও একটি বিখ্যাত গ্রন্থ হলো আবু বকর আত-তারতুশি(৭৯) রচিত 'সিরাজুল মুলুক'। এই স্থূলকায় গ্রন্থে তিনি একাধারে আরব, পারস্য, রোম, হিন্দুস্তান, সিন্ধু এলাকা এবং হিন্দ- সিন্ধের সমন্বিত নৃগোষ্ঠীর রাজনৈতিক সৌন্দর্যের দিকগুলো নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন। মূলত এ গ্রন্থটি তিনি লেখেন মিশরের নবনিযুক্ত উযির মামুন বাতাইহির(৮০) উদ্দেশ্যে। এর পেছনে তার লক্ষ্য ছিল, হক প্রতিষ্ঠায় মামুনকে উদ্বুদ্ধ করা। শরিয়তের প্রতি তাকে অনুগতরূপে গড়ে তোলা। আহলে সুন্নাতের মাযহাবগুলোর প্রতি তাকে শ্রদ্ধাশীল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। কারণ এর আগে মামুন ছিলেন মিশরের শিয়া ফাতেমি সাম্রাজ্যের অন্যতম উযির।

সিরাজুল মুলুক গ্রন্থটি চৌষট্টি পরিচ্ছেদে বিভক্ত। এতে বিবৃত হয়েছে রাজনীতি, শাসনবিধি, মানবাধিকার রক্ষা নীতি, একজন রাষ্ট্রনায়কের জন্য অপরিহার্য গুণাবলি, সুলতানের বৈশিষ্ট্য, রাজ্য সুরক্ষার কৌশল, রাষ্ট্রকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যাওয়ার সব নীতিমালা। স্থান পেয়েছে রাষ্ট্রনায়ক অবিচার ও স্বেচ্ছাচারে লিপ্ত হলে জনগণের করণীয়, সৈনিক ও যোদ্ধাদের সঙ্গে রাষ্ট্রনায়কের সম্পর্ক ও তাদের সঙ্গে আচরণ, রাজস্ব উত্তোলন ও অর্থ ব্যয়সহ রাজনৈতিক নানা বিষয়। তা ছাড়াও এই গ্রন্থে তিনি মন্ত্রীদের সম্পর্কে বলেছেন। উযিরদের বৈশিষ্ট্য ও নীতির কথা উল্লেখ করেছেন। রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি হিসেবে পরামর্শ ও উপদেশদানের মতো উন্নত গুণাবলি ধারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে একজন সুলতান কীভাবে এবং কতটুকু হস্তক্ষেপ করতে পারবেন তার বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। শহরে-নগরে নিয়োগকৃত সরকারি কার্যনির্বাহী ও কর্মচারীদের প্রতি সুলতান কীরূপ নীতি অবলম্বন করবেন সেই বিষয়গুলোও তিনি স্পষ্ট করেছেন। তা ছাড়া জিম্মির (ভিসা বা অনুমোদন নিয়ে মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাসরত অমুসলিম) প্রতি সরকারের আচরণ এবং এ সংক্রান্ত নীতিমালা তিনি সবিস্তারে উল্লেখ করেছেন। যুদ্ধবিষয়ক নিয়মনীতি ও কলাকৌশলের কথাও বিখ্যাত এ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে।

অপরদিকে ৫৮৯ হিজরিতে ইনতেকাল করা স্বনামধন্য আইনবিশারদ আবদুর রহমান ইবনে আবদুল্লাহ শাইযারি রহ. আল-মানহাজুল মাসলুক ফি সিয়াসাতিল মুলুক রচনা করেন। এ গ্রন্থ লেখার পেছনে তার লক্ষ্য ছিল, গল্প ও নানা ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনার ছলে সুলতান সালাহুদ্দিন ইবনে আইয়ুবকে রাজনৈতিক উপদেশ ও দিক-নির্দেশনা প্রদান করা।

পূর্ববর্তী শাসকদের অবস্থা বর্ণনা করে সেখান থেকে সারনির্যাস বের করে তাকে শিক্ষা গ্রহণের পথ বলে দেওয়া। এ কারনেই গ্রন্থের শুরুতে কিতাব লেখার নেপথ্য কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, সালাহুদ্দিনের জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ করতে আমি এ গ্রন্থ রচনা করেছি। এতে বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের কথা, সাহিত্যের মণিমুক্তা, রাজনৈতিক ও মানবাধিকার রক্ষার মূলনীতি লিপিবদ্ধ আছে। রাজ্যের ভিত্তি মজবুত করা এবং জনগণের মাঝে শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার কৌশলও এতে বিবৃত হয়েছে। যুদ্ধলব্ধ সম্পদ অর্জন এবং সৈনিকদের মাঝে এর সুষম বণ্টন পদ্ধতি, সেনাবাহিনীর ওপর জিহাদ সংক্রান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা সংযোজন করেছি। তা ছাড়া রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভালো ও মন্দ চরিত্রের দিকগুলো উল্লেখ করেছি। রাষ্ট্র পরিচালনায় মাশওয়ারা বা পরামর্শের গুরুত্ব, মাশওয়ারায় উৎসাহ প্রদান, শত্রুদের মোকাবেলা, সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি বিষয়গুলো সবিস্তারে উল্লেখ করেছি। এর জন্য প্রয়োজনীয় উদাহরণ, ঘটনা, যুক্তি, প্রমাণ সবকিছু বর্ণনা করেছি। (৮১) কোনো সন্দেহ নেই, সালাহুদ্দিনের মতো একজন দূরদর্শী ও বিখ্যাত রাষ্ট্রনায়ক সবসময় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে নিতেন। এ কারনেই জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দীক্ষা নিয়ে এবং পূর্ববর্তী খলিফা ও শাসকদের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি রচনা করেন একের পর এক বিজয়ের উপাখ্যান। রাষ্ট্রকে উন্নীত করেন সমকালীন সকল সাম্রাজ্যের ঊর্ধ্বে।

উক্ত গ্রন্থে স্বরাষ্ট্রীয় ও পররাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক ইস্যুকে ভূরাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে সাব্যস্ত করা হয়েছে। এজন্য সুলতানমাত্রই জনগণের সঙ্গে বসার ও তাদের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার ওপর জোর তাগিদ প্রদান করা হয়েছে। গ্রন্থে লেখক বলেন, জেনে রাখা দরকার, রাষ্ট্রনায়ককে সময় বের করে বসতে হবে। নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বাদী-বিবাদীর মাঝে নিষ্পত্তি বিধান করতে হবে। এগুলো ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। তা না করলে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় থাকবে না। সুষম বিচার সম্পন্ন করা সম্ভব হয়ে উঠবে না। (৮২) রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সফলতা ও ব্যর্থতার কারণ স্পষ্ট করতে গিয়ে সালাহুদ্দিনের উদ্দেশ্যে বইতে তিনি লেখেন, তিন কারণে রাষ্ট্র ধ্বংস ও অধঃপতনের দিকে যায়: প্রথম কারণটি রাষ্ট্রনায়ককেন্দ্রিক। আর সেটি হলো, শাসকের মনোবৃত্তি যদি তার বুদ্ধি বিবেচনাকে ছাপিয়ে যায়। তাহলে ভোগের সুযোগ আসামাত্রই সে তা লুফে নেবে। খুঁজবে শুধু আরাম-আয়েশ ও বিলাসিতার সকল উপায়-উপকরণ। দ্বিতীয় কারণটি হলো মন্ত্রিপরিষদ-কেন্দ্রিক। আর তা হলো নিজের মতের বিরুদ্ধে হলেই প্রতিহিংসা-প্রবণতা। এ ধরনের পরিস্থিতিতে তাদের মাঝে সবসময় মনোমালিন্য ঘটবে। ফলে তৈরি হবে বিভেদ। তৃতীয় কারণটি হলো, সেনাবাহিনী ও শাসকের একান্ত সহযোগীকেন্দ্রিক। আর তা হলো, জিহাদের চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে বরফের মতো জমে বসে থাকা। জিহাদের জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ না করে অস্ত্রের প্রয়োগ ছাড়া শান্তির পথ তালাশ করা। (৮৩)

তকিউদ্দিন ইবনে তাইমিয়া(৮৪) রহ. রচিত আস-সিয়াসাতুশ শারয়িয়‍্যা ফি ইসলাহির রায়ি ওয়ার-রায়িয়‍্যাহ গ্রন্থটিও ইসলামি রাজনীতির বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসূত্র হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ইবনে তাইমিয়া রহ. তার এ গ্রন্থে পরিষ্কার করে বলেছেন, বর্তমান সময়ে মুসলিমদের পিছিয়ে পড়া, তাদের রাষ্ট্রগুলো হাতছাড়া হওয়া এবং শত্রুদের হামলার কেন্দ্রস্থল হওয়ার একমাত্র কারণ শাসকদের স্বেচ্ছাচারিতা, নৈরাজ্য এবং আল্লাহর বিধান থেকে তাদের দূরে সরে যাওয়া। যার ব্যাপ্তি মুসলিম জনসাধারণকেও গ্রাস করে ছেড়েছে। শাসনযন্ত্র ও শাসকশ্রেণির বিনষ্টতাকে কেন্দ্র করে মূলত প্রধান দুটি নির্দেশনা নিয়ে তার এ বইটি রচিত। এর মধ্যে একটি হলো, যথাযথভাবে অর্থব্যয় নিশ্চিত করা এবং আমানত ও দায়িত্ব সুষ্ঠুরূপে আদায় করা। দ্বিতীয়টি হলো, সবকিছুতে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা এবং মানুষের সকল অধিকার রক্ষা করা। দ্বিতীয় ইস্যুর আলোচনা করতে গিয়ে তিনি একজন শাসকের চরিত্রের উত্তম দিকগুলো টেনে এনেছেন। শাসক ও শাসিত সকলকেই নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। যার ফলে নবীন ও প্রবীণ গবেষক মহলে বইটি বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। (৮৫)

ইসলামি রাজনীতির বিষয়ে উন্নত লেখনী বেরিয়ে এসেছে ইবনে খালদুনের হাত থেকেও। বিখ্যাত আল-মুকাদ্দিমায় তিনি রাজনীতির সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক এবং সমাজের সকল শ্রেণি ও দলকে একটি সংঘে পরিণত করার পদ্ধতি ও কৌশলগুলো স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ গ্রন্থে তিনি সমাজের শুধু একটি শ্রেণির বিবরণ ও তাদের সমস্যার কথা বর্ণনা করেননি, বরং সমাজের শহুরে ও গ্রাম্য উভয় শ্রেণির স্বাতন্ত্র্য বর্ণনা করে উভয় শ্রেণির সমস্যার সমাধানের পথ বর্ণনা করেন। ইবনে খালদুনের মতো জগদ্বিখ্যাত লেখকের শুধু এ গ্রন্থেই নয়, বরং তার লেখা সব পুস্তকেই তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার প্রমাণ পাওয়া যায়। এর চমৎকার একটি উদাহরণ হলো, খিলাফত ও ইমামতকে তিনি যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন। তিনি বলেন, খিলাফত হলো দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণার্থে শরিয়তের দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী সকল কিছু বিধান করা। অর্থাৎ আখেরাতের ভালোমন্দ পরিণামের কথা বিবেচনা করে জাগতিক সকল সমস্যার সমাধান শরিয়তের মাধ্যমেই সমাধান করতে হবে। আরেকটু পরিষ্কার করে বলতে গেলে, এক কথায় শরিয়তের বিধিবিধানের ওপর ভিত্তি করে ধর্মের সুরক্ষা এবং ভূ-রাজনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করার নাম হচ্ছে খিলাফত। (৮৬)

তবে খিলাফত ও রাজত্বের মাঝে পার্থক্য করেছেন ইবনে খালদুন। তিনি বলেন, রাজত্বের মূল হলো কিছু রাজনৈতিক বিধিনিষেধ, যেগুলো জনসাধারণ একবাক্যে মেনে নেয় এবং পালন করতে বাধ্য থাকে। এবার এই বিধানগুলো যদি রাষ্ট্রের বিজ্ঞ আইনবিদ ও দূরদর্শী শ্রেণির দ্বারা স্বীকৃত হয়, তবে তা হবে বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনীতি। আর যদি আল্লাহর নাযিল করা কুরআন এবং রাসুলের রেখে যাওয়া সুন্নাহ কর্তৃক স্বীকৃত হয়, তবে সেটি হবে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণবাহী ধর্মীয় রাজনীতি বা খিলাফত। (৮৭)

রাজনৈতিক বিষয়ে মুসলিম লেখকদের অবদান সংক্রান্ত আলোচনা শেষ করার আগে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। সেটি হলো, এ সংক্রান্ত সকল গ্রন্থে লেখকগণ কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসুলের দেখানো পথ অবলম্বন করেছেন। কুরআন-সুন্নাহ থেকে দিক-নির্দেশনা প্রদান করেছেন। নিছক শাসকশ্রেণির তোষামোদ পেতে এবং তাদের প্রিয়পাত্র হতে তাদের সঙ্গে দুর্নীতি ও অবিচারের পাল্লা ভারী না করে, বরং সবসময় কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসুলের দিকে ফিরে আসার প্রতি তাদের আহ্বান জানিয়েছেন। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল যুগেই প্রায় সকল মুসলিম লেখক একই পথ অনুসরণ করেছেন। তবে তাদের বর্ণনা ও উপস্থাপনভঙ্গিতে বৈচিত্র্য ছিল। পরবর্তীকালের লেখকদের লেখনীতে অনেক নতুন নতুন বিষয়ের আলোচনা ও প্রস্তাবনা ছিল।

কারণ এ সংক্রান্ত অধিকাংশ গ্রন্থ লেখার পেছনে তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা এবং খ্যাতিমান এ আইন বিশারদদের যুগে ইসলামি সভ্যতা বিনির্মাণের পথ সুগম করা। রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে লেখা মুসলিম লেখকদের গ্রন্থগুলোর সঙ্গে পশ্চিমা লেখকদের বইগুলোর তুলনা করলেই তাদের ও মুসলিম লেখকদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপের নবজাগরণের যুগে রাজনীতি বিষয়ে লেখা নিকোলা ম্যাকিয়াভেলির (৮৮) বিখ্যাত গ্রন্থ দা প্রিন্স সংকলনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল ইতালির একটি শহরের জনৈক শাসকের কৃপাদৃষ্টি লাভ করা। একজন শাসক কীভাবে তার সমকক্ষদের সামলাবেন তার বিবরণ তিনি এ গ্রন্থে দিয়েছেন। তার প্রধান রাজনৈতিক দর্শন ছিল 'লক্ষ্য ভালো হলে যেকোনো পদ্ধতি অবলম্বন করতে দোষ নেই'। অর্থাৎ কোনো লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে বৈধ-অবৈধ যেকোনো পন্থা অবলম্বন করা যেতে পারে। লক্ষ্যটা যদি ভালো হয় তবে এতে দোষের কিছু নেই। সেই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনে ধোঁকা, প্রতারণা, মিথ্যা, ষড়যন্ত্র ও অপকৌশলের আশ্রয় নেওয়ার কথা বলেছেন ম্যাকিয়াভেলি। জনসাধারণের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে হুমকি-ধমকি দিয়ে জোরপূর্বক স্বার্থ হাসিলের কথাও বলেছেন তিনি। তিনি আরও বলতেন, রাজনীতিতে নীতি-নৈতিকতা ও সাধুতা বলতে কিছু নেই। (৮৯)

কোনো সন্দেহ নেই, এই গ্রন্থকার এবং নেপোলিয়ন বোনাপার্ট (৯০) ও অ্যাডলফ হিটলারসহ (৯১) তার অনুসারী সকল শাসকবর্গের যে পরিমাণ মানুষের মালামাল লুণ্ঠন করা ও শাসক শ্রেণির ভোগবিলাসের উপকরণ নিশ্চিত করা উদ্দেশ্য ছিল সে পরিমাণ জনগণের মাঝে শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা এবং মানুষের জন্য সকল সামাজিক উপকরণ নিশ্চিত করা উদ্দেশ্য ছিল না। সেই তুলনায় মুসলিম লেখকদের উদ্দেশ্য ছিল কেবল শাসকদের ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়া। নানাভাবে, বিচিত্র পন্থায় আল্লাহর জমিনে সামগ্রিকভাবে আল্লাহর শরিয়ত প্রতিষ্ঠার প্রতি তাদের উদ্বুদ্ধ করা।

টিকাঃ
৭০. তিনি হলেন ইয়াকুব ইবনে ইবরাহিম ইবনে হাবিব আল-আনসারি আল-বাগদাদি। (১১৩-১৮২ হি./৭৩১-৭৯৮ খ্রি.) ইমাম আবু হানিফার ছাত্র ও সহচর। হানাফি মাযহাবের প্রথম প্রচারক হিসেবে বিখ্যাত এই মহাপুরুষ ছিলেন বিজ্ঞ ফকিহ, হাফিযুল হাদিস। কুফায় তার জন্ম। হাদিস ও রেওয়ায়েত বিষয়ে তিনি বিশেষজ্ঞতা অর্জন করেন। কাযিযুল কুযাত বা প্রধান বিচারপতি হিসেবে তাকেই প্রথম সম্বোধন করা হয়। তার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থসমূহের অন্যতম হলো আল-খারাজ। দেখুন, তাযকিরাতুল হুফফায, খ. ১, পৃ. ২৯২-২৯৩; আল-আ'লাম, খ. ৮, পৃ. ১৯৩। মুজামুল মাতবুআত, খ. ১, পৃ. ৪৮৮।
৭১. ইবনে মাজাহ, ২৮৬১; তিরমিযি, ১৭০৬; আহমাদ, ২৭৩০১।
৭২. আবু ইউসুফ, আল-খারাজ, পৃ. ১০।
৭৩. আবু ইউসুফ, আল-খারাজ, পৃ. ১২।
৭৪. আবদুল আযিয আদ-দুরি, আন-নুযুমুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৬৮।
৭৫. হিলাল আস-সাবি। তার পুরো নাম আবুল হুসাইন হেলাল ইবনে মুহসিন আস সাবি (৩৫৯-৪৪৮ হি./৯৭০-১০৫৬ খ্রি.)। তিনি একাধারে লেখক, চিন্তাবিদ, ইতিহাসবিদ। বাগদাদ নিবাসী এ লেখক বহুদিন পর্যন্ত বাগদাদের রাজদরবারের রচনা বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থসমূহের মধ্যে : আখবারু বাগদাদ, রুসুমু দারিল খিলাফা, গুরারুল বালাগা, তুহফাতুল উমারায়ি ফি তারিখিল ওযারায়ি উল্লেখযোগ্য। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৮, পৃ. ৯২।
৭৬. মাওয়ারদি, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, পৃ. ১।
৭৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩।
৭৮. মাওয়ারদি, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, পৃ. ২০।
৭৯. পুরো নাম আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনে ওয়ালিদ ইবনে খালাফ আল-কুরাশি আত-তারতুশি (৪৫১-৫২০ হি./১০৫৯-১১২৬ খ্রি.)। মালেকি মাযহাবের ফকিহ হিসেবে খ্যাত এ মনীষী ছিলেন পশ্চিম আন্দালুসের তারতুশ এলাকার অন্যতম সুসাহিত্যিক। তার ইনতেকাল হয় আলেকজান্দ্রিয়ায়। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৪, পৃ. ২৬২-২৬৪।
৮০. মামুন বাতাইহি (মৃ. ৫১৯ হি./১১২৫ খ্রি.) দরিদ্র অবস্থায় বেড়ে ওঠা এ মন্ত্রী শুরুতে কুলির কাজ করতেন। ফাতেমি সরকারের উঁচু স্তরের কর্মকর্তা আফজাল আল-উবাইদির কাছে তিনি মজদুরি করতেন। এরপর ধীরে ধীরে উন্নতি করতে করতে মিশরের মন্ত্রণালয়ে চাকরি পেয়ে যান। তিনি ছিলেন দুঃসাহসী, মহৎ ও দানবীর। তবে রক্তপাতের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রনায়ককে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করে তাকে শূলে চড়ানো হয়। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ১৯, পৃ. ৫৫৩।
৮১. শাইযারি, আল-মানহাজুল মাসলুক ফি সিয়াসাতিল মুলুক, পৃ. ১৫৮-১৫৯।
৮২. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৬২-৫৬৩।
৮৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৫৭।
৮৪. তার পুরো নাম আহমাদ ইবনে আবদুল হালিম আল-হাররানি (৬৬১-৭২৮ হি./১২৬৩-১৩২৮ খ্রি.)। তিনি একাধারে ইমাম, বড় আলেম, বিখ্যাত ফকিহ, মুফাসসির, মুহাদ্দিস, শাইখুল ইসলাম উপাধিতে ভূষিত। হাররানে জন্মেছেন। দামেশকে ইনতেকাল করেছেন। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত খ. ৭, পৃ. ১১।
৮৫. ইবনে তাইমিয়া, আস-সিয়াসাতুশ শারয়িয়্যা, পৃ. ৪-৫।
৮৬. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ১৯১।
৮৭. প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ১৯০। দেখুন, যাফির কাসেমি, নিযামুল হুকমি ফিশ-শারিআতি ওয়াত- তারিখিল ইসলামি, খ. ১, পৃ. ১৯১।
৮৮. নিকোলা ম্যাকিয়াভেলি (১৪৬৯-১৫২৭ খ্রি.)। ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাকে বাস্তববাদী রাজনৈতিক দর্শনের প্রবক্তা বলা হয়ে থাকে। তার লেখা সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ দা প্রিন্স।
৮৯. আলি ইবনে নায়েফ, আল-হাদারাতুল ইসলামিয়্যা বাইনা আসালাতিল মাযি ওয়া আমালিল মুসতাকবিল, পৃ. ২৯৪।
৯০. নেপোলিয়ন বোনাপার্ট (১৭৬৯-১৮২১ খ্রি.)। বিখ্যাত ইউরোপীয় সেনানায়ক। মিশরের বিরুদ্ধে ফরাসি আক্রমণের নেতৃত্ব দেন তিনি। ইউরোপেও বহু যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। সবগুলোতেই তিনি ছিলেন অপরাজেয়। তবে বেলজিয়ামের ওয়াটারলুতে সংঘটিত যুদ্ধে তিনি পরাজিত হন। এরপর তিনি সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসিত হন এবং সেখানেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
৯১. অ্যাডল্ফ হিটলার (১৮৮৯-১৯৪৫ খ্রি.)। জার্মানির বিখ্যাত রাষ্ট্রপ্রধান। তার মিত্রদের বিরুদ্ধে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। শেষ পর্যন্ত জার্মানির পতন ঘটে এবং তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 ইসলামি সভ্যতায় জনগণের সঙ্গে শাসকের সম্পর্ক

📄 ইসলামি সভ্যতায় জনগণের সঙ্গে শাসকের সম্পর্ক


ইসলামি সভ্যতায় জনগণের সঙ্গে শাসকদের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সম্প্রীতির ওপর। রোমান ও পারস্যসম্রাটগণ প্রজাদের সঙ্গে যেখানে বলপ্রয়োগ ও স্বেচ্ছাচারমূলক নীতি অবলম্বন করেছিলেন এবং সমাজকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করেছিলেন, ইসলামি সভ্যতায় মুসলিম শাসকগণ সেরকমটা কখনোই করেননি।

ইসলামি সভ্যতায় জনগণ ও শাসক সকলেই যে জীবনব্যবস্থাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আল-কুরআন ও সুন্নাতে রাসুলের অনুসরণের ওপর। এ কারণেই হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া প্রায় সকল মুসলিম শাসকই শরিয়তবান্ধব সেই শাসনব্যবস্থার ওপর অটল ছিলেন। শুধু তাই নয়, উম্মাহর বিদগ্ধ আলেম ও মহাপুরুষগণ শাসক ও সর্বস্তরের কার্যনির্বাহী গোষ্ঠীকে সবসময় সত্যের পথে ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর ছিলেন।

উপদেশদানের মাধ্যমে অত্যাচারী শাসককে সুপথে আনার উদ্যোগকে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শ্রেষ্ঠ জিহাদ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন,

«إِنَّ أَعْظَمَ الْجِهَادِ كَلِمَةُ عَدْلٍ عِنْدَ سُلْطَانٍ جَائِرٍ»

অত্যাচারী শাসকের সামনে ন্যায়ের কথা উচ্চারণ করা শ্রেষ্ঠ জিহাদ। (৯২)

ভুল পথে যাওয়া শাসক ও খলিফাদের ত্রুটিগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার সুমহান দায়িত্ব ইসলামের সূচনাকাল থেকেই উম্মতের বিদগ্ধ আলেমগণ সুচারুরূপে পালন করেছেন। বরং স্বয়ং খলিফাগণই জনগণকে এ কাজে উৎসাহিত করেছেন বলে আমরা দেখতে পাই। আমিরুল মুমিনিন হিসেবে মনোনীত হওয়ার পর জনগণের উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে আবু বকর রা. বলেন,

إِنْ أَسَأْتُ فَقَوَّمُوْنِي

আমি ভুল পথে গেলে বা ভুল সিদ্ধান্ত নিলে আপনারাই আমাকে সোজা পথে নিয়ে আসবেন। (৯৩)

এরই ধারাবাহিকতায় আমরা দেখি, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবসময় সঙ্গীদের নিয়ে পরামর্শে বসতেন। তাদের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতেন। তাদের সিদ্ধান্ত সঠিক মনে হলে একাত্মতা পোষণ করতেন। বদর যুদ্ধে সঙ্গীদের নিয়ে তিনি প্রথমে বদর কূপের সন্নিকটে একটি জায়গায় অবস্থানের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তা বিশিষ্ট সাহাবি হাব্বাব ইবনুল মুনযির রা.-এর মনঃপূত হয়নি। তিনি গিয়ে মুসলিম সেনাপতি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি কি আল্লাহর আদেশে এ জায়গাটি বেছে নিয়েছেন, এখানে কিন্তু সামনে-পেছনে যাওয়ার কোনো অবকাশ নেই; নাকি রণকৌশল হিসাবে এই স্থানটি পছন্দ করেছেন? বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এটা স্রেফ রণকৌশল। এ কথা শোনার পর হাব্বাব রা. বললেন, এই জায়গায় অবস্থান করাটা আমি সমীচীন মনে করছি না। আমাদের আরও এগিয়ে যেতে হবে। কুরাইশ বাহিনীর অবস্থানের সবচেয়ে নিকটবর্তী কূপ আমাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। তা ছাড়া অন্যান্য কূপের প্রতিও আমরা নজর রাখব। তাহলে ফল দাঁড়াবে এই, যুদ্ধ শুরু হলে আমরা পানি পান করতে পারব আর কুরাইশরা পানির অভাবে ছটফট করবে। হাব্বাবের এই সুপরামর্শ আল্লাহর রাসুলের পছন্দ হলো। তিনি খুশি হয়ে বললেন, তুমি সঠিক পরামর্শ দিয়েছ। এরপর তিনি সহযোদ্ধাদের নিয়ে এগিয়ে চললেন। রাতের মাঝামাঝি সময়ে শত্রুদের অবস্থানের নিকটবর্তী কূপের কাছে পৌঁছে তাঁবু খাটালেন। এরপর সাহাবিগণ হাউজ বানালেন এবং পানি ভরা হলে তাতে পাত্র ফেলে রাখলেন। (৯৪)

সাধারণ একজন যোদ্ধার সঙ্গে একজন সেনানায়কের কীরকম সম্পর্ক ছিল এবং রাষ্ট্রনায়ক হয়ে সাধারণ মানুষের মতামত তিনি কী পরিমাণ গুরুত্বের সঙ্গে নিতেন, তা এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট। এই মহৎ ও অনন্য ইসলামি সভ্যতায় জনগণের সঙ্গে শাসকের সম্পর্ক আন্তরিকতা, পরস্পর শ্রদ্ধাবোধ ও সুপরামর্শ বিনিময়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। হাব্বাবের এই ঘটনা থেকে বিষয়টি দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল।

উমর ইবনুল খাত্তাব রা. তখন আমিরুল মুমিনিন। একবার এক বেদুইন এসে উমর রা.-কে কিছু রাখালিয়া জমি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতে লাগল। জমিগুলো তার অনুমতি ছাড়া কেউ যেন ব্যবহার না করে সেই ফরমান আগেই দিয়ে রেখেছিলেন উমর রা.। সেই বেদুইন বলল, হে আমিরুল মুমিনিন, এটি আমাদের দেশ। জাহিলিয়াত যুগে এ দেশে আমরা যুদ্ধ করেছি। ইসলাম আসার পর এ ভূমিতেই আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি। তাহলে কীসের ভিত্তিতে আপনি এ ভূমি সংরক্ষণ করে রাখবেন? বেদুইনের এ কথা শুনে উমর বিরক্ত হয়ে গোঁফে ফুঁ দিতে লাগলেন আর গোঁফ পাকাতে লাগলেন। কোনোকিছু নিয়ে বিরক্ত হলে তিনি এমনটি করতেন। বেদুইন উমরের হাবভাব দেখে তার কথাগুলো পুনর্ব্যক্ত করল। এক পর্যায়ে উমর রা. বললেন, সকল সম্পদ একমাত্র আল্লাহর। সব মানুষ আল্লাহর বান্দা। আল্লাহর রাস্তায় যদি আমি তা ব্যবহার না করতাম, তাহলে এক বিঘত পরিমাণ জমিও আমি রক্ষা করতে পারতাম না। (৯৫)

উমর ইবনুল খাত্তাবের নিয়োগপ্রাপ্ত প্রাদেশিক গভর্নরগণ ছিলেন অত্যন্ত ধর্মভীরু ও নির্লোভ প্রকৃতির। এমনও পাওয়া গেছে, জনগণ ছিল ধনী আর শাসক ছিলেন চরম দরিদ্র। এরকমই একজন শাসক ছিলেন সাঈদ ইবনে আমের আল-জুমাহি। তারিখু মাদিনাতি দিমাশক গ্রন্থে ইবনে আসাকির লেখেন, একবার সিরিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর হিমস পরিদর্শনে এসে সেখানকার দরিদ্রদের একটি তালিকা করতে বলেন আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনুল খাত্তাব রা.। তালিকাটি পূর্ণ করে আমিরুল মুমিনিনের কাছে হস্তান্তর করা হলে তাতে সাইদ ইবনে আমেরের নাম দেখে জিজ্ঞেস করলেন, কে এই সাইদ ইবনে আমের? সবাই বলল, আমাদের শাসক হে আমিরুল মুমিনিন। উমর রা. আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের শাসক দরিদ্র?! সবাই বলল, জি হ্যাঁ! উমর রা. অবাক হয়ে বললেন, কী করে তোমাদের শাসক দরিদ্র হতে পারেন? তার ভাতা কোথায় যায়? তার রিযিক কোথায় ব্যয় হয়? সবাই উত্তর দিলেন, হে আমিরুল মুমিনিন, তিনি নিজের জন্য কিছুই অবশিষ্ট রাখেন না। এ কথা শুনে উমর রা. কেঁদে উঠলেন এবং এক হাজার দিনারের থলে প্রস্তুত করে তার কাছে পাঠিয়ে দেন। দূতকে বলেন, তাকে গিয়ে আমার সালাম বলো। কিন্তু সেই শাসক উমরের পাঠানো অর্থ নিজের কাছে না রেখে আল্লাহর পথের মুজাহিদদের কাছে হস্তান্তর করেন। (৯৬)

একবার খলিফাতুল মুসলিমিন এবং তৎকালীন বিশ্বের শক্তিধর শাসক মুআবিয়া রা. ভাষণের উদ্দেশ্যে মিম্বরে দাঁড়ালেন। এমন সময় বিশিষ্ট তাবেয়ি, আল্লাহর পথের নির্ভীক কণ্ঠস্বর আবু মুসলিম আল-খাওলানি রা. খলিফার সামনে গিয়ে বলতে লাগলেন, হে মুআবিয়া, আপনি তো একদিন লাশ হয়ে কবরে চলে যাবেন। পৃথিবীতে ভালো কিছু করে গেলে সেখানে সুখ পাবেন। অন্যথায় দুনিয়ার এই চাকচিক্য ও আড়ম্বরতা একদিন আপনার জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। হে মুআবিয়া, এমনটি কখনো ভাববেন না যে, খিলাফত শুধু রাজস্ব ও অর্থ উসুল করা এবং তা বিতরণ করার নাম। বরং খিলাফত হলো হকের উচ্চারণ ও ইনসাফের আচরণ এবং আল্লাহর দিকে মানুষকে মনোনিবেশ করার অন্যতম পথ। হে মুআবিয়া, ঝরনার উৎসমুখ যদি পরিষ্কার থাকে তাহলে নদনদীর জল ঘোলা হলেও আমাদের তাতে কিছু যায় আসে না। সাবধান, কখনো নির্দিষ্ট কোনো গোত্রের পক্ষপাতিত্ব করবেন না। তাহলে আপনার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।' এ কথাগুলা বলে তিনি বসে পড়লেন। মুআবিয়া রা. তার এ বলিষ্ঠ সতর্কবার্তা শুনে উত্তর দিলেন, তোমার প্রতি আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক হে আবু মুসলিম। (৯৭)

ইসলামি সভ্যতায় শাসক ও জনগণের মাঝে ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক সবসময় বিরাজমান ছিল। খলিফাগণ সবসময় জনগণের দুঃখদুর্দশা লাঘব করার জন্য সচেষ্ট থাকতেন। বিখ্যাত আব্বাসীয় খলিফা মুতাযিদ বিল্লাহ (মৃ. ২৮৯ হি.) রাজ্যের কৃষক শ্রেণির সঙ্গে সদয় আচরণ করতেন। তাদেরকে বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা করতেন। ফসল কাটার সঙ্গে সঙ্গে রাজস্ব উসুল না করে একমাস পর্যন্ত সময়ক্ষেপণ করতেন। যেন ফসল বিক্রি করে তারা নিজেদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারে। যার ফলে দেখা যায়, তার আমলে কৃষকদের অভাবনীয় উন্নতি ঘটে।(৯৮)

এমনকি আব্বাসীয় খিলাফতের অবস্থা যখন শোচনীয়, তখনও খলিফাগণ জনগণের উন্নতি, অগ্রগতি এবং তাদের সার্বিক প্রয়োজন পূরণের কাজেই ব্যস্ত থাকতেন। বিশিষ্ট আব্বাসি খলিফা আল-কাদির বিল্লাহ (মৃ. ৪২২ হি.) ছিলেন একজন ধর্মভীরু, নিষ্ঠাবান, ত্যাগী, নিয়মিত তাহাজ্জুদগুজার এবং খুব বেশি পরিমাণ দান ও সেবার কাজে নিবেদিত একজন ব্যক্তি। ইফতারের জন্য রাজদরবারে প্রস্তুত করা খাদ্যসামগ্রীর একতৃতীয়াংশ তিনি বড় দুটি মসজিদে বিতরণ করে দিতেন। খুব কাছ থেকে মানুষের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য অনেক সময় তিনি রাজপোশাক ছেড়ে একেবারে সাধারণ পোশাক পরে মানুষের সঙ্গে মিশে যেতেন। জনশ্রুতি আছে, হাদিসের মূলনীতি বিষয়ক একটি বইও তিনি রচনা করেন, যা প্রতি শুক্রবার আল-মাহদি মসজিদে হাদিস বিশারদদের বৈঠকে পড়া হতো। আর মানুষ তা শোনার জন্য মসজিদে চলে আসত।(৯৯)

বিপদের সময় খলিফাগণ জনগণের পাশে থাকতেন। দুঃখদুর্দশা ভাগ করে নিতেন। তাদের চাহিদা পূরণে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতেন। আন্দালুসের বিশিষ্ট শাসক আবদুর রহমান ইবনুল হাকামের (মৃ. ২৩৮ হি.) শাসনামলে মাটি থেকে সৃষ্ট হলুদ পঙ্গপালের আবির্ভাব এবং তা ছড়িয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে স্পেনে বড় ধরনের দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এ সময় খলিফা রাজকর্মচারীদের সঙ্গে মিশে নিজে দরিদ্র-মিসকিনদের মাঝে খাবার বিতরণ করেন। (১০০)

ইসলামি সভ্যতায় খলিফা ও গভর্নরদের মাঝে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও যথাযথ মর্যাদাদানের সম্পর্ক বিরাজমান ছিল। যার ফলে আমরা দেখি, খিলাফতের দুর্বল ও অন্তিম সময়গুলোতেও গভর্নর ও খলিফাদের পারস্পরিক এই সুসম্পর্কের বন্ধন অটুট ছিল। এক উম্মত হিসেবে পৃথিবীর সকল মুসলিম এবং সকল শাসকের মাঝে অভিন্ন আত্মার সম্পর্ক বজায় ছিল। তারা সকলেই খলিফার আদেশ-নিষেধকে সম্মান করতেন। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো আব্বাসীয় খিলাফতের সঙ্গে বিখ্যাত সেনাপতি বীর সালাহুদ্দিন আইয়ুবির সম্পর্ক। বাস্তব প্রেক্ষাপটে তখন আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ ছিল সালাহুদ্দিন আইয়ুবির হাতে। তিনি ছিলেন তৎকালীন গোটা মুসলিম জাহানের আশার আলো। এই বীরশ্রেষ্ঠ সেনাপতি সকল ক্রুসেড শক্তিকে চূর্ণবিচূর্ণ করে বাইতুল মাকদিস পুনরুদ্ধার করেন। ইসলামের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি সমুন্নত করেন। এই দুঃসাহসী বীরপুরুষের অবদান মুসলিমজাতি চিরকাল স্মরণ রাখবে। তিনি একাধারে সিরিয়া, মিশর, হেজায ও ইয়ামেনকে ইসলামি শক্তির নিয়ন্ত্রণাধীন করেন। এরকম মহান সেনাপতি হওয়ার পরও ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে আমরা দেখতে পাই, সালাহুদ্দিন আইয়ুবি এবং আব্বাসীয় খলিফার মাঝে সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ। অথচ তখন বাগদাদ ও আশপাশের কিছু এলাকা ছাড়া মুসলিমবিশ্বে আব্বাসীয় খলিফার আধিপত্য বলতে কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। এরপরও সে সময় সালাহুদ্দিন আইয়ুবি এবং আব্বাসীয় খলিফার মাঝে বিনিময় হওয়া চিঠিগুলো থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, আব্বাসীয় খলিফাকেই তিনি মুসলিমদের প্রকৃত আমির বলে মানতেন। এরই ধারাবাহিকতায় আব্বাসি খলিফা আন-নাসির লি দ্বীনিল্লাহর(১০১) প্রতি তিনি শুভেচ্ছাবার্তা পাঠান। শুধু শুভেচ্ছা জানিয়েই ক্ষান্ত হননি, সবসময় খলিফার পরামর্শ নিয়েই তিনি কাজ করতেন। খলিফার কল্যাণে অনেক বিজয়াভিযান সম্পন্ন করেন। ইবনে কাসির তার ইতিহাসগ্রন্থে খুব গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। মসুল শহর অবরোধ করার পেছনে মূলত সালাহুদ্দিন আইয়ুবির উদ্দেশ্য ছিল শহরের অধিবাসীকে খলিফার আনুগত্যে ফিরিয়ে আনা এবং ইসলামের বিজয় নিশ্চিত করা(১০২)। এমনকি খলিফা ও সালাহুদ্দিন আইয়ুবির মাঝে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি এ পরিমাণ উচ্চতায় পৌঁছেছিল যে, ৫৭০ হিজরিতে খলিফা তাকে খিলাফতের সম্মানসূচক পোশাক ও অনেক মূল্যবান বস্তু উপহার পাঠান। (১০৩)

হিজরি পঞ্চম শতকে মুরাবিতিন সাম্রাজ্যের (১০৪) (Almoravid dynasty) প্রতিষ্ঠাতা ইউসুফ ইবনে তাশফিন প্রথমে মরক্কো, এরপর মরক্কো ও স্পেন একসঙ্গে অধিকার করেন। সেই মহান সেনাপতি নিজেকে মহামান্য আব্বাসীয় খলিফার (১০৫) একজন নগণ্য সেবক মনে করতেন। অথচ মরক্কো এবং আব্বাসীয় খিলাফতের রাজধানী বাগদাদের মাঝে দূরত্ব ছিল প্রায় পাঁচ হাজার কিলোমিটার। আর মরক্কো তখন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পরিচালিতও হচ্ছিল, কিন্তু ইউসুফ ইবনে তাশফিন চাচ্ছিলেন খিলাফতের অধীনে থাকতে। সেই লক্ষ্যে খলিফা মুস্তাযহিরের কাছে পত্রযোগে খিলাফত সাম্রাজ্যে অন্তর্ভুক্তির আবেদন জানালে খলিফা তাকে ডেকে আনেন এবং মরক্কোকে খিলাফতের অন্তর্ভুক্ত ঘোষণা করে ইউসুফ ইবনে তাশফিনকে সেখানকার শাসক হিসেবে ঘোষণা করেন। ফলে মুরাবিতিন সাম্রাজ্যে আব্বাসীয়দের আধিপত্য বিরাজমান ছিল। আর খলিফার মর্যাদা ও আদব রক্ষার্থে ইউসুফ ইবনে তাশফিন আমিরুল মুমিনিন নয়, আমিরুল মুসলিমিন উপাধি গ্রহণ করেন। (১০৬)

২০৫ হিজরি সন থেকে তাহের ইবনে হুসাইন (১০৭) কর্তৃক খোরাসান রাজ্যের সিংহাসনে আরোহণ করার পর অনেক শাসক ও গভর্নর স্বাধীনভাবে নিজ নিজ প্রদেশ পরিচালনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত ২৫৯ হিজরি পর্যন্ত তাহেরের সন্তানগণ সেই সিংহাসন ধরে রাখতে সক্ষম হন। এরপরও তাহেরি রাজবংশ খিলাফত ও তার অনুষঙ্গ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন ঘোষণা করেননি। শুধু তাহের নয়, খোরাসানে তাহেরি সাম্রাজ্যের অন্যসব শাসকও খিলাফত থেকে নিজেদের স্বতন্ত্র বলে দাবি করেননি। অপরদিকে ২৫৪ হিজরি থেকে স্বাধীনভাবে মিশর শাসনকারী মুহাম্মাদ ইবনে তুলুন এবং পরবর্তীকালে তার সন্তানগণ খিলাফত থেকে বের হননি। তেমনই ৩২৩ হিজরি সন থেকে মিশরের কর্তৃত্ব গ্রহণকারী মুহাম্মাদ ইবনে তুগজ আল-ইখশিদ (১০৮), আলেপ্পোর বনু হামদের নেতাবর্গ এবং মরক্কো ও স্পেনের অন্য শাসকগণও খিলাফত থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন বলে দাবি করেননি।

এরকম অনেক স্বাধীন শাসক খিলাফত ব্যবস্থাকে অসামান্য মর্যাদার চোখে দেখতেন, এটাই চিরসত্য ও সুপ্রমাণিত। নিজ নিজ ভূখণ্ড ও প্রজাদের স্বাধীনভাবে পরিচালনা করার পরও অধিকাংশ সময় আব্বাসীয় খিলাফতের ছায়াতলেই থেকেছেন তারা।

হিজরি তৃতীয় শতক থেকে শাসনব্যবস্থার নানা অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যগত দিক থেকেও বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক উন্নতি পরিলক্ষিত হয়। স্বাধীন শাসকগণ নিজ নিজ ভূখণ্ডকে উন্নত ও প্রগতিশীল করার এবং ধর্মবর্ণনির্বিশেষে সকল মানুষের চাহিদা পূরণ করার প্রতি মনোযোগী হন। এমনকি তাদের অনেকে সেনাশক্তি অর্জন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দিক থেকে খিলাফত সাম্রাজ্যকেও ছাড়িয়ে যান। যার ফলে আব্বাসীয় খলিফা মুস্তাকফি বিল্লাহ (মৃ. ৩৩৮ হি.) মিশরের গভর্নর ও স্বাধীন শাসক মুহাম্মাদ ইবনে তুগজ ইখশিদের কাছে মিশর, সিরিয়া, ইয়ামেন, মক্কা ও মদিনার সঙ্গে বাগদাদকেও তার শাসনাধীন করার প্রস্তাব করেন। স্বভাবতই ইখশিদের মতো এরকম যোগ্য ও ক্ষমতাবান শাসকের হাতের ছোঁয়ায় মিশর নানাভাবে অনেক উন্নতি ও অগ্রগতি অর্জন করে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ, তিনি নিজ অধিকারভুক্ত রাজ্যগুলোতে স্বতন্ত্র ইখশিদি মুদ্রা প্রচলন করেন। এরকম আধুনিক মুদ্রানীতির প্রচলন সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে বিরাট সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

বিচারব্যবস্থা ও নেতা নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে যে উন্নত স্তরে পৌঁছেছিল ইসলামি সভ্যতা, তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো রাষ্ট্রীয় গোলযোগ ও ফেতনার সময় শাসক ও জনগণ সকলেই সমাধানের জন্য কাযি, বিচারক বা নেতৃত্বের যোগ্য ব্যক্তির দ্বারস্থ হতেন, যিনি এই সংকটময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের যোগ্যতা রাখেন। এরপর তুলনামূলক অধিক যোগ্য ব্যক্তি পাওয়া গেলে তার স্থলে ওই ব্যক্তিকে এ পদে বসাতেন। বিশেষত মুসলিম শাসনামলে স্পেনে এ রীতির প্রচলন ছিল। আবু আবদিল মালিক নামে খ্যাত ভ্যালেন্সিয়ার বিচারক ও অধিবাসী মারওয়ান ইবনে আবদুল্লাহ ৫৩৮ হিজরি সনের যিলহজ মাসে নিজ শহরের বিচারক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। কোনো কোনো ইতিহাসবিদ ৫৩৯ হিজরি, আবার কেউ কেউ ৫৪০ হিজরি বলেছেন। এরপর লামতুনিয়া সাম্রাজ্য পতনের সময় রমযানের শেষে কিংবা শাওয়ালের শুরুতে তিনি ভ্যালেন্সিয়ার প্রশাসক নিযুক্ত হন। ফলে ৫৪০ হিজরি সনের সফর মাসে তার হাতে মানুষ বাইআত গ্রহণ করে। অল্প কিছুদিন শাসকের দায়িত্ব পালন করার পর তার স্থলে আরেকজনকে শাসক হিসেবে নিয়োগ করা হয়। (১০৯)

আন্দালুসের ইতিহাস নিয়ে গবেষণাকারী প্রতিটি পাঠকের সামনে বিষয়টি স্পষ্ট যে, মুসলিম স্পেনে খণ্ডকালীন শাসক নিয়োগের প্রচলন ছিল। মানুষের কাছেও বিষয়টি গ্রহণযোগ্য ছিল। ইবনুল আব্বারের বর্ণনা করা এই আপৎকালীন নিয়োগব্যবস্থা বর্তমান কালে প্রচলিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার মতো। সাধারণত বর্তমান শাসক মারা যাওয়ার পর নতুন শাসক নিয়োগ করা পর্যন্ত অথবা কোনো রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা ছাড়ার পর নতুন কারও হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার আগ পর্যন্ত সংসদীয় কমিটির নিয়োগ মোতাবেক অনেকটা অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনব্যবস্থা বলা যায় এটিকে। এরকম ব্যবস্থার সর্বশেষ নিয়োগপ্রাপ্ত শাসক ছিলেন লিপিকার আখিল ইবনে ইদরিস আল-কাইসি। আবুল কাসেম নামে খ্যাত এ শাসক ছিলেন রান্দার অধিবাসী। জ্ঞান ও সাহিত্যে পণ্ডিত ছিলেন। বুদ্ধিমত্তা ও ভাষাগত শাস্ত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত ছিলেন। ছিলেন দানশীল, সহানুভূতিশীল, প্রখর মেধাসম্পন্ন এক বিরল ব্যক্তিত্ব। গোলযোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে তিনি রান্দার শাসনভার গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে তার স্থলে আরেকজনকে বসানো হয়। প্রথম জীবনে তিনি বিশিষ্ট কাযি আবু জাফর ইবনে হামদাইনের কেরানি ছিলেন। শেষজীবনে তিনি কর্ডোভা ও সেভিলে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন। (১১০)

ইসলামি সভ্যতার পুরোটা সময়জুড়ে মুসলিম জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গই ছিলেন এই উম্মতের কান্ডারি, আশার আলো। মুসলিমবিশ্বের কাঁধে যখনই কোনো অবিচার, অনাচারের খড়গ পড়েছে তখনই তারা মাথা উঁচু করে সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী আওয়াজ তুলেছেন। এ সম্পর্কে মিশর ও সিরিয়ার সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্স এবং ইমাম নববির মধ্যে সংঘটিত ঘটনাটি এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাতারদের দখলদারি থেকে মুক্ত করার কারণে দামেশকের একটি এলাকা নিজ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত বলে ঘোষণা করেন রুকনুদ্দিন বাইবার্স। প্রকৃত হকদারদের তা থেকে বঞ্চিত করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ইমাম নববি সুলতান রুকনুদ্দিনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। একের পর এক পত্র পাঠিয়ে তাকে সতর্ক করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত রুকনুদ্দিন তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হন। একটি চিঠির ভাষা ছিল এরকম:

এ ধরনের অধিকার চাপানোর ফলে মানুষ অবর্ণনীয় যাতনা ও সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছে। অন্যায়ভাবে সেখানকার অধিবাসীদের থেকে প্রমাণপত্র চাওয়া হচ্ছে। কোনো মুসলিম জ্ঞানীর কাছেই জনগণের ওপর এ ধরনের প্রক্রিয়া আরোপ বিধিসম্মত নয়। বরং যার অধিকারে যা আছে, সে তার মালিক। এ ব্যাপারে দ্বিমত করার এবং তার ওপর প্রমাণপত্র উপস্থিত করার দায় চাপানোর কোনো অবকাশ নেই। আমরা শুনেছি, সুলতান বাইবার্স শরিয়তের ওপর আমল করতে পছন্দ করেন। সরকারি কার্যনির্বাহী ও অধীনস্থদেরও শরিয়তমতে চলার কথা বলেন। ফলে আমার বিশ্বাস এ ব্যাপারেও তিনি শরিয়তসমর্থিত বিধানই মেনে নেবেন। (১১১)

এরকম হাজারও ঘটনার মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, মুসলিম জনসাধারণ সর্বযুগেই স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের সুযোগ পেয়েছেন। অবাধে নিজেদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা পেয়েছেন। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সাদা-কালো, সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে সকলেই এ স্বাধীনতা সমানভাবে উপভোগ করতেন। কোনো সন্দেহ নেই, এ বিষয়গুলো ইসলামি সভ্যতার মহত্ত্ব ও বড়ত্বের সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে।

টিকাঃ
৯২. তিরমিযি, কিতাবুল ফিতান, বাব: أَفْضَلُ الجَهَادِ كَلِمَةُ عَدْلٍ عِنْدَ سُلْطَانٍ جَائِرٍ ২১৭৩, হাদিসটি হাসান। আবু দাউদ, ৪৩৪৪; নাসায়ি, ৪২০৯; ইবনে মাজাহ, ৪০১১; আহমাদ, ১৮৮৫০।
৯৩. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ২, পৃ. ২৩৮।
৯৪. ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা, খ. ১, পৃ. ২৬০; ইবনে কাসির, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৪০২; সুহাইলি, আর-রওযুল উনুফ, খ. ৩, পৃ. ৬২; তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ২, পৃ. ২৯।
৯৫. ইমাম নববি, আল-মাজমু, খ. ১৫, পৃ. ২৩৪।
৯৬. ইবনে আসাকির, তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, খ. ২১, পৃ. ১৪৮-১৪৯।
৯৭. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ৫, পৃ. ২৯৭।
৯৮. ইউসুফ আল-উশ, তারিখু আসরিল খিলাফাতিল আব্বাসিয়্যা, পৃ. ১৬৭।
৯৯. ইবনুল জাওযি, আল-মুনতাযাম, খ. ৭, পৃ. ১৬১।
১০০. ইবনে হাইয়ান আল-কুরতুবি, আল-মুকতাবাসু মিন আনবায়িল উন্দুলুস, পৃ. ২২৫।
১০১. মুহাম্মাদ ইবনে তকিউদ্দিন আইয়ুবি, মিযমারুল হাকায়িকি ওয়া সিররিল খালায়িকি, পৃ. ৫।
১০২. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ১২, পৃ. ৩৮৭।
১০৩. ইবনুল আসির, আল-কামিল ফিত-তারিখ, খ. ৫, পৃ. ১৩২।
১০৪. হিজরি পঞ্চম শতকের মধ্যভাগে উত্তর আফ্রিকায় মালেকি সুন্নি মতাদর্শে প্রতিষ্ঠিত একটি ইসলামি সাম্রাজ্য, বর্তমানের মরক্কো, মৌরিতানিয়া, আলজেরিয়া, স্পেন, পর্তুগাল, জিব্রাল্টার, সেনেগাল, মালি ও নাইজেরিয়া এ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
১০৫. দেখুন, ইমাম গাযালির প্রতি ইমাম আবু বকর ইবনে আরাবির লেখা চিঠি। আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি, দাওলাতুল মুরাবিতিন, পৃ. ১২৩।
১০৬. আবুল আব্বাস আন-নাসিরি, আল-ইসতিকসাউ ফি আখবারিল মাগরিব, খ. ২, পৃ. ৫৮।
১০৭. পুরো নাম আবুত তাইয়িব তাহের ইবনুল হুসাইন ইবনে মুসআব আল খুযায়ি (১৫৯-২০৭ হি./৭৭৫-৮২২ খ্রি.)। তিনি ছিলেন বিশিষ্ট উযির ও সেনাপতি। সাহিত্য, জ্ঞান ও বীরত্বে তিনি সুনাম অর্জন করেন। আব্বাসীয় খলিফা মামুনের রাজত্ব শক্তিশালী করতে তার বিশাল ভূমিকা ছিল। খলিফা মামুন প্রথমে তাকে বাগদাদের পুলিশ প্রশাসন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেন। এরপর পর্যায়ক্রমে মসুল, আলজেরিয়া, সিরিয়া এবং মরক্কোর গভর্নর হিসেবে নিয়োগ করেন। এরপর তিনি খোরাসানের শাসক হিসেবে নিযুক্ত হন। খোরাসানে জুমআর খুতবায় খলিফা মামুনের জন্য দোয়া বর্জন করেন। অবশেষে তিনি বিষাক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। হত্যার নেপথ্যে ছিল তারই এক দাস। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৩, পৃ. ২২১।
১০৮. তার পুরো নাম আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনে তুগজ ইবনে জুফ ইবনে খাকান আল-ফারগানি আত-তুরকি (২৬৮-৩৩৪ হি./৮৮২-৯৪৬ খ্রি.)। তিনি ইখশিদি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। দামেশকে তার ইনতেকাল হয়। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ১৫, পৃ. ৩৬৬।
১০৯. অ্যাডাম মেজ, আল-হাদারাতুল ইসলামিয়্যা ফিল কারনির রাবিয়িল হিজরিয়্যি, খ. ১, পৃ. ৫৩।
১১০. প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ১৭৪।
১১১. আবদুর রাযযাক আল-কিলানি, মিন মাওয়াকিফি উযামায়িল মুসলিমিন, পৃ. ২৬২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00