📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 খিলাফতের শর্তসমূহ

📄 খিলাফতের শর্তসমূহ


খিলাফতের শর্ত বলতে, শরিয়ত এ বিষয়ে যেসব শর্ত আরোপ করেছে এবং প্রশাসনে বা খিলাফতের পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার আগে শাসকের মধ্যে যেসব শর্তের উপস্থিতিকে আবশ্যক বলে সকল শরিয়তজ্ঞ এবং জনসাধারণ একমত হয়েছেন, তা উদ্দেশ্য।

আর আপনি যদি শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত এসব শর্ত ও মানদণ্ডকে তৎকালীন পারস্য ও রোম সাম্রাজ্যে প্রচলিত আইনকানুনের সঙ্গে তুলনা করেন, তাহলে রাজনৈতিক ইতিহাসে ইসলামি সভ্যতা কত উন্নত ও উচ্চ আসন গ্রহণ করেছিল, তা খুব সহজেই অনুমান করতে পারবেন।

ইসলামের আগমনই ঘটেছিল কেবল মানুষের অধিকার রক্ষা এবং তাদের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ ও সমুন্নত রাখার জন্য, প্রতিটি মানুষকে আল্লাহর জমিনে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। তা ছাড়াও শরিয়ত নানা অবকাঠামো এবং উদার নিয়মের প্রচলন ঘটিয়ে ইসলামের একতা সুরক্ষায় জোর তাগিদ দিয়েছে। ফলে ইসলামি বিচারব্যবস্থা অন্যান্য সকল ব্যবস্থাকে ছাপিয়ে অনন্য ও সুউচ্চ আসন লাভ করতে সক্ষম হয়েছে।

কেননা ইসলাম পূর্ববর্তী ও পরবর্তী কালের সকল প্রশাসনিক অবকাঠামোতে হারিয়ে যাওয়া ন্যায়, সুবিচার ও সাম্যের মতো সামাজিক বিষয়গুলো পূর্ণমাত্রায় প্রতিষ্ঠা করতে শতভাগ সফলতার স্বাক্ষর রেখেছে। এই সাম্য প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হচ্ছে পৃথিবীতে আল্লাহর প্রণীত বিচারব্যবব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে জনগণের সকল অধিকার সুরক্ষা করা। মুসলিম অমুসলিম সকলের জন্য শরিয়ত অনুমোদিত সকল বৈধ উপাদান সরবরাহ ও সহজলভ্য করা। আর এই ন্যায়, ইনসাফ ও সমতা বিধানের নজির আমরা কেবল ইসলামি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মাঝে সমুজ্জ্বলরূপে দেখতে পাই।

যেহেতু খলিফা, আমিরুল মুমিনিন বা মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানের পদটি মানুষের দ্বীন-ধর্ম সুরক্ষা ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ, তাই ইসলামি স্কলার ও শরিয়তব্যবস্থায় বিজ্ঞ আলেমগণ এই পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য বেশ কিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। ইমাম মাওয়ারদি রহ.-এর মনোনীত সাতটি শর্ত আমরা এখানে উল্লেখ করছি। সেগুলো হলো :

১। ন্যায়পরায়ণ হওয়া। প্রয়োজনীয় সকল শর্তসহ।
২। কুরআন-হাদিসের আলোকে ইজতেহাদের যোগ্যতা পর্যন্ত পৌঁছায় এমন ইলমের ধারকবাহক হওয়া।
৩। দৈহিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া। তথা দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি ও বাশক্তি পুরোমাত্রায় সুস্থ ও ত্রুটিমুক্ত হওয়া।
৪। দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ ও শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নাড়াতে প্রতিবন্ধক হয় এমন সব রোগ ও ত্রুটি থেকে মুক্ত হওয়া।
৫। দক্ষতার সঙ্গে প্রশাসনিক কাজ পরিচালনার জন্য অপরিহার্য বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন হওয়া।
৬। শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ পরিচালনা করতে এবং মুসলিমদের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে সাহসিকতা ও বীরত্বের অধিকারী হওয়া।
৭। কুরাইশ বংশীয় হওয়া। কারণ এর সপক্ষে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে এবং এ ব্যাপারে ইজমা (উম্মতের ঐক্য) সাব্যস্ত হয়েছে। (১০)

কোনো সন্দেহ নেই, ইসলামের রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো সবসময় এই শর্তগুলোকে সামনে রেখেই তার পথ চলা অব্যাহত রেখেছে। মুসলিম জনসাধারণও তাদের রাষ্ট্রপ্রধানের মাঝে এসব শর্তের উপস্থিতিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। ফকিহদের পক্ষ থেকে নির্ধারিত এসব শর্ত আমরা অধিকাংশ মুসলিম খলিফার মাঝে পুরোপুরিভাবে দেখতে পাই। আল-ইমামাতু ওয়াস-সিয়াসাতু গ্রন্থে ইবনে কুতাইবা দিনাওয়ারি রহ. মুসলিম খলিফার মাঝে কী কী শর্ত থাকা জরুরি সে বিষয়ে আলোচনার সূচনালগ্নে খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান ইবনে হাকামের (মৃ. ৮৬ হি.) বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, নিশ্চয় আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান মানুষের কাছে ন্যায় প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেন। কিতাবুল্লাহ এবং সুন্নাতে রাসুল প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষকে উদাত্ত আহ্বান জানান। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। সত্যবাদিতায় তিনি ছিলেন বিখ্যাত এবং জ্ঞানগরিমায় তিনি ছিলেন সুপরিচিত। তার ধর্মানুরাগের ব্যাপারে কারও কোনো দ্বিমত নেই। তার আল্লাহভীতিতে কারও কোনো প্রশ্ন নেই। সকলেই এক বাক্যে তাকে খলিফা হিসেবে মেনে নেন। কুরাইশের কেউই তার খলিফা হওয়ার ব্যাপারে প্রশ্ন তোলেনি এবং শামের কোনো অধিবাসীও এ ব্যাপারে বিরোধিতা করেনি। (১১)

ইবনে কুতাইবার বর্ণনা করা ওইসব শর্তের উপস্থিতিতে মুসলিম জনসাধারণ আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানকে এক বাক্যে খলিফা হিসেবে মেনে নেন। ইসলামের ফকিহগণ খলিফার পদে সমাসীন ব্যক্তির মাঝে এসব শর্তের উপস্থিতিকে আবশ্যক হিসেবে গণ্য করেছেন। এখানে একটি বিষয়ে সতর্ক হওয়া দরকার, কুরআন-সুন্নাহ গবেষণা করে ফকিহগণ খলিফার ব্যাপারে যেসব শর্ত আরোপ করেছেন, তা নিছক সমাজবহির্ভূত ব্যক্তিগত মতামত নয়, বরং শরিয়ত কর্তৃক প্রণীত বিধান এবং ইসলামি ভূখণ্ডে তা বাস্তবায়নের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক জড়িত। 'খিলাফত' বা ইমামতে কুবরার ব্যাপারে এর সঠিক বাস্তবায়নই আমরা প্রত্যক্ষ করেছি।

আমাদের বোঝার বাকি নেই যে, ইসলামি সংস্কৃতিতে খিলাফতের পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। আর খলিফা তো ভিন্ন গ্রহের কেউ নন, সাধারণ একজন মানুষ। কিছু গুণ ও বৈশিষ্ট্যের কল্যাণে তিনি এই পদের উপযুক্ত বিবেচিত হয়েছেন। যাই হোক, তা সত্ত্বেও তিনি মানুষের কাছে জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নন। রোম ও পারস্যের সম্রাটদের মতো স্বৈরাচারী ভাবাপন্ন হবেন না। মনে রাখতে হবে রাষ্ট্রপ্রধানের পদটি এমন পদ যা মানবিক কল্যাণের জন্য নিবেদিত। জনসাধারণের সকল অধিকার রক্ষা করা, তাদের মাঝে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করাই তার প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব। রোম ও পারস্যের সম্রাটগণ যা গুরুত্বের সঙ্গে নেননি।

পারসিক সভ্যতায় পারস্য সাম্রাজ্যের অধিপতি খসরুকে প্রভু হিসেবে মানা হতো। পারসিক জনগণের সঙ্গে সম্রাটদের আচার-ব্যবহারের দ্বারা এর সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। এমনকি অধিকাংশ সম্রাট ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে মানুষের অর্থ আত্মসাৎ করে নিতেন। জনগণকে দাস বানিয়ে রাখতেন। সম্রাট দ্বিতীয় খসরুই এর সব থেকে বড় উদাহরণ। নিজেই নিজের উপাধি নির্ধারণ করেছেন এই বলে, সকল প্রভুর মাঝে চির অম্লান পুরুষ। সকল সম্রাটের মাঝে সবচেয়ে বড় অধিপতি। মহা ক্ষমতার অধিকারী। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি জেগে ওঠেন। বিখ্যাত নীলনদের জন্য তিনি তার দু-নয়ন উজাড় করে দিয়েছেন। (১২)

ইরান ফি আহদিস সাসানিয়্যিন গ্রন্থে আর্থার ক্রিস্টেনসেন খসরুর বিবরণ দিতে গিয়ে লেখেন, নিজের ধনভান্ডার পূর্ণ করার জন্য তিনি জনগণের প্রতি অবিচার করেন। সাম্রাজ্যের জ্ঞানী ও পুণ্যবান ব্যক্তিবর্গের তিনি আদৌ মর্যাদা দিতেন না। তিনি ছিলেন চরম হিংসুটে, সন্দেহপ্রবণ। তার জন্য নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিদের মধ্যে যাকে সন্দেহ করতেন তাকে হত্যা করার সুযোগ খুঁজতেন সবসময়। (১৩)

তা ছাড়া পারস্যসম্রাট মনোনীত হতো বংশপরম্পরা অনুসারে। ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক কোনো বিধিমালার আলোকে মনোনীত হতো না। আর তাই পারসিক সমাজে জনগণের ন্যূনতম কোনো অধিকার ও মূল্য অবশিষ্ট ছিল না। শুনে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, সামাজিকভাবে পারস্য সাম্রাজ্য চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল: এক. ধার্মিক শ্রেণি। দুই. যোদ্ধা ও সৈনিক শ্রেণি। তিন. বিধিমালা প্রণয়নে লেখক শ্রেণি। চার. সাধারণ জনগণ শ্রেণি (কৃষক, দিনমজুর ইত্যাদি)। আর এই চারটি স্তরের সবগুলোই ছিল (সাসানীয়) রাজপরিবার থেকে নিম্নস্তরের। রাজপরিবার ছিল এসব শ্রেণিবিন্যাসের অনেক ঊর্ধ্বে। (১৪)

রোমসম্রাটের অবস্থাও ছিল তাই। সাম্রাজ্য পরিচালনায় তাকে অবাধ ক্ষমতা দেওয়া হতো। তিনি স্বেচ্ছাচারমূলক রাষ্ট্র পরিচালনা করার ক্ষমতা রাখতেন। চরম স্বৈরাচারী হলেও তার বিরুদ্ধে টু শব্দ করার বা সামান্য প্রতিবাদ করার সুযোগ ছিল না কারও।(১৫)

পরবর্তীকালে সম্রাট মনোনয়নের ক্ষমতা সেনাবাহিনীর হাতে চলে যাওয়ায় তা প্রহসনে রূপ নেয়। এরপর থেকে সেনা অফিসারগণই রোমান সম্রাট হতে থাকেন। এসব ক্ষমতালোভী সেনাপতিগণ রাষ্ট্রপ্রধানের পদ পেয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। পাদরি, ধর্মযাজক, জ্ঞানী-গুণী কেউই তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পেত না। এরই ধারাবাহিকতায় ২৭০ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট উরিলিয়ন(১৬) যখন রোমান সাম্রাজ্যের অধিপতি হন, তখন তাকে প্রভু বা ঈশ্বর বলে উপাধি দেওয়া হয়। সম্রাট দাকলাদিয়ানুসের শাসনামলে তা আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। তার আমলেই রোমান সাম্রাজ্য অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি, অবক্ষয়ের চরম সীমায় উপনীত হয়। পাপের সাম্রাজ্য উপাধি পায় রোম।(১৭)

মোটকথা, ধর্মীয় ও চারিত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে যেসব মূলনীতি ফকিহগণ নির্ধারণ করেছেন, মুসলিম খলিফাদের মাঝে এর সবগুলোই বিদ্যমান ছিল। তাই তো আমরা দেখতে পাই খলিফা হারুনুর রশিদ রহ. আল্লাহর ওয়াস্তে ক্ষমা চাওয়ার কারণে ওই ব্যক্তিকে মাফ করে দেন যে তার সম্মানে আঘাত করেছিল।(১৮) পারস্য ও রোমসম্রাটদের ইতিহাসে এরকম কোনো নজির নেই। আর এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা নিছক মুসলিম খলিফাদের গুণাগুণ ও ন্যায়-ইনসাফের প্রদর্শনী নয়, বরং শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাসের আলোকে প্রমাণিত মুসলিম শাসকদের বাস্তব চরিত্রের প্রতিফলন।

টিকাঃ
১০. মাওয়ারদি, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, পৃ. ৫।
১১. ইবনে কুতাইবা দিনাওয়ারি, আল-ইমামাতু ওয়াস-সিয়াসাতু, খ. ৩, পৃ. ১৯৩।
১২. আর্থার ক্রিস্টেনসেন, ইরান ফি আহদিস সাসানিয়্যিন, পৃ. ৪৩২।
১৩. প্রাগুক্ত, ৪৩৩।
১৪. প্রাগুক্ত, ৮৫।
১৫. মাহমুদ ইবরাহিম সাদানি, মাআলিমু তারিখি রুমা আল-কাদিম, পৃ. ৬৩।
১৬. বিখ্যাত রোমান সম্রাট (২১৫-২৭৫ খ্রিষ্টাব্দ)। তার সেনাশাসনের দ্বারা নিজ সাম্রাজ্যে একনায়কতন্ত্র ফিরিয়ে আনেন। আশপাশের বিচ্ছিন্ন অঞ্চলগুলোকে সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। তার আমলে প্রণীত মুদ্রার ওপর তার উপাধি লেখা ছিল 'পৃথিবীর সংস্কারক'। অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের তীরঘেঁষা ইলিরিকম এলাকায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। অবশেষে সেনাবাহিনীর হাতেই তিনি নিহত হন।
১৭. মাহমুদ মুহাম্মাদ আল-হুয়াইরি, রু'য়াতুন ফি সুকুতিল ইমবারাতুরিয়‍্যা আর-রুমানিয়্যা, পৃ. ২৫, ২৬।
১৮. তারতুশি, সিরাজুল মুলুক, পৃ. ৭১।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 আমির বা খলিফা নির্বাচন পদ্ধতি

📄 আমির বা খলিফা নির্বাচন পদ্ধতি


খলিফা বা আমির মনোনয়নে শরিয়ত সবচেয়ে উত্তম ও ন্যায়সংগত পদ্ধতি প্রবর্তন করেছে। এ ক্ষেত্রে ইসলামি সংস্কৃতি অন্যান্য সকল সভ্যতাকে ছাপিয়ে এক অনন্য আসন গ্রহণ করেছে, এটি অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। চিরসুন্দর এই ইসলামি সভ্যতা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদের জন্য যোগ্য ব্যক্তি নির্বাচনে যে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন করেছে, তা হলো শুরা (শ্রেষ্ঠ ও যোগ্য ব্যক্তিদের সর্বসম্মত পরামর্শক্রমে গঠন) পদ্ধতি। এই শুরা পদ্ধতি যে নিরেট ইসলামি সভ্যতার সৃষ্টি এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র কারও সন্দেহ থাকার কথা নয়। ইসলাম ও মানবসভ্যতায় শুরার অপরিসীম গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে এর জন্য আমরা স্বতন্ত্র একটি অনুচ্ছেদ গঠন করেছি।

আর চলমান অনুচ্ছেদে শুধু খলিফা নির্বাচনে মুসলিমগণ যেসব আধুনিক ও যুগোপযোগী পন্থা আবিষ্কার করেছেন সেগুলো নিয়ে আলোচনা করব। কোনো সন্দেহ নেই ইসলামের একেবারে সূচনালগ্নে খুলাফায়ে রাশেদিনের নির্বাচনপ্রক্রিয়া সংঘটিত হয় চারটি ধাপে। সব খলিফার ক্ষেত্রে হুবহু এক রকম না হলেও মৌলিকভাবে প্রক্রিয়াগুলো অভিন্ন। ইসলামি সভ্যতা মুসলিম জনসাধারণের সামনে চারটি শরিয়তসম্মত পথ ও পদ্ধতির বিবরণ দিয়েছে, যেগুলোর নিরিখে মুসলিমদের ইমাম ও খলিফা নির্বাচন সম্ভব। নেতা নির্বাচনের বিষয়ে এটি গোটা বিশ্বমানবতার জন্য ইসলামি সভ্যতার এক অনন্য অবদান।

সবচেয়ে সুন্দর উদাহরণ ও শ্রেষ্ঠ নমুনা আমরা দেখতে পাই আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতিনিধি নির্বাচনের বেলায়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইনতেকালের পর তার খলিফা নির্বাচনের বিষয়ে সাকিফায়ে বনি সাদে আনসার সম্প্রদায় বৈঠকে বসে। তাদের মাঝে কেবল তিনজন ছিলেন মুহাজির: আবু বকর রা., উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এবং আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রা.। বৈঠকে সিংহভাগ সদস্য আনসার হওয়া সত্ত্বেও তারা এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে উপনীত হন। খলিফা নির্বাচনে মুহাজির সদস্যকে প্রাধান্য দেন। আবু বকর রা.-এর হাতে তারা বাইআত গ্রহণ করেন। বিশেষ করে আবু বকর রা. কুরাইশ গোত্রের 'তিম' নামক এক দুর্বল শাখার সদস্য এ কথা জানার পরও আনসারদের এ সিদ্ধান্ত বিশ্ব-ইতিহাসে নজিরবিহীন। অপরদিকে আনসারগণ সব দিক থেকেই ছিলেন এগিয়ে। দেশ তাদের। ভূখণ্ড তাদের। এরপরও তারা আবু বকরকে নেতা হিসেবে এগিয়ে দেন। কারণ তিনিই ছিলেন ধর্মীয় ও আদর্শগত দিক থেকে সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি। এই পদ্ধতিকে আমরা 'সরাসরি জনগণ কর্তৃক নির্বাচন পদ্ধতি' হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি। (১৯)

ঠিক তেমনই আবু বকর রা. যেভাবে উমর রা.-কে তার পরবর্তী খলিফা হিসেবে নিযুক্ত করেন সেটিও ইতিহাসের পাতায় রাজনৈতিক সভ্যতার দ্বিতীয় আরেকটি উদাহরণ হয়ে আছে। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ তাবারি রহ. লেখেন, মৃত্যুরোগে আক্রান্ত অবস্থায় আবু বকর রা. জনসম্মুখে আগমন করেন। তাদের উদ্দেশে ভাষণে তিনি বলেন, আমি যদি কাউকে খলিফা হিসেবে নিযুক্ত করে যাই, তাহলে আপনারা সন্তুষ্ট থাকবেন?! আল্লাহর শপথ, আমি এ বিষয়টি ভাবতে কোনো ত্রুটি করিনি এবং কোনো আত্মীয়স্বজনকেও আমি প্রস্তাব করছি না। বরং উমর ইবনুল খাত্তাবকে আমার প্রতিনিধি নির্বাচন করছি। আপনারা সবাই তার কথা শুনবেন। তার আনুগত্য করবেন। এরপর সকলে সমস্বরে বলল, আমরা আপনার কথা শুনলাম এবং নির্দ্বিধায় মেনে নিলাম। (২০)

প্রস্তাবটি ছিল আবু বকর রা.-এর পক্ষ থেকে জনগণের উদ্দেশে। খলিফা নির্বাচনের বিষয়টি আবু বকর রা.-এর একান্ত কর্তব্য ছিল না। জনগণও ছিলেন এ ব্যাপারে স্বাধীন। কিন্তু আবু বকর রা.-এর প্রস্তাবকে তারা প্রত্যাখ্যান করেননি। কারণ জনগণের উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে এবং দেশের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষের সামনে তিনি এ প্রস্তাব পেশ করেন। আবু বকর রা.-ও বিষয়টি মুখ ফসকে আচমকা বলে দেননি, বরং এর আগে এ বিষয়ে তিনি বড় বড় সাহাবির মতামত গ্রহণ করেন। তাবারি রহ. লেখেন, মৃত্যুশয্যায় আবু বকর রা. আবদুর রহমান ইবনে আওফকে ডেকে বললেন, উমর সম্পর্কে আপনার মতামত বলুন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুলের খলিফা, আল্লাহর শপথ! তিনি অন্য সবার চেয়ে উত্তম। তবে তার মধ্যে কিছু কঠোরতা আছে। তখন আবু বকর রা. বললেন, আবদুর রহমান ইবনে আওফ এ কথা এজন্য বলেছে, যেহেতু সে আমাকে নরম দেখেছে। তবে খিলাফতের দায়িত্ব তার কাঁধে চাপলে তিনি অনেক বিষয়ে কঠোরতা বর্জন করবেন। হে আবু মুহাম্মাদ, আমি তাকে খুব যাচাই করেছি। দেখেছি, আমি কোনো বিষয়ে কারও ওপর রেগে গেলে তিনি আমাকে তা মেনে নিতে বলেন। কারও প্রতি আমি নরম হলে সে ক্ষেত্রে তিনি কঠোর হওয়ার পরামর্শ দেন। হে আবু মুহাম্মাদ, আপনাকে যা বললাম তা কারও কাছে প্রকাশ করবেন না।

উত্তরে তিনি বললেন, জি আচ্ছা। এরপর উসমান ইবনে আফফান রা.-কে ডেকে বললেন, হে আবু আবদুল্লাহ, উমর সম্পর্কে আপনার মতামত দিন। উত্তরে উসমান রা. বললেন, তার সম্পর্কে আপনিই বরং বেশি অবগত। তখন আবু বকর রা. বললেন, হ্যাঁ, তার সম্পর্কে আমার ভালো জানা আছে। উসমান রা. বললেন, তবে আল্লাহর শপথ, যতদূর জানি বাহ্যিক রূপের চেয়ে তার ভেতরের রূপটা আরও বেশি উত্তম। আমাদের মাঝে তার কোনো জুড়ি নেই। তা শুনে আবু বকর রা. বললেন, আল্লাহ আপনাকে রহম করুন হে আবু আবদুল্লাহ। আমি যা বলেছি তা কারও সামনে প্রকাশ করবেন না। তিনি বললেন, আপনার যেমন ইচ্ছা। (২১) এভাবেই উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর খলিফা হওয়ার প্রক্রিয়াটি পূর্ববর্তী খলিফার প্রস্তাবের ভিত্তিতে ইজমায়ে উম্মতের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।

বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে ইসলামি সভ্যতার অনন্য কীর্তির উদাহরণ আমরা তৃতীয় খলিফা নির্বাচনের বেলায়ও দেখতে পাই। উমর ইবনুল খাত্তাব রা. জীবনের অন্তিম মুহূর্তে ছয়জন বড় বড় সাহাবিকে মনোনয়ন করেন পরামর্শের জন্য। এই ছয়জনের সম্মান ও মর্যাদার ব্যাপারে মদিনার বাইরের এবং ভেতরের কারও কোনো দ্বিমত ছিল না। মুসলিম নেতা নির্বাচনে তাদের থেকেই যে সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ মতামত পাওয়া যাবে এ বিশ্বাস সবার ছিল। বাস্তবতা হলো উমর রা. তাদেরকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সন্তুষ্টির ভিত্তিতেই মনোনীত করেছিলেন। কারণ তারা আশারায়ে মুবাশশারা তথা পৃথিবীতেই জান্নাতের সুসংবাদ লাভ করা দশজনের তালিকাভুক্ত ছিলেন। মূলত নির্বাচিত এ দলটি ছয়জনের নয়, ছিল সাতজনের। তারা হলেন উসমান ইবনে আফফান রা., আলি ইবনে আবু তালিব রা., আবদুর রহমান ইবনে আওফ রা., সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা., যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা., তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা.) আর সপ্তমজন ছিলেন সাইদ ইবনে যায়দ ইবনে আমর ইবনে নুফাইল রা.; কিন্তু নিকটাত্মীয়তা থাকায় তাকে তিনি এ কমিটির বাইরে রাখেন। উমরের বংশের আর কেউ এ পদে আসুক, তা তিনি চাননি। তিনি বলতেন, উমরের বংশের কেবল একজনই হোক, আর কাউকে যেন এ পদের জন্য আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে না হয়। (২২)

কোনো সন্দেহ নেই উমর রা.-এর এই মনোনয়নকমিটি গঠন মুসলিমদের সাধারণ-বিশেষ সকল শ্রেণির কাছে ছিল সমাদৃত, বরং এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, তৎকালীন বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে যে কৌশল অবলম্বন এবং যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন ছিল, উমর রা.-এর এই মনোনয়ন পদ্ধতি ছিল তার সঙ্গে পুরোমাত্রায় সংগতিপূর্ণ। এরকম নতুন পরিস্থিতিতে উমর রা. একা খলিফা নির্বাচন করে যাবেন তা যুক্তিযুক্ত ছিল না। এর সঙ্গে প্রতিনিয়ত বিশ্বপরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে থাকায় এর সঙ্গে খলিফা নির্বাচনের বিষয়টি জড়িয়ে গেলে বড় রকম কোনো দুর্ঘটনার আশঙ্কা ছিল। যাই হোক, উমর রা.-এর কমিটি গঠন ছিল পুরোপুরি শরয়ি নীতিমালার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ কারণেই উমর রা.-এর আহলে শুরা বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যেই পরামর্শের ভিত্তিতে খলিফা নির্বাচনের কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হন। উসমান ইবনে আফফান রা.-কে তৃতীয় খলিফা হিসেবে নির্বাচনের ব্যাপারে সবাই একমত পোষণ করেন। আর এভাবেই উমর রা.-এর মাধ্যমে একটি সম্পূর্ণ শরিয়াভিত্তিক সুষ্ঠু নেতা নির্বাচনব্যবস্থার গোড়াপত্তন হয়।

চতুর্থ পদ্ধতিটি আলি ইবনে আবু তালিব রা.-কে খলিফা হিসেবে নির্বাচনের বেলায় আমরা দেখতে পাই। এটা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত এবং কঠিন ফেতনার সময়। (২৩) সে কারণে সঠিক ও যোগ্য মানুষের নেতৃত্ব গ্রহণ তখন জরুরি হয়ে পড়ে। কারণ ফেতনার উদ্ভবই ঘটেছিল পূর্ববর্তী খলিফাকে হত্যার মধ্য দিয়ে। তাই এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে এবং ফেতনা বড় আকার ধারণ করার আগেই তা মূলোৎপাটন করা জরুরি ছিল। আলি ইবনে আবু তালিব রা. ছাড়া অন্য কারও হাতে মুসলিমগণ বাইআত গ্রহণ করবেন সেই পরিস্থিতি তখন আর অবশিষ্ট ছিল না। শেষ পর্যন্ত তিনিই খলিফা হন এবং মসজিদে নববিতে বাইআত গ্রহণ করার শর্ত জুড়ে দেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর মতো অনেক সাহাবি এরকম জটিল ও কঠিন পরিস্থিতিতে মসজিদে বাইআত গ্রহণ করা হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন; কিন্তু মুহাজির ও আনসার সকল সাহাবি শেষ পর্যন্ত মসজিদে নববিতেই আলি রা.-এর হাতে বাইআত গ্রহণ করেন। (২৪) এ ধরনের জটিল ও উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে নেতা নির্বাচনের যে প্রক্রিয়া মুসলিমগণ উপহার দেন, সেখান থেকে আমরা সঠিক সময়ে যোগ্য ব্যক্তিকে নেতা হিসেবে নির্বাচন করার পদ্ধতি আবিষ্কার করি।

উপর্যুক্ত চারটি ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে চার পদ্ধতিতে সফলভাবে নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া বিশ্ব রাজনীতির সামনে ইসলামি সভ্যতার এক অনন্য অবদান। পরিস্থিতি কখনো ছিল শান্তিপূর্ণ আর কখনো ছিল যুদ্ধ ও ফেতনা কবলিত। তবে যাই হোক, সবগুলো পদ্ধতির মূলে ছিল শুরা এবং বাইআত গ্রহণ প্রক্রিয়া। এ দুটি বিষয়ে আমরা স্বতন্ত্র অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। পাশাপাশি উত্তরাধিকারীকে বা নিকটস্থ কাউকে খলিফা নির্বাচনের বিধান নিয়েও আমরা আলোকপাত করব।

প্রকৃত বাস্তবতা এই যে, চার খলিফা এবং তাদের পরবর্তী সময়ে মুসলিমগণ নেতা নির্বাচনে যেসব পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন, যে আদর্শ পৃথিবীবাসীর সামনে রেখে গেছেন, তা মূলত শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় ইসলামি শরিয়ার প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে। যা বিচিত্র পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার এবং ফেতনা নিয়ন্ত্রণে ইসলামি সভ্যতার সামর্থ্য ও সক্ষমতার প্রমাণ দেয়। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে ইসলামি সভ্যতা এ ধরনের শান্তিপূর্ণ ও সফল নির্বাচন প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করে অন্য সব সভ্যতাকে ছাপিয়ে গেছে।

আর ইসলামের ইতিহাসে গভর্নর বা আমির নির্বাচনের প্রক্রিয়া ছিল আরও সুন্দর ও বৈচিত্র্যময়। আমির পদপ্রার্থীদের জন্য বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি আদর্শ উপদেশ বা অনন্য মূলনীতি রেখে গেছেন। আবদুর রহমান ইবনে সামুরা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, হে আবদুর রহমান ইবনে সামুরা, কখনো তুমি নেতৃত্ব প্রার্থনা করো না। কারণ প্রার্থনা করে নেতৃত্ব লাভ করলে এর যাবতীয় দায়ভার তোমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে (আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতার সুযোগ থাকবে না)। আর বিনা প্রার্থনায় পেলে তোমাকে সহযোগিতা করা হবে। (২৫)

আর তাই দায়িত্ব প্রদানের সময় বা নেতা নির্বাচনের বেলায় নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবসময় এই মূলনীতিকে সামনে রাখতেন। আবু যর রা. বলেন, একবার আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আমাকে গভর্নর নিযুক্ত করুন। এ কথা শুনে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার কাঁধে হাত চাপড়ে বলেন, হে আবু যর, তুমি দুর্বল। আর নেতৃত্ব একটি আমানত। কেয়ামতের দিন তা অপমান আর লাঞ্ছনার কারণ হবে। তবে তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় গ্রহণ করে প্রত্যেকের হক আদায় করে থাকলে সেই অপমান আর লাঞ্ছনা থেকে মুক্তি মিলবে। (২৬)

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন গোটা মুসলিম জাতির নেতা। নেতৃত্বের এই গুরুভার কে যথাযথভাবে পালন করতে পারবে আর কে পারবে না এ সম্পর্কে তিনিই সবচেয়ে বেশি অবগত। এ কথা পুরোপুরি জেনেই তিনি আবু যর রা.-কে এই দায়িত্বের অনুপযোগী বলেছিলেন। নেতৃত্ব পেলে যথাযথভাবে হয়তো হক আদায় করতে পারবে না এ আশঙ্কায় আবু যর রা.-কে তিনি নেতৃত্ব থেকে দূরে থাকতে বলেছিলেন। কোনো সন্দেহ নেই এটিই হলো যোগ্য ব্যক্তিকে নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে নববি পদ্ধতি ও ইসলামি সভ্যতার মূলনীতি। স্বজন বা বন্ধু হলেও অযোগ্যদের নির্বাচন না করে যোগ্য ও উপযুক্ত নেতা নির্বাচনে ইসলামি সভ্যতার এক অনন্য অবদান এই ‘নির্বাচনপ্রক্রিয়া’।

আর সুষ্ঠুভাবে নির্বাচনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্যে দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোক দেখে তিনি নেতা বা গভর্নর নির্বাচন করতেন। আত্মীয় হওয়া সত্ত্বেও তুলনামূলক এ বিষয়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ না হওয়ায় অনেককে তিনি এ পদের জন্য মনোনীত করেননি। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো, ইয়ামেনের গভর্নর হিসেবে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক বাহরাম জুরের পুত্র বাযান ইবনে সাসান রা.-কে মনোনীত করা। যাদুল মাআদ গ্রন্থে ইবনুল কাইয়িম রহ. লেখেন, 'বাযান ইবনে সাসান রা.-কে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গোটা ইয়ামেনের গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করেন। ইসলামের ইতিহাসে ইয়ামেনের প্রথম গভর্নর এবং অনারব রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে প্রথম ইসলামগ্রহণকারী তিনিই। বাযান রা.-এর মৃত্যুর পর তারই পুত্র শাহর ইবনে বাযান রা.-কে 'সানা'র প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত করেন। শাহর রা. নিহত হলে সাইদ ইবনুল আসের পুত্র খালেদ রা.-কে তার স্থলাভিষিক্ত করেন। আর কিন্দা ও সাদাফে নিয়োগ করেন মুহাজির ইবনে উমাইয়া মাখযুমি রা.-কে। (২৯)

বিশ্বনবীর যুগ থেকে বহুকাল অবধি ইসলামি সভ্যতায় দক্ষ, যোগ্য ও উপযুক্ত ব্যক্তিদেরকেই শুধু নেতৃত্বের পদগুলোতে নিয়োগ করা হতো। ইবনুল কাইয়িম রহ.-এর বিবরণে এ কথারই প্রমাণ মেলে। কারণ সে সময় মক্কা ও মদিনার জন্য ইয়ামেন ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রদেশ। সদকা, উশর ও ভূমিকরের প্রচুর অর্থ আসত ইয়ামেন থেকে। সেই বিবেচনায় এই ভূখণ্ডে নিযুক্ত গভর্নরকে অবশ্যই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শুল্ক উত্তোলন বিষয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হতে হবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

নেতৃত্বপ্রার্থী বা মনোনয়নপ্রত্যাশীর মধ্যে বেশ কিছু গুণ থাকা আবশ্যক বলেছেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রা.। তার ভাষায়, ‘নেতৃত্বের জন্য চারটি গুণ অবশ্যই লাগবে। এর একটিতে যদি সামান্য ঘাটতি থাকে, তবে সে নেতৃত্বের যোগ্য নয়। শর্তগুলো হলো : ন্যায়সংগত পন্থায় অর্থ উসুলের সামর্থ্য, যথাযথ পদ্ধতিতে অর্থ ব্যয়, স্বেচ্ছাচারিতা না করে কড়াকড়ি আরোপ এবং লজ্জায় না ফেলে এমন নম্রতা অবলম্বন।’(২৮)

তা ছাড়া উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এমনি হুট করে নেতা বা গভর্নর নির্বাচন করতেন না, বরং প্রকাশ্যে ও গোপনে তাকে বারবার যাচাই করতেন। নিবিড়ভাবে তার কার্যক্রম ও গতিবিধি লক্ষ করতেন। তার সম্পর্কে নিকটস্থদের জিজ্ঞেস করতেন। তার যোগ্যতা ও দক্ষতা সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে তবেই তাকে এ পদের জন্য মনোনীত করতেন। শর্ত জুড়ে দিতেন, মানুষের প্রয়োজন যতদিন পূরণ না হয়, ততদিন যেন তার দরজা উন্মুক্ত থাকে। যারা এ পদের প্রার্থী হতে চায়, সবসময় তিনি তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ দিতেন। তিনি বলতেন, যে ব্যক্তি পদ প্রার্থনা করবে, তাকে এ ব্যাপারে সহায়তা করা হবে না। এ কথার প্রবক্তা তিনিই প্রথম নন, বরং নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে এক ব্যক্তি এ পদের প্রার্থনা করলে বিশ্বনবী স্পষ্ট বলে দেন, 'যে ব্যক্তি এ পদ প্রার্থনা করবে, তার দ্বারা আমরা এ কাজে সহায়তা নেব না।'(২৯)

এ পদের যোগ্য ব্যক্তিদের মাঝে দয়া ও নম্রতার গুণ থাকা জরুরি মনে করতেন উমর ইবনুল খাত্তাব রা.। এসব গুণ না থাকলে তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে দিতেন। একবার বহু যাচাইবাছাই করে এক ব্যক্তিকে তিনি কোনো এক এলাকার প্রশাসক হিসেবে মনোনীত করতে চাইলেন। সভায় নিয়োগপত্র লেখা হচ্ছিল। এমন সময় এক শিশু এসে উমর রা.-এর কোলে উঠে বসল। উমর রা. শিশুটিকে আদর করলেন। তা দেখে লোকটি বলল, হে আমিরুল মুমিনিন, এর মতো আমার দশজন পুত্র রয়েছে। কেউ কখনো আমার কোলে উঠার সাহস করেনি। তখন উমর রা. বললেন, আল্লাহ যদি তোমার অন্তর থেকে দয়া বিলুপ্ত করে দেন, এতে আমার কী করার আছে! যারা দয়া করে, আল্লাহ তাদের প্রতিও দয়া করেন। এরপর কাতেবকে নিয়োগপত্র ছিঁড়ে ফেলার আদেশ দিয়ে বলেন, 'যে লোক নিজের পুত্রদের দয়া দেখাতে পারে না সে জনগণের ওপর কী দয়া দেখাবে?!) (৩০)

আমরা দেখতে পাই, নেতা নির্বাচনে এরকম সুষ্ঠু সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণেই তখনকার গভর্নর ও শাসকগণ ছিলেন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে বহুমাত্রিক যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার অধিকারী। যার মধ্যে অন্যতম হলেন আমর ইবনুল আস রা.। মিশরের গভর্নর হিসেবে উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর নিয়োগ করা বিশিষ্ট এই সাহাবি মাত্র তিন হাজার পাঁচশ যোদ্ধা নিয়ে মিশর অভিযানে যান। (৩১) বিজয়ের পর মিশরবাসীর জন্য তিনি বহুমুখী উন্নয়নপ্রকল্প হাতে নেন। অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনে অনেকগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এ কারণেই তার শাসনামলে মিশরে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির জোয়ার ছিল। তিনি জনগণকে প্রাণাধিক ভালোবাসতেন। তার আমলে মানুষ ন্যায্য ও স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের সুযোগ লাভ করে। এ সময় 'ফুসতাত' শহরকে তিনি উন্নত নগরী হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। (৩২) সমুদ্রপথে হেজায পর্যন্ত যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আনা-নেওয়া সহজ করতে উপসাগরকে লোহিত সাগর পর্যন্ত খননের প্রকল্প গ্রহণ করেন। (৩৩) সেখানে তিনি একটি বড় মসজিদ নির্মাণ করেন, তার নামেই এর নামকরণ করা হয়। এখনো পর্যন্ত মিশরের বুকে আমর ইবনুল আস নামের সেই মসজিদটি ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে বুক উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

খলিফা উমর ইবনে আবদুল আযিযও প্রশাসক নির্বাচনে এমনই যাচাইপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতেন। পরীক্ষা করতেন। মনের অবস্থা ও যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য বারবার বিভিন্নভাবে তাদের পরখ করতেন। উমর ইবনে আবদুল আযিয রহ. খলিফা হওয়ার পর বেলাল ইবনে আবি বুরদা (৩৪) এসে তাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, যে-ই খলিফা হয়েছে সে-ই সম্মানিত হয়েছে। আপনিও এ পদকে মর্যাদাপূর্ণ করেছেন। সুশোভিত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছেন। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। এরপর বেলাল মসজিদবান্ধব হয়ে পড়েন। দিনরাত সেখানে পড়ে থেকে তিনি তেলাওয়াতে মশগুল থাকেন। তা দেখে উমর ইবনে আবদুল আযিয রহ. তাকে ইরাকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগের ইচ্ছা পোষণ করে বলেন, এই লোকটি খুব ভালো এবং এ পদের জন্য সে উপযুক্ত ও নির্ভরযোগ্য।

এরপর নিজের একজন বিশ্বস্ত লোককে তার কাছে পাঠালেন। সে তাকে বলল, তোমাকে ইরাকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ করলে আমাকে তুমি কী দেবে? এ প্রস্তাব পেয়ে বেলাল তাকে প্রচুর অর্থ দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। এ কথা উমরের কানে যাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন এবং তাকে সেখান থেকে বের করে দিয়ে বলেন, হে ইরাকবাসী, তোমাদের এ সঙ্গী কথা বলতে পারে ভালো, তবে তার জ্ঞান-বুদ্ধির যথেষ্ট অভাব। তার ভাষার পাণ্ডিত্য প্রচুর, তবে তার নিষ্ঠায় ঘাটতি অনেক। (৩৫)

জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং তাদের মাঝে ন্যায়-ইনসাফের শাসন কায়েম করতে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পাদনের সময় অধিকাংশ খলিফা গভর্নরদের উপদেশ দিতেন। খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান তার ভাই আবদুল আযিযকে মিশরের দায়িত্ব দিয়ে পাঠানোর সময় উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিলেন,
সুখ ও সমৃদ্ধি ছড়িয়ে দাও। সহযোগীদের প্রতি নম্র হও। সকল কাজে সৌহার্দ্যপূর্ণ মনোভাব বজায় রাখো। কারণ সৌহার্দ্যের মাধ্যমেই লক্ষ্য অর্জিত হয়। তোমার সহযোগীরা যেন হয় শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ। কারণ তারাই তোমার অবয়ব ও বাহ্যিক রূপ। তোমার দরবারে আগতদের তুমি ভালো করে দেখে নিয়ো। যেন তুমি নিজেই তাকে নিয়োগ বা বিয়োগ করতে পারো। মজলিস শেষ করে সবাইকে সালাম দিয়ো, তাহলে তারা তোমার প্রতি সদয় হবে এবং তাদের অন্তরে তোমার প্রতি আস্থা ও ভালোবাসার জায়গা তৈরি হবে। কোনো সমস্যা বা জটিলতা তৈরি হলে তাদের সঙ্গে পরামর্শে বসো। কারণ পরামর্শের মাধ্যমে জটিল ও কঠিন বিষয়গুলো সহজ হয়ে যায়। কারও ওপর অসন্তুষ্ট হলে একটু বিলম্বে শাস্তি দিয়ো। কারণ হুট করে দণ্ড বাস্তবায়ন করে ফেললে কোনো কারণে সিদ্ধান্ত মূলতবি হলে তখন আর কিছুই করার থাকবে না। (৩৬)

এই ছিল মিশরের জন্য নবনিযুক্ত গভর্নরের উদ্দেশে খলিফা আবদুল মালিকের উপদেশবাণী। এতে যেকোনো গভর্নরের জন্য প্রশাসনিক কার্যসম্পাদনের প্রধান প্রধান মূলনীতি অন্তর্ভুক্ত আছে। এখান থেকে আমরা বুঝতে পারি, গভর্নর ও প্রশাসক নিবাচনে ইসলামি সভ্যতা এরকম হাজারও সফল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। পূর্ববর্তীকালের মুসলিম শাসকদের স্থাপন করা এসব উদাহরণ বিশ্বমানবতার কল্যাণে ইসলামি সভ্যতার অনন্য অবদানের বিষয়টি পরিষ্কারভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

টিকাঃ
১৯. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ২, পৃ. ২৪৩-২৪৫।
২০. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ২, পৃ. ৩৫২-৩৫৩।
২১. প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৩৫২।
২২. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ২, পৃ. ৮৫০।
২৩. আলি রা.-কে খলিফা হিসেবে নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়া এবং তৎকালীন মদিনার পরিস্থিতি নিয়ে ফেতনার অধ্যায়ে আমরা সবিস্তারে আলোচনা করব।
২৪. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ২, পৃ. ৬৯৬।
২৫. বুখারি, কিতাবুল আইমান ওয়ান-নুযুর, ৬২৪৮; মুসলিম, কিতাবুল আইমান, ১৬৫২।
২৬. মুসলিম, কিতাবুল ইমারা, ১৮২৫।
২৯. ইবনুল কাইয়িম, যাদুল মাআদ, খ. ১, পৃ. ১২৫।
২৮. তারতুশি, সিরাজুল মুলুক, পৃ. ৫০।
২৯. নাসায়ি, ৪, ইবনে হিব্বান, ১০৭১।
৩০. ইবনুল জাওযি, তারিখু উমার, পৃ. ১০৪-১০৫।
৩১. ইবনে আবদুল হাকাম, ফুতুহু মিসর ওয়া আখবারুহা, পৃ. ৬৫।
৩২. প্রাগুক্ত, ১০৫।
৩৩. প্রাগুক্ত, ১৭৯।
৩৪. বেলাল ইবনে আবি বুরদা আমের ইবনে আবু মুসা আল আশআরি। তিনি بصرার আমির ও কাযি ছিলেন। মর্যাদাবান লোক ছিলেন। দেখুন, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ৫, পৃ. ৬।
৩৫. ইবনে আসাকির, তারিখু দিমাশক, খ. ১০, পৃ. ৫১০।
৩৬. ইবনুত তিকতাকি, আল-ফাখরিয়্যু ফিল-আদাবিস সুলতানিয়্যা ওয়াদ-দুওয়ালিল ইসলামিয়্যা, ১২৬।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 বাইআত (তথ্য খলিফার আনুগত্যের অঙ্গীকার)

📄 বাইআত (তথ্য খলিফার আনুগত্যের অঙ্গীকার)


বিশ্বমানবতার কল্যাণে কাজ করা সকল সভ্যতার মধ্যে ইসলামি সভ্যতা এক অনন্য আসন তৈরি করেছে। সকল ধর্মের জন্য ইসলামি সভ্যতার চমৎকার ও উল্লেখযোগ্য অবদানগুলোর একটি হচ্ছে বাইআত (খলিফার আনুগত্যের অঙ্গীকার) ব্যবস্থা। লক্ষণীয় বিষয়, এর আগে কোনো সভ্যতায় বাইআত ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল না। বাইআতের অর্থ যদি হয় আনুগত্য ও বশ্যতা স্বীকার, অপর দিকে এর অর্থ হলো, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। যদিও ইসলামের রাজনৈতিক ইতিহাসে এর পরিমাণ খুব সামান্যই দেখা যায়। তারপরও এটি ইসলামি রাজনৈতিক ব্যবস্থার অন্যতম সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য।

'বাইআত' মানে প্রশাসকের বিধিনিষেধ মানা এবং তার সকল কার্যক্রম বাস্তবায়ন করার ব্যাপারে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অঙ্গীকারনামা। সেই কার্যক্রমের মূল হলো আল্লাহর শরিয়ত অনুযায়ী দ্বীন ও দুনিয়ার সকল সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করা। পাঠক জেনে অবাক হবেন, বাইআতের বেলায় ইসলাম নারী-পুরুষ বা বড়-ছোটর মাঝে কোনো তারতম্য করেনি। এটিই জনগণের মধ্যে সাম্য ও ভারসাম্য তৈরি করার অন্যতম উপাদান। কারণ, দেশ ও সমাজের উন্নয়নে সকল শ্রেণির অবাধ অংশগ্রহণের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার শিক্ষা দিয়েছে ইসলাম।

ইসলামি সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই আলো ছড়িয়েছে বাইআত। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে সাহাবিগণ একাধিকবার বাইআত গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: প্রথম ও দ্বিতীয় আকাবার বাইআত, বাইআতুর রিদওয়ান, বিশ্বনবীর হাতে তায়েফবাসীর বাইআত গ্রহণ ইত্যাদি। এ ছাড়াও ছোট-বড় বহু দল তার কাছে বাইআত গ্রহণ করেছিল। আল্লাহর রাসুলের হাতে বাইআত গ্রহণ করা পুরুষদের সংখ্যা অগণিত। তেমনই মহিলাদের মধ্যেও বিরাট সংখ্যক আল্লাহর রাসুলের হাতে বাইআত গ্রহণ করেছেন বলে প্রমাণিত। ইমাম ইবনুল জাওযি রহ. রাসুলের হাতে বাইআত গ্রহণকারী নারীর সংখ্যা ৪৫৭ উল্লেখ করেছেন। তবে তারা সবাই মুসাফাহার মাধ্যমে নয়, মৌখিকভাবে বাইআত গ্রহণ করেন। এমনকি আমরা দেখতে পাই, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিশুদের পর্যন্ত বাইআত করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইরের বাইআত গ্রহণকালে তার বয়স ছিল মাত্র সাত বছর। (৩৭)

এখান থেকে আমরা বুঝতে পারি, ইসলামি সভ্যতা এক পরিপূর্ণ ও সফল সভ্যতা। এক জীবন্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থা। যা সমাজের প্রতিটি সদস্যের জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করে। আশপাশে ঘটে যাওয়া সকল ঘটনায় তার সুষ্ঠু অংশগ্রহণে জোর তাগিদ দেয়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রাজনৈতিক আদর্শ থেকেও এর প্রমাণ মেলে। ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রথম দিন থেকেই তিনি বাইআতের রীতি প্রচলন করেন। কুরআনুল কারিমের একাধিক স্থানেও আমরা বাইআতের উল্লেখ পাই। এখান থেকেই ইসলামি সভ্যতায় বাইআতের গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়। সুরা ফাতহ-এ মহান আল্লাহ বলেন,

إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ যারা আপনার কাছে আনুগত্যের শপথ করে, তারা তো মূলত আল্লাহর কাছেই আনুগত্যের শপথ করে। তাদের হাতের ওপর রয়েছে আল্লাহর হাত। (৩৮)

একই সুরায় অন্যত্র বলেন, لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, যখন তারা বৃক্ষের নিচে আপনার কাছে শপথ করল। তাদের অন্তরে যা ছিল আল্লাহ সে সম্পর্কে অবগত ছিলেন। এরপর তিনি তাদের প্রতি প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদের পুরস্কার দিলেন আসন্ন বিজয়। (৩৯)

ইসলামি সভ্যতা বিনির্মাণে নারীদের অংশগ্রহণের গুরুত্ব বোঝাতে আল- কুরআনে নারীদের প্রতিও বাইআত গ্রহণের নির্দেশ এসেছে। মহান আল্লাহ বলেন,

فَبَايِعْهُنَّ وَاسْتَغْفِرْ لَهُنَّ اللَّهَ

তাদের (নারীদের) বাইআত গ্রহণ করুন এবং তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। (৪০)

বিশ্বনবীর পরিপূর্ণ অনুকরণ নিশ্চিত করতে মুসলিমগণ পরবর্তীকালে বাইআতকে রাজনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং নেতা নির্বাচনে জনগণের সুষ্ঠু অংশগ্রহণের অন্যতম উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করেন।

সম্মিলিত পরামর্শ ছাড়া একজনের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নেতা নির্বাচনের ঘোর বিরোধী ছিলেন উমর ইবনুল খাত্তাব রা.। হজের সময় একবার এ বিষয়টি তার কানে গেলে মুসলিমবিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আগত হাজিদের উদ্দেশে খলিফা নির্বাচনের শর্ত এবং বাইআত ও শপথ গ্রহণ সংক্রান্ত একটি ভাষণ প্রদানের সিদ্ধান্ত নেন। তখন কেউ কেউ বললেন, হজের মৌসুমে তো বিভিন্ন ধরনের মানুষের সমাগম হয়। তাদের মধ্যে এমনও আছে যারা আরবি ভাষা ঠিকমতো বোঝে না। ফলে তারা বিষয়টি ভালোভাবে না বুঝেই তাদের দেশে ফিরে যাবে এবং এতে আরও বেশি বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। তারচেয়ে ভালো হবে আপনি বিষয়টি মুলতবি রেখে মদিনায় ফেরার পর জ্ঞানী-গুনী ও বুদ্ধিমানদের সামনে এ নিয়ে কথা বললে। উমর রা. তাই করলেন। আল্লাহর রাসুলের মিম্বারের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা দিলেন, আমার কাছে সংবাদ এসেছে, আপনাদের মাঝে অনেকে বলেন, আল্লাহর শপথ, উমরের ইনতেকাল হয়ে গেলে আমি অমুকের হাতে বাইআত গ্রহণ করব। ভালো করে শুনে রাখো, আবু বকরের বাইআত গ্রহণটি ছিল একটি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি ত্বরিত শপথ গ্রহণ মাত্র-এ কথা বলে কেউ যেন প্রতারিত না হয়। হ্যাঁ, সেটি এরকমই ছিল। তবে এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন। আবু বকরের মতো গুরুজন এমন কেউ নেই এখন, যার দিকে মানুষ ঘাড় উঁচু করে দেখে। মুসলিমদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত ছাড়া যার হাতে বাইআত গ্রহণ করা হবে, বাইআতগ্রহীতা ও বাইআতকারী উভয়েই হত্যার উপযুক্ত সাব্যস্ত হবে। (৪১) এরপর তিনি আবু বকর রা.-এর শপথ গ্রহণের বিষয়টি টেনে তখনকার পরিস্থিতির কথা মানুষের সামনে তুলে ধরেন। ত্বরিত বাইআত গ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হলে মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কার বিষয়টি তিনি মানুষের কাছে পরিষ্কার করেন। আর আবু বকর রা.-এর গ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারে কোনো মুসলিমের মনে বিন্দুমাত্র সংশয় ছিল না। পক্ষান্তরে উমর রা.-এর বাইআত গ্রহণের বিষয়টিও ছিল বড় মাপের একদল সাহাবির সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ফসল। পরবর্তীকালে তা ইজমায়ে উম্মত হিসেবে গণ্য হয়। এ থেকেই বিষয়টি পরিষ্কার যে, বাইআত বা শপথ গ্রহণ প্রক্রিয়া অবশ্যই সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতেই অনুষ্ঠিত হবে। মনোনীত ও বিজ্ঞ, জ্ঞানী ও আলেমদের পরামর্শের মাধ্যমেই নেতা নির্বাচন সম্পন্ন হবে। (৪২)

উমর ইবনে আবদুল আযিয রহ.-এর মতো অনেক খলিফা বাইআতের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন। যদিও তিনি চাচাতো ভাই সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিক কর্তৃক পরবর্তী খলিফা নির্বাচিত হয়েছেন এবং তার নির্ধারিত চুক্তিপত্রের সিদ্ধান্তের ওপর সাধারণ মুসলিমগণ সুলাইমানের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করেছেন, তারপরও জনগণের পক্ষ থেকে বাইআত গ্রহণের ওপর তিনি জোর গুরুত্বারোপ করেন এবং বলেন, জনগণ যদি সন্তুষ্টচিত্তে তাকে খলিফা হিসেবে মেনে নেয়, তবেই তিনি খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। তাকে খলিফা হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে এমন সংবাদ শোনার পর উমর ইবনে আবদুল আযিযের দেওয়া প্রথম ভাষণেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। সেই ভাষণে তিনি বলেন, হে লোকসকল, এ পদের প্রতি সামান্য চাহিদা বা লোভ আমার ছিল না, তারপরও আমার ওপর এ দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে মুসলিমদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত ছাড়াই। তাই আমার হাতে বাইআতের যে দায়িত্ব আপনাদের ঘাড়ে ছিল, তা থেকে আপনাদের মুক্ত ঘোষণা করছি। এখন আপনারাই আপনাদের পছন্দ অনুযায়ী খলিফা নির্বাচন করুন। এ কথা শুনে উপস্থিত সকলেই সমস্বরে বলে উঠল, আমরা আপনাকেই নির্বাচন করেছি হে আমিরুল মুমিনিন। আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছি। তাই আপনিও সন্তুষ্টচিত্তে কল্যাণের জন্য আমাদের দায়িত্ব গ্রহণ করুন। (৪৩) এ ঘটনাটিতে উমর ইবনে আবদুল আযিয রহ.-এর দুনিয়াবিমুখতা প্রকাশের পাশাপাশি ইসলামি সভ্যতার ধারকবাহকদের চারিত্রিক সৌন্দর্য এবং যোগ্য নেতা নির্বাচনে তাদের পরিপক্বতার বিষয়টি সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।

গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে মুসলিম স্কলারগণ বাইআত গ্রহণের জন্য অপরিহার্য পাঁচটি শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। সেগুলো হলো:

১। যার হাতে বাইআত গ্রহণ করা হবে, তার মধ্যে ইমামতের জন্য প্রযোজ্য সকল শর্তের উপস্থিতি থাকতে হবে। খিলাফত অধ্যায়ে এ বিষয়ে আমরা সবিস্তারে আলোচনা করেছি।
২। বাইআত ব্যবস্থাপক ব্যক্তিকে অবশ্যই বিজ্ঞ ইসলামিক স্কলার বা নেতৃস্থানীয় পর্যায়ের হতে হবে। যার কথা সবাই অকুণ্ঠচিত্তে মেনে নেবে।
৩। যার হাতে বাইআত গ্রহণ করা হবে, বাইআতের প্রতি তার ইতিবাচক মনোভাব থাকতে হবে এবং বাইআত পরবর্তী দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে তাকে পুরো প্রস্তুত থাকতে হবে। যদি সে বাইআত করতে অনীহা প্রকাশ করে তাহলে জোরপূর্বক তাকে দায়িত্ব দেওয়া যাবে না।
৪। বাইআত গ্রহণকারী একজন হলে সাক্ষী উপস্থিত থাকতে হবে। তবে সংঘবদ্ধভাবে হলে সাক্ষীর প্রয়োজন নেই।
৫। যার হাতে বাইআত গ্রহণ করা হবে, তিনি হবেন একজন। একাধিক ব্যক্তির হাতে বাইআত গ্রহণ করা যাবে না। (৪৪)

কোনো সন্দেহ নেই, মুসলিম স্কলারদের প্রণীত ও স্বীকৃত এসব শর্ত ইসলামি শাসনব্যবস্থার উন্নত নিদর্শন এবং ইসলামি সভ্যতার অনন্য অবদান। কারণ এসব শর্ত ও বিধি প্রণয়নের একমাত্র লক্ষ্য একটি আদর্শ মুসলিম সমাজ গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল কল্যাণের বিষয় সংযুক্ত করা।

বাইআত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং খিলাফত গ্রহণের অন্যতম মৌলিক শর্ত হওয়ায় ইসলামি সভ্যতার পুরো ইতিহাসেই আমরা বাইআতের প্রতিফলন দেখতে পাই। এমনকি খিলাফতের পর্ব যখন একেবারে দুর্বল ও অন্তিম মুহূর্তে, তখনও ইসলামি খলিফাগণ এ বাইআতকে কতটুকু গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন সে ঘটনাগুলোও আমাদের জানা। সেলজুক শাসনামলেও মুসলিমগণ বাইআত গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এমনকি ৪৮৫ হিজরিতে বাগদাদের প্রধান বিচারপতি আবুল হাসান দামিগানি নবনিযুক্ত খলিফা মুস্তারশিদ বিল্লাহর হাতে বাইআত গ্রহণ করেন। বাইআতের গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে শুরুতেই খলিফা মুস্তারশিদ বিল্লাহ রাষ্ট্রের বিজ্ঞ ইসলামিক স্কলারদের বাইআত গ্রহণে এবং তাদের পক্ষ থেকে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনে মনোযোগ দেন। তৎকালীন বাগদাদের বিজ্ঞ স্কলার এবং হাম্বলি মাযহাবের বিদগ্ধ আলেম আবুল ওয়াফা ইবনে আকিল রহ. বলেন, মুস্তারশিদ বিল্লাহ খলিফা হওয়ার পর তিনজন সরকারি কর্মচারী আমার সঙ্গে দেখা করে বলেন, আমিরুল মুমিনিন আপনাকে তলব করেছেন। এরপর রাজদরবারে উপস্থিত হয়ে দেখি প্রধান বিচারপতি তার সামনে দাঁড়ানো। তিনি আমাকে বললেন, তিনিই আমিরুল মুমিনিন (তিনবার)। তখন আমি বললাম, তাহলে এটি আমাদের পরম সৌভাগ্য। আমাদের ও জনগণের ওপর আল্লাহর পরম কৃপা। এরপর আমি হাত বাড়িয়ে দিই। তিনিও নিজ হাত প্রসারিত করে সাড়া দেন। আমি সালাম দিয়ে মুসাফাহা করি। এরপর বাইআত গ্রহণ করে বলি, আমি কিতাবুল্লাহ, সুন্নাতে রাসুল এবং খুলাফায়ে রাশেদিনের আদর্শের ওপর আমিরুল মুমিনিন মুস্তারশিদ বিল্লাহর হাতে বাইআত গ্রহণ করলাম। আশা করছি, তিনি নিজ সাধ্যমতো কুরআন-সুন্নাহর ওপর অবিচল থাকবেন। এ ব্যাপারে আমি তার আনুগত্য প্রকাশ করলাম। (৪৫)

নববি যুগ থেকে চলে আসা এ অনুপম রীতি ও সুমহান ঐতিহ্যের মাধ্যমে নতুন খলিফা নির্বাচনে প্রজা বা জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের প্রমাণ পাওয়া যায়। কোনো সন্দেহ নেই, এসব ঘটনা ইসলামি সভ্যতার অনন্য কীর্তি ও অসামান্য অবদান, যা মানুষের মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা দেয়। এভাবেই একজন খলিফা, বিচারক থেকে শুরু করে ইসলামি স্কলার, আলেম, ফকিহসহ সর্বস্তরের মানুষের পক্ষ থেকে সমানভাবে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে রাষ্ট্রপ্রধানের আসন অলংকৃত করেন।

ইসলামি সভ্যতায় সবসময় বাইআত ছিল একটি সমুজ্জ্বল বৈশিষ্ট্যের মতো। নবনিযুক্ত প্রার্থী থেকে শুরু করে এমনকি পদত্যাগকারী সকলেই নিজেদের জন্য এবং তাদের যোগ্য পুত্র, ছোট-বড় সকলের জন্য জনগণের পক্ষ থেকে সুষ্ঠু বাইআত গ্রহণে সমান গুরুত্বারোপ করতেন। এ অনুপম রীতি শুধু একটি ইসলামি রাষ্ট্রেই নয়, তৎকালীন মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রতিটি অংশে, প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে এমনকি স্পেনেও বিরাজমান ছিল। মরক্কোয় প্রতিষ্ঠিত ইদরিসীয় সাম্রাজ্যের আমির ইদরিস ইবনে ইদরিস ইবনে আবদুল্লাহ মাত্র এগারো বছর বয়সে জনগণের পক্ষ থেকে বাইআত গ্রহণ করেন। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বাস্তবেও তিনি ছিলেন দায়িত্ব গ্রহণের যোগ্য, স্পষ্টভাষী ও দুরন্ত সাহসী। মিম্বারে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করেন, সকল বন্দনা আল্লাহর। তাঁরই প্রশংসা করছি। তাঁর কাছে ক্ষমা চাইছি। তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করছি। তাঁরই ওপর ভরসা করছি। নিজের ও সকল অনিষ্টকারীর অনিষ্ট থেকে আমি তাঁরই আশ্রয় চাচ্ছি। সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আর মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসুল। জিন ও ইনসানের প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে তিনি আগত। আল্লাহর ইচ্ছায় আল্লাহর দিকে তিনি মানুষকে আহ্বান করেন। তিনি সমুজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। মহান আল্লাহ তাঁর প্রতি, তাঁর সম্মানিত পরিবারবর্গের প্রতি রহম করুন। তাঁর পরিবারকে আল্লাহ সকল অনিষ্ট ও অপবাদ থেকে সুরক্ষা দান করেছেন এবং তাদের পূত-পবিত্র করেছেন। হে লোকসকল, এ পদে আমাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আর সকলেই জানেন, এ পদের কেউ ভালো কাজ করলে তার প্রতিদান সে বহুগুণ বেশি পাবে। তেমনই মন্দ কাজ করলে শাস্তিও তার দ্বিগুণ হবে। আলহামদুলিল্লাহ, আমি এর জন্য সঠিক লক্ষ্যেই আছি। তাই অন্য কারও প্রতি আপনারা মনোনিবেশ করবেন না। কারণ ন্যায় প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন আপনারা লালন করেন, তা আমাদের মাঝেই পাবেন। এরপর তিনি মানুষকে বাইআতের আহ্বান জানান। সকল স্তরের মানুষকে আনুগত্যের স্বীকৃতি দিতে উৎসাহ দেন। মানুষ তার স্পষ্টবাদিতা ও কৈশোরের এ অসামান্য দূরদর্শিতা দেখে অভিভূত হয়ে যায়। এরপর তিনি মিম্বার থেকে নেমে এলে মানুষ তার হাতে বাইআত গ্রহণের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তার হস্তচুম্বন করতে ভিড় করে। এরপর তিনি মরক্কোর যানাতা, আওরাবা, সানহাজা, গামারাসহ সকল বারবারীয় জাতি-গোষ্ঠীর বাইআত গ্রহণ করেন। এভাবেই তাঁর বাইআত প্রক্রিয়াটি সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়। (৪৬)

এ থেকেই আমরা বুঝতে পারি, ইসলামি সভ্যতায় বাইআত ছিল মানবতার প্রতি এক অসামান্য অবদান। যার ফলে সমাজের ছোট-বড়, ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ সবার ভাগ্য পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছিল এই মহান ব্যবস্থা। কোনো সন্দেহ নেই সাম্প্রতিক পশ্চিমা সভ্যতার চেয়ে অনেক অনেক এগিয়ে ছিল ইসলামি সভ্যতা। পাশ্চাত্যের অধুনা সভ্যতা শুধু ব্যক্তিবিশেষের শর্তসাপেক্ষে স্বাধীনতা দিয়েছে। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতকের গোড়ার দিকে (১২১৫ খ্রি.) কিং জন ব্রিটেনের সাম্রাজ্যাধিপতি হওয়ার পর 'অ্যারিস্টোক্রেসি' নামে মানবতার প্রতি মূল্যবোধ প্রদর্শনের যে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়, (৪৭) তা ছিল শুধুই নির্দিষ্ট কিছু লোক এবং একটি গোষ্ঠীর স্বাধীনতার স্বীকৃতি প্রদানের উদ্যোগ, গোটা মানবতার নয়। অনেকে এই ঘটনাকে ব্রিটিশ প্রশাসনের দৃষ্টিতে গণস্বাধীনতা ও মানবিক মূল্যবোধ অর্জনে একটি মাইলফলক হিসেবে মনে করেন। বরং কেউ কেউ খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতকে অবশেষে মানবতার মূল্যবোধের স্বীকৃতি প্রদান সম্ভব হয়েছে বলে গর্ববোধ করে এটিকে অভূতপূর্ব সাফল্য হিসেবে অভিহিত করেন। অথচ ইসলামি সভ্যতা কখনো মানুষের মাঝে বৈষম্য তৈরি করেনি। নেতা বা প্রশাসক নির্বাচনেও জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রচলন করে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের ধনী-গরিব সকলের সুষ্ঠু অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে ইসলামি সভ্যতা।

টিকাঃ
৩৭. কাত্তানি, আত-তারাতিবুল ইদারিয়‍্যা, খ. ১, পৃ. ২২২।
৩৮. সুরা ফাতহ: ১০।
৩৯. সুরা ফাতহ: ১৮।
৪০. সুরা মুমতাহিনা: ১২।
৪১. ইবনে তাইমিয়া, মিনহাজুস সুন্নাতিন নাবাবিয়‍্যা, খ. ৫, পৃ. ৩৩০-৩৩১।
৪২. মুহাম্মাদ রশিদ রেজা, আল-খিলাফা, পৃ. ২০-২১।
৪৩. আজুররি, আখবারু আবি হাফস উমার ইবনে আবদুল আযিয, পৃ. ৫৬; ইবনে আসাকির, তারিখু দিমাশক, খ. ৪৫, পৃ. ৩৫৭।
৪৪. আজুররি, আখবারু আবি হাফস উমার ইবনে আবদুল আযিয, পৃ. ৫৬; ইবনে আসাকির, তারিখু দিমাশক, খ. ৪৫, পৃ. ৩৫৭।
৪৫. কালকাশান্দি, মাআসিরুল ইনাফা, খ. ১, পৃ. ১৭৬।
৪৬. আহমাদ ইবনে খালেদ আন-নাসিরি, আল-ইসতিকসাউ লি-আখবারি দুওয়ালি মাগরিবিল আকসা, খ. ১, পৃ. ২১৮।
৪৭. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১৬, পৃ. ২৭৪-২৭৫।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 পরবর্তী খলিফা নির্বাচন

📄 পরবর্তী খলিফা নির্বাচন


পরবর্তী খলিফা নির্বাচন প্রক্রিয়া ইসলামি রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আধুনিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত। সূচনালগ্নে ইসলামি বিশ্ব যেরকম দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, একের পর এক দেশ বিজয়, নতুন নতুন সভ্যতার সঙ্গে পরিচয় ঘটছিল, নানা বর্ণের নানা জাতের নানা ভাষার মানুষ দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিচ্ছিল, তখন বাস্তবেই যোগ্য নেতৃত্ব গঠনের স্বার্থে এরকম নতুন ও আধুনিক ব্যবস্থা প্রণয়ন জরুরি হয়ে পড়েছিল।

'অলিয়ে আহদ' হলেন সেই ব্যক্তি, যাকে বর্তমান খলিফা বা শাসক তার মৃত্যুর পর শাসক হিসেবে নিযুক্ত করবেন। এরকম মনোনীত ব্যক্তি একজনও হতে পারেন, ক্রমান্বয়ে একাধিকও হতে পারেন। খলিফা কর্তৃক তার কোনো পুত্র অথবা পিতাকে পরবর্তী শাসক হিসেবে ঘোষণা করা অনেক ফিকহি মাযহাবেও স্বীকৃত। কারণ বর্তমান খলিফা হলেন আমিরুল মুমিনিন। তার আনুগত্য জনগণের ওপর ফরয। তিনি নিজে কাউকে খলিফা হিসেবে নিযুক্ত করলে অন্য কারও এখানে দ্বিমত করার অবকাশ থাকবে না। তার রেখে যাওয়া আমানতের ব্যাপারে কোনোপ্রকার অপবাদের সুযোগ থাকবে না। বিরুদ্ধাচরণ করার উপায় থাকবে না। (৪৮)

ولاية العهد বা পরবর্তী খলিফা নির্বাচন প্রক্রিয়ার উদ্ভাবক হলেন খলিফা মুআবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান রা. (মৃ. ৬০ হি.)। এটি ছিল তার 'ইজতিহাদি' উদ্ভাবন। এর পেছনে কারণও ছিল যথেষ্ট। কেননা পুত্র ইয়াযিদকে পরবর্তী খলিফা হিসেবে নিযুক্ত না করে গেলে রাষ্ট্রে গোলযোগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। ভয় ছিল যে, বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে গোটা রাষ্ট্র, পরবর্তী সময়ে যা পুরো মুসলিমজাতির জন্য সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে। কারণ তখন শামের অধিবাসী মুসলিম জনগোষ্ঠীই ছিলেন রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড এবং তারা ছিলেন খলিফা মুআবিয়া এবং তার পুত্র ইয়াযিদের সমর্থক। (৪৯)

বাস্তবতা হলো, পুত্র ইয়াযিদের বাইআতের জন্য মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান সকল অঞ্চলের নেতৃবৃন্দ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। শুধু তিনজন সাহাবি ও সাহাবিপুত্র এতে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন। (৫০) তবে এ ব্যাপারে তিনি ইজমায়ে উম্মত (সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত) অর্জনে সক্ষম হন। এর পেছনে তার মূল উদ্দেশ্য ছিল উম্মতকে বিরোধ, বিশৃঙ্খলা ও বিপর্যয় থেকে রক্ষা করা। আর এটাই ছিল তার কাছে সবকিছু থেকে অগ্রগণ্য।

যদিও মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রা.-এর হাতে ولاية العهد বা পরবর্তী খলিফা নির্বাচনব্যবস্থার গোড়াপত্তন হয়, তবে সেখানেও নতুন শাসকের জন্য বাইআত ব্যবস্থা বা জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সন্তুষ্টি ও আস্থা অর্জনের প্রক্রিয়া স্বমহিমায় বিদ্যমান ছিল। এ কারণেই মুআবিয়া থেকে শুরু করে পরবর্তী সকল উমাইয়া খলিফা শাসনকর্তার জন্য উন্নত চরিত্র ও অপরিহার্য সকল গুণের উপস্থিতিকে তারা জরুরি মনে করতেন। যাদের মাঝে এসব গুণ ও শর্ত অনুপস্থিত থাকত, তাদেরকে এড়িয়ে যেতেন। গুরুত্বপূর্ণ পদ প্রদানে তাদের বারণ করতেন। তাদের কাছে বাইআত গ্রহণ করতে মানুষও অনীহা প্রকাশ করত। এ কারণেই আমরা দেখতে পাই, খলিফা বা শাসকের মাঝে কী কী গুণ ও বৈশিষ্ট্য থাকা আবশ্যক, সেগুলো মুআবিয়া রা. আগেই সবিস্তারে বর্ণনা করে গেছেন। যেমন সত্যবাদিতা, বদান্যতা, সহনশীলতা, নিষ্কলুষতা, বীরত্ব। (৫১) পাশাপাশি সহিষ্ণুতা ও দানশীলতার গুণ থাকাও অপরিহার্য বলে মনে করতেন। কারণ সহিষ্ণুতা বিরোধিতা থেকে রক্ষা করবে। ঐক্যের পথ সুগম করবে। এ কারণেই তিনি ইয়াযিদকে বলতেন; পুত্র আমার! সহিষ্ণুতা অবলম্বন করলে কখনো অনুশোচনায় পড়তে হবে না তোমাকে। (৫২)

বড় পুত্রকেই পরবর্তী শাসক হিসেবে নিয়োগ করতে হবে এমন কোনো লিখিত নিয়ম ছিল না। তবে খলিফাগণ পুত্রদের মধ্যে সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিকেই পরবর্তী খলিফার পদের জন্য মনোনীত করতেন। আবার কখনো রাজপরিবারের বাইরের লোককেও পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনয়ন দিতেন।

যাই হোক, সকল খলিফাই ইসলামের মৌলিক আদর্শ প্রতিষ্ঠা ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সফল ছিলেন। ইয়াযিদ ইবনে মুআবিয়াই প্রথম তৎকালীন রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে অভিযান পরিচালনা করেন। যে অভিযানের ব্যাপারে স্বয়ং নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। সেই অভিযানে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধাদের তিনি প্রশংসা করে বলেছেন,
أَوَّلُ جَيْشٍ مِنْ أُمَّتِي يَغْزُوْنَ مَدِينَةَ قَيْصَرَ مَغْفُوْرٌ لَهُمْ

রোমসম্রাটের শহর অভিযানকারী আমার উম্মতের প্রথম সেনাবহর আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমাপ্রাপ্ত। (৫৩)

এ প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত একজন খলিফা হলেন আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান। তিনি উমাইয়া খিলাফত সাম্রাজ্যে দীর্ঘ ৬৫ হি. থেকে ৮৬ হি. পর্যন্ত শাসন করেন। ইসলামি রাষ্ট্র তার আমলে বিশাল বিস্তৃতি লাভ করে। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে ইসলাম। তার আমলে যথাক্রমে মাসলামা ইবনে আবদুল মালিক (৫৪) চীন বিজয় করেন। কুতাইবা ইবনে মুসলিম আল-বাহেলি (৫৫) সমরকন্দ ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলো বিজয় করেন। মুহাম্মাদ ইবনে কাসিম হিন্দুস্তান বিজয় করেন। মুসা ইবনে নুসাইর (৫৬) প্রথমে উত্তর আফ্রিকা ও পরে আন্দালুস বিজয় করেন। শুনে অবাক হতে হয়, উমাইয়া শাসনামলেই ইসলামের এত সব বিজয় সম্পন্ন হয়। ফলে এসব অঞ্চলের মানুষের মধ্যে দ্রুত ইসলামি সভ্যতা ছড়িয়ে পড়ে। (৫৭)

৯৯ হিজরিতে ইনতেকাল করা খলিফা সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিক পরবর্তী খলিফা হিসেবে উমর ইবনে আবদুল আযিযের (মৃ. ১০১ হি.) নাম ঘোষণা করেন। অথচ তখন পরবর্তী খলিফা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল তার ভাই হিশাম ইবনে আবদুল মালিকের (মৃ. ১২৬ হি.)। (৫৮) এ থেকেই বোঝা যায়, পরবর্তী খলিফা নির্বাচন নিজ পরিবার বা আপনজন থেকেই করতে হবে এরকম কোনো লিখিত নিয়ম ছিল না।

সেরকমই আরেকটি দৃষ্টান্ত আমরা দেখতে পাই আবদুর রহমান ইবনে মুআবিয়া আদ-দাখিলের (মৃ. ১৭২ হি.) ঘটনা থেকে। তার দুই পুত্র হিশাম ও সুলাইমান উভয়েই ছিলেন খলিফা হওয়ার যোগ্য আর সুলাইমান ভাইদের মধ্যে বড় ছিল। তৃতীয় পুত্র ও তাদের আরেক ভাই আবদুল্লাহকে তাদের মধ্যে খিলাফতের দায়িত্ব অর্পণে সালিস নির্ধারণ করেন। খলিফা আবদুর রহমান ছিলেন তখন মৃত্যুশয্যায়। পুত্র হিশাম তখন মারদা (৫৯) অঞ্চলের গভর্নর। অপর পুত্র সুলাইমান টলেডো (৬০) অঞ্চলের প্রশাসক। অন্তিম মুহূর্তে তিনি পুত্র আবদুল্লাহকে বললেন, তোমার দুই ভাইয়ের মধ্যে যে তোমার কাছে আগে এসে পৌঁছবে, তার হাতেই তুমি আংটি (সিল) ও নেতৃত্ব তুলে দেবে। হিশাম যদি আগে আসে তবে সে ধার্মিকতা ও সচ্চরিত্রে অতুলনীয়। সকলেই তাকে একবাক্যে মেনে নেবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর যদি সুলাইমান আগে আসে, তবে বয়সের দিক থেকে পরিণত হওয়ায় এবং শামবাসীদের কাছে জনপ্রিয় হওয়ায় সেও যথেষ্ট উপযুক্ত। এরপর সুলাইমানের আগে ছোট পুত্র হিশাম এসে কর্ডোভার নিকটবর্তী রাসাফায় অবতরণ করেন। ছোট ভাই আবদুল্লাহ কর্ডোভায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় তার ব্যাপারে হিশাম যথেষ্ট শঙ্কিত ছিলেন; কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে আবদুল্লাহ তার ভাই হিশামের কাছে ছুটে যান। পিতার ওসিয়তমতো হিশামের হাতে খিলাফত ও আংটি হস্তান্তর করে তাকে রাজপ্রাসাদে নিয়ে আসেন। (৬১)

এ থেকেই প্রতীয়মান হয়, স্পেনের খলিফা আবদুর রহমান আদ-দাখিল তার পুত্রদের মধ্যে সবচেয়ে যোগ্য ও উপযুক্ত ব্যক্তিকেই খলিফা হিসেবে মনোনীত করেন। তিনি জানতেন, তার পুত্রদের মধ্যে পরবর্তী খলিফা হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে হিশাম। কারণ খোদাভীতি, দক্ষতা, যোগ্যতা, প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে তার পারদর্শিতাসহ খলিফা হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সকল শর্তই তার মাঝে বিদ্যমান ছিল; কিন্তু তারপরও নিজ পুত্রদের মাঝে সংঘাত তৈরি হোক, খিলাফত নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হোক, এটা তিনি চাননি। কারণ প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বড় ছেলে সুলাইমানই পরবর্তী পদের অধিকারী হওয়ার কথা; কিন্তু সেই সংঘাত এড়াতে সুকৌশলে তিনি পুত্র আবদুল্লাহকে সঠিক নির্দেশনা প্রদান করেন। কর্ডোভায় যে আগে পৌঁছবে তার হাতেই খিলাফতের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেবে বলে পুত্র আবদুল্লাহকে ওসিয়ত করেন। এরপর আবদুর রহমান আদ-দাখিলের অনুমান সত্যি হয়। পুত্র হিশামই কর্ডোভায় আগে পৌঁছে যান। আর তিনিই ছিলেন পরবর্তী খলিফা হওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি।

কোনো সন্দেহ নেই, পরবর্তী খলিফা নির্বাচনব্যবস্থাটি ইসলামি সভ্যতায় একটি সুসংগঠিত ও বাস্তবিক প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। ইসলামি ভূখণ্ড যতই বিস্তৃত হয়েছে, ততই সেটি আরও জোরালোভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এর সবচেয়ে বড় সুফল ছিল উম্মত বা জাতি হিসেবে মুসলিমদের একতা সুরক্ষা, যা ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে উসমানীয় খিলাফতের পতনের আগ পর্যন্ত গোটা মুসলিমবিশ্বে বিদ্যমান ছিল।

টিকাঃ
৪৮. মাওয়ারদি, আল-আহকামুস সুলতানিয়‍্যা, পৃ. ১৩।
৪৯. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি, আদ-দাওলাতুল উমাবিয়‍্যা, খ. ১, পৃ. ৪৪৫।
৫০. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ৩, পৃ. ২৪৮। তারা হলেন, হুসাইন ইবনে আলি, আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর, আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর রা.।
৫১. নুওয়াইরি, নিহায়াতুল আরাব, খ. ৬, পৃ. ৪।
৫২. ইবনুত তিকতাকি, আল-ফাখারিয়্যু ফিল-আদাবিস সুলতানিয়্যা, পৃ. ১০৫।
৫৩. বুখারি: কিতাবুল জিহাদ ওয়াস-সিয়ার, বাব: মা কি-লা ফি কিতালির রুম, ২৭৬৬।
৫৪. মাসলামা ইবনে আবদুল মালিক (৬৬ হি.-১২০ হি./৬৮৫ খ্রি.-৭৩৮ খ্রি.)। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা দামেশকে। যুদ্ধবিষয়ক অনেক ঘটনা তার থেকে বর্ণিত রয়েছে। দেখুন, তাহযিবুল কামাল, খ. ২৭, পৃ. ৫২৩।
৫৫. কিংবদন্তি সেনানায়ক, সুমহান বীরপুরুষ তিনি। খাওয়ারিজম ও বুখারার মতো এলাকাগুলো তার হাতেই বিজিত হয়। এরপর ফারগানা ও তুর্কি দেশসমূহও মুসলিমদের করতলগত করেন তিনি। দেখুন, ইমাম যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ৪, পৃ. ৪১০।
৫৬. ৯৭ হিজরিতে ইনতেকাল করা এ সেনানায়কের বেড়ে ওঠা দামেশকে। খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক ৮৮ হিজরিতে তাকে উত্তর আফ্রিকার গভর্নর হিসেবে মনোনীত করেন। তারেক ইবনে যিয়াদের সঙ্গে মাত্র এক বছরের কম সময়ের মধ্যে তিনি স্পেন বিজয় সম্পন্ন করেন। তার ইনতেকাল হয় মদিনায়। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ৪, পৃ. ৪৯৬; ইবনে খাল্লিকান, ওফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৫, পৃ. ৩১৮।
৫৭. ইউসুফ আল কারযাবি, তারিখুনাল মুফতারা আলাইহি, পৃ. ৮২।
৫৮. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ৪, পৃ. ৭৪।
৫৯. ফিলিস্তিনের একটি শহর।
৬০. স্পেনের একটি প্রাচীন শহর।
৬১. ইবনে ইযারি, আল-বায়ানুল মুগরিব, খ. ২, পৃ. ৬১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00