📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 ভাষা-সংশ্লিষ্ট জ্ঞান

📄 ভাষা-সংশ্লিষ্ট জ্ঞান


আরবি ভাষা তো কুরআনের ভাষা এবং ইসলামের নিদর্শন, ইসলামি সভ্যতার আধার এবং তার শক্তির প্রতীক। উম্মাহর গঠনপ্রক্রিয়ায় ও মুসলিম ব্যক্তিত্ব নির্মাণে আরবি ভাষার বড় অবদান রয়েছে। অন্যান্য সভ্যতা থেকে ইসলামি সভ্যতার স্বাতন্ত্র্যে ও শ্রেষ্ঠত্বে আরবি ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম।

আরবি ভাষা-সংশ্লিষ্ট জ্ঞানের কয়েকটি শাখা রয়েছে। আরবি ভাষাবিজ্ঞানীরা এগুলো উদ্ভাবন করেছেন। এসব জ্ঞানশাখা একটি বিশ্বসভ্যতার ভাষা হিসেবে আরবি ভাষার পরিপক্বতা, উৎকর্ষ ও সমৃদ্ধি সাধনে অব্যাহত ভূমিকা পালন করেছে এবং একে বিপুল ঐশ্বর্যমণ্ডিত করেছে, যার চাকচিক্য ও ঔজ্জ্বল্য মুহূর্তের জন্যও ম্লান হয় না। ফলে আরবি ভাষা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষা হিসেবে কালযাপন করছে।

ভাষা-সংশ্লিষ্ট জ্ঞানশাখার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নিম্নরূপ:

১. ইলমুন নাহব (পদক্রম ও বাক্যবিন্যাসশাস্ত্র)
ইলমুন নাহবকে ইলমুল ইরাবও বলা হয়। এটি আরবি ভাষাবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ শাখা। এর দ্বারা আরবি বাক্যের গঠনপ্রক্রিয়া, পদক্রম, বাক্যগঠনে শব্দের অবস্থান ও সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলি শুদ্ধরূপে জানা যায়। কোনটা শুদ্ধ নয় সেটাও জানা যায়। ইলমুন নাহবের উদ্দেশ্য হলো আরবি ভাষা লেখা ও বলায় ভুলত্রুটি থেকে বাঁচা এবং তা বোঝা ও বোঝানোয় সক্ষমতা অর্জন করা।(৭৫৩)

এই জ্ঞানশাখার উদ্ভাবনের পেছনে কিছু কারণ আছে। আরবরা যখন বিজিত দেশগুলোর যেসব জাতি-গোষ্ঠী ইসলামে প্রবেশ করেছিল তাদের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করল, অধিক হারে পারস্পরিক সংমিশ্রণ ঘটল এবং তারা এ সকল নওমুসলিম অনারবকে তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী আরবি ভাষা শেখানোর চেষ্টা চালাল, তখন বহু আরবের কথাবার্তায় ভুলভ্রান্তি ও ত্রুটিবিচ্যুতির সংক্রমণ ঘটতে শুরু করল। ধীরে ধীরে ত্রুটিবিচ্যুতির সয়লাব ঘটে গেল। ফলে মুসলিম জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিরা কুরআনের ভাষার ব্যাপারে আশঙ্কা বোধ করলেন এবং নড়েচড়ে উঠলেন। তারা লেখ্য ও কথ্য ভাষাকে সুরক্ষাদানের জন্য নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করলেন। আরবি বাক্যে শব্দাবলির অবস্থানের ভিন্নতা অনুযায়ী শব্দের শেষে 'হরকত' (যের, যবর, পেশ) প্রদানের নীতিও গ্রহণ করলেন। যাতে সবাই বাক্যের অর্থ ও উদ্দেশ্য বুঝতে পারে।

এ প্রসঙ্গে ইবনে খালদুন বলেন, ...মুসলিম জ্ঞানী সম্প্রদায় আশঙ্কা বোধ করলেন যে, শুদ্ধরূপে কথা বলার যোগ্যতাই পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে এবং এ অবস্থায় দীর্ঘ সময় কেটে যাবে। ফলে কুরআন ও হাদিস কিছু বোঝা যাবে না, এগুলোর অর্থ ও উদ্দেশ্য বোধগম্য হবে না। তাই তারা আরবদের কথার স্রোতধারা থেকে ওই যোগ্যতা-সংশ্লিষ্ট প্রচলিত কানুনগুলো উদ্‌ঘাটন করলেন। এগুলো ছিল সামগ্রিক নীতি ও কায়দার অনুরূপ। এসব কায়দাকানুনের ওপর তারা সব রকমের কথাকে পরিমাপ করলেন এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ কথাকে অনুরূপ কথার সঙ্গে মেলালেন। যেমন: ফায়েল হলো মারফু, মাফউল হলো মানসুব, মুবতাদা হলো মারফু।

তারপর তারা দেখলেন যে, এসব শব্দের হরকতের পরিবর্তনের ফলে উদ্দিষ্ট অর্থেরও পরিবর্তন ঘটে। ফলে তারা এর পারিভাষিক নামকরণ করলেন 'ইরাব'(৭৫৪) এবং পরিবর্তন-কারকের নামকরণ করলেন 'আমিল'(৭৫৫)। এরূপ অন্যান্য বিষয়েরও পারিভাষিক নামকরণ করলেন। এসব পরিভাষা আরবিভাষীদের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে গেল। তারা এগুলোকে লিপিবদ্ধ করলেন এবং তাদের একটি বিশেষ শিল্প হিসেবে স্থির করলেন। তারা পরিভাষাসমগ্রের বিদ্যায়তনিক নাম দিলেন 'ইলমুন নাহব'।(৭৫৬)

আবুল আসওয়াদ আদ-দুওয়ালিকে(৭৫৭) ইলমুন নাহব-সংক্রান্ত প্রথম গ্রন্থরচয়িতা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। 'ফাতহা' (যবর), 'যম্মা' (পেশ) ও 'কাসরা' (যের)-রূপে পরিচিত হরকতগুলো তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেন। তারপর অন্যান্য মনীষী এ বিষয়ে লেখালেখি করেন। হারুনুর রশিদের খিলাফতকালে এ বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেন খলিল ইবনে আহমাদ আল-ফারাহিদি(৭৫৮)। খলিল ইবনে আহমাদ থেকে ইলমুন নাহব গ্রহণ করেন এবং ইলমুন নাহবের অধ্যায়গুলোকে পূর্ণতা দান করেন-ইবনে খালদুন যেমনটি উল্লেখ করেছেন-সিবাওয়াইহ(৭৫৯)। সিবাওয়াইহ ইলমুন নাহবে নতুন নতুন সংজ্ঞা ও পরিভাষা যুক্ত করেন। অসংখ্য দলিল-প্রমাণ উপস্থিত করেন। ব্যাকরণ-বিষয়ে 'আল-কিতাব' নামে তার বিখ্যাত গ্রন্থটি রচনা করেন। এই গ্রন্থ ছিল আরবি ব্যাকরণ বিষয়ে পরবর্তীকালে যত গ্রন্থ লিখিত হয়েছে তার সবগুলোর ইমাম বা পথপ্রদর্শক। আবু তাইয়িব আল-লুগাবি(৭৬০) এই গ্রন্থকে 'কুরআনুন নাহব' বা ব্যাকরণের কুরআন বলে আখ্যায়িত করেছেন। সিবাওয়াইহ সম্পর্কে তিনি বলেন, সিবাওয়াইহ হলেন খলিল ইবনে আহমাদের পরে ব্যাকরণ সম্বন্ধে সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি।(৭৬১) তারপর শিক্ষার্থীদের জন্য ছোট ছোট ব্যাকরণগ্রন্থ রচনা করেন আবু ইসহাক আয-যাজ্জাজ(৭৬২) ও আবু আলি আল-ফারিসি(৭৬৩)। সিবাওয়াইহ তার গ্রন্থে যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন তারা একই পদ্ধতি অবলম্বন করেন।(৭৬৪)

এরপর আরবি ভাষাবিদ ও ভাষাবিজ্ঞানীরা ব্যাকরণের ময়দানে অবতীর্ণ হন এবং ছোট-বড় প্রচুর ব্যাকরণগ্রন্থ রচনা করেন। দীর্ঘ কলেবরযুক্ত, সংক্ষিপ্ত, বিস্তারিত ব্যাখ্যাযুক্ত, টীকাভাষ্য ও হাশিয়া, বিবরণ-সংবলিত ও সাক্ষ্য-প্রমাণের বিশ্লেষণমূলক ইত্যাদি বিপুল গ্রন্থ রচিত হয়। তারপর আসে 'সহজ ব্যাকরণ পাঠ' জাতীয় পুস্তক রচনার পালা। এসব পুস্তক ব্যাকরণের শিক্ষার্থীদের জন্য জ্ঞানার্জনের পথ সুগম করে তোলে।(৭৬৫)

সিবাওয়াইহ কর্তৃক রচিত গ্রন্থের পরে আরবি ব্যাকরণ বিষয়ে প্রচলিত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাবলির মধ্যে কয়েকটি নিম্নরূপ:

১. আবু আমর ইবনুল হাজিবের (মৃ. ৬৪৬ হি.) গ্রন্থাবলি: পদপ্রকরণ ও বাক্যগঠন-বিষয়ে তার গ্রন্থ 'আল-কাফিয়া' এবং শব্দপ্রকরণ বিষয়ে তার গ্রন্থ 'আশ-শাফিয়া'। এই দুটি গ্রন্থের ওপর, বিশেষ করে 'আল-কাফিয়া'র ওপর প্রচুর ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচিত হয়েছে।
২. ইবনে মালিকের(৭৬৬) গ্রন্থাবলি : তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-আলফিয়্যাহ’ (ألفية ابن مالك)। এটি ছন্দে ছন্দে রচিত আরবি ব্যাকরণগ্রন্থ এবং বহু ভাষাবিদ এটির ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ইবনে হিশাম আল-আনসারি(৭৬৭), তার ব্যাখ্যাগ্রন্থের নাম 'আওযাহুল মাসালিক ইলা আলফিয়্যাতি ইবনে মালিক'। তার আরও কয়েকটি ব্যাখ্যাগ্রন্থ রয়েছে, সেগুলো হলো : 'মুগনিল লাবিব আন কুতুবিল আ'আরিব', 'শারহু শুযুরিয যাহাব ফি মারিফাতি কালামিল আরাব', ‘কাতরুন নাদা ওয়া বাললুস সাদা'। ইবনে আকিলও(৭৬৮) আল-আলফিয়্যাহর ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেছেন, সেটির নাম ‘শারহু ইবনে আকিল আলাল আলফিয়্যাহ'।

ইলমুন নাহব বা আরবি ব্যাকরণশাস্ত্রের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এভাবেই এবং তা ছিল সংস্কৃতিমূলক উজ্জ্বল মর্যাদাপূর্ণ কীর্তি, কেবল মুসলিমরাই এই কীর্তি সাধন করেছে।

২. ইলমুল আরুয (আরবি ছন্দশাস্ত্র)
ইলমুল আরুয আরবি কবিতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ইলমুল আরুয বলতে এমন নিয়মকানুনকে বোঝায় যার দ্বারা বিশুদ্ধ কবিতা ও অশুদ্ধ কবিতা চিহ্নিত করা যায়। অথবা এটি এমন শাস্ত্র যেখানে গ্রহণযোগ্য ছন্দ ও মাত্রারীতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। অথবা এটি কবিতার মানদণ্ড, যার দ্বারা শুদ্ধ ও ত্রুটিপূর্ণ কবিতার মধ্যে পার্থক্য করা যায়।(৭৬৯)

এটি একটি শিল্প, যার দ্বারা আরবি কবিতার শুদ্ধ ছন্দ ও মাত্রা এবং অশুদ্ধ ছন্দ ও মাত্রা জানা যায় এবং যা ছন্দের যিহাফ(৭৭০) ও ইলাল(৭৭১) সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়-বলেছেন আহমাদ আল-হাশিমি।(৭৭২)

আরবি ছন্দশাস্ত্রের যিনি উদ্ভাবক এবং যিনি একে অস্তিত্বদান করেছেন তিনি হলেন সিবাওয়াইহের গুরু খলিল ইবনে আহমাদ ফারাহিদি। তিনি ছন্দশাস্ত্র নিয়ে 'আল-আইন' গ্রন্থটি রচনা করেছেন, এটি প্রথম কোষগ্রন্থ যেখানে তিনি একটি জাতির ভাষাকে আঁটিয়ে ফেলেছেন। খলিল ইবনে আহমাদ আরবদের কবিতাসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং সেগুলোকে পনেরোটি ছন্দে শৃঙ্খলিত করেছেন। প্রত্যেক ছন্দের নাম দিয়েছেন 'বাহর'। আরও একটি কথা বলা হয়ে থাকে, ছন্দশাস্ত্রের প্রবর্তন করেছেন আহমাদ এবং তা পরিমার্জন করেছেন আবু নাস্ত্র জাওহারি(৭৭৩)। আখফাশ(৭৭৪) আরও একটি ছন্দ বাড়িয়েছেন এবং ছন্দটির নাম দিয়েছেন 'আল-মুতাদারাক'।(৭৭৫) মোট ছন্দ হয়েছে ষোলোটি।

হামযাহ আল-ইস্পাহানি(৭৭৬) বলেন, ইসলামের সাম্রাজ্যে যত নতুন জ্ঞানের উদ্ভব ঘটেছে, আরব জ্ঞানী সম্প্রদায় তার প্রত্যেকটির জন্য খলিল ইবনে আহমাদ থেকে মূলনীতি গ্রহণ করেছেন। এই ক্ষেত্রে আরবি ছন্দশাস্ত্রের চেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ আর কিছু নেই। খলিল ইবনে আহমাদ ছন্দশাস্ত্র কোনো প্রজ্ঞাবান থেকে গ্রহণ করেননি এবং তার পূর্বে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনো দৃষ্টান্তও ছিল না যাকে তিনি অনুসরণ করেছেন...। যদি তার যুগ হতো অতিপ্রাচীন এবং নিদর্শনাবলি হতো আরও দূরবর্তী, তাহলে এই জাতির অনেকেই তার সৃষ্টিকর্মের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করত। দুনিয়া সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে তার সৃষ্টিকর্মের মতো কারও সৃষ্টিকর্ম নেই, বিশেষ করে একটু আগে যে শাস্ত্রের (ছন্দশাস্ত্র) কথা বলা হয়েছে সে শাস্ত্রের উদ্ভাবন। একটিমাত্র গ্রন্থ রচনার মধ্য দিয়েই তিনি ছন্দশাস্ত্রের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেটি হলো ‘আল-আইন’। এই গ্রন্থে তিনি একটি জাতির ভাষাকে পুরোপুরি পুরে দিয়েছেন। সিবাওয়াইহ ইলমুন নাহব বা ব্যাকরণশাস্ত্রে খলিল থেকে যে সহযোগিতা পেয়েছেন তাও উল্লেখযোগ্য, তার থেকে জ্ঞান আহরণ করে সিবাওয়াইহ যে গ্রন্থ রচনা করেছেন তা ইসলামি সাম্রাজ্যের সৌন্দর্যরূপে বিদ্যমান।(৭৭৭)

আল-ইয়াফিয়ি(৭৭৮) বলেছেন, খলিল ইবনে আহমাদ ইলমুল আরুয বা আরবি ছন্দশাস্ত্র-যা কবিতার শুদ্ধতা ও অশুদ্ধতার মানদণ্ড-উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে মহামতি অ্যারিস্টটলের মতোই, যিনি যুক্তিবিদ্যা-যা অর্থের ও দলিলের শুদ্ধতার মানদণ্ড-উদ্ভাবন করেছেন।(৭৭৯)

একটি সূত্র থেকে জানা গেছে যে, খলিল ইবনে আহমাদ পবিত্র মক্কায় হজব্রত পালনাবস্থায় আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করেন, হে আল্লাহ, তুমি আমাকে এমন জ্ঞান দাও যা আমার পূর্বে কাউকে দাওনি এবং সে জ্ঞান যেন কেবল আমার থেকেই গ্রহণ করা হয়।

তিনি হজ থেকে ফিরে এলে আল্লাহ তাআলা তার জন্য ছন্দশাস্ত্রের দরজা উন্মুক্ত করে দেন। সুর ও সংগীত সম্পর্কে খলিলের পর্যাপ্ত জ্ঞান ছিল, সেই জ্ঞানই তাকে ছন্দশাস্ত্র সৃষ্টির পথ দেখিয়ে দেয়। যেহেতু উৎসের ক্ষেত্রে ছন্দশাস্ত্র ও সংগীতশাস্ত্র কাছাকাছি।(৭৮০)

ইলমুল আরুযের বিষয় হলো আরবি কবিতা, যেহেতু আরবি কবিতা বিশেষ কিছু ছন্দে আবদ্ধ। কোনটা গদ্য আর কোনটা কবিতা তা পার্থক্য করার ক্ষেত্রে ইলমুল আরুযের ফায়দাটা বোঝা যায়। এই শাস্ত্রের ফলেই কবিতা-লেখক একটি ছন্দের সঙ্গে আরেকটির তালগোল পাকিয়ে ফেলা থেকে বেঁচে যান। কারণ, আরবি ছন্দগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য অনেক এবং পার্থক্য অতি সূক্ষ্ম। ছন্দের টুটে যাওয়া ও ত্রুটিবিচ্যুতি থেকেও নিরাপদ থাকেন। এই শাস্ত্র জানা থাকলে কবিতা ছন্দ অনুযায়ী শুদ্ধভাবে পাঠ করা যায় এবং কোন কবিতার ছন্দ ঠিকঠাক আছে এবং কোনটার ছন্দে পতন ঘটেছে তাও বোঝা যায়।(৭৮১)

আরবদের জন্য আরবি ভাষা আল্লাহ তাআলার বিশেষ দান। খলিল তাদের ভাষা পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ করে আরবি কবিতাকে ষোলোটি ছন্দে শৃঙ্খলিত করেছেন। ছন্দগুলো হলো: আত-তাবিল, আল-মাদিদ, আল- বাসিত, আল-ওয়াফির, আল-কামিল, আল-হাযাজ, আর-রাজায, আর- রামাল, আস-সারি, আল-মুনসারিহ, আল-খফিফ, আল-মুযারি, আল-মুকতাযিব, আল-মুজতাম্স, আল-মুতাকারিব, আল-মুতাদারাক। এই শেষের ছন্দটি সংযোজন করেছেন আখফাশ এবং খলিলের যে ভ্রম ঘটেছিল তা দূর করেছেন।(৭৮২)

আবু তাহির আল-বাইযাবি ষোলোটি ছন্দকে দুটি পঙ্ক্তিতে সন্নিবিষ্ট করেছেন:
طوِيلٌ يَمُدُّ البَسْطَ بِالوَفْرِ كَامِلُ وَيَهْزِجُ فِي رَجْزٍ وَيُرْمِلُ مُسْرِعًا فَسَبِّحْ خَفِيفًا ضَارِعًا يَقْتَضِبُ لَنَا مَنِ اجْتُنَّ مِنْ قُرْبٍ لِنُدْرِكَ مَطْمَعًا

খলিল ইবনে আহমাদ ছাড়াও অন্যান্য ভাষাবিদ আরবি ছন্দশাস্ত্র নিয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন। এগুলোর বিখ্যাত কয়েকটি হলো : ১. কাসিদা ইবনুল হাজিব ২. আল-ওয়াফি ফি ইলমুল আরুজ ওয়া ইলমুল কাওয়াফি ওয়া উইয়ুবুশ শি’র(৭৮৩) , আল কাসিদাতুল খাযরাজিয়্যা ফিল আরুজ(৭৮৪) ৩. খাতিব তাবরিযি আল আরুজ ওয়াল কাওয়াফি ৪. শিফা-উল গালিল ফি ইলমিল খলিল, মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ আল-খাযরাজি; ওয়া নুসসির্‌ রামাজাহ, আমিনুদ্দিন আল-মাহাল্লি(৭৮৫) আর ৫. ইউসুফ ইবনে আবু বকর।

আস-সাক্কাকি ‘মিফতাহুল উলুম’ গ্রন্থে আরবি ছন্দ নিয়ে যে আলোচনা করেছেন তা এই শাস্ত্র বোঝার জন্য যথেষ্ট।(৭৮৬)

৩. অভিধান-সংকলন বিদ্যা(৭৮৭)
ড. আদনান আল-খতিব বলেছেন, প্রত্যেক ভাষাই তার অভিধান নিয়ে গৌরব প্রকাশ করে, তাই সমস্ত গৌরব সকল ভাষার মা আরবি ভাষার। কারণ এই পৃথিবী আরবদের মতো কোনো জাতি দেখেনি, মাতৃভাষার যত্ন-পরিচর্যা, সংগ্রহ ও সংকলন, শব্দানুসন্ধান, একক শব্দের হরফ তার অবস্থান অনুযায়ী কী অর্থ প্রকাশ করে তা জানার চেষ্টা করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে আরবজাতি পৃথিবীর অন্যসব জাতির চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছে।(৭৮৮)

মুজাম বা অভিধান বলতে শুরুর দিকে এমন গ্রন্থ বোঝাত যাতে ভাষার শব্দভান্ডারের এক বিরাট অংশ সংকলিত হয়েছে এবং শব্দগুলোকে উচ্চারণের ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে বিন্যস্ত করা হয়েছে এবং শব্দের অর্থ ও ব্যাখ্যা যুক্ত করা হয়েছে। মুজামকে কখনো কখনো ‘কামুস’ বা শব্দকোষও বলা হয়। অভিধানের প্রধান গুরুত্ব এখানে যে, তাতে অসংখ্য শব্দের অর্থ দেওয়া থাকে যা সংশ্লিষ্ট ভাষার কোনো একক ব্যক্তির পক্ষে আয়ত্ত করা সম্ভব নয়, এসব শব্দ অনুসন্ধান করে তার অর্থ জানার যতই আগ্রহ থাকুক এবং ভাষার শব্দরাশি যতই ছড়িয়ে থাকুক। নিজের পরিবেশ ও সংস্কৃতি অনুযায়ী প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই এ কথা প্রযোজ্য।

আরবদের মধ্যে অভিধান-চিন্তার প্রকাশ ঘটে কুরআন মাজিদ নাযিল হওয়ার পর। কুরআনে আরবদের বহু উপভাষার প্রয়োগ দেখা যায়। অনারবরা ইসলামে প্রবেশ করে এবং তাদের অনেকের কাছে কুরআনের কিছু কিছু শব্দ কঠিন ও দুর্বোধ্য ঠেকে। ফলে কুরআন ও হাদিসের অপ্রচলিত ও দুর্বোধ্য শব্দাবলি এবং সাধারণভাবে আরবি ভাষার কঠিন ও জটিল শব্দগুলোর ব্যাখ্যার দাবি অনিবার্য হয়ে ওঠে।

তাই আরবি ভাষাবিদদের জন্য অভিধান-সংকলন বিদ্যা আরব-ঐশ্বর্য থেকে প্রাপ্ত সম্পত্তি, অন্য কোথাও থেকে নয়। এ কারণে অভিধান সংকলন-বিদ্যাকে আরব ভাষাবিদদের একটি উদ্ভাবন হিসেবে গণ্য করা হয় এবং এ ক্ষেত্রে তারা পথিকৃৎ। অভিধান-রচনায় তারা অন্যান্য জাতি থেকে অনেক এগিয়ে রয়েছেন। অভিধান-সংকলনের বহু পদ্ধতি রয়েছে তাদের, অভিধানের প্রকারভেদও অনেক। তাই আরবদের অভিধান-চর্চা নিয়ে সমৃদ্ধ গবেষণাও রয়েছে। এসব গবেষণা থেকে এ স্বীকৃতি মিলেছে যে, অন্যান্য ভাষার পণ্ডিতদের চেয়ে আরবি ভাষার পণ্ডিতরা শ্রেষ্ঠ ও অগ্রগামী। জার্মান প্রাচ্যবিদ অগাস্ট ফিশার (August Fischer 1865-1949) বলেন, চীনকে যদি বাদ দিই, তাহলে আরব ছাড়া আর কোনো জাতি পাওয়া যাবে না যারা ভাষা ও ভাষাবিজ্ঞানের ওপর লিখিত গ্রন্থাবলির প্রাচুর্য এবং নীতিমালা ও নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুযায়ী ভাষার শব্দরাশিকে সুবিন্যস্ত করার প্রয়োজনীয়তাবোধ ও অগ্রসর চিন্তাভাবনার জন্য গৌরবের হকদার হতে পারে।(৭৮৯)

প্রখ্যাত অনারব আরবি-ভাষাবিদ এবং ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্টার্ন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ-এর খ্যাতিমান অধ্যাপক John A. Haywood তার 'সানাআতুল মাআজিম ফিল-আরাবিয়্যাহ' গ্রন্থে বলেছেন, আরবদের একটি পূর্ণাঙ্গ ও সামগ্রিক অভিধান রয়েছে, সেটি হলো 'লিসানুল আরব'(৭৯০)। ঊনবিংশ শতাব্দীর পূর্বে পৃথিবীর যাবতীয় ভাষার অভিধানাবলি সূক্ষ্মতায় ও সামগ্রিকতায় 'লিসানুল আরব'-এর সমকক্ষ হতে পারেনি।(৭৯১)

পবিত্র কুরআনের অপ্রচলিত ও জটিল শব্দাবলি নিয়ে প্রথম যিনি অভিধানমূলক পুস্তিকা রচনা করেন, তিনি হলেন আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (মৃ. ৬৮ হি./৬৮৭ খ্রি.)। এই পুস্তিকায় তিনি খারিজি সম্প্রদায়ের নাফে ইবনুল আযরাক (মৃ. ৬৫ হি./৬৮৪ খ্রি.) কর্তৃক উত্থাপিত প্রশ্নাবলির জবাব দিয়েছেন। পুস্তিকাটির নাম 'মাসায়িলু নাফে ইবনিল আযরাك ফি গরিবিল কুরআন'। তারপর এ বিষয়ে একাধিক পুস্তিকা রচিত হয়। যেমন: গরিফুল কুরআন, আবু সাঈদ আবান ইবনে তাগলিব(৭৯২); ‘তাফসির গরিফুল কুরআন’, ইমাম মালিক; ‘গারিফুল কুরআন’, আবু ফায়েদ মুআররিজ ইবনে আমর আস-সাদুসি(৭৯৩) এবং অন্যান্য।

সাধারণ ও সামগ্রিক অর্থে অভিধানগ্রন্থের প্রকাশ ঘটে হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে। যখন খলিল ইবনে আহমাদ তার ‘আল-আইন’ নামক কোষগ্রন্থটি রচনা করেন। উদাহরণস্বরূপ অনুযায়ী আরবি বর্ণমালার ভিত্তিতে এই কোষগ্রন্থের তুক্সিমূহ বিভিন্ন অধ্যায়ে বিন্যস্ত ও সন্নিবেশিত করা হয়।(৭৯৪) খলিল ইবনে আহমদের পথ অনুসরণ করেন আবু আলি আল-কালি (ম. ৩৫৬ হি./৯৬৬ খ্রি.)। তিনি তার অভিধান ‘আল-বারি’তে হরফের উদাহরণগুলো (মাখরাজ) অনুযায়ী ভুক্তিগুলো বিন্যস্ত করেন। আন্দালুসে রচিত এটিই প্রথম কোষগ্রন্থ। যারা খলিলকে অনুসরণ করেছেন এবং মাখরাজ অনুযায়ী বিন্যাস ও অধ্যায়ভুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁরই পথে হেঁটেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন আবু মানসুর আল-আজহারি(৭৯৫), তাঁর রচিত অভিধান ‘তাজহিবুল লুগাহ্’ এবং সাঈহ ইবনে ফাদ (ম. ৩৮৫ হি./৯৯৫ খ্রি.), তাঁর রচিত অভিধান ‘আল-মুহিত ফিল-লুগাহ্’। খলিলের আবিষ্কৃত বিন্যাসপদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে নতুন বিন্যাস ও শৈলীতে অভিধান রচনার প্রয়াস পেয়েছেন ইবনে দুরাইদ আল-আজদি। তাঁর রচিত অভিধানের নাম ‘জামহারাতুল লুগাহ্’। এই অভিধানে তিনি বর্ণনাক্রমিক (আলফাবেটিক) পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন, যদিও তা পরিপূর্ণভাবে প্রয়োগ করেননি। আহমাদ ইবনে ফারিস(৭৯৬) বর্ণনাক্রমিক পদ্ধতি ও শব্দের গঠন অনুযায়ী ভুক্তিবিন্যাসের পদ্ধতির মধ্যে মিশ্রণ ঘটানোর চেষ্টা করেন। তার রচিত অভিধানের নাম 'মাকায়িসুল লুগাহ'।

আবু নাস্ত্র ইসমাইল ইবনে হাম্মাদ আল-জাওহারি (মৃ. ৪০০ হি./১০০৯ খ্রি.) তার রচিত অভিধান 'আস-সিহাহ'-তে এক নতুন বিন্যাসপদ্ধতির উদ্ভব ঘটান, এই পদ্ধতি ছিল তার পূর্ববর্তীকালে রচিত সব ধরনের অভিধানের বিন্যাসরীতি থেকে ভিন্ন। তিনি বর্ণনানুক্রমিক রীতি অনুসরণ করেন বটে, তবে অধ্যায়ভুক্ত শব্দাবলিকে শেষ হরফ অনুযায়ী বিন্যস্ত করার পদ্ধতি অবলম্বন করেন। যা আর কেউ করেননি।

হিজরি পঞ্চম শতাব্দীর শেষের দিকে এবং ষষ্ঠ শতাব্দীর শুরুর দিকে যামাখশারি তার অভিধান 'আসাসুল বালাগাহ' রচনা করেন। এই অভিধানে তিনি ভিন্নভাবে বর্ণনানুক্রমিক পদ্ধতি অনুসরণ করেন। তিনি শব্দাবলিকে তাদের প্রথম বর্ণ অনুযায়ী, তারপর দ্বিতীয় বর্ণ অনুযায়ী, তারপর তৃতীয় বর্ণ অনুযায়ী বিন্যস্ত করেন। আধুনিক অভিধানগুলোতে শব্দের বিন্যাসে এই পদ্ধতিই অনুসরণ করা হয়েছে। তবে যামাখশারির দুই শতাব্দীরও পূর্বে এ একই পদ্ধতি অবলম্বন করে অভিধান রচনা করেন আলি ইবনুল হাসান আল-হুনায়ি, যিনি কুরাউন নাম্ল(৭৯৭) নামে পরিচিত। তার অভিধানের নাম 'আল-মুনাযযাদ'। এই অভিধান তিনি আলিফ-বা-তা-সা বর্ণনানুক্রম অনুসারে রচনা করেন। ইয়াকুত আল-হামাবি তার কোষগ্রন্থে এ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন এবং অন্যান্য জীবনীকাররাও তা-ই করেছেন।

অভিধান রচনায় পূর্ববর্তী মনীষীদের যে অভিজ্ঞতা তাকে পুঁজি করেই সাধারণ অভিধান রচনার ধারা অব্যাহত থাকে। আল-জাওহারি তার অভিধান 'আস-সিহাহ'-তে যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন একই পদ্ধতি অনুসরণ করে ইবনে মানযুর রচনা করেন 'লিসানুল আরব'। ফাইরুজাবাদি তার অভিধান 'আল-কামুসুল মুহিত'-এ 'লিসানুল আরব' ও 'আস-সিহাহ'-তে অনুসৃত পদ্ধতিই অবলম্বন করেছেন। অন্যদিকে মুরতাযা আয-যাবিদি(৭৯৮) অভিধান রচনায় 'আল-কামুসুল মুহিত'-এর ওপরই নির্ভর করেন। ১০ খণ্ডে রচিত তার অভিধানের নাম 'তাজুল আরুস মিন জাওয়াহিরিল কামুস'। তবে তিনি অভিধানের প্রত্যেক অধ্যায়ে সংশ্লিষ্ট হরফ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন, হরফটির বৈশিষ্ট্য কী এবং ভাষাগত ব্যবহার কী কী তার বর্ণনা দিয়েছেন।

সাধারণ আরবি অভিধানের উদ্দেশ্য ছিল শব্দার্থের ব্যাখ্যা প্রদান করা এবং দ্ব্যর্থবোধক অর্থকে স্পষ্ট করা। এগুলো মুজামুল আলফায বা শব্দাভিধান হিসেবে পরিচিত ছিল। এই ধরনের অভিধান রচনার পাশাপাশি আরেক ধরনের অভিধান রচনার ধারা তৈরি হয়, সেগুলোর নাম মুজামুল মাআনি বা অর্থাভিধান। এসব অভিধানের উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন শব্দ ও শব্দরূপ তৈরি করা, যার দ্বারা লেখক তার নিজস্ব অর্থ ও অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারেন অথবা যা তার জীবনে নতুন কিছু হিসেবে উপস্থিত হয়। এ প্রকারের অভিধানে ভুক্তিবিন্যাসে শব্দাভিধান থেকে ভিন্নতর পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে। যেমন বিষয় অনুযায়ী বিন্যাসপদ্ধতি। ইবনুস সিক্কিত (২৪৪ হি./৮৫৮ খ্রি.) কর্তৃক রচিত 'আল-আলফায' এই শ্রেণির প্রথম অভিধান। তারপর এ ধরনের অভিধান রচনার একটি ধারা তৈরি হয়। আবদুর রহমান ইবনে ঈসা আল-হামাদানি(৭৯৯) রচনা করেন 'আল-আলফাযুল ‘কিতাবিয়্যাহ’। তিনি বিষয়ভিত্তিক বিন্যাসের ক্ষেত্রে ইবনুস সিক্কিতের গ্রন্থকেই অনুসরণ করেন। তিনি আলোচ্য বিষয়গুলোকে কয়েকটি অধ্যায়ে সন্নিবিষ্ট করেন।

আল-হামাদানি কর্তৃক রচিত গ্রন্থটির অনুসন্ধান লাভের পর কুদামা ইবনে জাফর(৮০০) রচনা করেন 'জাওয়াহিরুল আলফায'। কিন্তু এটি তার আশা মেটায়নি এবং তাকে পরিতৃপ্ত করেনি। আবু হিলাল আল-আসকারি(৮০১) এই শ্রেণির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থটি রচনা করেন, বিন্যাস ও কাঠামোর দিক থেকে এটি বেশ গুরুত্ব বহন করে। গ্রন্থটির নাম 'আত-তালখিস'। সংক্ষিপ্ত হলেও এটি অভিধানের স্তরে উত্তীর্ণ। এই ময়দানে আরও অবতীর্ণ হন আবু মানসুর আস-সাআলিবি(৮০২) এবং রচনা করেন তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'ফিকহুল লুগাহ'। যিনি এই শ্রেণির রচনাকে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরান তিনি হলেন ইবনে সিদাহ আল-আন্দালুসি(৮০৩), তার রচিত অভিধান 'আল-মুখাসসাস'। গ্রন্থটি বিন্যাস ও অধ্যায়বিভক্তি এবং ব্যাপকতা ও সামগ্রিকতার দিক থেকে শীর্ষস্থান দখল করে নেয়। এখনো পর্যন্ত এটি সবচেয়ে বড় আরবি অর্থাভিধান, বিপুল সংখ্যক ভুক্তি রয়েছে এতে, অর্থাভিধান নামটি ধারণ করার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত গ্রন্থ এটি।(৮০৪)

ইউরোপীয় অভিধান-বিশেষজ্ঞ জন এ. হেউড (John A. Haywood) মুসলিমদের কাছে অভিধান ও কোষগ্রন্থের গুরুত্ব ও মহিমা যে কী তা নিয়ে চমৎকার মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, সত্য এই যে, অভিধান ও কোষগ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে প্রাচীন ও আধুনিক পৃথিবী এবং প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের তুলনায় আরবরা কেন্দ্রীয় ভূমিকায় রয়েছে। তা যুগের বা স্থানের যে বিবেচনাতেই হোক।(৮০৫)

তাই আরবি অভিধান ও কোষগ্রন্থ—তাদের বিভিন্ন শ্রেণি ও প্রকার নিয়েই—ইসলামি আরবের নবচিন্তার একটি অংশ এবং মুসলিম জ্ঞানী-মনীষীরা হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে যে শ্রম ও প্রচেষ্টা ব্যয় করেছেন তার ফল।

।। দ্বিতীয় খণ্ড সমাপ্ত।।

টিকাঃ
৭৫৩. সিদ্দিক হাসান আল-কনৌজি, আবজাদুল উলুম, খ. ২, পৃ. ৫৬০।
৭৫৪. শব্দের শেষ বর্ণের স্বরধ্বনি নিরূপণ।
৭৫৫. অন্য শব্দের চালক শব্দ।
৭৫৬. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ৫৪৬।
৭৫৭. আবুল আসওয়াদ আদ-দুওয়ালি: জালিম ইবনে আমর ইবনে সুফিয়ান (১৬ হিজরিপূর্ব-৬৯ হিজরি/৬০৫-৬৮৮ খ্রি.)। তাবিয়ি। ইলমুন নাহব বা আরবি ব্যাকরণের প্রবর্তক। আলি ইবনে আবি তালিব রা.-এর সঙ্গে সিফফিনযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। আলি রা.-এর ইনতেকালের পর মুআবিয়ার রা.-এর দলে যুক্ত হন। দেখুন, ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ৩, পৃ. ৩১২।
৭৫৮. খলিল ইবনে আহমাদ আল-ফারাহিদি: আবু আবদুর রহমান খলিল ইবনে আহমাদ ইবনে আমর ইবনে তামিম আল-ফারাহিদি আল-আযদি আল-ইয়াহমাদি (১০০-১৭০ হি./৭১৮-৭৮৬ খ্রি.)। আরবি ছন্দশাস্ত্রের প্রবর্তক ও ব্যাকরণবিদ। সংগীত ও সুরবিজ্ঞানও অধ্যয়ন করেছেন। তার দুজন বিখ্যাত উস্তাদ হলেন ঈসা ইবনে উমর এবং আবু আমর ইবনুল আলা। খলিল ব্যাকরণবিদ সিবাওয়াইহের গুরু। বসরায় বড় হন এবং এখানেই মৃত্যুবরণ করেন। ছিলেন দুনিয়াবিমুখ, জ্ঞান ও জ্ঞানীদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তার রচিত গ্রন্থাবলি: كتاب معاني الحروف، كتاب الإيقاع، كتاب النقط والشكل كتاب الشواهد، كتاب العروض كتاب النغم، كتاب معجم العين )
৭৫৯. সিবাওয়াইহ: আবু বিশর আমর ইবনে উসমান ইবনে কানবার আল-হারিসি (১৪৮-১৮০ হি./৭৬৫-৭৯৫ খ্রি.)। আরবি ব্যাকরণবিদদের ইমাম। তার উদ্ভাদদের মধ্যে রয়েছেন খলিল ইবনে আহমাদ আল-ফারাহিদি, ইউনুস ইবনে হাবিব, আবুল খিতাব আল-আখফাশ, ঈসা ইবনে উমর। 'আল-কিতাব' ব্যাকরণ বিষয়ে তার প্রধান কীর্তি।
৭৬০. আবু তাইয়িব আল-লুগাবি: আবদুল ওয়াহিদ ইবনে আলি আল-হালাবি (মৃ. ৩৫১ হি./৯৬২ খ্রি.)। আলেম, বিখ্যাত ভাষাবিদ। আলেপ্পোয় বসবাস করতেন। আলেঙ্কোর সম্রাট সাইফুদ দাওলাহ আল-হামদানির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক ছিল। ৩৫১ হিজরিতে রোমান সৈন্যরা আলেপ্পোর ওপর আক্রমণ করে এবং হত্যাযজ্ঞ চালায়। তাদের হাতে আবু তাইয়িব নিহত হন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: مراتب النحويين، شجر الدر المثلى، لطيف الإتباع، كتاب الأضداد، طبقات الشعراء
৭৬১. দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ১৯, পৃ. ১৭৩। আবু তাইয়িব আল-লুগাবি, মারাতিবুন নাহবিয়্যিন, পৃ. ৬৫।
৭৬২. আয-যাজ্জাজ বা আবু ইসহাক আয-যাজ্জাজ: আবু ইসহাক ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে সারি ইবনে সাহল আয-যাজ্জাজ আল-বাগদাদি (২৪১-৩১১ হি./৮৫৫-৯২৩ খ্রি.)। ধর্মীয় পণ্ডিত ও সাহিত্য-বিশারদ। বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন এবং বাগদাদেই মৃত্যুবরণ করেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: معاني القرآن ن تفسير أسماء الله الحسنى ، كتاب ما ينصرف وما لا ينصرف القوافي أو الكافي في أسماء القوافي
৭৬৩. আবু আলি আল-ফারিসি: হাসান ইবনে আহমাদ ইবনে আবদুল গাফফার আল-ফারিসি (২৮৮-৩৭৭ হি./৯০০-৯৮৭ খ্রি.)। আরবি ভাষাবিজ্ঞানী। পারস্যে জন্মগ্রহণ করেন এবং বাগদাদে মৃত্যুবরণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: التذكرة (আরবি ভাষাবিজ্ঞানের ওপর ২০ খণ্ডে রচিত), جواهر النحو (2) تعاليق سيبويه। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ২, পৃ. ৮০-৮২।
৭৬৪. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ৫৪৬।
৭৬৫. আবদুর রহমান হাসান হাবান্নাকা, আল-হাদারাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৪৮৮।
৭৬৬. ইবনে মালিক : জামালুদ্দিন মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ আল-আন্দালুসি (৬০০-৬৭২ হি./১২০৩-১২৭৪ খ্রি.)। আরবি ভাষাবিজ্ঞানী। আন্দালুসের জায়ানে জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন দামেশকে। ‘আল-আলফিয়্যাহ' তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। দেখুন, ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলি, শাযারাতুয যাহাব ফি আখবারি মান যাহাব, খ. ৫, পৃ. ৩৩৯।
৭৬৭. ইবনে হিশাম আল-আনসারি : জামালুদ্দিন আবদুল্লাহ ইবনে ইউসুফ ইবনে আহমাদ (৭০৮-৭৬১ হি./১৩০৯-১৩৬০ খ্রি.)। আরবি ভাষার ইমাম, বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ। মিশরে জন্মগ্রহণ করেন এবং এখানেই মৃত্যুবরণ করেন। مغني اللبيب عن كتب الأعاريب তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। দেখুন, ইবনে হাজার আসকালানি, আদ-দুরারুল কামিনাহ, খ. ৩, পৃ. ৯২-৯৪।
৭৬৮. ইবনে আকিল : বাহাউদ্দিন আবদুল্লাহ ইবনে আবদুর রহমান আল-কুরাশি (৬৯৪-৭৬৯ হি./১২৯৪-১৩৬৭ খ্রি.)। বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ। আবু হাইয়ান তার সম্পর্কে বলেছেন, আকাশের নিচে তার মতো বড় ব্যাকরণবিদ আর নেই। জন্ম ও মৃত্যু কায়রোতে। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : الجامع النفيس، مختصر الشرح الكبير، شرح ابن عقيل على ألفية ابن مالك দেখুন, ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলি, শাযারাতুয যাহাব ফি আখবারি মান যাহাব, খ. ৬, পৃ. ২১৪।
৭৬৯. উমর আল-আসআদ, মাআলিমুল আরুয ওয়াল-কাফিয়া, পৃ. ১১; মুহাম্মাদ আলি আশ-শাওয়াবাকাহ ও আনওয়ার আবু সুওয়াইলিম, মুজাম মুসতালাحاتিল আরুয ওয়াল-কাফিয়া, পৃ. ১৭৭; খতিব আত-তাবরিযি, আল-ওয়াফি ফিল-আরুয ওয়াল-কাওয়াফি, পৃ. ৩২-৩৩।
৭৭০. ছন্দের পরিমাপে পরিবর্তন-বিশেষ। পুরো কবিতায় একই পরিবর্তন জরুরি।
৭৭১. ছন্দ ও মাত্রায় পরিবর্তন, পুরো কবিতায় পরিবর্তনের সামঞ্জস্য বিধান জরুরি।
৭৭২. সাইয়িদ আহমাদ আল-হাশিমি, মিযানুয যাহাব ফি সানাআতি শিরিল আরাব, পৃ. ৫।
৭৭৩. আবু নাস্ত্র ইসমাইল ইবনে হাম্মাদ আল-জাওহারি আল-ফারাবি (মৃ. ৩৯৮ হি./১০০৭ খ্রি.)। ভাষাবিদ ও অভিধান-প্রণেতা। তৎকালীন তুর্কিস্তানের ফারাবে জন্মগ্রহণ করেন। ফারাব বর্তমানে কাজাখস্তানের অন্তর্গত। বিখ্যাত দার্শনিক আল-ফারাবি তার মামা। তার বিখ্যাত গ্রন্থ تاج اللغة وصحاح العربية যা 'আস-সিহাহ' নামে পরিচিত। ব্যাকরণ ও ছন্দশাস্ত্র নিয়েও তার গ্রন্থ রয়েছে। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ৯, পৃ. ৬৯।
৭৭৪. আখফাশ আল-আকবার : আবুল খাত্তাব আবদুল হামিদ ইবনে আবদুল মাজিদ। আল-আখফাশ আল-আকবার নামে সমধিক পরিচিত। বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ। তার উল্লেখযোগ্য ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেন সিবাওয়াইহ, ইউনুস ইবনে হাবিব, ঈসা ইবনে উমর, আবু উবাইদা মা'মার, আবু যায়দ আল-আনসারি, আল-আসমায়ি। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৩, পৃ. ২৮৮।
৭৭৫. সিদ্দিক হাসান খান আল-কনৌজি, আবজাদুল উলুম, খ. ২, পৃ. ৩৮১-৩৮২।
৭৭৬. হামযাহ আল-ইস্পাহানি: আবু আবদুল্লাহ হামযাহ ইবনুল হাসান আল-ইস্পাহানি (২৮০-৩৬০ হি./৮৯৩-৯৭০ খ্রি.)। ইতিহাসবিদ, সাহিত্যিক। ইরানের ইস্ফাহানে জন্মগ্রহণ করেন। বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : تاريخ سني ملوك الأرض، التنبيه على حدوث التصحيف والأنبياء। 'তারিখু আসবাহান' তার আরেকটি বিখ্যাত গ্রন্থ। দেখুন, মুস্তাফা জালবি (হাজি খলিফা), কাশফুয যুনুন, খ. ১, পৃ. ২৮২, ২৮৫, ৩০১; যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ২, পৃ. ২৭৭।
৭৭৭. ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ২, পৃ. ২৪৫।
৭৭৮. আল-ইয়াফিয়ি: আফিফুদ্দিন আবদুল্লাহ ইবনে আসআদ ইবনে আলি (৬৯৮-৭৬৮ হি./১২৯৮-১৩৬৭ খ্রি.)। ইতিহাসবিদ, গবেষক, সুফি সাধক, ইয়ামেনের শাফিয়িয়্যাহ বংশোদ্ভূত। আন্নে জন্ম এবং মক্কায় মৃত্যু। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : مرأة الجنان وعبرة اليقظان في معرفة حوادث الزمان وتقلب أحوال الإنسان وتاريخ موت بعض المشهورين من الأعيان نشر المحاسن، الغالية في فضائل المشايخ أولي المقامات العالية مختصر الدر النظيم في فضائل القرآن العظيم والآيات، والذكر الحكيم روض البصائر ورياض الأبصار في معالم الأقطار والأنهار الكبار ) দেখুন, ইবনে হাজার আসকালানি, আদ-দুরারুল কামিনাহ, খ. ৩, পৃ. ১৮-২০।
৭৭৯. আল-ইয়াফিয়ি, মিরআতুল জিনান ওয়া ইবরাতুল ইয়াকযান ফি মারিফাতি হাওয়াদিসিয যামান, খ. ১, পৃ. ১৬৫।
৭৮০. ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ২, পৃ. ২৪৪; সিদ্দিক হাসান খান আল-কনৌজি, আবজাদুল উলুম, খ. ৩, পৃ. ৪।
৭৮১. উমর আল-আসআদ, মাআলিমুল আরুদ ওয়াল-কাফিয়া, পৃ. ১৬; মুহাম্মাদ আবদুল মুনয়িম খাফাজি ও আবদুল আযিয শারফ, আল-উসুলুল ফান্নিয়্যাহ লি-আওযানিশ শিরিল আরাবি, পৃ. ২০-২১।
৭৮২. সাইয়িদ আহমাদ আল-হাশিমি, মিযানুয যাহাব ফি সানাআতি শিরিল আরাব, পৃ. ২৯।
৭৮৩. ইবনুল হাজিব: আবু আমর উসমান ইবনে উমর ইবনে আবু বকর (৫৭০-৬৪৬ হি./১১৭৪-১২৪৯ খ্রি.)। মালিকি ঘরানার ফকিহ ও ভাষাবিজ্ঞানী। মিশরের মালভূমিতে জন্মগ্রহণ করেন এবং আলেকজান্দ্রিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: আলজামি বাইনাল উম্মাহাত ফিল ফিকহ, কাফিয়া যবিল আরব ফি মা’রিফা কালামিল আরব। দেখুন, ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলি, শাযারাতুয যাহাব ফি আখবারি মান যাহাব, খ. ৫, পৃ. ২৩৪।
৭৮৪. খতিব তাবরিযি: আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনে আলি ইবনে মুহাম্মাদ আশ-শাইবানি আল-লুগাবি আল-খাতিব (৪২১-৫০২ হি./১০৩০-১১০৯ খ্রি.)। তাবরিযে জন্মগ্রহণ করেন এবং বাগদাদে বড় হন। সিরিয়া ও মিশর ভ্রমণ করেন। বাগদাদে মৃত্যুবরণ করেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: শারহু দিওয়ানিল হামাসাহ লি আবি তাম্মাম, তাহজিব ইসলাহিল মানতিক লি ইবনুস সিক্কিত, আল-মুলাখ্খাস ফি ইরাবিল কুরআন, শারহু ইখতিয়ারাতিল মুফাদ্দাল আদ্দাবি, আল-ওয়াফি ফিল আরুজ ওয়াল কাওয়াফি, শারহু শি’রিল মুতানাব্বি। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ’লাম, খ. ৮, পৃ. ১৫৭; ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আয়ান, খ. ৬, পৃ. ১৯১।
৭৮৫. আমিনুদ্দিন আল-মাহাল্লি: আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনে আলি ইবনে মুসা ইবনে আবদুর রহমান আল-আনসারি (৬০০-৬৭৩ হি.)। ভালো ভালো কবিতা লিখেছেন। কয়েকটি ভালো বইও লিখেছেন। উল্লেখযোগ্য বই : উরজুজা ফিল আরুজ। দেখুন, সুয়ুতি, বুগয়াতুল উয়াত ফি তাবাকাতিল লুগাবিয়্যিন ওয়ান-নুহাত, খ. ১, পৃ. ১৯২।
৭৮৬. হাজি খলিফা, কাশফুয যুনুন, খ. ২, পৃ. ১১৩৩-১১৩৪।
৭৮৭. আল-মাওসুআতুল আরাবিয়‍্যাতুল আলামিয়‍্যাহ, ডিজিটাল ইলেক্ট্রনিক ভার্সন, সৌদি আরব, ২৪২৫ হি./২০০৪ খ্রি.।
৭৮৮. আদনান আল-খতিব, আল-মুজামুল আরাবি বাইনাল মাযি ওয়াল-হাযির, পৃ. ৫।
৭৮৯. আল-মাজাল্লাতুল আরাবিয়্যাহ, সংখ্যা ৩৩৪, বর্ষ ২৯, যিলকদ ১৪২৫ হি./জানুয়ারি ২০০৫ খ্রি.।
৭৯০. ইবনে মানযুর (মৃ. ৭৯০ হি.), লিসানুল আরব।
৭৯১. আদনান আল-খতিব, আল-মুজামুল আরাবি বাইনাল মাযি ওয়াল-হাযির, পৃ. ৫।
৭৯২. আবান ইবনে তাগলিব : আবু সাঈদ আবান ইবনে তাগলিব ইবনে রাবাহ আল-বাকরি আল-জারিফি আল-কুফি (ম. ১৪১ হি./৭৫৮ খ্রি.)। রাবি, মুফাসসির, মুহাদ্দিস, কারি, ভাষাবিদ ও সাহিত্যিক। শিয়াঘ্নী। ইয়াকুল আবিদিন ইবনুল হুসাইনের সহচর। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : গরিবুছ্ সহিহ্, صنين القران, যিরিকলি, আল-আলাম, ৪, ১, পৃ. ২৬।
৭৯৩. আবু ফায়েদ মুআররিজ : আবু ফায়েদ মুআররিজ ইবনে আমর আস-সাদুসি (ম. ১৫৫ হি./৮৭০ খ্রি.)। আরবি ভাষাবিদ ও ব্যাকরণবিদ। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : জাহেরুল ফানালি, গরিব কুরআন, প্রভূতি, البلمة في تراجم أسماة النحو واللغة, দেখুন, ফায়েকুজ্জাদি।
৭৯৪. খলিল ইবনে আহমাদ, মুআজজমুল আইন, তারকিব, আবদুল হামিদ হিসাবদিবি, ৪. ১, পৃ. ১৫।
৭৯৫. আবু মনসুর আল-আজহারি : আবু মনসুর মুহাম্মদ ইবনে আহমাদ ইবনে আজহার আল-হারাবি (২৬২-৩৭০ হি./৮৭৫-৯৮১ খ্রি.)। ভাষা ও সাহিত্যের ইমাম। খুরাসানের হেরাতে জন্ম ও মৃত্যু। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : كتاب التفسير, تفسير الفاظ المزني, علل القراءات, كتاب الروح, كتاب الأسماء الحسنى, شرح ديوان أبى تمام, تفسير إصلاح المنطق। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, ৪, পৃ. ৩০৪।
৭৯৬. ইবনে ফারিস: আবুল হুসাইন আহমাদ ইবনে ফারিস ইবনে যাকারিয়া (৩২৯-৩৯৫ হি./৯৪১-১০০৪ খ্রি.)। আরবি ভাষা ও সাহিত্যের ইমাম। কাযবিনে জন্মগ্রহণ করেন, তারপর রায় শহরে গমন করেন এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: معجم مقاييس اللغة الإتباع والمزاوجه اختلاف النحويين، أخلاق النبي صلى الله عليه وسلم ! দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ১, পৃ. ১১৮।
৭৯৭. কুরাউন নাম্ল: আবুল হাসান আলি ইবনুল হাসান আল-হুনায়ি (মৃ. ৩১০ হি./৯২২ খ্রি.)। আরবি ভাষাবিদ। মিশরের অধিবাসী। 'আল-মুনায্যাদ' তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ২০, পৃ. ২০৯।
৭৯৮. মুরতাযা আয-যাবিদি: আবুল ফায়দ মুহাম্মাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আবদুর রাজ্জাক, তার উপাধি মুরতাযা (১১৪৫-১২০৫ হি./১৭৩২-১৭৯০ খ্রি.)। ভাষা, হাদিস, রিজালশাস্ত্র ও বংশবিদ্যায় অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী। ভারতবর্ষের উত্তরপ্রদেশের হারদুয়ি জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পূর্বপুরুষ ছিলেন ইরাকের ওয়াসিত শহরের বাসিন্দা। তার মা-বাবা তাকে নিয়ে ইয়ামেনের হাজরামাউতে চলে যান। ১২০৫ হিজরিতে মিশরে এক মহামারিতে মৃত্যুবরণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: تاج العروس من جواهر القاموس (203) ، إتحاف السادة المتقين في شرح إحياء علوم الدين للغزالي ( 20) أسانيد الكتب الستة عقود الجواهر المنيفة في أدلة مذهب الإمام أبي حنيفة كشف اللثام عن آداب الإيمان والإسلام، رفع الشكوى وترويح القلوب في ذكر ملوك بني أيوب )
৭৯৯. আবদুর রহমান ইবনে ঈসা আল-হামাদানি (মৃ. ৩২০ হি./৯৩২ খ্রি.) ছিলেন বিখ্যাত লিখন-শিল্পী। আমির বকর ইবনে আবদুল আযিয আল-আজালির চিঠিপত্রের লেখক ছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ 'আল-আলফাযুল কিতাবিয়্যাহ'। তার এই গ্রন্থ সম্পর্কে সাহিব ইবনে আব্বাদ বলেন, তিনি কিছু পৃষ্ঠায় আরবি ভাষার মূল্যবান মুক্তারাশি একত্র করেছেন। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৩, পৃ. ৩২১।
৮০০. কুদামা ইবনে জাফর: আবুল ফারাজ কুদামা ইবনে জাফর ইবনে কুদামা (মৃত্যু: ৩৩৭ হি./৯৪৮ খ্রি.)। লিখন-শিল্পী। যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনশাস্ত্রে অভিজ্ঞ। বাগদাদে মৃত্যুবরণ করেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : كتاب صناعة الكتابة، كتاب الخراج، كتاب نقد الشعر। দেখুন, ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ১১, পৃ. ২২০।
৮০১. আবু হিলাল আল-আসকারি: আবু হিলাল হাসান ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে সাহল (৯২০-১০০৫ খ্রি.)। সাহিত্যে পণ্ডিত ছিলেন। কবিতা লিখেছেন। ফিকহেও ব্যুৎপত্তি ছিল। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : شرح الحماسة، جمهرة الأمثال الفروق في اللغة ديوان المعاني المحاسن في تفسير القرآن | দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ১২, পৃ. ৫০।
৮০২. সাআলিবি: আবু মানসুর আবদুল মালিক ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাইল (৩৫০-৪২৯ হি./৯৬১-১০৩৮ খ্রি.)। ভাষা ও সাহিত্যের ইমাম। নিশাপুরের অধিবাসী ছিলেন। 'ইয়াতিমাতুদ দাহর' তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ১৯, পৃ. ১৩০।
৮০৩. ইবনে সিদাহ আল-আন্দালুসি: আবুল হাসান আলি ইবনে ইসমাইল, ইবনে সিদাহ আল-মুরসি নামে পরিচিত (৩৯৮-৪৫৮ হি./১০০৭-১০৬৬ খ্রি.)। ভাষাবিজ্ঞানী ও অভিধানবেত্তা। আন্দালুসের মুরসিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন দায়িনায়। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: المخصص المحكم والمحيط الأعظم، الأنيق، شرح إصلاح المنطق، شرح ما أشكل من شعر المتنبي، العلام في اللغة على الأجناس، العالم والمتعلم، الوافي في علم أحكام القوافي |
৮০৪. আদনান আল-খতিব, আল-মুজামুল আরাবি বাইনাল মাযি ওয়াল-হাযির, পৃ. ৩৭-৪৬।
৮০৫. আহমাদ মুখতার উমর, আল-বাহসুল লুগাবি ইনদাল আরাব, পৃ. ৩৪৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00